নাম তার ছিল: ১৭

পূর্বকথা: প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান হরিপদর স্ত্রীকে দাহ করতে গিয়ে রবীনের মনে পড়ে প্রয়াত হীরুদার কথা।

হীরুদার চলে যাওয়া বলরাম আর শ্যামলের জন্যে ছিল আশীর্বাদ। জেলা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে দুজনের উদ্ভাসিত মুখ, জুনিয়র কমরেডদের সাথে ঈষৎ অশ্লীল ইয়ার্কি করে হাসতে হাসতে বলরামের এর ওর গায়ে গড়িয়ে পড়া, শ্যামলের গম্ভীর থাকার চেষ্টা করতে করতে ফিক করে হেসে ফেলা — সবকিছুই জানান দিচ্ছিল ওরা জানে ওদের রাজত্ব ফিরে পেতে আর দেরী নেই।

আসলে হীরুদার মৃত্যুতে যাঁর জেলা সম্পাদক হওয়ার কথা, সেই সুব্রতদা যে লোক খারাপ তা নয়, বরং উনি নিপাট ভালমানুষ, তবে হীরুদা যেমন জেলার সব পার্টি সদস্যের মুখ চিনতেন তেমন করে উনি চেনেন না। প্রবীণ কৃষক নেতা, সর্বক্ষণের কর্মী, প্রচুর অত্যাচার সহ্য করেছেন এক সময়, জেলা অফিসেই থাকেন। সবই ভাল, কিন্তু লেখাপড়া বেশি দূর করেননি বলে বরাবর লোকটাকে হীনমন্যতায় ভুগতে দেখেছে রবীন। সেই সুযোগে ওঁর চেয়ে বয়সে ছোট, পার্টিকর্মী হিসাবে কম যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা নিজেদের ইচ্ছে মত সুব্রত মণ্ডলকে ব্যবহার করে — সে কি জেলা কমিটির অন্য সদস্যরা, কি এল সি এম, এল সি এসরা। একই কারণে সকলেই জানে উনি জেলা সম্পাদক হবেন নামেই। ওঁকে চালাবে আসলে কল্যাণপুরের এম পি রথীন রায়। সে যে কী জিনিস, সেটা কল্যাণপুরের কমরেডদের থেকে বহু আগেই শুনেছে রবীন। হীরুদাও বলতেন “কি সব লোক উঠে আসছে, রবীন! বিন্দুমাত্র সততা নেই, ক্ষমতার গন্ধে মাতাল, একেবারে মায়া দয়াহীন। অথচ কমরেডরা তো বটেই, সাধারণ লোকেও মোটের উপর একে পছন্দই করে!”

“সত্যি! পছন্দ করে? নাকি ভয় করে?”

“হ্যাঁ, কিছু লোক তো ভয়ে ভক্তি করে ঠিকই। সে না হয় সাধারণ লোকেদের কথা ধরলাম। কিন্তু পার্টি মেম্বাররা? তারা ওর দোষ ত্রুটি দেখতে পাবে না কেন?”

আপনি এই কথা বলছেন, হীরুদা! আপনি কি এই ব্যাপারটা প্রথম দেখছেন? আমাদের ওখানে বল একটা পঞ্চায়েত প্রধান, তাতেই কমরেডরা ভয়ে কাঁপে। আর রথীন রায় তো এম পি।”

“তা বটে,” হীরুদা বিষণ্ণ হয়ে বলেছিলেন। “আমাদেরই দোষ আসলে। গরীব মানুষের পার্টিকে আর গরীব মানুষের রাখা গেল না তো… এসব মৌ লোভী লোক তো উপরে উঠবেই।”

শ্যামলটা চিরকালের কূপমণ্ডূক। সবুজগ্রামের প্রধানের পদ ফিরে পেয়েই ও আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল। বলরামের উচ্চাকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। আটানব্বইয়ের ভোটে জেতার পর ও আবার প্রধান হতেই পারত, কিন্তু সে চেষ্টায় যায়নি। রথীন রায়ের কাছে দৌড়াদৌড়ি করে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছিল। আর ক্ষেত্রগ্রামের প্রধানের পদে রেখে দিয়েছিল বশংবদ কেষ্টকেই। একসাথে দুটো পদ হাতে রাখা গেল।

হরিপদর বউকে পুড়িয়ে আসার পর থেকেই সব কেমন বিস্বাদ লাগছিল রবীনের। সন্ধেবেলা হাঁটতে বেরিয়ে স্টেশনের কাছে দেখা হয়ে গেল বড়িহাটার কমরেড সুনীলের সাথে।

“রবীনদা, কই চললেন?”

“কোথায় যাওন যায় হেইডাই খুঁজতাছি”, রবীন মস্করা করে বলেছিল। “তুই কোত্থিকা?”

“এই যে, মাইয়ারে নিয়া গেছিলাম জয়েন্টের কাউন্সেলিঙে।”

আঠেরো-উনিশের মেয়েটা পেছনেই দাঁড়িয়েছিল।

“কোথায় হইল?”

“শিবপুরেই হইয়া গেছে। ওর তো ভাল র‍্যাঙ্ক আছিল। আমরা একটু নিশ্চিন্ত হইলাম। আমার গিন্নীই বেশি চিন্তা করতাছিল। মাইয়া তো, দূরে হইলে একা যাতায়াত করা…”

“মাইয়া তো কী? কিসব কথা কস তোরা? মাইয়ারা মহাকাশে যাইতাছে, আর তোরা ভাবতাছস একা কলেজ যাইতে পারব না।”

“মহাকাশে!”

“হ, সুনীতা উইলিয়ামস! ভুইল্যা গেছস? আরো আগে কল্পনা চাওলা?”

“ওসব ওদের দ্যাশে হয়। আমাগো মাইয়ারা তো অন্যরকম।”

“অন্যরকম? কই? তোর মাইয়ার তো দ্যাখতাছি দুইটা কইরা হাত, পা, চোখ, কান — সবই আছে। মাথাও ভাল, নাইলে জয়েন্টে ভাল র‍্যাঙ্ক করল কী কইরা? তাইলে অন্যরকম হইল কই?”

সুনীল নিরুপায় হেসে বলে “আপনার সাথে কথায় কি পারুম, রবীনদা? কিন্তু আপনে যা-ই কন, চিন্তা কিন্তু হয়।”

“আরে, সে তো হয়ই। কিন্তু তাই বইল্যা কি আর এদের ঘরে বসায় রাখন যায়? আমার পোলাডা দ্যাখ কোন দূরে বইস্যা আছে। তর মাইয়ারেও কি তুই আটকায় রাখতে পারবি? যদি একখান ভাল চাকরি পায়…”

এতক্ষণ মোবাইলে ব্যস্ত থাকা মেয়েটা হঠাৎ মুখর হয়ে ওঠে। “এটা একটু বোঝান তো, জেঠু। ওয়েস্ট বেঙ্গলে তো চাকরি বাকরি কিছুই নেই। এখানে পড়ে থাকলে জীবনে কিছু করা যাবে? আজকাল ব্যাঙ্গালোর, হায়দরাবাদ না গেলে কোন ফিউচার আছে? আর আমার তো ইচ্ছা বাইরে চলে যাওয়ার। আমার চেনা কতজন গেছে। বড়িহাটারই তো অনেকে ইউ এস এতে আছে।”

রবীনের কেমন একটা ধাক্কা লাগে।

“ঠিকই বলেছিস, মা। এখানে আর… চাকরি কোথায়? তবে একেবারে অন্য দেশে চলে যাবি? দেশের প্রতিও একটা দায় দায়িত্ব থাকে…”

“সে তো সবারই থাকে। কে পালন করছে?”

সুনীল মেয়েকে ধমকায় “অ্যাই! এ আবার কী কথা রে!”

রবীন ওর কাঁধে হাত রেখে বলে “আহা, বকতাছস ক্যান? কথাডায় কিন্তু দম আছে। কে দায়িত্ব পালন করতাছে? সত্যিই তো। কে করতাছে? আমরা কি আমাগো দায়িত্ব ঠিক কইরা পালন করছি?”

“আরে আপনি ছাড়েন তো, রবীনদা। আজকালকার পোলাপানদের কথাবার্তার কোন ছিরিছাঁদ নাই।”

ফুঁসতে থাকা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রবীন বলে “যাকগে, তোরা বাড়ি যা। সারাদিনের পরে বাড়ি ফিরতাছস, অনেক দেরী করায় দিলাম।”

রবীন ওদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। স্টেশন রোড ছেড়ে বাঁদিকে ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে ঝিলের ধারে শহীদ বেদিটার সামনে আড্ডা মারছে পার্টির ছেলেরা। একজন চড়ে বসে আছে। তার দু পায়ের ফাঁক দিয়ে ফলকটা দেখা যাচ্ছে। চশমাটা সঙ্গে নেই, চোখ কুঁচকে রবীন শুধু পড়তে পারল “আমরা তো ভুলি নাই শহীদ”। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে সবুজগ্রাম কলেজে ক্লাসে ঢুকে পাগলা সুরেন আর তার দলবল বার করে নিয়ে গিয়েছিল বিপ্রদাস পালকে। তারপর কলেজের মাঠে দাঁড় করিয়ে গুলি করেছিল। তারিখটা মনে আছে। ২২শে জুলাই, ১৯৭৪। এই বেদিটা তৈরি করা হয়েছিল আশি সালে। প্রত্যেক বছর ২২শে জুলাই এখানে লাল পতাকা তোলা, স্মরণসভা হয় যথারীতি। বাইশ তারিখ এসে গেল।

ভারত সেবাশ্রমের পাশ দিয়ে বাড়ির পথ ধরল রবীন। রিডিং ক্লাবের সামনে দেবু ঘোষের দোকানে বসেছিল অবনী। রবীনের চোখে চোখ পড়তেই চোরের মত চোখ নামিয়ে নিল। আসলে ওর প্রাণের বন্ধু, সমাজবিরোধী জগা বড়িহাটার এক ডি সি এমের অভয় পেয়ে কয়েক মাস হল সবুজগ্রামে ফেরত এসেছে। অবনীরও আর গলাগলি করতে বাধা নেই। গত রবিবার জগার ছেলের জন্মদিনে এলাহি খাওয়াদাওয়া, মদ্যপান করেছে অনেক সি পি এম নেতা, কর্মী। অবনী একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল। বমি টমি করে একসা কাণ্ড। ওর গিন্নী রবীনকে এসে জানানোর পর রবীন গিয়ে অবনীর কান মুলে দিয়ে এসেছে। অবনীর বউ রবীনের পা ধরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছে ও আর জগার সাথে মিশবে না, মদও ছোঁবে না। কিন্তু এই ভর সন্ধেবেলা দেবু ঘোষের দোকানে যে ও এগ রোল খাবে বলে বসে নেই, সেটা রবীন ভালই জানে।

সেদিন সন্ধের পর থেকেই ভীষণ গুমোট। দুবার স্নান করার পরেও ঘুম আসছিল না রবীনের। ভাবছে উঠে একটা বিড়ি খাবে, এমন সময় কলিং বেলটা বেজে উঠল। রবীন ভেবেছিল জোনাকি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু বেলটা বাজতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে বলল “কি গো? এত রাতে কে!” রবীন ধীরে সুস্থে উঠতে না উঠতেই আরো দুবার বাজল, সেই সঙ্গে দু তিনজনের উদ্বিগ্ন ডাক “রবীনদা, রবীনদা। রবীনদা জেগে আছেন?” দুজনেই বিছানা ছেড়ে উঠে দৌড়ল।

বারান্দার আলোটা জ্বেলে রবীন দ্যাখে স্কুলপাড়া, মানে রিডিং ক্লাবের পাড়ার কমরেড কমল দাঁড়িয়ে, সাথে ও পাড়ার দুই দোকানদার। পানওয়ালা ছেলেটার কানের পাশ দিয়ে রক্ত পড়ছে, ঠকঠক করে কাঁপছে। জোনাকি তাড়াতাড়ি চাবিটা এনে তালা খুলতেই ছেলেটা ধপ করে বারান্দার মাটিতেই বসে পড়ল। কমল আর অন্য দোকানদার ছেলেটা কোন মতে তুলে এনে ঘরের চেয়ারে বসাল ওকে। মনে হল অজ্ঞান হয়ে যাবে যে কোন সময়। “জল দাও, জল দাও,” রবীন জোনাকিকে বলে। “আর তুলো।”

রক্তপাত কমলে, ছেলেটা ধাতস্থ না হতেই কমল বলে “ওরা এখানে থাক, রবীনদা। আপনি চলুন শিগগির।”

“কোথায় রে?”

“আমাদের পাড়া। জগা দলবল নিয়ে এসে তাণ্ডব করছে। দোকানপাট, লোকের বাড়ি — সব ভাঙচুর করছে। এ বেচারার কানটা একটুর জন্যে বেঁচে গেছে। সোর্ড তুলেছিল।”

“কেন? এ আবার কী দোষ করল? এ ছেলেটা তো ভাল বলেই জানি!”

অন্যজন বলে “ওর কোন দোষ নেই, দাদা। সামনে পড়ে গিসল আর কি।”

“কিন্তু ওরা হঠাৎ এসে গোলমাল করছে কেন?”

“আপনাকে যেতে যেতে বলব সব। আপনি চলুন। একটা খুনটুন করে বসবে নাইলে।”

“আচ্ছা চ।” রবীন লুঙ্গির উপর ফতুয়াটা গলিয়ে নেয়।

“এ কি! তুমি একা একা এর মধ্যে যাচ্ছ?” জোনাকি প্রশ্ন করে।

“কোথায় একা?” রবীন খুব বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়। “কমল আছে তো।”

“কিন্তু পুলিসে একটা খবর দেয়া দরকার না? আমরা ফাঁড়িতে গেছিলাম। ওরা তো নড়েই বসল না। ফাঁড়ি থেকে বোম চার্জ করার আওয়াজ কিন্তু পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।”

“অ। জোনাকি ওকে একটু ফোনের ডায়রিটা দাও তো,” রবীন অন্য দোকানদারকে দেখিয়ে দেয়। “সত্যেনকে ফোন কর। বলবি এই ঘটনা, রবীনদা আপনাকে বলতে বলল, এক্ষুণি যেন মদনপুর থানা থেকে ফাঁড়িতে ফোন করে ধাতানি দেয়।”

সাইকেলে দক্ষিণপাড়া থেকে স্কুলপাড়া মিনিট সাতেক। তার মধ্যেই কমল রবীনকে জানাল দেবু ঘোষের দোকান বন্ধ করার সময়ে জগার দলের কয়েকজন এসে মদ চেয়েছিল। তাতে দেবুর ছেলে পল্টু বলে এখন দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, আর দেওয়া যাবে না। ব্যাস! তাতেই কথা কাটাকাটি, তারপর হাতাহাতি। আশপাশের দোকানদাররা জগার ছেলেগুলোকে তাড়া করেছিল বলে ওরা পালিয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে বোধহয় মোবাইলে খবর চলে গেছে জগার কাছে। সে নিমেষের মধ্যে আরো বড় দল নিয়ে সশরীরে হাজির। লাঠিসোটা, তলোয়ার, চাকু, পেটো, বন্দুক — কিচ্ছু বাদ নেই। লোকের বাড়ির জানলা, দরজাও ভাঙছে।

পৌঁছে রবীন দেখল কমল যা দেখে গিয়েছিল অবস্থা তার থেকেও খারাপ। বাবুরা উল্লাসে শূন্যে গুলি ছুঁড়ছেন। লোকে ভয়ে উপুড় হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে। পল্টুকে ল্যাম্পপোস্টের সাথে বেঁধে এলোপাথাড়ি লাথি, ঘুঁষি মারছে জগা স্বয়ং। ওর সাঙ্গোপাঙ্গরা দোকানগুলোর মালপত্র রাস্তায় ছত্রখান করে নষ্ট করছে। সব্জিওয়ালা খালেক এক কোণায় বসে চিৎকার করে কাঁদছে। বোধহয় ওর পায়ে কোপ টোপ মেরেছে। রক্তে ভাসাভাসি। কমলকে ওকে সামলাতে বলে রবীন জগার দিকে এগিয়ে গেল।

“অ্যাই হতভাগা,” বলে ওর কানটা টেনে ধরে মাথাটা ঘুরিয়েই এক থাপ্পড়। জগা এতটাই মত্ত ছিল যে “কে রে, কে রে” বলে উঠেছিল। রবীন তখন চুলের মুঠি ধরে আরো কয়েকটা চড় মারতে মারতে বলে “আমি রে। এই দ্যাখ, আমি। আমি, তোর অকম্মার ঢেঁকি মাস্টারমশাই। কী করবি? হাত কাটবি, পা কাটবি, না জানে মারবি? মার শালা, মার।”

ততক্ষণে জগার সম্বিত ফিরেছে। টলতে টলতে হাত জোড় করে বলে “ভুল হয়ে গেছে, স্যার। ভুল হয়ে গেছে। মাপ করে দিন। অ্যাই, থাম সব। কী হচ্ছে কি?”

ওর শাগরেদরা ধমক খেয়ে বিরক্ত, কিন্তু প্রতিবাদও করতে পারছে না। দিব্যি মজায় ভাঙচুর, লুটপাট চলছিল; এমন রসভঙ্গ কার ভাল লাগে? কিন্তু মনিবকে তো অগ্রাহ্য করা যায় না। একজন তো বিরক্তি সামলাতে না পেরে বলেই ফেলল “এ কে বে? এটাকে এত তোল্লাই কিসের, জগাদা? একটা রদ্দা মারলে হিসি করে দেবে শালা…” কথা শেষ করতে না দিয়ে ওর মাথায় চাঁটি মারে দলের একজন। ধমকায় “চুপ কর। মাস্টারমশাই। চিনিস না যখন, চুপ করে থাক, বাঞ্চোদ।”

ততক্ষণে সাহস পেয়ে যে ব্যবসায়ীরা লুকিয়ে পড়েছিল বা কাঠ হয়ে বসেছিল, তারা হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। জগাদের চোখে ভয় দেখতে পায় রবীন। ওর হাতটা কোমরের দিকে যেতে দেখেই খপ করে ধরে ফেলে। “আর একটা গুলি যদি তোরা কেউ চালাস, জগা। তোর প্রাণের গ্যারান্টি আমি দিতে পারব না কিন্তু। এতক্ষণ অনেক অত্যাচার করেছিস, লোকে কিন্তু ভীষণ রেগে গেছে। চুপচাপ চলে যা এখান থেকে।”

গোঁয়ার মস্তান বলে “আচ্ছা, আমিও দেখে নেব। আমার নাম শুনলে সবাই কাঁপে, আর আমার ছেলেরা মদ চাইলে মদ দেবে না? এত বড় আস্পদ্দা!”

“আবার কথা?” রবীন চড় তোলে। জগা পিছিয়ে যায়, শাগরেদদের ইশারা করে গাড়িতে উঠতে। টলতে টলতে টাটা সুমোটার স্টিয়ারিঙে গিয়ে বসে। বাইক বাহিনীর একজন স্টার্ট দিতে দিতে কাউকে একটা গালাগাল দিচ্ছিল, তিন চারজন ব্যবসায়ী ঝাঁপিয়ে পড়ে তার উপরে। জগার দলবল আবার শুরু করতে যাচ্ছিল, লোকে ঘিরে ধরে মারা শুরু করে। তাই দেখে কয়েকজন তড়িঘড়ি চম্পট দেয়, জগা সুমোয় বসে হুঙ্কার দেওয়ার বেশি সাহস করে না। মারের চোটে ছেলেগুলো মরেই যেত হয়ত, রবীন আর কমল মাঝে পড়ে আটকায়। অনেক কষ্টে শেষ অব্দি ওদের বিদায় করা যায়। যাওয়ার সময়ে অবশ্য একজন কয়েকটা পেটো চার্জ করে যায়।

ওরা চলে যেতেই রবীনের খেয়াল হয়, এই এলাকার পার্টি কমরেডরা এতক্ষণে জড়ো হয়েছে। প্রথমে ইচ্ছে করে শালাদের জোর ধমকাতে। যখন এই নেত্য শুরু হয় তখন এরা কোথায় সেঁধিয়েছিল? শেষ অব্দি তা না করে রবীন বলে “যার যার লেগেছে সব হেলথ সেন্টারে নিয়ে যা। আর তোদের প্রধানকে, আরো সমস্ত নেতাদের খবর দে।” একজন পল্টুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে “একেও নিয়ে যাব তো, রবীনদা?”

রবীন এতক্ষণে পল্টুর দিকে ভাল করে তাকানোর ফুরসত পায়।

“এই শুয়ারটাকে? এটাকে উচিৎ ছিল জগার হাতেই ছেড়ে দেয়া। কিন্তু আমরা তো মানুষ। তাই পারলাম না। আমি আবার এটারও মাস্টারমশাই। শালা ঘেন্না হয় নিজের উপরে। যা, নিয়ে যা এটাকেও।”

ব্যবসায়ীরা রবীনকে অনুরোধ করে ওদের সাথে ফাঁড়িতে যেতে, ডায়রি করতে। রবীন রাজি হল। ইতিমধ্যে এসে পড়ল বলরাম, ওর ভাই এবং অন্য তালেবররা। এসেই হম্বি তম্বি, জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। রবীনকে কমল বলল “এদিকে চলে আসেন, রবীনদা। আমরা একটু বসি। এর মধ্যে আমাদের কী কাজ?”

“ঠিক কথা। চল।”

দুর্গাবাড়ি, মানে যে বাড়িতে ফি বছর দুর্গাপুজো হয়, তাদের রোয়াকে বসে পড়ল দুজনে। জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে ও বাড়ির মাসিমা বললেন “ঠাকুরপো এট্টু চা খাবা নাকি?”

রবীন বলল “তেষ্টা তো পাইতাছে, কিন্তু এই মাঝরাতে আপনারে কষ্ট দিমু?”

“আরে কিচ্ছু কষ্ট নাই। আমরা তো ঘুমাইতে পারতাছিলাম না। কত্তা, পোলা, বউমা — সক্কলে জাইগ্যা আছে। তোমরা খাইলে আমরাও খামু এক কাপ কইরা।”

কমল বলল “চাপিয়ে দিন, মাসিমা।”

দুর্গাবাড়িতে চা খেতে খেতেই একজন এসে ডাকল “রবীনদা, ফাঁড়িতে ডেপুটেশন দিতে যাওয়া হচ্ছে। শ্যামলদা আপনাকে খুঁজছে।” যাওয়া হল।

ফাঁড়ির সামনে মিটিঙে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিল বলরাম আর শ্যামল। ফাঁড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে কী করে সমাজবিরোধীরা এইভাবে দাপাদাপি করতে পারে, জগার নামে এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কী করে সে জেলের বাইরে, এত অস্ত্র কোথা থেকে জোগাড় করল, প্রশাসন ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে আছে কেন — এইসব চোখা চোখা প্রশ্ন ছোঁড়া হল। দুজনেই অনেক করে রবীনকে বলতে বলেছিল। ও কিছুতেই রাজি হল না, বলল শরীরটা ভাল নেই।

মিথ্যে কথা। এক ঝুড়ি মিথ্যে বলা এড়ানোর জন্যে একটা ছোট্ট মিথ্যে।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply