নাম তার ছিল: ১৯

পূর্বকথা: সবুজগ্রাম গার্লস হাইস্কুলের জীবন বিজ্ঞানের দিদিমণি সুমিত্রার স্মরণসভায় গিয়ে নবারুণের সাথে দেখা হল রবীনের। তার বক্তৃতায় বিদায়ের সুর শুনে অবাক হয়ে গেল নবা। রবীন অবশ্য সভার পর পরিষ্কার বলল, পার্টির দুঃসময়ে সব ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকার কথা সে মোটেই ভাবছে না।

এ শহরের সাথে সবুজগ্রামের কোন মিল নেই। আর তাই সারাক্ষণ সবুজগ্রামের কথাই মনে পড়ে বিপ্লবের। ট্যাক্সিতে অফিস যেতে যেতে মনে পড়ে পদ্মপুকুরের ঘাটটা, লাঞ্চে অফিসের নীচের কে এফ সি তে বসে মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কুঁজোটার কথা। সেটা যখন নতুন এল বাড়িতে, তখনকার ঠান্ডা জলের কথা মনে পড়লে কোকের ক্যানটা শেষ করতে করতেই তেষ্টা পায়। আর ইদানীং, মানে এই মাস দেড়েক হল, সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বাবার কথা।

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়, পাশের চেনা মুখের অচেনা মানুষগুলোর ইয়ারফোন কানে দেওয়া মুখগুলো আড়চোখে দেখতে দেখতে যখন চোখ পড়ে যায় জানলার বাইরের দিকে লাগানো আয়নাটায়, তখন বিপ্লব খেয়াল করে যে বাকিদের সঙ্গে ওর আর বিশেষ পার্থক্য নেই। যেটুকু আছে, ক্রমশই সেটুকুও মুছে যাচ্ছে। বাকিদের মত ও-ও এই যে বাড়ি ফেরার পাঁচ ছ কিলোমিটার রাস্তা, সবটাই মোবাইলে গান শুনতে শুনতে ফেরে। কেউ কারো সাথে কথা বলে না।

ফলে ঐ যে সবুজ টপ পরা সুন্দরী মেয়েটা পেছনে বসেছে, যাকে দেড় বছর ধরে বিপ্লব দেখছে আর ভাবছে আলাপ করবে, কিছুতেই সেটা হয়ে উঠছে না। রোজই মেয়েটা ইয়ারফোন কানে দিয়ে কারো সাথে কথা বলতে বলতে লিফটে ওঠে ফোর্থ ফ্লোর থেকে, গাড়িটা চালু হতে হতে কথা শেষ হয়, আর সাথে সাথেই মেয়েটা ফোনে গান চালু করে দেয়, এত জোরে যে পাশে বসেও আওয়াজ পাওয়া যায়। ততক্ষণে অভ্যাসবশত বিপ্লবও গান চালিয়ে ফেলে, আর কথা বলতে ইচ্ছে করে না।

আজ যে মোটকা ছেলেটা ঐ মেয়েটার পাশে বসেছে, তাকে দেখতে অবিকল বলকাকুর ভাইপোর মত, যে বিপ্লবের স্কুলেই এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত। এই কম্পানিতে জয়েন করার পর প্রথম দিন একে দেখে তো বিপ্লব ভেবেছিল এ সে-ই। হাসবে কি হাসবে না বুঝে উঠতে পারেনি, কারণ বলকাকুর সাথে বাবার যা সম্পর্ক তাতে তার ভাইপোর সাথে দহরম মহরম করার কোন ইচ্ছে ছিল না। ভেবেছিল ছেলেটাও হয়ত সে জন্যেই দেখেও না দেখার ভান করছে। রাতে যখন মা-কে ফোন করে জানল বলকাকুর ভাইপো কলকাতা কর্পোরেশনে কাজ করে, আগের দিনই তার বিয়ে ছিল, তখন নিশ্চিন্ত হল যে এ সে নয়। অফিসের ছেলেটা অবশ্য বাঙালিই। যে পাড়ায় বিপ্লব ভাড়া থাকে, সে পাড়ারই বাসিন্দা। প্রায়ই পাড়ার স্টেশনারি দোকানটায় গিয়ে দেখা হয়ে যায়। তবু আজও আলাপ করা হয়নি।

এই গাড়িতে বাকি যারা ফেরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, তাদের মুখগুলোও চেনা। কিন্তু ঐ যে, কারো সাথেই কখনো আলাপ করার ইচ্ছে হয়নি। ওদেরও হয়নি নিশ্চয়ই। পনেরো তলা অফিসটায় একেবারে নিজের ডিপার্টমেন্টের সহকর্মী ছাড়া কে-ই বা কার সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলে? ব্যাপারটা তেমন নতুন কিছুও নয়। কলকাতায় কাজ করার সময়ও তো এরকমই ছিল সব। রোজ এস ডি এফ মোড় থেকে যাদের সাথে শাটলে বা বাসে চাপত বাড়ি ফেরার পথে, তাদের কারই বা নামধাম জানত বিপ্লব? সহকর্মীরা কেউ সঙ্গে না থাকলে এভাবে কানে ফোন দিয়েই তো কাটত পথটা। অনেক সময় সাথে কেউ থাকলেও দুটো একটা কথা বলার পর একটু বসার জায়গা পেলেই সে তার ফেসবুকে, বিপ্লব নিজেরটায় — এই তো ছিল স্বাভাবিক জীবন। এ জীবনে কখনো একঘেয়েমি আসেনি। প্রোজেক্ট আর প্রোমোশন নিয়েই তো জীবন ছিল ওর। বাবা একবার বলেছিল “তোর মুখে তো সারাক্ষণ শুধু দুটো পি শুনি। আরেকটা পি আন, তাহলে কথাগুলো একটু কম প্যানপেনে হয়।”

“কোন পি?”

“কত পি আছে তোর অফিসে… তোর মাকে গল্প করিস শুনি তো… প্রিয়া, পারমিতা, পায়েল, প্রজ্ঞা… যাকে তোর পছন্দ হয়। তোর পছন্দ হলেই তো আমাদের পছন্দ।”

“আমাদের তো পারভিন হলেও আপত্তি নেই। এরকম বাবা-মা কজনের হয়? তুই তো তার কোন সুবিধাই নিতে পারছিস না,” মা বলেছিল।

“আমার ওসবে ইন্টারেস্ট নেই, বাবা,” বিপ্লব বড় জাঁক করে বলেছিল। “তাছাড়া আমার প্রেম করার সময়ও নেই। দেখতেই তো পাও।”

“তা তো পাই,” অস্ফূটে বাবা বলেছিল। “তুমি আর নেই সে তুমি। আগে তোমার ঘর ভর্তি ছড়িয়ে থাকত ‘সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রেমের কবিতা’, ‘ঘুমিয়েছ, ঝাউপাতা’, ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা’। আর এখন? ফিল্মফেয়ার, কসমোপলিটান… যাকগে।”

বাবা যেটা বলতে গিয়ে বলল না সেটা বুঝে ভীষণ রাগ হয়েছিল বিপ্লবের। কেটে কেটে বলেছিল “সময়ের সাথে সাথে সবকিছুই বদলায়, আমিও বদলেছি। না বদলালে সার্ভাইভ করা যায় না আজকের দুনিয়ায়। তোমার মত ফসিল হয়ে বাঁচা তো আমার পক্ষে সম্ভব না।”

কথাটা শেষ করে বাবার দিকে তাকিয়ে যে মুখটা দেখেছিল, সেটা দেখে সেদিন বেশ মজাই লেগেছিল বিপ্লবের। মনে মনে বলেছিল “আমি আমার মত, তুমি তোমার মত। কে বলেছিল তোমাকে আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে যেতে?” বাবা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে থেকে, গলা খাঁকারি দিয়ে, উঠে গিয়েছিল। নিজেই তালাটা খুলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল তখনকার মত।

এক দেড় মাস হল, সে কথা মনে পড়লেই ভীষণ কান্না পাচ্ছে বিপ্লবের। পরিষ্কার বুঝতে পারছে বাবার গলা দিয়ে যে আওয়াজটা বেরিয়েছিল সেটা কান্না গিলে ফেললে বেরোয়। কেন যে সেদিন বোঝেনি! আর তখন বাবার মুখটা যা হয়েছিল, সে মুখ তো আর এক দিনই দেখেছে বিপ্লব। সেই ১৯৯৩ সালে। বিপ্লব অঙ্ক কষছিল সকালবেলা, আর বাবা পাশে বসে কাগজ পড়ছিল। হঠাৎ কাগজে জল পড়ার শব্দে পাশে তাকিয়ে দ্যাখে — বাবার চোখ থেকে বড় বড় ফোঁটা পড়ছে গণশক্তির উপর। সেখানে জ্বলন্ত রুশ পার্লামেন্ট। খবর বলছে ইয়েলৎসিন বিদ্রোহ দমন করেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি আর তার মুখপত্র প্রাভদাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

কয়েকদিন ভীষণ চুপচাপ ছিল বাবা। পুকুরে স্নান, খাওয়া, স্কুল যাওয়া, লোকের সাথে কথা বলা — কিছুই বন্ধ করেনি, কিন্তু বিপ্লব বুঝতে পারত এটা সেই লোকটা নয়। যে সব কাজ ঠিকঠাক করছে সে একটা যন্ত্র, আসল রবীন ঘোষাল শরীরটা ছেড়ে যেন কোথায় চলে গেছে, ফিরবে কিনা কে জানে! বিপ্লবের সেই সময় ভীষণ ভয় হয়েছিল — যদি আর না ফেরে? মা যে ব্যাপারটা টের পায়নি, সেটা ও ভালই বুঝেছিল। কিন্তু ওর কোন সন্দেহ ছিল না। রাতে বাবার পাশে শুয়েই বিপ্লব টের পেত বাবা কেমন মরা গাছের মত শুয়ে আছে। বিশাল হাতটা দিয়ে বিপ্লবকে জড়িয়ে ধরছে না, উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে এমনভাবে শুয়েছে যেন কেউ ডাকলে তক্ষুণি উঠে যাবে। বিপ্লব তখন করত কি, নিজেই বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঠ্যাংটা তুলে দিত গায়ে। ছ ফুটের লোকটাকে জড়িয়ে ধরা কি ঐ ছোট্ট হাত পায়ের কম্ম? তবু নিজের মত করে বিপ্লব বাবাকে একটু স্বস্তি দিতে চেষ্টা করত। বাবা স্বস্তি পেত কিনা কে জানে! বোধহয় পেত না, কারণ ঐ কদিন একটুও নাক ডাকেনি বাবা। ঘুম থেকেও উঠে পড়ত সাতসকালে, যত রাতেই শোয়া হোক।

নিজের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ইদানীং কেবলই সেসব কথা মনে পড়ে বিপ্লবের। চাকরিজীবন হয়ে গেল বেশ কয়েক বছর। তার আগে এম সি এ পড়ার তিন বছর আর কলেজে বি সি এ তে তিন বছর — প্রায় বছর দশেক বাবার সাথে দু দণ্ড বসে ভাল করে কথাও বলেনি ও। দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কলেজে ঢোকার পরেই। তার আগের বছরগুলো কেমন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে এই মাস দেড়েক ধরে। এই কটা বছর ভুলে যাওয়া যায় না দুঃস্বপ্নের মত? কী যেন গানটা গাইত বাবা? ভাবতে ভাবতে, বহুকাল পরে, গেয়ে ওঠে বিপ্লব। “তোমার কাছে এ বর মাগি, / মরণ হতে যেন জাগি / গানের সুরে।” অফিসের ঘটনাটার পর থেকে বড় বেশি করে মনে হচ্ছে, বেশ কয়েক বছর ধরে যেন মরেই ছিল বিপ্লব। আবার জাগতে বড় ইচ্ছে করছে, বাবার কাছে ফিরে যেতে বড় ইচ্ছে করছে। কিন্তু মরণ থেকে কি জাগা যায় আর? ফিরে যেতে হলে তো এখানকার চেয়ে কম মাইনে মেনে নিয়ে কলকাতায় চাকরি নিতে হবে। সেটা কি আর পোষাবে? তার চেয়েও বড় কথা যত আঘাত দিয়েছে বাবাকে, সেসব কি বাবা ভুলতে পারবে? আর কি সেই স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি আছে বিপ্লব, যে বাবার কাছে নতুন করে জানতে চাইবে “সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল কেন?”

পশ্চিমবঙ্গের উপর, কলকাতার উপর ঘেন্না ধরে গিয়েছিল। ছেড়ে চলে আসতে পেরে ভালই লেগেছিল বিপ্লবের। বাবাকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়নি, বরং বাবাকে বেশ অসহ্যই লাগত শেষ কয়েক বছর। মাকে ছেড়ে আসতেও বিশেষ কষ্ট হয়নি। মার সাথে মতের মিল তো হয় না কোন কালেই। কিন্তু সবুজগ্রাম জায়গাটার বড় মায়া। কষ্ট যেটুকু হয়েছিল সবুজগ্রামের জন্যেই। তবে তাও কাটিয়ে উঠতে সময় লাগেনি। মানুষ বাদ দিলে একটা জায়গার আর কতটুকুই বা দাম থাকে মানুষের কাছে? তবে সবকিছু সত্ত্বেও বাইরে চলে আসাটা হয়ত এত তাড়াতাড়ি হত না। সিনিয়রদের পরামর্শ ছিল তক্ষুণি চাকরি বদলানো উচিৎ না। বাড়িতে দমবন্ধ লাগলেও বিপ্লব ভেবেছিল আরো কয়েক বছর প্রথম চাকরিতে কাটিয়ে, তবেই অন্য কোথাও পালাবার কথা ভাববে। তার আগেই যে পালিয়ে এল হায়দরাবাদে, তার কারণ একটা লোক। ওর আগের চাকরির প্রোজেক্ট লিডার অচিন্ত্যদা।

হুল্লোড়ে লোক। আর টিমের ছেলেমেয়েদের জন্যে বটগাছের মত ছিল। কেউ কোন ভুল করে ফেললে একবার শুধু অচিন্ত্যদাকে গিয়ে বলার অপেক্ষা। একচোট ধমকা ধমকি করত, তারপর বলত “খবরদার আর কাউকে বলবি না এটা তুই করেছিলিস। আমার ওপর ছেড়ে দে, আমি বুঝে নেব।” তাছাড়া বিপ্লবকে একটু বেশিই পছন্দ করত। তা নিয়ে শ্লীল, অশ্লীল নানারকম ইয়ার্কি করত সহকর্মীরা। একেবারে নতুন ছেলে প্রোজেক্ট লিডারের কাছের লোক হয়ে গেছে, এটা যে অনেকে পছন্দ করত না সেটাও বেশ বোঝা যেত। কিন্তু অচিন্ত্যদারই বা কী করার ছিল? চাকরিতে নতুন ঢুকেই যেসব সমস্যার সমাধান বিপ্লব করে দিত, সেগুলো অনেক সিনিয়রও পারত না যে। এক বছর পূর্ণ হতে না হতে বিপ্লব এও বুঝতে পেরেছিল যে অচিন্ত্যদার কাজের ধরণটা উপর তলার অনেকেই পছন্দ করে না। অন্যের দোষ নিজের ঘাড়ে নেওয়া তাদের না-পসন্দ। ফলে অচিন্ত্যদাকে কত বেশি চাপ নিতে হয় সেটা বুঝতে পেরে লোকটার উপর শ্রদ্ধা বেড়ে গিয়েছিল বিপ্লবের। সেই অচিন্ত্যদা চাকরি ছেড়ে দেওয়ায় একটু অস্বস্তি হয়েছিল বটে, তবু চাকরি বদলানোর মত কিছু হয়নি বলেই ভেবেছিল।

কিন্তু অচিন্ত্যদা হায়দরাবাদে এসে জয়েন করার পর থেকেই ফোনে বা চ্যাটে যখনই কথা হত তখনই বলত “চলে আয় এখানে। তোর বয়স আর এক্সপিরিয়েন্সের তুলনায় যোগ্যতা বেশি। চলে আয়, অনেক টাকা হাইকও পাবি আর প্রোমোশনও হয়ে যাবে।” মাস ছয়েক না না করে যাওয়ার পর যখন নতুন প্রোজেক্ট লিডারের অকারণ ধাতানি খেয়ে খেয়ে বুঝে গেল অচিন্ত্যদার উপর লোকটার যত রাগ ছিল সেগুলো সুযোগ পেয়ে ওর উপর ঝাড়ছে, তখন বিপ্লব হ্যাঁ করেই দিল। অফিসে দু একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বলেছিল সিদ্ধান্তটা ভুল হচ্ছে। কিন্তু তাদের চেয়ে অচিন্ত্যদার উপর বিপ্লবের বিশ্বাস অনেক বেশি ছিল।

হায়দরাবাদে আসার পর অচিন্ত্যদার সাথে ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে গেল। শুরুর এক দেড় মাস প্রায়ই অফিস থেকে ওর ফ্ল্যাটেই চলে যেত বিপ্লব। অচিন্ত্যদাই ডাকত। তখনো ওর বউয়ের চাকরির ব্যবস্থা হয়নি বলে বৌদি আর মেয়ে এসে পৌঁছয়নি। একাকিত্ব কাটাতে তাই বিপ্লবকে ডেকে নিত। চমৎকার রান্নার হাত লোকটার। ভালমন্দ রেঁধে ওকে খাওয়াত, সঙ্গে বিদেশ থেকে আনা নানারকম মদ। কলকাতায় থাকতে মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সাথে খাওয়া অভ্যেস থাকলেও মাথায় রাখতে হত খেলে হয় রাতে বাড়ি ফেরা যাবে না, নয়ত এত খাওয়া যাবে না যাতে গন্ধ বেরোয়। এখানে এসে সেসব ঝামেলা নেই, তাছাড়া এত দামী মদ নিজের পয়সায় খাওয়ার সামর্থ্যও ছিল না। ফলে ঐ রাতগুলো দারুণ উপভোগ করত বিপ্লব। পরদিন ওখান থেকেই অচিন্ত্যদার গাড়িতে অফিস চলে যেত। মিতালী বৌদি আর ওদের দশ বছরের মেয়ে রিচা এসে পড়ার পরেও বেশ কয়েকবার হয়েছে ওরকম।

দিব্যি কেটে যাচ্ছিল জীবন। হঠাৎ এক দিন সুর কেটে গেল।

অচিন্ত্যদাকে কী একটা কথা বলতে গিয়ে প্রচণ্ড মুখ শুনতে হল। কেন তা বুঝল না বিপ্লব। “এটা পরে বলা যেত না? এখনই বলতে হবে? যাও নিজের কাজ করো। কেবল আজেবাজে কথা বলে সময় নষ্ট করা”। প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল অচিন্ত্যদা। ওরকম অকারণে বিপ্লব কেন, কারো সাথেই সাধারণত কথা বলত না ও। হঠাৎ অত চিৎকার করায় অফিসের সবাই এত অবাক হয়েছিল, যে পিন পড়লে আওয়াজ পাওয়া যেত। বিপ্লবেরও, যতটা খারাপ লেগেছিল তার চেয়েও বেশি অবাক লেগেছিল। সেদিন সারাক্ষণই নানা কারণে চিৎকার চেঁচামেচি করে গেল লোকটা। টিমের সকলেই অসন্তুষ্ট।

বিপ্লবের ঠিক পাশেই বসত শাহনওয়াজ বলে একটা ছেলে। খুব বুদ্ধিমান এবং ভীষণ ফচকে। রাতে ডিনার করতে বেরিয়ে সবাই যখন অচিন্ত্যদার শ্রাদ্ধ করছে, তখন নওয়াজ বলল “নহি, বন্দা বুরা নহি হ্যায়। লেকিন লগতা হ্যায় বহুত প্যায়সা খো দিয়া হ্যায়।”

একজন জিজ্ঞেস করল “প্যায়সা? ক্যায়সে?”

“আরে ইয়ার শেয়ার পে। হি’জ আ রিচ ম্যান। ঔর বহুত শেয়ার ট্রেডিং করতা হ্যায় উয়ো। বিপ্লব সে পুছ না।”

বিপ্লব জানে কথাটা ঠিকই। মানে সেটা অচিন্ত্যদার খারাপ মেজাজের কারণ হোক বা না-ই হোক, ও যে প্রচুর শেয়ার কেনাবেচা করে সেটা ঠিকই। ওর পাল্লায় পড়ে বিপ্লবও একবার কিনেছিল কিছু। কিন্তু ঐ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার সময় নেই বলে কয়েক মাস আগেই সব বেচে দিয়েছিল। এসব অবশ্য সহকর্মীদের বলা যায় না। তাই বিপ্লব একটু হেসে বলল “কমাল করতে হো ভাই। মুঝে ক্যায়সে পতা হোগা? মুঝসে পুছকে থোড়ি করতা হ্যায়।” ওরা অবশ্য কেউ বিশ্বাস করল না বিপ্লব জানে না। খানিকক্ষণ ইয়ার্কি, ফাজলামি চলল তাই নিয়ে। তবে নওয়াজের কথাটা বিপ্লবের কানে লেগে রইল।

পরদিন অচিন্ত্যদার মেজাজ একটু ঠান্ডা। বিপ্লবকে একবার ডেকে নিয়ে গেল বাইরে যাওয়ার সময়। সুযোগ পেয়ে সিগারেট ধরিয়ে দিতে দিতে বিপ্লব জিজ্ঞেস করল “তুমি কি কিছু নিয়ে একটু টেনশনে আছ?”

“একটু? ভীষণই টেনশনে আছি।”

“কেন গো?”

“সেনসেক্সের অবস্থা দেখেছিস? গ্লোবাল মার্কেটের হাল দেখেছিস?”

“হুঁ। চারদিকে তো ধস।”

“তবে?”

“অনেক লস হল তোমার?”

“যা হওয়ার তো হয়েছেই। আরো যে কত হবে বুঝতে পারছি না রে। সেটাই মুশকিল।”

“যাকগে, কী আর করবে? তোমার তো হাতে নেই।”

“আরে শুধু আমার গেলে কথা ছিল। আমার শ্বশুরমশাইকে কিছু কিনিয়েছিলাম। এখন লস হওয়াতে উঠতে বসতে কথা শোনাচ্ছে। এই নিয়ে রোজ বাড়িতে অশান্তি।”

“অশান্তি? কেন? উনি কি টাকা ফেরত চাইছেন তোমার কাছে?”

“হ্যাঁ। আসলে আমার থেকে ওনার লস একটু বেশিই হয়েছে। আমার কাছে আই সি আই সি আই শেয়ার অল্পই ছিল। ওনার বেশিটাই ওদের শেয়ার। একসাথেই কিনেছিলাম। আমি কী করে তখন জানব বল তো এরকম হবে?”

“এখন কী করবে তাহলে?”

“বোঝানোর চেষ্টা করছি যে পরে বাজার ঠিক হলে ঐ টাকা ওনার উঠে আসবে। কিন্তু শুনছেই না। গোদের ওপর বিষফোঁড়া আমার বউ। শালা গাঁইয়া তো গাঁইয়াই। এতদিন আমার সাথে থেকেও সেই মিডল ক্লাস মেন্ট্যালিটি। কেবল প্যানপ্যান করে চলেছে। ‘আমার বাবা কষ্টের পয়সা… তুমি কেন জোর করে কেনালে? এক্ষুণি ফেরত দিয়ে দাও।’”

“তুমি বেকার আর চাপ নিচ্ছ কেন? ফেরতই দিয়ে দাও না। অন্তত তোমাকে তো আর কথা শুনতে হবে না।”

অচিন্ত্যদা বেশ রেগে গেল এই কথায়।

“আরে টাকা কি খোলামকুচি নাকি? বললেই ফেরত দেয়া যায় এইভাবে? আমার নিজের পঞ্চাশ হাজার টাকা লস হয়েছে, ওনাকে আশি হাজার কোথা থেকে দেব আমি?”

টাকার অঙ্কগুলো শুনে হাঁ হয়ে গিয়েছিল বিপ্লব। সেটা দেখে আবার অচিন্ত্যদার রাগ পড়ে যায় কিছুটা।

“আরে চমকাচ্ছিস কেন? ওটা এমন কিছু টাকা না। শেয়ারের দাম উঠলে দ্য মানি উইল বি ব্যাক লাইক দিস,” তুড়ি মেরে বলেছিল।

“তোমার শ্বশুরমশাই কী করেন?”

“রিটায়ার্ড। স্কুলমাস্টার ছিল। হাজার পনেরো টাকা পেনশন পায় রে। আরামের লাইফ। তাও এত ঝামেলা করছে। ভাব!”

“রিটায়ার্ড? তা এত টাকা উনি তোমায় কোত্থেকে দিলেন?”

“আরে লাস্ট ইয়ারই রিটায়ার করেছে, না? গ্র‍্যাচুইটি ফ্যাচুইটি কিসব পেয়েছিল। কোথায় ইনভেস্ট করবে ভাবছিল। তা আমি বললাম শেয়ারে দিন। এত তাড়াতাড়ি এত বেশি রিটার্ন আর কিছুতে পাওয়া যায়, তুই বল?”

একটা ধাক্কা লেগেছিল বিপ্লবের। স্কুলমাস্টারের সারা জীবন খেটে রোজগার করা গ্র‍্যাচুইটির টাকা শেয়ারে খুইয়েছে অচিন্ত্যদা! হায়দরাবাদে আসার পর সেই প্রথমবার বাবার মুখটা মনে পড়েছিল। সাহস করে বলেছিল “আশি হাজার কিন্তু কম টাকা না, অচিন্ত্যদা। আর গ্র‍্যাচুইটি তো একজন স্কুল মাস্টারের তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে জমে। সেই টাকা এইভাবে চলে যাওয়া…”

“আরে তা আমি কী করব? আমি কি ইচ্ছা করে ওনার টাকা নষ্ট করেছি? আসলে আমারই ভুল। এসব কনজারভেটিভ লোক। এদের জন্যে পোস্ট অফিস, ফিক্সড ডিপোজিট — ওগুলোই ঠিক আছে। এরা হাই রিটার্ন চায় না। ভাল পরামর্শ দিতে নেই এদের।”

অচিন্ত্যদা সঙ্কটটা কিছুতেই বুঝবে না বুঝতে পেরে আর কিছু বলেনি বিপ্লব। ফ্ল্যাটে ফিরে মনে পড়েছিল, বাবার স্কুলের গোবর্ধনকাকু একবার বাবাকে শেয়ার কিনতে বলেছিল বছর কয়েক আগে।

“সরকার তো সবকিছুতে সুদ কমিয়ে দিচ্ছে, রবীনদা। আগামী দিনে আরো দেবে। কষ্ট করে রোজগার করা পয়সা, ব্যাঙ্কে বা পোস্ট অফিসে রেখে আর ক পয়সা রিটার্ন পাও? শেয়ারে ইনভেস্ট করো, দেখবে অনেক তাড়াতাড়ি বেড়ে যাবে টাকা।” গোবর্ধনকাকু লোভ দেখিয়েছিল।

“আমি ফাটকা খেলি না, গোবর্ধন। তুই যতই লোভ দেখা,” বাবা হেসে বলেছিল।

“ধুর! এটা বাড়াবাড়ি, রবীনদা। শেয়ার বাজার একটা পুরো লিগাল জিনিস। সরকার ট্যাক্স নেয়, রেগুলেটও করে। তুমি এমনভাবে বলছ যেন জুয়া।”

“শেয়ারের টাকা কেন বাড়ে, কখন বাড়ে আর কেন কমে, কখন কমে তুই জানিস? কারো নিয়ন্ত্রণ আছে?”

“না। কেউ নিয়ন্ত্রণ করলে সেটা তো দু নম্বরি হবে। সেটা আটকানোর জন্যে সরকার আছে।”

“আচ্ছা সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে? আমার টাকা গচ্চা যাবে না সে গ্যারান্টি সরকার দিতে পারে?”

“তা পারে না…”

“তালে তো এটা ফাটকা খেলাই। কপালে ঠেকিয়ে ছুঁড়ে দাও, তারপর বেড়ে ফেরত এলে তুমি আমির, আর কমে গেলে ফকির। এই তো?”

“না, ফকির আর কে হচ্ছে? ভাল একজন শেয়ার ব্রোকারকে দায়িত্ব দিলে তোমার কোন চিন্তাই নেই। আমরা তো এত জন শেয়ার ট্রেডিং করছি। আমাদের কি সব ভেসে গেছে?”

“যায়নি ঠিকই, তবে যাবে না যে তা তো তুইও গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারিস না। পারিস কি?”

“গ্যারান্টি তো কোন ব্যবসাতেই নেই, রবীনদা। ঝুঁকি তো নিতেই হবে। নো রিস্ক নো গেন।”

“আর আমার কী গেন করার আছে বল দেখি? আমার ছেলে চাকরি পেয়ে গেছে, ওর পেছনে খরচা নেই। আমাদের শরীর খারাপ হলে মেডিক্লেম আছে। আমার রোজগারে জোনাকির আর আমার হেসে খেলে চলে যাবে বাকি জীবনটা। আমার কোন দরকার চটজলদি বড়লোক হওয়ার জন্যে শেয়ার কেনাবেচা করার?”

কাগজ পড়তে পড়তে কথাগুলো শুনে মোটেই ভাল লাগছিল না সেদিন বিপ্লবের। ও আর থাকতে না পেরে বলেছিল “বাবা, সেসবের জন্যে শেয়ার কেনে না লোকে। অনেক মানুষের অনেক অ্যাম্বিশন থাকে। একটা এক্সট্রা ইনকাম থাকলে তুমি মাকে নিয়ে বিদেশে বেড়িয়ে আসতে পারো। সারা জীবন তো সবুজগ্রাম আর কলকাতা ছাড়া কিছুই চিনলে না।”

বাবা কথাটাকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে বলেছিল “না চিনে তোকে তো এমন বানাতে পেরেছি যে তুই বিদেশ যেতে পারিস। তোর যদি কখনো মনে হয় বাপ-মাকে বিদেশ নিয়ে যাবি, তো যাব। নইলে যাব না।”

অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ও ঘর থেকে উঠে চলে গিয়েছিল বিপ্লব। পাশের ঘর থেকে শুনতে পেয়েছিল বাবা বলছে “তাছাড়া কী জানিস, গোবর্ধন? সরকার বলছে কর্মচারীদের পি এফের টাকাও শেয়ার বাজারে খাটাবে। আমাদের পার্টি এটা ফাটকা বাজার বলেই তার বিরোধিতা করছে। তা আমি মিটিঙে লোককে বোঝাব এটা খারাপ, তারপর নিজেই শেয়ারে টাকা খাটাব? তা তো হয় না বাপু।”

শুনে অচিন্ত্যদার মত তারও মনে হয়েছিল, বাবার মত লোকেরা ভীষণ রক্ষণশীল। কিছুতেই মধ্যবিত্ত মানসিকতার ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না এরা। কোন “অ্যাম্বিশন” নেই। এসব ভাবা সত্ত্বেও, বোধহয় বাবার শেয়ার বাজার সম্পর্কে দেখানো ভয়টা অবচেতনে কোথাও কাজ করেছিল। তাই বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীরা সকলেই শেয়ার বাজার নিয়ে মাতলেও ও ভরসা করে খুব বেশি টাকা লাগাতে পারেনি। একবারই অচিন্ত্যদা খুব চাপাচাপি করায় আই ডি বি আই এর কিছু শেয়ার কিনেছিল। যে কদিন শেয়ারগুলো ছিল, কিরকম একটা উৎকণ্ঠা হত। ঘনঘন নেট খুলে দেখতে হত উঠল না নামল। মাস দুয়েক ওরকম চলার পর আর থাকতে না পেরে সব শেয়ার বেচে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিল বিপ্লব। হাজার পাঁচেক টাকার শেয়ার ছিল, বেচে দিয়ে সাড়ে ছ হাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। শুনে অচিন্ত্যদা বলেছিল “কিসের যে এত ভয় তোর? ভাল শেয়ারগুলো এরকমভাবে ছেড়ে দিলি? আমায় একবার জানাতে পারতিস তো?” তারপর থেকে যতবার আই ডি বি আই এর শেয়ারের দাম চড়েছে, অচিন্ত্যদা কাটা ঘায়ের নুনের ছিটে দেওয়ার মত করে বলেছে “আজকে শেয়ারগুলো থাকলে তুই লালে লাল হয়ে যেতিস।” একেক সময় যে আফসোস হয়নি তা নয়, তবে আবার শেয়ার কেনার উৎসাহ পায়নি বিপ্লব। অচিন্ত্যদার আর ওর শ্বশুরের অবস্থা শুনে মনে হয়েছিল “ভাগ্যিস!”

অচিন্ত্যদার উপর আস্থা তখন থেকেই কমতে শুরু করেছিল। তবে হায়দরাবাদে আর সেরকম বন্ধু কে ছিল? বসের মদ খাওয়ার বন্ধু যে হয়, তার এমনিতেও সমবয়সী সহকর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব খুব একটা জমে না, তার উপর কলেজজীবনের সেই ঘটনাগুলোর পর থেকে বিপ্লব নিজের বলিয়ে কইয়ে স্বভাবটা বদলে ফেলেছে অনেকটাই। ছুটির দিনে একসাথে আড্ডা মারা, সিনেমা দেখতে যাওয়ার বন্ধু ওর কেউ হয়নি হায়দরাবাদে আসার পর থেকে। ফলে অচিন্ত্যদার সাথে ভাবটা রয়েই গিয়েছিল।

তারপর এল ২০০৯। বসেরা ডিসেম্বর ২০০৮ থেকেই বলতে শুরু করেছিল “গেট রেডি ফর টাফ টাইমস।” মানে ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ভাল না, এবার হাইক টাইক ভাল হবে না — এইসব। জানুয়ারির শেষ দিক থেকে শোনা গেল পরিস্থিতি আরো খারাপ। মাইনে তো কমে যেতে পারেই, কিছু লোকের চাকরি গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। অচিন্ত্যদার ফ্ল্যাটে মদ খেতে খেতে একদিন ঠিক কী হতে যাচ্ছে জিজ্ঞেস করায় ফিসফিস করে বলল “চুপ কর, চুপ কর।” তারপর ইশারায় বোঝাল, মিতালি কিছু জানে না।

সেদিনও রাতে ওদের ফ্ল্যাটেই ছিল বিপ্লব। সারারাত ধরে অচিন্ত্যদা গ্লাসের পর গ্লাস শেষ করে গেল। যা বলল, শুনে বিপ্লবের চিন্তায় ঘুম উড়ে গেল। অবশ্য বারবারই বলছিল “তোর কোন ভয় নেই, বিপ্লব। তোর বড়জোর একটু স্যালারি কাট হবে। তাও হবে না আমার মনে হয়। ক্ষতি যা হবার হবে আমার।”

অচিন্ত্যদার জন্যে কষ্টই হচ্ছিল বিপ্লবের। মানুষটা পরিষ্কার বলল ওর আর্থিক অবস্থা ইতিমধ্যেই খারাপ। যা অবস্থা তাতে পরের মাসে রিচার জন্মদিনের পার্টিটা না করতে পারলেই ভাল হয়। কিন্তু সেটা করলে ওর স্কুলের বন্ধুদের কাছে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। তাছাড়া চাকরিতে যে টালমাটাল চলছে সেটা বউকে জানতে দিতে চায় না। পরদিন সকালে বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে বিপ্লব বলেই ফেলেছিল “দাদা, তোমার টাকাপয়সা লাগলে আমাকে বলতে পারো। অন্তত রিচার জন্মদিনের জন্যে যদি কিছু…”

“থ্যাঙ্ক ইউ,” ম্লান হেসে অচিন্ত্যদা বলেছিল। “এক্ষুণি নেব না, বুঝলি? দেখি কতটা কী করতে পারি? খুব দরকার হলে তোকে বলব। আর কাকে বলব, বল? এই শহরে আমার আত্মীয় বল, বন্ধু বল — তুই-ই। যতক্ষণ পকেট ভর্তি আছে ততক্ষণ সবাই বন্ধু। খালি হয়ে গেলে তখনই আসল বন্ধু চেনা যায়।”

সেই অচিন্ত্যদার মাস দেড়েক আগে চাকরিটা গেল। ওর একার যায়নি অবশ্য, ওর র‍্যাঙ্কের আরো কয়েকজনের গেছে। যেদিন শেষ অফিসে এল, সেদিন কারো সঙ্গে একটা কথা বলল না। তবে কেউ ওর সাথে কথা বলার চেষ্টাও করেনি। বিপ্লব একবার উঠে গিয়ে আর কী বলবে ভেবে না পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল “আজ লাস্ট?” অচিন্ত্যদা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল। সিটে ফিরে আসার পর নওয়াজ বলেছিল “ইয়ার তু কেয়া কর রাহা হ্যায়? দ্যাট ম্যান’স গন। ইউ ডোন্ট ওয়ন্ট বসেস টু নো ইউ টু আর ক্লোজ।”

পরে একদিন অচিন্ত্যদার ফ্ল্যাটে গিয়েছিল বিপ্লব। গিয়ে শুনল বৌদি মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেছে। আপাতত অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গেছে, তবে আসলে চাকরি খুঁজতে গেছে। কারণ বৌদির একার রোজগারে এই শহরে থাকা সম্ভব না, এই ফ্ল্যাটে তো নয়ই।

“এখন কী করবে ভাবছ? সি ভি পাঠালে কোথাও?”

“কোত্থাও লোক নিচ্ছে না রে ভাই। আর নিলেও আমায় নেবে না। অনেক বেশি বয়স আর মাইনে হয়ে গেছে আমার,” ভরদুপুরে গ্লাসে ভদকা ঢালতে ঢালতে বলেছিল অচিন্ত্যদা। সেদিন কেমন যেন নিশ্চিন্ত লেগেছিল ওকে। যেন একদমই চিন্তিত নয় ভবিষ্যৎ নিয়ে। চাকরি খোঁজার ইচ্ছাও নেই বিশেষ।

দিন সাতেক পরে নাইট করে এসে টেনে ঘুম দিচ্ছিল বিপ্লব। নটা, সাড়ে নটা নাগাদ ফোনটা বাজল। করেছিল মিতালি বৌদি। অচিন্ত্যদা গাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, পাশের ফ্ল্যাট থেকে বৌদির কাছে ফোন গেছে। কলকাতায় বসে আর কী-ই বা করার ছিল বিপ্লবকে ঘুম থেকে তোলা ছাড়া? ও হাসপাতালে দৌড়ে গিয়ে সব ব্যবস্থা করেছিল। সে যাত্রায় বেঁচে গেল লোকটা। পরদিন বৌদি এসে পৌঁছল, দিন তিনেক পরে যখন অচিন্ত্যদা হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল, তখন ওকে কলকাতায় নিয়ে চলে গেল। সেই থেকে আর কিচ্ছু ভাল লাগছে না বিপ্লবের। বারবার মনে হচ্ছে — ফিরে যাই, ফিরে যাই।

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ১৮

পূর্বকথা: হীরুদার মৃত্যুর পর বলরাম আর শ্যামলের প্রভাব আবার বেড়ে গেছে। রবীন স্বভাবতই কোণঠাসা। তবু সমাজবিরোধী জগার দলবল মাঝরাতে তাণ্ডব শুরু করলে রবীনের কাছেই ছুটে আসে লোকে, রবীনকে গিয়ে থামাতেও হয়। কিন্তু পুলিশ ফাঁড়ির সামনে লোক দেখানো ধিক্কার সভায় সে বক্তৃতা দিতে রাজি হয় না।

সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রাম, বড়িহাটার সকলে যে হরিপদর বউকে ঐ পরিচয়েই চিনত তা নয়। সবুজগ্রাম গার্লস হাইস্কুলের জীবন বিজ্ঞানের দিদিমণি হিসাবে সুমিত্রা স্বনামধন্য। প্রাইভেট টিউশন করলে অনেক টাকা করতে পারত, কিন্তু করল না কোনদিন। তবু দিন রাত বাড়িতে এলাকার পড়ুয়াদের আনাগোনা লেগেই থাকত। স্কুলে মেয়েদের দিয়ে ইকো ক্লাব করানো, গান বাজনার দল — এসব নিয়ে সারাক্ষণ মেতে থাকত সুমিত্রা। হরিপদ স্কুল আর রাজনীতি নিয়ে বরাবর মহা ব্যস্ত। তার সাহায্যের দরকার হয়নি কোনদিন।

সুমিত্রা বিজ্ঞান মঞ্চেরও সদস্য ছিল। ওরই উদ্যোগে প্রতিবার পুজোর সময়ে গার্লস স্কুলে বিজ্ঞানমেলা হত। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘বিষধর সাপের ঘরে জীবন্ত মানুষ।’ একটা সাপে ভর্তি খাঁচার ভেতর বসে বিজ্ঞান মঞ্চের একজন সাপ চেনাত আর সাপ সম্পর্কে নানা কুসংস্কার, ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করত। ওটা দেখতে সব বয়সের মেয়ে পুরুষের ভিড় হত। সেসব এস এস সি পরীক্ষা চালু হওয়ার আগের যুগের কথা। তখনকার প্রধান শিক্ষিকা অবসর নেওয়ার সময়ে ছাত্রীরা, তাদের অভিভাবকরা, অনেকেই চেয়েছিল সুমিত্রাই হেড মিস্ট্রেস হোক। ও-ও রাজি ছিল। কিন্তু শ্যামল কংসবণিক তো তখন সবুজগ্রামের সম্রাট। তার ভাইয়ের বউ থাকতে কী করে অন্য কেউ হেড মিস্ট্রেস হয়? রবীন চেয়েছিল নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে। নবারুণও বলেছিল “সুমিত্রার চেয়ে যোগ্য লোক নেই, ও দায়িত্ব পেলে স্কুলটা অন্য উচ্চতায় চলে যাবে। তুই হীরুদাকে বল।” কিন্তু সুমিত্রা জানতে পারা মাত্রই বারণ করেছিল। “প্লিজ এসব করবেন না, রবীনদা। হেড মিস্ট্রেস কে হবে এই নিয়ে টিচারদের মধ্যে দলাদলি হওয়া খুব খারাপ। ছাত্রীরা জানতে পারলে আমাদের আর সম্মান করবে না।”

সুমিত্রার মারা যাওয়ার খবরটা পাওয়ার পর থেকে নবারুণের মনে পড়ছিল কথাগুলো। শ্বশুরমশাই হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সে কদিন কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকছিল। বিকেলে শ্বশুরমশাইকে দেখে ফিরেই জানল খবরটা। বিজ্ঞান মঞ্চেরই একজন ফোনে জানাল।

সুমিত্রার গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীরা শ্রাদ্ধশান্তি মিটে যাওয়ার পর একটা স্মরণসভার আয়োজন করল সবুজগ্রাম রবীন্দ্র ভবনে। রবীন, নবারুণ দুজনেই বক্তা হিসাবে আমন্ত্রিত। হলের গেটের বাইরেই নবারুণের চোখে পড়ল রবীন বিড়ি ধরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু কাঁপা হাতে কিছুতেই ঠিক জায়গায় ঘষাটা লাগছে না।

“দে, আমারে দে,” বলে দেশলাইটা চেয়ে নেয় নবারুণ। “আমিও একখান খাইয়া নেই।”

রবীন পাঞ্জাবির পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বার করতে যাচ্ছিল। তার আগেই বুক পকেট থেকে উইলসের বাক্সটা বার করে বাড়িয়ে ধরে নবারুণ।

“আইচ্ছা, তোর কল্যাণে একখান সিগারেটই খাই,” রবীন একটু হেসে একটা বার করে নেয়।

নিজেরটা ঠোঁটে লাগিয়ে, দুজনেরটা ধরিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে নবারুণ বলে “তোর এখন সিগারেটই খাওয়া উচিৎ। বয়স তো হইতাছে, সিগারেটের ফিল্টারে ক্ষতিটা একটু তো আটকায়।”

“সিগারেটের অনেক খরচা। পদ্মা বিড়িই ভাল।”

“খরচা আবার কী? মাস্টারদের কি এখন সেই আগের মত মাইনে আছে? ইস্কুল মাস্টাররাও তো এহন বিদেশ বেড়াইতে যায়।”

“যে যায় সে যায়…”

“হেইডাই হইল গিয়া কথা। তুই বিড়িই খাবি। না খাইলে তোর মনে হইব কিছুই খাইলাম না।”

রবীন হাসতে হাসতে বলে “সে তো বটেই। আমাগো তো এই কইরাই জীবন কাইট্যা গেল। এহন আর বদলায় কী লাভ?”

“না বদলাইতে পারলে তো ভালই হইত রে। কিন্তু কখন যে চারপাশটা বদলায় গেল… আমরাও বদলায় গ্যালাম! টেরই পাইলাম না।”

“বদল তো সকলেরই হইছে। আমারও কি হয় নাই? আমি তো সারাজীবন একখান দম দেয়া এইচ এম টি ঘড়ি পরছি। এইবার ছুটিতে আইস্যা পোলায় দিয়া গেল কি একখান বিদেশী ঘড়ি। জম্মে নামও শুনি নাই সে কোম্পানির। দমও দিতে লাগে না। এদেশে পাইল কী কইরা জিগাইলাম, কইল হায়দরাবাদে নাকি অনেকদিনই পাওন যায়, এহন কলকাতাতেও যায়। তা সেই ঘড়িই পরতাছি। কেমন জানি লাগে, কিন্তু না পরলে পোলার মুখ ভার, পোলার মায়েরও মুখ ভার।”

নবারুণের মনটা এত ভারী হয়ে যায় যে বাঙাল কথা ছেড়ে দিয়ে বলে “আসলে আমরা হেরে গেলাম, রবীন। বহুজাতিকের কাছে। গোহারা হেরে গেলাম।”

“অত বড় সোভিয়েত রাশিয়াই হেরে গেল, আমরা তো কোন ছার” রবীন উত্তর দেয়।

“আমাদেরও ভুল ছিল। মনে আছে? ‘কম্পিউটারাইজেশন করতে দেব না’। এখন তোর ছেলে, আমার ছেলে — সব তো কম্পিউটারের জন্যেই করে খাচ্ছে।”

“হ্যাঁ। আর কেবল স্বার্থপর হচ্ছে। সারা বিশ্বের লোকের কাজ করছে আর নিজে কূপমণ্ডূক হচ্ছে।”

“যাঃ! বিপ্লব ওরকম না। তুই বেশি কড়া হয়ে ভাবছিস। আমাদের ছেলেপুলেরা ওরকম, বিপ্লব আর পাঁচটা ছেলের মত না।”

“না রে, না। কোন তফাত নেই। এখন সকলেই একই রকম। হায়দরাবাদে থাকে, ওখানকার রাজনীতির কোন খবরই রাখে না। জিগেস করলে বলে ‘আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আমার কী দরকার ঐ কচকচিতে?’ এবার যখন এল জিগেস করলাম ‘হ্যাঁ রে, হায়দরাবাদে যে এত ডেভেলপমেন্ট, বাকি অন্ধ্র কিরকম?’ বলে ‘আমার জেনে দরকার নেই। আমি কি ওখানে ভোট দেব?’”

“আরে তুই বুঝিসনি। তার মানে ওর ওখানে মনে টেকে না, এখানে ফিরে আসতে চায়। এটা তো ভাল লক্ষণ।”

“কে বলেছে মন টেকে না? খুবই টেকে। এই তো ক মাস আগে আমিই আগ বাড়িয়ে বললাম ‘সল্টলেকে তো এখন অনেক কোম্পানি হয়েছে। দ্যাখ না চলে আসতে পারিস কিনা?’ উড়িয়ে দিয়ে বলল ‘কম মাইনে নিয়ে আসতে হবে। পারব না।’”

এই কথাটা শুনে মনটা দমে যায় নবারুণেরও। দীর্ঘকাল রবীনদের বাড়ি যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও বিপ্লব তো পাড়াতেই বড় হয়েছে, চোখের সামনে। ছেলেটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। আর বুদ্ধিমানও। ওর বাবার সাথে যে নবারুণের মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সেটা ওর ব্যবহারে কিন্তু লোকে বুঝত না। একবার একটা স্কুলের ইকো ক্লাবের করা ইন্টার স্কুল বক্তৃতা প্রতিযোগিতার পুরস্কার দিতে গিয়ে নবারুণ শুনেছিল বিপ্লবের বক্তৃতা। তখন ও এইট কি নাইনে পড়ে। জল দূষণ ছিল বিষয়। বেধড়ক কারখানা তৈরি কিভাবে বারোটা বাজাচ্ছে সেটা কি সুন্দর বুঝিয়েছিল ছেলেটা! বক্তৃতার শেষটা এখনো কানে বাজে।

“রবীন্দ্রনাথ যতই বলুন, দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর। বনে গিয়ে বাস করতে বললে আমরা কেউই রাজি হব না। তাই নগর আমাদের লাগবে, শিল্পও আমাদের লাগবে। প্রশ্নটা হল, তার জন্যে কতটা মূল্য দেব আমরা? শিল্প মানুষের জন্য, না মানুষ শিল্পের জন্য? লাগামছাড়া ধনতন্ত্র আমাদের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অধিকার, পরিষ্কার জল খাওয়ার অধিকারটাও কেড়ে নিতে উদ্যত। অতএব দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিনা, সেটাই হল মূল প্রশ্ন।”

সেই ছেলের মুখে আজ এই কথা! আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করে নবারুণের। রবীন বলে “আর ধরাস না। চল ভেতরে যাই। সময় হয়ে গেল।”

সুমিত্রার স্মরণসভায় ওর বক্তৃতায় রবীন একেবারে শেষে বলল “সুমিত্রার দিন গেছে। ও ওর মত করে দুনিয়াটা সাজানোর চেষ্টা করেছিল। ভাল হল কি মন্দ হল সেসব বিচার করবে যারা রইল, তারা। রবিবার বিকেলবেলা নানা প্রলোভন উপেক্ষা করে প্রায় শ খানেক লোক যখন ওকে স্মরণ করছে, তখন নিশ্চয়ই ওর কাজে মানুষের কিছু ভাল হয়েছে। মানুষ হিসাবে আমাদের যার যতটুকু সাধ্য, তাই দিয়ে আশপাশের মানুষের ভাল করা — এইটাই তো যে কোন লোকের প্রধান কাজ বলে আমার মনে হয়। কেমন করে সেটা করা যায়, সুমিত্রার থেকে আমরা সবাই শিখেছি। তোমরা যারা আজকের আয়োজক, আশা করি তারা আরো বেশি শিখেছ। তোমরাই চারদিকের হতাশার মধ্যে আশার আলো। পৃথিবীটা তোমাদেরই থাকবে, তোমাদেরই এটাকে আরো সুন্দর করে তুলতে হবে। আমাদের তো আর সময় নেই।”

নবারুণের ভারী অবাক লাগল শেষ কথাগুলো। হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট হল যখন, সেই থেকে ও রবীনের বক্তৃতা শুনে আসছে। হয়ত কেউ খুন হয়েছে, সেখানে গিয়েও রবীন এমন বক্তৃতা দিয়েছে যে সকলে চাঙ্গা হয়ে গেছে। আজ এমন বিষণ্ণ উপসংহার কেন?

স্মরণসভা শেষ হওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে প্রশ্নটা করতেই, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে রবীন বলল “আরে পার্টি মিটিং নয় তো। ঐ জন্যে সুমিত্রা পার্টি মেম্বার হলেও শেষে লাল সেলাম, অমর রহে — ওসব বললাম না।”

নবারুণের মনে হল রবীন প্রশ্নটা বুঝেও না বোঝার ভান করছে। বলল “সে কথা বলছি না। তুই ‘আমাদের আর সময় নেই, তোমাদেরই যা করার করতে হবে’ — এসব বললি কেন? তোর তো এখনো ষাটও পুরো হয়নি। ডিসেম্বরে রিটায়ারমেন্ট না?”

“হ্যাঁ। তোর দু মাস আগে,” রবীন হেসে উত্তর দেয়।

“তাহলে আবার সময় শেষ কী? দেখছিস চারিদিকে কী অবস্থা, পার্টিটা প্যাঁচে পড়েছে, আর তুই এত সিনিয়র পার্টিকর্মী, কোথায় নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্ল্যান করবি, তা না…”

রবীন হা হা করে হেসে ওঠে। “আরে তুই কি ভাবছিস আমি পার্টি ছেড়ে দেব নাকি? কক্ষনো না। পার্টির বিপদে এখনো মিছিলের সামনে থাকব। ওটা এমনি বললাম। বয়স তো হয়েছে।”

“সত্যি কথা বল। শরীরটা খারাপ? তুই তো আবার জীবনে ডাক্তার ফাক্তার দেখাস না।”

“আরে বাবা, কিচ্ছু হয়নি। দাঁড়া একখানা বিড়ি খাই।”

পকেট হাতড়ে প্যাকেটটা বার করে রবীন। নবারুণ নিজের লাইটার দিয়ে বিড়িটা ধরিয়ে দেয়। তৃপ্তির ধোঁয়া ছাড়ার পর বেশ একটু কাশি হয় রবীনের। কাশা শেষ করে সেই আগের মত দুষ্টু হেসে বলে “একটা গান আছে না? কী একটা ব্যান্ডের গান? ‘বড় বড় গাছগুলো সব বুড়ো বলে বাদ দিও না গো।’ আমরা এখন সেইরকম। বড় গাছ, বুড়ো বলে বাদ।’”

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ১৭

পূর্বকথা: প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান হরিপদর স্ত্রীকে দাহ করতে গিয়ে রবীনের মনে পড়ে প্রয়াত হীরুদার কথা।

হীরুদার চলে যাওয়া বলরাম আর শ্যামলের জন্যে ছিল আশীর্বাদ। জেলা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে দুজনের উদ্ভাসিত মুখ, জুনিয়র কমরেডদের সাথে ঈষৎ অশ্লীল ইয়ার্কি করে হাসতে হাসতে বলরামের এর ওর গায়ে গড়িয়ে পড়া, শ্যামলের গম্ভীর থাকার চেষ্টা করতে করতে ফিক করে হেসে ফেলা — সবকিছুই জানান দিচ্ছিল ওরা জানে ওদের রাজত্ব ফিরে পেতে আর দেরী নেই।

আসলে হীরুদার মৃত্যুতে যাঁর জেলা সম্পাদক হওয়ার কথা, সেই সুব্রতদা যে লোক খারাপ তা নয়, বরং উনি নিপাট ভালমানুষ, তবে হীরুদা যেমন জেলার সব পার্টি সদস্যের মুখ চিনতেন তেমন করে উনি চেনেন না। প্রবীণ কৃষক নেতা, সর্বক্ষণের কর্মী, প্রচুর অত্যাচার সহ্য করেছেন এক সময়, জেলা অফিসেই থাকেন। সবই ভাল, কিন্তু লেখাপড়া বেশি দূর করেননি বলে বরাবর লোকটাকে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখেছে রবীন। সেই সুযোগে ওঁর চেয়ে বয়সে ছোট, পার্টিকর্মী হিসাবে কম যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা নিজেদের ইচ্ছে মত সুব্রত মণ্ডলকে ব্যবহার করে — সে কি জেলা কমিটির অন্য সদস্যরা, কি এল সি এম, এল সি এসরা। একই কারণে সকলেই জানে উনি জেলা সম্পাদক হবেন নামেই। ওঁকে চালাবে আসলে কল্যাণপুরের এম পি রথীন রায়। সে যে কী জিনিস, সেটা কল্যাণপুরের কমরেডদের থেকে বহু আগেই শুনেছে রবীন। হীরুদাও বলতেন “কি সব লোক উঠে আসছে, রবীন! বিন্দুমাত্র সততা নেই, ক্ষমতার গন্ধে মাতাল, একেবারে মায়া দয়াহীন। অথচ কমরেডরা তো বটেই, সাধারণ লোকেও মোটের উপর একে পছন্দই করে!”

“সত্যি! পছন্দ করে? নাকি ভয় করে?”

“হ্যাঁ, কিছু লোক তো ভয়ে ভক্তি করে ঠিকই। সে না হয় সাধারণ লোকেদের কথা ধরলাম। কিন্তু পার্টি মেম্বাররা? তারা ওর দোষ ত্রুটি দেখতে পাবে না কেন?”

আপনি এই কথা বলছেন, হীরুদা! আপনি কি এই ব্যাপারটা প্রথম দেখছেন? আমাদের ওখানে বল একটা পঞ্চায়েত প্রধান, তাতেই কমরেডরা ভয়ে কাঁপে। আর রথীন রায় তো এম পি।”

“তা বটে,” হীরুদা বিষণ্ণ হয়ে বলেছিলেন। “আমাদেরই দোষ আসলে। গরীব মানুষের পার্টিকে আর গরীব মানুষের রাখা গেল না তো… এসব মৌ লোভী লোক তো উপরে উঠবেই।”

শ্যামলটা চিরকালের কূপমণ্ডূক। সবুজগ্রামের প্রধানের পদ ফিরে পেয়েই ও আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। বলরামের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। আটানব্বইয়ের ভোটে জেতার পর ও আবার প্রধান হতেই পারত, কিন্তু সে চেষ্টায় যায়নি। রথীন রায়ের কাছে দৌড়াদৌড়ি করে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। আর ক্ষেত্রগ্রামের প্রধানের পদে রেখে দিয়েছিল বশংবদ কেষ্টকেই। একসাথে দুটো পদ হাতে রাখা গেল।

হরিপদর বউকে পুড়িয়ে আসার পর থেকেই সব কেমন বিস্বাদ লাগছিল রবীনের। সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়ে স্টেশনের কাছে দেখা হয়ে গেল বড়িহাটার কমরেড সুনীলের সাথে।

“রবীনদা, কই চললেন?”

“কোথায় যাওন যায় হেইডাই খুঁজতাছি”, রবীন মস্করা করে বলেছিল। “তুই কোত্থিকা?”

“এই যে, মাইয়ারে নিয়া গেছিলাম জয়েন্টের কাউন্সেলিঙে।”

আঠেরো-উনিশের মেয়েটা পেছনেই দাঁড়িয়েছিল।

“কোথায় হইল?”

“শিবপুরেই হইয়া গেছে। ওর তো ভাল র‍্যাঙ্ক আছিল। আমরা একটু নিশ্চিন্ত হইলাম। আমার গিন্নীই বেশি চিন্তা করতাছিল। মাইয়া তো, দূরে হইলে একা যাতায়াত করা…”

“মাইয়া তো কী? কিসব কথা কস তোরা? মাইয়ারা মহাকাশে যাইতাছে, আর তোরা ভাবতাছস একা কলেজ যাইতে পারব না।”

“মহাকাশে!”

“হ, সুনীতা উইলিয়ামস! ভুইল্যা গেছস? আরো আগে কল্পনা চাওলা?”

“ওসব ওদের দ্যাশে হয়। আমাগো মাইয়ারা তো অন্যরকম।”

“অন্যরকম? কই? তোর মাইয়ার তো দ্যাখতাছি দুইটা কইরা হাত, পা, চোখ, কান — সবই আছে। মাথাও ভাল, নাইলে জয়েন্টে ভাল র‍্যাঙ্ক করল কী কইরা? তাইলে অন্যরকম হইল কই?”

সুনীল নিরুপায় হেসে বলে “আপনার সাথে কথায় কি পারুম, রবীনদা? কিন্তু আপনে যা-ই কন, চিন্তা কিন্তু হয়।”

“আরে, সে তো হয়ই। কিন্তু তাই বইল্যা কি আর এদের ঘরে বসায় রাখন যায়? আমার পোলাডা দ্যাখ কোন দূরে বইস্যা আছে। তর মাইয়ারেও কি তুই আটকায় রাখতে পারবি? যদি একখান ভাল চাকরি পায়…”

এতক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকা মেয়েটা হঠাৎ মুখর হয়ে ওঠে। “এটা একটু বোঝান তো, জেঠু। ওয়েস্ট বেঙ্গলে তো চাকরি বাকরি কিছুই নেই। এখানে পড়ে থাকলে জীবনে কিছু করা যাবে? আজকাল ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ না গেলে কোন ফিউচার আছে? আর আমার তো ইচ্ছা বাইরে চলে যাওয়ার। আমার চেনা কতজন গেছে। বড়িহাটারই তো অনেকে ইউ এস এতে আছে।”

রবীনের কেমন একটা ধাক্কা লাগে।

“ঠিকই বলেছিস, মা। এখানে আর… চাকরি কোথায়? তবে একেবারে অন্য দেশে চলে যাবি? দেশের প্রতিও একটা দায় দায়িত্ব থাকে…”

“সে তো সবারই থাকে। কে পালন করছে?”

সুনীল মেয়েকে ধমকায় “অ্যাই! এ আবার কী কথা রে!”

রবীন ওর কাঁধে হাত রেখে বলে “আহা, বকতাছস ক্যান? কথাডায় কিন্তু দম আছে। কে দায়িত্ব পালন করতাছে? সত্যিই তো। কে করতাছে? আমরা কি আমাগো দায়িত্ব ঠিক কইরা পালন করছি?”

“আরে আপনি ছাড়েন তো, রবীনদা। আজকালকার পোলাপানদের কথাবার্তার কোন ছিরিছাঁদ নাই।”

ফুঁসতে থাকা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন বলে “যাকগে, তোরা বাড়ি যা। সারাদিনের পরে বাড়ি ফিরতাছস, অনেক দেরী করায় দিলাম।”

রবীন ওদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। স্টেশন রোড ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ঝিলের ধারে শহীদ বেদিটার সামনে আড্ডা মারছে পার্টির ছেলেরা। একজন চড়ে বসে আছে। তার দু পায়ের ফাঁক দিয়ে ফলকটা দেখা যাচ্ছে। চশমাটা সঙ্গে নেই, চোখ কুঁচকে রবীন শুধু পড়তে পারল “আমরা তো ভুলি নাই শহীদ”। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে সবুজগ্রাম কলেজে ক্লাসে ঢুকে পাগলা সুরেন আর তার দলবল বার করে নিয়ে গিয়েছিল বিপ্রদাস পালকে। তারপর কলেজের মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছিল। তারিখটা মনে আছে। ২২শে জুলাই, ১৯৭৪। এই বেদিটা তৈরি করা হয়েছিল আশি সালে। প্রত্যেক বছর ২২শে জুলাই এখানে লাল পতাকা তোলা, স্মরণসভা হয় যথারীতি। বাইশ তারিখ এসে গেল।

ভারত সেবাশ্রমের পাশ দিয়ে বাড়ির পথ ধরল রবীন। রিডিং ক্লাবের সামনে দেবু ঘোষের দোকানে বসেছিল অবনী। রবীনের চোখে চোখ পড়তেই চোরের মত চোখ নামিয়ে নিল। আসলে ওর প্রাণের বন্ধু, সমাজবিরোধী জগা বড়িহাটার এক ডি সি এমের অভয় পেয়ে কয়েক মাস হল সবুজগ্রামে ফেরত এসেছে। অবনীরও আর গলাগলি করতে বাধা নেই। গত রবিবার জগার ছেলের জন্মদিনে এলাহি খাওয়াদাওয়া, মদ্যপান করেছে অনেক সি পি এম নেতা, কর্মী। অবনী একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল। বমি টমি করে একসা কাণ্ড। ওর গিন্নী রবীনকে এসে জানানোর পর রবীন গিয়ে অবনীর কান মুলে দিয়ে এসেছে। অবনীর বউ রবীনের পা ধরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে ও আর জগার সাথে মিশবে না, মদও ছোঁবে না। কিন্তু এই ভর সন্ধেবেলা দেবু ঘোষের দোকানে যে ও এগ রোল খাবে বলে বসে নেই, সেটা রবীন ভালই জানে।

সেদিন সন্ধের পর থেকেই ভীষণ গুমোট। দুবার স্নান করার পরেও ঘুম আসছিল না রবীনের। ভাবছে উঠে একটা বিড়ি খাবে, এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। রবীন ভেবেছিল জোনাকি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু বেলটা বাজতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে বলল “কি গো? এত রাতে কে!” রবীন ধীরে সুস্থে উঠতে না উঠতেই আরো দুবার বাজল, সেই সঙ্গে দু তিনজনের উদ্বিগ্ন ডাক “রবীনদা, রবীনদা। রবীনদা জেগে আছেন?” দুজনেই বিছানা ছেড়ে উঠে দৌড়ল।

বারান্দার আলোটা জ্বেলে রবীন দ্যাখে স্কুলপাড়া, মানে রিডিং ক্লাবের পাড়ার কমরেড কমল দাঁড়িয়ে, সাথে ও পাড়ার দুই দোকানদার। পানওয়ালা ছেলেটার কানের পাশ দিয়ে রক্ত পড়ছে, ঠকঠক করে কাঁপছে। জোনাকি তাড়াতাড়ি চাবিটা এনে তালা খুলতেই ছেলেটা ধপ করে বারান্দার মাটিতেই বসে পড়ল। কমল আর অন্য দোকানদার ছেলেটা কোন মতে তুলে এনে ঘরের চেয়ারে বসাল ওকে। মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবে যে কোন সময়। “জল দাও, জল দাও,” রবীন জোনাকিকে বলে। “আর তুলো।”

রক্তপাত কমলে, ছেলেটা ধাতস্থ না হতেই কমল বলে “ওরা এখানে থাক, রবীনদা। আপনি চলুন শিগগির।”

“কোথায় রে?”

“আমাদের পাড়া। জগা দলবল নিয়ে এসে তাণ্ডব করছে। দোকানপাট, লোকের বাড়ি — সব ভাঙচুর করছে। এ বেচারার কানটা একটুর জন্যে বেঁচে গেছে। সোর্ড তুলেছিল।”

“কেন? এ আবার কী দোষ করল? এ ছেলেটা তো ভাল বলেই জানি!”

অন্যজন বলে “ওর কোন দোষ নেই, দাদা। সামনে পড়ে গিসল আর কি।”

“কিন্তু ওরা হঠাৎ এসে গোলমাল করছে কেন?”

“আপনাকে যেতে যেতে বলব সব। আপনি চলুন। একটা খুনটুন করে বসবে নাইলে।”

“আচ্ছা চ।” রবীন লুঙ্গির উপর ফতুয়াটা গলিয়ে নেয়।

“এ কি! তুমি একা একা এর মধ্যে যাচ্ছ?” জোনাকি প্রশ্ন করে।

“কোথায় একা?” রবীন খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়। “কমল আছে তো।”

“কিন্তু পুলিসে একটা খবর দেয়া দরকার না? আমরা ফাঁড়িতে গেছিলাম। ওরা তো নড়েই বসল না। ফাঁড়ি থেকে বোম চার্জ করার আওয়াজ কিন্তু পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।”

“অ। জোনাকি ওকে একটু ফোনের ডায়রিটা দাও তো,” রবীন অন্য দোকানদারকে দেখিয়ে দেয়। “সত্যেনকে ফোন কর। বলবি এই ঘটনা, রবীনদা আপনাকে বলতে বলল, এক্ষুণি যেন মদনপুর থানা থেকে ফাঁড়িতে ফোন করে ধাতানি দেয়।”

সাইকেলে দক্ষিণপাড়া থেকে স্কুলপাড়া মিনিট সাতেক। তার মধ্যেই কমল রবীনকে জানাল দেবু ঘোষের দোকান বন্ধ করার সময়ে জগার দলের কয়েকজন এসে মদ চেয়েছিল। তাতে দেবুর ছেলে পল্টু বলে এখন দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, আর দেওয়া যাবে না। ব্যাস! তাতেই কথা কাটাকাটি, তারপর হাতাহাতি। আশপাশের দোকানদাররা জগার ছেলেগুলোকে তাড়া করেছিল বলে ওরা পালিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে বোধহয় মোবাইলে খবর চলে গেছে জগার কাছে। সে নিমেষের মধ্যে আরো বড় দল নিয়ে সশরীরে হাজির। লাঠিসোটা, তলোয়ার, চাকু, পেটো, বন্দুক — কিচ্ছু বাদ নেই। লোকের বাড়ির জানলা, দরজাও ভাঙছে।

পৌঁছে রবীন দেখল কমল যা দেখে গিয়েছিল অবস্থা তার থেকেও খারাপ। বাবুরা উল্লাসে শূন্যে গুলি ছুঁড়ছেন। লোকে ভয়ে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। পল্টুকে ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে এলোপাথাড়ি লাথি, ঘুঁষি মারছে জগা স্বয়ং। ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা দোকানগুলোর মালপত্র রাস্তায় ছত্রখান করে নষ্ট করছে। সব্জিওয়ালা খালেক এক কোণায় বসে চিৎকার করে কাঁদছে। বোধহয় ওর পায়ে কোপ টোপ মেরেছে। রক্তে ভাসাভাসি। কমলকে ওকে সামলাতে বলে রবীন জগার দিকে এগিয়ে গেল।

“অ্যাই হতভাগা,” বলে ওর কানটা টেনে ধরে মাথাটা ঘুরিয়েই এক থাপ্পড়। জগা এতটাই মত্ত ছিল যে “কে রে, কে রে” বলে উঠেছিল। রবীন তখন চুলের মুঠি ধরে আরো কয়েকটা চড় মারতে মারতে বলে “আমি রে। এই দ্যাখ, আমি। আমি, তোর অকম্মার ঢেঁকি মাস্টারমশাই। কী করবি? হাত কাটবি, পা কাটবি, না জানে মারবি? মার শালা, মার।”

ততক্ষণে জগার সম্বিত ফিরেছে। টলতে টলতে হাত জোড় করে বলে “ভুল হয়ে গেছে, স্যার। ভুল হয়ে গেছে। মাপ করে দিন। অ্যাই, থাম সব। কী হচ্ছে কি?”

ওর শাগরেদরা ধমক খেয়ে বিরক্ত, কিন্তু প্রতিবাদও করতে পারছে না। দিব্যি মজায় ভাঙচুর, লুটপাট চলছিল; এমন রসভঙ্গ কার ভাল লাগে? কিন্তু মনিবকে তো অগ্রাহ্য করা যায় না। একজন তো বিরক্তি সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল “এ কে বে? এটাকে এত তোল্লাই কিসের, জগাদা? একটা রদ্দা মারলে হিসি করে দেবে শালা…” কথা শেষ করতে না দিয়ে ওর মাথায় চাঁটি মারে দলের একজন। ধমকায় “চুপ কর। মাস্টারমশাই। চিনিস না যখন, চুপ করে থাক, বাঞ্চোদ।”

ততক্ষণে সাহস পেয়ে যে ব্যবসায়ীরা লুকিয়ে পড়েছিল বা কাঠ হয়ে বসেছিল, তারা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। জগাদের চোখে ভয় দেখতে পায় রবীন। ওর হাতটা কোমরের দিকে যেতে দেখেই খপ করে ধরে ফেলে। “আর একটা গুলি যদি তোরা কেউ চালাস, জগা। তোর প্রাণের গ্যারান্টি আমি দিতে পারব না কিন্তু। এতক্ষণ অনেক অত্যাচার করেছিস, লোকে কিন্তু ভীষণ রেগে গেছে। চুপচাপ চলে যা এখান থেকে।”

গোঁয়ার মস্তান বলে “আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। আমার নাম শুনলে সবাই কাঁপে, আর আমার ছেলেরা মদ চাইলে মদ দেবে না? এত বড় আস্পদ্দা!”

“আবার কথা?” রবীন চড় তোলে। জগা পিছিয়ে যায়, শাগরেদদের ইশারা করে গাড়িতে উঠতে। টলতে টলতে টাটা সুমোটার স্টিয়ারিঙে গিয়ে বসে। বাইক বাহিনীর একজন স্টার্ট দিতে দিতে কাউকে একটা গালাগাল দিচ্ছিল, তিন চারজন ব্যবসায়ী ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপরে। জগার দলবল আবার শুরু করতে যাচ্ছিল, লোকে ঘিরে ধরে মারা শুরু করে। তাই দেখে কয়েকজন তড়িঘড়ি চম্পট দেয়, জগা সুমোয় বসে হুঙ্কার দেওয়ার বেশি সাহস করে না। মারের চোটে ছেলেগুলো মরেই যেত হয়ত, রবীন আর কমল মাঝে পড়ে আটকায়। অনেক কষ্টে শেষ অব্দি ওদের বিদায় করা যায়। যাওয়ার সময়ে অবশ্য একজন কয়েকটা পেটো চার্জ করে যায়।

ওরা চলে যেতেই রবীনের খেয়াল হয়, এই এলাকার পার্টি কমরেডরা এতক্ষণে জড়ো হয়েছে। প্রথমে ইচ্ছে করে শালাদের জোর ধমকাতে। যখন এই নেত্য শুরু হয় তখন এরা কোথায় সেঁধিয়েছিল? শেষ অব্দি তা না করে রবীন বলে “যার যার লেগেছে সব হেলথ সেন্টারে নিয়ে যা। আর তোদের প্রধানকে, আরো সমস্ত নেতাদের খবর দে।” একজন পল্টুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে “একেও নিয়ে যাব তো, রবীনদা?”

রবীন এতক্ষণে পল্টুর দিকে ভাল করে তাকানোর ফুরসত পায়।

“এই শুয়ারটাকে? এটাকে উচিৎ ছিল জগার হাতেই ছেড়ে দেয়া। কিন্তু আমরা তো মানুষ। তাই পারলাম না। আমি আবার এটারও মাস্টারমশাই। শালা ঘেন্না হয় নিজের উপরে। যা, নিয়ে যা এটাকেও।”

ব্যবসায়ীরা রবীনকে অনুরোধ করে ওদের সাথে ফাঁড়িতে যেতে, ডায়রি করতে। রবীন রাজি হল। ইতিমধ্যে এসে পড়ল বলরাম, ওর ভাই এবং অন্য তালেবররা। এসেই হম্বি তম্বি, জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। রবীনকে কমল বলল “এদিকে চলে আসেন, রবীনদা। আমরা একটু বসি। এর মধ্যে আমাদের কী কাজ?”

“ঠিক কথা। চল।”

দুর্গাবাড়ি, মানে যে বাড়িতে ফি বছর দুর্গাপুজো হয়, তাদের রোয়াকে বসে পড়ল দুজনে। জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে ও বাড়ির মাসিমা বললেন “ঠাকুরপো এট্টু চা খাবা নাকি?”

রবীন বলল “তেষ্টা তো পাইতাছে, কিন্তু এই মাঝরাতে আপনারে কষ্ট দিমু?”

“আরে কিচ্ছু কষ্ট নাই। আমরা তো ঘুমাইতে পারতাছিলাম না। কত্তা, পোলা, বউমা — সক্কলে জাইগ্যা আছে। তোমরা খাইলে আমরাও খামু এক কাপ কইরা।”

কমল বলল “চাপিয়ে দিন, মাসিমা।”

দুর্গাবাড়িতে চা খেতে খেতেই একজন এসে ডাকল “রবীনদা, ফাঁড়িতে ডেপুটেশন দিতে যাওয়া হচ্ছে। শ্যামলদা আপনাকে খুঁজছে।” যাওয়া হল।

ফাঁড়ির সামনে মিটিঙে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিল বলরাম আর শ্যামল। ফাঁড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কী করে সমাজবিরোধীরা এইভাবে দাপাদাপি করতে পারে, জগার নামে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কী করে সে জেলের বাইরে, এত অস্ত্র কোথা থেকে জোগাড় করল, প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে আছে কেন — এইসব চোখা চোখা প্রশ্ন ছোঁড়া হল। দুজনেই অনেক করে রবীনকে বলতে বলেছিল। ও কিছুতেই রাজি হল না, বলল শরীরটা ভাল নেই।

মিথ্যে কথা। এক ঝুড়ি মিথ্যে বলা এড়ানোর জন্যে একটা ছোট্ট মিথ্যে।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048