প্রতিবাদের অধিকার

JNUSU President Kanhaiya Kumar at JNU

হোক কলরব আন্দোলনের সময় দেখেছি, এখন আবার দেখছি যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একটা যুক্তি দেওয়া হয় — আয়করদাতাদের টাকায় যেহেতু তারা ভর্তুকিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে অতএব তাদের প্রতিবাদ-টতিবাদ করার অধিকার নেই। এগুলো করা মানে আয়করদাতার টাকা নষ্ট করা। এই যুক্তি যুগপৎ বোকার যুক্তি এবং গা-জোয়ারি যুক্তি।
কেন এটা বোকার যুক্তি সেটা আগে বলি।

ভারতবর্ষে কয়েক কোটি আয়করদাতা। তারা সকলে প্রায় কোন বিষয়েই একমত নয়। হওয়ার দরকারও নেই। তাহলে কি করে ধরে নেওয়া হয় যে সব আয়করদাতাই মনে করে ছাত্রছাত্রীদের কোন বিষয়ে প্রতিবাদ করা উচিৎ নয় বা আদৌ রাজনীতি করা উচিৎ নয়? যিনি এরকম ভাবেন তিনি ভাবুন কিন্তু আমার আয় বা ভাবনার মালিকানা আমি আপনাকে দিইনি। উপরন্তু যারা আন্দোলন করছে তাদের বাবা-মায়েরাও অনেকে আয়করদাতা। দেশগঠনে তাঁদের আয় কিছু কম পরিমাণে ব্যবহার হয় না। যাদবপুরের যেসব মাস্টারমশাই, দিদিমণি ছাত্রদের সমর্থন করেছিলেন এবং জে এন ইউ এর যাঁরা আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁরাও শুধু আয়করদাতার টাকায় মাইনে পান তা নয়, নিজেরাও আয়কর দেন। প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, যাঁরা এদেশে থাকেন, তাঁরাও আয়করদাতা। স্পষ্টত, যে কোন ছাত্র আন্দোলনই বহু আয়করদাতার স্নেহধন্য।

এবার আপনি বলবেন, তাহলে যেসব আয়করদাতা আন্দোলনকারীরা তাদের টাকা নষ্ট করছে মনে করে তাদের মতামত কি মূল্যহীন? একেবারেই না। এখানেই আসছে গা-জোয়ারির প্রশ্নটা। আপনি সমর্থন করেন না এমন একটা বিষয় নিয়ে আন্দোলন হলেই আপনি বলবেন “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ” ইত্যাদি। তাহলে তো মশাই যে পাড়ার লোক সরকারী দলের প্রার্থীকে জেতায় না সে পাড়ায় রাস্তা না বানানোটাই সঠিক রাজনীতি। আপনি মমতার রাজ্যে থেকে বি জে পি, সি পি এম, কংগ্রেস এদের ভোট দেবেন আর দিদির ভাইয়েরা আপনার জন্য ক্যাটরিনার গালের মত রাস্তা বানিয়ে দেবে! আপনিও তো যে পাতে খাচ্ছেন সে পাতেই হাগছেন। আমি বামপন্থী। তা বলে আমি একথা বলতে পারি না যে আমি আয়কর দিই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু এস এফ আই আর এ আই এস এফ কে রাজনীতি করতে দিতে হবে। ছাত্র পরিষদ, টি এম সি পি, এ বি ভি পি সকলেরই অধিকার আছে। আমি এদের অপছন্দ করি বলেই এরা আন্দোলন করলে বলতে পারি না “আমার টাকায় এসব করা চলবে না। যে পাতে খাচ্ছ, সে পাতেই হাগছ”।

যদি বলি তাহলে আমি গুন্ডা। স্বাধীন দেশের নাগরিক-ফাগরিক কিস্যু নই। যে অন্যের স্বাধীনতা মানে না তার নিজের স্বাধীনতাও বাঁচে না।

পুনশ্চ — বিদেশবাসী প্রাক্তনীদের কথা এখানে বললাম না। কারণ তাঁদের মধ্যে যাঁরা ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে যান তাঁরা অত্যন্ত দেশভক্ত। নিশ্চয় এসব দেশদ্রোহী আন্দোলন কোন যুক্তিতেই সমর্থন করেন না। আর যাঁরা ঐসব অনুষ্ঠানে যান না তাঁরা তো একেবারে দেশদ্রোহী। তাঁরা কি ভাবেন সেই নিয়ে আলোচনা করলে যদি পুলিশে ধরে!

Advertisements

প্যারিসের শিক্ষা

প্যারিসে নারকীয় সন্ত্রাসবাদী হানার পর ৪৮ ঘন্টা অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে অনেক কিছু শিখলাম। দেখুন তো ঠিক শিখেছি কি না ।
১) হিন্দুরা ভারতীয় বা বাংলাদেশি বা পাকিস্তানী। খ্রিস্টানরা ফরাসী, ইংরেজ, ওলন্দাজ, চীনা, জাপানী ইত্যাদি। কিন্তু মুসলমানরা সবাই মুসলমান। অতএব তাদেরই দায়িত্ব ইসলামিক স্টেটকে নিকেশ করা। বসিরহাটের ভাতডালখেকো মুসলমান যদি বলে “মশাই আমি ছা পোষা বাঙালি। জীবনে কলকাতা ছাড়া অন্য শহর দেখিনি। আমি ইরাক, সিরিয়ায় কি হচ্ছে তার কি করব?” সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে পাশের অমুসলমান লোকটাকে বলতে হয় “দেখেছেন কিরকম সেয়ানা! মুসলমান আবার বাঙালি”। তারপর ফেসবুকে লিখতে হবে “this tendency to live in denial is the bane of Islam” ইত্যাদি।

২) হিন্দুরা হিন্দু মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে কিন্তু বুঝতে হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে বা পয়সা খেয়েছে। তাছাড়া কি এমন হয়েছে যে “হিন্দু মৌলবাদ” বলে চেঁচাতে হবে? আগে আই এসের মত লন্ডন, প্যারিসে শ’দুয়েক লোক মারুক। তখন দেখা যাবে।

৩) মুসলমানদের চেয়ে হিন্দু এবং খ্রিস্টানরা ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক বেশি পড়াশোনা করে। কোরানের কোন্ অনুচ্ছেদে বা কোন্ হাদিশে লোকের মুন্ডু কাটতে বলা আছে তা বেশিরভাগ অমুসলমানেরই ক্লিকস্থ।

৪) ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের উৎস কোথায়, তার মদতদাতা কারা — এইসব আলোচনায় যাওয়া যাবে না। কারণ এইসব আলোচনা করা মানেই আপনি জেহাদি অথবা সিপিএম। নিদেনপক্ষে কংগ্রেস। আগামী বছর ভোটে দাঁড়াচ্ছেন; তাই এখন থেকে সংখ্যালঘু ভোট যোগাড়ে লেগেছেন।

৫) যদি ভুল করে সন্ত্রাসবাদের উৎপত্তি নিয়ে কথা বলেও ফেলেন তো “these murderers are being funded from the middle east” অব্দি বলে থেমে যাবেন। সৌদি আরবের নাম করতে যাবেন না। ওদের নাম করলেই আবার আমেরিকার নাম চলে আসবে। মনে রাখবেন ও দেশে অনেক ভারতীয় যায় এবং আরও অনেকে যেতে চায়। অতএব ঐ দেশটা ধোয়া তুলসীপাতা। ওদের এসব নোংরা অপবাদ দেওয়া বামপন্থীদের চক্রান্ত। ভুলে যাবেন না, যদিও কোনদিন কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসেনি, তবু ভারতবর্ষের আজকের অবস্থার জন্যে ওরাই দায়ী। পৃথিবীর যেখানেই ওরা ক্ষমতায় ছিল সেখানেই মানবাধিকার বলে আর কিছু রাখেনি। তেমনই একটা দেশ আফগানিস্তান। সেদেশকে মুক্ত করতে আমেরিকার অবদান ভুলে গেলে চলবে না। তারাই তালিবানদের সাহায্যে ….
এই রে! না না আমি কিছু বলিনি। নমস্কার নমস্কার।