আমাদের কেউ নেই

মমতা ব্যানার্জি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির — একথা ঘুমচোখে জিজ্ঞেস করলে বোধহয় পার্থ চ্যাটার্জিও বলবেন না। তবু রাজ্যপালের বিরুদ্ধে আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে অভিযোগ করেছেন সেটাকে অবিশ্বাস করার কারণ দেখছি না। তার কারণ দুটো। প্রথমত, কেশরীনাথ ত্রিপাঠী প্রাক্তন আর এস এস প্রচারক। আর এস এস দ্বারা শিক্ষিত একজন লোক ভারতীয় সংবিধানকে খুব সম্মান করে এবং নিজের সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন না করার ব্যাপারে খুব সচেতন — এরকম দাবী করলে ভক্তরা যা-ই বলুন, প্রেতলোকে গোলওয়ালকর, হেড়গেওয়াররা খুব রেগে যাবেন। দ্বিতীয়ত, বিজেপি ব্লক সভাপতির মত কথা এই ভদ্রলোক বলেই থাকেন। কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও বলেছেন।
কিন্তু সেটা প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হল ওভাবে কথা বলার সুযোগ ত্রিপাঠীমশাইকে কে করে দিল? উত্তর একটাই। মমতা ব্যানার্জি নিজে।
দেড়শো কোটির দেশে আজকাল মানুষ অপ্রতুল, কিন্তু গরুর কোন অভাব নেই। এক গরুর নিজের ভগবানের মহত্ত্বে এত ঠুনকো বিশ্বাস যে অন্যের ধর্মস্থানে তাঁকে না বসালে শরীরটা বেশ হিন্দু হিন্দু লাগে না। আরেকপাল গরুর আবার নিজের ধর্মের উপরে বিশ্বাস এত ঠুনকো যে সামান্য ফটোশপের ধাক্কাতেই তার অপমান হয় এবং ভাঙচুর, বাড়ি পোড়ানো, মারধর (গণপিটুনিরও দাবী ছিল) না করলে নিজেদের যথেষ্ট মুসলমান মনে হয় না।
কিন্তু কথা হচ্ছে মনে মনে তো অমন অনেকেই ভাবে। এই পরিমাণ হিংসা ছড়ানোর সাহস এদের হয় কখন? তখনই হয় যখন বিশ্বাস থাকে যে “আমার কিস্যু হবে না।” মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই বিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল কোন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ছিল না। ২০১১ র পর থেকে, ২০১৬ র পরে বিশেষত, একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে। সৌভাগ্যক্রমে এর জেরে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানি হয়নি, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। নইলে আরো বড় আকার নিত। এই ঘটনাগুলোর সবকটাতেই পুলিশ পৌঁছেছে হিন্দী সিনেমার পুলিশের মত দেরীতে। মালদা, চন্দননগর, ধূলাগড়, খড়গপুর, নদীয়া, অধুনা বাদুড়িয়া — এই সংঘর্ষগুলো কেন আগে থাকতে আটকানো গেল না সেটাও বড় প্রশ্ন। প্ররোচনা যে যাকেই দিয়ে থাক, সে প্ররোচনায় আগুন জ্বলার আগেই জল ঢালা গেল না কেন? সরকারের গোয়েন্দা বিভাগ তাহলে আছে কী করতে?
আসল কথা মমতা এক ভয়ঙ্কর খেলা শুরু করেছিলেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। বিজেপির হিন্দু মৌলবাদের মোকাবিলা করার বদলে মুসলমান মৌলবাদীদের তোল্লাই দিচ্ছিলেন। বস্তুত ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই দিচ্ছিলেন। মুসলমানদের উন্নয়নের জন্যে হাতেকলমে কিছু করার বদলে নজর ছিল মাথায় কাপড় দিয়ে নমাজ পড়ার ভঙ্গিতে ছবি তোলার দিকে। হাস্যকরভাবে সরকারী হোর্ডিং এ লেখা হচ্ছে “নমস্কার এবং সালাম।” যেন বাঙালি মুসলমান কখনো “নমস্কার” শব্দটা উচ্চারণ করে না। এতে কোন গরীব মুসলমানের কোন উপকার হয়নি। যা হয়েছে তা হল ইসলামিক মৌলবাদীদের বিশ্বাস তৈরি যে “দিদি আমাদের কিচ্ছু বলবে না” আর অন্যদিকে হিন্দু মৌলবাদীদের কাজ সহজ করা। তারা দিব্যি হিন্দুদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পারছে “দিদি ওদের লোক। হিন্দুবিরোধী।” একইসঙ্গে মমতার আমলে গ্রামে, মফঃস্বলে গত কয়েকবছরে আর এস এস কিভাবে বেড়েছে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেটাও দিদির ইচ্ছা।
আদরের দিদি ভেবেছিলেন আর এস এস বাড়লে মুসলমানরা ভয় পাবে, তাঁকে রক্ষাকর্ত্রী হিসাবে দেখবে আর ঢেলে ভোট দেবে। অন্যদিকে মুসলমান মৌলবাদীদের ভয়ে হিন্দুরা যদি বিজেপির দিকে ঢলে পড়ে তো পড়ুক। এই মেরুকরণে বেশিরভাগ মুসলমান ভোট আর কিছু হিন্দু ভোট তাঁর দিকে পড়লেই তো কেল্লা ফতে। রামনবমীর মিছিলের পরে বোধহয় বুঝেছেন অঙ্ক মিলছে না, তাই এখন আবার নিজেকে বড় হিন্দু প্রমাণ করতে নেমে পড়েছেন। তাঁর পার্টি বজরংবলীর পুজো করছে। তিনি পুরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছেন, উল্টোরথেও জ্বলজ্বল করছেন। কিন্তু যা হবার তা তো হয়ে গেছে। এখন দুই ধর্মের নেতাদের গরম গরম বাণী দিচ্ছেন। এতদিন যে ইদ্রিশ আলিদের পুষলেন, সে পাপ ভাগীরথীতে ধোয়া যাবে কি?
এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে রাজ্যের প্রধান প্রশাসক কী বললেন? না তিনি রাজ্যপালের কথায় এতটাই অপমানিত যে পদত্যাগ করবেন ভেবেছিলেন। চমৎকার। বাড়িতে ডাকাত পড়েছে, দাদু সুযোগ পেয়ে চেঁচামেচি করছেন আর মা ছেলেমেয়েদের কী করে বাঁচাব সেটা না ভেবে বললেন “আমি অত্যন্ত অপমানিত। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে বেরিয়ে যাব ভাবছিলাম। তারপর ভাবলাম আমি তো শ্বশুরমশাইয়ের মা নই, আমি ছেলেমেয়েদের মা। তাই গেলাম না। কিন্তু যেতে আমার দু মিনিট লাগবে।”
সঙ্কটমুহূর্তে পদত্যাগ যাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া, তিনি হচ্ছেন আমাদের মুখ্য প্রশাসক! আমাদের যে কে বাঁচাবে!
বিঃ দ্রঃ তৃণমূল, বিজেপি, জামাত ইত্যাদি ছাড়াও এ রাজ্যে আরেকটা রাজনৈতিক শক্তি নাকি আছে বলে খবর। তাদের নাম বামফ্রন্ট। তারা গরু নয়, কচ্ছপ। গতকাল কলকাতায় তারা একটা গনগনে মিছিল করেছে। কিসের বিরুদ্ধে? কলেজ স্কোয়ারে মিটিং, মিছিল নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে। নিষিদ্ধ করার ঘোষণাটা হয়েছিল প্রায় মাসখানেক আগে। অতএব ধৈর্য ধরতে হবে। আর মাসখানেক পরে ওঁরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে কিছু একটা করবেন আশা করা যায়।

অখন্ড বাংলা

“মোরা এক সে দেশের খাই গো হাওয়া
এক সে দেশের জল”

“আল্লা মেঘ দে পানি দে
ছায়া দে রে তুই”

“বাংলার মাটি বাংলার জল
বাংলার বায়ু বাংলার ফল
পুণ্য হউক পুণ্য হউক
হে ভগবান”

উপরের পংক্তিগুলো বাংলা ভাষার সম্পদ। “জল” বললেও বাংলা, “পানি” বললেও। যে অন্যকিছু ভাবে সে হয় বাংলাকে, বাঙালিকে চেনে না অথবা বদমাইশ। অসদুদ্দেশ্য আছে, তাই বোকা সাজছে। গত কয়েকশো বছর ধরে যে বাঙালি “জল” বলে আর যে বাঙালি “পানি” বলে তারা পাশাপাশি বাস করছে। কখনো শোনা যায়নি একদল অন্য দলকে বলেছে “তোমায় আমি যা বলছি তা-ই বলতে হবে। নইলে তুমি বাঙালি নও।” বস্তুত কোন বাঙালি হিন্দু হলেই যে “জল” বলবে আর মুসলমান হলেই “পানি”, এই ধারণাগুলোও অতিসরলীকৃত। উপরের পংক্তিগুলোতেই দেখা যাচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী নজরুল ব্রাক্ষ্ম রবীন্দ্রনাথের মতই “জল” লিখেছেন। ইচ্ছা হয়েছে বলে লিখেছেন, পানি লিখলেও মহাভারত অশুদ্ধ হত না। আব্বাসউদ্দিনের গলায় যখন ক্ষরাক্লিষ্ট গ্রাম্য মানুষের বৃষ্টির প্রার্থনা শুনি, “আল্লা” বলছেন বলে তা বিদেশী মনে হয় কি কখনো? বাংলার ভালোর জন্যে নিজের ভগবানের কাছে রবীন্দ্রনাথের উদাত্ত প্রার্থনা সুচিত্রা মিত্রের গলায় কি বিজাতীয় মনে হয় কোন মুসলমান শ্রোতার?
পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন এইরকম কিম্ভূত কিমাকার চিন্তাই করছেন। রামধনু শব্দটা শুনে যে বাঙালির বৃষ্টিদিনের অপরূপ দৃশ্য মনে না পড়ে দাশরথির কথা মনে পড়ে সে যে সুকুমারের দাশরথির চেয়েও বড় পাগল এটা আলাদা করে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই বোধহয়। হেসে উড়িয়ে দেওয়া যেত, যদি এই বিষ পাঠ্যবইয়ে ঢোকানোর চেষ্টা না হত।
বাংলা ভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছিল তারা অনেকেই হয়ত মা-কে আম্মি বলে ডাকত, বাবাকে আব্বা বা আব্বু। আবার বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনেকে মা-কে মা বলেই ডাকতেন। কী তফাত? শামসুর রহমান বাঙালি আর নির্মলেন্দু গুণ হিন্দু বাঙালি? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালি আর সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ মুসলমান বাঙালি? বাঙালি দুরকমের হয় — হিন্দু আর মুসলমান — শিশুদের একথা শিখিয়ে দেওয়া, এ তো নোংরামি! বাঙালি একরকমই — বাঙালি। কেউ ফুল বেলপাতা দিয়ে বিগ্রহের পূজা করেন, কেউ শুধু পশ্চিমদিকে মুখ করে জানু পেতে বসে নিজের ঈশ্বরের আরাধনা করেন। এ তো তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। তা বলে তাঁরা আলাদা!
যদি আলাদাই হবেন তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় এপারের বাঙালি কেন অধীর হয়ে থাকত দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় খবর শোনার জন্যে? কেন এপারের আমরা বড় হলাম শামসুরের নানির ‘বিষাদসিন্ধু’ পাঠ শুনতে শুনতে? যে কাজ লর্ড কার্জন করে উঠতে পারলেন না, কাঁটাতারও সেভাবে পেরে উঠল না, কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেকাজ করতে চাইছেন?
সরকারের কীর্তিকলাপ বেশ কিছুদিন ধরেই ভরসার বদলে সন্দেহের উদ্রেক করছে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক হতাশাজনক নেইয়ের পাশে দীর্ঘকাল একটা গর্ব করার মত নেই ছিল — সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নেই। বাম আমলের সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে এটাকেও বাতিল করবেন নাকি? সাম্প্রদায়িক গোলমাল আটকানোয় সরকারের গড়িমসি কিছুদিন ধরেই প্রকট হয়ে উঠছে। পুলিশ যেন হিন্দি সিনেমার পুলিশ হয়ে উঠেছে, পৌঁছয় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে। সেই প্রেক্ষাপটে রামধনুর রং বদল আরো বিপজ্জনক। এ যে একেবারে বুকের ভেতর দেওয়াল তোলার চেষ্টা, ছোট থেকেই আমরা-ওরা তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা।
বাঙালির এই বিপদে কোথায় কবি সুবোধ সরকার? তিনি তো মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ। তিনি প্রতিবাদ করবেন না? বলবেন না এটা অন্যায়, এটা বিপজ্জনক? নইলে কবি হিসাবে, সমাজের বিবেক হিসাবে কী করে মানব ভদ্রলোককে? কোথায় বা শিক্ষাবিদ সুনন্দ সান্যাল? তিনি তো শিক্ষার রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে যাওয়া নিয়ে বরাবর সোচ্চার ছিলেন। প্রাথমিকে ইংরিজি না পড়তে পেরে যাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে উনি বলতেন, তাদের ছেলেমেয়েরা একে অপরকে ধর্মের ভিত্তিতে চিনতে শিখুক — এই কি উনি চান? কোথায় কবীর সুমন যিনি বলেন মমতাদেবীর নামে মন্দির হবে? এই কি দেবীসুলভ কাজ?

পুনশ্চ: যাদের সাথে রাজনৈতিক লড়াইয়ে জেতার জন্যে মাননীয়া এই বিভাজন উস্কে দিচ্ছেন সেই সঙ্ঘ পরিবার এ খেলায় বিশ্বকাপের দাবিদার; মুখ্যমন্ত্রী তো সবে সন্তোষ ট্রফি খেলতে নেমেছেন। এখন মোহন ভ্যাগাবন্ড আসছে, এরপরে এ রাজ্যে ভোগী আদিত্যনাথ, শুঁড়ির সাক্ষী মহারাজও আসবে। এসে বঙ্গ ক্যালিফেট ইত্যাদি আষাঢ়ে গপ্প বলবে। সেই ঢপগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করার দায়িত্ব এতদ্বারা মুখ্যমন্ত্রীই নিয়ে নিয়েছেন। পারেন মাইরি! টিপু সুলতান মসজিদের একজন ইমাম আছেন তাই-ই জানতাম না ভাল করে। এখন দেখছি মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া ভাতায় বেশি খেয়ে তেনার এমন বদহজম হয়েছে যে নিজেকে দন্ডমুন্ডের কর্তা ভেবে বসেছেন।