নাম তার ছিল: ২৬

পূর্বকথা: পরিচারিকা পার্বতীদির খোঁজ করতে তার বাড়ি পৌঁছে বিপ্লব বড়পিসির বাড়ির গন্ধ পায়, মনে পড়ে সবুজগ্রামের বাড়িতে তার ছোটবেলায় কাজ করত লক্ষ্মীদি। তার কথা। অনেকদিন পর বাবাকে ফোন করতে ইচ্ছা করে।

তখন ভোটের মরসুম। মেয়াদ ফুরোবার মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে বিপ্লবের বাবার পার্টি আর অন্য বাম দলগুলো মনমোহন সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। মুলায়মের সমর্থনে সরকার বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত যথাসময়েই লোকসভা নির্বাচনে গেছে সরকার।

“শুধু সরকার ফেলার চেষ্টা করে প্রকাশ কারাতের শান্তি হয়নি, আবার সোমনাথ চ্যাটার্জিকে নিজের মর্জি মত চালাতে গেছিল। লোকটা শোনেনি বলে পার্টি থেকে বার করে দিল! শালাদের একটাও ভোট দেয়া উচিৎ না।”

বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা তখন উঠতে বসতে এসব কথা বলছে। বছর দুয়েক আগে হলে সে-ও তেড়ে গাল দিত, এখন শুধু চুপচাপ শুনে যায়। কে ঠিক, কে ভুল তা নিয়ে কিছুতেই আর মনস্থির করতে পারছে না। বাবার সাথে কথা হলে অবশ্য এসব কথা তুলবে না ঠিক করে নিয়েছে।

সাধারণত বার তিনেক রিং হলেই মা ফোনটা ধরে। কিন্তু এবার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল, ধরার নাম নেই। বিপ্লবের তর সইছিল না। তাই সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফোন করল। এবার একবারেই মা ধরল।

“মা, বাবা বাড়ি আছে? একটু দাও তো।”

“বাড়িতে তো আছে, কিন্তু ঘুমোচ্ছে। সন্ধেবেলা কথা বলিস,” মা গলাটা বেশ নীচু করে বলল।

“ঘুমোচ্ছে!” বিপ্লব হাতের ঘড়িতে দেখল একটা বাজে। “ভোটের সময় বাবা এই সময় বাড়িতে ঘুমোচ্ছে! স্কুলেও যায়নি? শরীর খারাপ নাকি?”

“দাঁড়া। এখান থেকে কথা বললে ঘুম ভেঙে যাবে। তুই ফোন রাখ, আমি তোকে মোবাইল থেকে করছি।”

প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে ফোনটা কেটে দিল বিপ্লব। ভোটের মরসুমে বাবাকে কখনো ভরদুপুরে ঘুমোতে দ্যাখেনি। ভোটের প্রচার চলছে মানেই বাবাকে খানিকক্ষণের জন্যেও বাড়িতে পাওয়া যাবে না — এটাই নিয়ম। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে পড়বে, দাঁতটা মেজে দু তিন গ্লাস জল খেয়েই বেরিয়ে যাবে, স্কুল থাকলে একেবারে শেষ মুহূর্তে ফিরেই “জোনাকি, ভাত বাড়ো” বলে দড়িতে টাঙানো গামছাটা নিয়ে পুকুরের দিকে দৌড়বে, ফিরে কোন মতে ভাত মুখে দিয়েই স্কুল, আবার স্কুল থেকে ফিরেই এক কাপ চা আর মুড়ি দুধ বা চিড়ে দুধ খেয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাবে, ফিরবে রাত বারোটা নাগাদ। এই হচ্ছে বিপ্লবের বাবার চিরকালের রুটিন। নিজে প্রার্থী হোক বা না হোক, ভোটটা পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, বিধানসভা, লোকসভা — যা-ই হোক, এর অন্যথা কখনো হয়নি। তাহলে এবার হঠাৎ কী হল?

মা মিনিট খানেকের মধ্যেই ফোন করল।

“আরে, এ বারে তো গরমটা ভীষণ পড়েছে। তার মধ্যেই প্রচারে টো টো করে ঘোরা। আজকে মিছিল ছিল প্রবীরদাকে নিয়ে। স্টেশনের ওখানে গিয়ে হঠাৎ সান স্ট্রোকের মত হয়ে গেছে।”

“তারপর? অজ্ঞান হয়ে গেছিল?”

“অজ্ঞানের মতই। তারপর যা-ই হোক, ফাল্গুনী, বল ওরা তো সব ছিল। ওরা ধরাধরি করে বিন্দুর দোকানে বসিয়েছে, মাথায় জল টল দিয়েছে। তারপর প্রবীরদা ওদের বলেছেন ‘আমার গাড়িটা করে রবীনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় তোরা।’ তাই দিয়ে গেল। এই একটু শুয়েছে।”

“ডাক্তার দেখাতে হবে তো।”

“ওখানেই একজন বুদ্ধি করে অমলেন্দুকে ডেকে এনেছিল। ও তো স্টেশনের কাছেই নার্সিংহোম করেছে।”

“কী বলেছে অমলকাকু?”

“ঐ সান স্ট্রোকই বলেছে। প্রেশারটা একটু লো আছে। তবে বলেছে চিন্তার কিছু নেই। কদিন বাড়ি থেকে একদম না বেরোতে বলেছে। এখন তোর বাবা শুনলে হয়। একটা কথা তো শোনে না। এত করে বলি একটা ছাতা নাও, কি টুপি পরো। শোনে কোথায়?”

“সে তো চিরকালই। কিন্তু এরকম তো আগে হয়নি! বাবার আবার প্রেশার লো হল কবে? কোনদিন তো এসব দেখিনি! অসুস্থ হতে তো সেই একবারই দেখেছি। ছোটখাট শরীর খারাপ তো কোনদিন হয় না বাবার! তাহলে?”

“আরে এতদিন হয়নি। তা বলে কখনো হবে না? বয়সটা তো হচ্ছে। সেটা দ্যাখ। আমি দিন রাত বলি, এখন আর আগের মত উল্টো পাল্টা রুটিনে চললে হবে না। যখন ইচ্ছে চান করলাম, যখন ইচ্ছে খেলাম, দুপুর রোদে টো টো করে ঘুরলাম — এসবের বয়স গেছে। জোর করে অস্বীকার করতে চাইলে তো হবে না..”

“না না, তুমি বুঝতে পারছ না। হঠাৎ করে এরকম হবে কেন? অন্য একটা ডাক্তার ফাক্তার দেখাও, একবার ই সি জি করিয়ে নাও। লাইনের ওপারে কে একজন কার্ডিওলজিস্ট থাকে না? সেই বাবাদের পার্টি অফিসের কাছে?”

“ওরে বাবা, অমলেন্দুর কাছেই তো ই সি জি মেশিন আছে। তেমন কিছু মনে হলে ও-ই করে নিত। তুই এত চিন্তা করিস না। তোর বাবা ঠিক আছে।”

“আমি তাও বলছি তুমি আরেকবার বাবাকে নিয়ে যাও সন্ধেবেলা। দরকার হলে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দাও দোষটা, বলো ‘ছেলে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে ই সি জি, ই সি জি করে।’”

অনেক চাপাচাপি করায় মা শেষ অব্দি রাজি হল, কিন্তু বিপ্লব বুঝতে পারল মা খুব একটা খুশি হল না। ফোনটা রাখার কয়েক মিনিট পরেই অবশ্য বিপ্লব নিজেই বুঝতে পারল, ও অকারণেই বেশি উতলা হয়ে পড়েছে। এ বছর হায়দরাবাদেও যা গরম পড়েছে, সবুজগ্রামে তো অসুস্থ হয়ে পড়া স্বাভাবিক। যা ঘাম হয় ওখানে। আর সত্যিই তো বাবার বয়স হচ্ছে। এ বছরের শেষেই তো বোধহয় রিটায়ারমেন্ট। সেই লোক যে আগের মত দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে ভোটের প্রচার করতে পারবে না তাতে আশ্চর্য কী?

কিন্তু বাবাকে আটকানোই বা যাবে কী করে? আটকানো কি উচিৎ হবে? ওটা বন্ধ হয়ে গেলে কী নিয়ে বাঁচবে লোকটা? এমনিতেই তো গত এক দশকে বাবার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনেক কমে এসেছে মনে হয়। এটুকুও করতে না দিলে তো জীবন্মৃত হয়ে থাকতে হবে মানুষটাকে। বিপ্লব ভাবল আরেকবার ফোন করে মাকে বলবে কদিন যেন বিশ্রাম নিতে বলে, কিন্তু সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে যেন জোর না করে। ফোনটা আবার হাতে নিয়েও শেষ অব্দি করল না। থাক। বাবা ঘুমিয়ে নিক, না হয় একেবারে রাতে ফোন করা যাবে। ততক্ষণে ই সি জি করিয়ে ফিরে আসবে। “কিছু পাওয়া যায়নি”। এই কথাটাই অমলকাকু পরীক্ষা করে বলে দিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

মৃদু উৎকণ্ঠা কিছুতেই গেল না। সেদিন আর অন্য ছুটির দিনের মত কোথাও বেরোল না বিপ্লব। বারবার ঘড়ি দেখেই কেটে গেল বিকেল, সন্ধে। টিভিটা চালু ছিল সারাক্ষণই, কিন্তু সেখানে কী যে চলছিল বিপ্লবের মনে নেই। সন্ধে নামার পর থেকে বিপ্লব ভাবছিল নিজেই ফোনটা করবে, নাকি মায়ের ফোনের অপেক্ষায় থাকবে? মাকে তো বলেও দেওয়া হয়নি ডাক্তার দেখিয়ে ফিরেই একবার ফোন করতে।

ভাবতে ভাবতে নটা নাগাদ ফোন এল।

“তুই শুধু শুধু এত টেনশন করলি। কিচ্ছু হয়নি বাবার। আমাদের দেখেই অমল বলল ‘কিচ্ছু হয়নি, বৌদি। এই গরমে অনেকেরই ওরকম হচ্ছে।’ তাও আমি বললাম ছেলে ফোন করে বলেছে ই সি জি করাতে, তুমি একবার করেই নাও। তাই করল। কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। হার্ট একদম ঠিক চলছে।”

শুনে নিশ্চিন্ত হল বিপ্লব। তারপরই বলল “একবার বাবাকে দাও তো ফোনটা।” বিপ্লব শুনতে পেল মা চেঁচিয়ে বাবাকে ডাকল। বাবা জিজ্ঞেস করল “আমাকে? কেন?” মা গলাটা আরো উপরে তুলে বলল “কী করে জানব? এসে ধরো না।”

অবাক হওয়া স্বাভাবিক। প্রবাসী হয়ে যাওয়ার পর থেকে কখনো বাবাকে ডেকে ফোনে কথা বলেনি বিপ্লব। বাবার সংশয় টের পেয়ে তারও হঠাৎ মনে হল, তাই তো! বাবাকে বলবটা কী? সোজা জিজ্ঞেস করব লক্ষ্মীদির খবর? কেমন অদ্ভুত হবে না ব্যাপারটা? কিছু ঠিক করতে পারার আগেই বাবা এসে ফোনটা ধরে ফেলল।

“হ্যালো।”

যাক, বাবার গলাটা একেবারেই পাল্টায়নি।

“বাবা, শরীর ঠিক আছে… এখন?”

“শরীর তো ঠিকই ছিল৷ ডাক্তারও তো তাই বলল। তোর এত চিন্তা করার দরকার নেই। তুই নিজের দিকে নজর দে, চাকরিটা মন দিয়ে কর। আমরা নিজেদের ঠিক সামলে নেব।”

হয়ত মনের ভুল, বাবা খুব একটা কিছু ভেবে বলেনি। তবু কথাগুলো থাপ্পড়ের মত মনে হল বিপ্লবের। সহসা কথা খুঁজে না পেয়ে ও বলেই ফেলল “বাবা, লক্ষ্মীদি এখন কোথায় থাকে?”

“লক্ষ্মী? কোন লক্ষ্মী? আমাদের মহিলা সমিতির নেত্রী?”

“না না। ঐ যে আমাদের বাড়িতে কাজ করত। আমাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যেত সঙ্গে করে…”

“ও আচ্ছা। ও এখানেই আছে। যে বাড়িতে থাকত সে বাড়িতেই। কলকাতায় কোন একটা জামাকাপড়ের কারখানায় কাজ করে। এই তো কাল ওদের পাড়ায় মিটিং ছিল, দেখা হল।”

“একা একাই থাকে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ও খুব সাহসী মেয়ে। প্রথম প্রথম এ সে বিরক্ত করত। এখন বুঝে গেছে সুবিধে হবে না। মনের সুখেই তো আছে মনে হল। ঘরটা পাকা করেছে, বলল বর্ষার আগে ছাদটাও ঢালাই করিয়ে নেবে। আমায় বলল ‘কাকু, আমার বাড়ি দেখে যাও।’ দেখাল, চা খাওয়াল। তোর কথাও জিজ্ঞেস করছিল। বলল ‘ভাইয়ের বিয়ে দেবে না?’ আমি বললাম ভাই বিয়ে করবে কিনা সে আমি জানি না বাপু। ভাই জানে আর ভাইয়ের মা জানে। কিন্তু তুই হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস?”

“না, এমনি। হঠাৎ মনে পড়ল…”

“আচ্ছা, ধর। মার সাথে কথা বল।… ও, ভাল কথা। সেদিন তোর মাকে কী একটা বলছিলিস… জোনাকি শুনলাম বলল ‘ওসব নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই… মানিয়ে নিতে হয়। কী ব্যাপার সেটা? অফিসে কিছু…?”

“সেদিন নয়। অনেকদিন আগে বলেছিলাম। আমাদের এখানে অনেকের চাকরি গেল তো…”

“অ। তা তোমার মা তো ঠিকই বলেছে। কার কোথায় চাকরি গেল তা নিয়ে ভেবে কী হবে? ভাবতে শুরু করলে তো সারাদিন ঐ নিয়েই ভাবতে হবে, কাজকম্ম আর কিছু হবে না। তোমরা ওপরে উঠবে, কিছু লোক নীচে পড়বে না? এই তো জগতের নিয়ম। অভ্যেস করে নাও। আমি তো ভেবেছিলাম তোমার অ্যাদ্দিনে অভ্যেস হয়েই গেছে। যাকগে। নাও তোমার মায়ের সাথে কথা বলো।”

আজ বিপ্লব বাবার সাথে কথা বলবে বলেই ফোন করেছিল, মার সাথে তো দু বেলাই কথা হয়। মা ফোনটা ধরে আরো কী সব যেন বলল, বিপ্লব না শুনেই “হ্যাঁ হুঁ” করে গেল। তখন সে ভাবছে, বাবার বকার ধরণটা কত বদলে গেছে। গলা চড়াল না একটুও, তেমন কড়া কথাও বলল না। তবু বোঝা গেল, বাবা বিপ্লবের অন্যের চাকরি যাওয়া নিয়ে উতলা হওয়াকে ন্যাকামির বেশি কিছু মনে করে না। বুঝিয়ে দিল তার জগৎ আর বাবার জগৎ একেবারে আলাদা। বিপ্লবের জগৎ নিয়ে তার বাবার বিশেষ আগ্রহ নেই। যে জীবন নিজে বেছে নিয়েছ, তা নিয়েই থাকো, সবুজগ্রামের জীবন আর তোমার নয়, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। বাবা যেন এই কথাটাই বলে দিল।

ফোনটা ছেড়ে দেওয়ার পর বিপ্লব ভেবে দেখল তার যতই খারাপ লাগুক, সবুজগ্রামের যে মানুষগুলোর কথা সে এত ভাবছে, তারা এখন বহু দূরের কোন গ্রহেরই মত। অনেক দূর থেকে সেসব গ্রহের আলো দেখে বেশ লাগে, ওখানে যেতে ইচ্ছেও করে। কিন্তু মাঝের দূরত্বটা কয়েক আলোকবর্ষের। তাছাড়া ঐসব মানুষগুলোকে, ঐ জায়গাটাকে, ঐ জীবনযাত্রাকে সত্যিই তো প্রবল বিতৃষ্ণায় সে নিজেই ছেড়ে এসেছিল। কেউ কেউ যেমন এখনো বিশ্বাস করে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তেমনি বিপ্লবও তো এতদিন ভেবে এসেছে তার জীবনের কেন্দ্রে সে নিজে, বাকি সবাই, সবকিছুই তাকে ঘিরে। এখন প্রান্তের প্রতি প্রেম উথলে উঠলে চলবে কেন? বাবার সাথে কার্যত সম্পর্ক তুলে দেওয়ার এত বছর পরে হঠাৎ শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে বাবাই বা কেন বিশ্বাস করবে ছেলে সত্যিই উদ্বিগ্ন?

কিন্তু টানটা তো মিথ্যে নয়, উদ্বেগটাও যে মিথ্যে নয়। বাবার জন্যে আজ এত উতলা হয়ে পড়ে বিপ্লব নিজেও অবাক। এতটা টান যে এখনো ছিল ভেতরে সে কথা সে নিজেও টের পায়নি এতদিন। হায়দরাবাদে চলে আসার পর থেকে মা বেশ কয়েকবার ফোনে বলেছে “বাবাকে দিই? কথা বল একবার?” বিপ্লব সজোরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই যে মা বলল বাবার বয়স হচ্ছে, সেটা হয়ত এই জন্যেই সে টের পায়নি। হয়ত বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পরে বাবার আরো কয়েকবার শরীর খারাপ হয়েছে। সে তো বাবার কথা জিজ্ঞেস করা দরকার বলেই মনে করেনি কখনো।

ভাবতে ভাবতে বড় অস্থির লাগে। খেয়াল হয় রান্নাবান্না কিছু করা হয়নি। আসলে শনিবার রাত্তিরে তো বাইরেই খায় বরাবর। কিন্তু আজ আর সে উৎসাহ নেই। খিদেটা কখন মরে গেছে। বিপ্লব কয়েকটা পাঁউরুটি সেঁকে নিয়ে ফ্রিজ থেকে টমেটো সস বের করে লাগিয়ে খাবে বলে। টিভিটা চালিয়ে দেয়। খবর দেখা বন্ধ করে দিয়েছে অনেকদিন। আজ মনে হয় ভোটের খবর দেখলে মন্দ হয় না। কোন পথে চলছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচার? কোনদিন না দেখা স্টার আনন্দই দেখা যাক না হয়। এ প্রার্থী সে প্রার্থী, তর্কবিতর্ক দেখতে দেখতে বিপ্লবের মন চলে যায় ছোটবেলায়।

সালটা বোধহয় ১৯৯৬। সেবারই প্রথম বিপ্লবদের লোকসভা কেন্দ্র থেকে বামফ্রন্ট মনোনীত সি পি আই (এম) প্রার্থী প্রবীরজেঠু। বাবা একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়ে বলল “আজকে সন্ধেবেলা তোকে নিয়ে যাব। ক্ষেত্রগ্রামে এক জায়গায় পাবলিক মিটিং আছে, প্রবীরদা বলবে ওখানে। তোর খুব ভাল লাগবে। দারুণ বক্তা। মার্কসবাদ একেবারে গুলে খেয়েছে তো।” বিপ্লবের তো দারুণ উত্তেজনা। তখন ও ক্লাস টেন। গণশক্তির পাতায় প্রবীর দাশগুপ্তের লেখা নিয়মিত পড়ে। রুশ বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী আন্দোলন, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি — এসব নিয়ে ওঁর লেখাগুলো অসাধারণ লাগে বিপ্লবের। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ঐ লেখাগুলোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। সেই প্রবীর দাশগুপ্ত বলবেন আর ও সামনে বসে শুনবে। ভাবা যায়!

মিটিংটা ছিল লক্ষ্মীদিদের পাড়ার মাঠে। ছোট্ট মঞ্চ, সামনে মাটিতে ত্রিপল পেতে বসার ব্যবস্থা। সাড়ে ছটায় মিটিং শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু যাদের জন্যে মিটিং তারা লোকের বাড়িতে কাজ করে, ভ্যান রিকশা টেনে, কোন বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করে বাড়ি ফিরবে। তারপর চান করবে, খাবে দাবে, তবে তো মিটিং শুনতে আসবে। তাই শুরু হতে সাতটা বেজে গেল। ওটা বলকাকুর এলাকা। তাই হম্বি তম্বি করে ঝটপট সকলকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করল। নইলে হয়ত আরো দেরী হত।

লক্ষ্মীদি বিপ্লবকে দেখতে পেয়েই পাশে এনে বসিয়েছিল। একেবারে সামনের সারিতে। প্রবীর দাশগুপ্ত যথাসময়েই এসে গেছেন এবং এসে থেকেই বারবার ঘড়ি দেখছেন। ভদ্রলোকের বেশ সমীহ জাগানো চেহারা। লম্বা, ফরসা, কামানো গাল, পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি। বিপ্লব হাঁ করে দেখছিল। ও বাবার কাছে প্রমোদ দাশগুপ্তের গল্প শুনেছে, বাবার রাজনৈতিক গুরুকে হীরেন্দ্রনাথ ঘোষকে দু একবার দেখেছে। এঁকে যেন তেমনই মনে হচ্ছে, যদিও এঁর বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে না। মঞ্চটা যেহেতু বেশ নীচু আর ছোট, তাই সকলের কথাবার্তাই শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। বিপ্লব শুনতে পেল প্রবীর দাশগুপ্ত বলছেন “অ্যাই বল, তোমাদের অনুষ্ঠানসূচী একটু চেঞ্জ করতে হবে ভাই। আমার কলকাতায় একটা জরুরী মিটিং আছে, গাড়িটাও সঙ্গে নেই। একটা অন্য গাড়ি আসার কথা, সেটাকে বসিয়ে রাখা যাবে না। তুমি রবীনকে সভাপতি ঘোষণা করো। তারপরই আমি বলব, বলে বেরিয়ে যাব। রবীন, তুমি লাস্ট বক্তা ভাই।”

বলকাকু মিটিং শুরুর ঘোষণা করতে গিয়েই মিনিট পাঁচেক কাটিয়ে দিল। বিপ্লবের ভাল লাগছিল না, ও লক্ষ্য করল ও পাড়ার লোকেরাও মশা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। প্রবীরজেঠু মাইক ধরতে ও নড়ে চড়ে বসল। উনি প্রায় আধ ঘন্টা বললেন। বিপ্লব সবটাই মন দিয়ে শুনল, কিন্তু আর কেউ শুনল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। পেছন থেকে নীচু স্বরে কথার আওয়াজ আসছিল, আর এক বৃদ্ধা তো ঢুলতে ঢুলতে বিপ্লবের গায়ে পড়েই গেলেন একবার। অন্যরা খুক খুক করে হেসে তাঁকে সোজা করে বসিয়ে দিল। এসবের মাঝে বক্তা কিন্তু নির্বিকার চিত্তে বলে গেলেন। শেষে হাততালিও পেলেন। বক্তৃতা শেষ হতেই হনহনিয়ে মাঠের পাশের রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়ির দিকে চলে গেলেন। বলকাকু আর অন্যান্য স্থানীয় পার্টিকর্মীরা প্রায় সবাই পিছু পিছু গেল। মঞ্চের উপর একা বিপ্লবের বাবা।

বাবা বলতে শুরু করল “আপনারা সকলেই আমাদের পার্টির আপনজন। আপনাদের তো নতুন করে কিছু বলার নেই। এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, আমাদের কর্মসূচী ইত্যাদিও আমাদের প্রার্থী খুব সুন্দর করে বলে গেলেন। আমি আর পুনরাবৃত্তি করব না। আমি বরং একটা গল্প বলি?”

শ্রোতারা, যাদের অধিকাংশই মহিলা, সমস্বরে “হ্যাঁ হ্যাঁ” করে উঠল। বাবা শুরু করল।

“এটা এক মেয়ের গল্প। গরীব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শেখেনি প্রায়। ছোট বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছে। বর কারখানায় কাজ করে। ডিউটি করে এসে আর শরীরে কিছু থাকে না। কেবল নেশা করে আর ঘুমোয়। আবার সকাল হলে ডিউটি চলে যায়। আর কোন কোনদিন নেশা করে বউকে ধরে পেটায়। এই করেই মেয়েটার কষ্টের জীবন কাটছিল। তারপর হল কি, মেয়েটার একটা ফুটফুটে ছেলে হল। ছেলেকে নিয়েই মায়ের দিন কাটে। মা ভাবে ছেলে আমার বড় হবে, ভাল হবে। তখন আমার সব দুঃখ ঘুচে যাবে। তা ছেলে যখন একটু বড়, তখন তার বাপটা একদিন দুম করে মরে গেল। সারাজীবন এত নেশা করেছে, কী করে আর বেশিদিন বাঁচবে? তা পাড়ার লোকজন মিলে তার জায়গায় ছেলেটাকে কারখানায় ঢুকিয়ে দিল। নইলে দুটো পেট চলবে কী করে? মা তো সামান্য এটা সেটা করে।

যেই না কারখানায় ঢোকা, ছেলেও তার বাপের মত মদ গিলতে শুরু করল। সেই এক জিনিস। প্রায় গোটা দিনটা ডিউটি করে, আর যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, কেবল নেশা করে। মায়ের বুকটা একেবারে ভেঙে গেল। কত আশা ছিল ছেলেকে নিয়ে। হায় রে! ছেলেটাও এমন হল!

কিন্তু কিছুদিন পরেই মা দেখল ছেলের ধরন ধারণ কেমন অন্যরকম। আর অত নেশা করছে না, মায়ের সাথে কথা বলার ধরণটাও কেমন মিষ্টি হয়ে উঠেছে, আর কারা সব যেন ওর সাথে দেখা করতে আসছে। তাদের কথাবার্তা সব অন্য ধারা। অমন মানুষ মা আগে দেখেনি। প্রথম প্রথম মাকে ওরা কিছু বলত না। পরে মা জানল এরা সব পার্টি করে। অন্যরকম দুনিয়া গড়ার পার্টি। মায়ের ছেলেও ওদের সাথে পার্টি করে। এরা সব কারখানার মালিকের বিপক্ষে। ধর্মঘট করে, মিটিং করে, মিছিল করে। শুরুতে মায়ের ভারী ভয় করত। নিজের ছেলের জন্যে তো বটেই, অন্য ছেলেমেয়েগুলোর জন্যেও। ওদের যদি পুলিশে ধরে? অত্যাচার করে? তারপর সত্যি পুলিশে ধরল মায়ের ছেলেকে। ব্যাস। মায়ের ভয় গেল কেটে। মা নিজেও নেমে পড়ল পতাকা হাতে।

কোন পতাকা? লাল পতাকা। কাস্তে হাতুড়িওয়ালা। আমাদের পার্টির পতাকা…”

যে বৃদ্ধা বিপ্লবের গায়ে ঢুলে পড়ছিলেন, তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন “হ্যাঁ গো রবীন মাষ্টার, এ গপ্প কে লিকেচে গো? এ যেন মনে হচ্চে আমারই গপ্প। তোমাদের পাটির কেউ লিকেচে বুঝি?”

বিপ্লবের বাবা হেসে বলে “মাসিমা, এদেশের লোক লেখেনি। রাশিয়া বলে একটা দেশ আছে। সে দেশের একজন লিখেছেন। আমাদের পার্টির লোকই বটে। নাম ম্যাক্সিম গোর্কি।”

“সে কি গো! সে ছোকরা আমাদের কতা জানলে কেমনে?”

“গরীব মানুষের দুঃখ সব দেশেই একই রকম যে মাসিমা। আর সেই জন্যেই তো আমাদের পার্টি করা। এই পার্টি আপনাদের। তাই এ বারেও আপনাদের আশীর্বাদ চাইতে আমরা এসেছি। আপনারা আমাদের প্রার্থীকে জেতান, যাতে দিল্লী গিয়ে জোর গলায় আপনাদের কথা বলতে পারে। এটুকুই চাওয়া।”

আরেক বৃদ্ধা বললেন “তা এই কতাটাই সোজা করে বলো না বাপু। আমি তো সেই কতাই ভাবচি। আমার কত্তা যকন ছেল সে আলাদা কতা ছেল। সে বলত হাতে ছাপ দাও, আমিও দিতুম। তিনি যাওয়ার পর থেকে তো বাপু তোমাদেরই দিচ্চি। সুখে দুঃখে বিপদে আপদে এই তোমাদের কাচেই তো দৌড়ে যাই। আর কারেই বা চিনি? সেইটে না বলে এতক্ষণ কী যে সব বলচিল তোমাদের বড় নেতা। সে বাবা আমার মাতায় কিচু ঢোকেনি। হ্যাঁ গো, তোমরা কেউ কিচু বুজেচ?”

বৃদ্ধার প্রশ্নের উত্তরে সকলেই নেতিবাচক মাথা নাড়ে। বিপ্লবের চোখে পড়ে মঞ্চের উপরে বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ডি ওয়াই এফ আই নেতা মদনকাকু হতাশ হয়ে মাথা নাড়ছে। বাবা সেসব খেয়াল না করে প্রশ্ন করে “তাহলে এ বারেও আপনাদের ভোট আমরা পাব তো নাকি?” সকলে হৈ হৈ করে সম্মতি দেয়। একটা লোক চেঁচিয়ে বলে “সবাই আমরা সারাদিন খেটে খুটে এসে ক্লান্ত বুঝলেন না? আর মিটিং মাথায় ঢোকে, মাস্টারমশাই?” সম্মতি জানিয়ে সভাপতি বিপ্লবের বাবা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল।

বাড়ি ফেরার সময়ে বিপ্লবকে যখন তার বাবা জিজ্ঞেস করে প্রবীর দাশগুপ্তের বক্তৃতা কেমন লাগল, তখন বিপ্লব বলেছিল “তোমারটাই বেশি ভাল। উনি অনেক জানেন বুঝলাম। কিন্তু সে তো গণশক্তির লেখাগুলো পড়েই বোঝা যায়। যে প্লাস মাইনাস শেখেনি তাকে উনি মিডল টার্ম ফ্যাক্টর শেখাচ্ছিলেন। কী করে চলবে?” বাবা কি এখনো মিটিঙে ওরকম গল্প বলে? সে গল্প কি এখনো মানুষকে ছুঁয়ে যায় সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রামে? সবই তো পাল্টে গেছে। মানুষও কি পাল্টে গেছে? ফেরত গেলে কাউকে কি চিনতে পারবে আর? ঝাপসা টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে বিপ্লব ভাবতে থাকে।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৫

পূর্বকথা: রবীনকে মার্কসবাদের পথ দেখিয়েছিলেন যে মাস্টারমশাই, তাঁরই একমাত্র ছেলের পুত্র বিপ্লবের কলেজে এ আই ডি এস ও করতে গিয়ে খুন হয়েছে এস এফ আই- এর হাতে। কাগজে নাম ধাম দেখেই রবীন কথাটা বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু বিপ্লবের সাথে সেসব কথা আলোচনা করার পরিস্থিতি ছিল না। রাজনৈতিক হত্যার পর্ব বামফ্রন্ট আমলেও শেষ হল না দেখে হতাশ লাগে রবীনের।

“সন্তানের পথ বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যাবে, সন্তান বাবা-মায়ের মত করে ভাববে না — এটাই তো স্বাভাবিক। চিরকাল এমনটাই তো হয়ে এসেছে। হওয়াও উচিৎ তাই। নইলে তো সভ্যতা এগোবে না। উকিল হাইনরিখ মার্কসের ছেলে কার্ল যদি বাবার মত ওকালতি করেই কাটিয়ে দিত জীবনটা, তাহলে কি মার্কসবাদ পেতাম আমরা? না আমাদের পার্টিটা তৈরি হত? বাবা ভাবলেন ছেলে আমার বড় উকিল হবে, নয় ভাল সরকারী চাকরি পাবে, তাই বন থেকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে দিলেন। আর ছেলে কী করল সেখানে গিয়ে?”

বাড়িতে সকালের আড্ডায় বাবা বলত কথাগুলো। বিপ্লবের বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে। বাবাকে চা খাইয়ে দিতে দিতে বা পাশের ঘরে পড়তে বসে কান খাড়া করে বিপ্লব শুনত।

“বার্লিনে গিয়ে বাউয়ের টাউয়েরের সাথে মিশে কার্ল যা হলেন, দুনিয়ার সব দেশের বাবারা চিরকাল সেটাকে মনে করে বখে যাওয়া।” কথাটা বলে বিপ্লবের বাবা মিটিমিটি হাসত। উপস্থিত পার্টি কমরেড বা পার্টির ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া লোকেরা মাথা নাড়ত। ঠিক তখনই বাবা যোগ করত “ভাগ্যিস ভদ্দরলোক বইখ্যা গেছিলেন। নাইলে আমি তগো মাথাগুলা খাইতাম কী কইরা?”

হাসির রোল উঠত।

বাবার কথাগুলো মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বিপ্লব। বাবা পড়ে রইল নিজের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের সবুজগ্রামে, আর সে চলে এল সুদূর হায়দরাবাদে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পিছু পিছু — একে গত কয়েক মাস ধরে যে ঘোর অন্যায় বলে বোধ হচ্ছে, সেই অপরাধবোধ ঢাকতে বাবাকেই আঁকড়ে ধরতে হল। মনটা পরিষ্কার হল না তাতে, কিন্তু তখনকার মত অফিস যাওয়ার অনীহা কাটিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া গেল।

কাজের মাসি আসছে না কদিন ধরে। এখানে অবশ্য কাজের লোককে মাসি পিসি বলে ডাকার রেওয়াজ নেই বোধহয়। বিপ্লবের বাড়িওয়ালা তো শুধু “বাই” বলে, আর বাড়িওয়ালি নাম ধরে “পার্বতী” বলে ডাকে, যদিও ভদ্রমহিলা ওদের চেয়ে বয়সে যে বড় সেটা বেশ বোঝা যায়। ওদের বিচ্ছু ছেলেটাও “বাই” বলে। অবশ্য শুধু ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিপ্লবের বেশ মনে আছে, সবুজগ্রামেও নবাকাকুদের যৌথ পরিবারের আবালবৃদ্ধবনিতা ষাটোর্ধ্ব কাজের পিসিকে “আরতিদি” বলত। বিপ্লব বাড়ির অভ্যেস ছাড়তে চায়নি, তাই “পার্বতীদি” বলে। ভদ্রমহিলার বয়স বছর পঁয়তাল্লিশ, ফলে মাসি টাসি বলা বাড়াবাড়ি হয়ে যেত।

এঁকে নিয়ে বিপ্লবের কোন অভিযোগ নেই। দেড় বছরে এর আগে কখনো কামাই করেননি, সকাল সকাল কাজে আসেন, দরকারের চেয়ে বেশি কথা বলেন না, কাজে যোগ দেওয়ার সময়ে বিপ্লবের হয়ে বাড়িওয়ালিই মাইনেপত্তর নিয়ে দরাদরি যা করার করে দিয়েছিল। সেই নিয়ে কোন ঝামেলা নেই, কাজকর্ম বেশ পরিচ্ছন্ন। আর কী চাই? কিন্তু এ বারে দিন সাতেক হয়ে গেল পাত্তা নেই। প্রথম দিকে বিপ্লব গা করেনি। এখন মেঝেতে বালি কিচকিচ করছে, আকাচা জামাকাপড় জমে গেছে অনেকগুলো। বন্ধুদের কথা মত এবার ওয়াশিং মেশিন একটা কিনেই ফেলবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু মাসের শেষ দিকে এসে সেটা করা সম্ভব না। বিপ্লব তাই ঠিক করল বাড়িওয়ালির কাছে একবার জানতে চাইবে পার্বতীদির খবর।

তার আর দরকার হল না। স্নান করতে ঢুকেই নীচে বাড়িওয়ালার ঘর থেকে তেলুগু ভাষায় ঝগড়ার শব্দ কানে এল। গলা দুটো চিনতে অসুবিধা হল না। স্নান সেরে জামাকাপড় পরে ব্রেকফাস্ট শেষ করতেই বেল বাজাল পার্বতীদি, বিপ্লব দরজা খুলে দিল।

যখন ঝাঁট দিচ্ছে, তখন কাগজ পড়তে পড়তে আলগোছে বিপ্লব জিজ্ঞেস করল সাত দিন কামাই করার কারণ। করতেই যা হল, বিপ্লব তা একেবারেই আশা করেনি। পার্বতীদি ফোঁস করে উঠে একতরফাই চেঁচাতে শুরু করল। বিপ্লব এ ধরণের ঝগড়া করতে একেবারেই পারে না। তার উপর এমন আচমকা হল ব্যাপারটা যে ও হতবুদ্ধি হয়ে গেল। অথচ তেমন কিছুই বলেনি, খুব নীচু গলাতেই কামাইয়ের কারণটা জিজ্ঞেস করেছিল। পার্বতীদির চিৎকৃত কৈফিয়ত থেকে জানা গেল, গত এক সপ্তাহ ওর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি চলেছে। প্রবল ডাইরিয়া হয়েছিল। প্রথম দিন বাড়িতে, তারপর থেকে হাসপাতালেই ছিল। আজ সকালেই ছেলে বাড়ি এসেছে, তাই ও কাজে এসেছে ছেলেকে প্রতিবেশীদের ভরসায় রেখে। সে এখনো বেশ দুর্বল। পার্বতীদি তিন-চার জায়গায় কাজ করে। সকাল থেকে কৈফিয়ত দিতে দিতে ওর গলা ব্যথা হয়ে গেছে, অথচ কেউই ওর দিকটা ভাবতে রাজি নয়। সকলে বিশ্বাসও করছে না যে ও এই কদিন সত্যিই বিপদের মধ্যে ছিল। নীচের তলার গিন্নী হুমকি দিয়েছেন, আবার এরকম না বলে কামাই করলে চাকরি যাবে। তাই বিপ্লব প্রশ্ন করা মাত্রই পার্বতীদি বুঝে গেছে, ওরও তাই বক্তব্য। অতএব উপসংহারে সে ঘোষণা করল “নই রাখনা হ্যায় তো বোল দো। দুসরা কাম দেখ লেগা ম্যায়। হাম কো ভি অ্যাইসা কাম নই মাংতা। ইস মহিনে কা তনখা লেকিন পুরা দেনা হোতা।” কয়েক সেকেন্ড দণ্ড শোনার জন্যে অপেক্ষা করে, বিপ্লব চুপ করে আছে দেখে পার্বতীদি কাজে লেগে পড়ল।

বিপ্লব বুঝল ওর মাথা গরম হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, তাই আর কথা বাড়াল না। কাজ সেরে চলে যাওয়ার সময়ে আবার প্রশ্ন এল “কাম কে লিয়ে আনা পড়তা?” অর্থাৎ “কাজটা আমার থাকল না গেল?” বিপ্লব মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। বিকারহীনভাবে “অচ্ছা” বলে পার্বতীদি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। বিপ্লবের বেশ আনন্দ হল। অকারণেই।

পরদিন শনিবার, মানে ছুটি। এই দিনগুলোয় পার্বতীদি না আসা অব্দি ও নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। কিন্তু মা হঠাৎ সাত সকালে ফোন করে ঘুমটা দিল ভাঙিয়ে। পরে আর ঘুম এল না। শুধু শুধু শুয়ে থাকলেই সবুজগ্রামে ফিরে যাওয়ার চিন্তাটা আবার ফিরে আসে, সেই সঙ্গে আসে অবসাদ। ঐভাবে কাত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর হঠাৎ দেওয়ালঘড়িতে চোখ পড়ায় খেয়াল হল, পার্বতীদি তখনো আসেনি, অথচ নটা বেজে গেছে। সাড়ে আটটার বেশি দেরী কখনো করে না। তাহলে? ছেলেটার কিছু হল নাকি? বিপ্লব লাফ দিয়ে উঠে পড়ল।

বাড়িওয়ালিকে জিজ্ঞেস করতে যাওয়াই ভুল হয়েছিল। সে কিছু জানে না। সুযোগ পেয়ে শুধু পার্বতীদির বাপ বাপান্ত করে নিল আরেকবার। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে বিপ্লব ঠিক করল একবার পার্বতীদির বাড়িই চলে যাবে। কিন্তু কোথায় বাড়ি ওর? কখনো তো জিজ্ঞেস করা হয়নি! অগত্যা আরেকবার বাড়িওয়ালির কাছেই যেতে হল। সে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানিয়ে দিল তার জানা নেই, তবে তার কর্তা নিশ্চয়ই জানে। কিন্তু সে তো ততক্ষণে দোকানে। বিপ্লব হতাশ হয়ে চলে আসছে, তখন সে বলল পাশের বাড়ির কাজের লোকটি জানতে পারে, কারণ সে সম্ভবত পার্বতীদির পাড়ারই বাসিন্দা। বিপ্লব এ বাড়িতে খায়, ঘুমোয় আর অফিস যায়। পাড়ার লোকজনকে মোটেই চেনে না। ফলে এই তথ্যে তার কোন সুবিধাই হল না। ব্যাজার মুখটা দেখে মুখরা বাড়িওয়ালিরও বোধহয় দয়া হল। তাই ওকে দাঁড়াতে বলে, নিজেই ফোন করে জেনে নিয়ে বলল “তুকারামগেট পুলিশ স্টেশন হ্যায় না? উধর রয়তা পার্বতী। উধর যাকে লক্ষ্মণ রাও পুছনা। পার্বতী কা পতি হ্যায়।” জায়গাটা খুব দূরে নয়। অচিন্ত্যদার গাড়িতে দু একবার পিকনিক করতে যাওয়ার পথে থানাটা চোখে পড়েছিল। বিপ্লব একটা অটো নিয়ে নিল।

থানার সামনে অটো থেকে নেমে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে বাড়িটা খুঁজে পেতে বেশি দেরী হল না। কিন্তু বাড়ির গ্রিলের দরজায় তালা। কী করবে, কাকে কী জিজ্ঞেস করবে ভাবতে ভাবতে শেষে একটা বারো-চোদ্দ বছরের ছেলেকেই বিপ্লব জিজ্ঞেস করল, ও বাড়ির লোকজন কোথায়। ছেলেটি বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলল, হাসপাতালে গেছে ওদের ছেলেকে নিয়ে। এরপর কী জানতে চাওয়া উচিৎ তা বিপ্লবের জানা নেই। ছেলেটা নিজেই বন্ধুদের সাথে গুলি খেলা স্থগিত রেখে হাঁকাহাঁকি করে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে বের করে আনল পার্বতীদির ঠিক পাশের বাড়িটা থেকে। তিনি জানালেন ছেলেটার শেষ রাত থেকে আবার পায়খানা শুরু হওয়ায় ওরা হাসপাতালে দৌড়েছে। তবে মোড়ের স্টেশনারি দোকানটায় লক্ষ্মণ একটু আগে ফোন করেছিল, ওরা স্বামী স্ত্রী বাড়ি আসছে। বাবু যদি একটু বসে যান, তাহলে দেখা হয়ে যাবে।

মনস্থির করতে একটু সময় লাগল বিপ্লবের। সরু গলির মধ্যে এদের বাসস্থান মোটেই সুখকর জায়গা নয়। থানাটা বড় রাস্তার উপরে। সেখানটা সেকেন্দ্রাবাদের বাকি জায়গাগুলোর মতই। ঝকঝকে তকতকে। সেখান থেকে গলি দিয়ে হেঁটে এই পাড়াটায় আসতে মিনিট দুয়েক লাগে। কিন্তু দুটো জায়গার আকাশ পাতাল তফাত। রাস্তায় যেখানে সেখানে কুকুরের বিষ্ঠা, এধারে ওধারে অনেকদিন পরিষ্কার না হওয়া আবর্জনার স্তূপ, ছোট ছেলেরা নর্দমার ধারে দিব্যি বসে পড়েছে পায়খানা করতে। পার্বতীদির বাড়ির উল্টো দিকে একটা মাঝারি আকারের মাঠ। সেদিক থেকে হালকা হাওয়া আসছে বলে তবু এখানটায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে। ওখানে দাঁড়িয়ে বিপ্লব ভাবার চেষ্টা করছিল গুমোট দিনগুলোয় এই দম বন্ধ করা গলিতে দুর্গন্ধ ভুলে মানুষ থাকে কী করে। অপেক্ষা করে যাওয়ার প্রস্তাবে তাই প্রথমে ভাবল চলেই যাবে। তারপর মনে হল, চলে গেলে পার্বতীদি ভাববে ও কাজে যাওয়ার তাগাদা দিতে এসেছিল। আসলে ওর ছেলের জন্যে উদ্বেগই যে আসার কারণ তা বুঝতে পারবে না। তাই একটু বসে যাওয়াই ভাল। বয়স্ক ভদ্রমহিলা দৌড়ে গিয়ে চাবি নিয়ে এলেন নিজের ঘর থেকে, পার্বতীদির ঘরেরই তালা খুলে বসতে দিলেন।

ঘরগুলোর চেয়ে গলিটা উঁচু। বাবা ছ ফুট লম্বা হলেও বিপ্লব পাঁচ ফুট পাঁচ। তবু মাথাটা একটু নামিয়ে ঢুকতে হল বাড়িটায়। ঢুকেই যে জায়গাটা সেটাই রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর। রাস্তার দিকে মুখ করে থাকা উনুনের সামনে একটা ছোট্ট জানলা। আলো না জ্বালালে এই খটখটে রোদের সকালেও এ ঘরের অর্ধেকটা অন্ধকারেই থাকে। হায়দরাবাদ-সেকেন্দ্রাবাদে বৃষ্টি হয়নি মাস দুয়েক, এখানে গ্রীষ্মও শুকনো, রুক্ষ। তবু মেঝেটা যেন ভেজা। বোধহয় সারাক্ষণ মাছ মাংস সবজি ধোয়া, রান্নাবান্না, বাসন মাজা ইত্যাদি চলে। ওখানটা পেরিয়ে এসে ঘর। কোন জানলা নেই। একটা দরজা আছে ভেতর দিকে, আধ খোলা থাকায় দেখা গেল ওটা বাথরুমের দরজা। দুটো করে ইঁট পেতে উঁচু করা একখানা বড়সড় খাট। পালঙ্কই বলা উচিৎ। এই বাড়িতে, এই ঘরে এ খাট একেবারেই মানানসই নয়। কে জানে কোত্থেকে এসেছে। আলমারি, ছোট একটা টেবিলের উপরে ঢাউস টেলিরামা টিভি, দেয়ালের তাকে ভর্তি ঠাকুর দেবতারা মিলে ঘরটাকে ভীষণ ছোট করে এনেছে। এত কোণ, এত ছায়া এই ঘরে যে একশো পাওয়ারের বালবটার সাধ্য কি অন্ধকার দূর করে?

খাটে বসেই বিপ্লব ভেবেছিল ওরা যত তাড়াতাড়ি ফেরত আসে ততই ভাল। এ ঘরে কয়েক মিনিটেই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠবে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে ওর ভাল লাগতে শুরু করল, মনে হল “ভাগ্যিস এসেছিলাম।” আসলে এই বাড়িতে ওর চেনা কিছু গন্ধ, কিছু দৃশ্য আছে। চেনা, কিন্তু বিস্মৃত। যেমন ঐ যে তাকে এক গাদা ঠাকুরের ফটো।

বিপ্লব যখন বছর পাঁচেকের, তখন ওদের বাড়িতে কাজ করত লক্ষ্মীদি। ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা, কাপড় কাচা কাজ ছিল ওর। কিন্তু সেসব হয়ে গেলেও বেশ খানিকক্ষণ বিপ্লবের সাথে খেলবে বলে রয়ে যেত। মা রান্নাবান্না বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে বিপ্লবকে চান করানো, ভাত খাওয়ানো এসব নিজে থেকেই করে দিত। মা অনেক সময় বলত “লক্ষ্মী, তুই আবার এখানে দেরী করছিস তো? অন্য বাড়িতে মুখ শুনতে হবে গিয়ে।”

লক্ষ্মীদি বলত “ছাড়ো তো, কাকিমা। কেউ মুখ করলে আমি পাত্তা দেই না। ঝটপট কাজ করে দিলে মুখ এমনিই বন্ধ হয়ে যায়।”

মা রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে বাবাকে বলত “মেয়েটার মনটা এত ভাল, কথাবার্তা এত সভ্য ভদ্র, একটু যদি লেখাপড়া শিখত, তাহলে লোকের বাড়ি কাজ করে খেতে হত না।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত “বাপটা অমানুষ যে। আমাদের স্কুলে তো পড়ছিল। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বিয়ে দিয়ে দিল। কত করে বারণ করলাম। এমন ছেলের সাথে বিয়ে দিল, সে কোথায় ভেগে গেল। এখন বাবা মাঝরাত্তিরে মদ খেয়ে এসে ঠ্যাঙায়, মা-মরা মেয়ে চুপচাপ ঠ্যাঙানি খায়, তারপর বমি পরিষ্কার করে। লক্ষ্মীও তেমনি গাড়োল। দেখতে শুনতে তো ভালই, তুইও একটা কারো সাথে পালিয়ে যা না বাপু। এই জীবন থেকে মুক্তি পাবি…”

“ইশ! কিসব কথা বলো। ছেলের সামনে এইসব বলছ?”

“আরে ও তো ঘুমোচ্ছে।”

“তবু। যদি কানে যায়?”

“গেলে যাবে। ছেলেকে এসব ভুলভাল মর‍্যালিটি শিখিয়ো না। একটা নিরপরাধ মেয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে সেইটা অন্যায় না, আর ও পালিয়ে গেলেই অন্যায়?”

বাবা, মা বুঝতেও পারত না বিপ্লব ঘাপটি মেরে সবই শুনছে। সে যা-ই হোক, কথা হচ্ছে সেই লক্ষ্মীদির বাড়ির তাকেও ওরকম গাদা দেব দেবী ছিল। কোন কোন দিন লক্ষ্মীদি মাকে বলত “কাকিমা, ভাইকে আজ একটু আমার বাড়ি নিয়ে যাব?”

“ও মা! তোর অন্য বাড়ি কাজ নেই?”

“আজকে তো নবাকাকুদের বাড়ি গুরুদেব আসবে। আজ আমার ও বাড়ি যাওয়া বারণ। আর দুটো বাড়ি শুধু ঝাঁট দেয়া, মোছা। ও আমার দু মিনিটে হয়ে যাবে। তারপর বাড়ি চলে যাব। নিয়ে যাই না, কাকিমা? সন্ধ্যের মধ্যে ফেরত দিয়ে যাব।”

“আচ্ছা, নিয়ে যা। তোর বাবা বকবে না তো?”

“বাবা সকালে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছে, সেই রাতে আসবে। বাবা থাকলে ওকে আমি কখনো নিয়ে যাই? ছিঃ!”

তারপর লক্ষ্মীদির হাত ধরে বিপ্লব বেরিয়ে পড়ত। মা একটা ছোট ব্যাগে স্নান করে উঠে পরার জামাকাপড় ভরে দিত। সেই ব্যাগটা থাকত লক্ষ্মীদির কাঁধে। অন্য বাড়িতে কাজ করার সময়ে বিপ্লব শান্ত হয়ে বসে থাকত পাশে, লক্ষ্মীদি বাসন মাজতে মাজতে বা কাপড় কাচতে কাচতে গল্প বলত। অনেক সময় বিপ্লবের কাছেও গল্প শুনতে চাইত। সেসব বাড়ির গিন্নীরা বিপ্লবের মায়ের কাছে বলতেন “হ্যাঁ গো, তোমার অমন ফুটফুটে ছেলেকে তুমি সারাদিনের নামে কাজের মেয়ের সাথে ছেড়ে দাও? কী উল্টো পাল্টা শিখে আসবে কোন ঠিক আছে?”

মায়ের বরাবরই মুখরা হওয়ার বদনাম। বলত “আজ অব্দি যখন রূপকথার গল্প আর ছোটখাট গান ছাড়া কিছু শেখেনি তখন চিন্তা নেই। ভদ্রলোকের ছেলেদের সাথে খেলাধুলো করেও তো গালাগালি দিতে শেখে অনেকে। নিজের চোখেই দেখতে পাই।”

তারপর এই যে ভেজা ভেজা গন্ধটা। এটাও ছিল বড়পিসির পুরনো বাড়িতে। এখন বিপ্লব বুঝতে পারে, ছেলেমেয়ে নিয়ে দু কামরার টিনের চাল দেয়া ভাড়া বাড়িতে সে বড় কষ্টের সংসার ছিল পিসির। তবু, কি আশ্চর্য! ও বাড়ি যেতে বড্ড ভাল লাগত ছোটবেলায়। মেঝেটা ছিল অসমান, ফুটিফাটা। বৃষ্টি হলে এক কোণের ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে আসত। ওখানকার মেঝেটায় তাই চট পেতে রাখা থাকত। বর্ষাকাল ছাড়াও, সব সময়েই এরকম একটা গন্ধ থাকত সেই ঘরে।

পাশের ঘরটা ছিল বড়পিসির রান্নাঘর। সেখানেও সেই এক গন্ধ। বিকেলের দিকে গেলে রাতে না খাইয়ে ছাড়ত না পিসি। সেই অনটনেও বড়পিসির রান্নার জাদুতে দু তিন পদ তৈরি হয়ে যেত নিমেষে। তারপর রান্নাঘরের মাটিতে বাবা, মা আর বিপ্লব খেতে বসত। ওকে অবশ্য শুধু মাটিতে বসতে দিত না পিসি। চৌকির নীচের ট্রাঙ্ক থেকে বের করে আনত হলুদের মধ্যে নীল সুতোর কাজ করে ফুটিয়ে তোলা পেখম মেলা ময়ূরওলা একখানা সাত পুরনো আসন। পাততে পাততে বলত “এই আসনখানা তোমাদের কাউরে দিমু না। হেইডায় আমার বাবায় বসত। এহনো আমার বাবাই বসব।” বলে বিপ্লবের কপালে চুমু খেয়ে ওকে সেই আসনে বসিয়ে দিত। ভাত খেতে খেতে যে গন্ধটা পাওয়া যেত, সেই গন্ধটাই আজ পার্বতীদির ঘরে।

ওরা হাসপাতাল থেকে ফিরে এল শিগগির। বিপ্লবকে দেখে পার্বতীদি একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল প্রথমে। বোধহয় ভেবেছিল ওকে ছাঁটাই করতে এসেছে। সেটা নয় বুঝে নিশ্চিন্ত হল, এক গ্লাস জল আর দুটো বিস্কুট না খাইয়ে ছাড়ল না। পার্বতীদির বর বলল ছেলের অবস্থার একটু ঘনঘন উন্নতি, অবনতি হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে চট করে বাড়ি না আনলেই ভাল ছিল। বিপ্লব বারবার বলে এল, পার্বতীদি যেন কাজে যাওয়ার জন্যে তাড়াহুড়ো না করে। ওর বর হেসে বলল “কাম পে তো যানা পড়তা, সাব। সবলোগ তো নই মানেগা আপ জইসা। হাম কো ভি যানা পড়তা, পারওয়াতি কো ভি যানা পড়তা। কিতনা দিন নই যাকে হোতা?”

ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমেই বিপ্লবের মনে হল, লক্ষ্মীদি কেমন আছে কে জানে! ওর মাতাল বাবা মারা গেছে শুনেছিল মনে আছে। এখন একা একা কী করে দিন কাটে লক্ষ্মীদির? ওদের পাড়ার কোন বাড়িতে কাজ করতে আসে না বহু বছর হল। তাহলে কি অন্য কোন কাজ করে? কত বয়স হবে এখন? বাবা নিশ্চয়ই জানবে। বহুকাল পরে বাবাকে ফোন করতে খুব ইচ্ছে হল।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৪

পূর্বকথা: ছাত্র সুবিমল এসে খবর দেয় নন্দীগ্রামে গুলি চলেছে। রবীন তাকে নিয়ে এক কমরেডের বাড়িতে ঢোকে খবরটা চাক্ষুষ করতে। টিভির পর্দায় যা দেখছে তা বিশ্বাস হতে চায় না, ছাত্রকে কী ব্যাখ্যা দেবে বুঝে উঠতে পারে না। বাড়ি ফেরার পথে রবীন অসুস্থ বোধ করে। মনে পড়ে, ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বক্তৃতায় জ্যোতি বসু বলেছিলেন “পুলিসকে আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করার কাজে ব্যবহৃত হতে দেব না।”

নন্দীগ্রামে গুলি চলার কয়েক মাস পরে একদিন সন্ধে নাগাদ রবীন বসে বসে কোন একটা অর্থহীন ছবি দেখছিল টিভিতে। এমন সময় একটা ফোন এল। খুব একটা কেউ ফোন করে না তখন। যত দিনে বাড়িতে ফোন নেওয়ার সামর্থ্য হয়েছে, তত দিনে ফোন করার লোক আর নেই তেমন। রবীন ঘোষাল তখন এক ক্ষমতাহীন সাধারণ সি পি এম কর্মীর নাম। কে আর ফোন করবে? ফোন নেওয়ার আগ্রহও তাই খুব একটা ছিল না। জোনাকি আর বিপ্লবের আগ্রহেই নিতে হয়েছিল। তবে একেক দিন, যেমন সেই যেদিন জগা দলবল নিয়ে স্কুলপাড়ায় দৌরাত্ম্য করল, সেইসব দিনে রবীনের মনে হয়েছে ফোনটা ভাগ্যিস নেওয়া হয়েছিল! নইলে এম এল এ সত্যেনকে তৎক্ষণাৎ ফোন করে পুলিশকে সক্রিয় করা যেত কী করে? ফোনটা করা হয়েছিল বলে অন্তত থান রোডে রাত্রিবেলায় টহল দেওয়া শুরু করেছিল পুলিশ।

মানে ফোনটা রবীনের কারো সাথে কথা বলতে হলে লাগত, কেউ রবীনকে ফোন করেছে এমনটা কমই হত। লাগাতার ফোন আসত জোনাকির। ওর মাসি, পিসি, তুতো বোনেরা, যারা সারাজীবন ওর সাথে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারেনি কারণ এই অজ পাড়াগাঁয়ে আসার তাদের সময় ছিল না, আর গেঁয়ো জামাইবাবুর ফোন কেনার পয়সা ছিল না, তারাই বারবার ফোন করে ফোন আসার পর থেকে।

আর করত বিপ্লবের বন্ধুবান্ধবরা, যখন ও কলেজে পড়ত। বহুবার ফোনটা তুলে রবীন শুনেছে কোন একটা মিষ্টি গলার বাচ্চা মেয়ে বলছে “বিপ্লবকে পাওয়া যাবে?” ছেলে যখন এসে ফোনটা ধরত, রবীন বই পড়া বা টিভি দেখার ভান করে আড়চোখে ওকে দেখত। ফরসা মুখটা একটু লালচে হয়েছে কি কথা বলতে গিয়ে? গলাটা স্বাভাবিকের চেয়েও নীচে নামিয়ে কথা বলছে কি? এসব প্রণয়চিহ্ন কেবলই খুঁজে বেড়াত বিপ্লবের ফোনালাপে। নিজের কখনো প্রেম করা হয়নি। বড় সাধ ছিল ছেলেটাকে একটা বেশ আধুনিক, সুন্দরী মেয়ের সাথে প্রেম করতে দেখবে। বিপ্লব কলেজে ঢোকার পরেও বেশ কিছুদিন রবীন নিশ্চিত ছিল ও কমিউনিস্ট পার্টি করবে, বড় নেতা হবে একদিন। তা জীবনসঙ্গিনীটি তেমন না হলে চলবে কী করে? যদি সেও পার্টি করে তাহলে তো কথাই নেই, যদি নাও করে, যেন বিপ্লবের রাজনীতিতে তার শ্রদ্ধা থাকে — এইসব ভাবত রবীন। কলেজের সেই ছেলেটা খুন হওয়ার আগে অব্দি বিপ্লবের সাথে এমন সখ্য ছিল যে ও-ও জানত বাবা মোটেই মন দিয়ে পড়ছে না। ফোনটা রেখেই রবীনের দিকে ফিরে মুচকি হেসে বলত “বাবা, এত অন্যমনস্ক হয়ে পড়লে এরকুল পোয়ারো কিচ্ছু বোঝা যায় না।” রবীনও হেসে ফেলে জবাব দিত “সবকটা বই আমার ছ সাতবার করে পড়া।” রবীনের দুটো ইচ্ছের একটাও পূরণ হল না। ছেলে রাজনীতি থেকে বহু যোজন দূরে চলে গেল, প্রেমই বা করল কই?

এইসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা রিং হয়ে হয়ে কেটেই গেল। জোনাকি পাশের ঘরে ভর সন্ধেবেলা অকারণেই গড়াচ্ছিল। ঝাঁঝিয়ে উঠল “কী গো! ফোনটা ধরলে না?”

“তুমি ধরলেই পারতে।”

“বাঃ! আমি সারাদিন খাটাখাটনির পর একটু শুয়ে আছি তোমার সহ্য হচ্ছে না, না? ও ঘরেই বসে আছ, আমাকে বলছ এখান থেকে গিয়ে ফোন ধরতে?”

রবীন একটা কড়া জবাব দেওয়ার আগেই ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল। কথা না বাড়িয়ে রবীনই তুলল।

“হ্যালো।”

“হ্যালো, এটা জোনাকির বাড়ি?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ।” রবীন রিসিভারটা নামিয়ে রেখে ধমকাল “বললাম তোমার ফোন।”

জোনাকি ভুরু কুঁচকে, উঠে আসার প্রবল অনিচ্ছায় জিজ্ঞেস করল “কে?”

“জানি না।” বলেই রবীন সটান গিয়ে টিভির সামনে বসে পড়ল।

ছবিটার মাথামুণ্ডু ছিল না একেবারেই। তাই উদ্দেশ্যহীনভাবে একের পর এক চ্যানেল ঘুরিয়ে যাচ্ছিল। জোনাকিকে কে ফোন করল, কী কথা হচ্ছে তাতে একেবারেই আগ্রহ ছিল না। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে কাঁদার শব্দ কানে আসায় ফিরে তাকাতেই হল।

জোনাকি ফোনের পাশের টুলটায় বসে অস্ফূটে কথা বলছে আর ডুকরে কাঁদছে। চিন্তিত হয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে মুখ তুলে তাকাল, এবং বহু বছর পর, যা আর কোনদিন ঘটবেই না ভেবেছিল রবীন, সেটাই ঘটল। জোনাকি ওর হাতটা প্রাণপণে জড়িয়ে ধরল। ওপারে কে হতে পারে ভাবতে চেষ্টা করল রবীন। একবার ভাবল ইশারায় জিজ্ঞেস করবে, তারপর মনে হল থাক, আগে কথা শেষ হোক। মিনিট পাঁচেক পরে ফোনটা নামিয়ে রেখে, ফোন স্ট্যান্ডটায় মাথা রেখে জোনাকি সজোরে কেঁদে উঠল — জল বাড়তে বাড়তে শেষ পর্যন্ত এক ধাক্কায় লকগেট ভেঙে গেলে যেমন হয়। রবীন মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল “কার ফোন?”

উত্তর দেওয়ার অবস্থায় আসতে জোনাকির আরো মিনিট খানেক লাগল।

“ঝোটনদার মা।”

নামটা রবীনের চেনা। বিয়ের কয়েক মাস পরে যে সময়টায় সম্বন্ধের বিয়ের অপরিচয় কেটে গিয়ে নবদম্পতির সময়টা চাঁদ, ফুল, পাখিতেই ঘুরপাক খায় কিছুদিন — সেই সময়টায় একদিন ওরা দুজনে দুজনকে জিজ্ঞেস করেছিল বিয়ের আগে কোন সম্পর্ক ছিল কিনা। কথাটা রবীনই তুলেছিল, জোনাকি বলেছিল “আহা! কায়দা করে আমারটা জেনে নিচ্ছ। এরপর সারাক্ষণ সন্দেহ করবে। নিজেরগুলো তো আর বলবে না…”

“ধুর। আমি বরাবরই ভ্যাবলাকান্ত। মেয়েদের সাথে কথা বলতে গেলেই তোতলা হয়ে যেতাম, আমার আবার প্রেম হবে কোত্থেকে?”

“মিথ্যে কথা বোলো না। চুটিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতে, তারপরে অল্প বয়সে নেতা হয়ে গেছ, আর মেয়েরা তোমায় পাত্তা দিত না? অন্য লোককে গল্প শুনিও।”

রবীন হেসে ফেলে বলেছিল “না না, সত্যি। প্রেম হয়নি। একজনকে আমার পছন্দ ছিল ঠিকই। কিন্তু সে তো এখান থেকে চলেই গেল।”

“কে গো, কে গো?”

“আমার এক বন্ধুর কথা বলেছি না তোমায়? যে নকশাল হয়ে গেছিল?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, মুন্না।”

“ঐ মুন্নারই বোন, মুনিয়া।”

“মুন্না তো তোমার ছোটবেলার বন্ধু।”

“হ্যাঁ। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় বাবা রিটায়ার করল, আমরা সবুজগ্রামে এলাম। তখন থেকে বন্ধু।”

“মুনিয়া তখন কত বড়?”

“কত হবে? ফোরে পড়ত বোধহয়।”

“বাব্বা! তাহলে তো বাল্য প্রেম। নিশ্চয়ই অনেক দূর এগিয়েছিলে? সত্যি কথা বলো।”

“না রে বাবা। আমারই ওকে পছন্দ ছিল। ওর কিছু ছিল বলে মনে হয় না। তারপর তো… মুন্না খুন হয়ে গেল, আর ওরাও এখানকার বাড়ি বেচে দিয়ে চলে গেল। একটা দুটো চিঠি লিখেছিল… আমার তো তখন থেকেই লেখার অসুবিধা শুরু হচ্ছে একটু একটু করে… আর রাজনীতিতেও নেমে পড়েছি… ভাল করে উত্তর দেয়া হয়নি… আর চিঠি আসেনি। কয়েক বছর পরে শুনলাম বিয়ে করে বিদেশ চলে গেছে।”

“দেখেছ, তুমি কিরকম? তাও সব সত্যি কথা বলছ না।”

“কেন? কী বললাম না আবার?”

“মেয়ে এখান থেকে চলে গিয়েও তোমায় চিঠি লিখত, আর তুমি বলছ ওর নাকি পছন্দ ছিল না।”

“আরে চিঠি লিখত ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছি তাই। আমি, নবা, মুন্না একেবারে গলাগলি ছিলাম তো। একেক সময় গোটা দিন ওদের বাড়ি কাটিয়েছি যে। মুনিয়া একবারই পুজোর সময় আমায় বলেছিল ‘রবীনদা, আমায় সিনেমায় নিয়ে যাবে?’ তখন ক্লাস টেনে পড়ি। অত সাহস ছিল আমার?”

“এ মা! তুমি নিয়ে গেলে না!”

“পাগল! বললাম আমার কাছে টাকা নেই।”

“ইশ! কী ক্যাবলা গো! তোমায় ঠাটিয়ে একটা থাপ্পড় মারেনি?”

“তুমি হলে মারতে। মুনিয়া শুধু রাগ করে সাতদিন কথা বলেনি।”

“ও ও ও! তার মানে তো খুবই প্রেম ছিল তার। ভাব করছ যেন বোঝোনি।”

“অ্যাই, তুমি এড়িয়ে যাচ্ছ, জোনাকি। আমারটা শোনা হল। এবার নিজেরটা বলো।”

জোনাকি বলতে শুরু করেছিল রঙ্গ রসিকতা করেই। কিন্তু শেষ করার পর হাউ হাউ করে কেঁদেছিল। রবীন সেদিনও এভাবেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল, ঠিক করেছিল জীবনে কখনো এই সম্পর্কটা নিয়ে ভুলেও কোন খোঁটা দেবে না, আর কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। আশি সালের সেই প্রতিজ্ঞা এই ২০০৭ পর্যন্ত রবীন অতি কষ্টে বজায় রেখেছে। সাতাশ বছরের বৈবাহিক জীবনে বহু কলহে যখন দুজনের বাঁধন ক্রমশ শিথিল হয়েছে, রবীনের রাজনীতি কিভাবে জোনাকির জীবন নষ্ট করে দিয়েছে সেই গঞ্জনা যখন বারংবার শুনতে হয়েছে, তখন বারবার রবীনের ঠোঁটে এসে গেছে “ঝোটনদাকে বিয়ে করলে কি অন্যরকম হত?” কিন্তু রবীন কথাটা শেষ অব্দি উচ্চারণ করেনি। অনেক সময় নিজেকে সামলাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে তখনকার মত।

সেই ঝোটনদার মা।

“এনার সাথে তোমার বহুকাল যোগাযোগ ছিল না, না?” রবীন জিজ্ঞেস করে।

“ঝোটনদা খুন হওয়ার পরেই তো মেসোমশাই হৃদয়পুর না দত্তপুকুর, কোথায় যেন উঠে গেলেন। তারপর থেকে আর…। ছোটমামার সাথে বনগাঁ লোকালে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে গিয়ে দেখা হত বলত। দিদিমা মারা যাওয়ার পরে তো আমি দাদার কাছে চলে গেলাম। সেই থেকে আর কিছু শুনতেও পাইনি।”

“তোমার নম্বর পেলেন কী করে?”

“অদ্ভুত ব্যাপার। মাসিমা এখন একা। মেসোমশাই মারা গেছেন। এখন বোনের কাছে থাকেন। অনিন্দ্যদার পাশের ফ্ল্যাট।”

“মানে কবি অনিন্দ্যদা?”

“হ্যাঁ। অনিন্দ্যদার বউয়ের সাথে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে পড়েছে যে ওরা আমার দাদার বন্ধু। তারপর বোনের নাতনিকে দিয়ে বউদিকে ফোন করিয়ে আমাদের নম্বর যোগাড় করেছেন।”

“অনেক বয়স এখন, না?”

“হ্যাঁ। নব্বই টব্বই হবে। কথা বলতে একটু কষ্টই হচ্ছিল।”

“তোমায় খুবই ভালবাসতেন। নইলে এতদিন বাদে ফোন… কী বললেন?”

“বললেন… তোর কথা খুব মনে পড়ছিল কদিন ধরে। ছত্রিশ বছর হল ঝোটন নেই। ওর বাবা মানত না, কিন্তু আমি তো বুঝি, ঝোটন মারাই গেছে। কত ছেলেকে মেরেছে তখন পুলিশ। আমি তাই ওর মৃত্যুদিনে ছবিতে মালা দিই, আর তোর কথা ভাবি। ঝোটনকে তো আর দেখতে পাব না। তোকে যদি মরার আগে আরেকবার দেখতে পাই…”

“কোথায় থাকেন যেন?”

“সল্টলেক।”

“ঘুরে এসো একদিন। দেরী কোরো না। আর কদিনই বা বাঁচবেন?”

বলে হাঁটতে বেরিয়ে যায় রবীন।

পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া ছেলের মা। হাজার চুরাশির মা। এমন মায়ের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। রাজনৈতিক বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির তিরিশ বছর পরেও। বাম শাসনের তিরিশ বছর হয়ে যাওয়ার পরেও। হাঁটতে হাঁটতে হরিমতীর ঝিলের ধারে গিয়ে বসে রবীন।

ভাদ্র মাসের ভ্যাপসা গরম। তবু ঝিলের ধার বলে হাওয়ায় একটু আরাম। বিড়িটা ধরাতে বেশ বেগ পেতে হল। একটা টান মেরে রবীন মনে করার চেষ্টা করল ছেলেটার নাম। ঐ… যে বিপ্লবের বন্ধু ছিল? হ্যাঁ, রঞ্জন। ঐ ছেলেটার মৃত্যুর পর থেকেই নিজের ছেলেটাও পর হয়ে গেল। এমন দেয়াল তুলে দিল নিজের চারপাশে, সে দেয়াল রবীন আর ভেদ করতে পারেনি। তাই আর বলা হয়ে ওঠেনি, কাগজে ছেলের বাবার নাম দেখেই ও চিনতে পেরেছিল এই ছেলে হল জীবেন স্যারের নাতি।

ভূগোলের স্যার জীবেন মাইতি — যিনি রবীনকে মার্কসবাদের পথে নিয়ে এসেছিলেন। স্যার বেঁচে থাকতেই তরুণদা, মানে স্যারের ছেলে, সবুজগ্রাম ছেড়েছিল। ওঁর স্ত্রী বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে, বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের দেখার কেউ ছিল না। তাই তরুণদা শ্বশুরবাড়িতেই থাকতে শুরু করেছিল। অবশ্য ওখানে গিয়েও পার্টি করা ছাড়েনি। এমার্জেন্সির সময় জেলও খেটেছে। যদ্দিন স্যারের স্ত্রী বেঁচেছিলেন, তদ্দিন সবুজগ্রামে যাতায়াত ছিল। এলেই রবীনদের পার্টি অফিসে আড্ডা মারতে আসত। তারপর আশি সালে মাসিমা মারা গেলেন, তরুণদারও সবুজগ্রামের পাট উঠে গেল। কাগজে খবরটা দেখে রবীন একবার ভেবেছিল স্যারের ভাইপোর থেকে নম্বর নিয়ে তরুণদাকে ফোন করবে। তারপর ভাবল, কী বলবে ফোন করে? সান্ত্বনা দেবে? যে পার্টির জন্যে উদয়াস্ত খেটেছে ওর বাবা, যে পার্টি করার অপরাধে তরুণদা নিজে জেল খেটেছে, সেই পার্টি ওর ছেলের জীবন শেষ করে দিল। এর কি কোন সান্ত্বনা হয়?

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048