নাম তার ছিল: ৩৪

পূর্বকথা: বহুদিন পরে জেলা সম্পাদকের তলব পেয়ে পার্টির জেলা অফিসে যেতে হল রবীনকে। সম্পাদকমশাই অভিযোগ করলেন, সে উপদল করছে। ফাল্গুনী আর শিবুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে জানিয়ে হুমকি দিলেন, ওদের সংস্রব ত্যাগ না করলে পার্টি সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হতে পারে।

আজ রবীনের চাকরি জীবনের শেষ দিন। সকাল থেকে পাগল মহারাজের কথা মনে পড়ছে খুব।

আড্ডা মারতে গিয়ে এক দিন ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিল “আচ্ছা, কত বছর বাঁচা ভাল বলে মনে হয় আপনার?”

“বয়স দিয়ে হিসাব করলে হবে না মাস্টারমশাই।”

“তবে? কর্মঠ থাকতে থাকতে মারা যাওয়াই ভাল বলছেন?”

“ঐ যে, আপনার প্রিয় ঠাকুর যা লিখেছেন? ঐটেই ঠিক।”

“উনি তো এত লিখেছেন যে হাজার খানেক গীতা হয়ে যাবে। আপনি কোনটার কথা বলছেন?”

“চাহি না রহিতে বসে, ফুরাইলে বেলা। তখনি চলিয়া যাব, শেষ হলে খেলা।”

“হুঁ। কিন্তু তেমন কি আর সবার হয়, মহারাজ? ভীষ্মের ছিল ইচ্ছামৃত্যু। তেমন সুবিধে থাকলে তো হয়েই যেত।”

“না, সে আর আমাদের কেমন করে হবে? তবে কি জানেন, কারোর বাঁচার ইচ্ছে চলে গেলে তাকে আর হাজার চেষ্টা করেও রাখা যায় না।”

কথাটা ভারী আশ্চর্য লেগেছিল রবীনের। সত্যিই তো! বাঁচতে গেলে তো সবচেয়ে প্রথমে বাঁচতে চাইতে হবে। এ কথাটা এভাবে মনে আসেনি কখনো। সে যখন অবাক হয়ে নিজের বাঁচার ইচ্ছে মাপছে, তখন মহারাজ যোগ করেছিলেন “কর্মী লোকেদের কাজ ফুরিয়ে গেলে বাঁচার ইচ্ছে চলে যায়। তখন তারা চলে যাবার জন্যে তৈরি হয়ে থাকে।”

পাগল মহারাজের অনেক কথাই রবীনকে অনেক সময় ভাবিয়েছে। ভাবনার খোরাক পাওয়া যায় বলেই তো তাঁর কাছে বারবার ছুটে যাওয়া। কিন্তু সেদিনের কথাগুলোর মত আর কোন কিছু কখনো ভাবায়নি। সেবার ওঁর কাছ থেকে ঘুরে আসার পরের কয়েকটা দিন খুব ব্যস্ততায় কেটেছিল। হঠাৎ একদিন সকালে ফাল্গুনী এসে খবর দিল পাগল মহারাজ অসুস্থ। ওর শ্বশুরবাড়ি মহারাজের আশ্রমের পাড়াতেই। সেখান থেকেই খবর পেয়েছে।

রবীন স্কুল থেকে ফিরেই ছুটল। সেই প্রথম মহারাজকে শুয়ে থাকতে দেখা।

“আমার তেমন কিছু হয়নি, মাস্টারমশাই। এরা সব ভয় পেয়েছে, তাই আমাকে জোর করে শুইয়ে রেখেছে।”

“হয়নি বললেই হল? আমি অপু মহারাজের সাথে কথা বলে এ ঘরে এলাম। আপনার রীতিমত একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে। এখন কদিন কথার অবাধ্য হওয়া চলবে না।”

“না, অবাধ্য আমি হব কেন? অপুর মত যোগ্য লোক আশ্রমের দায়িত্বে আছে, আমার তো শুয়ে থাকতে অসুবিধে নেই। তবে বেশিদিন শুয়ে থাকতে হবে না।”

“সে তো বটেই। আপনার মত কাজের লোক বেশিদিন শুয়ে থাকলে চলবে? আপনি নিয়ম মেনে চলুন, ঝটপট সুস্থ হয়ে যাবেন।”

“কাজ আমার ফুরিয়েছে। এবার বিদায় নেব।”

কথাটা শুনে যে ধাক্কাটা লেগেছিল সেটা এত বছর পরেও রবীনের মনে একেবারে টাটকা। সে চমকে উঠে বলেছিল “এসব কী বলছেন?”

“ঠিকই বলছি। আমার স্কুলটা দাঁড়িয়ে গেছে, কাকে ভার দিয়ে যাব সেই নিয়ে চিন্তা ছিল। অপুকে পেয়ে সে চিন্তাও দূর হয়েছে। আর তো আমার কিছু পাওয়ার নেই, মাস্টারমশাই। কিছু দেয়ারও নেই। যতটুকু আমার ছিল, সব দিয়ে দিয়েছি। আর থাকলে যে লোকের হেলা শ্রদ্ধার পাত্র হব। তার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল নয়?”

“অন্যদের কথা জানি না মহারাজ। আমি তো সাধারণ মানুষ, বড় স্বার্থপর। শুধু নিজের দরকারটাই ভাবি। আমার যে আপনাকে এখনো দরকার? এই যে জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপনার কাছে আসি, দুটো কথা বলি, থোড় বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোড়ের বাইরে আলাপ আলোচনা হয়… আপনি না থাকলে কার কাছে যাব বলুন তো?”

কথাটা শুনে মহারাজ ভারী স্নিগ্ধ হেসে হাতটা মেলে দিয়েছিলেন। রবীন দুহাত দিয়ে সেটাকে জড়িয়ে ধরতে বলেছিলেন “সঙ্গী পেয়ে যাবেন, মাস্টারমশাই। আর কেউ না থাক, কিচ্ছু না থাক, আপনার ছাত্রছাত্রীরা আছে না? ওরাই বাঁচার রসদ জুগিয়ে দেবে।”

ভারী অশান্ত মন নিয়ে সেদিন ফিরে এসেছিল রবীন। শিগগির আবার দেখতে যাবে ভেবেছিল। সে সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আর ও মুখো হয়নি। মহারাজ শেষ কথাটা অবশ্য ভুল বলেননি। উনি মারা গেছেন বছর পাঁচেক হল। স্কুল আর ছাত্রছাত্রীগুলো আছে বলেই একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে হয়নি। পার্টির সাথে যোগ তো কমে গেছে অনেকটাই, জোনাকির সাথে কতটুকু যোগ আছে সে কথা ভাবতেও রবীন ভরসা পায় না। আছে যে, সেই বিশ্বাসটুকুই বেঁচে থাক না হয়। আর ছেলেটা? সে যে কত দূরে তা মাপাও অসম্ভব। ইদানীং অবশ্য আগের তুলনায় ফোনে কথাবার্তা বলে বেশি। ওদিককার এক আধটা খবর নিজে থেকেই দেয়, এদিককার খবরও জিজ্ঞেস করে না তা নয়। রবীন তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করে। ছেলেমেয়ে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছলেই বাবার সাথে সেই ছোটবেলার সখ্য থাকে না, এমনটাই তো দেখে গেল সারা জীবন। তবু তো বিপ্লবের ক্ষেত্রে কলেজে ভর্তি হওয়া পর্যন্তও তেমনটা হয়নি।

সেদিন বৃহস্পতিবার। রবীনের দিনের শেষ ক্লাসটা থাকে সিক্স বি সেকশনে। কিন্তু হেডমাস্টার অনিল বলেই দিয়েছিল, সেদিন টিফিনের পর আর ক্লাস হবে না। রবীনের ফেয়ারওয়েল, তারপর ছুটি। অনিল কলকাতার ছেলে, মফস্বলের স্কুলের হেডমাস্টার হয়ে এসেছে। তবু নাক উঁচু ভাবটা নেই। প্রথম দিনই রবীনকে বলেছিল “সিনিয়র টিচাররা আমাকে নাম ধরেই ডাকতে পারেন। আর ‘আপনি আপনি’ করবেন না, প্লিজ। আমি আপনাদের চেয়ে বেশ কিছুটা ছোট।” রবীনের অবশ্য হেডমাস্টারকে তুমি বলা না-পসন্দ। তাই নাম ধরেও “আপনি” বলে এসেছে। ফেয়ারওয়েলের আয়োজনে আপত্তি করে বলেছিল “এসব আবার কেন করছেন, অনিল? আর কি আমার ইস্কুলে আসা বারণ?”

“ছি ছি! এ কী বলছেন, মাস্টারমশাই? এই স্কুল সব সময় আপনার। যখন ইচ্ছে আসবেন। কিন্তু এত বছর এই স্কুলটাকে যা দিলেন, স্কুলের তো কর্তব্য তার জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। সামান্য একটু আয়োজন। এতে আপত্তি করবেন না।”

সামান্য বললেও, রবীন দেখল ব্যাপার নেহাত সামান্য নয়। দোতলায় জীবনের শেষ ক্লাসটা নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে দেখতে পেল, ইউ আকৃতির স্কুলের বড় উঠোনটায় দু তিনটে টেবিল জুড়ে রাখা আছে, বসবার চেয়ার দেওয়া হয়েছে। সামনে সতরঞ্চি পাতা ছেলেমেয়েরা বসবে বলে। এর আগে যতজন বিদায় নিয়েছেন, এই ব্যবস্থাই ছিল বটে, তবু যেন নতুন লাগছে। কারণ অনুষ্ঠান সূচী তো রবীন নিজেই ঠিক করত। কোন ছাত্র স্যার বা দিদিমণি সম্পর্কে দু কথা বলবে, কে শুরুতে একটা গান গাইবে — এসব খুঁটিনাটি তো সে নিজেই দেখত বরাবর। মানপত্রটাও বাংলার দিদিমণি শ্রাবন্তী লিখে বাঁধাতে পাঠানোর আগে একবার দেখিয়ে নিত। এবার সবটাই অজানা। একতলায় নেমে টিচার্স রুমে গিয়ে অবশ্য বোঝা গেল এবারের আয়োজন সত্যিই একটু ব্যতিক্রমী। থুড়থুড়ে বুড়ি হয়ে পড়া রজনীদি, যিনি না থাকলে জোনাকির সাথে বিয়েটা হত না, তিনি এসেছেন। সেই কাঁকুড়গাছি থেকে! আবার নবাও হাজির। সপ্তাহের মাঝখানেই! অনিল ওকেও ডেকে এনেছে? হেডমাস্টার অনিল অতিথিদের নিয়ে গিয়ে যথাস্থানে বসাল। রবীনের দু পাশে। নবা যে স্কুলের গভর্নিং বডির সদস্য সেটা তখন খেয়াল হল।

সামনে ছেলেমেয়েগুলোকে ওরই মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকতে দেখে প্রথমবার রবীনের চোখ দুটো একটু ছলছলিয়ে উঠল। সকলের বসার জায়গা হয়নি। অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে ধার ঘেঁষে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। দোতলার বারান্দাতেও অনেকে। কী বিষাদময় কচি মুখগুলো! এতগুলো অপাপবিদ্ধ তরুণ মন তাকে ভালবাসে ভেবে বুকটা কেঁপে উঠল রবীনের। নিজের কানে কানে বলল “এদের ভালবাসার যোগ্য কি আমি?”

ওরা সব মাইক ঠিক করছে, হারমোনিয়াম, ফুলদানি ইত্যাদি নিয়ে আসছে। চারদিক দেখতে দেখতে খেয়াল হল, সতরঞ্চি যেখানে শেষ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সুবিমল। ছেলেটা মাধ্যমিকের পর উচ্চমাধ্যমিকেও এক দাঁড়ি পেয়েছে। রবীনের ইচ্ছে ও প্রফেসর হোক। হতভাগাটা কলেজ কামাই করে এসেছে। ওর উপর চোখ পড়তেই এক গাল হাসল, রবীনও হাসল। কিন্তু এতদূর থেকেও রবীন পরিষ্কার দেখতে পেল বোকাটার চোখে জল। ঠিক তখুনি নবা মুখটা কানের কাছে নিয়ে এসে বলল “ঐ কোণের মেয়েটা কে রে? ঐ যে স্কুল পাহারা দেয় রিকশাওয়ালা, ওর গিন্নী?”

প্রথমটায় রবীনের অচেনা মনে হল। হবে না-ই বা কেন? এই সেদিনের ফ্রক পরা, বিনুনি দোলানো মেয়েটা যদি শাড়ি ব্লাউজ পরে একটা বছর খানেকের বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকে তাহলে চট করে কি চেনা যায়? রবীন যখন ভুরু কুঁচকে তাকাচ্ছে, তখন ওর হাসিটা দেখে শেষ অব্দি চিনতে পারা গেল। শিউলি। প্রচুর ধমক খেয়ে শেষে ট্রান্সলেশনটা ঠিক হলে এইরকম হাসত। রবীন উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ডাকে। ও বাচ্চা কোলে এগিয়ে আসে।

“কী রে? একেবারে গিন্নী হয়ে গেছিস যে। ছেলেটা কবে হল?”

“এই তো। এক বচ্ছর হবে, স্যার।”

“তোর যেন কোথায় শ্বশুরবাড়ি?”

“বড়িহাটায়।”

“ও হ্যাঁ। তা তোকে কে বলল আমার আজকে ফেয়ারওয়েল?”

“ও মা! আমাদের পাড়ার কত ছেলেমেয়ে পড়ে এই ইস্কুলে।”

“তা বটে।” রবীন কোলের ছেলেটার দিকে হাত বাড়াতেই সে নিঃসঙ্কোচে চলে আসে। “বা রে, ভারী লক্ষ্মী ছেলে তো তোর? চেনা অচেনা নেই!”

“শিশুরা ভাল মানুষ খারাপ মানুষ বোঝে স্যার।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। খুব বোঝে। ছেলের মা হয়েও তোর বুদ্ধিটা পাকেনি রে পাগলি।”

রবীন পকেট হাতড়ে একটা একশো টাকার নোট পায়। সেটা শিউলির হাতে দিয়ে বলে “এটা রাখ। দাদুভাইকে রসগোল্লা খাওয়াস। নাকি তোরা চকলেট খাওয়াস আজকাল? সে যা-ই হোক।”

“এ মা! না স্যার।”

“না আবার কী? বলছি নে। আর যে কদিন বাপের বাড়িতে আছিস, একদিন আমার বাড়ি আয় ওকে নিয়ে। তোর জেঠিমা খুব খুশি হবে। জামাইকে তো ওভাবে আসতে বলা যায় না। ওটা নয় পরে হবে।”

“যাব স্যার।”

শিউলি টেবিলের তলা দিয়েই মাথা গলিয়ে পায়ের ধুলো নেয়।

“আহা, মাথা ঠুকে যাবে রে। যা যা বোস গিয়ে।”

“স্যার, আমরা তৈরি। শুরু করি এবার?” অ্যাসিস্টেন্ট হেডমাস্টার অমৃতেন্দু জিজ্ঞেস করল।

“ও হো। হ্যাঁ হ্যাঁ, শুরু করো। ছেলেমেয়েগুলো টিফিনটাও খেতে পারেনি আজকে। শিগগির শেষ করতে হবে,” বলতে বলতে রবীন বসে পড়ে।

সব বিদায়ের অনুষ্ঠানই এক রকম। শেষ দিনে সবাই অনুপ্রেরণা, সবচেয়ে ফাঁকিবাজ মাস্টারটাও জ্ঞানতাপস, আর সবথেকে মারকুটে মাস্টারও করুণাধারা। এই কথাটা বলে রবীন টিচার্স রুমে হাসির ফোয়ারা তুলেছে বহুবার। একের পর এক নিজের স্তুতি শুনতে শুনতে সেটা মনে পড়ে হাসি পাচ্ছিল। শেষে যখন মানপত্রটা পাঠ করতে করতে শ্রাবন্তীর গলা বুজে এল, তখন রবীন হেসেই ফেলল। থমথমে পরিবেশে ঐ হাসিতে সবাই থতমত খেয়ে গেল। মানপত্রটা হাতে তুলে দেওয়ার পর হেডমাস্টার ঘোষণা করলেন “এবার আমাদের সকলের প্রিয়, শ্রদ্ধেয় রবীন ঘোষালকে তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে কিছু বলতে অনুরোধ করছি।”

রবীন হাসিমুখে বলতে উঠল।

“সবার মুখ এমন ভার কেন? এটা তো স্মরণসভা নয়। আমি এখনো অন্তত দশ বছর বাঁচব। শুভেন্দু স্যার আমাদের জুনিয়র মোস্ট। ওনার বিয়েতে বরযাত্রী না গিয়ে আমি মোটেই মরছি না।”

হাসির রোল উঠল। সকলের সাথে খুব খানিকটা হেসে নিয়ে রবীন আবার শুরু করল।

“না, সত্যিই। একটা অবসর নিয়ে এত মুহ্যমান হয়ে পড়ার কিছু নেই। আমার বরং বেশ ভাল লাগছে, ভদ্রমণ্ডলী। আমি এই অনুষ্ঠানের আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞ যে ওঁদের উদ্যোগে বহু বছর পরে রজনীদির সাথে দেখা হল। আমার বাল্যবন্ধু নবারুণ খুব ব্যস্ত মানুষ। সে-ও এসেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই উঠোনে সবাই মিলে জড়ো হওয়াতে আমার প্রিয় ছেলেমেয়েগুলোকে শেষ দিনে একসাথে দেখতে পাচ্ছি। আজ তো টিফিনের আগে আমার মোটে দুটো ক্লাস ছিল, ফলে মনটা একটু খারাপই হচ্ছিল টিফিনের পরে যাদের ক্লাস নিই তাদের সাথে দেখা হল না বলে। সে দুঃখও মিটে গেল।

সত্যি কথা বলতে, আমি হেডস্যারকে বারণই করেছিলাম এমন কিছু করতে। উনিই জোর করলেন। তা এখন মনে হচ্ছে ভালই করেছেন। কয়েকটা কথা বলা যে আমার দরকার সেটা নিজেরই খেয়াল ছিল না। এখন সামনে এই মুখগুলো দেখে খেয়াল হল।

স্কুলের কয়েকজন প্রাক্তনীকেও দেখতে পাচ্ছি। আরো অনেকে হয়ত রয়েছে, আমি মনে করতে পারছি না। তোরা দুঃখ পাস না, মনা। বুড়ো হয়েছি, চোখের জ্যোতি কমে আসছে, স্মৃতির জোরও কমে গেছে। তবে চোখের জ্যোতি কমে গেলে হয় কি, মন দিয়ে অনেক কিছু দেখে ফেলা যায়। ঐ যে কবি বলেছেন না “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখব যখন আলোক নাহি রে?” তা অন্তরে ইদানীং যা দেখতে পাই, তাতে দেখছি ছাত্রছাত্রীদের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া দরকার। কী জন্যে? কারণটা এখনকার ছেলেমেয়েরা জানে না, সদ্যপ্রাক্তন যারা তারাও বুঝবে না, কিন্তু আমার পুরনো সহকর্মীরা আর প্রথম দিককার ছাত্রছাত্রীরা জানে, রবীন স্যার এক সময় কিরকম মারকুটে ছিল। রবীন স্যার আসছে শুনলে ছেলেমেয়েরা থরথর করে কাঁপত। অনিলের আগে যে হেডমাস্টারমশাই ছিলেন, তিনি অ্যানুয়াল স্পোর্টসে বা সরস্বতীপুজোয় ছেলেমেয়েরা খুব বাড়াবাড়ি করলে আমায় বলতেন ‘একটু ঠান্ডা করে দিন তো’। আমিও মহানন্দে ছড়ি নিয়ে নেমে পড়তাম। কাজটা ভাল করিনি। যাদের মেরেছি তাদের সকলের কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছি।

এখন তো বুঝতে পারি, চাকরিজীবনের প্রথম দশ পনেরো বছর আমি ছেলেমেয়েদের অভিভাবক হয়ে উঠতে পারিনি। তার পেছনে রাজনৈতিক কারণ ছিল ঠিকই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, মাঝে মাঝে স্কুলে এসেছি, তখন কী আর পড়ানোয় মন বসে? কিন্তু যে কারণই থাক, অন্যায় আমারই। পড়া না পারলেই মারতে শুরু করেছি। কেন পড়েনি, পড়লে কেন মনে নেই, বুঝেছে কি বোঝেনি — সেসব ভাবার চেষ্টাই করিনি। পরে যখন বাবা হলাম, পালানোর দিনও শেষ হল, তখন মারতে গেলেই আমার ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। তারপর দেখলাম, কোন ছেলে পড়া করে আসেনি, কারণ তাকে আগের দিন সন্ধেবেলা কোন বিয়েবাড়ির টেবিল পরিষ্কার করার কাজে যেতে হয়েছিল। কোন মেয়ের মা অনেকদিন বিছানায়, ছোট ছোট ভাই বোন আছে। সে বেচারি পড়া করবে না সংসার সামলাবে? কারো হয়ত বয়স পনেরো, বুদ্ধি সাত আট বছরের মত। দুবেলা পেট ভরে খেতেই পায়নি কখনো, বুদ্ধি পাকবে কী করে? এদের মারধোর করলে মানুষ হবে না, উল্টে ওরা যে মানুষ সেই বিশ্বাসটাই চলে যাবে।

কত যে গলদ আমাদের ব্যবস্থায়! যে ছেলেটা প্রত্যেকবার স্পোর্টসে হাই জাম্প, লং জাম্পে ফার্স্ট হয় তাকে আরো বড় লাফ দেয়ার শিক্ষা দেয়া আমাদের নাগালের বাইরে। কিন্তু সে অঙ্ক না পারলে আমরা বলে দিই ‘তোর দ্বারা কিস্যু হবে না।’ অথচ যে অঙ্কে ভাল কিন্তু স্পোর্টসে হিটও পেরোতে পারে না, তাকে কিন্তু বলি না ‘তোর দ্বারা হবে না।’

এসবের সমাধান ছড়িতে তো নেই বটেই, স্কুল চত্বরেও সবটা নেই। সমাধানের যে চেষ্টা দুনিয়া জুড়ে মানুষ করছে, আমি নিজের সামান্য সামর্থ্য নিয়ে সেই চেষ্টায় সামিল হতে চেয়েছিলাম। সেখানেও সফল হতে পারিনি। হয়ত সৎভাবে, সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করিনি। সে জন্যেও ক্ষমা চাইছি।

সহকর্মীরা আমার অনেক ফাঁক পূরণ করে দিয়েছেন, আমার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্যে কখনো আমায় ছোট করেননি, সে জন্যে অনেক ধন্যবাদ। রজনীদির মত কয়েকজন বরাবর পাশে না থাকলে আমার পক্ষে জীবনটা দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারত।

সর্বোপরি এই স্কুলের ছেলেমেয়েরা, যারা আমার সব দোষ ত্রুটি, অসুবিধা ভুলে আমাকে ভালবেসেছে, বিশেষ করে গত পাঁচ সাত বছর যারা আমার সমস্ত সময়টা ভরিয়ে রেখেছে, তাদের আর কী দিতে পারি আমি? তারাই আমায় এত দিয়েছে যে কুবেরের ধন তার কাছে তুচ্ছ। আমার এক পুরনো বন্ধুর কথা বলে শেষ করি। তিনি একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের দুটো লাইন মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন বেলা ফুরিয়ে গেলে আর বসে থাকতে চাই না। আমি তাই বলি, আমার বেলা ফুরিয়েছে। এবার আমায় হাসিমুখে বিদায় দিন। তবে স্কুলটাকে সবাই মিলে আগলে রাখতে হবে কিন্তু। এ স্কুল থেকে হয়ত গণ্ডায় গণ্ডায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বেরোয় না। কিন্তু এই স্কুলে বহু প্রথম প্রজন্মের ছাত্রছাত্রী পড়তে আসে। তার মানে এই স্কুল শিক্ষার আলো আরো আরো দূরে ছড়িয়ে দেয় প্রতি বছর। একটা স্কুলের এর চেয়ে বড় কাজ আর কী আছে? নমস্কার। ভাল থাকবেন সবাই।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply