আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

যদি ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি ২০১৫ বিশ্বকাপের বছর খানেক আগে ঘোষণা করতেন তিনি আর একদিনের ক্রিকেট খেলবেন না, কেমন হত ব্যাপারটা? তখন ধোনির বয়স সবে ৩৩ বছর। চোট আঘাতে বেশ কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এমন নয়, উইকেটরক্ষায় শিথিলতা দেখা যাচ্ছিল বা ব্যাটে রান ছিল না তা-ও নয়। সে অবস্থায় ক্রিকেটের অন্যতম বক্স অফিস ধোনি একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে অবশ্যই হইচই পড়ে যেত। কিন্তু এমন কিছু তখন ঘটেনি। সাদা বলের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন ধোনি শুধু ২০১৫ বিশ্বকাপ নয়, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপও খেলেছেন। কিন্তু ধোনি তখন ৫০ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেললে যতটা অবাক কাণ্ড হত, অতি সম্প্রতি তার চেয়েও অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অলরাউন্ডারদের একজন এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় বেন স্টোকস একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। ১৯ জুলাই (মঙ্গলবার) দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিকই ছিল তাঁর খেলোয়াড় জীবনের শেষ একদিনের ম্যাচ।

ধোনি অবসর নিলে যা হত, স্টোকসের অবসর তার চেয়েও বেশি আশ্চর্যের কারণ স্টোকসের বয়স এখন ৩১। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়, এই বয়সে এসে একজন ব্যাটার আরও পরিণত হয়ে ওঠেন। আর স্টোকস তাঁর বোলিং বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটার হিসাবেই ইংল্যান্ড দলে জায়গা পেতে পারেন তিন ধরনের ক্রিকেটেই। অতীতে বয়স বাড়লে, শরীরের ধকল নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেলে অনেক অলরাউন্ডারই বোলিং করা ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্টিভ ওয় ব্যাট হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ১২০ রান ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার শেষ অব্দি ফাইনালে পৌঁছত না। টাই হয়ে যাওয়া সেমিফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেছিলেন। স্টোকসও যে আগামী বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে পার্থক্য গড়ে দিতে পারতেন না তা বলা যায় না। কিন্তু তিনি সে বিকল্পের দিকে গেলেন না। এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি নিঃসন্দেহে একদিনের ক্রিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং যাঁর খেলা সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের বিলক্ষণ আনন্দ দেয়, তিনি কেন এত তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে নিলেন?

ভবিষ্যতে যখন ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হবে, তখন ২০২২ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নিয়ে একটা আলাদা অধ্যায় লিখতে হবে। এই এক সপ্তাহে এমন তিনটে ঘটনা ঘটে গেছে যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যুগ বদলে যাওয়ার সূচক। একটা অবশ্যই স্টোকসের মত একজন সক্রিয়, জনপ্রিয় এবং অল্পবয়সী ক্রিকেটারের একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া। কিন্তু ক্রিকেট দলগত খেলা। সেদিক থেকে আরও বড় ঘটনা স্টোকসের অবসরের ঠিক পাঁচদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার একটা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ জুলাই ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে জানায় যে তারা ওই সিরিজ খেলতে অপারগ, কারণ ওই সময়ে তারা নিজেদের দেশে যে নতুন টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করছে তার খেলা চলবে। সেই লিগ সামলে জাতীয় দলকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো সম্ভব নয়। আর বাকি বছরের ব্যস্ত ক্রীড়াসূচি থেকে আর কোনো সময় বার করাও সম্ভব নয়।

টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের গুরুত্ব কতটা বেড়ে গেছে আর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব কতটা কমে গেছে তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তে তাদের আগামী বছরের বিশ্বকাপ খেলার উপরে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, এখন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ সুপার লিগের অংশ। ঠিক যেমন টেস্ট ম্যাচগুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। তফাত বলতে সুপার লিগের পয়েন্ট দিয়ে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয় না, ঠিক হয় কোন কোন দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। ওই পয়েন্ট টেবিলের প্রথম আটটা দল (ভারত বাদে সাতটা, কারণ ভারত আয়োজক দেশ) ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, বাকিদের পাঁচটা অ্যাসোশিয়েট দেশের সঙ্গে যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে। সেখান থেকে মাত্র দুটো দেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ওই পয়েন্ট টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকা এই মুহূর্তে এগারো নম্বরে আছে। জানুয়ারি মাসের অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাদ যাওয়ায় মে মাসে ওই টেবিল চূড়ান্ত হওয়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা আর মাত্র দুটো সিরিজ খেলার সুযোগ পাবে – ইংল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে। সেই দুটো সিরিজ জিতে প্রথম পাঁচে উঠে আসা মোটেই সহজ নয়। যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতাও নেহাত সহজ হবে না, কারণ সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে থাকতে পারে শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ডের মত দলগুলো। এককথায়, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেল ফ্র্যাঞ্চাইজ টি টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করার জন্য।

আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের এই মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট হল অতীত। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটই ভবিষ্যৎ। যুগপৎ এই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত একটা ক্রিকেট বোর্ড সেরকমই মনে করছে। ১৩ তারিখ ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঘটেছে তৃতীয় ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ড যে টি টোয়েন্টি লিগের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল করেছে, সেই লিগের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর নিলাম ছিল ২০ তারিখ। সেখানে ছটা ফ্র্যাঞ্চাইজের সবকটাই কিনে নিয়েছেন আইপিএলের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং রাজস্থান রয়্যালসের মালিকরাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ওই লিগের ভাগ্যনিয়ন্তা। বহুদিন আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ এবং আমেরিকার লিগে দল আছে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকদের, মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মালিকরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর লিখে একটা দলের মালিক। ক্যারিবিয়ান লিগে পাঞ্জাব কিংস আর রাজস্থান রয়্যালসের মালিকদেরও দল রয়েছে। কিন্তু এর আগে কোনো লিগের সম্পূর্ণ দখল আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকদের হাতে আসেনি। তাদের ইচ্ছাতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এ পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগে ভারতীয় ক্রিকেটারদের খেলার অনুমতি দেয়নি। এখন কথা হল, অন্য দেশের লিগের দলগুলোও যখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ মালিকদেরই দখলে, তখন তাঁরা বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, ঋষভ পন্থ, হার্দিক পাণ্ড্যার মত জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের চাইবেন না কেন? চাইলে ভারতীয় বোর্ড কতদিন না বলতে পারবে? যদি না পারে, তখন ক্রিকেটাররা আর কত ক্রিকেট খেলবেন?

ক্রিকেটের মরসুম বলে আর কিছু নেই বহুকাল হল। বিশেষ করে ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যে পরিমাণ ক্রিকেটে খেলে তাতে ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত লেগেই আছে। জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, চেতেশ্বর পুজারার মত যাঁরা শুধু টেস্ট খেলেন একমাত্র তাঁদেরই দেখা যায় চোট আঘাত কম। বিশেষ করে জোরে বোলাররা দুটো সিরিজ খেলেন তো চারটে সিরিজ মাঠের বাইরে থাকেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত এবং ক্লান্তি তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি বছরের সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সাতজন ভারত অধিনায়ক (বিরাট, রোহিত, কে এল রাহুল, হার্দিক, ঋষভ পন্থ, যশপ্রীত বুমরা, শিখর ধাওয়ান) দেখে ফেলব আমরা। স্টোকসও কিন্তু ক্রীড়াসূচিকে দোষ দিয়েছেন। তিনি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিন ধরনের ক্রিকেটেই দলকে একশো শতাংশ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন।

ঘটনা হল, এভাবে চললে আরও অনেককেই তিরিশের আশেপাশে অবসর নিয়ে ফেলতে দেখা যাবে। একেকজন একেক ধরনের ক্রিকেট ছেড়ে দেবেন, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কেউই টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়বেন না। দেশের হয়ে না খেললেও ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলবেনই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত যেসব দেশে ক্রিকেটের অবস্থা সঙ্গীন, ক্রিকেট বোর্ড তেমন টাকাপয়সা দিতে পারে না, সেখানকার ক্রিকেটাররা গত এক দশক ধরেই দেশের হয়ে খেলার তোয়াক্কা না করে সারা পৃথিবীর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়েছেন। কারণ ওখানে অনেক টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ আরও বাড়ছে এবং বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন লিগে উৎসাহের কারণও আর্থিক। তাদের ক্রিকেটও ধুঁকছে। কিন্তু শুধু ওই একটা লিগ চালু হচ্ছে তা তো নয়, এ বছর থেকে আইপিএল আট দলের বদলে দশ দলের লিগ হয়ে গেছে। সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতীয় বোর্ড আয় করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও দল যোগ করে আইপিএলকে আরও লম্বা করতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এদিকে আইসিসির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াসূচি, যার পোশাকি নাম ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম, তাতে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় ছেড়ে রাখা হবে বলে একরকম সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ এবং ইংল্যান্ডের একশো বলের লিগ দ্য হান্ড্রেড – সেসবের জন্যেও আলাদা করে সময় ধার্য করা হবে। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা এত লিগ ক্রিকেট খেলে আর দেশের হয়ে খেলবেন কখন? কেনই বা খেলবেন? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মত যেসব দেশের বোর্ড সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের রোজগার থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ভাল পারিশ্রমিক দিতে পারবে, তারা না হয় তবু পারবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড – এরা কী করবে? এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডও খাবি খেতে পারে। এই সাইটেই আগে লিখেছি, এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক আগামী মরসুমে আইপিএলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে যা পারিশ্রমিক দেয় তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

কিন্তু ক্রিকেটাররা নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিপদে ফেলছে বোর্ডগুলো এবং আইসিসির লোভ। এই শতাব্দীর প্রথম দশকেও পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বেশ জনপ্রিয় ছিল ত্রিদেশীয়, চতুর্দেশীয় প্রতিযোগিতা; যদিও তার টান ক্রমশ কমে আসছিল। টি টোয়েন্টি যুগে আইসিসি ওই ধরনের প্রতিযোগিতা একেবারেই বন্ধ করে দিল, যাতে শুধুমাত্র আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোই বহুদলীয় হয়। কেন? সম্প্রচারের লাভের গুড় যাতে কম না পড়ে। অথচ আইসিসি কিন্তু একই যুক্তিতে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ছাড়া কোনো বহুদলীয় টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হবে না বলেনি। একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। আসলে আইসিসির বলার উপায় ছিল না। কারণ সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য ভারতই সবচেয়ে বড় লিগটা চালায়।

সুতরাং কুড়ি ওভারের ক্রিকেট তথা ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর পঞ্চাশ ওভারের খেলায় নতুন নিয়ম হল, দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা হবে। টি টোয়েন্টির মতই ছোট করে আনা হল বাউন্ডারি, তার উপর সারাক্ষণই পাওয়ার প্লে। ফলে পঞ্চাশ ওভারের খেলার নাটকীয়তার বারোটা বাজল। রিভার্স সুইং বন্ধ, স্পিনারদের ভূমিকা নগণ্য। কারণ বল পুরনো হয় না বলে ঘুরতে চায় না, ইনিংসের শেষ প্রান্তে বল নরম হয়ে গিয়ে আর মারা শক্ত হয় না। ফলে খেলাটা হয়ে দাঁড়াল টি টোয়েন্টিরই বড় সংস্করণ। সে জিনিস আলাদা করে দেখতে কার ভাল লাগে? এ নিয়ে শচীন তেন্ডুলকরের মত লোক আপত্তি করেছেন, আইসিসি কান দেয়নি। এখন একদিনের ক্রিকেট ভালবাসেন এমন অনেকে চাইছেন আইসিসি খেলাটাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিক। স্বয়ং ভারত অধিনায়ক রোহিত কদিন আগে মনে করিয়ে দিয়েছেন ত্রিদেশীয় সিরিজগুলোর কথা, বলেছেন ওগুলো আবার চালু করলে হয়ত খেলার সংখ্যা কমানো যাবে, ক্রিকেটারদের চাপ কমবে।

কিন্তু ক্রিকেটারদের চাপ কমাতে চাইছে কে? কেরি প্যাকারও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি যখন ওয়ার্ল্ড সিরিজ চালু করে রঙিন জামা, সাদা বলের ক্রিকেটের রাস্তায় হাঁটেন, স্বার্থটা একেবারেই ব্যবসায়িক ছিল। কিন্তু তিনি ক্রিকেটকে ব্যবহার করে টাকা রোজগার করতে চেয়েছিলেন, আজকের ক্রিকেটকর্তারা টাকা রোজগার করার জন্যে ক্রিকেটকে ব্যবহার করতে চান। কথায় বলে, মানুষের প্রয়োজনের শেষ আছে, লোভের শেষ নেই। মুনাফার লোভ তো অসীম। একবিংশ শতকে যে কোনো বড় ব্যবসার আর্থিক বছরের লক্ষ্য ঠিক হয় আগের বছরের মুনাফা অনুসারে। এ বছর আরও বেশি মুনাফাই লক্ষ্য। অতএব ক্রিকেটের ব্যবসায় ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়িয়ে চলাই লক্ষ্য। তাতে শুধু একদিনের ক্রিকেট নয়, সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই গোল্লায় গেলে ক্ষতি নেই। বরং গোল্লায় না পাঠালেই নয়।

আরও পড়ুন IPL auction: Where privilege holds court

তার জন্য জনমত তৈরি করার কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে পুরোদমে। ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে সাফল্যের মুখ দেখে ক্রিকেটজগতে বিলক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন রবি শাস্ত্রী। তিনি সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্ট চলাকালীন সম্প্রচার সংস্থার স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন, ক্রিকেটের ফুটবলের মতই ক্লাবভিত্তিক হয়ে ওঠা উচিত। ইংল্যান্ডের দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের পডকাস্টে বুধবার ফের একথা বলেছেন। যোগ করেছেন, বিশেষ করে টি টোয়েন্টিতে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট কমিয়ে ফেলা উচিত। শুধু বিশ্বকাপের সময়ে, আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোর সময়ে জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ক্রিকেট হওয়া উচিত। বাকি সময়টা দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট চলুক। তারপর, যেন টেস্ট ক্রিকেট বলে একটা বস্তু আছে সেকথা মনে পড়ায়, বলেছেন এমনটা করলে উপরের ছটা দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট খেলার জন্যে বেশি সময় পাওয়া যাবে। টেস্ট ক্রিকেটকে দুটো স্তরে ভাগ করে দেওয়া দরকার। নইলে দশ বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট বাঁচবে না। গোটা পডকাস্টের মধ্যে থেকে এই যে এক মিনিট তুলে টুইট করা হয়েছে, তাতেই কতগুলো চমকপ্রদ কথা!

পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা করার সাহস বোধহয় একমাত্র শাস্ত্রীরই আছে। তিনি এমন একটা খেলার সঙ্গে ক্রিকেটের তুলনা করেছেন যে খেলার একটাই ফরম্যাট – নব্বই মিনিট। সেই খেলার পথে হেঁটে নাকি টি টোয়েন্টি, টেস্ট, একদিনের ক্রিকেট – সবই বাঁচবে। উপরন্তু তিনি বলছেন দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, তাহলে নাকি টেস্ট খেলার সময় পাওয়া যাবে। বছরে মাসের সংখ্যা না বাড়ালে যে দুটো একইসঙ্গে কী করে সম্ভব তা তিনিই জানেন। সব দেশে সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নেই। পাকিস্তানের মত দেশে থাকলেও রাজনৈতিক কারণে ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান পিছিয়ে, তাই পাকিস্তান সুপার লিগের অদূর ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে আইপিএল বা বিগ ব্যাশের সমকক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাহলে ওই দেশগুলোতে ক্রিকেট বাঁচবে কী করে? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের দয়ায়? সে দয়ার বহর তো যথেষ্ট দেখা গেছে। আইসিসির রাজস্বের বেশিরভাগটা তাদেরই দিতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দেয় – এই যুক্তিতেই তো তারা চলে। নিজেদের মধ্যে ছাড়া অন্য দেশগুলোর সাথে এক সিরিজে দুটোর বেশি টেস্টও তারা খেলতে চায় না।

আসলে শাস্ত্রী যা বলেছেন তা আইসিসি তথা বিসিসিআই কর্তাদের মনের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যে ভবিষ্যৎ তিনি নির্দেশ করেছেন তা আরও সংকীর্ণ। ফলে মুনাফার ভাগীদার আরও কম, মুনাফার ভাগ বেশি। মুশকিল হল, ফুটবল খেলা হয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, ক্লাবও অসংখ্য। ক্রিকেট এখনো গোটা পনেরো দেশের খেলা। কর্তারা যে পথে যেতে চাইছেন তাতে ওই পনেরোও কমতে কমতে পাঁচে এসে ঠেকতে পারে। আরও ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি, সেই ভারতেও আসলে খেলাটা নয়, খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়। মাঠে, টিভির সামনে এবং মোবাইলের পর্দায় ভিড় হয় আন্তর্জাতিক তারকাদের টানে। আইপিএলের রমরমাও তাঁদের তারকাচূর্ণেই। ওটা বাদ গেলে কী হয়? ঘরোয়া ফুটবলের অবহেলিত প্রতিযোগিতা সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে মাঠ ভরে যায়, অনলাইন স্ট্রিমিং দ্যাখে কয়েক লক্ষ লোক। কিন্তু রঞ্জি ট্রফি ফাইনালের স্কোরের খবরও রাখে না বিশেষ কেউ। সুতরাং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দুয়োরানী হয়ে গেলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে মাতামাতি থিতিয়ে যেতে বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।

তবে ভবিষ্যৎ চিন্তা করার বদভ্যাস ক্রিকেটকর্তাদের নেই। শোনা যাচ্ছে অন্য দেশের লিগে দল কিনেছেন যাঁরা, তাঁদের চাপে আসন্ন সাধারণ সভায় বিসিসিআই নাকি ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিদেশের লিগে খেলার অনুমতি দিয়ে দিতে পারে। হয়ত এখনই শীর্ষস্থানীয়দের ছাড়া হবে না, সরাসরি বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ নন এমন ক্রিকেটারদের ছাড়া হবে। তা যদি ঘটে তাহলে ইতিমধ্যেই অবহেলিত ঘরোয়া ক্রিকেট আরও রক্তশূন্য হয়ে যাবে। বিপুল অর্থের হাতছানি উপেক্ষা করে কে পড়ে থাকবে জনশূন্য স্টেডিয়ামে চারদিন, পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার জন্য? তারপর শাস্ত্রীদের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের বাড়বাড়ন্তে টেস্ট ক্রিকেট তথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির ফ্যান্টাসি কী করে পূরণ হবে কে জানে!

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

ইংল্যান্ডের নতুন ক্রিকেট ভারতীয়দের যা শেখাল

১৯৯৬ বিশ্বকাপে একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ে সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনার জুটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরের কথা। একটা ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে দুরমুশ হওয়ার পর ভারত অধিনায়ক শচীন তেন্ডুলকরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আগে ব্যাট করে কত রান করলে এই শ্রীলঙ্কাকে হারানো যাবে বলে মনে হয়? শচীন অসহায়ের মত উত্তর দিয়েছিলেন, বোধহয় এক হাজার। গত মঙ্গলবার এজবাস্টনে পুরস্কার বিতরণের সময়ে যশপ্রীত বুমরার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, মার্ক বুচার যদি জিজ্ঞেস করতেন চতুর্থ ইনিংসে কত রানের লক্ষ্যমাত্রা দিলে ইংল্যান্ডকে হারানো যাবে বলে মনে হয়, তাহলে বুমরা শচীনের উত্তরটাই দিতেন। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে যদি কোনো দল ৩৭৮ রান মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে তুলে পঞ্চম দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই খেলা শেষ করে দেয়, তাহলে হেরে যাওয়া দলের অধিনায়ক এছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারেন? এজবাস্টনে যা ঘটেছে তা আরও বেশি চমকপ্রদ, আরও সুদূরপ্রসারী এই জন্যে যে টেস্টের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো দল পরপর চারটে ম্যাচ চতুর্থ ইনিংসে আড়াইশোর বেশি রান তুলে জিতল। এই রানগুলো যে গতিতে তোলা হয়েছে সেটাও টেস্ট ক্রিকেটে চট করে হয় না। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সাংবাদিক, সমর্থকরা আদর করে এই ধারার ব্যাটিংয়ের নাম দিয়েছেন ‘ব্যাজবল’ – দলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ডাকনাম ব্যাজ, সেই কারণে। ঘটনাটা যেহেতু একবার মাত্র ঘটেনি, পরপর চারবার ঘটে গেল, সুতরাং মানতেই হবে ব্যাজবল একটা নতুন ধারা। ব্যাজবল টেস্ট ক্রিকেটের প্রচলিত ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যতক্ষণ ইংল্যান্ডের বাইরে নানারকম পরিবেশে, নানারকম পিচে এ জিনিস করা হচ্ছে ততক্ষণ একে বিপ্লব বলা চলবে না ঠিকই। কিন্তু প্রয়াসটা যে বৈপ্লবিক তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই সহজ কথাটা মেনে নিতে কিন্তু ভারতীয়দের প্রচণ্ড অসুবিধা হচ্ছে। এজবাস্টন টেস্টের আগে থেকেই ইংল্যান্ড যা করছে তা যে নতুন কিছু নয়, তা ঠারেঠোরে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে সাধারণ দর্শক – সকলেই বলছিলেন। জোর গলায় ব্যাজবল নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি শুরু হয়ে যায় ঋষভ পন্থ ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংসে খেলে ফেলতেই। ইংল্যান্ড ব্যাটিং প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হওয়ায় তাচ্ছিল্যের মাত্রা বেড়ে যায়। জনি বেয়ারস্টোর একা কুম্ভের মত শতরানকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের দেখাদেখি ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও সিরিজ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন মাফিক ইংল্যান্ডকে ধোলাই দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লাস চলছিল। চতুর্থ দিন দুপুরে ভারত যখন ৩৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা খাড়া করে অল আউট হয়ে গেল, তখন আমরা কত অসাধারণ দল, আমাদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই ব্যাজবল কেমন অশ্বডিম্ব প্রসব করল – এসব উচ্চমার্গীয় আলোচনা চলছিল। কিন্তু বার্মিংহামে সন্ধে নামার আগেই গলা নামিয়ে ফেলতে হল সকলকে। বেয়ারস্টো আর ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস ফর্মে থাকলে তবেই ব্যাজবল খেলা সম্ভব – এমনটা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে বিশেষজ্ঞরা, তাঁরা দেখলেন ইংল্যান্ডের দুই নড়বড়ে ওপেনারই দারুণ আত্মবিশ্বাসে আক্রমণাত্মক ব্যাট করলেন। জ্যাক ক্রলি কিছুটা সাবেকি ওপেনারদের ঢঙে খেললেও অ্যালেক্স লিজ শামি, বুমরা, সিরাজ – সকলকেই আক্রমণ করলেন। বাঁহাতি ব্যাটারের অফস্টাম্পের বাইরে তৈরি হওয়া পিচের ক্ষত কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্র জাদেজা ভেলকি দেখাবেন বলে আশা ছিল। লিজ প্রথম ওভার থেকেই তাঁকে আক্রমণ করে সে আশায় জল ঢেলে দিলেন। সব মিলিয়ে ওভার পিছু পাঁচ রান করে নিয়ে ইংল্যান্ড একশো পেরিয়ে গেল। এরপর অস্থায়ী অধিনায়ক বুমরা দ্রুত দুটো উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা আশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অতঃপর যা ঘটল, তাকে ক্রিকেটের সাহেবি পরিভাষায় কী বলে সে কথা থাক, গোদা বাংলায় বলে দুরমুশ করা। ক্ষণেকের জন্য বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে জো রুট লিজের রান আউটের কারণ হয়ে না দাঁড়ালে হয়ত ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও হতভম্ব করার মত হত। যা-ই হোক, শেষপর্যন্ত রুট আর বেয়ারস্টো যথাক্রমে ৮২.০৮ আর ৭৮.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৩৪টা চার আর দুটো ছয় মেরে কার্য সমাধা করেছেন।

ভারতীয় পণ্ডিতরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। ম্যাচের পর স্টুডিওতে বসে সঞ্জয় মঞ্জরেকর মাথা নেড়ে বললেন এই ব্যাটিংটা ব্যাজবল নয়, এটা হল “সেন্সিবল ব্যাটিং”। মানে মোগলসরাইয়ের নাম দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর, টালিগঞ্জের নাম উত্তমকুমার। সঞ্জয় একা নন। ম্যাচটা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল; অজিত আগরকর, বীরেন্দর সেওয়াগ, ওয়াসিম জাফররা এখনো অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করতে যে ইংল্যান্ড নতুন কিছু আবিষ্কার করেনি। আপাতত যে তত্ত্বটি খাড়া করা হয়েছে, তা হল এমন ব্যাটিং তো ঋষভ পন্থই করে। এ আর নতুন কী? অনেকে ভিভ রিচার্ডস, সেওয়াগ, জয়সূর্য, অ্যাডাম গিলক্রিস্টেরও নাম করেছেন। পণ্ডিতদের (এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের ভক্তদের) বোঝানো দুঃসাধ্য যে কোনো একজন ব্যাটারের টেস্টে একদিনের ক্রিকেটের মেজাজে ব্যাটিং ব্যাজবল নয়, নতুন কিছুও নয়। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যানই তো একবার একদিনে ৩০০ রান করেছিলেন (১১ জুলাই ১৯৩০)। কিন্তু একটা আস্ত টেস্ট দলের ব্যাটিং কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য কিছু না ভেবে রান তাড়া করে যাওয়া, এক থেকে এগারো নম্বর, সবাই সেই নীতি মেনে ব্যাট করছে – এমনটা টেস্টের ইতিহাসে হয়নি। জো রুটের মত কপিবুক ব্যাটার নিয়মিত স্পিনারদের সুইচ হিট মারছেন, জোরে বোলারদের ব্যাট উল্টে স্লিপের মাথার উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ দলের পরিচালকরা এটাই চাইছেন। স্টোকস এজবাস্টনে টস জিতে বলেছিলেন, তাঁর দল রান তাড়া করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। টেস্ট ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়া হবে না প্রথমে ব্যাট করা হবে, তা ঠিক হচ্ছে পিচ বা আবহাওয়ার চরিত্র দেখে নয়, রান তাড়া করার পারদর্শিতা মাথায় রেখে – এ জিনিস অভূতপূর্ব। শুধু টেস্ট খেলা নয়, খেলাটাকে নিয়ে আলোচনা করার মানদণ্ডটাই তো বদলে দিল ইংল্যান্ড। ব্যাজবল বলুন বা অন্য কিছু বলুন, নামে কী আসে যায়? ব্যাজবলকে যে নামেই ডাকা হোক, তার সুগন্ধ কমে না। মুশকিল হল, আমরা ভারতীয়রা আর খেলার সুগন্ধ পাই না, সেটা সামরিক লড়াইসুলভ প্রতিহিংসার পূতিগন্ধে চাপা পড়ে যায়। আমাদের দলকে প্রত্যেক খেলায় জিততে হবে, আম্পায়ারের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে যেতে হবে। অন্যথা হলে আমাদের খেলোয়াড়রা দাঁত নখ বের করে ফেলেন, আমরাও গ্যালারিতে বা টিভির/মোবাইলের সামনে বসে ব্যাপারটা জাতীয় সংকট হিসাবে ধরে নিয়ে ফুঁসতে থাকি। প্রতিপক্ষের ভাল বোলিং বা ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাই যখন হারিয়ে গেছে, তাদের দলগত উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখে তারিফ করার ক্ষমতা আর থাকবে কী করে?

তবে প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কী বললেন; বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা কী টুইট করলেন আর তার প্রভাবে সাধারণ ক্রিকেটভক্তদের কী প্রতিক্রিয়া হল তা নিয়ে আলোচনার দরকার হত না, যদি না প্রতিপক্ষের অভিনবত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা খোদ ভারতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যেই দেখা যেত। এজবাস্টনে ভারত যেভাবে খেলেছে, তাতে মনে করা অমূলক নয় যে বুমরা আর কোচ রাহুল দ্রাবিড়ও ব্যাজবল ব্যাপারটাকে স্রেফ ইংরেজ মিডিয়ার অতিকথন বলেই ধরে নিয়েছিলেন। তাই তার জন্যে আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা করেননি। নইলে হু হু করে রান হয়ে যাচ্ছে দেখেও রানের গতি কমানোর জন্যে চতুর্থ দিন রক্ষ্মণাত্মক ফিল্ডিং সাজানো, রক্ষণাত্মক বোলিং করা হল না কেন? তাহলে কি ধরে নেওয়া হয়েছিল, কোনোভাবে কয়েকটা উইকেট ফেলতে পারলেই ইংল্যান্ড ম্যাচ বাঁচানোর কথা ভাববে, যেমনটা টেস্ট ক্রিকেটে চিরকাল হয়ে এসেছে? দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের ব্যাটিং দেখেও মনে হয়নি, তারা এমন একটা দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করছে যারা পরপর তিনটে টেস্টে ঝড়ের গতিতে আড়াইশোর বেশি রান তাড়া করে জিতেছে। চেতেশ্বর পুজারা ছাড়া আর কেউ যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করে ইংল্যান্ডের রান তোলার সময় কমিয়ে ফেলার কথা ভেবেছেন, এমন লক্ষণ দেখা যায়নি। ঋষভ যে সময়ে যে শট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আউট হলেন, তাতেও মনে হয় তাঁর ধারণা হয়েছিল যথেষ্ট রান উঠে গেছে। এরপর দ্রুত যা পাওয়া তা-ই বোনাস। এমনিতে ৩৭৮ রান যথেষ্ট বলে মনে হওয়া দোষের নয়। কিন্তু ভিডিও অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ ইত্যাদি বাহিনী সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট দল নিউজিল্যান্ড সিরিজের কথা জেনেও এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারল?

অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটে টেস্টে (দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ দুটো টেস্ট আর এজবাস্টন) চতুর্থ ইনিংসে বোলাররা চরম ব্যর্থ হওয়ার পর যে ভারতীয় বোলিংকে এতদিন পাইকারি হারে সর্বকালের সেরা তকমা দেওয়া হচ্ছিল, তাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। আসলে অন্ধ হলে যে প্রলয় বন্ধ থাকে না, সে কথাটা অন্য সব ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও আমরা অনেকদিন হল ভুলে থাকা অভ্যাস করেছি। তার ফল দেখে এখন মাথা চুলকোতে হচ্ছে। বোলারদের আর দোষ কী? ইংল্যান্ডের মত ফর্মে থাকা, জয়ের ছন্দে থাকা ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যদি আপনি তিনজন বোলার আর দুজন আধা অলরাউন্ডার নিয়ে খেলতে নামেন, তাহলে এমন ফল হওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন পিচ ম্যাচের শেষ দুদিনে বোলারদের যতটা সাহায্য করার কথা ততটা করল না।

তিনজন খাঁটি পেসারের সঙ্গে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মত একজন খাঁটি স্পিনারকে খেলানো হয়নি, খেলেছেন শার্দূল ঠাকুর আর রবীন্দ্র জাদেজা। এই একই কৌশল বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রীও নিয়েছিলেন ম্যাচের পর ম্যাচ। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে রোহিত শর্মা (এ ম্যাচে বুমরা)-দ্রাবিড় জুটিও একই কৌশল নিচ্ছে। জাদেজাকে আধা অলরাউন্ডার বললে অনেকে যারপরনাই রাগ করেন, কিন্তু সত্যিটা হল দেশের মাঠে তিনি একজন ম্যাচ জেতানো স্পিনার। কিন্তু বিদেশে ক্রিকেট খেলার সময়ে তিনি একজন শক্তিশালী ব্যাটার, যিনি সামান্য হাত ঘোরাতে পারেন। গত ৪-৫ বছরে বিদেশের মাঠে ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটার হলেন ঋষভ আর জাদেজা। ভারতের তিন, চার আর পাঁচ নম্বর সেই ২০১৮-১৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকেই নড়বড়ে। পুজারা, বিরাট আর অজিঙ্ক রাহানে যতগুলো ইনিংসে একসাথে সফল হয়েছেন তার চেয়ে বেশি ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন। উদ্ধার করেছেন নীচের সারির ব্যাটাররা। কখনো ঋষভ, কখনো বোলারদের সঙ্গে নিয়ে জাদেজা। অতএব উপরের তিনজনের ব্যর্থতা ঢাকতে তাঁর ব্যাটটা দরকার, তাতে বোলিং শক্তিতে যতই ঘাটতি হোক। একই কারণে বল হাতে তেমন সাফল্য না পেলেও হার্দিক পাণ্ড্যাকে এগারোটা টেস্ট খেলানো হয়েছিল। চোটের কারণে হার্দিক সরে যাওয়ার পর আনা হয়েছে শার্দূলকে। হার্দিকের তবু কিছুটা গতি ছিল, শার্দূলের তা-ও নেই। পিচ থেকে একেবারে সাহায্য না পেলে, প্রধান বোলাররা প্রথম দিককার উইকেটগুলো না নিতে পারলে শার্দূলের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মূলত বুমরা আর শামি দীর্ঘকাল দারুণ ফর্মে থাকায় এইসব ফাঁকফোকর ধরা পড়েনি। তাঁরা এখন প্রাকৃতিক নিয়মেই ফর্ম হারাচ্ছেন, আর ফাঁকগুলো বিরাট হাঁ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাহানেকে অনেক ব্যর্থতার পরে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুজারা আর বিরাট এখনো খেলে যাচ্ছেন। পুজারার কোনো ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই, তিনি সাদা বলের ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে পারেননি, আইপিএলও খেলেন না। তাই তাঁর যোগ্যতা নিয়ে তবু প্রশ্ন তোলা চলে। তিনি প্রথম একাদশ থেকে বেশ কয়েকবার বাদ গেছেন। উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা সিরিজেও বাদ পড়েছিলেন, কাউন্টি ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করে ফেরত আসতে হয়েছে। কিন্তু বিরাট হলেন অনির্বচনীয় গুণের আধার। ২০১৮-১৯ মরসুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে বিরাট বা পুজারা কেউই ধারাবাহিকভাবে রান করেননি। নভেম্বর ২০১৯ থেকে দুজনের পারফরম্যান্স পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে। প্রথম জনের গড় ২৯.৬৪, দ্বিতীয় জনের ২৮.৩১। কিন্তু দলে বিরাটের জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। সকলেই জানে, তিনি যে কোনো দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ৭১তম শতরানটি করে রানে ফিরবেন। ততদিন জাদেজা, শার্দূলরা তাঁর রানগুলো করে দেবেন না কেন?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

শাস্ত্রী-কোহলির দেখানো এই পথেই রাহুল-রোহিত হাঁটছেন যখন, তখন এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই ভারতীয় ক্রিকেটের ক্রমমুক্তি হবে নিশ্চয়ই। বছরের গোড়ায় যখন নতুন লোকেদের হাতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হল, তারপর সাঁইত্রিশ পেরনো ঋদ্ধিমান সাহাকে দ্রাবিড় জানিয়ে দিলেন তাঁর কথা আর ভাবা হবে না, তখন মনে হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট সত্যিই বদলাচ্ছে। কিন্তু এখন আবার সবাই চলতি হাওয়ার পন্থী। অফ ফর্মে থাকা বিরাট, সদ্য কোভিডের জন্য টেস্ট না খেলা অধিনায়ক রোহিত প্রমুখ বিশ্রাম নেবেন। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজে একদিনের ম্যাচে ভারতের অধিনায়কত্ব পাচ্ছেন সাঁইত্রিশের দিকে এগোনো শিখর ধাওয়ান।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

দেশপ্রেমিক সংগঠনে সন্ত্রাসবাদী স্লিপার সেল?

উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম, তালিব হুসেন শাহ, রিয়াজ আত্তারি – এদের মধ্যে মিল কোথায়? চারজনেই যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী তা তো নামগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপর? এরা কি সবাই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসবাদী, নাকি দেশপ্রেমিক? আলোচনা করা যাক।

প্রথম দুজন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন। দুজনেই প্রকাশ্য সভায় জনতাকে প্রতিবাদ করতে বলার অপরাধে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রয়েছেন। উমর নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন, শার্জিল অন্য পথের পথিক। কিন্তু দুজনেই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শার্জিলকে ওই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই দেওয়া দুটো বক্তৃতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ – তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছিলেন। উমরের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুজনের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আজ অব্দি প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ইউএপিএ আইনের দস্তুর অনুসারে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এরা কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই প্রমাণ জোগাড় করে যাওয়ার অধিকার আছে। তাই শার্জিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আর উমর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাস থেকে গরাদের পিছনে আছেন। জামিন খারিজ হয়েছে কিছু মামলায়, কোথাও জামিন হয়েছে, কোনোটার আবার শুনানিই হয়নি এখনো।

তৃতীয় ব্যক্তি তালিব ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবার অন্যতম কমান্ডার। তিনি জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা। গত রবিবার রেয়াসি জেলার টুকসানে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র সমেত ফয়জল আহমেদ দার বলে আরেকজনের সঙ্গে তিনি ধরা পড়েন বলে খবরে প্রকাশ। চতুর্থ ব্যক্তি রিয়াজ মানুষ খুনে অভিযুক্ত। রাজস্থানের উদয়পুরে কানহাইয়া লাল নামে একজনকে সে আর ঘাউস মহম্মদ নৃশংসভাবে খুন করে, সে দৃশ্যের ভিডিও তুলে সগর্বে শেয়ারও করে। এমন করার কারণ কী? কানহাইয়া হজরত মহম্মদ সম্পর্কে বিজেপির সাসপেন্ড হওয়া মুখপাত্র নূপুর শর্মার নোংরা মন্তব্যের সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করেছিলেন। রিয়াজ ও ঘাউসের মতে তা মহাপাপ। এ কাজে তাদের দুই স্যাঙাতের সন্ধানও পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।

রাজৌরির তালিব আর উদয়পুরের রিয়াজের মধ্যে একটা চমকপ্রদ মিল আছে। দুজনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিব নাকি বিজেপির জম্মু এলাকার মাইনরিটি মোর্চার সোশাল মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রেসিডেন্ট রবীন্দর রায়না তাঁকে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন, এমন ছবিও পাওয়া গেছে। দেশের প্রবল প্রতাপান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পিছনে অন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তালিব দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একখানা ছবি আছে বলেও জম্মু ও কাশ্মীরের কংগ্রেস দাবি করেছে। অন্যদিকে রিয়াজ যে উদয়পুরের বিজেপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারও একাধিক লক্ষণ দেখা গেছে। বিজেপির বক্তব্য রিয়াজ তাদের দলে ঢুকতে চাইতেন মাত্র, কিন্তু কানহাইয়া হত্যার বহু আগে থেকেই যে বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সাথে রিয়াজের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার একাধিক প্রমাণ সোশাল মিডিয়া থেকেই উঠে এসেছে।

এমন হতেই পারে যে সত্যিই দেশপ্রেমিক বিজেপি নেতারা কিছু বুঝতে পারেননি, সন্ত্রাসবাদীরা তাঁদের মধ্যে সুকৌশলে সেঁধিয়ে গেছে। গত দু-তিন দশকের হিন্দি সিনেমার মনোযোগী দর্শকদের বলে দিতে হবে না, স্লিপার সেল কী জিনিস। শত্রু সংগঠনে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে সেই সংগঠনের ক্ষতি করার কৌশল তো আরও পুরনো। অক্ষয় কুমারের ভক্তদের দায়িত্ব দিলে তো তাঁরা স্লিপার সেল চিহ্নিত করে তাদের শেষ করে দেওয়ার উপায়ও বাতলে দেবেন সম্ভবত। কিন্তু মুশকিল হল, বিজেপির মত এক নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দলের নেতারা বুঝতেই পারেননি এতবড় কাণ্ড হয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মত একজন জেমস বন্ডের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের শাসক দলে সন্ত্রাসবাদীরা দিব্যি ঢুকে পড়ছে – এ বড়ই চিন্তার বিষয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভরসা করেছিলাম। আমরা জানতাম তিনি পোশাক দেখলেই সন্ত্রাসবাদী চিনতে পারেন। তিনি পারেন আর তাঁর দলের অন্যরা পারেন না – এমন তো আমাদের জানা ছিল না! লেখার শুরুতেই একই পংক্তিতে দুজন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী আর একজন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর নাম করেছি, তার কারণ ওরকম নামের লোক মানেই যে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী, তা-ই আমাদের এতদিন শেখানো হয়েছে। কারা দেশদ্রোহী আর কারা দেশপ্রেমিক, তার স্পষ্ট তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু তালিব আর রিয়াজ ধরা পড়ায় সব যে গুলিয়ে গেল।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

তাহলে কি ধরে নিতে হবে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত উমর, শার্জিল, সিদ্দিক কাপ্পানের মত মুসলমান বা সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা, ভারভারা রাওয়ের মত হিন্দু এবং রোনা উইলসন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত খ্রিস্টানরাই শুধু নয়; ঘোষিত দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের উপস্থিতি আছে? না হয় স্লিপার সেলই হল। দুটো স্লিপার সেলের কথা জানা গেছে, এমন কত স্লিপার সেল যে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে তার সন্ধান দেবে কে? যে দেশদ্রোহীরা ধরা পড়েছে, তাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। গত বছর আজকের দিনেই তো পারকিনসন্স ডিজিজের রোগী স্ট্যান স্বামী শেষ কটা দিন জল খাওয়ার জন্য স্ট্র পর্যন্ত না পেয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর গতকাল শার্জিল আদালতকে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে ৮-৯ জন বন্দী তাঁকে মারধোর করেছেন, তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেশপ্রেমিক সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ভূতদের কী হবে?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: