নাম তার ছিল: ১৭

পূর্বকথা: প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান হরিপদর স্ত্রীকে দাহ করতে গিয়ে রবীনের মনে পড়ে প্রয়াত হীরুদার কথা।

হীরুদার চলে যাওয়া বলরাম আর শ্যামলের জন্যে ছিল আশীর্বাদ। জেলা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে দুজনের উদ্ভাসিত মুখ, জুনিয়র কমরেডদের সাথে ঈষৎ অশ্লীল ইয়ার্কি করে হাসতে হাসতে বলরামের এর ওর গায়ে গড়িয়ে পড়া, শ্যামলের গম্ভীর থাকার চেষ্টা করতে করতে ফিক করে হেসে ফেলা — সবকিছুই জানান দিচ্ছিল ওরা জানে ওদের রাজত্ব ফিরে পেতে আর দেরী নেই।

আসলে হীরুদার মৃত্যুতে যাঁর জেলা সম্পাদক হওয়ার কথা, সেই সুব্রতদা যে লোক খারাপ তা নয়, বরং উনি নিপাট ভালমানুষ, তবে হীরুদা যেমন জেলার সব পার্টি সদস্যের মুখ চিনতেন তেমন করে উনি চেনেন না। প্রবীণ কৃষক নেতা, সর্বক্ষণের কর্মী, প্রচুর অত্যাচার সহ্য করেছেন এক সময়, জেলা অফিসেই থাকেন। সবই ভাল, কিন্তু লেখাপড়া বেশি দূর করেননি বলে বরাবর লোকটাকে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখেছে রবীন। সেই সুযোগে ওঁর চেয়ে বয়সে ছোট, পার্টিকর্মী হিসাবে কম যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা নিজেদের ইচ্ছে মত সুব্রত মণ্ডলকে ব্যবহার করে — সে কি জেলা কমিটির অন্য সদস্যরা, কি এল সি এম, এল সি এসরা। একই কারণে সকলেই জানে উনি জেলা সম্পাদক হবেন নামেই। ওঁকে চালাবে আসলে কল্যাণপুরের এম পি রথীন রায়। সে যে কী জিনিস, সেটা কল্যাণপুরের কমরেডদের থেকে বহু আগেই শুনেছে রবীন। হীরুদাও বলতেন “কি সব লোক উঠে আসছে, রবীন! বিন্দুমাত্র সততা নেই, ক্ষমতার গন্ধে মাতাল, একেবারে মায়া দয়াহীন। অথচ কমরেডরা তো বটেই, সাধারণ লোকেও মোটের উপর একে পছন্দই করে!”

“সত্যি! পছন্দ করে? নাকি ভয় করে?”

“হ্যাঁ, কিছু লোক তো ভয়ে ভক্তি করে ঠিকই। সে না হয় সাধারণ লোকেদের কথা ধরলাম। কিন্তু পার্টি মেম্বাররা? তারা ওর দোষ ত্রুটি দেখতে পাবে না কেন?”

আপনি এই কথা বলছেন, হীরুদা! আপনি কি এই ব্যাপারটা প্রথম দেখছেন? আমাদের ওখানে বল একটা পঞ্চায়েত প্রধান, তাতেই কমরেডরা ভয়ে কাঁপে। আর রথীন রায় তো এম পি।”

“তা বটে,” হীরুদা বিষণ্ণ হয়ে বলেছিলেন। “আমাদেরই দোষ আসলে। গরীব মানুষের পার্টিকে আর গরীব মানুষের রাখা গেল না তো… এসব মৌ লোভী লোক তো উপরে উঠবেই।”

শ্যামলটা চিরকালের কূপমণ্ডূক। সবুজগ্রামের প্রধানের পদ ফিরে পেয়েই ও আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। বলরামের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। আটানব্বইয়ের ভোটে জেতার পর ও আবার প্রধান হতেই পারত, কিন্তু সে চেষ্টায় যায়নি। রথীন রায়ের কাছে দৌড়াদৌড়ি করে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। আর ক্ষেত্রগ্রামের প্রধানের পদে রেখে দিয়েছিল বশংবদ কেষ্টকেই। একসাথে দুটো পদ হাতে রাখা গেল।

হরিপদর বউকে পুড়িয়ে আসার পর থেকেই সব কেমন বিস্বাদ লাগছিল রবীনের। সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়ে স্টেশনের কাছে দেখা হয়ে গেল বড়িহাটার কমরেড সুনীলের সাথে।

“রবীনদা, কই চললেন?”

“কোথায় যাওন যায় হেইডাই খুঁজতাছি”, রবীন মস্করা করে বলেছিল। “তুই কোত্থিকা?”

“এই যে, মাইয়ারে নিয়া গেছিলাম জয়েন্টের কাউন্সেলিঙে।”

আঠেরো-উনিশের মেয়েটা পেছনেই দাঁড়িয়েছিল।

“কোথায় হইল?”

“শিবপুরেই হইয়া গেছে। ওর তো ভাল র‍্যাঙ্ক আছিল। আমরা একটু নিশ্চিন্ত হইলাম। আমার গিন্নীই বেশি চিন্তা করতাছিল। মাইয়া তো, দূরে হইলে একা যাতায়াত করা…”

“মাইয়া তো কী? কিসব কথা কস তোরা? মাইয়ারা মহাকাশে যাইতাছে, আর তোরা ভাবতাছস একা কলেজ যাইতে পারব না।”

“মহাকাশে!”

“হ, সুনীতা উইলিয়ামস! ভুইল্যা গেছস? আরো আগে কল্পনা চাওলা?”

“ওসব ওদের দ্যাশে হয়। আমাগো মাইয়ারা তো অন্যরকম।”

“অন্যরকম? কই? তোর মাইয়ার তো দ্যাখতাছি দুইটা কইরা হাত, পা, চোখ, কান — সবই আছে। মাথাও ভাল, নাইলে জয়েন্টে ভাল র‍্যাঙ্ক করল কী কইরা? তাইলে অন্যরকম হইল কই?”

সুনীল নিরুপায় হেসে বলে “আপনার সাথে কথায় কি পারুম, রবীনদা? কিন্তু আপনে যা-ই কন, চিন্তা কিন্তু হয়।”

“আরে, সে তো হয়ই। কিন্তু তাই বইল্যা কি আর এদের ঘরে বসায় রাখন যায়? আমার পোলাডা দ্যাখ কোন দূরে বইস্যা আছে। তর মাইয়ারেও কি তুই আটকায় রাখতে পারবি? যদি একখান ভাল চাকরি পায়…”

এতক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকা মেয়েটা হঠাৎ মুখর হয়ে ওঠে। “এটা একটু বোঝান তো, জেঠু। ওয়েস্ট বেঙ্গলে তো চাকরি বাকরি কিছুই নেই। এখানে পড়ে থাকলে জীবনে কিছু করা যাবে? আজকাল ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ না গেলে কোন ফিউচার আছে? আর আমার তো ইচ্ছা বাইরে চলে যাওয়ার। আমার চেনা কতজন গেছে। বড়িহাটারই তো অনেকে ইউ এস এতে আছে।”

রবীনের কেমন একটা ধাক্কা লাগে।

“ঠিকই বলেছিস, মা। এখানে আর… চাকরি কোথায়? তবে একেবারে অন্য দেশে চলে যাবি? দেশের প্রতিও একটা দায় দায়িত্ব থাকে…”

“সে তো সবারই থাকে। কে পালন করছে?”

সুনীল মেয়েকে ধমকায় “অ্যাই! এ আবার কী কথা রে!”

রবীন ওর কাঁধে হাত রেখে বলে “আহা, বকতাছস ক্যান? কথাডায় কিন্তু দম আছে। কে দায়িত্ব পালন করতাছে? সত্যিই তো। কে করতাছে? আমরা কি আমাগো দায়িত্ব ঠিক কইরা পালন করছি?”

“আরে আপনি ছাড়েন তো, রবীনদা। আজকালকার পোলাপানদের কথাবার্তার কোন ছিরিছাঁদ নাই।”

ফুঁসতে থাকা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন বলে “যাকগে, তোরা বাড়ি যা। সারাদিনের পরে বাড়ি ফিরতাছস, অনেক দেরী করায় দিলাম।”

রবীন ওদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। স্টেশন রোড ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ঝিলের ধারে শহীদ বেদিটার সামনে আড্ডা মারছে পার্টির ছেলেরা। একজন চড়ে বসে আছে। তার দু পায়ের ফাঁক দিয়ে ফলকটা দেখা যাচ্ছে। চশমাটা সঙ্গে নেই, চোখ কুঁচকে রবীন শুধু পড়তে পারল “আমরা তো ভুলি নাই শহীদ”। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে সবুজগ্রাম কলেজে ক্লাসে ঢুকে পাগলা সুরেন আর তার দলবল বার করে নিয়ে গিয়েছিল বিপ্রদাস পালকে। তারপর কলেজের মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছিল। তারিখটা মনে আছে। ২২শে জুলাই, ১৯৭৪। এই বেদিটা তৈরি করা হয়েছিল আশি সালে। প্রত্যেক বছর ২২শে জুলাই এখানে লাল পতাকা তোলা, স্মরণসভা হয় যথারীতি। বাইশ তারিখ এসে গেল।

ভারত সেবাশ্রমের পাশ দিয়ে বাড়ির পথ ধরল রবীন। রিডিং ক্লাবের সামনে দেবু ঘোষের দোকানে বসেছিল অবনী। রবীনের চোখে চোখ পড়তেই চোরের মত চোখ নামিয়ে নিল। আসলে ওর প্রাণের বন্ধু, সমাজবিরোধী জগা বড়িহাটার এক ডি সি এমের অভয় পেয়ে কয়েক মাস হল সবুজগ্রামে ফেরত এসেছে। অবনীরও আর গলাগলি করতে বাধা নেই। গত রবিবার জগার ছেলের জন্মদিনে এলাহি খাওয়াদাওয়া, মদ্যপান করেছে অনেক সি পি এম নেতা, কর্মী। অবনী একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল। বমি টমি করে একসা কাণ্ড। ওর গিন্নী রবীনকে এসে জানানোর পর রবীন গিয়ে অবনীর কান মুলে দিয়ে এসেছে। অবনীর বউ রবীনের পা ধরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে ও আর জগার সাথে মিশবে না, মদও ছোঁবে না। কিন্তু এই ভর সন্ধেবেলা দেবু ঘোষের দোকানে যে ও এগ রোল খাবে বলে বসে নেই, সেটা রবীন ভালই জানে।

সেদিন সন্ধের পর থেকেই ভীষণ গুমোট। দুবার স্নান করার পরেও ঘুম আসছিল না রবীনের। ভাবছে উঠে একটা বিড়ি খাবে, এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। রবীন ভেবেছিল জোনাকি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু বেলটা বাজতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে বলল “কি গো? এত রাতে কে!” রবীন ধীরে সুস্থে উঠতে না উঠতেই আরো দুবার বাজল, সেই সঙ্গে দু তিনজনের উদ্বিগ্ন ডাক “রবীনদা, রবীনদা। রবীনদা জেগে আছেন?” দুজনেই বিছানা ছেড়ে উঠে দৌড়ল।

বারান্দার আলোটা জ্বেলে রবীন দ্যাখে স্কুলপাড়া, মানে রিডিং ক্লাবের পাড়ার কমরেড কমল দাঁড়িয়ে, সাথে ও পাড়ার দুই দোকানদার। পানওয়ালা ছেলেটার কানের পাশ দিয়ে রক্ত পড়ছে, ঠকঠক করে কাঁপছে। জোনাকি তাড়াতাড়ি চাবিটা এনে তালা খুলতেই ছেলেটা ধপ করে বারান্দার মাটিতেই বসে পড়ল। কমল আর অন্য দোকানদার ছেলেটা কোন মতে তুলে এনে ঘরের চেয়ারে বসাল ওকে। মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবে যে কোন সময়। “জল দাও, জল দাও,” রবীন জোনাকিকে বলে। “আর তুলো।”

রক্তপাত কমলে, ছেলেটা ধাতস্থ না হতেই কমল বলে “ওরা এখানে থাক, রবীনদা। আপনি চলুন শিগগির।”

“কোথায় রে?”

“আমাদের পাড়া। জগা দলবল নিয়ে এসে তাণ্ডব করছে। দোকানপাট, লোকের বাড়ি — সব ভাঙচুর করছে। এ বেচারার কানটা একটুর জন্যে বেঁচে গেছে। সোর্ড তুলেছিল।”

“কেন? এ আবার কী দোষ করল? এ ছেলেটা তো ভাল বলেই জানি!”

অন্যজন বলে “ওর কোন দোষ নেই, দাদা। সামনে পড়ে গিসল আর কি।”

“কিন্তু ওরা হঠাৎ এসে গোলমাল করছে কেন?”

“আপনাকে যেতে যেতে বলব সব। আপনি চলুন। একটা খুনটুন করে বসবে নাইলে।”

“আচ্ছা চ।” রবীন লুঙ্গির উপর ফতুয়াটা গলিয়ে নেয়।

“এ কি! তুমি একা একা এর মধ্যে যাচ্ছ?” জোনাকি প্রশ্ন করে।

“কোথায় একা?” রবীন খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়। “কমল আছে তো।”

“কিন্তু পুলিসে একটা খবর দেয়া দরকার না? আমরা ফাঁড়িতে গেছিলাম। ওরা তো নড়েই বসল না। ফাঁড়ি থেকে বোম চার্জ করার আওয়াজ কিন্তু পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।”

“অ। জোনাকি ওকে একটু ফোনের ডায়রিটা দাও তো,” রবীন অন্য দোকানদারকে দেখিয়ে দেয়। “সত্যেনকে ফোন কর। বলবি এই ঘটনা, রবীনদা আপনাকে বলতে বলল, এক্ষুণি যেন মদনপুর থানা থেকে ফাঁড়িতে ফোন করে ধাতানি দেয়।”

সাইকেলে দক্ষিণপাড়া থেকে স্কুলপাড়া মিনিট সাতেক। তার মধ্যেই কমল রবীনকে জানাল দেবু ঘোষের দোকান বন্ধ করার সময়ে জগার দলের কয়েকজন এসে মদ চেয়েছিল। তাতে দেবুর ছেলে পল্টু বলে এখন দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, আর দেওয়া যাবে না। ব্যাস! তাতেই কথা কাটাকাটি, তারপর হাতাহাতি। আশপাশের দোকানদাররা জগার ছেলেগুলোকে তাড়া করেছিল বলে ওরা পালিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে বোধহয় মোবাইলে খবর চলে গেছে জগার কাছে। সে নিমেষের মধ্যে আরো বড় দল নিয়ে সশরীরে হাজির। লাঠিসোটা, তলোয়ার, চাকু, পেটো, বন্দুক — কিচ্ছু বাদ নেই। লোকের বাড়ির জানলা, দরজাও ভাঙছে।

পৌঁছে রবীন দেখল কমল যা দেখে গিয়েছিল অবস্থা তার থেকেও খারাপ। বাবুরা উল্লাসে শূন্যে গুলি ছুঁড়ছেন। লোকে ভয়ে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। পল্টুকে ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে এলোপাথাড়ি লাথি, ঘুঁষি মারছে জগা স্বয়ং। ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা দোকানগুলোর মালপত্র রাস্তায় ছত্রখান করে নষ্ট করছে। সব্জিওয়ালা খালেক এক কোণায় বসে চিৎকার করে কাঁদছে। বোধহয় ওর পায়ে কোপ টোপ মেরেছে। রক্তে ভাসাভাসি। কমলকে ওকে সামলাতে বলে রবীন জগার দিকে এগিয়ে গেল।

“অ্যাই হতভাগা,” বলে ওর কানটা টেনে ধরে মাথাটা ঘুরিয়েই এক থাপ্পড়। জগা এতটাই মত্ত ছিল যে “কে রে, কে রে” বলে উঠেছিল। রবীন তখন চুলের মুঠি ধরে আরো কয়েকটা চড় মারতে মারতে বলে “আমি রে। এই দ্যাখ, আমি। আমি, তোর অকম্মার ঢেঁকি মাস্টারমশাই। কী করবি? হাত কাটবি, পা কাটবি, না জানে মারবি? মার শালা, মার।”

ততক্ষণে জগার সম্বিত ফিরেছে। টলতে টলতে হাত জোড় করে বলে “ভুল হয়ে গেছে, স্যার। ভুল হয়ে গেছে। মাপ করে দিন। অ্যাই, থাম সব। কী হচ্ছে কি?”

ওর শাগরেদরা ধমক খেয়ে বিরক্ত, কিন্তু প্রতিবাদও করতে পারছে না। দিব্যি মজায় ভাঙচুর, লুটপাট চলছিল; এমন রসভঙ্গ কার ভাল লাগে? কিন্তু মনিবকে তো অগ্রাহ্য করা যায় না। একজন তো বিরক্তি সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল “এ কে বে? এটাকে এত তোল্লাই কিসের, জগাদা? একটা রদ্দা মারলে হিসি করে দেবে শালা…” কথা শেষ করতে না দিয়ে ওর মাথায় চাঁটি মারে দলের একজন। ধমকায় “চুপ কর। মাস্টারমশাই। চিনিস না যখন, চুপ করে থাক, বাঞ্চোদ।”

ততক্ষণে সাহস পেয়ে যে ব্যবসায়ীরা লুকিয়ে পড়েছিল বা কাঠ হয়ে বসেছিল, তারা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। জগাদের চোখে ভয় দেখতে পায় রবীন। ওর হাতটা কোমরের দিকে যেতে দেখেই খপ করে ধরে ফেলে। “আর একটা গুলি যদি তোরা কেউ চালাস, জগা। তোর প্রাণের গ্যারান্টি আমি দিতে পারব না কিন্তু। এতক্ষণ অনেক অত্যাচার করেছিস, লোকে কিন্তু ভীষণ রেগে গেছে। চুপচাপ চলে যা এখান থেকে।”

গোঁয়ার মস্তান বলে “আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। আমার নাম শুনলে সবাই কাঁপে, আর আমার ছেলেরা মদ চাইলে মদ দেবে না? এত বড় আস্পদ্দা!”

“আবার কথা?” রবীন চড় তোলে। জগা পিছিয়ে যায়, শাগরেদদের ইশারা করে গাড়িতে উঠতে। টলতে টলতে টাটা সুমোটার স্টিয়ারিঙে গিয়ে বসে। বাইক বাহিনীর একজন স্টার্ট দিতে দিতে কাউকে একটা গালাগাল দিচ্ছিল, তিন চারজন ব্যবসায়ী ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপরে। জগার দলবল আবার শুরু করতে যাচ্ছিল, লোকে ঘিরে ধরে মারা শুরু করে। তাই দেখে কয়েকজন তড়িঘড়ি চম্পট দেয়, জগা সুমোয় বসে হুঙ্কার দেওয়ার বেশি সাহস করে না। মারের চোটে ছেলেগুলো মরেই যেত হয়ত, রবীন আর কমল মাঝে পড়ে আটকায়। অনেক কষ্টে শেষ অব্দি ওদের বিদায় করা যায়। যাওয়ার সময়ে অবশ্য একজন কয়েকটা পেটো চার্জ করে যায়।

ওরা চলে যেতেই রবীনের খেয়াল হয়, এই এলাকার পার্টি কমরেডরা এতক্ষণে জড়ো হয়েছে। প্রথমে ইচ্ছে করে শালাদের জোর ধমকাতে। যখন এই নেত্য শুরু হয় তখন এরা কোথায় সেঁধিয়েছিল? শেষ অব্দি তা না করে রবীন বলে “যার যার লেগেছে সব হেলথ সেন্টারে নিয়ে যা। আর তোদের প্রধানকে, আরো সমস্ত নেতাদের খবর দে।” একজন পল্টুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে “একেও নিয়ে যাব তো, রবীনদা?”

রবীন এতক্ষণে পল্টুর দিকে ভাল করে তাকানোর ফুরসত পায়।

“এই শুয়ারটাকে? এটাকে উচিৎ ছিল জগার হাতেই ছেড়ে দেয়া। কিন্তু আমরা তো মানুষ। তাই পারলাম না। আমি আবার এটারও মাস্টারমশাই। শালা ঘেন্না হয় নিজের উপরে। যা, নিয়ে যা এটাকেও।”

ব্যবসায়ীরা রবীনকে অনুরোধ করে ওদের সাথে ফাঁড়িতে যেতে, ডায়রি করতে। রবীন রাজি হল। ইতিমধ্যে এসে পড়ল বলরাম, ওর ভাই এবং অন্য তালেবররা। এসেই হম্বি তম্বি, জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। রবীনকে কমল বলল “এদিকে চলে আসেন, রবীনদা। আমরা একটু বসি। এর মধ্যে আমাদের কী কাজ?”

“ঠিক কথা। চল।”

দুর্গাবাড়ি, মানে যে বাড়িতে ফি বছর দুর্গাপুজো হয়, তাদের রোয়াকে বসে পড়ল দুজনে। জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে ও বাড়ির মাসিমা বললেন “ঠাকুরপো এট্টু চা খাবা নাকি?”

রবীন বলল “তেষ্টা তো পাইতাছে, কিন্তু এই মাঝরাতে আপনারে কষ্ট দিমু?”

“আরে কিচ্ছু কষ্ট নাই। আমরা তো ঘুমাইতে পারতাছিলাম না। কত্তা, পোলা, বউমা — সক্কলে জাইগ্যা আছে। তোমরা খাইলে আমরাও খামু এক কাপ কইরা।”

কমল বলল “চাপিয়ে দিন, মাসিমা।”

দুর্গাবাড়িতে চা খেতে খেতেই একজন এসে ডাকল “রবীনদা, ফাঁড়িতে ডেপুটেশন দিতে যাওয়া হচ্ছে। শ্যামলদা আপনাকে খুঁজছে।” যাওয়া হল।

ফাঁড়ির সামনে মিটিঙে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিল বলরাম আর শ্যামল। ফাঁড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কী করে সমাজবিরোধীরা এইভাবে দাপাদাপি করতে পারে, জগার নামে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কী করে সে জেলের বাইরে, এত অস্ত্র কোথা থেকে জোগাড় করল, প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে আছে কেন — এইসব চোখা চোখা প্রশ্ন ছোঁড়া হল। দুজনেই অনেক করে রবীনকে বলতে বলেছিল। ও কিছুতেই রাজি হল না, বলল শরীরটা ভাল নেই।

মিথ্যে কথা। এক ঝুড়ি মিথ্যে বলা এড়ানোর জন্যে একটা ছোট্ট মিথ্যে।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১৬

পূর্বকথা: আমলকিতলায় রাস্তা থেকে তুলে আনা পাথরকে দেবতা বানিয়ে ধর্ম ব্যবসা চলছিল। সে পাথর আসন থেকে ফেলে দিয়ে, হাজিপাড়াকে দায়ী করে দাঙ্গা লাগানোর আয়োজন চলছিল। শেষ মুহূর্তে সব ভেস্তে দিল রবীন।

“কাজটা আপনি ভেবে চিন্তে করেছেন তো, মাস্টারমশাই?” পাগল মহারাজ বিড়ি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করেছিলেন। “সাধারণ লোকে এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করবে না, কিন্তু আপনার কমরেডরা জল ঘোলা করবেই। আপনি দেখে নেবেন।”

“তা আপনি ঠিকই বলেছেন। এটাকে পার্টির আদর্শের বিরোধী কার্যকলাপ বলে চালানোর একটা চেষ্টা তো হবেই। এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে?” রবীন মৃদু হেসে বলেছিল।

“আপনি হাসছেন? আমার তো বেশ চিন্তাই হচ্ছে আপনার জন্যে। সত্যিই তো। একটা রাস্তা থেকে তুলে আনা পাথরকে ভগবান বানিয়ে দিয়ে ধর্ম ব্যবসা চলছিল। সেটা যে করেই হোক বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল, আর আপনি কিনা পাথরটাকে আবার নিজের জায়গায় বসিয়ে দিলেন? এটা অন্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হল না?”

রবীন জানত পার্টি মিটিঙেও ঠিক এইভাবেই আক্রমণটা আসবে। এবং উত্তরও তার তৈরি ছিল। তাই সে আরো চওড়া হাসি হেসেছিল। পাগল মহারাজও হাসতে হাসতে বলেছিলেন “এখন যতই হাসুন। এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দিতেই হবে। ঝোঁকের মাথায় একটা কাজ করে ফেলেছেন… পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিকই করেছেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির লোক হিসাবে এই কাজটার সমর্থনে আপনি কী যুক্তি দেবেন?”

রবীন স্বীকার করেছিল, যে গণ্ডগোলের খবরটা পেয়ে কিচ্ছু মাথায় আসছিল না কী করা উচিৎ। শুধু মাথায় ছিল, যে করেই হোক দাঙ্গা লেগে যাওয়া আটকাতে হবে। ওখানে পৌঁছে পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল আটকানো অসম্ভব, অনেক দেরী হয়ে গেছে।

“কিন্তু যেই চোখ গেল এক ধারে পড়ে থাকা পাথরটার দিকে, তখনই মনে হল, হ্যাঁ, একটাই রাস্তা আছে — পাথরটাকে যথাস্থানে বসিয়ে দেয়া। তাতে যদি লোকে একটু ঠান্ডা হয়। তবে সেটা করব বলে ভেবেও নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আপনি যে প্রশ্নটা করলেন আমার মাথাতেও সেটাই ঘুরছিল। তারপরই মনে পড়ল লেনিনের কথা। ব্যাস! আর এক সেকেন্ডও ভাবিনি।”

“লেনিন!”

“হ্যাঁ। লেনিন বেশ কিছু বক্তৃতায় ধর্মের প্রশ্নে বলেছেন। লিখেছেনও। উনি পরিষ্কারই বলেছেন শ্রেণীসংগ্রামের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করাই পার্টির প্রধান কাজ। তা না করে লোকের ধর্ম কত বড় ভাঁওতা, ধর্ম মানুষের কী কী ক্ষতি করে, সেসব নিয়ে বেশি বক্তৃতা ঝাড়লে মানুষের উল্টে ধর্মের প্রতি টান বেড়ে যাবে, অন্ধ বিশ্বাস আরো জাঁকিয়ে বসবে।”

পাগল মহারাজ মিটিমিটি হাসছিলেন, যেন বিশ্বাস হয়নি।

“ভাবছেন বানিয়ে বলছি? আচ্ছা পরের দিন নিয়ে আসব বইটা,” রবীন বলেছিল।

“না না, বানিয়ে বলবেন কেন? এঙ্গেলসও তো ধর্ম সম্পর্কে একই রকম বলেছেন। লেনিন এঙ্গেলস থেকে কোট করেও দেখিয়েছেন যে ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারে জোর দেওয়াটা অতি বাম প্রবণতা। আর তাতে যা হয়, সেটা হল মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার সুবিধে হয়ে যায়। এই জন্যেই নিরীশ্বরবাদী প্রচারে জোর দেওয়া অনর্থক। তার চেয়ে প্রোলেতারিয়েতের মধ্যে শ্রেণীচেতনা জাগিয়ে তোলা অনেক বেশি জরুরী।”

“নিশ্চয়ই। এঙ্গেলস সেই পারী কমিউনের পর ফ্রান্স থেকে লন্ডনে পালিয়ে যাওয়া ব্লাঙ্কিপন্থীদের তো এই নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।”

কথাটা বলেই রবীনের খেয়াল হয়েছিল পাগল মহারাজ লেনিন পড়েছেন বলছেন! অমনি ও চেপে ধরে।

“আপনার সাথে আলাপ হওয়ার পরে পরেই একদিন আপনার কথা শুনে বুঝেছিলাম আপনি আমাদের পার্টির ব্যাপারে যথেষ্ট খবর রাখেন। কী করে সেটা আপনি বলেননি, আমারও আর পরে জিজ্ঞেস করার কথা খেয়াল হয়নি। শুধু বলেছিলেন সব সাধুরই একটা অতীত থাকে। কিন্তু এইমাত্র যা বললেন, এরপর তো সেই অতীতটা না জেনে আর থাকা যাচ্ছে না, মহারাজ।”

মহারাজ জিভ কেটে বলেন “ওসব জানতে চাইবেন না। সন্ন্যাসীদের পূর্বাশ্রমের কথা শুনলে পাপ হয়।”

“ধুর। পাপের দোহাই দিয়ে আপনি আমায় আটকাতে পারবেন মনে হয়? বলে ফেলুন, বলে ফেলুন। আজকে আমি ছাড়ছি না। হোস্টেলে প্রেয়ারের সময় হয়ে গেলেও উঠব না কিন্তু।”

রবীনের হুমকিতে এক গাল হেসে পাগল মহারাজ আরেকটা বিড়ি চেয়েছিলেন। সেটা ধরিয়ে বলেন “দেখুন, আপনি জোর করলেন বলেই বলছি। আপনার কিন্তু ভাল লাগবে না। আমাকে খুন টুন করে দেবেন না যেন।”

“হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট আর রাজনীতি একসাথে ধরেছি, বুঝলেন? চামড়া এই মোটা না করতে পারলে অ্যাদ্দিন রাজনীতি করছি? আবার কত বছর প্রশাসনেও ছিলাম ভেবে দেখুন।”

“আচ্ছা শুনুন,” মহারাজ বলতে শুরু করেছিলেন। “আমাদের আদি বাড়ি সিলেট। দেশ ভাগের পর বাবা জ্যাঠারা এসে শিলচরে জমিয়ে বসেছিল। কিন্তু ষাট-একষট্টি সালে সেই যে বাঙালি বনাম আসামী লেগে গেল, সেই সময় ওখানকার পাট উঠিয়ে চলে আসতে হল কলকাতা। আমি তখন বছর দশেকের ছেলে। কলকাতায় এসে জ্যাঠার কোন কাজ না জুটলেও বাবা একটা সদাগরি আপিসে চাকরি পেয়েছিল। ফলে আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি দিব্যি থিতু হয়ে গিয়েছিল। বাবা, মা, আমরা তিন ভাই এক বোন, আর জ্যাঠা জেঠি, আমার জ্যাঠতুতো দাদা আর দিদি। মণ্ডা মিঠাই না জুটলেও, ডাল ভাত জুটে যাচ্ছিল… যাদবপুরে এক পরিচিতের বাড়ি ভাড়া থাকতাম আমরা। কিন্তু সুখ টিকল না। শোনা গেল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ।”

“নকশাল হয়ে গেলেন?” রবীন চমকে উঠেছিল।

“আমি না। আমার বড়দা, মানে জ্যাঠার ছেলে। আমাদের পরিবারের সবাই সাতেও নেই পাঁচেও নেই টাইপ, বুঝলেন? খেলাম, দেলাম, ঘুমোলাম, লেখাপড়ার বয়সে লেখাপড়া করলাম। ব্যাস! দুনিয়াটা চুলোয় যাক। আমিও তাই। একমাত্র বড়দারই এদিকে নজর, সেদিকে নজর। কোন ছেলের লেখাপড়া করার পয়সা নেই, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না — এইসব আর কি। লেখাপড়ায় ভাল ছিল বলে বাবা, জ্যাঠা ওকে কিছু বলত না। কী করে বেড়ায় সারাদিন তাও জানতে চাইত না। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে তখন ও খুব জনপ্রিয় ছেলে। বাড়িতে আর কারো সাথে দরকার ছাড়া কথা বলত না, শুধু আমার মাথাটা খেত। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও — সবই বড়দাই আমায় ধরিয়েছিল।”

পাগল মহারাজের গল্পটা যেন মাঝখান থেকে শেষ হয়ে গেল। নীরবে বিড়ি টানতে লাগলেন। এসব গল্প যে মধুরেণ সমাপয়েৎ হয় না সেকথা সবাই জানে, রবীন তো জানত বটেই। তবু, কেন কে জানে, শেষ অব্দি না শুনেও থাকা যায় না। মহারাজকে খোঁচাতে খারাপই লাগছিল, নিজেকে ধর্ষকাম মনে হচ্ছিল। তবু রবীন বলে ফেলেছিল “সুখ টিকল না বলছিলেন?” মহারাজের মুখ দেখে মনে হল না উনি নতুন করে ব্যথা পেলেন।

বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতেই বললেন “বড়দার প্রভাবে, ওসব পড়ে টড়ে আমারও ইচ্ছে হয়েছিল নেমে পড়তে। কিন্তু আমি ভীতু ছেলে, আমার পরিবারের মতই। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তবে আমার এই ভালমানুষের মত মুখটার সুযোগ নিয়ে আমি এ পাড়া সে পাড়ায় খবর চালাচালিটা করতাম। ফলে কে কাকে কিভাবে সংশোধনবাদী দাগিয়ে দিল, কারা আগুনে বিপ্লবী থেকে রাতারাতি সংসদীয় পথে বিশ্বাসী হয়ে গেল — সেসব আমি নিজের চোখেই দেখেছি। আর সেইসঙ্গে… আপনার পার্টির ছেলেদের হাতে আমার বড়দার খুন হওয়া… সেটাও নিজের চোখেই দেখেছি। দেখার কথা ছিল না, কিন্তু লুকিয়ে দেখে ফেলি।

“এমন হতভাগা আমি, ওর সঙ্গে মরার সাহস ছিল না, ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছিলাম। আপনার খুনে কমরেডরা দেখতে পায়নি। তা পরিবারগুলো এসব ক্ষেত্রে যা করে আর কি। আরো বেশি করে পালানোর সুযোগ করে দেয়। আমার পরিবারও তাই করেছিল। মায়ের এক মামা বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের কলেজটার অধ্যাপক ছিলেন, মঠের কাছেই বাড়ি। আমাকে ওনার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল, উনি আমায় নিজের কলেজে ভর্তি করে নিলেন। তারপর কালে কালে… এই যা দেখছেন।”

রবীন মাথা নীচু করে ছিল অনেকক্ষণ। বহুকাল পরে মুন্নার কথা, এবং অবশ্যই মুনিয়ার কথা, মনে পড়ছিল। গলামনের পাড়ে বসে শীতের বিকেলের ভারী হাওয়ায় মনে হচ্ছিল কান পাতলে মুন্নার গলায় ভেসে আসবে “আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই / স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই।” পাগল মহারাজ বিড়িটা শেষ করে পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন “আমি কিন্তু আপনাকে দোষারোপ করছি না মাস্টারমশাই।”

রবীন উত্তর দিয়েছিল “আপনি না করলেই বা, দায় তো এড়ানো যায় না। ভ্রাতৃহত্যার দায়।”

“আপনি তাই মনে করেন বুঝি?”

“নিশ্চয়। লাল পতাকার নামে যারা যারা শপথ নেয়, সবাইকেই একই পথের পথিক মনে করি।”

“কিন্তু এক হওয়ার চেষ্টা কোথায়? আপনার পার্টির চোখে তো বামফ্রন্টের বাইরের বামপন্থী মানেই শত্রু।”

“সেই জন্যেই তো তিনটে রাজ্যের বাইরে বেরোতে পারছি না। বামপন্থীরা কেউই পারছে না। উল্টে যে জায়গাগুলো আমাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল, সেগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এক হতেই হবে, মহারাজ। বামপন্থীদের সব্বাইকে এক জায়গায় আসতে হবে। নইলে উপায় নেই।”

পাগল মহারাজ কথাটাকে খুব একটা আমল দিলেন না মনে হয়েছিল রবীনের। কিছুটা হালকা মেজাজেই ও বলেছিল “আমার জীবদ্দশায় যদি সে দিন আসে, আপনাকে এই আশ্রম থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাব। আপনি তো আমাদেরই লোক।”

“রক্ষে করুন। সেই যে পালিয়ে এসেছিলাম, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তই করে যাচ্ছি। আমি মোটেই লড়াকু নই। তাছাড়া এত বছর ধরে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ যা পড়লাম, তাতে মার্কসবাদে আমার যে সেই তখনকার মত বিশ্বাস আছে তা বলতে পারব না। আমি বড় জোর ভাল কাজে সমর্থন দিতে পারি। তেমন তেমন অবস্থায় পলাতক কমিউনিস্টদের লুকিয়েও রাখতে পারি। কিন্তু আমার জায়গা আশ্রমেই, পার্টি অফিসে নয়।”

যে কথা একজন সন্ন্যাসী নিজে নিজেই বুঝে গিয়েছিলেন, সে কথাটাই কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের বোঝাতে রবীনকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। শ্যামল আর বল দাঁত নখ বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রবীন আর হরিপদর উপরে। “দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে এলাকার শান্তি বিনষ্ট করার দায় স্বীকার করতে হবে” — এই মর্মে লোকাল কমিটির মিটিঙে নিন্দা প্রস্তাব এনেছিল ওরা। সঙ্গে রবীনের বিরুদ্ধে পার্টিবিরোধী কার্যকলাপ এবং অন্ধ বিশ্বাসে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। আলোচনায় অবশ্য দাঁড়াতে পারেনি। রবীন নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তছনছ করে দিয়েছিল সহজেই। হরিপদ আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে গিয়ে একটু মাথা গরম করে ফেলেছিল, শেষ পর্যন্ত সামলে দেয় আমলকিতলার সেই কমরেড। ছেলেটা এমনিতে খুব ডাকাবুকো বলে অভিযোগ নেই, কিন্তু হরিপদ কোণঠাসা হয়ে গেছে দেখেই সে খুব জোর দিয়ে বলে উঠেছিল “আমার পরিষ্কার মনে আছে হরিদার সঙ্গে যখন ঐ পাথরটা নিয়ে কথা হল, তখন ওখানে আমরা পার্টি সদস্যরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাহলে হরিদা এলাকার শান্তি ভঙ্গ করার সুযোগটা পেল কখন? কথাটা এলাকার লোকের কানে গেল কী করে? একটা তদন্ত হোক পার্টির পক্ষ থেকে, বার করা হোক কোন পার্টি সদস্য কাণ্ডটা করেছে?”

এই কথায় কয়েকজন গলা মেলাতেই বিপদ বুঝে এল সি এস শ্যামল ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। “একজন পার্টি সদস্যের বিরুদ্ধে পার্টিবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এসেছে। সেটা নিয়ে এগোনো অনেক বেশি জরুরী। যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। কে কাকে লাগিয়েছে, কেন লাগিয়েছে — এ সমস্ত ফালতু ব্যাপারে তদন্ত করার সময় লোকাল কমিটির নেই।”

“তাহলে কি রবীনদার বিরুদ্দে তদন্ত করবেন? কিসের তদন্ত, ভাই?” ওর কথা শেষ হতে না হতেই রুখে উঠেছিল শিবু মণ্ডল। “সেদিন সকাল থেকে আপনাদের কাউকে তো ডাকতে বাকি রাখিনি। আপনি আর বলদা তো ওদিক মাড়ালেন না। আর কেষ্টদা গিয়েচিল, দুটো খিস্তি খেয়েই এমন গায়ে লেগে গেল যে কেটে পড়ল। রবীনদা লেনিন কী বলেচেন, এঙ্গেলস কী বলেচেন — সেসব বললেন। আমি অত জানি না, কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখা জিনিস, রবীনদা সেদিন এই এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাওয়া আটকে দিয়েচেন। অতএব যা করেচেন বেশ করেচেন। পার্টি যদি মনে করে এইটা পার্টির বিরোধী কাজ, তা’লে পার্টির মাথা খারাপ হয়ে গেচে।”

এই কথা বলতেই বল, শ্যামল আর ওদের সাঙ্গোপাঙ্গরা বাঘের মত লাফিয়ে ওঠে। দুই দল কমরেডের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। রবীন আর ফাল্গুনী ঠান্ডা মাথায় গণ্ডগোল থামানোর অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোন ফল হয়নি। শেষ অব্দি শ্যামল, বলই পিছু হটে। নিন্দা প্রস্তাব নিয়ে আর ভোটাভুটির মধ্যে যায় না, রবীনের বিরুদ্ধে অভিযোগও প্রত্যাহার করে।

বল আর শ্যামলের প্রতিহিংসা রবীনের কোন ক্ষতি করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু হরিপদকে তাড়াতে পেরেছিল। পঞ্চায়েত ভোটের প্রার্থী তালিকা ঠিক করার আগেই হরিপদ বলে দিয়েছিল, ও আর দাঁড়াবে না। অনেকেই খুশি জেনেও রবীন জিজ্ঞেস করেছিল “কেন গো?”

“হেডমাস্টার হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছিলাম, রবীনদা। অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে সেই টালিগঞ্জের একটা স্কুলে। আসতে যেতেই কতটা সময় যাবে। তার উপর হেডমাস্টারের তো হাজারটা কাজ। আপনি নিজে স্কুলে আছেন, বোঝেনই তো।”

রবীন নীরবে মাথা নেড়েছিল। হীরুদার কানে গেলে হরিপদকে ডেকে পাঠাতেন। এক ধমক দিয়ে বলতেন “তুমি পার্টিকে না জানিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলে কেন? তুমি পার্টিকর্মী। পার্টি ঠিক করবে তুমি ভোটে দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না।” হরিপদ যতক্ষণ উত্তর হাতড়াচ্ছে ততক্ষণ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকতেন, তারপর বলতেন “যাকগে, দিয়েছ দিয়েছ। স্কুলগুলোতেও তো ভাল কমরেড দরকার। ওটা ছাড়তে হবে না। কিন্তু ভোটে দাঁড়াতে হবে। নাহয় অন্য কাউকে প্রধান করে দেব, তোমায় পঞ্চায়েত সমিতিতে পাঠাব। কয়েকটা ফালতু লোকের জন্যে তোমার মত একজন কমরেড প্রশাসন ছেড়ে দেবে কেন? এ সমস্ত এসকেপিজম আমি অ্যালাউ করব না। কমিউনিস্ট পার্টি করতে এসেছ, লড়তে শেখো।”

কিন্তু হীরুদা তখন আর নেই।

মৃত্যু ভাল মন্দ অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয়। হরিপদর বউয়ের ২০০৭ এ ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, এই মারা গেল। শ্মশানে হরিপদর পাশে বসে থাকতে থাকতে রবীনের মনে পড়ছিল আটানব্বইয়ের সেইসব দিন, আর হীরুদার চলে যাওয়ার কথা।

তখন শীতকাল। ততদিনে ব্যস্ততা অনেক কমে গেছে, তাই রবীন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে, সকাল সকাল ওঠে। বারান্দায় বসে দাঁত মাজছিল, কুয়াশা ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ফাল্গুনী।

“কী রে? এত ভোরে তুই!”

“মইদুলদা ফোন করেছিল…”

শুনেই উঠে পড়েছিল রবীন। হীরুদা এক সপ্তাহ ভেন্টিলেশনে ছিলেন। জানাই ছিল বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কম। মইদুল হাসপাতালে রাত জাগছিল। ও জানে ফাল্গুনীর বাড়িতে ফোন করলেই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি রবীন খবরটা পাবে। চট করে মুখ ধুয়ে নিয়ে রবীন বেরিয়ে পড়েছিল ফাল্গুনীর সাথে।

“কখন হল রে?”

“দুটোর সময় মারা গেছেন। মইদুলদা বলল ‘তোরা হীরুদার বাড়িই চলে যা। ছটায় বডি রিলিজ করে দেবে, আমরা সাড়ে সাতটা আটটায় পৌঁছে যাব।”

“হুম।”

“ওখানে নিয়ারেস্ট শ্মশানটা কোথায়, রবীনদা?”

“শ্মশান কী হবে? হীরুদার তো দেহ দান করা আছে।”

বাড়ির সামনেই দুটো টেবিল জুড়ে শোয়ানো হয়েছিল দেহটা, মাথার কাছে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে হীরুদার একমাত্র আত্মীয় — ঐ বাজারের চা ওয়ালা নন্দ। দিন পনেরো আগে যেদিন হীরুদা প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হল, সেদিন থেকে দোকানে তালা ঝুলিয়ে ও আর ওর বউ হাসপাতালেই পড়ে ছিল দিন রাত। আটটা বেজে গেলেও বাজার বসেনি সেদিন, ক্রেতা বিক্রেতা সবাই হীরুদাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। রবীনকে দেখে মইদুল এগিয়ে এল।

“সবাই খবর পেয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ। এখান থেকে জেলা অফিস যাবে, সেখান থেকে আলিমুদ্দিন। তারপর পিজিতে বডি দিয়ে দেয়া হবে।”

রবীন মাথা নেড়ে হীরুদার দিকে এগিয়ে যায়। কি চমৎকার দেখাচ্ছে সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে! যেমনটা চিরকাল ওঁকে দেখে এসেছে সবাই, ঠিক তেমনটাই। চশমাটাও ভারী যত্ন করে পরিয়ে দিয়েছে কেউ। হয়ত নন্দর বউই। রবীনের মনে হল এখুনি পাশ ফিরে চোখ খুলবেন হীরুদা। ওকে দেখেই বলবেন “আরে! তুমি এসে গেছ? অনেক বেলা হয়ে গেল, না? ঘড়িটা বিগড়ে গেল নাকি? অ্যালার্মটা বাজল না কেন?” তারপর নন্দর দিকে তাকিয়ে বলবেন “তুই এই সকালবেলা দোকান ফেলে এইখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বউটা একা অত লোক সামলাবে?”

এমনটা হলে বেশ হত, কিন্তু হবে কেন? রবীন নন্দর পিঠে হাত রাখে, ও মুখ তুলে তাকায়। কিসে ওর কান্না আটকে ছিল কে জানে! রবীনের চোখে চোখ পড়তেই সে বাধা সরে যায়। কাঁদতে কাঁদতে পড়ে যাচ্ছিল, রবীন সবলে জড়িয়ে ধরে ওকে। নন্দকে শান্ত করতে করতেই শোনে পিছন থেকে একজন বলছে “রবীনদা, একটু সরতে হবে।” গলন্ত বরফ নন্দকে নিয়ে রবীন সরে দাঁড়ায়, মইদুল আরেকজন কমরেডের সাথে মিলে লালের উপর সাদা কাস্তে হাতুড়ি আঁকা পতাকাটায় ঢেকে দেয় হীরুদার শরীর। সেদিন হীরুদাকে একটু হিংসেই হয়েছিল।

বাড়ি ফেরার সময়ে ট্রেনে ফাল্গুনী বলেছিল “এরকম জীবন সার্থক, বলো?”

“নিশ্চয়। নন্দর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে। কিভাবে কাঁদল দেখলি? কে হয় ওর হীরুদা? কেউ না। তাছাড়া লেখাপড়া বল, পারিবারিক পরিচয় বল, রাজনৈতিক কার্যকলাপ বল — কোন দিক থেকে কোন মিল আছে ওর সাথে হীরুদার? নেই। অথচ হীরুদার চলে যাওয়াটা ওর কাছে একটা ব্যক্তিগত ক্ষতি…”

“তার মানে কতটা ডিক্লাসড হতে পেরেছিল লোকটা!”

“এই হচ্ছে আসল কথা। ঐটেই একজন কমিউনিস্টের সবচেয়ে বড় সাধনা। বিশেষ করে আমাদের মত যারা মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে আসে তাদের। ঐখানটাতেই আমরা প্রায় সবাই ফেল।”

“হ্যাঁ। আমাদের বড় বড় নেতাদের মধ্যেও তো এই গুণটা আজকাল দেখতে পাই না।”

রবীন মুচকি হেসে বলেছিল “আমার কাছে বলতে ভয় পাচ্ছিস কেন? সবচেয়ে বড় নেতার মধ্যেই গুণটা নেই বলছিস তো?”

ফাল্গুনী আমতা আমতা করে বলেছিল “সাধারণ লোকে জ্যোতিবাবুর জীবনযাত্রা সম্পর্কে এই কথাটা কিন্তু আমাদের মুখের উপর বলে। আর আমরা কিছুই বলতে পারি না।”

“বলা উচিৎও নয়। সত্যিটাকে তো আর গায়ের জোরে অস্বীকার করা যায় না। তবে হ্যাঁ, আমাদের পার্টিতে এখনো হীরুদার মত নেতা নেই তা নয়। বিমান বোসের কথাই ভাব না।”

“সে তো হল, রবীনদা। কিন্তু ওরকম লোক যে সংখ্যায় কম সেটা তো মানবে?”

“তা তো বটেই। সেই জন্যেই তো মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। গরীব মানুষের পার্টি থেকে আমরা মধ্যবিত্তের পার্টি হয়ে যাচ্ছি দেখছিস না?”

ফাল্গুনীর সাথে সেই কথোপকথনটা মনে পড়তেই সদ্য স্ত্রী বিয়োগ হওয়া হরিপদর পাশে বসেও রবীনের একবার দেখতে ইচ্ছা হয় শ্মশানযাত্রী পার্টি সদস্যদের মধ্যে কে কে শ্রমিক, কৃষক বা সাধারণভাবে গরীব মানুষ। সবুজগ্রাম অবশ্য কোনদিনই কৃষিপ্রধান এলাকা ছিল না। অল্প চাষবাস যারা করত তারাও আর করে না বিশেষ। বাড়িঘর হয়ে গিয়ে কতটুকুই বা চাষের জমি পড়ে আছে? কিন্তু সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রাম, কুড়াইল, বড়িহাটার পার্টিতে শ্রমিক কমরেড নেহাত কম ছিল না। আশেপাশে যে ছোট বড় অনেক কারখানা ছিল।

গুনতে গিয়ে একজনই বন্ধ কারখানার শ্রমিক চোখে পড়ল। তবে সে হরিপদর ভাগ্নে। তা নাহলে পার্টি কমরেডের বউ মরেছে বলে শ্মশানে আসত কিনা কে জানে! পার্টি সদস্যদের মধ্যেও শ্রেণীবিভেদ এসে গেল নাকি! পার্টির সাথে গরীব মানুষের ছিয়ানব্বই সালের সেই দূরত্ব দুস্তর হয়ে গেছে এই দশ-এগারো বছরে। অথচ পার্টি তো ফুলে ফেঁপে উঠছে। মনে পড়ে, ১৯৪১ থেকে ৫২ — এই এগারো বছরে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা ৩৬ লক্ষ থেকে ৭০ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। আর ১৯৫৩য় মৃত্যুর আগে শেষ রচনায় স্তালিন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, পার্টিতে অসংখ্য নতুন সদস্য এসেছে যারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাথে মোটেই পরিচিত নয়। এদের নিয়ে কী করা যাবে? তাঁর সামনেই উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধি সমাবেশে ম্যাণ্ডেট কমিশন সগর্বে রিপোর্ট দিল বারোশো ডেলিগেটের মধ্যে কতজন গ্র‍্যাজুয়েট, কতজন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ, ডাক্তার, উকিল। কতজন শ্রমিক সেকথা উল্লেখই করা হল না। তারপরও অবশ্য প্রায় চার দশক টিকেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু টিকে থাকাই কি শেষ কথা?

পকেট হাতড়ে বিড়ির প্যাকেট আর লাইটারটা বার করে রবীন। টিকে থাকার কথায় মনে পড়ে বিপ্লব কাল ফোনে জোনাকিকে কী যেন বলছিল? পাশের ঘর থেকে রবীন শুনতে পেয়েছিল জোনাকি বলছে “তুই এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস কেন? টিকে থাকতে গেলে কিছু জিনিস অপছন্দ হলেও মেনে নিতে হয়।”

কলেজ ছাড়ার পর থেকে তো ছেলেটা আর দরকার ছাড়া কথাই বলে না বাপের সাথে। কে জানে কী বলছিল? বহুজাতিকের চাকরি করছে, মোটা মাইনে পাচ্ছে, নিজেরটা ছাড়া আর কারোরটা নিয়ে ভাবে না, তাতেও কিসের অসুবিধা ওর? তরতর করে তো পদোন্নতিও হচ্ছে, মাইনেও বাড়ছে। তাহলে আবার টিকে থাকার সমস্যা কেন? ভাবতে ভাবতে ছেলের উপর রাগ হয় রবীনের। ভাবনাও হয়। সেটাই মুশকিল। সন্তান মনের মত না হলেও তাকে ত্যাগ করা যায় না। পার্টির মতই।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

নাম তার ছিল: ১৫

পূর্বকথা: রবীন বলরাম আর শ্যামলের পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়ানো বন্ধ করতে চেয়েছিল, যাতে ওদের আর প্রধান হওয়া না হয়। উল্টে নিজেকেই আবার ভোটে দাঁড়াতে হল একটা কঠিন আসন উদ্ধার করার জন্য। তবে হীরুদা কথা দিলেন নির্বাচনের পর ঐ দুজনের ব্যবস্থা করবেন

১৯৭৮ থেকে ৮৮ পর্যন্ত শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ছিল রবীন। ৮৮ সালের ভোটের আগে ওর অনুরোধ রক্ষা করে হীরুদা আর ভোটে দাঁড়াতে বলেননি। তখন শরীরের যা অবস্থা তাতে ভোটে লড়া খুব ধকলও হয়ে যেত। রবীন খুশি হয়েছিল। মন দিয়ে সংগঠন করা যাবে আর স্বার্থান্বেষী লোকেরা চারপাশে ঘুরঘুরও করবে না — এই ভেবে। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার ৯১ সালে লোকসভার সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিনই হীরুদা ডেকে পাঠালেন এবং বললেন বিধানসভায় প্রার্থী হতে হবে। রবীন অবাক হয়েছিল, তবে পার্টি চাইলে আপত্তি করার প্রশ্ন নেই। তাছাড়া হীরুদাকে আর কবে “না” বলতে পেরেছে রবীন? কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ কেন্দ্রে বামফ্রন্ট প্রার্থী বদল করল না। সিদ্ধান্তটা হীরুদা আগেই রবীনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ও জোনাকিকে ইচ্ছে করেই কিছু বলেনি। রোজ একবার করে “হচ্ছে তো? হচ্ছে তো?” শুনতে বিরক্ত লাগত, হুঁ হাঁ করে চালিয়ে দিত। হচ্ছে না শুনলে জোনাকির কী প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল, তাই চেয়েছিল প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলে সোজা গণশক্তি থেকেই জানুক।

অনেক বারের জয়ী প্রার্থী সৌগত পানই মদনপুর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হচ্ছেন দেখে জোনাকি বেশ রেগে গিয়েছিল। আরো রেগে গিয়েছিল এটা বুঝে, যে রবীন আগে থেকেই জানত। “তুমি জানতে?” জিজ্ঞেস করায় “না” বললেও মিথ্যে বলায় রবীনের অপটুতা ওকে ধরিয়ে দিয়েছিল। “জানতে আবার না? ঠিকই জানতে। আমাকে কেন বলবে? বলবে তোমার পেয়ারের কমরেডদের, যারা পেছন থেকে ছুরি মারে। বুঝতেও তো পারো না। বেশ হয়েছে।” বলতে বলতে জোনাকির চেঁচামেচি শুরু হয়েছিল। চলেছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ না রবীন বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

সেসব মনে পড়তে নিজের অজান্তেই হেসে ফ্যালে রবীন। ঠিক তখনই এসে পৌঁছায় ফাল্গুনী।

“কি গো? একা একা বইস্যা হাসতাছ? কী হইছে?”

“আয় বয়। হাসুম না? চারদিকে কত মজার মজার জিনিস ঘটতাছে, হাসির কারণের তো অভাব নাই।”

“কী যে কও! আমি তো দ্যাখতাছি অবস্থা কেবল খারাপ হইতাছে।”

“ক্যান কী হইছে? দে, বিড়ি দে।”

ফাল্গুনী বিড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলে “আর কী হইব? পার্টি একটার পর একটা ভুল কাজ করতাছে।”

“কোনটার কথা কইতাছস? সিঙ্গুর?”

“হ্যাঁ। মমতা ন্যাশনাল হাইওয়ে আটকায় রাখছে। এটা তো বেআইনি। পুলিশ দিয়া উঠায় দিতে পারতাছে না?”

“সম্ভব না।”

“ক্যান?”

“মরাল রাইট নাই। নন্দীগ্রামে গুলি চালায় ফ্যালছে। আবার জোর খাটান যায়? রাজ্যে আগুন জ্বইল্যা যাইব। ভুল জায়গায় জোর খাটাইলে এই হয়। যখন দরকার তখন আর তুমি জোর খাটাইতে পারবা না।”

“তাইলে মমতা যা খুশি করব আর সরকার দাঁড়ায় দাঁড়ায় দ্যাখব!”

“উপায় নাই। মানুষের সমর্থন থাকলে অনেক কিছু করন যায়, না থাকলে কেবল বুড়ো আঙুল চোষা ছাড়া উপায় নাই।”

“সমর্থন তো আছেই।”

“নাই, নাই।”

“ক্যান? নাই কইতাছ ক্যান?”

“থাকলে মমতা ঐখানে বইস্যা থাকতেই পারত না অ্যাদ্দিন। ওখানকার মানুষই তুইল্যা দিত।”

“কিন্তু খবরে তো দ্যাখতাছি অনিচ্ছুক কৃষক কম, ইচ্ছুক কৃষকই বেশি।”

“এইগুলা কংগ্রেসী যুক্তি। আমাগো গরীব মানুষের সরকার এইভাবে ভাবব ক্যান? আমাদের ভাবা উচিৎ একজনই বা অনিচ্ছুক ক্যান?”

ফাল্গুনীর মুখ দেখেই রবীন বুঝেছিল ও ধন্দে পড়ে গেছে। তবে ওর প্রশ্ন করার অভ্যেসটা যে যায়নি আনন্দের কথা সেটাই। হালকা মেজাজ ঘুচে গিয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “তুমিই বলো। কেন?”

“কারণ মানুষকে তুমি বোঝাওনি ঠিক করে। তুমি ভেবেছিলে ‘সরকার আমার, এম এল এ আমার, এম পি আমার, পঞ্চায়েত আমার। তো আমার লোককে বোঝাতে যাওয়ার কোন ঠ্যাকা? রাইটার্সে বসে যা অ্যানাউন্স করব, লোকে মেশিনের মত মেনে নেবে।”

“কিন্তু ওরকম স্মুদলি তো অনেক কাজ করেছি আমরা। মানুষ তো আপত্তি করেনি কখনো!”

“করেনি কারণ মানুষ আমাদের তখন বিশ্বাস করত। ভাবত ‘এরা করছে যখন আমাদের ভালর জন্যই করছে’।”

“এখন আর বিশ্বাস করে না বলছ?”

“কী করে করবে বল তো? ক্ষেত্রগ্রামে যদি কাউকে বল গিয়ে বলে ‘তোমাদের জমিটা দিয়ে দাও, সরকার ভাল টাকা দেবে আর জমির উপরে কারখানা হবে, সেখানে তোমার লেখাপড়া জানা বেকার ছেলেটার চাকরি হবে।’ সে বিশ্বাস করবে?”

“আর কে কী করবে জানি না, আমি তো করব না,” ফাল্গুনী, বলরামের ছোটবেলার বন্ধু, হাসতে হাসতে বলে। “আমি তো ভাবব নিশ্চয়ই ওর ভাই ঐ জমি কোন প্রমোটারকে বেচবে বা নিজেই হাউজিং টাউজিং বানাবে। অবশ্য ওকে না বলতেও তো ভয় লাগবে। মনে হবে না দিলে যদি মেরে ধরে উঠিয়ে দেয়! নিজের থেকে ছেড়ে দিলে তো তাও টাকা দেবে বলছে।”

“তবে?” রবীন বিড়িটায় শেষ টান দিয়ে বলে “এইবার বুঝছস অনিচ্ছুক কৃষক আইল কোত্থিকা?”

“হুম। মমতা তাহলে ঐ লোকগুলোর সমর্থনই পাচ্ছে!”

“পাবেই তো। বিপদের সময় মানুষের পাশে যে দাঁড়াবে সে-ই মানুষের সমর্থন পাবে। যাদের তুমি ইচ্ছুক কৃষক বলছ তাদের সমর্থনও হয়ত মমতা পাচ্ছে। তারা হয়ত ভয়ে চেক নিয়ে নিয়েছিল তখন। এখন ভাবছে জমি ফেরত পেলে বেশ হয়।”

ফাল্গুনী বেচারার মুখ কালো হয়ে যায়। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর গলা নামিয়ে বলে “এদিকে আবার কী কাণ্ড জানো তো?”

“কোন দিকে?”

“আরে বল তো বলে বেড়াচ্ছে পরের বার বিধানসভায় নাকি ও দাঁড়াচ্ছেই।”

খবরটা ভাল না হলেও রবীন না হেসে থাকতে পারে না।

“হা হা হা। বলিস কী রে! এখন থেকে প্রচার শুরু করবে নাকি? ২০১১ তো অনেক দেরী, আগে তো ২০০৯ এর লোকসভাটা আছে।”

“ওকে নাকি আমাদের জেলা সম্পাদকমশাই কথা দিয়ে দিয়েছেন।”

“একেবারে কংগ্রেসী কালচার। পার্টির আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র-ফন্ত্র আর কিছু রাখবে না এরা। জেলা সম্পাদক টিকিট বিলোচ্ছে। তবে ভোটের সাড়ে তিন বছর আগে বোধহয় সোনিয়া গান্ধীও টিকিট বিলোয় না।”

বলেই হো হো করে হাসতে থাকে রবীন। ফাল্গুনীও হাসে, তবে ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে।

“তুমি হাসছ, রবীনদা? ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, তাতেই লোকে টিকতে পারে না। এম এল এ হলে কী করবে ভাবো।”

“কী আর করবে? হাতে মাথা কাটবে। তোর আর আমারটা তো কাটবেই। তার চেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের আরো দুর্গতি হবে। আর পার্টিটা উঠে যাবে।”

“না, পার্টি উঠে যাবে না। আমরা হয়ত পার্টিতে টিকতে পারব না। কিন্তু তাতে পার্টির কী? পার্টির তো ভোট পেলেই হল। সেই আমাদের পঞ্চায়েতটাকে মিউনিসিপ্যালিটি করা নিয়ে আমি আর তুমি এনামুলদার সঙ্গে যেদিন গেলাম, সেদিন সম্পাদকমশাই কী বললেন মনে নেই?”

“বাবা! সে কি ভোলা যায়! ‘আপনারা একটা এম পি সিট জেতাতে পারেন না, আবার এইসব দাবী নিয়ে আসেন!’”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু নয়, কমরেড,” রবীন ফাল্গুনীর পিঠে চাপড় মেরে উঠে পড়ে। “সুদিন শেষ। ভোট আর বেশিদিন পাওয়া যাবে না। চল, একটু চা খাই। গলাটা শুকিয়ে গেছে।”

বাবলুর দোকানে তখন অব্দি ভিড় জমেনি। চা দিতে বলে ফাল্গুনী নীচু গলায় জিজ্ঞেস করে “ভোট আর বেশিদিন পাওয়া যাবে না বলছ?”

“বলছি। লোকে আর সহ্য করবে না। সম্পাদকমশায়ের ওখানে কিভাবে ভোট হয় জানিস তো?”

“তা আর জানি না! গতবার তো লোকসভায় উনি যা ভোট পেয়েছিলেন তার সাথে তৃণমূল প্রার্থীর ভোট যোগ করলে মোট ভোটারের চেয়ে বেশি হচ্ছিল।”

“ওভাবে ভোট করার বিপদ দুটো। প্রথম হচ্ছে আসলে কত লোক তোর পক্ষে, তুই বুঝবিই না। দ্বিতীয়ত, ওভাবে তুই কবার ভোট করবি? একবার, দুবার, তিনবার, পাঁচবার? একদিন না একদিন তো তোর মেশিনারি ফেল করবেই। বিরোধীরা শক্তিশালী হয়ে উঠে আটকে দেবে। সেদিন যখন লোকে নিজের ভোট নিজে দিতে যাবে, তখন ঠিক করেই যাবে ‘আর যাকেই ভোট দিই, এই শালাদের আর দেব না।’ তখন তুই হেরে ভূত হয়ে যাবি।”

“আমাদের সেই সময় এসে গেছে বলছ?”

“শিরে সংক্রান্তি একেবারে। আমাদের দৌরাত্ম্য লোকে অনেক বেশিদিন সহ্য করে ফেলেছে বলা যায়। বোধহয় আমাদের আগের সুকৃতির কারণে। সেই কবে থেকে এ জিনিস শুরু হয়েছে ভাব। সবুজগ্রামে আমরা এই কালচারটা চালু হতে দিইনি তাই। ক্ষেত্রগ্রামে কবে থেকে বল বাইরের লোক আনছে ভেবে দ্যাখ। শ্যামলদারও খুব ইচ্ছা ওসব হোক। নইলে ওর নিজেকে বলর চেয়ে ছোট নেতা মনে হয়। কিন্তু ওকে অনেকদিন আগে একবার হীরুদা বলেছিল ‘ওসব করতে গেলে কিন্তু অনেক সময় পাড়ার লোক ক্ষেপে গিয়ে প্যাঁদাতে শুরু করে। সেটা সামলাতে পারবে তো?’ সেই ভয়ে ও শেষ অব্দি আর করে উঠতে পারে না।”

“তা নেতারাই বা এসব অ্যালাউ করে কেন?”

“বাহাদুরি। আর যে করেই হোক ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে। অনিল বিশ্বাসের আমল থেকে কে কত মার্জিন দিতে পারে সেই নিয়ে কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেছে। তুমি যেভাবে পারো মার্জিন বাড়াও, পার্টি তোমার সঙ্গে আছে।”

“কিন্তু এখনো কি মমতার এত জনসমর্থন হয়েছে যে আমাদের হারাবে?”

“সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু ওর সমর্থন প্রতিদিনই বাড়ছে এটা জেনে রাখ। আর আমাদের রাশ আলগা হচ্ছে। দেখছিস না, কিছুই সামলানো যাচ্ছে না? নন্দীগ্রামই বল আর সিঙ্গুরই বল।”

ফাল্গুনীর মুখটা দেখে বেশ মায়াই হচ্ছিল রবীনের। বেচারা নিপাট ভাল মানুষ, খুব অল্প বয়স থেকে পার্টি করছে, সবুজগ্রাম হাইস্কুলের দারুণ জনপ্রিয় মাস্টার। বেশ ভাল ছাত্র ছিল। যে সময় পাশ করেছে সেই সময় কলেজের চাকরি পেতে পারত কিন্তু নিজের জায়গা এই সবুজগ্রাম — এর উপর ওর এমন টান যে স্কুলের চাকরিটা পেয়ে যেতেই আর ওসব চেষ্টাই করল না। রবীন একটু বকাই দিয়েছিল তাই নিয়ে। তাতে ওর জবাব “আরে রবীনদা, যে ইস্কুলে পড়েছি সেইখানেই মাস্টারি করতে পারছি। এর চেয়ে সুখের আর কী আছে বলো? আর এখানেই ইস্কুল, সাইকেলে যেতে আসতে দশ দশ কুড়ি মিনিট; পার্টিটা করার সময় পাব। কলেজে ঢুকলে সে কোন কলেজে হবে, ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে করতেই জীবন কেটে যাবে। পার্টি করব কখন?” এমন বোকা ছেলে যে পাশের বাড়ির ছেলে, ল্যাংটো বয়সের বন্ধু বলরাম — তার মুখের উপর সত্যি কথা বলতে শুরু করেছিল। তাই ব্যাটা ওকে আর উঠতে দিল না। বল পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে রইল আর ফাল্গুনী পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হয়ে গেল — এতেও ওর চোখ টাটিয়েছিল। ফলে ল্যাং মেরে দিল। গত কনফারেন্সে এল সি এম পর্যন্ত থাকতে দিল না। পার্টি ওর থেকে কত কিছু পেতে পারত, কিছুই পেল না। ও-ই বা কী পেল?

“যাকগে, ছাড়ান দে। চা-টা দে,” বলে রবীন আলোচনাটা শেষ করার চেষ্টা করে। কয়েকজন খদ্দের এসে গেছে, তাদের এইসব আলোচনা শুনতে দেওয়া উচিৎ না।

ফাল্গুনী নিজের চায়ের গেলাসটা বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে রবীনেরটা ঠোঁটে ধরে। ও চুমুক দিতে না দিতে প্রায় স্বগতোক্তির মত ফাল্গুনী বলে “হীরুদা আর কয়েকটা বছর বাঁচলে…”

রবীন চা গিলে নিয়ে বলে “ধুর! হীরুদা আর কটা বছর বাঁচলে, জ্যোতি বসু আর কটা বছর বাঁচলে, প্রমোদ দাশগুপ্ত আর কটা বছর বাঁচলে, লেনিন আর কটা বছর বাঁচলে… এরকমভাবে রাজনীতি হয়? যারা বেঁচে থাকে, যা করার তাদেরই করতে হয়। তারাই গড়বড়ে হলে আর কী করা যাবে? তাছাড়া হীরুদা তো নব্বই বছর বয়সে মারা গেল। আর কতদিন বাঁচতে পারে একটা মানুষ?”

ফাল্গুনী গরম চা এক ঢোঁকে খেয়ে ফেলে বলে “তুমি তো কোন আশাই দিচ্ছ না, রবীনদা।”

“আশা আমায় দিতে হবে কেন? আশা আছে তো।”

“আছে!”

“নিশ্চয়। বামফ্রন্ট সরকার না থাকলেই কি বাম আন্দোলন শেষ নাকি?”

“সরকার না থাকলে কি আর পার্টি টিকবে?”

“যারা টিকবে না তাদের না টেকাই ভাল। যদ্দিন পার্টি ক্ষমতায় থাকবে ওগুলোকে বার করাও যাবে না। ক্ষমতা গেলে তবে নতুন করে গড়া যাবে।”

“কিন্তু কাদের নিয়ে গড়বে?”

“নতুনদের নিয়ে, তরুণ ছেলেমেয়েদের নিয়ে।”

“সে কি সম্ভব? আজকাল ছেলেমেয়েগুলো কি স্বার্থপর দ্যাখো না? নিজের কেরিয়ার ছাড়া এরা কিচ্ছু নিয়ে ভাবে না। এখন পার্টি ক্ষমতায় আছে বলে তাও কিছু ছেলেমেয়ে আসছে। ক্ষমতা চলে গেলে এরা আর ছায়া মাড়াবে না।”

রবীনের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পয়সাটা দিয়ে বলে “চল, বেরিয়ে কথা বলি।”

বেরিয়ে রবীন সুভাষ কলোনির দিকে হাঁটতে শুরু করে। “এ কি! এদিকে চললে? আজকে এল সি মিটিং না?” ফাল্গুনী বোধহয় ভেবেছিল রবীন কথা বলতে বলতে পার্টি অফিসে গিয়ে ঢুকবে, আর ও খানিকক্ষণ বসে গল্পগুজব করে মিটিঙের জন্য কমরেডরা আসতে শুরু করার আগে উঠে আসবে।

“বড় বড় বিপ্লবীদের মিটিং। আমার গিয়ে কাজ নেই। আমি আমার ছাত্রগুলোর খোঁজ নিয়ে আসি।”

“আমি যাব? আমার তো কোন কাজ নেই এখন।”

“চল না,” রবীন ফাল্গুনীর কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। “অদূর ভবিষ্যৎটা আমাদের ঝরঝরে, বুঝলি। সুদূরের যত্ন নেয়া দরকার। সেটাই করছি।”

ফাল্গুনী মুচকি হেসে বলে “ও, তাই বলো। তুমি ভবিষ্যতের কমরেড তৈরি করছ। তাই তোমার নতুনদের নিয়ে আশা?”

“আরে সবাই কি আর কমিউনিস্ট হবে? হবে না। কিন্তু এক দল ভাল মানুষ যদি তৈরি করা যায়, তার থেকে কিছু ভাল কমিউনিস্ট বেরোবেই।”

“হ্যাঁ, তোমার ঐ ছাত্রটাকে পার্টিতে আনতে হবে। কী যেন নাম? তোমার বাড়ি আলাপ হল একদিন?”

রবীন একটা চওড়া হাসি হেসে বলে “সুবিমল। খুব সম্ভাবনাময়। তবে ও একা নয়। ওর বয়সী সব ছেলেমেয়েকেই ধরতে হবে। আগামী দিনের কমরেড ওদের মধ্যে থেকেই আসবে রে।”

“তুমি বড্ড বেশি আশাবাদী, রবীনদা। হাতে গোনা কয়েকজনকে দেখে তুমি ভবিষ্যৎ নিয়ে এত উৎসাহিত!”

“হ্যাঁ রে, তোর বয়স কত?” রবীন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে। “আমার তো রিটায়ারমেন্টের সময় হল। এখন তো আমার নৈরাশ্যবাদী হবার সময়। তোর কী হইছে?”

“দেখে দেখে সিনিক হয়ে গেছি, রবীনদা। হয়ত হওয়া উচিৎ না। কিন্তু… তুমি নিজেই ভেবে দ্যাখো না। কেষ্টর থেকেও তো তোমার অনেক আশা ছিল। সেই জন্যেই তো ৯৩ তে বলকে সরিয়ে তুমি ওকে প্রধান করালে। কিন্তু ফল কী হল?”

ঠিকই। কোন লাভ হয়নি শেষ অব্দি। কিন্তু রবীন তো চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। চেষ্টাই তো করতে পারে মানুষ, সর্বশক্তি দিয়ে। আশা নেই বলে চেষ্টাও করবে না মানুষ? পরাজয়ের ভয় পাবে কমিউনিস্টরা?

হীরুদা কথা রেখেছিলেন। লোকাল আর জোনাল কমিটির সিদ্ধান্তকে জেলা কমিটি থেকে পুনর্বিবেচনার জন্যে ফেরত পাঠিয়ে, কী চান সেটা বুঝিয়ে দিয়ে সবুজগ্রামের প্রধানের পদ থেকে শ্যামলদাকে আর ক্ষেত্রগ্রামের প্রধানের পদ থেকে বলরামকে সরতে বাধ্য করেছিলেন। ডি ওয়াই এফ আই নেতা, সাতাশ বছরের হোলটাইমার কৃষ্ণমোহন দাসকে বলর জায়গায় আর বছর পঁয়তাল্লিশের শিক্ষক নেতা হরিপদ মজুমদারকে শ্যামলের জায়গায় বসানো হয়েছিল। নামগুলো, বলাই বাহুল্য, রবীনই যুগিয়ে দিয়েছিল।

কৃষ্ণমোহন, মানে কেষ্ট, রাজনীতিতে এসেছিল বলর হাত ধরেই। বল যে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার, কেষ্ট সেই স্কুলেই পড়ত। ফাল্গুনী, শিবুর মত অনেক কমরেডই রবীনকে সাবধান করেছিল, কেষ্ট ছেলে ভাল হলেও বলর প্রভাব এড়াতে পারবে না। তার চেয়ে এমন কাউকে প্রধান করা উচিৎ যে রবীনের কথা শুনবে। ও মানতে পারেনি। উদ্দেশ্য তো দুর্নীতিগ্রস্ত, দাম্ভিক প্রশাসককে সরিয়ে একজন সৎ লোককে দায়িত্ব দেওয়া, নিজের বশংবদ কাউকে প্রধান বানানো তো নয়।

ক্ষেত্রগ্রামে যারা সেবার পঞ্চায়েত সদস্য হয়েছিল তাদের মধ্যে সব মিলিয়ে কেষ্টর চেয়ে যোগ্যতর কাউকে দেখতে পায়নি রবীন। কেষ্ট দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই রবীনের কানে আসতে থাকে “প্রধান যে কে সে তো বোঝা যায় না। সইসাবুদগুলোই শুধু কেষ্ট করে। আমাদের আর্জি শোনে বলদা, বিধানও দেয় বলদা। আগের মতন বাড়িতে দরবারও বসাচ্ছে বলদা। তা’লে আর বদল হল কী?”

সবুজগ্রামে কিন্তু বদল হয়েছিল। কেষ্টকেই যোগ্যতম মনে হলেও হরিপদর ব্যাপারে রবীন ঠিক খুশি হতে পারেনি। প্রথমত, হরিপদ রবীনেরই বয়সী, মানে মোটেই তরুণ নয়। দ্বিতীয়ত, ও কলকাতার এক নাম করা স্কুলের মাস্টার। কথাবার্তায় একটু আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিল। শ্যামল কংসবণিকের বদলে যদি এমন কেউ প্রধান হয় যে চাষাভুষো দেখলে ভাল করে কথাই বলে না, তাহলে আর লাভ কী? হরিপদ যে পাড়ার পঞ্চায়েত সদস্য, সে পাড়ায় ওটা কোন সমস্যা নয় কারণ ওটা মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত চাকুরিজীবীদের পাড়া। কিন্তু প্রধান হলে? রবীনের তাই প্রথম পছন্দ ছিল অবনী ঘোষ।

স্টেশনের গায়ে যে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেরামিকের কারখানাটা, অবনী সেটায় কাজ করত। বন্ধ হয়েছে হালে। ৯৩ সালে রমরমিয়ে চলত। অবনী উচ্চমাধ্যমিকের বেশি পড়াশোনা না করে থাকলেও খুব গুণী ছেলে। হাতের লেখা মুক্তোর মত, আঁকতে পারত চমৎকার। যে কোন ভোটের সময় ওকে দিয়ে দেয়াল লেখাতে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত ব্রাঞ্চগুলোর মধ্যে। রবীনেরই ছাত্র, রবীনের হাত ধরেই পার্টিতে আসা। নিজের উদ্যোগে পার্টির বইপত্র পড়ত খুব। আর পড়ত সুনীল, শীর্ষেন্দু, সঞ্জীব, দুই সমরেশ। অমায়িক ব্যবহার বলে কারখানায় যেমন, এলাকাতেও তেমন জনপ্রিয়। সেবারই প্রথম পঞ্চায়েত সদস্য হয়েছে, বয়সও পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কিন্তু সবুজগ্রামের যতজন ভাল কমরেডের সাথে কথা বলেছিল রবীন, সকলেরই মত ছিল হরিপদকেই প্রধান করা ভাল। গোড়ায় রবীন ভেবেছিল ওরা ওরকম বলছে মধ্যবিত্ত অভ্যাস থেকে। মানে স্কুলমাস্টারকে প্রধান মানতে আপত্তি নেই, শ্রমিককে মানবে না। না মানবে বুঝলে অবশ্য জোর করে চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই, তবু রবীন ওদের বোঝানোর চেষ্টা করছিল। সেই চেষ্টা করতে গিয়েই একদিন শিবুর মুখে শুনল জগার সঙ্গে নাকি অবনীর আবার দোস্তি হয়েছে।

জগা এলাকার পলাতক সমাজবিরোধী। রবীনের স্কুলেই পড়ত, অবনীর গলায় গলায় বন্ধু ছিল। বাবা ছিল কুড়াইল জুটমিলের শ্রমিক। ছেলে ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পাগলা সুরেনের দলে ভিড়ে গিয়েছিল। সুরেন তখন সেই সময়কার কংগ্রেসী এম এল এর ছত্রছায়ায় রেল ইয়ার্ডের স্ক্র্যাপ স্মাগলিং করে।

তবে সাতাত্তরে বামফ্রন্ট সরকার আসার আগেই দুবার স্ট্রোক হয়ে সে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে, তার সাম্রাজ্য চলে গেছে জগার দখলে। রবীন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার পরে পরেই দলেরই একজনের সঙ্গে ওর ঝামেলা লেগে যায়। তার জেরে সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রামে শুরু হয় বোমাবাজি, খুনোখুনি। এই এলাকা তখন মদনপুর থানার মধ্যে পড়ে। হীরুদাকে গিয়ে রবীন বলেছিল একজন কড়া ও সি দরকার। সেই মত এসে পৌঁছেছিল জয়ন্ত ভৌমিক। রবীনেরই বয়সী। তার তাড়া খেয়ে সেই ৮৫ সাল থেকে জগা এলাকা ছাড়া, ওর দলবলও লোপাট হয়ে গিয়েছিল। রবীন শুনেছিল জগা ৯০-৯১ থেকে গলামনের ও পারে লক্ষ্মীপুরে ঘাঁটি গেড়ে জমির দালালি করছে, আর এ পারে ফিরে আসার রাস্তা খুঁজছে। অবনী যে আবার ওর পাল্লায় পড়েছে সেটা জানা ছিল না।

“কোন প্রমাণ দিতে পারব না, তবে লক্ষ্মীপুরে ওর আত্মীয়স্বজনও কেউ থাকে না, কাজের জন্যেও যাবার দরকার হয় না। তবু মাসে দুবার তিনবার অবনী খেয়া পার হয়ে ওখানে যাবেই। আর জগা যে এখন ওখানে আচে সে খবরটা পাকা। দুয়ে দুয়ে চার অনেকেই করচে,” বলেছিল শিবু। এরপর আর হরিপদ ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না।

হরিপদ যে শ্যামলকে ওরকম টাইট দিয়ে দেবে রবীনও ভাবতে পারেনি। ক্ষমতা এমন এক নেশা, যা ছাড়ানো বেশ শক্ত। যত দিন যায়, ছাড়ানো তত শক্ত হয়। শ্যামল তো আবার যে সে নেশাখোর নয়, দিনরাত ক্ষমতায় চুর হয়ে থাকা লোক। তাই হরিপদকে নিজের কথায় ওঠাবে বসাবে ভেবেছিল। কিন্তু সে একেবারে প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দেয়। শপথ নেওয়ার দিনই কি একটা জ্ঞান দিতে গিয়েছিল শ্যামল, হরিপদ সোজা বলে দেয় “আপনি নিজের কাজে মন দিন, শ্যামলদা। আমি আমারটা ঠিক বুঝে নেব।” এক ঘর লোকের মাঝখানে এই কথাটা শুনে শ্যামলের মুখটা কেমন হয়েছিল রবীন আজও ভোলেনি। লোকটা এমন বেহায়া, এর পরেও হরিপদকে ঠারেঠোরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আসলে ও-ই প্রধান। এতে বিরক্ত হয়ে হরিপদ ওকে এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা শুরু করে, যে কয়েক মাস পর থেকে শ্যামল পঞ্চায়েতে আসাই বন্ধ করে দেয়।

এসব রবীনের কানে আসত, আর আসত হরিপদর সুখ্যাতি। রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, সবজিওয়ালা — এরাই দেখা গেল নতুন প্রধানকে নিয়ে বেশি খুশি। “শ্যামলদা পুরানো লোক, অনেক করেছেন আমাদের জন্যে। কিন্তু বয়স্ক লোক তো, চট করে রেগে যান। ওনাকে একটু ভয় ভয় কত্ত, হরিপদবাবুকে মন খুলে বলা যায়,” রবীনকে স্টেশন বাজারের একজন বলেছিল।

আশ্বস্ত হয়েও রবীন ভেবেছিল শ্যামল কি আর ছেড়ে দেবে? নিশ্চয়ই প্রত্যাঘাত করবে। কিভাবে? অবশ্য শ্যামল যতটা গোঁয়ার ততটা ধূর্ত নয়। তাই ও বলরামের চেয়ে চিরকালই কম বিপজ্জনক। দুজনে রেষারেষিও আছে, তবে আঁতে ঘা লাগলে গলাগলি হতে দেরী হয় না। আর বল ওর পদচ্যুতির শোধ তুলতে চাইবেই, সে যতই বকলমে ও পঞ্চায়েত চালাক। সুতরাং দরকার পড়লে যে বলর থেকেই দুষ্টু বুদ্ধি পেয়ে যাবে শ্যামল, তাতে সন্দেহ ছিল না। আশঙ্কা সত্যি হল অনেক পরে — ৯৮ সালের গোড়ায়।

থান রোড ধরে জাতীয় সড়কের দিকে যেতে ক্ষেত্রগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা শেষ হয় আমলকিতলা দিয়ে। তারপরই হাজিপাড়া। ওটা দিয়ে আজাদপুর মিউনিসিপ্যালিটির এলাকা আরম্ভ। আমলকিতলায় আমলকি গাছ আর অবশিষ্ট ছিল না একটাও, তবে পাড়ায় ঢুকতেই একটা বিশাল বটগাছ ছিল। সেই গাছের তলায় কোত্থেকে একটা বড়সড় পাথর এনে ফেলে দিয়েছিল কেউ। ব্যাস, শিবরাম চক্রবর্তীর সেই গল্পটার মত দেবতার জন্ম হয়ে গেল।

ও পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ধাক্কা সামলে বাড়ি ফিরেছেন। তাই রবীন, হরিপদ, বলরাম আর ফাল্গুনী আরো কয়েকজনকে নিয়ে ওঁকে দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে তেল সিঁদুর মাখানো, খুচরো পয়সা পরিবৃত পাথরটার দিকে চোখ পড়তে হরিপদ ঐ পাড়ারই এক কমরেডকে জিজ্ঞেস করেছিল “এসব কী হচ্ছে রে?”

“আর বলবেন না, দাদা। মাস তিনেক আগে জলের লাইন বসল, তখন মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে ঐটে বেরিয়েছিল। আমার সামনে। অত ভারী পাথর, দুজন লেবার মিলে তুলল। তারপর কোথায় রাখবে? তা শ্যামলদা ছিলেন, বললেন ‘ঐ গাছের তলায় রেখে দিগে যা।’ রাখা হল। দু একদিন পর থেকেই দেখছি এই কাণ্ড।”

“সে তো বুঝলাম। মানুষের অন্ধ বিশ্বাস থেকে এগুলো হয়। কিন্তু তোরা সব রয়েছিস, তাও লোকের অন্ধ বিশ্বাস গেল না। এইটাই দুঃখের কথা।”

পরদিন রবীন স্কুলে গেছে, হঠাৎ টিফিনের সময়ে হন্তদন্ত হয়ে, আমলকিতলার কিছু ছেলেকে নিয়ে শিবু হাজির। “রবীনদা, শিগগির চলুন।”

“কেন রে? কী হল?”

“সকাল তেকে আমলকিতলায় অশান্তি। আমরা অনেক সামলানোর চেষ্টা কল্লুম, কিন্তু লোকজন হেবি ক্ষেপে আচে।”

“আরে, কী হয়েছে কি?”

“ঐ বটগাচ তলার ঠাকুরকে কে তুলে ফেলে দিয়েচে।”

রবীন কল্পনাও করেনি এমন হতে পারে। ও পাড়ার যে ছেলেটা আগের দিন সঙ্গে ছিল, সে অনেক দিনের পার্টি সদস্য। এত মাথামোটা হওয়ার তো কথা নয়!

“সে কি কথা রে!” রবীন আঁতকে উঠেছিল। “কে করল এই কাণ্ড?”

“সেসব জানি না। পাড়ার লোকের ধারণা হয়েচে হাজিপাড়ার কেউ।”

“সে কি!” হাজিপাড়া পুরোপুরি মুসলমানদের পাড়া। কী ঘটতে পারে ভেবে মাথা ঘুরে গেল রবীনের। “কেউ দেখেছে নাকি করতে? এটা কাদের অভিযোগ?”

“কেউ দ্যাখেনি, স্যার,” শিবুর সঙ্গের ছেলেদের একজন বলে। “যারা ভোরবেলা মর্নিং ওয়াক করতে বেরোয়, তারাই প্রথম দেখেছে পাথরটা রাস্তার ধারে গড়াগড়ি যাচ্ছে। তখন ভোর পাঁচটা। মানে গভীর রাতে করেছে কেউ। কে আর দেখতে পাবে? এই ঠান্ডায় তো সবার জানলা দরজাও বন্ধ।”

“তা কেষ্ট, বল — ওদের খবর দিয়েছিস?”

“কেষ্ট তো সকাল থেকে ওখানেই চিল। কিন্তু ওর কথা কেউ শুনচে না। রেগে মেগে চলে গেল এই মাত্তর,” শিবু বলে। “আর বলদার বাড়ি গিসলাম। সে তো বলল ‘আমি কে? আমি গিয়ে কী করব?’”

“অ। তা আমায় সকালে খবর দিসনি কেন?”

শিবু চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে “বলেচিলাম। কেষ্ট বললে ‘ওনাকে জানানোর দরকার নেই।’ কিন্তু এখন আপনি না গেলে উপায় নেই, রবীনদা। ক্লাবের ছেলেরা লাঠিসোটা বার করে ফেলেচে। বলচে হাজিপাড়ার লোকেদের মারতে যাবে।”

“আসছি, দাঁড়া।”

রবীনের টিফিনের পরে আরেকটা ক্লাস বাকি ছিল। সেটা যে করতে পারবে না হেডমাস্টারকে সে কথা মুখ বাড়িয়ে বলে দিয়েই সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ওদের সাথে। পথে যেতে যেতে শুনল শুরু থেকেই হল্লা বেশি করছে আমলকিতলা তরুণ সংঘের ছেলেরা, যারা বলরামের অনুগত সি পি এম বলে পরিচিত, বলরামের ভুয়ো ভোটার বাহিনীর সদস্য। সকাল থেকে দফায় দফায় কেষ্ট মিটিং করেছে ওদের সাথে, কিন্তু ওদের প্রথম থেকেই এক কথা — হাজিপাড়াকে শিক্ষা দিতে হবে। বয়স্ক লোকেরা প্রথম দিকে শান্ত থাকলেও এখন তারাও উত্তেজিত। ওখানকার পঞ্চায়েত সদস্য বাবুল বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আন্দাজে এরকম অভিযোগ করা ঠিক না। তাতে একজন বয়স্ক লোক ঠাস করে চড় কষিয়ে দিয়েছে। বাবুল অপমানিত হয়ে সেই যে বাড়ি ঢুকেছে, আর বেরোচ্ছে না। হাজিপাড়ার দুই পঞ্চায়েত সদস্য — ইসমাইল আর সিরাজুলকে কেষ্ট ডাকিয়েছিল। ওরা এসে বলে গেছে খুঁজে দেখছে, যদি দেখা যায় ওদের পাড়ার লোক এই কাণ্ড করেছে, তাহলে ওরাই কান ধরে নিয়ে আসবে। কিন্তু আমলকিতলার লোক ওদের বিশ্বাস করতে রাজি নয়।

রবীন পৌঁছে দেখে তরুণ সংঘের সবচেয়ে বদ ছেলেটা যে বেদীর উপর পাথরটা ছিল, সেটার উপর লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে। “এখন অনেক বড় বড় সি পি এম নেতা এখানে আসবে, এটা সেটা বলে ভোলানোর চেষ্টা করবে। আপনারা ভুলবেন না। এটা পাটির ব্যাপার না। এটা আমার আপনার ধর্মে লাথি। যা করার আমাদেরই কত্তে হবে। সি পি এম ওদের পক্ষই নেবে। ওরা সি পি এমের ভোট ব্যাঙ্ক…”

রবীন শিবুকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে “এ কি রে! এ এরকম উল্টো গাইছে?”

“নতুন বিজেপি হয়েচে তো। ক্লাবের আর দু একজনও হয়েচে।”

রবীন বুঝে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে “এই যে বাবা, তুমি হিন্দুর ছেলে ঠাকুরের বেদীতে উঠে দাঁড়িয়েছ কেন? তাও আবার চটি পায়ে?”

গলা শুনে ভিড়টা ওর দিকে ঘুরে গিয়েছিল। অনেকে “আসুন, রবীনদা” বলে জায়গা করে দেয়। রবীন বেদিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা তখনো কোমরে হাত দিয়ে বেদির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। একজন ধমক দেয় “অ্যাই হতভাগা! এখনো দাঁড়িয়ে আছিস! নাম।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে নেমে আসে। রবীন আর ওর দিকে না তাকিয়ে হাত তুলে সকলকে বলে “বসুন, সবাই বসুন। শান্তিতে কথা হোক।” জনতা বসে পড়ে।

“আপনাদের মুখগুলো দেখে বুঝতে পারছি সবাই খুব রেগে আছেন। রেগে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু রেগে থাকলে তো কোন সমাধান হবে না…”

“আমরা এসব ভ্যানতাড়া শুনব না,” কথার মাঝখানেই একজন চেঁচিয়ে বলে। এই মুখটাও চেনা। তরুণ সংঘেরই। রবীন ওর দিকে ঘুরে বলে “আচ্ছা, তাহলে আপনারা বলুন, আমি শুনি? বলুন কী করতে চান?”

সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। রবীন তার উপরে গলা চড়িয়ে বলে “একজন, একজন।” সবাই থেমে গেলে যে মাতব্বরটা বেদির উপরে দাঁড়িয়ে লোক ক্ষেপাচ্ছিল, সে-ই চিৎকার করে বলে “আমাদের ভগবানের গায়ে হাত তুলেছে। আমরা ছেড়ে দেব? হাত পা ভেঙে দোব শালাদের। একটাকেও আস্ত রাখব না। হাজিপাড়া জ্বালিয়ে দেব আজকে।” বলেই ছেলেটা হাতের লাঠিটা মাথার উপর তুলে ঘোরাতে থাকে। অনেকেই হৈ হৈ করে ওঠে। রবীন এবার হুঙ্কার দেয় “অ্যাই! থামা তোর হিন্দি সিনেমা। কে দেখেছে হাজিপাড়ার লোককে ঠাকুর ফেলে দিতে?”

সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে, গুজগুজ ফুসফুস করে, মিনিট খানেক কোন জবাব আসে না, তারপর এক ছোকরা বলে “আমি দেখেছি।” রবীন এগিয়ে গিয়ে খপ করে তার হাতটা ধরে।

“চল।”

“ক-কোথায় যাব?”

“হাজিপাড়ায়।”

“ক-কেন?”

“যে করেছিল তাকে চিনিয়ে দিবি। প্রথমে ব্যাটাকে পেটাব, তারপর পুলিশে দেব। চল।”

“ন-না, মানে মুখটা তো ঠিক ভাল করে দেখতে পাইনি…”

“কেন?”

“আ-সলে ভোররাত্তির তো… অন্ধকারের মধ্যে…”

“কটা বাজে তখন?”

“ঘড়ি দেখিনি তো।”

“কোথা দিয়ে দেখলি?”

“জানলা দিয়ে।”

“কোন বাড়ি তোর?”

“ও রমেশবাবুর ভাইপো, দাদা,” শিবু পেছন থেকে বলে। রমেশবাবু। অর্থাৎ আগের দিন বিকেলে রবীনরা যাকে দেখতে এসেছিল।

“তার মানে তোর বাড়ি তো সে-ই পুকুর ধারে।”

ছেলেটা ঢোঁক গিলে মাথা নাড়ে।

“তা সেখান থেকে এই বটতলা কী করে দেখতে পাওয়া যায়, বাপ? মধ্যিখানে এত ঘরবাড়ি?”

ছেলেটা কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল। তার আগেই রবীন ওকে টানতে শুরু করে। “চল, আগে তোকে পুলিশে দিই গুজব ছড়ানোর অপরাধে। তারপর দেখব কে করেছে কাণ্ডটা।”

ছেলেটা রবীনের পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। “ভুল হয়ে গেছে, রবীনদা। আর করব না, দাদা। এইবারটা ছেড়ে দিন।”

রবীন কানটা ধরে টেনে তোলে। তারপর বলে “কে বুদ্ধি দিয়েছিল এইসব বলতে? জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে তো বললি না? কিছুক্ষণ পরে বললি। বল কে ইশারা করল? বল, নইলে কিন্তু তোকে থানায় নিয়ে যাবই। এক রাত হাজতে থাকবি, পুলিশের খাতায় নাম উঠে যাবে, চাকরি বাকরি কিচ্ছু কোনদিন পাবি না। বল।”

“এখানে অনেকেই বলছে দেখেছে, কিন্তু কেউ সাহস করে বলছে না। আমাকে বলল ‘তুই বল তুই দেখেছিস। আমরা তোকে সাপোর্ট করব।’”

রবীন কানটা ছেড়ে দিয়ে বলে “আচ্ছা। কে কে সাপোর্ট করছে ওকে? কে কে নিজে চোখে দেখেছে হাজিপাড়ার লোককে এই কুকম্মটা করতে?”

কারোর মুখে আর কথা নেই। রবীন ছেলেটাকে বলে “দেখেছিস তো, বাজে লোকের কথায় নাচলে কী হয়? তোকে এখন পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেলেও কেউ টুঁ শব্দ করবে না। তোর বাবা, জ্যাঠা ভাল লোক, সেই জন্যে এ যাত্রায় তোকে ছেড়ে দিলাম। খবরদার যেন এসবে আর না দেখি।”

“আপনি সেই মুসলমানদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।” ফোঁস করে ওঠে সেই মাতব্বরটা। “বটেশ্বরের অপমানের প্রতিকার করার কোন ইচ্ছা নেই। এইসব চালাকি এখানে চলবে না।”

রবীন একগাল হেসে বলে “এক্ষুণি করছি প্রতিকার। এসো তো বাবা এদিকে।” কী হতে যাচ্ছে বুঝতে না পেরে ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে “কেন? কী করতে হবে?”

“ভয় পাচ্ছ নাকি হে? এখুনি তো লাঠিসোটা নিয়ে বেপাড়ায় মারামারি করতে যাচ্ছিলে। এসো এদিকে। মারবও না, ধরবও না।”

ছেলেটা তবুও ইতস্তত করে। কে একজন ভিড়ের মধ্যে থেকে বলে “দ্যাখো, দ্যাখো। এইবারে আর পা নড়তাছে না। সকাল থিকা ‘মাইরা ফ্যালামু, কাইট্যা ফ্যালামু’ বইলা লোক ক্ষ্যাপাইতাছে, এদিকে নিজের পায়রার বুক। নিশ্চয় কোন বদ মতলব আছিল।”

এই গঞ্জনার পরে আর ছেলেটা থাকতে পারে না, এগিয়ে আসে। রবীন কাঁধে হাত দিয়ে বলে “ঠাকুর মাটিতে পড়ে আছেন এটা তো ভাল কথা নয়। আগে সেইটের প্রতিকার করতে হবে তো। এসো, হাত লাগাও।”

দু পাশে ধানজমি, মাঝখান দিয়ে এখানকার রাস্তা। তাই রাস্তাটা অনেক উঁচু। রাস্তার একপাশে জমিতেই পড়েছিলেন বটেশ্বর। রবীন নেমে পড়ে হাত লাগায়, ছেলেটাও হাত লাগায়। দেখাদেখি অনেকে ছুটে আসে, বটেশ্বর অবিলম্বেই নিজের আসনে ফেরত চলে আসেন। রবীন বদমাইশটার চোখে চোখ রেখে বলে “এত বড় হিন্দু তুমি, তোমার দলবল নিয়ে সকাল থেকে এইটুকু করে উঠতে পারোনি, কেবল বাজার গরম করছিলে? ফের যদি মুখ খুলেছ, তোমাকেই থানায় নিয়ে যাব। দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টায় অ্যারেস্ট হবে, তারপর কে তোমায় জামিন দেয় আমি দেখব।”

ছেলেটা আর দাঁড়ায় না।

ভিড় ততক্ষণে অনেক পাতলা হয়ে গেছে। ঠাকুর আসনে বসে যেতেই বেশিরভাগের আর কে করল, কেন করল জানার উৎসাহ ছিল না। শুধু কয়েকজন পরিচিত কংগ্রেসী তখনো দাঁড়িয়ে। তাদেরই মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটি বললেন “ভালই ধামা চাপা দিলে, কিন্তু সকাল থেকে যে কাণ্ডটা হল তার জন্যে দায়ী কিন্তু তোমরাই।”

রবীন বেশ বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল “আমরা?”

“অবশ্যই। ঠাকুর দেবতাকে ভক্তি কত্তে তো শেখোনি। সে নয় হল, কিন্তু তোমাদের নেতা হরিপদ মজুমদার ঠাকুর দেবতাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অসম্মান করে কোন সাহসে?”

রবীন অবাক হয়ে মনে করার চেষ্টা করে আগের দিন সন্ধ্যায় ওরা যখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিল তখন এ পাড়ার লোক কেউ উপস্থিত ছিল কিনা। উনি বলেই চলেছেন। “তাছাড়া এই ক্লাবের ছেলেরা কাদের লোক সবাই জানে। ওরাই তো গণ্ডগোলটা পাকাচ্ছিল।”

“না না, ডাব্বু বিজেপি করে” শিবু প্রতিবাদ জানায়।

“সে তো হালে, বাপু। লাস্ট ভোটে ও কাদের কাছে পাঁউরুটি, আলুর দম খেয়েছে?”

“শুধু পাঁউরুটি, আলুর দম খেয়ে বাড়ি যায়নি, জেঠু। আমাদেরও খাইয়ে গেছে দু চার ঘা” একজন বলে। একটা ছোট খাটো হাসির রোল ওঠে।

রবীন মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে বলে “ধামা চাপা বলে আপনারা ভাবতেই পারেন, কিন্তু আর কী করার আছে আমার তো মাথায় ঢুকছে না। কেউ যদি যে করেছে তাকে ধরতে পারেন তো পুলিশে দিন, পার্টি তাকে প্রোটেক্ট করবে না, এটুকু নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি। আর হরিপদ কালকে ঠাকুর দেবতাকে অশ্রদ্ধা করে কিছু বলেনি, পাথরটা তুলে ফেলে দেওয়া উচিৎ তা-ও বলেনি। আপনাদের যে-ই এসব বলে থাক, মিথ্যে কথা বলেছে। আমি নিজে হরিপদর সঙ্গে ছিলাম।”

সেই ভদ্রলোক বলেন “তোমাকে তো আমরা অবিশ্বাস করছি না, বাবা। তুমি তো একটা যথাত্থ বামুনের ছেলের কাজ কল্লে নিজে চোখেই দেখলাম। কিন্তু তোমার দলের বিপ্লবীদের এট্টু সমঝে কথা বলতে বোলো রাস্তাঘাটে। নেতা হলে যখন যা মাথায় এল বলে দেয়া চলে না। আজকে সামলাতে পেরেছ, বারবার না-ও পারতে পারো। হাজিপাড়ার কেউ এই কম্ম করেছে এ আমরাও মনে করি না। এত বচ্ছর কল্ল না, হঠাৎ আজ কত্তে যাবে কোন দুঃখে? কিন্তু পাবলিক ক্ষেপলে তো আর কারো কথা শোনে না। আর আমাদের কথা শুনবেই বা কেন? এখন তোমাদের দিন।”

রবীন আর কথা বাড়ায় না, মাথা নেড়ে সাইকেলে উঠে পড়ে। ততক্ষণে পরিষ্কার মনে পড়েছে আগের দিন সন্ধ্যের কথা। শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছিল, যতক্ষণে রমেশবাবুর বাড়ি থেকে বেরনো হয়েছিল, ততক্ষণে সন্ধে উতরে গিয়ে রাস্তাঘাট শুনশান। ওরা কজন ছাড়া আর জনমনিষ্যি ছিল না এই মোড়ে।

এগুলো মনে পড়তেই রবীন বুঝতে পেরেছিল এই ভয়ঙ্কর দুর্বুদ্ধি কার। বুঝে গিয়েছিল ব্যাপারটা অত সহজে মিটবে না। মেটেওনি।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078