ম্যাজিক দেখার গল্প

ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি ছিলাম গল্পের পোকা। আর আমার বন্ধু রাজু দারুণ গল্প বলতে পারত। কোন ক্লাসে মাস্টারমশাই না এলেই আমরা রাজুকে ঘিরে বসতাম। ও হাত পা নেড়ে, গলা টলা বদলে এমন করে গল্প বলত যে মনে হত এক বর্ণও মিথ্যে নয়। ভূতের গল্প হলে আমাদের গায়ে কাঁটা দিত, আর মজার গল্প হলে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যেত। একবার তো রাজুর গল্পের কথা মনে পড়ে অঙ্ক স্যারের ক্লাসে অকারণে হেসে ফেলে আমাকে সারা ক্লাস বারান্দায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল।

তা সেই রাজু একবার আমাকে চুপিচুপি একটা গল্প বলেছিল যা শুনে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি ওটা আনন্দের গল্প, না দুঃখের গল্প। অবশ্য রাজু বলেছিল ওটা নাকি সত্যি ঘটনা। তাই তিন সত্যি করিয়ে নিয়েছিল বন্ধুদের কাউকে বলা চলবে না। বললে নাকি ওরা হাসাহাসি করবে! আমি কাউকে বলিনি, তবে ওসব সত্যি বলে বিশ্বাসও করিনি। কারণ ও তো দাবী করত ওর বলা সব গল্পই সত্যি। গল্পটা তোমাদের বলছি। তোমরাই বুঝে দ্যাখো সত্যি কিনা।

তখন আমাদের সবুজগ্রামে কোন বড় হল ছিল না। নাচ, গান, নাটকের সব বড় বড় অনুষ্ঠান হত আমাদের স্কুলের বিরাট মাঠে স্টেজ বানিয়ে। তা সেই মাঠে একবার এত বড় স্টেজ হল যে আমরা তো আমরা, স্যারেরাও বললেন সবুজগ্রামে এত বড় স্টেজ তাঁরা দ্যাখেননি।

“জাদুসম্রাট পি সি সরকারের ইন্দ্রজাল। দর্শকদের দাবিতে আরও এক সপ্তাহ। স্হান সবুজগ্রাম বিদ্যাভবনের খেলার মাঠ। প্রতিদিন দুটি শো। চার ও সাত ঘটিকায়। টিকিটের দাম একশো, দুশো ও চারশো টাকা। সভ্যপত্র সংগ্রহ করতে হলে এগিয়ে আসুন আমাদের প্রচার গাড়ির দিকে। এছাড়াও সভ্যপত্র পাওয়া যাচ্ছে…”

ঘোষণাটা রোজই রাজুর কানে আসত। বন্ধুরা অনেকেই দেখে ফেলেছে। শুনলে আশ্চর্য লাগে। কি করে যে কী করে লোকটা! রোজ রাতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত এটাই ভাবত সে।

ওর বাবাকে অবশ্য রাজু বুঝতে দেয়নি। বাবার সামনে ইচ্ছে করেই স্কুলে যা যা শুনেছে সেসব আলোচনা করেনি। আলাদা করে বোন টুপুরকে বলেছে। আমাদের ক্লাসের অনেকেই দেখে এসেছিল কিন্তু অনির্বাণের মত গুছিয়ে আর কেউ বলতে পারেনি। রাজু বাড়ি গিয়ে টুপুরকে অনির্বাণের মত করেই বলার চেষ্টা করত। টুপুর চোখ বড় বড় করে শুনত। একদিন বলে বসল “চল না, আমরা একদিন দেখে আসি?”

রাজু সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চাপা দেয়।

“চুপ কর, চুপ কর।”

“কেন?”

“মা শুনতে পেয়ে যাবে।”

“বকবে?”

“বকবে না। দুঃখ পাবে। টিকিটের অনেক দাম। ও আমাদের দেখা হবে না।”

“বাবাকে বল না।”

“এ রাম!” টুপুরের উপর একটু রাগই হয়েছিল রাজুর। “তুই কি পাগল? বাবা আরও কষ্ট পাবে।”

টুপুর দমে গিয়ে চুপচাপ যেমন ছবি আঁকছিল তেমন আঁকতে লাগল। তখন আবার ওর জন্যে কষ্ট হয় রাজুর। ঐটুকু মেয়ে কী করেই বা বুঝবে! রাজু তো জানত প্রতি মাসে ধার শোধ করতেই বাবার অর্ধেক মাইনে চলে যায়। তার উপর আবার রাজু দু জায়গায় প্রাইভেট পড়তে যেত। এত করেও যখন অঙ্কে কিছুতেই চল্লিশের বেশি নম্বর পেত না, তখন লজ্জায় বাবার দিকে তাকাতে পারত না ও। তাই জন্যে এবার বছরের শুরুতেই বাবাকে বলেছিল ইংরিজির স্যারকে ছাড়িয়ে দিতে। অঙ্কে আতঙ্ক থাকলেও আমাদের রাজু ইংরিজিতে ছিল দারুণ। ফার্স্ট বয় ঋক পর্যন্ত ইংরিজিতে রাজুকে সমঝে চলত। রাজুর বাবাও জানতেন সে কথা। তবু বলেছিলেন “বাবা, তোর বাপের এখনো এমন অবস্থা হয়নি যে মাস্টার ছাড়িয়ে দিতে হবে। তুই এরকম বললে আমার বড় কষ্ট হয় রে। এসব বলিস না।”

পরদিন অবাক কাণ্ড। বাবা খেতে বসে রাজুর মাকে বললেন “বেলা, পি সি সরকারের ম্যাজিকটা এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। সবাই মিলে তো যাওয়া সম্ভব না। ছেলেমেয়ে দেখে আসুক?”

“হ্যাঁ। আমিও তাই ভাবছিলাম। পাড়ার অনেক বাচ্চাই তো দেখে নিল। রাজু তো এখন বোনকে নিয়ে একাই যেতে পারে।”

“না না। অনেক টাকার টিকিট। দরকার নেই” বলে রাজু শুরুতেই আলোচনাটা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

“দেব টাকা। ভাবছিস কেন?” বাবা তখন আশ্বাস দেন। “শুধু এ মাসে মাংস খাওয়াটা হবে না।”

“কী দরকার? টুপুর কবে থেকে মাংস খেতে চাইছে…”

“না না, মাংস খাব না। ম্যাজিক দেখব,” টুপুর সাত তাড়াতাড়ি বলে ফেলেছে।

তো শেষ অব্দি যাওয়াই ঠিক হল। রাজু তো একেবারেই আশা করেনি পি সি সরকারের ম্যাজিক দেখা হবে। বাবা কি দারুণ বুদ্ধিটা বার করেছেন ভেবে রাজুর অবাক লেগেছিল। আগের মাসে মাংস খাওয়া হয়নি, না হয় সে মাসেও হল না। মাংস তো পরেও খাওয়া যাবে, পি সি সরকার তো আর রোজ রোজ সবুজগ্রামে ম্যাজিক দেখাতে আসবেন না।

এইসব ভাবতে গিয়ে হঠাৎ রাজুর মনে হল “আচ্ছা! মা কাল টুপুরের আর আমার কথা শুনতে পায়নি তো? নাহলে হঠাৎ আজ ম্যাজিকের কথা উঠল কেন? ছি ছি! আমাদের খুব দেখার ইচ্ছে জানতে পেরে বাবা হয়ত খুব কষ্ট করে টাকাটা যোগাড় করবে। হয়ত ধার করবে। এক কিলো মাংসের দাম দুশো টাকার চেয়ে কম। শুধু মাংস না খেলেই কি আর ক্ষতিপূরণ হবে?” এসব তো আর বাবাকে জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই অপরাধবোধ সত্ত্বেও ম্যাজিক দেখতে যাওয়ায় বাগড়া দেবে না ঠিক করল ও।

পরদিন যাওয়া। বাবা স্কুল থেকে ফিরে টাকা দেবে, রাজু একেবারে হলে গিয়েই টিকিট কেটে নেবে কথা হয়েছে। সকাল থেকে খুব উত্তেজনা। স্কুলে বন্ধুদের বলতেও ভাল লাগল “আজ আমি আর বোন আসছি দেখতে।”

বাবা ফেরার আগেই টুপুর সেজেগুজে তৈরি। সাধারণত যখন ফেরে তখনই বাবা ফিরল, কিন্তু রাজুর মনে হচ্ছিল যেন কত দেরি হচ্ছে।

বাবা ঢুকল কেমন থমথমে মুখে। মনে হল কিছু একটা হয়েছে। মা আগে থেকেই বলে রেখেছিল “ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে না। একটু ঠাণ্ডা হয়ে নিতে দিও টাকা চাওয়ার আগে। অনেক সময় আছে।” সেই জন্যেই রাজু আর টুপুর অনেক কষ্টে চুপ করে ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তর সইছিল না।

বাবা প্রথমে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মা বলল “কি গো! হাত-মুখ ধোও। খেতে দেব তো?” তখন বাবা হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলল। রাজু তখনই বুঝেছিল কিছু একটা হয়েছে। তারপর বাবা, যেন অনেক কষ্টে, ডাকল “টেঁপু মা, আমার কাছে আয়।”

টুপুরকে কোলে বসাল।

“রাজু বাবা, আয়।” রাজু পাশে গিয়ে বসল।
“বাবা শোন। আমি একটা কাজ করে ফেলেছি। তোরা অপরাধ নিস না।”

“কী হয়েছে? তুমি এরকম বলছ কেন?” মা জিজ্ঞেস করল।

“আসলে বেলা, আমাদের স্কুলের একটা মেয়ে… লেখাপড়ায় ভাল না। কিন্তু খেলাধুলোয় এক নম্বর। ও এবার স্টেট অ্যাথলেটিক্সে দৌড়ে তিনটে ইভেন্টে ফার্স্ট হয়েছে। ওরা অনেকগুলো ভাই বোন, বাবা রিকশা চালায়। আজ আমাদের স্কুলে এসেছিল। বলল একজন কোচের ওকে পছন্দ হয়েছে। বলেছে ওকে ন্যাশনাল লেভেলের জন্যে কোচিং করাবে, মাইনে কড়ি কিছু নেবে না। শুধু দৌড়ের জুতোটা কিনে দিতে হবে। এতদিন তো খালি পায়ে দৌড়েছে, আর তাতে হবে না।”

এতটা বলে বাবা ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। টুপুর তখনো বোঝেনি কেন এসব কথা হচ্ছে, মা বুঝেছে বলে মুখ ম্লান হয়ে এসেছে আর রাজু আন্দাজ করলেও জোর করে আশা করছে বাবা অন্য কিছু বলবে।

“ঐ জুতোর তো অনেক দাম,” বাবা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল। “ওর বাবা অত টাকা পাবে কোথায়? তা আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। সকলেই কিছু না কিছু দিল। আমি আজই তোরা ম্যাজিক দেখতে যাবি বলে তিনশোটা টাকা তুলেছিলাম। আর তো আমার কাছে কিছু নেই। তা কী করব? ঐ টাকাটাই দিয়ে দিলাম।”

কথা শেষ করেই তাড়াতাড়ি হাত-পা ধুতে চলে গেল বাবা। মা-ও কিছু না বলে বাবার খাবার আনতে গেল রান্নাঘরে। রাজু দেখল বোনের মুখখানা কাঁদো কাঁদো। “ধুর বোকা। কাঁদিস না। যখন পি সি সরকার কলকাতায় ম্যাজিক দেখাবে, তখন আমরা যাব” বলতে বলতে বোনকে বুকে টেনে নিল। টুপুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একটু কাঁদল। বেশি না।

চোখ মুছতে মুছতেই বাবা এসে পড়ল, মা এল দুধ রুটি নিয়ে। বাবা বলল “আমার ঠিক ক্ষিদে নেই গো।”

“ধ্যাত। ক্ষিদে নেই কি? সেই কখন ভাত খেয়ে গেছ!” মা রেগে গেল।

রাজু বুঝেছিল কেন বাবার ক্ষিদে নেই। জড়িয়ে ধরে বলেছিল “বাবা, আমি একটুও দুঃখ পাইনি। সত্যি বলছি। আমাদের তো তুমি তাও জুতো কিনে দিতে পারো। ঐ মেয়েটার বাবা তো পারে না।”

রাজুর বাবা তখন ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফ্যালেন। টুপুর অমনি লাফিয়ে কোলে উঠে চোখ মোছাতে মোছাতে বলে “ও বাবা, কাঁদছ কেন? আমিও দুঃখ পাইনি। সত্যি বলছি। আমরা পরে একদিন যাব ম্যাজিক দেখতে।”

তারপর রাজুর বাবা নাকি দুই ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। তিনজনেই কেঁদেছিল। না, চারজনে। রাজুর বাবা কাঁদতে কাঁদতেই ওর মা-কে বলেছিলেন “বেলা, ওরা আমারই ছেলেমেয়ে গো, আমারই।”

শুনে রাজুর মা হেসে ফ্যালেন। “ও আবার কী কথা? তোমার নয় তো কার ছেলেমেয়ে?”
তারপর বলেন “সামনের মাসে যেদিন মাংস আনবে সেদিন ঐ মেয়েটাকে আমাদের সাথে খেতে বলে দিও। অতগুলো মেডেল জিতেছে। ওকে তো একদিন খাওয়ানো উচিৎ।”

অলঙ্করণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

প্রকাশ: কিচিরমিচির, উৎসব সংখ্যা ২০১৯

বহুতল

এই শেষ। আর এই বাথরুমে চান করা হবে না। এক পাশ তুবড়ে যাওয়া সর্ষের তেলের বাটিটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। এত কিছু বয়ে নিয়ে যাওয়ার আছে, কী হবে বোঝা বাড়িয়ে?

ফেলে দেওয়া সোজা নয়। ঐ বাটিতে তেল ঢেলে শীতের উঠোনে মাদুর পেতে তেল মাখাত বাবা। নিজে মাখত আর ছেলেকে মাখাত। বহুক্ষণ ধরে হাতের তালু, পায়ের তলা ঘষে, হাত পা দলাই মলাই করে। মা রান্নাঘর থেকে তাগাদা দিত “কী হল? আর কত দেরি? তোমরা গেলে না এখনো? আমার রান্না যে হয়ে এল।” বাবা বলত “দাঁড়াও! টুবলুর গায়ে তেলটা বসুক আগে। নইলে আর এত কসরত করছি কেন?”

চান করে এসে উঠোনে দাঁড়িয়েই লুঙ্গি পরে গামছা ছাড়ত বাবা। গামছাটা মেলতে গিয়ে খেয়াল হত তেলের বাটিটা তুলে রাখা হয়নি। তখন বাঁ হাতে তুলে নিয়ে এই বাথরুমে ঢুকত পা ধুতে। আগে বাটিটা রাখত ঐ তাকের উপর। তারপর ডেকে বলত “টুবলু, কল টেপ।” তখনো মিউনিসিপ্যালিটির জল আসেনি এ তল্লাটে। উঠোনের কুয়ো থেকে মাটির নীচ দিয়ে পাইপ পাতিয়ে বাথরুমের ভেতরে টিউবওয়েল বসিয়েছিল বাবা। শাওয়ারের জলে চোখের জল মিশিয়ে দিতে দিতে মনে পড়ে।

এই শাওয়ারেও চান করে গেছে বাবা। তাই চাকরি চলে যাওয়ার সময়ে, বউয়ের সাথে এক এক ইঞ্চি করে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার সময়েও এই শাওয়ারে চান করে বড় শান্তি ছিল। এই শেষবারের মত বাবার আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে গায়ে মাথায়। টুবলু উপর দিকে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে যায়। হাতড়ে হাতড়ে নবটা খুঁজে পেয়ে বন্ধ করে শাওয়ারটা। দেওয়াল ধরে ধরে বেরিয়ে আসে।

গা মাথা মুছে দৃষ্টি ফিরে পেয়ে একদম ভাল লাগে না। আজ ভেজা পায়েই গামছা মেলতে যেতে হচ্ছে বারান্দায়। পাপোশগুলো তো ফেলে দেওয়া হয়ে গেছে। খাবার ঘরটা, বাবা-মায়ের ঘরটা, বারান্দা — সর্বত্র পায়ের ছাপ পড়ে গেল। আজ তো মা নেই বকতে। “টুবলুউউউউ। কতবার বলেছি ভেজা পায়ে বেরোবি না? কিছুতেই মনে থাকে না ধেড়ে ছেলের?”

বারান্দায় পৌঁছে খেয়াল হয় দড়িগুলো আগেই খোলা হয়ে গেছে, আজ আর গামছা মেলা যাবে না। টুবলু ঘরে এসে ভেজা গামছাটা প্লাস্টিকে পুরে কোনমতে গুঁজে দেয় ব্যাক প্যাকে।

আর কখনো পাশের ঘরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আঁচড়ানো হবে না চুল। ওটা কালই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্রেতার বাড়ি। ওটাও ফিরবে না, ঘরটাও থাকবে না। টুবলু চুল আঁচড়ানোর সময়ে কখনো অবাধ্য হয়নি মার, আজ হল। চিরুনি নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ঠিক সেইখানটায় যেখানে ঝুলগুলো দাগিয়ে রেখেছে ড্রেসিং টেবিলের জায়গা। সেই দেয়ালের দিকে মুখ করে আজ, শেষবারের মত, টুবলু দেখতে পেল নিজের মুখ আর মায়ের মুখ। ছোটবেলার মত ডানদিকে সিঁথে করে দিল মা, টুবলু প্রতিবাদ করল না।

শেষবার ফ্যান গালা হল টুবলুর মায়ের রান্নাঘরে। বড় সাধের, সাজানো রান্নাঘর ছিল। বিয়ে হয়ে যখন আসে তখন এর মাথায় ছিল অ্যাসবেস্টসের চাল। পুজোর বোনাসের সাথে কিছু ধার করে পাকা ছাদ করে দিয়েছিল বাবা। তবে অনেকদিন গুল কয়লায় রান্না করেছে এ ঘরে। মোচার ঘন্ট, সর্ষে বাটা দিয়ে লাউয়ের খোসার চচ্চড়ি, শশার তরকারি। মাসে কদিনই বা মাছ হত তখন? টুবলুর বউকে ফুলশয্যার পরদিনই মা বলে দিয়েছিল “যদ্দিন পরীক্ষা পাশ না হচ্ছে এ ঘরে তোমার ঢোকা বারণ, বৌমা।” সে বারণ বজায় রেখেছিল। দেবপ্রিয়ার নার্সিং পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিনই রান্না করতে করতে বেহুঁশ হয়ে গেছিল মা। পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেছিল টুবলু। মা আর বাড়ি ফেরেনি।

তারপর থেকে বড় ব্যস্ত জীবন ছিল টুবলু-দেবপ্রিয়ার। দিনে কথা বলার সময় ছিল না, রাতে আদর করার সময় ছিল না। সকালে বাবা কাগজ পড়ত বড় ঘরে বসে আর রান্নাঘরে প্রিয়াকে সাহায্য করতে করতে পারিশ্রমিক আদায় করত টুবলু। প্রিয়া ফিসফিসিয়ে বলত “তুমি যা কাজ কর তার ডবল মাইনে নাও।” টুবলু বলত “আমি যত মাইনে চাই তুমি তার আদ্ধেক দাও।” প্রিয়ার ঠোঁট বৈশাখী দুপুরের মত শুকনো হতে শুরু করেছিল এখানেই। টুবলু জানতে চেয়েছিল “কেন?” প্রিয়া উত্তর না দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। টুবলুর বাবা, ওদের চুমু খেতে না দেখেও, বুঝেছিল কেন। বলেছিল “এভাবে মানুষ পারে নাকি? বৌমার হাসপাতালের ওখানে একটা বাড়ি নে। এটা কোন জীবন হল? মেয়েটা তো মারা যাবে।” টুবলু তবুও যেতে চায়নি। ফলে দূরত্ব বেড়েছিল। তারপর একদিন এই রান্নাঘর ছেড়ে, এই বাড়ি ছেড়ে প্রিয়া চলে গেল। জানিয়ে দিল আর এ বাড়িতে ফিরবে না।

তখন টুবলুর কোম্পানি টালমাটাল, যে কোনদিন চাকরি চলে যেতে পারে। আলাদা বাড়ি নিলে সে বাড়ির ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য যে কদিন পরেই না-ও থাকতে পারে সে কথাটা বলব বলব করে আর বলাই হয়নি প্রিয়াকে। অবশ্য চাকরি চলে যাওয়ার পর কোত্থেকে খবর পেয়ে নিজেই এসেছিল সে। আর টুবলুর বাবা জোর করে তার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল টুবলুকে। “আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি তো অথর্ব হয়ে যাইনি। একসাথে থাক কয়েকদিন। সব ঝামেলা মিটে যাবে।”

মিটে গেছিল সত্যিই। রফা হয়েছিল সারা সপ্তাহ ওরা যাদবপুরে দেবপ্রিয়ার কোয়ার্টারে থাকবে আর শনি, রবি এই বাড়িতে টুবলুর বাবার সাথে। কোয়ার্টারটা বড্ড ছোট। দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার জন্যে আদর্শ। কলকাতায় থাকতে হওয়ায় আরেকটা চাকরির জন্যে দৌড়াদৌড়ি করতেও একটু সুবিধা হয়েছিল টুবলুর। তবুও দৌড়ানোই সার হয়েছে, কিচ্ছু পায়নি। শুধু প্রিয়াকে ফিরে পেয়েছিল। রবিবারগুলো চমৎকার কাটত তখন। বাবার রান্না মাংস তিনজন মিলে খেতে খেতে। সেই ডাইনিং টেবিলটায় কাল রাতেই শেষবার খাওয়া হয়েছে। আজ সকালে বিদায় হয়েছে।

ডাইনিং রুমের মাটিতে বসে ভাত আর আলুসেদ্ধ মাখে টুবলু। ঠিক এইখানে বসেই মা চটজলদি মেখে খাইয়ে দিত স্কুল যাওয়ার সময়ে। তখন ডাইনিং টেবিল থাকত বড়লোকদের বাড়িতে। দু একজন বন্ধুর বাড়িতে ছিল। ওদের বাড়ি গেলে টেবিলে বসে খেয়ে খিদে মিটত না। আত্মীয়দের মধ্যে সবচেয়ে আগে ডাইনিং টেবিল এসেছিল ছোটকাকার বাড়িতে। মার শ্রাদ্ধের কয়েকদিন পরে এসে এই ঘরে বসেই চা খেতে খেতে ছোটকাকা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল “দাদা, বাড়িটা নিয়ে কী করবি ভাবছিস?” বাবা কথাটার মানে বোঝেনি। টুবলু আর দেবপ্রিয়াও বোঝেনি। কাকা বুঝিয়ে বলেছিল “বাড়িটার বয়স তো ষাটের ওপর হল। এত বড় বাড়ি। মেনটেন করার খরচাও তো অনেক। আস্তে আস্তে তো অন্য কিছু ভাবতে হবে।” ওরা তিনজনেই জোরের সঙ্গে বলেছিল যে মেনটেন্যান্সের খরচা এমন কিছু ঘনঘন হয় না আর যেটুকু হয় তাতে ওদের কোন অসুবিধা হয় না। কাকু তখন মহদাশয় হয়ে বলেছিল বাড়িটা সকলের। ওরা তিনজনেই শুধু বাড়ির পেছনে পয়সা খরচ করবে সেটা ঠিক না। সকলেরই সাহায্য করা উচিৎ। টুবলুর বাবা হেসে বলেছিল “আচ্ছা দরকার হলে তোদের বলবখন।” তাতেই বেরিয়ে এসেছিল আসল কথাটা। “দ্যাখ আমার সাথে মেজদা, সেজদা, ফুলদা সবারই কথা হয়েছে। সকলেই একমত। আমরা তো আর কোনদিন এই বাড়িতে ফিরে আসব না, আমাদের ছেলেমেয়েরাও আসবে না। টুবলু, প্রিয়ারও তো কাজকর্ম সব কলকাতায়। সুতরাং বাড়িটা কোন প্রমোটারকে দিয়ে দেওয়াই ভাল। যে যার মত টাকা পেয়ে গেলাম, তোরা সঙ্গে একটা ফ্ল্যাট পেলি। ছুটিছাটায় এসে থাকা যাবে।” টুবলু রাগে বোবা হয়ে গেছিল, দেবপ্রিয়া উঠে রান্নাঘরে চলে গেছিল। টুবলুর বাবা খুব নীচু গলায় বলেছিল “বাবা আর আমি কাঁধে করে ইঁট বয়ে এই বাড়িটা করেছিলাম। আমাকে এখানেই মরতে দে, তারপর তোরা যা ভাল হয় করিস।” ছোটকাকা আর একটিও কথা বলেনি।

খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে ছাদে এসে বসে টুবলু। ছাদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বাতিল জিনিসের স্তূপটা এত বছর আগলে রেখেছিল সে। হয়ত কাল সকালেই ওটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। লুকোচুরি খেলার সময়ে ওর পেছনে অদৃশ্য হয়ে যেত সে আর সেজকাকুর ছেলেমেয়ে বুল্টি, ভেদুয়া। পাশের বাড়ির বোকাসোকা মেয়ে রাবড়িকে ভয় দেখানো হয়েছিল ওখানে সাপ আছে। তাই ওরা ওখানেই আছে বুঝেও সে দূর থেকেই উঁকি ঝুঁকি মারত, এগোত না। তারপর পেছন ফিরলেই — ধাপ্পা। গত দশ বছর সপ্তাহান্তে এসে ছেলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ওখানেই লুকিয়েছে টুবলু। এখনকার বাচ্চাদের সাহস অনেক বেশি। সাপের গল্পে ভয় পায় না। এতদিন পরে খেয়াল হল, যখন থেকে মার ছাদে বড়ি দেওয়া বন্ধ হয়েছে, কাক-টাক আর খুব একটা এসে বসে না বাড়িতে। ছাদের এ মাথা ও মাথা শেষবারের মত হেঁটে নেয় টুবলু। ফুলকাকা বলেছে ফ্ল্যাট হয়ে গেলে নাকি ছাদটা আরো বড় হবে।
বাবা বলত ভায়েদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিল মেজকাকা কিন্তু অধ্যবসায় সবচেয়ে বেশি ছিল ফুলকাকার। সেই জন্যে ও-ই সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে। ও-ই বরাবর লেগেছিল টুবলুর বাবার পেছনে। দুর্গাপুর থেকে ফোন করত বারবার একই কথা বোঝানোর জন্যে।

“তোদের তো কেউ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছে না, বড়দা। চার কাঠা জমি আমাদের, তার মধ্যে দু কাঠায় বাড়ি। ফ্ল্যাট হলে কত বড় বিল্ডিং হবে ভাব। আমরা তো সবাই টাকা নেব। তুই নাহয় দুটো ফ্ল্যাট একসঙ্গে করে নিয়ে নিস। প্রমোটারের সাথে সেরকমভাবেই এগ্রিমেন্ট করব। বাড়ির মতই হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে পারবি।”

বাবাকে অবশ্য টলাতে পারেনি। টুবলুও কলকাতায় থাকতে শুরু করার পর একদিন চার ভাই আর তাদের বউরা এসে চেপে ধরেছিল বুড়ো মানুষটাকে। খবর পেয়ে টুবলু আর মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। চারজনকেই ফোন করে ধমকেছিল “এত টাকার লোভ তোমাদের যে মানুষটা মরা পর্যন্ত তর সইছে না? বাবার যদি কিছু হয়, তোমাদের আমি জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব বলে দিলাম।” এসব অর্থহীন, রাগের কথা — প্রিয়া পরে বুঝিয়েছিল। ঠিকই।

চাকরি খোয়ানোয় শাপে বর হয়েছিল টুবলুর ফটোগ্রাফির। আর কোন কাজ ছিল না তো। পুরনো যোগাযোগগুলো আবার জোড়া লাগানোর সময়ও পেয়েছিল। সেই সূত্রে চাকরি যাওয়ার বছর দুয়েক পরে বেশ কিছু ফ্রিলান্স কাজ পেয়ে গেল। একটু সুরাহা হল। কিছুদিন পরেই প্রিয়ার পেটে এল কোপাই। তখনই, বাবার পরামর্শে, একটা দু কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল ওরা। দুজনের রোজগার মিলিয়ে ভাড়ার টাকাটা উঠে যেত। ফুলকাকা সেটা জানতে পেরে টুবলুকেও ফোন করা শুরু করে। “মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দ্যাখ। দেবপ্রিয়ার যা চাকরি তাতে অত দূর থেকে যাতায়াত করতে কোনদিনই পারবে না। এরপর ছেলেপুলে হলে তার লেখাপড়া আছে, আঁকার ক্লাস, এটার ক্লাস, সেটার ক্লাস। সব মিলিয়ে আর তুই ঐ বাড়িতে ফিরতে তো পারবি না। তার চেয়ে ওটা চল বেচে দিই, বড়দাকে তোর কাছে নিয়ে আয়। বুড়ো বয়সে ওকেও একা থাকতে হবে না, তোদেরও চিন্তা থাকবে না।” প্রস্তাবটা টুবলু বা তার বাবা — কারোরই ভাল লাগেনি।

ছাদ থেকে নেমে সিঁড়ির তলার দরজা খুলে বাগানে আসে টুবলু। শীত চলে যাবার সময় হল। এই সময়ে সারা বিকেল বাবা বাগানেই কাটাত। এ গাছে সার দিত, ও গাছে জল দিত, অমুক মরশুমি ফুলের মরা গাছটা উপড়ে ফেলে নতুন গাছ লাগাত। ডিসেম্বরের রঙিন বাগানে একটা ডালিয়ার উপরে বসা দুটো প্রজাপতির ছবিটাই প্রথম কোন পুরস্কার এনে দিয়েছিল টুবলুকে। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলে এখনো বাবার গায়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে মাটি থেকে।

টুবলু যখন থ্রি ফোরে পড়ে সেই সময় বাবা শখ করে একটা নারকেল গাছ পুঁতেছিল। কদিন না যেতেই খুব ভোরে কারা মাটি খুঁড়ে তুলে নিয়ে গেছিল সেটা। পোঁতার সময়ে এক প্যাকেট নুন ছড়িয়ে কাজে হাত লাগিয়েছিল টুবলু, তাই খুব কেঁদেছিল সে। বাবা বলেছিল “যাক গে, ভালই হয়েছে। নারকেল গাছ শিকড় ছড়িয়ে বাড়ির ভিত নষ্ট করে দেয়। ভুলই হয়েছিল লাগানো।”

ছোটকাকা তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিক। টুবলুর কান্না দেখে আরেকটা এনে বসিয়ে দিয়েছিল। সেটায় বেশ বড় বড় নারকেল ধরেছে এবারও। ওগুলো আর খাওয়া হবে না। যাক গে! কাল পরশু যারা গাছটা কাটবে তারাই নাহয় খাবে। মা তো বলতই “যার কপালে আছে সে-ই খায়। অন্য কেউ পায় না।” বাগানে আর দাঁড়ানো যায় না। গাছগুলোর কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

সিঁড়ির দরজা বন্ধ করতে করতে টুবলু ভাবে বাবা সিদ্ধপুরুষ। নইলে এমন মৃত্যু কজনের হয়? নিজের ভিটেয়, নিজের বিছানায়, ঘুমের মধ্যে? মা তবু স্ট্রোক হওয়ার পরে পঙ্গু হয়ে দিন দুয়েক বেঁচে ছিল। হাসপাতালে মারা গেছে। বাবা সেটুকু কষ্টও পায়নি। সকালে কাজ করতে এসে আরতি পিসি বেল বাজিয়ে সাড়া না পেয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের ডেকে তালা ভেঙে ঢুকেছে, ঢুকে দ্যাখে চোখ বন্ধ — যেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। গায়ে হাত না রাখলে বোঝাও যাচ্ছিল না মারা গেছে।

আরতি পিসির ভালই হল। ওর ছেলেমেয়েরা অনেকদিন ধরে ওকে কাজ ছাড়তে বলছিল। ছেলেরা এখন প্রতিষ্ঠিত এবং বাপ-মাকে ভালবাসে। গ্র্যাজুয়েট মেয়ের বিয়ে হয়েছে প্রাইমারি স্কুলের ক্লার্কের সাথে। ওদের মায়ের লোকের বাড়ি কাজ করার দরকার কী? অন্য সব বাড়ির কাজ ছেড়েও দিয়েছে অনেকদিন। বুড়োমানুষটা একা থাকে বলে এ বাড়িরটা এতদিন ছাড়েনি। আসলে ও কিছুতেই ভুলতে পারে না টুবলুর বাবা-মা ওর মদ্যপ স্বামীকে ধমকে ধামকে, ব্যবসা করার টাকা ধার দিয়ে পথে এনেছিল। নইলে কি আর ছেলেপুলে মানুষ হত?

বাবার খবরটা ফোন করে জানিয়েছিল পাশের বাড়ির অসীমকাকু। এ পাড়ার যা ধারা, শুধু বলেছিল “এখুনি একবার চলে আয় বৌমা আর কোপাইকে নিয়ে। দ্বিজেনদার শরীরটা খুব খারাপ।” শোনামাত্রই বুঝতে পেরেছিল টুবলু। পাড়ার যত লোকের মৃত্যুতে ও শ্মশানে গেছে, সবার আত্মীয়কে ফোনে ঠিক এই কথাটাই বলা হয়েছে যে। আর এভাবে মৃত্যু সংবাদ শোনা হবে না। যে হাউসিং সোসাইটিতে টুবলুদের ফ্ল্যাট সেখানে অত রেখে ঢেকে কেউ কথা বলে না।
সেদিন ভাগ্যিস রবিবার ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে পড়তে পেরেছিল সবাই মিলে। আর ট্যাক্সিটা স্টার্ট দিতেই হঠাৎ টুবলুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল “বাড়িটা আর থাকল না।” কোপাই খেয়াল না করলেও, কথাটার মানে বুঝে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল প্রিয়া। গাড়িটা যখন বিদ্যাসাগর সেতুতে, তখন কান্না সামলে নিয়ে বলেছিল “তুমিও আর বাধা দিও না। বাবাই নেই। বাড়ি থেকে আর কী হবে?”

কিসের বাধা? আর কোন অধিকারেই বা বাধা দিত টুবলু? একটা দিনও এসে থাকার সময় তো তাদের গত দুবছরে হয়নি। ফটোগ্রাফার হিসাবে নাম হয়ে যাওয়ার পর থেকে আজ দিল্লী, কাল মহীশূর, পরশু ফ্র্যাঙ্কফুর্ট — এই তো চলছে। কলকাতায় থাকলেও নানা ব্যস্ততা। দেবপ্রিয়ারও নার্সিংহোম ছেড়ে মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালে যোগ দেওয়ার পরে মাইনের মতই লাফিয়ে বেড়েছে ব্যস্ততা। কোনদিন ছুটি পাওয়া গেলেও সকালে বাবার কাছে এসে রাতে ফিরে যাওয়াই নিয়ম হয়ে গেছে বহুদিন। বাবাই বরং কয়েকবার থেকে এসেছে ওদের ফ্ল্যাটে। মৎস্যমুখীর দিন ফুলকাকা কথাটা তুলতেই এক বারে হ্যাঁ করে দিয়েছিল টুবলু। ওরা সকলে একটু অবাকই হয়েছিল। তারপর মাত্র কয়েকটা মাস লাগল সব ব্যবস্থা করতে। ভুল হল কি? আজ মনে হয় — হল হয়ত।
বাবার খাঁ খাঁ পড়ার ঘরের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ায় টুবলু। আসবাবপত্র সব বেচে দিয়েছে। ওসব ঢুকত কোথায় ঐ ফ্ল্যাটে! শুধু বইগুলো নিয়ে যাচ্ছে। নতুন শেল্ফ বানাতে হয়েছে ফ্ল্যাটের দেয়ালে, তবু বেশকিছু ডাঁই হয়ে থাকবে এদিক ওদিক। পরে দেখা যাবে কী ব্যবস্থা করা যায়। তাক থেকে নামিয়ে ঘরের মাঝখানে মেঝেতে রেখে হিসাব মত আলাদা আলাদা করে বাক্সে পুরে বাঁধতে কাল গোটা দিনটা গেছে টুবলু আর দেবপ্রিয়ার। ভাগ্যিস কোপাই একটা দিন দিদিমার কাছে থাকতে আপত্তি করেনি! আজ ভোরবেলা উঠে চলে গেছে প্রিয়া। হাসপাতাল থেকে জরুরী ফোন। ম্যাটাডোর বলা আছে, এসে যাবে একটু পরেই।

তার আগেই আসার কথা বীরেনকাকুর। ফুলকাকুর বন্ধু বীরেন সরকার — এই এলাকার সবচেয়ে বড় প্রমোটার। এই বাড়িটা ভেঙে বিলাসবহুল বহুতল গড়ার অধিকারটা সে-ই কিনে নিয়েছে। টুবলুর থেকে চাবির গোছাটা বুঝে নিতে আসবে। যে বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে তার আবার চাবির গোছা। টুবলু ফাঁকা বাড়ি কাঁপিয়ে হেসে ওঠে।

অপেক্ষা করা ছাড়া কোন কাজ নেই। একটা বইয়ের বাক্সকে শুইয়ে বালিশ করে নিয়ে ও লম্বা হয়। তখনই চোখে পড়ে একটা বাক্স ফাটিয়ে উঁকি মারছে বাবা-মার বিয়ের অ্যালবামটা। পুরো ফেটে গেলে কাজ বাড়বে। বাঁধনটা খুলে অ্যালবামটা বার করে নিয়ে আবার বেঁধে দেয়। বহুকাল দেখাও হয়নি বটে ছবিগুলো। শুয়ে পড়ে অ্যালবামটা খোলে টুবলু।

প্রথম পাতায় সাঁটা বিয়ের কার্ড থেকে বেরিয়ে আসে প্রজাপতিটা, উড়ে বেড়াতে থাকে সারা বাড়িতে। রজনীগন্ধার সুবাসে ভরে যায় চারিদিক আর বাজতে শুরু করে সানাই। টুবলু চমকে উঠে বসতে যেতেই কে নরম হাতে টেনে কোলে শোয়ায় তাকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ও মা! মা! আরামে চোখ বুজে আসার আগে শোনা যায় বাবার গলা “একটু ঘুমিয়ে নে, টুবলু। অনেকটা পথ যেতে হবে।”

প্রকাশ: কেঞ্চ’স ট্রেস পুজো কমিটির পত্রিকা, অক্টোবর ২০১৯

স্কেল চেঞ্জার

“তোমার গলাটা তো চমৎকার! আর কি সুন্দর উচ্চারণ! পরপর গেয়ে যাচ্ছ অথচ একটা কথাও ভুল হচ্ছে না, সুরও কেটে যাচ্ছে না! নিশ্চয়ই গান শিখেছ?”

কথাটা শুনে ছেলেটা ম্লান হেসে বলল “ভাল লাগে তাই গাই, বৌদি। কোথায় আর শিখব?”

“শুধু ভাল লেগে তো এরকম গাওয়া যায় না, ভাই। আমি গানের দিদিমণি। আমাকে ফাঁকি দেওয়া অত সোজা না।”

“না, আসলে একা একা কাজ করছি তো, গান গাইতে গাইতে করলে কিছু মনেই হয় না। আর করব না। আপনি পেঁপেদাকে কিছু বলবেন না বৌদি।”

“আচ্ছা বলব না। যদি তুমি আমায় সত্যি কথাটা বল।”

“কী কথা?”

“গান কোথায় শিখলে? আর এত ভাল গান জেনে রঙের মিস্তিরির কাজ কেন করছ?”

“শিখেছিলাম মার কাছে।”

“তোমার মা গায়িকা?”

“যেমন তেমন গায়িকা নয়, বৌদি। রেডিওর অডিশনে পাশ করা গায়িকা। রেডিওতে মার গান শুনেছে লোকে। সে অবশ্য আমার জম্মের আগে।”

“বাঃ! তারপর?”

“তারপর আর কী? গরীব লোকের গানবাজনা হয় না।”

“আরে বাবা, তোমায় তো শিখিয়েছেন তারপরেও।”

“সে বড় কষ্টের গল্প।”

“তবু। শুনিই না। দুঃখ ভাগ করলে কমে।”

“কী আর শুনবেন? মামুলি লোকের মামুলি ব্যাপার।”

“তুমি মোটেই মামুলি লোক নও। আমার ষাট বছর বয়স হতে চলল, কোনদিন শুনিনি কোন মিস্তিরি কাজ করতে করতে নিখুঁত সুরে, কথায় এইসব গান গায়। এভাবে মইয়ের উপর দাঁড়িয়ে দেয়াল রঙ করতে করতে গাইতে আমি বাপু পারতাম না।”

“মা এমন করে শিখিয়েছিল যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গাইলেও বোধহয় সুর ভুল হবে না।”

“সেই শেখানোর গল্পটাই শুনি না হয়।”

“আপনি তো ছাড়বেন না দেখছি,” ছেলেটা করুণ হেসে বলে। “আচ্ছা, আমি বরং কথা বলতে বলতে খেয়ে নিই। তাহলে আর সময় নষ্ট হবে না। এ ঘরটা আজ শেষ করে যেতেই হবে।”

রঙের কৌটো আর পাটের তুলিটা হাতে নিয়ে মই থেকে নেমে আসে ছেলেটা। নামিয়ে রেখে হাত ধুতে যায়। পরশু থেকে আমাদের দোতলাটার রঙ শুরু করেছে ও। ছেলের বিয়ে দেব বলে দোতলা করিয়েছি, রঙ করাব গোটা বাড়িটাই। পরশু থেকে কাজে লেগেছে ছেলেটা। এতবড় বাড়ি কখনো একজনে রঙ করতে পারে? সেকথা বলতেই পেঁপেবাবু আমায় আশ্বাস দিয়েছিলেন ওনার দুটো ফ্ল্যাটের কাজ একসাথে চলছে বলে আপাতত একজনকে দিচ্ছেন, পরে আরো একজনকে দেবেন। কিন্তু এ ছেলে তিনদিনে বেশিরভাগটাই সেরে ফেলেছে দেখছি। সেটা আশ্চর্য নয়, আশ্চর্য ওর গান গাওয়া।

মিস্তিরিরা অনেকেই কাজ করতে করতে গান গায়। এ আর নতুন কী? হিন্দি সিনেমার গান গাইতে শুনেছি, বাংলা সিনেমার গান গাইতেও শুনেছি। বিশেষ করে কিশোর কুমারের গান। কিন্তু এই প্রথম শুনলাম কোন মিস্তিরি “এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ” গাইছে। পরশু দুপুরে খেতে বসে প্রথম কানে এল ছেলেটা এই গানটা গাইছে। এসে থেকেই গুনগুন করে কিছু না কিছু গাইছিল, কিন্তু কী গাইছে খেয়াল করিনি এ কাজ সে কাজে। খেতে বসে কানে যাওয়া মাত্রই চমকে গেলাম। প্রথমে ভাবলাম অন্য কোন বাড়ি থেকে আসছে আওয়াজটা। উঠে সিঁড়ির মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম। না, দোতলা থেকেই তো আসছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্যে কয়েক ধাপ উঠলাম। দেখি আমাদের রঙের মিস্তিরিই গাইছে। রঙ গুলতে গুলতে।

সেদিনই ভাল লেগেছিল, তবে ভেবেছিলাম এ আর বলার কী আছে? কিন্তু দুদিন ধরে প্রাণ ভরে অনেক গান শোনার পরে একটু প্রশংসা করতে না পারলে নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল। তার উপর কৌতূহলও হচ্ছিল ভীষণ। দুদিন ধরে বেশ শক্ত শক্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত, সেই উত্তম-সুচিত্রার আমলের বাংলা ছবির গান — এসব গাইতে তো শুনেছিই, এমনকি অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্তের গানও রং করতে করতে কি অনায়াসে গায় ছেলেটা! তারপর আজ সকালে যখন শুনলাম “সুখের কথা বোল না আর, বুঝেছি সুখ কেবল ফাঁকি” গাইছে, তখন নিশ্চিত হলাম এ ছেলে গান শিখেছে এবং খুব মন দিয়ে শিখেছে। নইলে আজকাল দ্বিজেন্দ্রগীতি কজন জানে? সেই ছেলে এই কাজ করে কেন? সেটা না জানতে পারা পর্যন্ত আমার কিছুতে মন বসছিল না।

ছেলেটা খাবে বলে হাত ধুয়ে এসে টিফিন কৌটো খুলে মাটিতে বসতে যাচ্ছিল। আমি বললাম “এখানে বসলে বাপু তোমার কথা শোনা আমার হবে না। এই হাঁটু নিয়ে আমি মাটিতে বসতে পারব না। তুমি নীচে এসো।”

ছেলেটা ইতস্তত করে, তারপর নেমে আসে আমার পিছুপিছু। অনেক করে বলি ডাইনিং টেবিলে বসতে, সে কিছুতেই বসবে না। শেষে আমি বসি চেয়ারে, ও বসে মাটিতে।

“আমার মায়ের নাম কাবেরী। কাবেরী সাহা। রেডিওয় গাওয়ার সময় ছিল কাবেরী দাস,” ছেলেটা বলে। “এখন আর নাম শুনে কেউ চিনবে না। মা যখন সবে আঠারো, তখনই রেডিওর অডিশনে পাশ করে গাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। বছরখানেক গেয়েছিল। তারপরেই আমার দাদু মারা গেল, মায়ের কাকারা ঝটপট বিয়ে দিয়ে দিতে চাইল, কলেজটাও শেষ করতে দিল না। দিদিমা, একা মেয়ে নিয়ে, কী আর বলবে?”

“বিয়ের পরে আর গান গাওয়া হল না?”

“বাবা ওসব পছন্দ করত না যে। আর আমার ঠাকমাও ছিল মহা দজ্জাল। দেখেছি তো।”

“কী করতেন তোমার বাবা?”

“ঐ রেললাইনের ওপারের গদির কারখানায় কাজ করত। আমার ছোটবেলাতেই সে কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে রাস্তার ধারে সব্জির দোকান করেছে, ট্রেনে বাদাম বিক্রি করেছে, ভ্যান রিকশা টেনেছে। কোনটাতেই সুবিধে করতে পারেনি। কারণ নেশা।”

“ইশ! কী পাষণ্ড তোমার মায়ের কাকারা! অমন মেয়েকে এমন ছেলের সাথে বিয়ে দিল!”

“না দিয়ে উপায় কী বলুন? আমার দাদুদের তো নিজেদেরও অবস্থা ভাল ছিল না। মায়ের বাবার ছিল ছোট একখানা সেলুন। ভাইরা একজন হার্ডওয়্যারের দোকানে কাজ করত, আরেকজন কিছুই করত না। আমার বাবার চেয়ে ভাল পাত্র আর পেত কোথায়? নগদ চায়নি বিয়েতে। শুধু একখানা সাইকেল।”

আমি কিছুতেই মানতে পারি না। ছেলেটা আমার মুখ দেখে বিজ্ঞের মত হাসে। রুটি চিবোতে চিবোতে বলে “আপনার এসব শুনতে অদ্ভুত লাগবে। বড় ঘরের মেয়ে আপনি। আপনাদের ঘরে লেখাপড়া করা, গানবাজনা জানা মেয়েদের অমন বিয়ে হয় না তো।”

“তা হয় না। তবে তোমার মায়ের বিয়ে তো আর আজকের কথা নয়। পঁয়ত্রিশ চল্লিশ বছর আগে আমাদের মত পরিবারেও ওরকম হত,” আমি সামলে নিয়ে বলি।

ছেলে আরো বিজ্ঞের মত বলে “আমাদের মধ্যে এখনো হয়।”

“যাঃ!”

“বিশ্বাস হচ্ছে না, না?” হেসে কুটিপাটি হয়ে সে বলে। “আপনি অবশ্য জানবেনই বা কী করে।”

“মানে? তোমার মেয়ে থাকলে তুমি এমন বিয়ে দিতে?”

“নিজের পেটে ভাতের ঠিক নেই, বিয়ে দিলে যদি মেয়েটা খেয়ে পরে বাঁচবে মনে হয়, কেন দেব না?”
“আরে বাবা, গান গেয়েও তো মানুষ পেট চালাতে পারে।”

“ওসব পেটে বিদ্যে থাকলে তবে লোকে বুঝতে পারে। আমার বাপটা ক্লাস এইট পাশ না, ঠাকমা তো অক্ষরই চিনত না। বস্তিবাড়িতে আবার গান।”

“হা ভগবান! কী যে গেছে তোমার মায়ের ওপর দিয়ে।”

“তা গেছে। তবে মা আমার শক্ত লোক। বাবার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে শাড়িতে ফলস লাগানো, ব্লাউজ বানানো — এসব করত। ঠাকমা কিটির কিটির করত, তবু। বাবাও প্রথমদিকে রাগারাগি করত। পরে বুঝে গেছিল মা রোজগার করে বলে নেশা করতে পয়সাকড়ি পাওয়া যায়।”

“তবুও তোমার মায়ের গানের শখ যায়নি, না?”

“যার ভেতর গান আছে, বৌদি, তাকে জলেই ডোবান আর আগুনেই পোড়ান… গান তার মরবে না।”

কথাটা বলে ছেলেটা মন দিয়ে রুটি চিবোয়, আমি ভাবতে চেষ্টা করি আমার ভেতরে গান আছে কিনা। যদি কেউ গান গাইলেই জলে ডুবিয়ে মারবে বলে দাঁড়িয়ে থাকে, তবু কি আমি গাইব? কেউ যদি হাতে মশাল নিয়ে তৈরি থাকে, আমি গাইলেই আমার গায়ে আগুন দেবে, তাও কি আমি গাইতে সাহস করব? পারব না বোধহয়। বড় অস্থির লাগে। ভাবটা কাটানোর জন্যে প্রশ্ন করি “তা তোমায় শেখালেন কী করে সেটা বল।”

ছেলেটা মাথা নেড়ে বলে “আমার যখন বছর পাঁচেক বয়স তখন মা একখানা সেকেন্ড হ্যান্ড হারমোনিয়াম কিনল। সেই নিয়ে বাড়িতে কি অশান্তি, ঠাকমা কি গালাগালটাই না করল মাকে! বলল ‘সংসারের দরকারে হাত দিয়ে পয়সা গলে না, হারমোনিয়ামের পয়সা আসে কোত্থেকে?’ বাবাকে দিল উস্কে, বাবা দিল কয়েক ঘা বসিয়ে।”
আমি শিউরে উঠি।

“কিন্তু মায়ের সেই এক গোঁ ‘ছেলেকে আমি গান শেখাবই।’ তা মারধোর খেয়ে কেনা হল হারমোনিয়াম। যতই মারো আর গালি দাও, মায়ের রোজগারে তখন সংসার চলে। তা এল জিনিসটা।
জম্মে ইস্তক মার কাছে যা গল্প শুনেছি সবই গানের গল্প, বুঝলেন না? মার গুরুদের গল্প, আকাশবাণীতে অডিশন দিতে যাওয়ার গল্প, তারপর মা যে কবার গাইতে গেছিল তার মধ্যে একবার দেবব্রত বিশ্বাস আরেকবার হেমন্ত মুখার্জির পায়ে হাত দিয়ে পেন্নাম করার গল্প… আর মা গুনগুনিয়ে গাইত সারাক্ষণ। দাদু কেমন অনেকদিন ধরে পয়সা জমিয়ে স্কেল চেঞ্জিং হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছিল, সেসব শুনে শুনে তদ্দিনে আমার মুখস্থ। মাকে জিগেস করলাম ‘মা, স্কেল চেঞ্জ করে কী করে?’ মা বললে ‘এতে স্কেল চেঞ্জ হয় না, বাবা। আমার তো অত পয়সা নেই। তোকে গান শেখাব, তুই বড় শিল্পী হবি, তখন কিনবি একটা ভাল স্কেল চেঞ্জিং হারমোনিয়াম। সেইটা নিয়ে তুই ফাংশানে গাইবি, আমি ভি আই পি টিকিটে বসে শুনব।’
প্রথম যেদিন আমার পুরো সরগম হারমোনিয়ামের সাথে মিলল… সেদিন আমায় জড়িয়ে ধরে মায়ের কি কান্না! বাপ রে! তখন তো আর বুঝিনি তার মানে। এখন…”

ওর গলা বুজে যায়, আমি কী বলব ভেবে পাই না। ভেবে ভেবে যে কথাটা একেবারেই বলা উচিৎ ছিল না ঠিক সেটাই বলে ফেলি “মায়ের এত সাধ ছিল, তোমারও তো সাধ্য নেহাত কম নয়। তবু তুমি গান ছেড়ে দিলে, বাবা?”

“ছেড়েছি কি আর এমনি, বৌদি? ঐ সেকেন্ড হ্যান্ড হারমোনিয়ামেই আমার শেখা দিব্যি হচ্ছিল। স্কুলের ফাংশানে গেয়েটেয়ে দিব্যি নামডাকও হয়েছিল মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের কাছে। তারপর যখন ক্লাস এইটে পড়ি, মা বলল ‘আমার যতটুকু বিদ্যে আমি শিখিয়ে দিয়েছি। এবার তোকে আমার গুরুর কাছে দিতে হবে।’ বলে নিয়ে গেল মা যেখানে গান শিখত সেইখানে। গিয়ে দেখি মায়ের গুরু তদ্দিনে থুত্থুড়ে বুড়ো, গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোয় না, কথা বলতে কষ্ট হয়। তবু মাকে ভালবাসতেন বলে নাতনিকে বলে দিলেন আমায় শেখাতে। বিনা মাইনেয়।

দুই কি তিন হপ্তা গেছি, ভদ্দরলোক পটল তুললেন। তারপর থেকে দেখি দিদিমণি আমায় গান শেখাচ্ছে কম, ফাইফরমাশ খাটাচ্ছে বেশি। সবাই ক্লাস করছে আর আমি যাচ্ছি মুদির দোকান থেকে মাল এনে দিতে।”

আমি আর সামলাতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করেই ফেললাম “কার কাছে শিখতে গো?”

ছেলেটা জিভ কেটে বলল “এ রাম! গুরুনিন্দা করে ফেলছি। থাকগে, নাম বলব না। উনি আমায় শেখাতে না চাইলেও আমি তো শিখেছি ওনার কাছে। বদনাম করব না।”

“মানে? বাজার করে করেই শিখলে?”

“উপায় কী বলুন? মাইনে দেওয়া তো আমাদের দ্বারা হত না। আমি রেগে গিয়ে মাকে বলেছিলাম আর যাব না। মা বললে ‘গুরুকে তো দক্ষিণা দিতে হয়। মনে কর এটাই তোর দক্ষিণা। আমরা তো পয়সাকড়ি কিছু দিতে পারি না। মার কথা তো ফেলতে পারি না, তাই দাঁতে দাঁত চেপে শিখেছিলাম চার বছর। তারপর আর হল না।”

“কেন?”

“আমার বাপটার জন্যে। জ্বালিয়ে মারছিল। ‘ছেলে বড় হয়েছে, সংসার চলে না, রোজগার করতে হবে।’ রোজ অশান্তি, রোজ অশান্তি। মাকে ধরে মারবে সে কি আর ঐ বয়সে সহ্য করতে পারি, বলুন? তাই গানও গেল, সেকেন্ড ডিভিশনে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছিলাম, লেখাপড়াও আর হল না। ঢুকে গেলাম ব্যবসায়।”

“কিসের ব্যবসা?”

“কিছুই না। বাবার চেনা জানা ছিল। কিছু টাকা তাদের দিতে হল, তারা সবুজগ্রাম স্টেশনে ডাউন প্ল্যাটফর্মে একটা জায়গা করে দিল; পান, বিড়ি, সিগারেট, চা, বিস্কুটের দোকান খুললাম। মা খুব কান্নাকাটি করেছিল। বলেছিলাম গান আমি ঠিক করে যাব। কিন্তু বললেই কি আর হয়? রেয়াজের সময় কোথায়? তবে প্ল্যাটফর্মে দোকান দেয়ায় হল কি, ট্রেনে যারা বক্স নিয়ে গান গায়, দেখেছেন তো? ওদের সাথে আমার খুব দোস্তি হয়ে গেল। দোকানে কাজ করতে করতে আমি আপন মনে গাইতাম, কেউ শোনাতে বললে শোনাতাম। ঐ করতে করতে আমাকে বিল্টুদা বলে ওদের একজন, খুব বেসুরে গান গাইত, সে বলল ‘তুই এত ভাল গাস, দোকান বিক্রি করে দে। আমার সাথে ট্রেনে গান কর। তুই গাইলে আমি আর গাইব না, তোর সাথে থাকব, পয়সা তুলব। বক্সের খরচা আমার। যা পাওয়া যাবে হাফ তোর, হাফ আমার।’ দিলাম দোকান বেচে বিল্টুদার ভাইকে।”

“ট্রেনে গান গেয়ে দোকানের চেয়ে বেশি রোজগার হয়?”

“অত কিছু ভেবেই দেখিনি তখন। গাইতে পারব এই আনন্দেই আত্মহারা। মা-ও খুশি, তবে বলেছিল ‘কোথায় গাইবার কথা ছিল আর কোথায় গাইবি।’”

“আর তোমার বাবা কিছু বলল না? ঠাকুমা?”

“ঠাকমা তদ্দিনে ওপরে। বাবা চোটপাট করেছিল… কিন্তু আমি জোয়ান হয়ে গেছি, বেশি ঘাঁটাতে সাহস পায়নি। আর মায়ের গায়ে হাত তুললে আমি তখন দেখাতাম মজা।
প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হচ্ছিল, বুঝলেন? আমি তো রবীন্দ্রসঙ্গীত, অতুলপ্রসাদ এইসবই শিখেছিলাম। ট্রেনে ওসব আর কজন ভালবাসে? তারপর বিল্টুদা বলল ‘তুই কিশোরের গান ধর, তোর গলায় ভাল্লাগবে।’ কিশোর আমি শুনতাম এমনিতে, খারাপ লাগত না। তবে হিন্দি গান গাইব? ভাবতেই কেমন লাগত। তা পেটের দায়ে মানুষ কী না করে? তাও করতাম কি, কিশোরের একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে শুরু করতাম। ধরুন ‘মায়াবন বিহারিণী’। তারপর হিন্দি গান ধরতাম। রোজগার যা-ই হোক, লোকের কিন্তু ভাল লাগত। অনেকে পিঠ চাপড়ে প্রশংসাও করত। আর কী চায়, বলুন, একজন গায়ক? কিন্তু ও সুখ টিকল না।”

“কেন? রোজগারে পোষাচ্ছিল না?”

“দাঁড়ান। হাতমুখ ধুয়ে আসি।”

“এই বেসিনে ধুয়ে নাও।”

“না না, আমি হাত ধুলেই রঙ বেরোবে। কলপাড়ে যাই।”

অনেক চাপাচাপি করেও ছেলেটাকে রাজি করানো গেল না। আমি বসে বসে ভাবছি ওটুকু সুখও কেন এই দুঃখী মানুষটার জীবনে সইল না, সে ওদিকে কলপাড়ে টিফিন কৌটো ধুচ্ছে তো ধুচ্ছেই।

“সংসার মোটামুটি চলে যাচ্ছিল, বুঝলেন?” ফিরে এসে শুরু করল। “মার সেলাই ফোঁড়াই আর আমার গানে দুবেলা দুমুঠো আমাদের দিব্যি জুটে যাচ্ছিল। গান গাইতে যাবার সময় পরব বলে একটা ভাল ফুলহাতা সাদা শার্ট, কালো টেরিকটের প্যান্ট আর একজোড়া বুট কিনেছিলাম। লাইনের লোকেরা সেইজন্যে ক্ষেপাত, কিন্তু জামাকাপড়টা ঠিকঠাক না থাকলে, আমার মনে হয়, গানটা ঠিক করে হয় না। শিল্পীর তো একটা ডিসিপ্লিন থাকা উচিৎ নাকি, বৌদি?”

আমি অবাক হতে হতে শুধু মাথাই নাড়তে পারি।

“বছর দুয়েক চালিয়েছিলাম। শুধু ঐ করে তো চলে না। দোলের আগে রঙ বিক্রি, কালীপুজোর আগে বাজি বিক্রি, কখনো ধূপ বিক্রি — এসবও করছিলাম সাথে সাথে। বিয়েও করলাম। ওরম করেই তো সংসার চলে আমাদের। মুশকিল হয় গরীবের ঘরে বড়লোকের রোগে ধরলে। আমারও তাই হল। দু হাজার দশে বাবার ক্যান্সার হল… শালা হবে না কেন? কত লিটার চোলাই যে খেয়েছে…”

“তখনই তুমি অন্য কাজের খোঁজ করলে?”

“না করে আর উপায় ছিল না। মার সামান্য গয়নাগাঁটির মধ্যে খালি একগাছা চুড়ি ছিল, সেগুলোও বেচতে যাচ্ছিল। এরপরে কি আর গানের মায়া করা যায়, বলুন? পেঁপেদার সাথে বিল্টুদাই আলাপ করিয়ে দিল সেইসময়। তখন তো এই কাজ জানতাম না, পেঁপেদা ওর হার্ডওয়্যারের দোকানে কাজ দিল প্রথমে। তারপর আস্তে আস্তে এই কাজ শিখে নিলাম।”

“গান তাহলে সেই থেকে বন্ধ?”

“না, বন্ধ কোথায়? সারাক্ষণই তো গাইছি।”

“না, মানে হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ টেওয়াজ একেবারে বন্ধ।”

“তা বন্ধ। হারমোনিয়ামটা তো সেসময় বেচেও দিতে হল। বাবাকে অত করেও বাঁচানো গেল না, তবে পেঁপেদা ছিল বলে আমার সংসারটা ভেসে যায়নি। বাবা দুটো বছর ভুগেছিল। যা খরচ! শুধু আমাদের টালির চালের বাড়িটা বেচতে বাকি ছিল। পেঁপেদা আমায় অনেক টাকা ধার দিয়েছে। সব এখনো শোধও করতে পারিনি।”

শিল্পীর অপমৃত্যুর এমন গল্প শুনে মনটা ভারী হয়ে গিয়েছিল। ছেলেটা দিব্যি উপরে চলে গিয়ে রঙ করা শুরু করে দিল, আমি অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। কতক্ষণ কেটেছে ঐভাবে খেয়ালও করিনি, হঠাৎ চমকে উঠলাম ওর ডাকে।

“বৌদির তো মনটা বড্ড খারাপ হল দেখছি” একগাল হাসি নিয়ে ছেলেটা সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে বলছে। “অত মন খারাপ করবেন না। গান আমার বাদ যায়নি। মা আছে না? মার কাছে একটা পোকায় কাটা গীতবিতান আছে। ওটা নিয়ে রোজ কিছু না কিছু গায়। রোজ শুনতে পাই বলেই না এত মনে আছে?”

আমি হাসি। ছেলেটা বলে চলে “হারমোনিয়ামও আবার কিনব একটা। আমার মেয়েটাকে মা খালি গলাতেই গাওয়াচ্ছে আজকাল। সুর আছে ওর গলায়। একটা হারমোনিয়াম হলে ভাল করে শিখতে পারবে।”

ওঃ! কি ভালই যে বাসে এরা গানকে! ওদের জন্যে কিছুই কি করতে পারি না আমি? ভাবতেই মনে পড়ে আমার হারমোনিয়ামগুলোর কথা। কিন্তু ও কি নেবে? বলা কি উচিৎ হবে? গোটা দুপুরটা দোনামোনা করে শেষে ছেলেটা কাজ শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলেই ফেলি “তোমার নামটা যেন কী বললে, ভাই?”

“সুবল, বৌদি। সুবল সাহা।”

“আর তোমার মেয়ের নাম?”

“শ্যামা। আমার মায়ের দেয়া নাম।”

“আচ্ছা সুবল, তুমি শ্যামার জন্যে কিরকম হারমোনিয়াম কিনবে ভাবছ?”

“সাধারণ হারমোনিয়াম। নতুন স্কেল চেঞ্জার তো কিনতে পারব না।”

“আমার কাছে একটা ভাল স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়াম আছে। বছরখানেক পুরনো। সেটা নেবে?”

“নেব? আচ্ছা। তবে… দাম দিয়ে নেব কিন্তু।”

আমি নিশ্চিন্ত হই।

“তাই নিয়ো।”

“কাল তাহলে বাড়ি যাওয়ার সময়ে একটা রিকশা ডেকে নিয়ে যাব?”

“তাই কোর। এখন একবার জিনিসটা দেখে যাবে না? পয়সা দিয়ে কিনছ।”

শুনেই সুবলের চোখদুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঠিক যেমনটা আশা করেছিলাম।

আমার গানের ঘরটা খুলে ঐ হারমোনিয়ামটা ওর দিকে এগিয়ে দিই। সুবল একটু বাজিয়ে নেয় প্রথমে। তারপর গাইতে শুরু করে “সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি / দুঃখে তোমায় পেয়েছি / পেয়েছি প্রাণ ভরে।”

প্রকাশ: সৃষ্টি ওয়েবম্যাগ, মার্চ ২০১৯