নাম তার ছিল: ৩২

পূর্বকথা: লোকসভা নির্বাচনের ফল নবারুণকে হতবাক ও অবসন্ন করে। এই সময় রবীনের তাকে দরকার মনে করে তার বাড়িতে পৌঁছায় সে। শোনে হঠাৎ এসে আবার হঠাৎ চলে গেছে বিপ্লব। বাবার উপর রাগ করে।

অফিসের ওরা উল্লসিত। বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা। প্রসূন বলছিল দু হাজার এগারোতে বামফ্রন্ট হারলে সব্বাইকে প্যারাডাইসে ডিনার খাওয়াবে। সি পি এম ওদের গ্রামের জমি কেড়ে নিয়েছিল। সেই থেকে হারেনি, এতদিনে হারল। জমিয়ে সেলিব্রেট করতে হবে। এবার ফল প্রকাশের দিনটা শনিবার পড়ে যাওয়ায় অফিস থেকে বেরিয়ে কোন বারে গিয়ে সেলিব্রেট করা হয়নি। তাই ওরা ঠিক করেছে নেক্সট উইকেন্ডে রোহিত বলে ছেলেটার ফ্ল্যাটে খাওয়া দাওয়া হৈ হুল্লোড় করা হবে। পশ্চিমবাংলার ছেলে না হলেও শাহনওয়াজকে ডাকা হয়েছে। আসর জমাতে ওর মত কেউ পারে না।

“তু আ রাহা হ্যায় কল?” শুক্রবার এক ফাঁকে সিগারেট খেতে বেরিয়ে একলা পেয়ে শাহনওয়াজ বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল।

“ইয়া। হোয়াই নট?”

“নহি, মুঝে লগা থা তু অ্যাভয়েড করেগা।”

“কিঁউ?”

“ইয়োর ড্যাড ইজ আ সি পি এম ম্যান, না?”

বিপ্লব চমকে উঠল। এখানে এসে তো সচেতনভাবেই এই কথাটা কাউকে বলেনি! তাহলে নওয়াজ জানল কী করে?

“হাউ ডু ইউ নো?”

ইউ টোল্ড মি।”

“আই! হোয়েন?”

“কেয়া বাত কর রহা? তুঝে ইয়াদ তক নহি? তেরে ফ্ল্যাট মে পি রহে থে। তভি তো বোলা তু।”

বিপ্লব কিছুতেই ভেবে পায় না কোন দিনের কথা বলছে নওয়াজ। বিপ্লবের ফ্ল্যাটে ও একাধিকবার গেছে, দু একবার পান ভোজন হয়েছে। কিন্তু কবে আবার এত নেশা হল যে এই গোপন কথাটা ওকে বলে ফেলল! আবার মনেও রইল না!

“এনিওয়ে, আই হ্যাভন্ট টোল্ড এনিবডি। ডোন্ট ওয়ারি।”

নওয়াজ নিজের সিগারেট শেষ করে অফিসে ঢুকে যায়, বিপ্লবেরটা তখনো কিছুটা বাকি। টানতে টানতে ও ভাবে নওয়াজকে জিজ্ঞেস করতে হবে সেদিন নেশার ঘোরে আর কী কী বলে ফেলেছিল। বাবার রাজনৈতিক পরিচয়টা সযত্নে লুকিয়ে রেখেছিল এতদিন। তবু তো জয়ের রাস্তায় ছিল বাবার দল। আজ যখন হেরেছে, তখনই পরিচয়টা ফাঁস হয়ে যাওয়ার সময় হল? নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হয়। এই জন্যে নেশা করতে হলে একা করাই ভাল। অচিন্ত্যদার কথা আলাদা। তার সাথে অন্যরকম সম্পর্ক ছিল, নেশা করে মুখ ফসকে কিছু বলে ফেললেও সে কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয় ছিল না। কিন্তু নওয়াজ ছেলেটা ভাল হলেও সহকর্মীর বেশি কিছু নয়। কি কুক্ষণে যে ওকে কয়েকবার মদ্যপানের সঙ্গী করে ফেলেছিল! অবশ্য ও বলছে আর কাউকে বলেনি। বোধহয় সত্যিই বলেনি। নইলে টিটকিরি মারার এমন সুযোগ কি সকলে ছেড়ে দিত? অফিসে রাজনৈতিক আলোচনা খুব জোর গলায় হয় না বটে, কিন্তু ফল বেরোবার দিন সকাল থেকে নিশ্চয়ই প্রসূন অ্যান্ড কোম্পানি এস এম এস করে করে পাগল করে দিত। যে এস এম এস জোকগুলো এখন ফরোয়ার্ড করে নীচু গলায় বলছে “লেটেস্টটা দ্যাখ। ব্যাপক”, সেগুলোই সারাদিন ধরে পাঠাতে থাকত। আর ইচ্ছে করে একই জোক চার পাঁচ জন মিলে পাঠিয়ে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত, যদি একবারও টের পেত বামফ্রন্টের হারে বিপ্লবের দুঃখ পাওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে।

সিগারেটটা পায়ের নীচে পিষে দিয়ে ধোঁয়ার শেষ রিংটা ছেড়ে বিপ্লব ভাবে, এত চিন্তা করার অবশ্য কোন দরকার নেই। ওরা জানতে পারলেই বা কী? এই হার ওর তো গায়ে লাগেনি। ওরা যেসব জোকগুলো পাঠাচ্ছে সেগুলো পড়ে ও তো দিব্যি উপভোগ করছে। সেই যে, কী যেন? “চলুন, বেড়িয়ে আসি। কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয়। প্রকৃতির কোলে সি পি এমের জেতা লোকসভা সিট দেখতে।” পড়ে তো দিব্যি হা হা করে হেসেছে বিপ্লব। ওরা যদি জানতে পেরেও যায় তার বাবা সি পি এম, পেছনে লাগলে সটান বলে দেবে “বাবা সি পি এম তো কী? আমি অ্যান্টি সি পি এম।”

পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরে অবশ্য এত অলস লাগছিল, বিপ্লব ভাবল পার্টিটায় না গেলেই হয়। শুধু কী অজুহাত দেবে সেটা ঠিক করে রাখতে হবে। প্রসূন, রোহিত, তিতাস, অমরেশ, মালিনী — সবাই ঢপ দিয়ে অফিসে ডুব দিতে ওস্তাদ। ওদেরকে ঠকানো বেশ শক্ত কাজ। অবশ্য আলস্য কাটিয়ে চলে গেলেই আর অত ভাবনা চিন্তার দরকার পড়ে না। কিন্তু যেতে, কেন কে জানে, ইচ্ছাই করছে না। রোহিত বড়লোকের ছেলে, রুচিও বেশ উঁচু দরের। যদিও পার্টির খরচ খরচা ভাগ করে নেওয়া হয়েছে সবাই মিলে, তবু ওর ফ্ল্যাটে পার্টি মানে নিজের সংগ্রহ থেকে অত্যন্ত বেশি দামী কোন একটা মদ নিশ্চয়ই খাওয়াবে ও। অন্যের বাড়িতে পার্টি থাকলেও সঙ্গে করে ওরকম একটা বোতল ও বরাবরই নিয়ে যায়। না গেলে ওটা মিস হবে। তবু। কোথায় যে আটকাচ্ছে তা বিপ্লব ভেবে পাচ্ছে না।

প্রসূন সেই ১৬ই মে থেকে যেরকম তুরীয় মেজাজে আছে, তাতে ও সারা সন্ধ্যে দাপাবে আজকে। ছেলেটা এমনিতে মন্দ নয়, কিন্তু সি পি এম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলেই জ্ঞানগম্যি সব হারিয়ে ফেলে। খুব একটা যুক্তির ধার ধারে না কখনোই। সি পি এমের কথা উঠলে তো আর কথাই নেই। অনর্গল খিস্তি দেয়। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব, অনিল বিশ্বাস, বিমান বোস সকলের যৌন জীবন সম্পর্কে নানারকম রসাল মন্তব্য করে। এমনিতে না হয় মানিয়ে নেওয়া যায়। আজ ছুটির দিনে সন্ধে, রাত জুড়ে ওসব শুনতে হবে ভেবে বিরক্ত লাগছে।

রোহিতটাও তো কম যায় না। নিজের বাড়িটা কোন বিধানসভা এলাকায় সেটা বলতে পারে না, এদিকে জোর গলায় বলে “কমিউনিস্টদের গুলি করে মারা উচিৎ। ওদের জন্যেই পশ্চিমবঙ্গের কিচ্ছু হল না। গোটা দেশটারই কিছু হবে না যদ্দিন কমিউনিসটগুলোকে শেষ না করা হচ্ছে।” গোড়ার দিকে বিপ্লব কয়েকবার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে কমিউনিস্ট মানেই সি পি এম নয়। কিন্তু ওর তাতে কিছু এসে যায় না। ও জোর গলায় বলে “ভাই শোন, আয়াম নট ইন্টরেস্টেড ইন পলিটিক্স। আই হেট পলিটিশিয়ানস। স্পেশালি কমিউনিস্টস। দে হ্যাভ রুইনড এভরি কান্ট্রি দে রুলড। মাই হিরো ইজ হিটলার। দেশের উন্নতি কিভাবে করতে হয় লোকটা দেখিয়ে গেছে। আমি ভোট দিতে যাই না। যেদিন কোন পার্টি সাহস করে বলবে ‘আমরা হিটলারের রাস্তায় চলব’, সেদিন গিয়ে ভোট দিয়ে আসব।”

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে হতে বিপ্লব ঠিক করে ফেলল যাবে না, ফোনটা অফ করে রাখবে। বাড়িতেও থাকা উচিৎ হবে না। আটটা নাগাদ রোহিতের ফ্ল্যাটে পৌঁছবার কথা সকলের। তারপর ফোন করে না পেলে প্রসূন হয়ত দলবল নিয়ে এসে তুলে নিয়ে যেতে পারে। বেশি দূর তো নয় ওর ফ্ল্যাট থেকে। সন্ধের মুখে কেটে পড়তে হবে কোথাও।

সব ভেস্তে গেল দিবানিদ্রায়। বিকেলবেলাই বেরিয়ে পড়া উচিৎ ছিল। চুপচাপ খাটে পড়ে থাকায় চোখ লেগে গেল। ঘুম যখন ভাঙল তখন অন্ধকার হয়ে গেছে। বাড়িওয়ালার বিচ্ছু ছেলেটাও আজকে জ্বালাতে আসেনি। আশ্চর্য! ধড়মড়িয়ে উঠে বিপ্লব দ্যাখে সোয়া সাতটা বাজে। তাড়াতাড়ি চোখে মুখে জল দিয়ে উঠে প্যান্টটা গলিয়ে বেরোতে যাবে, এমন সময় কলিং বেল বাজল। যা আশঙ্কা ছিল প্রায় তাই ঘটল। দরজা খুলতেই সামনে মূর্তিমান শাহনওয়াজ।

“ওয়াহ। রেডি হো গয়া তু? চল নিকলতে হ্যাঁয়।”

বিপ্লব ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কিছু বলে উঠতে পারে না প্রথমটা। তারপর জিজ্ঞেস করে “তু ইয়াহাঁ?”

“হাঁ। আপনা কার লেকে আয়া ম্যায়। সোচা তুঝে উঠা লুঁ।”

এরপর কিভাবে এড়ানো সম্ভব কিছু ভেবে উঠতে না পেরে বিপ্লব গুটিগুটি পায়ে নওয়াজের সাথে ওর গাড়িতে গিয়ে ওঠে।

আসরটা দিব্যি জমে গেল। নওয়াজ সচরাচর যা করে থাকে, তা করেই জমিয়ে দিল। চটজলদি ড্রিঙ্ক তৈরি করে, এর পেছনে লেগে, ওর সাথে একটু খুনসুটি করে একেবারে মাতিয়ে দিল ঘন্টা খানেকের মধ্যেই। বিপ্লব খুশি হল কারণ নওয়াজের দাপটে যে জন্যে পার্টি সেসব নিয়ে কোন কথাই উঠছিল না। রোহিতের সাউন্ড সিস্টেমটা গাঁক গাঁক করে চলছিল প্রায় শুরু থেকেই। ফলে কথা বিশেষ বলাও যাচ্ছিল না। বিপ্লব বাকিদের মত নাচ না জেনেও নাচতে পারে না কোনদিনই, আর অত আওয়াজের মধ্যে লোকের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কথা বলাও কষ্টসাধ্য। ও তাই নিশ্চিন্তে এক কোণে সোফায় বসে বিয়ার খাচ্ছিল। আর যে নাচানাচির মধ্যে বিশেষ গেল না, সে হচ্ছে মালিনী। ও কিন্তু দিব্যি নাচতে পারে। বহু অফিস পার্টিতে ওকে ঘন্টার পর ঘন্টা টানা ডান্স ফ্লোরে থাকতে দেখেছে বিপ্লব। আজকে সেরকম উৎসাহ নেই দেখে একটু অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু কেন, কী বৃত্তান্ত — অত কিছু জিজ্ঞেস করার দরকারই বা কী?

সন্ধ্যেটা দিব্যি কেটে গেল। দশটা নাগাদ তিতাস বলল “গাইজ, আয়্যাম স্টার্ভিং।” প্রসূন জানিয়ে দিল পাশের ঘরে ডাইনিং টেবিলে সব সাজানোই আছে। তিতাস জিজ্ঞেস করল “এনিবডি ওয়ন্টস টু জয়েন মি?” মালিনী তক্ষুণি উঠে পড়ল। বিপ্লবকে জিজ্ঞেস করল “তুই খাবি এখন?” বিপ্লব বলল “না রে। আরেকটু পরে।”

এগারোটা নাগাদ যখন সবাই খেতে শুরু করেছে, তখনই প্রথম বিপ্লব বুঝতে পারল প্রসূনের বেশ নেশা হয়ে গেছে। নওয়াজের সাথে ঠাট্টা করে প্রেমের অভিনয় করতে করতে হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে গিয়ে এমনভাবে গলা জড়িয়ে ঠোঁটে চুমু খেতে গেল যে নওয়াজ ওর গালে আদরের চড়টা একটু জোরে কষিয়ে বলল “আবে ম্যায় করিনা হুঁ ইয়া তু গে হ্যায়?” তখন ঠাট্টা ইয়ার্কির উপর দিয়ে গেল ব্যাপারটা। ঝামেলা শুরু হল রোহিত খাওয়াদাওয়ার পরে শ্যাম্পেনের বোতল বের করে আনতেই।

অনেকেই প্রসূনকে বারণ করেছিল তক্ষুণি খেতে, কারণ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সন্ধ্যে থেকে বিয়ার আর হুইস্কি খেয়েই ছেলে টালমাটাল। কিন্তু ও হচ্ছে দলনেতা। কারোর বারণ শুনলে তো। যখন গ্লাসে গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢালা হচ্ছে তখন রোহিত নওয়াজকে ধরল গানের জন্যে। অনেক গুণের মধ্যে কিশোরভক্ত নওয়াজের এটাও একটা গুণ। বেশ ভাল গায়। চোখ বন্ধ করে শুনলে সহসা কিশোর কুমার গাইছে বলেই মনে হয়। ও ধরল “আ চলকে তুঝে ম্যায় লেকে চলুঁ এক অ্যায়সে গগন কে তলে।” কিছুটা চলার পরে অনেকেই গলা মেলাল, কেউ কেউ তাল দিতে থাকল। শুধু বিপ্লব বিষণ্ণ হয়ে পড়ল। আসলে গানটার সাথে একটা বিশেষ স্মৃতি জড়িয়ে ছিল।

বিপ্লব যখন খুব ছোট তখন বাড়িতে গান শোনার উপায় বলতে ছিল থাপ্পড় মেরে মেরে স্টেশন ঠিক করতে হওয়া ঢাউস রেডিওটা, আর ঠাকুর্দার রেকর্ড প্লেয়ারটা। তখনো পে কমিশনের দৌলতে বাবার মাইনে ভদ্রজনোচিত হয়নি। এর ওর থেকে রেকর্ড চেয়ে এনে বাবা চালাত, আর প্রতি পুজোয় মামার বাড়ি থেকে ফেরার পথে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের দোকান থেকে একটা করে লং প্লেয়িং রেকর্ড কিনে আনত মা। ঠাকুর্দার নিজের কেনা গুটি কয়েক এল পি রেকর্ড ছিল অবশ্য। তারই একটায় ছিল গানটা। বিপ্লবকে অনেক ডাকাডাকি করেও যখন ঘুম থেকে তোলা যেত না ভোরবেলা স্কুলে যাওয়ার জন্যে, তখন বাবা এই গানটা চালিয়ে দিত সজোরে। গান কানে গিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চোখ অল্প খুলতেই বাবা কোলে তুলে নিয়ে সোজা চলে যেত বাথরুমে। না জেগে উপায় থাকত না।

গান শেষ হতেই সকলে হাততালি দিয়ে, সিটি বাজিয়ে গায়ককে বাহবা দিল। বিপ্লব বসে রইল নিঝুম হয়ে। প্রসূনকে উশকে দিল সেটাই।

“অ্যাই শালা, তালি দে বি সি। কোন জগতে আছিস?” বিপ্লবকে খুব জোরে ঝাঁকিয়ে বলল সে।

বিপ্লব মৃদু হেসে হাতের গ্লাসটা নওয়াজের দিকে তুলে বলল “ও হ্যাঁ। ওয়েল সাং, ডিয়ার।”

প্রসূনের তাতে মন উঠল না। বলল “না বস। ওটুকুতে হবে না। লেটস ড্রিঙ্ক টু দ্য হেলথ অফ শাহনওয়াজ।” সকলে নিজের নিজের গ্লাস ঠেকিয়ে চিয়ার্স বলে চুমুক দিল। প্রসূন এক ঢোকে গ্লাসে যতটা শ্যাম্পেন ছিল শেষ করে দিল, তারপর আরেকটু ঢেলে বলল “অ্যাই এবার একটা টোস্ট দিদির জন্যে। মমতা দিদি। অ্যান্ড টু দ্য ডেথ অফ কমিউনিস্টস।”

বিপ্লব ইতস্তত করছিল, এমন সময় মালিনী বলল “নো। আয়্যাম নট রেইজিং এ টোস্ট টু দ্যাট উওম্যান। অ্যান্ড ডেফিনিটলি নট টু দ্য ডেথ অফ কমিউনিস্টস। আর ইউ ইনসেন?”

“কেন? ইনসেনের কী আছে? শালা সবকটাকে উলটো করে গাছে ঝুলিয়ে প্যাঁদানো উচিৎ,” প্রসূন চিৎকার করে বলল। “ওরা কম লোককে মেরেছে?”

“অ্যাবসোলিউটলি, বাডি। আই সাপোর্ট ইউ,” রোহিত বলল। “শালা ঐ জ্যোতি বসু আর বুদ্ধদেব ভটচায। সিঙ্গল হ্যান্ডেডলি শেষ করে দিল রাজ্যটাকে। বাংলা থেকে সি পি এমকে তাড়াও। এটাই দিদির এক নম্বর কাজ হওয়া উচিৎ।”

“শাট আপ, রোহিত। ইডিয়টের মত কথা বলিস না। ওয়েস্ট বেঙ্গলের অনেক কিছু খারাপ আছে আমি মানছি। বাট ডোন্ট গেট পার্সনাল। বুদ্ধবাবুর মত লোক হয় না,” মালিনীকে রুখে উঠতে দেখে বিপ্লব অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

“কেন, ভাই? তোর এত গায়ে লাগছে কেন?” অমরেশ তেড়ে আসে। “তুই কি সি পি এম?”

“আমি সি পি এম না হলেও, আমার বাবা, মা দুজনেই সি পি এম।”

বিপ্লব আর শাহনওয়াজ বাদে বাকিরা “দুয়ো দুয়ো” বলে হৈ হৈ করে ওঠে। প্রসূন সোল্লাসে বলে “ওরে, ছুপা রুস্তম রে। শালা এতদিন ঘাপটি মেরে ছিল! কি ঘোল খাইয়েছে মাইরি! একদম বুঝতে পারিনি। এ বাবা! অমরেশ, শালা তোর মামা না কে যেন টি এম সি করে না? আর তুই সি পি এমের মেয়েকে লাইন মারিস! ছ্যা ছ্যা ছ্যা!”

অমরেশের যে মালিনীকে পছন্দ সেটা সবাই জানত, সম্ভবত মালিনীও। কিন্তু কথাটা এভাবে বলায় অমরেশের মুখ লাল হয়ে ওঠে। গম্ভীর মুখে বলে “প্রসূন, তোর বেশি নেশা হয়ে গেছে। আর খাস না। আর মুখও খুলিস না।”

প্রসূন লাথি দেখায়। রোহিত, যার একটুও নেশা হয়নি, সে বলে ওঠে “অ্যাই প্রসূন, লেটস নট গেট পার্সনাল, ওকে? তবে মালিনী, তুইও কিন্তু অদ্ভুত। তোর বাবা মা সি পি এম করে ঠিক আছে। বাট ইউ আর বিহেভিং লাইক বুদ্ধ এট সেটরা আর ইয়োর ফ্যামিলি। গিম্মি আ ব্রেক, ইয়া। অল হি সেইড ওয়জ ‘লেটস রেইজ আ টোস্ট।’ এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে?”

“‘এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে’ মানে? হাউ ক্যান আই রেইজ আ টোস্ট টু দ্য ডেথ অফ মাই পেরেন্টস?” মালিনী উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। “আয়্যাম লীভিং।”

নওয়াজ আর তিতাস ওকে জড়িয়ে ধরে আটকায়। কিন্তু মালিনী কিছুতেই থাকবে না। রোহিত আর প্রসূন তখন সমানে বলে যাচ্ছে মালিনী ননসেন্সের মত আচরণ করছে। বিপ্লব বুঝতে পারে ওর যেটুকু নেশা হয়েছিল, সেটুকুও ছুটে যাচ্ছে। সব চেঁচামেচির উপরে গলা তুলে ও বলে “মালিনী, তুই চুপ করে বোস।” ওকে এভাবে কথা বলতে সহকর্মীরা কেউ কখনো শোনেনি। এক লহমায় সব গোলমাল থেমে যায়। তারপর বিপ্লব বলে “প্রসূন, তুই এক্ষুণি ক্ষমা চা। নইলে আমিও বেরিয়ে যাব।”

“হোয়াট! শালা তুইও সি পি এম নাকি?”

“আমি সি পি এম হই বা না হই। তোর কোন অধিকার নেই ঐভাবে কথা বলার।”

“অধিকার নেই! কিসের অধিকার? আমাকে অধিকার দেখাচ্ছিস? শালা সি পি এমের কী অধিকার ছিল আমাদের জমি গায়ের জোরে ছিনিয়ে নেয়ার?”

“একশো বার ছিল। হাজার বার ছিল। তোর চোদ্দ পুরুষ জমিতে অন্য লোককে খাটিয়ে, বসে বসে খেয়ে, গরীব মানুষের রক্ত চুষে অত সম্পত্তি বানিয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার বেশ করেছে ঐ জমি কেড়ে নিয়েছে।”

“অ্যাই বিপ্লব, এবার কিন্তু তুই বাড়াবাড়ি করছিস। একটা ইল্লিগাল ব্যাপারকে তুই সাপোর্ট করছিস,” রোহিত আঙুল তুলে বলে।

“শোন রোহিত, তোকে কোনদিন কিছু বলি না। আজকে বলছি শুনে রাখ। তোর মত পলিটিকালি অশিক্ষিত আমি দুটো দেখিনি। তুই কোন কেন্দ্রের ভোটার সেটা আগে মুখস্থ কর, তারপর রাজনীতি নিয়ে মুখ খুলবি আমার সামনে।”

“হা! আই ডিডন্ট নো ইউ আর আ টিপিকাল কমি। হোয়েন দে ডোন্ট হ্যাভ আনসারজ, দে জাস্ট শাউট পিপল ডাউন। সি পি এম বেআইনিভাবে জমি কেড়ে নিয়েছিল এটা সবাই জানে।”

“শাট আপ, ইউ ইডিয়ট।” নিজের গলার জোরে বিপ্লব নিজেই চমকে যায় প্রথমে। তারপর নিজেকে শান্ত করতে করতে বলে “তুই যে জমি কেড়ে নেওয়া নিয়ে দিন রাত বকবক করিস, সেটা ছিল অপারেশন বর্গা। আজ অব্দি এ দেশের অন্য কোন সরকারের সাহস হয়নি জোতদার, জমিদারদের কোমর ভেঙে দিয়ে এভাবে ভূমি সংস্কার করার। বেআইনি বলছিলি না? সংবিধানে ডাইরেক্টিভ প্রিন্সিপলস অফ স্টেট পলিসি বলে একটা জিনিস আছে। সেখানে সরকারকে ভূমি সংস্কার করতে বলা আছে। তাছাড়া পঞ্চান্ন সালের ল্যান্ড রিফর্মস অ্যাক্ট ছিল। সেই আইনটা প্রয়োগ করার সাধ্য ছিল না কারোর। জ্যোতি বসু আর বিনয় চৌধুরী করে দেখিয়ে দিয়েছে। উনআশি আর আশি সালে নিজেরা দুটো আইন বানিয়ে তোর চোদ্দ পুরুষের রক্ত চোষার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে গেছে।”

“ওঃ! চাষাদের উপর কী দরদ রে! ঐ জন্যে সিঙ্গুরে জমি কেড়ে নিয়েছে, নন্দীগ্রামে জমি কেড়ে নিয়েছে,” অমরেশ বলে।

“অন্যায় করেছে। প্রবল অন্যায় করেছে। সেই জন্যেই আজ হেরে গেছে।”

“নন্দীগ্রাম তাও ঠিক আছে। সিঙ্গুরে কিচ্ছু অন্যায় হয়নি। ওখানে বদমাইশি করে ঐ মহিলা কারখানাটা হতে দিল না। এদিকে বলবে সি পি এম বাংলায় শিল্প হতে দিল না,” মালিনী এতক্ষণ পরে গলা ফিরে পায়।

“ধুর! শালা ইম্পোটেন্ট গভমেন্ট। ক্ষমতা থাকলে পিটিয়ে তুলে দিত দিদিকে। দে ওনলি হ্যাভ এক্সকিউজেজ। ঠাঁই ঠাঁই ঠাঁই ফায়ারিং করে দিত একবার, সব শুয়োরের বাচ্চা ন্যাশনাল হাইওয়ে ছেড়ে পালিয়ে যেত। আমি সাপোর্ট করতাম সি পি এমকে। আমি,” রোহিত বলে।

“সেটাই প্রমাণ করে যে কাজটা অন্যায় হত। তোর মত মাইন্ডলেস ডেভিল যেটাকে সাপোর্ট করে সেটাই সবচেয়ে অন্যায় কাজ।”

“অ্যাই, এই সি পি এম দুটোকে ঘাড় ধরে বার করে দে তো,” প্রসূন আবার চেঁচিয়ে ওঠে। “শালা আস্তিন কা সাপ। বার করে দে দুটোকে।”

নওয়াজ এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি৷ এবার সে খিঁচিয়ে ওঠে “আরে ইয়ার, হোয়াটস রং উইথ ইউ? হোয়াই আর ইউ পিপল ফাইটিং ওভার অ্যান ইলেকশন রেজাল্ট ইন আ স্টেট ইউ হ্যাভ লেফট? কেয়া রখখা হ্যায় ইস মে? ফালতু ঝগড়কে শাম খরাব হো রহা। অবে প্রাসুন, কিঁউ ইয়ে বদতমিজি কর রাহা তু? ঔর রোহিত, তু কিস টাইপ কা হোস্ট হ্যায়? তেরে মেহমান কো ইয়ে নিকাল দে রহা ঔর তু চুপচাপ সুন রহা?”

“নো নো, আই ডোন্ট ওয়ন্ট এনিবডি টু গো। বাট সিরিয়াসলি, ম্যান। ইউ গাইজ আর আমেজিং। এভরিওয়ান নিউ হোয়াট দিস পার্টি ইজ ফর, রাইট? ইটস বিকজ আওয়ার দিদি হ্যাজ কিকড কমি অ্যাস। মালিনীর প্রবলেম থাকলে ও না এলেই পারত। আই ডিডন্ট নো শি হ্যাজ সি পি এম কানেকশনস। ডিড এনিবডি এলস নো?” রোহিত শ্রাগ করে বলে।

অমরেশ, তিতাস, নওয়াজ মাথা নাড়ে। প্রসূন বলে “না গুরু। একদম জানতাম না। কিন্তু শালা বিপ্লবটা কি জিনিস মাইরি! এতদিন সি পি এমকে কি গালাগাল দিত, আজকে বিরাট সি পি এম হয়ে গেল!”

বিপ্লবের মাথাটা ততক্ষণে ঠান্ডা হয়ে এসেছে।

“ভুল, প্রসূন। সবাই ভুল করেছে। মালিনী ভুল করেছে বাবা মায়ের পার্টির হেরে যাওয়া সেলিব্রেট করতে এসে। তুই ভেবেছিস সি পি এমকে গালাগাল করি মানে আমি কমিউনিস্টবিরোধী। আর সবচেয়ে বড় ভুল কে করেছে জানিস তো?”

নেশা চরমে ওঠা প্রসূন হেসে গড়িয়ে পড়তে পড়তে বলে “জানি, জানি। আই নো। ইটস শাহনওয়াজ খান। ব্যাটা বুঝতেই পারেনি হুইচ সাইড হি ইজ অন।”

“না। সবচেয়ে বড় ভুলটা করেছি আমি। কারণ আমি ভেবেছি নিজের রাজনীতিটা লুকিয়ে ফেলা যায়। লুকিয়ে ফেলা উচিৎ।”

“তার মানে? তুই সি পি এম করিস?” মালিনীর চোখ কপালে উঠে যায়। “আমার বাবা করে। যতদিন বাঁচবে ততদিনই করবে। আর আমি? যতদিন বাঁচব ততদিন বামপন্থী থাকব।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply