নাম তার ছিল: ২৮

পূর্বকথা: ভোটের প্রচারে বেরিয়ে মানুষের শীতলতা দেখে বিপ্লবের ধারণা হয়, খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে। যেদিন প্রচার শেষ হল, সেদিন সন্ধেবেলা হঠাৎ বিনা নোটিশে বিপ্লব এসে পড়ল। রবীনের আশঙ্কা হল, চাকরিটা আছে তো?

হঠাৎ এসে বাবাকে চমকে দেবে ভেবেছিল বিপ্লব। কিন্তু বাবা যে দুশ্চিন্তায় পড়বে তা কল্পনা করেনি। মা খুশি হয়েছে, বাবাও। কিন্তু বাবার যেন আনন্দের চেয়ে উদ্বেগ বেশি।

বিপ্লব ঠিক করেই এসেছিল বাবার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেবে। কিন্তু এসে বুঝল, ব্যাপারটা অত সহজ নয়। প্রথমে মনে হল এভাবে হঠাৎ এসে পড়ায় বাবা বেশ অসন্তুষ্ট। বিপ্লব বাড়িতে ঢোকার একটু পরেই কারেন্ট এল। বাবা তখনো একটাও কথা বলেনি। বিপ্লবও বলেনি, মায়ের একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সুযোগই পায়নি। কারেন্ট আসতেই বাবা দৌড়ে গিয়ে পাম্পটা চালিয়ে দিল। বলল “পাঁচ মিনিট চলুক, তারপর গিয়ে গা ধুয়ে নে।” গা ধুয়ে এসে বিপ্লব যখন ডাইনিং টেবিলে চিনি দিয়ে গরম পরোটা খেতে বসল, তখন বাবা কথা বলতে শুরু করল।

“হ্যাঁ রে, হঠাৎ চলে এলি? চাকরিটা? আছে তো?”

“আরে! চাকরি যাবে কেন?”

“না, তুই খবর টবর না দিয়ে দুম করে চলে এলি…”

“এসেছে তাতে ক্ষতিটা কী হয়েছে?” মা ঝাঁঝিয়ে ওঠে। “ছেলেটা এতদিন পরে বাড়ি এল সেটা তোমার ভাল্লাগছে না?”

“না না, ভাল লাগবে না কেন? কিন্তু ও তো আসতে চায় না খুব একটা…”

“আসতে চায় না তোমাকে বলেছে কখনো? সবকিছুই নিজের মত করে ভেবে নাও তুমি।”

“আরে তুমি সবেতে এভাবে কথা বল কেন, জোনাকি? আজকাল চাকরি বাকরির কী অবস্থা তুমি জান? চিন্তা হবে না?”

“না না, চিন্তার কিছু নেই, বাবা। আমি ছুটি নিয়েই এসছি। এই চাকরিটায় ঢোকার পর থেকে তো কোন বড় ছুটি নিইনি। তাই বস এক কথায় রাজি হয়ে গেল।”

“অ,” বাবা যেন ঠিক নিশ্চিন্ত হল না। “তা পরশুই তো কথা হল। তখন তো বললি না কিছু?”

“তখনো ভাবিনি আসব। কাল সকালে মনে হল, বসকে অফিসে গিয়ে বললাম, রাজি হয়ে গেল। ব্যাস।”

“এরকম ঝট করে টিকিট কাটলি, অনেক টাকা লাগল না?”

“হ্যাঁ, ঐ সাড়ে তিন মত।”

“সাড়ে তিন! কদিন অপেক্ষা করে আসতে পারতিস তো। একটু কমে পেতিস।”

“তুমি থামো তো,” মা আবার ক্ষেপে যায়। “ওর টাকায় ও এসেছে। তুমি এত হিসাব করছ কেন?”

“তা তো ঠিকই,” বাবা মুখ নামিয়ে নিয়ে বলে। বিপ্লবের খুব ইচ্ছে করে বাবাকে সেই ছোটবেলার মত জড়িয়ে ধরতে। পারে না। বাবাই ছোটবেলার মত বিপ্লবের পিঠে একটা চাপড় মেরে উঠে দাঁড়ায়। বলে “দাও, বাজারের ব্যাগটা দাও।”

“এই আটটার সময় বাজার যাবে কেন?”

“ছেলেটা এতদিন পরে এল, একটু মাংস নিয়ে আসি।”

“বাবা, তুমি সারাদিন প্রচার সেরে ফিরলে, এখন আর বেরিয়ো না।”

“আরে আমার শরীর একদম ঠিক আছে। সেদিন রোদে, গরমে মাথাটা ঘুরে গেছিল আর কি। তারপর গত এক মাস দিব্যি চুটিয়ে প্রচার করলাম তো। কোন অসুবিধে হয়নি।”

“তাও। থাক না। কাল সকালে মাংস আনবে নাহয়,” মা বলে। “এখন ডিমের ডালনা করে দিই। ও তো ভালবাসে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই করো মা। কতদিন খাইনি ওটা। এগ বন্ডা খেতে খেতে ডিমের ডালনার স্বাদই ভুলে যাচ্ছি। আর ওখানে মাংস, বিরিয়ানি তো আকছার খাই।”

“আচ্ছা থাক তাহলে। কাল হবে মাংস। তুই মার সাথে গল্প কর, আমি একটু ঘুরে আসি।”

“আবার কোথায় যাবে? বাড়িতে থাকো না একটু। ছেলেটা এল…”

“চলে আসব তাড়াতাড়ি। এসে একসাথে খাব।”

“কোথায় যাচ্ছ সেটা বলবে তো?”

“একবার মিনতি বৌদিকে দেখে আসি। সকালে স্টেশনের কাছে পটলার সাথে দেখা হল। বলল কদিন ধরে নাকি বৌদির শরীরটা ভাল নেই। শ্বাসকষ্ট।”

“ও। তাহলে তো আমারও একবার যাওয়া দরকার।”

“তুমি যেয়ো পরে, আমি তো সময় পাব না। টুক করে ঘুরে আসি।”

কিছুক্ষণ বিপ্লবের হায়দরাবাদ জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ নিয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পর রান্নার সময় হল। “তুই যা একটু গড়িয়ে নে। আমার হয়ে গেলে তুলে দেব,” বলে মা রান্নাঘরে চলে গেল।

“না, এখন আর শোব না। তারপর রাতে ঘুম আসবে না। আমি একটু ওপরে যাচ্ছি।”

বিপ্লবের নিজের ঘরটার সাথে অনেকদিন পরে সাক্ষাৎ হবে। এই ঘরে একদিন বাবা ওর অবর্তমানে ঢুকে পড়ে পর্ন ম্যাগাজিনগুলো দেখতে পেয়েছিল। খাটের উপর ছড়িয়ে থাকা পত্রিকাগুলো জড়ো করে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে গিয়েছিল, বিপ্লবকে কিছু বলেনি। কিন্তু বুঝতে পেরে লজ্জা পাওয়ার বদলে ও বাবার উপরেই রেগে গিয়েছিল। সেটা চাকরি জীবনের গোড়ার দিকের কথা। তারপর থেকে বাবা আর কখনো কোন প্রয়োজনেই ও ঘরে যায়নি, মা তো মোটা শরীর নিয়ে পারতপক্ষে সিঁড়ি ভাঙে না। এত দিনে নিশ্চয়ই ঝুল কালি ভর্তি হয়ে গেছে ঘরটা।

ও ঘরে অনেক বই। ছোট থেকেই বাবা-মার দেওয়া উপহার মানেই ছিল বই। মামা, মাসি, পিসি, জ্যাঠা — যে যখন কিছু দিতে চেয়েছে, বিপ্লব বইই নিয়েছে। স্কুল, কলেজে আবৃত্তি, এটা সেটা করেও অনেক বই পুরস্কার পেয়েছিল। সেই প্রাণাধিক প্রিয় বইগুলোর জন্যে দেয়াল আলমারি বানিয়ে দিয়েছিল বাবা। কেরিয়ারিস্ট বিপ্লবের পড়ার অভ্যেস চলে গিয়ে সেসব বইতে ধুলো জমেছে এখানে থাকতেই। বইগুলোর মান ভাঙাতে হবে, আলমারিটাকে ঝাড়পোঁছ করতে হবে। একবার সব বার করে রোদে দেওয়াও দরকার। দেখতে হবে কোন বইতে পোকা ধরেছে কিনা। সেগুলোকে আলাদা করতে হবে। কয়েকটা বেছে সঙ্গে নিয়ে যাবে বিপ্লব। অনেক কাজ। ও ভেবেই এসেছে। তাই কাজ এগিয়ে রাখতে দোতলার ঘরে উঠে আসে।

দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে বেশ ভাল লাগল বিপ্লবের। নিজে উপরে না এলেও মা যে রত্নাপিসিকে দিয়ে নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করায় সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। কোথাও ঝুল নেই, পশ্চিমের জানলার শিকগুলো পর্যন্ত ঝকঝকে। বিপ্লব নিজে যখন থাকত, তখনো এত পরিষ্কার থাকত না ঘরটা। বিছানার চাদরটাও কাচা এবং টানটান করে পাতা, বালিশগুলো পরিপাটি করে চাদর দিয়ে ঢাকা। ঠিক যেমনটা বাবা-মার ঘরে থাকে। মা নতুন কাজের লোক রেখেছে নির্ঘাত। নয়ত রত্নাপিসির মাইনে দ্বিগুণ করে দিয়েছে। সে নিজে থেকে এসব কাজ করার লোক তো নয়! যাকগে, বইগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।

আলমারিটা খুলে আরো অবাক হতে হল। বহুদিন না খোলা বইয়ের আলমারি থেকে যে গন্ধ পাওয়া যায় তা নেই। বিপ্লবের বই গুছিয়ে রাখার অভ্যেস ছিল না। প্রিয়, বারবার পড়া বইগুলো থাকত নীচের তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বাদ বাকি উপর দিকের তাকগুলোতে। বইয়ের ঠ্যালায় সারাক্ষণ হুলুস্থুল। আলমারি খুললেই দু চারটে বই ধপাধপ মাটিতে পড়ত, কারণ সেগুলো কোন মতে ঠেসে ঠুসে রাখা ছিল। আজ বিপ্লব আলমারি খুলে দেখল ঠাসাঠাসি হলেও বইগুলো সব পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখা। উপরের তাকে ওগুলো কী? মোটা মোটা কী বই ওগুলো? অন্য বইগুলোর চেয়ে তফাতে একটার উপর আরেকটা শুইয়ে রাখা? বিপ্লব পা উঁচু করে টানতে গেল, হুড়মুড়িয়ে মাথায় এসে পড়ল বই দুটো। বলা উচিৎ মাথায় ড্রপ খেয়ে মাটিতে পড়ল। ভেতর থেকে কিসব যেন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বই নয় তো! বিপ্লবের কবিতা লেখার ডায়রি। আর ছত্রখান হয়ে আছে নানা সময়ে খুচরো কাগজে লেখা কবিতাগুলো। এগুলো এখানে এল কোত্থেকে? বিপ্লব কবিতা টবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে সেই কবে। কলেজে থাকতেই। হায়দরাবাদ চলে যাওয়ার সময়ে ওগুলোকে বাজে কাগজ মনে করে পুরনো খবরের কাগজ বিক্রির ঝুড়িতে ফেলে এসেছিল। খুচরো কাগজগুলো সম্ভবত এ বই সে বইয়ের মধ্যে গোঁজা ছিল। সেগুলোর কোন ব্যবস্থা করার কথা মনেও আসেনি তখন। “মরে গেলেও ফিরে আসব না” ঠিক করেই তো গিয়েছিল আসলে। এসব উদ্ধার করে এভাবে পরম যত্নে গুছিয়ে রাখল কে? কেন?

“মা, আমার ঘরে কে ঢুকেছিল গো?” বিপ্লব সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“কেন রে? কিছু খুঁজে পাচ্ছিস না?” জোনাকি রান্নাঘর থেকে উত্তর দিল। “রত্না কালকে এলে জিজ্ঞেস করব, দাঁড়া। ওকে যত বলি জিজ্ঞেস না করে কিচ্ছু ফেলবে না, কিছুতেই শোনে না। মাটিতে কিছু পড়ে আছে দেখলেই না দেখে শুনে ঝাঁট দিয়ে ফেলে দেয়…”

“আরে বাবা, তা নয়। আমার বইয়ের তাকটা দেখছি গোছানো, কবিতার ডায়রিগুলো ফেলে দিয়ে গেছিলাম, সেগুলোও দেখছি এখানে?”

“ও, তাই বল। ওটা মনে হয় তোর বাবার কাজ।”

“বাবা!”

“হ্যাঁ তোর বাবা তো এখন তোর ঘরেই শোয়। সারাদিনই টঙে চড়ে বসে আছে। কেউ এলে ডাকতে ডাকতে আমার গলা ফেটে যায়। কী যে খুটুর খুটুর করে সারাক্ষণ! ঐসবই করে বোধহয়। সেই যে সকালবেলা চা খেয়ে কাগজটা নিয়ে তোর ঘরে ঢোকে, লোক না এলে তো আর নামার নামই করে না। বেলা একটার সময় স্নান করতে যায় পুকুরে, তখন নামে, আবার খাওয়াদাওয়া করে উঠে যায়। এই ভোটের কদিন রুটিন বদলেছে। নইলে তো বাড়ি থেকে বেরোয়ই না। সারাক্ষণ ভূতের মত বাড়িতে বসে থাকা।”

বিপ্লব আর কিছু না বলে ঘরে এসে খাটে বসে পড়ল। মা তখনো পাড়া জানিয়ে বাবার গুণকীর্তন করেই চলেছে।

রবীন ঘোষাল আর বাড়ি থেকে বেরোয় না খুব একটা। সারাক্ষণ বাড়ির এক কোণে একা একা সময় কাটায়। কিভাবে কাটায়? হয়ত কাগজ পড়ে, বই পড়ে। আর যে কাজটা অবশ্যই করে বলে দেখা যাচ্ছে, সেটা হল প্রবাসী ছেলের ঘরটাকে যত্ন করে সাজায়। ছেলের প্রিয় বইগুলোকে আলমারিতে সাজিয়ে রাখে, তার পরিত্যক্ত কবিতাগুলো, যেগুলো সে কিলো দরে বিক্রি হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে, সেগুলো রক্ষা করে। কেন করে? বিপ্লব ভাবতে চেষ্টা করে। রাজনীতিতে ব্রাত্য হয়ে যাওয়া তার বাবা, সবুজগ্রামের চেহারা বদলাতে বদলাতে দুনিয়া বদলানোর স্বপ্ন দেখা রাজনীতিবিদ বাবা এখন তাহলে অন্য জগতে চলে যাওয়া ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে? ছেলের আর পড়তে না চাওয়া এক আলমারি বই আর কৈশোর, যৌবনের অবান্তর আবেগের বহিঃপ্রকাশ অচল কবিতা নিয়ে সারাদিন কাটে সেই লোকটার, যে নিজের রাজনীতি থেকে এক চুল সরে না বলে রাগে, অভিমানে, কতকটা ঘেন্নায় সবুজগ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল বিপ্লব? বাবাকে চিনতে কতটা বাকি ছিল তাহলে? তার চেয়েও বড় কথা বাবা এরকম কেন করে? আর কিছু করার নেই বলে? পার্টি, বন্ধুবান্ধব, স্ত্রী সকলের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে এই যে একখানা ঘরে জীবন যাপন করছে তার বাবা, সে কি আর সকলের কাছে বাতিল হয়ে গেছে ভেবে? বিপ্লব তো সোচ্চারে বাতিল করে গিয়েছিল রবীন ঘোষালের রাজনীতিকে। সকলের আগে। তাহলে তার স্মৃতিতে কেন আশ্রয় খোঁজে লোকটা? আর কোন উপায় নেই বলে? নাকি আশা করে একদিন ঠিক ছেলে ফিরে আসবে?

কেন এমন আশা করো, বাবা? তুমিই না বলতে ইতিহাসের চাকা সব সময় সামনের দিকে ঘোরে? তোমার কাছেই তো শুনেছিলাম মার্কস বলেছিলেন, ইতিহাস নিজের পুনরাবৃত্তি করে ঠিকই। কিন্তু প্রথমে ট্র্যাজেডি হিসাবে, তারপর প্রহসন হিসাবে। তুমি কী মনে করো? আমি, তোমার ছেলে, একদিন ফিরে এসে বলব ‘না, বাবা। তুমি ভুল নও, আমিই ভুল। তোমার রাজনীতির দিন ফুরোয়নি’? বলে আমি তোমার মতই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে বেরিয়ে পড়ব? এ কি হয়? তোমার ট্র্যাজেডিতে আমি কেন অভিনয় করতে যাব? আমি কি সং? আধুনিক পুঁজিবাদের সমস্ত সুবিধা আমি ভোগ করছি এখান থেকে অনেক দূরের একটা শহরে বসে। সেসব ছেড়ে কেন আমি ফিরে আসব তোমার পশ্চিমবঙ্গে? তোমরাই বা মার্কস-লেনিনের কোন স্বপ্নের রাজ্য বানিয়ে রেখেছ এখানে, যে আশা করছ আমি ফিরে আসব? আমি কাগজ পড়ি না? টিভি দেখি না? আমি জানি না তোমরা কী করেছ নন্দীগ্রামে? কী চেষ্টা করছিলে সিঙ্গুরে?

বাবাকে এইসব প্রশ্নে জর্জরিত করে খুব ঝগড়া করবে বলে একলা ঘরে রিহার্সাল দিতে থাকল বিপ্লব। আর এসব শুনে বাবার মুখটা কেমন হবে মনে পড়ে কেঁদে ফেলল ঝরঝরিয়ে। কিছু পরে নীচ থেকে মা হাঁক দিল “নেমে আয়, বাবা। আমার রান্না হয়ে গেছে।”

বিপ্লব নেমে এসে বলল “বাবা ফেরেনি তো এখনো। একটু অপেক্ষা করি।”

“তোর গলাটা ভারী লাগছে কেন রে? ঘুমিয়ে পড়েছিলি?”

“হ্যাঁ, ঐ আর কি।”

“আচ্ছা আমি খাবারদাবার বাড়তে থাকি, এর মধ্যে এসে পড়বে তোর বাবা।”

সত্যিই এসে পড়ল। তালাটা খুলতে গিয়ে বাবার মুখ দেখে বিপ্লবের মনে হল যেন নিজের মুখটাই আয়নায় দেখছে। বাবাও নিশ্চয়ই কাঁদছিল। আগেকার বিপ্লব হলে বাবাকে জড়িয়ে ধরত, জিজ্ঞেস করত “বাবা, কী হয়েছে? তুমি কাঁদছিলে?” এখন আর সেসব করা যায় না। এ বয়সে ওটা ন্যাকা ন্যাকা লাগবে। তবু, বিপ্লবের মনে হল সেটাই করা উচিৎ ছিল।

খাবার টেবিলে এসে বসতেই মা কিন্তু সরাসরি জিজ্ঞেস করল “কি গো! তোমার মুখটা অমন দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? বৌদির অবস্থা কি খুব খারাপ?”

“নাঃ”।

শব্দটা প্রায় বেরোলই না বাবার গলা থেকে, মাথা নাড়া দেখে বুঝতে হল।

গলাটা একবার পরিষ্কার করে নিয়ে ভাত ভাঙতে ভাঙতে জিজ্ঞেস করল “তোর চাকরিটা ঠিক আছে তো রে? রাগ করিস না বারবার জিজ্ঞেস করছি বলে। আমি ছা পোষা লোক তো, আই টি ফাই টি তো একদম বুঝি না। বেসরকারী চাকরি মানেই ভাবি আজ আছে কাল নেই। তাই…”

“না, সেটা পুরো ভুল নয়,” বিপ্লব উত্তর দিল। “কিছুদিন আগে তো অনেকের চাকরি গেল ঠিকই। তবে আপাতত মনে হয় আর কিছু হবে না।”

“হ্যাঁ, দেখছিলাম কাগজে। চিন্তা হচ্ছিল…”

“আঃ। ছাড়ো তো,” মা অধৈর্য। “দেখতে পাচ্ছি তুমি কিছু একটা লুকোচ্ছ। বলো না গো কী হয়েছে?”

দীর্ঘ নীরবতার পর বিপ্লবের বাবা উত্তর দিল।

“লাল্টুর বউ আমায় বলল… হেসেই বলল। ‘কাকু, এবার কিন্তু তোমাদের ভোট দিতে পারব না। দিদিই আমাদের লোক, তোমরা না।’ আমি বললাম ‘সে কি রে! তোর বাবা জানে?’ বলে ‘বাবা শুনলে রাগ করবে। কিন্তু আমার যাকে ইচ্ছা আমি তো তাকেই ভোট দেব।’”

“ও মা! তা লাল্টু, পটল — ওরা কিছু বলল না?”

“লাল্টু ছিল। ও দেখলাম না শোনার ভান করল।”

“ছি ছি ছি! তিতলি এরকম বুঝিনি তো! ও তো ওর বাবাকে খুব ভালবাসে ভাবতাম! আর কি অকৃতজ্ঞ! ও জানে না, পার্টি না থাকলে ওর বরের চাকরি হত না, সংসারটা ভেসে যেত?” “ওগুলো কোন কথা নয়, জোনাকি। আমাদের দিন শেষ। আমরা মানুষের হাত ছেড়ে দিয়েছি, এবার মানুষ আমাদের হাত ছেড়ে দিল। আমার এবার গোড়া থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। আজ শিওর হয়ে গেলাম। বামফ্রন্ট সরকারের দিন শেষ।”

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply