নাম তার ছিল: ৩৩

পূর্বকথা: লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের হার হয়েছে বলে বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা উল্লসিত। তাদের উৎসবে কমিউনিস্টদের আসন্ন মৃত্যুর আনন্দে পান করা হয়। প্রতিবাদ করে বিপ্লব আর মালিনী। এতদিন চেপে রাখা বামপন্থী পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার পর বিল্পব ঘোষণা করে সে বামপন্থী। আজীবন বামপন্থীই থাকবে।

অপারেশন বর্গা। ভূমি সংস্কার। পঞ্চায়েত। তারপর? সবচেয়ে গরীব, ভূমিহীন চাষীর হাতে জমি তুলে দেওয়া? যৌথ খামার? সে আর হল কোথায়?

জেলা সম্পাদক ডাক পাঠিয়েছেন। ট্রেনে যেতে যেতে জানলা দিয়ে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে থাকা ক্ষেতজমি দেখতে দেখতে সে কথাই ভাবছিল রবীন। ইদানীং মাঝে মাঝে বেশ দুর্বল লাগে। তাই ট্রেনে করে যাওয়া হলেও একা যেতে ভরসা হল না আজ। শিবুকে বলতে হল “আমার সাথে একটু যাবি? যদি তোর অসুবিধা না থাকে?”

কারখানা বন্ধ হওয়ার পর থেকে শিবুর কাজ বলতে তো পার্টি করাটাই। রবীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার ফলে গত বছর সম্মেলনে বেচারা লোকাল কমিটিতেও জায়গা পায়নি। রবীন যেন এল সি এমও না থাকে তা নিশ্চিত করতে বলরাম আর শ্যামল কংসবণিক অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। আর ওদের আটকাতে পাগলের মত লড়ে গিয়েছিল ফাল্গুনী আর শিবু। রবীন বলেছিল ওসব না করতে। বয়স তো কম হল না। এল সি এম থাকা না থাকা দিয়ে কী আসে যায়? পার্টির কাজ করতে কোন তকমা লাগে না। রবীন লোকাল কমিটিতে থেকেই বা এমন কী করতে পারবে? কলকাঠি তো নাড়বে সেই বলরাম, আর তাল দেবে শ্যামল। অমন লোকাল কমিটিতে থাকা না থাকা সমান। কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবু নাছোড়বান্দা। ওরা দৌড়াদৌড়ি করে এল সি এস শ্যামলের প্যানেলের পালটা প্যানেল ঠিক তৈরি করে ফেলল। দুজনে মিলে দিন রাত রবীনকে বোঝানোর পরে ও খানিকটা ক্লান্ত হয়েই রাজি হয়ে গিয়েছিল প্যানেলে থাকতে। কারণ আশা করেছিল শেষ অব্দি প্যানেল করাই যাবে না। কোন কমরেড বল, শ্যামলের চক্ষুশূল হতে রাজি হবে? ওকে অবাক করে সত্যি সত্যি এগারো জনের প্যানেল বানিয়ে ফেলল ছেলে দুটো মিলে। সম্মেলনের আগের দিন সকালে প্যানেলটা দেখিয়ে শিবু রবীনকে রীতিমত বিজ্ঞের মত বলেছিল “রবীনদা, আপনি জানেন না কমরেডরা একনো আপনাকে কত সন্মান করে। সবকটা ব্রাঞ্চে গিয়ে আমরা কমরেডদের সাথে কতা বলেচি। আপনি লোকাল কমিটিতে থাকবেন না কেউ মানতে পারচে না। ফাল্গুনীকে, আমাকে পচন্দ করে না যারা তারাও বলচে ‘রবীনদাকে অসম্মান করা হবে এটা আমরা মানতে পারি না।’”

“মুখে তো অনেকেই অনেক কথা বলে। শেষে পরশু দিন দেখবি তোদের প্যানেলের লোকের নাম ওদের প্যানেলেও আছে,” রবীন হাসতে হাসতে বলেছিল।

“তা হোক। আমরা লোকাল কমিটিতে থাকি বা না থাকি, তোমাকে রাখবই,” ফাল্গুনী একেবারে গোঁয়ার গোবিন্দের মত বলেছিল। রবীনের মনে হয়েছিল এ যেন সবুজগ্রামের জনপ্রিয় ফিজিক্স টিচার, দাড়ি পাকতে শুরু করা ফাল্গুনী গুপ্ত নয়, সেই হাফপ্যান্ট পরা সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা ফাল্গুনী, যে বাবার সাইকেল হাফ প্যাডেল করে রবীনের স্কুলে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে খবর দিয়েছিল পাড়ায় পুলিশ ঢুকেছে, রবীনকে পালাতে হবে।

সম্মেলনের দিন দেখা গেল রবীন ঠিক, ফাল্গুনী আর শিবুও ঠিক। দুজন কমরেডের নাম দুই প্যানেলেই আছে। ডায়াস থেকে তুমুল চেষ্টা করা হল ভোটাভুটি যেন না হয়, কিন্তু ফাল্গুনী আর শিবুর সঙ্গে আরো বেশ কয়েকজন কমরেড লড়ে গেল। ভোট হল। একজন বাদে বল, শ্যামলের পুরো প্যানেল জিতে গেল। আর জিতল রবীন। গো হারান হেরে সম্মেলন শেষে যখন বেরোনো হল, ক্ষ্যাপা দুটোর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল ওরা বিশ্বকাপ ফুটবল জিতে উঠল। আর বল যখন পাশ দিয়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল, মুখখানা দেখে রবীনের হাসিই পেল। যেন খুব কাছের কেউ মারা গেছে।

তারপর থেকে সকালে গণশক্তি বিলি করা আর বউয়ের দোকানে নাম কা ওয়াস্তে মুখ দেখানো ছাড়া শিবুর আর বিশেষ কাজ থাকে না। রবীন ওদিকটায় গেলেই শিবুর গিন্নী অভিযোগ করে “ওকে একটু বলবেন তো দাদা, দোকানে যেন একটু সময় দেয়। আমি একা আর কত করব? একা একাই তো এত বছরের চেষ্টায় ব্যবসাটা বাড়ি থেকে দোকানে আনতে পারলাম। আমাকে একটুও সাহায্য করবে না? এই দোকানটাই তো আমাদের ভাত যোগায়।”

রবীন মাথা নেড়ে বলে “অ্যাই শিবু, বউডারে একটু হেল্প কর। ঠিকই তো কইতাছে। ব্যবসার কি খাটুনি কম?”

“তবে? বলুন দেখি? আগে তো বলত পার্টির কাজে সময় পায় না। এখন তো শুধু সকালে কাগজটা দিতে যায়। তবু একটু দোকানে বসবে না? এই বিকেলবেলাটা ঘন্টা খানেক বসে। তাও কোন দায়িত্ব নেবে না। খদ্দের এলে মাপও নিচ্ছি আমি, ক্যাশও সামলাচ্ছি আমি। আর পারি না বাপু।”

এসব কথার সময়ে শিবু সাত চড়ে রা কাড়ে না। রবীন বলে “শিবু, তুই কিন্তু বউয়ের কথা শোন। দুনিয়ার সব বুদ্ধিমান পুরুষ তাই করে। আর এই ব্যাপারে আমি ওর পক্ষই নিমু। হাঁটতে হাঁটতে তগো দোকানে আইলে যে সন্ধ্যাবেলা এক কাপ চা পাই, হেইডা বন্ধ করনের রিস্ক আমি নিতে পারুম না।”

রবীন আর শিবু হাসে, ওর বউ জিভ কেটে বলে “এ রাম! দাদা, তা কখনো হয়? আপনি এলে আমরা নিজেদের পাতের ভাতও আপনাকে দিয়ে দিতে পারি।”

রবীন হাসতে হাসতে বলে “জানি গো, জানি। আমার ভাই বোন, আত্মীয়, বন্ধু যা কও, সবই তো তোমরা। এই সবুজগ্রামে আমার জন্যে তোমরা আছ বইল্যাই তো কাউরে কেয়ার করি না। কিচ্ছু থাকে না, বুঝলা? পদও থাকে না, গায়ের জোরও থাকে না। মানুষের ভালবাসাডাই থাকে।”

সেই ভালবাসার জোরেই শিবুকে সঙ্গী হতে বলা।

“শিবু, রথীন রায়ের হঠাৎ আমায় কেন মনে পড়ল বল দেখি?” রবীন উল্টো দিকে বসা মানুষটাকে জিজ্ঞেস করে।

“আপনাকে ফোনে কী বলল?”

“খুলে তো বলল না কিছু। ফোনটা তো করেছিল ঐ রামকৃষ্ণ বলে ছেলেটা। ওনার ডান হাত। আমাকে শুধু বলল, রথীনদা আপনাকে একবার দেখা করতে বলেছে। যত তাড়াতাড়ি পারেন। তা আমি বললাম ‘ঠিক আছে, আমি রোববার আসছি।’”

“আমার মনে হয় পার্টিটাকে ঢেলে সাজানোর কোন প্ল্যান। এবারের ভোটের ফলটা তো নেতাদের চিন্তায় ফেলেচে ঠিকই। ফেলাই উচিৎ।”

“বলছিস? কি জানি! আমার ঠিক ভরসা হচ্ছে না রে। পার্টিটাকে ঠিক করা নিয়ে কত কথাবার্তা, কত পার্টি চিঠি, কত কী হল… সেই শৈলেন দাশগুপ্তর সময় থেকে। ফল তো কিছু দেখলাম না। আর এগুলো পার্টির যখন পায়ের তলায় মাটি আছে তখন করা অনেক সহজ। এখন তো মাটি সরতে শুরু করেছে। এখন কি আর ওসবের মধ্যে যাবে নেতারা?”

“কিন্তু দু হাজার এগারো যদি জিততে হয়, রবীনদা, অদল বদল কিন্তু কত্তে হবে। আপনি অনেক আগেই বুঝতে পেরেচিলেন, আমরা বুঝিনি। লোকসভা ভোটের রেজাল্ট বেরোবার পর থেকে কিন্তু সবাই বুঝতে পারচে। মানুষ কিন্তু রেগে আচে। আগে ভয়ে হোক বা যে কারণে হোক, মুখ খুলত না। এখন কিন্তু রাস্তাঘাটে বলাবলি করচে।”

“বলাবলি আগেও করত। আমাদের শোনার কান ছিল না। এখন পিঠে বাড়ি পড়েছে তাই কানগুলো খাড়া হয়েছে, বুঝলি? পার্টিকে অনেক আগেই সাবধান করা হয়েছিল। ভাল ভাল লোক সাবধান করেছে। তখন কেউ কথা কানে তোলেনি। অশোক মিত্রর মত লোককে আমরা রাখতে পারলাম না। উনি তাও অন্যরকম লোক। পার্টি ছেড়ে দিয়েও পার্টিবিরোধী কাজে জড়াননি…”

“পরে তো পার্টি ওনাকে রাজ্যসভাতেও পাটাল।”

“হ্যাঁ। তারপর সঈফুদ্দিন চৌধুরী। সে কি আর খারাপ লোক? লেখাপড়া জানা লোক। সে লোকটাকেও রাখতে পারলাম না। তিনি আলাদা পার্টি খুলে বসলেন। ওদিকে ত্রিপুরার নীরেন চক্কোত্তি। এখন কি আর সময় আছে?”

“ভোটের তো এখনো বচর দেড়েক দেরী। এর মদ্যে চেষ্টা কল্লে ঠিক সব গুচিয়ে নেয়া যাবে।”

“ভোটের সময়ের কথা বলছি না রে, বলছি মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করার কি আর সময় আছে? ভোট তো আসবে যাবে। পরপর এতগুলো ভোট আমরা জিতেছি, চিরকালই কি জিতব? তা তো হয় না। এক সময় তো হারতেই হবে। সেটা বড় কথা না।”

“কিন্তু সংসদীয় ব্যবস্তায় যতক্ষণ আচি, ভোটের কথা একেবারে ভাবব না বললে কি চলে, রবীনদা?”

“ঐখানেই তো গণ্ডগোল রে, শিবু। ঐ ভাবতে ভাবতেই আমাদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। ভোটে জেতার চিন্তা এত বড় হয়ে গেল, যে আসল দিকগুলোয় আর নজর দেয়া হল না। এখন আর হবেও না, তুই দেখে নে। এখন শর্ট কাটে কী করে ভোট ফেরত পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা হবে।”

“কিন্তু… আপনাকে তলবটা তা’লে কী জন্যে?”

“নির্ঘাত কোন নালিশ আছে। মানে আমার নামে কেউ নালিশ করেছে। শাস্তি দেয়ার আগে হুঁশিয়ারি দেবে বোধহয়।”

“শাস্তি!” শিবু একেবারে হাঁ হয়ে যায়। “অপরাদটা কী?”

“শাস্তি দিতে কি অপরাধের দরকার হয় সব সময়?”

শিবু কথাটার মানে বুঝতে পারে না।

জেলা অফিসে অনেকদিন পরে আসা হল রবীনের। হীরুদার মৃত্যুর পরে বার দুয়েক এসেছে। একবার সুব্রতদা, যিনি হীরুদার পরে জেলা সম্পাদক হলেন, তাঁর সাথে এলাকার একটা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে এসেছিল। তারই এক বছরের মধ্যে আরেকবার। সুব্রত মণ্ডল একদিন দুম করে স্ট্রোক হয়ে মারা গেলেন। তাঁর স্মরণসভায় এসেছিল। তখনো রবীন জোনাল কমিটির সদস্য। সেও প্রায় এক দশক আগেকার কথা। জোনাল কমিটি থেকে বাদ পড়ে গেছে নতুন সহস্রাব্দের গোড়ার দিকেই। আর কোনদিন জেলা পার্টির কারোর তাকে দরকার হবে রবীন ভাবেনি।

দোতলায় সম্পাদকের ঘরের সামনে ভিড়। দুটো বেঞ্চে লাইন দিয়ে লোক বসে আছে। প্রশস্ত টাকওয়ালা, অবশিষ্ট চুলগুলো আর সব দাড়ি পেকে যাওয়া একজন রবীনকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে বলল “আসেন, মাস্টারমশাই। বসেন।” এত বয়স্ক একটা লোক তাকে আপনি আজ্ঞে করছে দেখে রবীন একটু অবাকই হল। শিবু তো খুক করে হেসেই ফেলল। লোকটা সেটা খেয়াল না করে বলল “আপনি আমাকে চিনতে পারেননি তো?”

রবীন মাথা নেড়ে না বলল।

“চেনার কথাও না। সেই কবেকার কথা। আমার আজাদপুরে বাড়ি। আপনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি থাকার সময় আমাদের ওখানে একটা লাইব্রেরি করলেন মনে আছে?”

“খুব মনে আছে।”

“আমি তখন ওখানে এস এফ আই করতাম। লাইব্রেরি উদ্বোধন করতে শিক্ষামন্ত্রী, গ্রন্থাগার মন্ত্রী – এঁরা সব এলেন, আপনিও ছিলেন। আমি একটা কবিতা…”

“ও হ্যাঁ হ্যাঁ,” রবীন বুড়োটাকে জড়িয়ে ধরে। “রাস্তা কারো একার নয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। নিশ্চয় মনে আছে, খুব মনে আছে। কিন্তু তোমার নামটা যে মনে নেই গো।”

“আপনি তো অনেকটাই মনে রেখেছেন, স্যার। এতটা আমি আশা করিনি। আমার নাম ফরিদুর।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। এইবার মনে পড়েছে। তুমি শুধু এস এফ আই করতে? তুমি তো আজাদপুর কলেজে এস এফ আইয়ের প্রথম জি এস, তাই না? তোমাকে ভোটের দিন সি পি মেরে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিল।”

“আপনার তো অনেক কিছু মনে আছে স্যার!” লোকটা অবাক।

“আরে এসব যেদিন ভুলে যাব সেদিন আর পার্টি অফিসে পা দেয়ার অধিকার থাকবে না, বুঝলে? সেই হেমাঙ্গ বিশ্বাস দলবল নিয়ে একটা গান গাইতেন না? ‘আমরা তো ভুলি নাই শহীদ, কখনো ভুলব না, তোমার কইলজার খুনে রাঙাইল কে, আন্ধার জেলখানা।’ পার্টির জন্যে যারা মার খায়, প্রাণ দেয় তাদের ভুলে গেলে আর পার্টির থাকল কী? কিন্তু বাবা, তুমি এত বুড়িয়ে গেলে কী করে?”

“আর বলবেন না। দুবার জন্ডিস, একবার টাইফয়েড। একবার তো ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ায় মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। চুল সব আগেই উঠে গেছিল। মনের দুঃখে দাড়িই রাখতে শুরু করলাম। সেও সব পেকে গেছে চল্লিশের মধ্যে।”

উপস্থিত সবাই হেসে ওঠে। সবচেয়ে জোরালো হাসিটা রবীনের। সম্পাদকমশাইয়ের ঘর থেকে রামকৃষ্ণ পর্দা তুলে মুখ বাড়িয়ে বলে “একটু আস্তে। দাদার অসুবিধা হচ্ছে।” অপ্রস্তুত কমরেডরা চুপ করে যায়। রবীন ফরিদুরের কাঁধে হাত দিয়ে বলে “আমরা তো লাইনে অনেক পেছনে। চলো নীচে গিয়ে একটু চা খাই আর আজাদপুর কেমন আছে শুনি তোমার থেকে। যেতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু আজকাল আর অতটা সাইক্লিং করতে পারি না, বুঝলে? বয়স হয়েছে তো। এ বছর রিটায়ারমেন্ট।”

চা, বিড়ি খেয়ে এসে বেঞ্চে বসতে না বসতেই রবীনের ডাক এসে গেল। রবীন বলল “ফরিদুর, তুমি সেরে এসো আগে। আমার আগে থেকে বসে আছ তো?” কিন্তু রামকৃষ্ণ জোর দিয়ে বলল “না, রথীনদা আপনাকেই আগে ডাকছে।” অগত্যা।

রবীন আর শিবু ঘরে ঢুকতেই রথীন রায় বললেন “এটা কে?”

“কমরেড শিবু মণ্ডল,” রবীন শিবুর কাঁধে হাত রেখে বলল। “আমাদের এলাকার সবচেয়ে পার্টি অন্তপ্রাণ কমরেডদের মধ্যে একজন।”

“অ। তুমি বাইরে বসো।”

বলার ধরনটা একেবারেই ভাল লাগল না রবীনের। শিবু চুপচাপ বেরিয়ে গেল। রবীনের মনে হল ওরই ভুল। রথীন রায় কেমন লোক জেনেও শিবুকে আজকে নিয়ে আসা উচিৎ হয়নি। ওর ভুলেই বেচারাকে অপমানিত হতে হল।

“বসুন, কমরেড,” কাঠখোট্টা রথীন বলল। “আপনি ঐ লেজুড়টাকে নিয়ে এসেছেন কেন?”

রবীনের মাথাটা দুম করে গরম হয়ে গেল।

“আমি চল্লিশ বছরের উপর পার্টি করছি। আজ অব্দি কোন লেজুড় হয়নি আমার, অনেক কমরেড হয়েছে। কাজের কথায় এলে ভাল হয়। অনেকটা পথ যেতে হবে আমাদের।”

রথীন যে এরকম জবাব আশা করেনি সেটা মুখ দেখে ভালই বোঝা গেল। মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে রেখে বলল “হ্যাঁ, আমার হাতেও বেশি সময় নেই। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। অন্য কেউ হলে পার্টির যা নিয়মকানুন সেই অনুযায়ী কাজকর্ম শুরু করার নির্দেশ দিতাম। কিন্তু আপনি প্রবীণ লোক, চল্লিশ বছর ধরে পার্টি করছেন নিজেই বললেন, তাই মনে হল আপনাকে মুখে বললে যদি কাজ হয়। তাই ডেকে পাঠিয়েছি।”

“অভিযোগটা কী?”

“আপনার বিরুদ্ধে উপদল করার অভিযোগ আছে। এবং যাদের নিয়ে করছেন তাদের বিরুদ্ধে আরো গুরুতর অভিযোগ আছে।”

“তারা কারা?”

“বাবা! আপনি কিছুই জানেন না বলতে চান?”

“আমি আসলে পুরনো দিনের লোক তো। আজকাল অনেক নতুন নতুন কথা চালু হয়েছে, পুরনো কথার নতুন মানে হয়েছে। সেসব আমি সত্যিই বুঝি না। ফলে আপনার কথা বুঝতে আমার একটু অসুবিধাই হচ্ছে।”

“তার মানে আপনি বলছেন আপনি উপদলীয় কাজকর্ম করছেন না?”

“উপদল বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন আমি জানি না। আমি উপদল বলতে বুঝি দলের মধ্যে কয়েকজন যদি নিজেদের স্বার্থকে পার্টির স্বার্থের উপরে স্থান দেয় এবং পার্টির ক্ষতির কথা মাথায় না রেখে এই গোষ্ঠীর জন্যে ছোট বড় সুবিধা আদায় করার চেষ্টা করে, ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে, তাদেরকে। আমি এরকম কিছু করেছি বলে তো মনে পড়ে না।”

“তাহলে গত বছর লোকাল কমিটির সম্মেলনে আপনার নেতৃত্বে সরকারী প্যানেলের পাল্টা প্যানেল উঠল কী করে?”

“আমার নেতৃত্বে? আপনি ঘটনাটা ঠিক করে জানেন না, কমরেড। ঐ প্যানেলে প্রস্তাবিত এল সি এস হিসাবে কমরেড ফাল্গুনী গুপ্তর নাম ছিল, আমার নয়।”

“জানি, জানি। ঐ ফাল্গুনী তো আপনারই চ্যালা।”

“আপনি আমার চেয়ে বয়সে একটু ছোট হলেও পার্টির জেলা সম্পাদক। সেই জন্যে আপনার প্রশ্নগুলোর জবাব দিচ্ছি। লেজুড়, চ্যালা — এইসব শব্দ যদি কমরেডদের সম্বন্ধে ব্যবহার করেন তাহলে আর জবাব দেব না। আপনি যা ইচ্ছা ব্যবস্থা নিতে পারেন,” বলতে বলতে রবীন উঠে দাঁড়ায়।

“আপনার ঐ প্রিয় কমরেডদের সম্পর্কে অভিযোগগুলো শুনবেন না?”

“আপনি বললে শুনতেই পারি, কিন্তু তাঁদের হয়ে অভিযোগের জবাব দেয়া আমার কাজ নয়।”

“আপনার জবাব পার্টি শুনবেও না। অভিযোগগুলো শুনে যান, তাদের বলে দেবেন জবাব যেন তৈরি রাখে। শিগগির তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হবে।”

রবীন হ্যাঁ, না কিছুই বলে না, তবে দাঁড়িয়ে থাকে। রথীন রায় টেবিলের উপর থেকে একটা কাগজ হাতে নিয়ে বলেন “আপনার ঐ ফাল্গুনী কি যেন, তার বিরুদ্ধে একটি বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ আছে। এক বিধবা মহিলার সাথে। আর এই যাকে নিয়ে এসেছেন ট্যাঁকে করে, তার বিরুদ্ধে পার্টি মুখপত্র বিক্রির টাকা মেরে দেয়ার অভিযোগ। এদের পাশ থেকে সরে আসুন, কমরেড। নইলে কিন্তু আপনার সদস্যপদও বিপদে পড়তে পারে।”

“আপনি মাই বাপ, পার্টি আপনার,” রবীন চওড়া হেসে বলে। “আপনি কাকে পার্টিতে রাখবেন, কাকে বার করে দেবেন সে আপনার ব্যাপার। আমি যখন পার্টি করতে এসেছিলাম তখন ঐ সদস্যপদ পেতে গেলে অনেক রকম পরীক্ষা দিতে হত, কমরেড। সেগুলো পাশ করতে করতেই মানুষ পার্টির লোক হয়ে যেত। ফলে আগে পার্টির লোক হয়েছি, পরে সদস্যপদ পেয়েছি। আজ সদস্যপদ চলে গেলেও পার্টির লোকই থাকব। যদ্দিন বাঁচি। চলি।”

জেলা সম্পাদকের ঘর থেকে বেরিয়ে রবীন কিছু বলেনি, শিবুও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। স্টেশনে এসে শিবু যখন বিড়ি ধরিয়ে দিচ্ছে, তখন রবীন বলল “আমাকে এবার ত্যাগ কর, বুঝলি? আমার দিন শেষ। বাঁচতে চাস তো বলরামকে ধর। দু বেলা ওর বাড়ি যা, মিষ্টি কথা টথা বল। অপমান হজম করে বাজার টাজার যদি করে দিতে পারিস তাহলে আরো ভাল। বাঁচতে তো হবে, ভাই। আমার আর তোদের বাঁচানোর শক্তিটুকুও নেই রে।”

শুনে শিবু হো হো করে হাসতে থাকে। সে কি হাসি! আর থামেই না। লোকজন তাকাতে শুরু করে। রবীন বলে “কি রে? এত হাসির কী হল? সিরিয়াসলি বলছি।”

“রবীনদা, আপনি পারেন বটে,” হাসি সামলাতে সামলাতে শিবু বলে। “আচ্ছা ধরুন আমি আপনাকে ত্যাগ কল্লাম। আপনি পারবেন আমায় ত্যাগ কত্তে? যদি শোনেন শিবু হাসপাতালে, ঠিক তো গিয়ে হাজির হবেন। যদি শোনেন শিবুর বাড়ি হাঁড়ি চড়চে না, ছুতো করে কারো হাত দিয়ে বাড়ির এটা সেটা তো ঠিক পাঠাবেন। এত বচ্চর যারা আপনাকে ত্যাগ করেচে, সকলের সাথেই তো এই জিনিস করে এসেচেন আপনি। যে আপনার সাথে কতা বলা পয্যন্ত ছেড়ে দিয়েচে তারও চাকরির জন্যে একে তাকে বলেচেন, বাপ-মা মরলে শ্মশান গেচেন।”

রবীন বলে “আরে বোকা, সে তো করতেই হবে। আমায় পছন্দ করুক আর না-ই করুক, পার্টির লোকের পাশে দাঁড়াতে হবে না? নইলে আর কমরেড কিসের?”

“তা’লে আর আমায় এসব বলবেন না।”

“এমনি এমনি বলছি না রে। বড় ক্ষতির সম্ভাবনা দেখেই বলছি। পার্টির আর আমার মধ্যে যদি বাছতে হয়, পার্টিটাকেই তো বাছা উচিৎ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply