নাম তার ছিল: ৩১

পূর্বকথা: রিগিং-এর কথা শুনে ক্ষিপ্ত বিপ্লব একাই বাড়ি চলে এসেছিল। অসুস্থ বোধ করা রবীনকে পৌঁছে দিতে আসে ফাল্গুনী। তার সামনেই বিপ্লব বলে, সে ভাবত সে বাবাকে চেনে। এখন মনে হচ্ছে ততটা চেনে না।

সেদিন কলেজে যাওয়ার বিশেষ দরকার ছিল, কিন্তু নবারুণ গিয়ে উঠতে পারল না। এরকম হতভম্ব অবস্থায়, বিক্ষুব্ধ মন নিয়ে কলেজে পৌঁছলেও কোন কাজ করে উঠতে পারবে বলে মনে হল না। তাই না যাওয়াই স্থির করল।

শরীরটা কদিন ভাল ছিল না। ভোট দিতে সবুজগ্রামের বাড়িতে আসার দিন রাত থেকেই অল্প জ্বর, সর্দি কাশি। পরদিন রোদের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার পর জ্বরটা আরো বেড়ে গেল। ভোটের পরের দিনই কলকাতা ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। সে আর হয়ে উঠল না। ফল বেরোবার দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বেশ চাঙ্গা লাগল, তাই স্নানটা সেরে ভাত বসিয়ে দিয়েছিল নবারুণ। ভেবেছিল কলেজ করে একেবারে রাতে কলকাতার ফ্ল্যাটে ফিরবে। কিন্তু খেতে খেতে ভোটের ফলাফল দেখতে গিয়ে সব ভেস্তে গেল। বামফ্রন্টের সব দল মিলেও তৃণমূলের চেয়ে কম আসন পাবে! এমনটা নবারুণ স্বপ্নেও ভাবেনি। টিভি দেখতে দেখতে সে কেবলই ভাবছে গণনা এগোক, আবার সব যেমনকার তেমন হয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় কী? এক সময় টিভি বন্ধ করে বিছানা নিল। ততক্ষণে বেলা দুপুর, বামফ্রন্টের পরাজয় পরিষ্কার।

ঘুমোবার চেষ্টা বৃথা হল। হবেই তো। জীবনে কখনো দিবানিদ্রার অভ্যেস তো নেই। কী করা যায়? মাঝে একবার গিন্নী ফোন করেছিল। ফল দেখে ও-ও হতবাক। বলছিল “কলেজ যখন যাওনি, বেলাবেলি বেরিয়ে বাড়ি চলে এসো। কোথায় আবার মারামারি লেগে যাবে তার ঠিক আছে? এতদিন পরে জিতেছে, দিদির গুন্ডাবাহিনী কি ছেড়ে কথা বলবে?” কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে, কিন্তু অদ্ভুত আলস্য আসছিল। কিছুই ভাল লাগছে না, কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। সকালে স্নান, খাওয়া হয়ে গিয়েছিল তাই। নইলে সেটুকু করার উদ্যমও পেত না নবারুণ।

কোনদিন সক্রিয় পার্টিকর্মী নাহলেও সি পি এম তো নবারুণের বাইরে নেই, আছে ভেতরে। বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য কমিটির সদস্য হওয়া, ইউনিভার্সিটির সেনেটের মেম্বার হওয়া — এত সব দায়িত্ব তো সে নিতে চায়নি, পার্টিই দিয়েছে। সেই যে হীরেন্দ্রনাথ ঘোষের কাছে একবার নিয়ে গেল রবীন, তিনিই তো একের পর এক দায়িত্ব চাপালেন। কাজগুলো করতে অবশ্য ভালই লেগেছে। সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক হয়েছে অবশ্য কালাদীঘি কলেজের অধ্যক্ষতা।

পার্টি দায়িত্ব দেওয়ার সময়েই বলেছিল কলেজটায় লেখাপড়া প্রায় কিছুই হয় না। অধ্যাপকরা আসেন, যান, মাইনে পান কারণ ক্লাস নেওয়ার পরিবেশ নেই। ল্যাবগুলোর যা অবস্থা তাতে প্র‍্যাকটিকাল ক্লাস করানো অসম্ভব। একটা আস্ত ব্যুরেট খুঁজে পাওয়াই ভার। ছাত্রছাত্রীরাও যে লেখাপড়ায় দারুণ আগ্রহী তা নয়। ঐ এলাকায় যারা সত্যিই লেখাপড়া করতে চায়, তারা কষ্ট করে সবুজগ্রামের দিকের কোন কলেজে বা একেবারে কলকাতার কলেজে ভর্তি হয়। যাদের সে যোগ্যতা বা সাধ্য নেই, তারাই আসে কালাদীঘি কলেজে। কারণ সবাই জানে কলেজে হওয়ার মধ্যে হয় এই উৎসব, সেই টুর্নামেন্ট আর ভোট এসে পড়লে কলেজের মাঠে কংগ্রেসের জনসভা। কলেজটা চালান আসলে স্থানীয় বিধায়ক। তাঁর ইচ্ছা হাতেকলমে প্রয়োগ করার দায়িত্ব ছাত্র সংসদের উপর। সেটা বহু বছর ধরে ছাত্র পরিষদের দখলে। তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে যাবে কোন আহাম্মক? ইউনিয়ন রুমে ঢুকলে বোঝা যায় না জায়গাটা কলেজ না থানা। সেখানে সারাক্ষণ এলাকার ছোট, বড়, মেজ সমাজবিরোধীদের দেখতে পাওয়া যায়। বিদায়ী অধ্যক্ষ ছাত্র সংসদের বাধ্য ছেলে হয়ে চাকরিজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।

নবারুণের বেশ আত্মপ্রসাদ অনুভব হয় ভাবলে, যে আজ সেই কলেজের ছাত্রসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, অনেক নতুন কোর্স চালু হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলে তো অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। গতবছর তো ভূগোল অনার্সের একটি ছেলে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হল। এখন কালাদীঘি থেকে সবুজগ্রামে পড়তে আসা প্রায় বন্ধ। বরং সবুজগ্রাম, কুড়াইল থেকে কেউ কেউ এ তল্লাটে ভর্তি হতে না পারলে কালাদীঘি কলেজে ভর্তি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, কলেজটা কলেজ হয়ে উঠেছে। ক্লাসের সময়ে ক্লাস হয়, ছেলেমেয়েরা মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের সাথে যেমন ব্যবহার করা উচিৎ তেমনটাই করে। এসব করতে পারার জন্যে নবারুণকে প্রথম কয়েক বছর ছাত্রদের খিস্তি হজম করতে হয়েছে, ঘেরাও হয়ে থাকতে হয়েছে, বিধায়কের মুখ থেকে খুনের হুমকি শুনতে হয়েছে। একবার কলেজের মাঠে স্থানীয় ক্লাবের জলসা করতে অনুমতি না দেওয়ার অপরাধে গোটা কলেজে ভাংচুর সহ্য করতে হয়েছে। সেসব সত্ত্বেও যে কলেজটা আজকের জায়গায় পৌঁছেছে, সেটা সম্ভব হত না যদি পার্টি পাশে না থাকত। সেই পার্টির হার কী করে হজম করেন প্রফেসর এন বি, কালাদীঘির লোকে যাঁকে এক ডাকে চেনে?

শুয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, একবার বরং রবীনের কাছে যাওয়া যাক। নিজেরই যখন এত ছিন্নভিন্ন লাগছে, তখন রবীনের মনের অবস্থা নিশ্চয়ই আরো খারাপ। এই সময়েই তো বন্ধুর পিঠে হাত রাখা প্রয়োজন। রবীন, নবারুণের প্রাণের বন্ধু মুন্না যখন খুন হয়ে গেল, তখন দুজন দুজনের পাশে তো এভাবেই দাঁড়িয়েছিল। নইলে স্বাভাবিক হয়ে ওঠা বড় শক্ত হত। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মত রবীনের একমাত্র প্রেম, মুন্নার বোন মুনিয়া, যখন কলকাতা চলে গেল — তখনো তো ছায়ার মত নবারুণ লেগেছিল রবীনের সাথে। তেমন সঙ্কট নবারুণের জীবনে আসেনি। বাবার মৃত্যুর সময় মনে থাকার মত বয়সই হয়নি। প্রথম মানসিক সঙ্কট বলতে হঠাৎ মায়ের মৃত্যু। ততদিনে রবীনের সাথে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। তবু রবীন শুধু এসে দাঁড়ায়নি, মাকে কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিল। নবারুণ একটাও কথা না বললেও শ্মশানে সারাক্ষণ ঠিক পাশেই বসেছিল রবীন। আজ নবারুণের পালা।

মনে হতেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল সে। মনে পড়ল ভোট দিতে গিয়ে ফাল্গুনীর মুখে শুনেছিল, বিপ্লব নাকি এসেছে হায়দরাবাদ থেকে। ছোটবেলায় নবাকাকু বড় প্রিয় ছিল তার। নবাকাকুও খুব ভালবাসত ওকে। বই পড়ার নেশা দেখে ওর প্রতি জন্মদিনে একটা করে গল্পের বই দিত। মাঝের এতগুলো বছর রবীনের সাথে বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ায় বিপ্লবটার বড় হওয়াও দেখা হল না কাছ থেকে। ফাল্গুনীর মুখে শুনেই নবারুণ ঠিক করেছিল ওর সাথে গল্প করে আসবে। শরীরটা খারাপ থাকায় সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ভালই হবে। মনখারাপটা একটু কাটবে হয়ত।

বাইরের গেটটা খুলে রবীনের বাড়ির উঠোনে পা দিয়েই নবারুণ দেখতে পেল, সেদিকে চেয়েই বাইরের ঘরের বেতের চেয়ারে বসে আছে রবীন। হেঁকে বলল “আয় আয়। দাঁড়া তালাটা খুলি।” চাবি নিয়ে এসে তালাটা খুলতে হিমসিম খেয়ে গেল রবীন। নবারুণ বুঝল রবীনের হাতগুলো আজকাল এত কাঁপে, যে স্থির করে তালার গর্তে চাবি ঢোকানোও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। “দে, আমি খুলে নিচ্ছি,” বলে নিজেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে উল্টো দিক থেকে তালাটা খুলল নবারুণ।

“জোনাকি, নবা এসেছে,” ঘরে এসে চেয়ারে বসেই চেঁচিয়ে জানান দিল রবীন।

“ও নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছে? ডাকিস না, থাক।”

“না ডাকলে আবার পরে বলবে ‘নবাদা এল আর তুমি ডাকলে না?’”

“হুঁ। তুই বরং বিপ্লবকে ডাক দে। নাকি ও-ও ঘুমোচ্ছে?”

“বিপ্লব?”

“হ্যাঁ। ফাল্গুনী যে সেদিন বলল বিপ্লব নাকি এসেছে, ভোট দিতে গেছিল?”

“হ্যাঁ, এসেছিল। চলে গেছে।”

“এ রাম! মোটে এই কদিনের জন্যে এল?”

“বোধহয় আরো কদিন থাকার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পারল না থাকতে।”

“ও। অবশ্য উপায়ই বা কী? আজকাল চাকরিগুলো যা হয়েছে। আমার ছেলেও তো সক্কালবেলা বেরিয়ে যায় আর মাঝরাতে ফেরে। মাঝে মধ্যে রবিবারেও দৌড়ায়। ছুটিছাটার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। মানুষের সবটা একেবারে শুষে নেয় কোম্পানিগুলো।”

“দুনিয়াটা অনেক বদলে গেছে আর কি।”

“সেই,” দীর্ঘশ্বাস পড়ে নবারুণের। “এত বদলে গেছে যে ধরতেই পারছি না কোথা দিয়ে কী হয়ে যাচ্ছে। ভোটটা… কী যে হল!”

“কেন? কী হল?” রবীন মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করে। নবারুণের অবাক লাগে।

“কী হল মানে! এই ফল কী করে হল?”

“এ তো হওয়ারই ছিল।”

নবারুণ আরো অবাক হয়।

“হওয়ার ছিল! কেন বলছিস? সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল বলে?”

“ওটা ভুল ছিল না ঠিক ছিল জানি না। তবে আজ নয় কাল এই কাণ্ডটাই হত।”

“কেন বল তো?”

“হবে না? তুমি বলবে এক আর করবে এক। মানুষ কতদিন মেনে নেবে? তুমি মিটিঙে মিছিলে বলবে পুঁজিবাদ নিপাত যাক, তারপর টাটার জন্যে মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জমির ব্যবস্থা করবে। তুমি বলবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পার্টি লড়ছে, লড়বে। এদিকে লোকের চোখের সামনে তোমার পার্টি মেম্বার জমির দালালি, প্রোমোটারি, বালি সিমেন্টের ব্যবসা করে লাল হয়ে যাবে। এসব কতদিন চলতে পারে?”

“কিন্তু দুর্নীতি কি এদেশে নতুন কিছু? কংগ্রেস দুর্নীতি করে না? মমতাও কি ধোয়া তুলসীপাতা? অনেকে তো বলছে ওর সিঙ্গুর আন্দোলনের পেছনে অন্য গাড়ির কোম্পানির মদত আছে।”

“রতন টাটা বলেছে৷ সে থাকতেই পারে। মমতা একেবারে সততার পরাকাষ্ঠা এ আমায় কেউ এক গলা জলে দাঁড়িয়ে বললেও বিশ্বাস করব না। কিন্তু লোকে মমতাকেই বিশ্বাস করছে, আমাদের কেন বিশ্বাস করল না?”

“মানুষজন অনেক বদলে গেছে, রবীন। এখন সবাই শুধু নিজেরটুকু ভাবে।”

“তা তো বটেই। তবে আমরাও তো বদলে গেছি, নবা। বদলাইনি?”

“ও মা, নবারুণদা কখন এলেন? কী গো, তুমি আমাকে ডাকলে না?” বলতে বলতে আলুথালু জোনাকি পাশের ঘর থেকে এসে হাজির হয়।

“দেখলি তো, নবা? মানুষকে তুই বেশি চিনিস না আমি বেশি চিনি?” রবীন হাসতে হাসতে বলে।

“যে কাছাকাছি থাকে সে-ই বেশি চেনে,” নবারুণ রণে ভঙ্গ দেয়। “তা জোনাকি, তোমার ছেলে হুড়মুড়িয়ে ফিরে গেল?”

“আর বলবেন না। এই বাপ ছেলেকে আমি সারা জীবনে বুঝে উঠতে পারলাম না। দুম করে এল, দুম করে চলে গেল। এসে থেকে তো দেখলাম দুজনে গলাগলি। ভোটের দিন দুজনে মিলে হাঁটতে বেরোল। ও মা! খানিকক্ষণ পরে দেখি ছেলে একা ফিরে এল। জিজ্ঞেস করলাম বাবা কোথায়? সে কোন উত্তর না দিয়ে দুদ্দাড় করে উপরে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ পরে ফাল্গুনী এনাকে নিয়ে এল, এসে বলল এনার নাকি শরীরটা খারাপ হয়ে পড়েছিল। আমি বিপ্লবকে ধমকালাম একলা ফেলে চলে এসেছিল বলে, তাতে আবার ইনি আমার উপর মেজাজ করলেন। কী যে এদের মতি গতি বুঝি না।”

অভিযোগের পালা শেষ করে জোনাকি বলল “বসুন, একটু চা করে আনি।”

নবারুণ জোনাকির মুখ থেকে যা শুনল তার মাথা মুণ্ডু বুঝল না। তাই রবীনকে জিজ্ঞেস করতেই হল কী ব্যাপার।

“বিপ্লবকে নিয়ে সেদিন বাবলুর দোকানে ঢুকেছি, ঐ সুভাষ কলোনির একজন বসেছিল। লোকটাকে চিনি… এ পাড়ায় অনেক বাড়িতে বাগান টাগান করে দেয়, জন খাটে… গরীব মানুষ। আমি বাবলুকে জিজ্ঞেস করছিলাম ভোট কেমন হল। তা সেই লোকটা বলল ‘আমাদের এদিকে আর কবে শান্তিতে ভোট হয়?’ ঠিকই বলেছে কথাটা। আমি আর কথা বাড়াতাম না, ফলে সেও হয়ত চুপ করে যেত। বাবলুটা হঠাৎ মাথা গরম করে ফেলল। তাতে ঐ লোকটা গেল ক্ষেপে। সকলে মিলে না আটকালে মারামারি লেগে যেত। ব্যাস! আমার ছেলে ভীষণ রেগে গেল।”

“স্বাভাবিক। বাবাকে আজেবাজে কথা বললে ছেলে তো রেগে যাবেই।”

“না, তুই ধরতে পারিসনি,” নবারুণ দেখল রবীনের মুখে অদ্ভুত হাসি। সে হাসি বর্ণনা করা যায় না। “ও সেই জন্যে রাগেনি। ও রেগেছে আমার উপর। আমরা রিগিং করছিলাম বলে।”

“সে কি! তুই আবার কবে ওসব করলি? ওগুলো তো… ইয়ের লোক, নাকি? এ তো বহুদিন হল চলছে। এর মধ্যে তোর দোষ কোথায়?”

“হ্যাঁ, ওরা বলরামেরই লোক ছিল। কিন্তু ওসব বললে হবে না, নবারুণবাবু,” যেভাবে হঠাৎ রবীনের মুখটা আলো হয়ে উঠেছিল, সেভাবেই আচমকা অন্ধকারে ডুবে গেল। “আমার ছেলে ওভাবে ভাবে না।”

“মানে? ও কি ভেবেছে তুই জড়িত? তুই বললি না কিছু?”

“ভেবেছিলাম বলব, জানিস? তারপর ভাবলাম, কেন বলব? আমি অন্যায়টা করিনি বটে, কিন্তু আমি তো আটকানোর চেষ্টাও করিনি। সেটাও তো কম অন্যায় নয়।”

“কি মুশকিল! তুই তো একজন পার্টিকর্মী মাত্র। কজনকে আটকাবি?”

“ছেলেরা সবসময়েই তার বাবাকে ভাবে সর্বশক্তিমান। এ কি বদলানো যায়?”

“বুঝলাম। কিন্তু ওর মনে তো একটা ভুল ধারণা তৈরি হল। সেটা কি ভাল? ও ভাবল ‘বাবাকে কী ভেবেছিলাম আর বাবা কিরকম।’”

“সে ব্যথা ও নতুন করে পায়নি। ওর সেই দু হাজার সাল থেকেই ধারণা বাবাকে ও যেমনটা ভেবেছিল ছোটবেলায়, বাবা আসলে তেমন নয়।”

“দু হাজার সাল থেকে?”

“হ্যাঁ। সেই থেকেই তো আমার সাথে আর দরকার ছাড়া কথা বলে না। তুই যে বিপ্লবকে চিনতিস সে বদলে গেছে তখনই।”

“কেন?”

“সে অনেক কথা। বাদ দে।”

নবারুণের কেমন ধাক্কা লাগে। কী এমন রহস্য আছে যা রবীন তাকে জানতে দিতে চায় না? মাঝের বছরগুলো যে দূরত্ব তৈরি করেছে তা বুঝি আর এ জীবনে ঘুচবে না। রবীন এত কাছে, তবু যেন সঙ্কটে তার পিঠে হাত রাখার অধিকারটা আর নেই বলে মনে হয়। এরপর কী বলা উচিৎ বুঝতে না পেরে নীরব হয়ে যায় নবারুণ। জোনাকি চা নিয়ে আসে। সঙ্গে এক বাটি পায়েস।

“আবার পায়েস কেন গো?”

“বলুন তো কেন?” জোনাকি রহস্য ছড়িয়ে হাসে।

“বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান ছিল বুঝি?”

“আজ কত তারিখ?”

“আজকে? ষোল,” নবারুণ হাতের ঘড়িটায় তারিখ দেখে নিয়ে বলে।

“আজ কী? ভাল করে মনে করে দেখুন তো।”

নবারুণ চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবে, কী হতে পারে আজ? রবীনের জন্মদিন? কিন্তু সেটা তো কোনদিন পালন হয়েছে বলে মনে পড়ে না? রবীনের মা বেঁচে থাকতেও হয়নি বোধহয়। সে যুগে মধ্যবিত্ত বাড়িতে ওসবের চলই ছিল না। তাছাড়া কে-ই বা জন্মদিন মনে রাখত? নবারুণের নিজের জন্মদিনই তো ভাল করে জানা নেই। স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন এক পাড়াতুতো কাকা। তিনি আন্দাজে কি একটা হিসাব করে ফর্মে যে তারিখ বসিয়ে দিয়েছিলেন সেটাই সব মার্কশিট, সার্টিফিকেটে রয়ে গেছে। রবীনেরও তেমন কিছুই হবে। তাহলে?

“আজ কি তোমার জন্মদিন?”

“তোরও বয়স হইয়া যাইতাছে, নবা,” রবীন হাসতে হাসতে বলে। “তোর কিন্তু বরাবর মেমরি খুব শার্প আছিল।”

“আপনি বিপ্লবের ছোটবেলায় এই দিনে ওকে প্রতিবার একটা করে বই দিতেন।”

জোনাকি বলতেই নবারুণের সহসা মনে পড়ে যায়। তাই তো! আজ মে মাসের ১৬ তারিখ।

“এঃ হে! সত্যিই তো। আজ তো বিপ্লবের জন্মদিন।”

“যাক, মনে পড়েছে আপনার।”

“ইশ! কী করে যে ভুলে গেলাম! সেই সেবা সদনের ওটির বাইরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, আর রবীন থেকে থেকে বাইরে চলে যাচ্ছে সিগারেট খেতে। শেষে শুভময়দা ওকে বললেন ‘তুমি যে রেটে সিগারেট খাচ্ছ, এরপর তো কারখানায় যেতে হবে সিগারেট আনতে। একটু সুস্থির হয়ে দাঁড়াও তো এখানে।’

“হুম। তাই করে তো যখন হল তখন সঙ্গে সঙ্গে খবরটা পেলামই না।”

“পাবি কী করে? কোন চুলোয় গিয়ে যে ফুঁকছিলিস? আমি তো তোকে খুঁজে আনতে গিয়ে হয়রান।”

“ছেলেটা গত কয়েকবার জন্মদিনে তো বাড়ি ছিল না, এ বারে ভাবলাম এসেছে, নিজের হাতে ভালমন্দ রেঁধে খাওয়াব। তা বাবা ছেলের লড়াইয়ে আমার সে সাধ মিটল না।”

জোনাকি বিরক্তি লুকোবার চেষ্টা করে না। নবারুণ আবার অস্বস্তিতে পড়ে।

“আমার মনে হয় তুই একবার ফোন করে ওর সাথে কথা বল, রবীন।”

“তাই করতে হবে বোধহয়।”

চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। রবীন প্রায় লাফ দিয়ে উঠে পড়ে।

“চল, নবা। পার্টি অফিসে একবার ঢুঁ মেরে আসি।”

“এখন?”

“এখনই তো যেতে হবে, আজই তো যেতে হবে। হেরে গিয়ে কাঁধ সব ঝুলে পড়েছে কমরেডদের। তাদের চাঙ্গা করতে হবে না? তুই বোস, আমি পাজামাটা পরে আসি।”

রবীন বাথরুমের দিকে যায়, জোনাকি চেঁচিয়ে বলে “তোমার আজ হল কী? ছেলেকে ফোন করবে বলছ, এক যুগ পরে সন্ধেবেলা পার্টি অফিস যাচ্ছ?”

রবীন আর নবারুণ পার্টি অফিসের সামনে এসে দ্যাখে তখনো দরজাই খোলা হয়নি। রবীন বলে “চল বাবলুর দোকানে বসি গিয়ে। কেউ একটা ঠিক এসে যাবে।”

“এখন বাবলুর দোকানে যাবি? ওর দোকান তো সুভাষ কলোনির লোকে ভর্তি থাকে সব সময়। আবার কে কী বলবে…”

“বলুক গে। ওরা এখন জিতেছে, কথা তো শোনাবেই। তা বলে কি আমরা গর্তে সেঁধিয়ে যাব। গর্তে সেঁধোবে তারা, যাদের কাছে ভোটে জেতা হারা জীবন মরণ সমস্যা। কত গালাগাল, খিস্তি হজম করে আজকের জায়গায় এসেছি রে, নবা। ওতে ভয় পাই নাকি?”

নবারুণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও পা বাড়ায়। রবীন হাঁটতে শুরু করে স্তোত্র পাঠের সুরে নীচু গলায় বলে “আমরা রাস্তা থেকে লড়াই করতে করতে মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত গেছিলাম। এবার মারতে মারতে আবার রাস্তায় এনে দাঁড় করাতে চায় ওরা। এই সময়েই তো মানুষকে আঁকড়ে পড়ে থাকতে হবে। আগেও যখন আমরা মার খেয়েছি, মানুষ বাঁচিয়েছে। এবারও মানুষই বাঁচাবে। কিন্তু মানুষকে বোঝাতে হবে, যে আমরা এখনো তোমাদের লোক। যা যা দোষ করেছি, অন্যায় করেছি সেসবের জন্যে মানুষের কাছে মাথা নীচু করে ক্ষমা চাইতে হবে। এটাই একমাত্র বাঁচার রাস্তা।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply