নাম তার ছিল: ২১

পূর্বকথা: অনেকদিন পরে বিপ্লবের মনে পড়ে বাবার কথা, নিজের ছোটবেলার কথা। সে আবিষ্কার করে, ভাল রোজগারের সাথে সাথে তার জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। কিন্তু শৈশবে যে জীবনের কল্পনা করত সে, তার সাথে এই জীবনের কোন মিল নেই

“তোকে এসব গল্প বলি দিন রাত, তুই আবার অতীতচারী দুঃখবিলাসী তৈরি হোস না, বাবা। ইতিহাস জানা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়ার জন্যে। তা বলে ‘আহা কি ভাল দিন ছিল’ বলে হা হুতাশ করার কোন মানে হয় না কিন্তু। সবাই যদি তাই করত তাহলে আর সভ্যতাটা এগোত না, বুঝলি? তাছাড়া কোনদিনই কোন স্বর্ণযুগ ছিল না। অনেক লড়াই করে মানুষ সভ্যতাটাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আরো অনেক পথ যেতে হবে…”

“তুমি পারো বটে। ঐটুকু ছেলে ইতিহাস, সভ্যতা — এসব কী বোঝে?”

“বোঝে, বোঝে। সবটা বোঝে না ঠিকই, কিন্তু মনে একটা ছাপ পড়েই। আবছা ছাপ হয়ত, কিন্তু পড়ে। সেই ছাপটাই ফেলার চেষ্টা করছি, বুঝলে? ছোটদের আমরা যত ছোট ভাবি তারা তত ছোট নয় গো। আমাদের চেয়ে অনেক নরম মন তো ওদের, তাই অনেক ছোট ছোট জিনিস যেগুলো আমরা দেখি বা শুনি আর সাথে সাথে ভুলে যাই, সেগুলো ওদের উপর খুব প্রভাব ফেলে। সেই জন্যেই… যতটা পারি ভাল ভাল জিনিসের ছাপ দেয়ার চেষ্টা করছি।”

কথোপকথনটা ছবির মত মনে আছে বিপ্লবের। ও তখন ক্লাস ওয়ান টোয়ানে পড়ে। বর্ষাকাল। রবিবার। সন্ধের মুখে বাবা বেরোতে যাবে, ঝেঁপে বৃষ্টি এল। বারান্দার বেঞ্চে বসে পড়ল, বৃষ্টি থামলে বেরোবে বলে। বিপ্লবের একদমই ইচ্ছে ছিল না বাবা সেদিন বেরোক। কিন্তু পার্টির কাজ থাকলে বাবাকে কোনদিন ও বেরোতে বারণ করত না।

বৃষ্টি আর থামলই না। শিল পড়তে শুরু করল। বাড়িতে তখন বারান্দার মাথায় টিনের চাল। বিপ্লবের জন্মের পরপরই বাবা, জ্যাঠাদের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছিল দাদুর তৈরি বাড়িটা। দোতলাটা ছেড়ে দিয়ে একতলার দুটো ঘরে জায়গা হয়েছিল বাবা, মা আর বিপ্লবের। দাদুর তৈরি একতলার বারান্দাটা পড়েছিল ছোটজেঠুর ভাগে। যদিও সেদিকটা তালাবন্ধই থাকত, কারণ জেঠু চাকরিসূত্রে বাইরে। কিন্তু বারান্দা একটা দরকার। নইলে সকালবেলা বাবার সাথে দেখা করতে এসে লোকে বসবে কোথায়? বসছিল বটে বাইরের ঘরটায়। কিন্তু তখন আশির দশক, রবীন ঘোষাল এলাকার পার্টির গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তার উপর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। ঐটুকু ঘরে লোক উপচে পড়ত। রোদে জলে অনেককে খোলা উঠোনটাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হত। তাই বিপ্লবের যখন বছর চারেক বয়স, তখন মাসে মাসে টাকা দিয়ে অল্প গাঁথনি করে একটা কাঁচা মেঝের বারান্দা করা হয়েছিল, মাথার উপর টিনের চাল দিয়ে। বাবার ইচ্ছে ছিল পরে পাকা করে নেবে। হয়ে ওঠেনি বহু বছর।

তা সেদিন শিলাবৃষ্টি শুরু হতেই মা মুখটা আকাশের মতই কালো করে বাবাকে বলল “হ্যাঁ গো, এত শিল পড়ছে, টিনগুলো ভেঙে যাবে না তো?”

বাবা ততক্ষণে বুঝে গেছে মিটিঙে যাওয়া আর হবে না। পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বলল “গেলে যাবে। কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে সেটা এনজয় করো এখন।” তারপর বিপ্লবকে বলল “দৌড়ে গিয়ে বাথরুম থেকে ছোট বালতিটা নিয়ে আয়।”

“কী করছ কি? এই বৃষ্টিতে ভিজবে নাকি? মাথা ফেটে যাবে তো!”

“আরে ভিজতে বালতি লাগে নাকি? শিল জমাব। নিয়ে আয়, নিয়ে আয়।”

বিপ্লব দৌড়ে নিয়ে এসেছিল অ্যালুমিনিয়ামের বালতিটা। বাবা হাত বাড়িয়ে সেটা রেখে দিয়েছিল উঠোনে। টং টং আওয়াজে তার ভেতর শিল পড়ে অল্পক্ষণের মধ্যেই ভরে উঠেছিল। বাবা সেটাকে টেনে তুলল বারান্দায়, এক মুঠো শিল তুলে নিয়ে ডাকল “আয় আয়, এদিকে আয়।” তারপর মুঠো দুটো বিপ্লবের গালে ঠেকিয়ে বলল “দ্যাখ, কি ঠান্ডা!” কাঁপা মুঠোর মধ্যে থেকে সেই শিলগুলো কাঁপুনি ধরিয়ে দিল।

মা বলল “একি, একি! বারো মাস সর্দি কাশিতে ভোগে ছেলেটা। তুমি আবার এইসব শেখাচ্ছ?”

“আরে কিচ্ছু হবে না। শিল কি জিনিস হাতে নিয়ে দেখবে না? আয়, আয়। হাত দে।”

বিপ্লব মহা উৎসাহে কনুই অব্দি ডুবিয়ে দিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে শোনে মা চ্যাঁচাচ্ছে “না, হবে না। তোমার আর কী? তুমি তো দেশোদ্ধার করতে বেরিয়ে যাবে। রুগ্ন ছেলেটাকে নিয়ে ভুগব তো আমি।”

বাবা তখনই মহানন্দে বলে “আজ আর বেরোব না। বৃষ্টিটাও চট করে থামবে মনে হচ্ছে না।”

আশির দশকের শেষের সেই দিনগুলোতে ঝড় উঠলেই কারেন্ট চলে যেত সবুজগ্রামে। কখন আসবে কেউ ভাবত না, ভাবত কবে আসবে। সেদিনও কারেন্ট নেই, তার উপর বাবা অপ্রত্যাশিতভাবে বাড়িতে। বিপ্লব কিছুতেই পড়তে বসল না। ব্যর্থ হয়ে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে গজগজ করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেল মা, আর বিপ্লব চিৎ হয়ে থাকা বাবার উপর চড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। বাবা বলতে শুরু করল ম্যাক্সিম গোর্কির মাদারের গল্পটা। অনেকবার শোনা, তবু বাবা এমন ভাল বলত, মনে হত প্রতিবার নতুন। সে বয়সে গল্প শোনার ক্ষিদে ছিল এমন, যে একটা শেষ হলে আরেকটা, সেটা শেষ হলে আরো একটা — এইভাবে চলতেই থাকত, বাবা বলতেই থাকত। সেদিন অন্ধকারে একের পর এক গল্প বলতে বলতেই হঠাৎ বাবা বলেছিল কথাগুলো। “আমাদেরও সব ভাল নয়, যা যা করার সব আমরা করতে পারিনি। লেনিনও পারেননি, বুঝলি? পারলে আজকের অবস্থা হয়? মানুষের উপর নিশ্চয় খুব অন্যায় হচ্ছিল। নইলে আর কমিউনিস্টদের উপর মানুষ এত রেগে গেল কেন দেশগুলোতে?”

এই কথাগুলো, ঠিক এই কথাগুলোই বিপ্লব ফেরত দিয়েছিল, যখন বাবা ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল এস এফ আই ছেড়ে দেওয়াটা উচিৎ হবে না। ব্যক্তির চেয়ে সংগঠন বড়।

“সংগঠন? এমন সংগঠন ভেঙে দেওয়া উচিৎ,” প্রচণ্ড উত্তেজনায় সেদিন বলেছিল বিপ্লব। বাবার সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ার সেই শুরু। ও তখন কলেজে বি সি এ ফার্স্ট ইয়ার।

“তোর এখন মাথা গরম, তাই এসব বলছিস। মাথা ঠান্ডা হোক, তারপর কথা বলা যাবে।”

“আমার মাথা ঠান্ডাই আছে। তুমি তোমার পার্টি করেছে বলেই যে কোন অন্যায়কে জাস্টিফাই কোরো না, বাবা।”

“আমি জাস্টিফাই করব কি? আমি তো ঘটনাটাই সবটা জানি না। তোর থেকেই যা শুনেছি। কোন ঘটনারই এক পক্ষ শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ না।”

“এক পক্ষ! এর আবার অন্য পক্ষ কী থাকবে? জাস্ট অন্য পার্টির সংগঠন করে বলে একটা ছেলেকে অমানুষিকভাবে মারবে ওরা! শুধু তাতেও তো থামেনি, আবার সুকৃতিকে হুমকি দিয়েছে ‘জিনস খুলে নেব।’ এর নাম সংগঠন! আবার কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন? এদের সাথে সংগঠন করতে বলো তুমি?”

“এরাই সব নয়, বিপ্লব।”

“হ্যাঁঃ! সব নয়। দেখা হয়ে গেছে আমার। ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের জেলা সেক্রেটারিকে বললাম, সে কী করল? না ঐ ক্রিমিনালটাকেই ফোন করে জিজ্ঞেস করল ‘কী হয়েছে রে?’ তারপর তার কথায় বিশ্বাস করে আমায় বলল রঞ্জন আর সুকৃতি নাকি ছেলেমেয়েদের থ্রেট করছিল, তাই ওদেরকে ভয় খাইয়ে দেয়া দরকার ছিল।”

“হতেও তো পারে…”

“না, পারে না। গোটা কলেজে ডি এস ওর পঞ্চাশটা স্টুডেন্ট নেই। ওরা থ্রেট করবে? কখনো সম্ভব? আর রঞ্জন, সুকৃতি আমার ক্লাসের। ওদের আমি চিনি না? ওরা থ্রেট করার লোকই না।”

“দুনিয়াটা অত সোজা নয়, বাবা…”

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বিপ্লব বলেছিল “তাই দেখছি। যেমন তোমাকে বরাবর ভাবতাম সৎ কমিউনিস্ট। এখন দেখছি সৎ ফৎ কিছু না। আর সকলের মত তোমারও একটা মুখোশ আছে হয়ত।”

বাবা যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। মা ধমকে উঠেছিল “এ কি রে! এসব কী বলছিস বাবাকে? ছি ছি ছি!”

“থামো তো। অত ছি ছি করার কিছু নেই। এরা সব এক। আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে বাবাও রিগিং করে ভোটে জিতত।”

মা ঠাস করে এক চড় কষিয়ে দিয়েছিল। “এই চিনেছিস বাবাকে? হ্যাঁ? এই চিনেছিস?” বলে কান ধরে টেনে আরো কয়েকটা মারতেই বাবা আর্তনাদ করে দৌড়ে এসেছিল “কী করছ কি! এত বড় ছেলের গায়ে কেউ হাত তোলে?”

বাবা সর্বশক্তি দিয়ে ছাড়িয়ে নিল, কিন্তু মা বলতেই থাকল “ছেলে? কিসের ছেলে? এইভাবে বাপের সাথে কথা বলে কোন ছেলে? কে ওকে বলেছে কলেজে রাজনীতি করতে? আমি বারণ করিনি? করাও চাই আবার এইসব নিয়ে বাড়ির মধ্যে অশান্তি করাও চাই! এগুলো সহ্য করব না আমি বলে দিলাম।”

বিপ্লব রাগের চোটে দোতলায় নিজের ঘরে গিয়ে দুমদাম করে দরজা জানলা বন্ধ করে দিয়ে বসে থাকে। কিন্তু মায়ের গলা বরাবরই সরেস। কানে আসতে থাকে “তুমিই এর জন্যে দায়ী। আমি বারবার বলেছিলাম কলেজে পার্টি ফার্টি করবে না, কলেজটা লেখাপড়া করার জায়গা। তুমি তখন ওকে প্রশ্রয় দিয়েছ। এখন বোঝো। ছি ছি ছি! যা মুখে আসছে তাই বলছে! কোন শিক্ষা দীক্ষা হয়নি ছেলের!” উত্তরে বাবাও কিছু একটা বলে, কিন্তু সেটা ঠিক শুনতে পাওয়া যায় না। শুধু শোনা যায় মা আরো উঁচু গলায় চিৎকার করছে “হয় ছেলে পার্টি ছাড়বে, নয় তুমি পার্টি ছাড়বে, আমি বলে দিলাম। তোমার রাজনীতি করার জন্যে আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে গেছে, এখন আমি ঘরের মধ্যে এই অশান্তি আর সহ্য করব না। হয় কেউ একজন পার্টি ছাড়ো, নয় আমি এই বাড়ি থেকে চলে যাব।”

এরপরই শোনা যায় গ্রিলের গেট খোলার শব্দ। মা তখনো চেঁচিয়েই চলেছে।

বাবাকে পার্টি ছাড়তে হয়নি, মাকেও বাড়ি ছাড়তে হয়নি। আর রাজনীতি না করার সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলেছিল বিপ্লব। বন্ধ ঘরে বসে একটা লম্বা পদত্যাগপত্র লিখে ফ্যালে। তারপর বোঝে এত নাটক করার কোন দরকার নেই। কিসের আবার পদত্যাগ! সি আর বৈ তো নয়। তাও আবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। আর এস এফ আইয়ের জোনাল কমিটির সদস্য। এসব আর কী এমন পদ? আর পদত্যাগপত্র দেবেই বা কাকে? ঐ সাত্যকি সরকারকে? ও নামেই জি এস। আসলে একটা গাঁটকাটা। বিপ্লব এস এফ আই ছেড়ে দিলে ও খুশিই হবে। অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হতে হবে না, স্তাবকদের নিয়ে আরামে থাকতে পারবে। অতএব তিন পাতার পদত্যাগপত্রটা পাকিয়ে, নর্দমার দিকের জানলাটা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিপ্লব।

চিঠিটা লেখায় অবশ্য একটা লাভ হয় — উত্তেজনা অনেকটা কমে যায়। রাতে খাওয়ার টেবিলে বিপ্লব বুঝতে পারে, বাবাকে একটু বেশিই খারাপ কথা বলা হয়ে গেছে। কিন্তু ও কেনই বা ভুল স্বীকার করতে যাবে? বাবাই তো ছোটবেলায় শিখিয়েছিল, কমিউনিস্টদের যে সবই ভাল তা নয়। তাদেরও দোষ আছে, দোষ থাকতেই পারে। সমালোচনা করাই কর্তব্য। সে কথা বাবা আজ ভুলে গেল কেন? রঞ্জনকে ওভাবে মারা আর সুকৃতিকে রেপের হুমকি দিয়ে যে ওর কলেজের এস এফ আই অন্যায় করেছে — এটুকু মেনে নিতে কী অসুবিধা ছিল বাবার? ভুল বাবা করেছে, মিটমাট করতে হলে বাবাই করবে। ও নত হতে যাবে না। এই ভেবে কোন কথা না বলেই খাওয়া শেষ করে উঠে গিয়েছিল সে রাতে।

পরদিন ভোরবেলা দরজা ধাক্কিয়ে ঘুম থেকে তুলল মা। “শিগগির গিয়ে ফোনটা ধর। কে একটা মেয়ে ফোন করেছে, হাউ হাউ করে কাঁদছে। কেন জানি না।”

শুনেই বিপ্লব বুঝল কার ফোন। সুকৃতি। একটু আগে রঞ্জন মারা গেছে। কালই নার্সিংহোম থেকে শুনে এসেছিল ওর মাথার চোট গুরুতর। তা বলে মরে যাবে ছেলেটা! বিপ্লব ছুটল নার্সিংহোমে।

কোত্থেকে যেন এসে পড়েছে অনেক অচেনা ছেলেমেয়ে। এত লোক ডি এস ও করে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি বিপ্লব। ওরা রঞ্জনের দেহ নিয়ে মিছিল করে কলেজ ক্যাম্পাসে যেতে চেয়েছিল। ওর বাবা রাজি হলেন না। তাই প্রথমে ওর বাড়ি, তারপর সোজা শ্মশানে যাওয়া হল। অবশ্য গোটা সময়টা স্লোগান দিয়ে গেল ছেলেমেয়েগুলো। বিপ্লব গলা মেলাতে পারল না। হাজার হোক, ওরা তো ডি এস ও। এস এফ আই ছাড়লেও অন্য কারোর হয়ে গলা ফাটানো কি ঠিক হবে? মনস্থির করতে পারল না কিছুতেই। শ্মশানেই একটা মিটিং মত করল ওরা। তাতে বিপ্লবের চেয়ে বয়সে বেশ খানিকটা বড় একটা ছেলে বলল “কমরেড রঞ্জনের হত্যার জন্যে যারা দায়ী, তাদের আমরা ছেড়ে দেব না। প্রশাসনের কাছ থেকে বিচার আদায় করেই ছাড়ব। আগামীকাল সকালে কলেজ চত্বরে ঠিক সকাল দশটায় আমরা জমায়েত হব, কমরেড রঞ্জনকে স্মরণ করব। আপাতত, দাহ হয়ে গেলে আমরা থানায় যাব। আমাদের প্রতিনিধিরা ওসির সাথে দেখা করবেন। রঞ্জনকে কারা মেরেছিল সেটা সবাই জানে, অনেকেই দেখেছে। কমরেড সুকৃতি নিজে ঘটনার সাক্ষী। এরপরও খুনীদের ধরতে না পারার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। সে কথাই আমরা পুলিশকে জানিয়ে দিয়ে আসব। আমরা ২৪ ঘন্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবী জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা থানার সামনে গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান বিক্ষোভ করব।”

রঞ্জনের অস্থি ভাসানো হয়ে যাওয়ার পর ওরা মিছিল করে থানায় গেল। সুকৃতি বিপ্লবকে বলল “ভাই, তুই তো মিছিলে যাবি না। একটু রঞ্জনের বাবাকে বাড়ি পৌঁছে দিবি?”

বিপ্লব পৌঁছে দিল। খুবই শক্ত ধাতের লোক বলতে হবে। বিপ্লব কথা বলার অবস্থায় ছিল না, উনিই রিকশায় কথা বলতে বলতে গেলেন। বিপ্লবের নাম, ধাম, রঞ্জনকে কতটা চিনত — এসব জিজ্ঞেস করলেন। যেন কিছুই হয়নি। এমনকি রঞ্জনের ছোটবেলার অনেক ঘটনাও বললেন। শুনতে শুনতে বারবার চোখ ভরে আসছিল বিপ্লবের। কারণ ভীষণ মিল ওর নিজের ছোটবেলার সাথে। রঞ্জনের বাবাও সি পি এম করতেন। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে জেল খেটেছেন। কিন্তু ১৯৯৭ এর পর আর মেম্বারশিপ রিনিউ করাননি। বিপ্লব লজ্জায় বলতে পারল না যে ও এস এফ আই, বাবা সি পি এম। ভদ্রলোক বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নামার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “ভাল থেকো, বাবা। তোমরাই তো ভবিষ্যৎ।” তখনো গলাটা কাঁপল না একবারও।

বিপ্লব যখন বাড়ি ঢুকছে, বাবা তখন সাইকেল নিয়ে বেরোচ্ছে। বলল “ছেলেটা মারা গেল রে?” কোন উত্তর না দিয়ে গটগট করে ঢুকে গেল ও। খুনীর পার্টি আবার সহানুভূতি দেখাচ্ছে! ঠিক এই কথাটাই মনে হচ্ছিল তখন।

পরদিন সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। ও রোজকার মত স্নান টান করে নীচে নেমে বলল “মা, ভাত দাও।” মা বলল “এই দুর্যোগের মধ্যে কলেজ যাবি? ক্লাস কটায়?”

“ক্লাস যখনই থাক। আমি এখনই বেরোব। দরকার আছে।”

বাবা কাগজ পড়তে পড়তে বলল “ওদের কলেজের একটা ছেলে খুন হয়েছে, জোনাকি। ওকে যেতে দাও।”

“ও মা, সে কি! পরশু মারামারি, কালকে খুন! এসব কী হচ্ছে?”

“আরে বাবা, পরশুর মারামারিতেই আহত ছেলেটা কাল মারা গেছে। একটু কাগজ টাগজ পড়লেও তো পারো।”

অকারণেই ক্ষেপে উঠে বিপ্লব বলে “মারামারি হয়নি। মারা হয়েছে। ছেলেটা মারা যায়নি, মেরে ফেলা হয়েছে।”

বাবা কাগজ হাতে উঠে পড়ে, চলে যেতে যেতে বলে “তা তো বটেই। তাজা ছেলেটা…”

সেদিন কথাটা একেবারেই স্পর্শ করেনি বিপ্লবকে। আজ অটোয় বসে হায়দরাবাদের বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগতে বুঝতে পারল গলার কত নীচ থেকে ভেসে এসেছিল শব্দ দুটো — “তাজা ছেলেটা”।

বৃষ্টির মধ্যেই কলেজের মেন বিল্ডিঙের সামনে স্মরণসভা হয়েছিল রঞ্জনের। ডি এস ও করা ছেলেমেয়েদের বাদ দিলে হাতে গোনা কয়েকজন এসেছিল। আগেরদিন বিকেলেই পরবর্তী বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত কলেজ বন্ধ রাখার নোটিশ লেগে গিয়েছিল। এই অবস্থায় কে কলেজ মাড়াবে?

সভা শেষের মুখে, ততক্ষণে সবাই কাকভেজা। একেবারে পেছনের সারিতে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লব। সভা পরিচালনা করছিল সেই আগের দিনের ছেলেটা। বিপ্লব জেনেছে ওর নাম অনিকেত। এই কলেজের ছাত্র নয়, এস ইউ সি আই নেতা। বলল “আমরা সভা শুরু করেছি নীরবতা পালন করে। শেষ করব কমরেড রঞ্জনের খুব প্রিয় একটা গান দিয়ে। গাইবেন কমরেড অনন্যা।”

মেয়েটাকে বিপ্লব চেনে। থার্ড ইয়ার হিস্ট্রি অনার্স। গানটা ধরল বটে, কিন্তু গলায় মোটেই সুর নেই। বাবার গলায় লোডশেডিং আর বৃষ্টির সন্ধ্যায় বারবার শোনা গল্পগুলোর সাথে যে গানগুলো বহুবার শুনে প্রাণের গান হয়ে গেছে, তারই একটা। “ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না / নিগ্রো ভাই আমার / পল রোবসন।” দু চার লাইন শুনে বিপ্লব আর থাকতে পারেনি, গেয়ে উঠেছে সজোরে “আমরা আমাদের গান গাই / ওরা চায় না / ওরা চায় না।” মাইক ছাড়াই মিটিং হচ্ছিল তো, ওর গলাটা অনন্যার গলাকে ছাপিয়ে গেল। কিছু খেয়াল করার আগেই সবাই ঘুরে গেল ওর দিকে। অনন্যা অপ্রস্তুত হয়ে থেমে গেল। থতমত খেয়ে বিপ্লবও চুপ করে গেল। কয়েক সেকেন্ডের নৈঃশব্দ্য। তারপর অনিকেত বলল “গেয়ে যান, ভাই। চমৎকার গাইছেন। কমরেডস, আসুন গলা মেলাই।” গান চলতে থাকল, সবাই মিলে। খোলা অটোয় বেশ ঠান্ডা লাগছিল। গানটা গেয়ে নিজেকে গরম করার চেষ্টা করল বিপ্লব। গাইতে গাইতে ভাবল, বাবা অতীতচারী হতে বারণ করেছিল। বলেছিল স্বর্ণযুগ বলে কিছু হয় না। অচিন্ত্যদার ছাঁটাইয়ে মনটা চঞ্চল হয়েছে বলে ও খামোকা নস্ট্যালজিক হয়ে এইসব অন্যায়গুলোর কথা ভুলে গিয়ে সেই নরককুণ্ডে ফেরত যেতে চাইছে না তো? হয়ত বাবার প্রতি সত্যিই একটু বেশি কঠোর হয়েছে সে, কিন্তু বাবার কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? ওরকম অন্যায় বাবা কখনো করেছে বলে জানা নেই সত্যি, কিন্তু বাবা কি বিরোধিতা করেছে? অন্তত বলেনি তো ওকে! অবশ্য বছর দশেক হল সেভাবে কথাবার্তাই তো বলা হয়নি। রাজনীতি নিয়ে তো নয়ই। ফিরে যাওয়ার আগে একবার কথা বলে দেখবে নাকি? জিজ্ঞেস করবে নাকি সিঙ্গুর নিয়ে কী ভাবছে বাবা? নন্দীগ্রাম? বছর দেড়েক আগে যে অতগুলো লোককে মেরে ফেলল সি পি এমের পুলিশ? কী বক্তব্য বাবার? পার্টির এই অন্যায়টাকেও কি সমর্থন করে?

ভাল লাগলে টাকা দিতে পারেন Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply