নাম তার ছিল: ২৫

পূর্বকথা: রবীনকে মার্কসবাদের পথ দেখিয়েছিলেন যে মাস্টারমশাই, তাঁরই একমাত্র ছেলের পুত্র বিপ্লবের কলেজে এ আই ডি এস ও করতে গিয়ে খুন হয়েছে এস এফ আই- এর হাতে। কাগজে নাম ধাম দেখেই রবীন কথাটা বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু বিপ্লবের সাথে সেসব কথা আলোচনা করার পরিস্থিতি ছিল না। রাজনৈতিক হত্যার পর্ব বামফ্রন্ট আমলেও শেষ হল না দেখে হতাশ লাগে রবীনের।

“সন্তানের পথ বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যাবে, সন্তান বাবা-মায়ের মত করে ভাববে না — এটাই তো স্বাভাবিক। চিরকাল এমনটাই তো হয়ে এসেছে। হওয়াও উচিৎ তাই। নইলে তো সভ্যতা এগোবে না। উকিল হাইনরিখ মার্কসের ছেলে কার্ল যদি বাবার মত ওকালতি করেই কাটিয়ে দিত জীবনটা, তাহলে কি মার্কসবাদ পেতাম আমরা? না আমাদের পার্টিটা তৈরি হত? বাবা ভাবলেন ছেলে আমার বড় উকিল হবে, নয় ভাল সরকারী চাকরি পাবে, তাই বন থেকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে সরিয়ে দিলেন। আর ছেলে কী করল সেখানে গিয়ে?”

বাড়িতে সকালের আড্ডায় বাবা বলত কথাগুলো। বিপ্লবের বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে। বাবাকে চা খাইয়ে দিতে দিতে বা পাশের ঘরে পড়তে বসে কান খাড়া করে বিপ্লব শুনত।

“বার্লিনে গিয়ে বাউয়ের টাউয়েরের সাথে মিশে কার্ল যা হলেন, দুনিয়ার সব দেশের বাবারা চিরকাল সেটাকে মনে করে বখে যাওয়া।” কথাটা বলে বিপ্লবের বাবা মিটিমিটি হাসত। উপস্থিত পার্টি কমরেড বা পার্টির ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া লোকেরা মাথা নাড়ত। ঠিক তখনই বাবা যোগ করত “ভাগ্যিস ভদ্দরলোক বইখ্যা গেছিলেন। নাইলে আমি তগো মাথাগুলা খাইতাম কী কইরা?”

হাসির রোল উঠত।

বাবার কথাগুলো মনে করে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে বিপ্লব। বাবা পড়ে রইল নিজের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের সবুজগ্রামে, আর সে চলে এল সুদূর হায়দরাবাদে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার পিছু পিছু — একে গত কয়েক মাস ধরে যে ঘোর অন্যায় বলে বোধ হচ্ছে, সেই অপরাধবোধ ঢাকতে বাবাকেই আঁকড়ে ধরতে হল। মনটা পরিষ্কার হল না তাতে, কিন্তু তখনকার মত অফিস যাওয়ার অনীহা কাটিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়া গেল।

কাজের মাসি আসছে না কদিন ধরে। এখানে অবশ্য কাজের লোককে মাসি পিসি বলে ডাকার রেওয়াজ নেই বোধহয়। বিপ্লবের বাড়িওয়ালা তো শুধু “বাই” বলে, আর বাড়িওয়ালি নাম ধরে “পার্বতী” বলে ডাকে, যদিও ভদ্রমহিলা ওদের চেয়ে বয়সে যে বড় সেটা বেশ বোঝা যায়। ওদের বিচ্ছু ছেলেটাও “বাই” বলে। অবশ্য শুধু ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিপ্লবের বেশ মনে আছে, সবুজগ্রামেও নবাকাকুদের যৌথ পরিবারের আবালবৃদ্ধবনিতা ষাটোর্ধ্ব কাজের পিসিকে “আরতিদি” বলত। বিপ্লব বাড়ির অভ্যেস ছাড়তে চায়নি, তাই “পার্বতীদি” বলে। ভদ্রমহিলার বয়স বছর পঁয়তাল্লিশ, ফলে মাসি টাসি বলা বাড়াবাড়ি হয়ে যেত।

এঁকে নিয়ে বিপ্লবের কোন অভিযোগ নেই। দেড় বছরে এর আগে কখনো কামাই করেননি, সকাল সকাল কাজে আসেন, দরকারের চেয়ে বেশি কথা বলেন না, কাজে যোগ দেওয়ার সময়ে বিপ্লবের হয়ে বাড়িওয়ালিই মাইনেপত্তর নিয়ে দরাদরি যা করার করে দিয়েছিল। সেই নিয়ে কোন ঝামেলা নেই, কাজকর্ম বেশ পরিচ্ছন্ন। আর কী চাই? কিন্তু এ বারে দিন সাতেক হয়ে গেল পাত্তা নেই। প্রথম দিকে বিপ্লব গা করেনি। এখন মেঝেতে বালি কিচকিচ করছে, আকাচা জামাকাপড় জমে গেছে অনেকগুলো। বন্ধুদের কথা মত এবার ওয়াশিং মেশিন একটা কিনেই ফেলবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। কিন্তু মাসের শেষ দিকে এসে সেটা করা সম্ভব না। বিপ্লব তাই ঠিক করল বাড়িওয়ালির কাছে একবার জানতে চাইবে পার্বতীদির খবর।

তার আর দরকার হল না। স্নান করতে ঢুকেই নীচে বাড়িওয়ালার ঘর থেকে তেলুগু ভাষায় ঝগড়ার শব্দ কানে এল। গলা দুটো চিনতে অসুবিধা হল না। স্নান সেরে জামাকাপড় পরে ব্রেকফাস্ট শেষ করতেই বেল বাজাল পার্বতীদি, বিপ্লব দরজা খুলে দিল।

যখন ঝাঁট দিচ্ছে, তখন কাগজ পড়তে পড়তে আলগোছে বিপ্লব জিজ্ঞেস করল সাত দিন কামাই করার কারণ। করতেই যা হল, বিপ্লব তা একেবারেই আশা করেনি। পার্বতীদি ফোঁস করে উঠে একতরফাই চেঁচাতে শুরু করল। বিপ্লব এ ধরণের ঝগড়া করতে একেবারেই পারে না। তার উপর এমন আচমকা হল ব্যাপারটা যে ও হতবুদ্ধি হয়ে গেল। অথচ তেমন কিছুই বলেনি, খুব নীচু গলাতেই কামাইয়ের কারণটা জিজ্ঞেস করেছিল। পার্বতীদির চিৎকৃত কৈফিয়ত থেকে জানা গেল, গত এক সপ্তাহ ওর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে যমে মানুষে টানাটানি চলেছে। প্রবল ডাইরিয়া হয়েছিল। প্রথম দিন বাড়িতে, তারপর থেকে হাসপাতালেই ছিল। আজ সকালেই ছেলে বাড়ি এসেছে, তাই ও কাজে এসেছে ছেলেকে প্রতিবেশীদের ভরসায় রেখে। সে এখনো বেশ দুর্বল। পার্বতীদি তিন-চার জায়গায় কাজ করে। সকাল থেকে কৈফিয়ত দিতে দিতে ওর গলা ব্যথা হয়ে গেছে, অথচ কেউই ওর দিকটা ভাবতে রাজি নয়। সকলে বিশ্বাসও করছে না যে ও এই কদিন সত্যিই বিপদের মধ্যে ছিল। নীচের তলার গিন্নী হুমকি দিয়েছেন, আবার এরকম না বলে কামাই করলে চাকরি যাবে। তাই বিপ্লব প্রশ্ন করা মাত্রই পার্বতীদি বুঝে গেছে, ওরও তাই বক্তব্য। অতএব উপসংহারে সে ঘোষণা করল “নই রাখনা হ্যায় তো বোল দো। দুসরা কাম দেখ লেগা ম্যায়। হাম কো ভি অ্যাইসা কাম নই মাংতা। ইস মহিনে কা তনখা লেকিন পুরা দেনা হোতা।” কয়েক সেকেন্ড দণ্ড শোনার জন্যে অপেক্ষা করে, বিপ্লব চুপ করে আছে দেখে পার্বতীদি কাজে লেগে পড়ল।

বিপ্লব বুঝল ওর মাথা গরম হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, তাই আর কথা বাড়াল না। কাজ সেরে চলে যাওয়ার সময়ে আবার প্রশ্ন এল “কাম কে লিয়ে আনা পড়তা?” অর্থাৎ “কাজটা আমার থাকল না গেল?” বিপ্লব মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল। বিকারহীনভাবে “অচ্ছা” বলে পার্বতীদি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। বিপ্লবের বেশ আনন্দ হল। অকারণেই।

পরদিন শনিবার, মানে ছুটি। এই দিনগুলোয় পার্বতীদি না আসা অব্দি ও নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। কিন্তু মা হঠাৎ সাত সকালে ফোন করে ঘুমটা দিল ভাঙিয়ে। পরে আর ঘুম এল না। শুধু শুধু শুয়ে থাকলেই সবুজগ্রামে ফিরে যাওয়ার চিন্তাটা আবার ফিরে আসে, সেই সঙ্গে আসে অবসাদ। ঐভাবে কাত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর হঠাৎ দেওয়ালঘড়িতে চোখ পড়ায় খেয়াল হল, পার্বতীদি তখনো আসেনি, অথচ নটা বেজে গেছে। সাড়ে আটটার বেশি দেরী কখনো করে না। তাহলে? ছেলেটার কিছু হল নাকি? বিপ্লব লাফ দিয়ে উঠে পড়ল।

বাড়িওয়ালিকে জিজ্ঞেস করতে যাওয়াই ভুল হয়েছিল। সে কিছু জানে না। সুযোগ পেয়ে শুধু পার্বতীদির বাপ বাপান্ত করে নিল আরেকবার। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে বিপ্লব ঠিক করল একবার পার্বতীদির বাড়িই চলে যাবে। কিন্তু কোথায় বাড়ি ওর? কখনো তো জিজ্ঞেস করা হয়নি! অগত্যা আরেকবার বাড়িওয়ালির কাছেই যেতে হল। সে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জানিয়ে দিল তার জানা নেই, তবে তার কর্তা নিশ্চয়ই জানে। কিন্তু সে তো ততক্ষণে দোকানে। বিপ্লব হতাশ হয়ে চলে আসছে, তখন সে বলল পাশের বাড়ির কাজের লোকটি জানতে পারে, কারণ সে সম্ভবত পার্বতীদির পাড়ারই বাসিন্দা। বিপ্লব এ বাড়িতে খায়, ঘুমোয় আর অফিস যায়। পাড়ার লোকজনকে মোটেই চেনে না। ফলে এই তথ্যে তার কোন সুবিধাই হল না। ব্যাজার মুখটা দেখে মুখরা বাড়িওয়ালিরও বোধহয় দয়া হল। তাই ওকে দাঁড়াতে বলে, নিজেই ফোন করে জেনে নিয়ে বলল “তুকারামগেট পুলিশ স্টেশন হ্যায় না? উধর রয়তা পার্বতী। উধর যাকে লক্ষ্মণ রাও পুছনা। পার্বতী কা পতি হ্যায়।” জায়গাটা খুব দূরে নয়। অচিন্ত্যদার গাড়িতে দু একবার পিকনিক করতে যাওয়ার পথে থানাটা চোখে পড়েছিল। বিপ্লব একটা অটো নিয়ে নিল।

থানার সামনে অটো থেকে নেমে, একে ওকে জিজ্ঞেস করে বাড়িটা খুঁজে পেতে বেশি দেরী হল না। কিন্তু বাড়ির গ্রিলের দরজায় তালা। কী করবে, কাকে কী জিজ্ঞেস করবে ভাবতে ভাবতে শেষে একটা বারো-চোদ্দ বছরের ছেলেকেই বিপ্লব জিজ্ঞেস করল, ও বাড়ির লোকজন কোথায়। ছেলেটি বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়েই বলল, হাসপাতালে গেছে ওদের ছেলেকে নিয়ে। এরপর কী জানতে চাওয়া উচিৎ তা বিপ্লবের জানা নেই। ছেলেটা নিজেই বন্ধুদের সাথে গুলি খেলা স্থগিত রেখে হাঁকাহাঁকি করে এক বয়স্ক ভদ্রমহিলাকে বের করে আনল পার্বতীদির ঠিক পাশের বাড়িটা থেকে। তিনি জানালেন ছেলেটার শেষ রাত থেকে আবার পায়খানা শুরু হওয়ায় ওরা হাসপাতালে দৌড়েছে। তবে মোড়ের স্টেশনারি দোকানটায় লক্ষ্মণ একটু আগে ফোন করেছিল, ওরা স্বামী স্ত্রী বাড়ি আসছে। বাবু যদি একটু বসে যান, তাহলে দেখা হয়ে যাবে।

মনস্থির করতে একটু সময় লাগল বিপ্লবের। সরু গলির মধ্যে এদের বাসস্থান মোটেই সুখকর জায়গা নয়। থানাটা বড় রাস্তার উপরে। সেখানটা সেকেন্দ্রাবাদের বাকি জায়গাগুলোর মতই। ঝকঝকে তকতকে। সেখান থেকে গলি দিয়ে হেঁটে এই পাড়াটায় আসতে মিনিট দুয়েক লাগে। কিন্তু দুটো জায়গার আকাশ পাতাল তফাত। রাস্তায় যেখানে সেখানে কুকুরের বিষ্ঠা, এধারে ওধারে অনেকদিন পরিষ্কার না হওয়া আবর্জনার স্তূপ, ছোট ছেলেরা নর্দমার ধারে দিব্যি বসে পড়েছে পায়খানা করতে। পার্বতীদির বাড়ির উল্টো দিকে একটা মাঝারি আকারের মাঠ। সেদিক থেকে হালকা হাওয়া আসছে বলে তবু এখানটায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে। ওখানে দাঁড়িয়ে বিপ্লব ভাবার চেষ্টা করছিল গুমোট দিনগুলোয় এই দম বন্ধ করা গলিতে দুর্গন্ধ ভুলে মানুষ থাকে কী করে। অপেক্ষা করে যাওয়ার প্রস্তাবে তাই প্রথমে ভাবল চলেই যাবে। তারপর মনে হল, চলে গেলে পার্বতীদি ভাববে ও কাজে যাওয়ার তাগাদা দিতে এসেছিল। আসলে ওর ছেলের জন্যে উদ্বেগই যে আসার কারণ তা বুঝতে পারবে না। তাই একটু বসে যাওয়াই ভাল। বয়স্ক ভদ্রমহিলা দৌড়ে গিয়ে চাবি নিয়ে এলেন নিজের ঘর থেকে, পার্বতীদির ঘরেরই তালা খুলে বসতে দিলেন।

ঘরগুলোর চেয়ে গলিটা উঁচু। বাবা ছ ফুট লম্বা হলেও বিপ্লব পাঁচ ফুট পাঁচ। তবু মাথাটা একটু নামিয়ে ঢুকতে হল বাড়িটায়। ঢুকেই যে জায়গাটা সেটাই রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর। রাস্তার দিকে মুখ করে থাকা উনুনের সামনে একটা ছোট্ট জানলা। আলো না জ্বালালে এই খটখটে রোদের সকালেও এ ঘরের অর্ধেকটা অন্ধকারেই থাকে। হায়দরাবাদ-সেকেন্দ্রাবাদে বৃষ্টি হয়নি মাস দুয়েক, এখানে গ্রীষ্মও শুকনো, রুক্ষ। তবু মেঝেটা যেন ভেজা। বোধহয় সারাক্ষণ মাছ মাংস সবজি ধোয়া, রান্নাবান্না, বাসন মাজা ইত্যাদি চলে। ওখানটা পেরিয়ে এসে ঘর। কোন জানলা নেই। একটা দরজা আছে ভেতর দিকে, আধ খোলা থাকায় দেখা গেল ওটা বাথরুমের দরজা। দুটো করে ইঁট পেতে উঁচু করা একখানা বড়সড় খাট। পালঙ্কই বলা উচিৎ। এই বাড়িতে, এই ঘরে এ খাট একেবারেই মানানসই নয়। কে জানে কোত্থেকে এসেছে। আলমারি, ছোট একটা টেবিলের উপরে ঢাউস টেলিরামা টিভি, দেয়ালের তাকে ভর্তি ঠাকুর দেবতারা মিলে ঘরটাকে ভীষণ ছোট করে এনেছে। এত কোণ, এত ছায়া এই ঘরে যে একশো পাওয়ারের বালবটার সাধ্য কি অন্ধকার দূর করে?

খাটে বসেই বিপ্লব ভেবেছিল ওরা যত তাড়াতাড়ি ফেরত আসে ততই ভাল। এ ঘরে কয়েক মিনিটেই প্রাণ হাঁপিয়ে উঠবে। কিন্তু কয়েক মিনিট পরে ওর ভাল লাগতে শুরু করল, মনে হল “ভাগ্যিস এসেছিলাম।” আসলে এই বাড়িতে ওর চেনা কিছু গন্ধ, কিছু দৃশ্য আছে। চেনা, কিন্তু বিস্মৃত। যেমন ঐ যে তাকে এক গাদা ঠাকুরের ফটো।

বিপ্লব যখন বছর পাঁচেকের, তখন ওদের বাড়িতে কাজ করত লক্ষ্মীদি। ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা, কাপড় কাচা কাজ ছিল ওর। কিন্তু সেসব হয়ে গেলেও বেশ খানিকক্ষণ বিপ্লবের সাথে খেলবে বলে রয়ে যেত। মা রান্নাবান্না বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে বিপ্লবকে চান করানো, ভাত খাওয়ানো এসব নিজে থেকেই করে দিত। মা অনেক সময় বলত “লক্ষ্মী, তুই আবার এখানে দেরী করছিস তো? অন্য বাড়িতে মুখ শুনতে হবে গিয়ে।”

লক্ষ্মীদি বলত “ছাড়ো তো, কাকিমা। কেউ মুখ করলে আমি পাত্তা দেই না। ঝটপট কাজ করে দিলে মুখ এমনিই বন্ধ হয়ে যায়।”

মা রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে বাবাকে বলত “মেয়েটার মনটা এত ভাল, কথাবার্তা এত সভ্য ভদ্র, একটু যদি লেখাপড়া শিখত, তাহলে লোকের বাড়ি কাজ করে খেতে হত না।”

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত “বাপটা অমানুষ যে। আমাদের স্কুলে তো পড়ছিল। ক্লাস এইটে পড়ার সময় বিয়ে দিয়ে দিল। কত করে বারণ করলাম। এমন ছেলের সাথে বিয়ে দিল, সে কোথায় ভেগে গেল। এখন বাবা মাঝরাত্তিরে মদ খেয়ে এসে ঠ্যাঙায়, মা-মরা মেয়ে চুপচাপ ঠ্যাঙানি খায়, তারপর বমি পরিষ্কার করে। লক্ষ্মীও তেমনি গাড়োল। দেখতে শুনতে তো ভালই, তুইও একটা কারো সাথে পালিয়ে যা না বাপু। এই জীবন থেকে মুক্তি পাবি…”

“ইশ! কিসব কথা বলো। ছেলের সামনে এইসব বলছ?”

“আরে ও তো ঘুমোচ্ছে।”

“তবু। যদি কানে যায়?”

“গেলে যাবে। ছেলেকে এসব ভুলভাল মর‍্যালিটি শিখিয়ো না। একটা নিরপরাধ মেয়ে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছে সেইটা অন্যায় না, আর ও পালিয়ে গেলেই অন্যায়?”

বাবা, মা বুঝতেও পারত না বিপ্লব ঘাপটি মেরে সবই শুনছে। সে যা-ই হোক, কথা হচ্ছে সেই লক্ষ্মীদির বাড়ির তাকেও ওরকম গাদা দেব দেবী ছিল। কোন কোন দিন লক্ষ্মীদি মাকে বলত “কাকিমা, ভাইকে আজ একটু আমার বাড়ি নিয়ে যাব?”

“ও মা! তোর অন্য বাড়ি কাজ নেই?”

“আজকে তো নবাকাকুদের বাড়ি গুরুদেব আসবে। আজ আমার ও বাড়ি যাওয়া বারণ। আর দুটো বাড়ি শুধু ঝাঁট দেয়া, মোছা। ও আমার দু মিনিটে হয়ে যাবে। তারপর বাড়ি চলে যাব। নিয়ে যাই না, কাকিমা? সন্ধ্যের মধ্যে ফেরত দিয়ে যাব।”

“আচ্ছা, নিয়ে যা। তোর বাবা বকবে না তো?”

“বাবা সকালে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেছে, সেই রাতে আসবে। বাবা থাকলে ওকে আমি কখনো নিয়ে যাই? ছিঃ!”

তারপর লক্ষ্মীদির হাত ধরে বিপ্লব বেরিয়ে পড়ত। মা একটা ছোট ব্যাগে স্নান করে উঠে পরার জামাকাপড় ভরে দিত। সেই ব্যাগটা থাকত লক্ষ্মীদির কাঁধে। অন্য বাড়িতে কাজ করার সময়ে বিপ্লব শান্ত হয়ে বসে থাকত পাশে, লক্ষ্মীদি বাসন মাজতে মাজতে বা কাপড় কাচতে কাচতে গল্প বলত। অনেক সময় বিপ্লবের কাছেও গল্প শুনতে চাইত। সেসব বাড়ির গিন্নীরা বিপ্লবের মায়ের কাছে বলতেন “হ্যাঁ গো, তোমার অমন ফুটফুটে ছেলেকে তুমি সারাদিনের নামে কাজের মেয়ের সাথে ছেড়ে দাও? কী উল্টো পাল্টা শিখে আসবে কোন ঠিক আছে?”

মায়ের বরাবরই মুখরা হওয়ার বদনাম। বলত “আজ অব্দি যখন রূপকথার গল্প আর ছোটখাট গান ছাড়া কিছু শেখেনি তখন চিন্তা নেই। ভদ্রলোকের ছেলেদের সাথে খেলাধুলো করেও তো গালাগালি দিতে শেখে অনেকে। নিজের চোখেই দেখতে পাই।”

তারপর এই যে ভেজা ভেজা গন্ধটা। এটাও ছিল বড়পিসির পুরনো বাড়িতে। এখন বিপ্লব বুঝতে পারে, ছেলেমেয়ে নিয়ে দু কামরার টিনের চাল দেয়া ভাড়া বাড়িতে সে বড় কষ্টের সংসার ছিল পিসির। তবু, কি আশ্চর্য! ও বাড়ি যেতে বড্ড ভাল লাগত ছোটবেলায়। মেঝেটা ছিল অসমান, ফুটিফাটা। বৃষ্টি হলে এক কোণের ছাদ দিয়ে জল গড়িয়ে আসত। ওখানকার মেঝেটায় তাই চট পেতে রাখা থাকত। বর্ষাকাল ছাড়াও, সব সময়েই এরকম একটা গন্ধ থাকত সেই ঘরে।

পাশের ঘরটা ছিল বড়পিসির রান্নাঘর। সেখানেও সেই এক গন্ধ। বিকেলের দিকে গেলে রাতে না খাইয়ে ছাড়ত না পিসি। সেই অনটনেও বড়পিসির রান্নার জাদুতে দু তিন পদ তৈরি হয়ে যেত নিমেষে। তারপর রান্নাঘরের মাটিতে বাবা, মা আর বিপ্লব খেতে বসত। ওকে অবশ্য শুধু মাটিতে বসতে দিত না পিসি। চৌকির নীচের ট্রাঙ্ক থেকে বের করে আনত হলুদের মধ্যে নীল সুতোর কাজ করে ফুটিয়ে তোলা পেখম মেলা ময়ূরওলা একখানা সাত পুরনো আসন। পাততে পাততে বলত “এই আসনখানা তোমাদের কাউরে দিমু না। হেইডায় আমার বাবায় বসত। এহনো আমার বাবাই বসব।” বলে বিপ্লবের কপালে চুমু খেয়ে ওকে সেই আসনে বসিয়ে দিত। ভাত খেতে খেতে যে গন্ধটা পাওয়া যেত, সেই গন্ধটাই আজ পার্বতীদির ঘরে।

ওরা হাসপাতাল থেকে ফিরে এল শিগগির। বিপ্লবকে দেখে পার্বতীদি একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল প্রথমে। বোধহয় ভেবেছিল ওকে ছাঁটাই করতে এসেছে। সেটা নয় বুঝে নিশ্চিন্ত হল, এক গ্লাস জল আর দুটো বিস্কুট না খাইয়ে ছাড়ল না। পার্বতীদির বর বলল ছেলের অবস্থার একটু ঘনঘন উন্নতি, অবনতি হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে চট করে বাড়ি না আনলেই ভাল ছিল। বিপ্লব বারবার বলে এল, পার্বতীদি যেন কাজে যাওয়ার জন্যে তাড়াহুড়ো না করে। ওর বর হেসে বলল “কাম পে তো যানা পড়তা, সাব। সবলোগ তো নই মানেগা আপ জইসা। হাম কো ভি যানা পড়তা, পারওয়াতি কো ভি যানা পড়তা। কিতনা দিন নই যাকে হোতা?”

ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমেই বিপ্লবের মনে হল, লক্ষ্মীদি কেমন আছে কে জানে! ওর মাতাল বাবা মারা গেছে শুনেছিল মনে আছে। এখন একা একা কী করে দিন কাটে লক্ষ্মীদির? ওদের পাড়ার কোন বাড়িতে কাজ করতে আসে না বহু বছর হল। তাহলে কি অন্য কোন কাজ করে? কত বয়স হবে এখন? বাবা নিশ্চয়ই জানবে। বহুকাল পরে বাবাকে ফোন করতে খুব ইচ্ছে হল।

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য UPI অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply