আক্রমণে মৃণাল, রক্ষণে নীতা

সোশাল মিডিয়ায় কদিন হল ভাইরাল হয়েছে একটা ফুটবল দলের ছক। যে দলের সদস্য আমাদের বাংলা সাহিত্যের কিছু জনপ্রিয় চরিত্র। হয় তারা খেলছে বা দলের সঙ্গে অন্য নানা ভূমিকায় যুক্ত আছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ময়দান থেকে বহুদূরে থাকা আমরা এভাবেই দুধের সাধ ঘোলে মেটাই।
দলটার দিকে তাকিয়ে কল্পনার পাখা মেলে দিতে গিয়ে খেয়াল হল, ফিফা ক্রমতালিকায় ৯৭ নম্বরে থাকা ভারতের পুরুষদের জাতীয় দলের তুলনায় মেয়েদের দল কিন্তু অনেক এগিয়ে। এই মুহূর্তে আমাদের মেয়েরা ৬০ নম্বরে। উত্তর আমেরিকায় ২০২৬ থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপ ৪৮ দলের হয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে তেমন হলে (এই মুহূর্তে ২৪ দলের প্রতিযোগিতা) ভারতের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তখনই মনে হল, আমাদের সাহিত্যের জ্বলজ্বলে নারী চরিত্রদের নিয়েও একটা জবরদস্ত ফুটবল দল বানানো যেতেই পারে। তবে সে দল অতটা মজার হবে না, বরং লড়াকু হবে। আমাদের দেশের কজন মেয়েরই বা মজায় বাঁচার সুযোগ হয়।
এখানে স্বীকার্য যে আমার পড়ার পরিধি খুব ছোট। তার উপরে ওপার বাংলার সাহিত্য প্রায় কিছুই পড়া হয়নি। ফলে যাঁরা বেশি পড়েন তাঁরা নিশ্চয়ই আরো ভাল দল বানাতে পারবেন। আরো বলা প্রয়োজন যে খেলোয়াড় ঠিক করার সময়ে সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে যেভাবে এদের কারো কারো চরিত্রচিত্রণ হয়েছে তা ভুলতে পারিনি। সার্থক বাংলা ছবির অনেকগুলোই তো সাহিত্যাশ্রয়ী। ফলে আশা করি মহাপাতক হয়নি।
গোলে রাখলাম বাণী বসুর গান্ধর্বী উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অপালাকে। প্রতিকূল অবস্থাতেও সবদিক সামলে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই মহিলাকে দুর্গ সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়। ম্যানুয়েল নয়ারের মত মাল্টি টাস্কিং গোলরক্ষা এঁর পক্ষেই সম্ভব।
দুই সাইড ব্যাকের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথের কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর আইকনিক চরিত্র সুবর্ণলতা। সে যুগে দোর্দণ্ডপ্রতাপ স্বামীর সাথে দূরত্ব রেখে জীবন কাটানো ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের নায়িকা কুমুদিনী আর আশাপূর্ণা দেবীর ট্রিলজির সুবর্ণলতা রক্ষণে যেমন আঁটোসাটো, তেমনি কাফু আর রবার্তো কার্লোসের মত ওভারল্যাপে গিয়ে বিপক্ষকে তছনছ করে দিতেও পারে। মনে করে দেখুন স্বদেশী আন্দোলনের সমর্থনে সুবর্ণ কেমন বাড়ির উঠোনে বিলিতি জামাকাপড় পুড়িয়ে দিয়েছিল।
সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আমাদের দরকার তুলনায় কম দুঃসাহসী কিন্তু দৃঢ়চেতা দুজনকে। তাই রইলেন আশাপূর্ণারই ‘অনাচার’ গল্পের সুভাষ কাকিমা, যিনি অসুস্থ, মৃতপ্রায় শ্বশুরমশাইকে মানসিক আঘাত থেকে বাঁচাতে স্বামীর মৃত্যুর খবর গোপন করে সধবার জীবন কাটিয়েছিলেন দীর্ঘকাল, সামাজিক গঞ্জনা বা শাস্ত্রের ভয়কে তোয়াক্কা করেননি। ইনিই আমাদের ফ্রাঙ্কো বারেসি।
এঁর পাশেই থাকবেন শক্তিপদ রাজগুরুর নীতা, পরিবারের জন্যে যার সর্বস্ব ত্যাগকে পর্দায় অমর করে রেখেছেন ঋত্বিক ঘটক। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে এমন নিঃস্বার্থ সৈনিক আর পাব কোথায়?
মাঝমাঠে আমাদের জেনারেল হিসাবে থাকবেন নটী বিনোদিনী। ওখানে দরকার এমন একজনকে যিনি দলের স্বার্থে ডিফেন্সে নেমে আসবেন, আবার স্ট্রাইকারদের ডিফেন্স চেরা পাসও বাড়াবেন প্রয়োজনে। বাংলার সাধারণ রঙ্গালয় তৈরি করার জন্যে যিনি অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রবল ব্যথা সহ্য করে, যিনি অমর হয়ে আছেন ব্রজেন দের নাটকে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে, সেই নটীই এই কাজের উপযুক্ত। পেশায় যৌনকর্মী হওয়ায় আত্মত্যাগের প্রাপ্য প্রতিদান হিসাবে তাঁর নামে রঙ্গালয়ের নামকরণ সে যুগে করা হয়নি। তার প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে এই দলের ক্যাপ্টেনস আর্ম ব্যান্ড তাঁর পুরোবাহুতেই থাক।
বিনোদিনীর দুপাশে মাঠ আলো করে থাকবে পথের পাঁচালীর দুর্গা আর শেষের কবিতার লাবণ্য।
ভীষণ দুরন্ত দুর্গা এনগোলো কান্তের মত সারামাঠ দৌড়ে ব্যস্তিব্যস্ত করে দেবে প্রতিপক্ষকে। আর অকল্পনীয় পাসে মাঠে ফুল ফোটাবে লাবণ্য। দিয়েগো মারাদোনার মতই যাকে ছকে বাঁধা যায় না, যে দীঘির জল, ঘড়ার জল নয়, সে-ই তো লাবণ্য।
ত্রিফলা আক্রমণে স্ত্রীর পত্রের মৃণাল, দহনের ঝিনুক, আর বঙ্কিমের দেবী চৌধুরানি।
প্রথম জনের সাথে আজীবন শ্বশুরবাড়ির মূল্যবোধের লড়াই চলেছে। শেষে সে পুরী থেকে চিঠি লিখে স্বামীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সে শুধু মেজোবউ নয়, জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে তার যে অন্য সম্পর্কও আছে তা সে আবিষ্কার করেছে। সুতরাং সে আর সংসারের শিকলে বাঁধা পড়বে না। দ্বিতীয় জন গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে লড়েছে পুরুষের দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে। আর তৃতীয় জন নিরীহ বধূ থেকে ডাকাত সর্দার হয়ে একদা প্রভুত্ব করা পুরুষদের পদানত করেছে। এই আক্রমণভাগ দেখে যে কোন ডিফেন্স কাঁপতে বাধ্য।
আমাদের শক্তিশালী রিজার্ভ বেঞ্চে থাকছে সামাজিক রীতিনীতির বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস রাখে এরকম চারজন — তারাশঙ্করের মহাশ্বেতা, চোখের বালির নায়িকা বিনোদিনী, কাপালিকের কাছে বেড়ে ওঠা বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা এবং শরৎচন্দ্রের রাজলক্ষ্মী।
লীলা মজুমদারের রসিক, প্রবল বুদ্ধিমতী পদিপিসী এই দলকে চালনা করবেন। টেকনিক্যাল পরামর্শ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করবে হাঁটুর বয়সী কলাবতী — মতি নন্দীর চরিত্র। এখানে কোচ আর টিডির অশান্তির কোন সম্ভাবনা নেই। পিসী সম্ভবত ৪-৩-৩ ছকেই খেলাবেন কারণ যাদের হারাবার কিছু নেই, জয় করার জন্যে আছে গোটা জগৎ তাদের রক্ষণাত্মক হয়ে লাভ নেই।

গোলরক্ষক: অপালা। রক্ষণ: কুমুদিনী, সুভাষ কাকিমা, নীতা, সুবর্ণলতা। মাঝমাঠ: লাবণ্য, নটী বিনোদিনী, দুর্গা। আক্রমণ: মৃণাল, ঝিনুক, দেবী চৌধুরানী। অতিরিক্ত: মহাশ্বেতা (গোলরক্ষক), বিনোদিনী, কপালকুণ্ডলা, রাজলক্ষ্মী। কোচ: পদিপিসী। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর: কলাবতী।

বড়লোকের খেলা

saltlakeমাসখানেক আগে একদিন একটা ওয়েবসাইটের সাহায্যে হিসাব করে জানলাম আমি একবছরে যা রোজগার করি, প্যারিস সাঁ জা ফুটবল ক্লাবের ব্রাজিলীয় মহাতারকা নেমারের তা রোজগার করতে লাগে ছ ঘন্টার কিছু বেশি। মনে রাখতে হবে, মোদী সরকার যতই নানা ফন্দিফিকিরে আমার হকের টাকা থেকে আমায় বঞ্চিত করুক, আমি ভারতবর্ষের বেশিরভাগ লোকের চেয়ে সচ্ছল অবস্থাতেই আছি। অর্থাৎ আমার পরিবারের কাউকে আধপেটা খেয়ে থাকতে হয় না, আমার নিজের বাসস্থান আছে, প্রয়োজন পড়লে এবং না পড়লেও জামাকাপড় কেনার সংস্থান আছে, সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর জন্যে সরকারী অনুদানের অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে না, বাড়ির কেউ অসুস্থ হলে এ রাজ্যের সেরা বেসরকারী চিকিৎসা তাকে দেওয়ার মত আর্থিক সঙ্গতি আছে এবং এতকিছুর পরেও ইচ্ছে হলে সিনেমা দেখতে যাওয়া, রেস্তোরাঁয় খাওয়া, দরকার না হলেও বইপত্র কেনা এবং বছরে একবার সপরিবারে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। তা এই আমার বাৎসরিক রোজগারই যদি নেমার মোটে ছ ঘন্টায় আয় করে ফেলেন, তাহলে ভেবে দেখুন ভারতের মত একটা তৃতীয় বিশ্বের দেশের মহানগরগুলোর বস্তিতে যারা থাকে তাদের জীবনযাত্রার সাথে নেমারের জীবনযাত্রার ফারাক কতটা। একজন বস্তিবাসী যদি পৃথিবী হন, নেমার তাহলে মহাবিশ্ব।
কয়েকমাস আগেই নেমারের প্রাক্তন টিমমেট লায়োনেল মেসি বাল্যবন্ধু আনতোনেলাকে বিয়ে করলেন আর্জেন্টিনায় নিজের যে শহরে জন্ম সেই রোজারিও এক বিলাসবহুল হোটেলে। সংবাদসংস্থাগুলো আকাশ থেকে তোলা একটা ছবি পাঠিয়েছিল হোটেলটার, অনেক কাগজে ছাপাও হয়েছিল। সেই ছবিতে দেখা যায় হোটেলটার ঠিক বাইরেই বিস্তৃত এলাকাজুড়ে বস্তি। দেখতেই মনে পড়েছিল বিজন ভট্টাচার্য নামে এক পাগলের লেখা ‘নবান্ন’ বলে একটা নাটকের কথা। তার একটা দৃশ্য আমাদের পাঠ্য ছিল কোন এক সুদূর অতীতে। সেই দৃশ্যে এক বড়লোকের বাড়ির বিয়ে হচ্ছে। সেখানকার আসবাবপত্রের গা দিয়ে “আলো চুঁইয়ে পড়ছে” আর বিয়েবাড়ির বাইরে ময়লার ভ্যাটে একদল মানুষ কুকুরের সঙ্গে কামড়াকামড়ি করছে খাবারের জন্যে। আপনি বলবেন মেসি, নেমার তাঁদের জন্মগত প্রতিভা এবং অধ্যবসায়ের জোরে ঐ রোজগারে পৌঁছেছেন। কথাটা মিথ্যে নয়। একইসঙ্গে এটাও মিথ্যে নয় যে অনাহার ছাড়া অত্যাহার থাকতে পারে না।
যাই হোক, সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায় ছোটবেলা থেকে আমরা যে শুনে এসেছি ফুটবল হল গরীবলোকের খেলা সেটাকে এখন ছোটবেলার পরিত্যক্ত খেলনাগুলোর মত আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। সারা পৃথিবীতেই ফুটবল এখন বড়লোকের খেলা — বড়লোকেরাই দ্যাখে, বড়লোকেরাই খেলে। বিশ্বাস হচ্ছে না? ইন্টারনেটে খুঁজে দেখুন প্রিমিয়ার লিগের খেলাগুলোর টিকিটের দাম নিয়ে কত সমর্থক অসন্তুষ্ট। এন্ড্রু ফ্লিন্টফকে মনে পড়ে? তিনি তো নেহাত গরীব লোক নন, সিপিএম নন, বিজন ভট্টাচার্যের মত পাগলও নন। ইউটিউবে খুঁজে দেখুন, একটা রেডিও স্টেশনে বসে ফ্লিন্টফ প্রশ্ন তুলছেন আর্সেনালের খেলার টিকিটের দাম নিয়ে। বলছেন যে এওয়ে ম্যাচটা আর্সেনাল খেলতে যায় বিলাসবহুল প্লেনে করে, সে ম্যাচটা তো বাসে চড়েও খেলতে যাওয়া যায়। যে সমর্থক কষ্ট করে আয় করা পয়সা খরচ করে টিউবরেলে চড়ে খেলা দেখতে আসেন তিনি কুড়ি মিনিটের ফ্লাইটে যাতে সিনেমা দেখা যায়, ভিডিও গেম খেলা যায়, স্নানবিলাসী হওয়া যায় — তার জন্যে বেশি দামের টিকিট কিনতে বাধ্য হবেন কেন? গানাররা কেন বাসে করে খেলতে গিয়ে টিকিটের দাম কমানোর ব্যবস্থা করবে না?
তা এহেন ফুটবল খেলার ভবিষ্যতের তারকাদের আপনি দেখতে পাবেন আপনার দেশেই। আর কয়েকদিন পরেই আমাদের চিরচেনা (সাংবাদিক বন্ধুদের মুখে শুনছি আর চেনা যাচ্ছে না) সল্টলেক স্টেডিয়ামে তারা দাপিয়ে বেড়াবে। সেই স্টেডিয়ামের আশেপাশে কখনো বস্তি থাকতে দেওয়া যায়! ভাবলেন কী করে? পৃথিবীর সর্বত্রই তো দরিদ্র কুৎসিত, দারিদ্র্য নয়। অতএব বড়লোকেদের মোচ্ছবের জন্যে কিছু গরীবকে তো ঘরছাড়া হতেই হবে। আমাদের দেশটা কত সুজলাং সুফলাং সেটা দেখাতে হবে না দুনিয়াসুদ্ধু লোককে? হীরকরাজার মোচ্ছবের আগে লোকের ভিটেমাটি চাটি করার সেই দৃশ্য মনে নেই?
আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে এতবড় খেলাধুলোর আয়োজন মানেই তো এই। ব্রাজিলে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ হল তখনো এই একই ঘটনা ঘটেছিল তো। ব্রাজিল তো তবু ফুটবলের পীঠস্থান, আমাদের তো ফুটবলের বিশ্ব মানচিত্রের পিঠে স্থান খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। তবু আমরা এই মহাযজ্ঞ করছি। করার সুযোগ যে পেয়েছি সেও ফুটবল আর গরীবের খেলা নেই বলেই। মাঠের ভেতরে আমরা যা-ই করি না কেন, বাইরে আমাদের মত বড় বাজার আর কোথায় আছে? ফিফা আর তার স্পনসররা সেই বাজারে ব্যবসা করার এমন সুযোগ ছাড়বে কেন? আমাদের আম্বানি ইত্যাদিরাও সেই সুযোগে যারপরনাই কামিয়ে নেবেন না কেন? আর আমাদের শাসকরাই বা দুনিয়াকে দেখানোর এমন সুযোগ ছাড়বেন কেন যে আমাদের দেশে সবার পেটে ভাত না থাক, দারুণ দারুণ সব স্টেডিয়াম আছে, মোচ্ছব করতে আমরা ভারী ওস্তাদ। তাই অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপই শেষ নয়, প্রধানমন্ত্রীর সস্নেহ প্রশ্রয়ে অনূর্ধ্ব-২০ আয়োজন করার আব্দারও করে ফেলেছি আমরা। হরির লুট ভাল জমেছে বুঝলে ফিফা সে আব্দার রক্ষা করতেও পারে। চাই কি, ভবিষ্যতে সিনিয়র বিশ্বকাপও আমরা আয়োজন করতে চাইতে পারি। এক ফুয়েরারের বার্লিন অলিম্পিক দরকার হয়েছিল শক্তি প্রদর্শন করতে, আরেকজনের একটা ফুটবল বিশ্বকাপ তো লাগতেই পারে।
যাও বস্তির ছেলে, যাও। যেখানে পার পালিয়ে যাও, ফুটবল তোমার খেলা নয়। বস্তিতে ন্যাকড়া দিয়ে বল বানিয়ে খেলতে খেলতে ফুটবলের রাজা হয়ে ওঠা দিয়েগো মারাদোনা যখন তোমার শহরের আদরের প্রাক্তন ক্রিকেটারের সাথে বল লাথাবেন, তুমি তখন আসন্ন শীতে কোথায় মাথা গুঁজবে সেটা ভেবো। জগতের আনন্দযজ্ঞে তোমার নিমন্ত্রণ নেই, থাকতে পারে না।

পুনশ্চ: বন্ধুরা আমার ভন্ডামিতে ভুলবেন না যেন। আমি কিন্তু সত্যি সত্যি এই খেলার বিপক্ষে নই। হতেই পারি না। আগামী একমাস সাজিয়েগুছিয়ে ফলাও করে এই খেলারই খবর যারা আপনাদের সকালের কাগজে পরিবেশন করবে আমি তাদেরই একজন

আমাদের মেয়েরা

indianteam

লক্ষ লক্ষ অন্য শুক্রাণুর সঙ্গে লড়াই করে আপনাকে মায়ের জরায়ুতে ঢুকতে হয়েছিল। তারপর আট-ন মাসের নিশ্চিন্ত বিশ্রাম, মায়ের শরীর থেকে পুষ্ট হওয়া, অবশেষে ভূমিষ্ঠ হওয়া। তারপর অন্তত এক-দেড় দশক জীবনযুদ্ধ কী আপনি টের পাননি কারণ আপনার হয়ে যুদ্ধটা করেছেন আপনার বাবা-মা, নিকটাত্মীয় — যদি আপনি পুরুষ হন। যদি আপনি ভারতে জন্মানো মহিলা হন, তাহলে কিন্তু আপনার লড়াইটা মায়ের জরায়ুতে ঢুকে পড়েই শেষ হয়নি। আপনি যে ভূমিষ্ঠ হবেনই তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। দেশের আইন আছে, তার ফাঁকও আছে। সেই ফাঁক দিয়ে কোন অসাধু ডাক্তারের সাহায্যে আপনাকে যে কোনদিন হত্যা করা হতেই পারত। এরকম রোজ, প্রতি সেকেন্ডে ভারতে ঘটছে। এখনো ঘটছে।
অর্থাৎ কাল লর্ডসে আপনি যে এগারোজনকে আকাশনীল জার্সি গায়ে লড়তে দেখলেন, তারা আসলে এগারোটি কন্যাভ্রূণ যাদের হত্যা করা হয়নি। এগারোটি শিশুকন্যা যাদের জন্মানোর পরেই মুখে ধান পুরে দিয়ে বা গরম দুধে চুবিয়ে মেরে ফেলা হয়নি। এগারোটি শিশু যারা, কি ভাগ্যিস, তিনবছর বয়সেই কোন তথাকথিত বাবার লালসার শিকার হয়ে প্রাণ হারায়নি। এগারোটা মেয়ে যারা ঋতুমতী হওয়ার আগে থেকেই ট্রেনে বাসে বাপের বয়সী লোকের কনুইয়ের গুঁতো খেয়েছে। এগারোটা মেয়ে যাদের খেলোয়াড় হয়ে ওঠা দেখে কেউ না কেউ বাপ-মাকে বলেছে “কেমন ব্যাটাছেলেদের মত চেহারা হয়েছে। এর আর বিয়ে দিতে পারবে?” এগারোটা মেয়ে যাদের নিয়ে গত পরশু অব্দি আমাদের কারো তেমন আগ্রহ ছিল না কিন্তু কাল জিতে গেলে “আমাদের মেয়েরা” বলে দাবী করতাম এবং এখন উড়িয়ে দিতে গিয়ে বলছি “কেন নিন্দে করব না? এটা একটা টিম? এখানেও মেয়ে বলে রিজার্ভেশন নাকি?”
নিশ্চিত জানবেন, মিতালী, ঝুলনরা জিতলে আমাদের অবদান তাতে ঘন্টা আর হারলেও আমাদের কোন অধিকার নেই নিন্দা করার। কারণ আমরা এরপরেও বাড়ির মেয়েটা ক্রিকেট খেলতে চাইলে বলব “ছেলেদের সঙ্গে মেয়েরা খেলে না।”