নাম তার ছিল: ৫

পূর্বকথা: প্রবল বৃষ্টিতে রবীনের মনে পড়ে মায়ের চলে যাওয়ার দিনটা। আর মনে পড়ে ১৯৭৮ এর বন্যা। সেই বন্যায় একজন নতুন বন্ধু হয়েছিল। নাস্তিক রবীনের সন্ন্যাসী বন্ধু।

উদ্দালক মারা যাওয়ার পর মাস খানেক প্রবল আলস্য পেয়ে বসেছিল রবীনকে। বেশ কয়েকটা জরুরী মিটিঙে তো গেলই না। স্রেফ ঘুমিয়ে কাটাল বাড়িতে। সেই প্রথমবার মনে হয়েছিল কথাটা। খুবই অদ্ভুত একটা কথা। মনে হতেই চমকে উঠেছিল সে। এমন ভাবনা তার মনে স্থান পেতে পারে এমনটা কখনো ভাবতেও পারেনি। মনে হয়েছিল পার্টিটা ছেড়ে দিলে হয় না?

একি! কোথা থেকে মাথায় এল এসব! এই পলায়নী মনোবৃত্তি কী করে বাসা বাঁধল গোপনে! হীরুদা বেঁচে থাকলে কি প্রচণ্ড বকতেন তা বুঝতে পেরে কয়েকদিন নিজেরই কাছে অপরাধী হয়ে মাথা নীচু করে দিন কাটিয়েছিল।

তার মধ্যে একদিন গিন্নীকে নিয়ে যেতে হল শ্বশুরবাড়ির দিকের এক আত্মীয়ের বিয়েতে, কলকাতায়। ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। জোনাকি মোটা হয়েই চলেছে অথচ কিছুতেই হাঁটতে চায় না। একটু রাত হয়ে গেলে তো একেবারেই না। অগত্যা একটা রিকশা নিতে হল। সবুজগ্রাম স্টেশনের স্ট্যান্ডের বেশিরভাগ রিকশাওয়ালাই ততক্ষণে রিকশা রেখে টিকিট কাউন্টারের পেছনের চুল্লুর ঠেকে চলে গেছে। নিজের রিকশায় বসেছিল শুধু শঙ্কর। রেডিওর কিশোর কুমারের সাথে গলা মেলাচ্ছিল। এই নেশাটাই ওকে চুল্লুর থেকে দূরে রেখেছে।

রিকশা চলতে শুরু করলে রবীন জিজ্ঞেস করল “বাড়িতে সব কেমন গো?”

“সব ভাল, দাদা।”

“তোমার যেন কয়টা ছেলেপুলে? একখানাই তো?”

“হ্যাঁ, দাদা। একটাই মেয়ে আমার।”

“ও হ্যাঁ। কন্যা বিদ্যাপীঠে পড়ত না?”

“হ্যাঁ। এই তো উচ্চমাধ্যমিক পাশ করল।”

“বাঃ। কোন ডিভিশন গো?”

“ফাস্ট ডিভিশন। লেখাপড়ায় খুব মন ওর। কিন্তু আমাদের ঘরে তো। মাষ্টার রাখতে পারিনি ভাল। তাও যা পেয়েছে আমি খুশি, আমার গিন্নীও খুশি। মেয়ে খুশি না।”

“কী বলে মেয়ে?”

“বললে ‘বাবা, আর বারোটা নম্বর পেলে স্টার হয়ে যেত।’”

“আরে! তাহলে তো চমৎকার রেজাল্ট করেছে। এবার কী করবে বলছে?”

“ইচ্ছে তো কলেজে পড়ার। কিন্তু যা খরচা। আমি হাত জোড় করে বললাম এত তো পারব না রে। তা মেয়ে বাপের দুঃখ বোঝে, দাদা। খুব বোঝে। বলল ‘তা’লে থাক’।”

“কত খরচা? সাইন্স না আর্টস?”

“সে তো আমি বুঝি না, দাদা। আমি তো অক্ষর চিনি শুদু। তবে কিসব ব্যাং ট্যাং কাটত শুনেচি ইশকুলে।”

“হুম। সাইন্সই। খরচের ব্যাপার বটে।”

বাকি পথটা থম মেরে থাকে রবীন। বাড়িতে নেমে ভাড়া দেওয়ার সময় হঠাৎ আজাদপুরের কমরেড মইদুলের কথা মনে পড়ে যায়। ও আজাদপুর উইমেন্স কলেজের হেড ক্লার্ক। স্থানীয় ছেলে, জনপ্রিয় পার্টিকর্মী। ওর সাথে একবার কথা বলতে হবে। পয়সা নেই বলে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে?

পরদিন সকালেই মইদুলের সাথে ফোনে কথা হয়। রবীন পরিষ্কার বলে দিল, ভর্তি করতেই হবে যে করে হোক আর কলেজের ল্যাব চার্জ সুদ্ধু মাইনেটা মাফ করে দিতে হবে। মইদুল একটু গাঁইগুই করছিল, কিন্তু রবীন ওকে চেনে ও যখন এ জি মেম্বার তখন থেকে। ওর পার্টি মেম্বারশিপই হত না আরেকটু হলে। ছেলেটার সম্ভাবনা বুঝে রবীনই জোর করে করিয়ে দিয়েছিল। তাই শেষ অব্দি রবীনকে না বলতে পারল না।

অনেকদিন পরে সকালের চা খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে রবীন পার্টির প্যাডটা বের করে জোনাকিকে ডাকল “একটা চিঠি লিখে দিয়ে যাও তো।”

লেখা হল।

প্রিয় সাথী,

পত্রবাহক শঙ্কর সাহা আমাদের পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক। ওর মেয়ে এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনায় আগামী দিনে বিপুল খরচের সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। আপনার কাছে পাঠালাম। মার্কসবাদী হিসাবে যথাসাধ্য করবেন আশা রাখি।

ধন্যবাদান্তে

রবীন ঘোষাল

সদস্য

শ্রীপুর জোনাল কমিটি

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)

চিঠিটা নিয়ে তখনই স্টেশনে চলে গেল রবীন। স্ট্যান্ডে না পাওয়া গেলে শঙ্করের বাড়ি যেতে হবে।

স্ট্যান্ডেই পাওয়া গেল অবশ্য। হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে রবীন বলল “এ বেলাটা একটু কাজের ক্ষতি করে আজাদপুর চলে যাও। বাসে গিয়ে কলেজ স্টপেজে নামবে। দেখবে সোজা একটা গলি ঢুকে গেছে বাস রাস্তা থেকে। কলেজ অব্দি যেতে হবে না। তার আগেই একটা বড় পুকুর পড়বে বাঁ হাতে। এই পারে দাঁড়িয়ে নাক বরাবর ঐ পারে যে দোতলা বাড়িটা দেখবে, ওটাই মইদুলের বাড়ি। মইদুল ইসলাম। গিয়ে আমার নাম করে এই চিঠিটা দেখাবে। কলেজের মাইনে ফ্রি করে দেবে। মেয়েকে নিয়ে, মার্কশিট ফিট নিয়ে যাও। আজই ভর্তি করে এসো। ওদের ভর্তি এমনিতে শেষ হয়ে গেছে। আর মেয়েকে বলবে টিউশন করতে। তাতে যাতায়াত, বইখাতার খরচ অন্তত উঠে যাবে। আমি নাহয় পাঠিয়ে দেব কিছু ছেলেমেয়েকে।”

শঙ্কর বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়ে। সাইকেলে উঠে পড়েই রবীনের সবচেয়ে জরুরী কথাটা মনে পড়ে। “এই কদিনে আবার মেয়ের বিয়ে ঠিক করে বসোনি তো?”

শংকর একগাল হেসে বলে “এই দেখাশোনা শুরু করছিলাম, দাদা। লেখাপড়া না হলে তো দিতেই হত।”

“খবরদার। আর এগিয়ো না। এর পরে যদি শুনি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ, আমি গিয়ে ভাংচি দেব কিন্তু।”

শঙ্কর হাসে, অন্য রিকশাওয়ালারাও হাসতে থাকে। রবীনও হাসতে হাসতে চলতে শুরু করে।

বাড়ি ফিরে আয়েশ করে বাইরের ঘরের খাটটার উপর বসে, গণশক্তিটা হাতে নেয়। চশমাটা খুঁজতে গিয়ে খেয়াল হয়, চিঠি লেখার পরে প্যাডটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখা হয়নি। পাতার এক কোণে কাস্তে হাতুড়িটা দেখে হেসে ফেলে রবীন। পার্টি ছাড়বে? পাগল নাকি? আর কিছু না হোক, ঐ চিহ্নওয়ালা কাগজে একটা চিঠি লিখলে এখনো তো একটা গরীব মেয়ের লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়। সেই পার্টি ছেড়ে দেবে? কক্ষনো না।

রবীন কখনো কাউকে বলেনি — জোনাকিকে তো নয়ই — যে উদ্দালকের মধ্যে ও কী দেখেছিল। ঠিক তা-ই দেখেছিল যা বিপ্লবের মধ্যে ছিল।

রবীন আর জোনাকির একমাত্র ছেলে বিপ্লব। ততদিনে হায়দরাবাদে মোটা মাইনের চাকরি করছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু ছেলে সফটওয়্যারে চাকরি নিয়ে যা করে আর কি। জোনাকি চাইছে মেয়ে দেখা শুরু করতে, কিন্তু ছেলে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। বলা হয়েছিল নিজের কোন পছন্দ থাকলে জানাতে। সেরকম কিছুও বলছে না। সে নাকি আদৌ বিয়ে করতে চায় না। বিয়ে না করলে নাকি অনেক ঝাড়া হাত পা থাকা যায়, পেশায় অনেকদূর ওঠা যায়।

কথাগুলো ওর মুখ থেকে শুনতে বেশ অদ্ভুত লেগেছিল রবীনের। কবে যে ছেলেটা এত বদলে গেল! পেশায় উন্নতি তো বড় কথা ছিল না ওর কাছে! অত একমুখী ছাত্রজীবনে হলে তো অনেক ভাল রেজাল্ট করতে পারত। বরাবরই যে অন্যরকম ছিল ছেলেটা! রবীনের তা নিয়ে বেশ গর্ব ছিল। সেই জন্যে পরীক্ষায় খুব খারাপ ফল করলেও দুশ্চিন্তা হয়নি। হয়নি যে সেটা অবশ্য প্রকাশ করত না। কারণ ভয় ছিল, বুঝতে দিলে বিপ্লব একেবারেই লেখাপড়া তুলে দেবে। তাছাড়া জোনাকি। তাকে তো বোঝানো সম্ভব ছিল না বিপ্লব কত বড় হবে বলে রবীন আশা করে আছে। তাই অন্তত স্ত্রীকে দেখানোর জন্য হলেও বকাবকি করতেই হত। আত্মীয়স্বজনই বা কী বলত বাপ ছেলেকে কিছুই বলে না জানলে? অবশ্য একেকবার এতটাই খারাপ রেজাল্ট করত যে একটু চিন্তা সত্যিই হত। অন্তত পাশ করতে হবে তো পরীক্ষাগুলো। কয়েকটা ডিগ্রি না থাকলে যে কেউ কথার দামই দেবে না; আজীবন মফস্বলের নেতা হয়েই থাকতে হবে বিপ্লবকে। বাপের মত। উজ্জ্বল মুখ চোখ, ছোট থেকেই রাজনীতিতে প্রবল আগ্রহ, স্কুল ছাড়ার আগেই লেনিন পড়তে শুরু করেছে যে, যার মাথার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে মনটা, যার সাহস অসম্ভব বেশি, যে কথা বললে মাস্টারমশাইরাও হাঁ করে শোনেন, সে যে খুব বড় কিছু করবে এটাই মনে হত রবীনের। ঠিক কী করবে? ভাবতেও বুক কাঁপত। তাই মনে মনেও সে কথা উচ্চারণ করত না। বিশ্বাস না থাকলেও ও কথা মনে এলেই রবীন বিড়বিড় করে বলত “বালাই ষাট।” কিন্তু ছেলেটা বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত আর পাঁচজনের মত ওরও পার্টি সম্পর্কে বিতৃষ্ণা এসে গেল। লেখাপড়ায় খুব মন হল বি সি এ পড়তে পড়তে। দস্তুরমত কেরিয়ার সচেতন হয়ে উঠল।

উদ্দালক সবুজগ্রামেরই ছেলে। তবে ছাত্রজীবনের অনেকটা কাটিয়েছে হোস্টেলে। পার্টির সাথে যোগাযোগটাও সেখানেই। এই অঞ্চলের পার্টির সঙ্গে ওর সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় থেকে। ওর কাকা দীর্ঘদিনের পার্টিকর্মী। রবীনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা এই অঞ্চলের পার্টিকে গড়ে তুলেছিল, উদ্দালকের কাকা তাদের একজন। ভাইপোর কার্যকলাপে রবীনের মনে হয়েছিল ও যেন সেই ছেলেটা, যে ছেলে হয়ে উঠল না বিপ্লব। ওর রাজনীতি করা শুরু কলকাতা থেকে। ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটিতে ছিল; পার্টির বড় বড় নেতাদের নজর ওর উপরে সব সময়। অতএব ও একজন বড় নেতা হবেই — এমনটাই ভাবত রবীন। উদ্দালকের চলে যাওয়া তাই ওর কাছে বড় আঘাত। সবুজগ্রাম লোকাল কমিটির আর কোন কমরেড উপলব্ধি না করলেও রবীন বুঝেছিল মৃত্যুটায় কতটা ক্ষতি হল। শঙ্কর সাহার ব্যাপারটা না ঘটলে ধাক্কাটা সামলে উঠতে রবীনের আরো অনেক সময় লাগত।

তার কয়েকদিন পরে উদ্দালকদের পাড়ার কমরেড শিবু মণ্ডল এল রবীনের বাড়ি। ও লক্ষ্মীকান্ত মিলের শ্রমিক ছিল। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে গত পনেরো বছর বাড়ি বাড়ি কাগজ বিলি করে সংসার চালাচ্ছে। ওর বউও অবশ্য বসে থাকে না। শাড়িতে ফলস লাগানো, ব্লাউজ বানিয়ে দেয়া — এসব করে। ওদের ছেলেপুলে না থাকায় কষ্ট কম।

শিবু পার্টি অন্তপ্রাণ। বউ কম কথা শোনায় না। “পাটি পাটি করে হেদিয়ে মরো। পাটি তোমার ভাত যোগাতে পারে? কারখানাও তো খুলতে পারল না।”

শিবু ঝাঁঝিয়ে বলে “যা বোজো না, তাই নিয়ে কতা বোলো না। কারখানা কি পার্টির যে পার্টি খুলে দেবে?”

“তা একটা চাকরি তো দিতে পারে। এত লোককে চাকরি দিচ্ছে, তোমাকে দিতে পারে না?”

“ছি ছি! কী কতা বল? পার্টি করা কি চাকরি পাওয়ার জন্যে? ওসব ধান্দাবাজরা করে।”

শিবুর বউ এরপর বোঝায় কেন ধান্দাবাজ হওয়াই ভাল। শিবু সেসব এক কান দিয়ে ঢোকায়, আরেক কান দিয়ে বার করে। যেদিন মন মেজাজ বেশি খারাপ থাকে সেদিন চলে আসে রবীনের কাছে। খানিকক্ষণ কথাবার্তা বললে একটু বল পায়। পার্টি করা ব্যর্থ মনে হয় না আর। সেজন্যেই আসে।

সেদিন যখন এসেছে, তখন রবীন সবে প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে বসেছে আরেক কাপ চায়ের আবদার করে। শিবুকে ঢুকতে দেখে চেঁচিয়ে জোনাকিকে বলে “শিবু এসেছে।”

“না বৌদি, আমি চা খেয়েই এলুম বাড়ি থেকে।”

“আরে খেয়ে এলি তো কী হল? আরেক কাপ খা।”

“না, রবীনদা। রুটি, চা খেয়ে পেট ভর্তি। এখন আবার চা…”

“আচ্ছা, তাইলে একখান বিড়ি খা।”

শিবু টেবিলের উপর থেকে পদ্মা বিড়ির প্যাকেট আর লাইটারটা তোলে। একটা বিড়ি ধরিয়ে রবীনের ঠোঁটের ফাঁকে লাগিয়ে দেয়, তারপর নিজেরটা ধরিয়ে চেয়ারে বসে।

“মনটা কদিন বড় খারাপ ছিল, বুঝলি?”

“ছেলের জন্যে?”

“না না। ছেলে তো রোজই ফোন করছে। কোনদিন না করলে ওর মা করে। দূরে থাকে। এর চেয়ে বেশি আর কী হবে? সেজন্যে না।”

“তবে?”

“এই তোদের পাড়ায় যেটা হল। জোয়ান ছেলেটা রে। কিভাবে কাঁদছিল ওর মা! আমি তো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। শ্মশানেও যেতে পারলাম না।”

“আমি গিসলাম। গাবলুর বাবা তো পাথর হয়ে গেচে। সেদিন থেকেই।”

“তা তো হবেই। একমাত্র ছেলে।” রবীন চোখের জল সামলায়। “একবার বাপ-মায়ের কথা ভাবল না রে ছেলেটা? কী এমন হয়েছিল, বল দেখি?”

“ঠিক যে কী হয়েচিল তা তো কেউ বলতে পারচে না। কিন্তু আমি শুনেচি একটা কতা।”

“কী রে? প্রেম ট্রেম করত?”

“ছাইটা কোতায় ফেলি?”

“ঐ যে। তোর পেছনের তাকে। নিয়ে আয়।”

শিবু অ্যাশট্রেটা নিয়ে এসে ছাই ফেলে গলা খাঁকারি দেয়।

“বলাটা উচিৎ না হয়ত।”

“কেন?”

“না, লোকের মুখে শোনা তো। শোনা কতায় কারোর নামে বদনাম দেয়া তো ঠিক না।”

“আরে বাবা, তুই তো দুনিয়ার লোককে বলতে যাচ্ছিস না।”

“তা তো বটেই। আপনি বলেই সাহস করচি বলতে। আর কাউকে বলতে যাব না। আমার ঘাড়ে কয়টা মাতা?”

“কেন, তুই কার নামে কী বলবি?”

“আমায় কতাটা বলেচে কানু। আমি জানি না কিচু।”

“আরে এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? কী কথা? কানু মানে তোদের গলির মুখে মুদির দোকানটা যার?”

“হ্যাঁ। ওর দোকানে বসে তো গাবলু আড্ডা দিত অনেক সময়। তা মারা যাবার দিন সন্ধ্যাবেলাও নাকি আড্ডা দিচ্চিল, তখন বাইকে করে দুটো ষণ্ডামার্কা ছেলে এসে ওকেই জিজ্ঞেস করেচে ‘উদ্দালকদের বাড়ি কোনটা?’ জামার নীচে মেশিন ছিল। কানুও দেখেচে। তো গাবলু বলেচে ‘আমি তো এ পাড়ায় নতুন লোক, দাদা। আমি চিনি না।’ তখন কানুকে জিজ্ঞেস করেচে, কানু বলেচে ‘এই নামে তো চিনি না কাউকে। হয়ত ডাকনামে চিনি। ডাকনাম বলতে পারবেন?’ সে তারা বলতে পারেনি। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাকি খানিকক্ষণ নিজেদের মধ্যে কতা বলেচে ‘যাবে কোতায়? ঠিক বার করব’, এইসব। তারপর চলে গেচে। ওখানে ভাগ্যিস আর কেউ ছিল না! ভাবুন?”

“তাহলে তুই বলছিস ভয় পেয়ে উদ্দালক আত্মহত্যা করল?”

“না, রবীনদা। ভয় পাওয়ার ছেলে ও নয়। আর কোন উপায় না দেকে কল্ল মনে হয়।”

“উপায় নেই? কেন? ও পার্টিকে জানাতে পারত। কী ব্যাপার আমরা দেখতাম। ও পার্টি মেম্বার, তার উপর পঞ্চায়েত সদস্য। এটাই তো করা উচিৎ ছিল।”

“পার্টি মানে তো শুধু আপনি নয়, দাদা।”

“তা তো বটেই। পার্টি কারো একার সম্পত্তি নাকি?”

“সেই তো মুশকিল।”

“মুশকিল! কেন?”

“পার্টিকে জানালে তো… বলরামও জানবে।”

“তাতে কী?”

ততক্ষণে জোনাকি চা দিয়ে গেছে। শিবু উঠে এসে রবীনের ঠোঁটে চা ধরে। প্রথম চুমুক দিয়েই সে আবার জিজ্ঞেস করে “তাতে কী? বল?”

“ছেলেগুলো জগার দলের ছিল। নিশ্চিত।”

“তোদের পাড়ায় ফ্ল্যাট হচ্ছে নাকি?”

“চেষ্টায় আচে।”

“তাই নিয়ে কি উদ্দালকের সাথে কিছু হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। ঐ যে হারু ঘোষের জমিটা। ওটার মাটি কাটতে লোক এসেচিল কদিন আগে। গাবলুর চোখে পড়ে গিসল। ও গিয়ে বলেচে ‘এখানে কিসের মাটি কাটা হচ্চে?’ তা জন খাটচিল যারা তারা বলেচে ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। গাবলু বলেচে ‘চাষের জমিতে ফ্ল্যাট হবে, পারমিশন কই? কে পাঠিয়েচে তোমাদের?’ ওরা জগার নাম বলেচে। গাবলু তখন বলে ‘এখানে কাজ কত্তে দোব না। পঞ্চায়েত থেকে পারমিশন করিয়ে আনতে বলো, তবে কাজ কত্তে পারবে।’ ওরা বলেচিল পারমিশন হয়ে গেচে। গাবলু তো ছাড়বার ছেলে না। ‘আমি এখানকার পঞ্চায়েত সদস্য। হয়ে থাকলে আমি জানতাম।’ বলে ওদের ভাগিয়ে দিয়েচে।”

“তা এটা উদ্দালক কাউকে জানায়নি?”

“জানিয়েচিল। নইলে আমি জানলুম কী করে? পঞ্চায়েত অফিসে বলরামকে আমার সামনে বলেচিল ঘটনাটা।”

“তা বলরাম কী বলল?”

“‘এত লোক বাড়চে চাদ্দিকে। চাষের জমি বাদ দিলে এত লোক থাকবে কোথায়? সব কি তুই আটকাতে পারবি? কেন শুধু শুধু ঝামেলা করিস?’ বলতেই গাবলুর সাতে লেগে গেল। গাবলু বলল ‘নিয়মকানুন কিচু মানবে না? যার জমি সে বাড়ি কত্ত সে একরকম। তা বলে প্রমোটার ফ্ল্যাটবাড়ি তুলে দেবে? আর পঞ্চায়েতকে না জানিয়ে? এই সমস্ত আমি থাকতে হবে না।’ তো বলরামদা বলল ‘জানালে আমায় জানাবে। প্রধান আমি। তোকে কেন জানাতে যাবে?’ তা হাওয়া গরম হয়ে গেচে দেকে আমি বিবেচনা কল্লুম আমার ওখানে থাকা উচিৎ না, তাই সরে পল্লুম।”

চা শেষ। রবীন তখন আর কথা বলতে পারছে না। আঃ! হীরুদা আর কয়েকটা বছর বাঁচতে পারলেন না?

“যদ্দূর মনে পড়চে, যেদিন গাবলু গলায় দড়ি দিল সেদিন কি তার আগের দিন সকালে তক্কাতক্কিটা হল, রবীনদা।”

“অ। সকালে প্রধানকে পঞ্চায়েত সদস্য বলল বেআইনি কাজ করতে দেব না, আর সন্ধ্যাবেলাই প্রমোটারের লোক তাকে চমকাতে চলে এল বন্দুক নিয়ে। চমৎকার! চমৎকার! শাআআলা! কমিউনিস্ট পার্টি করে।”

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

অথবা

ক্লিক করুন নীচের লিঙ্কে

Donate

নাম তার ছিল: ৪

পূর্বকথা: প্রথম যৌবনে যাকে ভালবেসেছিল রবীনের স্ত্রী জোনাকি, সে হারিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক হিংসার যুগে। কারণ সে পালাতে শেখেনি। প্রায় এক যুগ পরে জোনাকির জীবনে এল রবীন। সে-ও পালাতে শেখেনি। অতঃপর

টানা অনেকক্ষণ বৃষ্টি পড়লে রবীনের মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। তারিখটা মনে নেই কিন্তু শনিবার ছিল। স্কুলে হাফ ছুটির পর বাড়ি না ফিরে স্টেশন রওনা দিয়েছিল। হীরুদা, পার্টির জেলা সম্পাদক, বারবার ডেকে পাঠাচ্ছেন অথচ যাওয়া হচ্ছে না। সেদিন যাবেই ঠিক করে রেখেছিল। যখন প্রায় স্টেশনে পৌঁছে গেছে তখন নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।

সকাল থেকেই মেঘ করেছিল বটে, কিন্তু ও মেঘে বেশি বৃষ্টি হয় না। ক্লাস করাতে করাতে রবীন খেয়ালই করেনি কখন ঘন হয়েছে সেই মেঘ। স্কুল থেকে বেরিয়ে সাইকেলে চাপতেই চারপাশটা বেশ অন্ধকার মনে হল। উপরে তাকিয়েই দ্যাখে মেঘে মেঘে সমস্ত আকাশটা ঢাকা পড়েছে প্রায়। মেঘগুলো একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়ে দ্রুত ভরাট করে দিচ্ছে ফাঁকা জায়গাগুলোও। তবু সে ভেবেছিল স্টেশন পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে। তারপর ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে পড়লেই হল। ট্রেন আসবে আর লাফিয়ে উঠে পড়বে। আশা করা যায় সাত স্টেশন দূরের জেলা সদরে একই সময়ে ভারী বৃষ্টি হবে না।

বর্ষাকালে এমন আশা করার কোন মানে হয় না। কিন্তু সেটা না করলে নিজের প্রতিবন্ধকতা মেনে নিতে হয়। ছাতা হাতে সাইকেল চালানো যে তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব সে কথা নিজের কাছেও স্বীকার করতে চাইত না রবীন। স্বীকার করলেই প্রতিবন্ধী মানসিকতা চেপে ধরবে — এই ভয়।

শুভাকাঙ্ক্ষীরা মৃদু স্বরে, বাকিরা বিদ্রূপের ভঙ্গীতে, বেশ কয়েকবার বলেছে একটা প্রতিবন্ধী কার্ড করিয়ে নেওয়ার কথা। ট্রেনে, বাসে ছাড় পাওয়া যায়; উঠলেই বসার জায়গা পাওয়া যায়, আরো নানা সুবিধা। রবীন কিন্তু নিজেকে প্রতিবন্ধী বলে মানতে চায় না। ওর হাঁটাচলা স্বাভাবিক, কথাবার্তা স্বাভাবিক। হাত দিয়ে ভারী কাজ করতেও কোন অসুবিধা নেই। কেনই বা নিজেকে প্রতিবন্ধী ভাববে? অসুবিধা বলতে ভাত খেতে গিয়ে এদিকে ওদিকে বেশ খানিকটা পড়ে যায়, গ্লাসে জল ভরে খেতে গিয়েও ভর্তি করে ফেললে চলকে পড়ে, চা নিজে হাতে একেবারেই খাওয়া যায় না — গরম গায়ে পড়বে বলে। লিখতেও একটু অসুবিধা হয় বটে কিন্তু বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কব্জিটা ধরে নিলে আর অতটা কাঁপে না। বোর্ডের লেখা কাঁপা কাঁপা হলেও ছাত্রছাত্রীরা শেষ বেঞ্চ থেকে দিব্যি পড়তে পারে। লেখার পরে বেশ খানিকক্ষণ হাত টনটন করে ঠিকই, তবে রবীন তো বিজ্ঞান কি ভূগোলের মাস্টার নয়, ফলে খুব বেশি বোর্ড ওয়ার্ক করতে হয় না। পরীক্ষার খাতায় নম্বর দিতেও দুটো হাতকেই কাজে লাগাতে হয়। কখনো কখনো লেখার কাজ বাঁ হাত দিয়েও চালিয়ে নিতে হয়। একেবারে দুর্বোধ্য লেখা পড়ে তা নয়। এইটুকু মানিয়ে নিতে অসুবিধা কোথায়? যে লোক মাইলের পর মাইল সাইকেল চালাতে পারে, ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতায় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে, প্রশাসন চালাতে পারে, সে কেন নিজেকে প্রতিবন্ধী ভাববে? কেন অন্যকে সুযোগ দেবে তাকে প্রতিবন্ধী ভাবার? সামান্য বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য?

এই জেদ বজায় রাখে বলেই অবশ্য রবীনের চট করে কারো সাহায্যের দরকার হয় না এখন অব্দি। তবে যখনকার কথা হচ্ছে তখনো অসুখটা প্রবল হয়নি। ১৯৭৮। কিছুদিন আগেই পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছে আর এক ঘুষখোর রেলকর্মী কংগ্রেসীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে রবীন পঞ্চায়েত সমিতির ভোটে জিতেছে। ওর একেবারেই ইচ্ছে ছিল না ভোটে দাঁড়ানোর। কিন্তু সেকথা বলতেই হীরুদা প্রচণ্ড ধমক দিয়েছিলেন।

“ভোটে দাঁড়াবে না তো কী করবে শুনি?”

“মন দিয়ে সংগঠনটা করতাম। কাজ তো সবে শুরু। আমাদের পার্টিটাকে একটা সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি করতে হবে তো। সাধারণ মানুষকে তো বোঝাতেও হবে আসলে আমরা কী করতে চাই।”

“শোনো ছোকরা, আমার বয়স কত জানো? জ্যোতি বোস আমার থেকে বয়সে ছোট। তা তুমি কি চাও আমরা বুড়ো হাবড়ারা প্রশাসন চালাই? তারপর লাইন দিয়ে মরতে শুরু করলে সামলাবে কে?”

“মরার বয়স আপনার এখনো হয়নি, হীরুদা।”

“ওসব বাজে কথা রাখো। প্রশাসনটা ভাল করে চালানোর গুরুত্বটা বোঝো। ঠিক কথাই যে পার্টিটাকে যেরকম করা দরকার তার এখনো দেরি আছে। কিন্তু তোমাদের তো বয়স কম, তোমরা সংগঠন করার অনেক সময় পাবে। এখন তোমাদের মত তাজা ছেলেদের প্রশাসনে দরকার। বিপ্লবটা করতে হলে তো সারা দেশে করতে হবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে কি বিপ্লব হবে?”

“কখনোই না। সেটা হবার হলে নকশালরাই পেরে যেত।”

“তবে? এই যে আমরা সরকার চালানোর সুযোগটা পেয়েছি, এটাকে কাজে লাগাতে হবে, বুঝেছ? দেখিয়ে দিতে হবে দেশের লোককে যে কমিউনিস্টদের মত সরকার অন্য কেউ দিতে পারে না। তবে অন্য রাজ্যের লোকেও বিশ্বাস করবে আমাদের। তবে বিপ্লব-টিপ্লবের কথা ভাবা যাবে।”

“কিন্তু…”

“আরে পুরো কথাটা শোনো আগে। এই যে আমরা পঞ্চায়েত করতে চাইছি, এ যদি সফল হয় তাহলে যা দাঁড়াবে সে জিনিস এত বড় করে ভারতবর্ষে আগে হয়নি। গরীব মানুষ নিজে হাতে নিজের এলাকা শাসন করবে। তা সে তো দুম করে পারবে না। তার তো সময় লাগবে, লেখাপড়া লাগবে। তোমার মত শিক্ষিত ছেলেরা যদি শুরুতে হাল না ধরো, হবে কী করে?”

“সে পার্টি সিদ্ধান্ত নিলে নিশ্চয়ই মেনে নেব…”

“মন সায় দিচ্ছে না? কেন? সংশয়টা কিসের?”

“না, ভাবছি শুধু ভোটে জেতাটাই তো আমাদের উদ্দেশ্য নয়…”

“একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আপাতত ওটাও জরুরী। মাও কী বলতেন? ‘সচেতন মানুষের হাতে বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, তাই তো? তা চারুবাবুরা সচেতন মানুষের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেলেন। কমরেডরা শিখলেন ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।’ আমরা এবার দেখাব যে বন্দুকের নল নয়, নলকূপ দিয়ে বিপ্লব শুরু করা যায়। তোমাকে যে কাজটা দিতে চাইছি সেটা বিপ্লব শুরু করার কাজ। ভেবো না এর সাথে বিপ্লবের কোন সম্বন্ধ নেই।”

সেদিন উঠে আসার আগে হীরুদা পিঠে হাত দিয়ে বলেছিলেন “একটা কথা জেনে রেখো। ভূমি সংস্কার আর পঞ্চায়েত যদি আমরা ঠিক করে করতে না পারি, ৮২র ভোটে ভরাডুবি হবে। আর সেটা হলে তোমার বিপ্লবের বাণী কেউ শুনবে না। এবং প্রশাসন চালাতে গিয়ে যা শিখবে তা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”

রবীনকে শুধু পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য করে অবশ্য হীরেন্দ্রনাথ ঘোষ ছাড়েননি, একেবারে সভাপতি করেছেন। দু একটা বাদে শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির অধিকাংশ আসন প্রত্যাশিতভাবেই বামফ্রন্ট প্রার্থীরা জিতেছিল। সকলেরই ধারণা ছিল পার্টি সভাপতি করবে অক্রূর গুপ্তকে। রবীন নিজেও তাই ভেবেছিল। অক্রূর দীর্ঘদিনের পার্টিকর্মী, নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে প্রবীণতম, কলকাতা কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ফলে প্রশাসন চালানোর কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল, আর ভদ্রলোক কর্তা হওয়ার উপযুক্তও বটে। কর্তৃত্ব করতে ভালবাসেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে জেলা কমিটি সিদ্ধান্ত নিল রবীন সভাপতি হবে। জোনাল কমিটির মত চাওয়া হয়েছিল, সেখানে ঐকমত্য হয়নি। পরে অবশ্য রবীন বুঝতে পেরেছিল হীরুদার মাথায় এই ভাবনাটাই ছিল, সেই জন্যেই ভোটে দাঁড়ানো নিয়ে অতগুলো কথা সেদিন বলেছিলেন।

পঞ্চায়েত সমিতি ব্যাপারটা ঠিক কিরকম হওয়া উচিৎ, পঞ্চায়েত আর জেলা পরিষদের মাঝখানে স্রেফ যোগসূত্র হয়ে থাকা উচিৎ নাকি নিজ উদ্যোগেও কিছু করা উচিৎ — এসব নিয়ে কারো থেকে কোন পরামর্শ পায়নি রবীন। নিজেকেই কাজ করতে করতে বুঝে নিতে হচ্ছিল। সেইসব করতে গিয়ে আর হীরুদার কাছে যাওয়া হয়নি বহুকাল। শেষ দেখা হয়েছিল শপথ গ্রহণের দিন। ৭৮ এর সেই বিকেলে তাই রবীন যাচ্ছিল হীরু ঘোষের রতুগঞ্জের বাড়ি। পথে নামল বৃষ্টি।

তোড় খুব বেড়ে যাওয়ার আগে কোন মতে নিমাইয়ের সাইকেল স্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছতে পেরেছিল রবীন, তাই শেডের নীচে দাঁড়াতে পারল। তাতেও পাঞ্জাবীটা ভিজে গিয়েছিল। বৃষ্টিটা চট করে থামবে না বুঝে নিমাই বলল “পাঞ্জাবীটা যে অ্যাক্কেরে ভিজা গ্যাছে, রবীনদা। দ্যাও ঐ ফ্যানের নীচে মেইলা রাখি। জল ধরনের আগে শুকায়া যাইব গিয়া।”

তাই-ই করা হল। তারপর রবীনের সাথে একথা সেকথা চলতে লাগল। একটু পরে লাগোয়া বিন্দুর চায়ের দোকান থেকে ভাঁড়ে চা নিয়ে এল বিন্দুর ছেলে। সে খাইয়ে দিচ্ছে, রবীন খাচ্ছে, কথাও বলছে। কিন্তু চোখ রাস্তার দিকে। আধ ঘন্টা যেতে না যেতেই নালাগুলো ভরতে শুরু করল। স্টেশন চত্বরটা তাও উঁচু জায়গা। এই বৃষ্টি আরো কিছুক্ষণ চললে বাকি সবুজগ্রামের কী অবস্থা হবে, সেটাই ভাবছিল রবীন। সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা সুভাষ কলোনি। পাশেই হরিমতীর ঝিল। যদি উপচে পড়ে! তাছাড়া শুধু তো সবুজগ্রাম নয়, আজাদপুর, ধাঙ্গড়পাড়া, ক্ষেত্রগ্রাম, বড়িহাটা — এরকম অনেকগুলো পঞ্চায়েত এলাকা শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে।

বৃষ্টি কমার নাম নেই। রবীন দোটানায় পড়ে গেল। শুধু অনেকদিন যাওয়া হয়নি বলেই নয়, সেদিন হীরুদার সাথে কিছু জরুরী আলোচনাও করার ছিল। সভাপতি না হতে পারাটা অক্রূরদা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সরাসরি রবীনকে অমান্য করতে পারে না, কিন্তু মাঝেমাঝেই ওকে না জানিয়ে একেকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে। অবধারিত খারাপ সিদ্ধান্ত। এ পর্যন্ত প্রত্যেকবারই রবীন জানতে পেরে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু পার্টিকে জানিয়ে রাখা দরকার যে উনি নিজের অধিকারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। অথচ যা বৃষ্টি হচ্ছে তাতে এলাকার অবস্থা সঙ্গীন হবে মনে হয়। সে অবস্থায় সন্ধ্যেটা নষ্ট করা কি উচিৎ হবে?

ঘন্টাখানেক হয়ে যাওয়ার পরেও যখন বৃষ্টি থামল না, তখন রবীন ঠিক করে ফেলল হীরুদার বাড়ি যাবে না। জামাটা ততক্ষণে প্রায় শুকিয়ে গেছে, কলারের কাছটা ছাড়া। পরে নিতে দেখে নিমাই জিজ্ঞেস করল “এই বৃষ্টিতে বাইরাইবা নাকি? যাইবা কোথায়?”

“বাড়িই ফিরা যামু রে। রাস্তাঘাটের কী অবস্থা দেখা দরকার। এ তো থামনের লক্ষণ নাই।”

“তা এট্টু দাঁড়ায়ে যাও। অন্তত কমুক কিছুটা। একবার ভিজছ আবার ভিজবা?”

কথাটা ঠিকই। অসুস্থ হয়ে পড়লে আবার বিপদ। রবীন তাই জামাটা পরে দাঁড়িয়েই রইল। মিনিট দশেক পরে মনে হল যেন অনেকটাই কমেছে। টিনের চালে জল পড়ার আওয়াজ শুনেই আন্দাজটা করতে হল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই কারেন্ট চলে গিয়েছিল। ফলে চারদিকে তো ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। ঐ অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়ল সে। সাইকেলে একটা আলো লাগিয়েছিল কদিন আগেই। হ্যান্ডেলের উপরে লাগানো হেডলাইটের মত। তার দিয়ে পেছনের চাকার গায়ে লেগে থাকা বোতলের মত দেখতে ব্যাটারির সাথে যুক্ত। চাকা ঘুরলে ঘর্ষণে সে ব্যাটারি চার্জ হয়। রবীনের মাথায় আসেনি। এক ছাত্রের বাবার দোকানে সেদিন হাওয়া দিতে গিয়েছিল। তিনিই জোর করে লাগিয়ে দিয়ে বললেন “আপনি তো সাইকেলটা নিয়েই হিল্লী দিল্লী করেন দিনরাত। খুব কাজে লাগবে আপনার।” সত্যিই খুব কাজে লাগল।

তখনো এক দু ফোঁটা পড়ছে। রবীন সবুজগ্রাম চষে ফেলে বুঝল হীরুদার বাড়ি যাওয়া বাতিল করে ঠিকই করেছে। হরিমতীর ঝিল প্রায় ভরে গেছে, সুভাষ কলোনির নীচু, সরু গলিগুলোতে ইতিমধ্যেই প্রায় হাঁটুজল, ঝিল উপচোলে আর দেখতে হবে না।

সেদিন তো হীরুদার কাছে যাওয়া হলই না, পরের প্রায় এক মাস হল না। বৃষ্টি বটে। সেবারের মত বর্ষা রবীন তার আগে বা পরে আর কখনো দ্যাখেনি। সবুজগ্রামের বেশিরভাগটা দীর্ঘদিন জলের তলায় ছিল। তার পঞ্চায়েত সমিতির বেশিরভাগ এলাকারই ঐ অবস্থা। সারাদিন এত কাজ থাকত যে কোন কোনদিন বাড়ি ফেরাই হত না। রবীন ভাবত, ভাগ্যিস বাবা একটা দোতলা বাড়ি করতে পেরেছিল। বুড়িমার পরিবারের কাজে লাগল।

সবুজগ্রামের বাড়ি তৈরি করতে ওর বাবার সর্বস্ব খরচা হয়ে গিয়েছিল। তাই পরের পনেরো বছর অত বড় বাড়ি ঝাঁট দেয়া, মোছার কাজ মাকে একা হাতেই করতে হয়েছে। যন্ত্রণাও এক সময় অভ্যেস হয়ে যায়। এমনই অভ্যেস যে ওটা ছাড়া বাঁচা যায় না। রবীনের দিদিরা একটু বড় হয়ে যখন সংসারের কাজে হাত লাগাল তখনো ঝাঁট দেওয়া মোছাটা কিছুতেই ওদের করতে দিতেন না মহিলা। শেষপর্যন্ত চাকুরে বড় ছেলে জোর করে কাজের লোক রাখে — এই বুড়িমাকে।

তখন সবে রবীনের দাড়ি গোঁফ বেরোতে শুরু করেছে, বুড়িমা তখনই বুড়ি। সেই থেকে যদ্দিন বেঁচেছিল, ঘোষালবাড়ি তার অর্ধেক বাড়ি ছিল। নাতি নাতনিদের কাঁখে করে কাজে আসত, তারা এই বাড়ির মেঝেয় হামাগুড়ি দিতে দিতে, মুড়ি চিঁড়ে, ধুলো খেতে খেতে বড় হয়ে যেত। বুড়িমার শরীর খারাপ হলে সে নিজের ছেলেদের বলত না, বলত রবীনের বাবাকে বা ওর দাদাদের কাউকে। দাদারা যখন চাকরিসূত্রে একে একে সবাই বাইরে চলে গেল, তখন রবীনই হয়ে উঠল বুড়িমার অভিভাবক। ততদিনে অবশ্য গোটা ঘোষালবাড়ির অভিভাবক বুড়িমা। রবীনের মায়ের মাথাটা যখন একেবারে খারাপ, ওর বাবাকে খামোকা গালাগালি দেয়, ছেলের বউয়েরা খাবারে বিষ মেশাবে বলে অভিযোগ করে, তখন একমাত্র বুড়িমাই পারত জোর করে স্নান করাতে, ভাত খাওয়াতে। বুড়ি দুম করে মারাও গেল এ বাড়ির ঘর ঝাঁট দিতে দিতেই। সেই বুড়িমার নাতিপুতিরা নিজেদের ঘরে জল ঢুকতেই এসে হাজির হয়েছিল রবীনের কাছে। ওর বাড়ির একতলাও জলের তলায়। ও থেকেছে দোতলার দুটো ঘরে ওদের ছয়জনের সাথে ভাগাভাগি করে। কাছাকাছি সময়ে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে অত বড় বাড়িতে ও একা মানুষ। বুড়িমার পরিবার আসায় কদিন বাড়িতে থাকার লোক হয়েছে।

জল যখন নামতে শুরু করেছে, চারিদিকে নানা অসুখ বিসুখ, তখন একদিন পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে ঢুকে রবীন দ্যাখে এক সন্ন্যাসী অক্রূরদার উল্টোদিকে বসে আছে। ও ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। অক্রূরদা বলল “এনাকে চেনো? না চিনলে চিনে রাখো। ইনি হলেন স্বামী মৃণ্ময়ানন্দ।”

রবীন প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলে “মাপ করবেন, নাম শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

“ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম। তোমরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা কোন খোঁজখবর রাখো না, রাখার চেষ্টাও করো না…”

“আরে, ধুর! আমি এমন কোন লোক নই যে উনি জানবেন”। অক্রূর গুপ্তর কথার মাঝখানেই ভদ্রলোক বলে ওঠেন। “কাজ বলতে আমরা কজন সাধু মিলে একটা আবাসিক স্কুল খুলেছি। এই বড়িহাটায়, গলামনের পাড়ে।”

“ও! আপনি ঐ রামকৃষ্ণ সংঘের হেড সন্ন্যাসী তো? পাগল মহারাজ?”

“ঠিক ধরেছেন। লোকে আমাকে ঐ নামেই ডাকে বটে। আমারও ঐটেই বেশি পছন্দ। সন্ন্যাসী মানুষের নামের কী গুরুত্ব বলুন? গেরুয়া পাবার সময় গুরু একটা নাম দিয়েছিলেন সেইটে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কিন্তু আমি যাদের পূজা করি তারা আমায় যে নাম দিয়েছে সেইটেই তো আমার আসল নাম। নয় কি?”

সাধু সন্ন্যাসীদের বিশেষ পছন্দ করত না রবীন, তবে এঁর কথা বলার ধরনটা মন্দ লাগে না।

“আমি আসলে আপনার সাথে দেখা করতে চাইছি অনেকদিন থেকে। কিভাবে আসা উচিৎ বুঝতে পারছিলাম না ঠিক, তা অক্রূরদা আমার পরিচিত। ওনাকে বলাতে উনি বললেন ‘এসো, আলাপ করিয়ে দেব।’”

“আমার সাথে? কেন বলুন তো?”

“আসলে ত্রাণের কাজ তো এখনো শেষ হয়নি। তা ভাবছিলাম আমার ছেলেদের যদি আপনি কাজে লাগিয়ে নিতেন। আমি নিজেও নামতে চাই।”

অক্রূরদা মন্তব্য করলেন “ও সাধু সন্ন্যাসীদের একদম পছন্দ করে না।”

“পছন্দ করার তো দরকার নেই, দাদা। উনি মানুষের জন্যে কাজ করছেন, আমিও মানুষের জন্যে কাজ করতে চাইছি। আমাদের পছন্দ অপছন্দ দিয়ে হবে কী?”

প্রস্তাবটা রবীনের একটু অদ্ভুত লেগেছিল। সে বলেই ফেলল “না, এমনিতে তো আপত্তির কিছু নেই। অনেক সংস্থাই তো করছে। নিজেদের মত করে করছে। আমরা তো বাধা দিই না। আপনি আপনার ছেলেদের নিয়ে করুন না। কিন্তু আমি কাজে লাগাব মানে বুঝলাম না।”

মহারাজ হেসে বললেন “ও হো, আপনি বোধহয় আমায় রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু ভাবছেন?”

“হ্যাঁ। তা আপনি তো রামকৃষ্ণ সংঘ…”

“সংঘ। মিশন নয়। আমি ঐ মিশন থেকে দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন আশ্রম করেছি। তাই নামও আলাদা। কিন্তু আমারও গুরু সেই রামকৃষ্ণ, সেই বিবেকানন্দ। মানে আপনারা যেমন সি পি আই ভেঙে বেরিয়ে সি পি এম করেছিলেন আর কি। আপনাদেরও গুরু মার্কস-এঙ্গেলস, ওনাদেরও তাই।”

“বুঝলাম। কিন্তু আমার কী সাহায্য লাগবে বুঝলাম না।”

“বোঝাচ্ছি। আপনাদের পার্টি যখন হয় তখন অফিস কাছারি, পত্রিকা এসব নিয়ে সি পি আইয়ের সাথে গোলমাল হয়েছিল। আপনাদের দিকে বেশি কমরেড থাকাতে অনেক কিছুই দখল করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাদের বেলায় আমরা মোটে তিনজন সাধু আর দুজন ব্রক্ষ্মচারী। না আছে টাকাপয়সা, না ত্রাণ সামগ্রী। এমনকি লোকবলও নেই। তা বলে এই দুর্যোগে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? তাই আপনাদের যারা কাজ করছে তাদের সাথে নেমে পড়তে চাইছি আর কি। আমরা পাঁচজন আর স্কুলের জনা পনেরো ছাত্র।”

এই সন্ন্যাসী যা বলছেন এবং যেভাবে বলছেন তা যে একেবারেই অন্য সন্ন্যাসীদের মত নয় তা দেখে রবীনের অবাক লাগছিল। কিন্তু ওঁর প্রস্তাব না মানার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল না। তাই রাজি হয়ে গেল। উনি যখন যাবেন বলে উঠে পড়েছেন তখন বলতেই হল “আপনি আমাদের পার্টি সম্পর্কে অনেকগুলো কথা বললেন। বেশ খবর রাখেন দেখছি।”

পাগল মহারাজ একগাল হেসে বললেন “অদ্ভুত লাগছে, না? একটা কথা আছে জানেন তো, সব পাপীরই ভবিষ্যৎ আছে আর সব সাধুরই অতীত আছে?”

“তা আপনার অতীতটা কী?”

“সে তো লম্বা গল্প, মাস্টারমশাই। একদিন বলা যাবে। অক্রূরদা বলেছিল আপনার সাথে আমার একদম বনবে না। আমার তো উল্টোটাই মনে হচ্ছে। দেখা যাক ঠাকুরের কী বিধান। আজ আসি।” সেই আলাপ পাগল মহারাজের সাথে, তারপর একসাথে বন্যার কাজ, বন্ধুত্ব। বৃষ্টি এলে সেসব মনে পড়ে রবীনের।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

Donate

নাম তার ছিল: ৩

পূর্বকথা: উদ্দালক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে জানার পর থেকে রবীন দিশাহারা। লেখাপড়ায় ভাল, এলাকায় জনপ্রিয় একজন তরুণ পার্টিকর্মী কেন আত্মহত্যা করবে তা রবীনের কাছে রহস্য। কিন্তু স্ত্রী জোনাকি এর মধ্যে কোন রহস্য খুঁজে পায় না। তার ধারণা এই আত্মহত্যার কারণ ব্যর্থ প্রেম। এই ব্যাখ্যায় রবীন অবশ্য সন্তুষ্ট হতে পারে না। উদ্দালকের কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে নিজের যৌবনের কথা। সেই স্মৃতিতে প্রেমের স্থান সামান্য। মায়ের মৃত্যু, রাজনীতি, গ্রেপ্তার হওয়া — এসবই প্রায় সবটা অধিকার করে আছে। আর কিছু আছে কি?

পরাজিতের কোন ইতিহাস নেই। কথাটা জনপ্রিয় হলেও সত্য নয়। কারণ আজ যে পরাজিত কাল সে-ই জয়ী হবে, আজকের জয়ীকে হার স্বীকার করে নিয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করতে হবে সেদিন। ইতিহাসও নতুন করে লেখা হবে। আসলে ইতিহাস নেই তাদের, যারা জয়ের কাণ্ডারী ছিল কিন্তু জয়ের অপব্যবহার মেনে নিতে পারেনি, জয়ীর স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সময়ে প্রতিবাদ করেছে, আটকানোর চেষ্টা করেছে, না পেরে নীরবে সরে গেছে অথবা গলাধাক্কা খেয়েছে। যখন স্বৈরাচারের অবসান হয় তখন নতুন জয়ী এদের স্বৈরাচারের সৈনিক হিসাবেই গাল পাড়ে, আঁচড়ায় কামড়ায়, তফাত করতে পারে না। অথবা করতে চায় না। এমন হতভাগ্যের অভাব হয় না কস্মিনকালে। তেমনই একজন রবীন ঘোষাল।

সবুজগ্রামের দক্ষিণপাড়ার মুখেই একটা দোতলা বাড়ি। সারা সপ্তাহ দিনের বেলায় নিঝুম পুরী। তবে প্রতি সন্ধ্যায় এক দশাসই ভদ্রমহিলা দরজার মুখে বসে থাকেন পালিশ চটে যাওয়া কাঠের চেয়ারে। মাথার চুল কমে এসেছে, যা আছে তা-ও সাদা। ও পাড়ায় এমন কেউ নেই যাকে উনি চেনেন না, পথনির্দেশ দিতেও ক্লান্তিহীন। দোষের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই। কোন অচেনা পথিক কারোর বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন, সঙ্গে জুড়ে দেন “ওদের বাড়ি কার কাছে যাবেন?” উত্তর পেলে পরের প্রশ্নটা হয় “ওর কাছে কী দরকার গো?” এই অনধিকার চর্চার জন্ম একাকিত্বে। স্বামী গত হয়েছেন বছর দশেক। ছেলে, ছেলের বউ বহুজাতিকের ঘানি টানতে যায় ভোর ভোর, ফেরে সন্ধ্যে উতরে গেলে। খেতে, ঘুমোতে। ভদ্রমহিলার ধারণা ওদের মৈথুনের সময়টুকুও নেই। নইলে নাতি-নাতনির দাবী ওরা হেসে উড়িয়ে দিত না এত বছর ধরে। এক সময় সারাক্ষণ বাড়িতে চেনা অচেনা লোকের আনাগোনা লেগেই থাকত, এখন ডেকে ঘরে আনতে চাইলেও কেউ আসে না বড় একটা। কথা না বলতে পেরে উনি হাঁসফাস করেন। তাই কাউকে একবার হাতে পেলে উনি নানা ছলে কিছুক্ষণ কথা বলবেনই। আজকাল ওঁর নতুন বিপদ হয়েছে স্মৃতিভ্রংশ। খানিকক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাও বেমালুম ভুলে যান। কী যেন করার ছিল, মনে পড়ছে না — এই যন্ত্রণা নিয়েও দিনের অনেকটা সময় কাটে ওঁর। তবে বহু পুরনো ঘটনা এখনো ছবির মত মনে আছে। ইনি জোনাকি ঘোষাল — রবীন ঘোষালের স্ত্রী।

বৃদ্ধা জোনাকিকে দেখে কল্পনা করা শক্ত উনি এক সময় শঙখবেলার মাধবীর মত ছিপছিপে ছিলেন। দুদিকে তখন দুটো লম্বা বেণী ঝুলত। সাজগোজের দিকে একেবারেই নজর ছিল না তখন, মনোযোগ বেশি ছিল বই পড়ায়, সৌন্দর্য যা ছিল সে দুই চোখে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। তখনকার সেই বই থেকে মুখ না তোলা জোনাকি দুম করে প্রেমে পড়ে গেল। বইয়ের জন্যই।

আসলে পাঠ্য বইয়ের প্রতি জোনাকির বিশেষ আগ্রহ ছিল না, ছিল অপাঠ্যের প্রতি। ফলে পাড়ার লাইব্রেরিটাই ছিল বিকেলের ঠিকানা। বুড়ি লাইব্রেরিয়ানের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে বরানগরে দিদিমার কাছে মানুষ মেয়েটার খুব একটা বন্ধুবান্ধব ছিল না, তাই লাইব্রেরিয়ান মাসির সাথে গল্প আর তাঁর কাজে সাহায্য করেই সবচেয়ে ভাল সময় কাটত।

লাইব্রেরিয়ান মাসির প্রিয় পাত্র ছিল ঝোটন। পাড়ারই ছেলে। ওকে ভালবাসে না এমন লোক পাড়ায় ছিল না। যেমন ফুটবলার তেমন উপকারী। যত ভাল ছাত্র তত ডানপিটে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, এক মাথা চুল, গায়ের রং অমাবস্যার আকাশের মত কিন্তু পৃথিবীর সব আলো যেন ওর চোখে। এমন নয় যে ঐ চোখের দিকে জোনাকি আগে কখনো তাকায়নি। কিন্তু লাইব্রেরিতে বসে গল্প করতে করতে সে প্রথম বুঝতে পারে কোন আলোয় অত উজ্জ্বল চোখ দুটো। ঝোটন প্রায়ই গল্প করতে এসে ঝগড়া বাধাত মাসির সাথে — অমুক বইটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়। তমুক লেখক এখন আর লেখক নেই, দালাল হয়ে গেছে। এখন চাঁদ ফুল এসব নিয়ে ঘ্যানঘেনে কবিতা লেখার সময় নয়।

এসব কথা শুনে প্রথম প্রথম ভারী অবাক লাগত জোনাকির। তার চেয়ে মাত্র বছর দুয়েকের বড় ছেলে। সে এত জানল কোত্থেকে! এত অন্যরকম বই সে পড়ল কোথায়! মাসির মত পড়ুয়া মানুষ জোনাকি আর দ্যাখেনি। লাইব্রেরির কোন তাকের কোন কোণে কোন বইটা আছে তা মাসির হাতের তালুর মত জানা। কোন বইয়ের কোন পাতায় কী আছে তা-ও ঠোঁটস্থ। তিনিও অনেক সময় তর্কে পেরে ওঠেন না ঝোটনের সঙ্গে। হয়ত বলেন “আচ্ছা দিয়ে যাস। পড়ে দেখি কী এমন নতুন কথা লিখেছে তোর সরোজ দত্ত।” গোড়ার দিকে ওদের তর্কে একরোখা হয়ে তর্ক করত জোনাকি। করবে না-ই বা কেন? তারাশঙ্করকে কেউ বলবে “জোতদার জমিদারদের লোক” আর সে চুপ করে থাকবে, তা হয় না। মাঝেমধ্যে তো রবীন্দ্রনাথকেও উড়িয়ে দিত ঝোটন। গা পিত্তি জ্বলে যেত জোনাকির। তারপর হল কি, মাসির জন্যে ঝোটনের আনা বইগুলো কেড়ে নিয়ে আগে সে-ই পড়তে শুরু করল। আর পছন্দ অপছন্দগুলো কেমন গুলিয়ে যেতে শুরু করল।

লাইব্রেরি থেকে উত্তরমুখো মিনিট পাঁচেক হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই জোনাকিদের বাড়ি। তবু বকবক করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে গেলে মাসি কিছুতেই ওকে একা ছাড়ত না। ঝোটনকে বলত “একটু পৌঁছে দিয়ে আয় না, বাবা।” আসলে সময়টা ভাল না। বরানগরে তো আরোই ভাল না। মারামারি, খুনখারাপি লেগেই আছে।

ঐ পাঁচ মিনিট হাঁটতে গিয়ে এমন কোন কথা শুরু হয়ে যেত যা বাড়ির দরজায় গিয়ে শেষ হত না। জোনাকির দিদিমা দরজা খুলেই হয়ত বলতেন “ঝোটন একটু বইস্যা যা। বেগুনি করতাছি।” ঝোটনকে টানত বেগুনি আর জোনাকিকে টানত ঝোটনের কথা। আরো ঘন্টাখানেক চলত আড্ডা। তার ফলে এমন অনেক বই আসতে শুরু করল জোনাকির হাতে যেগুলোর খবর লাইব্রেরিয়ান মাসিও পেত না। ঝোটন হয়ত নিয়ে এল লেনিনের ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’, এডগার স্নোয়ের লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ আর ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’। মাসির কাছে পৌঁছল শুধু শেষেরটা, বাকি দুটো লাইব্রেরিতে ঢোকার আগেই চালান হয়ে গেল জোনাকির স্কুলফেরত ব্যাগে। ইংরিজি বই পড়ার অভ্যেস ওর ছিল না। কিন্তু ঝোটন বলেছিল “রাশিয়া থেকে বেশকিছু জরুরী বই এখন বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে। কিন্তু সব তো হয়নি। তা বলে কি হাপিত্যেশ করে বসে থাকবি? জীবন খুব ছোট। ইংরিজিতেই পড়ে ফ্যাল।”

এরকম চলেছিল বছর দুয়েক। শেষের দিকে শুধু বই নয়, এক আধ লাইন চিঠিরও আদানপ্রদান হত। জোনাকিই প্রথম জানিয়েছিল তার মুগ্ধতার কথা। জানিয়ে ফেলেছিল বলা উচিৎ।

আসলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার বেশ কিছু অভিযোগ থাকলেও মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে তাঁর গান গেয়ে উঠত ঝোটন। দু লাইন গেয়েই বলত “আহা! এই গানটা জর্জ বিশ্বাসের গলায় যা লাগে…”। জোনাকি সেরকম গানের একটা তালিকা করেছিল গোপনে। ভেবেছিল ছোটমামার সাথে শ্যামবাজার গিয়ে খুঁজে খুঁজে কিনে আনবে রেকর্ডগুলো। সেই চিরকুটটা রাখা ছিল ঝোটনের পড়তে দেওয়া ‘ইস্পাত’ এর ভেতর। ফেরত দেওয়ার সময় আর মনে নেই। সেই চিরকুট দেখে ছেলে সোজা এসে প্রশ্ন করে “তুই কি আমাকে ভালবাসিস?”

লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে আচমকা এই প্রশ্ন বড় বিপদে ফ্যালে জোনাকিকে। সে আর তাকাতে পারে না ঝোটনদার দিকে। কী উত্তর দেওয়া উচিৎ তা না ভেবে সে ভাবতে থাকে ঝোটন জানতে পারল কী করে এবং এ জন্যে কী শাস্তি তাকে দেবে। কারণ জোনাকির এ নিয়ে কোন সন্দেহই ছিল না যে সে ঝোটনের প্রেমের যোগ্য নয়। ঝোটনের মত অত বড় মন তার নেই। চা বাগানের শ্রমিকের অন্নচিন্তায় রাতের ঘুম ওড়ে না তার। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে চীনের পার্টির কোথায় তফাত তা-ও সে সবে বোঝার চেষ্টা করছে। মুখ নীচু করে নীরবে হাঁটতে হাঁটতে যখন জোনাকির গাল ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে, তখন তার হাতে চিরকুটটা গুঁজে দেয় ঝোটন। দিয়ে বলে “ছেলেমানুষী করিস না।”

বটেই তো। ছেলেমানুষী ছাড়া আর কী? জোনাকি সেদিন ভেবেছিল ঝোটনের সাথে সম্পর্ক বুঝি ঘুচে গেল। কিন্তু পরদিন স্কুল থেকে লাইব্রেরির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্যাখে নেতাজি ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে সে। ইদানীং আর আগের মত অত ঘন ঘন লাইব্রেরিতে যায় না ঝোটন। পরপর দুদিন তো নয়ই। তবু আজ দাঁড়িয়ে! জোনাকি ভেবে পায়নি কোন দিক দিয়ে পালাবে। পা দুটো পাথর হয়ে যাওয়ার যোগাড়। বোধহয় বুঝতে পেরেই ঝোটন এগিয়ে এসে তার হাতে ধরিয়ে দেয় একটা বই, বলে “এবার এটা পড়ে ফ্যাল।” কী বই সেটা দেখার আগেই জোনাকির চোখে পড়ে পেজ মার্কের মত বেরিয়ে রয়েছে একটা লাইন টানা কাগজ। “লাইব্রেরি যাবি তো?” বলেই উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ওর সাথে হাঁটতে শুরু করে ঝোটন। অস্ফূটে বলতে শুরু করে “ভেতরে একটা চিঠি আছে। পরে পড়িস। জানি তুই ভুল বুঝেছিস। সবটা বোঝানোর জন্য লিখতে হল। বলে বোঝানো শক্ত। তাছাড়া তোর সাথে আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ পাই কতটুকু?”

সেই চিঠিটা জোনাকির কাছে বহুকাল ছিল। বিয়ের কয়েকদিন আগে ওর আলমারি গোছাতে গিয়ে খুঁজে পেয়ে বউদি ফেলে না দিলে আরো অনেকদিন থাকত। চিঠিতে ঝোটন লিখেছিল তারও জোনাকিকে ভাল লাগে, নইলে তার তখন যা কাজের চাপ তাতে লাইব্রেরি না যেতে পারলেই ভাল হয়। কিন্তু ভালবাসবার তার উপায় নেই। কখন পার্টির কাজে তাকে কোথায় যেতে হয় তার ঠিক নেই। সুতরাং ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখাও সম্ভব নয়। পার্টি আগে, প্রেম পরে। চিঠির শেষ কয়েকটা লাইন পাকা চুলের দশাসই জোনাকিরও দাঁড়িকমাসুদ্ধু মনে আছে।

“বিপ্লবীরা জীবনসঙ্গিনী চায় না, সহযোদ্ধা চায়। তোর মধ্যে সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার গুণ আছে। কিন্তু তৈরি হতে সময় লাগবে। তোদের বাড়ির সবাইকে খুব শ্রদ্ধা করি। দিদিমার মত মানুষ হয় না। লেবুকাকা, নবুকাকা, ভুটুজেঠু কমিউনিস্ট না হলেও খুব ভাল মানুষ। তুই ওনাদের চোখের মণি। সেই তুই আমাদের রাস্তায় এলে ওঁরা কি মানতে পারবেন? হয়ত না। একথাটা মনে হলে আবার তোকে এ পথে টানতে মন চায় না। কী জানি কোনটা ঠিক? তবে যদি তুই এ পথে আসিস, জানবি আমি তোর জন্যে আছি। বিপ্লব আসছে। তার জন্যে আমাদের অনেককে মারতে হবে, মরতেও হবে। বিপ্লবের পর যদি বেঁচে থাকি, যদি ঘর বাঁধা হয়, তোকে নিয়েই বাঁধব। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”

এর কিছুদিন পরেই ঝোটন বি এস সি পাশ করে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এমএসসি পড়তে শুরু করে। লাইব্রেরিতে আসা আরো কমে যায়। মাঝেমাঝেই সে উধাও হয়ে যেত পাড়া থেকে। কোথায় যেত, কেন যেত সেকথা বাবা-মাকেও বলে যেত না। এ নিয়ে ওর বাবা অনেক চ্যাঁচামেচি করেও কিছু করে উঠতে পারেনি। তবে জোনাকি জানতে পারত সবই। কারণ যাওয়ার আগে পরে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও কোথাও দেখা করে যেত, হাতে দিয়ে যেত একটা চিঠি। তাতেই লেখা থাকত তার সর্বশেষ অন্তর্ধান রহস্য আর প্রেম সম্ভাষণ। জোনাকি তখন জানে ঝোটন সি পি আই (এম-এল) কর্মী। ভাবত শুধু সে-ই জানে।

জোনাকির দাদা শুভময় তখন স্কুলমাস্টার, কলুটোলা স্ট্রিটের মেসে থাকে, সপ্তাহান্তে মামাবাড়ি আসে। মাস্টারির চেয়েও মন দিয়ে রাজনীতি করছে। কলেজজীবন থেকেই সে সাড়া জাগানো ছাত্রনেতা। ৬৪ সালে পার্টি ভাগ হওয়ার সময়ে সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সবার সঙ্গ ছেড়ে সি পি আইতে থেকে গিয়েছে। এক শনিবার বিকেলে সে বাড়ি ঢুকল গম্ভীর মুখে।

দিদিমার বড় আদরের নাতি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে যখন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য মেসে থাকতে শুরু করে, মামাদের চেয়েও বেশি অভিমান করেছিলেন দিদিমা। তখনো মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে তিনি শনিবার বিকেলে একটু ভালমন্দ জলখাবার করতে চেষ্টা করেন “খোকা” আসবে বলে। সেই খোকা সেদিন বাড়িতে ঢুকেই পুলিশি স্বরে জানতে চাইল “জোনাকি কোথায়?”

বৃদ্ধা করুণাময়ী এই স্বর শেষ শুনেছিলেন প্রয়াত স্বামীর গলায়। তিনি গত হয়েছেন বছর তিরিশেক। হতবুদ্ধি হয়ে করুণাময়ী বলেন “আসে নাই এখনো কলেজ থিকা। আইস্যা পড়ব। সময় হয় নাই। লুচিটা কি এখন ভাজুম নাকি মনা আইলে?”

“লুচি টুচি পরে হবে। আপনি ঘরে আসুন। কথা আছে।”

এরপর করুণাময়ীকে শুভময় বোঝায় যে ঝোটন হল নকশাল। সেই নকশাল যারা শিক্ষক অধ্যাপকদের নামে হুলিয়া জারী করেছে, কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা কেটেছে, যাদের রাজনীতি হল খতম করার রাজনীতি। এই ছেলের সাথে জোনাকিকে মিশতে দেওয়া মানে ওর সর্বনাশ করা। এতসব বুঝিয়ে শুভময় শেষে বলে “আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, আপনি কী করে এটা অ্যালাউ করছেন? আপনি তো আর পাঁচজনের মত নন, দিদিমা! আমি এ বাড়িতে বড় হয়েছি। আমি তো জানি আপনি রোজ কাগজ পড়েন, রেডিওতে খবর শোনেন। আপনি বুঝতে পারছেন না জোনাকি কত বড় ফাঁদে পা দিচ্ছে?”

করুণাময়ী সবটা চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন “তুমি ঝোটনরে চেনো? চেনো না। এই পাড়ায় একখান লোক নাই যার ও কোন উবগার করে নাই। কি তাজা পোলাডা… আর অর থিকা মনার কোন ক্ষতি হইব না।”

“ক্ষতি হবে না? কী করে জানলেন?”

“তুমি বাপ হও, তুমিও বুঝবা। তুমি এবাড়ি আইছো দশ বচ্ছর বয়সে। তোমার বোনের তখন ছয় মাস বয়স। আমি অর দিদিমা নই, মা। ও কারে ভালবাসে, কে অরে ভালবাসে হেইডা আমি অন্ধ হয়া গ্যালেও বুইঝ্যা ফ্যালামু। আমারে শিখায়ো না।”

শুভময় ভেবে পায় না এরপর কী বলা উচিৎ। ভালবাসে! ঝোটন বলে ছেলেটা জোনাকিকে ভালবাসে! উত্তর কলকাতার নকশালদের কুখ্যাত নেতা অনুপম মিত্র তার বোনের প্রেমিক! মাথার উপর ছাদ ভেঙে পড়ল না কেন? এ যে কত বড় বিপদ, শুভময়ের কত বড় অপমান তা দিদিমাকে কী করে বোঝায় সে? দিদিমা জানে ওরা কতজনকে ইতিমধ্যেই মেরেছে? আরো কতজনকে মেরে ফেলতে চায়? এসব ভাবতে ভাবতেই দিদিমা আরো বলেন “আর খতম টতম কি কইতাছিলা? অরা মারতাছে ঠিকই কিন্তু অরাও যে মরতাছে হেইডা তো কইলা না?”

“খুনোখুনির রাজনীতিতে তো এটাই হয়, দিদিমা।”

“খুনোখুনি ভাল না ঠিকই। আমি তো ঝোটনরে কই। ও আমার মুখে মুখে কথা কয় না। কিন্তু তুমি আমারে কও তো, তোমরাও তো কমুনিষ্ট। তোমাগো বইপত্তরে ল্যাখা নাই যে দরকারে রক্তপাত করত অইব? এই পোলাগুলান তো ঐসবই পড়ছে। তোমরাই তো পড়তে শিখাইছ। শেখাও নাই?”

“হ্যাঁ রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের কথা আছে বটে। কিন্তু দিদিমা আমাদের পার্টি কিন্তু অনেকদিন আগেই বলেছে এদেশে তার দরকার নেই। যে যে কারণে পার্টি ভেঙে সি পি এম হল তার মধ্যে এটা একটা। ঝোটনদের দল তো আবার আরো চরমপন্থী।”

“সে তো মনীষীদের কথা যে যেমন বুঝে। তোমরা এক বুঝছো, ঝোটনরা আর এক বুঝছে। কে ঠিক হেইডা ঠিক করনের আমি কে? ঠিক করব ইতিহাস।”

“তার মানে? এই যে ওরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে, মাস্টারমশাইদের খুন করছে এসব ঠিক?”

“না। এগুলা নিশ্চয় ভুল। কিন্তু পালটা মাইরা অরা যে ভুল করতাছে হেইডা বোঝান যাইব না। আর খিদা প্যাটে আমার বাড়ি আইলে আমি যদি তাড়ায়ে দি, তাইলেও বোঝান যাইব না।”

শুভময় ভীষণ রেগে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, করুণাময়ী হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন “আমি বাইচ্যা থাকতে তোমার বোনেরে ঘর থিকা কেউ তুইলা নিয়া যাইতে পারব না। তোমার বিশ্বাস না থাকে বোনেরে নিয়া যাও, আমি কিছু কমু না।”

বাপ-মা মরা দুই ভাইবোনকে যিনি মানুষ করেছেন সেই দিদিমাকে এরপর আর কিছু বলা যায় না। সত্যিই তো। বরানগরে নকশালদের যতই বাড়বাড়ন্ত হোক, করুণাময়ীর ছায়ার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পৃথিবীর কোথাও নেই। জোনাকির জন্যে তো নেইই, শুভময়ের জন্যেও নেই — একথা শুভময় জানত। ভুলে গিয়েছিল। আসলে বরানগরের এক সি পি এম বন্ধু ওকে আওয়াজ দিয়েছিল “তুই শালা সংশোধনবাদী সি পি আই আর তোর বোন একেবারে নকশাল! এটা কিরকম হল, শুভ?” ও যে কিছুই জানে না এটা সে প্রথমে বিশ্বাসই করেনি। তারপরে খুলে বলল যে সি পি এমের সম্ভাবনাময় ছাত্রনেতা, যে সি পি আই (এম-এল) হয়ে যাওয়ায় অনেক নেতা দুঃখ করেছেন, তার সঙ্গে জোনাকিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। শুভময়ের মামাবাড়িতেও তার আনাগোনা আছে বলে খবর। শুনে আর মাথার ঠিক ছিল না।

সত্যি কথা বলতে এই নিয়ে জোনাকির বড়মামা, মানে ঝোটনের ভুটুজেঠু, কিছুদিন আগেই মায়ের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ঝোটন যে আর আগের ঝোটন নেই, তার যে লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিতে ইদানীং মন বেশি, সেকথা বলেছিলেন। কিন্তু ও বাড়িতে করুণাময়ীর সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তাই সব যেমন চলার তেমনই চলতে থাকে, এসব আলোচনা জোনাকির কানে পৌঁছায় না।

পরিস্থিতি তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। শুভময়ের সাথে করুণাময়ীর এই কথোপকথনের কদিন পরে ঝোটন বলে কয়েই বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এক সন্ধ্যাবেলা। যাওয়ার পথে করুণাময়ীকে প্রণাম করতে আসে। পায়ের ধুলো নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে “রাতবিরেতে জ্বালাতে আসব কিন্তু, দিদিমা। বাড়ি গেলে বিপদ। আমার মা আপনার মত সাহসী নয় তো।”

করুণাময়ী ওর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা কামড় দিয়ে, মাথায় থুতু ছিটিয়ে বলেন “আসবা, বাবা। একশো বার আসবা। সাবধানে থাইকো। মানুষের ভাল কইরো।”

জোনাকি জল ভরা চোখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে ঝোটন বলে “আসব রে। মন খারাপ করিস না। চলি।” জোনাকির দিদিমা বলেন “যাওন নাই, আসো গিয়া।” কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে নিকষ কালো চেহারার ঝোটন অন্ধকারে মিশে যায়।

সে কথা রেখেছিল। জোনাকিদের বাড়ির পিছনে বেশ বড় একটা বাগান। ওর ছোটমামার সাধের বাগান। তারপরই খেলার মাঠ। বল উড়ে এসে বাগানের বারোটা বাজাবে বলে আগের শীতেই উঁচু পাঁচিল দেওয়া হয়েছে। সেই পাঁচিল টপকে প্রায় মাঝরাতে হঠাৎ কোন কোন দিন এসে পড়ত ঝোটন। জোনাকি ভাবত ধুপ করে পড়ার শব্দটা শুধু ওর কানেই গেছে। কিন্তু ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়েই দেখত ততক্ষণে দিদিমা বাগানের দরজায় পৌঁছে গেছে। একটু রাগই হত তখন। আহা! যেন ঝোটন তার কাছে নয়, ঐ বাহাত্তুরে বুড়ির অভিসারেই আসে।

ইশারায় ওকে জোনাকির ঘরে বসাতে বলে করুণাময়ী চলে যেতেন রান্নাঘরে। কে জানে কী করে নিঃশব্দে, তাঁর ঘুমন্ত ছেলে, বউদের টেরটিও না পেতে দিয়ে রেঁধে ফেলতেন এক থালা ভাত আর আলু কি কুমড়ো সেদ্ধ। ঘরের মাটিতে আসন পেতে দিয়ে থালার একপাশে দিতেন দুটো কাঁচালঙ্কা। ঝোটন যখন ক্ষুধার্ত নেড়ি কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়ত থালাটার উপর, তখন মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন “খা, মণি। আর তো কিছু নাই। খিদা দিয়া খা।” কখনো সখনো ক্ষিদে দিয়ে খাওয়ার জন্য তার দু একজন কমরেডকেও সঙ্গে আনত ঝোটন। খাওয়া শেষ করে একটু জিরিয়ে নিয়ে, রাত থাকতেই পাঁচিল টপকে মিশে যেত অন্ধকারে।

এক মাস, দু মাস অন্তর কয়েক মিনিটের এইটুকু দেখা সম্বল করে আর সেই চিঠিগুলো উল্টে পাল্টে বারবার পড়ে অনেকদিন বেঁচে ছিল জোনাকির প্রেম। তারপর একদিন রাত দশটা নাগাদ সদর দরজায় কড়া নাড়ল পুলিশ। ও পাড়ায় পুলিশ আসা তখন সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে। পুলিশ আসবে, কোন ছেলের খোঁজে তার বাড়িতে চোটপাট করবে, তারপর খুঁজে না পেয়ে তার বাবা-মাকে গালিগালাজ করে, কখনো বা চড় থাপ্পড় মেরে চলে যাবে — এই ছিল রুটিন। কিন্তু সেদিন অব্দি জোনাকিদের বাড়িতে কোনদিন পুলিশ আসেনি। ও বাড়িতে কোন জোয়ান ছেলে নেই, জোনাকির মামারা কেউ কখনো কোন পার্টি করেননি। পুলিশ আসবেই বা কেন? তাই দরজা খুলে পুলিশ দেখে মেজমামা থ। দারোগা জানালেন সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। তাছাড়া জিজ্ঞাসাবাদেরও ব্যাপার আছে। এই বাড়িতে নকশালদের যাতায়াত আছে বলে অভিযোগ।

সেই প্রথম জোনাকি ভয় পেয়েছিল। ঝোটনকে সে চেনে পাড়ার ছেলে হিসাবে কিন্তু বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আর দ্যাখেনি, কিছু জানেও না — এইটুকু মিথ্যে বলতেই তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মেজমামা লালবাজারে ক্লার্কের চাকরি করেন বলেই যে পুলিশ তাকে সহজে বিশ্বাস করে নিল এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আরো বেশি ভয় হয়েছিল তল্লাশি চালিয়ে কী পাওয়া যাবে তা ভেবে। পড়ার টেবিলের ড্রয়ারেই পরপর সাজিয়ে রাখা ছিল ঝোটনের চিঠিগুলো। আর বইয়ের তাকে ওর উপহার দেওয়া বেশকিছু বই — গোর্কি, মায়াকভস্কি, তলস্তয়, মাও সে তুং, চে। কিন্তু তল্লাসীর সময় জোনাকি অবাক হয়ে দেখল চিঠিগুলো হাওয়া আর তাক জুড়ে রয়েছে গীতা, কথামৃত, স্বামি শিষ্য সংবাদ, স্বামীজিকে যেমন দেখিয়াছি। এই বইগুলো জোনাকিরই বটে কিন্তু বছর তিনেক ধরে ওগুলোতে হাত পড়েনি, আগামীদিনেও পড়বে না ভেবে সে চালান করে দিয়েছিল সিঁড়ির নীচে পুরনো কাগজের জায়গায়। কী করে সেখান থেকে কয়েক মিনিটের নোটিশে বইয়ের তাকে উঠে এল সে খবর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ জানেন না, যাঁর জানার কেবল তিনিই জানতেন। পুলিশ সে যাত্রায় “মেয়ে কার সঙ্গে মিশছে না মিশছে একটু খেয়াল রাখবেন তো। দিনকাল কেমন জানেন না?” বলে মৃদু ধমক দিয়ে চলে গিয়েছিল।

এরপর ঘন্টা খানেক করুণাময়ীর তিন ছেলে জীবনে প্রথম এবং শেষবার তাঁর উপরে যারপরনাই চেঁচামেচি করেন। “তোমার প্রশ্রয়েই এরকম হয়েছে” ইত্যাদি। পুত্রবধূদের মধ্যে একমাত্র বড়টিই একটু বলিয়ে কইয়ে। সে শাশুড়ি এবং ভাগ্নীর পক্ষ নিয়ে শুনিয়ে দেয় “তোমরা তিন ভাই এক কাজ করো। চাকরি বাকরি ছেড়ে বাড়ি পাহারা দাও। ঐ তো পুলিশ। তাজা ছেলে দেখলেই নকশাল, সি পি এম আরো যা যা ইচ্ছে বলে ধরে নিয়ে যায়, ছেলেকে না পেলে বাপের গায়ে হাত তোলে। তারা কী বলে গেছে তাই নিয়ে বাড়ি মাথায় করছ। আমরা সারাদিন বাড়িতে থাকি। ঝোটন এখনো যদি আসা যাওয়া করত আমরা দেখতে পেতাম না? বলাই তো হল আগে আসত। তখন তো তোমরাও দেখেছ। কিছু তো বলোনি? আদিখ্যেতা! পুলিশ যেন ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির।”

জোনাকির বড়মামা বিড়বিড় করে বলতে থাকেন “জানি জানি। ঝোটন কি আর খারাপ ছেলে? সোনার টুকরো ছেলে। কিন্তু… সময়। আর সঙ্গ। সে জন্যেই আমাদের মেয়েটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ছেলেটার বাপ-মায়ের কি অবস্থা! আহা রে!”

এই নিয়ে আর বেশিদিন দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। বিপ্লব যে সফল হবে না সেটা বোঝা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। চতুর্দিক থেকে আসছিল নকশালদের ধরা পড়ার আর খুন হওয়ার খবর। একটা করে খবর শোনা যেত আর মিত্র বাড়ির দুই বুড়ো বুড়ির মত চক্রবর্তী বাড়ির এক বুড়িও ঠাকুরের ছবির সামনে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। জোনাকির অকারণ প্রত্যয় ছিল — ঝোটনদার কিচ্ছু হবে না। তাই তার উদ্বেগ হত না এসবে। তারপর এক রাতে গোটা বরানগর চলে গেল মনুষ্যেতর প্রাণীদের দখলে। সব দরজা জানালা বন্ধ করেও এড়ানো গেল না তাদের উল্লাসের শব্দ, থাবার নীচে পড়া মানুষের আর্তনাদ। জোনাকি জানত ঝোটন এলাকায় নেই কিন্তু তার বাবা-মাকে ওরা ছাড়বে না। তাই সে বারবার ছুটে যেতে চাইছিল ওঁদের কাছে। কি আসুরিক শক্তি তখন ঐ রোগাপটকা  মেয়ের! তিন মামা, তিন মামী আর দিদিমা মিলে আটকে রাখছিল তাকে আর মুখ চেপে ধরে আটকাচ্ছিল চিৎকার। ইতররা চিৎকারে রক্তের গন্ধ পায়। চাইলে দেয়াল ফুঁড়ে ঢুকে পড়তে পারে ঘরে।

পরদিন বেলার দিকে জোনাকির মেজমামা আর ছোটমামা খোঁজ নিতে যান ঝোটনদের বাড়িতে। তেমন কিছু হয়নি ওঁদের। ওর বাবার একটা হাত আর একটা পা ভেঙে দিয়ে গেছে বীরের দল, মায়ের একগাছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আর কী নিয়ে গেছে সেকথা বলার অবস্থায় উনি নেই তখন। জোনাকির মামারা যখন ওঁদের হাসপাতালে নিয়ে যায় তখনো রাস্তাতেই পড়েছিল বহু মৃতদেহ — গোটা, কাটা, চিহ্নিত, অচিহ্নিত।

দিন দশেক পরেই থানায় ডাক পড়ে ঝোটনের বাবার। পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছিল কোথায় যেন, এবং ধরা দিতে বলেছিল। কথা শোনেনি, দৌড়ে পালাতে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে গুলি চালাতে হয়। ভদ্রলোককে ডাকা হয়েছিল শনাক্ত করে দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্যে। উনি বাড়ি ফেরার পথে চক্রবর্তীদের বাড়ি আসেন এবং জোনাকির মাথায় হাত রেখে বলে যান “আমি বডি দেখতে গেলাম না রে, মা। ওরা যা পারে করুক। আমি জানি ওটা আমার ছেলের বডি না। আমার ছেলে জীবনে কখনো পালায়নি। কত মার মেরেছি। কখনো পালায়নি। সে পিঠে গুলি খেয়ে মরতে পারে না।”

সারা বিকেল একা একা চেয়ারে বসে সেই কথাগুলো মনে পড়ে জোনাকির। তার কাছের মানুষরা কেউ পালাতে শিখল না।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

Donate