মুখ্যমন্ত্রীর আরএসএস: বিশ্বাসে মিলায় বস্তু

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কেবল গুণী মানুষ নন, তাঁর প্রতিভা বহুমুখী। তিনি সাহিত্য রচনা করেন, ছবি আঁকেন, গান লেখেন। তার উপর রাজ্যের প্রশাসন চালাতে হয়। একজন মানুষকে এত কাজ করতে হলে কাগজ পড়ার সময়ের অভাব ঘটা খুবই স্বাভাবিক। নিশ্চয়ই প্রতিদিন কাগজ পড়ার সময় মুখ্যমন্ত্রী পান না। পেলে চোখে পড়ত কলকাতা থেকে প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের একটা খবর, যার শিরোনাম ‘RSS yet to clear air on bombing claim affidavit’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের মিডিয়া বিভাগের প্রধান পবন খেরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) এক প্রাক্তন প্রচারকের মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেলা ও সেশনস আদালতে জমা দেওয়া হলফনামা প্রকাশ্যে এনেছেন। সেই হলফনামায় যশবন্ত শিন্ডে নামক ওই লোকটি দাবি করেছে, সংঘ পরিবারের সদস্য সংগঠনগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সংবাদমাধ্যমের একাংশ এবং পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় তার দোষ মুসলমান সম্প্রদায়ের ঘাড়ে চাপিয়েছে। ফলে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি লাভবান হয়েছে।

খবরটা মুখ্যমন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে গিয়ে থাকতেই পারে, কারণ এ নিয়ে কোনো চ্যানেলে কোনো বিতর্কসভা বসেনি। কলকাতার অন্যান্য তথাকথিত উদার খবরের কাগজগুলোতেও আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হবে এই খবর। তাছাড়া কংগ্রেস তো বানিয়েও বলতে পারে। কারণ তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে বিজেপির প্রধান বিরোধী হয়ে উঠতে দিতে চায় না। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর শক্তিশালী সোশাল মিডিয়া টিম আছে। টুইটারে তাঁর সাত মিলিয়ন ফলোয়ার, ফেসবুকে ৪.৯ মিলিয়ন। সেই সোশাল মিডিয়া টিমের সাহায্য নিলেই মুখ্যমন্ত্রী জানতে পারবেন যে ওই মর্মে হলফনামা সত্যিই ফাইল করা হয়েছে। চাইলে স্বয়ং যশবন্তের মুখ থেকেই হলফনামায় লিখিত অভিযোগগুলো সংক্ষেপে শুনে নিতেও পারবেন। মারাঠি যশবন্তের ভিডিও ইংরেজি সাবটাইটেল সমেত সোশাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

যশবন্তের হলফনামার কথা প্রকাশ্যে এল বৃহস্পতিবার, কলকাতার কাগজের প্রথম পাতায় সে খবর বেরোল শুক্রবার সকালে। সেদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী বললেন “আরএসএস এত খারাপ ছিল না, এবং এত খারাপ বলে আমি বিশ্বাস করি না।” মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই খবরটা জানতে পারেননি বলেই ওরকম বলেছেন। স্বীকার্য যে যশবন্তের কথাগুলো অভিযোগ মাত্র। কিন্তু যে সংগঠনের একদা প্রচারকরা এই মুহূর্তে দেশের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী – তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ যে মারাত্মক, সে কথা না বোঝার মত রাজনীতিবিদ মমতা ব্যানার্জি নন। তাছাড়া তিনদিন হয়ে গেল, এখন পর্যন্ত আরএসএস যশবন্তকে মিথ্যাবাদী বলে কোনো বিবৃতি দেয়নি। অবশ্য জবাবদিহি না চাইলে বিবৃতি দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ২০০৬ সালের নানদেড় বিস্ফোরণ কাণ্ডে সরকারি সাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হতে চেয়ে আবেদন করেছিল যশবন্ত। আদালত সবেমাত্র সেই আবেদন গ্রহণ করেছে, আরএসএসকে জবাবদিহি করতে তো ডাকেনি। সাংবাদিকদেরই বা ঘাড়ে কটা মাথা, যে এ নিয়ে মোহন ভাগবতকে প্রশ্ন করবে? অতএব আরএসএসের বয়ে গেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা বলে ঘোষণা করতে। কথায় আছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর। মুখ্যমন্ত্রী তো বিশ্বাসই করেন না আরএসএস খারাপ। ফলে যতক্ষণ তারা নিজেরা না বলছে “হ্যাঁ, আমরা খারাপ”, মুখ্যমন্ত্রী নিশ্চিন্ত। কিন্তু খটকা অন্যত্র।

“এত খারাপ ছিল না”। এত খারাপ মানে কত খারাপ? তার মানে মুখ্যমন্ত্রী জানেন যে আরএসএস একটু একটু খারাপ? সেই পরিমাণটা কি তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক? খারাপ ছিল না মানেই বা কী? আগে যতটুকু খারাপ ছিল তাতে তাঁর আপত্তি ছিল না, এখন বেশি খারাপ হয়ে গেছে – এ কথাই কি বলতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী? তাঁর কাছে কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ তা অবশ্য আমাদের জানা নেই। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা কি খারাপ? সে হত্যায় আরএসএস যোগ প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ হয়নি বটে, তবে সেই ঘটনার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছিলেন, আরএসএস নেতাদের ভাষণগুলো যে বিষ ছড়িয়েছে তারই পরিণতি গান্ধীহত্যা। তাই ভারত সরকার আরএসএসকে নিষিদ্ধ করে। কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জওহরলাল নেহরুর বদলে যিনি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারত সোনার দেশ হত বলে আরএসএস এখন দিনরাত ঘোষণা করে। মুখ্যমন্ত্রী নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন, তাই ধরে নিচ্ছি অতকাল আগের ব্যাপার তাঁর মনে নেই। তাই তার ভালমন্দ ভেবে দেখেননি। তবে যেহেতু তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী এবং নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করেন, সেহেতু ধরে নিতে দোষ নেই যে যশবন্ত শিন্ডে তার হলফনামায় যে ধরনের কার্যকলাপের কথা লিখেছে সেগুলো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর চোখে খারাপই। কারণ কাজগুলো বেআইনি এবং সাম্প্রদায়িক।

এখন কথা হল, যশবন্ত যে অভিযোগ করেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে, সে অভিযোগও কিন্তু এই প্রথম উঠল তা নয়। মুখ্যমন্ত্রী কাগজ পড়ারই সময় পান না যখন, বই পড়ার সুযোগ না পাওয়ারই কথা। তবে তাঁর তো পড়ুয়া পারিষদের অভাব নেই। তাঁরা কেউ কেউ নির্ঘাত মহারাষ্ট্র পুলিসের প্রাক্তন ইন্সপেক্টর জেনারেল এস এম মুশরিফের লেখাপত্র পড়েছেন। তাঁর লেখা আরএসএস: দেশ কা সবসে বড়া আতঙ্কবাদী সংগঠন বইতে ২০০৭ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত মোট ১৮টা বোমা বিস্ফোরণে আরএসএস, অভিনব ভারত, জয় বন্দেমাতরম, বজরং দল এবং সনাতন সংস্থা – এই পাঁচটা হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে দায়ী করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর পার্ষদরা কেন যে এসব কথা তাঁকে জানাননি! জানলে নিশ্চয়ই আরএসএস খারাপ “ছিল না” – একথা মুখ্যমন্ত্রী অতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে বলতেন না। অবশ্য মুশরিফ যা লিখেছেন তার সমস্তই তো স্রেফ অভিযোগ। মালেগাঁও বিস্ফোরণের প্রধান অভিযুক্ত সাধ্বী প্রজ্ঞা যেভাবে ছাড়া পেয়ে সাংসদ হয়ে গেছেন, তাতে ওসব অভিযোগকে আর আমল দেওয়া চলে কিনা সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে আরএসএসের উপর অত্যন্ত জোরালো বিশ্বাস না থাকলে এসব জেনে সংঘ পরিবারের সদস্য নয় এমন এক রাজনৈতিক দলের সর্বময় নেত্রীর কিছুটা সন্দিহান হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের বিশ্বাসে অটল।

রাজনীতিতে দুজন ব্যক্তি, দুটো সংগঠন বা একজন ব্যক্তির সঙ্গে একটা সংগঠনের সম্পর্ক চোখ বন্ধ করে ভরসা করার মত পর্যায়ে পৌঁছনো চাট্টিখানি কথা নয়। বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর ইতিহাস না থাকলে তেমনটা হওয়া শক্ত। সেদিক থেকে মমতার আরএসএসের প্রতি এই বিশ্বাস বুঝতে অসুবিধা হয় না। আজকের মুখ্যমন্ত্রী গত শতকের শেষ দশকে যখন ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন এককালের স্বয়ংসেবক অটলবিহারী বাজপেয়ী আর লালকৃষ্ণ আদবানির স্নেহ না পেলে মমতার পক্ষে আস্ত একখানা রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব হত কি? হলেও সদ্যোজাত দলটাই মধ্যগগনে থাকা সিপিএম তথা বামফ্রন্টের বিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষমতা রাখে – এ বিশ্বাস কংগ্রেসের ভোটার তথা কর্মীদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করা যেত কি? মাত্র আটজন সাংসদ যে দলের, সেই দলের নেত্রীকে রেল মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের প্রভাবিত করার মহার্ঘ সুযোগ দিয়েছিল বিজেপি। শুধু কি তাই? তেহেলকা কাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরেই সততার প্রতীক মমতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এনডিএ ত্যাগ করেন। তা সত্ত্বেও ২০০৩ সালে তাঁকে দপ্তরহীন মন্ত্রী করে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। আরএসএস আর বিজেপি আলাদা – এই তত্ত্বে এখনো বিশ্বাস করেন যাঁরা, তাঁদের কথা আলাদা। বাকিরা নিশ্চয়ই মানবেন, এভাবে পাশে থাকার পরেও যদি মমতা আরএসএসকে বিশ্বাস না করতেন তাহলে ভারি অন্যায় হত।

আসলে মমতার আরএসএসে বিশ্বাস ততটা অসুবিধাজনক নয়। তাঁর বারংবার আরএসএস প্রীতি ঘোষণা সত্ত্বেও দেশসুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের কেষ্টবিষ্টুদের মমতায় বিশ্বাস বরং বৃহত্তর বিপদের কারণ। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে যখন বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানোই মূল এজেন্ডা হয়ে দাঁড়াল, তখন বামপন্থীদের মধ্যে লেগে গেল প্রবল ঝগড়া। সিপিএম নেতৃত্বাধীন বাম দলগুলো বলতে শুরু করল বিজেপি আর তৃণমূল অভিন্ন, তাই তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপিকে ভোট দেওয়া একই কথা। উঠে এল একটা নতুন শব্দ – বিজেমূল। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা বলতে লাগল, যেখানে যে প্রার্থী বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী তাকে ভোট দিতে। বিজেমূল তত্ত্বের প্রমাণ হিসাবে সিপিএম “দলে থেকে কাজ করতে পারছি না” বলে লাইন দিয়ে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়া শীর্ষস্থানীয় নেতা, মন্ত্রীদের দেখাতে লাগল। আর যত না তৃণমূল, তার চেয়েও বেশি করে নকশালরা তার জবাবে তালিকা দিতে থাকল, কোন ব্লক স্তরের সিপিএম নেতা বিজেপিতে গেছে, কোন জেলা স্তরের নেত্রী বিজেপিতে যোগ দিলেন। অর্থাৎ দুপক্ষের কেউই তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতি কী, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা থাকলে কেন আছে বা না থাকলে কেন নেই – সে আলোচনায় গেল না। অথচ ঠিক তখনই ইন্ডিয়া টুডে কনক্লেভে বসে লাইভ অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন “আমি সংঘ পরিবারের বিরুদ্ধে লড়ছি না। ওরা তো নির্বাচনে লড়ে না। ওরা বিজেপিকে সমর্থন করে। আমি লড়ছি বিজেপির সঙ্গে।” এই নেত্রীর দল জয়যুক্ত হল, একমাত্র বিরোধী দল হিসাবে উঠে এল বিজেপি। অর্থাৎ ঘোষিতভাবে আরএসএসের বন্ধু দুটো দলের হাতে চলে গেল বাংলার আইনসভা। অথচ পশ্চিমবঙ্গের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিমানরা উল্লসিত হয়ে ঘোষণা করলেন, বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য জিতে গেল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ জিতে গেলেন, ইত্যাদি।

আরও মজার কথা, নির্বাচনে গোল্লা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিপিএমও পরিত্যাগ করল বিজেমূল তত্ত্ব। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বছর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দেশের একমাত্র যে নেতা সর্বদা নাম করে আরএসএসকে আক্রমণ করেন, সেই রাহুল গান্ধীর দল কংগ্রেস থেকে শুরু করে সিপিএম, লিবারেশন সমেত সমস্ত বাম দল সমর্থন করে বসল মমতার পছন্দের প্রার্থীকে। সে আরেক যশবন্ত – বিজেপি থেকে তৃণমূলে এসেছেন। এ থেকে যা প্রমাণিত হয় তা হল, মমতার মত আরএসএস-বান্ধব নয় যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো, তারাও ব্যাপারটাকে নির্বাচনী লড়াইয়ের বেশি কিছু ভাবে না।

আরএসএসের কাছে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলা মতাদর্শগত মরণপণ লড়াই। সে লক্ষ্যে পৌঁছতে তারা সাংবিধানিক, অসাংবিধানিক – সবরকম পথই নিতে রাজি। প্রয়োজনে আদবানির মত আগুনে নেতাকে বঞ্চিত করে বাজপেয়ীর মত নরমপন্থীকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি ছিল। জমি শক্ত হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর মত কড়া হিন্দুত্ববাদীকে নেতা করেছে, ভবিষ্যতে তাঁকেও আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে আরও গোঁড়া আদিত্যনাথকে সর্বোচ্চ নেতার আসনে বসাতে পারে। বিরোধীরা ওই বিস্তারে ভেবেই উঠতে পারেনি এখনো। এমনকি তথাকথিত কমিউনিস্ট দলগুলোও কেবল স্ট্র্যাটেজি সন্ধানে ব্যস্ত। কোথায় কাকে সমর্থন করলে বা কার সাথে নির্বাচনী জোট গড়লে বিজেপির ক্ষমতায় আসা আটকানো যাবে – এটুকুই তাদের চিন্তার গণ্ডি। সে কারণেই বিজেমূল শব্দটা নির্বাচনের আগে ভেসে ওঠে, পরাজয়ের পর মিলিয়ে যায়। যদি সিপিএমের পক্ষ থেকে সংঘমূল কথাটা বলা হত এবং শূন্য হয়ে যাওয়ার পরেও বলে যাওয়া হত, তাহলে জনমানসে সত্যি সত্যি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হতে পারত। হিন্দুরাষ্ট্র কী, তা হওয়া আটকানো কেন দরকার, আটকানোর ক্ষেত্রে মমতাকে সত্যিই প্রয়োজন, নাকি তিনি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া – শতকরা ৮০-৯০ জন মানুষ এই মুহূর্তে এসব নিয়ে ভাবছেন না (সোশাল মিডিয়া দেখে যা-ই মনে হোক)। সংঘ পরিবারকে সরাসরি রাজনৈতিক ভাষণে, কর্মসূচিতে আক্রমণ করা হলে ভাবতে বাধ্য হতেন।

বিহারে বিজেপিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ আসা মাত্রই সমস্ত বাম দল একজোট হয়ে নীতীশকুমারকে সমর্থন করেছে। কেবল লিবারেশন নয়, সিপিএমও। সে জোটে কংগ্রেসও আছে। অথচ নীতীশও মমতার মতই বিজেপির সঙ্গে ঘর করেছেন। শুধু তা-ই নয়, মমতার বিজেপির সাথে শেষ জোট ছিল ২০০৬ সালে। নীতীশ কিন্তু ২০১৬ বিধানসভা ভোটে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সঙ্গে লড়ে জিতেও বিশ্বাসঘাতকতা করে বিজেপির কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। কেন নীতীশ আরএসএস-বিরোধী বাম দল এবং কংগ্রেসের কাছে গ্রহণযোগ্য আর কেন মমতা নন, তা নিয়ে কোনো আলোচনাই শুনলাম না আমরা। আলোচনাটা হল না সম্ভবত এইজন্যে, যে বামেরা বা কংগ্রেস নিজেরাই ওসব নিয়ে ভাবে না। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলেই খুশি, শেষমেশ আরএসএসের প্রকল্পই সফল হয়ে যাবে কিনা তা ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। অথবা ‘যখন হবে তখন দেখা যাবে’ নীতি নিয়ে চলছে।

আসলে কিন্তু মমতায় আর নীতীশে তফাত বড় কম নয়। নীতীশ সুযোগসন্ধানী, ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদ। তারই অনিবার্য ফল হিসাবে ভূতপূর্ব জনতা দলের সঙ্গে, একদা সতীর্থ লালুপ্রসাদের সাথে তাঁর বিচ্ছেদ হয়েছিল। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সূতিকাগার হল সমাজবাদী রাজনীতি, নিম্নবর্গীয় মানুষের রাজনীতি। সে কারণেই নীতীশ কখনো বিজেপিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেননি, বিজেপিও পারেনি। নীতীশ কখনো মমতার মত সোচ্চার আরএসএস বন্দনাও করেননি। কারণ আরএসএস হল ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরিচালিত, হিন্দু সমাজের উপর ব্রাহ্মণ আধিপত্য বজায় রাখার জন্য গঠিত সংস্থা। নীতীশের দলের নিম্নবর্গীয় সদস্য, সমর্থকদের সঙ্গে আরএসএসের আড়চোখে দেখার সম্পর্কটুকুই হওয়া সম্ভব। তার বেশি নয়।

অন্যদিকে মমতা ব্রাহ্মণকন্যা। তাঁকে দুর্গা বলে সম্বোধন করতে আরএসএসের কোথাও বাধে না। মমতার রাজনীতির ইতিহাস অন্য দিক থেকেও নীতীশের সঙ্গে মেলে না। বস্তুত যুগপৎ কংগ্রেস বিরোধিতা এবং কমিউনিস্ট বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত মমতা ছাড়া ভারতের কোনো আঞ্চলিক দলের নেই। তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় রাজনীতির ভিত্তিতে তৈরি দলগুলোর স্বভাবতই প্যাথোলজিকাল বাম বিরোধিতা নেই, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বিরোধিতা ছিল। তেলুগু দেশম, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি, জগন্মোহন রেড্ডির দল বা ওড়িশার বিজু জনতা দলের জন্ম তৃণমূলের মতই কংগ্রেস ভেঙে। কিন্তু তাদেরও বামেদের সাথে ধুন্ধুমার সংঘাতের ইতিহাস নেই। তাদের এলাকায় বামেদের দুর্বলতা তার কারণ হতে পারে, কিন্তু এ কি নেহাত সমাপতন যে বিন্ধ্য পর্বতের উত্তর দিকে আরএসএস বাদ দিলে তৃণমূলই একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি, কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেস, দু পক্ষই যাদের ঘোষিত শত্রু? লক্ষণীয়, ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল আর কংগ্রেসের জোট গড়তে দারুণ উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছিলেন প্রণব মুখার্জি। তাঁর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দেখা গেল, তিনি আরএসএসের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। সেই জোট বামফ্রন্টকে হারাতে পেরেছিল বটে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের ভাঙনের গতিও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তাহলে আরএসএসের সাথে সম্পর্ক মমতাকে কী কী দিয়েছে তা বোঝা গেল। এবার আরএসএস কী কী পেয়েছে সে আলোচনায় আসা যাক? রাজনীতিতে তো কেউ “আমি   নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি,/ তুমি   অবসরমত বাসিয়ো” গায় না। আরএসএস যা যা পেয়েছে সবকটাই অমূল্য।

১) আরএসএসের দুই ঘোষিত শত্রু মুসলমান আর কমিউনিস্ট। তৃণমূলের উদ্যোগে কমিউনিস্টরা প্রথমে তাদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি থেকে ক্ষমতাচ্যুত, পরে ছত্রভঙ্গ হয়েছে। তার জন্যে আরএসএসের আগমার্কা কোম্পানি বিজেপিকে বিন্দুমাত্র কসরত করতে হয়নি। মুসলমানরা আগে প্রান্তিক ছিলেন, তৃণমূল আমলে বাংলার হিন্দুদের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত হয়ে গেছেন। মমতা প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ইমাম ভাতা চালু করলেন, বিজেপি প্রায় বিনা আয়াসেই হিন্দুদের বোঝাতে সক্ষম হল, মুসলমানরা মমতার দুধেল গাই। পরে মমতা নিজেই অনবধানবশত (নাকি সচেতনভাবেই?) সেকথা বললেনও। এখন পরিস্থিতি এমন, যে বাম আমলে মুসলমানরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়ি ভাড়া পেতেন না, এখন খোদ সল্টলেকে হোটেলের ঘর ভাড়া পান না।

২) মুসলমান তোষণ হচ্ছে – এই প্রোপাগান্ডা হিন্দুদের একটা বড় অংশের বদ্ধমূল ধারণায় পরিণত হয়েছে তৃণমূল শাসনের ১১ বছরে। ইতিমধ্যে বেলাগাম হিন্দু তোষণ চলছে। বিজেপি আজগুবি অনলাইন প্রচার শুরু করল “পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপুজো করতে দেওয়া হয় না”, তৃণমূল সরকার দুর্গাপুজোগুলোকে নগদ অনুদান দিতে শুরু করল। আরএসএস শুরু করল রামনবমীতে অস্ত্র মিছিল, তৃণমূল আরম্ভ করল বজরংবলী পুজো। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরির পথ খুলে গেল, আরএসএসের প্রতিশ্রুতি পূরণ হল। এদিকে দিদি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা নিলেন। রাজ্যে বিজেপির সরকার থাকলেও এভাবে হিন্দুত্বকে রাজনীতির এজেন্ডায় নিয়ে আসতে পারত কিনা সন্দেহ।

৩) ভারতের একেক রাজ্যের একেকটা বিশিষ্ট গুণ আছে, যা সেই রাজ্যের মানুষের মূলধন। গুজরাটের যেমন ব্যবসা, পাঞ্জাবের কৃষিকাজ। বাংলার ছিল লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা ইত্যাদি। অন্য রাজ্যের লোকেরা যাকে কটাক্ষ করে এককথায় বলে কালচার। এই কালচার আরএসএসের হিন্দুত্বের একেবারে বিপরীত মেরুর জিনিস। তৃণমূল আমলে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে সাড়ে সর্বনাশ ঘটানো গেছে এই কালচারের। বাংলার ছেলেমেয়েরা ফড়ফড় করে ইংরেজি বলতে না পারলেও দেশে বিদেশে গবেষক, অধ্যাপক হিসাবে তাদের দাম ছিল। এখনো সর্বভারতীয় বিজ্ঞান পুরস্কারগুলোর প্রাপকদের তালিকা মাঝে মাঝে সেকথা জানান দেয়। সে দাম ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে স্কুল, কলেজের চাকরি বিক্রি করে লেখাপড়া লাটে তুলে দিয়ে। নায়ক, নায়িকা, গায়ক, গায়িকারা কাতারে কাতারে বিধায়ক আর সাংসদ হয়ে গেছেন। লেখকরা ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলি দিতে আর চরণামৃত পান করতে। সিনেমার কথা না বলাই ভাল। শৈল্পিক উৎকর্ষ বাদ দিন, পারিশ্রমিকের হাল এত খারাপ যে কলকাতার শিল্পীরা স্রেফ বাংলা ছবিতে, ওয়েব সিরিজে কাজ করে টিকে থাকতে পারবেন কিনা সন্দেহ। মন্ত্রীর বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়ার ছবি দেখে প্রথম সারির অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য হা-হুতাশ করছেন, ওই পরিমাণ টাকার অর্ধেক পেলেও বাংলা ছবিগুলো অনেক ভাল করে করা যেত।

কিন্তু এসব গোল্লায় যাওয়ার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে। লেখাপড়া, গানবাজনা, সাহিত্য, সিনেমা মিলিয়ে যে বাঙালি মনন ছিল সেটাই নষ্ট হয়ে গেছে। আসল ক্ষতি সেটা। বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের অন্তত একটা ভান ছিল, যে সে ভারতের অন্য অনেক রাজ্যের লোকেদের মত ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে না। দুর্গাপুজো এলে কদিন পাগলামি করে; নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো, সত্যনারায়ণের সিন্নি চলে। কিন্তু বাইরে সে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। এখন সেসব গেছে। নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি হলে তার গায়ে খোদাই করা হচ্ছে গণেশের মুখ, শিবলিঙ্গ বা স্বস্তিকা। কলিং বেলে বেজে উঠছে “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ”। অক্ষয় তৃতীয়ায় এখনো গণেশপুজো এবং হালখাতা হয় এমন দোকান খুঁজে পাওয়া দায়, অথচ গণেশ চতুর্থী এক দশকের মধ্যে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। শিগগির পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনন্ত ছুটির তালিকায় যোগ হবে নির্ঘাত। অল্পবয়সী বাঙালি কথা বলছে হিন্দি মিশিয়ে, ছোটরা স্কুলে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে শিখছে হিন্দি। বঙ্গভঙ্গের নাম করতেই লর্ড কার্জনের ঘুম কেড়ে নেওয়া বাঙালি নিজে নিজেই প্রায় উত্তর ভারতীয় হিন্দু হয়ে গেল তৃণমূল আমলে। এই সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশ তামিলনাড়ুতে কিছুতেই হয়ে উঠছে না আরএসএসের দ্বারা। কেরালায় মার খেতে হচ্ছে, এমনকি নিজেদের হাতে থাকা কর্ণাটকেও করতে গিয়ে অনবরত সংঘাত হচ্ছে। বাংলায় কিন্তু ওসবের দরকারই হচ্ছে না। বিনা রক্তপাতে বাঙালি বাঙালিয়ানা বিসর্জন দিচ্ছে।

আরও পড়ুন শাহেনশাহ ও ফ্যাসিবিরোধী ইশতেহার

এর বেশি আর কী চাইতে পারত আরএসএস? মমতা হিন্দুরাষ্ট্রের জন্য রুক্ষ, পাথুরে বাংলার মাটিতে হাল চালিয়ে নরম তুলতুলে করে দিয়েছেন। বীজ বপনও সারা। ফসল তোলার কাজটা শুধু বাকি।

ফিফা থেকে নির্বাসন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মাত্র

এমন কি হতে পারে যে ফিফা সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে (এআইএফএফ) নির্বাসন দেওয়ায় কোনো ভারতীয় খুশি হয়েছে? খেলোয়াড় বা ফুটবলপ্রেমীদের খুশি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ক্লাবকর্তারাই বা খুশি হবেন কী কারণে? এমনিতেই তো ইন্ডিয়ান সুপার লিগের বাইরের ক্লাবগুলো ধুঁকছে। তার উপর ফিফার নির্বাসন মানে ফিফা থেকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) মারফত যা টাকাকড়ি এআইএফএফের কাছে আসত তা-ও বন্ধ থাকবে। ফলে ছিটেফোঁটা যা চুঁইয়ে পড়ত ক্লাবগুলোর দিকে, সে পথও বন্ধ হয়ে যাবে। স্পনসরদেরও খুশি হওয়ার কারণ নেই। স্পনসর মানে মোটের উপর আইএসএলের স্পনসরদের কথাই ধরতে হবে, কারণ তার বাইরে ভারতীয় ফুটবলে আগ্রহী স্পনসর পাওয়া বেশ কঠিন। নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতের আর সব ফুটবল প্রতিযোগিতার মত আইএসএলও হয়ে গেল ফিফার অনুমোদনহীন লিগ। অর্থাৎ আগামী জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতে নতুন করে বিদেশি ফুটবলার আর নেওয়া যাবে না। বিদেশিরাই যে আইএসএলের জাঁকজমকের অর্ধেক, তাতে সন্দেহ নেই। তাহলে এই নির্বাসনে খুশি হতে পারে কে?

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় কেউ না। কিন্তু ভারত হল রামায়ণ-মহাভারতের দেশ। এখানে গল্পের মধ্যে গল্প, তার মধ্যে গল্প, সে গল্পের মধ্যেও আরেকখানা গল্প থাকে। এখানে আপাতদৃষ্টির ধোঁকা খাওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং হতেই পারে যে একদল ফুটবল প্রশাসক এই নির্বাসনে খুশিই হয়েছেন। দেশের ফুটবল এতে গোল্লায় গেলেও তাঁদের কিছু যায় আসে না। ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনকে পৈতৃক জমিদারি বানিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই জমিদারি হাতছাড়া হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। তখনই তাঁরা হুমকি দিয়েছিলেন, আদালত দেশের ফুটবল প্রশাসনে হস্তক্ষেপ করলে ফিফা এ দেশের ফেডারেশনকে ব্যান করে দিতে পারে। সেই হুমকি ফলে যাওয়ায় আজ তাঁরা বাঁকা হাসতেই পারেন, মনে মনে বলতেই পারেন “দ্যাখ কেমন লাগে।” এই তাঁরা কারা? রহস্য করবার দরকার নেই, কারণ দেশের আপামর ফুটবলপ্রেমী জানেন প্রফুল প্যাটেল আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরাই আইনত মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার পরেও এআইএফএফ এক্সিকিউটিভ কমিটি আলো করে বসেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের গুঁতোয় আসনচ্যুত হওয়ার পর এবার যদি তিনি প্রফুল্ল অন্তরে এস্রাজ বাজান তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আদালতের নির্দেশে ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদ হারালেও প্রফুল কিন্তু এখনো ফিফায় ভারতের প্রতিনিধি। ফলে কোনো কোনো মহল থেকে এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে, যে ফিফার সিদ্ধান্তে তাঁর হাত আছে। কিন্তু ঘটনা হল, এর জন্য প্রফুলকে খুব একটা দায়ী করা চলে না। ফিফা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির (আইওসি) সনদে স্বাক্ষরকারী। সেই সনদ অনুযায়ী বিশ্বের কোনো দেশের কোনো খেলার জাতীয় ফেডারেশনে সরকার বা কোনো তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করলে সেই ফেডারেশনের অনুমোদন বাতিল করা হয়। সুতরাং যে মুহূর্তে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কমিটি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর্স (সিওএ) গঠন করে ফেডারেশনের দায়িত্ব তাদের হাতে দিয়েছে, সেই মুহূর্তেই নির্বাসনের সম্ভাবনা তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

১৬ অগাস্ট সিওএ যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে বলা হয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত তাদের অবাক করেছে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, ভারত সরকারের জাতীয় ক্রীড়া বিধি মেনে নতুন এক্সিকিউটিভ কমিটি গঠনের জন্য নির্বাচনের কাজ দ্রুত এগোচ্ছিল এবং এই প্রক্রিয়া নিয়ে অনবরত ফিফা, এএফসি সহ সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চলছিল। উপরন্তু, ২৫ জুলাই ফিফা-এএফসি এআইএফএফের অ্যাক্টিং সেক্রেটারি জেনারেলকে যে চিঠি দিয়েছিল প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে, সেই চিঠির সুপারিশ মেনে স্ট্যাটিউটে বদলও করা হয়েছে। কিন্তু ২৫ জুলাইয়ের চিঠিটি পড়লে সিওএ-র যুক্তি অসার বলে মনে হবে। কারণ ওই চিঠিতে প্রস্তাবিত স্ট্যাটিউট সম্পর্কে ফিফা-এএফসি কিছু আপত্তি প্রকাশ করেছিল। সেই আপত্তিগুলোতে বিশেষ আমল দেওয়া হয়নি, কোনো মতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৫ অগাস্ট সাসপেনশনের চিঠিতে ফিফা সেকথাই উল্লেখ করেছে।

তবে এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। ফিফা কাউন্সিল নির্বাসনের সিদ্ধান্ত জানানোর পাশাপাশিই বলেছে, ভারত সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছে এবং আশাবাদী যে সমস্যা মিটে যাবে। আসলে এই সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক ফলগুলোর অন্যতম হল অক্টোবর মাসে এ দেশে যে মেয়েদের অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল বিশ্বকাপ হওয়ার কথা, তা বাতিল হয়ে যাওয়া। সেটা হলে এ দেশের মেয়েদের ক্ষতি, ফিফাও তেমনটা চায় না। এমনকি ভারত সরকারও চায় না। সবেমাত্র স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নারী অধিকার নিয়ে একগাদা ভাল ভাল কথা বলেছেন, এখনই মহিলাদের বিশ্বকাপ ভারত থেকে সরে গেলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেই হয়ত সরকারপক্ষের বিশ্বাস। নইলে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টের কাছে জরুরি ভিত্তিতে ১৭ তারিখই এ বিষয়ে শুনানির আর্জি জানাবেন কেন? সকাল সকাল শুনানি হওয়ার কথা এবং সর্বোচ্চ আদালত যদি সিওএকে ফিফার কথামত কাজ করার নির্দেশ দেন, তাহলে ভারতের নির্বাসন উঠে যেতে সপ্তাহ খানেকের বেশি লাগবে না।

কিন্তু নির্বাসন ক্ষণস্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী – যা-ই হোক না কেন, দেশের ফুটবল এ অবস্থায় পৌঁছল কেন তা নিয়ে কিন্তু আলোচনা করতেই হবে। সুপ্রিম কোর্ট তো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবল প্রশাসনে নাক গলায়নি। দিল্লির আইনজীবী রাহুল মেহরাকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল কেন? সেসবের বিস্তারিত আলোচনা এখানে পাবেন।

প্রফুল প্যাটেল শুধু অগণতান্ত্রিক উপায়ে ফেডারেশনের মাথায় বসেছিলেন তা নয়, তাঁর আমলে কুকীর্তির তালিকা বেশ লম্বা। তাঁর আমলেই ফেডারেশনকে কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করে দেশের ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তায় পরিণত হয়েছে একটি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ, যার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর কোনো দেশের ফুটবল ইতিহাসে পাওয়া যাবে না। আজ যে ফুটবলপ্রেমীরা গেল গেল রব তুলছেন, তাঁদের স্বীকার করে নেওয়ার সময় এসেছে, যে ফিফার সিদ্ধান্ত আসলে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমন নয় যে ভারতীয় ফুটবল দারুণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল, হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে প্রাণহানি হয়েছে। মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল আইএসএল খেলছে – বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা এতেই খুশি হয়েছেন। দেশের আর কোথায় ফুটবল খেলাটার কী হল না হল তা নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে রাজি হননি। তাঁরা খেয়ালই করেননি কলকাতা লিগটা পর্যন্ত ছেলেখেলায় পরিণত হয়েছে। কখন হয়, কেমন করে হয় তার কোনো ঠিক নেই। দুই বড় ক্লাব নিজেদের মর্জি অনুসারে খেলে অথবা খেলে না। বছর ১০-১৫ আগে কলকাতায় তিন প্রধান ছাড়াও কিছু ক্লাব দেখা যেত যারা চমকে দেওয়ার মত ফুটবল খেলত। একসময় জাতীয় লিগে খেলা টালিগঞ্জ অগ্রগামী গেল কোথায়? নতুন দল গড়ে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের সাথে সমানে সমানে লড়ে যাওয়া ইউনাইটেড এসসি তো আইএসএল থেকে শত হস্ত দূরে। এমনকি মহমেডান স্পোর্টিংও অনেকখানি পিছিয়ে পড়েছে।

একই চিত্র জাতীয় স্তরে। মাহিন্দ্রা কোম্পানি দল তুলে দিয়েছে অনেকদিন হল। জেসিটির নাম আর শোনা যায় এখন? সবই আইএসএলের দোষে হয়েছে তা নয়, কিন্তু আইএসএল সব সংকটের শীর্ষবিন্দু। মুমূর্ষু ভারতীয় ফুটবলের চিকিৎসা করার বদলে প্রফুলের আমলে স্যালাইন, অক্সিজেন খুলে নিয়ে শেষ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে আইএসএলের মাধ্যমে। গত দুই দশকে জাতীয় দলের সেরা খেলোয়াড়দের ধাত্রীভূমি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট ক্লাবগুলো। শিলং লাজং, আইজল এফসির মত ক্লাবের বহু বছরের পরিশ্রমকে পাত্তা না দিয়ে তাদের করে দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় শ্রেণির (অর্থাৎ আই লিগের) নাগরিক। আর স্রেফ বিত্তের জোরে প্রথম সারির নাগরিক হয়েছে ইতিহাসবিহীন নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড এফসি। ডেম্পো বা সালগাঁওকারের মত দল পড়ে রইল, গোয়া ফুটবলের ধারক ও বাহক হয়ে গেল এফসি গোয়া। বিজয়ন, সত্যেন, আনচেরি, পাপ্পাচানদের কেরল পুলিস কোথায় মিলিয়ে গেছে। টাইটেনিয়াম ক্লাবের কথা কজনেরই বা মনে আছে? সারা ভারত চিনছে কেরালা ব্লাস্টার্সকে।

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

যে মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলকে ফুটবল জগতের কেন্দ্রবিন্দু মনে করেন বাংলার ফুটবল পাগলরা, তাদের অবস্থাও তো কহতব্য নয়। প্রতি মরসুমের শুরুতেই মনে হয় এই বুঝি ইস্টবেঙ্গল দলটা উঠে গেল। তখন মুখ্যমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন আর একটি জোড়াতালি দেওয়া ব্যবস্থা হয়। আর মোহনবাগান? তাদের নাম আদৌ মোহনবাগান কিনা তা নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয় মাঝেমধ্যে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি হিসাবে কলকাতা লিগ খেলে না দলটি, তারপর সেই প্রতিযোগিতায় হজম করে আসে আধ ডজন গোল।

এভাবে ভারতীয় ফুটবল কোনদিকে যাচ্ছিল? সুনীল ছেত্রী গোল করায় লায়োনেল মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডোর সঙ্গে পাল্লা দেন বটে, কিন্তু জাতীয় দলের ফলাফলে বিশেষ তারতম্য হয়নি। বাইচুং ভুটিয়া থেকে সুনীল হয়ে জেজে লালপেখলুয়া – জাতীয় দল ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে সেই একশোর আশপাশে ঘোরাফেরা করছে (২৩ জুন ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে ১০৪)।

এই নির্বাসনে আশু ক্ষতি হল বরং মেয়েদের ফুটবলের। আমরা অনেকেই খবর রাখি না, মেয়েদের ফুটবলে ভারত অনেক এগিয়ে (৫ অগাস্ট ২০২২ তারিখে সর্বশেষ আপডেটের সময়ে র‍্যাঙ্কিং ৫৮)। সেই ফুটবল নিয়েও চরম ছেলেখেলা চলেছে প্রফুলের আমলে। শুধু যে অতি অযত্নে ইন্ডিয়ান উইমেন্স লিগ চালানো হয় তা-ই নয়, এ বছরের গোড়ায় দেশে এশিয়ান কাপের আয়োজন করতে গিয়ে চরম কেলেঙ্কারি হয়েছে। প্রতিযোগিতা চলাকালীন ভারতীয় দলের ১২ জন কোভিডাক্রান্ত হওয়ার মেয়েদের আর সেই প্রতিযোগিতায় খেলাই হয়নি। অথচ তার জন্যে কে দায়ী তা নিয়ে ফেডারেশন মাথা ঘামায়নি, আজ অবধি কারোর শাস্তিও হয়নি। ভারতের ফুটবল মহল, সংবাদমাধ্যম – সকলেই এত সচেতন যে ওসব হওয়ার আশাও বোধহয় কেউ করেনি। শুধু কি তাই? অনূর্ধ্ব-১৭ মহিলাদের জাতীয় দলের সহকারী প্রশিক্ষক অ্যালেক্স অ্যামব্রোসের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ পর্যন্ত উঠেছে। সিওএ পত্রপাঠ তাঁকে বরখাস্ত করেছে। প্রফুলের আমল হলে কী হত কে জানে?

স্বভাবতই ফেডারেশনের নির্বাসনের খবরে যেরকম চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে, কোমর ভেঙে যাওয়া ভারতীয় ফুটবলকে উঠে দাঁড়াতে গেলে কী করতে হবে তা নিয়ে সেরকম আলোচনা হবে না ধরে নেওয়া যায়। কারণ কোনো উপায়ে আইএসএল যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া নিশ্চিত করা গেলেই কোমর যে আদৌ ভাঙেনি তা বিশ্বাস করে নেবেন ফুটবলপ্রেমীরাও।

নাগরিক ডট নেট-এ প্রকাশিত

সততা ও বাংলার সংবাদমাধ্যম: কোনো প্রশ্ন নয়

যাদবেন্দ্র পাঁজা
কংগ্রেস করতেন, বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ এই মানুষটিকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা লিখে রেখেছেন। বাঘা যতীনের শিষ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামী কিরণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৯৫০ সালে থাকতেন কলেজ স্ট্রিটে ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটের পিছনে এক গলিতে এক অকিঞ্চিৎকর বাড়ির দোতলা কি তেতলার একটি ঘরে। সে ঘরের বর্ণনা এরকম “এক প্রান্তে একটা শতরঞ্চি বিছানো, অন্য প্রান্তে আরেকখানা। শতরঞ্চির ওপর অল্পস্বল্প শয্যাসম্বল আর পাশে একখানা টিনের সুটকেস, দু-প্রান্তেই।” একদিকে বসে কিরণচন্দ্র অন্য দিকে শুয়ে থাকা একজনকে হেঁকে বলেন “সময় হয়নি? যেতে হবে না?” সেই মানুষটি উঠলেন, ব্র্যাকেটে ঝোলানো একখানা আধময়লা পাঞ্জাবি পরে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। শঙ্খ ঘোষ তাঁকে চিনতেন না। কিরণচন্দ্রের মুখে পরিচয় শুনে বিস্মিত হলেন। তারপর:

যাদবেন্দ্র পাঁজা? মন্ত্রী?
আমার চোখে বিস্ময় লক্ষ করে কিরণদা বলেন: ‘মন্ত্রী তো কী হলো, সেটা কোনো কথা নয়, ও হলো যাদবেন্দ্র পাঁজা। এখন বেরিয়ে গিয়ে রাইটার্সে যাবে, হয়তো হেঁটে হেঁটেই।’

সুবোধ ব্যানার্জি
প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী। এঁর বিষয়ে ১৯৯৭ সালে লিখেছিলেন বিখ্যাত আমলা দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সুবোধবাবু যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন কংগ্রেস সরকারের শ্রমমন্ত্রী গোপাল দাস নাগের মহানুভবতায় বিদেশ থেকে একটি অত্যন্ত দামি এবং এ দেশে পাওয়াই যায় না এমন ওষুধ আনানো হয়েছিল। ডাক্তারদের মতে সেই ওষুধের কয়েকটা ডোজ নিতে পারলে সুবোধবাবুর আয়ু খানিকটা বেড়ে যেতে পারত। কিন্তু বাণিজ্যিক সংস্থার আনুকূল্যে আনানো সেই ওষুধ ফিরিয়ে দেন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটি, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা।

বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যে বিনয় চৌধুরী বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনযাত্রার সারল্য, সততা নিয়ে আজ অবধি মুখে মুখে ফেরে। জ্যোতি বসু স্কচ খেতে ভালবাসতেন, অভিজাত ক্লাবের সদস্য ছিলেন, প্রাসাদোপম সরকারি বাড়িতে থাকতেন। তাঁর ছেলে পিতৃপরিচয় ব্যবহার করে শিল্পপতি হয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিস্তর নিউজপ্রিন্ট খরচ হয়েছে একসময়, কিন্তু জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধেও ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ওঠেনি। বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধেই বিরোধীরা (বামপন্থীরা) দুর্নীতির অভিযোগ এনেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে, সে অভিযোগও মিথ্যা।

উদাহরণের তালিকা আরও দীর্ঘ করা সম্ভব, কিন্তু নিষ্প্রয়োজন। কারণ এই নাতিদীর্ঘ তালিকাই এটুকু প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট, যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথম ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ নন যিনি সততার পরাকাষ্ঠা বা সাদাসিধে জীবন কাটান। অথচ পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যম গত এক দশকে তেমনটাই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে গেছে ক্রমাগত। আজ যদি আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর ধারণা হয়ে থাকে, তৃণমূল কংগ্রেসের আর সব নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলেও দিদি সৎ — তার কৃতিত্ব মমতার চেয়েও এ রাজ্যের সংবাদমাধ্যমের বেশি। জাতীয় স্তরের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম মোদী বন্দনার জন্য কুখ্যাত। তাদের প্রচারে তবু একটি সঙ্গতি আছে। তারা কেবল মোদীকে পুরুষোত্তম সত্য হিসাবে উপস্থিত করে না; অনুরাগ ঠাকুর, কিরেণ রিজিজু, স্মৃতি ইরানির মত চুনোপুঁটি বিজেপি নেতা নেত্রী থেকে শুরু করে হেভিওয়েট অমিত শাহ পর্যন্ত সকলকেই সকল গুণের আধার হিসাবে বর্ণনা করে। বাংলার সংবাদমাধ্যম কিন্তু তেমন নয়। অনুব্রত মণ্ডল যে প্রকৃতপক্ষে বাহুবলী, তা দেখাতে এখানকার খবরের চ্যানেলগুলোর আপত্তি নেই। নারদ স্টিং অপারেশনের সময়ে স্টুডিওতে সভা বসিয়ে ফিরহাদ হাকিম, সৌগত রায়, শোভন চ্যাটার্জি, শুভেন্দু অধিকারীদেরও যথেষ্ট নিন্দা করা হয়েছে। গ্রেপ্তারির পর মদন মিত্রের নিন্দাও কাগজে বেরিয়েছে, কুণাল ঘোষ যে দুর্নীতিগ্রস্ত সে কথাও দিবারাত্র উচ্চারিত হয়েছিল যথাসময়ে। আর পার্থ চ্যাটার্জির বেলায়? ইংরেজিতে একটা কথা আছে – washing dirty linen in public। বেলঘরিয়ার ফ্ল্যাট থেকে ২২ কোটি টাকা উদ্ধার হওয়ার পর থেকে তো আক্ষরিক অর্থেই পার্থবাবুর বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, অন্তর্বাস জনসমক্ষে ধোলাই করছে মিডিয়া। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর দলের আর সকলকে অসৎ বলতে বাংলার সংবাদমাধ্যম রাজি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তিনি যেন পদ্মফুল – পাঁকে থাকেন কিন্তু গায়ে পাঁক লাগে না।

নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে যখন রাজ্য উত্তাল, তখন সংবাদমাধ্যম নিয়ে এই আলোচনার কী দরকার? অভিযুক্ত তো রাজ্যের একজন মন্ত্রী এবং তাঁর বান্ধবী। মুখ্যমন্ত্রী তো নন, সংবাদমাধ্যমও নয়।

দরকার কারণ পশ্চিমবঙ্গ অনেকদিন হল কিছু মৌলিক গণতান্ত্রিক রীতিনীতির উল্টো দিকে হাঁটছে। যেমন গণতন্ত্রে সবাই সবার কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এ রাজ্যে সংবাদমাধ্যম সবার (আক্ষরিক অর্থে নেবেন না) কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারলেও তার কার্যকলাপ নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলে না। প্রকাশ্য সভায় সাংবাদিকরা ভাতার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রীকে। মুখ্যমন্ত্রীও বলেন সরকারি আধিকারিকরা নজর রাখবেন কে কীরকম খবর করছে। ‘ভাল’ খবর করলে সাহায্য পাওয়া যাবে। এতবড় অগণতান্ত্রিক কাণ্ড নিয়ে কোনো কাগজে কোনো সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয় না, কোনো চ্যানেলে সান্ধ্য বিতর্কসভা বসে না। বোঝাই যায়, মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনগুলো লাইভ দেখলে কেন শেক্সপিয়রের নাটকের মনোলগের দৃশ্য দেখছি মনে হয়।

পশ্চিমবঙ্গে অল্টনিউজ বা নিউজলন্ড্রি নেই, সংবাদমাধ্যমের কভারেজের ভালমন্দ উচিত-অনুচিত নিয়ে কোনো মিডিয়া কাটাছেঁড়া করে না। ফলে সংবাদমাধ্যমের দিকে কোনো আঙুল ওঠে না, কিন্তু তারা নিশ্চিন্তে অন্যদের দিকে আঙুল তুলতে পারে। যেমন ২২ জুলাই টালিগঞ্জের ফ্ল্যাট থেকে কুবেরের ধনের প্রথম কিস্তি আবিষ্কারের পর আটদিন পেরিয়ে গেল, এখনো জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় প্রমুখরা মুখ খুলছেন না বলে তাঁদের দিকে আঙুল তুলছে। সন্দেহ নেই সরকার ঘনিষ্ঠ এই বিখ্যাতরা, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কমিটিতে আসীন এই কৃতীরা, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের পক্ষে কথা বলা এই খ্যাতিমানরা এত বড় কাণ্ডে চুপ করে থাকলে এঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মজার কথা, বাংলার সংবাদমাধ্যম কেবল সেই বিখ্যাতদের দিকেই আঙুল তোলে যাঁরা সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন। দেব, মিমি চক্রবর্তী, নুসরত জাহান বা সায়নী ঘোষের মত যে বিখ্যাতরা রীতিমত দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ কেউ নির্বাচনে জিতে সাংবিধানিক পদ আলো করে আছেন, তাঁদের প্রতিক্রিয়া অগ্রাধিকার পায় না। বগটুই কাণ্ডের পর কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম কোন কোন বিখ্যাত মানুষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি তার আলাদা তালিকা পর্যন্ত প্রকাশ করেছিল। অথচ দেব, মিমি, নুসরতরা প্রতিক্রিয়া না দিলে কেন দিলেন না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় না। অথচ তাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এসব নিয়ে কথা বলা তাঁদের সাংবিধানিক দায়।

দায়ের কথা বলতে গেলে এ কথাও বলতে হবে, দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের দায়। গত আটদিনে বাংলার সংবাদমাধ্যম সে দায় পালন করতে উৎসাহী হয়েছে। পার্থবাবুকে ফোন করে চাকরিপ্রার্থীদের যন্ত্রণা জানিয়ে বেকুব হয়েছিলেন – এরকম এক নীচু তলার তৃণমূল কর্মীর ফোনালাপের অডিও প্রকাশ্যে এনেছে একটি চ্যানেল। সেই কর্মীটিকে সাদরে স্টুডিওতে ডেকে এনে সান্ধ্য বিতর্কসভায় স্থানও দেওয়া হয়েছে একদিন। পাঁচশো তিন দিন ধরে যাঁরা রাস্তায় বসে আছেন তাঁদের কয়েকজনকেও এখন এ চ্যানেল সে চ্যানেলে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে। একটি চ্যানেলে তাঁদের কয়েকজনকে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা গেল। যৌবন চুরি হয়ে যাওয়া এই অসহায়, বিধ্বস্ত মানুষেরা এখন চ্যানেলগুলির হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন হয়ে উঠেছেন। ঝকঝকে চেহারার অ্যাঙ্কররা যথাসম্ভব আবেগ সহকারে ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করছেন “আর কতদিন…?” কিন্তু এই চাকরিপ্রার্থীদের কেউ যদি আচমকা অ্যাঙ্করকে জিজ্ঞেস করে বসেন “আপনারা এতদিন কোথায় ছিলেন”, তাহলে পালাবার পথটা দেখে রাখা ভাল। কারণ লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা, আমাদের ছেলেমেয়েদের হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা যে রাস্তায় বসে আছেন – এ দৃশ্য বাংলার চ্যানেলওয়ালা, কাগজওয়ালাদের গত আট দিনে চোখে পড়েছে। তার আগের ৪৯০-৯৫ দিন ক্যামেরা আর ল্যাপটপগুলো অন্য কোনো গুরুতর খবর নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কোটি পঞ্চাশেক নগদ টাকা আর গয়নাগাঁটি উদ্ধার না হলে ৫০০ দিন পেরোলেও আন্দোলনকারীদের দিকে নজর পড়ত কিনা সন্দেহ আছে। চক্ষুলজ্জাই এ যাত্রায় ক্যামেরা এবং কম্পিউটারগুলোর মুখ আন্দোলনকারীদের দিকে ঘুরিয়ে দিল হয়ত। গত এগারো বছরে কলকাতার বুকে এসএসসি, টেট, মাদ্রাসা – নানারকম শিক্ষকদের একাধিক অবস্থান বিক্ষোভ হয়েছে, শিক্ষক-হবু শিক্ষকরা পুলিসের লাঠির বাড়ি খেয়েছেন, জলকামান দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। মারাও গেছেন বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী। সেসব আন্দোলনকে প্রধান খবরের মর্যাদা দেয়নি কোনো খবরের কাগজ বা চ্যানেল। প্রথম পাতার খবর হয়েছে, যখন দীর্ঘ আন্দোলন ভাঙতে মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে আন্দোলনকারীদের শুকনো আশ্বাস দিয়েছেন বা আদালত বলেছে, আপনার অমুক জায়গায় বসবেন না, তমুক জায়গায় বসুন। সাধারণ মানুষের অসুবিধা করে আন্দোলন করা চলবে না।

আরও পড়ুন সত্যান্বেষী পাঠক জাগুন, সরকারি বিজ্ঞাপন পেতে গেলে ইতিবাচক খবর লিখতে হবে

এখনো কভারেজের অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে পার্থ-অর্পিতার সম্পর্কের রসাল খুঁটিনাটি। যে অধ্যবসায়ে কোন গাড়িতে লং ড্রাইভে যেতেন আর কোন বাগানবাড়িতে চেটেপুটে খিচুড়ি খেতেন তা রিপোর্ট করা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে বাংলার মিডিয়া স্রেফ একটা সেক্স টেপের অপেক্ষায় আছে। সেটা পাওয়া গেলেই আন্দোলনকারীরা আবার অবজ্ঞার অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন, দুর্নীতিও চাপা পড়ে যাবে। এই অধ্যবসায় ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে থাকলে, সত্য উদ্ঘাটন করার এই অদম্য উৎসাহ আগে দেখালে নিয়োগ দুর্নীতি প্রকাশ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হত না। কাজটা পশ্চিমবঙ্গের সদাজাগ্রত সংবাদমাধ্যমই করতে পারত।

‘বিশ্বাসে মিলায় সততা, তর্কে বহুদূর’ মন্ত্রে বিশ্বাসী মিডিয়া কিন্তু এখনো প্রশ্ন করছে না, মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো আন্দোলনকারীদের আশ্বাস দিতে পারেন কোন প্রশাসনিক অধিকারে? তিনি তো সরকারের কেউ নন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কেন কথা বলছেন না? শুধু কথা বলে কী হবে, সে প্রশ্নও করছে না খুব বেশি মিডিয়া। গত কয়েক দিনে আবার কিছু বর্ষীয়ান সাংবাদিক সোশাল মিডিয়ায় বনলতা সেনগিরি করতে নেমেছেন। বাম আমলে কী হয়েছে, সব জানি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে লিখে দেব – এই জাতীয় পোস্ট দেখা যাচ্ছে। এঁরা কি বুঝছেন না, এই উচ্চারণে মিডিয়ার কর্তব্যে অবহেলাই আরও পরিষ্কার হচ্ছে? বাম আমলের দুর্নীতির কথা জানা ছিল, অথচ রিপোর্ট করা হয়নি – এ যদি সত্যি হয়, সে দায় সংবাদমাধ্যম ছাড়া কার?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে মরে প্রমাণ করতে হবে সে মরেনি

যদি ২০১১ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় মহেন্দ্র সিং ধোনি ২০১৫ বিশ্বকাপের বছর খানেক আগে ঘোষণা করতেন তিনি আর একদিনের ক্রিকেট খেলবেন না, কেমন হত ব্যাপারটা? তখন ধোনির বয়স সবে ৩৩ বছর। চোট আঘাতে বেশ কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল এমন নয়, উইকেটরক্ষায় শিথিলতা দেখা যাচ্ছিল বা ব্যাটে রান ছিল না তা-ও নয়। সে অবস্থায় ক্রিকেটের অন্যতম বক্স অফিস ধোনি একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিলে অবশ্যই হইচই পড়ে যেত। কিন্তু এমন কিছু তখন ঘটেনি। সাদা বলের ক্রিকেটের সর্বকালের সেরাদের একজন ধোনি শুধু ২০১৫ বিশ্বকাপ নয়, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপও খেলেছেন। কিন্তু ধোনি তখন ৫০ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেললে যতটা অবাক কাণ্ড হত, অতি সম্প্রতি তার চেয়েও অবাক কাণ্ড ঘটে গেছে। যে কোনো ধরনের ক্রিকেটে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অলরাউন্ডারদের একজন এবং ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় বেন স্টোকস একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। ১৯ জুলাই (মঙ্গলবার) দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিকই ছিল তাঁর খেলোয়াড় জীবনের শেষ একদিনের ম্যাচ।

ধোনি অবসর নিলে যা হত, স্টোকসের অবসর তার চেয়েও বেশি আশ্চর্যের কারণ স্টোকসের বয়স এখন ৩১। ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে বলা হয়, এই বয়সে এসে একজন ব্যাটার আরও পরিণত হয়ে ওঠেন। আর স্টোকস তাঁর বোলিং বাদ দিয়ে শুধু ব্যাটার হিসাবেই ইংল্যান্ড দলে জায়গা পেতে পারেন তিন ধরনের ক্রিকেটেই। অতীতে বয়স বাড়লে, শরীরের ধকল নেওয়ার ক্ষমতা কমে গেলে অনেক অলরাউন্ডারই বোলিং করা ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্টিভ ওয় ব্যাট হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তাঁর অপরাজিত ১২০ রান ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার শেষ অব্দি ফাইনালে পৌঁছত না। টাই হয়ে যাওয়া সেমিফাইনালেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতরান করেছিলেন। স্টোকসও যে আগামী বছর ভারতীয় উপমহাদেশের বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে পার্থক্য গড়ে দিতে পারতেন না তা বলা যায় না। কিন্তু তিনি সে বিকল্পের দিকে গেলেন না। এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি নিঃসন্দেহে একদিনের ক্রিকেটের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় এবং যাঁর খেলা সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীদের বিলক্ষণ আনন্দ দেয়, তিনি কেন এত তাড়াতাড়ি অবসর নিয়ে নিলেন?

ভবিষ্যতে যখন ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হবে, তখন ২০২২ সালের জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নিয়ে একটা আলাদা অধ্যায় লিখতে হবে। এই এক সপ্তাহে এমন তিনটে ঘটনা ঘটে গেছে যা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যুগ বদলে যাওয়ার সূচক। একটা অবশ্যই স্টোকসের মত একজন সক্রিয়, জনপ্রিয় এবং অল্পবয়সী ক্রিকেটারের একদিনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়া। কিন্তু ক্রিকেট দলগত খেলা। সেদিক থেকে আরও বড় ঘটনা স্টোকসের অবসরের ঠিক পাঁচদিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট বোর্ডের একটা সিদ্ধান্ত। ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দক্ষিণ আফ্রিকার একটা একদিনের ম্যাচের সিরিজ খেলার কথা ছিল। কিন্তু ১৩ জুলাই ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে জানায় যে তারা ওই সিরিজ খেলতে অপারগ, কারণ ওই সময়ে তারা নিজেদের দেশে যে নতুন টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু করছে তার খেলা চলবে। সেই লিগ সামলে জাতীয় দলকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো সম্ভব নয়। আর বাকি বছরের ব্যস্ত ক্রীড়াসূচি থেকে আর কোনো সময় বার করাও সম্ভব নয়।

টি টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের গুরুত্ব কতটা বেড়ে গেছে আর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব কতটা কমে গেছে তা এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার এই সিদ্ধান্তে তাদের আগামী বছরের বিশ্বকাপ খেলার উপরে প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নিয়মানুযায়ী, এখন একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো আইসিসি ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ সুপার লিগের অংশ। ঠিক যেমন টেস্ট ম্যাচগুলো বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ। তফাত বলতে সুপার লিগের পয়েন্ট দিয়ে একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নির্ধারিত হয় না, ঠিক হয় কোন কোন দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে। ওই পয়েন্ট টেবিলের প্রথম আটটা দল (ভারত বাদে সাতটা, কারণ ভারত আয়োজক দেশ) ২০২৩ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, বাকিদের পাঁচটা অ্যাসোশিয়েট দেশের সঙ্গে যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতায় খেলতে হবে। সেখান থেকে মাত্র দুটো দেশ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ওই পয়েন্ট টেবিলে দক্ষিণ আফ্রিকা এই মুহূর্তে এগারো নম্বরে আছে। জানুয়ারি মাসের অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাদ যাওয়ায় মে মাসে ওই টেবিল চূড়ান্ত হওয়ার আগে দক্ষিণ আফ্রিকা আর মাত্র দুটো সিরিজ খেলার সুযোগ পাবে – ইংল্যান্ড আর ভারতের বিরুদ্ধে। সেই দুটো সিরিজ জিতে প্রথম পাঁচে উঠে আসা মোটেই সহজ নয়। যোগ্যতা অর্জনকারী প্রতিযোগিতাও নেহাত সহজ হবে না, কারণ সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে থাকতে পারে শ্রীলঙ্কা, আয়ারল্যান্ডের মত দলগুলো। এককথায়, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ খেলার সুযোগও ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে গেল ফ্র্যাঞ্চাইজ টি টোয়েন্টি লিগ আয়োজন করার জন্য।

আইসিসির পূর্ণ সদস্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ডের এই মনোভাব ইঙ্গিত দিচ্ছে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট হল অতীত। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটই ভবিষ্যৎ। যুগপৎ এই ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত একটা ক্রিকেট বোর্ড সেরকমই মনে করছে। ১৩ তারিখ ক্রিকেট সাউথ আফ্রিকা এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পরে ঘটেছে তৃতীয় ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার বোর্ড যে টি টোয়েন্টি লিগের জন্য অস্ট্রেলিয়া সফর বাতিল করেছে, সেই লিগের ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর নিলাম ছিল ২০ তারিখ। সেখানে ছটা ফ্র্যাঞ্চাইজের সবকটাই কিনে নিয়েছেন আইপিএলের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকরা। মুম্বাই ইন্ডিয়ানস, চেন্নাই সুপার কিংস, দিল্লি ক্যাপিটালস, লখনৌ সুপার জায়ান্টস, সানরাইজার্স হায়দরাবাদ এবং রাজস্থান রয়্যালসের মালিকরাই এখন দক্ষিণ আফ্রিকার ওই লিগের ভাগ্যনিয়ন্তা। বহুদিন আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ এবং আমেরিকার লিগে দল আছে কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকদের, মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের মালিকরা সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর লিখে একটা দলের মালিক। ক্যারিবিয়ান লিগে পাঞ্জাব কিংস আর রাজস্থান রয়্যালসের মালিকদেরও দল রয়েছে। কিন্তু এর আগে কোনো লিগের সম্পূর্ণ দখল আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজের মালিকদের হাতে আসেনি। তাদের ইচ্ছাতেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এ পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগে ভারতীয় ক্রিকেটারদের খেলার অনুমতি দেয়নি। এখন কথা হল, অন্য দেশের লিগের দলগুলোও যখন আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজ মালিকদেরই দখলে, তখন তাঁরা বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, ঋষভ পন্থ, হার্দিক পাণ্ড্যার মত জনপ্রিয় ক্রিকেটারদের চাইবেন না কেন? চাইলে ভারতীয় বোর্ড কতদিন না বলতে পারবে? যদি না পারে, তখন ক্রিকেটাররা আর কত ক্রিকেট খেলবেন?

ক্রিকেটের মরসুম বলে আর কিছু নেই বহুকাল হল। বিশেষ করে ভারত, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া যে পরিমাণ ক্রিকেটে খেলে তাতে ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত লেগেই আছে। জেমস অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রড, চেতেশ্বর পুজারার মত যাঁরা শুধু টেস্ট খেলেন একমাত্র তাঁদেরই দেখা যায় চোট আঘাত কম। বিশেষ করে জোরে বোলাররা দুটো সিরিজ খেলেন তো চারটে সিরিজ মাঠের বাইরে থাকেন। ভারতীয় ক্রিকেটারদের চোট, আঘাত এবং ক্লান্তি তো এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি বছরের সাত মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই সাতজন ভারত অধিনায়ক (বিরাট, রোহিত, কে এল রাহুল, হার্দিক, ঋষভ পন্থ, যশপ্রীত বুমরা, শিখর ধাওয়ান) দেখে ফেলব আমরা। স্টোকসও কিন্তু ক্রীড়াসূচিকে দোষ দিয়েছেন। তিনি বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিন ধরনের ক্রিকেটেই দলকে একশো শতাংশ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। তাই পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেট থেকে অবসর নিচ্ছেন।

ঘটনা হল, এভাবে চললে আরও অনেককেই তিরিশের আশেপাশে অবসর নিয়ে ফেলতে দেখা যাবে। একেকজন একেক ধরনের ক্রিকেট ছেড়ে দেবেন, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যায়, কেউই টি টোয়েন্টি ক্রিকেট ছাড়বেন না। দেশের হয়ে না খেললেও ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট খেলবেনই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মত যেসব দেশে ক্রিকেটের অবস্থা সঙ্গীন, ক্রিকেট বোর্ড তেমন টাকাপয়সা দিতে পারে না, সেখানকার ক্রিকেটাররা গত এক দশক ধরেই দেশের হয়ে খেলার তোয়াক্কা না করে সারা পৃথিবীর ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ খেলে বেড়িয়েছেন। কারণ ওখানে অনেক টাকা রোজগার করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ আরও বাড়ছে এবং বাড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন লিগে উৎসাহের কারণও আর্থিক। তাদের ক্রিকেটও ধুঁকছে। কিন্তু শুধু ওই একটা লিগ চালু হচ্ছে তা তো নয়, এ বছর থেকে আইপিএল আট দলের বদলে দশ দলের লিগ হয়ে গেছে। সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি করে যে বিপুল পরিমাণ টাকা ভারতীয় বোর্ড আয় করছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আরও দল যোগ করে আইপিএলকে আরও লম্বা করতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। এদিকে আইসিসির কেন্দ্রীয় ক্রীড়াসূচি, যার পোশাকি নাম ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম, তাতে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় ছেড়ে রাখা হবে বলে একরকম সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ এবং ইংল্যান্ডের একশো বলের লিগ দ্য হান্ড্রেড – সেসবের জন্যেও আলাদা করে সময় ধার্য করা হবে। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা এত লিগ ক্রিকেট খেলে আর দেশের হয়ে খেলবেন কখন? কেনই বা খেলবেন? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মত যেসব দেশের বোর্ড সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের রোজগার থেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ভাল পারিশ্রমিক দিতে পারবে, তারা না হয় তবু পারবে। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড – এরা কী করবে? এমনকি অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডও খাবি খেতে পারে। এই সাইটেই আগে লিখেছি, এক অস্ট্রেলিয় সাংবাদিক আগামী মরসুমে আইপিএলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক এমন জায়গায় পৌঁছতে পারে যা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে যা পারিশ্রমিক দেয় তার চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি।

কিন্তু ক্রিকেটাররা নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিপদে ফেলছে বোর্ডগুলো এবং আইসিসির লোভ। এই শতাব্দীর প্রথম দশকেও পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটে বেশ জনপ্রিয় ছিল ত্রিদেশীয়, চতুর্দেশীয় প্রতিযোগিতা; যদিও তার টান ক্রমশ কমে আসছিল। টি টোয়েন্টি যুগে আইসিসি ওই ধরনের প্রতিযোগিতা একেবারেই বন্ধ করে দিল, যাতে শুধুমাত্র আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোই বহুদলীয় হয়। কেন? সম্প্রচারের লাভের গুড় যাতে কম না পড়ে। অথচ আইসিসি কিন্তু একই যুক্তিতে ওয়ার্ল্ড টি টোয়েন্টি ছাড়া কোনো বহুদলীয় টি টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা হবে না বলেনি। একের পর এক ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। আসলে আইসিসির বলার উপায় ছিল না। কারণ সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্য ভারতই সবচেয়ে বড় লিগটা চালায়।

সুতরাং কুড়ি ওভারের ক্রিকেট তথা ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ২০১১ বিশ্বকাপের পর পঞ্চাশ ওভারের খেলায় নতুন নিয়ম হল, দুই প্রান্ত থেকে দুটো বলে খেলা হবে। টি টোয়েন্টির মতই ছোট করে আনা হল বাউন্ডারি, তার উপর সারাক্ষণই পাওয়ার প্লে। ফলে পঞ্চাশ ওভারের খেলার নাটকীয়তার বারোটা বাজল। রিভার্স সুইং বন্ধ, স্পিনারদের ভূমিকা নগণ্য। কারণ বল পুরনো হয় না বলে ঘুরতে চায় না, ইনিংসের শেষ প্রান্তে বল নরম হয়ে গিয়ে আর মারা শক্ত হয় না। ফলে খেলাটা হয়ে দাঁড়াল টি টোয়েন্টিরই বড় সংস্করণ। সে জিনিস আলাদা করে দেখতে কার ভাল লাগে? এ নিয়ে শচীন তেন্ডুলকরের মত লোক আপত্তি করেছেন, আইসিসি কান দেয়নি। এখন একদিনের ক্রিকেট ভালবাসেন এমন অনেকে চাইছেন আইসিসি খেলাটাকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিক। স্বয়ং ভারত অধিনায়ক রোহিত কদিন আগে মনে করিয়ে দিয়েছেন ত্রিদেশীয় সিরিজগুলোর কথা, বলেছেন ওগুলো আবার চালু করলে হয়ত খেলার সংখ্যা কমানো যাবে, ক্রিকেটারদের চাপ কমবে।

কিন্তু ক্রিকেটারদের চাপ কমাতে চাইছে কে? কেরি প্যাকারও ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি যখন ওয়ার্ল্ড সিরিজ চালু করে রঙিন জামা, সাদা বলের ক্রিকেটের রাস্তায় হাঁটেন, স্বার্থটা একেবারেই ব্যবসায়িক ছিল। কিন্তু তিনি ক্রিকেটকে ব্যবহার করে টাকা রোজগার করতে চেয়েছিলেন, আজকের ক্রিকেটকর্তারা টাকা রোজগার করার জন্যে ক্রিকেটকে ব্যবহার করতে চান। কথায় বলে, মানুষের প্রয়োজনের শেষ আছে, লোভের শেষ নেই। মুনাফার লোভ তো অসীম। একবিংশ শতকে যে কোনো বড় ব্যবসার আর্থিক বছরের লক্ষ্য ঠিক হয় আগের বছরের মুনাফা অনুসারে। এ বছর আরও বেশি মুনাফাই লক্ষ্য। অতএব ক্রিকেটের ব্যবসায় ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে দৈর্ঘ্যে প্রস্থে বাড়িয়ে চলাই লক্ষ্য। তাতে শুধু একদিনের ক্রিকেট নয়, সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই গোল্লায় গেলে ক্ষতি নেই। বরং গোল্লায় না পাঠালেই নয়।

আরও পড়ুন IPL auction: Where privilege holds court

তার জন্য জনমত তৈরি করার কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে পুরোদমে। ভারতীয় দলের কোচ হিসাবে সাফল্যের মুখ দেখে ক্রিকেটজগতে বিলক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন রবি শাস্ত্রী। তিনি সম্প্রতি এজবাস্টন টেস্ট চলাকালীন সম্প্রচার সংস্থার স্টুডিওতে বসে বলেছিলেন, ক্রিকেটের ফুটবলের মতই ক্লাবভিত্তিক হয়ে ওঠা উচিত। ইংল্যান্ডের দ্য টেলিগ্রাফ কাগজের পডকাস্টে বুধবার ফের একথা বলেছেন। যোগ করেছেন, বিশেষ করে টি টোয়েন্টিতে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট কমিয়ে ফেলা উচিত। শুধু বিশ্বকাপের সময়ে, আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোর সময়ে জাতীয় দলগুলোর মধ্যে ক্রিকেট হওয়া উচিত। বাকি সময়টা দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেট চলুক। তারপর, যেন টেস্ট ক্রিকেট বলে একটা বস্তু আছে সেকথা মনে পড়ায়, বলেছেন এমনটা করলে উপরের ছটা দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট খেলার জন্যে বেশি সময় পাওয়া যাবে। টেস্ট ক্রিকেটকে দুটো স্তরে ভাগ করে দেওয়া দরকার। নইলে দশ বছর পরে টেস্ট ক্রিকেট বাঁচবে না। গোটা পডকাস্টের মধ্যে থেকে এই যে এক মিনিট তুলে টুইট করা হয়েছে, তাতেই কতগুলো চমকপ্রদ কথা!

পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা করার সাহস বোধহয় একমাত্র শাস্ত্রীরই আছে। তিনি এমন একটা খেলার সঙ্গে ক্রিকেটের তুলনা করেছেন যে খেলার একটাই ফরম্যাট – নব্বই মিনিট। সেই খেলার পথে হেঁটে নাকি টি টোয়েন্টি, টেস্ট, একদিনের ক্রিকেট – সবই বাঁচবে। উপরন্তু তিনি বলছেন দেশে দেশে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগগুলোকে উৎসাহ দেওয়া উচিত, তাহলে নাকি টেস্ট খেলার সময় পাওয়া যাবে। বছরে মাসের সংখ্যা না বাড়ালে যে দুটো একইসঙ্গে কী করে সম্ভব তা তিনিই জানেন। সব দেশে সফল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নেই। পাকিস্তানের মত দেশে থাকলেও রাজনৈতিক কারণে ক্রিকেট বিশ্বে পাকিস্তান পিছিয়ে, তাই পাকিস্তান সুপার লিগের অদূর ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে আইপিএল বা বিগ ব্যাশের সমকক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। তাহলে ওই দেশগুলোতে ক্রিকেট বাঁচবে কী করে? ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের দয়ায়? সে দয়ার বহর তো যথেষ্ট দেখা গেছে। আইসিসির রাজস্বের বেশিরভাগটা তাদেরই দিতে হবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দেয় – এই যুক্তিতেই তো তারা চলে। নিজেদের মধ্যে ছাড়া অন্য দেশগুলোর সাথে এক সিরিজে দুটোর বেশি টেস্টও তারা খেলতে চায় না।

আসলে শাস্ত্রী যা বলেছেন তা আইসিসি তথা বিসিসিআই কর্তাদের মনের কথা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যে ভবিষ্যৎ তিনি নির্দেশ করেছেন তা আরও সংকীর্ণ। ফলে মুনাফার ভাগীদার আরও কম, মুনাফার ভাগ বেশি। মুশকিল হল, ফুটবল খেলা হয় পৃথিবীর প্রায় সব দেশে, ক্লাবও অসংখ্য। ক্রিকেট এখনো গোটা পনেরো দেশের খেলা। কর্তারা যে পথে যেতে চাইছেন তাতে ওই পনেরোও কমতে কমতে পাঁচে এসে ঠেকতে পারে। আরও ভাল করে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, যে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি, সেই ভারতেও আসলে খেলাটা নয়, খেলোয়াড়রা জনপ্রিয়। মাঠে, টিভির সামনে এবং মোবাইলের পর্দায় ভিড় হয় আন্তর্জাতিক তারকাদের টানে। আইপিএলের রমরমাও তাঁদের তারকাচূর্ণেই। ওটা বাদ গেলে কী হয়? ঘরোয়া ফুটবলের অবহেলিত প্রতিযোগিতা সন্তোষ ট্রফির ফাইনালে মাঠ ভরে যায়, অনলাইন স্ট্রিমিং দ্যাখে কয়েক লক্ষ লোক। কিন্তু রঞ্জি ট্রফি ফাইনালের স্কোরের খবরও রাখে না বিশেষ কেউ। সুতরাং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দুয়োরানী হয়ে গেলে ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগ নিয়ে মাতামাতি থিতিয়ে যেতে বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।

তবে ভবিষ্যৎ চিন্তা করার বদভ্যাস ক্রিকেটকর্তাদের নেই। শোনা যাচ্ছে অন্য দেশের লিগে দল কিনেছেন যাঁরা, তাঁদের চাপে আসন্ন সাধারণ সভায় বিসিসিআই নাকি ভারতীয় ক্রিকেটারদের বিদেশের লিগে খেলার অনুমতি দিয়ে দিতে পারে। হয়ত এখনই শীর্ষস্থানীয়দের ছাড়া হবে না, সরাসরি বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ নন এমন ক্রিকেটারদের ছাড়া হবে। তা যদি ঘটে তাহলে ইতিমধ্যেই অবহেলিত ঘরোয়া ক্রিকেট আরও রক্তশূন্য হয়ে যাবে। বিপুল অর্থের হাতছানি উপেক্ষা করে কে পড়ে থাকবে জনশূন্য স্টেডিয়ামে চারদিন, পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার জন্য? তারপর শাস্ত্রীদের ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগের বাড়বাড়ন্তে টেস্ট ক্রিকেট তথা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির ফ্যান্টাসি কী করে পূরণ হবে কে জানে!

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

অসংসদীয় শব্দ: মুখ বুজে বাঁচা অভ্যাস করতে হবে

“কথা বোলো না কেউ শব্দ কোরো না 
ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন 
গোলযোগ সইতে পারেন না।”

মনোজ মিত্রের নরক গুলজার নাটকের এই গান গত শতকের একটা অংশে রীতিমত জনপ্রিয় ছিল। আমাদের এঁদো মফস্বলে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার দেখার অভ্যাস খুব বেশি লোকের ছিল না। তৎসত্ত্বেও নব্বইয়ের দশকে অন্তত দুবার শখের অভিনেতাদের পাড়ার মঞ্চে এই নাটক করতে দেখেছি আর নারদের চরিত্রে যে-ই থাকুক, তার গলায় সুর থাক বা না থাক, এ গান গাওয়া মাত্রই দর্শকদের মজে যেতে দেখেছি। পিতামহ ব্রহ্মা টেনে ঘুমোচ্ছেন, দেবর্ষি নারদ নেচে নেচে এই গান গাইছেন – এই হল দৃশ্য। নাটকটি আগাগোড়া সরস। এখানে ব্রহ্মা একজন মানুষকে পুনর্জন্ম দেওয়ার জন্য ঘুষ নিতে যান, চিত্রগুপ্ত দেখে ফেলে আর্তনাদ করে ওঠে “উৎকোচ”। ব্রহ্মা ট্যাঁকে টাকা গুঁজতে গুঁজতে বলেন “মেলা ফাজলামি কোরো না। উৎকোচ ছাড়া আমাদের ইনকামটা কী, অ্যাঁ? আমরা কি খাটি, না এগ্রিকালচার করি, না মেশিন বানাই? অতবড় স্বর্গপুরীর এস্ট্যাবলিশমেন্ট কস্ট আসবে কোত্থেকে, অ্যাঁ?” তাছাড়া এই নাটকে একজন বাবাজি আছেন, যিনি ব্রহ্মার কৃপায় কল্পতরু থলি পাওয়া মাত্রই রম্ভাকে চেয়ে বসেন। কিন্তু থলিতে হাত ঢোকালে হাতে উঠে আসে একটি মর্তমান কলা।

আর বেশি লিখব না, কারণ বৃদ্ধ বয়সে মনোজ মিত্রকে হাজতবাস করানো আমার উদ্দেশ্য নয়। কথা হল বিশ-পঁচিশ বছর আগে একশো শতাংশ হিন্দু (নব্বই শতাংশ উচ্চবর্ণ) অভিনেতাদের দ্বারা অভিনীত এই নাটক দেখেছি, আর একশো শতাংশ হিন্দু দর্শককুলকে নাটক দেখে হেসে গড়াগড়ি খেতে দেখেছি। কিন্তু বিস্তর ধস্তাধস্তির পর মহম্মদ জুবের আজ দিল্লি পুলিসের দায়ের করা মামলাতেও জামিন না পেলে এবং জজসাহেব তাঁর রায়ে বাকস্বাধীনতা যে সাংবিধানিক অধিকার সেটি ষোড়শোপচারে মনে করিয়ে না দিলে সাহস করে এই লেখা লিখতে বসতাম না। কারণ কী লেখা যাবে, কোনটা বলা যাবে সে ব্যাপারে আজকাল আর সংবিধান চূড়ান্ত নয়, সরকারের বকলমে পুলিস চূড়ান্ত। পুলিসের অধিকারের সীমাও বেড়ে গেছে অনেক। একদা পুলিসের হাত এত ছোট ছিল, যে আশিতে আসিও না ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় জলে নেমে পড়ে বলেছিলেন তাঁকে আর ধরা যাবে না, কারণ তিনি তখন জলপুলিসের আন্ডারে। আর এ যুগে আসাম পুলিসের হাত গুজরাট পর্যন্ত লম্বা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের হাত গোয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দেশটা যে প্রেতপুরীতে পরিণত হয়েছে, এই বোধহয় তার সর্বোত্তম প্রমাণ। কারণ ছোটবেলায় জ্যাঠা-জেঠিদের মুখে কলকাতায় মেসে থেকে চাকরি করা এক গ্রাম্য ভদ্রলোকের গল্প শুনেছিলাম। তিনি বহুকাল পরে বাড়ি গিয়ে খেতে বসেছেন, ডালের সাথে মেখে খাবেন বলে দুটি পাতিলেবুর আবদার করেছেন। করেই দেখেন বউয়ের হাতদুটো ইয়া লম্বা হয়ে নিজের বাড়ির সীমানা পেরিয়ে পাশের বাড়ির গাছ থেকে লেবু পেড়ে নিয়ে এল। আসলে ওলাউঠার মহামারীতে গ্রাম সাফ হয়ে গিয়েছিল। ঘৃণার মহামারীতে আমাদের দেশ সাফ হয়ে গেছে। গল্পের ভদ্রলোক শহরে পালিয়ে বেঁচেছিলেন, আমরা কোথায় পালিয়ে বাঁচব জানি না। ভারত জোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি? আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি।

আমরা ভারতীয়, আমরা মেনে নিতে জানি। যা যা বলা বারণ, লেখা বারণ সেগুলো মেনে নিয়ে চলব বলেই ঠিক করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম অবাক কাণ্ড! কেবল আমরা মানিয়ে নিলে চলবে না, হাজার ভণ্ডামি ও নোংরামি সত্ত্বেও যে সংসদের দিকে আমরা তাকিয়ে থাকি তার সদস্যদের জন্যেও তালিকা তৈরি হয়েছে। ভগবান, থুড়ি সরকার, যাতে নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারেন, কেউ গোল করতে না পারে তার নিশ্ছিদ্র ব্যবস্থা করতে কোন কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে না, অর্থাৎ কোনগুলো অসংসদীয়, তার নতুন ফর্দ প্রকাশিত হয়েছে সংসদের মৌসুমি অধিবেশনের প্রাক্কালে। সেখানেই শেষ নয়, আরও বলা হয়েছে, সংসদ চত্বরে কোনো “ডেমনস্ট্রেশন”, ধর্না, ধর্মঘট করা যাবে না। এমনকি অনশন বা কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানও করা যাবে না। অর্থাৎ সমস্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের মন্দিরে বারণ। এ হল সেই মন্দির, যেখানে প্রথমবার প্রবেশ করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘটা করে সিঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান করা যাবে না – এই দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ আদেশের কারণ অবশ্য দুর্বোধ্য। কারণ মাত্র কয়েকদিন আগে নতুন সংসদ ভবনে দন্তবিকশিত সিংহের মূর্তি স্থাপন করার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিজে পুজো-আচ্চা করেছেন। তাহলে বক্তব্যটি কি এই, যে পুরনো মন্দিরে পুজো চলবে না, নতুন মন্দিরে চলবে? গণতন্ত্রের মন্দিরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিষিদ্ধ করার অর্থই বা কী? তাহলে কি শান্তিভঙ্গ করে যেসব প্রতিবাদ প্রণালী, সেগুলোর পথ পরিষ্কার করা হচ্ছে? মোদীজির বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর ক্যাপিটল হিলে যেরকম প্রতিবাদ দেখে সারা বিশ্ব শিউরে উঠেছিল, তেমন প্রতিবাদ ছাড়া কি এ দেশে আর কোনো প্রতিবাদ করতে দেওয়া হবে না? করলেই বুলডোজার চালানো হবে? প্রতিবাদের চেহারা অবশ্য বিচিত্র। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় আরেক ধরনের প্রতিবাদ হচ্ছে। প্রতিবাদের ধরনধারণ, সীমানা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আজ পর্যন্ত কোনো দেশের কোনো শাসকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। অবশ্য মোদীজি বালক বয়সে খালি হাতে কুমিরের মুখ থেকে ক্রিকেট বল এবং কুমিরছানা নিয়ে এসেছেন। তাঁর অসাধ্য কী?

মোদীজির সরকার কী কী পারে তা আমরা এতদিনে জেনে ফেলেছি, বিরোধীরা কী পারেন তা দেখা এখনো বাকি আছে। অসংসদীয় শব্দের তালিকার সংযোজনগুলো সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। দু-একজন বিরোধী সাংসদ বলছেন বটে, তাঁরা নির্দেশ অগ্রাহ্য করে ওই শব্দগুলো সংসদে ব্যবহার করবেন, কিন্তু সেই ২০১৪ সাল থেকে তাঁরা যেরকম লক্ষ্মীসোনা হয়ে আছেন, তাতে না আঁচালে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না। পালানিয়প্পম চিদম্বরমের মত দু-একজন প্রবীণ সাংসদ তো ইতিমধ্যেই টুইট করে দেখিয়েছেন, ভাষার উপর দখল থাকলেই যে শব্দগুলোকে অসংসদীয় বলে ঘোষণা করা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়েও সরকারের সমালোচনা করা সম্ভব। সোশাল মিডিয়ায় মস্করাও চালু হয়েছে, শশী থারুরের মত জ্যান্ত থিসরাস থাকতে আর কিসের চিন্তা? এমন সুবোধ বিরোধী থাকতে আমাদের আর কিসের চিন্তা? ইন্টারনেট জোক আর মিম সংস্কৃতি এমন গভীরে পৌঁছেছে যে সাংসদরাও গভীরে ভাবছেন না। তাঁরা বোধহয় ভেবে দেখছেন না, যে কোনো শব্দ অসংসদীয় বলে ঘোষিত হল মানে জোর করে সে শব্দ উচ্চারণ করলেও সংসদের কার্যবিবরণীতে তা নথিবদ্ধ করা হবে না। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে অন্তত সংসদের কার্যবিবরণী থেকে কোনো ইতিহাস লেখক জানতে পারবেন না যে ভারতে ‘স্নুপগেট’ বলে কিছু ঘটেছিল, কেউ ‘ডিক্টেটোরিয়াল’ ছিল বা সরকারের বিরুদ্ধে ‘তানাশাহি’-র অভিযোগ ছিল। মনোমত ইতিহাস লেখার যে ব্যবস্থা ভারতে চলছে, এ-ও যে তারই অঙ্গ, সেকথা বিরোধী দলের কেউ বুঝছেন কি? শুধু ইতিমধ্যেই লিখিত ইতিহাস বিকৃত করা নয়, এই অসংসদীয় শব্দের তালিকা যে ভবিষ্যতে যে ইতিহাস লেখা হবে তা-ও বিকৃত করার প্রচেষ্টা, তা বিরোধীরা কেউ ভেবে দেখেছেন বলে তো মনে হচ্ছে না।

আরও পড়ুন পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হলে ক্ষতি নেই বিজেপির

এত সহজে ইতিহাস থেকে সত্য মুছে ফেলা যায় কিনা সে বিতর্ক নেহাতই বিদ্যায়তনিক। তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে বিরোধী দলের রাজনীতিবিদদের অধিকার হরণ শুরু হওয়া মাত্রই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমাদের বিরোধীরা তেমন করেন না। তাঁদের মধ্যে বিদ্যাসাগর কথিত গোপালরাই দলে ভারি। মাঝেমধ্যে রাহুল গান্ধী রাখাল হয়ে ওঠেন বটে, কিন্তু কদিন না যেতেই ইউরোপে দম নিতে চলে যান। সুললিত ইংরেজি বলতে পারা থারুর বা মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েনরাই আজকের সংসদীয় বিরোধিতার মুখ। তাঁরা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত বা সোমনাথ চ্যাটার্জির মত জাঁদরেল নন, সেকালের মমতা ব্যানার্জির মত ওয়েলে নেমে গিয়ে স্পিকারের মুখে কাগজ ছুড়ে মারার মত মেঠো রাজনীতিও তাঁদের আসে না। তেমন কাজ করলেও দল যে তাঁদের পাশে দাঁড়াবেই, তার নিশ্চয়তা নেই। এমন বিরোধী পেলে যে কোনো শাসকেরই পোয়া বারো হয়। তারা কাকে রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী করবে তা নিয়ে অযথা মাথা ঘামায়, শেষ লগ্নে মাথা চুলকে বলে, আগে বললে তো ওনাদের প্রার্থীকেই সমর্থন করতাম। এদিকে সরকার নিশ্চিন্তে একের পর এক অধিকার হরণ করে চলে।

অতএব আমরা, সাধারণ ভারতীয়রা, আধেক ধরা পড়ে বাকি আধেকের আশঙ্কাতেই থাকি। ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া বা রচপ তৈয়প এর্দোগানের তুরস্কে মানুষ যেমন মুখ বুজে বাঁচে, তেমনভাবে বাঁচা আমাদের শিগগির অভ্যাস করে নিতে হবে। তবে অসংসদীয় শব্দের তালিকার মত হাজতে পোরার যোগ্য শব্দেরও একটা প্রকাশ্য তালিকা থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

ইংল্যান্ডের নতুন ক্রিকেট ভারতীয়দের যা শেখাল

১৯৯৬ বিশ্বকাপে একদিনের ক্রিকেটের ব্যাটিংয়ে সনৎ জয়সূর্য আর রমেশ কালুভিথরনার জুটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেওয়ার কিছুদিন পরের কথা। একটা ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে দুরমুশ হওয়ার পর ভারত অধিনায়ক শচীন তেন্ডুলকরকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আগে ব্যাট করে কত রান করলে এই শ্রীলঙ্কাকে হারানো যাবে বলে মনে হয়? শচীন অসহায়ের মত উত্তর দিয়েছিলেন, বোধহয় এক হাজার। গত মঙ্গলবার এজবাস্টনে পুরস্কার বিতরণের সময়ে যশপ্রীত বুমরার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, মার্ক বুচার যদি জিজ্ঞেস করতেন চতুর্থ ইনিংসে কত রানের লক্ষ্যমাত্রা দিলে ইংল্যান্ডকে হারানো যাবে বলে মনে হয়, তাহলে বুমরা শচীনের উত্তরটাই দিতেন। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে যদি কোনো দল ৩৭৮ রান মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে তুলে পঞ্চম দিন মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই খেলা শেষ করে দেয়, তাহলে হেরে যাওয়া দলের অধিনায়ক এছাড়া আর কী-ই বা বলতে পারেন? এজবাস্টনে যা ঘটেছে তা আরও বেশি চমকপ্রদ, আরও সুদূরপ্রসারী এই জন্যে যে টেস্টের ইতিহাসে এই প্রথমবার কোনো দল পরপর চারটে ম্যাচ চতুর্থ ইনিংসে আড়াইশোর বেশি রান তুলে জিতল। এই রানগুলো যে গতিতে তোলা হয়েছে সেটাও টেস্ট ক্রিকেটে চট করে হয় না। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সাংবাদিক, সমর্থকরা আদর করে এই ধারার ব্যাটিংয়ের নাম দিয়েছেন ‘ব্যাজবল’ – দলের কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ডাকনাম ব্যাজ, সেই কারণে। ঘটনাটা যেহেতু একবার মাত্র ঘটেনি, পরপর চারবার ঘটে গেল, সুতরাং মানতেই হবে ব্যাজবল একটা নতুন ধারা। ব্যাজবল টেস্ট ক্রিকেটের প্রচলিত ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে এক বিদ্রোহ। যতক্ষণ ইংল্যান্ডের বাইরে নানারকম পরিবেশে, নানারকম পিচে এ জিনিস করা হচ্ছে ততক্ষণ একে বিপ্লব বলা চলবে না ঠিকই। কিন্তু প্রয়াসটা যে বৈপ্লবিক তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই সহজ কথাটা মেনে নিতে কিন্তু ভারতীয়দের প্রচণ্ড অসুবিধা হচ্ছে। এজবাস্টন টেস্টের আগে থেকেই ইংল্যান্ড যা করছে তা যে নতুন কিছু নয়, তা ঠারেঠোরে ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে সাধারণ দর্শক – সকলেই বলছিলেন। জোর গলায় ব্যাজবল নিয়ে ঠাট্টা ইয়ার্কি শুরু হয়ে যায় ঋষভ পন্থ ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ইনিংসে খেলে ফেলতেই। ইংল্যান্ড ব্যাটিং প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ হওয়ায় তাচ্ছিল্যের মাত্রা বেড়ে যায়। জনি বেয়ারস্টোর একা কুম্ভের মত শতরানকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের দেখাদেখি ক্রিকেটভক্তদের মধ্যেও সিরিজ সম্প্রচারকারী টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞাপন মাফিক ইংল্যান্ডকে ধোলাই দেওয়া হচ্ছে বলে উল্লাস চলছিল। চতুর্থ দিন দুপুরে ভারত যখন ৩৭৮ রানের লক্ষ্যমাত্রা খাড়া করে অল আউট হয়ে গেল, তখন আমরা কত অসাধারণ দল, আমাদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই ব্যাজবল কেমন অশ্বডিম্ব প্রসব করল – এসব উচ্চমার্গীয় আলোচনা চলছিল। কিন্তু বার্মিংহামে সন্ধে নামার আগেই গলা নামিয়ে ফেলতে হল সকলকে। বেয়ারস্টো আর ইংল্যান্ড অধিনায়ক বেন স্টোকস ফর্মে থাকলে তবেই ব্যাজবল খেলা সম্ভব – এমনটা ভেবে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে বিশেষজ্ঞরা, তাঁরা দেখলেন ইংল্যান্ডের দুই নড়বড়ে ওপেনারই দারুণ আত্মবিশ্বাসে আক্রমণাত্মক ব্যাট করলেন। জ্যাক ক্রলি কিছুটা সাবেকি ওপেনারদের ঢঙে খেললেও অ্যালেক্স লিজ শামি, বুমরা, সিরাজ – সকলকেই আক্রমণ করলেন। বাঁহাতি ব্যাটারের অফস্টাম্পের বাইরে তৈরি হওয়া পিচের ক্ষত কাজে লাগিয়ে রবীন্দ্র জাদেজা ভেলকি দেখাবেন বলে আশা ছিল। লিজ প্রথম ওভার থেকেই তাঁকে আক্রমণ করে সে আশায় জল ঢেলে দিলেন। সব মিলিয়ে ওভার পিছু পাঁচ রান করে নিয়ে ইংল্যান্ড একশো পেরিয়ে গেল। এরপর অস্থায়ী অধিনায়ক বুমরা দ্রুত দুটো উইকেট তুলে নিয়ে কিছুটা আশা দেখিয়েছিলেন। কিন্তু অতঃপর যা ঘটল, তাকে ক্রিকেটের সাহেবি পরিভাষায় কী বলে সে কথা থাক, গোদা বাংলায় বলে দুরমুশ করা। ক্ষণেকের জন্য বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে জো রুট লিজের রান আউটের কারণ হয়ে না দাঁড়ালে হয়ত ভারতের হারের ব্যবধানটা আরও হতভম্ব করার মত হত। যা-ই হোক, শেষপর্যন্ত রুট আর বেয়ারস্টো যথাক্রমে ৮২.০৮ আর ৭৮.৬২ স্ট্রাইক রেটে ৩৪টা চার আর দুটো ছয় মেরে কার্য সমাধা করেছেন।

ভারতীয় পণ্ডিতরা ভাঙবেন তবু মচকাবেন না। ম্যাচের পর স্টুডিওতে বসে সঞ্জয় মঞ্জরেকর মাথা নেড়ে বললেন এই ব্যাটিংটা ব্যাজবল নয়, এটা হল “সেন্সিবল ব্যাটিং”। মানে মোগলসরাইয়ের নাম দীনদয়াল উপাধ্যায় নগর, টালিগঞ্জের নাম উত্তমকুমার। সঞ্জয় একা নন। ম্যাচটা শেষ হয়েছে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল; অজিত আগরকর, বীরেন্দর সেওয়াগ, ওয়াসিম জাফররা এখনো অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এটা প্রমাণ করতে যে ইংল্যান্ড নতুন কিছু আবিষ্কার করেনি। আপাতত যে তত্ত্বটি খাড়া করা হয়েছে, তা হল এমন ব্যাটিং তো ঋষভ পন্থই করে। এ আর নতুন কী? অনেকে ভিভ রিচার্ডস, সেওয়াগ, জয়সূর্য, অ্যাডাম গিলক্রিস্টেরও নাম করেছেন। পণ্ডিতদের (এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের ভক্তদের) বোঝানো দুঃসাধ্য যে কোনো একজন ব্যাটারের টেস্টে একদিনের ক্রিকেটের মেজাজে ব্যাটিং ব্যাজবল নয়, নতুন কিছুও নয়। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যানই তো একবার একদিনে ৩০০ রান করেছিলেন (১১ জুলাই ১৯৩০)। কিন্তু একটা আস্ত টেস্ট দলের ব্যাটিং কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্য কিছু না ভেবে রান তাড়া করে যাওয়া, এক থেকে এগারো নম্বর, সবাই সেই নীতি মেনে ব্যাট করছে – এমনটা টেস্টের ইতিহাসে হয়নি। জো রুটের মত কপিবুক ব্যাটার নিয়মিত স্পিনারদের সুইচ হিট মারছেন, জোরে বোলারদের ব্যাট উল্টে স্লিপের মাথার উপর দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠাচ্ছেন। অর্থাৎ দলের পরিচালকরা এটাই চাইছেন। স্টোকস এজবাস্টনে টস জিতে বলেছিলেন, তাঁর দল রান তাড়া করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। টেস্ট ম্যাচে টসে জিতে ফিল্ডিং নেওয়া হবে না প্রথমে ব্যাট করা হবে, তা ঠিক হচ্ছে পিচ বা আবহাওয়ার চরিত্র দেখে নয়, রান তাড়া করার পারদর্শিতা মাথায় রেখে – এ জিনিস অভূতপূর্ব। শুধু টেস্ট খেলা নয়, খেলাটাকে নিয়ে আলোচনা করার মানদণ্ডটাই তো বদলে দিল ইংল্যান্ড। ব্যাজবল বলুন বা অন্য কিছু বলুন, নামে কী আসে যায়? ব্যাজবলকে যে নামেই ডাকা হোক, তার সুগন্ধ কমে না। মুশকিল হল, আমরা ভারতীয়রা আর খেলার সুগন্ধ পাই না, সেটা সামরিক লড়াইসুলভ প্রতিহিংসার পূতিগন্ধে চাপা পড়ে যায়। আমাদের দলকে প্রত্যেক খেলায় জিততে হবে, আম্পায়ারের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত আমাদের পক্ষে যেতে হবে। অন্যথা হলে আমাদের খেলোয়াড়রা দাঁত নখ বের করে ফেলেন, আমরাও গ্যালারিতে বা টিভির/মোবাইলের সামনে বসে ব্যাপারটা জাতীয় সংকট হিসাবে ধরে নিয়ে ফুঁসতে থাকি। প্রতিপক্ষের ভাল বোলিং বা ব্যাটিং দেখে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাই যখন হারিয়ে গেছে, তাদের দলগত উদ্ভাবনী ক্ষমতা দেখে তারিফ করার ক্ষমতা আর থাকবে কী করে?

তবে প্রাক্তন ক্রিকেটাররা কী বললেন; বিশ্লেষক, সাংবাদিকরা কী টুইট করলেন আর তার প্রভাবে সাধারণ ক্রিকেটভক্তদের কী প্রতিক্রিয়া হল তা নিয়ে আলোচনার দরকার হত না, যদি না প্রতিপক্ষের অভিনবত্বকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা খোদ ভারতীয় ক্রিকেট দলের মধ্যেই দেখা যেত। এজবাস্টনে ভারত যেভাবে খেলেছে, তাতে মনে করা অমূলক নয় যে বুমরা আর কোচ রাহুল দ্রাবিড়ও ব্যাজবল ব্যাপারটাকে স্রেফ ইংরেজ মিডিয়ার অতিকথন বলেই ধরে নিয়েছিলেন। তাই তার জন্যে আলাদা করে কোনো পরিকল্পনা করেননি। নইলে হু হু করে রান হয়ে যাচ্ছে দেখেও রানের গতি কমানোর জন্যে চতুর্থ দিন রক্ষ্মণাত্মক ফিল্ডিং সাজানো, রক্ষণাত্মক বোলিং করা হল না কেন? তাহলে কি ধরে নেওয়া হয়েছিল, কোনোভাবে কয়েকটা উইকেট ফেলতে পারলেই ইংল্যান্ড ম্যাচ বাঁচানোর কথা ভাববে, যেমনটা টেস্ট ক্রিকেটে চিরকাল হয়ে এসেছে? দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের ব্যাটিং দেখেও মনে হয়নি, তারা এমন একটা দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করছে যারা পরপর তিনটে টেস্টে ঝড়ের গতিতে আড়াইশোর বেশি রান তাড়া করে জিতেছে। চেতেশ্বর পুজারা ছাড়া আর কেউ যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাট করে ইংল্যান্ডের রান তোলার সময় কমিয়ে ফেলার কথা ভেবেছেন, এমন লক্ষণ দেখা যায়নি। ঋষভ যে সময়ে যে শট খেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আউট হলেন, তাতেও মনে হয় তাঁর ধারণা হয়েছিল যথেষ্ট রান উঠে গেছে। এরপর দ্রুত যা পাওয়া তা-ই বোনাস। এমনিতে ৩৭৮ রান যথেষ্ট বলে মনে হওয়া দোষের নয়। কিন্তু ভিডিও অ্যানালিস্ট, পরিসংখ্যানবিদ ইত্যাদি বাহিনী সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেট দল নিউজিল্যান্ড সিরিজের কথা জেনেও এত নিশ্চিন্ত থাকতে পারল?

অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটে টেস্টে (দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ দুটো টেস্ট আর এজবাস্টন) চতুর্থ ইনিংসে বোলাররা চরম ব্যর্থ হওয়ার পর যে ভারতীয় বোলিংকে এতদিন পাইকারি হারে সর্বকালের সেরা তকমা দেওয়া হচ্ছিল, তাকে নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। আসলে অন্ধ হলে যে প্রলয় বন্ধ থাকে না, সে কথাটা অন্য সব ক্ষেত্রের মত ক্রিকেটেও আমরা অনেকদিন হল ভুলে থাকা অভ্যাস করেছি। তার ফল দেখে এখন মাথা চুলকোতে হচ্ছে। বোলারদের আর দোষ কী? ইংল্যান্ডের মত ফর্মে থাকা, জয়ের ছন্দে থাকা ব্যাটিংয়ের বিরুদ্ধে যদি আপনি তিনজন বোলার আর দুজন আধা অলরাউন্ডার নিয়ে খেলতে নামেন, তাহলে এমন ফল হওয়া তো অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে যখন পিচ ম্যাচের শেষ দুদিনে বোলারদের যতটা সাহায্য করার কথা ততটা করল না।

তিনজন খাঁটি পেসারের সঙ্গে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মত একজন খাঁটি স্পিনারকে খেলানো হয়নি, খেলেছেন শার্দূল ঠাকুর আর রবীন্দ্র জাদেজা। এই একই কৌশল বিরাট কোহলি আর রবি শাস্ত্রীও নিয়েছিলেন ম্যাচের পর ম্যাচ। তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হয়েছিল, কিন্তু দেখা যাচ্ছে রোহিত শর্মা (এ ম্যাচে বুমরা)-দ্রাবিড় জুটিও একই কৌশল নিচ্ছে। জাদেজাকে আধা অলরাউন্ডার বললে অনেকে যারপরনাই রাগ করেন, কিন্তু সত্যিটা হল দেশের মাঠে তিনি একজন ম্যাচ জেতানো স্পিনার। কিন্তু বিদেশে ক্রিকেট খেলার সময়ে তিনি একজন শক্তিশালী ব্যাটার, যিনি সামান্য হাত ঘোরাতে পারেন। গত ৪-৫ বছরে বিদেশের মাঠে ভারতের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটার হলেন ঋষভ আর জাদেজা। ভারতের তিন, চার আর পাঁচ নম্বর সেই ২০১৮-১৯ সালের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকেই নড়বড়ে। পুজারা, বিরাট আর অজিঙ্ক রাহানে যতগুলো ইনিংসে একসাথে সফল হয়েছেন তার চেয়ে বেশি ইনিংসে ব্যর্থ হয়েছেন। উদ্ধার করেছেন নীচের সারির ব্যাটাররা। কখনো ঋষভ, কখনো বোলারদের সঙ্গে নিয়ে জাদেজা। অতএব উপরের তিনজনের ব্যর্থতা ঢাকতে তাঁর ব্যাটটা দরকার, তাতে বোলিং শক্তিতে যতই ঘাটতি হোক। একই কারণে বল হাতে তেমন সাফল্য না পেলেও হার্দিক পাণ্ড্যাকে এগারোটা টেস্ট খেলানো হয়েছিল। চোটের কারণে হার্দিক সরে যাওয়ার পর আনা হয়েছে শার্দূলকে। হার্দিকের তবু কিছুটা গতি ছিল, শার্দূলের তা-ও নেই। পিচ থেকে একেবারে সাহায্য না পেলে, প্রধান বোলাররা প্রথম দিককার উইকেটগুলো না নিতে পারলে শার্দূলের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মূলত বুমরা আর শামি দীর্ঘকাল দারুণ ফর্মে থাকায় এইসব ফাঁকফোকর ধরা পড়েনি। তাঁরা এখন প্রাকৃতিক নিয়মেই ফর্ম হারাচ্ছেন, আর ফাঁকগুলো বিরাট হাঁ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাহানেকে অনেক ব্যর্থতার পরে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুজারা আর বিরাট এখনো খেলে যাচ্ছেন। পুজারার কোনো ব্র্যান্ড ভ্যালু নেই, তিনি সাদা বলের ক্রিকেটে জায়গা করে নিতে পারেননি, আইপিএলও খেলেন না। তাই তাঁর যোগ্যতা নিয়ে তবু প্রশ্ন তোলা চলে। তিনি প্রথম একাদশ থেকে বেশ কয়েকবার বাদ গেছেন। উপর্যুপরি ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কা সিরিজেও বাদ পড়েছিলেন, কাউন্টি ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করে ফেরত আসতে হয়েছে। কিন্তু বিরাট হলেন অনির্বচনীয় গুণের আধার। ২০১৮-১৯ মরসুমের অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে বিরাট বা পুজারা কেউই ধারাবাহিকভাবে রান করেননি। নভেম্বর ২০১৯ থেকে দুজনের পারফরম্যান্স পাল্লা দিয়ে খারাপ হয়েছে। প্রথম জনের গড় ২৯.৬৪, দ্বিতীয় জনের ২৮.৩১। কিন্তু দলে বিরাটের জায়গা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না। সকলেই জানে, তিনি যে কোনো দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর ৭১তম শতরানটি করে রানে ফিরবেন। ততদিন জাদেজা, শার্দূলরা তাঁর রানগুলো করে দেবেন না কেন?

আরও পড়ুন বড় ক্রিকেটারে নয়, বিরাট ব্র্যান্ডে মোহিত জনগণমন

শাস্ত্রী-কোহলির দেখানো এই পথেই রাহুল-রোহিত হাঁটছেন যখন, তখন এই পথে আলো জ্বেলে এ পথেই ভারতীয় ক্রিকেটের ক্রমমুক্তি হবে নিশ্চয়ই। বছরের গোড়ায় যখন নতুন লোকেদের হাতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হল, তারপর সাঁইত্রিশ পেরনো ঋদ্ধিমান সাহাকে দ্রাবিড় জানিয়ে দিলেন তাঁর কথা আর ভাবা হবে না, তখন মনে হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট সত্যিই বদলাচ্ছে। কিন্তু এখন আবার সবাই চলতি হাওয়ার পন্থী। অফ ফর্মে থাকা বিরাট, সদ্য কোভিডের জন্য টেস্ট না খেলা অধিনায়ক রোহিত প্রমুখ বিশ্রাম নেবেন। তাই ওয়েস্ট ইন্ডিজে একদিনের ম্যাচে ভারতের অধিনায়কত্ব পাচ্ছেন সাঁইত্রিশের দিকে এগোনো শিখর ধাওয়ান।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

দেশপ্রেমিক সংগঠনে সন্ত্রাসবাদী স্লিপার সেল?

উমর খালিদ, শার্জিল ইমাম, তালিব হুসেন শাহ, রিয়াজ আত্তারি – এদের মধ্যে মিল কোথায়? চারজনেই যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী তা তো নামগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু তারপর? এরা কি সবাই দেশদ্রোহী সন্ত্রাসবাদী, নাকি দেশপ্রেমিক? আলোচনা করা যাক।

প্রথম দুজন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি বম্বের মত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা এবং অধ্যাপনা করেছেন, রাজনীতি করেছেন। দুজনেই প্রকাশ্য সভায় জনতাকে প্রতিবাদ করতে বলার অপরাধে দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ রয়েছেন। উমর নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করেন, শার্জিল অন্য পথের পথিক। কিন্তু দুজনেই নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শার্জিলকে ওই আন্দোলনের অঙ্গ হিসাবেই দেওয়া দুটো বক্তৃতার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অভিযোগ – তিনি হিংসায় প্ররোচনা দিচ্ছিলেন। উমরের বিরুদ্ধে দিল্লি দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুজনের কারোর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ আজ অব্দি প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু ইউএপিএ আইনের দস্তুর অনুসারে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এরা কারারুদ্ধ থাকা অবস্থাতেই প্রমাণ জোগাড় করে যাওয়ার অধিকার আছে। তাই শার্জিল ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আর উমর ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাস থেকে গরাদের পিছনে আছেন। জামিন খারিজ হয়েছে কিছু মামলায়, কোথাও জামিন হয়েছে, কোনোটার আবার শুনানিই হয়নি এখনো।

তৃতীয় ব্যক্তি তালিব ইসলামিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবার অন্যতম কমান্ডার। তিনি জম্মুর রাজৌরির বাসিন্দা। গত রবিবার রেয়াসি জেলার টুকসানে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে বিস্তর অস্ত্রশস্ত্র সমেত ফয়জল আহমেদ দার বলে আরেকজনের সঙ্গে তিনি ধরা পড়েন বলে খবরে প্রকাশ। চতুর্থ ব্যক্তি রিয়াজ মানুষ খুনে অভিযুক্ত। রাজস্থানের উদয়পুরে কানহাইয়া লাল নামে একজনকে সে আর ঘাউস মহম্মদ নৃশংসভাবে খুন করে, সে দৃশ্যের ভিডিও তুলে সগর্বে শেয়ারও করে। এমন করার কারণ কী? কানহাইয়া হজরত মহম্মদ সম্পর্কে বিজেপির সাসপেন্ড হওয়া মুখপাত্র নূপুর শর্মার নোংরা মন্তব্যের সমর্থনে সোশাল মিডিয়ায় কিছু পোস্ট করেছিলেন। রিয়াজ ও ঘাউসের মতে তা মহাপাপ। এ কাজে তাদের দুই স্যাঙাতের সন্ধানও পাওয়া গেছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।

রাজৌরির তালিব আর উদয়পুরের রিয়াজের মধ্যে একটা চমকপ্রদ মিল আছে। দুজনেই বিজেপির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। তালিব নাকি বিজেপির জম্মু এলাকার মাইনরিটি মোর্চার সোশাল মিডিয়ার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক। জম্মু ও কাশ্মীরের বিজেপি প্রেসিডেন্ট রবীন্দর রায়না তাঁকে পুষ্পস্তবক দিচ্ছেন, এমন ছবিও পাওয়া গেছে। দেশের প্রবল প্রতাপান্বিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পিছনে অন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে তালিব দাঁড়িয়ে আছেন, এমন একখানা ছবি আছে বলেও জম্মু ও কাশ্মীরের কংগ্রেস দাবি করেছে। অন্যদিকে রিয়াজ যে উদয়পুরের বিজেপির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন তারও একাধিক লক্ষণ দেখা গেছে। বিজেপির বক্তব্য রিয়াজ তাদের দলে ঢুকতে চাইতেন মাত্র, কিন্তু কানহাইয়া হত্যার বহু আগে থেকেই যে বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের নেতাদের সাথে রিয়াজের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার একাধিক প্রমাণ সোশাল মিডিয়া থেকেই উঠে এসেছে।

এমন হতেই পারে যে সত্যিই দেশপ্রেমিক বিজেপি নেতারা কিছু বুঝতে পারেননি, সন্ত্রাসবাদীরা তাঁদের মধ্যে সুকৌশলে সেঁধিয়ে গেছে। গত দু-তিন দশকের হিন্দি সিনেমার মনোযোগী দর্শকদের বলে দিতে হবে না, স্লিপার সেল কী জিনিস। শত্রু সংগঠনে ঢুকে পড়ে ভিতর থেকে সেই সংগঠনের ক্ষতি করার কৌশল তো আরও পুরনো। অক্ষয় কুমারের ভক্তদের দায়িত্ব দিলে তো তাঁরা স্লিপার সেল চিহ্নিত করে তাদের শেষ করে দেওয়ার উপায়ও বাতলে দেবেন সম্ভবত। কিন্তু মুশকিল হল, বিজেপির মত এক নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দলের নেতারা বুঝতেই পারেননি এতবড় কাণ্ড হয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের মত একজন জেমস বন্ডের উপস্থিতি সত্ত্বেও দেশের শাসক দলে সন্ত্রাসবাদীরা দিব্যি ঢুকে পড়ছে – এ বড়ই চিন্তার বিষয়। আমরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসবাণীতে ভরসা করেছিলাম। আমরা জানতাম তিনি পোশাক দেখলেই সন্ত্রাসবাদী চিনতে পারেন। তিনি পারেন আর তাঁর দলের অন্যরা পারেন না – এমন তো আমাদের জানা ছিল না! লেখার শুরুতেই একই পংক্তিতে দুজন রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী আর একজন সম্ভাব্য সন্ত্রাসবাদীর নাম করেছি, তার কারণ ওরকম নামের লোক মানেই যে নিরপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী, তা-ই আমাদের এতদিন শেখানো হয়েছে। কারা দেশদ্রোহী আর কারা দেশপ্রেমিক, তার স্পষ্ট তালিকা আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু তালিব আর রিয়াজ ধরা পড়ায় সব যে গুলিয়ে গেল।

আরও পড়ুন মঈন সম্পর্কে কুৎসিত বিদ্রূপে সন্দেহ জাগে, তসলিমা কি হিন্দুত্বের ট্রোজান ঘোড়া? 

তাহলে কি ধরে নিতে হবে ইউএপিএ আইনে অভিযুক্ত উমর, শার্জিল, সিদ্দিক কাপ্পানের মত মুসলমান বা সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা, ভারভারা রাওয়ের মত হিন্দু এবং রোনা উইলসন, ফাদার স্ট্যান স্বামীর মত খ্রিস্টানরাই শুধু নয়; ঘোষিত দেশপ্রেমিক সঙ্ঘ পরিবারের মধ্যেও দেশদ্রোহীদের উপস্থিতি আছে? না হয় স্লিপার সেলই হল। দুটো স্লিপার সেলের কথা জানা গেছে, এমন কত স্লিপার সেল যে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে তার সন্ধান দেবে কে? যে দেশদ্রোহীরা ধরা পড়েছে, তাদের ব্যবস্থা তো হয়েই গেছে। গত বছর আজকের দিনেই তো পারকিনসন্স ডিজিজের রোগী স্ট্যান স্বামী শেষ কটা দিন জল খাওয়ার জন্য স্ট্র পর্যন্ত না পেয়ে কারাগারেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। আর গতকাল শার্জিল আদালতকে জানিয়েছেন জেলের মধ্যে ৮-৯ জন বন্দী তাঁকে মারধোর করেছেন, তাঁর নিরাপত্তা সম্পর্কে আর নিশ্চিন্ত থাকা যাচ্ছে না।

কিন্তু দেশপ্রেমিক সর্ষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ভূতদের কী হবে?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

বোর্ডের ঘরে যে ধন আছে, ক্রিকেটের ঘরে সে ধন আছে?

রাজা বাদশারা বিশেষ আনন্দের দিনে দাঁড়িপাল্লার এক দিকে বসতেন আর অন্যদিকে চাপানো হত সোনাদানা। হুজুরের ওজনের সমান সম্পদ গরীবগুরবোদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হত। সবকিছুকেই কতটা ধন পাওয়া যাবে তার সাপেক্ষে মাপার সেই কি শুরু? কে জানে! তবে আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন সাফল্য-ব্যর্থতা তো বটেই, উৎকর্ষ-অপকর্ষ, উচিত-অনুচিতও টাকা দিয়েই মাপা হয়। তাই খেলার খবরেও ঢুকে পড়ে টাকার হিসাব; খেলোয়াড়দের রান, উইকেট, ক্যাচের চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের নিলামে তাঁদের দর। স্বভাবতই ক্রিকেট দলের সাফল্য দিয়ে ক্রিকেট বোর্ডের সাফল্য মাপার দিনও শেষ, দলের ব্যর্থতায় বোর্ডের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার যুগও গত হয়েছে। ভারতীয় ক্রিকেট দলের মতই ক্রিকেট বোর্ডও আমাদের নয়নের মণি, কারণ বোর্ড সফল। তাই আমরা প্রশ্ন তুলি না, বোর্ড সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি আর সচিব জয় শাহের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরেও তাঁরা কেন চেয়ার ছাড়ছেন না। কেন তুলব? বোর্ড তো সফল। বহু বছর হল ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী বোর্ডের নাম বোর্ড অফ কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া। এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী আছে? যদি কোনোদিন দেখা যায় ভারতীয় বোর্ডের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, আয়ের দিক থেকে এক নম্বর জায়গাটা অন্য কোনো দেশের হাতে চলে গেছে, তখন কাঠগড়ায় তোলা হবে সৌরভ-জয়কে।

তা সম্প্রতি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড আরও একটা বড়সড় সাফল্য পেয়েছে। এ যুগের বিচারে বিখ্যাত সৌরভ-শচীন জুটির সব সাফল্যের দাম এর চেয়ে কম। কারণ তাঁরা গোটা কয়েক ম্যাচ জিতিয়েছেন ভারতকে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ এবং টুর্নামেন্ট জিতিয়েছেন। সেসবের স্মারক মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বোর্ডের সদর দপ্তরে গেলে দেখা যায়। কিন্তু সৌরভ-জয় জুটি বোর্ডকে সদ্য এনে দিয়েছে ৪৮,৩৯০ কোটি টাকা। এ একেবারে নগদ লাভ। এ জিনিস কেবল ব্যাঙ্কে গেলে দেখা যায় তা নয়, এর উপস্থিতি প্রতি মুহূর্তে টের পাওয়া যায়। পাঁচ বছরের জন্য আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব বেচে এই রোজগার হয়েছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মহামতি জয় শাহ সংবাদসংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পরের ফিউচার টুরস প্রোগ্রামে, অর্থাৎ কোন দেশ কবে কার বিরুদ্ধে কোথায় খেলবে তার যে বিস্তারিত সূচি তৈরি হয় তাতে, আলাদা করে আইপিএলের জন্য আলাদা করে আড়াই মাস সময় দেওয়া থাকবে। মানে সেইসময় পৃথিবীর কোথাও কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা হবে না, যাতে সব দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটাররা শুধু আইপিএল খেলতে পারেন। লক্ষ করুন, এই ঘোষণা করে দিলেন বিসিসিআইয়ের সচিব, আইসিসির কোনো কর্মকর্তা নয়। জয় বলেছেন এ নিয়ে আইসিসি এবং বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা হয়ে গেছে। তা হতেই পারে। কিন্তু ফিউচার টুরস প্রোগ্রাম তো তৈরি করে আইসিসি। তাহলে কোন এক্তিয়ারে জয় এই ঘোষণা করতে পারেন? উত্তর ওই ৪৮,৩৯০ কোটি। এই মূল্যে সম্প্রচার সত্ত্ব বিক্রি হওয়ায় ম্যাচ পিছু সম্প্রচার মূল্যের বিচারে আইপিএল সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের চেয়েও এগিয়ে গেল।

স্রেফ অর্থের জোরে যেমন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বশংবদ, আইসিসি তেমন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের অনুগত। বিশ্ব রাজনীতিতে তবু অবাধ্য চীন আছে, দুর্বিনীত রাশিয়া আছে। ফলে নিজের স্বার্থরক্ষায় যা খুশি করতে পারলেও পৃথিবীর সর্বত্র সর্বদা আমেরিকার কথাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু ক্রিকেট দুনিয়ায় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রতিস্পর্ধী কোনো শক্তি নেই। যে কটা দেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট খেলে, যাদের দেশে ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য বাজার আছে, তাদের মধ্যে ভারত সবচেয়ে জনবহুল এবং ক্রিকেটের জন্য পাগল দেশ। ফলে এখানকার বাজার সবচেয়ে বড়। বিশ্বায়নের আগে, ভারতীয় অর্থনীতির উদারীকরণের আগের যুগে যে বোর্ডগুলো ক্রিকেটের উপর ছড়ি ঘোরাত, সেই ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার একাধিপত্যের জবাব দিচ্ছে বিসিসিআই – এমন একটা কথা ভেবে অনেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক আনন্দ পান। বিসিসিআইয়ের যে কোনো অন্যায়কে এই যুক্তিতে ভারতের ক্রিকেটবোদ্ধারা বৈধ বলে ঘোষণা করে থাকেন বলেই সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীর মনে অমন ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু ঘটনা হল, বিসিসিআই মোটেই কোনো বৈপ্লবিক কায়দায় আইসিসির উপর আধিপত্য কায়েম করেনি। ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) আর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার (সিএ) সাথে সমঝোতা করেই এই ছড়ি ঘোরানো চলছে।

২০১৪ সালে এন শ্রীনিবাসন আইসিসি চেয়ারম্যান থাকার সময়ে রীতিমত আইন করে তৈরি হয় আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন পদ্ধতি, যাকে সাধারণত ‘বিগ থ্রি মডেল’ বলা হয়ে থাকে। এই মডেল অনুযায়ী ২০১৫-২০২৩ সালে আইসিসির আয় থেকে ৪৪০ মিলিয়ন ডলার পেতে পারত বিসিসিআই, প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার পেত ইসিবি আর প্রায় ১৩২ মিলিয়ন ডলার পেত সিএ। যা পড়ে থাকত তা বাকিদের মধ্যে নানা পরিমাণে ভাগ হত। কিন্তু পরে শ্রীনিবাসনের স্থলাভিষিক্ত হন আরেক ভারতীয় – শশাঙ্ক মনোহর। তিনি নিজে ভারতীয় হয়েও তেলা মাথায় তেল দেওয়া বিগ থ্রি মডেলের বিরোধিতা করেন এবং শেষপর্যন্ত ২০১৭ সালে বিগ থ্রি মডেল বাতিল করে ১৪-১ ভোটে পাস হয় নতুন মডেল। সেখানে আইসিসির রাজস্ব থেকে ভারতীয় বোর্ডের প্রাপ্য হয় ২৯৩ মিলিয়ন ডলার, ইংল্যান্ডের বোর্ডের ১৪৩ মিলিয়ন ডলার, বাকি সাত (অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ) পূর্ণ সদস্য বোর্ডের ১৩২ মিলিয়ন ডলার করে আর জিম্বাবোয়ের প্রাপ্য হয় ৯৪ মিলিয়ন ডলার। বিসিসিআই এই নতুন ব্যবস্থায় যারপরনাই রুষ্ট হয়; ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট বোর্ডও খুশি হয়নি। বিগ থ্রি মডেলের পক্ষে তাদের সোজাসাপ্টা যুক্তি – আমরা সবচেয়ে বেশি টাকা এনে দিই, অতএব আমরাই সবচেয়ে বেশি টাকা নেব। এমন নির্ভেজাল বৈষম্যবাদী যুক্তি প্রকাশ্যে বলতে জেফ বেজোস বা ইলন মাস্কের মত ধনকুবেরও লজ্জা পেতেন। মনে করুন, কোনো পরিবারে দশ ভাই। যে তিন ভাই সবচেয়ে বেশি রোজগার করে, তারা যদি খেতে বসে বলে খাবারের বেশিরভাগ অংশ তাদের দিয়ে দিতে হবে – তাহলে যেমন হয় আর কি। ব্যাপারটা যে শুধু দৃষ্টিকটু তা নয়। এই ব্যবস্থা চলতে দিলে যা হবে, তা হল ওই তিন ভাই ক্রমশ মোটা হবে আর বাকিরা অপুষ্টিতে ভুগবে, হয়ত শুকিয়ে মরবে।

পুঁজিবাদ এমনিতে তেলা মাথায় তেল দেওয়ারই ব্যবস্থা; মানুষের সাধ্যমত অবদান গ্রহণ করে তার প্রয়োজন মত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। কিন্তু পুঁজিবাদকেও বাঁচতে হলে খেয়াল রাখতে হয়, যেন শোষণ করার উপযুক্ত শোষিত থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভূতপূর্ব গভর্নর এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজন ও লুইগি জিঙ্গেলসের একটা বইয়ের নামই হল সেভিং ক্যাপিটালিজম ফ্রম দ্য ক্যাপিটালিস্টস ক্রিকেটের বাজার তো এমনিতেই ছোট, কারণ নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে ডজনখানেক দেশ। মনোপলি কায়েম করতে গিয়ে ছোট ছোট দেশগুলোকে শুকিয়ে মারলে যে ব্যবসার ভাল হবে না – তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

কিন্তু একে নব্য উদারবাদী অর্থনীতির যুগ, তার উপর বিসিসিআই হল সর্বশক্তিমান। তাই গোঁসাঘরে মিলিত হয়ে তিন ক্রিকেট বোর্ড নতুন ফিকির বার করল। আইসিসি তো বন্টন করে আইসিসি আয়োজিত প্রতিযোগিতাগুলোর রাজস্ব, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বেশিটাই তো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ। সেই সিরিজের আয় পুরোটাই ভাগ হয় দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে। তাই এই তিন দেশ নিজেদের মধ্যে ঘুরে ফিরে বেশি খেলা আরম্ভ করল। আইসিসির ফিউচার টুরস প্রোগ্রামকে ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ প্রথমত, তা করলে আইসিসি ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। ব্যবসার মুনাফা বাড়ানো উদ্দেশ্য, বিদ্রোহ করা তো নয়। দ্বিতীয়ত, ২০১৯ থেকে চালু হয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। সবার সাথে সবাইকে খেলতে হবে (যদিও রাজনৈতিক কারণে ভারত-পাকিস্তান সিরিজ হয় না), পয়েন্টের প্রশ্ন আছে। তাই ত্রিদেব করলেন কী, নিজেদের মধ্যে চার-পাঁচ টেস্টের সিরিজ খেলা শুরু করলেন। ওদিকে নিউজিল্যান্ডের মত ভাল দলের সঙ্গে ভারত দুটো টেস্টের বেশি খেলে না। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে কটা ম্যাচ খেলা হবে; একই সফরে একদিনের ম্যাচ, টি টোয়েন্টি খেলা হবে কিনা তা নিয়ে দরাদরি চলে। ওই যে বলেছি, খেলার উৎকর্ষ বিচার্য নয়। বিচার্য হল কোন সিরিজ বেচে বেশি টাকা আসবে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় করোনা পরিস্থিতি যখন বেশ খারাপ, তখনো ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর দিব্যি চালু ছিল। অথচ করোনার কারণেই অস্ট্রেলিয়া ২০২০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে তিন টেস্টের সিরিজ বাতিল করে দিয়েছিল।

বিসিসিআই আইসিসিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে ফেলতে পেরেছে এবং ইসিবি আর সিএকে লেজুড় বানিয়ে ফেলতে পেরেছে। এর একমাত্র কারণ টাকা। আর সেই টাকার সবচেয়ে বড় উৎস হল আইপিএল। এই প্রতিযোগিতা কতটা এগিয়ে দেয় বিসিসিআইকে? উদাহরণ হিসাবে এই ৪৮,৩৯০ কোটি টাকাকেই ব্যবহার করা যাক। আগেই বলেছি, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পাস হওয়া আইসিসির নতুন রাজস্ব বন্টন মডেল অনুযায়ী আট বছরের জন্য বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ২৯৩ মিলিয়ন ডলার। মানে আজকের বিনিময় মূল্যে প্রায় ২,২৯৫ কোটি টাকা। যখন এই সিদ্ধান্ত হয় তখন ডলারের সাপেক্ষে টাকার দাম আরও বেশি ছিল, ফলে বিসিসিআইয়ের প্রাপ্য ছিল আরও কম। এই টাকা পাওয়া যায় কিস্তিতে। আগামী দিনে শেষ কিস্তি পাওয়ার সময়ে টাকার দাম পড়তে থাকলে হয়ত আরেকটু বেশি পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যা-ই পাওয়া যাক, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শুধু আইপিএলের পাঁচ বছরের সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি করেই বিসিসিআই তার ২৩-২৪ গুণ বেশি টাকা আয় করতে পারে। এর আগের বছরগুলোর (২০১৫-২২) স্বত্ব বিক্রি করে বোর্ড পেয়েছিল ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকা। আইসিসির দেয় টাকা তো তার কাছেও নস্যি। সুতরাং বিসিসিআইয়ের যদি আর কোনো আয়ের উৎস না-ও থাকে, কেবল আইপিএলই ক্রিকেট জগতে আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট।

এই আধিপত্য খাটিয়ে যা যা করা হচ্ছে তা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নানারকম আপত্তি উঠছে, দুশ্চিন্তা প্রকাশ করা হচ্ছে। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া আজব দেশ। সেখানকার প্রাক্তন ক্রিকেটাররা, বড় বড় সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা নিজেদের ক্রিকেট বোর্ডের দোষ ধরেন। ফলে বিসিসিআইয়ের সাথে হাত মিলিয়ে তারা বিলক্ষণ লাভ করছে জেনেও তাঁরা অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলেন। অস্ট্রেলিয়ার ‘দি এজ’ পত্রিকার ক্রিকেট লিখিয়ে ড্যানিয়েল ব্রেটিগ যেমন লিখেছেন, আইপিএলের আয় আকাশ ছোঁয়ার ফলে টেস্ট ক্রিকেট ক্রমশ মাইনর লিগে পরিণত হতে পারে। তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক নয় তার ইঙ্গিত জয়ের সাক্ষাৎকারে রয়েছে।

এমনিতেই আইসিসির উপর প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম মরসুমে (২০১৯-২১) এক অত্যাশ্চর্য পয়েন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছিল। সব ম্যাচের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল না, কিন্তু সব সিরিজের পয়েন্ট মূল্য সমান ছিল। কারণটা সহজবোধ্য – ত্রিদেব তো নিজেদের মধ্যে যতগুলো টেস্ট খেলবেন, অন্যদের সাথে ততগুলো খেলবেন না। ফলে পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে পাওয়া যাচ্ছিল ১২০ (২৪x৫) পয়েন্ট, আবার ভারত-নিউজিল্যান্ডের দুই টেস্টের সিরিজেও সব ম্যাচ জিতলে সেই ১২০ (৬০x২)। এত বায়নাক্কা বজায় রেখেও অবশ্য খেতাবটা জিততে পারেনি তিন প্রধানের কেউ। বর্তমান মরসুমে এই বায়না আর মানা হয়নি, কিন্তু জয়ের বয়ান অনুযায়ী, আগামী দিনে বছরে আড়াই মাস আইপিএলকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে ঠিক হয়েছে। এদিকে পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাতেও এখন ফ্যাঞ্চাইজ লিগ চালু হয়েছে। ইংল্যান্ডে চালু হয়েছে ১০০ বলের খেলার ফ্যাঞ্চাইজ লিগ – দ্য হান্ড্রেড। সেগুলো অত টাকার খনি নয় বলে আইসিসির আনুকূল্য পাবে না, কিন্তু উপার্জনের প্রয়োজনে বেশকিছু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার সেগুলোতেও খেলেন এবং খেলবেন। নয় নয় করে সারা বিশ্বে কেবল ফ্র্যাঞ্চাইজ লিগই খেলে বেড়ানো ক্রিকেটারের সংখ্যা এখন কম নয়। তাঁদের দর ক্রমশ বাড়ছে, ফলে আরও বেশি সংখ্যক ক্রিকেটার যে আগামী দিনে ওই পথ বেছে নেবেন তাতে সন্দেহ নেই, শীর্ষস্থানীয়রা তো থাকবেনই। তাহলে জাতীয় দলের হয়ে ক্রিকেট খেলবেন কোন ক্রিকেটাররা এবং কখন?

এদিকে বিসিসিআই ছাড়া অন্য বোর্ডগুলোর পক্ষে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সেভাবে বাড়ানো কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। ব্রেটিগ লিখেছেন, আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয় করা অর্থের ২৫ শতাংশও যদি আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর স্যালারি ক্যাপ বাড়াতে ব্যবহার করা হয়, তাহলেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়ে দাঁড়াবে “ফাইন্যানশিয়াল আফটারথট”। অর্থাৎ “ওটা সময় পেলে খেলা যাবে এখন”। কারণ আইপিএলের সম্প্রচার স্বত্ব যখন ১৬,৩৪৭.৫০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল, তখন তার ১৪ শতাংশ ছিল স্যালারি ক্যাপ। আগামী নিলামে সেই অনুপাত বজায় রাখলেই স্যালারি ক্যাপ হয়ে যাবে এখনকার তিন গুণ। তখন কেমন পারিশ্রমিক হবে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের? ব্রেটিগ প্যাট কামিন্সের উদাহরণ দিয়েছেন। কামিন্স এখন ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার থেকে পান মরসুম পিছু ২ মিলিয়ন ডলার, যা আইপিএলে খেলার জন্য সর্বোচ্চ যা পাওয়া যায় তার তুল্য। নতুন সম্প্রচার স্বত্বের পরিমাণ অনুসারে পারিশ্রমিক বাড়লে আইপিএলের সবচেয়ে দামি ক্রিকেটারের পারিশ্রমিক কিন্তু ১০ মিলিয়ন ডলারেও পৌঁছে যেতে পারে।

এখানেই শেষ নয়। যে প্রিমিয়ার লিগকে আইপিএল ছাপিয়ে গেছে বলে এত হইচই, সেই লিগের সম্প্রচার স্বত্বের অর্ধেকেরও বেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হয়। আইপিএল যদি সেই মডেল অনুসরণ করে তাহলে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কত হবে ভাবুন। তখন পাঁচদিনের ক্রিকেট খেলার উৎসাহ কজনের থাকবে? অন্য ফর্ম্যাটেই বা দেশের জার্সি গায়ে খেলার কতটুকু গুরুত্ব থাকবে? স্রেফ আইপিএল ফ্যাঞ্চাইজগুলোর চোখে পড়ার মঞ্চ হয়ে উঠবে কি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দান?

কেউ বলতেই পারেন, তেমন হলে ক্ষতিটা কোথায়? আন্তর্জাতিক ফুটবল তো কবে থেকেই ওভাবে চলছে। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, আফ্রিকান নেশনস কাপ থেকে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলো ফুটবলার পছন্দ করে। তারপর তারা ইউরোপের লিগগুলোতে খেলতে এসে আকাশছোঁয়া পারিশ্রমিক পান। দেশের হয়ে খেলার জন্যে তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না – এমন অভিযোগে মাঝেমধ্যে বিবাদ বিসম্বাদও হয়। তাই সেসবের জন্য বিশ্ব নিয়ামক সংস্থা ফিফাকে আলাদা নিয়মও তৈরি করতে হয়েছে। না হয় আইসিসিও তেমন কিছু করবে। ক্রিকেটারদের রোজগার বাড়লে ক্ষতি কী? ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের রোজগার বাড়লে, প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়লেই বা অসুবিধা কোথায়?

ঠিক কথা। খেলা তো আসলে ব্যবসা। যে ফর্ম্যাট বেশি বিক্রি হবে সে ফর্ম্যাটই টিকে থাকবে। ফলে টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল ফেলে লাভ নেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বদলে ফ্র্যাঞ্চাইজ ক্রিকেটই আসল খেলা হয়ে দাঁড়ালেও কালের গতি হিসাবেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু মুশকিল হল, ইউরোপের ফুটবল মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আর ভারতের ক্রিকেট মাঠে খেলা দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতায় এখনো আকাশ-পাতাল তফাত। বিশ্বের ধনী ফুটবল ক্লাবগুলো অর্জিত অর্থের বেশ খানিকটা ব্যয় করে দর্শক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে। অথচ ভারতের বহু ক্রিকেট মাঠে সাধারণ দর্শকদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে পূতিগন্ধময় বাথরুম। কোথাও তিনতলায় খেলা দেখতে বসলে পানীয় জলের জন্য নামতে হয় একতলায়।

ইউরোপে নিয়মানুযায়ী ক্লাবগুলোর নিজস্ব অ্যাকাডেমি থাকে, সেখানে শিশু বয়স থেকে ফুটবলার তৈরি করা হয়। আইপিএলে ওসব তো নেই বটেই, শুরু হওয়ার সময়ে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’-র ক্রিকেটের উন্নতিকল্পে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো কীসব করবে শোনা গিয়েছিল। এখন ক্যাচমেন্ট এরিয়া ব্যাপারটারই আর নামগন্ধ নেই। কলকাতা নাইট রাইডার্সে বাংলার ক্রিকেটার দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়, গুজরাট টাইটান্সে খুঁজতে হয় গুজরাটের খেলোয়াড়। উপরন্তু ফুটবলে উন্নত দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামগুলোর মালিক ক্লাবগুলোই। সেই পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য ব্যবহৃত হয়। ক্রিকেটে কিন্তু ব্যাপারটা উল্টো। দেশের ক্রিকেট বোর্ডের অর্থে তৈরি পরিকাঠামোই ব্যবহার করছে ফ্র্যাঞ্চাইজগুলো। মানে খেলাটার থেকে তারা নিচ্ছে সবকিছু, কী ফিরিয়ে দিচ্ছে তার হদিশ নেই।

আর বিশ্বের সবচেয়ে বিত্তশালী ক্রিকেট বোর্ডের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। আইপিএলের বিন্দুমাত্র সমালোচনা করলেই বিসিসিআই ও তার অনুগত প্রাক্তন ক্রিকেটার, বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিকরা বলতে শুরু করেন ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নতি হয়েছে আইপিএল থেকে আসা অর্থের জন্যই। ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক, প্রাক্তনদের পেনশন বেড়েছে সে কথা সত্যি। কিন্তু সেগুলো তো যে কোনো পেশাতেই নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাড়ার কথা। গত দুই দশকে দেশে যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সে অনুপাতে কিন্তু ওই টাকার অঙ্কগুলো বাড়েনি। আর ওটুকুই তো একটা খেলার উন্নতির সব নয়। বাকি চেহারাটা কেমন?

আরও পড়ুন বড়লোকের খেলা

কোভিড পর্বে বোর্ড প্রবল উৎসাহে আইপিএল আয়োজন করেছে (প্রয়োজন পড়লে বিদেশে), জাতীয় দলের বিদেশ সফরের ব্যবস্থা করেছে। অথচ রঞ্জি ট্রফি খেলা ক্রিকেটারদের টাকা দেওয়ার কথা ভুলেই গিয়েছিল। আম্পায়ার, স্কোরার, মাঠ পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও বিস্মৃত হয়েছিলেন। মুম্বাই আর মধ্যপ্রদেশের মধ্যে এবারের রঞ্জি ট্রফি ফাইনালে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেমের ব্যবস্থা নেই, কারণ খরচে কুলোবে না। উত্তরাখণ্ডের রঞ্জি দলের ক্রিকেটারদের দুর্দশার কথা জানলে অবশ্য মনে হবে এসব কিছুই নয়। এ মাসের গোড়ায় সাংবাদিক জেমি অল্টারের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই ক্রিকেটাররা এক বছর ধরে পারিশ্রমিক পাচ্ছেন দিনে মাত্র ১০০ টাকা। সে টাকাও মাসের পর মাস বকেয়া থাকে। অধিনায়ক জয় বিস্তা বিসিসিআইকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ মরসুমের বকেয়ার ব্যাপারে চিঠি লিখে কোনো জবাব পাননি।

মেয়েদের ক্রিকেট বিসিসিআই কীভাবে চালাচ্ছে তা নিয়ে লিখতে বসলে আরও হাজার দুয়েক শব্দ লিখতে হবে। এটুকু বলা যাক, যে চলতি ভারত-শ্রীলঙ্কা সিরিজ ভারতে বসে টিভিতে সরাসরি দেখা যাচ্ছে না। বহু টালবাহানার পর আগামী বছর অবশ্য মেয়েদের আইপিএল শুরু হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ বিসিসিআই নিঃসন্দেহে একটি সফল কোম্পানি, কিন্তু সে সাফল্যে ক্রিকেটের কী লাভ হচ্ছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। একসময় সারা পৃথিবীতে অর্থনীতির আলোচনায় ‘ট্রিকল ডাউন’ কথাটা বেশ জনপ্রিয় ছিল। বলা হত সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়বে নীচের দিকে, তাতেই নীচের তলার মানুষের হাল ফিরবে। বাস্তবে তা কতটা ঘটে তা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা তর্ক করবেন, কিন্তু অন্তত ভারতীয় ক্রিকেটে বিসিসিআইয়ের সচ্ছলতা চুঁইয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য চোখের জল না হয় না-ই ফেললাম, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চুলোয় যাওয়াও না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু বিসিসিআইয়ের সমান ওজনের সমৃদ্ধি যে দেশীয় ক্রিকেটে দেখা যাচ্ছে না।

ইনস্ক্রিপ্টে প্রকাশিত

টলমলে ট্রিবিউটে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গুবলেট

আমাদের যখন সবে গোঁফ দাড়ি গজাচ্ছে, তখন ট্রেনের কামরা বা পাবলিক টয়লেটের দেয়ালে সাঁটা কিছু বিজ্ঞাপন নজর কাড়ত। সেখানে লেখা থাকত একটা কথা, যার অর্থ বুঝতে না পেরে আমরা আকাশ-পাতাল ভাবতাম এবং বন্ধু মহলে বিস্তর আলোচনা করতাম। কথাটা হল, কৈশোরের কিছু “কুঅভ্যাস” ছাড়তে না পারলে নাকি বিবাহিত জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিজেরা কিশোর বলেই ওখানে কোন অভ্যাসের কথা বলা হত তা জানতে আমরা যারপরনাই উদগ্রীব ছিলাম। কথাটা মনে পড়ল সদ্য ওটিটিতে মুক্তি পাওয়া ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি দেখে। এই ওয়েব সিরিজের মূলধন হল ফেলুদা আর সত্যজিৎ সম্পর্কে বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা। ও জিনিসটা মানুষ মাত্রেরই থাকে, কিন্তু ওটা এই মুহূর্তে আমাদের জাতীয় কুঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আমরা চিরকিশোর হয়ে পড়েছি। ফলে পুনরাবৃত্তিই আমাদের শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, অনুকরণই আমাদের আপ্লুত করছে। গালভরা নাম হয়েছে ‘ট্রিবিউট’। অনীক দত্ত সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষে তাঁকে ট্রিবিউট দিতে ছবি তৈরি করেছেন। সে ছবির বৈশিষ্ট্য (বিজ্ঞাপন জগতের ভাষায় – ইউনিক সেলিং পয়েন্ট) হল, নামভূমিকায় যিনি আছেন তাঁকে হুবহু সত্যজিতের মত দেখাচ্ছে (অথচ চরিত্রটির নাম সত্যজিৎ নয়), আর পথের পাঁচালীর দৃশ্যগুলোর দারুণ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এতেই আমাদের আবেগে গলা বুজে আসছে। আসল পথের পাঁচালী দেখার উপায় থাকতে অনুকরণ কেন দেখতে যাব, সে প্রশ্ন করলে লোকে তেড়ে আসছে।

ব্যাপারটা শৈল্পিক হোক বা না হোক, স্মৃতিমেদুরতা (বাঙালিরা যাকে বলে নস্ট্যালজিয়া) যে লালমোহন গাঙ্গুলির ভাষায় “সেলিং লাইক হট কচুরিজ”, তাতে সন্দেহ নেই। ফলে সৃজিত মুখার্জিও নস্ট্যালজিয়া বেচতেই নেমেছেন। সিরিজের প্রথম পর্বের শুরুটাই হুবহু অনুকরণ, থুড়ি ট্রিবিউট। সোনার কেল্লা ছবিতে ফেলুদাকে পর্দায় প্রথমবার দেখানোর সময়ে শীর্ষাসনরত পদযুগল দেখানো হয়েছিল, তোপসে দৌড়ে এসে খবর দিয়েছিল মক্কেল এসেছে। এখানে পদযুগল এসেছে কয়েক সেকেন্ড পরে, প্রথমবার দেখানো হয়েছে শীর্ষাসনরত ফেলুদার মুখের ক্লোজ আপ। মুশকিল হল, অনুকরণেরও সক্ষমতা অক্ষমতা আছে। মক্কেল আসার খবর ফেলুদাকে তখুনি জানানোর দরকার পড়ে। জটায়ুর আগমন তো কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয় যে তৎক্ষণাৎ জানাতে হবে। কিন্তু নির্দেশক ওসব ভাবতে যাবেন কেন? দর্শককে নস্ট্যালজিয়ায় জবজবে করে ফেলতে পারাই আসল। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।

নস্ট্যালজিয়া নিশ্ছিদ্র করতে সিরিজটিকে পিরিয়ড পিসে পরিণত করা হয়েছে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বোধহয় এমন সিনেমা বোদ্ধা দর্শক পাওয়া যায়, যাঁরা বিশ্বাস করেন ছবি সেপিয়া টোনে রাখলেই পিরিয়ড পিস হয়ে যায়। কারণ ফেলুদারা দার্জিলিংয়ে যে হোটেলে ওঠে, তার বাইরের দেয়াল আধুনিক কায়দার। আশির দশকের ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে ট্রিবিউট দিতেই বোধহয় দার্জিলিংয়ের ঠান্ডাতেও এই সিরিজের ফেলুদা টোটা রায়চৌধুরীকে ফিনফিনে পাজামা আর পাঞ্জাবির উপরে স্রেফ একটা চাদর জড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু বাইরে বেরোবার সময়ে তিনি দিব্যি টি-শার্ট পরে ফেলেন। মর্নিং ওয়াকেও চলে যান আধুনিক জামাকাপড় পরে। সেইসব সময়ে আশির দশক বজায় থাকে ফেলুদা আর তোপসের পেতে আঁচড়ানো চুলে। বিরূপাক্ষ মজুমদারের পুত্র সমীরণের সঙ্গে ফেলুদার বাকযুদ্ধ অবশ্য পুরোদস্তুর রেট্রো। ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া প্রভাত রায়ের প্রতিকার ছবির কথা মনে পড়ে যায়। ভয় হয়, চোখা চোখা সংলাপ বলতে বলতে এখুনি চিরঞ্জিত আর ভিক্টর ব্যানার্জির মত টোটা আর সমীরণরূপী সুপ্রভাত দাস মারামারি শুরু করে দেবেন। ট্রিবিউট অবশ্য এখানেই শেষ নয়। এই সিরিজে ফেলুদার সংলাপ সম্ভবত এমএলএ ফাটাকেষ্ট চরিত্রের অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীকে ট্রিবিউট। নইলে নিজের গায়ের জোর কতটা তা বোঝাতে ফেলুদা বলতে পারেন না “ঘোড়া যেমন চাঁট মেরে মানুষের মাথার খুলি উড়িয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনই বহু দেশে ঘোড়াকে কেটে তার মাংস রান্না করে খাওয়া হয়।” (তারপর ঘাড় বেঁকিয়ে “সুস্বাদু। জানেন?”)

দার্জিলিংয়ে ফেলুদার কার্যকলাপ অবশ্য সৌমিত্র বা চিরঞ্জিতের চেয়েও যাঁকে বেশি মনে পড়ায় তিনি অমিতাভ বচ্চন। কারণ এই ফেলুদা চিতাবাঘের চোখে চোখ রাখতে পারেন, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেই গুনগুন করে গান গাইতে পারেন। সে আবার ইংরেজি গান, যেহেতু তাতে ল্যাভেন্ডার শব্দটা আছে এবং যে ধাক্কা মেরেছিল তার শরীর থেকে ইয়ার্ডলি ল্যাভেন্ডার পারফিউমের গন্ধ পেয়ে ফেলুদা তাকে চিনতে পেরেছেন। এখানেই শেষ নয়, ফেলুদা আহত, ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতের উপর গোটা শরীরের ভার নিতে পারেন। তিনি আরও একটি জিনিস পারেন যা এমনকি আশির দশকের বচ্চনও পারতেন না। তা হল দু হাতে বন্দুক চালানো। সমীরণ মজুমদারের গাড়ির টায়ারে ফেলুদা গুলি করেন বাঁ হাতে, গাড়ি থেকে নেমে আবার বন্দুক তাক করেন ডান হাতে।

ভক্তরা নিশ্চয়ই বলবেন এসব পরিচালকের স্বাধীনতা। ফিল্মের সাহিত্যকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করার দায় নেই। সত্যজিৎ নিজেও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের গল্প নিয়ে ছবি করার সময়ে চিত্রনাট্যে অনেককিছু বদলে দিয়েছেন। কথাটা ঠিকই। এই স্বাধীনতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার সৃজিতবাবু এই সিরিজে করেছেন। যেমন সত্যজিতের গল্পের টফ্রানিল বড়ি হয়ে গেছে ট্রফানিল। কিন্তু সমস্যা হল, ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মাত্র ছদিনে লিখিত এই গল্পে (সূত্র: ফেলুদা সমগ্র ১, ষষ্ঠ মুদ্রণ, নভেম্বর ২০০৯; আনন্দ) সত্যজিৎ যে টফ্রানিলের কথা লিখেছেন, সামান্য গুগল সার্চই বলে দিচ্ছে ওই ওষুধটি (Tofranil) অ্যান্টি-ডিপ্রেস্যান্ট, যার প্রয়োজনীয়তা বিরূপাক্ষবাবু নিজে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু Trofanil বলে কোনো ওষুধের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এ যুগের সিধুজ্যাঠা গুগল Tromanil Plus বলে একটি ট্যাবলেটের কথা বলছে বটে, কিন্তু সেটিও রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অ্যাঙ্কিলোসিং স্পন্ডিলাইটিস এবং অস্টিওআর্থ্রাইটিসে ব্যবহার হয়। তাহলে কি পরিচালক সত্যজিতের উপর কলম চালিয়ে কোনো অদ্যাবধি অনাবিষ্কৃত ওষুধের সন্ধান দিলেন? পিরিয়ড পিসে কি তা করা চলে? প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অবশ্য হতাশ হতে হবে। যেমন বিরূপাক্ষবাবুর বেয়ারা লোকনাথকে খুন করা হয়েছিল গলা কেটে। মৃতদেহের তলপেটের কাছেও কী করে রক্ত লাগল – এ প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই।

গল্পের যে পরিবর্তনটিকে সোশাল মিডিয়ায় কেউ কেউ বৈপ্লবিক আখ্যা দিচ্ছেন, সেটি চিত্রনাট্যকে কীভাবে সমৃদ্ধ করেছে তা-ও যেমন বোঝা গেল না। দার্জিলিং জমজমাট গল্পে বলিউডের নায়িকা সুচন্দ্রার উল্লেখমাত্র আছে। এই সিরিজে কিন্তু তাঁর উপস্থিতি বেশ কয়েকটি দৃশ্যে। শুধু তা-ই নয়, ফিল্মের নায়ক রাজেন রায়না ওরফে বিষ্ণুদাশ বালাপোরিয়ার সঙ্গে তাঁর উদ্দাম প্রেম আছে – একথা একেবারে শুরু থেকেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত দর্শককে (এবং ফেলুদাকে) একটি চুম্বন দৃশ্য উপহার দেওয়া ছাড়া চরিত্রটির আর কোনও ভূমিকা নেই। নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক বিরূপাক্ষ মজুমদার হত্যা রহস্যকে নতুন কী দিতে পারল তা বোধহয় জিজ্ঞেস করা উচিত হবে না। কিন্তু সুলভ পর্নোগ্রাফির যুগেও বাঙালি দর্শকের একটি লং শটের চুম্বন দৃশ্যকে বৈপ্লবিক মনে হচ্ছে দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই।

একইরকম অবাক করে গল্পের সাধারণ ভদ্রলোক হরিনারায়ণ মুখোপাধ্যায়কে ‘অ্যাংগ্রি ওল্ড ম্যান’ গোছের চরিত্রে পরিণত করা। তিনি নাকি বিরূপাক্ষবাবুর উপর নজর রাখার জন্য লোক লাগিয়েছিলেন। কী উদ্দেশ্যে তার ব্যাখ্যা অবশ্য চিত্রনাট্যে নেই। উপরন্তু তিনি বলেন, “ব্লাড প্রেশার আর গেঁটে বাতের সমস্যা না থাকলে” তিনি হয়ত বিরূপাক্ষবাবুকে খুন করার চেষ্টা করতেন। এটাও কি আশির দশকের বচ্চনকে ট্রিবিউট? মানে পিরিয়ড পিস হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য হঠাৎ একটিমাত্র দৃশ্যে একটিমাত্র দেয়ালে আখরি রাস্তা-র পোস্টার সাঁটা হয়েছে বলে জিজ্ঞেস করছি।

আরও পড়ুন ‘অলৌকিক মেগা সিরিয়াল দেখা সমাজের সত্যজিতের ছবি দেখার কোন কারণ নেই, তিনি উপলক্ষ মাত্র’

ট্রিবিউটাভ্যাস চরমে উঠেছে ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে। কদিন পরে কলকাতা মেট্রোর উত্তমকুমার স্টেশনের আশপাশে হাঁটতে গেলে নির্ঘাত কোনো ব্যোমকেশ বা ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীর সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাবে। দেখা যাচ্ছে তাতেও যথেষ্ট ট্রিবিউট হয়নি। তাই সৃজিতবাবুর সিরিজে পুলক ঘোষাল জটায়ুর নারীচরিত্রহীন উপন্যাসের চিত্রনাট্যে নায়িকা আমদানি করার যুক্তি হিসাবে খাড়া করছেন শরদিন্দুর সত্যান্বেষীর বিবাহিত জীবনকে। আবার রহস্যোদ্ঘাটনের দৃশ্যে স্বয়ং ফেলুদা বলছেন চিত্রচোর গল্পের সঙ্গে নাকি বিরূপাক্ষ হত্যার ঘটনার মিল আছে। মিলটি যে কী তা আমার খাটো বুদ্ধিতে ধরা পড়ল না। শরদিন্দুর গল্পের অপরাধী তার পুরনো চেহারাটা গায়েব করার জন্য ছবি চুরি করেছিল। এ গল্পের অপরাধী তো বুঝতেই পারেনি তার একখানা পুরনো চেহারার ছবি রয়েছে নয়নপুর ভিলায়। অবশ্য আমাদের মত দর্শকের বুদ্ধির দৌড় কতটুকু তা নির্দেশক ভালই জানেন। তাই ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্যগুলি বার তিনেক করে না দেখিয়ে ক্ষান্ত দেননি। বিরূপাক্ষবাবুর বুকে ছুরি মারার শটটি যে কতবার কতভাবে দেখিয়েছেন তা গুনতে গিয়ে ব্যর্থ হলাম।

নস্ট্যালজিয়া ছাড়া আর যে জিনিসটি এখন সেলিং লাইক হট কচুরিজ, সেটি হল গোয়েন্দা গল্প। এই দুয়ের চাপে এই সিরিজের একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে গেছেন। তাঁর নাম অনির্বাণ চক্রবর্তী। সবে গত মাসে মুক্তি পেয়েছে আরেক গোয়েন্দার কীর্তিকলাপ নিয়ে ছবি দ্য একেন। সেই ছবিতে অনির্বাণ নিজেই গোয়েন্দা। এমন একজন গোয়েন্দা যিনি বিলক্ষণ ভাঁড়ামি করেন। বাংলা প্রবাদ বলতে ভুল করেন, হাস্যকর হিন্দি বলেন। দুটি ছবিরই প্রেক্ষাপট দার্জিলিং, লোকেশনেও মিল। অনেক ফ্রেমে মনে হয় একই ছবি দেখছি। কে জানে, হয়ত শুটিংও কাছাকাছি সময়ে হয়েছে। এই ডামাডোলে অনির্বাণ একেনবাবুই থেকে গেছেন, লালমোহনবাবু হয়ে উঠতে পারেননি। জটায়ু যে ভাঁড় নন তা অভিনেতা বা নির্দেশক কেউই বুঝে উঠতে পারেননি মনে হয়। বিশেষ করে অঘোরচাঁদ বাটলিওয়ালার চরিত্রে অভিনয় করার সময়ে অনির্বাণ যা করেছেন তা সিনেমা কেন, যাত্রার মঞ্চেও বিসদৃশ লাগে। অবশ্য বিরূপাক্ষ মজুমদারের চরিত্রে বরুণ চন্দ, মহাদেব ভার্মার চরিত্রে সুব্রত দত্ত ইন্সপেক্টর যতীশ সাহার চরিত্রে লোকনাথ দে আর সুচন্দ্রার চরিত্রে মুনমুন রায় ছাড়া এই সিরিজে প্রায় সকলেই বাড়াবাড়ি করেছেন।

ফেলুদার চরিত্রে টোটাকে দিব্যি মানিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চিড়িয়াখানায় চিতাবাঘকে প্রায় কামড়াতে যাওয়া ফেলুদাকে তো মানায় না বটেই, কোনো শিক্ষিত মানুষকেই মানায় না। সোনার কেল্লায় মুকুল ভবানন্দকে দুষ্টু লোক বলে চিনতে পেরেছিল তখন, যখন সে ময়ূরের দিকে গুলি চালায়। জীবজগতের প্রতি এই সংবেদনশীলতা গোটা রায় পরিবারের অভিজ্ঞান। লীলা মজুমদারের ‘কুঁকড়ো’ গল্পেও যার প্রমাণ রয়েছে। ফেলুদাকে হি-ম্যান বানাতে গিয়ে সেই সংবেদনশীলতার জায়গায় আলিপুর চিড়িয়াখানায় যারা বাঘের খাঁচায় ঢুকে তাকে মালা পরাতে গিয়েছিল, তাদের মানসিকতা এনে ফেলা হয়েছে। সন্দীপ রায়ের ফেলুদাও অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারতেন না, কিন্তু নিদেনপক্ষে তাঁর ফেলুদা সলমন খান বা টাইগার শ্রফ মার্কা মোটা দাগের অ্যাকশন হিরো হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন না। সৃজিতের ফেলুদা যদি পেশিবহুল চেহারার, বাঘ সিংহের সাথে লড়াই করা পুরোদস্তুর একটি নতুন চরিত্র হয়ে উঠতেন, তাহলেও কথা ছিল। ভাবা যেত বিবিসির শার্লক সিরিজের মত নতুন কিছু হল। কিন্তু এক পা নস্ট্যালজিয়ার সেপিয়া নৌকায় রেখে অন্য পা হাস্যকর মাচোইজমে রাখা এই টলমলে ট্রিবিউট আপন মনে গাওয়ার মত শীর্ষ সঙ্গীতটি ছাড়া বাংলা চলচ্চিত্র জগৎকে কী দিল?

https://nagorik.net এ প্রকাশিত

সাংবাদিক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন, শিক্ষার মাথায় ছাতা ধরবে কে?

বাংলায় দেরিতে হলেও বর্ষা এসে পড়েছে। এই সময়ে ছাতার চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সোশাল মিডিয়া দেখে বোধ হচ্ছে এবার বর্ষায় ছাতা নিয়ে কথা বললে বিপদ হবে। এক সাংবাদিক পূর্বজন্মের পাপের ফল হিসাবেই বোধহয় একটি মেয়েকে ছাতার ইংরেজি প্রতিশব্দ umbrella বানান জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলেন। এখন সকলে সাংবাদিকের ‘এলিটিজম’, ‘ক্লাসিজম’, ‘সেক্সিজম’, আরও নানা ইজম নিয়ে দিনরাত শাপ শাপান্ত করছেন। স্বীকার্য যে সাংবাদিকরা কেউ দেবতা, গন্ধর্ব নন। বিভিন্ন চ্যানেলের বুম ধরে কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়ান যে সাংবাদিকরা, কাগজগুলো ভরে আছেন যে সাংবাদিকরা তাঁরা অনেকেই আসেন এলিট পরিবার থেকে। ভারতীয় সাংবাদিকতার ধারাটাই এমন। খুব সাধারণ পরিবার থেকে যাঁরা আসেন তাঁরাও তো একই সমাজের উৎপাদন। ‘এলিটিস্ট’, ‘ক্লাসিস্ট’, ‘সেক্সিস্ট’ সমাজ থেকে অন্যরকম সাংবাদিক তো সংখ্যায় কমই বেরোবে। কিন্তু দু-তিনদিন কেটে যাওয়ার পরও বাঙালি ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলারা যেভাবে সাংবাদিকটিকে আক্রমণ করে চলেছেন তাতে “সব ব্যাটাকে ছেড়ে বেঁড়ে ব্যাটাকে ধর” মানসিকতাই প্রকট।

সোশাল মিডিয়ার কুপ্রভাব নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, অনেকেই আজকাল প্রভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন, ফলে সচেতনভাবে সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ কী নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে তা বোঝার জন্য সোশাল মিডিয়া গুরুত্ব আজ অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোশাল মিডিয়ায় যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তাকেও “ওটা ভার্চুয়াল দুনিয়া” বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই। সোশাল মিডিয়ার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাব এখন আর গোপন নেই এবং অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে নূপুর শর্মা আর নবীন জিন্দালের বক্তব্য এবং তা নিয়ে জায়গায় জায়গায় উত্তেজনা, ভাংচুর থিতিয়ে গেছে। বাঙালি ভদ্রসমাজের বুলডোজারের ব্যাপারে চোখ বুজে থেকে “ওরা এত অসহিষ্ণু কেন” পোস্ট করাও বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা চলে এল অথচ স্কুলে গরমের ছুটি কেন বাড়িয়ে দেওয়া হল, তা নিয়ে কিছু চুটকি আর কয়েকটা মিম ছাড়া রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঢেউ নেই ফেসবুকের দেয়ালে দেয়ালে। মাসের পর মাস স্কুল বন্ধ রাখাকে রাজনৈতিক ইস্যু করে বিরোধী দলগুলো কেন রাজ্যব্যাপী রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে না, সে প্রশ্নও বড় একটা কেউ তুলছেন না। দিল্লিতে গত কয়েকদিন ধরে দেশের অন্যতম বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রধানতম নেতা রাহুল গান্ধীকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কী যে জেরা করা হচ্ছে কেউ জানে না। কংগ্রেসের অফিসে ঢুকে পড়ছে দিল্লি পুলিস, নেতা কর্মীদের নানা ছুতোয় শারীরিক নিগ্রহ করা হচ্ছে। ভারতীয় গণতন্ত্রে জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে এরকম ঘটনা খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ভয়ানক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি হচ্ছে। তা নিয়েও গণতন্ত্রপ্রিয় বাঙালির ফেসবুকে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ইংরেজিতে ফেল করে প্রতিবাদী হয়ে ওঠা একটি মেয়েকে কেন সাংবাদিক আমব্রেলা বানান জিজ্ঞেস করল, তা নিয়ে পোস্ট আর ফুরোচ্ছেই না।

আমাদের রাজ্যে, বিশেষত কলকাতায়, নানা দাবিতে নিয়মিত মিছিল মিটিং হয়ে থাকে (অনেক ভদ্রজনের তাতে বিষম আপত্তি থাকে চিরকালই)। সেইসব আন্দোলনে সাংবাদিকদের যেতে হয় খবর সংগ্রহে। সেখানে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে কথা বলেন, জিজ্ঞেস করেন কী কী দাবি নিয়ে আন্দোলন, সেই দাবির সপক্ষে যুক্তিগুলো কী কী। অনেকসময় তা করেন না, কেবল অকুস্থল থেকে নিজের (অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসলে চ্যানেলের বা কাগজের) মতামত দর্শককে/পাঠককে গিলিয়ে দেন। সেটা বরং অন্যায়, আন্দোলনকারীর থেকে তাঁদের দাবির ব্যাখ্যা চাওয়া মোটেই অন্যায় নয়। এক্ষেত্রে সাংবাদিক সেই কাজটাই করছিলেন। যে বলে তাকে অন্যায়ভাবে ইংরেজিতে ফেল করানো হয়েছে, তার যোগ্যতার প্রমাণ চাওয়া আদপেই অন্যায় নয়। নইলে এরপর কৃষক আন্দোলন হলে প্রশ্ন করা যাবে না, কোথা থেকে এসেছেন? আপনার কত বিঘা জমি আছে? সেখানে কী চাষ করেন? নতুন কৃষি আইন নিয়ে আপত্তি করছেন কেন? সরকারকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা কোথায়? প্রশ্নগুলো করার উদ্দেশ্য আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য বের করে আনা। উত্তরে আন্দোলনকারীরা যা বলেন, তা তাঁদের বিরুদ্ধে গেল কিনা তা দেখা কিন্তু সাংবাদিকের কাজ নয়। সাধারণত যদি যা করছেন সে সম্পর্কে আন্দোলনকারীর সম্যক ধারণা থাকে, যদি ইস্যুগুলো সত্যিকারের ইস্যু হয়, তাহলে এমন কিছু বলে ফেলেন না যাতে আন্দোলন লোকের চোখে হাস্যকর হয়ে যায়। তবে হাস্যকর কারণে আন্দোলন করলে উত্তর তো হাস্যকরই হবে।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। ক্ষেপে উঠবেন না। কী বলবেন জানি। এক্ষুনি বলবেন, যেভাবে ওই মেয়েটিকে প্রশ্ন করা হয়েছে সেইভাবে সরকারকে প্রশ্ন করতে পারে না? এই দেখুন, বনলতা সেনগিরি হয়ে গেল। সরকারকে যে সংবাদমাধ্যম কড়া কড়া প্রশ্ন করে না তা নিঃসন্দেহে অন্যায়। কিন্তু সেটা পারে না বলে আর কাউকেই কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না? এ-ও তো সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাওয়াই হল একরকম। তার মানে মমতা ব্যানার্জি বা নরেন্দ্র মোদীর মত আপনিও চান, সংবাদমাধ্যম একমাত্র আপনার পছন্দের প্রশ্নগুলোই করুক। এমন প্রশ্ন যেন না করে যাতে উত্তরদাতা অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে আজকাল নানা অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। একটা ঘটনা প্রায় রোজই ঘটে। সেটা হল কোনো ইস্যুতে যার দায় সবচেয়ে বেশি, তাকে বাদ দিয়ে আর সকলকে আক্রমণ করা। যেমন ধরুন আজকের বেহাল অর্থনীতির জন্য মনমোহন সিংকে আক্রমণ করা, চীন লাদাখে একের পর এক এলাকা দখল করে নিচ্ছে বলে জওহরলাল নেহরুকে আক্রমণ করা, দেশে চাকরি-বাকরি নেই বলে মোগলদের আক্রমণ করা। এগুলো একরকম। আরেকরকম হল এসএসসি নিয়োগে দুর্নীতি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হচ্ছে বলে সিপিএমকে আক্রমণ করা, কেকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে রূপঙ্কর বাগচীকে আক্রমণ করা, বগটুই কাণ্ড নিয়ে রাজ্য সরকারের চেয়ে বিখ্যাতদের বেশি আক্রমণ করা। এক্ষেত্রেও দেখছি সেই ব্যাপার ঘটছে। সাংবাদিক নয়, অভিযোগের আঙুল ওঠা উচিত ছিল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে। প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, সামান্য আমব্রেলা বানান না জেনে ওই মেয়েটি যে ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত চলে এসেছে সে দায় কার? শিক্ষাব্যবস্থার এমন দুর্দশা হল কী করে? যাঁরা ওই মেয়েটিকে এবং তার সহপাঠীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন ছোট থেকে, তাঁরা কেমন শিক্ষক? শিক্ষকদের দিক থেকে এ প্রশ্নের একটা সম্ভাব্য উত্তর – ক্লাস এইট পর্যন্ত পাস-ফেল তুলে দেওয়া হয়েছে। যে কিছুই শিখতে পারেনি তাকে যে আরও এক বছর একই ক্লাসে রেখে দিয়ে শেখাব, তার অবকাশ কোথায়? কথাটা ভেবে দেখার মত। ভাবলে এইট অব্দি পাস-ফেল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত কিনা সেই আলোচনায় যেতে হবে। চুটকি, মিম, গালাগালি দিয়ে সে আলোচনা চলবে না। সাংবাদিককেও সে আলোচনার চাঁদমারি করা যাবে না।

আরও যে প্রশ্ন ওঠা উচিত ছিল, তা প্রাইভেট টিউশন নিয়ে। দেশের আর কোনো রাজ্যের শিক্ষার্থীরা এত বেশি টিউশনের উপর নির্ভরশীল নয়। ২০২১ সালের Annual Status of Education Report (ASER) অনুযায়ী, আমাদের রাজ্যে ৭৬% ছাত্রছাত্রী প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভর করে, যা গোটা দেশের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত শতাব্দীর আশি, নব্বইয়ের দশক থেকে এ রাজ্যে প্রাইভেট টিউশন এক সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। সেই ব্যবস্থা কীভাবে মূল শিক্ষাব্যবস্থার কোমর ভেঙে দিল তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা স্বল্পমেয়াদি মূল্যায়ন আজ অব্দি হয়নি। অথচ সকলেরই জানা আছে, প্রাইভেট টিউশনের রমরমায় কতরকম নৈতিক ও আইনগত দুর্নীতি শিক্ষাজগতে প্রবেশ করেছে। বাড়িতে টোল খুলে প্রবল পরিশ্রম করে মাস্টারমশাই স্কুলে গিয়ে ঝিমোচ্ছেন – এ দৃশ্য আমাদের ছাত্রাবস্থাতেই বিরল ছিল না। স্কুলের পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন করে ছেলেমেয়েদের কম নম্বর পাইয়ে দিয়ে অভিভাবকদের নিরুপায় করে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্কুলে এসে শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছেন কী করলে সন্তান ওই বিষয়ে উন্নতি করতে পারবে। উত্তরে বলা হয়েছে, আমার কাছে পড়তে পাঠিয়ে দেবেন। এমন ঘটনাও দেখেছি। এ তো গেল স্কুল স্তরের দুর্নীতি। বৃহত্তর ক্ষেত্রে কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে বোর্ডের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ইতিহাসও আছে। সত্যদার কোচিংয়ের কথা সকলেই ভুলে যাননি আশা করি। তা স্কুল আর টিউশন – দুটো জায়গায় পড়াশোনা করেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আমব্রেলা বানানটুকুও শিখে উঠতে পারছে না?

আরও পড়ুন প্রখর তপন তাপে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা কাঁপে

ভেবে দেখুন, এতগুলো প্রশ্ন করার পরিসর তৈরি হল ওই সাংবাদিক আপনার অপছন্দের প্রশ্নটা করেছিলেন বলে, এবং এই প্রশ্নগুলো করা উচিত শিক্ষাব্যবস্থা যাঁরা চালান তাঁদের। তা না করে আপনি সাংবাদিকটি কত অযোগ্য তা প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। না হয় মেনে নেওয়া গেল, সাংবাদিক অযোগ্য। তাতে কী? আপনি আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থার কোনো লাভ হবে কী?

শিক্ষক, অধ্যাপক, শিক্ষা নিয়ে গবেষণারত মানুষজন, ডাক্তার, উকিল নির্বিশেষে মানুষ যেভাবে ফেল করে পাস করিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে ব্রতীদের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক খেদাতে নেমেছেন তাতে রাজ্যের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে বই কমে না। কোনো সন্দেহ নেই যে এক-আধবার ফেল করা মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বস্তুত পরীক্ষায় ভাল নম্বর, খারাপ নম্বর সবকিছুর প্রমাণ নয়। ইংরেজিতে কত নম্বর পেলাম তা দিয়ে যে সবকিছু প্রমাণ হয় না তা-ও ঠিক। পৃথিবীতে কত লোক তো আদৌ লেখাপড়াই করে না, পরীক্ষা দেয় না। তারা কি ফেলনা নাকি? কিন্তু মুশকিল হল, ফেল করলে পাস করিয়ে দেওয়ার দাবিতে পথ অবরোধ করব – এই মানসিকতাকে প্রশ্রয় দিলে সমূহ বিপদ। তাহলে স্কুল, কলেজ থেকে পরীক্ষা ব্যবস্থা তুলে দিলেই তো হয়। আহা বাছা, ফেল করেছ তো কী হয়েছে? তোমার দোষ নয়, দুনিয়ার আর সক্কলের দোষ – এই বলে যদি কারোর পাশে দাঁড়ানো হয়, তাহলে আর সে নিজেকে শুধরে নিয়ে পাস করার চেষ্টা করবে কেন? পাস করা যে প্রয়োজন, এটা অন্তত মানেন তো নাকি? না রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ টেনে বলবেন, পাস না করলেই বা কী? তা বলতেই পারেন, তবে মনে রাখবেন, অনেকেই দেবেন্দ্রনাথের মত বিত্তশালী, প্রভাবশালী অভিভাবক নয়। ফলে তাদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষায় পাস করে সার্টিফিকেট, ডিগ্রি ইত্যাদি পাওয়ার প্রয়োজন আছে। যাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাদেরও দরকার আছে। নইলে রাস্তা অবরোধ করত না।

আসলে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে এসে ঠেকেছে। এমনিতেই ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক প্রাইভেট টিউশনের কল্যাণে এবং বিশ্বায়নের গুণে ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল আগেই, এখন আবার শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা দেখে ফেলেছে যে বহু শিক্ষক পরীক্ষা না দিয়ে বা সাদা খাতা জমা দিয়ে, স্রেফ ঘুষ দিয়ে মাস্টার হয়েছে। উপরন্তু বাঙালি ভদ্রসমাজের নীতিবোধে আমূল পরিবর্তন এসেছে। যে ছেলে হল ম্যানেজের কথা বাবা-মা জানতে পারলে কী বলবে তা নিয়ে ভয়ে থাকত, সে এখন বাবা হয়ে ছেলেমেয়ের স্কুলে দাবি জানাচ্ছে অতিমারী কেটে গিয়ে থাকলেও পরীক্ষাটা অনলাইনেই হোক। কেন এই দাবি তা বলে দেওয়ার দরকার নেই। মাস্টারমশাই, দিদিমণিরা সোশাল মিডিয়ায় এবং তার বাইরে খাতা দেখার যেসব অভিজ্ঞতা বিবৃত করছেন সেগুলো খেয়াল করলেই বোঝা যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে ছাত্র রাজনীতির সুপ্রাচীন ইতিহাস রয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ইস্যু থেকে শুরু করে জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইস্যু নিয়েও আন্দোলন করে থাকে। কিন্তু কদিন আগে দেখা গেল আরও এক অভূতপূর্ব ঘটনা। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আন্দোলন করল অফলাইন পরীক্ষা দেবে না বলে। তাদের অন্যতম যুক্তি ছিল, সিলেবাস শেষ করানো হয়নি। সেক্ষেত্রে পরীক্ষাই বাতিল হোক দাবি করলেও না হয় কথা ছিল। কিন্তু তারা পরীক্ষা দিতে রাজি, শুধু বাড়িতে বসে পরীক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা চায়। এই দাবির কারণ কি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে? এরা তবু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। বাবা-মা এদের মতামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। কিন্তু সদ্য স্কুল ছাড়তে অকৃতকার্য ছেলেমেয়েরা যে বাবা-মায়েদের সম্মতি ছাড়া রাস্তা অবরোধ করার সাহস পেত না, তা বলাই বাহুল্য। অনেক বাবা-মাকে তো সগর্বে ক্যামেরার সামনে বাইট দিতেও দেখা যাচ্ছে। একজন যেমন বলেছেন, যারা মোবাইলে বাংলায় মেসেজ করে তারা ইংরেজিতে পাস করে গেল আর তাঁর মেয়ে ইংরেজিতে মেসেজ করেও পাস করতে পারল না – এ অসম্ভব।

এই পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। রিচার্ড ফাইনম্যান ইংরেজিতে খারাপ ছিলেন, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন স্কুলজীবনে অঙ্কে দুর্বল ছিলেন – এইসব আবোল তাবোল কথা বলে এদের পাশে দাঁড়ালে সাড়ে সর্বনাশ। এই অকৃতকার্য শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে এক হাড় হিম করা সত্য বেরিয়ে আসছে। তা হল পড়াশোনা এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞাগুলোই একেবারে উল্টে গেছে এই রাজ্যে। যেনতেনপ্রকারেণ নম্বর পেলেই হয় এবং নম্বর দেওয়া শিক্ষকদের কর্তব্য – এমন ধারণা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আমরা সম্ভবত গণটোকাটুকির যুগে ফেরত যেতে চলেছি। এবার আর রাজনৈতিক অশান্তির কারণে নয়, সামাজিক সম্মতিপূর্বক।

২০১৫ সালে বিহারের একটা ছবি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, ইংল্যান্ডের দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রভৃতি বিশ্বখ্যাত কাগজ এ নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ছবিটা এরকম – পরীক্ষা হচ্ছে একটা স্কুলে, আর পরীক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা দেয়াল বেয়ে উঠে জানলা দিয়ে পরীক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন। আগামীদিনে পশ্চিমবঙ্গে এরকম কিছু দেখা গেলে অবাক হবেন না। দয়া করে তখন আলোকচিত্রীকে গাল দেবেন না – এইটুকু অনুরোধ। তিনি সাংবাদিক, তাঁর কাজই ওই।

https://nagorik.net/ এ প্রকাশিত

%d bloggers like this: