মার্কস বাদ?

marx

একশো বছরের বেশি হল দুনিয়ায় মার্কসবাদী আর মার্কসবিরোধী — দু ধরণের লোকই আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। দু পক্ষেরই অনেক ভাল ভাল যুক্তি আছে। কিন্তু বেশকিছু উঁচু ডিগ্রিধারী লোককেও দেখতে পাই মার্কসবাদ সম্পর্কে অত্যন্ত হাস্যকর কিছু যুক্তি দেন। সেগুলো এত দুর্বল যে তার প্রতিযুক্তি দিতে মার্কসবোদ্ধা হতে লাগে না। তারই কয়েকটা প্রতিযুক্তিসহ নীচে দিলাম —
১) সাম্য ব্যাপারটাই অস্বাভাবিক। প্রকৃতিবিরোধী। অতএব সাম্যবাদী সমাজ একটি ইউটোপিয়া।

তাই তো! কিন্তু একটা অসুবিধা হয়ে গেল যে! সমাজ, রাষ্ট্র — এগুলোও অস্বাভাবিক। প্রকৃতিবিরোধী। এগুলো মানুষ বানিয়েছে। এগুলোকেও ফেলে দেওয়া দরকার তাহলে। প্রযুক্তি ব্যাপারটা তো ভীষণভাবেই প্রকৃতিবিরোধী। অতএব বাড়ির জলের লাইন, বিদ্যুতের লাইন কাটিয়ে দিন, হাতের ফোনটা এখনই ছুঁড়ে ফেলে দিন, জামাকাপড় ত্যাগ করে সপরিবার উলঙ্গ হয়ে থাকুন। আসলে বাড়িটাও প্রকৃতিবিরোধী। অতএব জঙ্গলে চলে গিয়ে পর্ণকুটিরেই থাকা উচিৎ।

২) মার্কসবাদের উদ্ভব হয়েছিল শিল্পবিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে। এখন আর সেই মতবাদের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই কারণ পৃথিবী বদলে গেছে।

আচ্ছা পুঁজিবাদের উদ্ভব কি কৃষিবিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে? সেই পৃথিবী এতদিনে বদলায়নি?

৩) কমিউনিস্ট শাসন সব দেশেই গুলাগ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচুর মৃত্যুর কারণ হয়েছে। অত্যন্ত দমনমূলক শাসনব্যবস্থা। সেই শাসনব্যবস্থার প্রবক্তার তত্ত্বের কোন দাম নেই।

প্রথমত, আপনি কি জানেন মার্কসবাদী মানেই বলশেভিক বা চীনের কমিউনিস্ট পার্টি নয়? পিট সিগার আর এরিক হবসবম দুজন প্রসিদ্ধ মার্কসবাদী। কিন্তু দুজনেই বলশেভিক শাসনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেছেন। এমনকি চে গেভারাও বলেছেন। উদাহরণ হিসাবে আরো বলা যায় যে কিউবাতে কাস্ত্রো যেভাবে শাসন চালিয়েছেন তার সাথে কিন্তু রাশিয়া বা চীনের পার্থক্য বিস্তর।

দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট শাসন ছাড়া পৃথিবীর আর কোন শাসনব্যবস্থাই কি কারো মৃত্যুর কারণ হয়নি? ভারতে বিয়াল্লিশের মন্বন্তরে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছিল তারা কোন কমিউনিস্ট শাসনের প্রজা? কদিন আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়াতে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এখনো এদেশে বছরে ১২০০০ কৃষক আত্মহত্যা করেন। তাঁদের মৃত্যুর জন্যে দায়ী কোন কমিউনিস্ট সরকার? ১৯৯১ এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে অপুষ্টিজনিত কারণে যত শিশুর মৃত্যু হয়েছে তাদের জীবনের দাম দেবে কোন কমিউনিস্ট সরকার? নাকি ঐ মৃত্যুগুলো দুর্ঘটনার মধ্যে পড়ে?
জারের গুলাগ পরে স্তালিনের গুলাগ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অত্যন্ত অন্যায় কোন সন্দেহ নেই। মার্কসবাদে কোথাও গুলাগের ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে বলে জানি না। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন যদি গুলাগের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করত, চমৎকার হত। কিন্তু গুয়ান্তানামো বে জিনিসটা কী? আবু ঘ্রাইবটা কী ব্যাপার? সিঙ্গাপুরের যে একনায়ক কয়েকবছর আগে মারা গেলেন তাঁর রাজত্বে বিরোধীরা কেমন ছিলেন? কেমন আছেন আজকের তুরস্কের বিরোধীরা, রাশিয়ার বিরোধীরা, ভারতের বিরোধীরা, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধীরা? যত দোষ মার্কস ঘোষ? স্তালিন, মাও, পল পটের দোষে যদি মার্কসবাদ বাতিল করতে হয় তাহলে পুঁজিবাদী দেশগুলোর কতজন শাসকের দোষে কতবার পুঁজিবাদ বাতিল হওয়া উচিৎ?

৪) মার্কসবাদ গরীবদের জন্য। পুঁজিবাদ উন্নয়নের মাধ্যমে গরীবদের বড়লোক করে দিচ্ছে। অতএব মার্কসবাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

দারুণ সুসংবাদ। কবে কখন কোথায় এটা হচ্ছে খবর দেবেন, প্লিজ। পুঁজিবাদের ঝান্ডা নাড়তে ছুটে যাব কথা দিচ্ছি। আপাতত যা দেখছি আমেরিকা, ফ্রান্সের মত দেশেও দারিদ্র্য, বেকারত্ব নাকি বেড়েই চলেছে। তাই লোকে খচে বোম হয়ে এমনসব লোকেদের ভোট দিচ্ছে যাদের দেখে বড় বড় পুঁজিবাদীদেরও মাথায় হাত। আর বাকি বিশ্বের কথা ছেড়েই দিন। আমরা তো তৃতীয় বিশ্ব। এখানে একই শহরে এন্টিলা আর ধরভি। ফোন বলছে “জিও”, মন বলছে “মর”। এই বাজারে মার্কস ফার্কস চলে নাকি?

যারে কয় ব্যালান্স

বাজারে একটা জিনিসের এখন দারুণ কাটতি — ভারসাম্য, বাংলায় আজকাল যারে কয় ব্যালান্স। সবেতেই ব্যালান্স রাখতে হবে। হিন্দুর বাঁদরামির নিন্দা করলেই মুসলমানেরও কোন একটা দোষ নিয়ে যারপরনাই গাল দিতে হবে, কোথাও দলিতদের বাড়িতে উঁচু জাতের লোকেরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে জেনে আমি যদি রেগে চিৎকার করি তাহলে সিগারেটের প্যাকেটের বিধিসম্মত সতর্কীকরণের মত সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বলতেই হবে যে দলিতরা যদি এরকম করত সেটাও অন্যায় হত। কোথাও কোন সাঁওতাল মেয়ের উপরে পুলিসী নির্যাতনের নিন্দা করলেই আমাকে বলতে হবে “যদিও আমি সাঁওতালদের দেশবিরোধী কার্যকলাপকে সমর্থন করি না” (মানে দেশটা আমার বাপের জমিদারী আর সাঁওতালরা আমার প্রজামাত্র এবং কোন সাঁওতাল সরকারবিরোধী কিছু করল মানেই মেয়ে-বউরা আমার বৈধ খাদ্য হয়ে গেল)। আমাকে আরো বলতে হবে যে আমি সবার সমানাধিকারের পক্ষে, কাউকে কোন বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে। অর্থাৎ শিক্ষায় এবং চাকরিতে তফসিলি জাতি উপজাতির জন্য (আর ট্রেনে বাসে মহিলা ও বয়স্কদের ব্যাপারটা কী হবে?) আসন সংরক্ষণের বিপক্ষে। এই ভারসাম্য রক্ষা যদি আমি না করতে পারি তাহলেই আমি হিন্দুবিদ্বেষী/দেশদ্রোহী/মাওবাদী/সিকুলার। মনে রাখতে হবে এগুলো সমার্থক শব্দ।
মানে ব্যালান্স ব্যাপারটা কিরকম বুঝলেন তো? আইসিস অধ্যুষিত সিরিয়ায় দাঁড়িয়ে আমাকে বলতে হবে যে আমি ক্যাথলিক গোঁড়ামির তীব্র সমালোচক, নইলে ধরে নেওয়া হবে যে আমি আইসিসের নিন্দা করছি মুসলমান বিদ্বেষবশত। ওখানে তার শাস্তি কী জানেন তো? পিনারাই বিজয়ন আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যা করলে এখানে কোটিপতি হওয়ার অফার দেওয়া হয় আর কি। সিরিয়া এই জায়গাটায় আমাদের থেকে এগিয়ে আছে এখনো। ওদের কথা কম, কাজ বেশি।
তা এই যে জনগণ ব্যালান্স দাবি করছে আমার থেকে তা নিশ্চয়ই এই জন্যে যাতে আমাদের দেশের ব্যালান্স নষ্ট না হয়? তা দেখা যাক কিরকম ব্যালান্সের মধ্যে বাস করি আমরা।
দেশের ৭৫% এর বেশি যারা তাদের ধর্মীয় নেতারা গলা উঁচিয়ে বলবে অন্যদের যেন বাড়তে না দেওয়া হয়। “বড্ড বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ চারটে পাঁচটা করে বাচ্চার জন্ম দেওয়া যাতে আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকতে পারি।” মানে জনসংখ্যায় ব্যালান্স এসে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানো এবং যেন না আসে তার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে বলা।
এরপরে আবার এদেশে ব্যালান্সের কথা বলা হয় কোন মুখে?
গেরুয়া পরা সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী জাগতিক দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসবে অনর্গল সাম্প্রদায়িক বিষ বমনের পর এবং তাকে বলা হবে জননেতা অথচ গৃহী মুসলমানকে বলা হবে “সাম্প্রদায়িক নেতা” যেহেতু তার গালে দাড়ি আর মাথায় ফেজ।
এই দেশে ব্যালান্স বজায় রাখতে হবে।
কারোর যথেষ্ট প্রমাণ না থাকতেও ফাঁসি হবে “সমবেত বিবেক” কে উপশম দিতে আর কেউ প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েও মন্ত্রী সান্ত্রী হবে, কোটি কোটি লোকের পূজনীয় হয়ে উঠবে। পঁচিশ বছর পর কাঠগড়ায় দাঁড়ালে লোকে এমন করবে যেন বেচারা ভগৎ সিং।
এই দেশে ব্যালান্স বজায় রাখতে হবে! আমরা কি নাগরিক না ট্রাপিজের খেলোয়াড়?
এক ভদ্দরলোক আবার সারাজীবন শীতকালে খোলামাঠে লাউডস্পিকারে গান গেয়ে পয়সা কামালেন, এখন লাউডস্পিকারে নামাজ শুনে ঘুমোতে পারছেন না। লোকে দ্বিচারিতাটা ধরে দিতেই ঝুলি থেকে ব্যালান্স বার করলেন — “গুরুদ্বার, মন্দির সবের কথাই বলছি। মসজিদে আপত্তি নেই, লাউডস্পিকারে আপত্তি।” মুম্বাই শহরে থেকে গণেশ চতুর্থীর হুজ্জত নিয়ে কিন্তু কোনদিন কিছু বলেছেন বলে অভিযোগ নেই। সেই সিরিয়ায় দাঁড়িয়ে ক্যাথলিকদের সমালোচনা আর কি। তবে এঁর চালাকিকে ব্যালান্স করার মত নির্বোধও তো আছে আমাগো দ্যাশে। তেমন একজনের কল্যাণে উনি এখন কামিয়ে কামানোর চেষ্টা করছেন। নাম কামাতে সফল হয়েছেন এর মধ্যেই, অনেকদিন পর। তবে পয়সা কামাতে হয়ত সফল হবেন না কারণ যে নির্বোধ দশ লাখ দেবে বলেছিল তার বোধহয় টাকা কম পড়েছে, তাই নতুন নতুন শর্ত দিচ্ছে। আসলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করতে হয় না তো (যাদের হয় তারা ফতোয়া দেয় না কারণ তাদের টাকার দাম আছে), তাই ব্যালান্স চেক করার অভ্যাসটা নেই।
একটা গোটা দেশের এহেন কেমিক্যাল ইমব্যালান্স নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক।

নির্বাচিত ক্রোধ

taslima

১৯৮০ সালে মুক্তি পায় ‘হীরক রাজার দেশে’। অনেকেই মনে করেন ছবিটা ইন্দিরা গান্ধীর জরুরী অবস্থার বিরুদ্ধে সত্যজিৎ রায়ের প্রতিক্রিয়া। ওটা মুক্তি পাওয়ার সময়ে ভারতে “selective outrage” কথাটা চালু হয়নি। হয়নি বলেই কংগ্রেসিরা বা ইন্দিরা সমর্থকেরা প্রশ্ন তোলেনি “এমার্জেন্সির অত্যাচার নিয়ে ছবি করেছেন। ইংরেজের অত্যাচার নিয়ে ছবি করেননি কেন?”
“Selective” আর “outrage” দুটো শব্দই ইংরিজি ভাষায় থাকলেও পাশাপাশি বসিয়ে নতুন অর্থ দেওয়ার কথা সম্ভবত ১৯১৯ সালে ইংরেজদের মাথাতেও আসেনি। নইলে রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি ত্যাগ করার পরে সরকার বাহাদুর বলতেই পারতেন “Where were you when Mughals killed Sikhs in Sikh-Mughal wars? Why this selective outrage?”
ভারতীয় দক্ষিণপন্থীদের এক অনন্য অবদান এই “selective outrage”। কী বাংলা হওয়া উচিৎ এর? “নির্বাচিত ক্রোধ?” আচ্ছা উন্মাদ ছাড়া কেউ কি সবেতেই রেগে যায়? নাকি সকলে একই জিনিসে ক্রুদ্ধ হন? আপনি কখনো কোন দক্ষিণপন্থীকে দেখেছেন ভারতে বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মুসলমান আর দলিতদের অস্বাভাবিক বেশি অনুপাত নিয়ে “outraged” হতে? পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মগুরুদের প্রভাব নিয়ে সরব হলেও গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় “outraged” হননি এরকম লোকেরাই তো এদেশে এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। একেও কি “selective outrage” বলা উচিৎ? যাঁরা জাকির নায়েককে উস্কানিমূলক কথাবার্তার জন্য হাতকড়া পরাতে চান কিন্তু যোগী আদিত্যনাথকে একটা সুযোগ দিতে চান তাঁদের রাগকে কি নির্বাচিত ক্রোধের দলে ফেললে খুব অন্যায় হবে?
আসলে “outrage” বা ক্রোধ একটি মানবিক অনুভূতি, যা নির্ভর করে কোন বিষয়ে একজন মানুষের “opinion” বা মতামতের উপর। দক্ষিণপন্থীদের মত হল ভারতীয় মুসলমান এবং দলিতরা মায়ের পেট থেকেই পড়েই অপরাধী হয়ে যায়। সুতরাং অন্যদের চেয়ে তারা বেশি কারারুদ্ধ হবে, এতে আর ক্রুদ্ধ হওয়ার কী আছে? পাকিস্তান, বাংলাদেশের ধর্মগুরুরা অত্যন্ত রক্ষণশীল কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ হাইটেক প্রগতিশীল অতএব তাঁর কথা আলাদা — এই হচ্ছে তাঁর সমর্থকদের মতামত। সেইজন্যেই এনার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া নিয়েও এঁদের কোন outrage নেই। জাকির নায়েক যে ধর্মের লোক সে ধর্মের লোকেরা সন্ত্রাসবাদী হয় তাই তাঁর বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা দরকার কিন্তু যোগী আদিত্যনাথ যতই প্রকাশ্য সভায় বলে থাকুন যে “একজন হিন্দু মরলে আমরা এফ আই আর করতে যাব না, কম করে দশজন মুসলমানকে মারব”, তাঁর প্রশাসক হিসাবে একটা সুযোগ প্রাপ্য যেহেতু হিন্দুরা সন্ত্রাসবাদী হয় না, আজমের বিস্ফোরণে দোষী সাব্যস্ত হলেও “activist” হয়।
এই মতামতগুলো ভাল কি মন্দ, ন্যায় কি অন্যায় সে আলোচনায় যাচ্ছি না, কিন্তু দক্ষিণপন্থীদের ক্রোধও যে নির্বাচিত সেটা কিন্তু এ থেকে বোঝা যাচ্ছে। এবং সেজন্যে তাঁদের গাল পাড়ছি না কারণ তাঁদের মতামতানুসারেই তাঁরা ক্রুদ্ধ হবেন। সেটাই স্বাভাবিক। গাল পাড়ব মতামতগুলোর জন্য, নির্বাচিত রাগের মত কোন কাঁঠালের আমসত্ত্বের জন্য নয়।
অনেকদিন আগে একটা বই পড়েছিলাম — নির্বাচিত কলাম। সে বইয়ের লেখিকা তসলিমা নাসরিন দ্রুত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অগ্রগণ্য নারীবাদী, প্রগতিশীল লেখিকা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। নিজের দেশ থেকে মুসলমান মৌলবাদীদের যাতনায় নির্বাসিত হয়ে দীর্ঘদিন এই বাংলায় ছিলেন। একই ধর্মের উগ্রবাদীদের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে ২০০৭ এ পশ্চিমবঙ্গের ধ্বজভঙ্গ সরকারের তাঁকে চলে যেতে বলা নিঃসন্দেহে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। মৌলবাদের যাতনায় মায়ের দেশ এবং মাসির দেশ (শিবনারায়ণ রায়ের ভাষায়) ছাড়তে বাধ্য হওয়া এই সাহিত্যিক শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে দাঁড়াবেন আশা করছিলাম। গতকাল দেখলাম দাঁড়িয়েছেন, তবে ছায়া এড়িয়ে। ভারতের অনেক জায়গায় এখনো উঁচু জাতের লোকেরা যেভাবে নীচু জাতের ছায়া এড়িয়ে দাঁড়ায়, সেভাবে।
“শ্রীজাত, মন্দাক্রান্তার পাশে আছি কারণ আমি বাকস্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু….” সেই নির্বাচিত ক্রোধের তত্ত্ব। ওঁকে কলকাতা থেকে যখন চলে যেতে বলা হয় তখন কিছু বলেনি কেন? এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। কোথায় ছিল এরা যখন তামিলনাডুর নাস্তিক এইচ ফারুককে হত্যা করা হল? খাগড়াগড় নিয়ে কবিতা লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? রোজ কত মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়, তসলিমাকেই কত হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাই নিয়ে বলে না কেন?
“তখন বলেনি এখন বলছে কেন” যুক্তিটা কতটা খেলো সেটা আগেই বলেছি। দুরভিসন্ধিযুক্ত শাসক বা নিজের কুকীর্তি ঢাকতে ব্যস্ত কেউ ছাড়া অন্য লোক প্রতিবাদের বিরুদ্ধে এই যুক্তি খাড়া করে না। তসলিমা কেন করলেন সেটা ভাববার বিষয়। কিন্তু আর যা যা বলেছেন সেগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে।
এরা কেবল হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম কথাটা একশোভাগ সত্যি। এবার বলি, বেশ করে। এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের মৌলবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে প্রথমেই মৌলবাদীরা যেটা করে সেটা হল তার ধর্মকে বিধর্মী আক্রমণ করেছে বলে চেঁচিয়ে মৌলবাদী নন এমন মানুষদেরও সহানুভূতি আদায় করা। তাই করেই মকবুল ফিদা হুসেনকে তাড়ানো হয়েছিল। তসলিমাও বেশ করেন কেবল মুসলমান মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তিনিই বা কবে কালবুর্গি বা নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যার ব্যাপারে কড়া বিবৃতি দিলেন? উলটে বলেছিলেন কয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনায় প্রমাণ হয় না ভারত অসহিষ্ণু।
এবার তর্কের খাতির দূর করে বাস্তবে আসি। তসলিমা যথেষ্ট না জেনেই অভিযোগটা করে বসেছেন। শ্রীজাত ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন লিখছেন। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার বিরুদ্ধে তিনি এতটাই সরব ছিলেন যে কবীর সুমন তাঁকে মুসলমানবিদ্বেষী আখ্যা দিয়ে প্রায় গালিগালাজ করেছিলেন ফেসবুকেই।
খাগড়াগড় নিয়ে লেখেনি কেন? ধূলাগড় নিয়ে লেখেনি কেন? প্রশ্নগুলো এমন একজন করেছেন যিনি নাকি নিজে কবিতা লেখেন। অবাক লাগছে ভাবতে যে একজন কবি প্রায় রাজনৈতিক নেতার মত ভাষায় নির্ধারণ করতে চাইছেন কবিকে কোন কোন ঘটনা নিয়ে লিখতে হবে। কবি তা নিয়েই লিখবেন যা নিয়ে তাঁর লিখতে ইচ্ছা করে। কবি সাংবাদিক নন। এটা তসলিমা জানেন না? আর ধূলাগড়? একজনও মানুষ মারা গেছে ওখানে? একটিও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে? ঘরেদোরে আগুন ধরানো হয়েছিল। সেই সংক্রান্ত অপরাধে ৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিলকে তাল কোন না কোন উদ্দেশ্য নিয়েই করা হয় বলে জানি। সোশাল মিডিয়ার গুন্ডাদের উদ্দেশ্য বোঝা যায়। তসলিমাকে সেই দলে ফেলতে যে মন চায় না।
খাগড়াগড়? সে তো আরেক কান্ড। বিস্ফোরণের পর থেকে মৃত অভিযুক্তের নাম বদলাতে বদলাতে কোথা থেকে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছেছে। হাজার হাজার ডক্টর হাজরা একেবারে। এন আই এ তদন্ত করছে, কয়েকজনকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, এদিকে যে নাকি নাটের গুরু সে গত ২৮শে মার্চ সিলেটে নিহত হয়েছে। এটা নিয়ে কবির কী লেখার ছিল বুঝলাম না। আচ্ছা একটা প্রতিপ্রশ্ন করি? এই যে কদিন আগে আজমের ব্লাস্টে দুই আর এস এস কর্মীর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হল, তসলিমার কি এই নিয়ে কিছু লেখা উচিৎ ছিল? যাক গে।
মন্দাক্রান্তাকে ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে তসলিমা যা বলেছেন সেটা পড়ে হাসব না কাঁদব এখনো বুঝে উঠতে পারিনি। এরকম হুমকি তো কত মেয়েই পায়। এখন মন্দাক্রান্তা পেয়েছে বলে লোকে হৈ হল্লা করছে — এই হল তসলিমার খেদ। ঠিকই তো। ভারতে রোজ কত মেয়ে ধর্ষিতা হচ্ছে, হঠাৎ নির্ভয়াকে নিয়ে সকলের অত চেগে ওঠার কী দরকার ছিল ভগবান জানে। বহু মেয়ে ধর্ষণের হুমকি পায় এবং ভয়ে কুঁকড়ে যায়, চুপ করে যায়, অনেকসময় হুমকিবাজরা দেখিয়ে দেয় তারা মুখেন মারিতং জগৎ নয়। ধর্ষণের পর মেয়েটি আরো নীরব হয়ে যায়। মন্দাক্রান্তা সেনেরও উচিৎ ছিল চুপচাপ হয়ে যাওয়া, প্রয়োজন হলে ফেসবুক ছেড়ে দেওয়া, অতঃপর দরজা জানালা এঁটে বাড়িতে বসে থাকা। এরকমটাই আপনার থেকে আশা করেছিলাম, তসলিমা দেবী। এই না হলে নারীবাদী?
আপনি চালিয়ে যান, ম্যাডাম। আপনি পুরো ব্যাপারটাকেই দাঁড় করালেন বুদ্ধিজীবী বনাম বুদ্ধিজীবী হিসাবে। আপনি শ্রীজাতর পাশে আছেন কিনা সেটা তো বড় কথা নয়, বড় কথা হল আপনি দাঙ্গাবাজের রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার পক্ষে না বিপক্ষে। সে ব্যাপারে আপনি একটা শব্দও খরচ করেননি। আপনার নীরবতা মুখর।

কয়েকটা প্রাসঙ্গিক লিঙ্ক

http://www.outlookindia.com/…/taslima-questions-sri…/1018138
http://m.economictimes.com/…/wont-…/articleshow/51564448.cms
http://twocircles.net/2014dec03/1417616083.html
http://www.timesnow.tv/…/mastermind-behind-2014-burdw…/58316