পেনাল্টি

রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনাল শেষ হতে মিনিটখানেক বাকি। এমন সময়। পেনাল্টি।
সবুজগ্রাম ইউনিয়নের তিরিশের এপাশে ওপাশে থাকা অপেশাদারদের বেশ কয়েক মিনিট আগেই দম ফুরিয়ে গেছে। কুড়াইলের দুটো ছেলে এমনিতেই কলকাতায় থার্ড ডিভিশন, ফোর্থ ডিভিশনে খেলে। তারা আবার টালিগঞ্জ অগ্রগামীর একজনকে খেপ খেলাতে নিয়ে এসেছে। এদের সাথে কখনো দশটা পাঁচটা অফিস করা লোকে পারে?

এ অঞ্চলের দলগুলোর মধ্যে বরাবর ভদ্রলোকের চুক্তি ছিল — রমাবাবু এলাকার গর্ব ছিলেন, তাঁর নামের টুর্নামেন্টে নিজেদের মধ্যেই খেলা হবে। কোন দল বাইরের খেলোয়াড় এনে খেলাবে না। কিন্তু সেসব আর কেউ মানে না। সবাইকেই যে কোন মূল্যে জিততে হবে। জিতে পাবে তো একটা সাত পুরনো শিল্ড আর এক হাজার এক টাকা, তবু এত কান্ড করা চাই। কুড়াইলের লোকজনের বাজে খরচের সাধ বেশি, সাধ্যও। তাই ওরাই পাঁচ বছর ধরে নিজেদের এলাকার খেলোয়াড়দের সাথে বাইরে থেকে সবচেয়ে ভাল ভাল খেলোয়াড় নামিয়ে শিল্ড জিতে নিয়ে যাচ্ছে। অন্য দলগুলো আপত্তি করলেই বলে এ অমুকের ভাগ্নে বা তমুকের ভাইপো। সবাই সব বোঝে, কিন্তু প্রমাণ করবে কী করে? ফলে সবুজগ্রামের সবাই জানত যতই ফাইনালে ওঠা হোক, শিল্ড সেই কুড়াইল ব্রাদার্সই জিতবে। তবু পাড়া থেকে যারা কালীতলার মাঠে খেলা দেখতে গেছিল, তারা গেছিল দলের সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটার জন্যে।
চেহারায় বা হাবেভাবে অবশ্য বোঝার উপায় নেই যে ও সবার ছোট। সবে ক্লাস এইট, এর মধ্যেই প্রায় ছ ফুট, আবার দিব্যি গোঁফও গজিয়েছে। দলের সবার চেয়ে লম্বা। আর গোলে দাঁড়িয়ে যেভাবে সবাইকে চিৎকার করে এটা করিস না, ওটা কর বলে, রেগে গিয়ে খিস্তি করে, তাতে অচেনা লোকে ভাববে ও-ই সবার বড়। ওর থেকে অনেক বড় ছেলেরা সব মুখ বুজে সহ্য করে কারণ বলটা গোলের দিকে এলেই বোঝা যায় এ যে সে ছেলে নয়।

সবুজগ্রাম যে ফাইনালে পৌঁছেছে সে অনেকটাই ওর প্রসাদে। তিনটে ম্যাচে মোটে একটা গোল খেয়েছে। আগেই বলে রাখে “একটা গোল কোন ভাবে দিয়ে দাও, বাকি আমি বুঝে নেব। গোল হয়ে গেলে পরে আর কেউ হাফের উপর উঠবে না বলে দিলাম। উঠলে কিন্তু আমিও উঠে যাব। অন্য কাউকে গোলে দাঁড়াতে হবে।“ সে সাহস, বলাই বাহুল্য, কেউ করে না। তাতে যদিও বিশেষ লাভ হয় না। ওকে একের পর এক অবধারিত গোল বাঁচাতে হয়। ও একটা করে গোল বাঁচায় আর অপদার্থ ডিফেন্ডারদের ধমকায়।

বছরদুয়েক ধরে স্কুলের ইন্টার ক্লাস খেলা থেকে শুরু করে গোটা মহকুমার যে কোন খেপ খেলায় বারের নীচে ও থাকলে দল নিশ্চিন্ত। তাই এলাকায় ছেলেটার নাম হয়ে গেছে অতনু। মানে ইস্টবেঙ্গলের অতনু ভটচায আর কি। সবুজগ্রাম হল বাঙালদের পাড়া। তাই স্কুলের রেজিস্টারে যতই ওর নাম হোক নীলাঞ্জন; বাবা, মা, ঠাকুমা যতই ডাকুক নীলু; স্কুলের স্যারেরা বলেন অতনু, বন্ধুরা বলে অতনু, সাত মুল্লুকের লোক বলে অতনু, যারা খেপ খেলতে নিয়ে যায় তারাও বলে অতনু।

রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনালে ফার্স্ট হাফেই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা কর্নার থেকে জটলার মধ্যে একটা গোল করে ফেলেছিল সবুজগ্রাম। তারপর থেকেই কুড়াইল বনাম অতনু। দিব্যি চলছিল। কিন্তু খেলা শেষের মিনিট তিনেক আগে, রাইটার্সের আপার ডিভিশন ক্লার্ক মোটা সুধীর ঐ টালিগঞ্জের ছেলেটাকে আর সামলাতে না পেরে বক্সের মধ্যে মারল টেনে লাথি। ফাইনালের জন্যে পয়সা খরচা করে ভাল রেফারি আনা হয়েছিল। এদিককার লোক হলে হয়ত পেনাল্টিটা দিত না।
অতনু যদি পাতালেও খেলতে যায় তাহলেও একটা ঝাঁকড়া পাকা চুলের, ঘোলাটে চশমা পরা সাড়ে ছ ফুট লোককে মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে অনর্গল চেঁচাতে দেখা যায়। খেয়াল করে শুনলে বোঝা যাবে উনি অতনুকে নির্দেশ দিচ্ছেন কী করতে হবে। ও সেদিকে কান না দেওয়ার চেষ্টা করে, যখন অসহ্য হয়ে যায় তখন চেঁচিয়ে বলে “থাম তো। জীবনে পায়ে বল দিল না, আমায় জ্ঞান দিচ্ছে।“ এতে অবশ্য মিনিট দুয়েকের বেশি চুপ করিয়ে রাখা যায় না লোকটাকে। ম্যাচ জিতলে মাঠের ভেতর ঢুকে পড়ে উনি ঐ ধেড়ে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে থাকেন, হারলে অতনু নিজের এবং দলের ভুলগুলোর জন্যে কাঁদতে কাঁদতে যায় আর উনি পাশে বলতে বলতে যান “ঠিক আছে”, “খেলায় হারজিত আছেই”, “পরের ম্যাচে ঠিক হয়ে যাবে”, “ওরা আরো ভাল খেলেছে” ইত্যাদি। একমাত্র তখনই বোঝা যায় যে বারের নীচে সে যতই মহীরুহ হোক, অতনু আসলে একটা বাচ্চা ছেলে। ঐ ভদ্রলোক হলেন কাছের বড়িহাটা হাইস্কুলের হেডমাস্টার শিবরাম গাঙ্গুলি। এমন হেডমাস্টার যে হয় যারা চোখে দ্যাখেনি তারা কক্ষনো বিশ্বাস করবে না।

তা রমাকান্ত দে স্মৃতি শিল্ডের ফাইনালে রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেওয়া মাত্রই, শিবরামবাবু এসে দাঁড়ালেন গোলের ঠিক পেছনে। অতনুর ততক্ষণে গোটা দলকে খিস্তি দেওয়া সারা। সেই টালিগঞ্জের ছেলেটি বলটা স্পটে বসিয়ে শট নেবে বলে পিছিয়ে যাচ্ছে, শিবরামবাবু বললেন “চোখদুটো দ্যাখ। কোনদিকে মারবে ঠিক করেছে বোঝার চেষ্টা কর।”

অতনু পেছন ঘুরে আঙুল উঁচিয়ে বলল “মুখ বন্ধ না করলে কিন্তু মাঠ থেকে বার করে দেব।”

রেফারি ধমকাল “অ্যাই ছেলে, তুমি দর্শকের সাথে কথা বলছ কেন? কার্ড দেখাব কিন্তু।”

অতনু কটমট করে তাকিয়ে, গলাটা খাদে নামিয়ে বলল “ওটা আমার বাবা।”

ভ্যাবাচ্যাকা রেফারি কোনমতে বললে “যাকগে, এখন পেনাল্টি নেওয়া হবে।”

অতনু ভুরু কুঁচকে টালিগঞ্জের ছেলেটার চোখে চোখ রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল। সাধারণত ওকে ওভাবে দেখেই যে পেনাল্টি মারবে তার গলা শুকিয়ে যায়, গোলটা ছোট দেখায়। কিন্তু এ ছেলে কলকাতায় খেলে। অতনু দেখল সে ওর দিকে তাকাচ্ছেই না, একদৃষ্টে বলের দিকে তাকিয়ে আছে। অস্ফূটে “যাঃ শালা” বলে ও ছেলেটার পা দুটো দেখতে লাগল।

রেফারি দিল বাঁশি, ছেলেটা একবার আলগোছে গোলের দিকে তাকাতেই অতনু বুঝে গেল ওর ডানদিকে মারবে। ঝাঁপটা মেরেই টের পেল শটটা ঠিক হয়নি। বলটা যত না ডাইনে যাচ্ছে তার চেয়ে বেশি উপরে উঠছে। কী আর করা। পড়ে যেতে যেতে কোনমতে বাঁহাতটা মুঠো করে উপর দিকে তুলে দিল সে। শটে জোর ছিল। বলটা আঙুল টাটিয়ে বার কাঁপিয়ে সামনে ড্রপ খেল। এবার টালিগঞ্জ পার্টি এসে গোলে মেরে দেবে ভেবে চোখ বন্ধ করে ফেলতে যাবে, মাটি ফুঁড়ে সুধীর তার বিরাট ভুঁড়ি নিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে এসে বলটাকে বহুদূরে উড়িয়ে দিল। টালিগঞ্জের ছেলেটার আগে কী করে যে ও বলের কাছে পৌঁছল সে কথা ভেবে অতনু লাফিয়ে উঠে চকাম করে এক চুমুই খেয়ে ফেলল মোটা সুধীরের গালে। থ্রো ইন হতে না হতেই শেষ বাঁশি বেজে গেল। পাড়াসুদ্ধু লোক মাঠে ঢুকে পড়ে অতনুকে কাঁধে তুলে সে কি নাচ! তার মধ্যে ওর বাবা এসে একখানা মালা পরিয়ে দিল।

বিকেলবেলায় রজনীগন্ধার মালা। আচ্ছা পাগলামি বটে। ভাবতে ভাবতে হেসে ফেলল নীলাঞ্জন। এখন আর ওকে কেউ অতনু বলে না। এতক্ষণ স্ট্যাচুর মত গম্ভীর হয়ে বসে থাকা লোকটা হঠাৎ হেসে গড়িয়ে পড়ায় বাসের সহযাত্রীরা যে তাকাচ্ছে, সেসব খেয়ালই করল না ও। ওর চোখে তখন ভাসছে মালা পরানোর পরে বাবার সেই চেহারাটা। ধাক্কাধাক্কির চোটে চশমাটা একদিকে বেঁকে গেছে সে খেয়ালই নেই, কেবল সবার সাথে মিলে “সবুজগ্রাম জিন্দাবাদ, অতনু জিন্দাবাদ” বলে চলেছে আর মুষ্টিবদ্ধ হাত ছুঁড়ছে আকাশে।

বাস থেকে নেমে ছেলেমেয়ের হাত ধরে হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করেই নীলাঞ্জনের বউ শ্রাবণী গর্জে উঠল “তোমার মাথাটা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে?”

“কেন? কী করলাম আবার?”

“কী করলাম! দিব্যি চুপচাপ ভালমানুষ বসেছিলে, হঠাৎ খ্যাকখ্যাক করে হাসতে শুরু করলে কেন?”

“আমি!”

“না তো কি আমি? ছি ছি ছি। আমার পাশের মহিলা তার সাথের জনকে বলল ‘কোন পাগলা গারদ থেকে পালিয়েছে রে? কামড়ে টামড়ে দেবে না তো?’”

নীলাঞ্জন দমে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “সত্যি খুব জোরে হেসেছি?”

শ্রাবণী দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বলল “পোড়া কপাল।”

নীলাঞ্জন জানে বউ বানিয়ে বলছে না। আজকাল ও এমন এমন কান্ড করে ফেলে না বুঝে, বুঝলে সেসব কখনো করত না। কিন্তু কোথা দিয়ে যে কী হয়ে যায়! মনেও থাকে না ঠিক করে। এই যেমন শ্রাবণী বলার পরে ওর শুধু মনে পড়ছে ও বাসে আসতে আসতে ছবির মত দেখতে পাচ্ছিল জীবনের অন্যতম সেরা দিনটা। বাবার নাচটা মনে পড়ে মনটা আনন্দে ভরে আছে এখনো। কিন্তু খ্যাকখ্যাক করে হাসছিল ও? কিছুতেই মনে পড়ছে না তো!

সেদিন দোকানে বসেও এরকম হল। একটা মেশিনে উইন্ডোজ ইনস্টল করতে দিয়ে ও বসেছিল। থাকতে থাকতে হঠাৎ দেখে যে মেয়েটার ল্যাপটপ, সে ওর চোখের সামনে খুব হাত নাড়ছে। তাকাতেই বলল “দাদা আপনি ঠিক আছেন? কিছু হয়েছে?”

“হ্যাঁ, ঠিকই তো আছি। ও হো, ইনস্টল হয়ে গেছে, না? সরি, খেয়াল করিনি।”

“না না, সেজন্যে না।”

“তাহলে?”

“আসলে… যেন মনে হল আপনি কাঁদছেন…”

নীলাঞ্জন চমকে চোখে হাত দিয়ে দ্যাখে চোখটা ভিজে ভিজেই বটে। অপ্রস্তুত হয়ে রুমাল দিয়ে চোখ মুখ মুছে নিতে মেয়েটা জিজ্ঞেস করে “কিছু মনে করবেন না, আপনার কি কোন কারণে মন খারাপ?”

মাথা নেড়ে “না” বললেও নীলাঞ্জন ভাবে, মনটা তো খারাপ ছিল না, এখন খারাপ হয়ে গেল।

আবছা মনে পড়ছে একটা দিনের কথা। সকাল সকাল কোথায় যেন যাওয়ার ছিল? রাতেই খেলার বুটজোড়া আর গ্লাভসদুটো কেচেকুচে ঝকঝকে করে রাখা ছিল। রাতটা এপাশ ওপাশ করেই কেটেছে। কেন যেন? একটু আগেই মনে ছিল, তখন আর নেই। ভোর রাত্তিরে কে যেন ঘুম থেকে তুলে দিল, তারপর বাবাকে নিয়ে শ্মশানে যাওয়া হল এইটুকু মনে পড়ছে। সেদিনই তাহলে বাবার মৃত্যুদিন। সেটা মনে পড়েই কি চোখে জল এসে গেছিল? তা আর বুঝে উঠতে পারেনি নীলাঞ্জন।
শ্রাবণীর এক জামাইবাবু ডাক্তার। তার মেয়ের জন্মদিনে গিয়েও একটা গোলমাল হয়েছিল। সেটা বেশ কিছুদিন আগেকার কথা। কিছুই মনে নেই প্রায়। শুধু মনে আছে শ্রাবণী খুব রেগে গেছিল। বাড়ি এসেও চেঁচামেচি। বলেছিল “কী ব্যাপারটা কী? শ্বশুর শাশুড়িদের তুই তোকারি করছ… আর কী নোংরা নোংরা সব কথা! কোন ভদ্রলোক ঐ ভাষায় কথা বলে? ছেলেমেয়েই বা কী শিক্ষা পেল? ভূতে ভর করেছিল নাকি?”

শুনে নীলাঞ্জনের খুবই লজ্জা লেগেছিল। শ্রাবণী না বললেও ও নিজে থেকেই পরদিন ডাক্তার ভায়রাভাইকে ফোন করে ক্ষমা চেয়েছিল। বলেছিল একদমই ইচ্ছা করে করেনি, বুঝতে পারছে না কী করে হল। সে অবশ্য খুবই ভাল। অনেকক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানা প্রশ্ন করে তারপর বলেছিল “দ্যাখো নীলাঞ্জন, আমি তো ডাক্তার। আমার একটা কথা শোন। তোমার একটা মানসিক সমস্যা হচ্ছে। এটার কিন্তু চিকিৎসা দরকার। নইলে বিপদ হবে।”

নীলাঞ্জন বুঝতেই পেরেছিল ভায়রা ইঙ্গিত করছে ও পাগল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ও কী করে বোঝাবে যে ওসব কিছু নয়, আসলে ওর আর কিছুই ভাল লাগছে না। যত দিন যাচ্ছে ততই ও বুঝতে পারছে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। যার তিনকাঠির নীচে দাঁড়িয়ে একা কুম্ভের মত দলকে রক্ষা করার ক্ষমতা ছিল, সে কম্পিউটারের দোকান সামলাচ্ছে, এ যে কী যন্ত্রণা সেটা কেউ বুঝে উঠতে পারছে না।

ফুটবলই জীবন ছিল নীলাঞ্জনের, কিন্তু বাবা বলত ফুটবলের সাথে জীবন কাটাতে হলে শুধু ভালবাসলে হয় না, পরিশ্রম করতে হয়। সে তো কম করেনি ও। সেই দশ বারো বছর বয়স থেকে বারো মাস ভোর চারটেয় উঠে দৌড়তে শুরু করেছে, এটা খায়নি, সেটা খায়নি, এমনকি ক্লাস সেভেনে বিড়ি ধরেও যেদিন শুনেছে বিড়ি খেলে দম কমে যায়, সেইদিন ছেড়ে দিয়েছে। কোন কোচ ছিল না তখনো, কোথায় কোচিং পাওয়া যায় তাও জানা ছিল না। শুধু বাবা কানের কাছে বলে যেত “তুই সাধনাটা কর, গুরু নিজেই তোকে খুঁজে নেবে।” সেই ভরসায় লেখাপড়া প্রায় শিকেয় তুলে দিয়ে দিনরাত খেলেছে।

তা বাবা তো নেহাত ভুল বলেনি। খেলার জন্যে গোটা জেলাটা চষে ফেলতে ফেলতেই তো একদিন বিভূতি ঘোষের চোখে পড়ে গেছিল। সে মাঠে যাওয়াও কি কম কষ্ট? পাঁচটার ট্রেন ধরে চারটে স্টেশন পেরিয়ে যাওয়া, ফিরে স্কুল, বিকেলে আবার প্র‍্যাকটিস। কিন্তু কষ্ট তো গা করেনি সেইসময়। স্পোর্টসস্টারের সাথে পাওয়া একটা পিটার শিল্টনের পোস্টার বাবা বাঁধিয়ে দেয়ালে টাঙিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল “যা-ই কর, জানবি শিল্টন তোর থেকে বেশি পরিশ্রম করত। তবে চল্লিশ বছর বয়সেও বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছে। ঐরকম হতে হবে।” একেকবার সারা গায়ে ব্যথা নিয়ে নীলাঞ্জন অবশ্য মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছে “হ্যাঁ, শিল্টন তোমার কানে কানে বলে গেছে তো।” কিন্তু মনে মনে জানত বাবা ভুল বলে না। দিনরাত খেলার বই পড়ে যখন, নিশ্চয়ই কোথাও পড়েছে।

মায়ের একদম পছন্দ ছিল না লেখাপড়া বাদ দিয়ে বাপ-ছেলের এই ফুটবল পাগলামি। একে নীলুর মামারা সব ডাক্তার, উকিল, ইঞ্জিনিয়ার, তার উপর বাবা হেডমাস্টার। মা মাঝেমাঝেই বলত “লোকের কাছে আমার মুখ দেখানোর উপায় রাখবে না তোমরা। ঘষটে ঘষটে ক্লাসে ওঠে, কোনদিন ফেল করবে। তুমি একটা ইস্কুলের হেডমাস্টার না? তোমার সম্মানটাই বা কোথায় থাকবে?”

বাবা পাত্তাই দিত না।

“ও এক আধবার ফেল করলে কিচ্ছু এসে যায় না। বড় বড় গোলকিপাররা কেউ পণ্ডিত লোক ছিল না। আর হলেও সেসব কেউ মনে রাখে না। লেভ ইয়াশিন কোন পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছিল কিনা কেউ জানে? গর্ডন ব্যাঙ্কস যদি পি এইচ ডি ও হত, কী এসে যেত তাতে? আমাদের থঙ্গরাজ কি মহাপণ্ডিত? তারপর ধর শিবাজী ব্যানার্জি। সে তো বড় চাকরি করে। কিন্তু শুধু সেইটে হলে কে চিনত তাকে? কিন্তু এত গোল বাঁচিয়েছে, যে ভোলবার জো নেই।”

“তুমিই কানের কাছে বড় বড় নাম করে ছেলেটার মাথা খাচ্ছ। অত বড় কি সবাই হয় নাকি? ওর দ্বারা কদ্দূর কী হবে কে বলতে পারে? কিছুই যদি না হয় তখন খাবে কী? ভদ্দরলোকের ছেলে রিকশাও তো টানতে পারবে না।”

“আরে বাবা, তোমার ছেলেও অনেক বড় হবে। আমি নিজে না খেললেও কম তো দেখিনি আর পড়িনি। আমার ভুল হয় না। আচ্ছা আমি নয় ফালতু লোক। কিন্তু বিভূতি ঘোষ? মস্ত লোক। সে তোমার ছেলেকে নিজে ডেকে নিয়েছে।”

“হ্যাঁ, বিভূতি ঘোষের তো দিব্যদৃষ্টি আছে…”

“তার চেয়েও বেশি। কত ফুটবলারকে লোকটা নিজে হাতে তৈরি করেছে তা জান? আর নিজে কত বড় ফুটবলার ছিল তাও যদি জানতে। রেলের গোলে যখন খেলতেন তোমাদের ঘটিদের দলের সব বড় বড় স্ট্রাইকার মাথা ঠুকে মরত। জিজ্ঞেস করে দেখো না, তোমার বড়দা, মেজদাকে। তেনারা না বললে তো আবার তোমার বিশ্বাস হয় না।”

বিভূতি ঘোষের কোচিংয়ে নীলাঞ্জন ততদিনে বুঝে গেছে যে ও সত্যিই অনেক বড় গোলকিপার হতে পারে। ওঁর কাছে প্র্যাকটিস করতে যাওয়ার এক বছরের মধ্যে ওঁর ক্লাবের এক নম্বর গোলকিপার হয়ে গেছে ও। বয়স তখন মোটে সতেরো। আগের বছর মাধ্যমিকটা সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করায় মা বলল “বাপের বাড়ি যাওয়ার আর মুখ রইল না আমার।” মামারা বাড়ি বয়ে বলে গেল “দিনকাল তো ভাল নয়, এই রেজাল্ট নিয়ে কী করবে তোর ছেলে? দ্যাখ যদি শিবরামদার কোন ছাত্র টাত্রর দোকানে কাজে ঢুকিয়ে দিতে পারিস।”

নীলাঞ্জনের এমন গা পিত্তি জ্বলছিল যে ভেবেছিল মাঠে শেখা সব খিস্তি উজাড় করে দেবে। সেই ভয়েই বাবা ওকে ঠেলেমেলে দোতলায় পাঠিয়ে দিয়েছিল। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে সিঁড়ির মুখে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ও শুনেছিল মামারা যা তা বলেই চলেছে আর বাবা মুখ বুজে শুনছে। শেষে শুধু একটাই কথা বলেছিল।

“নীলুর চাকরি নিয়ে কারোর ভাবনাচিন্তা করার দরকার নেই। ওর খেলাই ওর চাকরি জুটিয়ে দেবে। আপনারা পনেরো কুড়ি বছর হল মাঠের ধারেকাছে যান না তো। জানবেন কোত্থেকে?”

তাতে মামারা খুব চোটপাট করে বিদেয় হয়েছিল। বাবা উপরের ঘরে এসে ফিক করে হেসে বলেছিল “শালা কি আর এমনি বলে? তুই যেদিন ইস্টবেঙ্গলকে লিগটা জেতাবি সেইদিন বাড়িতে ডেকে ইলিশের তেল খাওয়াব, ঝোল খাওয়াব, ঝাল খাওয়াব। তারপর বলব ‘দ্যাখ শালারা, বলেছিলিস না এ ছেলের কিস্যু হবে না?’”

“কি গো? ছেলেটা তখন থেকে বলছে পায়খানায় যাবে, তোমার কানে কথা যাচ্ছে না?” শ্রাবণীর ধমকে চমকে ওঠে নীলাঞ্জন। তাড়াতাড়ি ছেলের প্যান্টটা খুলিয়ে বাথরুমে দৌড়য়। রান্নাঘর থেকে শ্রাবণী গজগজ করে “রুদ্রদা ঠিকই বলেছিল। তোমার মাথাটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

গত এক দেড় বছরে এই কথাটা এতবার শুনতে হয়েছে এতজনের মুখে যে মাথাটা ঝট করে গরম হয়ে যায় নীলাঞ্জনের। “হ্যাঁ, আমারই তো মাথা খারাপ। তোমরা সকলে তো সুস্থ লোক। তাই জন্যে তো সবাই মিলে আমার খেলাটা ছাড়িয়েছিলে। কতকগুলো অশিক্ষিতর পাল্লায় পড়ে… আজকে খেলায় থাকলে আমার গাড়ি, বাড়ি সব হত। দিনরাত এটা নেই ওটা নেই বলে খোঁটা দেওয়া বার করে দিতাম। তর সইল না কারোর। তক্ষুণি চাকরি করতে হবে। শা…”

“অ্যাই অ্যাই, খবরদার। ছেলেমেয়ের সামনে মুখ খারাপ করবে না,” শ্রাবণী রান্নাঘর থেকে খুন্তি উঁচিয়ে ছুটে আসে। নীলাঞ্জনের মা ঘর থেকে চিৎকার করে “আমাদের তর সইছিল না, না তোমারই তর সইছিল না? শ্রাবণীকে বিয়ে করার জন্যে কে ক্ষেপে উঠেছিল? আমি?”

“বাঃ! আমি জানতাম আমারই দোষ হবে শেষ অব্দি। দিতেন না বিয়ে। আমি কি পায়ে ধরেছিলাম? অনেক ভাল ভাল সম্বন্ধ আসত আমার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার — কী না।”

রাগের চোটে ছেলেটাকে কমোডে বসিয়ে রেখেই জলভর্তি বালতিটা লাথি মেরে ফেলে দিয়ে বাথরুম থেকে ছাদে চলে যায় নীলাঞ্জন। মা আর বউ দুজনে সুর সপ্তমে চড়িয়ে দেয়। অঙ্ক ফেলে নীলাঞ্জনের পিছু পিছু দৌড়য় মেয়েটা। সেদিন পূর্ণিমা। ছাদে গিয়ে আলসেয় হেলান দিয়ে বসে ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে নীলাঞ্জন। মেয়েটা ভয়ে ভয়ে পাশে এসে বসে। “বাবা, রাগ কোর না। বাবা!” জ্যোৎস্নায় মেয়েটার মুখ দেখে রাগ পড়ে আসে। বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়ে সাহস পেয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এইভাবে নীলুর বাবা হাত বুলিয়ে দিতেন, হারা ম্যাচের পরে।
শ্রাবণীর সেই জামাইবাবু ঠিকই বুঝেছিলেন যে এ দেশের শতকরা পঁচানব্বইটা লোকের মতই নীলাঞ্জন মনের ডাক্তার দেখানোর পরামর্শটার মানে বুঝবে তাকে পাগল বলা হল। তাই আলাদা করে শালীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে মানসিক রোগী মানেই উন্মাদ নয়, তবে নীলাঞ্জনের যেটা হয়েছে সেটার চিকিৎসা না করালে ফলাফল মারাত্মক হবে। শ্রাবণী নিমরাজি হয়েছিল, কারণ তার মনে হয়েছিল ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়। নীলু মানুষটা বরাবরই তো একটু রগচটা। বিয়ের আগের থেকেই শ্রাবণী তা জানে। তবু জামাইবাবুর কথায় সে ডাক্তার দেখাতে তৈরি ছিল। কিন্তু শাশুড়ি একেবারে হাঁকড়ে দিলেন। তাঁর ছেলের অনেক দোষ আছে ঠিকই, তা বলে তাকে পাগল ঠাওরাবে ছেলের শ্বশুরবাড়ির লোক এটা তিনি মেনে নেন কী করে? “আমার ছেলে লেখাপড়া বেশিদূর করেনি, আমিও গোমুখ্যু। বিপদের সময় তোর বাবা আমায় সাহায্য করেছিলেন বলে আমি চিরঋণী, সেও ঠিক। তা বলে এইভাবে তোরা আমাদের অপমান করতে পারিস না, শ্যামু। ভগবান আছেন,” ইত্যাদি বলে তিনি বাড়িতে মহা অশান্তি লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আর কার সাধ্য নীলুকে ডাক্তার দেখায়?

ফুটবল ছেড়ে দিতে হওয়ার জন্যে যেদিন মা আর বউ মিলে নীলাঞ্জনকেই দায়ী করেছিল, সেদিন ওর মুখে কথা যোগায়নি। কারণ ঠিক কোন ঘটনার জন্যে শেষ অব্দি ওকে খেলা ছেড়ে দিতে হয়েছিল সেকথা ঠিক করে মনেই পড়ছিল না। পড়ল একদিন দোকানে বসে থাকতে থাকতে।
সবুজগ্রামের সবচেয়ে পুরনো কম্পিউটারের দোকানটার মালিক শিবরামবাবুর এক সময়ের ছাত্র রঘু সেন। শুরু করেছিল অল্প পুঁজিতে ছোট্ট দোকান দিয়ে। বছর পাঁচেক আগে যখন রেললাইনের ওপারে বড়িহাটায় সুপার মার্কেট তৈরি হল তখন তার দোতলায় ‘সেন’স আই টি শপ’ বলে বিশাল দোকান করে বসেছে। সেই ছোট দোকানের আমল থেকেই নীলাঞ্জন ওর কর্মচারী। হেড স্যারের অনেক প্রকাশ্য ও গোপনীয় অবদান রঘুর জীবনে, তাছাড়া নীলু পরিশ্রমী ছেলে। তাই ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিজের ডান হাত করে নিয়েছিল রঘু। ইদানীং অবশ্য নীলুর হঠাৎ হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ রঘুকে একটু চিন্তায় রেখেছে।

সেদিন প্রচন্ড গরম, সন্ধ্যের পরেও খদ্দের টদ্দের বেশি নেই। দোকানের এ সি তে বেশ আরামেই চুপচাপ বসেছিল নীলাঞ্জন। পাশেই একটা কম্পিউটারে দুটো অল্পবয়সী কর্মচারী মিলে ইউটিউবে মারাদোনার খেলার ভিডিও দেখছিল। এসে পড়ল সেই সাতজনকে কাটিয়ে গোল দেয়ার দৃশ্য। ওটা যতবার দেখেছে ততবার শিল্টনের জন্যে বড় কষ্ট হয়েছে নীলাঞ্জনের। লোকটা আগের গোলটা দিয়ে গেল হাত দিয়ে, রেফারিটা দেখলই না! তখনই লাল কার্ডটা দেখিয়ে দিলে তো আর দ্বিতীয় গোলটা হয় না। শিল্টনের আর কী করার ছিল? একটা লোকের পায়ে যদি বলটা আঠার মত লেগে থাকে তো গোলকিপার কী করবে? অথচ লোকে চিরকাল বলবে “শিল্টন দু গোল খেয়েছিল।” সেদিন দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে এল।

তখনো আলো ফোটেনি। সারারাত পাঁচটার অ্যালার্মের জন্যে কান খাড়া করে থাকতে থাকতে একটু ঘুম এসেছিল। ভেঙে গেল মায়ের ডাকে। “নীলু, ও নীলু! শিগগির ওঠ বাবা। দ্যাখ তোর বাবা কিরকম করছে!” নীলাঞ্জন দৌড়ে গিয়ে দ্যাখে বাবা কেমন গোঁ গোঁ শব্দ করছে। ডাকতে বুঝতে পারল বলেও মনে হল না। দুটো বাড়ি পরেই মিহির ডাক্তার থাকে। নীলাঞ্জন হাঁকাহাঁকি করে ডেকে আনল। ততক্ষণে সব শেষ।

সেদিন সাতটার মধ্যে এরিয়ান্স মাঠে পৌঁছনোর কথা। বিভূতিদা থাকবেন। এরিয়ান্স কোচ বিভূতিদার সাথে দীর্ঘদিন খেলেছেন। নিজে ট্রায়াল নেবেন নীলাঞ্জনের। পছন্দ হলেই এই মরসুমে কলকাতা লিগে কুড়ি বছরের নীলাঞ্জন গাঙ্গুলি। ওদের এক নম্বর গোলকিপার এবারে মোহনবাগানে সই করেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর উপর কোচের ভরসা নেই বিশেষ। দলে নিলে খেলাবেনই। বাবা বলে দিয়েছে, ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে এরিয়ান্সকে সমর্থন করবে না। গোলের নীচে নীলু থাকলেও না। বিভূতি ঘোষ নটা নাগাদ এরিয়ান্স মাঠ থেকে সোজা শ্মশানে এলেন।
দু তিনদিন পরে বাড়িতেও এসেছিলেন। এক ফাঁকে নীলাঞ্জন আর ওর মাকে আলাদা করে নিয়ে বোঝালেন, অনেক কষ্টে এরিয়ান্সকে আটকে রেখেছেন। ওকে একদিন গিয়ে ট্রায়ালটা দিয়ে আসতেই হবে। নইলে ওরা অন্য কাউকে নিয়ে নেবে এবার। মা কিছুতেই বুঝল না। বলল “নীলুর দিদির পাত্র ঠিক করে গেছেন ওর বাবা। অঘ্রাণেই বিয়ে। ওনারা এক বছর পেছোতে পারবেন না বলে দিয়েছেন, আমাদের কন্যাদায় তাই মেনে নিয়েছি। যোগাড়যন্ত্র কী করে কী হবে সেসব ছেলে হিসেবে নীলুর দায়িত্ব। বিয়েটা মিটলে ও যেখানে ইচ্ছে খেলে বেড়াক আমি কিচ্ছু বলব না।”

যাবার সময় বিভূতিদা পিঠ চাপড়ে বলে গেলেন “কুছ পরোয়া নেই। কলকাতায় পরের সিজনে খেলবি। এদিককার ঝামেলাগুলো মিটিয়ে নে। যদ্দিন প্র্যাকটিসে আসতে না পারিস নিজে প্র্যাকটিসটা করিস। আর ফিটনেসটা যেন থাকে। ফোন করিস আমায়।”

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মামাদের দেখা গেল খুবই টানাটানির সংসার। ভাগ্নির বিয়ের খরচ উঠতেই চায় না। শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে নীলাঞ্জনের মা গেলেন শ্রাবণীর বাবার কাছে। বছর তিনেক হল গোটা সবুজগ্রাম জানে তাদের অতনুর হবু গিন্নী হচ্ছে শিবরামবাবুর স্কুলের সেক্রেটারি গণেশ মুখার্জির মেয়ে শ্রাবণী। বাবা-মায়েদের আপত্তি নেই। পাকে পড়লে হবু কুটুমের কাছেও হাত পাতে মানুষ। নীলুর খুব রাগ হয়েছিল কিন্তু দিদির বিয়ে বাতিল হয়ে যায় যে। শেষ অব্দি শ্রাবণীর বাবাই উদ্ধার করলেন ধার দিয়ে। তিনি অবশ্য বলেছিলেন ওটা আগাম যৌতুক, ফেরত দেয়ার দরকার নেই। শুধু ওদের মেলামেশা নিয়ে লোকে নানা কথা বলে। তাই পরের বছরেই নীলু-শ্যামুর বিয়েটাও তিনি দিয়ে দিতে চান।

এভাবে গোল খাওয়া হজম হয়নি অতনুর। তাই পণ করেছিল যত তাড়াতাড়ি পারে শ্বশুরের পাইপয়সা চুকিয়ে দেবে। পারতে গেলে একটা চাকরি লাগে। যা পাওয়া যায়। পি ডিভিশনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ ছেলেকে কে আর কী বড় চাকরি দেবে? তখন দেবদূতের মত কাজটা দিল রঘুদা। বিয়ের আগেই চাকরিতে ঢুকে গেল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এইসব তালেগোলে এরিয়ান্সে ট্রায়ালটা দিতে যাওয়া হয়নি আর।

খেয়াল হতেই লাফ দিয়ে উঠে পড়ল নীলাঞ্জন। নাঃ, আর অপেক্ষা করা যাবে না। এখনই চলে যাওয়া ভাল। কোণে রাখা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে হনহনিয়ে হাঁটা দিল। পেছন থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করল “নীলুদা, বাড়ি চললে?” ও দৌড়তে দৌড়তেই উত্তর দিল “মাঠে, মাঠে।”

খাবার টেবিলে ওর জন্যে অপেক্ষা করে করে নীলাঞ্জনের মেয়ে আর বউ ঘুমিয়েই পড়ল।

অলঙ্করণ: চন্দ্রা সরকার, দেবজ্যোতি পাত্র

প্রকাশ: আমার কাগজ, শারদীয়া ১৪২৫

Advertisements

অগম পারে

অস্থি ভাসানো হয়ে গেছে, বাবুন পেছন ফিরে ঘট ভেঙে শ্মশান থেকে বেরিয়ে এসেছে, সঙ্গে আমরা সবাই। ম্যাটাডোরে উঠতে গিয়ে খেয়াল হল মন্টুকাকু আর রঞ্জনদা নেই। সবাই মিলে নাম ধরে ডাকাডাকি করছি, এদিক ওদিক দেখছি, কোন পাত্তা নেই দুজনের। গেল কোথায়?

রন্টুজেঠু শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং মন্টুকাকুর দাদা। খুব বিরক্ত হয়ে বলেই ফেলল “এরা এখনো শান্তিতে থাকতে দেবে না।” তারপর ম্যাটাডোরে উঠে পড়ে অল্পবয়সীদের বলল “দ্যাখ দ্যাখ, খুঁজে দ্যাখ কোনদিকে গেল। দুজনে যে একই জায়গায় আছে তাও তো নয়। জ্বালাতন!”

আমরা শ্মশানের এপাশ ওপাশ দেখতে শুরু করলাম। রঞ্জনদা আর মন্টুকাকু যে এক জায়গায় থাকতেই পারে না সে কথা আমরা সকলেই জানতাম। এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে গত বিশ পঁচিশ বছরে। তার আগে বরং উল্টোটাই সত্যি ছিল। দুজনকে কখনো আলাদা দেখা যেত না। সম্পর্কে ওরা মামা-ভাগ্নে হলেও সমবয়স্ক এবং ছোট থেকে গলায় গলায় বন্ধু। সেই বন্ধুত্ব ওদের থাকল না। বলে কয়ে আড়ি হয়নি, এমনকি কোন ঝগড়াই হয়নি। একটু একটু করে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল। এর জন্যে সবাই যাকে দোষ দেয় সে আজ চলে গেল — মীরা বৌদি। মানে রঞ্জনদার বউ।

রঞ্জনদা আমার ঠিক কিরকম দাদা সেটা হয়তো আমার দাদু-ঠাকুমা বেঁচে থাকলে বলতে পারত। আমার বাবা-কাকারা কেউই ঠিকঠাক মনে করে বলতে পারে না। ওরা শুধু জানত রঞ্জনদার বাবা ওদের কোন একরকমের দাদা হয়। সেই কারণেই রঞ্জনদাও আমার দাদা। তবে আত্মীয়তা আছে সেটা বাড়িতে অনুষ্ঠানের নেমন্তন্নের তালিকা বানানোর সময়ে ছাড়া কোন পক্ষেরই মনে থাকত না। পাড়ার অন্য অনেক বাড়িতেই আমাদের আনাগোনা বেশি ছিল।

যেমন মন্টুকাকুদের বাড়ি। পাড়ায় ওদের বাড়িতে প্রথম রঙিন টিভি আর কেবল কানেকশন এসেছিল। তাই আমি আর বাবা খেলা দেখতে যেতাম রাতবিরেতেও। মন্টুকাকুর সাথে খেলা দেখার মজাই আলাদা। নিজে ভাল খেলত — ক্রিকেট, ফুটবল দুটোই। ওর বাবা মেরে ধরে খেলা ছাড়িয়েছিল, নইলে খেলোয়াড়ই হতে চেয়েছিল। এত খেলা দেখেছে আর খেলার বই পড়েছে যে দারুণ গল্প শুনতে শুনতে খেলা দেখা যেত। তাছাড়া রন্টুজেঠু আমাদের পাড়ার এক নম্বর পুরুতমশাই। “বেণীমাধব শীল ভুল করতে পারে, ওনার ভুল হয় না” — আমার মা বলে। সেই সুবাদেও আমাদের বাড়িতে ওনার যাতায়াত ছিল। ওনারা যখন রঞ্জনদার আত্মীয় তখন আমাদেরও আত্মীয় কিন্তু সে পরিচয়টার দরকার পড়েনি কখনো। আমি এমনিতেই মন্টুকাকুর ফ্যান ছিলাম বেশ বড় বয়স অব্দি। শেষপর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক আর জয়েন্টের পড়ার চাপ আমাকে মন্টুকাকুর লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করে।

ঘটনাচক্রে তার পরে পরেই আমার রঞ্জনদাদের বাড়ি যাওয়া আসা শুরু। মন্টুকাকুর ভক্ত হলেও ওর গলাগলি বন্ধুটিকে আমার দারুণ কিছু মনে হয়নি। ও সত্যিই খুব সাধারণ। আমি ভাবতাম কিসের এত মিল ওদের? নিয়মিত শরীরচর্চায় মন্টুকাকুর চেহারাটা সিনেমার নায়কদের মত; রঞ্জনদা সেখানে গোলগাল লাল্টু। খেলা বলতে ক্যারাম আর তাস। অবশ্য দুটোতেই মন্টুকাকু পার্টনার। মন্টুকাকুর শুধু চেহারাটাই নায়কোচিত নয়, আশেপাশের সব নাটক, যাত্রায় নায়কের চরিত্রে অভিনয়ও করত এবং রীতিমত ভাল করত। বয়স হওয়ায় এখন অন্য চরিত্র করে এবং সবসময়ই সকলের চেয়ে ভাল করে। রঞ্জনদা ওসবের ধার কাছ দিয়ে যায়নি কখনো। মন দিয়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের চাকরি করেছে শুধু।

ওদের বোধহয় একটা জায়গাতেই মিল ছিল। অন্ধ অমিতাভ ভক্তিতে। আমি যখন স্কুলের ছাত্র তখন দেখতাম চিত্রা হলে অমিতাভ বচ্চনের নতুন ছবি এলেই দুজনে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো দেখতে ছুটত, দরকার হলে অফিস কামাই করে। এখন হল ভেঙে মল হয়ে গেছে। তবুও ওদের রুটিন বদলায়নি। এখন কলকাতার কোন হলে যায়। একা। যাক সে কথা।

যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে বসে আছি রেজাল্টের অপেক্ষায় সেই সময়েই রঞ্জনদার বিয়ে হয়। যথারীতি বৌভাত খেতে গেছি, গিয়ে কনেকে একটা নমস্কার ঠুকতে হয়েছে। নিতান্ত অমনোযোগী চোখে যেটুকু দেখেছি তাতে মনে আছে একটা সাধারণ চেহারা। তবে বাঙালি মেয়েদের তুলনায় বেশ লম্বা। পাঁচ ফুট সাতের রঞ্জনদা পাশে দাঁড়াতে দেখলাম প্রায় মাথায় মাথায়। মা-কাকিমারা খেতে বসে আলোচনা করলেন “মুখখানা সুন্দর কিন্তু রংটা একটু চাপা। রঞ্জুর অমন গায়ের রং, তার পাশে যেন কেমন লাগছে।” কিন্তু মীরা বৌদি যে সাধারণ নয় সেটা বুঝতে পাড়ার কারোর বেশি সময় লাগল না।

রঞ্জনদা পাড়ার পুজোর সেক্রেটারি। ভোগ রান্নায় ওর মায়ের বড় ভূমিকা থাকত। ছেলের বিয়ের দিন থেকেই উনি সবাইকে বলে বেড়িয়েছেন “আমি এবার থেকে আর ওসবে যাব না। আমার বয়স হয়েছে, তাছাড়া বৌমা এসে গেছে। আমাদের বাড়ি থেকে এসব কাজ এবার ও-ই করবে।” কিন্তু মহালয়ার পর থেকে শোনা গেল এই নিয়ে বউ-শাশুড়িতে লেগে গেছে। বউ ভোগ রাঁধায় রাজি নয়, শাশুড়ি বলেছেন তিনি যখন সবাইকে বলে ফেলেছেন তখন করতেই হবে। আমাদের বাড়ির কাজের লোক, যে রঞ্জনদাদের বাড়িতেও কাজ করে, সে এসে বলল “কি মুখরা বউ রে, বাবা ! মুখের ওপর বলে দিল ‘আমি দুনিয়ার লোকের রান্না করার জন্যে বিয়ে করিনি। আপনি লোককে বলার সময় কি আমায় জিজ্ঞেস করে বলেছিলেন? আপনার ভাল লাগে আপনি করেন। আমারও ভাল লাগবে এমন কি কথা?'” পুজোর সময়ে দেখা গেল বৌমারই জিত হয়েছে, শাশুড়ির প্রতাপ ভোগে গেছে।

ততদিনে পাড়ার দোকানদার, রিকশাওয়ালা, সাইকেল আরোহী মাছওয়ালা — সকলেই মীরা বৌদিকে চিনে গেছে। ও বাড়ির বউরা কেউ তার আগে বাজার ঘাট করত না, মীরা বৌদি করে। সকলের সাথেই হেসে কথা বলে, রিকশাওয়ালাদের বউ ছেলেমেয়ের খোঁজ নেয় — এমন ভদ্রবাড়ির বউ আমাদের পাড়ায় কস্মিনকালে কেউ দ্যাখেনি। তাই প্রবীণদের কেউ কেউ আড়ালে নিন্দে করলেও বৌদি অল্প দিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। আমিও ফ্যান হয়ে গেছিলাম পুজো এসে পড়ার আগেই।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও সায়েন্স পড়ার খেসারত দিয়ে সেকেন্ড ডিভিশনে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছিলাম, জয়েন্ট ফেল। বাড়ির সকলে আমার “আর কিস্যু হবে না” ধরে নেওয়াতে কাছাকাছি এক কলেজে ইচ্ছামত বাংলা অনার্স নিয়ে ভর্তি হতে পেরেছি।

একদিন বাড়ি ফিরছি, বাসে অসম্ভব ভিড়। ব্যাগটা নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছি, শুনি লেডিস সিট থেকে কোন একজন “এই ছেলে, এই ছেলে” বলে ডাকছে। প্রথমে তাকাইনি অন্য কাউকে ডাকছে ভেবে। তারপর এক ভদ্রলোক বললেন “ভাই, তোমাকে ডাকছে।” তাকিয়ে দেখি — মীরা বৌদি। কুশল বিনিময়ের অবস্থাও তখন নেই চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে। আমার ব্যাগটা শুধু চেয়ে নিয়ে কোলের উপর রাখল।

আমার ধারণা ছিল আমাকে ঠিকমত চেনেই না। কিন্তু বাস থেকে নেমে রিকশায় বাড়ি অব্দি আসতে আসতে বুঝলাম নামটাই যা জানত না। আমাদের বাড়ি চেনে, আমার বাবা কে, কাকা কারা, বাবার দোকান কোনটা সেসব ঠোঁটস্থ। রিকশায় বসেই বৌদি জানল যে আমি বাংলায় অনার্স পড়ছি। জানতেই বলল “বাঃ! আমিও তো বাংলার ছাত্রী। এম এ কমপ্লিট করা হয়নি। চাকরিটা দরকার ছিল তো। অবশ্য চাকরি তো সেই ছেড়েই দিতে হল বিয়ের জন্যে। বি এ পরীক্ষায় কিন্তু আমি ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিলাম।”
শুনে আমি ভীষণ ঘাবড়ে গেলাম। এত ভাল ছাত্রী! আমি তো বিজ্ঞানের হাতে চড় খেয়ে সাহিত্যের ঘরে সেঁধোবার চেষ্টা করা ওঁচা ছেলে। বৌদি আমার মুখ দেখে বোধহয় বুঝল কিছু।

“তুমি না, মাঝে মাঝে চলে এসো আমার কাছে। তোমার বইপত্র উল্টে পাল্টে আমার একটু মনের ক্ষিদে মিটবে। অবশ্য তোমার তাতে কোন লাভ হবে কিনা জানি না।”

আমার তো লাভই লাভ। আমার কাছে তখন পর্যন্ত সাহিত্য মানে গল্পের বই ছাড়া কিছুই নয়। ছোট থেকে প্রচুর গল্পের বই পড়তাম তাই ভেবেছিলাম সাহিত্য পড়তে অসুবিধা হবে না। ব্যাপার যে অত সোজা নয় কে জানত? আমার চোদ্দপুরুষে কেউ ওসব নিয়ে পড়াশোনা করেনি। ফলে আমি তখন অনার্স ক্লাসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখি এক একজন কিভাবে প্রশ্ন করে, তর্ক করে অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের সাথে। প্রাইভেট পড়তে গিয়েও মুখ খুলি না বোকা বোকা কথা বলে ফেলার ভয়ে। ফলে যা বুঝি না তা না বোঝাই থেকে যায়, ভাবি মুখস্থ করে নেব। এই অবস্থায় একজন ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া মানুষের কাছে অবাধ প্রবেশাধিকার পাওয়া তো হাতে চাঁদ পাওয়া।

সেই আমার মীরা বৌদির সাথে বন্ধুত্বের শুরু। শিগগির তুই তোকারির সম্পর্ক হয়ে গেল। আমার চেয়ে তো এমন কিছু বড় নয়। কলেজে কী শিখেছিলাম মনে নেই, প্রাইভেটের স্যার যা নোটে লিখিয়েছিলেন তাও পরীক্ষার খাতাতেই উগরে এসে ভুলে গেছি। যা আজও মনে আছে তা হল বৌদির সাথে পড়া জিনিসগুলো।

“বুকের ভেতর কিছুটা পাথর থাকা ভাল। ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়”। এই কবিতাটা আমাকে প্রথম পড়িয়েছিল বৌদিই। তখন শীত শেষ, আমগাছে বউল ধরছে। দোতলার বারান্দায় বসে এই কবিতাটা পড়তে পড়তে হঠাৎ বলেছিল “তোর দাদা মানুষটা বড় ভাল। কিন্তু প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় না।”

তখন ওদের বিয়ের বছর দুয়েক হয়ে গেছে আর আমি মন্টুকাকুর ফ্যান থেকে মীরা বৌদির চ্যালা হয়ে গেছি। আমার পিছু পিছু ওবাড়ি যেতে যেতে পাড়ার আরো কিছু ছেলেমেয়েও তখন বৌদি বললে ট্রামের নীচে প্রাণ দিতে প্রস্তুত।

তা সেবার পুজোর আগে বৌদি আমায় বলল “তোর কেবল বইপড়া বিদ্যে হচ্ছে। প্র্যাকটিকাল ক্লাস দরকার।” বাংলা অনার্সের আবার প্র্যাকটিকাল হয় এ আমি কোথাও শুনিনি। সেকথা বলতে বৌদি বলল “আমাদের শান্তিনিকেতনে হয়। এখানেও চাইলেই হয়।” আমাদের ভারী কৌতূহল হল ব্যাপারটা কেমন দেখবার। বৌদি সেই সুযোগে আমাদের দিয়ে করিয়ে নিল একখানা নাটক — রথের রশি।

অষ্টমীর সন্ধ্যায় সেই নাটকে পাড়ার সকলে মুগ্ধ। কিন্তু ওটা হয়ে উঠত না মন্টুকাকুর জোরালো সাহায্য ছাড়া। রঞ্জনদা আমল দেয় না বলে বৌদির খোলামেলা জীবনযাপন নিয়ে অভিযোগ করা ওর শাশুড়ি ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ির বউ রাত দশটা অব্দি ক্লাবে অল্পবয়সী ছেলেদের নাটকের রিহার্সাল করাবে সেটা আর ওনার সহ্য হল না। সেই প্রথম দেখা গেল রঞ্জনদাও আপত্তি করছে। পুজোর সময় নাটক করার কী দরকার তা সে বুঝে পাচ্ছিল না। মন্টুকাকু প্রথমে তাকে বোঝাল যে পুজোমণ্ডপে নাটক-ফাটক হলে বেশি লোক দেখতে আসবে। তারপর বাড়ির বউয়ের রাত অব্দি রিহার্সালকে নিষ্কলঙ্ক রাখতে নিজে রোজ শেষপর্যন্ত উপস্থিত থাকা শুরু করল।

নাটকটা হয়ে যাওয়ার পরে অবশ্য সকলে এত প্রশংসা করল যে রঞ্জনদাও বুক ফুলিয়েই সকলকে বলতে লাগল “আমার বউই তো সব শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছে।”

আমাদের লোভ লেগে গেল। আমি তো প্রায় বৌদির প্রেমেই পড়ে গেলাম। বৌদি কেমন গান করে তা আমার জানা ছিল। রঞ্জনদাদের বাড়ির ছাদে বসে এপ্রিলের সন্ধ্যায় ও আমায় শুনিয়েছে “আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে”। কখনো হয়ত রঞ্জনদার জন্য অমলেট বানাতে বানাতে গুনগুনিয়ে উঠেছে “যদি কিছু আমারে শুধাও।” আমি ডাইনিং টেবিলে বসে অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাতা উল্টোতে উল্টোতে বলেছি “জোরে। একটু জোরে হোক।” এই নাটক করতে গিয়ে দেখলাম বৌদি কি দারুণ অভিনয় করে। একসময় তো আমরা জেদ ধরেছিলাম ওকেও অভিনয় করতে হবে। বৌদি কিছুতেই রাজি হল না। বলল “এটা তোদের নাটক, তোরাই কর। আমি পরে কখনো করব বড়দের সঙ্গে।” একটা মেয়ে বলেছিল যে বৌদি আমাদের কারো চেয়ে বছর আষ্টেকের বেশি বড় নয়। তাতে বৌদি হেসে বলেছিল “আমি তোদের কারো বৌদি, কারো কাকিমা। শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকতে আমার আপত্তি আছে, ভাই।”

যা-ই হোক বৌদির অভিনয় প্রতিভা এমন একজনের চোখে পড়েছিল যে পাড়ার যাত্রা ক্লাবের পান্ডা। মন্টুকাকুর কথা বলছি। পরের বছর যখন ঐ ক্লাব উৎপল দত্তের ‘সন্ন্যাসীর তরবারি’ করবে ঠিক হল, তখন কাকু হিসাবরক্ষক রঞ্জনদাকে বলে “এবারে আমাদের একটা ফিমেলের খরচ বেঁচে যাবে, বুঝলি? দেবী চৌধুরানীর পার্টটা তোর বউকে দিয়ে করাব।”

“মীরা? ও পারবে নাকি?”

“পারবে কি রে! ওর মত কোন পেশাদার ফিমেলও পারবে না। আমি তো ওদের রিহার্সালে থেকেছি রোজ। ও অভিনয়টা জানে। শিক্ষিত অভিনেত্রী যাকে বলে। আমরা যাদের পয়সা দিয়ে আনি তারা ঐ করতে করতে যেটুকু শিখেছে আর কি। ট্রেনিং বলতে যা বোঝায় সেটা নেই।”

রঞ্জনদার মুখ ভার দেখে মন্টুকাকু জিজ্ঞেস করেছিল “তোর কি আপত্তি আছে নাকি?”

মন্টুকাকুর কথায় আপত্তি করার সাহস রঞ্জনদার সেসময় ছিল না। সেই যাত্রায় দেবী চৌধুরানীর চরিত্রে যাকে মঞ্চের উপর দেখলাম সে যেন কোন রানী; আমার মীরা বৌদি নয়। রামানন্দ গিরির চরিত্রে মন্টুকাকু যথারীতি দারুণ করেছিল। পাড়ার সবচেয়ে নিন্দুক জেঠিমারাও নাটক দেখে উঠে বললেন “রঞ্জনের বউটা সত্যিই অসাধারণ।”

পরের বারও একটা রোল বৌদির জন্য বাঁধা ছিল। কিন্তু বাবুন তখন হব হব। তবে অষ্টমীর ফাংশানের জন্য বাড়িতে ডেকে ‘শাপমোচন’ করিয়ে দিয়েছিল পাড়ার মেয়েদের। আমার বোন ছিল সে দলে। বাড়ি এসে বলত, যতক্ষণ রিহার্সাল চলত নীচ থেকে বৌদির শাশুড়ির গলা শোনা যেত “এইসময় ধেই ধেই করে নাচতে কাউকে দেখিনি, বাবা। সর্বনাশ হবে, এ মেয়ের সর্বনাশ হবে… বড়দের কথা শোনা মেয়ের কুষ্ঠিতে লেখা নেই… শান্তিনিকেতনে পড়েছে উদ্ধার করেছে। আমরা তো সব ক অক্ষর গোমাংস… কিচ্ছু বলছি না, মুখ বুজে সব সহ্য করছি। আমার বংশধরের যদি কিছু হয়, ওরই একদিন কি আমারই একদিন” ইত্যাদি।
সর্বনাশ বলতে যদি ভ্রূণ বা মায়ের মৃত্যু হয় তাহলে শাশুড়ির আশঙ্কা সত্যি হয়নি বলতে হবে। বাবুন যথাসময়ে বেশ গাঁট্টাগোঁট্টা হয়েই জন্মেছিল, সিজার পর্যন্ত করতে হয়নি।

বাবুনের জন্মের পর থেকে ওকে নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বৌদি যে আমাকেও সময় দিতে পারত না। পাড়ার ছেলেমেয়েরাও নিজে নিজে অনুষ্ঠান করা শিখে ফেলল। আগেকার মত গান শোনা, বই পড়া, আড্ডা দেওয়া আর হত না, তবু আমি মাঝে মাঝে যেতাম। বাবুনও ওর মায়ের মত আমাকে বেশ পছন্দ করত। ওর যখন বছর তিনেক বয়স তখন মন্টুকাকু একদিন আমার সামনেই এসে বলল “মীরা, ছেলে তো একটু বড় হয়েছে। এবারের যাত্রাটা তাহলে করো না।”

বৌদির চোখের ঝিলিক আমার নজর এড়ায়নি কিন্তু ও কিছু বলার আগেই রঞ্জনদা লুচি আলুর দমের ঢেঁকুর তুলে বলল “ছেলের মা হয়ে গেছে। এখন আর ওসব মানায়?”

মন্টুকাকু জবাব দিল “ঠিক মানাবে। হয়ত একটু বেশি রিহার্সাল দিতে হবে। অনেকদিন অভ্যেস নেই বলে।”

“যা শিখেছিলাম সাঁতার শেখার মত শিখেছিলাম, মামা। দশবছর স্টেজে না উঠলেও ভুলব না”, বাবুনকে খাওয়াতে খাওয়াতে বৌদি শুনিয়ে দিল।
মন্টুকাকু দেখলাম দারুণ খুশি কিন্তু রঞ্জনদার মুখটা হাঁড়ি। ক্ষীণ কন্ঠে বলল “আচ্ছা দ্যাখো কোন মা, জেঠিমার রোল টোল থাকলে করবে না হয়।”

মন্টুকাকু হো হো করে হাসতে থাকে।

“তিরিশ বছর বয়সে মা, জেঠিমার রোল করবে কি রে? ও আমাদের হিরোইন হবে।”

রঞ্জনদা বেশ কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে “হিরোটা কে? তুই?”

“হ্যাঁ, আমি। কেন? তোর কি ধারণা আমি তোর বউকে নিয়ে পালিয়ে যাব?” মন্টুকাকু আরো জোরে হাসতে হাসতে বলে।

আমিও তখন হাসছি।

বৌদি রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বলে “পালাতে হলে আমার বরের সাহায্য লাগবে, মামা। আপনার ক্যাশবাক্স তো ওর জিম্মায়।”

রঞ্জনদাও হাসল, যেন অনিচ্ছায়। সেবারের যাত্রায় বৌদি নায়িকার চরিত্রই করল। কে বলবে অনেকদিন পরে করল?

তখন আমি সদ্য এম এ ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। বৌদির আশীর্বাদে আমিও বি এ তে ফার্স্ট ক্লাস। বাংলায় এম এ র ফর্ম তুলে বেড়াচ্ছিলাম, বৌদি একদিন হঠাৎ আমায় বলে “একটু অন্যরকম করে ভাব না। তুই তো পড়তে ভালবাসিস। শুধু বাংলা সাহিত্য পড়েই খুশি থাকবি? যাদবপুরে যা। কম্পেয়ারেটিভ লিটারেচার পড়।”

তখন অব্দি বৌদির কথা আমার কাছে বেদবাক্য। ভর্তি হয়ে গেলাম। ক্লাস তো ভাল লাগলই, এক ক্লাসমেটকেও ভাল লেগে গেল। অনেকটা সময় কাটতে লাগল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে। বৌদির কাছে আর যাওয়াই হয় না। মাসখানেক পরে একদিন যাওয়ার সময় পেলাম।

গিয়ে দেখি বৌদির মুখ ভার। গম্ভীর আগেও দেখেছি, অমনটা দেখিনি। আমাকে দেখে কষ্ট করে হলেও বৌদি একটু হাসেনি এমন আগে কখনো হয়নি। মনের প্রশ্ন মনে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ বসে বসে বাবুনের সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে হল। তারপর ওর ঠাকুমা কোন কারণে ওকে ডেকে নিলেন একতলায়। তখন জিজ্ঞেস করলাম “কী হয়েছে রে, বৌদি?”

কেমন ক্ষেপে উঠল।

“শুনে আসিসনি বাড়ি থেকে? রাস্তাঘাটে শুনিসনি?”

“কী শুনব?”

“ঠাট্টা করছিস?”

“আমি কিচ্ছু জানি না। বিশ্বাস কর।”

অদ্ভুতভাবে এরপর বেশ কয়েক মিনিট বৌদি চুপ করে রইল। ভাবছি আমারই কোন দোষ হয়েছে কিনা। আর কি কথাই বলবে না? আমার কি চলে যাওয়া উচিৎ?

“বাবুনের বাবা চলে গেছে।”

নীরবতা ভাঙবে এমন একটা কথায়, আমার ধারণা ছিল না। কথাটার কোন মানেই বুঝলাম না।

“কোথায় গেছে?”

“ট্রান্সফার নিয়ে মাদ্রাজ চলে গেছে।”

“ও। তোরা কবে যাচ্ছিস?”

“গাধা! আমার সাথে থাকবে না বলেই তো গেছে।”

মনে হল চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে চীনের কোন শহরের রাস্তায় আমাকে ছেড়ে দিয়েছে কেউ। চীনা ভাষায় খুব জরুরী কথাবার্তা বলা হচ্ছে কিন্তু ভাষাটা জানি না বলে কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার অবস্থা দেখে হো হো করে হাসতে লাগল বৌদি। “আশেপাশে কী হচ্ছে কিছুই খবর রাখিস না দেখছি। যাদবপুরে প্রেম ট্রেম করছিস নিশ্চয়ই?”

আমার রাঙা হওয়া দেখে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে বৌদি খুব নিরুত্তাপ গলায় আমাকে বোঝাল যে রঞ্জনদার আপত্তি সত্ত্বেও যাত্রা করার শাস্তি হিসাবে তিনি বউবাচ্চাকে ফেলে মাদ্রাজে বসবাস শুরু করেছেন, বলে গেছেন কর্তব্যে গাফিলতি হবে না এবং ছুটিছাটায় আসবেন।

“যাত্রা! এ পাড়ার মেয়েরা তো অভিনয়-টভিনয় করেই। আমার পিসিরাও তো করেছে বিয়ের আগে।”

আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম।

“হুম। বিয়ের আগে।”

শুধু বিয়ে হয়ে গেছে বলেই পাড়ার যাত্রায় নায়িকা সাজা এত বড় অপরাধ হতে পারে, ১৯৯৫এ দাঁড়িয়ে আমার একথা বিশ্বাস হয়নি। বৌদি আসল কারণটা বলল তারপর।

“আসলে ও সে জন্যে যায়নি। ওর ধারণা আমি অন্য একজনের সাথে প্রেম করি।”

কথাটা শেষ না হতেই সব অস্পষ্টতা কেটে গেল। মন্টুকাকু! মন্টুকাকুর সাথে মীরা বৌদির প্রেম! সত্যিই তো। কিরকম বুদ্বুদের মধ্যে বাস করি আমি! সেই ‘রথের রশি’ র সময় থেকেই তো মন্টুকাকু বৌদির পাশে সবসময়। বৌদিকে যাত্রায় নামানোর জন্যেও তো সে-ই পীড়াপীড়ি করেছিল। মা-ও যেন এ বারে যাত্রা দেখে এসে কিসব বলছিল জেঠিমাকে? “পরপুরুষ” আর “ঢলাঢলি” শব্দ দুটো মনে পড়ল। আমি ওসবে কান দিইনি কারণ আমি অভিনয়কে অভিনয় হিসাবে দেখতে জানি। কিন্তু রঞ্জনদার কেন মনে হল ওদের মধ্যে সম্পর্ক আছে? তাহলে কি আমিই ভুল?

“মন্টুকাকু আর রঞ্জনদা তো খুব বন্ধু। রঞ্জনদা তাও এরকম ভাবল কেন?”

প্রশ্নটা করেই ফেললাম। বৌদি উঠে চলে গেল, যাওয়ার আগে বলে গেল “সেটা রঞ্জনদাকেই জিজ্ঞেস করা উচিৎ। বউ বলে সে কিসে কী ভাবছে না ভাবছে সব জেনে রাখার দায়িত্ব আমার নাকি? আর সে যখন আমায় স্ত্রী বলে ভাবতে চায় না, আমিও তাকে স্বামী বলে ভাবতে বাধ্য নই।”

আমার যে প্রশ্নটা করা উচিৎ হয়নি সেকথা তখন আমার মনে হয়নি, তবে বুঝেছিলাম বৌদি আহত হয়েছে। কিন্তু আমার যে বৌদিকে সন্দেহ হয়েছিল তা তো মিথ্যে নয়। তাই ভেবেছিলাম বৌদির কাছে আর যাব না। আমার পক্ষে অভিনয় করা সম্ভব নয়।

লেখাপড়া, প্রেম, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি — সব নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে খুব সচেতনভাবে বৌদির থেকে দূরে সরে আসতে হল না আমাকে। কষ্টও হল না। আমি এম এ পাশ করলাম, গবেষণা শেষ করলাম, অধ্যাপক হলাম, সেই সহপাঠিনীকে বিয়ে করলাম, বাবা হলাম। এক পাড়ায় থাকার সূত্রে দেখলাম বাবুন বড় হয়ে গেল। বাবার মত টকটকে গায়ের রং আর মায়ের মত গুণী। এখন ও আর্ট কলেজের ছাত্র।

বৌদি যাত্রায় নাটকে নায়িকার চরিত্রে দাপটে অভিনয় করতে করতে ক্রমশ নায়কের বৌদি, কাকিমা, নায়িকার মা ইত্যাদি চরিত্রে সরে গেল। মন্টুকাকুর একটা বিশাল ভুঁড়ি হয়ে গেল চল্লিশ পেরোতেই। ফলে আরো আগে প্রবীণ লোকের চরিত্র ধরে নিল। যদিও পঞ্চাশেও চুলে পাক ধরেনি। স্কুটারে করে যখন শাড়িপরা মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যায় তখন দাদা বলে চালিয়ে দিলেও অচেনা লোক অবিশ্বাস করবে না।

রঞ্জনদা কথা রেখেছিল। বছরে দু তিনবার বাড়িতে আসত, পাড়ায় আড্ডা দিতে বেরোত। বৌদি আর বাবুনকে নিয়ে এদিক ওদিক বেড়াতে যেতেও দেখেছি। পাড়ার লোকের গুজগুজ ফুসফুস বছর খানেক পরেই কমে গিয়েছিল।

আমার সাথে রাস্তাঘাটে কখনো কখনো বৌদির দেখা হয়ে যেত। সেই অকৃত্রিম হাসিটাই হাসত, আমি পোশাকি হাসি হেসে এগিয়ে যেতাম। পাছে কথা বলতে হয়! তখনো যে নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি। সন্ধ্যেবেলা বৌদির বাড়ির পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরতাম। রান্নাঘরটা রাস্তার উপরে। শুনতে পেতাম বৌদি রান্না করতে করতে গাইছে। প্রায় সব গানই আমি বহুবছর আগে শুনেছি ওর গলায়। তবু অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতাম। ভাগ্যিস ওবাড়ির সামনের ল্যাম্পপোস্টের বাল্বটা বহুবছর সারানো হয়নি।

বছরতিনেক আগে কানে এল বৌদির ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়েছে, অপারেশন হবে। আর থাকতে পারছিলাম না। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পরে গেলাম দেখতে। দরকার পড়লে অজুহাত হিসাবে আমার পাঁচ বছরের মেয়েকে দেখানো যেত। ও বৌদির পরিচালনায় পুজোর ফাংশনে নাচ করেছে। সত্যিই “মীরা জেম্মা” অসুস্থ শুনে যেতে চাইছিল।

অজুহাতের দরকার অবশ্য পড়ল না। বৌদি এমনভাবে কথা বলল যেন মাঝখানের কয়েকটা বছর ক্যালেন্ডারের পাতা ছেঁড়ার মত ছিঁড়ে ফেলেছে চুপিসাড়ে। আমি এখন কী পড়াচ্ছি জিজ্ঞেস করল, আমার মায়ের বাতের ব্যথা কেমন আছে জানতে চাইল, বলল আমার মেয়ে আমার মতই “খুব সেনসিটিভ।” আমার তখন চোখের কোণে জল এসে গেছে, মেয়ের সামনে নিজেকে সামলাচ্ছি। বৌদি এক টানে চশমাটা খুলে নিয়ে বলল “চোখটা মোছ। পাগল! আমি মরছি না রে বাবা। কেমো নিতে হবে, তারপর আবার দেখবি নেচে বেড়াব। রিল্যাপ্স হতেই পারে। সেই ভয়ে কুঁকড়ে থাকব নাকি? যেদিন যেতে হবে, সেদিন চলে যাব।”

কোন ক্যান্সারের রোগীর এত মনের জোর আমি দেখিনি। বিশ্বাস করিনি কথাগুলো। বেরিয়ে আসার সময় বাইরের ঘরে বসা রঞ্জনদা অবশ্য বলল ডাক্তার নাকি ওরকমই বলেছেন। পরদিন শুনলাম সে কাজের জায়গায় ফিরে গেছে।
কয়েকমাস পরে দেখলাম সত্যিই বৌদি যথারীতি রান্নাঘরে গান করছে। আমার গিন্নী জানাল ট্রেনে ওর সাথে দেখা হয়েছে বেশ কয়েকবার। রঞ্জনদা কাজের জায়গায় ফিরে গেছে বলে বৌদি একা একাই ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছে। শুনে বাবুনকে “অযোগ্য ছেলে” ইত্যাদি বলে গাল দিলাম। মনে মনে খিস্তি করলাম মন্টুকাকুকে।

“শুয়োরের বাচ্চা। কম্পানি তো কবে ভি আর এস দিয়ে দিয়েছে। বাড়িতে বসে থাকতে পারে আর মীরা বৌদিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারে না? সবাই সব জানে। এতবছর পরে লোকলজ্জার ন্যাকামি? আসলে যতদিন বৌদির শরীর ছিল ততদিন উনি রসিক নাগর ছিলেন। এখন শালার প্রেম শুকিয়ে গেছে।”

দিন সাতেক আগে থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে আর বৌদির গান শুনি না। পরশু শুনলাম হাসপাতালে ভর্তি, বাঁচার আশা কম। আজ সকালে খবর এল — সব শেষ। রবিবার হওয়াতে শ্মশানযাত্রী হতে পারলাম নিশ্চিন্তে।

গামছা কোমরে বেঁধে বৌদির বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি বডি আসার আগে থেকেই। হাসপাতাল থেকে নিয়ে এল রঞ্জনদা আর বাবুন, সঙ্গে রন্টুজেঠু। বাবুন কান্নাকাটি করলেও রঞ্জনদার মুখে চোখে কোন দুঃখকষ্ট দেখতে পেলাম না। শুধু বৌদির মাথায় হাত রেখে চুপ করে বসে রইল।

পাড়ার ক্লাবের পক্ষ থেকে মাল্যদান, ছোটদের প্রণামের পালা যখন প্রায় শেষ তখন এসে পৌঁছাল মন্টুকাকু। ওকে দেখেই ভুরু কুঁচকে ঘরে গিয়ে ঢুকল রঞ্জনদা। কাকু অবশ্য সেটা খেয়াল করেনি কারণ সে এসেই সকলের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে, কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়েছে বৌদির পা দুটো ধরে। এভাবে দীর্ঘ মিনিট দুয়েক কাটল। সকলেই এত অপ্রস্তুত যে কেউ ওকে সামলাতেও গেল না। তারপর বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে রঞ্জনদা বলল “ফালতু বেলা বাড়িয়ে লাভ নেই, রন্টুমামা। রওনা দেওয়া যাক।” আড়ষ্টতা কাটিয়ে আমরা কজন মিলে মন্টুকাকুকে সরালাম। ম্যাটাডোরে শ্মশানে আসার পথে কেউ ওর সাথে একটাও কথা বলেনি। ও একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করেছে দেখেছি। ওকে ম্যাটাডোরে উঠতে দেখে রঞ্জনদা ঝাঁঝিয়ে উঠেছিল “ও-ও যাবে নাকি?”

রন্টুজেঠু পালটা ধমকে দেয় “তোর এখন এসব ভাববার সময়? মা মরা ছেলেটাকে সামলা। বোস গিয়ে সামনে।”

বৌদিকে চুল্লিতে ঢোকানো পর্যন্ত আর কোন ঝামেলা হয়নি। বাড়ি ফেরার সময়ে কোথায় যে গেল!

পেয়েছি। আমিই দেখতে পেয়েছি। শ্মশানের উত্তরদিকে পাঁচিলের ভাঙা অংশটা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি রঞ্জনদাকে। ঘাটের সিঁড়ির ধাপে বসে সিগারেট খাচ্ছে। আমি দৌড়ে যাই। একটু কাছে যেতেই দেখি — অবাক কাণ্ড! এক ধাপ নীচেই বসে আছে মন্টুকাকু। কী যেন গাইছে গুনগুন করে? আমি পা টিপে টিপে গিয়ে দাঁড়াই ওদের পেছনে। শুনি রঞ্জনদা বলছে “একটু জোরে গা না, মন্টু। তার গলায় তো আর শুনব না, তোর গলাতেই শুনি।”

মন্টুকাকু গলা চড়াল “তোমার অভিসারে/ যাব অগম পারে/ চলিতে পথে পথে/ বাজুক ব্যথা পায়ে।”

অলঙ্করণ: দেবজ্যোতি পাত্র

প্রকাশ: আমার কাগজ, শারদীয়া ১৪২৪