নাম তার ছিল: ১৬

পূর্বকথা: আমলকিতলায় রাস্তা থেকে তুলে আনা পাথরকে দেবতা বানিয়ে ধর্ম ব্যবসা চলছিল। সে পাথর আসন থেকে ফেলে দিয়ে, হাজিপাড়াকে দায়ী করে দাঙ্গা লাগানোর আয়োজন চলছিল। শেষ মুহূর্তে সব ভেস্তে দিল রবীন।

“কাজটা আপনি ভেবে চিন্তে করেছেন তো, মাস্টারমশাই?” পাগল মহারাজ বিড়ি খেতে খেতে জিজ্ঞেস করেছিলেন। “সাধারণ লোকে এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করবে না, কিন্তু আপনার কমরেডরা জল ঘোলা করবেই। আপনি দেখে নেবেন।”

“তা আপনি ঠিকই বলেছেন। এটাকে পার্টির আদর্শের বিরোধী কার্যকলাপ বলে চালানোর একটা চেষ্টা তো হবেই। এমন সুযোগ কেউ ছাড়ে?” রবীন মৃদু হেসে বলেছিল।

“আপনি হাসছেন? আমার তো বেশ চিন্তাই হচ্ছে আপনার জন্যে। সত্যিই তো। একটা রাস্তা থেকে তুলে আনা পাথরকে ভগবান বানিয়ে দিয়ে ধর্ম ব্যবসা চলছিল। সেটা যে করেই হোক বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল, আর আপনি কিনা পাথরটাকে আবার নিজের জায়গায় বসিয়ে দিলেন? এটা অন্ধ বিশ্বাসকে প্রশ্রয় দেওয়া হল না?”

রবীন জানত পার্টি মিটিঙেও ঠিক এইভাবেই আক্রমণটা আসবে। এবং উত্তরও তার তৈরি ছিল। তাই সে আরো চওড়া হাসি হেসেছিল। পাগল মহারাজও হাসতে হাসতে বলেছিলেন “এখন যতই হাসুন। এ প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দিতেই হবে। ঝোঁকের মাথায় একটা কাজ করে ফেলেছেন… পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিকই করেছেন। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির লোক হিসাবে এই কাজটার সমর্থনে আপনি কী যুক্তি দেবেন?”

রবীন স্বীকার করেছিল, যে গণ্ডগোলের খবরটা পেয়ে কিচ্ছু মাথায় আসছিল না কী করা উচিৎ। শুধু মাথায় ছিল, যে করেই হোক দাঙ্গা লেগে যাওয়া আটকাতে হবে। ওখানে পৌঁছে পরিস্থিতি দেখে মনে হয়েছিল আটকানো অসম্ভব, অনেক দেরী হয়ে গেছে।

“কিন্তু যেই চোখ গেল এক ধারে পড়ে থাকা পাথরটার দিকে, তখনই মনে হল, হ্যাঁ, একটাই রাস্তা আছে — পাথরটাকে যথাস্থানে বসিয়ে দেয়া। তাতে যদি লোকে একটু ঠান্ডা হয়। তবে সেটা করব বলে ভেবেও নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। আপনি যে প্রশ্নটা করলেন আমার মাথাতেও সেটাই ঘুরছিল। তারপরই মনে পড়ল লেনিনের কথা। ব্যাস! আর এক সেকেন্ডও ভাবিনি।”

“লেনিন!”

“হ্যাঁ। লেনিন বেশ কিছু বক্তৃতায় ধর্মের প্রশ্নে বলেছেন। লিখেছেনও। উনি পরিষ্কারই বলেছেন শ্রেণীসংগ্রামের দিকে মানুষকে আকর্ষণ করাই পার্টির প্রধান কাজ। তা না করে লোকের ধর্ম কত বড় ভাঁওতা, ধর্ম মানুষের কী কী ক্ষতি করে, সেসব নিয়ে বেশি বক্তৃতা ঝাড়লে মানুষের উল্টে ধর্মের প্রতি টান বেড়ে যাবে, অন্ধ বিশ্বাস আরো জাঁকিয়ে বসবে।”

পাগল মহারাজ মিটিমিটি হাসছিলেন, যেন বিশ্বাস হয়নি।

“ভাবছেন বানিয়ে বলছি? আচ্ছা পরের দিন নিয়ে আসব বইটা,” রবীন বলেছিল।

“না না, বানিয়ে বলবেন কেন? এঙ্গেলসও তো ধর্ম সম্পর্কে একই রকম বলেছেন। লেনিন এঙ্গেলস থেকে কোট করেও দেখিয়েছেন যে ধর্মের বিরুদ্ধে প্রচারে জোর দেওয়াটা অতি বাম প্রবণতা। আর তাতে যা হয়, সেটা হল মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করার সুবিধে হয়ে যায়। এই জন্যেই নিরীশ্বরবাদী প্রচারে জোর দেওয়া অনর্থক। তার চেয়ে প্রোলেতারিয়েতের মধ্যে শ্রেণীচেতনা জাগিয়ে তোলা অনেক বেশি জরুরী।”

“নিশ্চয়ই। এঙ্গেলস সেই পারী কমিউনের পর ফ্রান্স থেকে লন্ডনে পালিয়ে যাওয়া ব্লাঙ্কিপন্থীদের তো এই নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন।”

কথাটা বলেই রবীনের খেয়াল হয়েছিল পাগল মহারাজ লেনিন পড়েছেন বলছেন! অমনি ও চেপে ধরে।

“আপনার সাথে আলাপ হওয়ার পরে পরেই একদিন আপনার কথা শুনে বুঝেছিলাম আপনি আমাদের পার্টির ব্যাপারে যথেষ্ট খবর রাখেন। কী করে সেটা আপনি বলেননি, আমারও আর পরে জিজ্ঞেস করার কথা খেয়াল হয়নি। শুধু বলেছিলেন সব সাধুরই একটা অতীত থাকে। কিন্তু এইমাত্র যা বললেন, এরপর তো সেই অতীতটা না জেনে আর থাকা যাচ্ছে না, মহারাজ।”

মহারাজ জিভ কেটে বলেন “ওসব জানতে চাইবেন না। সন্ন্যাসীদের পূর্বাশ্রমের কথা শুনলে পাপ হয়।”

“ধুর। পাপের দোহাই দিয়ে আপনি আমায় আটকাতে পারবেন মনে হয়? বলে ফেলুন, বলে ফেলুন। আজকে আমি ছাড়ছি না। হোস্টেলে প্রেয়ারের সময় হয়ে গেলেও উঠব না কিন্তু।”

রবীনের হুমকিতে এক গাল হেসে পাগল মহারাজ আরেকটা বিড়ি চেয়েছিলেন। সেটা ধরিয়ে বলেন “দেখুন, আপনি জোর করলেন বলেই বলছি। আপনার কিন্তু ভাল লাগবে না। আমাকে খুন টুন করে দেবেন না যেন।”

“হাফপ্যান্ট ছেড়ে ফুলপ্যান্ট আর রাজনীতি একসাথে ধরেছি, বুঝলেন? চামড়া এই মোটা না করতে পারলে অ্যাদ্দিন রাজনীতি করছি? আবার কত বছর প্রশাসনেও ছিলাম ভেবে দেখুন।”

“আচ্ছা শুনুন,” মহারাজ বলতে শুরু করেছিলেন। “আমাদের আদি বাড়ি সিলেট। দেশ ভাগের পর বাবা জ্যাঠারা এসে শিলচরে জমিয়ে বসেছিল। কিন্তু ষাট-একষট্টি সালে সেই যে বাঙালি বনাম আসামী লেগে গেল, সেই সময় ওখানকার পাট উঠিয়ে চলে আসতে হল কলকাতা। আমি তখন বছর দশেকের ছেলে। কলকাতায় এসে জ্যাঠার কোন কাজ না জুটলেও বাবা একটা সদাগরি আপিসে চাকরি পেয়েছিল। ফলে আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি দিব্যি থিতু হয়ে গিয়েছিল। বাবা, মা, আমরা তিন ভাই এক বোন, আর জ্যাঠা জেঠি, আমার জ্যাঠতুতো দাদা আর দিদি। মণ্ডা মিঠাই না জুটলেও, ডাল ভাত জুটে যাচ্ছিল… যাদবপুরে এক পরিচিতের বাড়ি ভাড়া থাকতাম আমরা। কিন্তু সুখ টিকল না। শোনা গেল বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ।”

“নকশাল হয়ে গেলেন?” রবীন চমকে উঠেছিল।

“আমি না। আমার বড়দা, মানে জ্যাঠার ছেলে। আমাদের পরিবারের সবাই সাতেও নেই পাঁচেও নেই টাইপ, বুঝলেন? খেলাম, দেলাম, ঘুমোলাম, লেখাপড়ার বয়সে লেখাপড়া করলাম। ব্যাস! দুনিয়াটা চুলোয় যাক। আমিও তাই। একমাত্র বড়দারই এদিকে নজর, সেদিকে নজর। কোন ছেলের লেখাপড়া করার পয়সা নেই, কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না — এইসব আর কি। লেখাপড়ায় ভাল ছিল বলে বাবা, জ্যাঠা ওকে কিছু বলত না। কী করে বেড়ায় সারাদিন তাও জানতে চাইত না। যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে তখন ও খুব জনপ্রিয় ছেলে। বাড়িতে আর কারো সাথে দরকার ছাড়া কথা বলত না, শুধু আমার মাথাটা খেত। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন, মাও — সবই বড়দাই আমায় ধরিয়েছিল।”

পাগল মহারাজের গল্পটা যেন মাঝখান থেকে শেষ হয়ে গেল। নীরবে বিড়ি টানতে লাগলেন। এসব গল্প যে মধুরেণ সমাপয়েৎ হয় না সেকথা সবাই জানে, রবীন তো জানত বটেই। তবু, কেন কে জানে, শেষ অব্দি না শুনেও থাকা যায় না। মহারাজকে খোঁচাতে খারাপই লাগছিল, নিজেকে ধর্ষকাম মনে হচ্ছিল। তবু রবীন বলে ফেলেছিল “সুখ টিকল না বলছিলেন?” মহারাজের মুখ দেখে মনে হল না উনি নতুন করে ব্যথা পেলেন।

বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতেই বললেন “বড়দার প্রভাবে, ওসব পড়ে টড়ে আমারও ইচ্ছে হয়েছিল নেমে পড়তে। কিন্তু আমি ভীতু ছেলে, আমার পরিবারের মতই। সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। তবে আমার এই ভালমানুষের মত মুখটার সুযোগ নিয়ে আমি এ পাড়া সে পাড়ায় খবর চালাচালিটা করতাম। ফলে কে কাকে কিভাবে সংশোধনবাদী দাগিয়ে দিল, কারা আগুনে বিপ্লবী থেকে রাতারাতি সংসদীয় পথে বিশ্বাসী হয়ে গেল — সেসব আমি নিজের চোখেই দেখেছি। আর সেইসঙ্গে… আপনার পার্টির ছেলেদের হাতে আমার বড়দার খুন হওয়া… সেটাও নিজের চোখেই দেখেছি। দেখার কথা ছিল না, কিন্তু লুকিয়ে দেখে ফেলি।

“এমন হতভাগা আমি, ওর সঙ্গে মরার সাহস ছিল না, ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছিলাম। আপনার খুনে কমরেডরা দেখতে পায়নি। তা পরিবারগুলো এসব ক্ষেত্রে যা করে আর কি। আরো বেশি করে পালানোর সুযোগ করে দেয়। আমার পরিবারও তাই করেছিল। মায়ের এক মামা বেলুড়ে রামকৃষ্ণ মিশনের কলেজটার অধ্যাপক ছিলেন, মঠের কাছেই বাড়ি। আমাকে ওনার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল, উনি আমায় নিজের কলেজে ভর্তি করে নিলেন। তারপর কালে কালে… এই যা দেখছেন।”

রবীন মাথা নীচু করে ছিল অনেকক্ষণ। বহুকাল পরে মুন্নার কথা, এবং অবশ্যই মুনিয়ার কথা, মনে পড়ছিল। গলামনের পাড়ে বসে শীতের বিকেলের ভারী হাওয়ায় মনে হচ্ছিল কান পাতলে মুন্নার গলায় ভেসে আসবে “আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই / স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের চিতা আমি তুলবই।” পাগল মহারাজ বিড়িটা শেষ করে পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন “আমি কিন্তু আপনাকে দোষারোপ করছি না মাস্টারমশাই।”

রবীন উত্তর দিয়েছিল “আপনি না করলেই বা, দায় তো এড়ানো যায় না। ভ্রাতৃহত্যার দায়।”

“আপনি তাই মনে করেন বুঝি?”

“নিশ্চয়। লাল পতাকার নামে যারা যারা শপথ নেয়, সবাইকেই একই পথের পথিক মনে করি।”

“কিন্তু এক হওয়ার চেষ্টা কোথায়? আপনার পার্টির চোখে তো বামফ্রন্টের বাইরের বামপন্থী মানেই শত্রু।”

“সেই জন্যেই তো তিনটে রাজ্যের বাইরে বেরোতে পারছি না। বামপন্থীরা কেউই পারছে না। উল্টে যে জায়গাগুলো আমাদের শক্ত ঘাঁটি ছিল, সেগুলোও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এক হতেই হবে, মহারাজ। বামপন্থীদের সব্বাইকে এক জায়গায় আসতে হবে। নইলে উপায় নেই।”

পাগল মহারাজ কথাটাকে খুব একটা আমল দিলেন না মনে হয়েছিল রবীনের। কিছুটা হালকা মেজাজেই ও বলেছিল “আমার জীবদ্দশায় যদি সে দিন আসে, আপনাকে এই আশ্রম থেকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাব। আপনি তো আমাদেরই লোক।”

“রক্ষে করুন। সেই যে পালিয়ে এসেছিলাম, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্তই করে যাচ্ছি। আমি মোটেই লড়াকু নই। তাছাড়া এত বছর ধরে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ যা পড়লাম, তাতে মার্কসবাদে আমার যে সেই তখনকার মত বিশ্বাস আছে তা বলতে পারব না। আমি বড় জোর ভাল কাজে সমর্থন দিতে পারি। তেমন তেমন অবস্থায় পলাতক কমিউনিস্টদের লুকিয়েও রাখতে পারি। কিন্তু আমার জায়গা আশ্রমেই, পার্টি অফিসে নয়।”

যে কথা একজন সন্ন্যাসী নিজে নিজেই বুঝে গিয়েছিলেন, সে কথাটাই কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের বোঝাতে রবীনকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। শ্যামল আর বল দাঁত নখ বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল রবীন আর হরিপদর উপরে। “দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে এলাকার শান্তি বিনষ্ট করার দায় স্বীকার করতে হবে” — এই মর্মে লোকাল কমিটির মিটিঙে নিন্দা প্রস্তাব এনেছিল ওরা। সঙ্গে রবীনের বিরুদ্ধে পার্টিবিরোধী কার্যকলাপ এবং অন্ধ বিশ্বাসে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ। আলোচনায় অবশ্য দাঁড়াতে পারেনি। রবীন নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তছনছ করে দিয়েছিল সহজেই। হরিপদ আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে গিয়ে একটু মাথা গরম করে ফেলেছিল, শেষ পর্যন্ত সামলে দেয় আমলকিতলার সেই কমরেড। ছেলেটা এমনিতে খুব ডাকাবুকো বলে অভিযোগ নেই, কিন্তু হরিপদ কোণঠাসা হয়ে গেছে দেখেই সে খুব জোর দিয়ে বলে উঠেছিল “আমার পরিষ্কার মনে আছে হরিদার সঙ্গে যখন ঐ পাথরটা নিয়ে কথা হল, তখন ওখানে আমরা পার্টি সদস্যরা ছাড়া আর কেউ ছিল না। তাহলে হরিদা এলাকার শান্তি ভঙ্গ করার সুযোগটা পেল কখন? কথাটা এলাকার লোকের কানে গেল কী করে? একটা তদন্ত হোক পার্টির পক্ষ থেকে, বার করা হোক কোন পার্টি সদস্য কাণ্ডটা করেছে?”

এই কথায় কয়েকজন গলা মেলাতেই বিপদ বুঝে এল সি এস শ্যামল ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। “একজন পার্টি সদস্যের বিরুদ্ধে পার্টিবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এসেছে। সেটা নিয়ে এগোনো অনেক বেশি জরুরী। যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। কে কাকে লাগিয়েছে, কেন লাগিয়েছে — এ সমস্ত ফালতু ব্যাপারে তদন্ত করার সময় লোকাল কমিটির নেই।”

“তাহলে কি রবীনদার বিরুদ্দে তদন্ত করবেন? কিসের তদন্ত, ভাই?” ওর কথা শেষ হতে না হতেই রুখে উঠেছিল শিবু মণ্ডল। “সেদিন সকাল থেকে আপনাদের কাউকে তো ডাকতে বাকি রাখিনি। আপনি আর বলদা তো ওদিক মাড়ালেন না। আর কেষ্টদা গিয়েচিল, দুটো খিস্তি খেয়েই এমন গায়ে লেগে গেল যে কেটে পড়ল। রবীনদা লেনিন কী বলেচেন, এঙ্গেলস কী বলেচেন — সেসব বললেন। আমি অত জানি না, কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখা জিনিস, রবীনদা সেদিন এই এলাকায় দাঙ্গা বেধে যাওয়া আটকে দিয়েচেন। অতএব যা করেচেন বেশ করেচেন। পার্টি যদি মনে করে এইটা পার্টির বিরোধী কাজ, তা’লে পার্টির মাথা খারাপ হয়ে গেচে।”

এই কথা বলতেই বল, শ্যামল আর ওদের সাঙ্গোপাঙ্গরা বাঘের মত লাফিয়ে ওঠে। দুই দল কমরেডের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। রবীন আর ফাল্গুনী ঠান্ডা মাথায় গণ্ডগোল থামানোর অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোন ফল হয়নি। শেষ অব্দি শ্যামল, বলই পিছু হটে। নিন্দা প্রস্তাব নিয়ে আর ভোটাভুটির মধ্যে যায় না, রবীনের বিরুদ্ধে অভিযোগও প্রত্যাহার করে।

বল আর শ্যামলের প্রতিহিংসা রবীনের কোন ক্ষতি করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু হরিপদকে তাড়াতে পেরেছিল। পঞ্চায়েত ভোটের প্রার্থী তালিকা ঠিক করার আগেই হরিপদ বলে দিয়েছিল, ও আর দাঁড়াবে না। অনেকেই খুশি জেনেও রবীন জিজ্ঞেস করেছিল “কেন গো?”

“হেডমাস্টার হওয়ার পরীক্ষা দিয়েছিলাম, রবীনদা। অ্যাপয়েন্টমেন্ট হয়েছে সেই টালিগঞ্জের একটা স্কুলে। আসতে যেতেই কতটা সময় যাবে। তার উপর হেডমাস্টারের তো হাজারটা কাজ। আপনি নিজে স্কুলে আছেন, বোঝেনই তো।”

রবীন নীরবে মাথা নেড়েছিল। হীরুদার কানে গেলে হরিপদকে ডেকে পাঠাতেন। এক ধমক দিয়ে বলতেন “তুমি পার্টিকে না জানিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলে কেন? তুমি পার্টিকর্মী। পার্টি ঠিক করবে তুমি ভোটে দাঁড়াবে কি দাঁড়াবে না।” হরিপদ যতক্ষণ উত্তর হাতড়াচ্ছে ততক্ষণ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকতেন, তারপর বলতেন “যাকগে, দিয়েছ দিয়েছ। স্কুলগুলোতেও তো ভাল কমরেড দরকার। ওটা ছাড়তে হবে না। কিন্তু ভোটে দাঁড়াতে হবে। নাহয় অন্য কাউকে প্রধান করে দেব, তোমায় পঞ্চায়েত সমিতিতে পাঠাব। কয়েকটা ফালতু লোকের জন্যে তোমার মত একজন কমরেড প্রশাসন ছেড়ে দেবে কেন? এ সমস্ত এসকেপিজম আমি অ্যালাউ করব না। কমিউনিস্ট পার্টি করতে এসেছ, লড়তে শেখো।”

কিন্তু হীরুদা তখন আর নেই।

মৃত্যু ভাল মন্দ অনেক কিছু মনে করিয়ে দেয়। হরিপদর বউয়ের ২০০৭ এ ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, এই মারা গেল। শ্মশানে হরিপদর পাশে বসে থাকতে থাকতে রবীনের মনে পড়ছিল আটানব্বইয়ের সেইসব দিন, আর হীরুদার চলে যাওয়ার কথা।

তখন শীতকাল। ততদিনে ব্যস্ততা অনেক কমে গেছে, তাই রবীন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে, সকাল সকাল ওঠে। বারান্দায় বসে দাঁত মাজছিল, কুয়াশা ফুঁড়ে বেরিয়ে এল ফাল্গুনী।

“কী রে? এত ভোরে তুই!”

“মইদুলদা ফোন করেছিল…”

শুনেই উঠে পড়েছিল রবীন। হীরুদা এক সপ্তাহ ভেন্টিলেশনে ছিলেন। জানাই ছিল বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা কম। মইদুল হাসপাতালে রাত জাগছিল। ও জানে ফাল্গুনীর বাড়িতে ফোন করলেই সবচেয়ে তাড়াতাড়ি রবীন খবরটা পাবে। চট করে মুখ ধুয়ে নিয়ে রবীন বেরিয়ে পড়েছিল ফাল্গুনীর সাথে।

“কখন হল রে?”

“দুটোর সময় মারা গেছেন। মইদুলদা বলল ‘তোরা হীরুদার বাড়িই চলে যা। ছটায় বডি রিলিজ করে দেবে, আমরা সাড়ে সাতটা আটটায় পৌঁছে যাব।”

“হুম।”

“ওখানে নিয়ারেস্ট শ্মশানটা কোথায়, রবীনদা?”

“শ্মশান কী হবে? হীরুদার তো দেহ দান করা আছে।”

বাড়ির সামনেই দুটো টেবিল জুড়ে শোয়ানো হয়েছিল দেহটা, মাথার কাছে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে হীরুদার একমাত্র আত্মীয় — ঐ বাজারের চা ওয়ালা নন্দ। দিন পনেরো আগে যেদিন হীরুদা প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হল, সেদিন থেকে দোকানে তালা ঝুলিয়ে ও আর ওর বউ হাসপাতালেই পড়ে ছিল দিন রাত। আটটা বেজে গেলেও বাজার বসেনি সেদিন, ক্রেতা বিক্রেতা সবাই হীরুদাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। রবীনকে দেখে মইদুল এগিয়ে এল।

“সবাই খবর পেয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ। এখান থেকে জেলা অফিস যাবে, সেখান থেকে আলিমুদ্দিন। তারপর পিজিতে বডি দিয়ে দেয়া হবে।”

রবীন মাথা নেড়ে হীরুদার দিকে এগিয়ে যায়। কি চমৎকার দেখাচ্ছে সাদা ধুতি পাঞ্জাবিতে! যেমনটা চিরকাল ওঁকে দেখে এসেছে সবাই, ঠিক তেমনটাই। চশমাটাও ভারী যত্ন করে পরিয়ে দিয়েছে কেউ। হয়ত নন্দর বউই। রবীনের মনে হল এখুনি পাশ ফিরে চোখ খুলবেন হীরুদা। ওকে দেখেই বলবেন “আরে! তুমি এসে গেছ? অনেক বেলা হয়ে গেল, না? ঘড়িটা বিগড়ে গেল নাকি? অ্যালার্মটা বাজল না কেন?” তারপর নন্দর দিকে তাকিয়ে বলবেন “তুই এই সকালবেলা দোকান ফেলে এইখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? বউটা একা অত লোক সামলাবে?”

এমনটা হলে বেশ হত, কিন্তু হবে কেন? রবীন নন্দর পিঠে হাত রাখে, ও মুখ তুলে তাকায়। কিসে ওর কান্না আটকে ছিল কে জানে! রবীনের চোখে চোখ পড়তেই সে বাধা সরে যায়। কাঁদতে কাঁদতে পড়ে যাচ্ছিল, রবীন সবলে জড়িয়ে ধরে ওকে। নন্দকে শান্ত করতে করতেই শোনে পিছন থেকে একজন বলছে “রবীনদা, একটু সরতে হবে।” গলন্ত বরফ নন্দকে নিয়ে রবীন সরে দাঁড়ায়, মইদুল আরেকজন কমরেডের সাথে মিলে লালের উপর সাদা কাস্তে হাতুড়ি আঁকা পতাকাটায় ঢেকে দেয় হীরুদার শরীর। সেদিন হীরুদাকে একটু হিংসেই হয়েছিল।

বাড়ি ফেরার সময়ে ট্রেনে ফাল্গুনী বলেছিল “এরকম জীবন সার্থক, বলো?”

“নিশ্চয়। নন্দর চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হবে। কিভাবে কাঁদল দেখলি? কে হয় ওর হীরুদা? কেউ না। তাছাড়া লেখাপড়া বল, পারিবারিক পরিচয় বল, রাজনৈতিক কার্যকলাপ বল — কোন দিক থেকে কোন মিল আছে ওর সাথে হীরুদার? নেই। অথচ হীরুদার চলে যাওয়াটা ওর কাছে একটা ব্যক্তিগত ক্ষতি…”

“তার মানে কতটা ডিক্লাসড হতে পেরেছিল লোকটা!”

“এই হচ্ছে আসল কথা। ঐটেই একজন কমিউনিস্টের সবচেয়ে বড় সাধনা। বিশেষ করে আমাদের মত যারা মধ্যবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে কমিউনিস্ট পার্টিতে আসে তাদের। ঐখানটাতেই আমরা প্রায় সবাই ফেল।”

“হ্যাঁ। আমাদের বড় বড় নেতাদের মধ্যেও তো এই গুণটা আজকাল দেখতে পাই না।”

রবীন মুচকি হেসে বলেছিল “আমার কাছে বলতে ভয় পাচ্ছিস কেন? সবচেয়ে বড় নেতার মধ্যেই গুণটা নেই বলছিস তো?”

ফাল্গুনী আমতা আমতা করে বলেছিল “সাধারণ লোকে জ্যোতিবাবুর জীবনযাত্রা সম্পর্কে এই কথাটা কিন্তু আমাদের মুখের উপর বলে। আর আমরা কিছুই বলতে পারি না।”

“বলা উচিৎও নয়। সত্যিটাকে তো আর গায়ের জোরে অস্বীকার করা যায় না। তবে হ্যাঁ, আমাদের পার্টিতে এখনো হীরুদার মত নেতা নেই তা নয়। বিমান বোসের কথাই ভাব না।”

“সে তো হল, রবীনদা। কিন্তু ওরকম লোক যে সংখ্যায় কম সেটা তো মানবে?”

“তা তো বটেই। সেই জন্যেই তো মানুষের সাথে আমাদের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। গরীব মানুষের পার্টি থেকে আমরা মধ্যবিত্তের পার্টি হয়ে যাচ্ছি দেখছিস না?”

ফাল্গুনীর সাথে সেই কথোপকথনটা মনে পড়তেই সদ্য স্ত্রী বিয়োগ হওয়া হরিপদর পাশে বসেও রবীনের একবার দেখতে ইচ্ছা হয় শ্মশানযাত্রী পার্টি সদস্যদের মধ্যে কে কে শ্রমিক, কৃষক বা সাধারণভাবে গরীব মানুষ। সবুজগ্রাম অবশ্য কোনদিনই কৃষিপ্রধান এলাকা ছিল না। অল্প চাষবাস যারা করত তারাও আর করে না বিশেষ। বাড়িঘর হয়ে গিয়ে কতটুকুই বা চাষের জমি পড়ে আছে? কিন্তু সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রাম, কুড়াইল, বড়িহাটার পার্টিতে শ্রমিক কমরেড নেহাত কম ছিল না। আশেপাশে যে ছোট বড় অনেক কারখানা ছিল।

গুনতে গিয়ে একজনই বন্ধ কারখানার শ্রমিক চোখে পড়ল। তবে সে হরিপদর ভাগ্নে। তা নাহলে পার্টি কমরেডের বউ মরেছে বলে শ্মশানে আসত কিনা কে জানে! পার্টি সদস্যদের মধ্যেও শ্রেণীবিভেদ এসে গেল নাকি! পার্টির সাথে গরীব মানুষের ছিয়ানব্বই সালের সেই দূরত্ব দুস্তর হয়ে গেছে এই দশ-এগারো বছরে। অথচ পার্টি তো ফুলে ফেঁপে উঠছে। মনে পড়ে, ১৯৪১ থেকে ৫২ — এই এগারো বছরে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য সংখ্যা ৩৬ লক্ষ থেকে ৭০ লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। আর ১৯৫৩য় মৃত্যুর আগে শেষ রচনায় স্তালিন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন, পার্টিতে অসংখ্য নতুন সদস্য এসেছে যারা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সাথে মোটেই পরিচিত নয়। এদের নিয়ে কী করা যাবে? তাঁর সামনেই উনবিংশ পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধি সমাবেশে ম্যাণ্ডেট কমিশন সগর্বে রিপোর্ট দিল বারোশো ডেলিগেটের মধ্যে কতজন গ্র‍্যাজুয়েট, কতজন ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ, ডাক্তার, উকিল। কতজন শ্রমিক সেকথা উল্লেখই করা হল না। তারপরও অবশ্য প্রায় চার দশক টিকেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু টিকে থাকাই কি শেষ কথা?

পকেট হাতড়ে বিড়ির প্যাকেট আর লাইটারটা বার করে রবীন। টিকে থাকার কথায় মনে পড়ে বিপ্লব কাল ফোনে জোনাকিকে কী যেন বলছিল? পাশের ঘর থেকে রবীন শুনতে পেয়েছিল জোনাকি বলছে “তুই এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস কেন? টিকে থাকতে গেলে কিছু জিনিস অপছন্দ হলেও মেনে নিতে হয়।”

কলেজ ছাড়ার পর থেকে তো ছেলেটা আর দরকার ছাড়া কথাই বলে না বাপের সাথে। কে জানে কী বলছিল? বহুজাতিকের চাকরি করছে, মোটা মাইনে পাচ্ছে, নিজেরটা ছাড়া আর কারোরটা নিয়ে ভাবে না, তাতেও কিসের অসুবিধা ওর? তরতর করে তো পদোন্নতিও হচ্ছে, মাইনেও বাড়ছে। তাহলে আবার টিকে থাকার সমস্যা কেন? ভাবতে ভাবতে ছেলের উপর রাগ হয় রবীনের। ভাবনাও হয়। সেটাই মুশকিল। সন্তান মনের মত না হলেও তাকে ত্যাগ করা যায় না। পার্টির মতই।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply