নাম তার ছিল: ৩

পূর্বকথা: উদ্দালক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে জানার পর থেকে রবীন দিশাহারা। লেখাপড়ায় ভাল, এলাকায় জনপ্রিয় একজন তরুণ পার্টিকর্মী কেন আত্মহত্যা করবে তা রবীনের কাছে রহস্য। কিন্তু স্ত্রী জোনাকি এর মধ্যে কোন রহস্য খুঁজে পায় না। তার ধারণা এই আত্মহত্যার কারণ ব্যর্থ প্রেম। এই ব্যাখ্যায় রবীন অবশ্য সন্তুষ্ট হতে পারে না। উদ্দালকের কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে নিজের যৌবনের কথা। সেই স্মৃতিতে প্রেমের স্থান সামান্য। মায়ের মৃত্যু, রাজনীতি, গ্রেপ্তার হওয়া — এসবই প্রায় সবটা অধিকার করে আছে। আর কিছু আছে কি?

পরাজিতের কোন ইতিহাস নেই। কথাটা জনপ্রিয় হলেও সত্য নয়। কারণ আজ যে পরাজিত কাল সে-ই জয়ী হবে, আজকের জয়ীকে হার স্বীকার করে নিয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করতে হবে সেদিন। ইতিহাসও নতুন করে লেখা হবে। আসলে ইতিহাস নেই তাদের, যারা জয়ের কাণ্ডারী ছিল কিন্তু জয়ের অপব্যবহার মেনে নিতে পারেনি, জয়ীর স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সময়ে প্রতিবাদ করেছে, আটকানোর চেষ্টা করেছে, না পেরে নীরবে সরে গেছে অথবা গলাধাক্কা খেয়েছে। যখন স্বৈরাচারের অবসান হয় তখন নতুন জয়ী এদের স্বৈরাচারের সৈনিক হিসাবেই গাল পাড়ে, আঁচড়ায় কামড়ায়, তফাত করতে পারে না। অথবা করতে চায় না। এমন হতভাগ্যের অভাব হয় না কস্মিনকালে। তেমনই একজন রবীন ঘোষাল।

সবুজগ্রামের দক্ষিণপাড়ার মুখেই একটা দোতলা বাড়ি। সারা সপ্তাহ দিনের বেলায় নিঝুম পুরী। তবে প্রতি সন্ধ্যায় এক দশাসই ভদ্রমহিলা দরজার মুখে বসে থাকেন পালিশ চটে যাওয়া কাঠের চেয়ারে। মাথার চুল কমে এসেছে, যা আছে তা-ও সাদা। ও পাড়ায় এমন কেউ নেই যাকে উনি চেনেন না, পথনির্দেশ দিতেও ক্লান্তিহীন। দোষের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই। কোন অচেনা পথিক কারোর বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন, সঙ্গে জুড়ে দেন “ওদের বাড়ি কার কাছে যাবেন?” উত্তর পেলে পরের প্রশ্নটা হয় “ওর কাছে কী দরকার গো?” এই অনধিকার চর্চার জন্ম একাকিত্বে। স্বামী গত হয়েছেন বছর দশেক। ছেলে, ছেলের বউ বহুজাতিকের ঘানি টানতে যায় ভোর ভোর, ফেরে সন্ধ্যে উতরে গেলে। খেতে, ঘুমোতে। ভদ্রমহিলার ধারণা ওদের মৈথুনের সময়টুকুও নেই। নইলে নাতি-নাতনির দাবী ওরা হেসে উড়িয়ে দিত না এত বছর ধরে। এক সময় সারাক্ষণ বাড়িতে চেনা অচেনা লোকের আনাগোনা লেগেই থাকত, এখন ডেকে ঘরে আনতে চাইলেও কেউ আসে না বড় একটা। কথা না বলতে পেরে উনি হাঁসফাস করেন। তাই কাউকে একবার হাতে পেলে উনি নানা ছলে কিছুক্ষণ কথা বলবেনই। আজকাল ওঁর নতুন বিপদ হয়েছে স্মৃতিভ্রংশ। খানিকক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাও বেমালুম ভুলে যান। কী যেন করার ছিল, মনে পড়ছে না — এই যন্ত্রণা নিয়েও দিনের অনেকটা সময় কাটে ওঁর। তবে বহু পুরনো ঘটনা এখনো ছবির মত মনে আছে। ইনি জোনাকি ঘোষাল — রবীন ঘোষালের স্ত্রী।

বৃদ্ধা জোনাকিকে দেখে কল্পনা করা শক্ত উনি এক সময় শঙখবেলার মাধবীর মত ছিপছিপে ছিলেন। দুদিকে তখন দুটো লম্বা বেণী ঝুলত। সাজগোজের দিকে একেবারেই নজর ছিল না তখন, মনোযোগ বেশি ছিল বই পড়ায়, সৌন্দর্য যা ছিল সে দুই চোখে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। তখনকার সেই বই থেকে মুখ না তোলা জোনাকি দুম করে প্রেমে পড়ে গেল। বইয়ের জন্যই।

আসলে পাঠ্য বইয়ের প্রতি জোনাকির বিশেষ আগ্রহ ছিল না, ছিল অপাঠ্যের প্রতি। ফলে পাড়ার লাইব্রেরিটাই ছিল বিকেলের ঠিকানা। বুড়ি লাইব্রেরিয়ানের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে বরানগরে দিদিমার কাছে মানুষ মেয়েটার খুব একটা বন্ধুবান্ধব ছিল না, তাই লাইব্রেরিয়ান মাসির সাথে গল্প আর তাঁর কাজে সাহায্য করেই সবচেয়ে ভাল সময় কাটত।

লাইব্রেরিয়ান মাসির প্রিয় পাত্র ছিল ঝোটন। পাড়ারই ছেলে। ওকে ভালবাসে না এমন লোক পাড়ায় ছিল না। যেমন ফুটবলার তেমন উপকারী। যত ভাল ছাত্র তত ডানপিটে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, এক মাথা চুল, গায়ের রং অমাবস্যার আকাশের মত কিন্তু পৃথিবীর সব আলো যেন ওর চোখে। এমন নয় যে ঐ চোখের দিকে জোনাকি আগে কখনো তাকায়নি। কিন্তু লাইব্রেরিতে বসে গল্প করতে করতে সে প্রথম বুঝতে পারে কোন আলোয় অত উজ্জ্বল চোখ দুটো। ঝোটন প্রায়ই গল্প করতে এসে ঝগড়া বাধাত মাসির সাথে — অমুক বইটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়। তমুক লেখক এখন আর লেখক নেই, দালাল হয়ে গেছে। এখন চাঁদ ফুল এসব নিয়ে ঘ্যানঘেনে কবিতা লেখার সময় নয়।

এসব কথা শুনে প্রথম প্রথম ভারী অবাক লাগত জোনাকির। তার চেয়ে মাত্র বছর দুয়েকের বড় ছেলে। সে এত জানল কোত্থেকে! এত অন্যরকম বই সে পড়ল কোথায়! মাসির মত পড়ুয়া মানুষ জোনাকি আর দ্যাখেনি। লাইব্রেরির কোন তাকের কোন কোণে কোন বইটা আছে তা মাসির হাতের তালুর মত জানা। কোন বইয়ের কোন পাতায় কী আছে তা-ও ঠোঁটস্থ। তিনিও অনেক সময় তর্কে পেরে ওঠেন না ঝোটনের সঙ্গে। হয়ত বলেন “আচ্ছা দিয়ে যাস। পড়ে দেখি কী এমন নতুন কথা লিখেছে তোর সরোজ দত্ত।” গোড়ার দিকে ওদের তর্কে একরোখা হয়ে তর্ক করত জোনাকি। করবে না-ই বা কেন? তারাশঙ্করকে কেউ বলবে “জোতদার জমিদারদের লোক” আর সে চুপ করে থাকবে, তা হয় না। মাঝেমধ্যে তো রবীন্দ্রনাথকেও উড়িয়ে দিত ঝোটন। গা পিত্তি জ্বলে যেত জোনাকির। তারপর হল কি, মাসির জন্যে ঝোটনের আনা বইগুলো কেড়ে নিয়ে আগে সে-ই পড়তে শুরু করল। আর পছন্দ অপছন্দগুলো কেমন গুলিয়ে যেতে শুরু করল।

লাইব্রেরি থেকে উত্তরমুখো মিনিট পাঁচেক হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই জোনাকিদের বাড়ি। তবু বকবক করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে গেলে মাসি কিছুতেই ওকে একা ছাড়ত না। ঝোটনকে বলত “একটু পৌঁছে দিয়ে আয় না, বাবা।” আসলে সময়টা ভাল না। বরানগরে তো আরোই ভাল না। মারামারি, খুনখারাপি লেগেই আছে।

ঐ পাঁচ মিনিট হাঁটতে গিয়ে এমন কোন কথা শুরু হয়ে যেত যা বাড়ির দরজায় গিয়ে শেষ হত না। জোনাকির দিদিমা দরজা খুলেই হয়ত বলতেন “ঝোটন একটু বইস্যা যা। বেগুনি করতাছি।” ঝোটনকে টানত বেগুনি আর জোনাকিকে টানত ঝোটনের কথা। আরো ঘন্টাখানেক চলত আড্ডা। তার ফলে এমন অনেক বই আসতে শুরু করল জোনাকির হাতে যেগুলোর খবর লাইব্রেরিয়ান মাসিও পেত না। ঝোটন হয়ত নিয়ে এল লেনিনের ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’, এডগার স্নোয়ের লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ আর ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’। মাসির কাছে পৌঁছল শুধু শেষেরটা, বাকি দুটো লাইব্রেরিতে ঢোকার আগেই চালান হয়ে গেল জোনাকির স্কুলফেরত ব্যাগে। ইংরিজি বই পড়ার অভ্যেস ওর ছিল না। কিন্তু ঝোটন বলেছিল “রাশিয়া থেকে বেশকিছু জরুরী বই এখন বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে। কিন্তু সব তো হয়নি। তা বলে কি হাপিত্যেশ করে বসে থাকবি? জীবন খুব ছোট। ইংরিজিতেই পড়ে ফ্যাল।”

এরকম চলেছিল বছর দুয়েক। শেষের দিকে শুধু বই নয়, এক আধ লাইন চিঠিরও আদানপ্রদান হত। জোনাকিই প্রথম জানিয়েছিল তার মুগ্ধতার কথা। জানিয়ে ফেলেছিল বলা উচিৎ।

আসলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার বেশ কিছু অভিযোগ থাকলেও মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে তাঁর গান গেয়ে উঠত ঝোটন। দু লাইন গেয়েই বলত “আহা! এই গানটা জর্জ বিশ্বাসের গলায় যা লাগে…”। জোনাকি সেরকম গানের একটা তালিকা করেছিল গোপনে। ভেবেছিল ছোটমামার সাথে শ্যামবাজার গিয়ে খুঁজে খুঁজে কিনে আনবে রেকর্ডগুলো। সেই চিরকুটটা রাখা ছিল ঝোটনের পড়তে দেওয়া ‘ইস্পাত’ এর ভেতর। ফেরত দেওয়ার সময় আর মনে নেই। সেই চিরকুট দেখে ছেলে সোজা এসে প্রশ্ন করে “তুই কি আমাকে ভালবাসিস?”

লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে আচমকা এই প্রশ্ন বড় বিপদে ফ্যালে জোনাকিকে। সে আর তাকাতে পারে না ঝোটনদার দিকে। কী উত্তর দেওয়া উচিৎ তা না ভেবে সে ভাবতে থাকে ঝোটন জানতে পারল কী করে এবং এ জন্যে কী শাস্তি তাকে দেবে। কারণ জোনাকির এ নিয়ে কোন সন্দেহই ছিল না যে সে ঝোটনের প্রেমের যোগ্য নয়। ঝোটনের মত অত বড় মন তার নেই। চা বাগানের শ্রমিকের অন্নচিন্তায় রাতের ঘুম ওড়ে না তার। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে চীনের পার্টির কোথায় তফাত তা-ও সে সবে বোঝার চেষ্টা করছে। মুখ নীচু করে নীরবে হাঁটতে হাঁটতে যখন জোনাকির গাল ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে, তখন তার হাতে চিরকুটটা গুঁজে দেয় ঝোটন। দিয়ে বলে “ছেলেমানুষী করিস না।”

বটেই তো। ছেলেমানুষী ছাড়া আর কী? জোনাকি সেদিন ভেবেছিল ঝোটনের সাথে সম্পর্ক বুঝি ঘুচে গেল। কিন্তু পরদিন স্কুল থেকে লাইব্রেরির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্যাখে নেতাজি ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে সে। ইদানীং আর আগের মত অত ঘন ঘন লাইব্রেরিতে যায় না ঝোটন। পরপর দুদিন তো নয়ই। তবু আজ দাঁড়িয়ে! জোনাকি ভেবে পায়নি কোন দিক দিয়ে পালাবে। পা দুটো পাথর হয়ে যাওয়ার যোগাড়। বোধহয় বুঝতে পেরেই ঝোটন এগিয়ে এসে তার হাতে ধরিয়ে দেয় একটা বই, বলে “এবার এটা পড়ে ফ্যাল।” কী বই সেটা দেখার আগেই জোনাকির চোখে পড়ে পেজ মার্কের মত বেরিয়ে রয়েছে একটা লাইন টানা কাগজ। “লাইব্রেরি যাবি তো?” বলেই উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ওর সাথে হাঁটতে শুরু করে ঝোটন। অস্ফূটে বলতে শুরু করে “ভেতরে একটা চিঠি আছে। পরে পড়িস। জানি তুই ভুল বুঝেছিস। সবটা বোঝানোর জন্য লিখতে হল। বলে বোঝানো শক্ত। তাছাড়া তোর সাথে আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ পাই কতটুকু?”

সেই চিঠিটা জোনাকির কাছে বহুকাল ছিল। বিয়ের কয়েকদিন আগে ওর আলমারি গোছাতে গিয়ে খুঁজে পেয়ে বউদি ফেলে না দিলে আরো অনেকদিন থাকত। চিঠিতে ঝোটন লিখেছিল তারও জোনাকিকে ভাল লাগে, নইলে তার তখন যা কাজের চাপ তাতে লাইব্রেরি না যেতে পারলেই ভাল হয়। কিন্তু ভালবাসবার তার উপায় নেই। কখন পার্টির কাজে তাকে কোথায় যেতে হয় তার ঠিক নেই। সুতরাং ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখাও সম্ভব নয়। পার্টি আগে, প্রেম পরে। চিঠির শেষ কয়েকটা লাইন পাকা চুলের দশাসই জোনাকিরও দাঁড়িকমাসুদ্ধু মনে আছে।

“বিপ্লবীরা জীবনসঙ্গিনী চায় না, সহযোদ্ধা চায়। তোর মধ্যে সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার গুণ আছে। কিন্তু তৈরি হতে সময় লাগবে। তোদের বাড়ির সবাইকে খুব শ্রদ্ধা করি। দিদিমার মত মানুষ হয় না। লেবুকাকা, নবুকাকা, ভুটুজেঠু কমিউনিস্ট না হলেও খুব ভাল মানুষ। তুই ওনাদের চোখের মণি। সেই তুই আমাদের রাস্তায় এলে ওঁরা কি মানতে পারবেন? হয়ত না। একথাটা মনে হলে আবার তোকে এ পথে টানতে মন চায় না। কী জানি কোনটা ঠিক? তবে যদি তুই এ পথে আসিস, জানবি আমি তোর জন্যে আছি। বিপ্লব আসছে। তার জন্যে আমাদের অনেককে মারতে হবে, মরতেও হবে। বিপ্লবের পর যদি বেঁচে থাকি, যদি ঘর বাঁধা হয়, তোকে নিয়েই বাঁধব। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”

এর কিছুদিন পরেই ঝোটন বি এস সি পাশ করে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এমএসসি পড়তে শুরু করে। লাইব্রেরিতে আসা আরো কমে যায়। মাঝেমাঝেই সে উধাও হয়ে যেত পাড়া থেকে। কোথায় যেত, কেন যেত সেকথা বাবা-মাকেও বলে যেত না। এ নিয়ে ওর বাবা অনেক চ্যাঁচামেচি করেও কিছু করে উঠতে পারেনি। তবে জোনাকি জানতে পারত সবই। কারণ যাওয়ার আগে পরে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও কোথাও দেখা করে যেত, হাতে দিয়ে যেত একটা চিঠি। তাতেই লেখা থাকত তার সর্বশেষ অন্তর্ধান রহস্য আর প্রেম সম্ভাষণ। জোনাকি তখন জানে ঝোটন সি পি আই (এম-এল) কর্মী। ভাবত শুধু সে-ই জানে।

জোনাকির দাদা শুভময় তখন স্কুলমাস্টার, কলুটোলা স্ট্রিটের মেসে থাকে, সপ্তাহান্তে মামাবাড়ি আসে। মাস্টারির চেয়েও মন দিয়ে রাজনীতি করছে। কলেজজীবন থেকেই সে সাড়া জাগানো ছাত্রনেতা। ৬৪ সালে পার্টি ভাগ হওয়ার সময়ে সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সবার সঙ্গ ছেড়ে সি পি আইতে থেকে গিয়েছে। এক শনিবার বিকেলে সে বাড়ি ঢুকল গম্ভীর মুখে।

দিদিমার বড় আদরের নাতি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে যখন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য মেসে থাকতে শুরু করে, মামাদের চেয়েও বেশি অভিমান করেছিলেন দিদিমা। তখনো মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে তিনি শনিবার বিকেলে একটু ভালমন্দ জলখাবার করতে চেষ্টা করেন “খোকা” আসবে বলে। সেই খোকা সেদিন বাড়িতে ঢুকেই পুলিশি স্বরে জানতে চাইল “জোনাকি কোথায়?”

বৃদ্ধা করুণাময়ী এই স্বর শেষ শুনেছিলেন প্রয়াত স্বামীর গলায়। তিনি গত হয়েছেন বছর তিরিশেক। হতবুদ্ধি হয়ে করুণাময়ী বলেন “আসে নাই এখনো কলেজ থিকা। আইস্যা পড়ব। সময় হয় নাই। লুচিটা কি এখন ভাজুম নাকি মনা আইলে?”

“লুচি টুচি পরে হবে। আপনি ঘরে আসুন। কথা আছে।”

এরপর করুণাময়ীকে শুভময় বোঝায় যে ঝোটন হল নকশাল। সেই নকশাল যারা শিক্ষক অধ্যাপকদের নামে হুলিয়া জারী করেছে, কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা কেটেছে, যাদের রাজনীতি হল খতম করার রাজনীতি। এই ছেলের সাথে জোনাকিকে মিশতে দেওয়া মানে ওর সর্বনাশ করা। এতসব বুঝিয়ে শুভময় শেষে বলে “আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, আপনি কী করে এটা অ্যালাউ করছেন? আপনি তো আর পাঁচজনের মত নন, দিদিমা! আমি এ বাড়িতে বড় হয়েছি। আমি তো জানি আপনি রোজ কাগজ পড়েন, রেডিওতে খবর শোনেন। আপনি বুঝতে পারছেন না জোনাকি কত বড় ফাঁদে পা দিচ্ছে?”

করুণাময়ী সবটা চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন “তুমি ঝোটনরে চেনো? চেনো না। এই পাড়ায় একখান লোক নাই যার ও কোন উবগার করে নাই। কি তাজা পোলাডা… আর অর থিকা মনার কোন ক্ষতি হইব না।”

“ক্ষতি হবে না? কী করে জানলেন?”

“তুমি বাপ হও, তুমিও বুঝবা। তুমি এবাড়ি আইছো দশ বচ্ছর বয়সে। তোমার বোনের তখন ছয় মাস বয়স। আমি অর দিদিমা নই, মা। ও কারে ভালবাসে, কে অরে ভালবাসে হেইডা আমি অন্ধ হয়া গ্যালেও বুইঝ্যা ফ্যালামু। আমারে শিখায়ো না।”

শুভময় ভেবে পায় না এরপর কী বলা উচিৎ। ভালবাসে! ঝোটন বলে ছেলেটা জোনাকিকে ভালবাসে! উত্তর কলকাতার নকশালদের কুখ্যাত নেতা অনুপম মিত্র তার বোনের প্রেমিক! মাথার উপর ছাদ ভেঙে পড়ল না কেন? এ যে কত বড় বিপদ, শুভময়ের কত বড় অপমান তা দিদিমাকে কী করে বোঝায় সে? দিদিমা জানে ওরা কতজনকে ইতিমধ্যেই মেরেছে? আরো কতজনকে মেরে ফেলতে চায়? এসব ভাবতে ভাবতেই দিদিমা আরো বলেন “আর খতম টতম কি কইতাছিলা? অরা মারতাছে ঠিকই কিন্তু অরাও যে মরতাছে হেইডা তো কইলা না?”

“খুনোখুনির রাজনীতিতে তো এটাই হয়, দিদিমা।”

“খুনোখুনি ভাল না ঠিকই। আমি তো ঝোটনরে কই। ও আমার মুখে মুখে কথা কয় না। কিন্তু তুমি আমারে কও তো, তোমরাও তো কমুনিষ্ট। তোমাগো বইপত্তরে ল্যাখা নাই যে দরকারে রক্তপাত করত অইব? এই পোলাগুলান তো ঐসবই পড়ছে। তোমরাই তো পড়তে শিখাইছ। শেখাও নাই?”

“হ্যাঁ রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের কথা আছে বটে। কিন্তু দিদিমা আমাদের পার্টি কিন্তু অনেকদিন আগেই বলেছে এদেশে তার দরকার নেই। যে যে কারণে পার্টি ভেঙে সি পি এম হল তার মধ্যে এটা একটা। ঝোটনদের দল তো আবার আরো চরমপন্থী।”

“সে তো মনীষীদের কথা যে যেমন বুঝে। তোমরা এক বুঝছো, ঝোটনরা আর এক বুঝছে। কে ঠিক হেইডা ঠিক করনের আমি কে? ঠিক করব ইতিহাস।”

“তার মানে? এই যে ওরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে, মাস্টারমশাইদের খুন করছে এসব ঠিক?”

“না। এগুলা নিশ্চয় ভুল। কিন্তু পালটা মাইরা অরা যে ভুল করতাছে হেইডা বোঝান যাইব না। আর খিদা প্যাটে আমার বাড়ি আইলে আমি যদি তাড়ায়ে দি, তাইলেও বোঝান যাইব না।”

শুভময় ভীষণ রেগে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, করুণাময়ী হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন “আমি বাইচ্যা থাকতে তোমার বোনেরে ঘর থিকা কেউ তুইলা নিয়া যাইতে পারব না। তোমার বিশ্বাস না থাকে বোনেরে নিয়া যাও, আমি কিছু কমু না।”

বাপ-মা মরা দুই ভাইবোনকে যিনি মানুষ করেছেন সেই দিদিমাকে এরপর আর কিছু বলা যায় না। সত্যিই তো। বরানগরে নকশালদের যতই বাড়বাড়ন্ত হোক, করুণাময়ীর ছায়ার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পৃথিবীর কোথাও নেই। জোনাকির জন্যে তো নেইই, শুভময়ের জন্যেও নেই — একথা শুভময় জানত। ভুলে গিয়েছিল। আসলে বরানগরের এক সি পি এম বন্ধু ওকে আওয়াজ দিয়েছিল “তুই শালা সংশোধনবাদী সি পি আই আর তোর বোন একেবারে নকশাল! এটা কিরকম হল, শুভ?” ও যে কিছুই জানে না এটা সে প্রথমে বিশ্বাসই করেনি। তারপরে খুলে বলল যে সি পি এমের সম্ভাবনাময় ছাত্রনেতা, যে সি পি আই (এম-এল) হয়ে যাওয়ায় অনেক নেতা দুঃখ করেছেন, তার সঙ্গে জোনাকিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। শুভময়ের মামাবাড়িতেও তার আনাগোনা আছে বলে খবর। শুনে আর মাথার ঠিক ছিল না।

সত্যি কথা বলতে এই নিয়ে জোনাকির বড়মামা, মানে ঝোটনের ভুটুজেঠু, কিছুদিন আগেই মায়ের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ঝোটন যে আর আগের ঝোটন নেই, তার যে লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিতে ইদানীং মন বেশি, সেকথা বলেছিলেন। কিন্তু ও বাড়িতে করুণাময়ীর সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তাই সব যেমন চলার তেমনই চলতে থাকে, এসব আলোচনা জোনাকির কানে পৌঁছায় না।

পরিস্থিতি তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। শুভময়ের সাথে করুণাময়ীর এই কথোপকথনের কদিন পরে ঝোটন বলে কয়েই বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এক সন্ধ্যাবেলা। যাওয়ার পথে করুণাময়ীকে প্রণাম করতে আসে। পায়ের ধুলো নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে “রাতবিরেতে জ্বালাতে আসব কিন্তু, দিদিমা। বাড়ি গেলে বিপদ। আমার মা আপনার মত সাহসী নয় তো।”

করুণাময়ী ওর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা কামড় দিয়ে, মাথায় থুতু ছিটিয়ে বলেন “আসবা, বাবা। একশো বার আসবা। সাবধানে থাইকো। মানুষের ভাল কইরো।”

জোনাকি জল ভরা চোখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে ঝোটন বলে “আসব রে। মন খারাপ করিস না। চলি।” জোনাকির দিদিমা বলেন “যাওন নাই, আসো গিয়া।” কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে নিকষ কালো চেহারার ঝোটন অন্ধকারে মিশে যায়।

সে কথা রেখেছিল। জোনাকিদের বাড়ির পিছনে বেশ বড় একটা বাগান। ওর ছোটমামার সাধের বাগান। তারপরই খেলার মাঠ। বল উড়ে এসে বাগানের বারোটা বাজাবে বলে আগের শীতেই উঁচু পাঁচিল দেওয়া হয়েছে। সেই পাঁচিল টপকে প্রায় মাঝরাতে হঠাৎ কোন কোন দিন এসে পড়ত ঝোটন। জোনাকি ভাবত ধুপ করে পড়ার শব্দটা শুধু ওর কানেই গেছে। কিন্তু ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়েই দেখত ততক্ষণে দিদিমা বাগানের দরজায় পৌঁছে গেছে। একটু রাগই হত তখন। আহা! যেন ঝোটন তার কাছে নয়, ঐ বাহাত্তুরে বুড়ির অভিসারেই আসে।

ইশারায় ওকে জোনাকির ঘরে বসাতে বলে করুণাময়ী চলে যেতেন রান্নাঘরে। কে জানে কী করে নিঃশব্দে, তাঁর ঘুমন্ত ছেলে, বউদের টেরটিও না পেতে দিয়ে রেঁধে ফেলতেন এক থালা ভাত আর আলু কি কুমড়ো সেদ্ধ। ঘরের মাটিতে আসন পেতে দিয়ে থালার একপাশে দিতেন দুটো কাঁচালঙ্কা। ঝোটন যখন ক্ষুধার্ত নেড়ি কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়ত থালাটার উপর, তখন মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন “খা, মণি। আর তো কিছু নাই। খিদা দিয়া খা।” কখনো সখনো ক্ষিদে দিয়ে খাওয়ার জন্য তার দু একজন কমরেডকেও সঙ্গে আনত ঝোটন। খাওয়া শেষ করে একটু জিরিয়ে নিয়ে, রাত থাকতেই পাঁচিল টপকে মিশে যেত অন্ধকারে।

এক মাস, দু মাস অন্তর কয়েক মিনিটের এইটুকু দেখা সম্বল করে আর সেই চিঠিগুলো উল্টে পাল্টে বারবার পড়ে অনেকদিন বেঁচে ছিল জোনাকির প্রেম। তারপর একদিন রাত দশটা নাগাদ সদর দরজায় কড়া নাড়ল পুলিশ। ও পাড়ায় পুলিশ আসা তখন সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে। পুলিশ আসবে, কোন ছেলের খোঁজে তার বাড়িতে চোটপাট করবে, তারপর খুঁজে না পেয়ে তার বাবা-মাকে গালিগালাজ করে, কখনো বা চড় থাপ্পড় মেরে চলে যাবে — এই ছিল রুটিন। কিন্তু সেদিন অব্দি জোনাকিদের বাড়িতে কোনদিন পুলিশ আসেনি। ও বাড়িতে কোন জোয়ান ছেলে নেই, জোনাকির মামারা কেউ কখনো কোন পার্টি করেননি। পুলিশ আসবেই বা কেন? তাই দরজা খুলে পুলিশ দেখে মেজমামা থ। দারোগা জানালেন সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। তাছাড়া জিজ্ঞাসাবাদেরও ব্যাপার আছে। এই বাড়িতে নকশালদের যাতায়াত আছে বলে অভিযোগ।

সেই প্রথম জোনাকি ভয় পেয়েছিল। ঝোটনকে সে চেনে পাড়ার ছেলে হিসাবে কিন্তু বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আর দ্যাখেনি, কিছু জানেও না — এইটুকু মিথ্যে বলতেই তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মেজমামা লালবাজারে ক্লার্কের চাকরি করেন বলেই যে পুলিশ তাকে সহজে বিশ্বাস করে নিল এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আরো বেশি ভয় হয়েছিল তল্লাশি চালিয়ে কী পাওয়া যাবে তা ভেবে। পড়ার টেবিলের ড্রয়ারেই পরপর সাজিয়ে রাখা ছিল ঝোটনের চিঠিগুলো। আর বইয়ের তাকে ওর উপহার দেওয়া বেশকিছু বই — গোর্কি, মায়াকভস্কি, তলস্তয়, মাও সে তুং, চে। কিন্তু তল্লাসীর সময় জোনাকি অবাক হয়ে দেখল চিঠিগুলো হাওয়া আর তাক জুড়ে রয়েছে গীতা, কথামৃত, স্বামি শিষ্য সংবাদ, স্বামীজিকে যেমন দেখিয়াছি। এই বইগুলো জোনাকিরই বটে কিন্তু বছর তিনেক ধরে ওগুলোতে হাত পড়েনি, আগামীদিনেও পড়বে না ভেবে সে চালান করে দিয়েছিল সিঁড়ির নীচে পুরনো কাগজের জায়গায়। কী করে সেখান থেকে কয়েক মিনিটের নোটিশে বইয়ের তাকে উঠে এল সে খবর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ জানেন না, যাঁর জানার কেবল তিনিই জানতেন। পুলিশ সে যাত্রায় “মেয়ে কার সঙ্গে মিশছে না মিশছে একটু খেয়াল রাখবেন তো। দিনকাল কেমন জানেন না?” বলে মৃদু ধমক দিয়ে চলে গিয়েছিল।

এরপর ঘন্টা খানেক করুণাময়ীর তিন ছেলে জীবনে প্রথম এবং শেষবার তাঁর উপরে যারপরনাই চেঁচামেচি করেন। “তোমার প্রশ্রয়েই এরকম হয়েছে” ইত্যাদি। পুত্রবধূদের মধ্যে একমাত্র বড়টিই একটু বলিয়ে কইয়ে। সে শাশুড়ি এবং ভাগ্নীর পক্ষ নিয়ে শুনিয়ে দেয় “তোমরা তিন ভাই এক কাজ করো। চাকরি বাকরি ছেড়ে বাড়ি পাহারা দাও। ঐ তো পুলিশ। তাজা ছেলে দেখলেই নকশাল, সি পি এম আরো যা যা ইচ্ছে বলে ধরে নিয়ে যায়, ছেলেকে না পেলে বাপের গায়ে হাত তোলে। তারা কী বলে গেছে তাই নিয়ে বাড়ি মাথায় করছ। আমরা সারাদিন বাড়িতে থাকি। ঝোটন এখনো যদি আসা যাওয়া করত আমরা দেখতে পেতাম না? বলাই তো হল আগে আসত। তখন তো তোমরাও দেখেছ। কিছু তো বলোনি? আদিখ্যেতা! পুলিশ যেন ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির।”

জোনাকির বড়মামা বিড়বিড় করে বলতে থাকেন “জানি জানি। ঝোটন কি আর খারাপ ছেলে? সোনার টুকরো ছেলে। কিন্তু… সময়। আর সঙ্গ। সে জন্যেই আমাদের মেয়েটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ছেলেটার বাপ-মায়ের কি অবস্থা! আহা রে!”

এই নিয়ে আর বেশিদিন দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। বিপ্লব যে সফল হবে না সেটা বোঝা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। চতুর্দিক থেকে আসছিল নকশালদের ধরা পড়ার আর খুন হওয়ার খবর। একটা করে খবর শোনা যেত আর মিত্র বাড়ির দুই বুড়ো বুড়ির মত চক্রবর্তী বাড়ির এক বুড়িও ঠাকুরের ছবির সামনে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। জোনাকির অকারণ প্রত্যয় ছিল — ঝোটনদার কিচ্ছু হবে না। তাই তার উদ্বেগ হত না এসবে। তারপর এক রাতে গোটা বরানগর চলে গেল মনুষ্যেতর প্রাণীদের দখলে। সব দরজা জানালা বন্ধ করেও এড়ানো গেল না তাদের উল্লাসের শব্দ, থাবার নীচে পড়া মানুষের আর্তনাদ। জোনাকি জানত ঝোটন এলাকায় নেই কিন্তু তার বাবা-মাকে ওরা ছাড়বে না। তাই সে বারবার ছুটে যেতে চাইছিল ওঁদের কাছে। কি আসুরিক শক্তি তখন ঐ রোগাপটকা  মেয়ের! তিন মামা, তিন মামী আর দিদিমা মিলে আটকে রাখছিল তাকে আর মুখ চেপে ধরে আটকাচ্ছিল চিৎকার। ইতররা চিৎকারে রক্তের গন্ধ পায়। চাইলে দেয়াল ফুঁড়ে ঢুকে পড়তে পারে ঘরে।

পরদিন বেলার দিকে জোনাকির মেজমামা আর ছোটমামা খোঁজ নিতে যান ঝোটনদের বাড়িতে। তেমন কিছু হয়নি ওঁদের। ওর বাবার একটা হাত আর একটা পা ভেঙে দিয়ে গেছে বীরের দল, মায়ের একগাছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আর কী নিয়ে গেছে সেকথা বলার অবস্থায় উনি নেই তখন। জোনাকির মামারা যখন ওঁদের হাসপাতালে নিয়ে যায় তখনো রাস্তাতেই পড়েছিল বহু মৃতদেহ — গোটা, কাটা, চিহ্নিত, অচিহ্নিত।

দিন দশেক পরেই থানায় ডাক পড়ে ঝোটনের বাবার। পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছিল কোথায় যেন, এবং ধরা দিতে বলেছিল। কথা শোনেনি, দৌড়ে পালাতে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে গুলি চালাতে হয়। ভদ্রলোককে ডাকা হয়েছিল শনাক্ত করে দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্যে। উনি বাড়ি ফেরার পথে চক্রবর্তীদের বাড়ি আসেন এবং জোনাকির মাথায় হাত রেখে বলে যান “আমি বডি দেখতে গেলাম না রে, মা। ওরা যা পারে করুক। আমি জানি ওটা আমার ছেলের বডি না। আমার ছেলে জীবনে কখনো পালায়নি। কত মার মেরেছি। কখনো পালায়নি। সে পিঠে গুলি খেয়ে মরতে পারে না।”

সারা বিকেল একা একা চেয়ারে বসে সেই কথাগুলো মনে পড়ে জোনাকির। তার কাছের মানুষরা কেউ পালাতে শিখল না।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

 

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

 

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

 

নাম তার ছিল: ২

পূর্বকথা: তরুণ কমরেড উদ্দালককে নিয়ে কিছু স্বপ্ন দেখত বর্ষীয়ান পার্টি কর্মী রবীন। পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সমবয়স্কদের পদস্খলন দেখে ক্লান্ত চোখে উদ্দালকই ছিল আশার আলো। সেই উদ্দালকের মৃত্যুর খবর পেয়ে তার বাড়িতে পৌঁছল রবীন। কী হয়েছিল ছেলেটার?

“আমাদের কিছু করতে হবে না। পুলিশ আসবে তো,” এক কমরেড বলে।

পুলিশ! রবীন চমকে ওঠে। উদ্দালকের মৃত্যুটা বুঝি যথেষ্ট চমকে দেওয়ার মত ছিল না। ছেলেটা কথাবার্তায়, চিন্তা ভাবনায়, পড়াশোনায় সত্তরের দশকের পার্টিকর্মীদের মতই ছিল বেশি। মৃত্যুটাও কি তাদেরই মত হল? রাজনৈতিক হত্যা? এ তল্লাটে তো ওসব অনেককাল বন্ধ! কারা করল এটা? কেন?

রবীন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সেটাই ভাবছিল। আন্দাজ করতে পেরে বলরাম বলল “রবীনদা, তুমি যা ভাবছ তা নয়। সাইকেলটা রাখো।” বলতে বলতে নিজেই সাইকেলটা নিয়ে আরেকজনের হাতে দিয়ে একপাশে রাখার ব্যবস্থা করল।

“সুইসাইড। গলায় দড়ি দিয়েছে।”

এটা রবীনকে অবাক করল আরো বেশি। তবে কেন, কী বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস করার সময় তো তখন নয়।

উদ্দালকদের বাড়ি থেকে বেশ তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়ল রবীন। উদ্দালকের বাবার সাথে দু চারটে কথা বলেই। আসার সময়ে শ্মশান যাবে ভেবেই এসেছিল। কিন্তু সেসব তো এক্ষুণি হচ্ছে না। তবে আসল কথা সেটা নয়। উদ্দালকের মায়ের পাঁঠাকাটার মত চিৎকারটা সহ্য করা গেল না। ওভাবে কাউকে কাঁদতে দেখার অভ্যাস বহুদিন নষ্ট হয়ে গেছে। এক সময় কতজনের মা, বউ, মেয়ের ঐরকম কান্না অগ্রাহ্য করে মরা মানুষটাকে খাটিয়ায় তুলে শ্মশানে নিয়ে গেছে রবীন। ও উপস্থিত থাকলে মৃতের নিকটাত্মীয়দের সরানোর কাজটা অন্য কেউ করতেই যেত না। সকলেই জানত এসব করতে গিয়ে ওর মত ইস্পাতকঠিন হতে আর কেউ পারবে না। আর নেতা রবীন, শিক্ষক রবীনকে না বলার সাহসও তেমন কারো ছিল না। অবশ্য যে রবীনের পরিচয় জানত না সে-ও কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মত সরে যেত মৃতদেহ ছেড়ে। কিছু একটা ছিল ওর কণ্ঠস্বরে বা বাচনভঙ্গীতে।

উদ্দালকের মায়ের উপর সেই জোর খাটানোর জোরটা পেল না রবীন। মনে হল, কাঁদুন, যত ইচ্ছে কাঁদুন। ওঁকে থামানোর অধিকার নেই কারোর। তাজা ছেলে, ওঁর একমাত্র ছেলে — তাকে বাঁচাতে যারা পারেনি তাদের কোন অধিকার নেই ওঁর কান্না থামানোর। কোন অধিকার নেই ওঁকে সরিয়ে ছেলের শরীরটা নিয়ে যাওয়ার। ওসব আর যে করে করুক, রবীন করবে না।

নেহাতই অযৌক্তিক, আবেগপ্রবণ চিন্তা। এভাবে ভাবতে অভ্যস্ত নয় ও। ছাত্রছাত্রীদের, অনুজ কমরেডদের, নিজের ছেলেকে — সবাইকেই সব সময় যুক্তি দিয়ে ভাবতেই শিখিয়ে এসেছে। কিন্তু আজ যা ঘটেছে তা কি কোন যুক্তিতে হজম করা যায়? একটা ২৫-২৬ বছরের ছেলের হঠাৎ মৃত্যু মেনে নেবে কোন্ যুক্তিতে? আরো আশ্চর্য তার আত্মহত্যা। ওরকম প্রাণোচ্ছ্বল, নিবেদিতপ্রাণ এবং পরিশ্রমী একজন তরুণ পার্টিকর্মী আত্মহত্যা করবে কী কারণে? ছেলেটা তো অজাতশত্রু। পাড়ায় ভীষণ জনপ্রিয়। সেই জন্যেই গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ওকে দাঁড় করানো হয়েছিল এবং ড্যাং ড্যাং করে জিতেছে। ও পাড়ায় কিন্তু বরাবর জিততেন প্রবীণ কংগ্রেসী মানিক চক্রবর্তী। ভালমানুষ, সৎ। পাড়ার একটা পুকুরও বোজাতে দেননি। ওঁকে কোনদিন হারানো যেতে পারে রবীনরা কখনো ভাবেনি। তাঁকে হারিয়েই জিতেছিল উদ্দালক।

জিতবে না-ই বা কেন? ভোটের দিনই ও পাড়ার বুথের বাইরে মানিককাকার সাথে রবীনের দেখা। একগাল হেসে বললেন “অ্যাদ্দিনে তোমরা ঠিক লোকেরে দাঁড় করাইছ। এই পোলারে ভোট দিব না কেডা?”

“কী বলছেন? আপনি হারবেন? এ তো আমি জন্মে দেখিনি কাকা।”

“এইবার দ্যাখবা। সইত্য কইতাছি। পাড়ায় সক্কলের বিপদে আপদে প্রথম যে পৌঁছায় সে হইল উদ্দালক। তা অরে ভোট দিব না? জিতুক। হেয়াই জিতুক। আমার বয়স হইছে, দৌড়াদৌড়ি করতে আর ভাল্লাগে না গো। তার উপর কারো কারো সাথে কটু কথাও তো কইতে হয়। এই বয়সে আর ওসব ঠিক না। এখন কেদার বদ্রী করনের সময়, বুঝলা না?”

রবীন মশকরা করে বলেছিল “কাকা, আপনার কথা শুইন্যা তো মনে হইতাছে আপনার ভোটটাও অরেই দিছেন।”

বৃদ্ধ মানুষটি উত্তর দিলেন “আমি দিই নাই, তবে আমার গিন্নী দিছে। আমারে বইলা কইয়াই দিছে।”

সেই ছেলে আত্মহত্যা করবে কেন?

রবীনের স্ত্রী জোনাকি অবশ্য এর মধ্যে কোন রহস্য আছে বলে মনে করে না। বাড়ি ফিরেও কেমন অশক্ত বোধ করছিল রবীন, তাই এক কাপ চায়ের আব্দার করেছিল। চা খাওয়াতে গিয়ে রবীনের বিস্ময়ের কথা শুনে জোনাকি বলল “রাজনীতি করতে করতে এমন হয়ে গেছো যে সবেতেই রাজনীতি খোঁজো। এ তো সোজা ব্যাপার। এই বয়সের ছেলে কেন সুইসাইড করল বুঝতে এত ভাবতে লাগে?”

রবীন অবাক হয়ে ভাবে কোন্ অতিসামান্য জিনিস তার চোখ এড়িয়ে গেছে। ওর অবস্থা দেখে জোনাকি আরও জোর দিয়ে বলে “এত বছর মাস্টারি করেও ছেলেপুলের মন বোঝো না? কী মাস্টারি করো বুঝি না বাবা!”

দীর্ঘ গঞ্জনায় অতিষ্ঠ হয়ে রবীন খিঁচিয়ে ওঠে “নাটক না করে কী বলতে চাইছ পরিষ্কার বলো।”

“কী আবার! প্রেম। নিশ্চয়ই কারোর সাথে প্রেম করত, সে লেঙ্গি মেরেছে।”

“কিন্তু… উদ্দালকের ঐরকম রেজাল্ট, সুন্দর চেহারা। ও তো পার্টি করবে বলে বাইরে কোন বড় চাকরি নিয়ে যায়নি। ওরকম যোগ্য ছেলে কি পাড়ায় পাড়ায় পাওয়া যায়?”

“আজকালকার মেয়েদের কাছে ওসব কোন ব্যাপার নয়। দ্যাখো, হয়ত কোন এন আর আই পেয়ে গেছে।” বলতে বলতে চায়ের কাপ দুটো নিয়ে জোনাকি রান্নাঘরে চলে যায়। সেখান থেকে চেঁচিয়ে যোগ করে “এটা আমাদের যুগ নয় যে পাঁচশো টাকা মাইনের স্কুলমাস্টারকে বিয়ে করে কলকাতার মেয়ে এই অজ পাড়াগাঁয়ে আসবে।”

রবীন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। সত্যিই এই ব্যাপারটা ওর মাথায় আসেনি। উদ্দালকের মত ছেলের তো প্রেমে না পড়াই অস্বাভাবিক। রোম্যান্টিক না হলে কেউ কমিউনিস্ট হয় না। তাও আবার ঐরকম কমিউনিস্ট। রবীনের মত গেঁয়ো, অল্পশিক্ষিত কমিউনিস্ট তো উদ্দালক ছিল না। মার্কসবাদ নিয়ে ওর পড়াশোনার গভীরতা বেশ বোঝা যেত। মার্কস কি জেনিকে বাদ দিয়ে? নাকি ক্রুপস্কায়াকে বাদ দিয়ে লেনিনকে ভাবা যায়? পি সি যোশী – কল্পনা যোশী? কেন যে এগুলো মনে হয়নি! বোধহয় জোনাকি ঠিকই বলেছে। জীবনভর তো রাজনীতিই করে গেল রবীন, এসব বুঝবে কী করে? প্রেম-ট্রেম করা তো হয়ে উঠল না ওর দ্বারা। আজকাল মুনিয়ার মুখটাও ভাল মনে পড়ে না। অবশ্য ওর সাথে কি ঠিক প্রেম ছিল? হয়ত না, তবু এই বয়সেও মুনিয়ার কথা মনে আসতেই অশান্তি কিছুটা কাটল। তবে খটকা একটা রয়েই গেল —- যে ছেলে হপ্তাখানেক আগেই বলছিল হোলটাইমার হবে, সেই ছেলে শুধু প্রেমে ব্যর্থ বলে আত্মহত্যা করবে? ময়না তদন্তের পর যেদিন উদ্দালককে পোড়ানো হল, সেদিন অন্য কমরেডরা গেলেও রবীন আর গেল না।

ওকে হোলটাইমার হতে বারণই করেছিল সে। নেট তো পাশ করাই আছে। এরপর অধ্যাপক হয়ে ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করা, তাদের মধ্যে থেকে পার্টিকর্মী তৈরি করা, এগুলোও বড় কাজ — এমনটাই ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল রবীন। উদ্দালক নিমরাজি হয়েছিল। সেই মুখটা মনে আছে। তা-ই থাক। গলায় দড়ি দিলে মুখটা কেমন হয় অনেকবার দেখেছে। নতুন করে আর কী দেখবে?

সন্ধ্যায় জোনাল কমিটির মিটিং। সাইকেলটা নিয়ে বেরোতে যাবে, দ্যাখে ঈশান কোণে মেঘ। এ সময়ে বিকেলে বৃষ্টি আসাই স্বাভাবিক। আর বাবা বলত ঈশান কোণে মেঘ হলে নাকি বৃষ্টি হবেই। কে জানে সত্যি কিনা? তবে রবীন ছাতা নিল না। কাঁপা হাতে ছাতা নিয়ে সাইকেল চালানো অসম্ভব। বৃষ্টি এলে কোথাও না কোথাও দাঁড়িয়ে পড়ে। আজও নাহয় তাই করবে। তাছাড়া বহুকাল বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি। মন ভাল থাকলে বৃষ্টিতে ভিজতে বড় ভাল লাগে। মন ভারী হয়ে থাকলেও বৃষ্টিতে ভিজলে অনেকটা হালকা হয়।

বৃষ্টি হয়েছিল মা চলে যাওয়ার দিন। রবীন তখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পার্টির নির্দেশ — ধরা পড়া চলবে না। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে আসতেই হয়েছিল। হীরুদাই খবর পাঠিয়ে বাড়ি যেতে বলেছিলেন। চিরকুটে লেখা ছিল “তোমার মা খুব অসুস্থ। বাড়ি যাও। ধরা পড়লে পড়বে, তবে সাবধান থেকো।”

শ্মশান অব্দি পৌঁছানোর আগেই রবীন খেয়াল করেছিল পুলিশের লোক পিছু পিছু হাঁটছে। শ্মশানে ঢোকার মুখেই জিপ দাঁড়িয়ে ছিল। দারোগা পথ আটকে বলল “আপনাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে। গ্রেপ্তার করছি।”

রবীনের ছোড়দা বলেছিল “একটু ওয়েট করুন না। পোড়ানো শুরু হয়ে যাক। ও পালাবে না।”

দারোগা হাত জোড় করে বলে “পারব না, দাদা। মাপ করবেন। আমি হুকুমের চাকর। আমিও বামুনবাড়ির ছেলে। মাঝপথে আটকাব না বলে এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছি। অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছি। আরো সময় দিলে আমি বিপদে পড়ে যেতে পারি। কে ওপরতলায় জানিয়ে দেবে আমি সি পি এম নেতার প্রতি সিম্প্যাথেটিক, আর আমাকে সুন্দরবনে ট্রান্সফার করে দেবে।”

এরপর আর কোন কথা হয় না। রবীন খাট থেকে কাঁধ সরিয়ে নেয়, ওর জায়গা নেয় বলরাম। তখন তার সবে গোঁফ দাড়ি উঠছে।

জিপে ওঠার সময় রবীনকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে ওর মেজদা। রবীনের যে কান্না পায়নি তা নয়, কিন্তু তখন কাঁদলে পুলিশ হয়ত ভাবত ওকে ভাঙা সহজ।

তখন বৃষ্টির জোরটা কমে এসেছে। কালীপুর হাইস্কুলের সামনে দিয়ে যখন জিপটা যাচ্ছে তখন টিফিন। বেশ কিছু ছেলে গেটের বাইরে হজমিওয়ালা, ফুচকাওয়ালাকে ঘিরে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতেই ফরমাশ করে যাচ্ছিল। তাদের একজনের সাথে চোখাচোখি হল রবীনের। ঢ্যাঙা একটা ছেলে, যার দাড়িগোঁফ ভর্তি মুখের চোখ দুটো প্রমাণ করে পরনে ফুলপ্যান্ট থাকলেও মনটা হাফপ্যান্ট ছাড়েনি। যেন চেনা চেনা লাগল। না-ও হতে পারে। ওরকম চেহারার ছেলে তো রবীনের স্কুলেও কম নেই।

সেদিন শুক্রবার। জানা কথাই যে সোমবারের আগে কোর্টকাছারির মধ্যে যাবে না পুলিশ। থানায় ঢোকামাত্র দারোগা বলেছিলও সেকথা। “এই কটা দিন থাকুন আমাদের গেস্ট হয়ে। তারপর তো মদনপুর জেলে।”

কিছুক্ষণ পরেই স্লোগানের শব্দ কানে আসে রবীনের।

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”

“রবীন স্যারের গ্রেপ্তার মানছি না মানব না।”

“শোষকের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও।”

দারোগা বেচারা ব্যতিব্যস্ত।

“কি পার্টি দাদা আপনাদের! আধ ঘন্টা হতে না হতে এত লোক জড়ো হয়ে গেল! এরকম জানলে আপনাকে জিপে করে আনতাম না। শালা আপনাদের টিকটিকি তো দেখছি আমাদের টিকটিকির এক কাঠি উপরে।”

স্লোগানের আওয়াজ বাড়তে বাড়তে থানার ভেতর ঢুকে আসবে মনে হয়। বৃষ্টি ক্রমশ বাড়তে থাকে, পাল্লা দিয়ে স্লোগান। দারোগার ভয় হয় জনা সাতেক কনস্টেবল দিয়ে এই জনতাকে আটকানো যাবে না বেশিক্ষণ। সে পাগলের মত ফোন করতে থাকে ওপরওয়ালাদের। কিছুক্ষণ পরেই নির্দেশ আসে আপদ অন্যত্র চালান করার। পত্রপাঠ পুলিশ ভ্যান বেরোয় থানা থেকে, অঝোর বৃষ্টি আর স্লোগান অগ্রাহ্য করে। ভ্যানের গায়ে কয়েকটা ঢিলও পড়ে। পাল্টা লাঠি চালায় পুলিশ। নইলে কেউ রাস্তা ছাড়ত না ভ্যানটাকে। কালীপুর হাইস্কুলের কিছু ছাত্র ভ্যানের পেছনে দৌড়য় কিছুক্ষণ। যেন দৌড়েই ধরে ফেলবে মোটরগাড়িটাকে আর ছিনিয়ে নেবে রবীন স্যারকে। তখন স্বপ্ন দেখার সময়। তখন এসব ভাবা যেত; অঝোর বৃষ্টিপাতে পেছল রাস্তায় দৌড়তে দৌড়তেও যে কোন দৌড় জেতার কথা ভাবা যেত। আর কয়েকটা স্কুলের ছেলের দৌড় দেখে বুক কাঁপত দারোগার।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১

এ তল্লাটে মানুষ অনেকদিন বাঁচে। কেন যে বাঁচে!

ভাবতে ভাবতে সবুজগ্রাম রিডিং ক্লাব পেরোল রবীন। ক্লাবের দরজায় বসে সিগারেট খাচ্ছিল শ্যামল কংসবণিক আর ঠিক সামনের চায়ের দোকানটা খুলে সবে গঙ্গাজল ছড়াতে শুরু করেছিল দেবু ঘোষ। ঠিক তার আগেই গার্লস স্কুলের সামনে দিয়ে আসার সময়ে নজরে পড়েছে এই বিকেল পাঁচটাতেও রিকশায় গুঁড়ি মেরে ঘুমোচ্ছে শম্ভু। ওর ছেলে যে কদিন আগেই অভিযোগ করল ও আজকাল দিনের বেলাও নেশা করে, সেটা তাহলে সত্যি।

শম্ভুর ছেলেটা রবীনের স্কুলেই পড়ত। মাধ্যমিক পাস করেছিল সেকেন্ড ডিভিশনে। কথা শুনল না। কিছুতেই পড়াশোনাটা চালাল না। অবশ্য বাপের মত নেশাভাং ধরেনি। স্টেশন চত্বরে খেলনার দোকান খুলেছে, রীতিমত পরিশ্রম করে। ফলে দোকানটা দাঁড়িয়ে গেছে। ওর বউটাও মাধ্যমিক পাশ। দোকানের কাজে সাহায্যও করে। শম্ভুর বউ মারা গেছে পাঁচ-ছ বছর হবে। ছেলে যা রোজগার করে তাতে শম্ভুর আর রিকশা না চালালেও চলে। রবীনের মনে হয়েছিল ছেলে হয়ত দ্যাখে না, তাই ও চালিয়ে যাচ্ছে। সে কথা একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করাতে ছেলেটা বলল “আপনি মাস্টারমশাই, আপনার কাছে তো মিথ্যে বলব না। আমার অসুবিধা নেই, কিন্তু আমার বউয়ের একদম ইচ্ছা নয় বাবা আর রিকশা চালায়। ও কতবার করে বলল, আমিও বলেছি। কদিন তো বেরোনো বন্ধ করেছিল। তারপর বলল ‘না, ঘরে বসে কী করব? কতক্ষণ টিভি দেখে কাটে?’ আসলে তা না। বাবার তো নেশা আছে আপনি জানেন। বাড়ি থাকলে তো ওটা হচ্ছে না, না?”

“বয়স তো অনেক হল। দ্যাখ না ছাড়াতে পারিস কিনা?”

“খুব অশান্তি করে স্যার। আমার বউ একবার খাবারে ওষুধ দিয়েছিল। বুঝতে পেরে গিয়ে সে কি গালাগাল! আগে শুধু সন্ধ্যের পরে নেশা করত, আজকাল দিনে দুপুরে ধরেছে। আমি তাও দিনরাত বলছি যে এবার এসব ছাড়ো। দুদিন পরে নাতিপুতি হবে, সে কী শিখবে তোমায় দেখে?”

“ও বাবা! এটা তো ভাল খবর দিলি। বউমা মা হইব? কবে ডেট?”

পাশে দাঁড়ানো বউটা একটু রাঙা হয়। ছেলেটা একগাল হেসে বলে “এই সবে তিন মাস।”

“বাঃ বাঃ, বহুত আচ্ছা” বলতে বলতে রবীন প্রাক্তন ছাত্রটিকে জড়িয়ে ধরে। “কত বড় হয়ে গেলি তোরা! বউয়ের দিকে নজর রাখিস, বাবা। এই কটা দিন খুব সাবধানে রাখতে হয়।”

দোকানদার দেবু ঘোষ লোক ভাল, পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষী। অনেকবার অনেককে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে কংগ্রেস আমলে। রবীনকেও। রিডিং ক্লাবের সামনেই দোকান, ফলে পুলিসের বিষনজরে পড়া স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এত চালাক চতুর যে দারোগা, কনস্টেবলরা ভাবত ও সি পি এমকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। তাই ওর গায়ে হাত পড়েনি। রবীনদের তাতে সুবিধা হয়েছে।

পার্টি সে ঋণ সুদে আসলে মিটিয়েও দিয়েছে। দেবুর ছেলে সবুজগ্রাম কলেজে ক্লাস ফোর স্টাফের চাকরি পেয়েছে; দোকানটা ছিল ঝুপড়ি, হয়েছে পাকা। সে আমলে শুধু চা, বিস্কুট, বিড়ি, সিগারেট পাওয়া যেত। এখন সন্ধ্যের পরে রোল, চাউমিন, মোগলাই, কোল্ড ড্রিঙ্কস। ওর ছেলে কলেজ ছুটির পরে এসে দোকানের দায়িত্ব নিয়ে নেয়, দেবু বাড়ি চলে যায়। ইদানীং অভিযোগ উঠেছে দোকানে নাকি লুকিয়ে চুরিয়ে মদ বিক্রি হচ্ছে। রবীন খোঁজ নিয়ে দেখেছে — কথাটা সত্যি।

জানতে পারা মাত্রই লোকাল কমিটির মিটিঙে তুলেছিল ব্যাপারটা। এল সি এস শ্যামল কংসবণিক স্রেফ উড়িয়ে দিল “ধুর ! এইসব তুমি বিশ্বাস করো?”

“এটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্নই নয়, শ্যামলদা। আমি নিজে খবর নিয়ে দেখেছি। কথাটা ঠিকই। এটা বন্ধ করা দরকার।”

রবীন এতটা কড়াভাবে বলবে শ্যামল ভাবেনি। একটু থতমত খেয়ে বলে “হ্যাঁ, যদি সত্যি হয় তাহলে তো বন্ধ করতেই হবে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া …”

“প্রমাণ!” বাঘের মত লাফিয়ে ওঠে উদ্দালক। প্রেসিডেন্সির প্রাক্তনী, ছাত্রনেতা, সবে পার্টি সদস্যপদ পেয়েছে। এ ধরণের ছেলেরা আজকাল পার্টির ধারে কাছে আসে না চট করে, এলেও কলকাতায় সদস্যপদ নেয়।

“আমরা কি পুলিশ না উকিল? প্রমাণ আবার কী? সারা সবুজগ্রাম জানে ব্যাপারটা। দোকানে গিয়ে ধমকালেই বাপ বাপ বলে ও বোতলগুলো বার করে দেবে। পার্টির জন্যে ওর চাকরি, দোকান সবকিছু। পার্টি চাইলে ওর দোকান বন্ধ করে দেবে। একদিন ওকে ডেকে আপনারা সিনিয়র লোকেরা বলে দিন ‘বাপু, এসব আজ থেকে বন্ধ করো’। কথা শুনলে ভাল, নাহলে গিয়ে দোকান ভেঙে দিয়ে আসব।”

“এটা গুন্ডামি। আমি এল সি এস থাকতে ও সমস্ত অ্যালাউ করব না।”

“আপনি তো অদ্ভুত কথা বলছেন!” রবীন এবার বেশ রেগে যায়। “পাড়ার মধ্যে মদ বিক্রি করছে তাতে আপনার আপত্তি নেই। সেটা বন্ধ করাটা গুন্ডামি?”

“বেআইনি কাজ করছে। সেটা বন্ধ করার জন্যে পুলিশ আছে। আমাদের এত লাফালাফির কী আছে? দেবু পার্টির জন্যে কম করেছে? রবীন তো জানে সব। ওর পেটে লাথি মারলে পার্টির ভাল হবে?”

“না, তা কেন হবে? পাড়ার লোকে দেখছে সি পি এম ঘনিষ্ঠ একটা ছেলে দোকানে লুকিয়ে মদ বেচছে। এতেই পার্টির ভাল হচ্ছে।” উদ্দালক রাগে গরগর করে ওঠে।

“আচ্ছা শ্যামলদা, আপনি তো ঐ পাড়াতেই থাকেন। দুবেলা রিডিং ক্লাবে গিয়ে না বসলে আপনার চলে না। আপনি কী করে এটা সাপোর্ট করছেন বলুন তো? পাড়ার লোকে তো দুদিন বাদে আপনাকেই গাল দেবে।” রবীন বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। তাতে একটা চমকপ্রদ উত্তর আসে।

“শ্যামল কংসবণিককে সবুজগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে গালাগালি দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই।”

উপস্থিত আরো কয়েকজন কমরেডের চাপাচাপিতে সম্রাট শ্যামল কংসবণিক শেষ অব্দি পরের এল সি মিটিঙের এজেন্ডায় ব্যাপারটা রাখতে রাজি হন।

উদ্দালক সাইকেলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বলেছিল “এটা কী হল, রবীনদা? এইসব ব্যাপারেও মিটিং করতে লাগে?”

মনে যা-ই থাকুক, রবীন মুখে বলেছিল “না, আসলে সবার মতামত নিয়ে করতে চাইছে আর কি।”

রাস্তাটায় ল্যাম্পপোস্টগুলো বেশ দূরে দূরে আর কথাটা বলে সোজাসুজি উদ্দালকের দিকে তাকাতেও চাইছিল না রবীন। তাই ওর মুখটা দেখতে পেল না ভাল করে। কিন্তু আড়চোখে দেখেই বুঝল ও ভীষণ অসন্তুষ্ট। স্বাভাবিক। উদ্দালকের বয়সে রবীনেরও এমনটাই হত। তখন অবশ্য, যতদূর মনে পড়ে রবীনের, চোলাই মদের ঠেক ভেঙে দেওয়া গুন্ডামি বলে মনে হত না কোন নেতার। বেশ কয়েকটা তো দল বেঁধে রবীন নিজেই গিয়ে ভেঙে এসেছে।

বাকি রাস্তা উদ্দালক আর কথাই বলেনি। পান্তির মোড় থেকে ওকে বাঁদিকে চলে যেতে হয়, রবীনের বাড়ি সোজা গিয়ে দু তিনটে বাড়ি পরেই। মোড়টায় এসে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ে তাজা ছেলেটা, তারপর তার বর্ষীয়ান কমরেডকে জিজ্ঞেস করে “আচ্ছা রবীনদা, আপনি এটা মানছেন তো যে পল্টুর মদ বিক্রি পার্টির ক্ষতি করছে এবং এটা বন্ধ করা পার্টির দায়িত্ব?”

“একশো বার।”

“যাক, বাবা !” কালো মুখটা একটু উজ্জ্বল হয়। “ছোটবেলা থেকে আপনাকে দেখছি। আপনি, আমার কাকা — এদের দেখেই তো কমিউনিস্ট হলাম। আপনাদের মত হতে চেয়ে। আপনারা যেন বদলে যাবেন না।”

কথাটা শুনে ভীষণ লজ্জা করে রবীনের।

“আমরা কেউ কমিউনিস্ট হইনি রে। হতে এসেছিলাম। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি হয়ে ওঠার। পারিনি। আমার তো সময় বেশি নেই, আর বোধহয় হয়ে উঠল না। দ্যাখ, তোরা হতে পারিস কিনা?”

বলতে গিয়ে গলা কেঁপে গিয়েছিল রবীনের। ইদানীং এটা হয়। চট করে চোখে জল এসে যায়। আসলে এমনিতে তো আশাবাদী হওয়ার মত বিশেষ কিছু নেই, যখন কোন তরুণ কমরেড এরকম কথা বলে তখনই শুধু মনে হয় সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি, শেষ হয়ে যায় না।

তবে পল্টু ঘোষের শাস্তিবিধান যে হবে না সেটা রবীন সেদিনই বুঝে গিয়েছিল। উদ্দালক নতুন ছেলে তাই ও ভেবেছিল মিটিঙে ইতিবাচক সিদ্ধান্তই হবে। কিন্তু রবীন পার্টি আর ফুলপ্যান্ট ধরেছিল একসঙ্গে। এই ষাট বছর বয়সে কোন্ মিটিঙে কী হতে চলেছে সেটা বুঝতে আর মিটিং অব্দি অপেক্ষা করতে হয় না। শ্যামল ব্যাপারটাকে আলোচনার বিষয় করেছে কোন ব্যবস্থা নিতে চায় না বলেই। লোকাল কমিটির অধিকাংশ সদস্যই ওর ধামাধরা। এল সি এসের কথাই তাদের বেদবাক্য। অতএব শেষ অব্দি এই সিদ্ধান্তই হবে যে “পার্টি পুলিশের কাজ করতে যাবে না।” একথা রবীন আগেই বুঝতে পেরেছিল। পরের শনিবার মিটিঙে ঠিক তাই হল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে উদ্দালক বলেছিল “রবীনদা, লোকাল কমিটি যা-ই বলুক, ব্যাপারটা তো অন্যায়। চলুন না পাড়ার লোকের সঙ্গে গিয়ে আমরাই ভেঙে দিয়ে আসি দোকানটা। আপনি লিড করলে অনেক পার্টি মেম্বারই চলে আসবে।”

“সেটা করা যায় কিন্তু তারপরে আর পার্টিতে থাকা যাবে না। আর আমরা পার্টি ছাড়া মানে পার্টিটাকে বাজে লোকেদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। সেটাও কোন কাজের কথা নয়।”

“তাহলে কী করা উচিৎ?”

“ধৈর্য ধরতে হবে। কমরেডদের বোঝাতে হবে। সবকিছু কি এক্ষুণি এক্ষুণি হবে বাবা?”

“তার মানে তদ্দিন পল্টুর চোলাইয়ের ব্যবসা রমরমিয়ে চলবে?”

“অগত্যা। তবে আরেকটা উপায়ও আছে। জানি না কতটা কাজে দেবে।”

পরদিনই অন্য উপায়টা পরখ করে দেখেছিল রবীন। বাজারে দেখা হয়ে যাওয়াতে পল্টুর বাবাকে একপাশে ডেকে বলেছিল “তোমাগো দোকানটা এইবারে ভাইঙা ফ্যালামু ভাবতাছি, দেবুদা।” নিমেষে দেবুর মুখটা চুরি করে দুধ খেয়ে ধরা পড়া পোষা বেড়ালের মত হয়ে গিয়েছিল। মুখটা নামিয়ে নিয়ে সে চুপচাপ শুনে গেল।

“তোমাগো দোকানে মদ বিক্কিরি হয় ক্যান? মদের দোকান করনের লাইগ্যা তোমারে পঞ্চায়েত লোন দিছিল?”

“আমার নাতির নামে দিব্যি কইরা কইতাছি রবীন, আমি হেইডা একদম সমর্থন করি না। আমি পল্টুরে অনেকবার বারণ করছি। কিন্তু হেয়া এখন বড় হইয়া গ্যাছে, আমার কথা শোনে কৈ? একদিন তো এই নিয়া কথা কাটাকাটি কইরা আমার গায়ে হাত তুইলা দিছে।”

কাঁদতে কাঁদতে মাটিতেই বসে পড়ে অশক্ত বৃদ্ধ দেবু ঘোষ।

“অ! এই স্বভাব হইছে? এত বাড় বাড়ছে যে বাপের গায়ে হাত তোলে? তাইলে তো আরোই দোকান ভাইঙা দেয়া দরকার।”

এবার দেবু একেবারে পা জড়িয়ে ধরে রবীনের। “এই সর্বনাশ তুমি কইরো না। দুটি পায়ে পড়ি। আমার বউমা, নাতির মুখ চাইয়া ছাড়ান দ্যাও।”

ব্যাপারটা ঠিক এইখানেই আনতে চাইছিল রবীন। তাই সে বলে “দ্যাখো দেবুদা, দোকানডা তুমি অনেক কষ্ট কইরা করছিলা। তাছাড়া তুমি পার্টির জন্যেও কম করো নাই। তাই এত কইরা কইতাছি। অন্য কেউ হইলে কিছুই কইতাম না, সোজা যাইয়া ভাইঙা দিতাম। তোমারে এক মাস সময় দিলাম। এর মইধ্যে পল্টুরে কও এইসব দুনম্বরী ধান্দা বন্ধ করতে। নাইলে কিন্তু আর তোমার কথা মনে থাকব না।”

পল্টু যে বাপকে ঠ্যাঙায় এটা শোনার পরে এই টোটকা কাজ করবে বলে আর রবীন আশা করেনি। সে এ-ও জানত যে এক মাস পর কোন ব্যবস্থাই নেওয়া যাবে না। তবু এটা করল যাতে অন্তত নিজের কাছে পরিষ্কার থাকা যায়, যাতে নিজেকে বোঝাতে পারে “আমার যতটুকু সাধ্য আমি করেছি।”

তবে নিজেকে ঠকানো বড় শক্ত। “সত্যিই কি আমার ক্ষমতা এইটুকুই?” এই প্রশ্নটা বারবার ফিরে আসছিল, বিশেষত রাতে শোয়ার পর। এপাশ ওপাশ করতে করতে বাঁদিকে কাত হয়ে চোখ খুললেই বাইরের ঘরে আলমারির মাথায় রাখা হীরুদার ছবিটার উপর চোখ পড়ে। ঐ মানুষটা বেঁচে থাকলে এই সংশয়টা তৈরিই হত না। একবার এও মনে হয়েছিল যে উদ্দালকই ঠিক বলেছে। ওটাই করে ফেললে হয়। কিন্তু অল্পবয়সীগুলোর কথা ভেবেই ভাবনাটা বাতিল করতে হয়েছিল। বেআইনি মদের ঘাঁটি ভেঙে দেওয়ার জন্যে রবীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস শ্যামলের হত না। তবে উদ্দালকের মত ছেলেদের পেছনে হয়ত অন্য কোনভাবে লেগে যেত। তাতে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হত — ওদের টাইট দেওয়া আর রবীনকে দুর্বল করে দেওয়া। ফলে পল্টু ঘোষের দুনম্বরী ব্যবসা টিকে গেল। রবীন শুধু দেবুর হাতের চা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। রিডিং ক্লাবে গেলে আজকাল চায়ের তেষ্টা পেলেও ও উচ্চবাচ্য করে না। অবশ্য ওখানে যাওয়ার দরকারও চট করে হয় না। রিডিং ক্লাব এখন গসিপ ক্লাব। পার্টি ক্লাস তো আজকাল স্কুলবাড়িগুলোতেই করা হয়, আর আগেকার মত ভাল বক্তা এনে সেমিনার করার উৎসাহ কমরেডদের মধ্যে বিশেষ নেই। বইপত্র আর পড়ে কে যে ওখান থেকে বই নেবে বা বই নিয়ে আলোচনা হবে?

এইসব ভাবতে ভাবতে রবীন কালীতলা পেরিয়ে গেল। পল্টুর বাইকটা চোখে পড়ল। মদ বেচছে, বাপকে ঠ্যাঙাচ্ছে আর দুবেলা কালীবাড়ি যাচ্ছে। “খাসা জীবন”, রবীন আপনমনেই বলে ওঠে। দেবুর কথা ভাবলে খারাপই লাগে। বেচারা বোধহয় মরতে পারলে বেঁচে যায়। কিন্তু দিব্যি বেঁচে আছে, রীতিমত সুস্থ শরীরে। রিকশাওয়ালা শম্ভুও যদি এখন বিদেয় হয় তাতে কারো ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। ওর বউ মরেছে অনেকদিন, ছেলে মানুষ হয়ে গেছে, জীবনে ওর আর নতুন কিছু করার নেই, নেশা করে ছেলে-বউকে বিব্রত করা ছাড়া। অথচ ও-ও বেঁচে আছে। এতবছর ধরে মদ-গাঁজা টানার পরেও অসুখবিসুখ তেমন কিছু নেই। শুধু চোখে একটু কম দ্যাখে। সে তো ৬০-৬৫ তে হতেই পারে। গোঁয়ারগোবিন্দ বলে চশমা পরতে চায় না, নয়ত এতেও অসুবিধা হত না।

তবে যে লোকটা এখুনি মরে গেলে তবু কিছুটা সম্মান নিয়ে মরতে পারত সে হল এল সি এস শ্যামল। ভাবতে অবাক লাগে রবীনের যে এই লোকটা কী পরিমাণ আত্মত্যাগ করেছে এক সময়। ভাল সরকারী চাকরি পেয়েছিল বাবার পরিচিতির কারণে। পেতে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি করা ছাড়তে হত শুধু। নেয়নি সে চাকরি। রাগে বাবা বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর আগে অব্দি লুকিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যেত, থাকত শ্বশুরবাড়িতে। সেই লোক এখন উপদল করতে ব্যস্ত। কী করে বড় নেতাদের প্রিয় হয়ে নিজে আরো বড় নেতা হবে সেটাই একমাত্র চিন্তা। বামফ্রন্ট সরকার হওয়ার পরে কাজের কাজ বলতে করেছে শুধু শালার আর ছেলের চাকরির ব্যবস্থা। কংগ্রেস আমলে লোকটা ছিল অকুতোভয়। কম লাঠির বাড়ি খেয়েছে? সবমিলিয়ে জেল খেটেছে বছর তিনেক। আর এখন? মদের ঠেক ভাঙতে ভয় পায়। ভয় পায় নাকি পেয়ারের লোক বলে পল্টুকে আড়াল করছে? যা-ই হোক, ঐ লোককে এভাবে দেখে বড় ঘেন্না হয়। একা রবীনের হয় তা নয়। অনেক সাধারণ লোকও ইদানীং পেছনে গাল দেয় শ্যামলদাকে, বলে “শালা যদ্দিন ফালতু পার্টির নেতা ছিল তদ্দিন ভদ্দরলোক ছিল। ক্ষমতা পেয়েই আসল চেহারা বেরিয়ে পড়েছে।” সকলের সবটুকু শ্রদ্ধা হারানোর আগে মারা গেলেই ভাল হয় না? বয়সও তো প্রায় সত্তর হল ওঁর।

নিজের সম্পর্কেও একই কথা মনে হয় রবীনের। না বিপ্লব হল, না গরীব মানুষের জন্য কিছু করা হল, না নিজের আপাদমস্তক কমিউনিস্ট হওয়া হল। এমনকি নিজের ছেলেটাও মনের মত হল না। কী লাভ আর বেঁচে থেকে? শরীরে কোন গ্লানি নেই সত্যি। কিন্তু ৫৮-৫৯ এ কি মরে না কেউ? হঠাৎ হার্ট ফেল করে? এ তল্লাটে অবশ্য এরকম হয় না খুব একটা। এখানে যাদের না বাঁচলেও চলে তারা অনেকদিন বাঁচে। মরে উদ্দালকের মত ছেলেরা, যাদের অনেকদিন বাঁচা দরকার ছিল।

রবীন সাইকেল থেকে নামে।

“কী রে, ম্যাটাডোরকে খবর দেওয়া হয়েছে?” পার্টির ছেলেগুলোকে জিজ্ঞেস করে।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতকিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078