টুকটুকে বউমা

ফিসফাস চলেছিল, এত টুকটুকে কি ওর পেটের ছেলে? নিজের তো ঐ রঙ। নিশ্চয় কিনে এনেছে। গরমের ছুটিতে কাশ্মীর গেছিল না? ওখানে তো সব ভীষণ গরীব। নিজের পেটে ভাত জোটে না, চারটে পাঁচটা বাচ্চা। বেচে দেয় পারলেই। নিশ্চয় কিনে এনেছে।

কানে যেতে খুব কেঁদেছিল কালো মা। উনি বলেছিলেন “ছাড়ো তো। লোকের কথার দাম দেড় পয়সা।”

পৈতেয় খেতে এসে দেওরের বড় শালী লজ্জার মাথা খেয়ে বললে “ওঃ! কি ফরসা কি ফরসা আপনার ছেলে! দেখলে বুক টনটন করে। আমাদের তো আর বয়েস নেই। ও ছেলের বউ পাবেন কোথায়, দিদি? কাশ্মীর থেকে আনাবেন বুঝি?”

কালো মা কে ধলো ছেলের জন্যে কত কথাই যে শুনতে হল এতকাল!

আজ বারো দিন ছেলের খবর নেই। কাশ্মীর যাবে শুনেই মায়ের মন কু ডেকেছিল। কিন্তু চাকরি। ফোন কাজ করছে না, ইন্টারনেট বন্ধ। উনি ছেলের অফিসে ফোন করে করে হয়রান। ওরাও কোন খবর পাচ্ছে না।

কালো মা ফেসবুকে খুঁজছে। কাশ্মীরের কোন খবর যদি থাকে। টিভিতে তো বলছে সবাই ভাল আছে, তাহলে কোন খবর নেই কেন? ছেলের গলা শোনা যায়নি কতদিন।

মা যত দ্যাখে শরীর তত অবশ হয়। ছেলের বন্ধুরা, ওনার বন্ধুরা। সবাই কিসব লিখেছে ফেসবুকে! বাপ, ব্যাটা সব একাকার! একখানা কাশ্মীরি মেয়ে পেলেই হয়! আপেলের মত গাল, এর মত বুক, তার মত পেট, অমুকের মত পাছা… মা আর পড়তে পারে না।

কালো, কালো, কালো। ছোট থেকে শুনতে শুনতে কুঁকড়ে থাকা মা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে “ঠাকুর, তোমার অশেষ দয়া। ভাগ্যে ফরসা করোনি। খোকা, ভালোয় ভালোয় ফিরে আয় বাবা। টুকটুকে বউমার আমার দরকার নেই।”

প্রকাশ: অণুগল্প (ফেসবুক গ্রুপ)

বাটিক প্রিন্ট

চমৎকার দেখাচ্ছিল ছেলেটিকে। দূর থেকে দেখেও বেশ বোঝা যাচ্ছিল সুপুরুষ। কতই বা বয়স হবে? পনেরো বা ষোল। রাজ কাপুরের ভাষায় “থোড়া থোড়া বচপন, থোড়ি থোড়ি জওয়ানি।”

আমার তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকল। ছেলেটিকে দেখে কিশোরবেলার কথা মনে করে বেশ ফুরফুরে লাগছিল। রথের মেলায় এমনি কাঁচের চুড়ি আমিও কিনেছি লুকিয়ে। এ ছেলেও দেখি এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। চেনাশোনা কেউ দেখে ফেলল না তো! ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে আমিও দেখি। কোন চোখ ওর দিকে কটমটিয়ে তাকিয়ে আছি কি? যদি থাকে, ভস্ম করে দেব না?

অল্প দাড়ি গোঁফ ওঠা ফর্সা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ভাবি, সাদা পাজামা পাঞ্জাবিতেই একে এমন দেখাচ্ছে, একখানা লাল টুকটুকে জামায় আর নীল ফেডেড জিনসে কেমন দেখাবে? আজকাল বাটিক প্রিন্ট না কী যেন বেরিয়েছে? তাতেও দারুণ মানাবে নিশ্চয়। পাশে থাকবে সেই মেয়েটি, যার জন্যে চুড়ি কেনা। হয়ত বেগুনী ওড়না আর সালোয়ারে, কামিজটা বাসন্তী। লম্বা বেণীর চঞ্চল মেয়েটি কথা বলতে বলতে ঘাড় ঘোরায়, সেই মোটা বেণী এসে লাগে ছেলেটির গায়ে। কত কথা ভেসে ওঠে, কিন্তু বলবার আগেই মিলিয়ে যায়।

“বারোয়ারীতলা কোন দিকে দাদু?”

ছেলেটা এসে আমাকেই জিজ্ঞেস করে।

বলব। আয় বাছা, একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিই তার আগে, চুমু দিই কপালে। ভাল থাকো বাবা, বেঁচে থাকো। বড় হও, ভাল হও। যার জন্যে চুড়ি কিনলে তারও ভাল হোক।

এসব বলব ভেবেছিলাম, বলিনি। পাগল ভাবত।

আজ সকালে কাগজ খুলেছি। আরে! তারই ছবি নাকি! তেমনি পাঞ্জাবি পাজামা, মাথায় টুপি। তবে জামাটি তো পুরো সাদা নয় মনে হচ্ছে? বাটিক প্রিন্ট না? চশমা ছাড়া ঝাপসা দেখি। বুড়োর মন। মুখও দেখতে পাইনি, কেবল সাদা পাজামা আর টুপি দেখেই কাল বিকেলের ছেলেটার কথা মনে পড়ল।

হাতড়ে হাতড়ে তাকের উপর পেলাম চশমাটা।

হ্যাঁ সে-ই বটে। তারই মৃতদেহ। বাটিক প্রিন্ট নয়। রক্ত। কাল বারোয়ারীতলায় কারা যেন…। কাগজে লিখেছে এত মারেনি যে মরে যাবে। নির্ঘাত হার্ট ফেল করেছে।

প্রকাশ: অণুগল্প (ফেসবুক গ্রুপ)

মুকুলদার পুতুল

“তোমার তাহলে আর চিন্তা নেই। বুড়ো বয়সে পায়ের উপর পা তুলে থাকতে পারবে, কী বলো?”

কথাটা বলতেই মৃদু হাসল মুকুলদা। অবশ্য কথায় আনন্দ প্রকাশ করল না। মুরগিটাকে মাঝ বরাবর দু ভাগ করে বলল “আমি পায়ের উপর পা তুলে থাকার ছেলে নই। গায়ে গতরে খেটে রোজগার করেছি, যদ্দিন গায়ে জোর আছে, তাই করব।”

“কিন্তু তোমার ছেলে কি করতে দেবে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

মুকুলদা ঠ্যাংটা কাটতে গিয়ে থমকে গেল।

“করতে দেবে না কেন?”

“না, বলতেই পারে ‘বাবা, এতদিন তো কষ্ট করলে, এবার বিশ্রাম নাও। আমি তো রয়েছি…”

এবার আর মুকুলদা উচ্ছ্বাস গোপন করতে পারল না।

“হে হে, সে তো ছেলে এখনই বলে। ওর মাকে দিয়েও বলাচ্ছে। তবে আমি কানে তুলি না। ইঞ্জিনিয়ারিং করেছে, চাকরি পেয়েছে, সবই ঠিক আছে। কিন্তু আজকাল তো বলে এম বি এ না করলে বেশি দূর উঠতে পারবে না। তার তো খরচা আছে, সেটা করুক আগে। এখনই সংসারের দায়িত্ব নিতে আমি বারণ করেছি।”

“হ্যাঁ, তোমার অবশ্য বয়স বেশি হয়নি। আর স্বাস্থ্যও ভাল…”

“তাহলে? আমার থেকে তো অ্যাদ্দিন মাংস নিচ্ছ, কোনদিন শরীর খারাপ বলে দোকান বন্ধ দেখেছ?”

সত্যিই গত কুড়ি পঁচিশ বছরে একদিনও মুকুলদার দোকান বন্ধ দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না।

“বাবা-মা একুশ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল বলে এত বড় ছেলে আমার, বুঝলে না? এখনই কেন ঘরে বসতে যাব বলো তো?” মাংস আমার ব্যাগে ভরে দেওয়ার সময় সে বলল।

ইঞ্জিনিয়ার ছেলে প্রবাসে থেকেও কেমন খোঁজ খবর রাখে, পুজোয় মাকে কেমন বালুচরি দিয়েছে, বাবাকে ব্র‍্যান্ডেড টি শার্ট দিয়েছে — সেসব ততক্ষণে শোনা হয়ে গেছে। অনেকদিন পর প্রফুল্ল চিত্তে বাড়ি ফিরলাম। চারিদিকে এত খারাপ খবর, তার মধ্যে উপযুক্ত ছেলে বাবা-মাকে দ্যাখে না এমন খবরও কম থাকে না। আমাদের মফস্বলে পাড়ায় পাড়ায় কত ঘটনা। তার মধ্যে মুকুলদার অমন ছেলের কথা শুনে যে কত ভাল লাগল তা বলে বোঝানো মুশকিল। আমার মা অবশ্য শুনে বলল “দাঁড়াও, আগে ছেলের বিয়ে থা হতে দাও।” পরিসংখ্যানের নিরিখে হয়ত কথাটা সত্যি, তবে শর্মিষ্ঠা শাশুড়ির মন্তব্য শুনে প্রসন্ন হল না। মায়ের কথাটা আমারও ভাল লাগল না। পরে যদি ছেলে বিগড়ে যায় তো যাবে। আপাতত বড় কোম্পানিতে মোটা মাইনের চাকরি পেয়ে, মুম্বাইয়ের মত শহরে থেকেও যে সে পাড়াগেঁয়ে স্কুলের চৌকাঠ না পেরনো বাবা-মাকে অসম্মান করছে না, এই বা কম কী?

দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে যখন দিবানিদ্রার প্রস্তুতি নিচ্ছি, শর্মিষ্ঠা বলল “সব দোষ ছেলের বউয়ের। এই অজ পাড়া গাঁয়ে বাড়ি, বাবা মাংস কাটে, মা কে জানে কতদূর লেখাপড়া করেছে? ঐ ইঞ্জিনিয়ার ছেলের যে মেয়েকে পছন্দ হবে সে তো লেখাপড়া জানা মডার্ন মেয়ে হবে। এই শ্বশুর শাশুড়ির সাথে সে ঘর করতে পারবে? পারা সম্ভব?” দেখলাম মায়ের কথার যেমন যুক্তি ছিল, শর্মিষ্ঠার কথাগুলোও ফেলে দেওয়ার মত নয়। তবে এসব যুক্তির ঠ্যালায় সকালের ফুরফুরে মনটা ক্রমশ মেঘাচ্ছন্ন হচ্ছে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে পাশ ফিরে কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

এমন সুন্দর পুতুল আঁকা কোলবালিশ জড়ালে ঘুম আসতে বিশেষ সময় লাগে না। কৃতিত্বটা শর্মিষ্ঠারই। ওর হাতের কাজ রীতিমত ভাল। কেবল বালিশের ওয়াড়ে পুতুলের নকশা আঁকতে পারে তা নয়। আমাদের বৈঠকখানা, খাবার ঘর, শোবার ঘর জুড়ে ওর বানানো অনেক পুতুল। আত্মীয় বন্ধুদের বাচ্চাকাচ্চার জন্মদিনেও ওর তৈরি পুতুলই উপহার দেওয়া হয়। যে দ্যাখে সে-ই প্রশংসা করে। ওর মাসতুতো ভাই খুব টেক স্যাভি। তার মতে এইসব পুতুল বেচার জন্য একটা ওয়েবসাইট চালু করলে প্রচুর বিক্রি হবে। নিদেন পক্ষে একটা ইউটিউব চ্যানেল চালু করলে আমার শর্মিষ্ঠা ইন্টারনেট সেনসেশন হয়ে যাবে বলে তার ধারণা। কিন্তু দিদিকে কিছুতেই রাজি করিয়ে উঠতে পারছে না।

তবে শর্মিষ্ঠার মুকুলদার সম্বন্ধে ধারণা সবটা ঠিক নয়। লেখাপড়া তেমন না জানলেও মুকুলদা মোটেই খুব প্রাচীনপন্থী লোক নয়। আমার চেয়ে এগারো বারো বছরের বড় হবে। ইদানীং একটু ফুলে গেছে বলে অবশ্য আরো বেশি মনে হয়। ওর দোকান থেকে মাংস কেনা ছিল আমার বাবার অভ্যেস, তাই আমারও অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে। বাবা থাকতে আমি বাজারে গেছি কালেভদ্রে, তাও বাবা জোর করে নিয়ে গেছেন বলে। বাজার কোনদিনই আমার পছন্দের জায়গা ছিল না। ছোটবেলায় বাবার সাথে যেতে ভাল লাগত বোধহয় কোন দায়িত্ব ছিল না বলে। নইলে ঘুরে ঘুরে দরাদরি করে বাজার করা আমার কম্ম নয়। চেষ্টা করলেও পারব না। কানের পাশে বেগুন নিয়ে এসে অনেক টেপাটেপি করার পরেও বেশ কয়েকবার কানা বেগুন নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। বাবা যে কী করে মাছে হাত দিয়েই বলে দিতেন “এই মাছ গছাচ্ছ ভাই? এ তো কড়াইয়ে ছাড়লেই পেট ফেটে যাবে”, সে আমার কাছে আজও রহস্য। তাই বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে বাজারে গিয়ে আমি ওসব চেষ্টাই করি না। বাবা কার থেকে কোনটা বেশি কিনত সেটুকু ভাল করে মনে রেখেছিলাম, ঠিক সেই লোকের থেকে সেই জিনিসটা কিনি। বাবা গত হয়েছেন তিন বছর হয়ে গেল। এই পদ্ধতিতে মা, বউ দুজনকেই খুশি রাখতে পেরেছি। সেই ফর্মুলা মেনেই আমি মুকুলদার বাঁধা খদ্দের।

রবিবার সকালে বাজারে গিয়ে মুকুলদার সাথে এক ভাঁড় চা আমার বাঁধা। যে রবিবার খাসির মাংস কিনি, সে রবিবারেও আমাকে দেখতে পেলে চা না খাইয়ে ছাড়ে না। “আরে মাংস নেবে না বলে দুটো কথাও বলতে নেই নাকি গো? তোমার সাথে কি আজকের সম্পর্ক? তোমার দাদু মুরগি কিনত আমার বাবার থেকে। তোমার আমার জম্ম হয়নি তখন।” এইভাবে নাড়িতে টান দিয়ে সে ডেকে নেয়। ক্লাস এইট অব্দি লেখাপড়া করেছিল আমার বাবার স্কুলেই, সেই সূত্রে প্রচুর কানমলা আর বেত্রাঘাত সহ্য করেছিল। খুব কাছে সরে এসে নীচু গলায় সেসব গল্পই বলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। আমার বেশ অস্বস্তিই হয়, কিন্তু সেকথা বললেই মুকুলদা বলে “না গো, সুবীর স্যার ওরম বেতের বাড়ি দিয়েছিলেন বলে মানুষ হয়েছি। সভ্যতা ভদ্রতা শিখেছি। আজকাল ছেলেপুলেদের হাবভাব দেখেছ? গলা টিপলে দুধ বেরোয়, হাতে মোবাইল, তাই নিয়েই সারাক্ষণ আছে। গুরুজনদের সন্মান দিতে জানে না, একটা কাজ ঠিক করে করতে পারে না, আলালের ঘরের দুলাল। ঠ্যাঙানি খায়নি বলে সব এরম তৈরি হয়েছে।”

“না মুকুলদা, মেরে ধরে পড়ানো ভাল জিনিস নয়। ওভাবে কাউকে কিছু শেখানো যায় না।” নিজের বাবার শিক্ষা পদ্ধতির বিরোধিতা করে আমি বলি।

“কে বলল যায় না? আমার মাথায় ঘিলু ছিল না বলে আমার কিছু হয়নি। নইলে স্যারের হাত থেকে কত ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার জজ ব্যারিস্টার বেরিয়েছে তুমি জানো? এই তো আমার ক্লাশেই ছিল কৌশিক মল্লিক। শনিবার করে বাজারে আসে। ইনকাম ট্যাক্সের বিরাট অফিসার। তোমার বাবার হাতে কম মার খেয়েছে? টিফিন বেলায় পাঁচিল টপকে তারা টকিজে ববি দেখতে যাচ্ছিল। স্যার কান ধরে পাঁচিল থেকে নামিয়ে সে কি মার! একটা রা কাড়েনি। তবে তো অত বড় চাকরি পেয়েছে। আজকালকার ছেলে হলে বাপ-মা থানা পুলিশ করে ফেলত। তাই জন্যে তো আজকাল কেউ মানুষ হয় না।”

“তা কেন? তোমার ছেলে তো এখনকারই ছেলে। সে মানুষ হয়নি?” একদিন বললাম।

একেবারে নতুন বউয়ের মত লজ্জা পেল এবং গদগদ হয়ে পড়ল।

“ওর ধরনটাই আলাদা। আমাদের ঘরে এমন ছেলে কেমন করে জন্মাল সত্যি জানি না গো। বোধহয় সুবীর স্যারের মত মানুষদেরই আশীর্বাদ”, সে মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে।

লেখাপড়া মন দিয়ে না করে থাকলেও, ক্লাস ফাইভেই বিড়ি ধরে থাকলেও পৈতৃক পেশায় আসার পর থেকে সে কাউকে কখনো এক পয়সা ঠকায়নি। ফলে তার খরিদ্দার মাস্টারমশাইরা তাকে দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছেন, তাঁদের আশীর্বাদেই একমাত্র ছেলেটা আর পাঁচজনের চেয়ে আলাদা হয়েছে বলে মুকুলদার বিশ্বাস। এতে ছেলের শিক্ষকদের কোনরকম কৃতিত্ব মানতে সে নারাজ। নিজে শিক্ষক হয়ে আমাদের প্রজন্মের মাস্টারদের মোটেই পাত্তা দেয় না এমন একজন লোকের সাথে আড্ডা মারতে ভাল লাগার কথা নয়, অথচ আমার লাগে। সম্ভবত বাবার স্তুতি শুনতে মানুষের কখনো ক্লান্তি আসে না। তাই। তাছাড়া মাঝে মাঝে ওর ছেলের গল্প শুনতেও মন্দ লাগে না। আমরা শিক্ষকের বংশ, আর বাবা বলতেন “কোন স্কুলে বোর্ডের পরীক্ষায় হায়েস্ট নম্বর কত ওঠে সেটা বড় কথা নয়। ফার্স্ট জেনারেশন লার্নারের সংখ্যা কত, তারা কতদূর পড়াশোনা করছে সেটাই আসল। আমাদের স্কুলগুলো তো ওরা আছে বলেই চলে।” আজকাল কথাটা আরো বেশি সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই একজন ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার অতদূর গেছে, আরো দূরে যাচ্ছে — জানলে আমাদের মত অনামী স্কুলের মাস্টাররা বুকে বল পায়।

মুকুলদা আমাকে নিয়মিত খবর দেয়। ছেলের পদোন্নতি হয়েছে, তার অধীনে আগে এত জন কাজ করত, এখন অত জন কাজ করছে — এইসব। কিন্তু একদিন বাজারে গিয়ে দেখি হাসিখুশি লোকটা কেমন কাঁচুমাচু মুখ করে বসে আছে। বাড়িতে শ্বশুরবাড়ির লোক আসবে বলে একটা কিলো দুয়েকের মুরগি দিতে বললাম। বিনা বাক্য ব্যয়ে খাঁচা থেকে বার করে ডানা কেটে ছাল ছাড়াতে শুরু করল। কথা শুরু করার জন্য বললাম “কী গো, বাড়িতে সব ভাল?” মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। অগত্যা নিজেই বললাম “চা খাওয়াবে না?” হাঁকডাক করে চায়ের ব্যবস্থা অবশ্য করল, কিন্তু ভাঁড়টা এক পাশে রেখে চুপচাপ মুরগি কাটতে লাগল। কথাবার্তা নেই। আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম “কী ব্যাপার গো? কিছু হয়েছে? শরীর খারাপ? নাকি ছেলের সাথে মান-অভিমান?”

কেমন যেন চমকে গিয়ে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে মুকুলদা বলল “ছেলে! না, ছেলে ভালই আছে…”

“তবে? শরীর ভাল নেই?”

“না… দাও, তোমার ব্যাগ দাও।”

ব্যাগে মাংসের প্যাকেটটা ঢুকিয়ে দিয়ে, হাত ধুয়ে সে শেষ পর্যন্ত চায়ের ভাঁড় নিয়ে আমার পাশে এসে বসল।

“শরীর অনেকদিন ধরেই ভাল যাচ্ছে না, বুঝলে? রাতে ঘুম হচ্ছে না একদম। এদিকে ভোর ভোর উঠে পড়তে হয় তো, মাল আসে। তারপর হজমেরও গোলমাল হচ্ছে, যা খাচ্ছি বমি হয়ে যাচ্ছে। একদম ক্ষিদে লাগছে না। মাঝে মাঝে জ্বরও আসছে। কী যে করি!”

“ডাক্তার দেখালে?”

“বক্সীদাকে তো দেখালাম। কিছু ধরতে পারল না তো।”

“কী বলল?”

“ধুর! কী ছাইপাঁশ ওষুধ দিল। দশ দিন তো হয়ে গেল খাচ্ছি। কোন লাভ হচ্ছে না।”

“তাহলে অন্য ডাক্তার দেখাও।”

“দেখিয়েছি। প্রবলেম তো আমার আজকের নয়, এই ধরো ছ মাস হল ভুগছি। সবুজগ্রামের সব ডাক্তার দেখানো হয়ে গেছে। কেউ কিছু ধরতেই পারছে না। এবার ভাবছি হোমিওপ্যাথি করাব।”

“কিছু ডিটেকশন হয়নি? মানে অসুখটা কী বলেনি কেউ?”

“কই আর বলল? ঘুরে ফিরে সেই হজমের ওষুধ, ঘুমের ওষুধ।”

“সে কি গো! এই সামান্য সমস্যা এতদিন ধরে ওষুধ খেয়েও মিটছে না! তাহলে তো চিন্তার কথা। তুমি হোমিওপ্যাথি ফ্যাথির মধ্যে না গিয়ে কলকাতায় বড় ডাক্তার দেখাও, বুঝলে? দিন কাল ভাল নয়, কী থেকে কী হয় বলা যায় না।”

সেদিনের পর দীর্ঘকাল আর বাজারে যাওয়া হয়নি। শর্মিষ্ঠা অফিস ফেরত প্রায়ই বাজার করে আনছিল, তারপর পুজোর ছুটি পড়ল, সপরিবার রাজস্থান বেড়াতে গেলাম। সব মিলিয়ে মাস খানেক পরে বাজারে গিয়ে দেখি মুকুলদার ছোট্ট দোকান তালা বন্ধ। উল্টো দিকের মদনদার থেকে খাসি কিনতে গিয়ে জানলাম মুকুলদা বেশ অনেকদিন হল বসছে না। শরীর খুব খারাপ। বাইরে কোথাও চিকিৎসা করাতে নিয়ে গেছে বাড়ির লোকে। একটা বড় কাতলার মাথা কাটতে কাটতে অখিলদা চেঁচিয়ে বলল “ভেলোর নিয়া গ্যাছে অর শালায়। ব্রেনে কী য্যান হইছে।” শুনেই মনটা কেমন কু ডাক দিল। ভাবলাম কারোর কাছে মুকুলদার ফোন নম্বর থাকলে নিয়ে আসি, ফোন করব। তারপর ভাবলাম থাক, বাড়াবাড়ি করে কাজ নেই। যেখানেই গিয়ে থাক, ফিরবে তো বটেই। বাজারেই দেখা হয়ে যাবেখন।

পুজোর পর স্কুল খুলতেই একগাদা পরীক্ষার খাতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, শর্মিষ্ঠাকে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে বাজারের দায়িত্বটা কদিনের জন্য ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলা গেল। হপ্তা দুয়েক পরে আবার বাজার যাওয়ার সময়ে মনে পড়ল মুকুলদার কথা। এতদিনে নির্ঘাত ফিরে এসেছে।

কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখি একজন মহিলা তার দোকানে বসে আছেন।

“মুকুলদা কোথায় গেল?”

“বাড়িতে। আমিই বসছি কদিন।”

“বাড়িতে? শরীরটা সারেনি তাহলে?”

উত্তর না দিয়ে উনি জিজ্ঞেস করলেন “আপনার কি গোটা মুরগি লাগবে?”

আমার কৌতূহল বেড়ে গেল, একটু অপমানিতও লাগল। কোন মতে বললাম “আমার এক কেজি মতন হলেই হবে। কাটা থেকেও দিতে পারেন।”

“না, কাটা আর কোথায়? এতদিন পরে দোকান খুলেছি…”

দেখলাম এই সুযোগ।

“আপনি তো মুকুলদার স্ত্রী, নাকি?”

“হ্যাঁ, দাদা।”

“ভেলোরে আপনিও সঙ্গে গেছিলেন?”

“না, আমি মেয়েমানুষ। ওখানে কী আন্ডু পান্ডু ভাষা বলে, ও আমি বুঝব না। তাছাড়া আমার শাশুড়ি মা তো নড়তে চড়তে পারে না। কার ঘরে ফেলে যাব? আমার ভাই গিসল।”

“যাক, ভালই হয়েছে। তা কী বলল ওখানকার ডাক্তাররা? বাজারে শুনছিলাম ব্রেনের অসুখ?”

ভদ্রমহিলার মুখটা নরম হয়ে এসেছিল, আবার দেখলাম শক্ত হয়ে গেল। যেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোর দিয়েই ছটফটে মুরগিটার গলা বঁটিতে এক বারে কেটে ফেলে বললেন “হ্যাঁ, তাই তো বলল। তবে কী রোগ সেসব আমি বলতে পারব না। আমি অত লেখাপড়া জানি না, বুঝিও না।”

বুঝলাম ভদ্রমহিলার মেজাজটা বিশেষ ভাল নেই কোন কারণে। আমিও হয়ত বেশি কৌতূহল প্রকাশ করছি। মুকুলদা আমাকে খাতির করে বলেই তার বউও করবে এরকম মনে করার সত্যিই কোন মানে হয় না। মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণ বোঝাও তো শক্ত নয়। অসহায়তা। কোনদিন ঘর থেকে বেরোতে দেওয়া হয়নি, আজ একেবারে ভরা বাজারে দোকানে এসে বসতে হয়েছে স্বামীর অসুস্থতার কারণে। নির্ঘাত খুব অস্বস্তি বোধ করছেন।

মাংস ওজন করার সময়ে মনে হল একেবারে ঠিক ধরেছি। আমাকে বললেন মদনদাকে ডাকতে। “আমি এই দাঁড়িপাল্লা দেখতে জানি না। ওনাকে একটু বলুন না দেখে দিতে?” ডিজিটাল স্কেলের ডিসপ্লে নিয়ে শঙ্কা। কোনটা ওজন কোনটা দাম বুঝতে পারবেন না ভাবছেন, তাই মদনদা সহায়। তিনি এসে সব দেখে দিয়ে আমার ব্যাগে মাংস একেবারে ঢুকিয়ে দিয়ে বৌদিকে বললেন “ইনি নিজেই ওজন দেখে নিয়ে নেবেন, আমায় ডাকতে হবে না। এনারা সব মুকুলের বাঁধা খদ্দের।” সে আশ্বাসে বৌদি নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। আকুল হয়ে আমাকে বললেন “আসবেন কিন্তু আবার। অন্য জায়গা থেকে নেবেন না যেন।”

ভাবলাম এটা সেটা নিয়ে কথা বলে ওঁকে একটু সহজ করে দিই। বললাম “আমার বাপ ঠাকুর্দা আপনাদের দোকান থেকে মাংস নিত, আমিও নেব। ভাববেন না একদম। আর দাদা সুস্থ হয়ে যাবে, ভাল জায়গায় নিয়ে গেছেন যখন…”

“তাই যেন হয়, আপনারা সব আশীর্বাদ করুন।”

“তা ছেলে কি ভেলোর গেছিল, নাকি ছুটি পায়নি? প্রাইভেট কোম্পানির চাকরিগুলো যা হয়েছে আজকাল…”

“কোন ছেলে?”

ভদ্রমহিলা একেবারেই স্বাভাবিক স্বরে প্রশ্নটা করলেন, আমি হাঁ হয়ে গেলাম।

“মানে? আপনার ছেলে! আপনাদের ছেলে!”

বৌদি এক মনে দরজার উই ধরা জায়গাটার কাঠ খুঁটলেন কয়েক সেকেন্ড ধরে। আমি থতমত খেয়ে বললাম “আপনাদের তো একটাই ছেলে? মুম্বাইতে থাকে, ইঞ্জিনিয়ার। তাই না?”

“আমাদের কোন ছেলেপুলে হয়নি।” বলে বৌদি খুঁটে তোলা কাঠের গুঁড়ো পরিষ্কার করতে লাগলেন। আমাদের দুজনকেই বাঁচিয়ে দিলেন এক বাজখাঁই গলার ক্রেতা। “কই, মুকুল কোথায়? আমাকে দুটো মাল দেবেন। কাটতে হবে না, শুধু ওজন করে দিয়ে দেবেন।” বৌদি খাঁচা খুললেন, আমি সাইকেল নিয়ে সরে পড়লাম।

এমন ধাক্কা অনেকদিন খাইনি। এ কি রে বাবা! একটা লোক এতদিন ধরে স্রেফ বানিয়ে বলে যাচ্ছে তার ছেলের সম্বন্ধে এত কথা! যে ছেলের কোন অস্তিত্বই নেই!

বাড়িতে ঢুকতেই শর্মিষ্ঠা জিজ্ঞেস করল “কি গো! কী হয়েছে? এরকম মুখ চোখ কেন তোমার?”

সব শুনে মা বলল “কি মিথ্যে বলতে পারে আজকাল লোকে! অকারণে। কী লাভ হয় এসব বানিয়ে বানিয়ে বলে? অদ্ভুত লোক!”

শর্মিষ্ঠা কিছুই বলল না, এদিকে আমার অশান্তি কিছুতেই দূর হচ্ছে না। দুপুরে শোবার ঘরে বললাম “কি আশ্চর্য ব্যাপার বলো তো? আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। মুকুলদা এইরকম অবলীলায় মিথ্যে বলতে পারে? আর আমিও কেমন বোকা! কিচ্ছু বুঝতে পারিনি।”

শর্মিষ্ঠা ও পাশ ফিরে বলল “এত অবাক হওয়ার কী আছে? যে পারে সে পুতুল বানায়, যে পারে না সে গল্প বানায়।”

অলঙ্করণ: সঞ্জয় মাহাত

প্রকাশ: মেঘমুক্তি; শ্রাবণ ১৪২৭