নাম তার ছিল: ১২

পূর্বকথা: গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল রবীন। ডাক্তার দেখাতে ট্রেনে বাসে কলকাতায় যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। অশক্ত অবস্থায় রোড কন্ট্র্যাক্টরের গাড়িতে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার ব্যবস্থা মেনে নিতেই হল।

নির্জন বাড়িটায় সারাদিন একলা ভূতের মত বসে থাকা জোনাকির খবর নিতে আজকাল একজনই আসে — নবারুণ। এলে খুব যে কথা হয় তা নয়। দুজনে মুখোমুখি বসে থাকে, একটা দুটো কথা বলে। নবারুণ জিজ্ঞেস করে জোনাকির শরীর ঠিক আছে কিনা, জোনাকি জিজ্ঞেস করে নবারুণের সুগার এখন নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, ওর স্ত্রী সুদেষ্ণার প্রেশার কমল কিনা, ছেলে-ছেলের বউয়ের কী খবর, নাতি কত বড় হল।

একটা কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে অবসর নিয়েছিল নবারুণ, বছর দশেক আগে। ততদিনে ছেলে চাকরি পেয়ে গেছে, সবুজগ্রাম থেকে কলকাতা যাতায়াত করা কলেজজীবন থেকেই তার পোষায় না বলে সে ভাড়াবাড়িতে থাকত। ফিরে আসার প্রশ্নই নেই। সুদেষ্ণাও দু তিনটে জায়গার পার্ট টাইম পড়ানো সেরে প্রায়ই ছেলের কাছে থেকে যেত। মাঝে মধ্যে আসত শুধু নবারুণ সবুজগ্রামের বাড়িতে থাকত বলে। না থেকে উপায়ই বা কী? হাওড়া থেকে কালাদীঘি যেতে হলে প্রথমে ট্রেন, তারপর বাস, শেষে রিকশা — প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাগে; সবুজগ্রাম থেকে মোটে সোয়া এক ঘন্টা। অবসরের পরে আর ছেলে, বউ ছাড়বে কেন? নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে তাই নবারুণ কলকাতাবাসী হয়ে গেছে বহুদিন। এখন মাসে দু মাসে একবার সবুজগ্রামে আসা, যদ্দিন না বাড়িটা বেচে দেওয়া হচ্ছে।

সুদেষ্ণা আর ছেলে খুবই চাইছে বেচে দেওয়া হোক। অন্য দাদা-বউদিরা জীবিত নেই, তাদের ছেলেমেয়েরাও রাজি। কিন্তু নবারুণই কিছুতে মনস্থির করে উঠতে পারছে না। প্রতিবার ছেলে, বউয়ের মুখ ঝামটা শুনে সংকল্প নিয়ে আসে প্রমোটার বন্ধু অতীনের বাড়ি গিয়ে কথাবার্তা বলে আসবে, কিন্তু যে মুহূর্তে রবীনের বাড়িটার দিকে চোখ পড়ে, অমনি ইচ্ছেটা উবে যায়। নিজেদের বাড়িটা বেচে দিলে আর তো কোন ছুতোয় সবুজগ্রামে আসা হবে না, জোনাকির খোঁজখবর নেওয়া হবে না। বন্ধুটা বলতে গেলে অকালেই মরে গেল। তার বউকে কুশল জিজ্ঞাসা করার মতও তো বিশেষ কেউ নেই। সেটাও তো আর করা হবে না বাড়িটা না থাকলে। এই কথাটা সুদেষ্ণাকে বা নিজের ছেলেকে কিছুতেই বলে উঠতে পারে না নবারুণ। অত দিন পরে পরে একবার গিয়ে জোনাকির শরীর কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে তার যে বিশেষ কোন উপকার হয় তা অবশ্য নয়। আসলে উপকার হয় নবারুণের নিজের।

সে ২০০৪ এর পরে আর পার্টি সদস্যপদ রিনিউ করায়নি। রবীনও ততদিনে বুঝতে শুরু করেছে যে পার্টিতে সে খুব একটা বাঞ্ছিত নয়। বুঝে নিজের ব্যস্ততায় নিজেই রাশ টানছে। তখন আবার কথাবার্তা, যাতায়াত শুরু হয়। শৈশব, কৈশোর, যৌবনের সেই উষ্ণতা হয়ত ফিরে আসত রবীন হঠাৎ চলে না গেলে। কলকাতায় ফ্ল্যাট কেনার আবদার তখন থেকেই ছিল, কিন্তু নবারুণ ঠিক করেই ফেলেছিল, ফ্ল্যাট কিনে দিয়ে ছেলেকে, তেমন হলে সুদেষ্ণাকেও, বলবে ওখানে থাকতে। নিজে এই সবুজগ্রামের বাড়িতেই জাঁকিয়ে বসবে। রান্নার লোকটোক সবই তো আছে। মাঝের অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেছে রবীনের সাথে আড়ি করে। সেগুলো সুদে আসলে আদায় করতে হবে তো। সে সময়কার বন্ধুরা অনেকেই আর নেই ততদিনে। কিন্তু রবীন থাকলে আর কাকে লাগে?

রবীন থাকল না। নবারুণের সব প্ল্যান ভেস্তে দিয়ে সে চলে গেল হঠাৎ। হঠাৎ? না, এমনিতে কেউ ওটাকে হঠাৎ বলবে না। কিন্তু তিনটে মাস কি যথেষ্ট প্রাণের বন্ধুর মৃত্যুর জন্যে তৈরি হওয়ার পক্ষে?

সে যা-ই হোক, রবীন চলে যাওয়ার পরে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়েছিল। মাঝের এতগুলো বছর আলাদা হয়ে জীবন কাটাতে হল বলে। তখন মনে হয়নি, কিন্তু যত দিন গেছে ততই নবারুণ বুঝেছে, যে ঘটনাটায় সে রবীনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল, তাতে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল রবীনই। সেকথা নিজের কাছে স্বীকার করলেও আর কারো কাছে স্বীকার করে উঠতে পারেনি। আসলে ইগো বড় বিষম বস্তু। রবীন যখন মৃত্যুশয্যায়, দিনের অনেকটা সময় তার সামনে চেয়ারে বসে আড্ডা মারতে মারতে কাটায় নবারুণ, তখনো ভেবেছে একদিন গল্প করতে করতে বলবে “রবীন, তুইই ঠিক ছিলিস। আমারই ভুল।” কিন্তু বলে উঠতে পারেনি শেষ অব্দি।

তা জোনাকির সাথে দুটো একটা কথা বললে মনে হয় কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হল। “প্রায়শ্চিত্ত! ছ্যাঃ। এসব তুই কী কস, নবা? তুই কমিউনিস্ট, আবার বিজ্ঞানের মাস্টার। এসব কী কইতাছস?”

মনে হয় কানের পাশে সজোরে বলে উঠল রবীন। নবারুণ চমকে ওঠে। ঠিক কথা। প্রায়শ্চিত্ত, পরলোক — এসব গালগল্প। মানুষ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বানিয়েছে। যা রবীনকে বলা হয়নি তা আজ জোনাকিকে বলে কোন লাভ নেই। রবীন শুনতে পাবে না। তাছাড়া নবারুণ কোনদিন বলে উঠতেও পারবে না। যে ইগো বন্ধুর কাছেই বিসর্জন দেওয়া যায় না, তা কি আর বন্ধুর বউয়ের কাছে বিসর্জন দেওয়া যায়?

তবে যতই যুক্তিহীন হোক, ও বাড়িতে পা রাখলে কিন্তু সত্যিই মনে হয় রবীনকে এখনো ছোঁয়া যায়। কয়েকটা বাঁধা কথার পর জোনাকি আর নবারুণ যে চুপ করে থাকে তার কারণ দুজনেই তখন রবীনকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে, রবীনের সাথে হেঁটে আসা পথে আবার হাঁটতে বেরোয়।

ছবির মত মনে আছে নবারুণের। ১৯৮৬। তখন পাড়ায় গোটা পাঁচেক টিভি, কিন্তু রঙীন টিভি একটাই — মিলিটারি সুখেনদের বাড়িতে। আসলে সুখেনের সাথে মিলিটারির কোন সম্পর্ক নেই, তবে ওর বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সবুজগ্রামের দক্ষিণপাড়ায় জমিটা উনিই কিনেছিলেন, বাড়ি করে থাকাটা আর হয়নি। একাত্তরের যুদ্ধে মারা যান। সুখেনের মা বাড়িটা করিয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখানে থাকতে শুরু করেন। সুখেনের তখন বছর দশেক বয়স। সেই থেকে ও মিলিটারি সুখেন হয়ে গেছে। লেখাপড়ায় ভাল, একবারে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি পেয়েছিল। নেশাভাং করত না, অফিস আর বাড়ি বাদ দিলে বাকি সময়টা রবীন, নবারুণদের যাত্রাক্লাব নটনটীতে পড়ে থাকত। প্রম্পটারের বেশি হওয়ার সাধ্য ওর ছিল না, তবে টাকাপয়সা, উদ্যোগ মিলিয়ে ও একজন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজক ছিল। স্বভাবতই বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলাগুলো ওর বাড়িতেই দেখা হচ্ছিল। মারাদোনা যেদিন সাতজনকে কাটিয়ে গোল দিল, সেদিনই সুখেনের মা খেলার ফাঁকে বললেন ছেলের বিয়ে ঠিক করেছেন। বিয়েটা হয়েছিল শীতের শেষ দিকে। নটনটীর সবাই মিলে বরযাত্রী যাওয়া হয়েছিল সেই সাঁইথিয়া।

সুখেনের বউকে দেখে শুনে নবারুণ, রবীনের বেশ ভালই লেগেছিল। শুধু চেহারার দিক থেকে নয়, যেটুকু কথাবার্তা হয়েছিল তাতে বোঝা গিয়েছিল মেয়েটা রুচিশীল, লেখাপড়া জানা। মানে নাম কা ওয়াস্তে এম এ পাশ নয়। কিন্তু মাস খানেক যেতে না যেতেই গণ্ডগোল লেগে গেল। অত আড্ডা দিত অথচ সুখেন কিন্তু কিছু বলেনি নবারুণদের। প্রথম শোনা গেল মহিলা মহল থেকে।

সুদেষ্ণা একদিন জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁ গো, সুখেনের বউকে নিয়ে নাকি খুব অশান্তি ওদের বাড়িতে?” নবারুণ আকাশ থেকে পড়েছিল। জানা গেল পাড়ায় সবাই বলাবলি করছে বউয়ের মাথায় নাকি ছিট আছে। অভিযোগটা তুলেছে সুখেনের মা আর বোন। বউ নাকি বরকে পাশে শুতে দেয় না, শাশুড়ি কিছু বললে ভীষণ রেগে যায়, একদিন গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েছিল। আর সন্দেহ করে ননদ ওর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেবে।

নবারুণ খুবই অবাক হয়েছিল যে এত কাণ্ড চলছে বাড়িতে অথচ ক্লাবে সুখেন কিচ্ছু বলেনি। এমনিতে তো মায়ের বাতের ব্যথা থেকে বোনের বিয়ের পরিকল্পনা পর্যন্ত কিছুই বাদ দেয় না। বিশেষ করে রবীন আর নবারুণ নাকি সুখেনের “ফ্রেন্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড”।

সেদিন সন্ধ্যায় ক্লাবে চেপে ধরতেই ছেলে জবাব দিয়েছিল “কী বলব বলো তো? বলার মত কিছু থাকলে তো বলব। কেন এরকম আচরণ করছে কিছুই তো বুঝছি না।”

“ওকে জিজ্ঞেস করেছিস?” রবীন জানতে চেয়েছিল।

“হ্যাঁ… মানে, না। কী আর জিজ্ঞেস করব? যা উন্মাদের মত আচরণ করছে, কথা বলার কোন উপায় আছে?”

“উন্মাদের মত মানে? কথা বলতে গেলে কামড়াতে আসছে?” নবারুণ প্রশ্ন করেছিল।

“না, ঠিক তা নয়…”

“যদি তা না হয় তাহলে পরিষ্কার কথা বল। সমস্যাটাকে বাড়তে দিচ্ছিস কেন? তোর বউ, তোকেই তো মেটাতে হবে।”

সুখেনের বক্তব্য ছিল ঝামেলাটা মূলত তার মা আর বোনের সঙ্গে, তার সঙ্গে নয়। তাই সে ব্যাপারটার মধ্যে ঢুকছে না।

“তোর মা, বোন পাড়ায় বলে বেড়াচ্ছে তোর বউ পাগল, আর তোর কোন বক্তব্য নেই? মানেটা কী?” রবীন খুব রেগে গিয়েছিল।

“দেখে শুনে তো পাগল বলে আমারও মনে হচ্ছে।” এই ছিল সুখেনের আত্মপক্ষ সমর্থন।

“সেটা ওর বাপের বাড়িতে জানিয়েছিস? সত্যিই যদি কোন অস্বাভাবিকতা থেকে থাকে সেটা তো একটা অসুখ। তার চিকিৎসা করাতে হবে। পাড়ার লোককে বলে বেড়িয়ে কী হবে?”

রবীনের এই কথাটা নবারুণের ঠিক পছন্দ হয়নি। সুখেন বলেছিল মা-বাপ মরা মেয়েটার দাদাদের নাকি বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা বলেছে তাদের বোন মোটেই পাগল নয়। সঙ্গে যোগ করেছিল “আসলে লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছে তো, এখন স্বীকার করবে কেন?” এখানটায় অবশ্য নবারুণের একটা খটকা ছিল, কারণ বিয়ের সময়ে মেয়েটাকে একেবারেই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু কথা হচ্ছে সুখেনই তো চেনা। মেয়েটা অচেনা, তার পরিবারও অচেনা। সুতরাং বিশ্বাস করতে হলে সুখেনকেই করা উচিৎ। এটাই তো সহজ সরল কথা। ক্লাব থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে রবীনকে একথা বলতেই সে বলেছিল “এটা কোন যুক্তি নয়। কোন ব্যাপারেই এক পক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত করা উচিৎ না। আমি যে পক্ষকে চিনি সে-ই ঠিক, এটা তো একটা বিশ্বাস। যুক্তি আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়।”

কিছুদিনের মধ্যেই কানাঘুষো খবর পাওয়া গেল সুখেনের বউ নাকি বাপের বাড়ি চলে গেছে। ওকে আবার জিজ্ঞেস করতে বেশ বুক ফুলিয়ে বলল “কী করব? কিছুতেই তেনার মন ওঠে না। আমার বাড়ির নাকি সবাই খারাপ। তো আমি বললাম তাহলে চলে যাও যেখান থেকে এসেছিলে। সেখানে তো সবাই ভাল।”

“ও। তাহলে বউ চলে যায়নি, তাড়িয়ে দিয়েছিস বল,” রবীন বলেছিল।

সুখেন তাতে ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলেও কথাটা নবারুণের মোটে পছন্দ হয়নি। ওদের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছে, বউটা সত্যিই বদ কিনা — সেসব ঠিক করে না জেনে এভাবে মন্তব্য করা উচিৎ না বলেই মনে হয়েছিল। রবীন কিন্তু প্রচণ্ড বকাবকি করেছিল সুখেনকে। রবীনকে অতটা রাগতে ক্লাবের কমবয়সী সদস্যরা আগে কখনো দ্যাখেনি। সুখেন কোন উত্তর দিতে পারেনি, কিন্তু ভুল হয়েছে তাও কিছুতেই স্বীকার করেনি।

বোধহয় তার ঠিক পরের দিন, যখন রোববার সকালের আড্ডা চলছে রবীনের বাড়িতে, সেই সময় এক ভদ্রলোক এসে হাজির হন। মুখটা দেখে চেনা চেনা লাগলেও পরিচয়টা ঠিক মনে করতে পারছিল না নবারুণ। রবীন অবশ্য উনি ঢোকামাত্রই চিনতে পেরেছিল। “আরে, আপনি! আসুন আসুন” বলে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করেছিল।

দেখে মনে হচ্ছিল ভদ্রলোক অনেক দূর থেকে এসেছেন, ভীষণ ক্লান্ত। রবীন বলরামকে ভেতরে পাঠাল খাবার জল আনতে। তারপর জিজ্ঞেস করল “আপনাকে এরকম বিধ্বস্ত লাগছে! সোজা সাঁইথিয়া থেকে আসছেন?”

“না। সাঁইথিয়া থেকে কাল রাতে এসেছি। বড়িহাটায় এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেছি। যে জন্যে এসেছি… আজ সকালে গেলাম বোনের শ্বশুরবাড়ি। ওখান থেকেই আপনার কাছে আসছি… আসলে আর কাউকে তো চিনি না এখানে… আপনার নামটা মনে ছিল। বাড়িটা একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে চলে এলাম আর কি…”

ওঁর গলার স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছিল ভীষণ ভেঙে পড়েছেন। কেন, তা ভাবার চেষ্টা করতেই নবারুণের মনে পড়ে গিয়েছিল লোকটি কে। সুখেনের বড় শালা, মানে ওর বউ অনামিকার বড়দা। মেয়েটার বাবা জীবিত নেই, সুতরাং উনিই ওর অভিভাবক বলা যায়। ওঁর এই অবস্থা!

জল খাওয়া হলে রবীন নবারুণ ছাড়া সবাইকে বিদায় করে আড্ডা ভেঙে দিয়েছিল। তারপর সুখেনের শালার কাছে জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে। উনি যা বললেন সেটা এরকম।

“আমার বোন হপ্তা খানেক আগে হঠাৎ একা গিয়ে হাজির। আমরা জিগেস করলাম ‘জামাই কই?’ তা বলল ওর মন খারাপ করছিল তাই একাই চলে গেছে, জামাই পরে যাবে। তা সে আর যায় না, যায় না; এদিকে বোন নাকি লুকিয়ে কাঁদে। আমার ছেলেমেয়েরা দেখেছে। কিন্তু ওকে জিগেস করলে বলে ‘কিছু হয়নি’। আমার বউ, আমার ভায়ের বউ — সবাই জিগেস করে দেখেছে। কিছুতেই মেয়ে মুখ খোলে না। এমনিতেও ও একটু চাপা স্বভাবের। তাই আমি ভাবলাম নিজে গিয়ে খবর নিয়ে আসি কী হল। তাই গেছিলাম ওদের বাড়ি। কিন্তু… এমন অপমান করল, দাদা…”

বলতে বলতে অত বড় একটা লোক — রবীন, নবারুণের চেয়ে একটু বড়ই হবেন — কেঁদে ফেললেন। ফেলারই কথা অবশ্য, কারণ সুখেনরা বলে দিয়েছিল মেয়ে পাগল, ওঁরা সেটা লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। সেজন্যে ওঁদের পুলিশে দেওয়া উচিৎ। ওরা নেহাত ভদ্রলোক বলে সেটা করছে না, তবে ঐ মেয়েকে ওরা আর ফিরিয়ে নেবে না। “আমাকে চোর, চিটিংবাজ — আরো নানা কথা বললেন সুখেনের মা…”

“সুখেন নিজে কী বলল?” জোনাকি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল, এইবার সে ফোঁস করে ওঠে।

“সে তো বিশেষ কিছুই বলল না। যা বলার তো ওর বোন আর মা-ই বললেন। ও দিব্যি পায়ের উপর পা তুলে টিভি দেখছিল। আমিই সব শুনে জিগেস করলাম ‘তোমারও কি এই মত?’ তাতে বলল ‘মা আর ছেলের মত আলাদা হবে ভাবলেন কী করে? আমাদের বাড়ির ওরকম শিক্ষা দীক্ষা না।’”

“বাঃ! চমৎকার। এবার তোমরা ওকে কিছু বলো? এত বড় অন্যায় করল, আর তোমরা চুপটি করে থাকবে?”

জোনাকির এত উত্তেজনা নবারুণের একেবারেই পছন্দ হয়নি। ভদ্রলোক এসেছিলেন রবীনের কাছে, কিছুটা ওর পদমর্যাদা, কিছুটা পাড়ার মধ্যে ওর প্রভাবের কারণে। তার মধ্যে জোনাকির ঢুকে পড়ার দরকারটা কী? আরো বিরক্তিকর লেগেছিল রবীনের প্রতিক্রিয়া। বউও বলল আর ও-ও অমনি ক্ষেপে উঠল। “চল তো, নবা। একবার মুখোমুখি গিয়ে কথা বলে আসি। ওদের বক্তব্যটা কী শুনে আসি।”

“আমাকে দয়া করে আর ও বাড়ি যেতে বলবেন না,” সুখেনের শালা হাত জোড় করে বললেন।

“কোন প্রশ্নই ওঠে না।” রবীন অভয় দেয়। “তবে আপনি এই দুপুর রোদে বেরোবেন না। স্নানটান করে, দুটো ডাল ভাত খেয়ে যাবেন।”

“না না, আমার তো বন্ধুর বাড়িতে ব্যবস্থা আছে।”

“তা বললে হবে না, দাদা। আমাদের পাড়া থেকে কুটুম মানুষ এইভাবে চলে যেতে আমরা দেব না। জোনাকি, ওনাকে ছেড়ো না। আমি ঘুরে আসছি।”

সেই দুপুরে সুখেনের বাড়ি গিয়ে লাভ কিছু হয়নি। ওর, ওর মায়ের আর বোনের কথা বলার ধরণ দেখে নবারুণ তাজ্জব বনে গিয়েছিল। ঘুরে ফিরে সেই এক কথা — বউ বদ্ধ পাগল, অতএব তাকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। পাগল হওয়ার প্রমাণ কী? না উনুনে রান্না বসিয়ে ভুলে যায়, চান করতে ঢুকে পড়ে জামাকাপড় না নিয়েই, তারপর শাশুড়ি বা ননদকে বলে জামাকাপড় হাতে দিতে। এগুলোকে যখন রবীন মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ বলে মানতে চাইল না, তখন সুখেনের বোন বলল “আপনারা আমার বাবার মত, আপনাদের মুখ ফুটে আর কী বলব? বৌদি দাদাকে এক বিছানায় শুতে পর্যন্ত দেয় না। পাগল না হলে কেউ এটা করে?”

নবারুণ গোটা সময়টা দর্শক হয়েই ছিল। একথা শোনার পর রবীনকে বলেছিল “এটা কিন্তু সত্যিই অস্বাভাবিক।”

“নিশ্চয়। কিন্তু বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াটা তো তার সমাধান নয়। ওর সাথে বসতে হবে। জানতে হবে এরকম কেন করে। হতে পারে এটা মানসিক সমস্যা। বা কোন শারীরিক সমস্যাও থেকে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ওর বাপের বাড়িতে খবর দিয়ে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল। মেয়েটাকে ওরা তাড়িয়েছে কী বলে?”

“আমি তোমাকে আগেও বলেছি, রবীনদা। আমরা তাড়াইনি, ও নিজেই চলে গেছে,” সুখেন তেরিয়া হয়ে উত্তর দিয়েছিল এবং ধেড়ে লোকেরও পিলে চমকে যাওয়ার মত একটা ধমক খেয়েছিল।

“চোপ। তাড়াইনি। সেই জন্যে ওর দাদার সাথে ঐরকম ব্যবহার করেছো?”

সুখেনের মা বলতে গিয়েছিল যে যারা বোনের মাথার গণ্ডগোল লুকিয়ে বিয়ে দেয়, তাদের কুটুমের খাতির আশা করা উচিৎ নয়। তাতে রবীন আরো জোরে ধমকে দেয়। “তখন থেকে মাথার গণ্ডগোল বলে যাচ্ছেন? আপনি কি ডাক্তার? আপনি কে একটা মানুষকে পাগল তকমা দেয়ার?”

নবারুণ একেবারেই মন থেকে মানতে পারছিল না রবীনের এতটা চরমপন্থী ব্যবহার, কিন্তু ওর বিরোধিতা করার সাহস তখনো ছিল না। রবীন উঠে আসার সময়ে বলেছিল “এখন ভালয় ভালয় মিটিয়ে নিতে বলছি শুনছো না। এরপর যদি এই নিয়ে পুলিশ কাছারি হয় তখন আমার কাছে আসবে না বলে দিলাম।”

সুখেনের শালা অবশ্য তখন মানসিকভাবে ওসব ভাবার মত অবস্থায় ছিলেন না। শুধু বলে গিয়েছিলেন “বাড়ি গিয়ে সবার সাথে কথা বলি। বোন কী বলে দেখি। তারপর যা থাকে কপালে।”

ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নেয় এরপর। রবীন-জোনাকিকে সুখেনদের আশপাশের বাড়ির বেশ কিছু লোক জানায় যে অশান্তিটা বৌভাতের পরদিন থেকেই চলছিল আসলে। নতুন বউয়ের গায়ে হাত তোলাও নাকি বাকি ছিল না। নবারুণ এসব শুনে সুখেনকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলেছিল “তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, নবাদা, সব মিথ্যে কথা। এত বছর এ পাড়ায় আছি। আমরা সেই ধরণের লোক, তুমি বলো?” রবীনকে বলাতে ও শুধু “হুঁ” বলেছিল, বিশ্বাস করেছিল কিনা বোঝা যায়নি। মেয়ে পক্ষ থেকে কোন সাড়াশব্দ না আসায় নবারুণ ভেবেছিল ওরা বোধহয় নিজেদেরই দোষ বুঝে চুপ মেরে গেছে। রবীনেরও বোধহয় পার্টি, প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ততায় এই ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন রাত দেড়টা দুটোর সময়ে এক দল ছেলের ডাকাডাকিতে রবীন আর জোনাকির ঘুম ভেঙে যায়। ওরা পাড়ার ক্লাবের ছেলে, কয়েকজন মিলে রাত পাহারায় ছিল। বছর তিরিশেক আগে পরিত্যক্ত একটা চণ্ডীমণ্ডপের পেছনে গজিয়ে ওঠা ঝোপ থেকে নড়াচড়ার আওয়াজ পেয়ে ভাম বা শেয়াল ভেবে তাড়াতে গিয়ে দুটি মৈথুনরত মানুষকে আবিষ্কার করেছে। একটি সুখেন, অন্যটি তার প্রাণের বন্ধু ভোম্বলের বোন অমৃতা।

দক্ষিণপাড়ায় বাড়ির বউকে তাড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। সুখেনদের উপরে পাড়া প্রতিবেশী তাই এমনিতেই চটেছিল, এরকম বামালসমেত ধরা পড়ায় ছেলেরা আরো ক্ষেপে উঠেছিল। মেরে আধমরা করে দিত হয়ত, কিন্তু ওদের মধ্যে ঠান্ডা মাথার কয়েকজন থাকায় আক্ষরিক অর্থে কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রবীনের কাছে নিয়ে এসেছিল সুখেনকে। বোধহয় পাড়ার মেয়ে বলেই অমৃতাকে ওরা ধমকে ধামকেই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সুখেনকে নিয়ে এসে রবীনকে বলেছিল “ওর বউকে কেন পাগল সাজিয়েছে বুঝলেন তো?” রবীন খুব করে ধমকে “যা, বাড়ি যা। কাল সকালে তোর ব্যবস্থা হবে” বলে তখনকার মত বিদেয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্লাবের ছেলেরা ছাড়বার পাত্র নয়। ওরা দাবী করে সুখেনকে কান ধরে ওঠবোস করতে হবে এবং রবীনের কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে এই ব্যভিচার ও আর করবে না। রবীন হ্যাঁ, না কিছু বলার আগেই ছেলে সুবোধ বালকের মত ঐ কাজটুকু সেরে ফ্যালে।

পরদিন সকালে এই ঘটনা শুনে নবারুণ প্রথমবার রবীনের সাথে ঝগড়া করে।

“এই দল বেঁধে গুন্ডামিটা তুই সমর্থন করলি?”

“মোটেই সমর্থন করিনি। করলে তো ওদের হাতেই ছেড়ে দিতাম। তা তো দিইনি। কিন্তু এত বড় অন্যায় করে এর থেকে কী ভাল ব্যবহার পেত ও?”

“অন্যায় ঠিক বলা যায় কি? ও কি অমৃতাকে রেপ করতে গিয়েছিল?”

“এসব তুই কী বলছিস, নবা? নিজের বউকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য একটা মেয়ের সাথে রাতের অন্ধকারে ফষ্টিনষ্টি করছে। এটা অন্যায় নয়?”

আজ ভাবলে নবারুণের লজ্জা হয় যে সেদিন ওরকম একটা ব্যাপারকে সে সমর্থন করেছিল। তখন কিন্তু মনে হয়েছিল ঠিকই করছে। আসলে সুখেনের প্রতি অন্ধ স্নেহ, তার উপর অমৃতাকেও ছোট থেকে দেখছে। তাও হয়ত রবীনের প্রতি মনটা অতটা বিরূপ হত না, যদি না জোনাকি ব্যাপারটার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ত।

প্রথম থেকেই এই ঘটনায় জোনাকি খুব সুখেনের বউয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলছিল। অমৃতার সঙ্গে সুখেনের সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পরে তো আরো বেশি করে। নবারুণ পরে শুনেছে, সেদিন রাতে যখন সুখেনকে ওরা ধরে এনেছিল, রবীন ধীর স্থির থাকলেও জোনাকি নাকি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে কথা বলেছিল। এক সময় রবীন বিরক্ত হয়ে ধমকে ওকে ভিতরে পাঠিয়ে দেয়।

পরদিন সকালে এই ব্যাপারটা নিয়ে কী করবে ভেবে ওঠার আগেই পাড়ার নানা বয়সের পুরুষ, মহিলারা রবীনদের বাড়িতে হাজির। দাবী একটাই — সুখেনের একটা উপযুক্ত শাস্তি চাই, ভদ্রলোকের পাড়ায় এ সমস্ত চলবে না। কথাটা অসঙ্গত তা নয়, কিন্তু কে শাস্তি দেবে? কার অভিযোগের ভিত্তিতে? সুখেনের শ্বশুরবাড়ির দিক থেকেও তো কোন অভিযোগ আসেনি। এগুলো রবীন সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, নবারুণ চুপ করে শুনছিল। কিন্তু বুঝিয়ে পারবে কী করে? রবীনের বউই তো বারবার পাড়ার লোকের পক্ষ নিয়ে কথা বলে যাচ্ছিল। তার বক্তব্য একটাই “এসব ছেলেকে চাবকে সোজা করে দেয়া উচিৎ।”

বলরামও উপস্থিত ছিল। তখন পর্যন্ত ও রবীনের ছোট ভাই। ও-ও রবীনের পক্ষ নিয়ে লোককে বোঝাতে চেষ্টা করছিল। এরকম চলতে চলতে ফস করে জোনাকি বলে বসে “যারা নিজের বাড়ির মেয়েদের পর্দানশীন করে রাখে তারাই শুধু সুখেনের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারে।” কথাটা নবারুণের গায়ে আলপিনের মত বিঁধেছিল। সুদেষ্ণা ছাড়া ওদের বাড়ির আর কোন বউই সেরকম লেখাপড়া জানা নয়, কথাবার্তায় জোনাকির মত চৌখসও নয়। ফলে বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোয় না প্রয়োজন ছাড়া। বলরামও রেগে গিয়েছিল। সে “বৌদি, আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন” বলে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছিল। নবারুণের দ্বারা ঐ ছোটলোকামি হত না, তাই সে চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল। রবীন তখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে জোনাকিকে ওখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার।

ঐ যে বেরিয়ে আসা, তার পরে প্রায় দু দশক আর ও বাড়িতে পা রাখা হয়নি। আসলে এত দ্রুত সবকিছু বদলে গেল… হয়ত কাকতালীয় নয় যে দু একদিনের মধ্যেই শোনা গেল সুখেনের শ্বশুরবাড়ি ওদের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগ করেছে পুলিশে।

দক্ষিণপাড়া তখন সি পি এমের শক্ত ঘাঁটি। লোকে বলত ওখানে একটা নুড়িকে সি পি এম প্রার্থী করে দিলে সেও হৈ হৈ করে জিতবে। সুখেনের পরিবার, অমৃতার পরিবারও, ব্যতিক্রমহীনভাবে, সি পি এম সমর্থক। ভোম্বল তো ততদিনে এ জি মেম্বার। সবুজগ্রাম লোকাল কমিটির পরবর্তী মিটিঙের এজেন্ডার বিবিধতে এই ব্যাপারটাও উঠে পড়ল। নবারুণ তখনো পার্টি মেম্বার নয়, খবরগুলো পেত বলরামের থেকে। মিটিঙে গিয়ে রবীন আবিষ্কার করে এই ইস্যুতে সে সম্পূর্ণ একা। লোকাল কমিটির সদস্যদের সবার মতে পার্টির উচিৎ তার সদস্য, সমর্থকদের বিপদে পাশে থাকা। রবীন জিজ্ঞেস করেছিল যাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক লোকে নিজের চোখে দেখেছে, তারা কোন যুক্তিতে বিপন্ন। বলরামের নেতৃত্বে সবাই মিলে বলেছিল, সব অভিযোগ মিথ্যে। বউকে মারতে কোন পার্টি সদস্য দ্যাখেনি, অমৃতা আর সুখেনকে অস্বস্তিকর অবস্থাতেও পার্টির কেউ আবিষ্কার করেনি।

ক্রমশ এমন হল যে প্রত্যেক মিটিঙেই সুখেনের সমস্যাটাই হয়ে দাঁড়াল অলিখিত প্রধান এজেন্ডা। একা পড়ে যাওয়ায় রবীন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না ব্যাপারটা। এদিকে পাড়ার অবস্থা ভাল নয়। সুখেনদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন নিতে হয়েছে। আবার মারধোর খাওয়ার ভয়ে গোটা পরিবার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, বলরাম আর নবারুণ অভয় দেওয়ায় ফেরত এসেছে, কিন্তু পাড়ার কেউ ওদের সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। লোকাল কমিটির মিটিঙে কী ঘটছে না ঘটছে সে খবরটা দেখা গেল পাড়ার সবাই জানতে পারছে। এক মিটিঙে বলরাম দাবী তুলে দিল “পার্টি থেকে সরকারীভাবে কমরেড সুখেন্দু মজুমদার এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হোক।”

“কমরেড!” রবীন হো হো করে হেসে ফেলেছিল বলে শোনা যায়। “সমর্থক কবে থেকে কমরেড হয়ে গেল আমাদের পার্টিতে, কমরেড বলরাম?”

“সমস্ত নিপীড়িত মানুষই একজন কমিউনিস্টের কমরেড বলে আমি মনে করি।”

“আপনি মনে করেন? পার্টির গঠনতন্ত্র, আদবকায়দা এসব কি এখন থেকে আপনি ঠিক করবেন নাকি? আপনি কি লেনিন না স্তালিন? নাকি আরো বড় কেউ? আর ‘নিপীড়িত’? কমিউনিস্ট পার্টিতে নয় নয় করে কম দিন তো আপনার হল না। এতদিন পার্টি করে আপনার যদি মনে হয় একজন লম্পট, বউ পেটানো উচ্চবিত্ত চাকুরীজীবী হচ্ছে নিপীড়িত, তাহলে আপনার মার্কসীয় সাহিত্য কিচ্ছু পড়া হয়নি। আবার পড়ুন।”

ঘটনাটা নবারুণকে বলার সময়ে বলরাম বুক ফুলিয়ে বলেছিল “এর উত্তরে আমি যা বললাম… রবীনদার মুখে রা নেই। আমি বললাম ‘যারা কতকগুলো লুম্পেনের কথায় পার্টির একজন বিশ্বস্ত সমর্থককে অবিশ্বাস করে, একজন কমরেডের বোনকে বদনাম করার চেষ্টা করে, তাদের কাছে আমি মার্কসীয় সাহিত্যের পাঠ নিই না, কমরেড।’”

শুনে নবারুণ বলরামের সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। রবীনের হাত ধরেই পার্টির সদস্যপদ পাওয়া একটা ছেলে এরকম দাপটে কথা বলেছে পার্টি মিটিঙে! ভাবা যায়! তখন ভাবতে পারেনি, এখন ভেবে লজ্জা হয় নবারুণের।

মজার কথা বলরাম সেই সময় পাড়ার অনেককে আলাদা করে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সুখেনের পরিবারকে একঘরে করে রাখা অন্যায় এবং যারা এগুলো করছে পার্টি তাদের চিনে রাখছে। যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, পার্টি তাদের পাশে থাকবে। তাতে কারো মত বদলানো যায়নি, উল্টে লোকে আরো বিগড়ে গিয়েছিল। যে ক্লাবের ছেলেরা সুখেন আর অমৃতাকে হাতেনাতে ধরেছিল, সেই গান্ধী সংঘের একটি ছেলে তো নবারুণের সামনেই বলরামকে মুখের উপর বলে দিয়েছিল “পার্টি মানে কি তুমি? না রবীনদা? রবীনদা অনেক বড় নেতা। তোমার কথা কেন শুনতে যাব?”

পাড়ার লোকে সব জানে একথা বুঝেও রবীন কারো সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করত বলে শোনা যায়নি। তবে অনেকে নাকি বাড়ি বয়ে এসে বলে যেত, পার্টিতে ও একলা পড়ে গেলেও পাড়ার লোকেরা সকলে ওর সঙ্গেই আছে। বলরাম অ্যান্ড কোম্পানির শত চেষ্টা সত্ত্বেও, রবীন যেটা করতে পেরেছিল সেটা হল লোকাল কমিটিতে সুখেনকে সমর্থন করে কোন প্রস্তাব পাশ হতে দেয়নি। বলরামের ভয়ে বা ভক্তিতে যে কমরেডরা গোটা ব্যাপারটায় সুখেনের পক্ষে ছিল বা নিরপেক্ষ থাকার ভান করছিল, তারাও ব্যাপারটা ভোটাভুটি অব্দি নিয়ে যেতে সাহস করছিল না। কারণ এলাকায় রবীনের জনপ্রিয়তা তারা জানত। এও জানত যে জেলা সম্পাদক হীরুদা রবীনের গডফাদার। বলরামের সাহসের পেছনে ছিল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর স্থানীয় সাংসদ অচ্যুত মুখার্জি। কিন্তু সবুজগ্রামের অধিকাংশ কমরেড বুঝত, জেলায় যে কোন ব্যাপারে শেষ কথা বলবেন হীরেন্দ্রনাথই, অচ্যুত মুখার্জিকেও সেকথা মানতেই হবে। জ্যোতি বসু যাঁকে হীরুদা বলেন, তাঁকে টপকে যাওয়ার ক্ষমতা অচ্যুতের নেই। উনি বড় জোর বলরাম প্যাঁচে পড়ে গেলে তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন।

তবে বলরামের আর যে দোষই থাক, কোনদিন দুঃসাহস এবং দুষ্টু বুদ্ধির অভাব ছিল না। তাই পার্টির জেলা নেতৃত্বের কাছে শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রবীন ঘোষালের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে একটা চিঠি জমা পড়ে। চিঠিটা লিখেছেন কমলা মজুমদার বলে একজন মহিলা। তাঁর অভিযোগ রবীন ঘোষালের প্রত্যক্ষ মদতে পাড়ার ছেলেরা তাঁকে, তাঁর নিরীহ ছেলে সুখেনকে এবং অবিবাহিতা তরুণী মেয়ে অদিতিকে উত্যক্ত করছে। ছেলেকে মিথ্যে বদনাম দিয়ে মারধোর করেছে, মেয়েকে রাস্তাঘাটে টোন টিটকিরি হজম করতে হচ্ছে, তিনি নিজেও পাড়ায় বেরোলেই নানা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এইসব কারণে তিনি নিজের বাড়িতে নিজের ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকতে ভয় পাচ্ছেন। নেতারা যেন বিহিত করেন। এই মর্মে তিনি এফ আই আর ও করেছেন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে।

এফ আই আরে ক্লাবের যে ছেলেরা সেই চণ্ডীমণ্ডপে সুখেনের কান মুলে দিয়েছিল তাদের কয়েকজনের নাম ছিল। এর ফলে ফাঁড়ি থেকে পাড়ায় পুলিশ এসে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই আগুনে ঘি পড়ল। নবারুণ একদিন সাতসকালে উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে দেখল রবীনদের উঠোন ভর্তি লোক। সবাই পাড়ার লোক। রবীন আর জোনাকিও রয়েছে। লোকে খুব উত্তেজিত। আসলে সকলে ছুটে এসেছিল রবীনের কাছে বিচার চাইতে। যে দোষী সে উল্টে পাড়ার কতকগুলো নির্দোষ ছেলের নাম পুলিশের খাতায় তুলে দিল — কে মেনে নেবে? তখন পর্যন্ত পাড়ার লোকে সুখেনের পরিবার সম্পর্কে বলতে আসত জোনাকিকে, যেহেতু রবীনকে কিছু বলে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত না। কিন্তু এবার রবীনকে কিছু একটা করতেই হবে — এটাই দাবী।

রবীন কী বুঝিয়ে উত্তেজিত জনতাকে বাড়ি পাঠাল সেটা উঠোনে দাঁড়িয়ে ঠিক বোঝেনি নবারুণ। বোঝা গেল কদিন পরে, যখন ক্লাবের ছেলেরা বাড়ি বাড়ি এসে বলে গেল “কাল বিকেল পাঁচটায় আমাদের ক্লাবের মাঠে সুখেনের ব্যাপারটা নিয়ে মিটিং। পার্টির লোকেরা থাকবে, সুখেনের পরিবার থাকবে, আমরা পাড়ার লোকেরা থাকব। বাড়ির সবাই প্লিজ আসবেন।”

বলরামের তখন সকালের আড্ডা রবীনের বাড়ি থেকে উঠে এসেছে নবারুণের বাড়ির বারান্দায়। ওকেই নবারুণ জিজ্ঞেস করেছিল “কী রে? রবীন এত সাহস কী করে পাচ্ছে? পার্টির বাইরের লোকের সঙ্গে মিলে মিটিং ডাকছে!”

“আরে অত বোকা নাকি! ঝানু জিনিস,” বলরাম ব্যাজার মুখ করে বলে। “জেলা কমিটি থেকে এল সি এস কে অ্যাড্রেস করে চিঠি করিয়েছে। তাতে নির্দেশ আছে পার্টি সদস্যরা যেন এই ঝামেলা মেটাতে সব রকম চেষ্টা করে। আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে যেন জনমত মাথায় রাখা হয়।”

“আর রবীনের বিরুদ্ধে অভিযোগটা?”

“লেখা আছে ‘পার্টিনেতাদের এর সঙ্গে জড়ানোর প্রচেষ্টা সহ্য করা হবে না।’”

“যাঃ! তার মানে তো হেরেই বসে আছিস।”

“অত সোজা নয়, দাদা; অত সোজা নয়। আজ হারলাম বলেই কি চিরকাল হারব? রবীন ঘোষালের নেতাগিরি আমি ঘুচিয়ে ছাড়ব।”

সেটা তৎক্ষণাৎ পেরে ওঠেনি বলরাম। প্রচণ্ড উত্তপ্ত সেই মিটিঙে ভয়ঙ্কর চাপে পড়ে সুখেন্দু মজুমদার ঐ এফ আই আর প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় এবং বলরাম, নবারুণ, শ্যামল কংসবণিকের মত যেসব পার্টির লোকেরা ওদের পক্ষে ছিল, তাদের পাড়ার লোকের কাঁচা খিস্তি হজম করতে হয়।

তবে নবারুণের সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল যেভাবে জোনাকি পাড়ার লোকেদের সঙ্গে মিলে ওদের যা নয় তাই বলে। ও যে ও পক্ষের একজন বক্তা হয়ে যেতে পারে সেটাই নবারুণ কল্পনা করেনি। রবীনের মুখ দেখে সন্দেহ হয়েছিল ও-ও বোধহয় সেটা জানত না। মাঝখানে যত ব্যবধানই থাক, বন্ধুর মুখ দেখেই নবারুণ বুঝেছিল, পার্টির বিরুদ্ধে, কমরেডদের বিরুদ্ধে বলা প্রত্যেকের প্রত্যেকটা কথা ওর বুকে তীরের মত বিঁধছে। জোনাকির বক্তৃতার সময়ে রবীনের মুখটা যেমন দেখাচ্ছিল, তেমনি দেখিয়েছিল পঁচিশ বছর পরে, মারা যাওয়ার ঠিক আগের সন্ধ্যায়। বিপ্লব যতবার জিজ্ঞেস করছিল “বাবা, ব্যথা করছে?” ততবার চোখ বন্ধ করে ঢোঁক গিলে মাথা নেড়ে বলছিল “না”। সেদিন তবু নবারুণ রবীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পেরেছিল, ঐ মিটিঙে পারেনি। নেতাগিরি না ঘুচলেও, রবীন নবারুণের বন্ধুত্ব হারিয়েছিল।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১১

পূর্বকথা: পেশায় রোড কন্ট্রাক্টর সমীর পঞ্চায়েত সমিতিতে রবীনের কাছে পাত্তা না পেয়ে বাড়িতে এসে হাজির হয়, হাতে শুভময়ের কবিবন্ধুর বই। ক্রমশ যাতায়াত বাড়ে, কোন দিন কী সুবিধা চেয়ে বসবে ভেবে অস্বস্তি হয় রবীনের। সমীরের গাড়ি চেপে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার প্রস্তাবে জোনাকি উল্লসিত হয়, রবীনের বারণ শোনে না। অতঃপর

শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির লাগোয়া ঋষিনগর পঞ্চায়েত সমিতি। সেখানে বেশ কয়েক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হবে। পুজোর পরেই টেন্ডার ডাকা হবে জানত রবীন। পুজোর আগে জেলা পার্টি অফিসে ওখানকার সভাপতি কমরেড রাখী সরকারের সাথে দেখা হয়েছিল, উনিই বলেছিলেন।

সমীরদের বাড়িতে বড় করে লক্ষ্মীপুজো হত। টিফিন কেরিয়ারে সেই প্রসাদ নিয়ে বাইক চালিয়ে সন্ধেবেলা এসেছিল সে। রবীন তখন বাড়িতেই। জোনাকি চা করল, খেতে খেতে সমীর বলল “রবীনদা, শুনলাম ঋষিনগরে একটা বড় রাস্তার কাজ আছে?”

গণশক্তিতে সেদিন সরোজ মুখার্জির লেখাটা সকাল থেকে পড়ে ওঠার সময় পায়নি রবীন। সবে শুরু করেছে, বকবক করার একদম ইচ্ছে ছিল না। শুধু বলে “হুঁ।”

“ওখানকার সভাপতি তো একজন মহিলা, না?”

“হুঁ। রাখীদি।”

“ও, আপনার থেকে সিনিয়র? আমি ভেবেছিলাম একটু জুনিয়রই হবে।”

রবীন কোন জবাব দেয় না। মন তখন পুরোপুরি লেখাটায়।

সমীরই বলে “আপনার সাথে তো খুব ভাল আলাপ।”

“হুঁ।”

“ভাবছিলাম ওখানকার টেন্ডারটা তুলব।”

“তোলো।”

“আপনি একটু বলে রাখবেন নাকি?”

এবার কাগজ থেকে চোখ তুলতেই হয়। সে দৃষ্টি দেখে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে সমীরের।

“কাকে কী বলতে বলছ?”

“ন….না। ও….ই আর কি। রাখীদিকে।”

“কী বলব?”

কী বলতে হবে সেটা রবীন জানে না তা যে একেবারেই নয়, সেটুকু বোঝার বুদ্ধি সমীরের ছিল। উঠে চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় জোনাকি ঘরে ঢুকেই হড়বড় করে অনেক আবোল তাবোল বলতে থাকে। সমীর বুঝতে পারে সেদিকেই মন দেওয়া ভাল, রবীনও গণশক্তির পাতায় ফিরে যায়।

তবে আর একটা শব্দও পড়ে উঠতে পারে না। মাথাটা এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে কিছুতেই ঠান্ডা করে লেখাটায় মন দেওয়া যাচ্ছিল না।

পরদিন ছিল শনিবার। স্কুল থেকে ফিরে, খেয়ে দেয়ে আর বিশ্রাম না নিয়ে রবীন হীরুদার বাড়ি রওনা দিয়েছিল।

পৌঁছে দ্যাখে ঘর ভর্তি লোক। অধিকাংশই চেনা, পার্টির লোক। কিন্তু তাদের সামনে যা বলতে এসেছে তা বলা উচিৎ হত না। অতএব চুপ করে অপেক্ষা করতে হয়। ঘরে ঢুকতেই হীরুদা খেয়াল করেছেন, হাত নেড়ে বসতেও বলেছেন। মুখ দেখেই বুঝেছেন গুরুতর কিছু ঘটেছে। তাই উনিও সকলের মাঝখানে উচ্চবাচ্য করছেন না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন “রবীন চা খাবে নাকি? খেলে… আচ্ছা থাক।” আসলে বলতে শুরু করেই মনে পড়েছে রবীনের চা খেতে ইদানীং খুবই অসুবিধা হয়, হাতটা আজকাল একটু বেশিই কাঁপে। তাই চুপ করে গেলেন।

ঘন্টা দুয়েক লাগল সবার সাথে কথা শেষ করতে। ঘর খালি হলে রবীনকে চৌকিতে পাশে এসে বসতে বললেন। তারপর তলা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের বড় বাটিটা বের করে তাকের টিন থেকে মুড়ি, আর কৌটো থেকে চানাচুর ঢাললেন। পাশের ছোট বাটি থেকে গোটা তিনেক লঙ্কা নিয়ে এসে বসলেন। রবীনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন “নাও। একটু শুকিয়ে গেছে, তাও খারাপ ঝাল নয়।”

রবীন এক গাল মুড়ি মুখে ফেলে, লঙ্কায় একটা কামড় দিয়ে বলল “হীরুদা, আর পারছি না। এবার আমায় ছেড়ে দিন।”

“পারছ না? কী পারছ না?”

“সভাপতির দায়িত্ব আর সামলাতে পারছি না। আপনি অনুমতি দিলে আমি রিজাইন করব।”

“সে কি! তুমি জেল খাটা ছেলে, কী এমন চাপ পড়ল যে রিজাইন করতে চাইছ? অক্রূরকে তো তোমার এখন সামলাতে পারা উচিৎ। ওর বিষদাঁত তো অনেকদিন ভেঙে ফেলেছ!”

“না, সমস্যা ওনাকে নিয়ে নয়।”

“তবে?”

“সমস্যা নিজেকে নিয়ে। আমি প্রলোভনগুলো এড়াতে পারছি না।”

রবীনকে অবাক করে হীরুদা মুচকি হাসেন। তারপর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাঁক দেন “নন্দওওও।”

নীচের রাস্তা থেকে উত্তর আসে “এই যে, কাকু।”

“দুটো চা। একটা আমার, আরেকটা দুধ চিনি দিয়ে।”

“পাঠাচ্ছি।”

হীরুদা বিড়ি ধরিয়ে জিজ্ঞেস করেন “তা কী দিয়ে তোমায় কেনা গেল শেষ অব্দি?”

রবীন শশব্যস্ত হয়ে বলে “না না, সেরকম কিছু হয়নি। আমি ঘুষ টুষ নিইনি। প্রস্তাব দিতে সাহসই পাবে না কেউ।”

“এই যে বললে ‘প্রলোভন জয় করতে পারছি না’? কিসের প্রলোভন দিয়েছে?”

রবীন মাটিতে মিশে যেতে যেতে বলে “আমাকে নয়, আমার বউকে।”

“অ। তোমায় কাবু করতে পারবে না বুঝে তোমার বউকে ধরেছে। কে? কোন কন্ট্রাক্টর?”

রবীন মাথা নাড়ে। এবার হীরুদা একটু গম্ভীর হয়ে যান।

“কী দিয়েছে? শাড়ি জামাকাপড়?”

“সেটা হলে তো জোর করে ফেরত দিয়ে দিতাম, মিটে যেত। এ চালাক লোক। পুজোর মধ্যে একদিন গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাকেও পীড়াপীড়ি করেছিল। আমি কাটিয়ে দিয়েছি।”

“তা তোমার বউ রাজি হয়ে গেল?”

“অনেক বুঝিয়েছিলাম। বুঝল না।”

“বোঝো! তোমার শালা তো শুভময়। মানে সি পি আই রাজ্য কমিটির সদস্য শুভময়। তাই না?”

“হুম।”

“তার বোনের এরকম বুদ্ধি শুদ্ধি! আশ্চর্য!”

রবীনের চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। নিভে যাওয়া বিড়িটা আবার ধরিয়ে হীরুদা বলেন “যাক গে। লোকটা তার বিনিময়ে কী দাবী করেছে? পুজো তো সেই কবে হয়েছে, হঠাৎ আজ তোমার পদত্যাগ করার ইচ্ছে হল কেন?”

“তখুনি তখুনি তো কিছু দাবী করেনি… সেই জন্যেই আর কিছু বলিনি। কিন্তু গতকাল আলগাভাবে বলার চেষ্টা করছিল আমি যেন রাখীদিকে বলি ওর টেন্ডারটা দেখতে। ঋষিনগরে মেন রোডটা তৈরি হচ্ছে না?”

“তা তুমি কী বললে?”

“কিছুই বলিনি। কটমটিয়ে তাকাতেই ভয়ে চুপ মেরে গেছে।”

“কী নাম এর?”

“সমীর। সমীর রাউত। থান রোডের যে কাজটা আমাদের পঞ্চায়েত সমিতিতে হল সেটাও ওরাই করেছিল। কিন্তু তখন আমার সাথে আলাপ ছিল না। টেন্ডার কী করে জমা দিতে হয় জানতে একদিন হঠাৎ আমার অফিসে ঢুকে পড়েছিল, আমি ভাগিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন দেখি আমার বাড়ি গিয়ে হাজির। জোনাকির দাদার এক বন্ধুর রেফারেন্স নিয়ে এসেছিল। ফলে ঠিক তাড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়নি।”

“এবং সেই থেকে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছে তো?”

“হ্যাঁ। ছেলের সাথেও ভাব জমিয়েছে, জোনাকিকেও ‘বৌদি বৌদি’ করে পকেটে পুরে ফেলেছে। কী বিপদে যে পড়েছি, হীরুদা।”

“তোমার ছেলের তো বছর ছয়েক বয়স। তার কথা নয় বুঝলাম, কিন্তু তোমার স্ত্রী…”

“আমার রিজাইন করা ছাড়া কোন উপায় নেই, দাদা। আমার চারপাশে স্বার্থান্বেষীদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। এই বেলা ক্ষমতা ছেড়ে না দিলে পরিস্থিতি আমাকে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য করবে।”

চা এসে পড়ে। হীরুদা খেতে খেতে পায়চারি করেন। রবীনকে অপেক্ষা করতে হয় একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্যে। নইলে চলকে পড়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড হবে। ও বুঝতে পারে হীরুদা বেশ চিন্তায় পড়েছেন।

হাঁটাহাঁটি করতে করতেই চা শেষ করেন। তারপর বসে পড়ে বলেন “আপাতত তুমি চালিয়ে যাও, বুঝলে? কোন উপায় নেই। এই সময়ে হঠাৎ সভাপতি বদল করলে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলবে ‘কেন? কী হয়েছিল?’ তখন আমরা কী জবাব দেব? তাছাড়া তোমার জায়গায় বসাব কাকে, বলো তো? সহ সভাপতিটিকে বসালে কি কেলেঙ্কারিটা হবে তুমি তো বোঝোই।”

রবীন প্রবল প্রতিবাদ করে। “কিন্তু এদের আমি আটকাব কী করে, হীরুদা? বউকে বাড়ি থেকে বার করে দেব? তা তো পারব না।”

“ছি ছি, তা করবে কেন? বউকে বোঝাও। প্রয়োজনে ঝগড়া করো। দুর্বল হলে চলবে না, কমরেড। লড়াইয়ের এই তো শুরু।”

রবীন ভেবে পায় না কী করে, কতদিন আটকাতে পারবে সমীরকে, সমীরের মত আরো যারা ভবিষ্যতে আসবে তাদের।

“তুমি গান টান শোনো, রবীন?” এই প্রশ্নটা হঠাৎ কেন, রবীন বুঝতে পারে না।

“শুনি। বাবা সবুজগ্রামের বাড়িটা করার পরে অনেক কষ্টে একটা রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিলেন, এখনো দিব্যি চলছে। পিন বদলানো ছাড়া কোন খরচ নেই।”

“বাঃ! আমার তো গান শোনা বলতে এইটে।” হীরুদা টেবিলের উপর থেকে হাতলওয়ালা রেডিওটা তুলে দেখান। “যা-ই হোক, গান যখন শোনো তখন রবীন্দ্রনাথ শোনো নিশ্চয়। ঐ গানটা মন দিয়ে শুনবে। ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে, তা বলে ভাবনা করা চলবে না।’”

রবীন বোঝে, কিন্তু কিভাবে চলা উচিৎ সেটা বোঝে না।

“অত ভাবনার কিছু নেই,” হীরুদা কাঁধে হাত রেখে বলেন। “তুমি যেমনভাবে ছেলেটিকে স্টোনওয়াল করছ, তেমনই করে যাও। সুবিধা আদায় করতে না পারলেই দেখবে ছোঁড়া নিজেই সরে পড়বে। আগামী পঞ্চায়েত ভোটে আর তোমায় প্রার্থী করব না। কথা দিচ্ছি।”

কথাটা কিছুটা স্বস্তি দেয় রবীনকে। ভোটের তখন আর কয়েক মাস বাকি।

হীরুদার কথামত সে জোনাকিকে আবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সমীরের মত কারো সঙ্গে রবীনের বা তার পরিবারের কোন রকম ঘনিষ্ঠতাই থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু বলতে গেলেই এমন রণং দেহি মূর্তি হয়ে দাঁড়াত স্ত্রীর যে বলাই বন্ধ করে দিতে হয়। জোনাকির সেই এক কথা। “তোমার মনটাই ব্যাঁকা। মানুষকে সোজা ভাবে দেখতে জানো না। আমি মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখি, পেশা দিয়ে বিচার করি না।” অগত্যা রবীন করত কি, সমীর এলেই কোন না কোন ছুতোয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। তাতে জোনাকির উপর কোন প্রভাব না পড়লেও রবীন এই ভেবে স্বস্তি পেত যে সমীর কোন অন্যায় অনুরোধ করার সুযোগ পাচ্ছে না।

সেবারের বসন্তটা রবীন আমৃত্যু ভোলেনি।

তখন দক্ষিণে হাওয়া ছেড়েছে। সন্ধেয় কোন কাজ না থাকলে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বিপ্লবকে কাঁধে চড়িয়ে হরিমতীর ঝিলের পাড়ে চলে যেত। বাবলুর চায়ের দোকানে বসে বিকেলের চা খেত, বিপ্লব খেত সন্দেশ বিস্কুট বা বাপুজি কেক। ওখানে বসে এলাকার পার্টি না করা লোকেদের সাথে গল্পগুজব হত। যার যত অভাব অভিযোগ সব ওখানে জানা যেত। পার্টির ছেলেপুলে দু একজনও থাকত না তা নয়। বাবলুই ছিল পার্টির সবচেয়ে বড় সমালোচক। ও জ্যোতি বসুর উপর চটে থাকত প্রায় সব সময়েই। জ্যোতিবাবু যা করেন, সবই ওর চোখে ভুল। সবেরই বিকল্প ব্যবস্থা ওর জানা। মাঝে মাঝে রবীন হাসতে হাসতে বলত “নাঃ! জ্যোতিবাবুরে দিয়া আর চলব না রে, বাবলু। আগামী বারে আমরা জিতলে তরেই মুখ্যমন্ত্রী করুম।” অন্য ক্রেতারা হেসে খুন হত।

তেমনই একটা দিনের কথা। সেদিন সকাল থেকেই শরীরটা ভাল লাগছিল না। জোনাকি বারণ করেছিল পঞ্চায়েত সমিতি যেতে। কিন্তু সেদিন অনেকগুলো জরুরী মিটিং, না গিয়ে উপায় ছিল না। সারাদিন কেমন বুক পেট ভার লাগল। ক্যান্টিনের যে খাবার রোজ দুপুরে তৃপ্তি করে খেত রবীন, সেটাও সেদিন সামান্য খেয়ে আর ভাল লাগল না। অফিস থেকে বেরোনোর সময়ে মনে হল গা গুলোচ্ছে, বমি হবে। হনহনিয়ে বাথরুমে যেতে যেতেই মাথাটা ঘুরে গেল, তারপর সব অন্ধকার।

যখন জ্ঞান ফিরল, রবীন দ্যাখে ও সভাপতির টেবিলে শুয়ে আছে, ওকে ঘিরে অফিসের সবাই। পঞ্চায়েত সমিতিরই সদস্য ডাক্তার প্রাণতোষ হাজরা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। “সব দেখতে পাচ্ছেন পরিষ্কার? আমাদের সবাইকে চেনা যাচ্ছে?” রবীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে পেরেছিল। কথা বলার শক্তি পাচ্ছিল না। তখনো যেন চারপাশটা অল্প অল্প দুলছে। “দেখি পালসটা। সঙ্গে তো স্টেথোটা পর্যন্ত নেই,” বলতে বলতে উনি রবীনের কব্জিটা ধরেন। ঘড়ি দেখে বলেন “এখন অনেকটা ভাল। বাড়ি গিয়ে অবশ্যই একটা কাউকে দেখিয়ে নেবেন। ইসিজি মাস্ট। এখুনি উঠবেন না, আরেকটু শুয়ে থাকুন।”

মিনিট কয়েক পরে উঠে বসলেও, মাটিতে পা রাখতেই মাথাটা ঝনঝন করে ওঠে। ডাক্তার হাজরা বলেন “ওনাকে একলা ছাড়া যাবে না। ট্রেনে করে একা একা যাওয়ার অবস্থা নেই। আমি যাচ্ছি সঙ্গে। আর কে যাবে?” আরো জনা দুয়েক রাজি হয়ে যায়। এস ডি ও সাহেব নিজের গাড়িটা দিতে চেয়েছিলেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য, রবীন রাজি হয়নি। হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনজনে মিলে প্রায় চ্যাংদোলা করে রিকশায় মদনপুর স্টেশন, তারপর ট্রেন, তারপর সবুজগ্রাম স্টেশন থেকে আবার রিকশায় চাপিয়ে রবীনকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল।

সেদিন পাড়ার হরিসভায় কীর্তন হচ্ছিল। দুপুর থেকেই জোনাকি ছেলেকে নিয়ে সেখানে। বাড়ির উল্টোদিকের ক্লাবের ছেলেরা মাঠে বসে আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎ দ্যাখে রবীনকে রিকশায় কোন মতে শুইয়ে দুজন নিয়ে আসছে, পেছনে আরেকটা রিকশা। রবীনের চোখ বন্ধ দেখে মনে হয়েছিল বুঝি অজ্ঞান। আসলে চোখ খুলে রাখলে মাথায় অসহ্য ব্যথা হচ্ছিল, তার উপর রিকশার ঝাঁকুনি। বাড়ি তালাবন্ধ দেখে ক্লাবের ছেলেরাই দৌড়ে গিয়ে রবীনকে নিয়ে এসে ক্লাবঘরে শোয়ায়। সারা পাড়ার লোক জড়ো হয়। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা জানতেন জোনাকি আর বিপ্লব হরিসভায়। একটা ছেলে দৌড়ে ডেকে নিয়ে এসেছিল ওদের।

ডাক্তার হাজরা স্থানীয় কার্ডিওলজিস্ট এসে ইসিজি করা পর্যন্ত ছিলেন। ইসিজিতে কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু সাহায্য ছাড়া হেঁটে বাথরুম পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল না রবীনের। পরের হপ্তা দুয়েক এই অবস্থা চলেছিল। সেই পনেরো দিনে শুভময় আর রচনা এসে দেখে গেছে, সেই বিয়ের আগে থেকে বলা সত্ত্বেও রবীন বড় ডাক্তার দেখায়নি বলে বকাঝকা করেছে। পারিবারিক ডাক্তার আর ডাক্তার হাজরার সাথে আলোচনাও করেছে কী করা উচিৎ। দুই ডাক্তারের মতেই হার্টের সমস্যা নেই যখন, তখন অসুখটা নিউরোলজিকাল। সম্ভবত রবীনের হাত কাঁপার সঙ্গে জড়িত। শুভময়ের সাথে ছাত্র রাজনীতি করতেন, পরে সিপিএমে যোগ দেন ডাক্তার জীবন চৌধুরী। তখন ভারতের সবচেয়ে নাম করা নিউরোলজিস্ট। তাঁকে দেখানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল শুভময়।

পরের ছ মাস মাসে দুবার সবুজগ্রাম থেকে কলকাতা যেতে হত ওঁকে দেখাতে। রবীনের তখন যা অবস্থা, ট্রেনে বাসে যাওয়া খুব কষ্টকর। কষ্ট করে হলেও সেভাবেই সে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু জোনাকি কিছুতেই গাড়ি ছাড়া ওকে নিয়ে যাবে না, আর সে গাড়ি সমীরের। রবীন প্রবল আপত্তি করলেও বলরাম, দিদি শ্যামা আর শুভময় জোনাকির পক্ষ নিয়ে প্রবল ধমকাধমকি করে। অশক্ত শরীরে রবীনকে মেনে নিতেই হয়।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১০

পূর্বকথা: প্রশাসন চালাতে গিয়ে পদে পদে প্রলোভন জয় করতে হয়েছে রবীনকে। সকলে পারে না। যারা পারেনি, তাদের কথা ভেবে মন খারাপ হয় রবীনের। আর মনে পড়ে তার একমাত্র ছেলে বিপ্লব কত ছোট বয়সে বুঝতে পেরেছিল, সৎ থাকা মানে কেবল প্রলোভন জয় করা নয়। কমিউনিস্ট হওয়া মানেও কেবল নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকা নয়

“আমার লোভ নেই — এই অহঙ্কারটা করলেই গণ্ডগোল, মাস্টারমশাই,” বলেছিলেন পাগল মহারাজ। “লোভ সকলেরই থাকে। সেই লোভের সাথে লড়াই করতে হয়, লোভ জয় করতে হয়। যেই আপনি ভাববেন আপনার লোভ নেই, অমনি আলগা দেবেন আর সেই সুযোগে লোভ জিতে যাবে। কিন্তু আপনাকে তো সে লড়াইয়ে হারতে দেখিনি এখন অব্দি! তাহলে কার লোভ দেখে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন?”

রবীন কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, উত্তরটা দেয়নি। কারণ সত্যি কথাটা বলতে পারা যেত না, পারা যায় না। ততদিনে স্বামী মৃণ্ময়ানন্দর সাথে বেশ জমাট সখ্য হয়েছে। তবু বলা যায় না। যতই হোক, উনি তো আর নবারুণের মত ছোটবেলার বন্ধু নন। তার সাথেই যেখানে এই গোপন ব্যথাগুলো ভাগ করে নেওয়ার দিন নেই, সেখানে কয়েক বছরের বন্ধুত্বে পাগল মহারাজকে কী করে বলা যায়? যার লোভ রবীনকে অস্থির করে তুলেছিল সে যে জোনাকি। তাকে যে রবীন ভালবাসে। তার দোষ ত্রুটি কখনো বাইরের লোককে বলা যায়? মহারাজ রবীনের যত বড় বন্ধুই হোন না কেন, নবার মত পরিবারের অংশ তো হয়ে যাননি। কোনদিন হবেন না।

নবার সাথে বিচ্ছেদ অনেকটা একা করে দিয়েছে রবীনকে। বিচ্ছেদের কারণ কিছুটা জোনাকিও বটে, কিন্তু সেজন্যে ওকে দায়ী করে না রবীন। প্রশ্নটা ছিল নৈতিক এবং সেখানে ও আপোষ করেনি। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। সেদিন না হোক, পরে কখনো নবার এই চেহারা ধরা পড়তই। যত দেরি হত, হয়ত তত বেশি কষ্ট হত বন্ধুর স্খলন দেখে। বন্ধুবিচ্ছেদের জন্য তাই কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আফশোস হয়নি রবীনের। বরং বেশ গর্বই হয়েছে নীতির পরীক্ষায় পাশ করতে পেরে, ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাণের বন্ধুকে ত্যাগ করেও যা অন্যায় তার বিরুদ্ধে খাড়া থাকতে পেরে। জোনাকির সক্রিয় সমর্থন সেই ঘটনায় সাহায্যই করেছিল। নইলে হয়ত পারা যেত না।

বন্ধুকে শত কষ্ট সত্ত্বেও ত্যাগ করা যায়, স্ত্রীকে যায় কি? জোনাকির লোভ নীতিতে অনড় থাকতে দিচ্ছে না বুঝেও তো তাকে ত্যাগ করতে পারেনি রবীন। মুখ বুজে আত্মনির্যাতন করে, ফাঁক পেতেই ছুটে গিয়েছিল পাগল মহারাজের কাছে। মনের জ্বালা মেটাতে। কারো নাম না করেই একটানা অনেকক্ষণ অভিযোগ করেছিল। কথা দিয়ে কথা না রাখা আর লোভের কাছে আত্মসমর্পণ — রবীনের এই দুটো অভিযোগ ছিল জোনাকির বিরুদ্ধে এবং কমরেডদের বিরুদ্ধে। কাকে আর বলা যায় সেসব কথা? কিন্তু না বললেও তো হাঁপ ধরে। তাই ৮৫-৮৬ সালে নবার সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে হালকা হতে হলে পাগল মহারাজের কাছেই চলে যেত রবীন। মহারাজ বার দুয়েক দেখেছেন জোনাকিকে, সি পি এম কর্মীদের তো চতুর্দিকেই দেখতে পেতেন। ফলে নিশ্চয়ই বুঝতেন রবীনের ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে। তবু রবীন নিজে কখনো মুখ ফুটে কারো নাম করে কথাগুলো বলেনি। জোনাকির চেয়ে পার্টি তার কম প্রিয় ছিল না তো। মহারাজও বিচক্ষণ। নিজের মতামত দেওয়ার সময়েও ভান করতেন যেন বোঝেননি কার ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে।

যদিও প্রথম সাক্ষাতেই মৃণ্ময়ানন্দের মনে হয়েছিল রবীনের সাথে জমবে ভাল, আটাত্তরের বন্যাত্রাণের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে আর ওদের দেখা হয়নি। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তখন ভীষণ ব্যস্ত। একাশির মে মাসে বিপ্লবের জন্ম ব্যস্ততা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তার কয়েক মাস পরে হঠাৎ একদিন পাগল মহারাজ পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে এসে হাজির।

“মাস্টারমশাই, চিনতে পারছেন তো?”

“আরে! বসুন, বসুন। চিনব না কেন? বন্যায় আপনি আর আপনার ছেলেরা ঐরকম খাটলেন। এর মধ্যেই ভুলে যাব?”

“আজকে কিন্তু নিজের কাজে এসেছি।”

“তা তো আসবেনই। আমরা তো পাবলিক সার্ভেন্ট। আপনাদের কাজই তো আমাদের কাজ। বলুন কী করতে পারি আপনার জন্যে?”

“খুব শক্ত কিছু না। একবারটি আমার ওখানে পায়ের ধুলো দিতে হবে আর কি,” কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বাদামী খাম বার করে রবীনের হাতে দিয়ে মহারাজ বলেন।

ভেতরে একটা চিঠি। ছাব্বিশে জানুয়ারী পাগল মহারাজের স্কুলের প্রথম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার নিমন্ত্রণপত্র।

“বাঃ! আপনার স্কুলটা তাহলে একটু একটু করে বড় হচ্ছে?”

“হ্যাঁ, আসলে বেশ কয়েকটা পয়সাওয়ালা লোককে টুপি পরাতে পেরেছি আর কি,” হাতের ছোট্ট কৌটো থেকে একটু মৌরি ঢেলে মুখে দিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে মহারাজ বলে ওঠেন।

রবীন চমকে যায়। ধর্ম তো মানুষকে টুপিই পরায়, কিন্তু সে কথা একজন সন্ন্যাসী নিজ মুখে অবলীলাক্রমে বলতে পারে? ওর মুখ দেখে মনের ভাবটা বুঝতে অসুবিধা হয় না মহারাজের। মুচকি হেসে বলেন “আরে মশাই, আপনার কাছে আমার লুকোনোর দরকার নেই। আলবাত টুপি পরিয়েছি। ভাল কাজের জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না। এ আমাদের ঠাকুরের কথা।”

রবীনের অস্বস্তি কাটে না, তবু সে হাসার চেষ্টা করে বলে “কী বলে টুপি পরালেন?”

“খুব সোজা। বললাম একটা আশ্রম করেছি, ঠাকুরের একটা মন্দির করছি, সঙ্গে দুঃস্থ ছেলেদের জন্যে একটা স্কুল। মুক্ত হস্তে দান করুন।”

“মন্দির? আমি কিন্তু মন্দির উদ্বোধন করতে যাব না।”

“সে আমি জানি। এই কটা বছর আমি আপনার খবর রেখেছি। জানি আপনি খাঁটি লোক। মন্দির হলে তবে তো উদ্বোধন করার প্রশ্ন।” মহারাজ বিচ্ছু ছেলের মত চোখ মারেন।

“মানে?”

“মানে মন্দিরের কথা না বললে লোকে হাত খোলে না, বুঝলেন না? যদি শুধু বলতাম গরীব ছেলেদের জন্যে স্কুল করছি, অমনি পাঁচ টাকা, দশ টাকা বেরোত। আসলে কাদের টুপি পরাচ্ছি বলুন তো? পাপীদের। ধনী ব্যবসায়ী, ঘুষখোর সরকারী অফিসার, চালের আড়তদার — এরাই তো বেশি দানধ্যান করতে পারে। সাদা পথে রোজগার করা সত্যিকারের ভক্ত দানধ্যান করার জন্যে পাঁচ দশ টাকার বেশি পাবে কোথায় বলুন? তা এই যে সব বড় বড় পাপী, এরা সারাক্ষণ অপরাধবোধে ভোগে, বুঝলেন তো? ধর্মস্থানে টাকা দিচ্ছি জানলে এদের মনে হয় বুঝি পাপ স্খালন হল। মানে আমার মত সাধু সন্ন্যাসীদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার বকলমা দেয় আর কি। সেই নাটকটা দেখেছেন তো?”

“কোনটা? নটী বিনোদিনী?”

“ঠিক। ঠাকুর গিরীশকে বলেন না, ‘দে, বকলমা দে’? এও সেই ব্যাপার।”

“শুধু দেখেছি নয়, আমাদের ক্লাবের যাত্রায় গিরীশের চরিত্রে অভিনয়ও করেছি।”

মহারাজ একগাল হেসে বলেন “তাহলে ঠিকই বুঝেছি। আপনার উপরে ঠাকুরের আশীর্বাদ আছে।”

রবীন হো হো করে হেসে ওঠে। “নাস্তিক, মার্কসবাদী লোকের উপরে রামকৃষ্ণের আশীর্বাদ! এই জন্যেই আপনাকে মঠ থেকে বার করে দিয়েছিল, মহারাজ।”

মহারাজও হাসতে হাসতে বলেন “আপনি বিশ্বাস না-ই করতে পারেন। কিন্তু ঠাকুরের ইচ্ছা হলে তিনি অবিশ্বাসীকেও আশীর্বাদ করতে পারেন। আপনি ঠেকাতে পারবেন না।”

“আচ্ছা আচ্ছা, সে নয় হল। কিন্তু মন্দির বানাব বলে লোকের থেকে টাকা নিলেন, তারপর না বানালে তো ঠ্যাঙাবে আপনাকে।”

“আমি অত কাঁচা লোক নই, মাস্টারমশাই। ঐদিন সকালে ভিতপুজোর ব্যবস্থা করে রেখেছি। ভক্তসমাগম হবে, তারা এসে দেখবে মন্দির হচ্ছে। টাকাগুলো দিয়ে আমার ছেলেগুলোকে উৎসাহ দেওয়ার কাজটা এদিকে হয়ে গেল।”

“আপনার সব যুক্তিই ঠিক, মহারাজ। কিন্তু যদি আপনি মন্দির শেষ অব্দি না-ই করেন, কয়েক বছর পরে যদি লোকে আপনার বিরুদ্ধে জোচ্চুরির অভিযোগ তোলে, তখন তো আমার বিরুদ্ধে জোচ্চোরের পাশে থাকার অভিযোগ উঠবে।”

“ছি ছি,” একহাত জিভ কেটে মহারাজ বলেন “মন্দির একেবারে করবই না বললাম কখন? আমি ঠাকুরের চ্যালা, তাঁর মন্দির করব সংকল্প করে যদি না করি কত বড় পাপ হবে বলুন দেখি? মন্দির হবে। ধীরে ধীরে। আগে আমার স্কুলের উন্নতি, পরে মন্দির। ঠাকুর মন্দিরে থাকেন না, থাকেন মানুষের মধ্যে। তাদের ভাল আগে করলে পাপ হয় না।”

“হুম। জীবে প্রেম… কী যেন?”

“‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার

ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেইজন

সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’

আপনি বিবেকানন্দ পড়েন নাকি, মাস্টারমশাই!”

“না না। আমার স্ত্রীর মুখে শোনা। ও তো মিশনের দীক্ষিতা।”

“তবেই দেখুন। ঠাকুর সারাক্ষণ আপনাকে ছুঁয়ে আছেন।”

“এই রে, আপনাকে বলাই ভুল হল দেখছি।”

দুজনেই হেসে গড়াগড়ি। সেই শুরু নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা।

শুধু সেবার নয়, তারপর থেকে যতদিন পাগল মহারাজ বেঁচেছিলেন, বড়িহাটা রামকৃষ্ণ হাইস্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীনকে যেতেই হত। যখন স্কুলটা রীতিমত নাম করা হয়ে উঠেছে আর রবীন সব প্রশাসনিক পদ ছেড়ে দিয়েছে, পার্টির জোনাল কমিটিতেও নেই, পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই তার, তখনো মহারাজ ছাড়তেন না। “আমার স্কুল। আমি যাকে খাঁটি লোক মনে করি সে প্রধান অতিথি যদি না-ও হয়, কয়েকটা পুরস্কার আমার ছেলেদের হাতে তাকে দিতেই হবে। আপনার ইচ্ছে না হলেও বন্ধু হিসাবে এই অত্যাচার আপনাকে সহ্য করতেই হবে।”

সেই বন্ধুত্বের অধিকারেই ১৯৮৭র সেই বিকেলে মহারাজের কাছে ছুটে গিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত রবীন। ঘটনাটা বেড়াতে যাওয়া নিয়ে।

সমীর বলে ছেলেটি কন্ট্রাক্টর। আজাদপুরের কাছে এক জায়গায় রাস্তা বানানোর বরাত নেবে বলে সোজা রবীনের কাছে চলে এসেছিল একদিন। রবীন বলেছিল “কদ্দিন ব্যবসা করছ, বাবা? বরাত কিভাবে দেওয়া হয় জানো না? টেন্ডার জমা দাও গে। সভাপতির সাথে দেখা করার তো কিছু নেই। কেটে পড়ো।” ছেলেটি কথা না বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। পরে যখন বরাত দেওয়া হয়ে গেল, রবীন খেয়াল করেছিল যে ঐ ছেলেটির কোম্পানিই বরাত পেয়েছে।

এরপর একদিন সন্ধেবেলা পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে রবীন দ্যাখে সমীর একতলার ভেতরের ঘরের খাটে বসে বিপ্লবের সাথে খেলাধুলো করছে। বিপ্লবের কোন চেনা অচেনা ছিল না জন্মের পর থেকেই। ফলে সমীরের সাথে তার দিব্যি ভাব জমেছে। রবীন যখন ভুরু কুঁচকে ভাবছে বদমাশটাকে ছেলের সামনে কতটা ভদ্রভাবে বিদেয় করা যায়, তখনই জোনাকি এসে বলে “জানো, ওকে অনিন্দ্যদা পাঠিয়েছে। তুমি আসবে বলেই বসিয়ে রেখেছি। ও বসতে চাইছিল না। তোমাকে চেনে বলল, তাই বললাম দেখা করেই যাও।”

অনিন্দ্যসুন্দর সেনগুপ্ত বিখ্যাত কবি এবং জোনাকির দাদা শুভময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রবীনদের বিয়েতে এসেছিলেন, পরেও সস্ত্রীক সবুজগ্রামের বাড়িতে এসে সারাদিন কাটিয়ে গেছেন। অমায়িক লোক। উনি যে অত বিখ্যাত মানুষ তা বোঝাই যায় না। কলকাতার বুদ্ধিজীবীকে মাটিতে বসে অত চেটেপুটে খেতে রবীন কখনো দ্যাখেনি। সেই লোককে এই যন্তরটি কী করে চিনল ভেবেই পেল না রবীন। নির্ঘাত মিথ্যে কথা।

ছেলেটি চোর চোর মুখ করে তাকিয়ে ছিল। রবীন কাঁধে হাত রেখে শুধোল “তুমি অনিন্দ্যদাকে কীভাবে চেনো?”

“ওনার বোন-ভগ্নীপতি আমাদের বাড়িতে ভাড়া এসেছেন বছর খানেক হল। ওনাদের মেয়েটা তো সারাক্ষণ আমাদের ঘরেই থাকে। আমার সাথে বাচ্চাদের খুব ভাব।”

“বুঝলাম। কিন্তু বাচ্চার মামার সাথে আলাপটা কী করে হল, ভাই?”

“ঐ… ওনাদের ঘরে উনি সেদিন এসেছিলেন… আমি ছিলাম,” সমীর ঢোঁক গিলে বলেছিল। “কী করি টরি সেসব জিজ্ঞেস করছিলেন। তো কথায় কথায় বউদির কথা, আপনার কথা বললেন…”

কথা শেষ করার আগেই জোনাকি বলে “ওর হাত দিয়ে অনিন্দ্যদা ওঁর নতুন বইটা পাঠিয়েছেন। এই দ্যাখো।”

বইটা হাতে নিয়ে রবীনের মেজাজটা একটু ঠান্ডা হল। সবুজ মলাটের উপর সাদায় লেখা বইয়ের নাম ‘তোমার জন্যে পংক্তিভোজন’, আর কবির নাম। ভিতরে লাল কালিতে লাইন দুয়েক লিখেও দিয়েছেন ভদ্রলোক

আদরের জোনাকি আর তার আগুনে বর রবীনকে। সশরীরে হাজির হতে না পারার অপরাধ মার্জনা কোরো। পরে কবজি ডুবিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করব।

              — অনিন্দ্যদা

যাক, ছেলেটা তাহলে ছুতো করে কোন দু নম্বরি প্রস্তাব টস্তাব নিয়ে আসেনি। রবীন নিশ্চিন্ত হয়ে বইটা নিয়ে ভিতরে চলে যায়। জোনাকিকে গিয়ে বলে “তোমার বাপের বাড়ির দিক থেকে এসছে। ছেলেটাকে একটা অমলেট টমলেট খাইয়েছ তো? নইলে আবার কুটুমবাড়িতে আমার বদনাম হবে।”

“অমলেট কী বলছ? কত মিষ্টি নিয়ে এসেছে দ্যাখো,” জোনাকি বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখায়। “এত মিষ্টি তো আমরা সাতদিন ধরে খেয়েও শেষ করতে পারব না। ওখান থেকেই ওকে দিলাম কয়েকটা। অমলেটও দিয়েছি।”

রবীনের সন্দেহটা আবার ফিরে আসে। জোনাকি বুঝতে পারে না মিষ্টি দেখে রবীনের মত খাইয়ে লোকের কী কারণে মুখ গোমড়া হতে পারে। সে বাইরের ঘরে গিয়ে সমীরের সাথে গল্পগুজব করে, রবীন গামছা পরে কুয়োতলায় গায়ে জল ঢালতে যায়। ফিরে আসতেই সমীর বলে “আমি এবার উঠি, রবীনদা।”

“আচ্ছা, এসো। অনিন্দ্যদা কি এখন মাঝে মধ্যে আসছেন তোমাদের ওখানে?”

“না, এই তো প্রথম দেখলাম।”

“আচ্ছা। আবার এলে বোলো রবীনদা, বৌদি যেতে বলেছে।”

“ওকেও আবার আসতে বলো”, জোনাকি খেয়াল করায়।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই। এসো সময় করে।”

সমীরের সময়ের দেখা যায় বিশেষ অভাব নেই। কদিন পরে পরেই তার দেখা মেলে। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি ফিরে রবীন শোনে সন্ধ্যায় সে এসেছিল। ব্যাপারটা রবীনের খুব একটা ভাল না লাগলেও দেখা যায় বিপ্লব তার বেশ ন্যাওটা হয়ে গেছে। জোনাকিও খাঁ খাঁ বাড়িতে একটা কথা বলার লোক পেয়ে আনন্দিত। কাজ সম্পর্কিত কোন কথা বলেনি বলে রবীন এই যাতায়াতে আপত্তি করে না, কিন্তু মনটা খচখচ করে। কোন স্বার্থ ছাড়াই তার বাড়িতে একজন কন্ট্রাক্টর এতবার আসছে — এটা কেমন হিসাবে মেলে না।

এসব ৮৬ সালের কথা। পরবর্তী এক বছরে সমীর বৌদির বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে, বিপ্লবও সমীরকাকুর ফ্যান। আজাদপুরের সেই রাস্তা বানানো শেষ হয়ে সমীর তার পাওনা গণ্ডাও বুঝে নিয়েছে এর মধ্যেই। কোথাও প্রাপ্যের বেশি কিছু দাবী করেনি, এতবার রবীনের বাড়ি এসেও ঐ প্রোজেক্ট নিয়ে কোন কথাবার্তাই বলেনি। তাই সভাপতির মনটা একটু নরম হয়। বিকেল ছাড়াও ছুটির দিনে সমীর সকালে আসতে শুরু করে। বলরামের সঙ্গে সে-ও ঐ আড্ডার একজন নিয়মিত সদস্য হয়ে যায়। যথারীতি পার্টির অন্য ছেলেপুলে বা রবীনের রাজনীতির বাইরের বন্ধুরাও থাকত সেখানে, দফায় দফায় চা আর রান্না চাপানো বাদ দিলে, জোনাকিও। এবং বিপ্লব।

ওর তখন সকালে স্কুল, ফিরতে ফিরতে রবীনের বেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। পঞ্চায়েত সমিতি সেরে, পার্টির কাজ সেরে সে বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। কোন কোনদিন বাবার সাথে খাবে বলে জোর করে জেগে থাকলেও বেশিরভাগ দিনই জোনাকির বকুনিতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে হয়। রবিবার সকালগুলোতে তাই সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে লেপ্টে থাকত বিপ্লব। বিকেল হলেই আবার বেরিয়ে যাবে যে।

তেমনই এক রবিবারের আড্ডায় অয়ন প্রস্তাব দেয় পুজোয় গাড়ি করে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া হোক। পরের সপ্তাহেই পুজো।

অয়ন কুড়াইল জুটমিলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিটু নেতা বিজন চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। লোকে বলত মাথায় ছিট আছে। কারণ বাপের কারখানা শাসনের উত্তরাধিকার বুঝে নেওয়ায় তার মোটে আগ্রহ ছিল না, ছিল কবিতা লেখায় আর লোককে ডেকে ডেকে শোনানোয়। রবীন বিজনকে কোনদিন পছন্দ করেনি এবং তার ছেলেকেও প্রথম দিকে পাত্তা দেয়নি। তারপর লোকে যেভাবে ওকে দেখলেই কবিতার ভয়ে দূর থেকে কেটে পড়ে আর আড়ালে পাগল ছাগল বলে, তাতে মায়া হল। তার ফলে নিয়মিত প্রচুর বাজে কবিতা শুনতে হয়, তবু রবীন ওকে একটু প্রশ্রয় দেয়। ছেলেটা বাপের মত নয় একেবারেই, বরং অত্যন্ত সরল, সাদা মনের মানুষ — একথা সে বুঝেছে।

সেই অয়নই একদিন ধুয়ো তোলে “বাবাকে বলব একটা গাড়ি যোগাড় করে দিতে। অষ্টমীর রাতে চলুন, রবীনদা।”

রবীন প্রথমেই জল ঢেলে দেওয়ার জন্যে বলে “না রে। আমার হবে না। অষ্টমীর দিন হীরুদার বাড়ি যেতে হবে।”

সমীর জোনাকিকে বলে “বৌদি, আপনি রাজি হয়ে যান, তাহলেই রবীনদা রাজি হবে।”

রবীনকে চমকে দিয়ে জোনাকির উত্তর “আমি তো রাজিই। আমি সব সময় রাজি। কিন্তু তোমাদের দাদার সময় হয় কোথায় ঘোরা বেড়ানোর? এখানেই দুটো ঠাকুর দেখতে যেতে চায় না। এই করে ছেলেটারও পাড়ার বাইরে কোন ঠাকুর দেখা হয় না।”

“না না, যাবে যাবে। এবারে যাবেখন,” বলরাম ফুট কাটে। “হীরুদার বাড়ি পরে যেও, রবীনদা। বছরে একটা দিন তো বিপ্লব, বৌদি — ওদের নিয়ে একটু রিল্যাক্স করবে নাকি?”

“এটা কিন্তু ঠিক,” সমীর জোর দেয়। “ওদের তো আপনি একদমই সময় দিতে পারেন না। আর আপনারও তো বিশ্রাম দরকার।”

“ওর বিশ্রাম টিশ্রাম লাগে না,” বেশ তেতো করেই জোনাকি বলে। “সারাক্ষণ রাজনীতির কচকচি না হলে ওর ভালই লাগে না। আমারই বরং বিশ্রাম দরকার।”

“আচ্ছা, তাহলে অন্তত বৌদির কথা ভেবেই চলুন? গাড়ি আমি নিয়ে আসব, অয়ন। তুমি, আমি, রবীনদা, বৌদি আর বিপ্লব।” সমীরের ব্লু প্রিন্ট তৈরি। “বলদা, তুমিও চলো।”

“না রে। আমার পাড়ার পুজোয় তো অষ্টমীর দিন দুঃস্থদের বস্ত্র বিতরণ। আমাকে প্রধান অতিথি করেছে।” বলরাম, ততদিনে ক্ষেত্রগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, বলে।

উপস্থিত সকলে মিলে চাপাচাপি করে রবীনের মৌখিক সম্মতি আদায় করেই ছাড়ে। শুধু বিপ্লব, কে জানে কী বুঝে, বারবার বলছিল “আমি ঠাকুর দেখতে ভালবাসি না।”

বাড়ি খালি হওয়ার পর রবীন জোনাকিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে একজন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সপরিবারে কলকাতা বেড়াতে যেতে পারে না। জোনাকি এটাকে অকারণ ছুঁৎমার্গ ছাড়া আর কিছুই ভেবে উঠতে পারেনি।

“সমীর এতদিন আসছে। কোনদিন তোমার থেকে কোন অন্যায় সাহায্য চেয়েছে? কখনো বলেছে ‘রবীনদা আমার হয়ে ওকে বলে দিন, এটায় সই করে দিন, সেটায় সই করে দিন?’ তোমার তাতেও সন্দেহ যায় না?”

“এখনো কোন সুবিধা নেয়নি বলেই যে ভবিষ্যতেও নিতে চাইবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। এখনো চায়নি বলেই বাড়িতে ঢুকতে দিই। সেটা কথা নয়। কথা হচ্ছে ওর পেশার লোকের আমার পদের লোককে দরকার পড়েই। ওর গাড়িতে চড়ে আমরা বেড়াতে গেলে লোকে ভাবতেই পারে আমি অসৎ।”

“লোকের কথার দাম দেড় পয়সা। তুমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকলেই হল।”

“আমাকে যারা নেতা বানিয়েছে তারাই আমার বিবেক, জোনাকি। গরীব মানুষের পার্টি করি বলতে বলতে আমি কন্ট্রাক্টরের গাড়িতে চড়তে পারি না।”

এরপর তুমুল ঝগড়া লেগে যায়। বিয়ের সাত বছর হয়ে গেছে ততদিনে। ফলে জোনাকির যে সুখী জীবনযাত্রার উপরে যথেষ্টই লোভ আছে, সেকথা জানতে রবীনের বাকি ছিল না। কিন্তু সে যা চায় তা পাওয়ার জন্যে যে রবীনের নীতি আদর্শকেও বলি দিতে পারে — এতটা ধারণা ছিল না। বেশ খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করার পর রবীনের মনে হয় মিথ্যে এত শক্তি খরচ করা। এত বয়সে কি কারো জীবনদর্শন বদলানো যায়?

বিকেলে হরিমতীর ঝিলের ধারে বসে বিড়ি খেতে খেতে রবীনের মন বলে “জোনাকির যখন এত ইচ্ছা, ও আর ছেলে ঘুরে আসুক। আমি না গেলেই তো হল।”

“তাতেও কি বদনাম আটকাবে?” মস্তিষ্ক জিজ্ঞেস করে।

“তা আটকাবে না, কিন্তু এছাড়া উপায় কী? বউকে তো আর মেরে ধরে আটকাতে পারব না,” মন উত্তর দেয়।

মানতেই হয়।

অষ্টমীর দিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেই বেরোনো। অশান্তি এড়াতে আগে থেকে জোনাকিকে কিছু বলেনি রবীন। খেতে খেতেই বলে, সে যাচ্ছে না। প্রতিক্রিয়াটা অপ্রত্যাশিত। বিপ্লব বলে “আমিও যাব না। আমার ঠাকুর দেখতে ভাল লাগে না।”

জোনাকি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলে “তুমি কিছুতেই আমার কোন সাধ আহ্লাদ পূরণ হতে দেবে না, না? আবার ছেলেটাকেও শিখিয়ে রেখেছ।”

রবীন বুঝিয়ে বলে, সে চায় জোনাকি আর বিপ্লব ঘুরে আসুক অয়ন আর সমীরের সাথে। জোনাকি আরো রেগে চিৎকার করে “তুমি খুব ভাল করেই জানো আমি তোমাকে বাদ দিয়ে যাব না। যাওয়াটা বানচাল করার জন্যেই এই ফন্দি এঁটেছ।” কীভাবে নিজের সমস্ত শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সে রবীনের হেঁশেল ঠেলছে সেই প্রসঙ্গ এরপর সারা পাড়া শুনতে পায় ভরদুপুরে। রবীন চুপ করে শোনে আর ভাবে ভিতরে কত ক্ষোভ জমা হয়ে থাকলে পাঁচ বছরের ছেলের সামনেই এভাবে তাকে অভিযুক্ত করতে পারে জোনাকি। সত্যিই তো। কত বড় পরিবারের মেয়ে কী সংসারে এসে পড়েছে! অনায়াসে কোন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কি সরকারী অফিসারের বউ হতে পারত মেয়েটা। কোন অভাব থাকত না। রবীনেরই ভুল। তাড়াহুড়ো করে সে-ই তো নষ্ট করেছে ওর জীবনটা। জোনাকি একটু শান্ত হলে রবীন বলে “রাগ করে বলিনি। আমার তোমাদের গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখানোর সামর্থ্য কোনদিন হবে বলে মনে হয় না। ঘুরে এসো। পুজোর দিনে মন খারাপ করে ঘরে বসে থেকো না। একবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, বেচারার মুখটা ছোট হয়ে গেছে।”

জোনাকি বিপ্লবকে বুকে টেনে নিয়ে মন ভাল করে, সাজগোজ শুরু করে। রবীন হীরুদার বাড়ি যাওয়ার নাম করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গিয়ে পৌঁছায় গলামনের পাড়ে পাগল মহারাজের আশ্রমে। মানুষ একা হলে একা মানুষ খোঁজে।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078