ভূত বলে কিছু নেই

ভূত বলে কিছু নেই।

লোকের কাছে বুক ফুলিয়ে কথাটা বলে আসছি বহু বছর ধরে, কিন্তু মনে ভয় ছিলই। একলা বাড়িতে ঝড়বৃষ্টির সময় হঠাৎ লোডশেডিং হয়ে গেলে বুকটা যে দুরুদুরু করত না তা নয়। ধরুন স্টেশন থেকে সরু, আধো অন্ধকার গলি দিয়ে শীতের সন্ধ্যেবেলা হেঁটে আসছি, চারিদিকে জনমনিষ্যি নেই। এমন সময় কোন বাড়িতে কথা নেই বার্তা নেই একটা বাচ্চা চিল চিৎকার জুড়ে দিল। অমনি হাতের জিনিসপত্র যে দু একবার রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েনি তাও নয়। সত্যি কথা বলতে কি, একবার তো ভোর রাত্তিরে পায়খানায় বসে বাথরুমের খোলা জানলা দিয়ে কালো মত কি একটা ঢুকছে দেখে এমন চেঁচিয়ে উঠেছিলাম যে সারা বাড়ির লোকের ঘুম ছুটে গিয়েছিল। তবু কিন্তু আমায় দিয়ে কেউ বলাতে পারেনি যে ভূত আছে। কারণ যেটা জানলা দিয়ে ঢুকছিল সেটা আমার চিৎকারে ভয় পেয়ে ধুপ করে বাথরুমের বাইরে সেপটিক ট্যাঙ্কের উপর পড়ে, এবং পড়েই যে আওয়াজটা করে তাতে প্রমাণ হয়ে যায় যে ওটা হল পাড়ার কুখ্যাত কালো বেড়ালটা।

এরকম বেইজ্জতির পরে সকলের চাপাচাপিতে আমি এই পর্যন্ত স্বীকার করেছিলাম যে আমার ভূতের ভয় আছে। কিন্তু ভূত নেই। অবশ্য মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছিলাম সত্যি যদি কখনো ভূতের পাল্লায় পড়ি তা হলে “ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি” ইত্যাদি বলেই দেব। যুক্তি, মান সম্মান পরে, আগে হচ্ছে প্রাণ বাঁচানো। ভূতের যদি মানুষের ঘাড় মটকাতে ইচ্ছে হয়েই থাকে তাহলে আমি যুক্তিবাদী বলে তো আর ছেড়ে দেবে না। বাঁচলে পরে যুক্তি বদলে নেয়া যাবেখন। সেটাই তো বৈজ্ঞানিক, তাই না? ভূত থাকার কোন প্রমাণ নেই এখন অব্দি, তাই বিজ্ঞান বলে ভূত নেই। প্রমাণ পাওয়া গেলে তখন মেনে নিতে অসুবিধা কি যে ভূত আছে? “বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?”

কিন্তু আমার সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। আমি একেবারে নিঃসংশয়ে জেনেছি যে ভূত নেই। ঘটনাটা শুনলে আপনারাও একমত হবেন।

আষাঢ় মাসে আমার বাবা মারা গেলেন। জীবনে প্রথমবার আমার মনে হল, ভূত জিনিসটা থাকলে বেশ হত। কেন জানেন? কারণ কতকগুলো আফশোস রয়ে গেছিল। কিছু ব্যাপারে বাবার কাছে দোষ স্বীকার করব ভেবেছিলাম, সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। তাছাড়া বাবাকে একটা ডাহা মিথ্যে বলেছিলাম, সেজন্যেও ক্ষমা চাইতে ইচ্ছে করছিল খুব। কি আশ্চর্য! বেঁচে থাকতে সাহস হয়নি কথাগুলো বলার, শ্মশান থেকে যেই বাড়ি ফিরলাম, মনে হল এইবার বাবাকে একবার সামনে পাই, সব দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইব। ঠিক পারব।

একথা বাড়িতে কাউকে বললে বিচ্ছিরি নাটক হত। আত্মীয়স্বজনেরা সব ছুটে আসত, কোন পিসিমা কি জেঠিমা ঠিক বুদ্ধি দিত শ্রাদ্ধশান্তি অব্দি এগারো দিন আমার সাথে কাউকে একটা শুতে হবে। নয়ত আমার নিজের ঘরে শোয়া চলবে না, এক তলায় মায়ের পাশে শুতে হবে। ওসব অভ্যেস আমার গত কুড়ি বছর ধরে নেই। এত বছরের অভ্যেস বদলালে ঘুমই হবে না। তাছাড়া বাবা দেখা দিতে চাইলেও পারবে না। কোন কোন আত্মীয় আবার একটু বেশিই ভাল চায়। তারা বলতে পারে আমাকে ডাক্তার দেখানো দরকার। বাবা মারা যাওয়ার পরে কাঁদিনি বলে এমনিই তাদের আমার জন্যে চিন্তায় ঘুম হচ্ছিল না।

অতএব মনে কী আছে সেটা কাউকে বললাম না। যাদের মন্ত্রতন্ত্রে বিশ্বাস আছে তারা আমার জায়গায় থাকলে কোন ওঝাটোঝাকে ধরত। আমার আবার ওসব একদম বুজরুকি মনে হয়। ভূতের ইচ্ছে হলে সে আসবে, নইলে আসবে না। আমার মতই দুটো করে হাত পা, চোখ মুখ, আর হয়ত নাকের উপর একখানা চশমা যে লোকের, সে নাকি এত শক্তি ধরে যে মৃত মানুষের আত্মাকে ডেকে আনতে পারে — এ আমার বিশ্বাস হয় না। তাই আমার অফিসে এক মহিলা ছিল যে প্ল্যানচেট নিয়ে চর্চা করে, কাগজে গা ছমছমে অভিজ্ঞতা লিখেটিখে বেশ নামও করেছে, তার কাছে পর্যন্ত কোন পরামর্শ চাইলাম না।

শুধু একটাই কাজ করলাম। শেষ কয়েক বছর বাবা শুত দোতলায় আমার ঠিক পাশের ঘরে। রোজ রাতে নিজের বিছানা করার আগে ঐ ঘরে বাবার বিছানাটাও আগের মতই করা শুরু করলাম। ঠিক যেভাবে বাবা নিজে করত।

একটা বালিশে শুতে পারত না। একটার উপর আরেকটা চাপাত। দক্ষিণের জানলার দিকে মাথা দিত, পা থাকত উত্তরের দরজার দিকে। সেভাবেই বালিশগুলো পাততাম। বারো মাস খালি গায়ে শোয়া অভ্যেস ছিল। একখানা ফতুয়া বিছানায় বালিশের পাশে যেমন অগোছালো করে রেখে বাবা শুত, ঠিক তেমনি করে রেখে দিতাম। মশারিটা টাঙিয়ে ভেতরে ঢুকে মশা আছে কিনা দেখে নিতাম। থাকলে মেরে দিয়ে বেরোতাম। তারপর আলোটা নিভিয়ে দিতাম। আলো নেভানো হলে বাবা আমায় বলত “একটা জলের বোতল দিস তো।“ আমি তাই একখানা জলভর্তি বোতল মশারির ভেতর রেখে দিতাম। উত্তরের বারান্দায় যাওয়ার রাস্তাটা থাকত খোলা, দক্ষিণে বাথরুমে যাওয়ার দরজাটা থাকত ভেজানো। তাই করতে থাকলাম। বাবাকে রাতে বারবার উঠতে হত, তাই বাথরুমের আলোটা জ্বালাই থাকত। তাও করলাম।

কিন্তু এসব করেও লাভ কিছু হল না। এগারো দিনে শ্রাদ্ধ আর তেরো দিনে মৎস্যমুখী দিব্যি কেটে গেল। প্রতি রাতেই আমি নিজের ঘরে শুয়ে অপেক্ষা করতাম। একবার যদি বাবার গলা খাঁকারি শোনা যায়, কি বাথরুমের দরজাটা খোলার শব্দ পাওয়া যায়। কিন্তু রোজই একটু পরেই ঘুম এসে যেত। এক ঘুমে রাত কাবার। সকালে ঘুম থেকেই উঠেই বাবার ঘরে গিয়ে দেখতাম বালিশগুলো ব্যবহার হয়েছে কিনা, ফতুয়াটা আলনায় ফিরে গেছে কিনা, বোতলে জল একটুও কমেছে কিনা। নাঃ! কিচ্ছু হল না একদিনও।

লোকে তো বলে শাস্ত্রে নাকি আছে শ্রাদ্ধশান্তি হওয়া অব্দি মৃতের আত্মা বাড়ির চারপাশেই ঘুরে বেড়ায়। সেই কদিনেই যখন কিছু হল না, কাজকর্ম সব মিটে যাওয়ার পরে কি আর কোন আশা আছে? হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু ভাবতে ভাবতে মনে হল, ওসব অং বং চং মন্ত্রে আবার কিছু হয় নাকি? যত্তসব কুসংস্কার। তাছাড়া আমার বাবা ছিল নাস্তিক লোক। সেই লোকের উপরে ওসব মন্ত্র আরোই কাজ করবে না। বরং এই কদিন বাড়িতে বারবার লোকজন আসছিল। হৈ চৈ তে হয়ত বাবার আসতে ইচ্ছেই করেনি। এবার সব ঠান্ডা হয়ে গেল, এখন হয়ত আসতে পারে।

মৎস্যমুখীর পরদিন থেকে আবার কাজে যোগ দিলাম। আমার প্রেসের চাকরি। বাড়ি ফিরি রাত আড়াইটে তিনটেয়। অত রাতে এসে নিজের বিছানা করতেই আলস্য লাগে, সেখানে দুটো বিছানা করা দুষ্কর। তাই দুপুরে অফিস যাওয়ার আগেই বাবার বিছানাটা করে দিতে লাগলাম। মা, বোন বা কাজের লোক উপরে এসে ওরকম দেখলে সেটা আবার চাউর হয়ে যাবে, সব প্ল্যান যাবে ভেস্তে। তাই বিছানা করে ঘরের দরজায় তালা দিয়ে দিতাম। প্রথম দিন দেখতে পেয়ে মা জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁ রে, তুই ও ঘরের দরজায় তালা দিয়েছিস কেন?” মুখে যতটা সম্ভব বিষণ্ণতা এনে বললাম “বাবার জিনিসপত্রগুলো দেখলে স্থির থাকতে পারি না, মা। ও ঘরটা বন্ধই থাক।“ মায়ের তো সাদা মনে কাদা নেই। বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিল।

এই ব্যবস্থায় বাবার দুটো সমস্যা হওয়ার কথা। এক, বাথরুমে যেতে পারবে না। কারণ আমি অফিস যাওয়ার আগে যদি আলোটা জ্বেলে রেখে যাই তাহলে কেউ উপরে এলে সে ভুল হয়েছে ভেবে ঠিক নিভিয়ে দেবে। আর উত্তরের দিকের দরজাটা খোলা রাখলে ঘরে ঢুকে পড়ে সব দেখতে পেয়ে যাবে। এটুকু বাবাকে মানিয়ে নিতেই হবে। অবশ্য আমি অফিস থেকে এসেই জামাকাপড় না ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে বাথরুমের আলোটা জ্বেলে ওদিককার দরজাটা খুলে দিই। মুখ বাড়িয়ে বলি “বাবা, আলো জ্বেলে দিয়েছি। এবার বাথরুম ঘুরে এস।“

কিন্তু এত কান্ড করেও কোন লাভ হল না। মাসতিনেক কেটে গেল। বাবার দিক থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। শ্রাদ্ধের পর থেকে কিন্তু আমার আর ঘুম আসে না। অফিসে কাজ করতে করতে ঢুলে পড়ি, বসের ধমক খাই।

আমার অপরাধবোধ বেড়েই চলে। অসুস্থ হয়ে পড়ার আগের কয়েক মাস প্রচন্ড গরমে বাবা ঐ ঘরটায় শুত আর আমি এ ঘরে এ সি চালিয়ে শুতাম। বলেছিলাম আমার সাথে শুতে, কিন্তু বাবা রাজি হয়নি। বলেছিল “আমার এ সি তে একটু পরেই নাক টাক বন্ধ হয়ে যায় রে। ঘুম হয় না। তুই শো। অফিস থেকে খেটেখুটে আসিস। আমার অসুবিধা হচ্ছে না।” আমি রোজ রাতে ভাবি, একটিবার যদি বাবা দেখা দেয়, শেষবারের মত একবার বাবার পাশে শুয়ে নেব। স্কুলে পড়ার সময় অনেক দুষ্টুমি করে এসে রাতে বাবার সাথে শুয়ে বলতাম অমুকটা করে ফেলেছি। বলে ভয়ে চুপ করে থাকতাম। বাবা কয়েক সেকেন্ড পরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলত “নিজে থেকে বলেছ ভাল করেছ। তার মানে তুমি বুঝেছ কাজটা অন্যায় হয়েছে। আর কখনো কোর না।“ সে কাজ সত্যিই আর কখনো করতাম না আমি।

ভাবি আর একটিবার বাবার পাশে শুতে পেলে অমনি করে বলব “বাবা, আমি তোমায় হাসপাতালে মিথ্যে বলেছিলাম। আমি তখনই জানতাম তোমার আয়ু আর এক মাস। ডাক্তার সেদিন তাইজন্যেই বাড়ি নিয়ে আসতে বলেছিলেন। সেকথা তোমায় বলি কী করে? তাই বলেছিলাম ‘তোমার শরীর এখন অনেক ভাল। কেমো দিতে লাগবে না।“

কিছুতেই কিছু হচ্ছে না দেখে আমি বাবার বিছানাতেই শুতে শুরু করলাম। তাতে যদি বাবার সুবিধা হয় আসতে। মাসছয়েক হয়ে গেল, কিছুই ঘটেনি। তবে আজকাল আর জামা গায়ে শুতে পারি না, তাই জামাটা খুলে মাথার কাছে রাখি। জলের বোতল তো বিছানাতেই থাকে, তেষ্টা পেলে তাই অসুবিধা হয় না। বারবার বাথরুম যেতে হয় বটে, তাতেও অসুবিধা নেই। ওদিকের দরজাটা তো ভেজানোই থাকে, বাথরুমের আলোটাও জ্বালা থাকে।

মা, বোন কেউ কিছু টের পায়নি। ওরা জানে বাবার ঘর বন্ধই থাকে। শুধু যখন মাঝে মাঝে মাকে “শিখা” আর বোনকে “বুড়ি” বলে ডেকে ফেলি, ওরা চমকে ওঠে। বোন তো একদিন বললও “দাদা, এইভাবে যখন তখন ভয় দেখাবি না তো। আমার নাহয় অল্প বয়স। মার কোনদিন হার্ট ফেল করে যাবে। আর তুই এত ভাল গলা নকল করতে শিখলি কোথায়?” আমি মোটেও গলা নকল করতে পারি না। কে জানে ওদের কেন আমার ডাক শুনে মনে হয় বাবা ডাকল? তবে ব্যাপারটা আমার ভালই লাগে৷

আরো ভাল লাগে যখন দেখি আমার অসভ্য বসটি এমনভাবে আদেশ করে যেন অনুরোধ করছে। ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ঋত্বিকের মতে “সেই যে সেদিন বসকে সবার সামনে প্রচন্ড ধমকালে? তারপর থেকে আর তোমায় ঘাঁটাতে চায় না।“ ছেলেটা মহা গুলবাজ। বসকে ধমকেছি আমি! সূর্য পশ্চিমে উঠলেও সম্ভব না। কদিন অন্যমনস্ক ছিলাম, সেটার সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে একটা গল্প বানিয়ে আমাকে তুষ্ট করার চেষ্টা আর কি। ওর প্রমোশন আমার হাতে যে।

বাবা মারা গেছে এক বছর হতে চলল। এতদিনেও যখন কিছু হল না, ভূতের উপর বিশ্বাস রাখার কি আর কোন যুক্তি আছে, বলুন?

প্রকাশ: ফেসবুক

চিরকুট

বহু বছর পর, আজ সুখেন্দুর অফিস থেকে বেরনোর তাড়া নেই।

কাজ শেষ, সবাই বেরোবে বলে তোড়জোড় করছে, সুখেন্দু দেখছে আর ভাবছে — এরা কেউ সোজা বাড়ি যাবে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা করে আড্ডা মারবে কোথাও, কেউ পরকীয়া প্রেম করবে, কেউ নাইট শোতে সিনেমা দেখে রেস্তোরাঁয় খেয়ে বাড়ি ফিরবে বেশ রাতে। শুক্রবারের সন্ধ্যে এসে পড়লেই কত মনোরম দৃশ্যের জন্ম হয় এই শহরে, সেসব দৃশ্যের অভিনেতা অভিনেত্রীদের আরো কত দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা থাকে শনি, রবিবার নিয়ে। তাই এত তাড়া। সুখেন্দুর কল্পনা নেই, পরিকল্পনা নেই। ফলত তাড়া নেই।

কি বোর্ডটাকে মনিটরের কোলে তুলে দিয়ে ডেস্কে এক চিলতে জায়গা বার করে হাতে মাথা রেখে চোখদুটো বুজে ফেলে মনে হয় — মন্দ কী? সাত বছর ধরে সারাদিন যা ব্যস্ততায় কেটেছে, এখন নির্জন অবসরে সেসব রোমন্থন করেই তো দিব্যি চলে যাবে। শরীরেরও তো সহ্যের সীমা আছে। চঞ্চলতা সহ্য করা আর তার পক্ষে সম্ভব হবে না। আর তো একটা সপ্তাহ। তারপর যেটুকু দৌড়াদৌড়ি করতে হয় অফিস যেতে, সেটুকুও থাকবে না। অখন্ড অবসর। কল্পনার সাথে।

মিনিট খানেক জিরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে সুখেন্দু টের পায় একটা চিনচিনে ব্যথা বাঁ কাঁধ বেয়ে নামছে, হাতটা ভারী হয়ে উঠছে। ভাগ্যিস এসব ব্যথা বেদনা গত সোমবার অব্দি লুকিয়ে ছিল। নইলে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে দৌড়ে মেট্রো ধরে সাড়ে পাঁচটায় হাসপাতালে পৌঁছে এক ঘন্টা কল্পনার সাথে গল্প করে গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাটে ফিরে রান্নাবান্না করে খেয়ে সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে কল্পনার নির্দেশ মত বাড়ির সব কাজ সেরে ঠিক সাড়ে দশটায় অফিসে আসার ধকল এই আটান্ন বছরের শরীরটা নিত কী করে?

কল্পনার তো কিছুতেই বিশ্বাস হত না সুখেন্দু একা একা সব ঠিকঠাক করে নিতে পারে। তাই শেষদিকে মোবাইলে ছবি তুলে এনে দেখাতে হত।

দেখে কল্পনা লিখত “ভালই হয়েছে৷ কিন্তু মাটিটা আরেকটু কুপিয়ে দিতে হত। আর গৌরাঙ্গর মা দেখছি খুব ফাঁকি দিচ্ছে। থালায় মুখ দেখা যাচ্ছে কই?”

উত্তরে সুখেন্দু “উফ! কিছুতেই তোমায় সন্তুষ্ট করতে পারলাম না।”

মুচকি হেসে কল্পনা লিখত “পরের জন্মে আবার গোড়া থেকে চেষ্টা কোর।”

বৃষ্টির দিনগুলোয় কল্পনার ভারী আহ্লাদ হত। যাওয়া মাত্রই লিখত “জানলার পাশে বস। গান গাও।”

“যাঃ! পাশের কেবিনের পেশেন্টরা বিরক্ত হবে।”

“হোক। এদের তো জীবন পড়ে রয়েছে। তুমি তো আমার জন্যে গাইছ। আর তো বেশিদিন শুনতে পাব না। গাও।”

এরপর না গেয়ে উপায় কী?

গত সপ্তাহে অবশ্য এই ঠান্ডার মধ্যেও ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ়’ গাইতে হল বার পাঁচেক। কারণ কল্পনা লিখল “এটা ফুলশয্যায় গেয়েছিলে। সামনের বর্ষা অব্দি থাকা হবে না। এখনই শুনিয়ে দাও।”

ভোকাল কর্ডটা বাদ দেওয়ার কথা যখন ডাক্তার মন্ডল বলেছিলেন তখন সুখেন্দু ভেবেছিল কল্পনা আপত্তি করবে। গান গাওয়া বন্ধ হলে সেই কষ্টেই ও মারা যাবে। ডাক্তার যে ভাবছেন “লাইফ এক্সপেকট্যান্সি” বাড়বে, সে মোটেই হবে না। অবাক কান্ড! কল্পনা কিন্তু এক কথায় রাজি হয়ে গেল। অপারেশনের পর থেকে ও-ই বুদ্ধি করে চিরকুটে কথা বলা চালু করল। ভাগ্যিস। একের পর এক অর্গান ফেল করা সত্ত্বেও শেষ দিন কোমায় চলে যাওয়া অব্দি কথাবার্তা তো চালিয়ে যাওয়া গেল।

অফিস থেকে এক সময় বেরোতেই হল। বাসে উঠে জানলার সিটটা পেয়ে গেল সুখেন্দু। তারপর হাতের ব্যাগ থেকে বের করল চিরকুটের তাড়াটা। পড়ছে আর আপন মনে হাসছে। ভিড় বাড়ল, সুখেন্দুর ভ্রূক্ষেপ নেই। একটু দূরে বসা অল্পবয়সী ছেলেটি পাশে বসা বান্ধবীকে হোয়াটস্যাপ করল “এই বয়সেও বুড়োর রস দেখেছিস?”

প্রকাশ: ফেসবুক

ভগবান নেই?

পুলিন অন্ধ। মাথারও ঠিক নেই। পাড়ার ছেলেপুলেরা তাই দেখতে পেলেই পেছনে লাগে, আর পুলিন রেগে গিয়ে মুখ খারাপ করে। আগে বাড়ি বাড়ি ধূপ বিক্রি করে পেট চলত, ক বছর হল টাকাপয়সার হিসাব রাখতে পারে না। কার কাছে পায় আর কে ওর কাছে পায় কিছুই খেয়াল থাকে না, লোকেও ঠকিয়ে নেয় ইচ্ছে মত, ব্যবসা লাটে উঠেছে। কেউ দয়া করে দু পয়সা দিলে দুটো খাওয়া হয়। সব দিন হয় না।

বাঁড়ুজ্জে বাড়ির গিন্নী কিন্তু খেয়াল রাখেন। ধূপ কিনতে হলে ওর থেকেই কেনেন, তখুনি পয়সা দিয়ে দেন। এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা পুলিনকাকু বলে, পেছনে লাগে না। তাই এ বাড়িতে পুলিন ঘন ঘন আসে, যতগুলো প্যাকেট পারে বেচে দিয়ে যায়। গিন্নী হিমসিম খান বোঝাতে যে পরশুই তিন প্যাকেট দিয়ে গেছে, এখন আর কেনা যাবে না। পুলিন পীড়াপীড়ি করে, তারপর হতাশ হয়ে লাঠি ঠকঠক করতে করতে ফিরে যায়। গিন্নীর মনটা ভার হয়ে থাকে সারা বেলা।

কর্তা একদিন পুলিনকে বললেন “তোমার প্রতিবন্ধী কার্ড আছে?” পুলিন ওসব জানত না। তা কর্তা বললেন “একদিন এসো, চিঠি লিখে দেব। করিয়ে নিলে অনেক সুবিধা। ট্রেনে, বাসে ভাড়া লাগবে না।” পুলিন করিয়েছিল।
পুলিনের মাংস ভাত খাওয়ার সাধ। একদিন মুখ ফুটে বাঁড়ুজ্জে গিন্নীকে বলেই ফেলল। গিন্নী কর্তাকে বলতে তিনি বললেন “বেশ তো। এই সোমবারে তো মাইনে পাব। ওকে সামনের রোববার খেতে বলে দাও।”

ডাল, ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি আর মুরগির ঝোল। পুলিন চেটেপুটে খেল। তারপর এক গেলাস জল খেয়ে যে তৃপ্তির হাসি হাসল, গিন্নী তা দেখে চোখ মুছলেন। মানুষটা অনেককাল পেট ভরে খায়নি নিশ্চয়ই। মাস খানেক পরেই পুজো। কর্তা পুলিনের জন্যে একখানা শার্ট কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন। হাতে দিয়ে গিন্নী বললেন “তোমার জামাটা একদম ছিঁড়ে গেছে গো। এটা পরে নিও।” পুলিন ব্রাউন কাগজের প্যাকেটটায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল “কী রঙ, বৌদি?” “কচি কলাপাতা।”

এসব পুলিনের জোয়ান বয়সের কথা। এখন ওর অনেক চুল পেকে গেছে। মাথাটা আরো খারাপ হয়েছে। চেনা পাড়াতেও রাস্তা হারিয়ে ফেলে। বাঁড়ুজ্জে গিন্নী মাঝে মাঝে ভাবেন, লোকটা গেল কোথায়? আজকাল তো আর এদিকে আসেই না। বেঁচে আছে তো?

অনেকদিন পর ঘুরতে ঘুরতে সেদিন ও পাড়ায় গেছে বাঁড়ুজ্জেদের বাড়ি যাবে ভেবেই। ধূপ আর বেচা হয় না, তবু। পাগলের খেয়াল। গিয়ে শোনে চারদিকে বড্ড হৈ চৈ, অনেক লোক। “বলো হরি হরিবোল।” কাকে যেন সাবধানে ম্যাটাডোরে তুলতে বলছে সবাই।

“কে গো? কে মারা গেল?” জিগেস করতে করতে মুখ ব্যথা পুলিনের। সবাই ভীষণ ব্যস্ত, পাগলের কথার জবাব দেয়ার সময় নেই। শেষে বয়স্ক একজন বেজায় বিরক্ত হয়ে বললেন “আঃ! কিছুই খবর রাখো না? এত বড় মানুষটা এই বয়সে চলে গেল?”

“কে? কার কথা বলচেন?”

“আরে কে আবার! বাঁড়ুজ্জে মশাই। আহা, সবে ষাট হয়েছিল গো…”

পুলিন হঠাৎ, কে জানে কার উপর রেগে গিয়ে চেঁচাতে শুরু করল “অ্যাঁ! বাঁড়ুজ্জে মশাই নেই! কেন? কেন থাকবেন না? উপরে ভগবান নেই? ভগবান দেখছেন না? দেখবেন না আমাদের?” পাড়ার লোকে অনেক কষ্টে পুলিনকে চুপ করাল, বলল “শোকের জায়গায় চেঁচামেচি করতে নেই।”

প্রকাশ: ফেসবুক