নাম তার ছিল: ৩০

পূর্বকথা: ভোট মিটে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় বিপ্লবকে নিয়ে বাবলুর চায়ের দোকানে ঢুকেছিল রবীন। সেখানে ভোট কেমন হল জিজ্ঞেস করায় একজন মুখের উপর বলে তাদের কোনদিনই ভোট দিতে দেয় না রবীনের পার্টি। শুনে বিপ্লব বাবার উপর রাগ করে বাড়ির পথ ধরে।

“আপনার মৃত্যুচিন্তা আসে?”

“আসে।”

“কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই মৃত্যুতে বিশ্বাস করেন না?”

“ও জিনিসটায় বিশ্বাস না করে কি উপায় আছে, মাস্টারমশাই?”

“না, মানে আমি বলছি আমাদের কাছে মৃত্যু মানে যেমন সব শেষ, আপনি নিশ্চয়ই তা মনে করেন না?”

“কেন?”

“না ঐ যে গীতায় কি সব আছে? আমার গিন্নী বলে ‘বাসাংসি জীর্ণানি…”

“…যথা বিহায় / নবানি গৃহ্নাতি নরোয়পরাণি। / তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি / সংযাতি নবাণি দেহী।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। আপনি কি এটা বিশ্বাস করেন না?”

“পড়েছি। ঋষিবাক্য, চট করে অবিশ্বাস করি কী করে? কিন্তু কথা কী জানেন? যতক্ষণ শরীর না যাচ্ছে ততক্ষণ তো এটা সত্যি কিনা তা বোঝার উপায় নেই। আর সত্যি যদি হয়ও, নতুন শরীরে গিয়ে কি আমি টের পাব যে এই আমি সেই আমি? পাব না। তাহলে আর এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী?”

“তাহলে আপনিও আমাদের মতই মনে করেন মরলেই সব চুকে বুকে গেল?”

“অ্যাদ্দিন তো তাই দেখে এলুম। কাছের, দূরের কত মানুষকে তো মরতে দেখলুম। কাউকে তো নতুন চেহারায় ফিরে আসতে দেখিনি এ পর্যন্ত। যাচাই না করে বিশ্বাস করি কী করে বলুন দেখি? আমার ঠাকুরও তো যাচাই করতে বলতেন। সেসব তো আপনি জানেন নিশ্চয়ই?”

“হ্যাঁ, শুনেছি কিছু কিছু। বিপ্লব যখন ছোট ছিল তখন আমার গিন্নী ওকে কিছু বইপত্তর কিনে দিয়েছিল মিশনের। সেখানেও দেখেছি কিছু কিছু।”

“কিন্তু ছেলে তো ও লাইন ধরেনি?”

“ছেলে আমার লাইনও ধরেনি।”

“তা কেন বলছেন? যা শুনেছি তাতে ছেলে তো আপনার বামপন্থীই।”

“ছিল এককালে। এখন বোধহয় ভোগপন্থী।”

“নিশ্চিত? আমার কিন্তু সন্দেহ আছে।”

“আপনি আর আমার ছেলেকে দেখলেন কতটুকু?”

“যেটুকু দেখেছি তা থেকেই বলছি, মাস্টারমশাই। অত হতাশ হবেন না। ও ছেলে ভোগবাদী হবে না। আপনার অংশ ওর মধ্যে খুব জোরালো।”

“আপনি ওকে শেষ দেখেছেন বছর দশেক আগে। তখন আমারও তাই মনে হত। তারপর তো সে ছেলে বদলে গেল। পুরোটা ওর দোষ নয় অবশ্য। ওদের কলেজে সেই যে ওর বন্ধুটাকে পিটিয়ে মেরে দিল বদমাশগুলো… তাইতে বিপ্লব বড় আঘাত পেয়েছিল। সেই থেকেই…”

“আপনি ভোগবাদী বলছেন কেন? হায়দরাবাদ চলে গেছে বলে?”

“ঠিক তা নয়। এখানে থাকতেই তো কেমন একা একসেড়ে হয়ে গেল। আমার পার্টি না-ই করল। যদি অন্য কোন পার্টিও করত আমার দুঃখ থাকত না, মহারাজ। রাজনীতি করতেই হবে, তাও বলছি না। কিন্তু ও যে আসলে পালিয়ে গেল। আমার দুঃখ সেইখানে। এখানে থাকল, না হায়দরাবাদে থাকল, না লন্ডনে থাকল সেটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে নিজের কেরিয়ার, নিজের পরিবার, নিজের টাকা, নিজের ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এসব নিয়েই পড়ে থাকল, নাকি অন্যের সুখ দুঃখের কথা ভাবল? কমিউনিস্ট যদি না-ও হয়, কেবল নিজের জন্যে বাঁচাটা কি বাঁচা? আপনিই বলুন?”

“ভোগবাদের হাত বড় লম্বা, মাস্টারমশাই। তার জাল ভারী সূক্ষ্ম। সে জালে আপনার ছেলে ধরা পড়েছে হয়ত। কিন্তু আপনি দেখবেন, ও বেরিয়ে আসবে ঠিক।”

“আসবে? বলছেন আসবে?”

“নিশ্চিত।”

“আপনার কথাই যেন সত্যি হয়। এটুকু যেন দেখে যেতে পারি।”

“কেন পারবেন না? এখনই চলে যাওয়ার কথা ভাববেন না, মাস্টারমশাই। আপনার এখনো অনেক কাজ বাকি।”

গলামন নদীর ঘাটে বসে পাঁচ বছর আগে এমন এক সন্ধ্যায় পাগল মহারাজের সাথে সেই কথোপকথন রবীনের মনে পড়ে। “ছেলেটা ফিরে এসেছিল, রাখতে পারলাম না,” আপন মনে বলে।

“কী গো? একা একা বইস্যা কী বিড়বিড় করতাছ?”

ফাল্গুনীর গলার আওয়াজে চমকে ওঠে রবীন।

“আয়, বোস। একটা বিড়ি দে তো। মাথাটা টিপটিপ করতাছে।”

ফাল্গুনী দুজনের বিড়ি ধরিয়ে জিজ্ঞেস করে “তোমার সাথে কে একটা বইস্যাছিল না? ছাদ থিকা দ্যাখলাম মনে হইল?”

“হুম। বিপ্লব।”

“তা গেল কই?”

“বাড়ি চইল্যা গেল।”

“ও মা! এইটুক বইস্যাই চইল্যা গেল?”

বিড়িতে দুটো টান মারতেই রবীনের বুকটা কেমন জ্বালা করতে লাগল। মাথাটাও মনে হল ছেড়ে যাওয়ার বদলে কেমন ভারী হয়ে যাচ্ছে। চোখ বুজে ফেলতে ইচ্ছে করল। সেই অবস্থাতেই আরেকটা জোর টান মেরে ধোঁয়া ছেড়ে বলল “এই প্রাইমারি স্কুলের বুথটায় আজকে বলর ভুয়ো ভোটারগুলো মার খেয়েছে, না?”

“হ্যাঁ। যা মার মেরেছে না। মেরেই ফেলত। পুলিশ এসে উদ্ধার করেছে। তাও একজনের পা ভেঙে গেছে।”

“মানুষ আর কদ্দিন সহ্য করবে?”

“বলর তো তারপরেও লজ্জা নেই। নাটু যারা মারায় নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের বাড়ি গিয়ে থ্রেট দিয়ে এসেছে। বিজয় মিছিল করে এসেই নাকি ওদের দেখে নেবে।”

রবীন বিড়িটা অর্ধেক খাওয়া অবস্থাতেই ছুঁড়ে ফেলে দিল। মাথাটা বড্ড ব্যথা করছে, বুকের জ্বলুনি বেড়েই চলেছে। চোখ বন্ধ করে চুলগুলোর গোড়া ধরে টানতে টানতে রবীন বলল “এবার আর বিজয় মিছিল হবে না।”

“কী গো, রবীনদা? কী হল? মাথাটা খুব ব্যথা করছে?”

রবীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে পারে শুধু।

“চলো, বাড়ি চলো। তোমায় দিয়ে আসি।”

“আরে কিচ্ছু হয়নি। একটু চা খেতে পারলেই…”

“আচ্ছা, তুমি বসে থাকো এইখানে।”

ফাল্গুনী দৌড়ে রিকশা স্ট্যান্ডের চায়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে আসে। কয়েক চুমুক খেয়ে মাথার ব্যথাটা যেন একটু কমেছে মনে হয় রবীনের। তবে হাতে পায়ে তেমন জোর পাওয়া যায় না। বুকের জ্বালাটা কমে, কিন্তু পুরোপুরি যায় না। কাশি আসে, ফাল্গুনী ভাবে বিষম খেল বুঝি। খানিকটা কেশে নিয়ে চায়ে আরেকটা চুমুক দিয়ে রবীন বলে “বোধহয় ঘাম বসে ঠান্ডা লেগে গেছে, বুঝলি?”

“তাই হবে। যা গরম পড়েছে।”

চা শেষ করে রবীন বলে “নে, এবার তুই চা খেয়ে নে। তারপর চ বাড়ি গিয়েই বসি। শরীরটা ঠিক সুবিধের লাগছে না। একটু আগেই ঠিক ছিলাম…”

“তুমি চলো। আমি আর খাব না, বাড়ি থেকে এক কাপ খেয়েই বেরিয়েছি।”

উঠে দাঁড়াতে গিয়ে রবীন টলে গেল। ফাল্গুনী না ধরলে পড়েই যেত।

“কী গো? মাথা ঘোরাচ্ছে নাকি?”

“হ্যাঁ, ঘুরে গেল হঠাৎ।”

ফাল্গুনী কপালে হাত ছুঁইয়ে বলে “জ্বর তো নেই মনে হচ্ছে। যা-ই হোক, তুমি বাড়িই চলো।”

রবীন মন্থর পায়ে ফাল্গুনীর সাথে হাঁটতে শুরু করে।

“তুমি কী বলছিলে? বিজয় মিছিল হবে না?”

“না রে। হবে না।”

“কিন্তু আমরা তো বহুদিন এখানে হারিনি, রবীনদা?”

“শেষ হেরেছিলাম চুরাশির ভোটে। কিন্তু এবার হারব।”

“তুমি নিশ্চিত?”

“নিশ্চিত। বিপুল ভোটে হারব।”

ফাল্গুনী চুপ করে যায়।

“আরো বলি শোন। এবারে মমতা আমাদের থেকে বেশি সিট পাবে।”

ফাল্গুনী হেসে ফ্যালে।

“হেসে নে, হেসে নে। খুব কঠিন দিন আসছে। আমি থাকব কিনা জানি না, তোরা তো থাকবি। তোদেরই সামলাতে হবে।”

রবীন বাড়ি ঢুকে বিপ্লবকে দেখতে পেল না। ফাল্গুনীই জিজ্ঞেস করল “বৌদি, বিপ্লব কোথায়? কতদিন দেখিনি ওকে।”

“এরা বাপ ব্যাটায় কী যে করে! দুজনে দিব্যি একসাথে হাঁটতে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দেখি ছেলে একা ফিরে এল। জিজ্ঞেস করলাম ‘বাবা কোথায় রে?’ সে কিছু না বলে দুদ্দাড় করে উপরে চলে গেল।”

“রবীনদার তো শরীরটা খারাপ।”

রবীন ক্ষীণ কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল কিচ্ছু হয়নি, কিন্তু জোনাকি ততক্ষণে শুরু করে দিয়েছে।

“দেখেছিস কাণ্ড? বললে কোন কথা শোনে? সারাদিন রোদের মধ্যে টো টো করে ঘুরে বেড়াতে বারণ করেছিলাম। তার জন্যে কি মুখ ঝামটা সহ্য করতে হল! এখন বোঝো। আর অদ্ভুত ছেলেও জুটেছে আমার কপালে। অসুস্থ বাবাকে রাস্তার মধ্যে ফেলে চলে এল। তুই দেখতে না পেলে কী হত বল তো?”

রবীন এতক্ষণে গলা তুলে বলতে পারে “আঃ! কী হচ্ছে কি? বিপ্লব যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ আমার শরীর ভালই ছিল। খামোকা ওকে দোষ দিচ্ছ কেন?”

জোনাকির চেঁচামেচি শুনে বিপ্লব নেমে আসে।

“কী হয়েছে বাবার, ফাল্গুনীকাকু?”

“আরে! আয় আয়, তোকে একটু দেখি” বলে ফাল্গুনী বিপ্লবকে পাশে বসায়। “তেমন কিছু হয়নি। ঐ মাথাটা ঘোরাচ্ছিল আর কি। আসলে এই গরমে সারাদিন দৌড়াদৌড়ি গেছে তো।”

“তা এত দৌড়াদৌড়ি না করলেই তো হয়।”

“এটা তুই কী বললি, বিপ্লব? তুই তোর বাবাকে চিনিস না? রবীনদার তো পার্টিটাই জীবন। এটা ছাড়া লোকটা বাঁচতে পারে?”

“বাবাকে চিনি?” বাঁকা হেসে বিপ্লব বলে। “ভাবতাম চিনি। এখন দেখছি ততটা চিনি না। যাকগে।”

বলে আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে যায়। ফাল্গুনী অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে, রবীনের দিকে তাকাতে চায় না। রবীনও চোখ বুজে ফ্যালে।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৯

পূর্বকথা: ভোটের আগের দিন হঠাৎ বিপ্লব এসে হাজির। ওর চাকরিতে কোন গোলমাল হয়নি নিশ্চিত হওয়ার পর অসুস্থ মিনতি বৌদিকে দেখতে যায় রবীন। বিপ্লব নিজের ঘরে গিয়ে আবিষ্কার করে, বাবা এখন তার স্মৃতি আঁকড়েই বেঁচে আছে। মিনতি বৌদির বাড়ি থেকে ফিরে রবীন ঘোষণা করে, তার সন্দেহ নির্ভুল। বামফ্রন্ট সরকারের দিন শেষ।

ভোটের দিন সকাল থেকে রবীনের শরীরটা সুবিধের লাগছিল না। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খেয়েই বিড়ি ধরিয়ে পায়খানায় গিয়ে বসা চিরকালের অভ্যেস। চা শেষ করতে না করতেই বেগ এসে যায় বরাবর, না হলে বিড়িতে দুটো টান দিলেই কাজ হয়। কিন্তু সেদিন চায়ের পর তিনটে বিড়ি শেষ করে ফেলেও লাভ হল না। অথচ অনেক দিন বাদে বিপ্লবকে পাশে নিয়ে শুয়ে ঘুমটা বেশ ভাল হয়েছিল। ভাল ঘুমের পর সকালে এই সমস্যা কখনো হয়েছে বলে রবীন মনে করতে পারে না। অস্বস্তি নিয়েই দাঁতটা মেজে এসে ঢকঢক করে দু গ্লাস জল খেয়ে ফেলল। তবু পায়খানা পায় না। এদিকে পেটটা ফুলে ঢোল।

আজই দরকার ছিল ঝটপট প্রাতঃকৃত্য সেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া, আর আজই কিনা এরকম হল? রবীন নিজের উপরই বিরক্ত হল। আটটা অব্দি আরো কয়েক গ্লাস জল, ঘরের মধ্যে হনহন করে হাঁটাহাঁটির পরেও যখন পায়খানা পেল না, তখন সিদ্ধান্ত নিল এবার বেরিয়েই পড়বে। স্নান সেরে এসে পায়জামা পরতে পরতে জোনাকিকে বলল “আমার ভোটার কার্ডটা বের করে দাও, ভোটটা দিয়ে চলে যাই। সারা দিনে আর সময় পাব না।”

“খালি পেটে বেরিয়ে যাবে?”

“খাওয়ার জায়গা নেই। পায়খানাটা হল না তো।”

“তা করে বেরোও।”

“এখন হবে না। অনেক তো চেষ্টা করলাম।”

“এরকম হচ্ছে কেন? টেনশন করছ নাকি?”

রবীন থমকে দাঁড়ায়।

“না না। কিসের টেনশন? যা হবার তো হবেই। কী হবে তা তো বুঝেই গেছি।”

“আচ্ছা বেরোও। কিন্তু এখনই ভোট দিতে যেয়ো না, পরে এসে দিও। এতদিন পর ছেলেটা বাড়িতে। একসাথে ভোট দিতে যেতাম।”

“ও কি যাবে ভোট দিতে? কোনদিন তো ভোট দেয়নি?”

“যাবে, যাবে। আমাকে বলেছে। এবার ভোট দেবে বলেই তাড়াহুড়ো করে এল।”

অস্বস্তি, উৎকণ্ঠার মধ্যেও রবীনের বেশ ভাল লাগে কথাটা শুনে। ছেলে তখনো দেয়ালের দিকে ফিরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। পিঠে হাতটা বুলিয়ে বলে “আচ্ছা। থাক তাহলে। আমি বেরোই। আসব তাহলে দুপুরের দিকে একবার।”

“খাবে কোথায়?”

“খেয়ে নেব কারো বাড়িতে।”

“কোন দিকে থাকবে তুমি?”

সাইকেল বার করতে করতে রবীন বেশ চটেই গেল। “তিরিশ বছর বিয়ে হয়েছে, এখনো এইসব প্রশ্ন করো? ভোটের দিন কি এক জায়গায় বসে থাকি?”

“আমি জানি যে তুমি টো টো করে বেড়াবে,” জোনাকিও ঝাঁঝিয়ে ওঠে। “সেটাই করতে বারণ করছি। বয়সটা যে হচ্ছে সেটা তো ভালই বোঝা যাচ্ছে। অগ্রাহ্য করলে কী অবস্থা হয় সেটা তো দেখলে কদিন আগে। শিক্ষা হবে না তোমার।”

ওসব কথায় কান দেওয়ার সময় তখন রবীনের নেই।

একটা নাগাদ ঘেমে নেয়ে বাড়ি ফিরল। বিপ্লব আর জোনাকির তখন সবে স্নান সারা হয়েছে।

“চল চল। এখন বুথটা ফাঁকা আছে দেখে এলাম। দুটো আড়াইটের পরে আবার লাইন লেগে যাবে।”

“রোদ থেকে এলে, একটু বসে নাও?”

“আরে একেবারে এসে বসব। চলো চলো, দেরী করে লাভ নেই।”

“বাবা, খুব ঘেমে গেছ। পাঁচ মিনিট বসো, তারপর যাব,” বিপ্লব প্রায় বাবার মত জোর দিয়ে বলে।

রবীনের অবাক লাগে, ভালও লাগে। মনে পড়ে, বাবা ক্যান্সার অপারেশনের পর যখন শয্যাশায়ী, তখন ডাক্তারের বারণগুলো কিছুতেই শুনতে চাইত না। রবীন, সবচেয়ে ছোট ছেলে রবীন, তখন তার বাবাকে শাসন করত। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবা রবীন কিছু বললে মেনে নিত। ধমকা ধমকি করে বাবাকে চিরতার জল বা ইসবগুল খেতে বাধ্য করে সে নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদত। কারণ রবীনের বাবা কোনদিনই অন্য বাবাদের মত ছিল না। রবীনকে কখনো ধমকেছে বলে মনে পড়ে না। দাদাদের দু একবার ধমকাতে দেখেছে, মায়ের সাথেও কোনদিন উঁচু গলায় কথা বলতে শোনেনি। বরং মনে পড়ে, মা যখন রাতে বাবাকে খেতে দিত তখন বাবার পাশে বসে রবীন আর ওর পিঠোপিঠি ছোড়দি অনেক আবোল তাবোল প্রশ্ন করে যেত, এ ওর নামে নালিশ করত। মাঝেমাঝে মা বিরক্ত হয়ে বলত “সারাদিনের পরে মানুষটা খাইতে বইছে, এহন তগো বকবক না কল্লে হয় না?” বাবা হাত তুলে বলত “থাউক, থাউক। অগো পরানের কথাও তো শুনতে লাগব।”

রবীন যখন কাঁদত, তখন বাবার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা বুড়িমা পা টিপে টিপে এসে পিঠে হাত বুলিয়ে বলত “কাইন্দো না, ভাই। কাইন্দো না। তুমি কোন অন্যায় করতাছ না। বাপ-মায়ের বয়স হইলে তারা পোলাপান হইয়া যায়। তহন তাগোও শাসন করতে লাগে। তুমি তো আর নিজের জন্যে করতাছ না, বাপের ভালর জন্যই করতাছ। ওতে দোষ নাই।”

রবীন ভাবল তারও তো দিন শেষ হয়ে এল। ছেলেটা জোয়ান হয়েছে, এখন তার কথা তো শুনতেই হবে। ভেবে বসেই পড়ল। পাঞ্জাবিটা খুলে রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে ভারী আরাম লাগল। রবীন অনুভব করল সে ভীষণ ক্লান্ত। বিপ্লব উঠে এসে পাঞ্জাবি দিয়ে গা মুছিয়ে দিল। রবীন আরো অবাক হল। ছেলের মনে তার জন্যে এত জায়গা আছে সে ভাবেনি।

খানিকক্ষণ পাখার নীচে বসে ঘাম শুকোবার পর রবীনের মনে হল, এখানেই ঘুমিয়ে পড়তে পারলে ভাল হত। কিন্তু ভোটটা দিতে তো যেতে হবে। তিন তিনটে ভোট। এবারের নির্বাচনে পার্টির একজন ভোটারও যেন বাড়িতে বসে না থাকে সেটা দেখা খুব জরুরী। নিজেকে জোর করে ঠেলে তোলে রবীন।

“চলো, জোনাকি। শাড়ি পরা হয়েছে?”

“আমি তো চান করেই ভাল শাড়ি পরে নিয়েছি। আমরা রেডি। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।”

বুথের দিকে যেতে যেতে জোনাকি বলে “তুমি তো আরেকটু হলে ঘুমিয়ে পড়ছিলে, ভোট দিয়ে এসে আর বেরিয়ো না, বুঝলে? ভাত খেয়ে টেনে ঘুম দাও। সকালে তো শরীরটা ভাল ছিল না।”

“হ্যাঁ, আর বেরোব না ভাবছি।”

“বেরোবে না?” বিপ্লব খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। “তুমি তো কোনদিন ভোটে দুপুরবেলা বাড়ি ঢুকে পড়ো না!”

রবীন বলতে চাইল না শরীরটা সত্যিই আর দিচ্ছে না। ওরা অযথা চিন্তা করবে। অবশ্য তার চেয়েও বড় কারণ একটা ছিল। সেটা বিপ্লবকে বলা চলে না।

“তবে ভাত আর খাব না, জোনাকি। খেয়েছি।”

“কোথায় খেলে?”

“মইদুলদের বাড়িতে।”

“সেই আজাদপুরের মইদুলকাকু?” বিপ্লবের চোখে একটা অনেক দিনের পুরনো ঝিলিক দেখতে পেল রবীন।

“হ্যাঁ। তোর মনে আছে ওকে?”

“ও বাবা, মনে থাকবে না? সেই আমার আঁকার খাতায় কি সুন্দর সুন্দর স্কেচ করে দিত। তারপর মইদুলকাকুকে বিয়ের পর একদিন খেতে বলেছিলে আমাদের বাড়িতে… কাকিমাকে অপূর্ব দেখতে… সে খাওয়ার পরে কিছুতেই মাকে এঁটো কুড়োতে দেবে না… তুমি তখন খুব ধমকালে। বললে ‘তোমার ভাই, ভায়ের বউ বাড়িতে খেতে গেলে কি তুমি তাদের পাত কুড়োতে দাও?’ তখন কেঁদে ফেলল। শেষে বলল ‘তাহলে আমাদের বাড়ি একদিন বৌদি, বিপ্লবকে নিয়ে খাবেন বলুন?’”

“হ্যাঁ। আমি তখন বললাম ‘তোমার শাশুড়িকে গিয়ে জিজ্ঞেস কোরো তো আমি তোমাদের বাড়ি কতবার খেয়েছি? আমরা কমিউনিস্ট পার্টি করি। আমাদের ওসব বাছবিচার কোনদিন নেই। মইদুলের যদি আমি এসব দেখি, ওকে মারব ধরে।’”

“কিন্তু কাকিমা তাও শুনছিল না। বলল ‘বৌদি তো পার্টি করে না, দাদা। ওনার তো অসুবিধা থাকতে পারে।’ তখন মা বলল ‘আমি রামকৃষ্ণের ভক্ত। আমার গুরু কলমা পড়ে মুসলমান হয়েছিলেন, খ্রীষ্টানও হয়েছিলেন। আমার ওসব বাতিক থাকতে যাবে কেন?’”

“বাব্বা! জোনাকি? ছেলের তো সবই মনে আছে গো! তখন কতই বা বয়স ওর!”

“আমি তখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি।”

“তা এত মনে আছে আর আসল কথাটাই চেপে গেলি?” জোনাকি মুখ টিপে হাসে।

“কী কথা?”

“এ মা! তোমারও মনে নেই? ওদের বাড়ি আমরা যেদিন খেতে গেলাম সেদিন তোমার ছেলে মইদুলের বউয়ের গালে হাত বুলিয়ে বলল ‘তোমাকে পরীর মতন দেখতে।’ তাতে সে বলল ‘আহা রে, এমন কথা তো আমায় আর কেউ বলেনি। তুমি আগে বললে না কেন গো? আমি তা’লে তোমাকেই বিয়ে করতাম।’”

রবীনের মনে পড়ে যায়। ছেলেকে আড়চোখে দেখে নিয়ে বলে “মইদুলের মেয়ে কিন্তু ওর মায়ের চেয়েও সুন্দরী হয়েছে। তোমার মনে আছে একদিন হাওড়া স্টেশনে আমাদের সাথে দেখা হল?”

জোনাকি কোন উত্তর দেওয়ার আগেই বিপ্লব গম্ভীর গলায় বলে “বাবা, এই আলোচনাটার কোন দরকার নেই।”

রবীন চুপ করে যায়, জোনাকিও কথা বাড়ায় না। পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার মত এই কয়েকটা মুহূর্ত নষ্ট করে লাভ নেই।

ভোট দিয়ে ফেরার সময় পার্টির ক্যাম্পে রবীন চেঁচিয়ে ফাল্গুনীকে জিজ্ঞেস করে “কত হল রে?”

“ষোলশো চুয়ান্ন পড়ে গেছে এর মধ্যেই।”

“তার মানে প্রায় ফিফটি পারসেন্ট। বহুত আচ্ছা।”

“মোট কত ভোট আমাদের এখানে, বাবা?” বিপ্লব জিজ্ঞেস করে।

“তিন হাজার দুশো ছাব্বিশ।”

বাড়ি ফিরে বিপ্লব আর জোনাকি খেতে বসে, রবীন বালিশ নিয়ে শুয়ে পড়ে। হঠাৎ খেয়াল হতে জোনাকি জিজ্ঞেস করে “হ্যাঁ গো, তোমার আর পায়খানা হলই না?”

“হল তো। মইদুলদের বাড়িতে। ও আমাকে বলেই রেখেছিল ‘এদিকে এলে আমার বাড়িতেই খাবেন।’ তা ওর বাড়ি যেতে ওর গিন্নী আমপোড়ার শরবত দিল, সেটা খেতেই পেট গুড়গুড়, তারপর ফার্স্ট ক্লাস পায়খানা হল।”

“বাঃ! তাহলে তারপরে বেশ তৃপ্তি করে খেতে পারলে নিশ্চয়ই?”

“সে আর বলতে? রাবেয়ার তো রান্নাটা চমৎকার।”

“অনেক কিছু খাওয়াল?”

“হ্যাঁ… ভাত, মাছের মাথা দিয়ে মুগ ডাল… আলু… ভাজা… মাংস…” বলতে বলতে কথা জড়িয়ে গেল রবীনের। বহুকালের ঘুম নেমে এল চোখে।

ঘুম ভাঙল সন্ধে নামার পর। জোনাকি ততক্ষণে পছন্দের সিরিয়াল দেখতে বসে গেছে। ইচ্ছে থাকলেও খবর দেখা যাবে না। রবীন চোখ মুখ ধুয়ে এসে দেখল বিপ্লব টিভির দিকে পেছন ফিরে বসে কি একটা বই পড়ছে।

“কী রে? কী বই পড়ছিস?”

“‘তোমার জন্যে পংক্তিভোজন’।”

“ও, সেই অনিন্দ্যদার বইটা?”

“হুম। তোমাদের দুজনকে উপহার দিয়েছিল।”

“হ্যাঁ। সেসব কবেকার কথা… মনে হয় যেন গত জন্মের কথা। যত বড় কবি, তত বড় মানুষ। ভাল মানুষগুলোই সব আগে চলে যায়। আর যত আজেবাজে লোক…” দীর্ঘশ্বাসটা বেরিয়েই পড়ে। “যাক গে। আমি একটু হেঁটে আসি।”

“চলো আমিও যাই।”

রবীন আবার অবাক হয়, ভাবে এ সুখ টিকবে তো? চায়নি, তবু গেয়ে ফেলে “তুমি তো সেই যাবেই চলে / কিছু তো না রবে বাকি।” বিপ্লবের মুখটা নিমেষে কালো হয়ে যায়। ঠিক যেমনটা ওর ছোটবেলায় হত, রবীন যদি কখনো বলত “বাবা কি আর চিরকাল থাকবে রে?” মুখটা দেখে রবীনের তীব্র অপরাধবোধ হয়। ইশ! ভারী অন্যায় হল ছেলেটার প্রতি। কত বড় হয়ে গেছে, কত দূরত্ব তৈরি হয়েছে তার সঙ্গে সেসব কথা না ভেবে রবীন ঠিক তা-ই করে ফেলে যা বিপ্লবের ছোটবেলায় করত এই সময়। বুকে জড়িয়ে ধরে। “চল বাবা, ঘুরে আসি।”

রবীন আজ মোটেই হাঁটতে বেরোয়নি, বেরিয়েছে কোথায় কেমন ভোট হল কমরেডদের থেকে সেই খবর নিতে। পার্টি অফিসে গিয়ে কোন লাভ নেই। সেখানে বলরাম আর শ্যামল তাদের স্তাবকবৃন্দ নিয়ে সারা সন্ধে বসে বসে ২৪ ঘন্টা দেখবে টিভিতে, আর রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে কী হতে চলেছে তা নিয়ে মনোজ্ঞ ভাষণ দেবে। ওরা নিশ্চিত যে এই কেন্দ্রে এবং গোটা পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট হৈ হৈ করে জিতবে। কোন পোলিং এজেন্ট যদি অন্যরকম কোন খবর দেয় তাকে ওরা উড়িয়ে দেবে, ভোটারদের শ্রেণীচরিত্র বোঝাবে হয়ত। রবীন বিপ্লবকে নিয়ে গিয়ে ঢুকল বাবলুর দোকানে।

“বাবলু, চা দে।”

“আরে! বিপ্লববাবু কবে এল?”

“এই তো। পরশু।”

“তোমারও কি লাল চা?”

“না, আমার দুধ চা।”

দোকানে তখন বেশ লোকজন। রবীন জিজ্ঞেস করল “বাবলু ভোট দিলি?”

ও কেমন নিরাসক্ত গলায় উত্তর দিল “দিলাম।”

“কেমন ভোট হল তোদের এদিকে? সব ঠিকঠাক ছিল?”

“আমাগো বুথে আর ঠিকঠাক ভোট কবে হয়, মাষ্টারমশয়?” এক কোণ থেকে একজন মাঝবয়সী লোক তীব্র শ্লেষে বলল।

রবীন কিছু বলল না, কিন্তু বাবলু বলল “কেন, এই বার আর অভিযোগ কিসের? যারা ঝামেলা কত্তে আইছিল তাগো ভাগায় দিছ। একজনের তো বোধহয় ঠ্যাঙও ভাইঙ্গা দিছ। আর কী চাই?”

“তা ভাঙছি। আবার আইলে আবার ভাইঙ্গা দিমু। কিন্তু অরা আইব ক্যান? আপনেই কন মাষ্টারমশয়? আমরা বিপদে আপদে আপনাগো কাছে যাই। তা বইল্যা আপনেরা বাইর থিকা মস্তান আইন্যা ভোট দিয়া দিবেন ক্যান? আমাগো ভোট আমাদেরে দিতে দিবেন না? আমরা গরীব মানুষ বইল্যা কি আমাগো ভোটের দাম নাই?”

রবীন উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাবলু প্রচণ্ড জোরে ধমকে উঠল “আরে তুমি চেনো না, শোনো না, কথা কও ক্যান? কারে কী কইতাছ? এই মাস্টারমশাই লোক নিয়া গেছিল বুথে?”

“তা তো কই নাই,” লোকটাও রুখে উঠল। “কিন্তু উনার পার্টিরই লোক তো সব। উনারে শুনতে অইব।”

“কে কইছে ওনার পার্টির লোক? গায়ে ল্যাখা আছিল?” বাবলু এবার গায়ের জোরে তর্ক করতে শুরু করল। লোকটাও ছাড়বার পাত্র নয়। হাতাহাতির উপক্রম দেখে রবীন উঠে বাবলুকে জড়িয়ে ধরল। সে চেঁচিয়েই চলল। অন্য খদ্দেররা সেই লোকটাকে ধরে ফেলে জোর করে বসাল। অনেকে ধমক ধামক দিল অপ্রিয় কথা বলার জন্যে। লোকটা সি পি এম আর বাবলুকে কাঁচা খিস্তি করতে করতে দোকান থেকে বেরিয়ে গেল।

বাবলুকে একটু ঠান্ডা করে, চা না খেয়েই রবীন বিপ্লবকে নিয়ে বেরিয়ে হরিমতীর ঝিলের ধারে এসে বসল। এতক্ষণ পরে ছেলের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে চেহারাটাই বদলে গেছে। ফুঁসছে।

“তোমরা তাহলে এখানেও ছাপ্পা মেরে জেতো।”

রবীন চুপ করে থাকে।

“এই জন্যে। এই জন্যে আমি চলে গেছিলাম। এই জন্যে ঠিক করেছিলাম আর কোনদিন আসব না।” বলেই বিপ্লব উঠে হনহনিয়ে হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে। রবীনের মনে হয় ও পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে গেছে। এই ঝিলের ধার থেকে উঠে আর কোনদিন বাড়ি ফিরতে পারবে না।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

নাম তার ছিল: ২৮

পূর্বকথা: ভোটের প্রচারে বেরিয়ে মানুষের শীতলতা দেখে বিপ্লবের ধারণা হয়, খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। যেদিন প্রচার শেষ হল, সেদিন সন্ধেবেলা হঠাৎ বিনা নোটিশে বিপ্লব এসে পড়ল। রবীনের আশঙ্কা হল, চাকরিটা আছে তো?

হঠাৎ এসে বাবাকে চমকে দেবে ভেবেছিল বিপ্লব। কিন্তু বাবা যে দুশ্চিন্তায় পড়বে তা কল্পনা করেনি। মা খুশি হয়েছে, বাবাও। কিন্তু বাবার যেন আনন্দের চেয়ে উদ্বেগ বেশি।

বিপ্লব ঠিক করেই এসেছিল বাবার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু এসে বুঝল, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। প্রথমে মনে হল এভাবে হঠাৎ এসে পড়ায় বাবা বেশ অসন্তুষ্ট। বিপ্লব বাড়িতে ঢোকার একটু পরেই কারেন্ট এল। বাবা তখনো একটাও কথা বলেনি। বিপ্লবও বলেনি, মায়ের একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সুযোগই পায়নি। কারেন্ট আসতেই বাবা দৌড়ে গিয়ে পাম্পটা চালিয়ে দিল। বলল “পাঁচ মিনিট চলুক, তারপর গিয়ে গা ধুয়ে নে।” গা ধুয়ে এসে বিপ্লব যখন ডাইনিং টেবিলে চিনি দিয়ে গরম পরোটা খেতে বসল, তখন বাবা কথা বলতে শুরু করল।

“হ্যাঁ রে, হঠাৎ চলে এলি? চাকরিটা? আছে তো?”

“আরে! চাকরি যাবে কেন?”

“না, তুই খবর টবর না দিয়ে দুম করে চলে এলি…”

“এসেছে তাতে ক্ষতিটা কী হয়েছে?” মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে। “ছেলেটা এতদিন পরে বাড়ি এল সেটা তোমার ভাল্লাগছে না?”

“না না, ভাল লাগবে না কেন? কিন্তু ও তো আসতে চায় না খুব একটা…”

“আসতে চায় না তোমাকে বলেছে কখনো? সবকিছুই নিজের মত করে ভেবে নাও তুমি।”

“আরে তুমি সবেতে এভাবে কথা বল কেন, জোনাকি? আজকাল চাকরি বাকরির কী অবস্থা তুমি জান? চিন্তা হবে না?”

“না না, চিন্তার কিছু নেই, বাবা। আমি ছুটি নিয়েই এসছি। এই চাকরিটায় ঢোকার পর থেকে তো কোন বড় ছুটি নিইনি। তাই বস এক কথায় রাজি হয়ে গেল।”

“অ,” বাবা যেন ঠিক নিশ্চিন্ত হল না। “তা পরশুই তো কথা হল। তখন তো বললি না কিছু?”

“তখনো ভাবিনি আসব। কাল সকালে মনে হল, বসকে অফিসে গিয়ে বললাম, রাজি হয়ে গেল। ব্যাস।”

“এরকম ঝট করে টিকিট কাটলি, অনেক টাকা লাগল না?”

“হ্যাঁ, ঐ সাড়ে তিন মত।”

“সাড়ে তিন! কদিন অপেক্ষা করে আসতে পারতিস তো। একটু কমে পেতিস।”

“তুমি থামো তো,” মা আবার ক্ষেপে যায়। “ওর টাকায় ও এসেছে। তুমি এত হিসাব করছ কেন?”

“তা তো ঠিকই,” বাবা মুখ নামিয়ে নিয়ে বলে। বিপ্লবের খুব ইচ্ছে করে বাবাকে সেই ছোটবেলার মত জড়িয়ে ধরতে। পারে না। বাবাই ছোটবেলার মত বিপ্লবের পিঠে একটা চাপড় মেরে উঠে দাঁড়ায়। বলে “দাও, বাজারের ব্যাগটা দাও।”

“এই আটটার সময় বাজার যাবে কেন?”

“ছেলেটা এতদিন পরে এল, একটু মাংস নিয়ে আসি।”

“বাবা, তুমি সারাদিন প্রচার সেরে ফিরলে, এখন আর বেরিয়ো না।”

“আরে আমার শরীর একদম ঠিক আছে। সেদিন রোদে, গরমে মাথাটা ঘুরে গেছিল আর কি। তারপর গত এক মাস দিব্যি চুটিয়ে প্রচার করলাম তো। কোন অসুবিধে হয়নি।”

“তাও। থাক না। কাল সকালে মাংস আনবে নাহয়,” মা বলে। “এখন ডিমের ডালনা করে দিই। ও তো ভালবাসে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই করো মা। কতদিন খাইনি ওটা। এগ বন্ডা খেতে খেতে ডিমের ডালনার স্বাদই ভুলে যাচ্ছি। আর ওখানে মাংস, বিরিয়ানি তো আকছার খাই।”

“আচ্ছা থাক তাহলে। কাল হবে মাংস। তুই মার সাথে গল্প কর, আমি একটু ঘুরে আসি।”

“আবার কোথায় যাবে? বাড়িতে থাকো না একটু। ছেলেটা এল…”

“চলে আসব তাড়াতাড়ি। এসে একসাথে খাব।”

“কোথায় যাচ্ছ সেটা বলবে তো?”

“একবার মিনতি বৌদিকে দেখে আসি। সকালে স্টেশনের কাছে পটলার সাথে দেখা হল। বলল কদিন ধরে নাকি বৌদির শরীরটা ভাল নেই। শ্বাসকষ্ট।”

“ও। তাহলে তো আমারও একবার যাওয়া দরকার।”

“তুমি যেয়ো পরে, আমি তো সময় পাব না। টুক করে ঘুরে আসি।”

কিছুক্ষণ বিপ্লবের হায়দরাবাদ জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর রান্নার সময় হল। “তুই যা একটু গড়িয়ে নে। আমার হয়ে গেলে তুলে দেব,” বলে মা রান্নাঘরে চলে গেল।

“না, এখন আর শোব না। তারপর রাতে ঘুম আসবে না। আমি একটু ওপরে যাচ্ছি।”

বিপ্লবের নিজের ঘরটার সাথে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ হবে। এই ঘরে একদিন বাবা ওর অবর্তমানে ঢুকে পড়ে পর্ন ম্যাগাজিনগুলো দেখতে পেয়েছিল। খাটের উপর ছড়িয়ে থাকা পত্রিকাগুলো জড়ো করে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে গিয়েছিল, বিপ্লবকে কিছু বলেনি। কিন্তু বুঝতে পেরে লজ্জা পাওয়ার বদলে ও বাবার উপরেই রেগে গিয়েছিল। সেটা চাকরি জীবনের গোড়ার দিকের কথা। তারপর থেকে বাবা আর কখনো কোন প্রয়োজনেই ও ঘরে যায়নি, মা তো মোটা শরীর নিয়ে পারতপক্ষে সিঁড়ি ভাঙে না। এত দিনে নিশ্চয়ই ঝুল কালি ভর্তি হয়ে গেছে ঘরটা।

ও ঘরে অনেক বই। ছোট থেকেই বাবা-মার দেওয়া উপহার মানেই ছিল বই। মামা, মাসি, পিসি, জ্যাঠা — যে যখন কিছু দিতে চেয়েছে, বিপ্লব বইই নিয়েছে। স্কুল, কলেজে আবৃত্তি, এটা সেটা করেও অনেক বই পুরস্কার পেয়েছিল। সেই প্রাণাধিক প্রিয় বইগুলোর জন্যে দেয়াল আলমারি বানিয়ে দিয়েছিল বাবা। কেরিয়ারিস্ট বিপ্লবের পড়ার অভ্যেস চলে গিয়ে সেসব বইতে ধুলো জমেছে এখানে থাকতেই। বইগুলোর মান ভাঙাতে হবে, আলমারিটাকে ঝাড়পোঁছ করতে হবে। একবার সব বার করে রোদে দেওয়াও দরকার। দেখতে হবে কোন বইতে পোকা ধরেছে কিনা। সেগুলোকে আলাদা করতে হবে। কয়েকটা বেছে সঙ্গে নিয়ে যাবে বিপ্লব। অনেক কাজ। ও ভেবেই এসেছে। তাই কাজ এগিয়ে রাখতে দোতলার ঘরে উঠে আসে।

দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে বেশ ভাল লাগল বিপ্লবের। নিজে উপরে না এলেও মা যে রত্নাপিসিকে দিয়ে নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করায় সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কোথাও ঝুল নেই, পশ্চিমের জানলার শিকগুলো পর্যন্ত ঝকঝকে। বিপ্লব নিজে যখন থাকত, তখনো এত পরিষ্কার থাকত না ঘরটা। বিছানার চাদরটাও কাচা এবং টানটান করে পাতা, বালিশগুলো পরিপাটি করে চাদর দিয়ে ঢাকা। ঠিক যেমনটা বাবা-মার ঘরে থাকে। মা নতুন কাজের লোক রেখেছে নির্ঘাত। নয়ত রত্নাপিসির মাইনে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। সে নিজে থেকে এসব কাজ করার লোক তো নয়! যাকগে, বইগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।

আলমারিটা খুলে আরো অবাক হতে হল। বহুদিন না খোলা বইয়ের আলমারি থেকে যে গন্ধ পাওয়া যায় তা নেই। বিপ্লবের বই গুছিয়ে রাখার অভ্যেস ছিল না। প্রিয়, বারবার পড়া বইগুলো থাকত নীচের তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বাদ বাকি উপর দিকের তাকগুলোতে। বইয়ের ঠ্যালায় সারাক্ষণ হুলুস্থুল। আলমারি খুললেই দু চারটে বই ধপাধপ মাটিতে পড়ত, কারণ সেগুলো কোন মতে ঠেসে ঠুসে রাখা ছিল। আজ বিপ্লব আলমারি খুলে দেখল ঠাসাঠাসি হলেও বইগুলো সব পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা। উপরের তাকে ওগুলো কী? মোটা মোটা কী বই ওগুলো? অন্য বইগুলোর চেয়ে তফাতে একটার উপর আরেকটা শুইয়ে রাখা? বিপ্লব পা উঁচু করে টানতে গেল, হুড়মুড়িয়ে মাথায় এসে পড়ল বই দুটো। বলা উচিৎ মাথায় ড্রপ খেয়ে মাটিতে পড়ল। ভেতর থেকে কিসব যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বই নয় তো! বিপ্লবের কবিতা লেখার ডায়রি। আর ছত্রখান হয়ে আছে নানা সময়ে খুচরো কাগজে লেখা কবিতাগুলো। এগুলো এখানে এল কোত্থেকে? বিপ্লব কবিতা টবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। কলেজে থাকতেই। হায়দরাবাদ চলে যাওয়ার সময়ে ওগুলোকে বাজে কাগজ মনে করে পুরনো খবরের কাগজ বিক্রির ঝুড়িতে ফেলে এসেছিল। খুচরো কাগজগুলো সম্ভবত এ বই সে বইয়ের মধ্যে গোঁজা ছিল। সেগুলোর কোন ব্যবস্থা করার কথা মনেও আসেনি তখন। “মরে গেলেও ফিরে আসব না” ঠিক করেই তো গিয়েছিল আসলে। এসব উদ্ধার করে এভাবে পরম যত্নে গুছিয়ে রাখল কে? কেন?

“মা, আমার ঘরে কে ঢুকেছিল গো?” বিপ্লব সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কেন রে? কিছু খুঁজে পাচ্ছিস না?” জোনাকি রান্নাঘর থেকে উত্তর দিল। “রত্না কালকে এলে জিজ্ঞেস করব, দাঁড়া। ওকে যত বলি জিজ্ঞেস না করে কিচ্ছু ফেলবে না, কিছুতেই শোনে না। মাটিতে কিছু পড়ে আছে দেখলেই না দেখে শুনে ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেয়…”

“আরে বাবা, তা নয়। আমার বইয়ের তাকটা দেখছি গোছানো, কবিতার ডায়রিগুলো ফেলে দিয়ে গেছিলাম, সেগুলোও দেখছি এখানে?”

“ও, তাই বল। ওটা মনে হয় তোর বাবার কাজ।”

“বাবা!”

“হ্যাঁ তোর বাবা তো এখন তোর ঘরেই শোয়। সারাদিনই টঙে চড়ে বসে আছে। কেউ এলে ডাকতে ডাকতে আমার গলা ফেটে যায়। কী যে খুটুর খুটুর করে সারাক্ষণ! ঐসবই করে বোধহয়। সেই যে সকালবেলা চা খেয়ে কাগজটা নিয়ে তোর ঘরে ঢোকে, লোক না এলে তো আর নামার নামই করে না। বেলা একটার সময় স্নান করতে যায় পুকুরে, তখন নামে, আবার খাওয়াদাওয়া করে উঠে যায়। এই ভোটের কদিন রুটিন বদলেছে। নইলে তো বাড়ি থেকে বেরোয়ই না। সারাক্ষণ ভূতের মত বাড়িতে বসে থাকা।”

বিপ্লব আর কিছু না বলে ঘরে এসে খাটে বসে পড়ল। মা তখনো পাড়া জানিয়ে বাবার গুণকীর্তন করেই চলেছে।

রবীন ঘোষাল আর বাড়ি থেকে বেরোয় না খুব একটা। সারাক্ষণ বাড়ির এক কোণে একা একা সময় কাটায়। কিভাবে কাটায়? হয়ত কাগজ পড়ে, বই পড়ে। আর যে কাজটা অবশ্যই করে বলে দেখা যাচ্ছে, সেটা হল প্রবাসী ছেলের ঘরটাকে যত্ন করে সাজায়। ছেলের প্রিয় বইগুলোকে আলমারিতে সাজিয়ে রাখে, তার পরিত্যক্ত কবিতাগুলো, যেগুলো সে কিলো দরে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে, সেগুলো রক্ষা করে। কেন করে? বিপ্লব ভাবতে চেষ্টা করে। রাজনীতিতে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া তার বাবা, সবুজগ্রামের চেহারা বদলাতে বদলাতে দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন দেখা রাজনীতিবিদ বাবা এখন তাহলে অন্য জগতে চলে যাওয়া ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে? ছেলের আর পড়তে না চাওয়া এক আলমারি বই আর কৈশোর, যৌবনের অবান্তর আবেগের বহিঃপ্রকাশ অচল কবিতা নিয়ে সারাদিন কাটে সেই লোকটার, যে নিজের রাজনীতি থেকে এক চুল সরে না বলে রাগে, অভিমানে, কতকটা ঘেন্নায় সবুজগ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল বিপ্লব? বাবাকে চিনতে কতটা বাকি ছিল তাহলে? তার চেয়েও বড় কথা বাবা এরকম কেন করে? আর কিছু করার নেই বলে? পার্টি, বন্ধুবান্ধব, স্ত্রী সকলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এই যে একখানা ঘরে জীবন যাপন করছে তার বাবা, সে কি আর সকলের কাছে বাতিল হয়ে গেছে ভেবে? বিপ্লব তো সোচ্চারে বাতিল করে গিয়েছিল রবীন ঘোষালের রাজনীতিকে। সকলের আগে। তাহলে তার স্মৃতিতে কেন আশ্রয় খোঁজে লোকটা? আর কোন উপায় নেই বলে? নাকি আশা করে একদিন ঠিক ছেলে ফিরে আসবে?

কেন এমন আশা করো, বাবা? তুমিই না বলতে ইতিহাসের চাকা সব সময় সামনের দিকে ঘোরে? তোমার কাছেই তো শুনেছিলাম মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে ঠিকই। কিন্তু প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসাবে, তারপর প্রহসন হিসাবে। তুমি কী মনে করো? আমি, তোমার ছেলে, একদিন ফিরে এসে বলব ‘না, বাবা। তুমি ভুল নও, আমিই ভুল। তোমার রাজনীতির দিন ফুরোয়নি’? বলে আমি তোমার মতই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব? এ কি হয়? তোমার ট্র্যাজেডিতে আমি কেন অভিনয় করতে যাব? আমি কি সং? আধুনিক পুঁজিবাদের সমস্ত সুবিধা আমি ভোগ করছি এখান থেকে অনেক দূরের একটা শহরে বসে। সেসব ছেড়ে কেন আমি ফিরে আসব তোমার পশ্চিমবঙ্গে? তোমরাই বা মার্কস-লেনিনের কোন স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে রেখেছ এখানে, যে আশা করছ আমি ফিরে আসব? আমি কাগজ পড়ি না? টিভি দেখি না? আমি জানি না তোমরা কী করেছ নন্দীগ্রামে? কী চেষ্টা করছিলে সিঙ্গুরে?

বাবাকে এইসব প্রশ্নে জর্জরিত করে খুব ঝগড়া করবে বলে একলা ঘরে রিহার্সাল দিতে থাকল বিপ্লব। আর এসব শুনে বাবার মুখটা কেমন হবে মনে পড়ে কেঁদে ফেলল ঝরঝরিয়ে। কিছু পরে নীচ থেকে মা হাঁক দিল “নেমে আয়, বাবা। আমার রান্না হয়ে গেছে।”

বিপ্লব নেমে এসে বলল “বাবা ফেরেনি তো এখনো। একটু অপেক্ষা করি।”

“তোর গলাটা ভারী লাগছে কেন রে? ঘুমিয়ে পড়েছিলি?”

“হ্যাঁ, ঐ আর কি।”

“আচ্ছা আমি খাবারদাবার বাড়তে থাকি, এর মধ্যে এসে পড়বে তোর বাবা।”

সত্যিই এসে পড়ল। তালাটা খুলতে গিয়ে বাবার মুখ দেখে বিপ্লবের মনে হল যেন নিজের মুখটাই আয়নায় দেখছে। বাবাও নিশ্চয়ই কাঁদছিল। আগেকার বিপ্লব হলে বাবাকে জড়িয়ে ধরত, জিজ্ঞেস করত “বাবা, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছিলে?” এখন আর সেসব করা যায় না। এ বয়সে ওটা ন্যাকা ন্যাকা লাগবে। তবু, বিপ্লবের মনে হল সেটাই করা উচিৎ ছিল।

খাবার টেবিলে এসে বসতেই মা কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করল “কি গো! তোমার মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? বৌদির অবস্থা কি খুব খারাপ?”

“নাঃ”।

শব্দটা প্রায় বেরোলই না বাবার গলা থেকে, মাথা নাড়া দেখে বুঝতে হল।

গলাটা একবার পরিষ্কার করে নিয়ে ভাত ভাঙতে ভাঙতে জিজ্ঞেস করল “তোর চাকরিটা ঠিক আছে তো রে? রাগ করিস না বারবার জিজ্ঞেস করছি বলে। আমি ছা পোষা লোক তো, আই টি ফাই টি তো একদম বুঝি না। বেসরকারী চাকরি মানেই ভাবি আজ আছে কাল নেই। তাই…”

“না, সেটা পুরো ভুল নয়,” বিপ্লব উত্তর দিল। “কিছুদিন আগে তো অনেকের চাকরি গেল ঠিকই। তবে আপাতত মনে হয় আর কিছু হবে না।”

“হ্যাঁ, দেখছিলাম কাগজে। চিন্তা হচ্ছিল…”

“আঃ। ছাড়ো তো,” মা অধৈর্য। “দেখতে পাচ্ছি তুমি কিছু একটা লুকোচ্ছ। বলো না গো কী হয়েছে?”

দীর্ঘ নীরবতার পর বিপ্লবের বাবা উত্তর দিল।

“লাল্টুর বউ আমায় বলল… হেসেই বলল। ‘কাকু, এবার কিন্তু তোমাদের ভোট দিতে পারব না। দিদিই আমাদের লোক, তোমরা না।’ আমি বললাম ‘সে কি রে! তোর বাবা জানে?’ বলে ‘বাবা শুনলে রাগ করবে। কিন্তু আমার যাকে ইচ্ছা আমি তো তাকেই ভোট দেব।’”

“ও মা! তা লাল্টু, পটল — ওরা কিছু বলল না?”

“লাল্টু ছিল। ও দেখলাম না শোনার ভান করল।”

“ছি ছি ছি! তিতলি এরকম বুঝিনি তো! ও তো ওর বাবাকে খুব ভালবাসে ভাবতাম! আর কি অকৃতজ্ঞ! ও জানে না, পার্টি না থাকলে ওর বরের চাকরি হত না, সংসারটা ভেসে যেত?” “ওগুলো কোন কথা নয়, জোনাকি। আমাদের দিন শেষ। আমরা মানুষের হাত ছেড়ে দিয়েছি, এবার মানুষ আমাদের হাত ছেড়ে দিল। আমার এবার গোড়া থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। আজ শিওর হয়ে গেলাম। বামফ্রন্ট সরকারের দিন শেষ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048