পাঠশালা বন্ধ?

অন্তত একজন মাস্টারমশাইকে চিনি যিনি খুব ছোটবেলায় পিতৃহীন হন, বাবা খুব সামান্য কাজ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর মা লোকের বাড়িতে বাসন মাজা, কাপড় কাচার কাজ করে ছেলেকে বড় করেন। আমার বছর কুড়ির ছাত্রজীবনে অন্তত পাঁচ জন সহপাঠীকে পেয়েছি যারা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, কিন্তু মেধা এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতায় অন্য সকলের চেয়ে দু তিন গুণ এগিয়ে। নিজেদের ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে তারা সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছে। প্রাথমিক স্তরে একটা স্কুলে দু দফায় দু তিন বছর পড়েছিলাম, যেখানে প্রত্যেক ক্লাসে প্রায় নব্বই শতাংশ পড়ুয়াই প্রথম প্রজন্মের। আমার বাবা যে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন সেই স্কুলেরও অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুল শেষ করতে পারত না। লেখাপড়ার চেয়ে, পরীক্ষা পাশ করার চেয়ে গ্রাসাচ্ছাদনের তাগিদ তাদের এবং তাদের পরিবারের অনেক বেশি। বাবার মুখে শুনতাম, এখন গঞ্জ এলাকার স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রীর কাছেও শুনি, অনেক ছাত্রীর মেধা থাকা সত্ত্বেও বিয়ে হয়ে যায় মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই। বেশি লেখাপড়া শিখলে পাত্র পাওয়া মুশকিল হবে, বরপণের অঙ্কটা তখন নাগালের বাইরে চলে যাবে। অনেক ছাত্রী স্কুলে এসে থেকে কেবল জানতে চায় কখন মিড ডে মিল পাওয়া যাবে, কারণ বাড়ি থেকে ভরপেট ভাত খেয়ে আসার সৌভাগ্য তাদের হয় না।

এই আমাদের দেশ। এ দেশের শিক্ষানীতি নিয়ে আমরা কথা বলছি।

এটা মার্ক জুকরবার্গের দেশ নয়। আমরা ক্রমশ ভুলে যাচ্ছি যে সুন্দর পিচাই, সত্য নাডেলারা এখানে ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। আর তাদের গুগল, মাইক্রোসফটের সি ই ও হয়ে বসায় এ দেশের একটি মানুষেরও এক কণা লাভ হয়নি। ওগুলো কোন ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, কারণ ওতে ওঁদের দুজনের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স ফুলে ফেঁপে ওঠা ছাড়া পৃথিবীর আর কারো কোন লাভ বা ক্ষতি হয়নি। প্রথম অনুচ্ছেদে যাদের কথা লিখেছি, তারাই এ দেশের মানুষ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। আমার পরিচিত মাস্টারমশাই যে শেষ পর্যন্ত মাস্টারমশাই হতে পেরেছেন, আমার ঐ সহপাঠীরা কেউ কেউ বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে, অধ্যাপনা করে তাক লাগিয়ে দিতে পেরেছে, তার কারণ অনেক দূর পর্যন্ত তাদের পড়াশোনার খরচের সিংহভাগ বহন করেছিল সরকার। তখনো বিপুল মাইনের বেসরকারী স্কুলে দিগ্বিদিক ভরে যায়নি (বিশেষত যারা অভিভাবকদের বলতে পারে দরকার হলে বাড়ির জিনিসপত্র বিক্রি করে মাইনে দিন, নয়ত স্টুডেন্টকে নিয়ে যান), টাকা থাকলেই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়ার ঢালাও সুযোগ ছিল না। কিন্তু মেধা থাকলে পড়া আটকাত না। কারণ পড়তে পুঁজির দরকার হত না, সরকারই ছিল মধ্যবিত্ত এবং গরীব বাবা-মায়ের পুঁজি। “লম্পট”, “দুশ্চরিত্র”, “দুর্বল” প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আর তাঁর বিরোধীদের আসনে থাকা “গোঁড়া”, “সেকেলে”, “শিল্পবিরোধী”, “দেশদ্রোহী” বামপন্থীরা এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত জানত দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে বড় সুযোগ লেখাপড়া করা। এমন নয় যে তখন পাশ করলেই টপাটপ চাকরি জুটে যেত, দেশে বেকারত্ব ছিলই না। কিন্তু মেধা আছে, পুঁজি নেই বলে লেখাপড়া শেষ হবে না — এমনটা ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছিল।

সে ধারা গতিপথ বদলাতে শুরু করেছিল আজকের উচ্চবিত্তদের পরম পূজ্য মনমোহন সিং আর নরসিমা রাওয়ের আমল থেকে। আমাদের ছাত্রজীবনের শেষদিকেই দেখেছি অনেকে উষ্মা প্রকাশ করছে “ব্যাঙ্গালোর ট্যাঙ্গালোরে কত অপশন। একটু টাকা খরচ করলেই ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া যায়। এখানে লেফটিস্টগুলো না ইন্ডাস্ট্রি রেখেছে, না কলেজ খুলতে দিচ্ছে।” কোয়ান্টিটি-কোয়ালিটির ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্কের কথা তখন কেউ শুনতে চায়নি। বামফ্রন্ট সরকারও, শেষ অবধি, ঢালাও কলেজ খোলার অনুমতি দিলেন। ক্যাপিটেশন ফি কথাটা আমাদের অভিধানে জাঁকিয়ে বসল। সেই সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের রমরমা হল। তাদের সোম, বুধ, শুক্র একরকম ইউনিফর্ম; মঙ্গল, বৃহস্পতি অন্যরকম। সেখানে না পড়লে মনুষ্য জন্ম বৃথা বলে জানা গেল। ভদ্রসন্তানদের ইংরেজি শিখতে না দেওয়ার বামপন্থী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সে এক যুগান্তকারী আন্দোলন। কোন মাধ্যমে পড়াশোনা হচ্ছে সেটাই হয়ে দাঁড়াল মুখ্য। কী পড়ানো হচ্ছে, কত ভাল পড়ানো হচ্ছে, কারা পড়াচ্ছেন — সেসব ছেঁদো ব্যাপার হয়ে গেল। সরকারী স্কুলগুলো হয়ে পড়ল প্রান্তিক। কারণ ভদ্রসন্তানরা আর ওমুখো হলেন না, ফলে মাস্টারমশাই দিদিমণিদের পড়ানোর উৎসাহ তলানিতে পোঁছাল। ঝাঁ চকচকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল নেই যে গ্রামাঞ্চলে তার কথা আলাদা। শহর বা মফস্বলে যারা লোকের বাড়িতে কাজ করে বা রিকশা চালায় বা ভাগচাষী, তাদের ছেলেমেয়েদের আবার কিসের মেধা? কী হবে তাদের লেখাপড়া শিখে? পথে দেখা হতে আমাদের এলাকার নামকরা ছেলেদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক একদিন হতাশ গলায় বললেন “আগে আমাদের স্কুলে পড়ত ডাক্তার, মাস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অফিসারদের ছেলেরা। এখন কারা পড়ে জানিসই তো। এদের নিয়ে আর কী লেখাপড়া হবে?”

সেই কারণেই সরকারী স্কুল সরকারের নিজেরও দুয়োরানি হয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী বেসরকারী স্কুলের ফি নিয়ে গণ্ডগোল মেটাতে নিজে আসরে নামেন, কিন্তু সরকারী স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, নামমাত্র মাইনেয় কাজ করে যান প্যারা টিচাররা। অনশন করতে গিয়ে পথের পাশে মারা যান, কাগজের ভিতরের পাতায় খবর হয় আর মহামান্য আদালত নির্দেশ দেন এমন জায়গায় আন্দোলন করতে হবে যেখানে কারোর অসুবিধা হবে না।

এইসব ভাবনাতেই শিলমোহর দিল নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি। ফ্যালো কড়ি, মাখো তেল। যাদের বাবা-মায়ের সঙ্গতি আছে সেই ভদ্রসন্তানরা দামী স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন। যত যাবেন তত গরীব, সংখ্যালঘু, নিম্নবর্গীয়, জাতি উপজাতির মানুষই কেবল পড়ে থাকবেন সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আর তাঁদের লেখাপড়া করা যে তেমন জরুরী নয় সে সিদ্ধান্ত সমাজ এবং সরকার তো নিয়েই রেখেছে। তাছাড়া সরকারী প্রতিষ্ঠানের আর কী দাম থাকবে? সরকারী পক্ষপাত তো রিলায়েন্স ইউনিভার্সিটির মত বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিই। তাছাড়া নতুন শিক্ষানীতি বলেই দিয়েছে “চরে খাও।” রামকৃষ্ণ মিশন বা সেন্ট জেভিয়ার্সের মত হাতে গোনা কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কে আর চরে খেতে পারবে? মাইনে বাড়বে। মধ্যবিত্ত ঋণ নেবে, নিম্নবিত্ত পড়া ছেড়ে দেবে। এ হেন বেসরকারীকরণে ভদ্রলোকদের খুশি হওয়ার মত আরেকটা ব্যাপার ঘটবে। যাদের তাঁরা “সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো” বলেন, তাদের লেখাপড়া করা কমে যাবে। এমনিতেই বহু জায়গায় সংরক্ষিত আসনগুলো পূরণ হয় না (তথাপি জেনারেল ক্যাটেগরি ‘বঞ্চিত’), এরপর যেমন-খুশি-ফি-বাড়াও ব্যবস্থায় আরো কম ছাত্রছাত্রী ভর্তি হবে। কারণ ভদ্রলোকদের মস্তিষ্কের গভীরে প্রবিষ্ট প্রোপাগান্ডা যা-ই বলুক, ভারতের গরীব মানুষদের মধ্যে বামুন, কায়েতদের চেয়ে তফসিলি জাতি উপজাতিভুক্ত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।

আপনি ফোনে, ট্যাবে, ল্যাপটপে বা ডেস্কটপে এতদূর পড়ে ভাবছেন বাজে সময় নষ্ট হল। ফালতু লোকেদের জন্য এত অশ্রুপাত কিসের? আমার জন্য, আমার ছেলেমেয়ের জন্য তো নতুন শিক্ষানীতি অনেক দ্বার খুলে দিল। সত্যি কি তাই? নতুন ব্যবস্থায় আপনারাও ফালতু লোকেদের দলে পড়ে যাবেন না তো? মনে রাখবেন, এখন থেকে কিন্তু ডিগ্রির দাম আর আগের মত থাকবে না। ফার্স্ট ইয়ারে পড়া ছেড়ে দিলে সার্টিফিকেট, সেকেন্ড ইয়ারে ছাড়লে ডিপ্লোমা, শেষ অব্দি পড়লে ডিগ্রি। অধ্যবসায়ের বিশেষ দাম থাকল কি? চাকরির বাজারে এমন ডিগ্রির দাম থাকবে তো? ফিজিক্সের সাথে ইতিহাস পড়া যাবে শুনতে রোমহর্ষক। কিন্তু অঙ্ক আর কেমিস্ট্রি না পড়ে ইতিহাস পড়লে ফিজিক্স শেখা যাবে তো? অন্তত চাকরি বাকরি পাওয়ার মত শেখা সম্ভব হবে তো? যে সরকার এই শিক্ষানীতি বানিয়েছেন তাঁরা আবার মেকলের শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমালোচক, কারণ ওটা ছিল ইংরেজ সরকারের কেরানি তৈরি করার ব্যবস্থা। তার বদলে এঁরা এনেছেন বহুজাতিকের বাধ্য কর্মী তৈরির ব্যবস্থা, তাই স্কুলস্তর থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা। কিন্তু সেটাও সুচারুভাবে সম্পন্ন হবে তো? তাছাড়া শিক্ষক শিক্ষিকাদের মেধাও তো এবার থেকে বাজারের পণ্য হয়ে গেল, তারও দরাদরি হবে। ইতিমধ্যেই উচ্চশিক্ষায় পার্ট টাইমার দিয়ে কাজ চালানো দস্তুর হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে তার যোগ্যতার উপযুক্ত দাম পাবে তো?

পাঠ্যক্রম কী হবে সে আলোচনায় কালক্ষেপ করা উচিৎ হবে না। যে যে রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসে গেছে সেখানকার খবর রাখলেই সহজে আন্দাজ করা যায় নজরুল, সুকান্ত বাদ যাবেন। রবীন্দ্রনাথ টিকে গেলেও যেতে পারেন, তবে ‘ভারততীর্থ’, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ’ ইত্যাদি কবিতাগুলো ছেলেমেয়েদের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেওয়া হবে না। বাংলার ইতিহাস ব্যাপারটা বাদ দেওয়াই ভাল হবে, কারণ সেই পাল যুগ থেকে শুরু করে পলাশীর যুদ্ধ অব্দি কেবল বিধর্মীদের রমরমা তো। আর উনবিংশ শতকের সমাজ সংস্কার আন্দোলন ব্যাপারটা একদম পড়ানো যাবে না। ঐ সময়েই তো বাঙালিরা সব অহিন্দু ম্লেচ্ছ হয়ে গেল। রামমোহন বলে একটা লোক গভর্নর জেনারেলকে চিঠি লিখল (ডিসেম্বর ১৮২৩), এ দেশের যুবকদের সংস্কৃত পড়ানোয় অত মন না দিলেও চলবে। ইংরেজি পড়ান, আধুনিক দর্শন পড়ান। মানে লোকটা কেবল পবিত্র সতীদাহ প্রথা তুলে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। ও আপদ বিদেয় হতে না হতেই আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলে আরেকজন হাজির। সে আরো বড় বিপদ। কেবল বিধবাদের বিয়ে দিয়েছে, মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়েছে তা নয়; পণ্ডিতদের সাথে, ব্যালান্টাইন সাহেবের সাথে ঝগড়া করে বেদ, বেদান্ত, সংস্কৃতকে পাশে সরিয়ে দিয়ে ইংরেজি আর পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞান শিক্ষার পাকা ব্যবস্থা করেছে। ওসব পড়েই তো দেশটা উচ্ছন্নে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র — এসব বুদ্ধি তো ঐ পশ্চিমের জানলা গলেই ঢুকে পড়েছে।

অবশ্য বাংলা ভাষাটাই তো থাকবে না, বাংলার ইতিহাসের কথা আসছে কোথা থেকে? ইংরেজি মাধ্যমে তো পড়াতে দেবেন না বলছেন সরকার। তা আপনারা যারা ছেলেমেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চেয়েছিলেন, তারা কি আর বাংলা মাধ্যমে পড়াবেন এখন? তা তো হয় না। সরকার জানেন সে কথা। তাই বলবেন হিন্দি মাধ্যমে পড়াতে। বোকা তামিলদের তাতে আপত্তি থাকতে পারে, আপনাদের তো নেই। এমনিতেই তো ছেলেমেয়ের সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দি করে রেখেছেন অনেকে।

নয়া শিক্ষানীতি কি জয়, হিন্দি মিডিয়াম কি জয়।

যত পূজা হল না সারা


সুপ্রভাত,

তোমরা যখন এই চিঠি পড়বে তখন আর আমি থাকব না। আমার উপর রাগ কোর না। আমি জানি তোমরা অনেকে সত্যিই আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে, আমাকে ভালবাসতে এবং আমার সাথে ভাল ব্যবহারও করতে। আমার কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই। চিরকাল আমি নিজেই আমার সমস্যা। আমার আত্মা আর শরীরের ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে, ফলে আমি একটা দানবে পরিণত হয়েছি। আমি বরাবর লেখক হতে চাইতাম। বিজ্ঞান লেখক — কার্ল সেগানের মত। শেষ অব্দি এই চিঠিটা ছাড়া আমার আর কিছু লেখা হয়ে উঠল না।

আমি বিজ্ঞান, নক্ষত্র এবং প্রকৃতিকে ভালবাসতাম। কিন্তু মানুষকে ভালবেসেছিলাম একথা না বুঝেই, যে মানুষ বহুকাল হল প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। আমাদের অনুভূতি ধার করা, আমাদের ভালবাসা বানানো, আমাদের স্বকীয়তা কৃত্রিম শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। আঘাত না পেয়ে ভালবাসা সত্যিই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা মানুষের দাম কমাতে কমাতে তার পরিচিতির সমান করে দেওয়া হয়েছে। একটা ভোটের সমান, একটা নম্বরের সমান, কোন একটা জড় পদার্থের সমান। কিছুতেই একটা মানুষকে একটা মস্তিষ্ক হিসাবে গণ্য করা হয় না, নক্ষত্রচূর্ণে তৈরি এক মহিমাময় বস্তু বলে তাকে ভাবা হয় না। কোন ক্ষেত্রেই হয় না। না লেখাপড়ায়, না রাস্তাঘাটে, না মৃত্যুতে, না জীবনে।

আমার জন্ম এক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। আমার শৈশবের একাকিত্ব কিছুতেই আমার পিছু ছাড়ল না। আমি সেই কল্কে না পাওয়া শিশুটিই রয়ে গেলাম।

চলে যাওয়ার পর লোকে আমায় ভীতু বলতে পারে, স্বার্থপর বলতে পারে বা বোকা বলতে পারে। আমার তাতে বয়ে গেছে। আমি মৃত্যুর পরের জীবনে বিশ্বাস করি না, ভূত প্রেতেও বিশ্বাস করি না। আমি একমাত্র যা বিশ্বাস করি তা হল আমি তারায় তারায় ভ্রমণ করতে পারি আর অন্য বিশ্ব সম্বন্ধে জানতে পারি।

না, এটা সুশান্ত সিং রাজপুতের সুইসাইড নোটের বাংলা ভাষান্তর নয়। তিনি ভাল ছাত্র ছিলেন, জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় খুব উপরের দিকে র‍্যাঙ্ক করে দিল্লী কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তিও হয়েছিলেন। আর দুটো সেমিস্টার পড়লে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ারও হয়ে যেতেন। পড়েননি সে তাঁর ইচ্ছা। অভিনয় করলে বেশি ভাল করবেন বিবেচনা করে ওখানেই লেখাপড়া সাঙ্গ করেন। সিদ্ধান্তটা যে খুব ভুল ছিল তা-ও নয়। আসলে ইংরেজিতে লেখা এই সুইসাইড নোট যে ছাত্রের তিনি কিন্তু লেখাপড়াই করতে চেয়েছিলেন। তিনি হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পি এইচ ডি গবেষক ছিলেন। সুশান্তের মত মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেননি, এসেছিলেন দারিদ্র্য সীমার নীচের এক পরিবার থেকে। দোষের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন করতেন, তার উপর জাতে ছোটলোক (মৃত্যুর পরে অবশ্য সকলে মিলে প্রমাণ করার চেষ্টা হয়েছিল তিনি আদৌ তফসিলি জাতির মানুষ নন)। তাই তাঁর স্টাইপেন্ড বন্ধ করে দিয়ে, সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়েছিল।

যাঁরা এখনো বোঝেননি বা বেমালুম ভুলে গেছেন, তাঁদের জন্য বলা যাক — ছাত্রটির নাম রোহিত ভেমুলা। মানসিক স্বাস্থ্য, অবসাদ, depression মানে কেবল বাঙালি কবি কথিত মনখারাপ আর নিম্নচাপই কিনা — এসব নিয়ে আলোচনা দেখছি আর শুনছি। অবাক হয়ে ভাবছি এই গণ বেদনা, গণ উদ্বেগ, গণ হাহাকার কেন রোহিতের কপালে জোটেনি? একটা কারণ অবশ্যই সুশান্তের পেশা। অমন সুদর্শন একজন মানুষ, যিনি এগারোটা ছবির ছোট্ট কেরিয়ারে অনেককে মোহিত করেছিলেন, তাঁর এভাবে চলে যাওয়া ভারতের কয়েকশো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটার একজন অখ্যাত গবেষকের আত্মহত্যার চেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার চেষ্টা করছি।

রোহিতের আত্মহত্যায় সোশাল মিডিয়া এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভিতরে বাইরে বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল “গেছে আপদ গেছে। লেখাপড়া না করে যারা রাজনীতি করে তাদের মায়া দয়া দেখানোর মানে হয় না।” অনেকের, বিশেষত রাষ্ট্রের, প্রতিক্রিয়া ছিল “ও তো দলিতই নয়, আবার দলিত দলিত করে নাচার কী আছে?” অস্যার্থ দলিত হলে না হয় কিছুটা কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করা যেত। ভয়, পাছে ভোট নষ্ট হয়। এ ছাড়াও কারো কারো প্রতিক্রিয়া ছিল “আমি ব্যাপারটা ঠিক জানি না। না জেনে কিছু বলা উচিৎ হবে না।” এর বাইরে ছিলেন তাঁরা, যাঁরা রোহিতের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলতে নারাজ। বলছিলেন ক্ষমতার কাঠামো তাকে ষড় করে জবাই করেছে আসলে।

এই শেষ দলের মানুষদের কথা বাদ দিন। তাঁরা স্পষ্টতই অ্যান্টি ন্যাশনাল। কিন্তু বাকিদের কারো কেন মনে হয়নি ছেলেটা বড় একা হয়ে গিয়েছিল, ওর পাশে কেউ কেন দাঁড়াল না? ছেলেটার হয়ত অনেক কিছু বলার ছিল, শোনার কেউ থাকলে এভাবে ওকে চলে যেতে হত না? ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমে রোহিতের সুইসাইড নোট পড়ে কারো তো মনে হয়নি “ইশ! ছেলেটার মহাবিশ্ব নিয়ে কি অদম্য আগ্রহ ছিল! যদি সেগানের মত লেখক হয়ে উঠতে পারত কি ভালই না হত!” আজ সুশান্তের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স প্রীতি নিয়ে এই গণ হা হুতাশ ক্রমশ ক্লান্ত, ক্লান্ত করে। যে যতই শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করুন, আসলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে মনোযোগের এই পার্থক্যের আসল কারণটা রোহিতই তার সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন।

সুশান্ত যদি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পড়তেই ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির জয় লোবোর মত প্রত্যাশার চাপে গলায় দড়ি দিতেন, তাহলেও সে মৃত্যু রোহিতের মৃত্যুর চেয়ে আমাদের বেশি নাড়া দিত। প্রথমত তিনি মধ্যবিত্ত বলে, বাংলায় যাকে বলে ভদ্রলোকের ছেলে। দ্বিতীয়ত, সুশান্ত সিং রাজপুত বলে। অন্ধ্রপ্রদেশের মালা জাতের হতদরিদ্র একটি ছেলের ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করতে করতে আত্মহত্যা করা কোন দুর্ঘটনা নয় আমাদের কাছে। “ওরা তো রিজার্ভেশন না থাকলে চান্সই পেত না”। কিন্তু ভদ্রলোকের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার বদলে আত্মহত্যা করবে — এ কিন্তু অকল্পনীয়। আঁতকে ওঠার মত। ২০১৬ সালে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সামনে সুশান্তর বক্তৃতা শুনলাম। সেখানে তিনি বলছেন ছোট থেকেই পরিবার ঠিক করে দিয়েছিল তাঁকে ইঞ্জিনিয়ারই হতে হবে, আর দিদিদের ডাক্তার হতে হবে। সুশান্তর পরিবার যেমন, ভারতীয় সমাজও তেমন। ঠিক করে দিয়েছে রোহিত যদি একে গরীব তায় ভেমুলা হয়, তাহলে তাকে মুচি মেথর না হোক, পিওন টিওনই হতে হবে। কার্ল সেগান টেগান ভেবে আনন্দ পেলে পাক, কিন্তু সেসব হয়ে ওঠার বদলে যদি আত্মহত্যা করে বসে তাতে ব্যথিত হওয়ার কিচ্ছু নেই। তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবার কিচ্ছু নেই। বরং অর্থনৈতিক জোরে এই নিয়ম ভেঙে যদি টিনা দাবির মত কেউ আই এ এস পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করে যায়, তখন তার মেধার প্রশংসা করার বদলে সবাই মিলে বলতে হবে “দেখেছ, কারা সব রিজার্ভেশন নিয়ে বসে আছে?”

তাই ভাবছিলাম, নিত্য সোনার চাঁদ সোনার টুকরো বলে ডাকা হয় যাদের, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর পর এই প্রথম কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলেন একজন আদিবাসী — সোনাঝরিয়া মিঞ্জ। যাঁরা হতে পারেননি, কেবল গায়ের রঙ, মুখের ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে ইচ্ছাকৃত এবং অন্যমনস্ক টিটকিরি শুনতে শুনতে জীবন কাটালেন বা না পেরে পড়াশোনার জায়গা থেকে, চাকরি থেকে, কখনো বা জীবন থেকেই বিদায় নিলেন চুনী কোটালের মত, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে ভাবে?

কে ভাবে সেইসব সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে, যারা কেবল মুসলমান বলে বা আমিষাশী বলে অন্য শহরে পড়তে গিয়ে, চাকরি করতে গিয়ে বাড়ি ভাড়া পায় না? ঘরে বাইরে অনলাইনে অফলাইনে গত দুদিন ধরে এই যে সকলের কথা মন দিয়ে শোনার, কোন বন্ধুকে একা হতে না দেওয়ার কোটি কোটি শপথ এর মধ্যে কোথাও এসবের প্রতিকারের কোন প্রত্যয় রয়েছে কি?

অলস কল্পনায় কোন শিল্পীর হয়ত ভাবতে ইচ্ছা করবে সুশান্ত আর রোহিতের স্বর্গবাস হয়েছে। সেখানে রোহিতের বায়োপিক হচ্ছে, রোহিতের ভূমিকায় অভিনয় করছেন সুশান্ত। আমার মত বেরসিক লোকেরা এসব ভেবে উঠতে পারে না। আমরা গল্পের গরুকে একেবারে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী। মানে রোহিতের ভূমিকায় আলি ফজল।

মা হওয়া কি মুখের কথা?

আমাদের ভাবনায় মায়েরা অতিমানবিক। তাঁরা পারেন না এমন কিছু নেই। দশ মাস দশ দিন পেটে ধরতে পারেন, অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করতে পারেন, বাড়ির সব কাজ একাই করতে পারেন শুধু নয়, নিখুঁতভাবে পারেন। মায়েদের নেহাত মানুষ হয়ে বাঁচা খুবই লজ্জার। অতএব আমাদেরই দায়িত্ব যন্ত্রণা অকল্পনীয় স্তরে নিয়ে গিয়ে তাঁদের অতিমানবিক হতে সাহায্য করা। এই দায়িত্ব আমরা একনিষ্ঠ নিয়মানুবর্তিতায় বরাবর পালন করে এসেছি। বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা দাঁড়ান।

একেবারে পুরাণ থেকে শুরু করুন। সীতা অন্তঃসত্ত্বা, রামচন্দ্র বাবা হবেন। যাকে বলে হৈ হৈ কাণ্ড, রৈ রৈ ব্যাপার। একজন রানীর প্রসবে কোন সমস্যা হওয়ারই কথা নয়। সর্বদা যত্নে থাকবেন, ভালমন্দ খাবেন, সময় মত রাজবৈদ্যের উপস্থিতিতে তাঁর সন্তান হবে। কিন্তু তা আর হল কোথায়? দস্যু মোহনের গল্পের মত “কী হইতে কী হইয়া গেল”, সীতার চরিত্র সম্বন্ধে সর্বজ্ঞ রাম পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। প্রজাদের কানাকানি তাঁর কানে জ্বালা ধরাল, তিনি সীতাকে নির্বাসন দিলেন। লব কুশের জন্ম হল জঙ্গলের মাঝখানে বাল্মীকির আশ্রমে।

তারপর দেবকী। তিনিও রাজনন্দিনী, যথারীতি আরেক রাজার সাথে বিয়েও হল। এঁরও যথা সময়ে নির্বিঘ্নে মা হতে পারার কথা। কিন্তু পাষণ্ড ভ্রাতা কংস ইতিমধ্যে খবর পেয়েছে বোনের অষ্টম গর্ভই তার মৃত্যুর কারণ হবে। তাই স্বামী স্ত্রী দুজনকেই ঢোকাও কাস্টডিতে। আর কি নিখুঁত ব্যবস্থা! অষ্টম গর্ভ অব্দি অপেক্ষা করার ব্যাপার নেই। একটি করে সন্তান হয় আর পত্র পাঠ তাদের শেষ করে দেওয়া হয়। এত কষ্ট সহ্য করেও কিন্তু দেবকী ঠিক শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিয়েই ফেললেন। আবার স্বামী-স্ত্রী ষড় করে দৈব সহায়তায় সন্তানটিকে বাঁচিয়েও ফেললেন। ভাবুন, দেবকী অতিমানবিক নন?

কলি যুগ বলে আজকাল সতীত্ব টতীত্ব নিয়ে লোকে অত মাথা ঘামায় না। বিজ্ঞান সে যুগের মত উন্নত নেই। ফলে অমুকের গর্ভ তমুকের মৃত্যুর কারণ হবে — এসবও জানতে পারা যায় না। তবে অতিমানবিক মা কিন্তু কম পড়েনি। এই ধরুন ‘মাদার ইন্ডিয়া’। ছবিটা নাকি সত্য ঘটনা অবলম্বনে তৈরি। ভাবুন, একজন মহিলা স্বামী পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর চরম দারিদ্র্য সামলে ছেলেদের মানুষ করলেন। শেষে আবার বিগড়ে যাওয়া ছেলেকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে নিজেই তাকে হত্যা করলেন। এ যুগের কোন বাবা পারবেন? ক্ষমতাবান, স্নেহান্ধ বাবাদের আমলে ছেলেদের সম্পত্তি কেমন লাফিয়ে বাড়ছে সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
সে যা-ই হোক, সিনেমার মাদার ইন্ডিয়াকে অন্তত গর্ভাবস্থায় রাজার তাড়নায় জঙ্গলে বা জেলে কাটাতে হয়নি। বাস্তবের গুজরাটে বিলকিস বানোর তিন বছরের মেয়ে সালেহাকে তাঁর চোখের সামনেই পাথরে আছড়ে মেরে ফেলা হয় বলে অভিযোগ। আসলে ধর্ষণ করার তাড়া ছিল আর কি। তারপর এতগুলো বছর কেটে গেছে, বিলকিস এখনো আইন আদালত করে চলেছেন। অতিমানবিক নয়? মা বলেই তো পারেন।

তারপর সফুরা জারগর। ভাল ছাত্রী, পি এইচ ডি করছেন জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। নিজের এবং আসন্ন সন্তানের নাগরিকত্ব লোপাট করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে মিছিল, মিটিং, ধরনা সংগঠিত করার অপরাধে গত ১২ই এপ্রিল গ্রেপ্তার হয়েছেন। কোন দোকানে আগুন লাগাননি, কাউকে গাঁট্টা পর্যন্ত মারেননি। অন্যকে ওসব করতে প্ররোচিত করেছেন এমন প্রমাণও আদালতে দাখিল করা হয়নি পুলিশের পক্ষ থেকে। তবু এই অন্তঃসত্ত্বা তরুণী গতকালও জামিন পেলেন না। বিচারক বললেন অন্তত চাক্কা জ্যাম করার প্রাথমিক প্রমাণ তো পাওয়া গেছে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে। অতএব জামিন দেওয়া যাবে না। এ নিয়ে অনেকে রাগ করছেন। তাঁরা মহৎ উদ্দেশ্যটা বুঝতেই পারছেন না। সফুরাকে এমন যন্ত্রণার মধ্যে না রাখলে তিনি পৌরাণিক মহত্ত্বে উত্তীর্ণ হবেন কী করে? পুরাণগুলো কি কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নাকি? ওগুলো হিন্দু, মুসলমান নির্বিশেষে সব ভারতীয়ের। সে যুগে ইসলাম ছিল না বলে দুঃখ কষ্ট সহ্য করে মহত্ত্ব অর্জনে মুসলমান মহিলারা অনেক পিছিয়ে আছেন। তাঁদের সমান হওয়ার সুযোগ দিতে হবে না?

এখন আপনারা বলবেন হাতি মায়ের জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভুলভাল তথ্য দিয়ে কেঁদে ভাসাচ্ছেন, মানুষ মায়ের জন্য কেন দরদ নেই? ধুর মশাই! হাতি কি মানুষ? তার কি পুরাণ আছে? তার মহৎ হওয়ার কোন দরকার আছে? সে একটা নিরীহ জীব। তাকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখাই কর্তব্য। বিশেষত বাকি ভারতে শিল্পের জন্য, খনিজের জন্য, বুলেট ট্রেনের জন্য জঙ্গল সাফ করে দেওয়ার ফলে হাতিদের যখন ক্ষতি হচ্ছে তখন কেরালায় অন্তত তাদের বাঁচাতেই হবে। তাই এই তৎপরতা। ভাল করে ভেবে দেখুন, হাতি মা এমনকি গোমাতাও নন। হলে না হয় একটা মন্দির টন্দির করে দেওয়ার কথা ভাবা যেত। তা যখন সম্ভব নয় তখন মর্মান্তিক মৃত্যুর প্রতিবাদ করাই কি উচিৎ কাজ নয়?

মাথা ঠান্ডা করে শবাসন করুন। করলেই বুঝতে পারবেন, সব ঠিক আছে। মায়েদের প্রতি আমাদের ব্যবহার একেবারে সনাতন ঐতিহ্য মেনে চলছে। অসুবিধা অন্যত্র। মায়েরা তো মহান হয়ে যান, এবারও হবেন হয়ত। বিষ্ণুর অবতার রামকে কিন্তু শেষ অব্দি নিতান্ত ছাপোষা গেরস্থের মত অবসাদে ভুগে সরযূ নদীর জলে ঝাঁপ দিতে হয়েছিল। কংসের অবস্থা আরো শোচনীয়। জনসমক্ষে হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছে বেদম পেটানি খেয়ে মৃত্যু। পুরাণ কিন্তু ভারতীয়দের যৌথ উত্তরাধিকার, কেবল হিন্দুদের সম্পত্তি নয়।

ভারতমাতা কি জয়!