ব্যর্থ নমস্কার

প্রথমে ভেবেছিলাম এই বিষয়ে একটা লাইনও লিখব না। প্রবৃত্তি হচ্ছিল না। বাস্তবিক যা ঘটেছে এবং ঘটছে তা দেখে বমি পাচ্ছিল। কিন্তু শেষ অব্দি ভেবে দেখলাম ইতরামির স্বর্ণযুগে প্রবৃত্তির দোহাই দিয়ে চুপ করে থাকা অপরাধমূলক কাজ। যারা ভালবাসো, অন্তর হতে বিদ্বেষ বিষ নাশো ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলেছিলেন, দুর্দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের কবীন্দ্র স্বয়ং তাঁদের ব্যর্থ নমস্কারে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি কোন হরিদাস পাল? তাই সংক্ষেপে কয়েকটা কথা বমি করার মত করেই উগরে দিই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি কেন ভাঙা হয়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অত বিশালকায় বাঙালি আর কে-ই বা আছেন? ওঁকে না ভাঙলে বাংলাকে কী করে ভাঙা যাবে? আমার নিজের অন্তত কারা ভেঙেছে তা নিয়েও কোন সন্দেহ নেই, যতক্ষণ না তদন্ত অন্যরকম প্রমাণ করছে। কিন্তু বলার কথা এই যে বাঙালির ভণ্ডামি যারা মূর্তি ভেঙেছে তাদেরই হাত শক্ত করছে।
যত লোক ফেসবুকে বিদ্যাসাগরকে ডিপি বানিয়েছে তার অর্ধেকও যদি ফেসবুকে বাংলায় পোস্ট করার অভ্যাস রাখত, হোয়াটস্যাপে বাংলায় চ্যাট করত তাহলে বাংলার রাজধানীতে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার সাহস কারো হত না। কলকাতা জুড়ে কয়েকশো ইংরিজি মাধ্যম স্কুল। সেই স্কুলে পাঠরত লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলেমেয়ে যদি অন্তত দ্বিতীয় ভাষা হিসাবেও বাংলা পড়ত, তাহলে আমাদের বিদ্যাসাগরকে নিয়ে গদগদ হওয়ার একটা মানে থাকত। কিন্তু তারা পড়ে হিন্দি। বাবা-মায়েরা গর্ব করেন “জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না।“ এদিকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হয়েছে বলে লোকে কেঁদে ভাসাচ্ছে।
রাজ্যের বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো শিক্ষক শিক্ষিকার অভাবে ধুঁকছে, ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বেশিদিন আগের কথা নয়, স্বয়ং বিদ্যাসাগরের প্রতিষ্ঠা করা স্কুল বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল। আমাদের মধ্যে যাঁদের কথা কম, কাজ বেশি তাঁরা আপাতত বাঁচিয়েছেন। আমরা কেউ সেসব নিয়ে ভাবি? বিদ্যাসাগর অবিভক্ত বাংলায় ঘুরে ঘুরে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। কেন? যাতে শিক্ষার আলো সবচেয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে, সবচেয়ে গরীব মানুষটার ঘরেও পৌঁছায়। এবং সেটা সম্ভব একমাত্র জোরালো সরকারপোষিত শিক্ষাব্যবস্থা থাকলে তবেই। অথচ আমাদের এখানে সরকারী শিক্ষাব্যবস্থার মুমূর্ষু অবস্থা নিয়ে আমাদের কারোর মাথা ব্যথা আছে? বেসরকারী স্কুলগুলোর বেশি ফি এর জন্যে মুখ্যমন্ত্রী একদিন মালিকদের ডেকে ধমকালেই তো আমরা খুশি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা গোল্লায় যাক, যতক্ষণ হাতে কলমে মূর্তি না ভাঙা হচ্ছে ততক্ষণ সব ঠিক আছে। মাস দুয়েক আগে কলকাতা শহরের বুকে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা রোদ বৃষ্টি মাথায় করে না খেয়ে রাস্তায় বসেছিলেন। একদিন দুদিন নয়, আঠাশ দিন। কজন গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন আর কটা ফেসবুক পোস্ট দেখেছি পরিষ্কার মনে আছে। শিক্ষকের দুঃখে যার প্রাণ কাঁদে না সে কিরকম বিদ্যাসাগরপ্রেমী?
আরো মোটা দাগে বলব? বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতিরও কম অসম্মান কলকাতার বুকে মূর্তি ভাঙার আগে থেকেই হয়নি। লুকিয়ে চুরিয়ে হয়নি, আমার আপনার চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করিনি, আমাদের অগ্রগামী শিল্পী, সাহিত্যিক, অধ্যাপকরাও করেননি। গোটা শহর ছেয়ে গেছে বিভিন্ন মনীষীদের উক্তি সম্বলিত হোর্ডিংয়ে, যার মধ্যে বিদ্যাসাগরও আছেন। সঙ্গের ছবিটি কিন্তু সেই মনীষীদের নয়, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর। আরেক ধরণের হোর্ডিংয়ে বাংলার মনীষীদের সঙ্গে এক সারিতে বসানো হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীকে। সেই হোর্ডিংও আলো (বা অন্ধকার) করে রেখেছে শহরের আকাশ। কারো মনে হয়নি ব্যাপারটা অন্যায়, অশ্লীল? বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত? আমরা কি অপেক্ষা করছিলাম কবে বিদাসাগরের মুন্ডুটা আছড়ে মাটিতে ফেলা হবে তার জন্যে?
আর একটা কথা বলার আছে। বাংলার সংস্কৃতি আক্রান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু চট করে ব্যাপারটা যেরকম বাঙালি বনাম অবাঙালি করে ফেলা হয়েছে তা শুধু সঙ্কটটাকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। লড়াইটা আসলে ভাল বনাম মন্দের, বাঙালি বনাম অবাঙালির নয়। বাঙালিকে নিজভূমে পরবাসী হতে কেউ জোর করেনি।
অফিসে কাজ করতে করতে ক্ষিদে পেলে সুইগি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনাই। গত এক দেড় মাসে দুবার দুজন ডেলিভারি বয় খাবার নিয়ে এসে আমাকে ফোন করে হিন্দিতে কথা বলেছে। একজনের পদবী হালদার, অন্যজনের সাহা। তবু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে তাঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম “ভাই, আপনি বাঙালি তো?” সদর্থক উত্তর পেয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমার পদবি বন্দ্যোপাধ্যায় দেখেও কেন হিন্দিতে কথা বললেন। দুজনেই জানালেন আজকাল বাঙালি খদ্দেররা নাকি বাংলায় কথা বললে বুঝতেই পারেন না। এ জিনিস বাঙালিকে বড়বাজারের গদির কোন মারোয়াড়ি শেখাননি, ভবানীপুরের পাঞ্জাবীরাও শেখাননি। ঠিক যেমন বাঙালি মেয়ের বিয়েতে সঙ্গীত করতে হবে এমনটা কোন অবাঙালি মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দাবী করেননি, বাঙালি বর বৌভাতে শেরওয়ানি না পরলে ভোটার লিস্ট থেকে নাম কেটে দেওয়া হবে, এমনটাও কোন অবাঙালি রাজনীতিবিদ হুমকি দেননি। হিন্দিকে বাংলার মাথায় চাপিয়েছে বাঙালি নিজেই। যে কারণে শহুরে, লেখাপড়া জানা বাঙালির বিদ্যাসাগরের জন্যে এই হঠাৎ আবেগকে মড়াকান্নার বেশি কিছু বলা শক্ত।
বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত করা শুরু হয়েছে তখন থেকে যখন বাংলার অধিকাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও যেখানে সেখানে রাজনৈতিক হোর্ডিং লেখা শুরু হয়েছে উর্দুতে। প্রবল আঘাত করা হয়েছে তখন যখন হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। বিরাট আঘাত নেমে এসেছে তখন যখন কলকাতার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রাঙ্গণে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, অজয় কর, নিদেনপক্ষে উত্তম কুমার বা সুচিত্রা সেনের বদলে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন নেত্রীর ঢাউস প্রতিকৃতি টাঙানো হয়েছে। পঞ্চধাতুর বা দুশো ফুটের বিদ্যাসাগর মূর্তি বানিয়ে এই ক্ষতি পূরণীয় নয়। এবং এ ক্ষতি অবাঙালিরা কেউ করেনি।
বিদ্যাসাগরকে রাধাকান্ত দেব, রসময় দত্তর মত বাঙালিদের বিরুদ্ধেই লড়তে হয়েছিল। তাই অনেকে যে বলছেন “বাঙালিকে সব বিভেদ ভুলে এক হতে হবে”, সেকথা একেবারে ভুল। বরং বাঙালিকে পক্ষ নিতে হবে। ঠিক করতে হবে সে বিদ্যাসাগরের পক্ষে না রাধাকান্তদের পক্ষে। কথায় এবং কাজে আমাদের রামমোহন, বিদ্যাসাগরের আত্মীয় ছিলেন মহারাষ্ট্রের আত্মারাম পান্ডুরঙ্গ, জ্যোতিরাও ফুলেরা। ঠিক তেমনি সেদিন যাঁরা বিদ্যাসাগরকে অকথা কুকথা বলেছেন, প্রাণ নাশের চেষ্টা করেছেন তাঁদের উত্তরসূরী আজকের মোদী, অমিত শাহরা। অতএব হিন্দি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে বাঙালি জাতীয়তাবাদের অতিসরলীকরণ দিয়ে এ লড়াই লড়া যাবে না। ওভাবে লড়লে বড়জোর কারো নির্বাচনী লড়াইয়ে সুবিধা হতে পারে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আড়ালে নিজেদের অপসংস্কৃতি লুকিয়ে ফেলার সুবিধা হতে পারে।
পুনশ্চ: অধুনা যে হাওয়া তাতে এই লেখাটাকে বামের রাম হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসাবে চালানো হবে হয়ত। হলে আমি নিরুপায় কারণ আমি ছোট থেকে অঙ্কে কাঁচা। বাইনারি বুঝি না।

লেখাপড়া করে যে-ই

মোদ্দাকথা পড়াশোনা হোক সেটা সরকার চায় না। কেন্দ্রীয় সরকারও চায় না, রাজ্য সরকারও চায় না।
যাঁরা ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকারের বিরুদ্ধে তাঁদের মধ্যে দুরকম মত আছে। এক দল মনে করেন ছাত্রদের শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা উচিৎ, আর কিছু করা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। আরেক দল মানুষের মতে রাজনীতি করতে পারে, কিন্তু সে রাজনীতির দাবীদাওয়া হওয়া উচিৎ একান্ত ছাত্রদের। ক্যাম্পাসের বাইরের কোন ঘটনার অভিঘাত সেখানে থাকা চলবে না। এই মতগুলোর ভাল মন্দের মধ্যে যাচ্ছি না। কিন্তু দুরকম মতের লোকেরাই নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে এ রাজ্যের এবং এ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কত কয়েক বছর ধরে যা চলছে তা সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ায় প্রভাব ফ্যালে। সুতরাং সেগুলোকে ভুলে বই মুখে গুঁজে বসে থেকে তাদের বিশেষ লাভ নেই। কারণ পড়ার পরিবেশ এবং উদ্দেশ্যই নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
স্কুলে বাংলার শিক্ষক নেই। সে জায়গা পূরণ করা দীর্ঘদিনের দাবী। অথচ এসে হাজির হলেন উর্দু আর সংস্কৃতের শিক্ষকরা। ছাত্রদের মধ্যে অসন্তোষ, হতেই পারে কিছু বাইরের লোকও তাদের অসন্তোষে ঘৃতাহুতি করেছে। একটা এলাকার স্কুল কলেজের সাথে সেই এলাকার সমস্ত মানুষেরই স্বার্থ জড়িত আছে, বিশেষত সরকারপোষিত স্কুলগুলোর সাথে। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্তরা এখন ছেলেমেয়েকে অমুক ইন্টারন্যাশনাল, তমুক পাবলিক স্কুলে পাঠাতে পারেন। গরীব, নিম্নবিত্ত ছেলেমেয়েদের জন্যে এখনো যে সরকারী স্কুলই ভরসা। ফলে বহিরাগত আপনি বলবেন কাকে? তাছাড়া কোন রাজনীতিবিদ এসে দিদিমণিকে জগ ছুঁড়ে মারলে যখন বহিরাগতর প্রশ্ন ওঠে না, তখন এ বেলাতেই বা সে প্রশ্ন কেন উঠবে?
ইসলামপুর নিয়ে পক্ষ নিতেই হবে কারণ ইসলামপুর প্রথম ঘটনা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। দীর্ঘ তিন চার দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে যে চাকরিটা যোগ্যতা থাকলেই পাওয়া যায় বলে লোকে জানত সেটা হল স্কুল শিক্ষকের চাকরি। সেখানেও দুর্নীতি, স্বজনপোষণ ঢুকে পড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নেট বা স্লেট পরীক্ষার আদলে স্কুল সার্ভিস পরীক্ষা চালু হয়। বর্তমান সরকার আসার পরে সেই পরীক্ষা নিয়মিত হয় না, হলেও কে পাশ করল আর কে চাকরি পেল তা ভগবান আর সরকার ছাড়া কাক পক্ষীতেও টের পায় না। বেসরকারী ক্ষেত্রে কাজ করা লোকেরা বিশ্বায়নের যুগে কর্মক্ষেত্রে আন্দোলন করার অধিকার হারিয়েছে, সরকারী কর্মচারীদের সে অধিকার বজায় আছে বলে জানা ছিল। কিন্তু শিক্ষকদের অধিকারের এমনই চেহারা যে এক সহকর্মীর ভোট করাতে গিয়ে রহস্যমৃত্যুর তদন্ত চাইলেও হাজতবাস করতে হয়, মার খেতে হয়। স্কুল চত্বরেও বিভিন্ন শ্রী সামলাতে সামলাতে লেখাপড়ার বিশ্রী অবস্থা মেনে নিতে হচ্ছে মাস্টারমশাই-দিদিমণিদের।
এদিকে কলেজগুলো চলছে একগাদা আংশিক সময়ের অধ্যাপকদের দিয়ে। তরুণ মেধাবীরা প্রায় ঠিকে ঝিতে পর্যবসিত। তারা এবং প্রবীণরা সর্বদাই আতঙ্কে আছেন, কখন ছাত্র সংসদ বা অন্য কারো কোপদৃষ্টি পড়ে। মারধোর না খেয়ে সসম্মানে বাড়ি ফিরতেই পারলেই যথেষ্ট, পড়ানোয় আর মন দেবেন কখন?
উল্টোদিকে কলেজ ভর্তি হতে গেলে কয়েক হাজার বা লক্ষ টাকা তোলা দিতে হবে ছাত্র সংসদকে। অথচ ছাত্র সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু কলেজে। আন্দোলনের দাবী ন্যায্য, অন্যায্য যা-ই হোক, যাদবপুর থেকে বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বত্র সরকার এবং প্রধানদের সমাধান হল “পুলিশ ডাকো আর ঠ্যাঙাও।” এও মোটামুটি স্বতঃসিদ্ধ যে ছাত্রদের কোন দাবী থাকতে নেই। অতএব হোস্টেলে থাকার জায়গা আদায় করতে হলেও তাদের হয় মেডিকাল কলেজের মত অনশন করতে হবে, নয় প্রেসিডেন্সির মত কলেজের গেটে তালা ঝুলিয়ে বলতে হবে “হোস্টেল দাও তবে তালা খুলব।” সুবিধামত সরকার কোথাও বলবে “এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” আর কোথাও “সরকারের টাকায় চলবে, সরকারের কথা শুনবে না?” ওদিকে মালদার স্বীকৃতিবিহীন কলেজটার ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন এখনো চলছে, কলকাতার বুকে। ওদের জন্যে কেউ কোন সমাধান খুঁজছেন কিনা কে জানে?
আপনি যদি শিক্ষিত যুবক/যুবতী বা তাদের বাবা-মা হন, আপনি ভাবতেই পারেন “এ রাজ্যটা একেবারে গেছে। ওকে বাইরে পাঠিয়ে দেব।” কিন্তু তাতেও নিস্তার নেই। সমস্ত সরকারী বা বেসরকারী সমীক্ষায় দেশের যে বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় প্রথম সারিতে (যদি প্রথম না হয়) থাকে, সেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারী পার্টির ছাত্র সংগঠন মারদাঙ্গা করেও সংসদ দখল করতে পারেনি। সেই রাগে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলে দিয়েছেন ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে “ভারতবিরোধী শক্তি” কাজ করছে। অর্থাৎ দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের ভারত সরকার শত্রু হিসাবে দেগে দিল। তার কয়েকদিন আগেই দিল্লীর জাকির হুসেন কলেজেও সংসদ নির্বাচনের দিন তাণ্ডব চলেছে।
গত পাঁচ বছরে ভারত সরকারের নিশানায় জেএনইউ ছাড়াও এসেছে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিগড় প্রভৃতি। ক্যান্টিনে এটা কেন, ওটা কেন নয়? অমুক জায়গায় তমুকের ছবি ঝুলছে কেন? আবোল তাবোল ছুতোয় পড়াশোনা নষ্ট করে দেওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে, চলবে।
কোথায় কেমন লেখাপড়া হচ্ছে তা নিয়ে সরকার বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢাউস জাতীয় পতাকা টাঙাতে ব্যস্ত, সাঁজোয়া গাড়ি রাখতে চায়। অবশ্য শুধু চায় বললে এই সরকারের সক্রিয়তাকে নেহাতই অসম্মান করা হয়। খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন ২৯শে সেপ্টেম্বর তারিখটা সার্জিকাল স্ট্রাইক দিবস হিসাবে পালন করতে হবে। সেদিন এন সি সি প্যারেড করতে হবে, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে সেনাবাহিনীর প্রশংসাসূচক ডিজিটাল বা সত্যিকারের কার্ড বানাতে হবে, দিল্লীতে এবং সব রাজ্যের রাজধানীতে এই উপলক্ষে যে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের সেখানে যেতে উৎসাহ দিতে হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ততটা পড়াশোনার জায়গা নয় যতটা দেশপ্রেমের প্রদর্শনীর জায়গা।
অবশ্য এর জন্যে মঞ্জুরি কমিশনের উপর রাগ না করাই ভাল। সে বেচারা নিজেই তো আর দুদিন পর থাকবে না। পরিকল্পনা কমিশন গিয়ে নীতি আয়োগ এসেছে, যার প্রয়োগ সম্বন্ধে রচনা লিখতে দিলে চেয়ারম্যান নিজেও মাথা চুলকোবেন। আগামী দিনে মঞ্জুরি কমিশন গিয়ে কোন এক জো হুজুরি কমিশন আসবে নিশ্চয়ই। অবশ্য ওসবের দরকারই বা কী? এখনো তৈরি না হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে যখন সরকার স্বয়ং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়ে দিচ্ছেন তখন আর ন্যাক, ইউজিসি এসব রেখে আয়করদাতার পয়সা নষ্ট করা কেন?
এসবেও অবশ্য অনেকেরই আপত্তি নেই। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে পুষ্পক বিমানের মডেল নিয়ে তো আলোচনা হয়েই গেছে। ফলে বোঝাই যাচ্ছে আধুনিক বিদ্যাগুলো সব ফালতু। ওগুলো শেখার কোন দরকারই নেই। অতএব উঠে যাক না স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে খারাপ লাগে আমার সেইসব বোকা বন্ধুদের জন্যে, যারা গত এক দশক উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন গবেষণাগারে কাজ করে, এ দেশের চেয়ে অনেক উন্নত জীবনযাত্রায় থেকেও ভুলতে পারেনি যে তার লেখাপড়ার খরচ অনেকদিন পর্যন্ত ভাগ করে নিয়েছে এ দেশের রিকশাওয়ালা, পানওয়ালা, লোকের বাড়িতে বাসন মাজে যারা তারা। সেই বোকাগুলো দেশে ফিরে এসে দেশকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাইছে আর কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না তাদের যোগ্যতা কেন দেশে ফিরে আসার জন্যে যথেষ্ট হচ্ছে না। ভাবি তাদের মনে করিয়ে দেব “লেখাপড়া করে যে-ই/অনাহারে মরে সে-ই।/জানার কোন শেষ নাই/জানার চেষ্টা বৃথা তাই।/বিদ্যালাভে লোকসান/নাই অর্থ নাই মান”।
সরকার কেন খাল কেটে উদয়ন পণ্ডিত আনতে যাবে?