নাম তার ছিল: ১৮

পূর্বকথা: হীরুদার মৃত্যুর পর বলরাম আর শ্যামলের প্রভাব আবার বেড়ে গেছে। রবীন স্বভাবতই কোণঠাসা। তবু সমাজবিরোধী জগার দলবল মাঝরাতে তাণ্ডব শুরু করলে রবীনের কাছেই ছুটে আসে লোকে, রবীনকে গিয়ে থামাতেও হয়। কিন্তু পুলিশ ফাঁড়ির সামনে লোক দেখানো ধিক্কার সভায় সে বক্তৃতা দিতে রাজি হয় না।

সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রাম, বড়িহাটার সকলে যে হরিপদর বউকে ঐ পরিচয়েই চিনত তা নয়। সবুজগ্রাম গার্লস হাইস্কুলের জীবন বিজ্ঞানের দিদিমণি হিসাবে সুমিত্রা স্বনামধন্য। প্রাইভেট টিউশন করলে অনেক টাকা করতে পারত, কিন্তু করল না কোনদিন। তবু দিন রাত বাড়িতে এলাকার পড়ুয়াদের আনাগোনা লেগেই থাকত। স্কুলে মেয়েদের দিয়ে ইকো ক্লাব করানো, গান বাজনার দল — এসব নিয়ে সারাক্ষণ মেতে থাকত সুমিত্রা। হরিপদ স্কুল আর রাজনীতি নিয়ে বরাবর মহা ব্যস্ত। তার সাহায্যের দরকার হয়নি কোনদিন।

সুমিত্রা বিজ্ঞান মঞ্চেরও সদস্য ছিল। ওরই উদ্যোগে প্রতিবার পুজোর সময়ে গার্লস স্কুলে বিজ্ঞানমেলা হত। বিশেষ আকর্ষণ ছিল ‘বিষধর সাপের ঘরে জীবন্ত মানুষ।’ একটা সাপে ভর্তি খাঁচার ভেতর বসে বিজ্ঞান মঞ্চের একজন সাপ চেনাত আর সাপ সম্পর্কে নানা কুসংস্কার, ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করত। ওটা দেখতে সব বয়সের মেয়ে পুরুষের ভিড় হত। সেসব এস এস সি পরীক্ষা চালু হওয়ার আগের যুগের কথা। তখনকার প্রধান শিক্ষিকা অবসর নেওয়ার সময়ে ছাত্রীরা, তাদের অভিভাবকরা, অনেকেই চেয়েছিল সুমিত্রাই হেড মিস্ট্রেস হোক। ও-ও রাজি ছিল। কিন্তু শ্যামল কংসবণিক তো তখন সবুজগ্রামের সম্রাট। তার ভাইয়ের বউ থাকতে কী করে অন্য কেউ হেড মিস্ট্রেস হয়? রবীন চেয়েছিল নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে। নবারুণও বলেছিল “সুমিত্রার চেয়ে যোগ্য লোক নেই, ও দায়িত্ব পেলে স্কুলটা অন্য উচ্চতায় চলে যাবে। তুই হীরুদাকে বল।” কিন্তু সুমিত্রা জানতে পারা মাত্রই বারণ করেছিল। “প্লিজ এসব করবেন না, রবীনদা। হেড মিস্ট্রেস কে হবে এই নিয়ে টিচারদের মধ্যে দলাদলি হওয়া খুব খারাপ। ছাত্রীরা জানতে পারলে আমাদের আর সম্মান করবে না।”

সুমিত্রার মারা যাওয়ার খবরটা পাওয়ার পর থেকে নবারুণের মনে পড়ছিল কথাগুলো। শ্বশুরমশাই হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সে কদিন কলকাতার ফ্ল্যাটেই থাকছিল। বিকেলে শ্বশুরমশাইকে দেখে ফিরেই জানল খবরটা। বিজ্ঞান মঞ্চেরই একজন ফোনে জানাল।

সুমিত্রার গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রীরা শ্রাদ্ধশান্তি মিটে যাওয়ার পর একটা স্মরণসভার আয়োজন করল সবুজগ্রাম রবীন্দ্র ভবনে। রবীন, নবারুণ দুজনেই বক্তা হিসাবে আমন্ত্রিত। হলের গেটের বাইরেই নবারুণের চোখে পড়ল রবীন বিড়ি ধরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু কাঁপা হাতে কিছুতেই ঠিক জায়গায় ঘষাটা লাগছে না।

“দে, আমারে দে,” বলে দেশলাইটা চেয়ে নেয় নবারুণ। “আমিও একখান খাইয়া নেই।”

রবীন পাঞ্জাবির পকেট থেকে বিড়ির প্যাকেটটা বার করতে যাচ্ছিল। তার আগেই বুক পকেট থেকে উইলসের বাক্সটা বার করে বাড়িয়ে ধরে নবারুণ।

“আইচ্ছা, তোর কল্যাণে একখান সিগারেটই খাই,” রবীন একটু হেসে একটা বার করে নেয়।

নিজেরটা ঠোঁটে লাগিয়ে, দুজনেরটা ধরিয়ে, ধোঁয়া ছেড়ে নবারুণ বলে “তোর এখন সিগারেটই খাওয়া উচিৎ। বয়স তো হইতাছে, সিগারেটের ফিল্টারে ক্ষতিটা একটু তো আটকায়।”

“সিগারেটের অনেক খরচা। পদ্মা বিড়িই ভাল।”

“খরচা আবার কী? মাস্টারদের কি এখন সেই আগের মত মাইনে আছে? ইস্কুল মাস্টাররাও তো এহন বিদেশ বেড়াইতে যায়।”

“যে যায় সে যায়…”

“হেইডাই হইল গিয়া কথা। তুই বিড়িই খাবি। না খাইলে তোর মনে হইব কিছুই খাইলাম না।”

রবীন হাসতে হাসতে বলে “সে তো বটেই। আমাগো তো এই কইরাই জীবন কাইট্যা গেল। এহন আর বদলায় কী লাভ?”

“না বদলাইতে পারলে তো ভালই হইত রে। কিন্তু কখন যে চারপাশটা বদলায় গেল… আমরাও বদলায় গ্যালাম! টেরই পাইলাম না।”

“বদল তো সকলেরই হইছে। আমারও কি হয় নাই? আমি তো সারাজীবন একখান দম দেয়া এইচ এম টি ঘড়ি পরছি। এইবার ছুটিতে আইস্যা পোলায় দিয়া গেল কি একখান বিদেশী ঘড়ি। জম্মে নামও শুনি নাই সে কোম্পানির। দমও দিতে লাগে না। এদেশে পাইল কী কইরা জিগাইলাম, কইল হায়দরাবাদে নাকি অনেকদিনই পাওন যায়, এহন কলকাতাতেও যায়। তা সেই ঘড়িই পরতাছি। কেমন জানি লাগে, কিন্তু না পরলে পোলার মুখ ভার, পোলার মায়েরও মুখ ভার।”

নবারুণের মনটা এত ভারী হয়ে যায় যে বাঙাল কথা ছেড়ে দিয়ে বলে “আসলে আমরা হেরে গেলাম, রবীন। বহুজাতিকের কাছে। গোহারা হেরে গেলাম।”

“অত বড় সোভিয়েত রাশিয়াই হেরে গেল, আমরা তো কোন ছার” রবীন উত্তর দেয়।

“আমাদেরও ভুল ছিল। মনে আছে? ‘কম্পিউটারাইজেশন করতে দেব না’। এখন তোর ছেলে, আমার ছেলে — সব তো কম্পিউটারের জন্যেই করে খাচ্ছে।”

“হ্যাঁ। আর কেবল স্বার্থপর হচ্ছে। সারা বিশ্বের লোকের কাজ করছে আর নিজে কূপমণ্ডূক হচ্ছে।”

“যাঃ! বিপ্লব ওরকম না। তুই বেশি কড়া হয়ে ভাবছিস। আমাদের ছেলেপুলেরা ওরকম, বিপ্লব আর পাঁচটা ছেলের মত না।”

“না রে, না। কোন তফাত নেই। এখন সকলেই একই রকম। হায়দরাবাদে থাকে, ওখানকার রাজনীতির কোন খবরই রাখে না। জিগেস করলে বলে ‘আমি আমার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, আমার কী দরকার ঐ কচকচিতে?’ এবার যখন এল জিগেস করলাম ‘হ্যাঁ রে, হায়দরাবাদে যে এত ডেভেলপমেন্ট, বাকি অন্ধ্র কিরকম?’ বলে ‘আমার জেনে দরকার নেই। আমি কি ওখানে ভোট দেব?’”

“আরে তুই বুঝিসনি। তার মানে ওর ওখানে মনে টেকে না, এখানে ফিরে আসতে চায়। এটা তো ভাল লক্ষণ।”

“কে বলেছে মন টেকে না? খুবই টেকে। এই তো ক মাস আগে আমিই আগ বাড়িয়ে বললাম ‘সল্টলেকে তো এখন অনেক কোম্পানি হয়েছে। দ্যাখ না চলে আসতে পারিস কিনা?’ উড়িয়ে দিয়ে বলল ‘কম মাইনে নিয়ে আসতে হবে। পারব না।’”

এই কথাটা শুনে মনটা দমে যায় নবারুণেরও। দীর্ঘকাল রবীনদের বাড়ি যাতায়াত বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকলেও বিপ্লব তো পাড়াতেই বড় হয়েছে, চোখের সামনে। ছেলেটা একেবারেই অন্যরকম ছিল। আর বুদ্ধিমানও। ওর বাবার সাথে যে নবারুণের মুখ দেখাদেখি বন্ধ, সেটা ওর ব্যবহারে কিন্তু লোকে বুঝত না। একবার একটা স্কুলের ইকো ক্লাবের করা ইন্টার স্কুল বক্তৃতা প্রতিযোগিতার পুরস্কার দিতে গিয়ে নবারুণ শুনেছিল বিপ্লবের বক্তৃতা। তখন ও এইট কি নাইনে পড়ে। জল দূষণ ছিল বিষয়। বেধড়ক কারখানা তৈরি কিভাবে বারোটা বাজাচ্ছে সেটা কি সুন্দর বুঝিয়েছিল ছেলেটা! বক্তৃতার শেষটা এখনো কানে বাজে।

“রবীন্দ্রনাথ যতই বলুন, দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর। বনে গিয়ে বাস করতে বললে আমরা কেউই রাজি হব না। তাই নগর আমাদের লাগবে, শিল্পও আমাদের লাগবে। প্রশ্নটা হল, তার জন্যে কতটা মূল্য দেব আমরা? শিল্প মানুষের জন্য, না মানুষ শিল্পের জন্য? লাগামছাড়া ধনতন্ত্র আমাদের মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অধিকার, পরিষ্কার জল খাওয়ার অধিকারটাও কেড়ে নিতে উদ্যত। অতএব দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে ধনতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিনা, সেটাই হল মূল প্রশ্ন।”

সেই ছেলের মুখে আজ এই কথা! আরেকটা সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করে নবারুণের। রবীন বলে “আর ধরাস না। চল ভেতরে যাই। সময় হয়ে গেল।”

সুমিত্রার স্মরণসভায় ওর বক্তৃতায় রবীন একেবারে শেষে বলল “সুমিত্রার দিন গেছে। ও ওর মত করে দুনিয়াটা সাজানোর চেষ্টা করেছিল। ভাল হল কি মন্দ হল সেসব বিচার করবে যারা রইল, তারা। রবিবার বিকেলবেলা নানা প্রলোভন উপেক্ষা করে প্রায় শ খানেক লোক যখন ওকে স্মরণ করছে, তখন নিশ্চয়ই ওর কাজে মানুষের কিছু ভাল হয়েছে। মানুষ হিসাবে আমাদের যার যতটুকু সাধ্য, তাই দিয়ে আশপাশের মানুষের ভাল করা — এইটাই তো যে কোন লোকের প্রধান কাজ বলে আমার মনে হয়। কেমন করে সেটা করা যায়, সুমিত্রার থেকে আমরা সবাই শিখেছি। তোমরা যারা আজকের আয়োজক, আশা করি তারা আরো বেশি শিখেছ। তোমরাই চারদিকের হতাশার মধ্যে আশার আলো। পৃথিবীটা তোমাদেরই থাকবে, তোমাদেরই এটাকে আরো সুন্দর করে তুলতে হবে। আমাদের তো আর সময় নেই।”

নবারুণের ভারী অবাক লাগল শেষ কথাগুলো। হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট হল যখন, সেই থেকে ও রবীনের বক্তৃতা শুনে আসছে। হয়ত কেউ খুন হয়েছে, সেখানে গিয়েও রবীন এমন বক্তৃতা দিয়েছে যে সকলে চাঙ্গা হয়ে গেছে। আজ এমন বিষণ্ণ উপসংহার কেন?

স্মরণসভা শেষ হওয়ার পর বাইরে বেরিয়ে প্রশ্নটা করতেই, যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে রবীন বলল “আরে পার্টি মিটিং নয় তো। ঐ জন্যে সুমিত্রা পার্টি মেম্বার হলেও শেষে লাল সেলাম, অমর রহে — ওসব বললাম না।”

নবারুণের মনে হল রবীন প্রশ্নটা বুঝেও না বোঝার ভান করছে। বলল “সে কথা বলছি না। তুই ‘আমাদের আর সময় নেই, তোমাদেরই যা করার করতে হবে’ — এসব বললি কেন? তোর তো এখনো ষাটও পুরো হয়নি। ডিসেম্বরে রিটায়ারমেন্ট না?”

“হ্যাঁ। তোর দু মাস আগে,” রবীন হেসে উত্তর দেয়।

“তাহলে আবার সময় শেষ কী? দেখছিস চারিদিকে কী অবস্থা, পার্টিটা প্যাঁচে পড়েছে, আর তুই এত সিনিয়র পার্টিকর্মী, কোথায় নতুন করে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্ল্যান করবি, তা না…”

রবীন হা হা করে হেসে ওঠে। “আরে তুই কি ভাবছিস আমি পার্টি ছেড়ে দেব নাকি? কক্ষনো না। পার্টির বিপদে এখনো মিছিলের সামনে থাকব। ওটা এমনি বললাম। বয়স তো হয়েছে।”

“সত্যি কথা বল। শরীরটা খারাপ? তুই তো আবার জীবনে ডাক্তার ফাক্তার দেখাস না।”

“আরে বাবা, কিচ্ছু হয়নি। দাঁড়া একখানা বিড়ি খাই।”

পকেট হাতড়ে প্যাকেটটা বার করে রবীন। নবারুণ নিজের লাইটার দিয়ে বিড়িটা ধরিয়ে দেয়। তৃপ্তির ধোঁয়া ছাড়ার পর বেশ একটু কাশি হয় রবীনের। কাশা শেষ করে সেই আগের মত দুষ্টু হেসে বলে “একটা গান আছে না? কী একটা ব্যান্ডের গান? ‘বড় বড় গাছগুলো সব বুড়ো বলে বাদ দিও না গো।’ আমরা এখন সেইরকম। বড় গাছ, বুড়ো বলে বাদ।’”

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

One thought on “নাম তার ছিল: ১৮”

Leave a Reply