মেঘে মেঘে

কয়েক বছর হল বর্ষাকাল এসে পড়লেই আতঙ্কে ভুগি — যদি এই বর্ষাই শেষ হয়! যদি আগামী বছর থেকে আমাদের জনপদে আর বৃষ্টি না হয়! যদি দেখতে দেখতে আমাদের সুজলাং সুফলাং জায়গাটা মরুভূমি হয়ে যায়!
ছোটবেলায় কত পাখির বাসা দেখেছি বাড়ির আশপাশের নানারকম গাছে। চড়াইয়ের বাসা, শালিকের বাসা, কোকিলের বাসা, কাকের বাসা। আর সবচেয়ে সুন্দর বাবুইয়ের বাসা। আজকাল তো আর দেখি না, আমার মেয়ের সাত বছর বয়স হয়ে গেল। ছবির বাইরে বাবুই পাখির বাসা তো সে দেখে উঠল না! কেমন দেখতে হাঁড়িচাচাকে? মেয়ে জানে কি? যখন আতঙ্ক মাথায় ওঠে, তখন ইতিউতি তাকিয়ে তত পাখি তো দেখি না যত আমার সাত বছর বয়সে দেখেছি! এভাবে পাখিরা যদি হারিয়ে যেতে পারে, বৃষ্টিও তো হারিয়ে যেতেই পারে! পারে না?
আমার আশঙ্কা এত তাড়াতাড়ি এত ভয়ানক সত্যি হয়ে উঠবে আমিও ভাবিনি। বৃষ্টিতে ভেজা আমার বড় প্রিয়। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেক সময় এমন মুহূর্তে বৃষ্টি নামে যখন কিছুতেই ভেজার উপায় নেই। তবু, প্রতি বর্ষায় অন্তত একবার ভিজে চুপচুপে না হয়ে আমি ছাড়ি না। গত কয়েক বছর প্রথম সুযোগেই ভেজার চেষ্টা করি। কেবলই আতঙ্ক — এই যদি আমার জীবনের শেষ বৃষ্টি হয়!
এবার বর্ষায়, কি সৌভাগ্য, সেদিন আমাদের নবগ্রামে ঠিক সন্ধ্যের মুখে আকাশ অন্ধ করে বৃষ্টি এল। ঠিক আমার ছুটির দিনটায়। ঐ দিন আমি বিকেল, সন্ধ্যের বিনিময়ে ভাত-কাপড়ের সংস্থান কিনতে নদীপারের শহরে যাই না। উল্লসিত হয়ে নেমে পড়লাম বাড়ির উল্টোদিকের মাঠে। কড়কড়ে বাজের ধমক অগ্রাহ্য করে বৃষ্টির সাথে আমার নির্লজ্জ অভিসার। আশ মিটিয়ে ভিজে ঘরে ফিরেছি যখন তখনো ঝমঝমিয়ে রমরমিয়ে বৃষ্টি চলছে। ইউটিউবে চালিয়ে দিলাম “আজি ঝরঝর মুখর বাদর দিনে।” আমার মতই একা একা উত্তমকুমার ভিজছেন আর লাজুক মাধবী গাছের তলায় বসে গাইছেন। সেদিন মাথা মুছতে মুছতে হৃষ্ট চিত্তে ভেবেছিলাম, যাক, আমরা এবারও বেঁচে গেলাম। আষাঢ়ের গোড়াতেই যখন এমন বৃষ্টি, তখন এ মরসুমে আর মরুভূমি দেখতে হচ্ছে না।
কিন্তু সেই শেষ। তারপর হপ্তাদুয়েক হয়ে গেল, বৃষ্টির আর দেখা নেই। অথচ আকাশে মেঘ আছে, মাঝে মাঝে সূর্যকে ম্লান করে দিয়ে আশা জাগিয়েও ব্যালে নাচের সুন্দরীদের মত হালকা সেসব মেঘ মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে একদিন সকালের দিকে জানলার দিকে চোখ পড়তেই দেখি আকাশের বেশ মাজা রঙ হয়েছে আর ছিটেফোঁটা ঝরছেও বটে। ভাবলাম এই বুঝি প্রতীক্ষার অবসান হল। সবে গুনগুন শুরু করেছি, মেয়ে আমার ফিসফিসিয়ে বলল “বাবা, এখনই গেয়ো না। ভাল করে শুরু হোক আগে।” আমল দিচ্ছিলাম না, কিন্তু মিনিট খানেকের মধ্যেই দেখলাম সাঁইত্রিশ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে সাত বছরের আশঙ্কাই বেশি সত্যি। বৃষ্টি থেমে গেল।
সেই থেকে আকাশে মেঘ দেখে অদ্ভুত পীড়া হচ্ছে। কখনো ভাবিনি ঘন নীল আকাশ আর কাশফুলের মত মেঘ দেখে একদিন বিরক্তি আসবে, কান্না পাবে, চেপে রাখা আশঙ্কা চাগাড় দিয়ে উঠবে।
মধ্যরাত পেরিয়ে যখন নির্জনে বাড়ি ফিরি সেই সময় বালি ব্রিজের উপর ভেসে চলা কিছু কৃশকায় মেঘের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানালাম। বললাম “কেরালায় এত বৃষ্টি, হিমাচলে, অরুণাচলে, আসামে, বিহারে, এমনকি উত্তরবঙ্গের কিছু জেলা বানভাসি আর তোমরা কিনা উড়ে বেড়াচ্ছ, একফোঁটা বৃষ্টি নেই ভাগীরথীর এপারে ওপারে? কিসের অভাব তোমাদের? কী পেলে মোটাসোটা হয়ে ঝরে পড়ে একটু শান্তি দেবে?
কি বেইজ্জত যে হতে হল কী বলব। তারা বলল “যা চাই তা পারবে দিতে? তোমাদের তো আদ্ধেক পুকুর চুরি হয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোতে সক্কলে মিলে আবর্জনা ছুঁড়ে ফেলে মজিয়ে ফেলেছ। গাছ যা ছিল সেসবও সাফ করে কংক্রিট দিয়ে সৌন্দর্যায়ন করেছ। বলি জলীয় বাষ্প কই যে খেয়ে দেয়ে মোটা হব? আমরা কি তোমার বাথরুমের শাওয়ার নাকি, যে ইচ্ছে মত খুললেই জল পড়বে?”
মাথা নীচু করে শোনা ছাড়া উপায় ছিল না। অপমান হজম করে নিয়ে বললাম “তাহলে কি কোনদিন আর আমাদের ছোটবেলার বর্ষা ফেরত পাব না?” তারা হাত উল্টে বলল “সে কথা কি বলা যায়? মৌসুমীর কখন কী মর্জি হবে সে তো আর আমরা বলতে পারি না। সে আমাদের মালকিন বলে কথা। তবে বাপু যা চাইবে ভেবে চেয়ো। কোন বছর আমরা প্রাণ ভরে ঢাললে তো আবার তোমরা এক গলা জলে হাবুডুবু খাবে। জল উপচে পড়ার জায়গাগুলো তো আর কিছু রাখোনি।”
কোন মতে বললাম “তাহলে উপায়? হয় অনাবৃষ্টি নয় অতিবৃষ্টি — এই কি আমাদের ভবিষ্যৎ? আমার মেয়ের তবে রাস্তার জলে কাগজের নৌকো ভাসানো হবে না? বড় হয়ে মাধবী হওয়া হবে না?”
“কালবেলা তো নিজেরাই ডেকে এনেছ। এখন শঙ্খবেলা চাইলে হবে বাছা?” বলতে বলতে তারা কোন দিকে যে উড়ে গেল রাতের অন্ধকারে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।

একজন সাব এডিটর

রোজ সকালে যে কাগজটা পড়েন সেটার মধ্যে ছাপাখানার শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের পাশাপাশি অনেক মানুষের মানসিক শ্রম মিশে থাকে। তার মধ্যে যারা নিজেদের ভাল কাজের জন্যে প্রায় কখনোই পুরস্কৃত হয় না, কিন্তু ভুল হলে প্রচণ্ড তিরস্কৃত হয়, তাদের নাম সাব এডিটর। ভাল খবর বেরোলে সম্পাদকের পিঠ চাপড়ানি এবং পাঠকের কাছে নাম — দুইই হয় রিপোর্টারের। বস্তুত পাঠকের কাছে সাব এডিটর বলে কোনকিছুর অস্তিত্বই নেই প্রায়। সাব এডিটর যখনই কোথাও সাংবাদিক হিসাবে নিজের পরিচয় দেন তখনই শুনতে হয় “ও, আপনি রিপোর্টার?” সাংবাদিকতার ইতিহাস, সব দেশে সব যুগেই, রিপোর্ট তথা রিপোর্টারদের ইতিহাস। কাগজের চমকে দেওয়া হেডিং, ছবির স্মরণীয় ক্যাপশন পাঠক ভোলেন না। কিন্তু যিনি ওগুলো দিয়েছেন তাঁর নাম কাগজে ছাপা হয় না বলে পাঠক জানতেও পারেন না। প্রতিভাবান সাংবাদিকরা যখন আত্মজীবনী বা কাল্পনিক কাহিনী লেখেন তখনো সাব এডিটরদের কথা বড় একটা আসে না। বিখ্যাত রিপোর্টার বা কাগজের সম্পাদক মারা গেলে তাঁর কাগজে (তেমন বিখ্যাত হলে অন্য কাগজেও) খবরটা ছাপা হয়। সাব এডিটর, সে তিনি যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, মারা গেলে সাধারণত তা হয় না। অন্য চাকরিতে কর্মরত কেউ মারা গেলে অফিসে একটা স্মরণসভা হয়, খবরের কাগজের অফিসে দৈনন্দিন কাজের এমন চাপ যে সে ফুরসতও নেই।
অতএব যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না। বিশেষ করে যখন মৃত্যুর বেশ আগে থেকেই ভাস্করদার সাব এডিটরবৃত্তি ঘুচে গিয়েছিল।
এক অর্থে খবরের কাগজে সাব এডিটরদের জীবন মৃত্যুর এই যে অকিঞ্চিৎকর অবস্থান, এটাই সবচেয়ে বাস্তবানুগ। যে কোন পেশার মানুষের জীবন মৃত্যুই তো, খুব বড় কিছু না করে থাকলে, এই বিরাট পৃথিবীতে এরকমই অকিঞ্চিৎকর। তবু, সবচেয়ে নগণ্য লোকটা যখন মারা যায় তখনো তার চেনা জানা মানুষরা, কাছের মানুষরা, অন্তত কয়েকটা দিন শোক পালন করে। কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। একবিংশ শতাব্দীতে নিশ্চয়ই আরো কম। তাই ভাবলাম এই বেলা স্মৃতিচারণটা সেরে ফেলা যাক। কদিন পরে আমারই লোকটাকে মনে থাকবে কিনা সে কি হলফ করে বলা যায়?
ভাস্করদার সাথে আমার শেষ দেখা ২০০৭ এ, যেদিন স্টেটসম্যান থেকে তার পাওনা টাকা পয়সার তাগাদা দিতে সে অফিসে এসেছিল। তারপর বার দুয়েক ফোনে কথা হয়েছে। শেষ কথা হয় ২০০৯ এ। আমার বিয়ের নেমন্তন্ন করবার জন্যে ফোন করেছিলাম। ভাস্করদা আসবে বলে কথা দিয়েও আসতে পারেনি। সাব এডিটরদের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। ভাস্করদা তদ্দিনে হিন্দুস্তান টাইমসের অধুনালুপ্ত সংস্করণের উচ্চপদস্থ সাব এডিটর। উচ্চপদস্থ, কিন্তু সাব এডিটর তো। তারপর থেকে ভাস্করদার সাথে যোগাযোগ আছে যে বন্ধুদের, তাদের কাছ থেকে তার খোঁজখবর নিয়েছি। কারণ ভাস্করদার জীবনে শোনার মত কিছুই ঘটছে না এরকম প্রায় হত না। এক আধবার ইচ্ছে হয়েছে দেখা করার উদযোগ আয়োজন করি, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ আলস্যে সে আর করা হয়ে ওঠেনি। তাহলে এখন লোকটার স্মৃতিচারণ করতে বসলাম কেন? এ কি আদিখ্যেতা নয়? নয়। তার কারণ আমি লিখছি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যে। কিসের কৃতজ্ঞতা? সেই কথাই বলি।
আমি যখন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসাবে ২০০৫ এর জুন মাসে দ্য স্টেটসম্যান কাগজে যোগ দিই তখন বহিরঙ্গ আর অন্তরঙ্গ — দুদিক থেকেই কাগজটার অবস্থা জলসাঘর ছবির জমিদারবাড়িটার মত। কাজ শেখার পক্ষে অবশ্য জায়গাটা তখনো চমৎকার ছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে তো সময় লাগে। কী শিখতে হবে, কোনটা আগে শিখতে হবে কোনটা পরে — সেসব বুঝতেও সময় লাগে। আর সেসব বুঝে ওঠার জন্যে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরকার হয়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য যুগিয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আমার তৎকালীন বস, ক্রীড়া সম্পাদিকা ইলোরা সেনের। ব্যাপারটা আরো একটু সহজ হয়েছিল ক্রীড়া বিভাগে আমার সহকর্মীদের মধ্যে আমার দুই সহপাঠী সুদীপ্ত আর অরিজিৎ থাকায়। কিন্তু সাংবাদিক মাত্রেই জানেন, আমাদের পেশায় এক কঠিন ঠাঁই আছে যেখানে নবীন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এবং যেখানে কেউ কোন সাহায্য করতে পারে না। সে ঠাঁইয়ের নাম নাইট ডিউটি। যখন সেই ডিউটিতে থাকতাম, তখন গোড়ার দিকে বাড়ি যাওয়ার সময় ইলোরাদি বলে দিয়ে যেতেন “ভাস্কর, মনো (মনোজিৎ দাশগুপ্ত), ও রইল। প্রথম প্রথম নাইট করছে তো। একটু দেখো।” ঐ দুজনের ব্যবহারে আমরা (শিক্ষানবিশরা) কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেলাম, ভুল হলেও ভয় নেই। শুধরে দেওয়ার জন্যে ভাস্করদা, মনোদা আছে। আমার কাছে সেদিনের ঐ ভরসাটুকুর দাম, যত বয়স হচ্ছে তত বেড়ে যাচ্ছে।
আমি মফঃস্বলের ছেলে, চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সাংবাদিক ছিল না। তার উপর স্টেটসম্যান এমন একটা কাগজ যা পড়ে বাবা ইংরিজি শিখতে বলত ছোটবেলায়। ফলে বেশি রাতে অফিস ফাঁকা হয়ে গেলে অন্য ডেস্কের কার সাথে কতটা কথা বলব, কার সাথে হাসিঠাট্টা করা চলে, কার ঠাট্টায় হাসা চলে আর কার ঠাট্টায় হাসলে তিনি রেগে যাবেন — এসব নিয়ে প্রাথমিক দ্বিধা ছিলই। সেই দ্বিধা কাটাতে যে লোকটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল, সেও ভাস্করদাই। ফলে কিছুদিন পরেই দেখা গেল তার ভাষায় আমি হয়ে গেছি “কোন্নগরের সিপিএম।” ভাস্করদার কিন্তু সিপিএমকে ঘোর অপছন্দ। অথচ আমার বাবা সিপিএম করে বলে ঐ নামকরণটা করলেও আমাকে বেশ পছন্দ বলেই মনে হয়।
সেইসময় নাইট ডিউটি শেষ হওয়ামাত্রই বাড়ি আসার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে অফিসেই অপেক্ষা করতে হত ভোর চারটে অব্দি। তারপর অফিসের গাড়ি আমায় নামিয়ে দিত শেষ রাতের হাওড়া স্টেশনে। দিনের প্রথম ট্রেন ধরে আমি বাড়ি ফিরতাম। রাত দেড়টা দুটো নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার পর ঐ যে দুটো ঘন্টা, তা আমার দেখতে দেখতে কেটে যেত ভাস্করদার জন্যেই। হুল্লোড়ে লোকের নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ জীবনে আর হয়নি। সেই মধ্যরাতের আড্ডাগুলোতেই ভাস্করদাকে ভাল করে দেখার আমার সুযোগ হল। এবং যত দেখলাম, তত অবাক হলাম।
দেখলাম লোকটা যেমন ঝড়ের বেগে টাইপ করে সন্ধ্যেবেলা, তেমনি দুপুর রাতে গড়গড়িয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা বলে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাঞ্জাবী বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে খালিস্তানপন্থী আন্দোলন কী এবং কেন, ভিন্দ্রানওয়ালে ইন্দিরা গান্ধীর ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন কিনা সেই আলোচনায় ঢুকে পড়ে অনায়াসে। আদবানির প্রশংসা করতে করতে দুম করে ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্প’ শট ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে আরম্ভ করে।
বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে, অফিস থেকে বেরনোর সময়ে দেখা গেছে ভাস্করদা, মনোদাকে পৌঁছতে যাবে আবার আমাকেও হাওড়ায় ছাড়তে যাবে, অত গাড়ি মজুত নেই। ওরা তখন আমায় নামিয়ে দিয়ে বাড়ি গেছে।
স্বভাবতই আমার মত নবীনদের অনেকেরই ভাস্করদাকে তখন দারুণ পছন্দ। দেখা গেল অফিসের সমস্যা নিয়ে ভাস্করদার পরামর্শ তো চাইছিই, উপরন্তু কোন সুন্দরীকে মনে ধরেছে কিন্তু বলে উঠতে পারছি না — সে সমস্যার সমাধানও ভাস্করদার কাছেই দাবী করছি। ভাস্করদা হয়ত বলছে “ওরে ****, এর চেয়ে আমিই বলে আসি নাহয়।”
ভাস্করদার সাথে আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত এক নবমীর রাত। জীবনে প্রথম নবমীর দিন নাইট ডিউটি করছি। ব্যাজার মুখে। কাজ শেষ হওয়ার পর ভাস্করদা টানতে টানতে নিয়ে গেল প্রতিদিন অফিসের সামনে। নিজেরা চা খাচ্ছে, আমাকেও খেতেই হবে। যতই বলি আমি চা খাই না, ভাস্করদা বলে “আমি বলছি, তোকে খেতে হবে **।” খাওয়া হল, তারপর বলল “আচ্ছা, এটা আমার ইচ্ছায় খেলি, এবার তোর কী খাওয়ার ইচ্ছে বল। যা বলবি তাই খাওয়াব।” সেটা সুইগি, জোম্যাটোর যুগ নয়। ক্ষিদেও পেয়েছে তেড়ে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না সঙ্কোচে। শেষ অব্দি ভাস্করদাই “আচ্ছা, তুই ডিম ভালবাসিস তো?” বলে রাস্তার ধারের দোকান থেকে ডবল ডিমের ভুর্জি কিনে দিল। নিউজরুমে ফিরে সামনে বসিয়ে সমস্তটা খাওয়াল। রাত আড়াইটেয় খাওয়া সেই ডিমের ভুর্জির স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
ওরকম একজন সাব এডিটর হয়ে উঠতে আমরা কেউ পারলাম না। সব বিষয়ে অত আগ্রহ, অত পড়ার শক্তি আমাদের নেই। ওরকম একজন সিনিয়র হয়ে উঠতেও পারিনি। অত মমতাও আমাদের নেই।

ছবি: ভাস্করদার ফেসবুক পেজ থেকে

অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

মৃণাল সেন প্রতিভাবান, মৃণাল সেন এ দেশে নতুন ধারার চলচ্চিত্রের দিকপালদের একজন, মৃণাল সেনের লেখার হাত চমৎকার — এসব গুণ সত্ত্বেও তাঁর একটা বড় দোষ তিনি রাজনৈতিক। ছবিতে বা ছবির বাইরে তিনি কখনো পাঁচিলের উপর বসে সিগারেট হাতে পা দোলাননি। নিরপেক্ষ হতে তাঁর বয়ে গেছে।
শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি প্রায়শই পার্টিজান। তাঁর ছবির রঞ্জিত মল্লিক যে চাকরি স্যুটেড বুটেড হওয়াটাকেই যোগ্য হওয়ার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে সেই চাকরি না পেয়ে স্যুট বুটের দোকানে আধলা ইঁট ছুঁড়ে মারে। তাঁর ছবিতে ফিল্ম ইউনিট নিজেদের শৌখিন মানবপ্রেমের অসারতা উপলব্ধি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে যায়। অতএব গত পরশু অব্দিও মৃণাল সেন আজকের ভদ্রলোকদের পাঞ্চিং ব্যাগও ছিলেন। প্রমাণ চাই? দিচ্ছি।
হয়ত আমার নিজের মুদ্রাদোষেই অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবিবাসরীয় কাগজে দেখলাম এক স্বনামধন্য প্রাক্তন আমলা নতুন বাঙালিদের নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন আজকের বাঙালি যে বাংলার সংস্কৃতি ভুলে গেছে, হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা মিশিয়ে আজব ভাষায় কথা বলছে তার দায় যে নির্দিষ্ট কোন সরকারের ঘাড়ে চাপানো উচিৎ তা নয় তবে এর জন্যে আসলে দায়ী ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির পলায়ন, আর তারই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নাকি বাঙালির ক্রমশ অবাঙালি হয়ে ওঠা। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিযোগ ইনিই প্রথম করলেন। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আউটলুক পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যে কারণে সেই আমলার লেখাটার কথা এখানে উল্লেখ করছি সেটা হল তিনি এক জায়গায় লিখেছেন
“এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না — এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।
এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়।”
লেখাটা পড়া শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখেছি সবে, এমন সময় হোয়াটস্যাপে এক সিনেমা অন্তপ্রাণ বন্ধু জানাল মৃণাল সেন প্রয়াত। লেখকের বক্তব্য সঙ্গত না অসঙ্গত তা বিচার করতে বসছি না এখন। শুধু বক্তব্য এই যে লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না, সম্ভবত আরেক ঘোষিত মার্কসবাদী ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রেও নয়।
মৃণাল সেনের একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন এক অভিনেতা। প্রায় প্রতি সাক্ষাৎকারেই বলেন “মৃণালদার থেকে কত যে শিখেছি” ইত্যাদি। অধুনা নিজে ফিল্ম বানান। আমার মত অবসর যাপনের জন্যে ফিল্ম দেখা অশিক্ষিত লোকের সেসব ফিল্ম মুখে না রুচলেও ভদ্রসমাজে তাঁর ছবি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনিও কয়েকবছর আগে নবীন পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের ছবির সমালোচনায় এক জায়গায় লিখেছিলেন “আশির দশকের মৃণাল সেনের ছবির মত।“ কেন? না ছবিতে টানাটানির সংসার চালানো এক শ্রমিক দম্পতিকে দেখানো হয়েছিল যাদের জীবিকা অর্জনের লড়াই এত কঠোর যে ঠিক করে কথাও হয় না সারাদিন, দেখা হয় পলক পড়ার মত। আর ক্ষণিকের জন্যে ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল একটি লাউডস্পিকারকে, যা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলনের সংবাদ বিসংবাদ। বারবার এসে পড়ছিল অর্থনৈতিক মন্দার নানা লক্ষণও।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে লোকের নিন্দা করতে নেই — এই সূত্র মেনে যত বিখ্যাত, অবিখ্যাত লোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা এখন দেখছি, পড়ছি তার অনেকগুলোর আড়ালেই আছে এই অনুভব, এই মতামত যে মৃণাল সেনের ছবি আসলে বাতিল সময়ের বাতিল দলিল। বাতিল মতাদর্শের বাতিল বুলি ছাড়া ও থেকে আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই। কিছু কিছু লোকের কাজ নিজ গুণে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায় যে সে কাজকে ভাল না বললে আবার রুচিশীল তকমা পাওয়া যায় না, উচ্চকোটির সদস্য হিসাবে পরিচয়টা নড়বড়ে হয়ে যায়। অগত্যা মৃণাল সেন সম্পর্কে গদগদ না হয়ে আজ অনেকেরই উপায় নেই। কিন্তু বাংলার ফিল্ম জগতের একজনেরও কাজ দেখলে কি মনে হয় যে কেউ “মৃণালদার” থেকে কিছু শিখেছেন?
সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলা যাক। যাঁরা ছবি বানান আর আমরা যারা দেখি, কেউই বিশ্বাস করি না যে মৃণাল সেনের ছবিতে আর দেখার কিছু আছে। কেন করি না? কারণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা — এসবের অভ্যেস আমরা ‘মহাপৃথিবী’ ছবির ভিক্টর ব্যানার্জির মায়ের ডায়রির পাতার মতই পুড়িয়ে দিয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা বাধ্য হতে শিখেছি। বাধ্য হলেই যাবতীয় আরাম, যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, যাবতীয় ভোগ্যপণ্য আমাদের হাতের মুঠোয় তা আমরা বুঝে গেছি। পোষ্যকে দুভাবে বাধ্য করা যায়। এক, কলার পরিয়ে। দুই, লোভ দেখিয়ে। বস্তুত লোভ দেখিয়ে বাধ্য করে নিয়ে কলার পরানোই সবচেয়ে উত্তম উপায়। আমরা বাঙালি ভদ্দরলোকেরা সেভাবেই বাধ্য হয়েছি। আমরাই তো বাংলা ছবির দর্শক, আমাদেরই কেউ কেউ বাংলা ছবির নির্মাতা।
আমরা এতটাই বাধ্য যে শুধু যে নিজেরা প্রতিবাদ করি না তা নয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে দেখলেও যারপরনাই রুষ্ট হই। তাই কলকাতায় মিটিং, মিছিল হলে বাসে আলোচনা করি গাঁয়ের লোকেদের কাজকম্ম নেই তাই এই সুযোগে কলকাতায় বেড়াতে চলে আসে, ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়। মাননীয় আমলা যাদের কথা লিখেছেন আর কি। “মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারা।”
এই যে সাদা কলারের আমরা, আমাদের কী করেই বা মৃণাল সেনের ছবি ভাল লাগবে? কলকাতায় মিছিল বেরোয়, ট্যাক্সিচালকরা ইউনিয়ন করে তা নিয়ে বাংলার বাইরের লোকেদের কাছে আমাদের যে লজ্জার শেষ নেই। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন। বছরখানেক আগে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে কৃষকদের বিশাল মিছিল হল। সেখানকার ভদ্রলোকেরা অনেকেই সেই মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কদিন আগে সারা দেশের কৃষকরা দিল্লীতে মিছিল করলেন। সেখানেও আমাদের মত ভদ্রলোকেরা খাবার নিয়ে, জল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানকার মত খবরও হল না কোন রাস্তায় কার গাড়ি আটকে পড়ে কার ফ্লাইট মিস হয়েছে। বাংলায় যখন কোন মিছিল, মিটিং হয় তখন আপনি তন্নতন্ন করে সংবাদের হাজারটা উৎস খুঁজেও একটা প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাবেন না। সেটা হল “কেন?” মানে মিছিলটা হল কেন? কোন দাবীতে? খবরটা আমাদের কেউ দেয় না কারণ আমরা জানতে চাই না। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে মিছিলটা এড়াতে পারব সেটুকু জানতে পারলেই আমরা খুশি। অতএব কী দরকার বাপু সিনেমার মধ্যে ওসব জিনিসের? রাজ্যটা অনেক দেরীতে উন্নয়নের রাস্তা ধরেছে, ওসব দেখলে বা দেখালে লোকে আবার যদি বিগড়ে যায়?
এভাবেই সত্যি সত্যি ভাল থাকা গেলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাদা কলারের লোকেরা লক্ষ্মী হয়ে থেকেও মৃণাল সেনের সর্বহারাদের মত দুর্গতিগুলো এড়াতে পারছে না। কারখানার অস্থায়ী কর্মীদের মতই বহুজাতিকের এক্সিকিউটিভের হুটপাট চাকরি চলে যাচ্ছে, কর্মী হিসাবে যেসব অধিকার জন্মগত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সে অধিকারগুলো কোম্পানি বলে কয়েই কেড়ে নিচ্ছে অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলা যাচ্ছে না। ছ ঘন্টার বদলে আট ঘন্টা, আট ঘন্টার বদলে দশ ঘন্টা কাজ করেই চলেছেন। বাড়িতে এসেও ল্যাপটপ খুলে মালিকের লাভের কড়ি বাড়িয়েই চলেছেন। বেসরকারী ক্ষেত্রের বসেদের কথা বাদ দিন, সরকারপোষিত স্কুল কলেজের সামান্য টিচার ইন চার্জরাও সাক্ষাৎ হিটলার হয়ে উঠেছেন। সেই যে সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা, যারা ১২ই জুলাই কমিটির নাম শোনেনি, আন্দোলনের নাম না করেই সোনা মুখ করে কাজ করে, তারা এত ভাল আছে যে বারো-পনেরো হাজার টাকার জন্যে বাইক নিয়ে দিন নেই রাত নেই ঝড় নেই জল নেই সুইগি, জোমাটোর হয়ে ডেলিভারি করছে। পিঠে খাবারের বোঝা তবু এ খাবার যাবে না ছোঁয়া। ছুঁয়ে ফেললেই ভিডিও ভাইরাল হবে, সামান্য মাইনের, বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ও অধিকারবিহীন চাকরিটিও যাবে।
একজন লিখেছিলেন “খাওয়া না খাওয়ার খেলা যদি চলে সারা বেলা হঠাৎ কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।” একেবারে যে কিছু ঘটছে না তাও নয়। কয়েক বছর আগেই উবের, ওলার আগমনে যারা সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল ঐ দালালদ্বয় এখন তাদের টাকা পয়সা কমিয়ে শুধু নিজেদের পকেট ভর্তি করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বাইপাসের উপর গাড়ি পেটাচ্ছে। আমি, আপনি তখনো জানতে চাইছি না দাবীগুলো কী কী?
আর কটা দিন সবুর করুন। এ আই আসিছে চড়ে জুড়ি গাড়ি। তখন আমার আপনার অবস্থাও অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় বা উবেরের ড্রাইভারের মত হতে পারে। সেদিন মৃণাল সেনের কোরাস হয়ত খুব অলীক মনে হবে না। যে নায়ক আধলা ইঁট ছোঁড়ে তাকে যে স্রেফ নকশালই মনে হবে তাও ঠিক করে বলা যায় না। আজকের অর্থহীন তর্পণ বাদ দিন। মৃণাল সেনকে আসলে সেদিন আপনার দরকার হবে।
আজ যতই ফেসবুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বান ডাকুক না কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে না দেখেই মৃণাল সেনের ছবিকে আঁতেল আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল এবং আছে। কারণ ছবিগুলো পপকর্ন খেতে খেতে দেখা যায় না। অপমানে যেদিন সবার সমান হতে হবে, সেদিন বোঝা যাবে আসলে কোন ছবিগুলো আঁতেল, অর্থাৎ আমার আপনার কথা কোনদিন বলেনি, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা, আমাদের টেনে নিয়ে চলা জীবনের কথা বলেনি, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর গোয়েন্দা গল্পের গাড্ডায় ফেলে রেখেছিল।
মৃণাল সেন মার্কসবাদী ছিলেন আমৃত্যু। পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লেগে যখন এই বাংলায় অনেক আগমার্কা বামপন্থী কবি, অভিনেতা, গাইয়ে রাতারাতি আবিষ্কার করলেন তাঁরা এত বছর ভুল পথে ছিলেন, তখনো মৃণাল সেন অবস্থান বদলাননি। তা মার্কসবাদ ব্যাপারটাকেই যখন বাতিল করে দিয়েছিল সকলে তখন একজন মার্কসবাদীর চলচ্চিত্র ভাবনাকে বাতিল করে দেওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন হাওয়া বদলাচ্ছে। এতটাই বদলেছে যে ‘দি ইকনমিস্ট’ এর মত চরম দক্ষিণপন্থী পত্রিকা মার্কসের দ্বিশতবার্ষিকীতে লিখেছে পুঁজিবাদকে বর্তমান সঙ্কট থেকে বাঁচাতে হলেও মার্কস পড়তে হবে। অতএব কেউ যদি সচেতন হন, তাহলে এই নাম কা ওয়াস্তে তর্পণ শেষ হওয়ার পরেই মৃণাল সেনকে শিকেয় তুলে রাখার ভুল তিনি করবেন না। তবু এরকম বলার মানে হয় না যে বাংলা ছবির নির্মাতারা তাঁর মত সোচ্চার বামপন্থী ভাবধারার ছবি না বানালেই সেগুলো ফালতু। বলার কথাটা হল ছবিতে আটপৌরে জীবন, তার লড়াই, তার সঙ্কট না থাকাই ফাঁকিবাজি। সেই ফাঁকিবাজি করে, তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মৃণাল সেনের প্রয়াণে গদগদ হওয়ার মানে হয় না।
সেই ফাঁকিবাজি না করার জন্যে মার্কসবাদী বা বামপন্থী ছবি বানাতে হয় না। অনেকেই তো বলেন পশ্চিমবাংলায় বাম শাসন ছিল অপশাসন। সেই অপশাসনের স্বরূপ নিয়ে কটা বাংলা ছবি হয়েছে? অথচ সারা পৃথিবীতেই তো অপশাসনের মধ্যে থেকেই দারুণ দারুণ ছবি হয়। ইরানের পরিচালকরা যেমন করেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত, অস্থির সময়গুলো নিয়েই তো অসামান্য সব ছবি হয়। সেগুলো সবই যে বামপন্থী ছবি তা তো নয়। আবার একটা কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।
মৃণাল সেন মারা যাওয়ার আগের রাতে নেটফ্লিক্সে আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’ দেখছিলাম। মেক্সিকোর ছাত্র আন্দোলন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় বানানো সাদাকালো, আবহসঙ্গীতবিহীন ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মত ভেতো বাঙালি, ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে ক্ষীণ সম্পর্কযুক্ত দর্শকের বারবারই ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। এই ২০১৮তে তৈরি ছবিতে ১৯৭০-৭১ এর গল্প বলা হচ্ছে। এমনকি ১০ই জুন ১৯৭১ এ সংঘটিত কুখ্যাত কর্পাস ক্রিস্টি গণহত্যাও দেখানো হচ্ছে। মৃণাল সেন তো রাজনৈতিক হত্যাগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন কেবল কাগজের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। এই বাংলার কেউ ‘রোমা’ বানালে বোদ্ধারা নির্ঘাত বলতেন “এ ছবি দিয়ে কী হবে? এ তো মৃণাল সেনের মত।“
‘রোমা’ ছবির যে সময়কাল তা এই বাংলাতেও অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন, গণহত্যার সময়। ঠিক ১৯৭১ সালেই ঘটেছিল কাশীপুর গণহত্যা। এখন তো রাজ্যে কংগ্রেস সরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর মৃত, সেই কান্ডের খলনায়করা সকলেই প্রায় ক্ষমতাহীন, নির্বিষ। কই হোক তো দেখি একটা ভাল ছবি সেই নিয়ে। বামফ্রন্ট আমলেও তো দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসার অনেক ঘটনা। নাহয় তাই নিয়েই হোক। এ আমলে ওসব নিয়ে ছবি করলে তো পুলিশে ধরবে না, উলটে একটা ভূষণ টুষণ জুটে যেতে পারে।
হবে না। কারণ “মৃণালদার” থেকে যদি স্রেফ একটা জিনিস শেখার থাকে, সেটা হল বুকের পাটা। ওটা আবার কারো শেখা হয়নি। আর মেধা? থাক সে কথা। বরং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসা চলুক। পার্টিজানদের ব্যাপারে অস্বস্তি কাটানোর সেরা উপায় তাদের কাল্ট ফিগার বানিয়ে দেওয়া। চিরকালই।