সকল অহঙ্কার হে আমার

সেদিন যথাসময়ে অফিসে ঢুকে দেখি, অনেক দেরি করে ফেলেছি। নিউজরুম আলো করে বসে আছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।

তখন ‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ তে কাজ করি। কলকাতা সংস্করণের অধুনা প্রয়াত রেসিডেন্ট এডিটর সুমিত সেন সৌমিত্রবাবুর স্নেহভাজন ছিলেন বলে শুনেছি। সেই সুবাদেই টাইমসের অফিসে আসা। আসবেন জানতাম না। যখন পৌঁছেছি, তখন তাঁর প্রায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমার মত আরো অনেকেরই আশ মেটেনি সেদিন। তাই কিছুদিন পরেই আরেকবার তিনি আসবেন বলে কথা হল।

সে দিন আসতে আসতে আরো বছর খানেক কি দেড়েক। আগেরবার এসে শুনেছি গটগট করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিলেন। এবার একতলাতেই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঐ মানুষটিকে আগে কয়েকবার রবীন্দ্র সদন, বিমানবন্দর ইত্যাদি জায়গায় বহুদূর থেকে দেখেছি। দু হাত দূরত্ব থেকে সেদিন দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আড্ডার মেজাজে কথা হল, অনেকে অনেক প্রশ্ন করলেন, আমারও অনেক কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজই বেরোল না। বেরোবে কী করে? কেবল আমার কান তো তাঁর কথা শুনছিল না, আমার প্রতিটি রোমকূপ শুনছিল।

তিনি যা যা বললেন তার মধ্যে অনেক কথা বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন বা লিখেছেন। আজকের কাগজগুলোতেও সেসব বিলক্ষণ পাওয়া যাবে। যা আমাকে সবচেয়ে চমৎকৃত করেছিল, সেটা বলি। কারণ সেগুলো আর কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না।

বলছিলেন অগ্রজ শিল্পীদের কথা। শিশির ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী থেকে ছবি বিশ্বাসে এসে দীর্ঘক্ষণ বললেন। সত্যি কথা বলতে, নিজের অভিনয় নিয়ে যা বললেন সেগুলো সবই নানাজনের প্রশ্নের উত্তরে। তার চেয়ে অনেক বেশি কথা বললেন ছবি বিশ্বাসের সম্বন্ধে। কেবল ছবি বিশ্বাসের অভিনয় প্রতিভা নয়, বললেন তাঁর অসম্ভব পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়েও। ছবি বিশ্বাসের জীবনের শেষ দিকে কোন এক ছবিতে দুজনের একটা দীর্ঘ দৃশ্য ছিল।

“লম্বা সিন, আর সংলাপগুলোও খুব লম্বা লম্বা। আমি বারবার ভুল করছি আর শট এন জি হয়ে যাচ্ছে। ছবিদার তখন শরীরটা এমনিই বেশ খারাপ। ঐ সিনটাতে আবার সুট বুট পরা, অথচ তখন অসম্ভব গরম। শট ওকে হচ্ছে না বলে ফ্যান চালানোও যাচ্ছে না। ফলে ওঁর আরো শরীর খারাপ লাগছে, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন। শেষে পরিচালক বললেন ‘আমরা একটু ব্রেক নিই, আপনারা একটু রেস্ট নিয়ে নিন। তারপর আবার চেষ্টা করা যাবে।’ আমি ছবিদার সাথে বসে সারেন্ডার করলাম। বললাম ‘দেখছেন তো পারছি না। দিন না বাবা একটু দেখিয়ে?’ উনি সেই বিখ্যাত গম্ভীর গলায় বললেন ‘বুঝতে পেরেছ তাহলে’? তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ‘তুমি আমার ডায়লগ বলো, আমি তোমার ডায়লগ বলছি।’ তারপর অতবড় সিন গোটাটা রিহার্সাল করালেন, মুভমেন্টগুলোও শুধরে দিলেন। তারপর নিজের নিজের ডায়লগ বলিয়ে আবার করালেন। শেষে ডিরেক্টরকে ডেকে এনে শট নেওয়ালেন, শট ওকে হল।

আমি অবাক হয়ে গেলাম শরীরের ঐ অবস্থাতেও ওরকম উদ্যম দেখে। তাছাড়া আমার একটা অহঙ্কার ছিল, আমার সংলাপ সবসময় মুখস্থ থাকে। সেই অহঙ্কারটাও চুরমার হয়ে গেল। কারণ দেখলাম ছবিদার শুধু নিজের নয়, আমার ডায়লগও হুবহু মুখস্থ। বরং আমি দু এক জায়গায় ভুল করে ফেলেছিলাম, উনি ধমকালেন ‘কী যে করো তোমরা! ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারো না?”

প্রবাদপ্রতিম অভিনেতার মুখে এই গল্পটা শুনে আশ্চর্য লেগেছিল, কিভাবে আমাদের সামনে নিজের ত্রুটিগুলো অকপটে বললেন! অগ্রজ অভিনেতার কাছ থেকে কত শিখেছেন সেটাও কেমন সবিস্তারে বললেন! অথচ কত সহজ ছিল “আমি এই, আমি তাই, আমি সেই” বলা। সেরকম বলার মত যথেষ্ট কীর্তি তো তাঁর ছিলই। অবশ্য হয়ত আমরা এই প্রজন্মের লোক বলেই আমাদের এত অবাক লাগে। সৌমিত্রবাবু তো বললেনই “আমাদের সময়ে আমরা এইসব স্টলওয়ার্টদের পেয়েছি আর নিংড়ে নিয়েছি। যতটা পারা যায় শিখে নিতাম। ওঁরাও খুব ভালবেসে শেখাতেন, দরকারে বকাঝকাও করতেন। এখন আর আমি কাকে কী শেখাব? আজকাল তো সবাই সব জানে।”

“নিজেরে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলি করি অপমান” কথাটা আমরা ভুলে গেছি। তাই কলকাতার ফিল্মোৎসবে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কাট আউট ঝোলে না। ঝোলে আয়োজক প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর ছবি। মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা অবশ্য আকাশ থেকে পড়েন না, আমাদের মধ্যে থেকেই উঠে আসেন। আমরা সবাই তো এখন আত্মরতিপ্রবণ। নইলে কোন বিখ্যাত মানুষ মারা গেলে সাংবাদিকরা কেন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখবেন, “অমুক সালে যখন আমি তমুক এক্সক্লুসিভটা করে অমুক প্রোমোশনটা পেয়েছি…”? কেনই বা আসবে মৃত মানুষটি কবে কী কারণে লেখকের প্রশংসা করেছিলেন?

ভাগ করলে বাড়ে

“ও আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে / ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং কুড়াকুড় বাদ্যি বেজেছে…” গানটা বেশ জনপ্রিয়। পুজোর মরসুমে বিশেষত ছোটদের নাচ-গানের অনুষ্ঠানে প্রায় সর্বত্র শোনা যায়। ১৯৭৭ সালের পুজোয় সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি তাঁর কন্যা অন্তরার গলায় প্রথম শোনা গিয়েছিল। গানটার সঞ্চারী এরকম “কাঁদছ কেন আজ ময়নাপাড়ার মেয়ে? / নতুন জামা ফ্রক পাওনি বুঝি চেয়ে? / আমার কাছে যা আছে সব তোমায় দেব দিয়ে / আজ হাসিখুশি মিথ্যে হবে তোমাকে বাদ দিয়ে।”

আনন্দ যে ভাগ করলে বাড়ে, সে কথা আজকাল আর ছোটদের বোঝানোর সময় পাই না আমরা। সলিল চৌধুরীর প্রজন্মের মানুষ প্রাণপণে শেখাতেন। এই স্তবকটা সেদিক থেকে চমকপ্রদ কিছু নয়। কিন্তু বহুবার শোনা এই গানটা কদিন আগে নিজের মেয়ের গলায় শুনে যে কারণে কানটা বেশি খাড়া করতে হল, তা হল দুটো শব্দ — “ময়নাপাড়ার মেয়ে”।

ঐ দুটো শব্দে ঘুমন্ত স্মৃতি সজাগ হয়ে উঠল। আমাদের বাড়িতে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি প্রথম টেপ রেকর্ডার (বা ক্যাসেট প্লেয়ার) আসার পর গোড়ার দিকে কেনা ক্যাসেটগুলোর একটার নাম ছিল ‘হিটস অফ সলিল চৌধুরী’। সেই ক্যাসেটের অধিকাংশ গান সকলের চেনা, সেই বারো-তেরো বছর বয়সে আমারও চেনা। কিন্তু সেই প্রথম শুনেছিলাম এক আশ্চর্য গান — সুচিত্রা মিত্রের গলায় ‘সেই মেয়ে’।

১৯৫০ এ প্রকাশিত সেই গানের শরীরে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলার গ্রামের মানুষের দুর্দশা আর তেভাগা আন্দোলন। কলকাতায় এসে পড়া অগণিত অভুক্ত, অর্ধভুক্ত মানুষের মধ্যে একটি মেয়েকে দেখে গীতিকার লিখেছেন “হয়ত তাকে কৃষ্ণকলি বলে, কবিগুরু, তুমিই চিনেছিলে।” শীর্ণ বাহু তুলে ক্ষুধায় জ্বলতে দেখে শুরুতেই ভেবেছেন “কে জানে হায়, কোথায় বা ঘর কী নাম কালো মেয়ে?” তারপরই চিহ্নিত করেছেন “হয়ত বা সেই ময়নাপাড়ার মাঠের কালো মেয়ে।” একজন স্রষ্টা কিভাবে আরেক স্রষ্টার সৃষ্টি আত্তীকরণ করে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে যান, বোধহয় এই গান তার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

চৌঠা আষাঢ় ১৩০৭ এ রচিত রবীন্দ্রনাথের “কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি” সুচিত্রা মিত্র বা শান্তিদেব ঘোষের গলায় কে না শুনেছে? সেই উৎকৃষ্ট প্রেমের (যদিও ক্ষণিকা কাব্যগ্রন্থের এই কবিতা গীতবিতানের প্রেম পর্যায় নয়, বিচিত্র পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত) গানের নায়িকা সলিল চৌধুরীর কলমে ফিরে এল অভুক্ত পল্লীবালা হিসাবে। তেভাগা আন্দোলনে উদ্দীপ্ত গীতিকার নিজের গানের শেষে কবিগুরুকে বললেন “আবার কোনদিন যদি তারে দেখো পথে / বোলো তারে বোলো তারই তরে / ময়নাপাড়া থেকে খবর আসে তারি তরে রে / সে যেন ফিরে যায় রে।”

জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে দুই স্রষ্টার এই সংলাপ কৈশোর থেকেই জানা ছিল। মধ্যবয়সের মুখে এসে খেয়াল করে শিহরিত হলাম যে সেই ময়নাপাড়ার মেয়ে সলিল চৌধুরীকে ১৯৭৭ এও ছেড়ে যায়নি। ১৯৫০ এ তিনি বছর আঠাশের যুবক, সাতাশ বছর পরে প্রায় বৃদ্ধ। তাঁর কল্পনায় রবীন্দ্রনাথের গানের যুবতী ততদিনে ছোট্ট মেয়ে হয়ে গেছে। তেভাগার তাপ এ গানে নেই, সময় বদলেছে বলে, হয়ত শিশুদের জন্য গান বলেও। কিন্তু গানটা যে সচ্ছল পরিবারের শিশুর জবানিতে রচিত, সে নিজে যা উপহার পেয়েছে তার সবই ময়নাপাড়ার মেয়েকে দিয়ে দেবে বলছে, নইলে হাসিখুশি মিথ্যে হয়ে যাবে।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর সলিল চৌধুরীর সংলাপ বোধহয় এই গানে কেবল ময়নাপাড়ার মেয়েতে শেষ নয়, কারণ সচ্ছল মেয়ের প্রত্যয়ে প্রতিধ্বনি পাচ্ছি ‘শিশু’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূজার সাজ’ কবিতার। দরিদ্র কৃষক বাবার দুই ছেলে — বিধু আর মধু। বাবার কিনে আনা সামান্য ছিটের জামা বিধুর পছন্দ হয়েছে, মধু কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষী। সে ধনী রায়বাবুর কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে। রায়বাবু নিজের ছেলেকে ডেকে বলেন “ওরে গুপি, তোর জামা দে তুই মধুকে।” কবিতার মূল প্রতিপাদ্য অবশ্য আত্মসম্মান, তাই বিধু-মধুর মা মধুর ধার করা জামা দেখে দুঃখ পান, বিধুকে বলেন “দরিদ্র ছেলের দেহে দরিদ্র বাপের স্নেহে / ছিটের জামাটি করে আলো।” কিন্তু লক্ষণীয় যে, রায়বাবুও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পক্ষপাতী।

স্রষ্টারা ভাগ করে নিতে জানেন।

সব পথ এসে মিলে গেল শেষে

মেয়ো রোডের মাঝখানে পুব দিকে মুখ করে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। গতকাল বিকেলে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের ধর্ষণ ও নির্মম হত্যা, খোদ সরকারের দ্বারা প্রমাণ লোপাট এবং ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা কর্তৃক সত্যকে ধর্ষণ করার প্রতিবাদে একটা মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম। সেই মিছিল শেষ হল গান্ধীজির পাদদেশে। তারপর পথসভা। সেই সভায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, পিছন দিক থেকে আসা ডুবন্ত সূর্যের আলোয় গান্ধীজির মুখে যেন প্রসন্ন হাসি। কিসের প্রসন্নতা?

এই বাল্মিকী সম্প্রদায়ের মানুষ চলতি কথায় ভাঙ্গি। যুগ যুগ ধরে এঁদের পেশা মানুষের মল মূত্র পরিষ্কার করা। বাংলায় আমরা এই পেশার লোকেদের বলি মেথর। বলা বাহুল্য, ব্রাহ্মণ্যবাদ বা মনুবাদ অনুসারে এঁরা অস্পৃশ্য। দিল্লীতে এঁদের মহল্লায় গান্ধীজি দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন। শোনা যায় ঐ এলাকার (যার বর্তমান নাম বাল্মিকী কলোনি) লোকেরা আজও মনে করেন, তাঁদের কাছ থেকে গান্ধীজিকে বিড়লা হাউসে সরিয়ে না নিয়ে গেলে নাথুরাম গডসের ঊর্ধ্বতন চতুর্দশ পুরুষের সাধ্য ছিল না তাঁকে হত্যা করে। এ বিষয়ে বিবেক শুক্লার লেখা Gandhi in Delhi বই থেকে আরো বিস্তারিত জানা যেতে পারে। কিন্তু বর্ণবাদ নিয়ে গান্ধীজির সমালোচনা করার অনেক অবকাশ আছে। তিনি যে মনে করতেন নিম্নবর্ণের লোকেদের জোর করে মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করা অনুচিত, উচ্চবর্ণের লোকেদের প্রায়শ্চিত্ত করবার জন্য সেবা করতে দেওয়া উচিৎ — তা সমর্থনযোগ্য মনে হয় না অনেকেরই। বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর নেহাত ব্যক্তিগত আক্রোশে গান্ধীজির সমালোচনা করতেন না। এমনকি এই যে বাল্মিকী সম্প্রদায়ের লোকেদের সাথে থাকা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে।

অরুন্ধতী রায় তাঁর ‘The Doctor and the Saint’ নিবন্ধে লিখছেন “In his history of the Balmiki workers of Delhi, the scholar Vijay Prashad says when Gandhi staged his visits to the Balmiki Colony on Mandir Marg (formerly Reading Road) in 1946, he refused to eat with the community:

‘You can offer me goat’s milk,’ he said, ‘but I will pay for it. If you are keen that I should take food prepared by you, you can come here and cook my food for me’… Balmiki elders recount tales of Gandhi’s hypocrisy, but only with a sense of uneasiness. When a dalit gave Gandhi nuts, he fed them to his goat, saying that he would eat them later, in the goat’s milk. Most of Gandhi’s food, nuts and grains, came from Birla House; he did not take these from dalits. Radical Balmikis took refuge in Ambedkarism which openly confronted Gandhi on these issues.”

এতৎসত্ত্বেও নিম্নবর্ণের অনেক মানুষের মনেই গান্ধীজির জন্য জায়গা আছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ভারতের বর্তমান মনুবাদী, ফ্যাসিবাদী শাসকের গান্ধীজিকে আক্রমণ না করা। গান্ধীজির একনিষ্ঠ সহচর জওহরলাল নেহরুকে নোংরা ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে তারা ছাড়ে না। কিন্তু গান্ধীজিকে আক্রমণ করার বদলে বরং দেখানোর চেষ্টা করে যে তারা গান্ধীর পথেই চলেছে। তার কারণ “মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক” কে ঘৃণা করলেও “দলিত ভোটব্যাঙ্ক” তাদের বিশেষ প্রয়োজন। পাছে গান্ধীজিকে গালাগালি করলে সেই ভোটে ভাঙন ধরে! তাই গডসের মূর্তি আর গান্ধীর মূর্তি — দুয়েই মালা দেওয়া হয়।

গান্ধীর সমালোচনা করার আরো অনেক জায়গা আছে। তিনি নিজেই যখন বলেছেন “আমার জীবনই আমার বাণী”, তখন জীবন আর বাণী — দুটোতেই নানা অসঙ্গতি দেখানো সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকাকালীন তিনি যে গড়পড়তা ভারতীয়দের মতই আফ্রিকানদের ভারতীয়দের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে করতেন তার প্রমাণ তাঁর লেখাপত্র, বক্তৃতাতেই আছে।

রাজনীতিতে ধর্মের প্রবেশ কি বিষময় হতে পারে তা আমরা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছি। সে কাজটাও যে গান্ধীর হাত দিয়েই হয়েছে — এমন সমালোচনা বাম ও দক্ষিণ, উভয় দিক থেকেই হয়েছে। বক্তব্যগুলো উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। তাঁর হিন্দ স্বরাজ যে স্বপ্নের রাষ্ট্রের কথা বলে, তার সাথে ধর্মীয় ভাবনা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যদিও হিন্দুত্ববাদের গুরু বিনায়ক দামোদর সাভারকরের সেরকম রাষ্ট্র মোটেই পছন্দ হয়নি, ফলে এখনকার হিন্দুত্ববাদীদের গান্ধীজির পথেই চলার দাবী যে বিশুদ্ধ গঞ্জিকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গান্ধীজি যে অহিংসার কথা বলতেন, যাকে তিনি দর্শনে পরিণত করেছিলেন তার সাথেও পুরোপুরি একমত হওয়া শক্ত। পৃথিবীর সর্বত্র বাস্তবতা হল বলপ্রয়োগ না করলে কোন কোন কাজ একেবারেই করা সম্ভব হয় না, অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ না করলে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে প্রশ্রয়ই দেওয়া হয়। কিন্তু গতকাল বিকেলে গান্ধীজির পায়ের নীচে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে অহিংস আন্দোলন সম্ভবত তাঁর সময়ের চেয়ে আজ বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

আজকের দুনিয়ায় ভারতের মত সুবৃহৎ রাষ্ট্র, যার বিপুল পুলিশ বাহিনী এবং সুবিশাল সেনাবাহিনী আছে, তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালকের মিছিলের শ খানেক লোক আণুবীক্ষণিক তো বটেই, কয়েক লক্ষ লোকের মিছিলও তেমন বড় কিছু নয়। এত লোকের হাতে অস্ত্র থাকলেও তেমন কিছু এসে যায় না। যদি তা না হত, তাহলে বাইরে থেকে অস্ত্রের যোগান থাকা সত্ত্বেও এভাবে কাশ্মীরের জিভ কেটে নেওয়া সম্ভব হত না। আসলে প্রতিবাদীর হাতে অস্ত্র থাকলে তাদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে, নিজের পীড়নের সপক্ষে মত তৈরি করতে আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রের আরো সুবিধা হয়। সেই কারণেই প্রতিবাদীদের দলমত নির্বিশেষে জেহাদি বা আর্বান নকশাল বলে দেগে দেওয়া। অথচ কয়েক হাজার নিরস্ত্র প্রতিবাদীকে সন্ত্রাসবাদী বলে মিথ্যা অভিযোগে হাজতে পোরা গেলেও, লোকচক্ষে সন্ত্রাসবাদী বলে প্রমাণ করা বড় শক্ত। তার জন্য বশংবদ সংবাদমাধ্যম লাগে, মাইনে করা আই টি সেল লাগে। সে প্রোপাগান্ডাই বা কতদিন বিশ্বাসযোগ্য থাকে সেটা দেখার। এই দোনলা প্রোপাগান্ডার বয়স কিন্তু এখনো বছর দশেক হয়নি। একটা দেশের ইতিহাসে দশ বছর কতটুকুই বা সময়? তাই আজ বহু মানুষ কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ বা শার্জিল ইমামকে কতিপয় আত্মবিক্রীত নিউজ অ্যাঙ্করের কথায় টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং বলে বিশ্বাস করছেন বলেই যে চিরকাল করবেন — এমনটা নাও হতে পারে। প্রোপাগান্ডা সততই স্বল্পায়ু।

কিন্তু এসবের ফলে যা হয়েছে তা হল আদর্শের দিক থেকে গান্ধীজির শত যোজন দূরে থাকা উমর থেকে শুরু করে কংগ্রেসী রাহুল গান্ধী পর্যন্ত সকলেই তাঁদের বক্তৃতায় একই সুরে বলছেন, আমরা এই শাসককে জমি ছাড়ব না, আমরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করব। কিন্তু শান্তিপূর্ণভাবে, সংবিধান মেনে। অর্থাৎ সকলেই গান্ধীগিরি শিরোধার্য করেছেন। গান্ধীর প্রসন্নতা বোধহয় এই কারণে।

ভারতের সংবিধান হিন্দুত্ববাদের রমরমায় অধুনা অনেকের কাছেই একটি ঘৃণিত নথিপত্র। বিশেষত বর্ণহিন্দুরা, যাঁরা হাথরাসের ঘটনাকে স্রেফ ধর্ষণ হিসাবে দেখতে পছন্দ করেন, মেয়েটির দলিত হওয়ার কোন আলাদা গুরুত্ব নেই ভাবতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন, তাঁদের অনেকেরই সংবিধানটা অপছন্দ। কারণ “আম্বেদকর এস সি, এস টি র দিকে ঝোল টেনে দেশটার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।” গান্ধীজির হত্যাকারীরা যখন তেমন শক্তিশালী ছিল না, তখনই এঁরা শিখেছেন সংবিধানটা একা আম্বেদকরই লিখে ফেলেছিলেন এবং গায়ের জোরে বামুন, কায়েতদের বঞ্চিত করে গেছেন। সংবিধান সভা বলে কোন কিছুর সম্বন্ধে যে অধিকাংশ মানুষ জানেন না, সংবিধানের প্রত্যেকটি অনুচ্ছেদের দায়িত্ব যতটা আম্বেদকরের ততটাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির — এ কথা যে বেশিরভাগ নাগরিক বোঝেন না, তার জন্য মধ্যপন্থী বা বামপন্থীরা কম দায়ী নন। কিন্তু মজার কথা, ঘোর দক্ষিণপন্থার আক্রমণে যখন সংবিধান নিয়ে এই প্রথম সচেতন কাটা ছেঁড়া হচ্ছে, তখন গান্ধীর কৌশল সব বিরোধীরই কৌশল হয়ে উঠছে। আর যে নথিকে তাঁরা হাতিয়ার করছেন সেটা গান্ধীর সবচেয়ে বড় সমালোচক আম্বেদকরের সাথে সমার্থক। এ বছরের জানুয়ারি মাসে সি এ এ – এন আর সি – এন পি আর বিরোধী মিছিল মিটিঙেও তো আমরা দেখেছি সেই অভূতপূর্ব দৃশ্য — পাশাপাশি গান্ধী আর আম্বেদকরের ছবি। গান্ধী মূর্তির প্রসন্নতা হয়ত সে কারণেও।

ইতিহাস বোধহয় এভাবেই গড়ে পিটে নেয়। মেয়ো রোডের গান্ধী মূর্তির কাছে অনেকগুলো রাস্তা এসে মিশেছে। সংখ্যায় অল্প হলেও কাল সেখানে এসে মিশেছিলেন নানা পথের বামপন্থীরা — যোগেন্দ্র যাদবের মত ঘোষিত গান্ধীবাদী সমাজবাদের দল স্বরাজ ইন্ডিয়ার মানুষজন; সি পি আই (এম) থেকে নির্বাসিত প্রসেনজিৎ বসুর মত লোক; কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের টগবগে বামপন্থী ছেলেমেয়েরা, যারা নানা দলের বা হয়ত শুধুই ক্যাম্পাস লেফট; আমার মত রাজনীতি না করা বামপন্থীরা। আরো অনেকে আসেননি, কিন্তু আসতে বাধা নেই। সচেতনে বা অবচেতনে গান্ধীজির পথে এমন অনেকেই এসে পড়ছেন, যাঁদের সাথে তাঁর আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল। সকলে মিলিত হলে যদি দেশের ভাল হয় তাতে গান্ধী, আম্বেদকর, নেহরু, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে বা জ্যোতি বসু — কেউই আপত্তি করতেন বলে মনে হয় না। গান্ধীজিকে যিনি মহাত্মা বলেছিলেন, সেই রবীন্দ্রনাথ (অমিতাভ চৌধুরীর মতে উনিই প্রথম বলেননি) থাকলে আশা করতেন “ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজও / বন্ধ নাশিবে — তারাও আসিবে দাঁড়াবে ঘিরে।”