রজত জয়ন্তী — গাঁটে গাঁটে

ভারতে অর্থনৈতিক উদারীকরণের রজত জয়ন্তী পালনে জোর কদমে নেমে পড়েছে কংগ্রেস। কিন্তু এখানেও তাদের টেক্কা দিল বিজেপি। মনমোহনকে যতই গালাগাল দিক না কেন, তাঁরই দেখানো পথে এগিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা, ওষুধপত্র, খুচরো ব্যবসা সবকিছুতে জমিয়ে ব্যবসা করার জন্য দরজা হাট করে খুলে দিল নরেন্দ্র মোদীর সরকার আর প্রধানমন্ত্রী সদর্পে ঘোষণা করলেন ভারত এখন পৃথিবীর সবচেয়ে মুক্ত অর্থনীতি। উদারীকরণের এর চেয়ে বড় উদযাপন আর কী হতে পারে?
চমৎকার পদক্ষেপ। যে মুষ্টিমেয় সংবাদমাধ্যম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির জন্য, প্রতিশোধমূলক রাজনীতির জন্য সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছিল তারা একবাক্যে স্বীকার করল এতদিনে একটা কাজের মত কাজ হয়েছে। উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও ভারত এবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবেই এটা বলতে বাধ্য হলেন। এখানে মনে রাখতে হবে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে বুদ্ধিজীবী হলেন ধনী বিক্রেতারা। মার্কিন দেশে বিল গেটস, স্টিভ জোবস হলে এদেশে মুকেশ আম্বানি, নারায়ণমূর্তি, ফিকি, অ্যাসোচেম ইত্যাদিরা। তবে সবচেয়ে বড় লাভ হল লেখাপড়া শেখা মধ্যবিত্ত, যারা আচ্ছে দিনের গাজরটা খুড়োর কলে ঝোলানো দেখে খচে বোম হয়েছিল, তারা মহা খুশি। তারা এক ধাক্কায় গ্যাসের ভর্তুকির দুঃখ ভুলে গেছে, ডাল, টমেটোর দামও ভুলে গেছে। কারণ তারা জানে বিদেশী পুঁজি আসা মানেই হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি চাকরি আর ভুরিভুরি মাইনে। গত সপ্তাহে মলে যে স্টোরটার ব্র্যান্ডেড শার্টটা দূর থেকে দেখে চলে আসতে হয়েছে সেটাই এবার নাগালে চলে আসবে। জয় নরসিমার জয়, জয় মনমোহনের জয়, জয় মোদীর জয়, জয় জেটলির জয়।
এই বাজারে কয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। মানে আমি বামপন্থী লোক তো। বামপন্থীদের কাজই হল বাজে বকা। সেইটুকুই করতে চাইছি আর কি। সকলে ক্ষমা ঘেন্না করে নেবেন আর কারো কাছে উত্তর থাকলে দিয়ে দেবেন। প্রতিপ্রশ্ন করলে অ্যান্টি ন্যাশনালও বলতে পারেন।
বলছি এই ২৫ বছরে কোন্ কোন্ শিল্পে আমরা খুব এগোলুম আর প্রচুর চাকরি দিতে পারলুম? কত কারখানা বন্ধ হয়েছে সে হিসাবটা আমার কাছে নেই বলে আমি দুঃখিত। আসলে আমি বরাবর অঙ্কে কাঁচা। বড় বড় সংখ্যা দেখলেই ভিরমি খাই। তবে ঐ নাম করা শিল্প আমাদের যা ছিল, পাবলিকের সম্পত্তি, তার মধ্যে এইচ এম টি লাটে, চিত্তরঞ্জন খাবি খাচ্ছে। বি এস এন এল তথৈবচ ওদিকে তাদেরই টাওয়ার ব্যবহার করে ভোডাফোন, এয়ারটেল লালে লাল। থ্রি জি বলে টু জি দিয়ে আমাদের দিব্যি টুপি পরাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছে। আদালত জরিমানা করলে “এরম করলে খেলব না” বলে ঠোঁট ফোলাচ্ছে আর সরকার সব মিটমাট করে নিচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পে কত লোকের চাকরি গেছে সে প্রশ্ন তুলছি না। ওসব নির্ঘাৎ অযোগ্য লোক ছিল তাই চাকরি গেছে। পুঁজিবাদে যোগ্যতমের উদ্বর্তন হবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই কত লোকের চাকরি হয়েছে জানতে চাইছি। বেকার টেকার আর নেই তো? মানে চারদিকে তো তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া আর প্রযুক্তি দেখি না। যে পড়েছিল খনি প্রযুক্তি সে-ও দেখি সফটওয়্যারে আর যে ছিল কম্পিউটার সায়েন্সের ভাল ছাত্র সে-ও সফটওয়্যারে। তারও আবার বেশিরভাগ কাজই বিদেশি কোম্পানির কাজ এদেশে বসে হচ্ছে। কোনদিন এই কাজগুলো আসা বন্ধ হলে যে কী হবে! কোথায় থাকবে যোগ্যতমের উদ্বর্তনের তত্ত্ব!
ও হ্যাঁ। আরেকরকম শিল্পেও চাকরি হচ্ছে বটে — কর্তাশিল্প। এম বি এ পাশ করে বিভিন্ন কোম্পানির কর্তা হওয়ার শিল্প। এছাড়াও আছে কথাশিল্প। সারারাত জেগে লোকের গালমন্দ শুনে মাস গেলে হাজার দশ-পনেরো টাকা আয় করা, যা দিয়ে আজকের বাজারে আড়াই জনের সংসার চালানোও শক্ত। এরও অনেকটাই বিদেশের কাজ।
তাহলে পঁচিশ বছর ধরে দেশের কোন্ উন্নতিটা হল? এত শিল্পোন্নত দেশ হল আমাদের যে এখন মনমোহনের সুযোগ্য ছাত্র নরেন্দ্রকে বলতে হচ্ছে #MakeInIndia? মানে আসলে কিস্যু হয়নি এখানে? তাহলে ব্যবস্থাটা ব্যর্থ তো?
উহুঁ। তা নয়। ব্যবস্থাটা কংগ্রেস ঠিক করে চালাতে পারেনি। কাছাটা পুরো না খুললে কি আর বিশ্ব বাজারে সাঁতার কাটা যায় বাপু? এই সবে আমাদের মিত্র দিলেন খুলে। এবারেই দেশটা পুরো ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা হয়ে যাবে। আর পঁচিশটা বছর ধৈর্য ধরুন।
আচ্ছা কাছা আমাদের আগেই যারা খুলেছিল তারা এখন কেমন আছে? দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো খুলেছিল। এই সহস্রাব্দের গোড়াতেই রক্তাক্ত অবস্থায় জল থেকে উঠে আসে। উদারীকরণের পিরানহা শুধু হাড়গুলো বাকি রেখেছিল। তারা বামদিকে হাঁটতে শুরু করে। অধুনা সঙ্কট সত্ত্বেও উদারীকরণের রাস্তায় তারা এখুনি ফিরছে না। গ্রীসের অবস্থা আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি। এতই করুণ যে “আর পারছি না, চলে যাব” বলে চিৎকার করেও শেষ অব্দি “দু বেলা দু মুঠো দিস” বলে ফের নির্যাতন মেনে নিয়েছে।
আর যে দেশ প্রথমে নিজে বিবস্ত্র হয়ে জলে নেমে অন্যদের ডেকেছিল খোদ সেই দেশে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে। অনেকে দেউলিয়া হয়ে গেছে।
তা হোক গে। মনমোহন আর মোদীর দেখানো পথই আমাদের পথ। পুঁজিবাদেরও যে রকমফের হতে পারে তা আমরা শুনব কেন? এলোমেলো করে দে মা, লুটেপুটে খাই। আম্বানি, আদানি খাবে খাক না। চুঁইয়ে এসে যেটুকু পড়বে তাতেই আমাদের যথেষ্টর চেয়ে অনেক বেশি হবে। গরীব, নিম্ন মধ্যবিত্তের যা হয় হোক। দেশে আর গরীব যদি না-ই থাকে সেটা কি খারাপ? বামপন্থীদের খালি “গরীব গরীব” করে চেল্লানো স্বভাব। আসলে গরীব না থাকলে আমাদের পাত্তা দেবে কে? যত্তোসব।

পুনশ্চ: অবাম বন্ধুরা আশা করি স্বীকার করবেন আমার মত হদ্দ বোকা বামপন্থীরা এখন এদেশে অনুল্লেখ্য। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো কিন্তু সবেতে বাগড়া দেওয়ার বদনাম ঘোচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সবচেয়ে বড় বামপন্থী দলটাকেই দেখুন না। এসব আলোচনায় তারা নেই। আন্দোলনে নামার হুমকি-টুমকিও দিচ্ছে না। তাদের বৃহত্তম সমস্যা এখন কংগ্রেসের সঙ্গে প্রেম করব না ঝগড়া করব। তাই নিয়ে তিনদিন ধরে মিটিং করছে, কেউ এই প্রেম অবৈধ বললে তাকে বার করে দিচ্ছে। এক কথায় (ফ্যাতাড়ুদের ভাষায়) “ছিঁড়ছে”। ভারতবর্ষের মত এত বড় মাঠে ফাঁকায় গোল দেওয়ার সুযোগ বহুজাতিকগুলো পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের সময়ও পায়নি।

প্রতিবাদের অধিকার

JNUSU President Kanhaiya Kumar at JNU

হোক কলরব আন্দোলনের সময় দেখেছি, এখন আবার দেখছি যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটা যুক্তি দেওয়া হয় — আয়করদাতাদের টাকায় যেহেতু তারা ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে অতএব তাদের প্রতিবাদ-টতিবাদ করার অধিকার নেই। এগুলো করা মানে আয়করদাতার টাকা নষ্ট করা। এই যুক্তি যুগপৎ বোকার যুক্তি এবং গা-জোয়ারি যুক্তি।
কেন এটা বোকার যুক্তি সেটা আগে বলি।

ভারতবর্ষে কয়েক কোটি আয়করদাতা। তারা সকলে প্রায় কোন বিষয়েই একমত নয়। হওয়ার দরকারও নেই। তাহলে কি করে ধরে নেওয়া হয় যে সব আয়করদাতাই মনে করে ছাত্রছাত্রীদের কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করা উচিৎ নয় বা আদৌ রাজনীতি করা উচিৎ নয়? যিনি এরকম ভাবেন তিনি ভাবুন কিন্তু আমার আয় বা ভাবনার মালিকানা আমি আপনাকে দিইনি। উপরন্তু যারা আন্দোলন করছে তাদের বাবা-মায়েরাও অনেকে আয়করদাতা। দেশগঠনে তাঁদের আয় কিছু কম পরিমাণে ব্যবহার হয় না। যাদবপুরের যেসব মাস্টারমশাই, দিদিমণি ছাত্রদের সমর্থন করেছিলেন এবং জে এন ইউ এর যাঁরা আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরাও শুধু আয়করদাতার টাকায় মাইনে পান তা নয়, নিজেরাও আয়কর দেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যাঁরা এদেশে থাকেন, তাঁরাও আয়করদাতা। স্পষ্টত, যে কোন ছাত্র আন্দোলনই বহু আয়করদাতার স্নেহধন্য।

এবার আপনি বলবেন, তাহলে যেসব আয়করদাতা আন্দোলনকারীরা তাদের টাকা নষ্ট করছে মনে করে তাদের মতামত কি মূল্যহীন? একেবারেই না। এখানেই আসছে গা-জোয়ারির প্রশ্নটা। আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন। আমি বামপন্থী। তা বলে আমি একথা বলতে পারি না যে আমি আয়কর দিই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এস এফ আই আর এ আই এস এফ কে রাজনীতি করতে দিতে হবে। ছাত্র পরিষদ, টি এম সি পি, এ বি ভি পি সকলেরই অধিকার আছে। আমি এদের অপছন্দ করি বলেই এরা আন্দোলন করলে বলতে পারি না “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ”।

যদি বলি তাহলে আমি গুন্ডা। স্বাধীন দেশের নাগরিক-ফাগরিক কিস্যু নই। যে অন্যের স্বাধীনতা মানে না তার নিজের স্বাধীনতাও বাঁচে না।

পুনশ্চ — বিদেশবাসী প্রাক্তনীদের কথা এখানে বললাম না। কারণ তাঁদের মধ্যে যাঁরা ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যান তাঁরা অত্যন্ত দেশভক্ত। নিশ্চয় এসব দেশদ্রোহী আন্দোলন কোন যুক্তিতেই সমর্থন করেন না। আর যাঁরা ঐসব অনুষ্ঠানে যান না তাঁরা তো একেবারে দেশদ্রোহী। তাঁরা কি ভাবেন সেই নিয়ে আলোচনা করলে যদি পুলিশে ধরে!

ভালবাসা কারে কয়

বেশ ছোটবেলাতেই আমার একটা বদভ্যাস হয়েছিল — প্রেমে পড়ার। জার্মান কবি শিলার একটা মজার কথা বলেছিলেন “মানুষ প্রেমে পড়ে বলে কবিতা লেখে না। কবিতা লেখে বলে প্রেমে পড়ে।” হয়ত সেভাবেও এই বদভ্যাসটা হয়ে থাকতে পারে।
যখন বিএ ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তখন দীর্ঘদিনের পরিচিত এক প্রাক্তন সহপাঠিনীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। সে বেচারি কিন্তু এর বিন্দু বিসর্গ জানে না। এক বন্ধুর থেকে ফোন নম্বর নিয়ে তার বাড়িতে ফোন করি। করে চুপ করে থাকি যতক্ষণ না সে হ্যালো হ্যালো বলতে বিরক্ত হয়ে ফোন ছেড়ে দেয়। অন্য কেউ ফোন ধরলে কেটে দিয়ে আবার করি। সেবার সরস্বতী পুজোর সময়ে রোখ চাপল এবার “প্রপোজ” করবই। কোনবার ঐ ছুটিতে বাড়ি আসতাম না। সেই উপলক্ষ্যে এলাম। এক বন্ধুর সেই মেয়েটির বাড়িতে প্রসাদ খাওয়ার নেমন্তন্ন ছিল। তার সহায়তায় আমারও নেমন্তন্ন হল। গেলাম। কখনো তাকে শাড়ি পরে দেখিনি। এমনিতেই আমি ক্যাবলা, আরো কেবলে গেলাম। প্রগল্ভ আমি সেদিন এতটাই চুপচাপ ছিলাম যে সে বলতে বাধ্য হল “তুই তো আজ কথাই বলছিস না।”
পরদিন বিকেলে হোস্টেলে ফেরত যাওয়া। রিকশায় ওঠার সময়ে বাবার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললাম আমি চলে গেলে ওটা পড়তে। বাবা অবাক। চিঠির প্রথম লাইনটা ছিল “বাবা, মনে হচ্ছে প্রেমে পড়েছি।” তারপর সেই মেয়েটির নামধাম ইত্যাদি।
হোস্টেলে ফেরার হপ্তাখানেক পরে বাবার চিঠি এল। তার সব কথা এখানে প্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু বাবা লিখেছিল “Love is not just an emotion. It is a height to be achieved.” সেই উচ্চতায় উঠতে পেরেছি কিনা জানি না তবে চেষ্টা করে গেছি। আর শর্টকাট হিসাবে কখনো ভ্যালেন্টাইনস ডে কার্ড, ভেলভেটের হৃদপিন্ড, দামী চকোলেট — এসবের সাহায্য নিইনি। তাতেও কিন্তু আমাকে প্রেমিক হিসাবে অনেকেই অবিশ্বাস করেনি। যার সাথে গত ন’বছরের অভিন্ন জীবন, সে-ও করেনি।
আজকাল ভাবনা হয় আমার মেয়ের যখন প্রেমে পড়ার বয়স হবে তখন সে-ও বহুজাতিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়ে প্রেমকে উপহারের মূল্যে আর উদ্ঘাটনের প্রাবল্যে মাপতে শিখবে না তো?