যত পূজা হল না সারা


সুপ্রভাত,

তোমরা যখন এই চিঠি পড়বে তখন আর আমি থাকব না। আমার উপর রাগ কোর না। আমি জানি তোমরা অনেকে সত্যিই আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে, আমাকে ভালবাসতে এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহারও করতে। আমার কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই। চিরকাল আমি নিজেই আমার সমস্যা। আমার আত্মা আর শরীরের ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, ফলে আমি একটা দানবে পরিণত হয়েছি। আমি বরাবর লেখক হতে চাইতাম। বিজ্ঞান লেখক — কার্ল সেগানের মত। শেষ অব্দি এই চিঠিটা ছাড়া আমার আর কিছু লেখা হয়ে উঠল না।

আমি বিজ্ঞান, নক্ষত্র এবং প্রকৃতিকে ভালবাসতাম। কিন্তু মানুষকে ভালবেসেছিলাম একথা না বুঝেই, যে মানুষ বহুকাল হল প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। আমাদের অনুভূতি ধার করা, আমাদের ভালবাসা বানানো, আমাদের স্বকীয়তা কৃত্রিম শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আঘাত না পেয়ে ভালবাসা সত্যিই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা মানুষের দাম কমাতে কমাতে তার পরিচিতির সমান করে দেওয়া হয়েছে। একটা ভোটের সমান, একটা নম্বরের সমান, কোন একটা জড় পদার্থের সমান। কিছুতেই একটা মানুষকে একটা মস্তিষ্ক হিসাবে গণ্য করা হয় না, নক্ষত্রচূর্ণে তৈরি এক মহিমাময় বস্তু বলে তাকে ভাবা হয় না। কোন ক্ষেত্রেই হয় না। না লেখাপড়ায়, না রাস্তাঘাটে, না মৃত্যুতে, না জীবনে।

আমার জন্ম এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। আমার শৈশবের একাকিত্ব কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ল না। আমি সেই কল্কে না পাওয়া শিশুটিই রয়ে গেলাম।

চলে যাওয়ার পর লোকে আমায় ভীতু বলতে পারে, স্বার্থপর বলতে পারে বা বোকা বলতে পারে। আমার তাতে বয়ে গেছে। আমি মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করি না, ভূত প্রেতেও বিশ্বাস করি না। আমি একমাত্র যা বিশ্বাস করি তা হল আমি তারায় তারায় ভ্রমণ করতে পারি আর অন্য বিশ্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

না, এটা সুশান্ত সিং রাজপুতের সুইসাইড নোটের বাংলা ভাষান্তর নয়। তিনি ভাল ছাত্র ছিলেন, জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় খুব উপরের দিকে র‍্যাঙ্ক করে দিল্লী কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তিও হয়েছিলেন। আর দুটো সেমিস্টার পড়লে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারও হয়ে যেতেন। পড়েননি সে তাঁর ইচ্ছা। অভিনয় করলে বেশি ভাল করবেন বিবেচনা করে ওখানেই লেখাপড়া সাঙ্গ করেন। সিদ্ধান্তটা যে খুব ভুল ছিল তা-ও নয়। আসলে ইংরেজিতে লেখা এই সুইসাইড নোট যে ছাত্রের তিনি কিন্তু লেখাপড়াই করতে চেয়েছিলেন। তিনি হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি গবেষক ছিলেন। সুশান্তের মত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেননি, এসেছিলেন দারিদ্র্য সীমার নীচের এক পরিবার থেকে। দোষের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন করতেন, তার উপর জাতে ছোটলোক (মৃত্যুর পরে অবশ্য সকলে মিলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছিল তিনি আদৌ তফসিলি জাতির মানুষ নন)। তাই তাঁর স্টাইপেন্ড বন্ধ করে দিয়ে, সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছিল।

যাঁরা এখনো বোঝেননি বা বেমালুম ভুলে গেছেন, তাঁদের জন্য বলা যাক — ছাত্রটির নাম রোহিত ভেমুলা। মানসিক স্বাস্থ্য, অবসাদ, depression মানে কেবল বাঙালি কবি কথিত মনখারাপ আর নিম্নচাপই কিনা — এসব নিয়ে আলোচনা দেখছি আর শুনছি। অবাক হয়ে ভাবছি এই গণ বেদনা, গণ উদ্বেগ, গণ হাহাকার কেন রোহিতের কপালে জোটেনি? একটা কারণ অবশ্যই সুশান্তের পেশা। অমন সুদর্শন একজন মানুষ, যিনি এগারোটা ছবির ছোট্ট কেরিয়ারে অনেককে মোহিত করেছিলেন, তাঁর এভাবে চলে যাওয়া ভারতের কয়েকশো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটার একজন অখ্যাত গবেষকের আত্মহত্যার চেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার চেষ্টা করছি।

রোহিতের আত্মহত্যায় সোশাল মিডিয়া এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভিতরে বাইরে বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল “গেছে আপদ গেছে। লেখাপড়া না করে যারা রাজনীতি করে তাদের মায়া দয়া দেখানোর মানে হয় না।” অনেকের, বিশেষত রাষ্ট্রের, প্রতিক্রিয়া ছিল “ও তো দলিতই নয়, আবার দলিত দলিত করে নাচার কী আছে?” অস্যার্থ দলিত হলে না হয় কিছুটা কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করা যেত। ভয়, পাছে ভোট নষ্ট হয়। এ ছাড়াও কারো কারো প্রতিক্রিয়া ছিল “আমি ব্যাপারটা ঠিক জানি না। না জেনে কিছু বলা উচিৎ হবে না।” এর বাইরে ছিলেন তাঁরা, যাঁরা রোহিতের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ। বলছিলেন ক্ষমতার কাঠামো তাকে ষড় করে জবাই করেছে আসলে।

এই শেষ দলের মানুষদের কথা বাদ দিন। তাঁরা স্পষ্টতই অ্যান্টি ন্যাশনাল। কিন্তু বাকিদের কারো কেন মনে হয়নি ছেলেটা বড় একা হয়ে গিয়েছিল, ওর পাশে কেউ কেন দাঁড়াল না? ছেলেটার হয়ত অনেক কিছু বলার ছিল, শোনার কেউ থাকলে এভাবে ওকে চলে যেতে হত না? ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে রোহিতের সুইসাইড নোট পড়ে কারো তো মনে হয়নি “ইশ! ছেলেটার মহাবিশ্ব নিয়ে কি অদম্য আগ্রহ ছিল! যদি সেগানের মত লেখক হয়ে উঠতে পারত কি ভালই না হত!” আজ সুশান্তের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স প্রীতি নিয়ে এই গণ হা হুতাশ ক্রমশ ক্লান্ত, ক্লান্ত করে। যে যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুন, আসলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে মনোযোগের এই পার্থক্যের আসল কারণটা রোহিতই তার সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন।

সুশান্ত যদি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির জয় লোবোর মত প্রত্যাশার চাপে গলায় দড়ি দিতেন, তাহলেও সে মৃত্যু রোহিতের মৃত্যুর চেয়ে আমাদের বেশি নাড়া দিত। প্রথমত তিনি মধ্যবিত্ত বলে, বাংলায় যাকে বলে ভদ্রলোকের ছেলে। দ্বিতীয়ত, সুশান্ত সিং রাজপুত বলে। অন্ধ্রপ্রদেশের মালা জাতের হতদরিদ্র একটি ছেলের ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে করতে আত্মহত্যা করা কোন দুর্ঘটনা নয় আমাদের কাছে। “ওরা তো রিজার্ভেশন না থাকলে চান্সই পেত না”। কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার বদলে আত্মহত্যা করবে — এ কিন্তু অকল্পনীয়। আঁতকে ওঠার মত। ২০১৬ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সুশান্তর বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি বলছেন ছোট থেকেই পরিবার ঠিক করে দিয়েছিল তাঁকে ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে, আর দিদিদের ডাক্তার হতে হবে। সুশান্তর পরিবার যেমন, ভারতীয় সমাজও তেমন। ঠিক করে দিয়েছে রোহিত যদি একে গরীব তায় ভেমুলা হয়, তাহলে তাকে মুচি মেথর না হোক, পিওন টিওনই হতে হবে। কার্ল সেগান টেগান ভেবে আনন্দ পেলে পাক, কিন্তু সেসব হয়ে ওঠার বদলে যদি আত্মহত্যা করে বসে তাতে ব্যথিত হওয়ার কিচ্ছু নেই। তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার কিচ্ছু নেই। বরং অর্থনৈতিক জোরে এই নিয়ম ভেঙে যদি টিনা দাবির মত কেউ আই এ এস পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে যায়, তখন তার মেধার প্রশংসা করার বদলে সবাই মিলে বলতে হবে “দেখেছ, কারা সব রিজার্ভেশন নিয়ে বসে আছে?”

তাই ভাবছিলাম, নিত্য সোনার চাঁদ সোনার টুকরো বলে ডাকা হয় যাদের, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর এই প্রথম কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন একজন আদিবাসী — সোনাঝরিয়া মিঞ্জ। যাঁরা হতে পারেননি, কেবল গায়ের রঙ, মুখের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে ইচ্ছাকৃত এবং অন্যমনস্ক টিটকিরি শুনতে শুনতে জীবন কাটালেন বা না পেরে পড়াশোনার জায়গা থেকে, চাকরি থেকে, কখনো বা জীবন থেকেই বিদায় নিলেন চুনী কোটালের মত, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে?

কে ভাবে সেইসব সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে, যারা কেবল মুসলমান বলে বা আমিষাশী বলে অন্য শহরে পড়তে গিয়ে, চাকরি করতে গিয়ে বাড়ি ভাড়া পায় না? ঘরে বাইরে অনলাইনে অফলাইনে গত দুদিন ধরে এই যে সকলের কথা মন দিয়ে শোনার, কোন বন্ধুকে একা হতে না দেওয়ার কোটি কোটি শপথ এর মধ্যে কোথাও এসবের প্রতিকারের কোন প্রত্যয় রয়েছে কি?

অলস কল্পনায় কোন শিল্পীর হয়ত ভাবতে ইচ্ছা করবে সুশান্ত আর রোহিতের স্বর্গবাস হয়েছে। সেখানে রোহিতের বায়োপিক হচ্ছে, রোহিতের ভূমিকায় অভিনয় করছেন সুশান্ত। আমার মত বেরসিক লোকেরা এসব ভেবে উঠতে পারে না। আমরা গল্পের গরুকে একেবারে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী। মানে রোহিতের ভূমিকায় আলি ফজল।

Advertisements

মা হওয়া কি মুখের কথা?

আমাদের ভাবনায় মায়েরা অতিমানবিক। তাঁরা পারেন না এমন কিছু নেই। দশ মাস দশ দিন পেটে ধরতে পারেন, অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করতে পারেন, বাড়ির সব কাজ একাই করতে পারেন শুধু নয়, নিখুঁতভাবে পারেন। মায়েদের নেহাত মানুষ হয়ে বাঁচা খুবই লজ্জার। অতএব আমাদেরই দায়িত্ব যন্ত্রণা অকল্পনীয় স্তরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের অতিমানবিক হতে সাহায্য করা। এই দায়িত্ব আমরা একনিষ্ঠ নিয়মানুবর্তিতায় বরাবর পালন করে এসেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা দাঁড়ান।

একেবারে পুরাণ থেকে শুরু করুন। সীতা অন্তঃসত্ত্বা, রামচন্দ্র বাবা হবেন। যাকে বলে হৈ হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। একজন রানীর প্রসবে কোন সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। সর্বদা যত্নে থাকবেন, ভালমন্দ খাবেন, সময় মত রাজবৈদ্যের উপস্থিতিতে তাঁর সন্তান হবে। কিন্তু তা আর হল কোথায়? দস্যু মোহনের গল্পের মত “কী হইতে কী হইয়া গেল”, সীতার চরিত্র সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ রাম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। প্রজাদের কানাকানি তাঁর কানে জ্বালা ধরাল, তিনি সীতাকে নির্বাসন দিলেন। লব কুশের জন্ম হল জঙ্গলের মাঝখানে বাল্মীকির আশ্রমে।

তারপর দেবকী। তিনিও রাজনন্দিনী, যথারীতি আরেক রাজার সাথে বিয়েও হল। এঁরও যথা সময়ে নির্বিঘ্নে মা হতে পারার কথা। কিন্তু পাষণ্ড ভ্রাতা কংস ইতিমধ্যে খবর পেয়েছে বোনের অষ্টম গর্ভই তার মৃত্যুর কারণ হবে। তাই স্বামী স্ত্রী দুজনকেই ঢোকাও কাস্টডিতে। আর কি নিখুঁত ব্যবস্থা! অষ্টম গর্ভ অব্দি অপেক্ষা করার ব্যাপার নেই। একটি করে সন্তান হয় আর পত্র পাঠ তাদের শেষ করে দেওয়া হয়। এত কষ্ট সহ্য করেও কিন্তু দেবকী ঠিক শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিয়েই ফেললেন। আবার স্বামী-স্ত্রী ষড় করে দৈব সহায়তায় সন্তানটিকে বাঁচিয়েও ফেললেন। ভাবুন, দেবকী অতিমানবিক নন?

কলি যুগ বলে আজকাল সতীত্ব টতীত্ব নিয়ে লোকে অত মাথা ঘামায় না। বিজ্ঞান সে যুগের মত উন্নত নেই। ফলে অমুকের গর্ভ তমুকের মৃত্যুর কারণ হবে — এসবও জানতে পারা যায় না। তবে অতিমানবিক মা কিন্তু কম পড়েনি। এই ধরুন ‘মাদার ইন্ডিয়া’। ছবিটা নাকি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ভাবুন, একজন মহিলা স্বামী পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর চরম দারিদ্র্য সামলে ছেলেদের মানুষ করলেন। শেষে আবার বিগড়ে যাওয়া ছেলেকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে নিজেই তাকে হত্যা করলেন। এ যুগের কোন বাবা পারবেন? ক্ষমতাবান, স্নেহান্ধ বাবাদের আমলে ছেলেদের সম্পত্তি কেমন লাফিয়ে বাড়ছে সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
সে যা-ই হোক, সিনেমার মাদার ইন্ডিয়াকে অন্তত গর্ভাবস্থায় রাজার তাড়নায় জঙ্গলে বা জেলে কাটাতে হয়নি। বাস্তবের গুজরাটে বিলকিস বানোর তিন বছরের মেয়ে সালেহাকে তাঁর চোখের সামনেই পাথরে আছড়ে মেরে ফেলা হয় বলে অভিযোগ। আসলে ধর্ষণ করার তাড়া ছিল আর কি। তারপর এতগুলো বছর কেটে গেছে, বিলকিস এখনো আইন আদালত করে চলেছেন। অতিমানবিক নয়? মা বলেই তো পারেন।

তারপর সফুরা জারগর। ভাল ছাত্রী, পি এইচ ডি করছেন জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের এবং আসন্ন সন্তানের নাগরিকত্ব লোপাট করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে মিছিল, মিটিং, ধরনা সংগঠিত করার অপরাধে গত ১২ই এপ্রিল গ্রেপ্তার হয়েছেন। কোন দোকানে আগুন লাগাননি, কাউকে গাঁট্টা পর্যন্ত মারেননি। অন্যকে ওসব করতে প্ররোচিত করেছেন এমন প্রমাণও আদালতে দাখিল করা হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। তবু এই অন্তঃসত্ত্বা তরুণী গতকালও জামিন পেলেন না। বিচারক বললেন অন্তত চাক্কা জ্যাম করার প্রাথমিক প্রমাণ তো পাওয়া গেছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। অতএব জামিন দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে অনেকে রাগ করছেন। তাঁরা মহৎ উদ্দেশ্যটা বুঝতেই পারছেন না। সফুরাকে এমন যন্ত্রণার মধ্যে না রাখলে তিনি পৌরাণিক মহত্ত্বে উত্তীর্ণ হবেন কী করে? পুরাণগুলো কি কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নাকি? ওগুলো হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে সব ভারতীয়ের। সে যুগে ইসলাম ছিল না বলে দুঃখ কষ্ট সহ্য করে মহত্ত্ব অর্জনে মুসলমান মহিলারা অনেক পিছিয়ে আছেন। তাঁদের সমান হওয়ার সুযোগ দিতে হবে না?

এখন আপনারা বলবেন হাতি মায়ের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুলভাল তথ্য দিয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছেন, মানুষ মায়ের জন্য কেন দরদ নেই? ধুর মশাই! হাতি কি মানুষ? তার কি পুরাণ আছে? তার মহৎ হওয়ার কোন দরকার আছে? সে একটা নিরীহ জীব। তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখাই কর্তব্য। বিশেষত বাকি ভারতে শিল্পের জন্য, খনিজের জন্য, বুলেট ট্রেনের জন্য জঙ্গল সাফ করে দেওয়ার ফলে হাতিদের যখন ক্ষতি হচ্ছে তখন কেরালায় অন্তত তাদের বাঁচাতেই হবে। তাই এই তৎপরতা। ভাল করে ভেবে দেখুন, হাতি মা এমনকি গোমাতাও নন। হলে না হয় একটা মন্দির টন্দির করে দেওয়ার কথা ভাবা যেত। তা যখন সম্ভব নয় তখন মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদ করাই কি উচিৎ কাজ নয়?

মাথা ঠান্ডা করে শবাসন করুন। করলেই বুঝতে পারবেন, সব ঠিক আছে। মায়েদের প্রতি আমাদের ব্যবহার একেবারে সনাতন ঐতিহ্য মেনে চলছে। অসুবিধা অন্যত্র। মায়েরা তো মহান হয়ে যান, এবারও হবেন হয়ত। বিষ্ণুর অবতার রামকে কিন্তু শেষ অব্দি নিতান্ত ছাপোষা গেরস্থের মত অবসাদে ভুগে সরযূ নদীর জলে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল। কংসের অবস্থা আরো শোচনীয়। জনসমক্ষে হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছে বেদম পেটানি খেয়ে মৃত্যু। পুরাণ কিন্তু ভারতীয়দের যৌথ উত্তরাধিকার, কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নয়।

ভারতমাতা কি জয়!

নতুন করে পাব বলে

20200508_164038-COLLAGE.jpg

প্রিয় কবি,

আপনার সাথে আমার সংলাপে বিপত্তির অন্ত নেই। এক দিকে খবরদারি, অন্য দিকে দেখনদারি। আপনাকে নিজের করে পাবার জো নেই।

এক দল টিকি নেড়ে বলবে “রবীন্দ্রনাথকে যেখানে সেখানে যেভাবে ইচ্ছে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিলেই হল? নিয়ম কানুন নেই? আজ প্রত্যুষে শুকতারাটি অমুক কোণে স্থির হয়ে ছিল কি? না হয়ে থাকলে কোন আক্কেলে গুনগুনিয়ে ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও’ গাইছিলে? বলি ভোরের বেলার তারা তুমি পেলে কোথায়?”

আবার বিপক্ষ দল বলবে “কিসব ন্যাকা ন্যাকা ব্যাপার! রবীন্দ্রনাথ কারো বাপের সম্পত্তি নাকি? রবীন্দ্রনাথকে বুকে রেখেচি। বুকে। শালা হৃদয় আমার নাচে রে, পাগল কুত্তার মত নাচে রে।”
প্রথম দলের মত আসলে এরাও মনে করে আপনি এদের পৈতৃক সম্পত্তি। আপনার লেখা নিয়ে যা ইচ্ছে করলেই হল। অন্য কারো লেখা চটকালে তো সহজে বিখ্যাত হওয়া যায় না।

আমাকে তাই বারবার আপনাকে নিয়ে পালাতে হয়। কোলাহল বারণ হলে মন্দ হয় না, আপনার আমার কথা কানে কানে হওয়াই ভাল। গত পঁচিশে বৈশাখের পর থেকে আজ অব্দি যা যা হয়েছে, তাতে আপনার সাথে কিছু নতুন সংলাপের প্রয়োজন হয়েছে। সে কথাই বলি।

কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!

মহাসঙ্কট উপস্থিত। দেশের রাজার (হ্যাঁ, রাজাই। স্বাধীনতার এত বছর পরে দেশটা একেবারে যক্ষপুরী হয়ে উঠেছে। সে কথায় পরে আসছি) আদেশ, দেশকে মা বলে ভাবতে হবে। কেবল ভাবলে হবে না, আবার চিৎকার করে ডাকতেও হবে। যারা ছাগল ছানাদের মত দিবারাত্র গলা ছেড়ে ডাকবে না, তাদের দেশের শত্রু দেগে দেওয়া হয়েছে। গারদে ভরার ব্যবস্থাও হয়েছে। দেশকে মা বলে ডাকতে হুকুম হয়েছে, এদিকে দেশের লোককে সন্তান ভাবার হুকুম হল না। তারা কেবল প্রজা। রাজা হুকুম করবেন, তারা তামিল করবে। অন্যথা হলেই রাজার পাইক, বরকন্দাজ লাঠিপেটা করবে, গারদে ভরবে। আবার সকলে প্রজা নয়, কেউ কেউ প্রজা। রাজা যাকে প্রজা বলবেন, কেবল সে-ই প্রজা। বাকি সব অনুপ্রবেশকারী শয়তান।

তা দেশ মানে কী? দেশ মানে কে? আপনাকে সে প্রশ্ন করতে গিয়ে কোন মায়ের ছবি তো পেলাম না। পেলাম কেবল মানুষ। ক্লাসঘরে আর ঠাকুরঘরে আপনাকে দেখতে অভ্যস্ত চোখে দেখলাম আমার সাথে প্রতিবাদ মিছিলে। যে মহামানবের সাগরতীর বলে ভারতকে চিনিয়েছেন, দেখলাম সেই মানবসাগরই আপনাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। আপনার বিশ্বভারতী অভ্রভেদী দেবালয় হয়ে গেছে অনেকদিন, তা থেকে আপনার বিগ্রহটুকুও উধাও করে দেওয়া হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায় না। শিবরাম কবেই সাবধান করেছিলেন, “সঙ্ঘ মানেই সাংঘাতিক।” চুলোয় যাক সেই সঙ্ঘ, তার সাথে আর যত সঙ্ঘ আছে। আপনি তো আমাদেরই লোক। আমরা আমাদের মত করে পেলেই হল। কিন্তু গোলমালের এখানেই শেষ নয়।

দেশকে দিনরাত মা বলে প্রণাম ঠুকতে হবে, অথচ মায়েদের জন্য দেশটা বড় শক্ত ঠাঁই হয়ে উঠেছে। যারা প্রজা হয়ে থাকতে রাজি নয়, যারা আপনার গান শুনে বা না শুনে দাবী করেছে আমরা সবাই রাজা, তাদের মধ্যে মায়েরা বড় কম ছিলেন না। সেই মায়েদের উপর রাজার আঘাত নেমে এসেছে। সাতাশ বছরের সফুরা জারগরের সন্তানের জন্মের প্রথম ক্ষণ শুভ হবে না, হতে দেওয়া হবে না। কারাগারের অন্ধকূপে তাকে মা হতে হবে রাজার আদেশে। পুরাণকে ইতিহাস বলে গেলানো কংস রাজার অনুগত অসুরকুল অবশ্য তাতেও খুশি নয়। তারা প্রশ্ন তুলেছে সফুরা কি বিবাহিতা, নাকি সফুরা কুমারী? মুসলমানবিদ্বেষী, বিকৃত কামনায় হিলহিলে অসুরকুল মায়ের অগ্নিপরীক্ষা চায়। সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে।

সফুরা কুন্তীর মত কুমারী না হলেও তার সন্তান যেন কর্ণের মতই পাণ্ডব বর্জিত হয় তা নিশ্চিত করতে রাজা রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নতুন ভারত গড়েছেন। এ ভারতে সংখ্যালঘুকে গর্ভে থাকতেই নিষ্ফলের, হতাশের দলে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কবি, এ দেশে কি আর কেউ অনাথ বিধর্মী শিশুকে নিজের সন্তান বলে মানবে? আর কি কোন সন্তান বলবে “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকল জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন”?
আপনি কি পিছিয়ে পড়লেন, কবি?

৪৭ফ, ৬৯ঙ

“একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোন অর্থে পৌঁছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা।”

আমাদের কালের কথাই লিখেছেন আপনি। এতখানি বয়সে এসে এই উপলব্ধি হল। যক্ষপুরীর কথা বলছিলাম। শুধু দেশটা কেন? গোটা পৃথিবীটাই যে রক্তকরবীর যক্ষপুরীতে পরিণত। নবীন কোরোনাভাইরাস এসে কদিন খনির দরজা এঁটে দিয়েছে৷ তাই এ কদিনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৪৭ফ আর ৬৯ঙ দের এবার মুখের রক্ত তুলে মরতে হবে। যক্ষপুরীর কবলের মধ্যে ঢুকলে তার হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, এখন তার জঠরের মধ্যে যাবার একটি পথ ছাড়া আর পথ নেই। তাই বিল্ডারদের সাথে মিটিং করে সরকার রেলকে বলে “এদের বাড়ি যাবার ট্রেন বাতিল করো হে।” যদিও বিস্তর চেঁচামেচি হওয়ায় ঢোঁক গিলে বলতে হয়েছে “আচ্ছা বাতিল করতে হবে না। এরা যাবেখন।”
কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে। বিশেষত আমাদের মত পুঁথি পড়ে চোখ খোয়াতে বসা, সর্দারদের চর বিশু পাগলদের জন্য। চাকরি থেকে ছুটি। ওরা বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছে, কেমনে দিই ফাঁকি?

উত্তর খুঁজছি, পাচ্ছি না। রচনাবলী, গীতবিতান, ছিন্নপত্রাবলী, ইংরেজি বক্তৃতামালা — সর্বত্র খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে আপনার উপর বেজায় রেগে যাচ্ছি কখনো, কখনো আনন্দে কাঁদছি, আত্মগ্লানিতে হাসছি, বিষাদে চুপ করে থাকছি। সংলাপ চলছে, চলবে। আপনাকে এ জানা আমার ফুরাবে না।