নাম তার ছিল: ২৬

পূর্বকথা: পরিচারিকা পার্বতীদির খোঁজ করতে তার বাড়ি পৌঁছে বিপ্লব বড়পিসির বাড়ির গন্ধ পায়, মনে পড়ে সবুজগ্রামের বাড়িতে তার ছোটবেলায় কাজ করত লক্ষ্মীদি। তার কথা। অনেকদিন পর বাবাকে ফোন করতে ইচ্ছা করে।

তখন ভোটের মরসুম। মেয়াদ ফুরোবার মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে বিপ্লবের বাবার পার্টি আর অন্য বাম দলগুলো মনমোহন সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। মুলায়মের সমর্থনে সরকার বাঁচিয়ে শেষ পর্যন্ত যথাসময়েই লোকসভা নির্বাচনে গেছে সরকার।

“শুধু সরকার ফেলার চেষ্টা করে প্রকাশ কারাতের শান্তি হয়নি, আবার সোমনাথ চ্যাটার্জিকে নিজের মর্জি মত চালাতে গেছিল। লোকটা শোনেনি বলে পার্টি থেকে বার করে দিল! শালাদের একটাও ভোট দেয়া উচিৎ না।”

বিপ্লবের বাঙালি সহকর্মীরা তখন উঠতে বসতে এসব কথা বলছে। বছর দুয়েক আগে হলে সে-ও তেড়ে গাল দিত, এখন শুধু চুপচাপ শুনে যায়। কে ঠিক, কে ভুল তা নিয়ে কিছুতেই আর মনস্থির করতে পারছে না। বাবার সাথে কথা হলে অবশ্য এসব কথা তুলবে না ঠিক করে নিয়েছে।

সাধারণত বার তিনেক রিং হলেই মা ফোনটা ধরে। কিন্তু এবার রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল, ধরার নাম নেই। বিপ্লবের তর সইছিল না। তাই সঙ্গে সঙ্গেই আবার ফোন করল। এবার একবারেই মা ধরল।

“মা, বাবা বাড়ি আছে? একটু দাও তো।”

“বাড়িতে তো আছে, কিন্তু ঘুমোচ্ছে। সন্ধেবেলা কথা বলিস,” মা গলাটা বেশ নীচু করে বলল।

“ঘুমোচ্ছে!” বিপ্লব হাতের ঘড়িতে দেখল একটা বাজে। “ভোটের সময় বাবা এই সময় বাড়িতে ঘুমোচ্ছে! স্কুলেও যায়নি? শরীর খারাপ নাকি?”

“দাঁড়া। এখান থেকে কথা বললে ঘুম ভেঙে যাবে। তুই ফোন রাখ, আমি তোকে মোবাইল থেকে করছি।”

প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে ফোনটা কেটে দিল বিপ্লব। ভোটের মরসুমে বাবাকে কখনো ভরদুপুরে ঘুমোতে দ্যাখেনি। ভোটের প্রচার চলছে মানেই বাবাকে খানিকক্ষণের জন্যেও বাড়িতে পাওয়া যাবে না — এটাই নিয়ম। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে পড়বে, দাঁতটা মেজে দু তিন গ্লাস জল খেয়েই বেরিয়ে যাবে, স্কুল থাকলে একেবারে শেষ মুহূর্তে ফিরেই “জোনাকি, ভাত বাড়ো” বলে দড়িতে টাঙানো গামছাটা নিয়ে পুকুরের দিকে দৌড়বে, ফিরে কোন মতে ভাত মুখে দিয়েই স্কুল, আবার স্কুল থেকে ফিরেই এক কাপ চা আর মুড়ি দুধ বা চিড়ে দুধ খেয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যাবে, ফিরবে রাত বারোটা নাগাদ। এই হচ্ছে বিপ্লবের বাবার চিরকালের রুটিন। নিজে প্রার্থী হোক বা না হোক, ভোটটা পঞ্চায়েত, মিউনিসিপ্যালিটি, বিধানসভা, লোকসভা — যা-ই হোক, এর অন্যথা কখনো হয়নি। তাহলে এবার হঠাৎ কী হল?

মা মিনিট খানেকের মধ্যেই ফোন করল।

“আরে, এ বারে তো গরমটা ভীষণ পড়েছে। তার মধ্যেই প্রচারে টো টো করে ঘোরা। আজকে মিছিল ছিল প্রবীরদাকে নিয়ে। স্টেশনের ওখানে গিয়ে হঠাৎ সান স্ট্রোকের মত হয়ে গেছে।”

“তারপর? অজ্ঞান হয়ে গেছিল?”

“অজ্ঞানের মতই। তারপর যা-ই হোক, ফাল্গুনী, বল ওরা তো সব ছিল। ওরা ধরাধরি করে বিন্দুর দোকানে বসিয়েছে, মাথায় জল টল দিয়েছে। তারপর প্রবীরদা ওদের বলেছেন ‘আমার গাড়িটা করে রবীনকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আয় তোরা।’ তাই দিয়ে গেল। এই একটু শুয়েছে।”

“ডাক্তার দেখাতে হবে তো।”

“ওখানেই একজন বুদ্ধি করে অমলেন্দুকে ডেকে এনেছিল। ও তো স্টেশনের কাছেই নার্সিংহোম করেছে।”

“কী বলেছে অমলকাকু?”

“ঐ সান স্ট্রোকই বলেছে। প্রেশারটা একটু লো আছে। তবে বলেছে চিন্তার কিছু নেই। কদিন বাড়ি থেকে একদম না বেরোতে বলেছে। এখন তোর বাবা শুনলে হয়। একটা কথা তো শোনে না। এত করে বলি একটা ছাতা নাও, কি টুপি পরো। শোনে কোথায়?”

“সে তো চিরকালই। কিন্তু এরকম তো আগে হয়নি! বাবার আবার প্রেশার লো হল কবে? কোনদিন তো এসব দেখিনি! অসুস্থ হতে তো সেই একবারই দেখেছি। ছোটখাট শরীর খারাপ তো কোনদিন হয় না বাবার! তাহলে?”

“আরে এতদিন হয়নি। তা বলে কখনো হবে না? বয়সটা তো হচ্ছে। সেটা দ্যাখ। আমি দিন রাত বলি, এখন আর আগের মত উল্টো পাল্টা রুটিনে চললে হবে না। যখন ইচ্ছে চান করলাম, যখন ইচ্ছে খেলাম, দুপুর রোদে টো টো করে ঘুরলাম — এসবের বয়স গেছে। জোর করে অস্বীকার করতে চাইলে তো হবে না..”

“না না, তুমি বুঝতে পারছ না। হঠাৎ করে এরকম হবে কেন? অন্য একটা ডাক্তার ফাক্তার দেখাও, একবার ই সি জি করিয়ে নাও। লাইনের ওপারে কে একজন কার্ডিওলজিস্ট থাকে না? সেই বাবাদের পার্টি অফিসের কাছে?”

“ওরে বাবা, অমলেন্দুর কাছেই তো ই সি জি মেশিন আছে। তেমন কিছু মনে হলে ও-ই করে নিত। তুই এত চিন্তা করিস না। তোর বাবা ঠিক আছে।”

“আমি তাও বলছি তুমি আরেকবার বাবাকে নিয়ে যাও সন্ধেবেলা। দরকার হলে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দাও দোষটা, বলো ‘ছেলে অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে ই সি জি, ই সি জি করে।’”

অনেক চাপাচাপি করায় মা শেষ অব্দি রাজি হল, কিন্তু বিপ্লব বুঝতে পারল মা খুব একটা খুশি হল না। ফোনটা রাখার কয়েক মিনিট পরেই অবশ্য বিপ্লব নিজেই বুঝতে পারল, ও অকারণেই বেশি উতলা হয়ে পড়েছে। এ বছর হায়দরাবাদেও যা গরম পড়েছে, সবুজগ্রামে তো অসুস্থ হয়ে পড়া স্বাভাবিক। যা ঘাম হয় ওখানে। আর সত্যিই তো বাবার বয়স হচ্ছে। এ বছরের শেষেই তো বোধহয় রিটায়ারমেন্ট। সেই লোক যে আগের মত দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে ভোটের প্রচার করতে পারবে না তাতে আশ্চর্য কী?

কিন্তু বাবাকে আটকানোই বা যাবে কী করে? আটকানো কি উচিৎ হবে? ওটা বন্ধ হয়ে গেলে কী নিয়ে বাঁচবে লোকটা? এমনিতেই তো গত এক দশকে বাবার রাজনৈতিক কার্যকলাপ অনেক কমে এসেছে মনে হয়। এটুকুও করতে না দিলে তো জীবন্মৃত হয়ে থাকতে হবে মানুষটাকে। বিপ্লব ভাবল আরেকবার ফোন করে মাকে বলবে কদিন যেন বিশ্রাম নিতে বলে, কিন্তু সব ছেড়ে ঘরে বসে থাকতে যেন জোর না করে। ফোনটা আবার হাতে নিয়েও শেষ অব্দি করল না। থাক। বাবা ঘুমিয়ে নিক, না হয় একেবারে রাতে ফোন করা যাবে। ততক্ষণে ই সি জি করিয়ে ফিরে আসবে। “কিছু পাওয়া যায়নি”। এই কথাটাই অমলকাকু পরীক্ষা করে বলে দিলে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।

মৃদু উৎকণ্ঠা কিছুতেই গেল না। সেদিন আর অন্য ছুটির দিনের মত কোথাও বেরোল না বিপ্লব। বারবার ঘড়ি দেখেই কেটে গেল বিকেল, সন্ধে। টিভিটা চালু ছিল সারাক্ষণই, কিন্তু সেখানে কী যে চলছিল বিপ্লবের মনে নেই। সন্ধে নামার পর থেকে বিপ্লব ভাবছিল নিজেই ফোনটা করবে, নাকি মায়ের ফোনের অপেক্ষায় থাকবে? মাকে তো বলেও দেওয়া হয়নি ডাক্তার দেখিয়ে ফিরেই একবার ফোন করতে।

ভাবতে ভাবতে নটা নাগাদ ফোন এল।

“তুই শুধু শুধু এত টেনশন করলি। কিচ্ছু হয়নি বাবার। আমাদের দেখেই অমল বলল ‘কিচ্ছু হয়নি, বৌদি। এই গরমে অনেকেরই ওরকম হচ্ছে।’ তাও আমি বললাম ছেলে ফোন করে বলেছে ই সি জি করাতে, তুমি একবার করেই নাও। তাই করল। কিচ্ছু পাওয়া যায়নি। হার্ট একদম ঠিক চলছে।”

শুনে নিশ্চিন্ত হল বিপ্লব। তারপরই বলল “একবার বাবাকে দাও তো ফোনটা।” বিপ্লব শুনতে পেল মা চেঁচিয়ে বাবাকে ডাকল। বাবা জিজ্ঞেস করল “আমাকে? কেন?” মা গলাটা আরো উপরে তুলে বলল “কী করে জানব? এসে ধরো না।”

অবাক হওয়া স্বাভাবিক। প্রবাসী হয়ে যাওয়ার পর থেকে কখনো বাবাকে ডেকে ফোনে কথা বলেনি বিপ্লব। বাবার সংশয় টের পেয়ে তারও হঠাৎ মনে হল, তাই তো! বাবাকে বলবটা কী? সোজা জিজ্ঞেস করব লক্ষ্মীদির খবর? কেমন অদ্ভুত হবে না ব্যাপারটা? কিছু ঠিক করতে পারার আগেই বাবা এসে ফোনটা ধরে ফেলল।

“হ্যালো।”

যাক, বাবার গলাটা একেবারেই পাল্টায়নি।

“বাবা, শরীর ঠিক আছে… এখন?”

“শরীর তো ঠিকই ছিল৷ ডাক্তারও তো তাই বলল। তোর এত চিন্তা করার দরকার নেই। তুই নিজের দিকে নজর দে, চাকরিটা মন দিয়ে কর। আমরা নিজেদের ঠিক সামলে নেব।”

হয়ত মনের ভুল, বাবা খুব একটা কিছু ভেবে বলেনি। তবু কথাগুলো থাপ্পড়ের মত মনে হল বিপ্লবের। সহসা কথা খুঁজে না পেয়ে ও বলেই ফেলল “বাবা, লক্ষ্মীদি এখন কোথায় থাকে?”

“লক্ষ্মী? কোন লক্ষ্মী? আমাদের মহিলা সমিতির নেত্রী?”

“না না। ঐ যে আমাদের বাড়িতে কাজ করত। আমাকে মাঝে মাঝে নিয়ে যেত সঙ্গে করে…”

“ও আচ্ছা। ও এখানেই আছে। যে বাড়িতে থাকত সে বাড়িতেই। কলকাতায় কোন একটা জামাকাপড়ের কারখানায় কাজ করে। এই তো কাল ওদের পাড়ায় মিটিং ছিল, দেখা হল।”

“একা একাই থাকে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ। ও খুব সাহসী মেয়ে। প্রথম প্রথম এ সে বিরক্ত করত। এখন বুঝে গেছে সুবিধে হবে না। মনের সুখেই তো আছে মনে হল। ঘরটা পাকা করেছে, বলল বর্ষার আগে ছাদটাও ঢালাই করিয়ে নেবে। আমায় বলল ‘কাকু, আমার বাড়ি দেখে যাও।’ দেখাল, চা খাওয়াল। তোর কথাও জিজ্ঞেস করছিল। বলল ‘ভাইয়ের বিয়ে দেবে না?’ আমি বললাম ভাই বিয়ে করবে কিনা সে আমি জানি না বাপু। ভাই জানে আর ভাইয়ের মা জানে। কিন্তু তুই হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছিস?”

“না, এমনি। হঠাৎ মনে পড়ল…”

“আচ্ছা, ধর। মার সাথে কথা বল।… ও, ভাল কথা। সেদিন তোর মাকে কী একটা বলছিলিস… জোনাকি শুনলাম বলল ‘ওসব নিয়ে তোর ভাবার দরকার নেই… মানিয়ে নিতে হয়। কী ব্যাপার সেটা? অফিসে কিছু…?”

“সেদিন নয়। অনেকদিন আগে বলেছিলাম। আমাদের এখানে অনেকের চাকরি গেল তো…”

“অ। তা তোমার মা তো ঠিকই বলেছে। কার কোথায় চাকরি গেল তা নিয়ে ভেবে কী হবে? ভাবতে শুরু করলে তো সারাদিন ঐ নিয়েই ভাবতে হবে, কাজকম্ম আর কিছু হবে না। তোমরা ওপরে উঠবে, কিছু লোক নীচে পড়বে না? এই তো জগতের নিয়ম। অভ্যেস করে নাও। আমি তো ভেবেছিলাম তোমার অ্যাদ্দিনে অভ্যেস হয়েই গেছে। যাকগে। নাও তোমার মায়ের সাথে কথা বলো।”

আজ বিপ্লব বাবার সাথে কথা বলবে বলেই ফোন করেছিল, মার সাথে তো দু বেলাই কথা হয়। মা ফোনটা ধরে আরো কী সব যেন বলল, বিপ্লব না শুনেই “হ্যাঁ হুঁ” করে গেল। তখন সে ভাবছে, বাবার বকার ধরণটা কত বদলে গেছে। গলা চড়াল না একটুও, তেমন কড়া কথাও বলল না। তবু বোঝা গেল, বাবা বিপ্লবের অন্যের চাকরি যাওয়া নিয়ে উতলা হওয়াকে ন্যাকামির বেশি কিছু মনে করে না। বুঝিয়ে দিল তার জগৎ আর বাবার জগৎ একেবারে আলাদা। বিপ্লবের জগৎ নিয়ে তার বাবার বিশেষ আগ্রহ নেই। যে জীবন নিজে বেছে নিয়েছ, তা নিয়েই থাকো, সবুজগ্রামের জীবন আর তোমার নয়, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। বাবা যেন এই কথাটাই বলে দিল।

ফোনটা ছেড়ে দেওয়ার পর বিপ্লব ভেবে দেখল তার যতই খারাপ লাগুক, সবুজগ্রামের যে মানুষগুলোর কথা সে এত ভাবছে, তারা এখন বহু দূরের কোন গ্রহেরই মত। অনেক দূর থেকে সেসব গ্রহের আলো দেখে বেশ লাগে, ওখানে যেতে ইচ্ছেও করে। কিন্তু মাঝের দূরত্বটা কয়েক আলোকবর্ষের। তাছাড়া ঐসব মানুষগুলোকে, ঐ জায়গাটাকে, ঐ জীবনযাত্রাকে সত্যিই তো প্রবল বিতৃষ্ণায় সে নিজেই ছেড়ে এসেছিল। কেউ কেউ যেমন এখনো বিশ্বাস করে সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, তেমনি বিপ্লবও তো এতদিন ভেবে এসেছে তার জীবনের কেন্দ্রে সে নিজে, বাকি সবাই, সবকিছুই তাকে ঘিরে। এখন প্রান্তের প্রতি প্রেম উথলে উঠলে চলবে কেন? বাবার সাথে কার্যত সম্পর্ক তুলে দেওয়ার এত বছর পরে হঠাৎ শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে বাবাই বা কেন বিশ্বাস করবে ছেলে সত্যিই উদ্বিগ্ন?

কিন্তু টানটা তো মিথ্যে নয়, উদ্বেগটাও যে মিথ্যে নয়। বাবার জন্যে আজ এত উতলা হয়ে পড়ে বিপ্লব নিজেও অবাক। এতটা টান যে এখনো ছিল ভেতরে সে কথা সে নিজেও টের পায়নি এতদিন। হায়দরাবাদে চলে আসার পর থেকে মা বেশ কয়েকবার ফোনে বলেছে “বাবাকে দিই? কথা বল একবার?” বিপ্লব সজোরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই যে মা বলল বাবার বয়স হচ্ছে, সেটা হয়ত এই জন্যেই সে টের পায়নি। হয়ত বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পরে বাবার আরো কয়েকবার শরীর খারাপ হয়েছে। সে তো বাবার কথা জিজ্ঞেস করা দরকার বলেই মনে করেনি কখনো।

ভাবতে ভাবতে বড় অস্থির লাগে। খেয়াল হয় রান্নাবান্না কিছু করা হয়নি। আসলে শনিবার রাত্তিরে তো বাইরেই খায় বরাবর। কিন্তু আজ আর সে উৎসাহ নেই। খিদেটা কখন মরে গেছে। বিপ্লব কয়েকটা পাঁউরুটি সেঁকে নিয়ে ফ্রিজ থেকে টমেটো সস বের করে লাগিয়ে খাবে বলে। টিভিটা চালিয়ে দেয়। খবর দেখা বন্ধ করে দিয়েছে অনেকদিন। আজ মনে হয় ভোটের খবর দেখলে মন্দ হয় না। কোন পথে চলছে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের প্রচার? কোনদিন না দেখা স্টার আনন্দই দেখা যাক না হয়। এ প্রার্থী সে প্রার্থী, তর্কবিতর্ক দেখতে দেখতে বিপ্লবের মন চলে যায় ছোটবেলায়।

সালটা বোধহয় ১৯৯৬। সেবারই প্রথম বিপ্লবদের লোকসভা কেন্দ্র থেকে বামফ্রন্ট মনোনীত সি পি আই (এম) প্রার্থী প্রবীরজেঠু। বাবা একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময়ে বলল “আজকে সন্ধেবেলা তোকে নিয়ে যাব। ক্ষেত্রগ্রামে এক জায়গায় পাবলিক মিটিং আছে, প্রবীরদা বলবে ওখানে। তোর খুব ভাল লাগবে। দারুণ বক্তা। মার্কসবাদ একেবারে গুলে খেয়েছে তো।” বিপ্লবের তো দারুণ উত্তেজনা। তখন ও ক্লাস টেন। গণশক্তির পাতায় প্রবীর দাশগুপ্তের লেখা নিয়মিত পড়ে। রুশ বিপ্লব, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী আন্দোলন, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি — এসব নিয়ে ওঁর লেখাগুলো অসাধারণ লাগে বিপ্লবের। স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ঐ লেখাগুলোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে। সেই প্রবীর দাশগুপ্ত বলবেন আর ও সামনে বসে শুনবে। ভাবা যায়!

মিটিংটা ছিল লক্ষ্মীদিদের পাড়ার মাঠে। ছোট্ট মঞ্চ, সামনে মাটিতে ত্রিপল পেতে বসার ব্যবস্থা। সাড়ে ছটায় মিটিং শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু যাদের জন্যে মিটিং তারা লোকের বাড়িতে কাজ করে, ভ্যান রিকশা টেনে, কোন বাড়ির সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করে বাড়ি ফিরবে। তারপর চান করবে, খাবে দাবে, তবে তো মিটিং শুনতে আসবে। তাই শুরু হতে সাতটা বেজে গেল। ওটা বলকাকুর এলাকা। তাই হম্বি তম্বি করে ঝটপট সকলকে ডেকে আনার ব্যবস্থা করল। নইলে হয়ত আরো দেরী হত।

লক্ষ্মীদি বিপ্লবকে দেখতে পেয়েই পাশে এনে বসিয়েছিল। একেবারে সামনের সারিতে। প্রবীর দাশগুপ্ত যথাসময়েই এসে গেছেন এবং এসে থেকেই বারবার ঘড়ি দেখছেন। ভদ্রলোকের বেশ সমীহ জাগানো চেহারা। লম্বা, ফরসা, কামানো গাল, পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি। বিপ্লব হাঁ করে দেখছিল। ও বাবার কাছে প্রমোদ দাশগুপ্তের গল্প শুনেছে, বাবার রাজনৈতিক গুরুকে হীরেন্দ্রনাথ ঘোষকে দু একবার দেখেছে। এঁকে যেন তেমনই মনে হচ্ছে, যদিও এঁর বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে না। মঞ্চটা যেহেতু বেশ নীচু আর ছোট, তাই সকলের কথাবার্তাই শুনতে পাওয়া যাচ্ছিল। বিপ্লব শুনতে পেল প্রবীর দাশগুপ্ত বলছেন “অ্যাই বল, তোমাদের অনুষ্ঠানসূচী একটু চেঞ্জ করতে হবে ভাই। আমার কলকাতায় একটা জরুরী মিটিং আছে, গাড়িটাও সঙ্গে নেই। একটা অন্য গাড়ি আসার কথা, সেটাকে বসিয়ে রাখা যাবে না। তুমি রবীনকে সভাপতি ঘোষণা করো। তারপরই আমি বলব, বলে বেরিয়ে যাব। রবীন, তুমি লাস্ট বক্তা ভাই।”

বলকাকু মিটিং শুরুর ঘোষণা করতে গিয়েই মিনিট পাঁচেক কাটিয়ে দিল। বিপ্লবের ভাল লাগছিল না, ও লক্ষ্য করল ও পাড়ার লোকেরাও মশা নিয়েই বেশি ব্যস্ত। প্রবীরজেঠু মাইক ধরতে ও নড়ে চড়ে বসল। উনি প্রায় আধ ঘন্টা বললেন। বিপ্লব সবটাই মন দিয়ে শুনল, কিন্তু আর কেউ শুনল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। পেছন থেকে নীচু স্বরে কথার আওয়াজ আসছিল, আর এক বৃদ্ধা তো ঢুলতে ঢুলতে বিপ্লবের গায়ে পড়েই গেলেন একবার। অন্যরা খুক খুক করে হেসে তাঁকে সোজা করে বসিয়ে দিল। এসবের মাঝে বক্তা কিন্তু নির্বিকার চিত্তে বলে গেলেন। শেষে হাততালিও পেলেন। বক্তৃতা শেষ হতেই হনহনিয়ে মাঠের পাশের রাস্তায় দাঁড় করানো গাড়ির দিকে চলে গেলেন। বলকাকু আর অন্যান্য স্থানীয় পার্টিকর্মীরা প্রায় সবাই পিছু পিছু গেল। মঞ্চের উপর একা বিপ্লবের বাবা।

বাবা বলতে শুরু করল “আপনারা সকলেই আমাদের পার্টির আপনজন। আপনাদের তো নতুন করে কিছু বলার নেই। এবারের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, আমাদের কর্মসূচী ইত্যাদিও আমাদের প্রার্থী খুব সুন্দর করে বলে গেলেন। আমি আর পুনরাবৃত্তি করব না। আমি বরং একটা গল্প বলি?”

শ্রোতারা, যাদের অধিকাংশই মহিলা, সমস্বরে “হ্যাঁ হ্যাঁ” করে উঠল। বাবা শুরু করল।

“এটা এক মেয়ের গল্প। গরীব পরিবারের মেয়ে, লেখাপড়া শেখেনি প্রায়। ছোট বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছে। বর কারখানায় কাজ করে। ডিউটি করে এসে আর শরীরে কিছু থাকে না। কেবল নেশা করে আর ঘুমোয়। আবার সকাল হলে ডিউটি চলে যায়। আর কোন কোনদিন নেশা করে বউকে ধরে পেটায়। এই করেই মেয়েটার কষ্টের জীবন কাটছিল। তারপর হল কি, মেয়েটার একটা ফুটফুটে ছেলে হল। ছেলেকে নিয়েই মায়ের দিন কাটে। মা ভাবে ছেলে আমার বড় হবে, ভাল হবে। তখন আমার সব দুঃখ ঘুচে যাবে। তা ছেলে যখন একটু বড়, তখন তার বাপটা একদিন দুম করে মরে গেল। সারাজীবন এত নেশা করেছে, কী করে আর বেশিদিন বাঁচবে? তা পাড়ার লোকজন মিলে তার জায়গায় ছেলেটাকে কারখানায় ঢুকিয়ে দিল। নইলে দুটো পেট চলবে কী করে? মা তো সামান্য এটা সেটা করে।

যেই না কারখানায় ঢোকা, ছেলেও তার বাপের মত মদ গিলতে শুরু করল। সেই এক জিনিস। প্রায় গোটা দিনটা ডিউটি করে, আর যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, কেবল নেশা করে। মায়ের বুকটা একেবারে ভেঙে গেল। কত আশা ছিল ছেলেকে নিয়ে। হায় রে! ছেলেটাও এমন হল!

কিন্তু কিছুদিন পরেই মা দেখল ছেলের ধরন ধারণ কেমন অন্যরকম। আর অত নেশা করছে না, মায়ের সাথে কথা বলার ধরণটাও কেমন মিষ্টি হয়ে উঠেছে, আর কারা সব যেন ওর সাথে দেখা করতে আসছে। তাদের কথাবার্তা সব অন্য ধারা। অমন মানুষ মা আগে দেখেনি। প্রথম প্রথম মাকে ওরা কিছু বলত না। পরে মা জানল এরা সব পার্টি করে। অন্যরকম দুনিয়া গড়ার পার্টি। মায়ের ছেলেও ওদের সাথে পার্টি করে। এরা সব কারখানার মালিকের বিপক্ষে। ধর্মঘট করে, মিটিং করে, মিছিল করে। শুরুতে মায়ের ভারী ভয় করত। নিজের ছেলের জন্যে তো বটেই, অন্য ছেলেমেয়েগুলোর জন্যেও। ওদের যদি পুলিশে ধরে? অত্যাচার করে? তারপর সত্যি পুলিশে ধরল মায়ের ছেলেকে। ব্যাস। মায়ের ভয় গেল কেটে। মা নিজেও নেমে পড়ল পতাকা হাতে।

কোন পতাকা? লাল পতাকা। কাস্তে হাতুড়িওয়ালা। আমাদের পার্টির পতাকা…”

যে বৃদ্ধা বিপ্লবের গায়ে ঢুলে পড়ছিলেন, তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন “হ্যাঁ গো রবীন মাষ্টার, এ গপ্প কে লিকেচে গো? এ যেন মনে হচ্চে আমারই গপ্প। তোমাদের পাটির কেউ লিকেচে বুঝি?”

বিপ্লবের বাবা হেসে বলে “মাসিমা, এদেশের লোক লেখেনি। রাশিয়া বলে একটা দেশ আছে। সে দেশের একজন লিখেছেন। আমাদের পার্টির লোকই বটে। নাম ম্যাক্সিম গোর্কি।”

“সে কি গো! সে ছোকরা আমাদের কতা জানলে কেমনে?”

“গরীব মানুষের দুঃখ সব দেশেই একই রকম যে মাসিমা। আর সেই জন্যেই তো আমাদের পার্টি করা। এই পার্টি আপনাদের। তাই এ বারেও আপনাদের আশীর্বাদ চাইতে আমরা এসেছি। আপনারা আমাদের প্রার্থীকে জেতান, যাতে দিল্লী গিয়ে জোর গলায় আপনাদের কথা বলতে পারে। এটুকুই চাওয়া।”

আরেক বৃদ্ধা বললেন “তা এই কতাটাই সোজা করে বলো না বাপু। আমি তো সেই কতাই ভাবচি। আমার কত্তা যকন ছেল সে আলাদা কতা ছেল। সে বলত হাতে ছাপ দাও, আমিও দিতুম। তিনি যাওয়ার পর থেকে তো বাপু তোমাদেরই দিচ্চি। সুখে দুঃখে বিপদে আপদে এই তোমাদের কাচেই তো দৌড়ে যাই। আর কারেই বা চিনি? সেইটে না বলে এতক্ষণ কী যে সব বলচিল তোমাদের বড় নেতা। সে বাবা আমার মাতায় কিচু ঢোকেনি। হ্যাঁ গো, তোমরা কেউ কিচু বুজেচ?”

বৃদ্ধার প্রশ্নের উত্তরে সকলেই নেতিবাচক মাথা নাড়ে। বিপ্লবের চোখে পড়ে মঞ্চের উপরে বাবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা ডি ওয়াই এফ আই নেতা মদনকাকু হতাশ হয়ে মাথা নাড়ছে। বাবা সেসব খেয়াল না করে প্রশ্ন করে “তাহলে এ বারেও আপনাদের ভোট আমরা পাব তো নাকি?” সকলে হৈ হৈ করে সম্মতি দেয়। একটা লোক চেঁচিয়ে বলে “সবাই আমরা সারাদিন খেটে খুটে এসে ক্লান্ত বুঝলেন না? আর মিটিং মাথায় ঢোকে, মাস্টারমশাই?” সম্মতি জানিয়ে সভাপতি বিপ্লবের বাবা সভার সমাপ্তি ঘোষণা করল।

বাড়ি ফেরার সময়ে বিপ্লবকে যখন তার বাবা জিজ্ঞেস করে প্রবীর দাশগুপ্তের বক্তৃতা কেমন লাগল, তখন বিপ্লব বলেছিল “তোমারটাই বেশি ভাল। উনি অনেক জানেন বুঝলাম। কিন্তু সে তো গণশক্তির লেখাগুলো পড়েই বোঝা যায়। যে প্লাস মাইনাস শেখেনি তাকে উনি মিডল টার্ম ফ্যাক্টর শেখাচ্ছিলেন। কী করে চলবে?” বাবা কি এখনো মিটিঙে ওরকম গল্প বলে? সে গল্প কি এখনো মানুষকে ছুঁয়ে যায় সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রামে? সবই তো পাল্টে গেছে। মানুষও কি পাল্টে গেছে? ফেরত গেলে কাউকে কি চিনতে পারবে আর? ঝাপসা টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে বিপ্লব ভাবতে থাকে।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply