নাম তার ছিল: ১৫

পূর্বকথা: রবীন বলরাম আর শ্যামলের পঞ্চায়েত ভোটে দাঁড়ানো বন্ধ করতে চেয়েছিল, যাতে ওদের আর প্রধান হওয়া না হয়। উল্টে নিজেকেই আবার ভোটে দাঁড়াতে হল একটা কঠিন আসন উদ্ধার করার জন্য। তবে হীরুদা কথা দিলেন নির্বাচনের পর ঐ দুজনের ব্যবস্থা করবেন

১৯৭৮ থেকে ৮৮ পর্যন্ত শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি ছিল রবীন। ৮৮ সালের ভোটের আগে ওর অনুরোধ রক্ষা করে হীরুদা আর ভোটে দাঁড়াতে বলেননি। তখন শরীরের যা অবস্থা তাতে ভোটে লড়া খুব ধকলও হয়ে যেত। রবীন খুশি হয়েছিল। মন দিয়ে সংগঠন করা যাবে আর স্বার্থান্বেষী লোকেরা চারপাশে ঘুরঘুরও করবে না — এই ভেবে। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকার ৯১ সালে লোকসভার সঙ্গেই বিধানসভা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরদিনই হীরুদা ডেকে পাঠালেন এবং বললেন বিধানসভায় প্রার্থী হতে হবে। রবীন অবাক হয়েছিল, তবে পার্টি চাইলে আপত্তি করার প্রশ্ন নেই। তাছাড়া হীরুদাকে আর কবে “না” বলতে পেরেছে রবীন? কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐ কেন্দ্রে বামফ্রন্ট প্রার্থী বদল করল না। সিদ্ধান্তটা হীরুদা আগেই রবীনকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ও জোনাকিকে ইচ্ছে করেই কিছু বলেনি। রোজ একবার করে “হচ্ছে তো? হচ্ছে তো?” শুনতে বিরক্ত লাগত, হুঁ হাঁ করে চালিয়ে দিত। হচ্ছে না শুনলে জোনাকির কী প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল, তাই চেয়েছিল প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলে সোজা গণশক্তি থেকেই জানুক।

অনেক বারের জয়ী প্রার্থী সৌগত পানই মদনপুর কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হচ্ছেন দেখে জোনাকি বেশ রেগে গিয়েছিল। আরো রেগে গিয়েছিল এটা বুঝে, যে রবীন আগে থেকেই জানত। “তুমি জানতে?” জিজ্ঞেস করায় “না” বললেও মিথ্যে বলায় রবীনের অপটুতা ওকে ধরিয়ে দিয়েছিল। “জানতে আবার না? ঠিকই জানতে। আমাকে কেন বলবে? বলবে তোমার পেয়ারের কমরেডদের, যারা পেছন থেকে ছুরি মারে। বুঝতেও তো পারো না। বেশ হয়েছে।” বলতে বলতে জোনাকির চেঁচামেচি শুরু হয়েছিল। চলেছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ না রবীন বিরক্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।

সেসব মনে পড়তে নিজের অজান্তেই হেসে ফ্যালে রবীন। ঠিক তখনই এসে পৌঁছায় ফাল্গুনী।

“কি গো? একা একা বইস্যা হাসতাছ? কী হইছে?”

“আয় বয়। হাসুম না? চারদিকে কত মজার মজার জিনিস ঘটতাছে, হাসির কারণের তো অভাব নাই।”

“কী যে কও! আমি তো দ্যাখতাছি অবস্থা কেবল খারাপ হইতাছে।”

“ক্যান কী হইছে? দে, বিড়ি দে।”

ফাল্গুনী বিড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলে “আর কী হইব? পার্টি একটার পর একটা ভুল কাজ করতাছে।”

“কোনটার কথা কইতাছস? সিঙ্গুর?”

“হ্যাঁ। মমতা ন্যাশনাল হাইওয়ে আটকায় রাখছে। এটা তো বেআইনি। পুলিশ দিয়া উঠায় দিতে পারতাছে না?”

“সম্ভব না।”

“ক্যান?”

“মরাল রাইট নাই। নন্দীগ্রামে গুলি চালায় ফ্যালছে। আবার জোর খাটান যায়? রাজ্যে আগুন জ্বইল্যা যাইব। ভুল জায়গায় জোর খাটাইলে এই হয়। যখন দরকার তখন আর তুমি জোর খাটাইতে পারবা না।”

“তাইলে মমতা যা খুশি করব আর সরকার দাঁড়ায় দাঁড়ায় দ্যাখব!”

“উপায় নাই। মানুষের সমর্থন থাকলে অনেক কিছু করন যায়, না থাকলে কেবল বুড়ো আঙুল চোষা ছাড়া উপায় নাই।”

“সমর্থন তো আছেই।”

“নাই, নাই।”

“ক্যান? নাই কইতাছ ক্যান?”

“থাকলে মমতা ঐখানে বইস্যা থাকতেই পারত না অ্যাদ্দিন। ওখানকার মানুষই তুইল্যা দিত।”

“কিন্তু খবরে তো দ্যাখতাছি অনিচ্ছুক কৃষক কম, ইচ্ছুক কৃষকই বেশি।”

“এইগুলা কংগ্রেসী যুক্তি। আমাগো গরীব মানুষের সরকার এইভাবে ভাবব ক্যান? আমাদের ভাবা উচিৎ একজনই বা অনিচ্ছুক ক্যান?”

ফাল্গুনীর মুখ দেখেই রবীন বুঝেছিল ও ধন্দে পড়ে গেছে। তবে ওর প্রশ্ন করার অভ্যেসটা যে যায়নি আনন্দের কথা সেটাই। হালকা মেজাজ ঘুচে গিয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল “তুমিই বলো। কেন?”

“কারণ মানুষকে তুমি বোঝাওনি ঠিক করে। তুমি ভেবেছিলে ‘সরকার আমার, এম এল এ আমার, এম পি আমার, পঞ্চায়েত আমার। তো আমার লোককে বোঝাতে যাওয়ার কোন ঠ্যাকা? রাইটার্সে বসে যা অ্যানাউন্স করব, লোকে মেশিনের মত মেনে নেবে।”

“কিন্তু ওরকম স্মুদলি তো অনেক কাজ করেছি আমরা। মানুষ তো আপত্তি করেনি কখনো!”

“করেনি কারণ মানুষ আমাদের তখন বিশ্বাস করত। ভাবত ‘এরা করছে যখন আমাদের ভালর জন্যই করছে’।”

“এখন আর বিশ্বাস করে না বলছ?”

“কী করে করবে বল তো? ক্ষেত্রগ্রামে যদি কাউকে বল গিয়ে বলে ‘তোমাদের জমিটা দিয়ে দাও, সরকার ভাল টাকা দেবে আর জমির উপরে কারখানা হবে, সেখানে তোমার লেখাপড়া জানা বেকার ছেলেটার চাকরি হবে।’ সে বিশ্বাস করবে?”

“আর কে কী করবে জানি না, আমি তো করব না,” ফাল্গুনী, বলরামের ছোটবেলার বন্ধু, হাসতে হাসতে বলে। “আমি তো ভাবব নিশ্চয়ই ওর ভাই ঐ জমি কোন প্রমোটারকে বেচবে বা নিজেই হাউজিং টাউজিং বানাবে। অবশ্য ওকে না বলতেও তো ভয় লাগবে। মনে হবে না দিলে যদি মেরে ধরে উঠিয়ে দেয়! নিজের থেকে ছেড়ে দিলে তো তাও টাকা দেবে বলছে।”

“তবে?” রবীন বিড়িটায় শেষ টান দিয়ে বলে “এইবার বুঝছস অনিচ্ছুক কৃষক আইল কোত্থিকা?”

“হুম। মমতা তাহলে ঐ লোকগুলোর সমর্থনই পাচ্ছে!”

“পাবেই তো। বিপদের সময় মানুষের পাশে যে দাঁড়াবে সে-ই মানুষের সমর্থন পাবে। যাদের তুমি ইচ্ছুক কৃষক বলছ তাদের সমর্থনও হয়ত মমতা পাচ্ছে। তারা হয়ত ভয়ে চেক নিয়ে নিয়েছিল তখন। এখন ভাবছে জমি ফেরত পেলে বেশ হয়।”

ফাল্গুনী বেচারার মুখ কালো হয়ে যায়। কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর গলা নামিয়ে বলে “এদিকে আবার কী কাণ্ড জানো তো?”

“কোন দিকে?”

“আরে বল তো বলে বেড়াচ্ছে পরের বার বিধানসভায় নাকি ও দাঁড়াচ্ছেই।”

খবরটা ভাল না হলেও রবীন না হেসে থাকতে পারে না।

“হা হা হা। বলিস কী রে! এখন থেকে প্রচার শুরু করবে নাকি? ২০১১ তো অনেক দেরী, আগে তো ২০০৯ এর লোকসভাটা আছে।”

“ওকে নাকি আমাদের জেলা সম্পাদকমশাই কথা দিয়ে দিয়েছেন।”

“একেবারে কংগ্রেসী কালচার। পার্টির আভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র-ফন্ত্র আর কিছু রাখবে না এরা। জেলা সম্পাদক টিকিট বিলোচ্ছে। তবে ভোটের সাড়ে তিন বছর আগে বোধহয় সোনিয়া গান্ধীও টিকিট বিলোয় না।”

বলেই হো হো করে হাসতে থাকে রবীন। ফাল্গুনীও হাসে, তবে ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে।

“তুমি হাসছ, রবীনদা? ও পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি, তাতেই লোকে টিকতে পারে না। এম এল এ হলে কী করবে ভাবো।”

“কী আর করবে? হাতে মাথা কাটবে। তোর আর আমারটা তো কাটবেই। তার চেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের আরো দুর্গতি হবে। আর পার্টিটা উঠে যাবে।”

“না, পার্টি উঠে যাবে না। আমরা হয়ত পার্টিতে টিকতে পারব না। কিন্তু তাতে পার্টির কী? পার্টির তো ভোট পেলেই হল। সেই আমাদের পঞ্চায়েতটাকে মিউনিসিপ্যালিটি করা নিয়ে আমি আর তুমি এনামুলদার সঙ্গে যেদিন গেলাম, সেদিন সম্পাদকমশাই কী বললেন মনে নেই?”

“বাবা! সে কি ভোলা যায়! ‘আপনারা একটা এম পি সিট জেতাতে পারেন না, আবার এইসব দাবী নিয়ে আসেন!’”

“তাহলে?”

“তাহলে কিছু নয়, কমরেড,” রবীন ফাল্গুনীর পিঠে চাপড় মেরে উঠে পড়ে। “সুদিন শেষ। ভোট আর বেশিদিন পাওয়া যাবে না। চল, একটু চা খাই। গলাটা শুকিয়ে গেছে।”

বাবলুর দোকানে তখন অব্দি ভিড় জমেনি। চা দিতে বলে ফাল্গুনী নীচু গলায় জিজ্ঞেস করে “ভোট আর বেশিদিন পাওয়া যাবে না বলছ?”

“বলছি। লোকে আর সহ্য করবে না। সম্পাদকমশায়ের ওখানে কিভাবে ভোট হয় জানিস তো?”

“তা আর জানি না! গতবার তো লোকসভায় উনি যা ভোট পেয়েছিলেন তার সাথে তৃণমূল প্রার্থীর ভোট যোগ করলে মোট ভোটারের চেয়ে বেশি হচ্ছিল।”

“ওভাবে ভোট করার বিপদ দুটো। প্রথম হচ্ছে আসলে কত লোক তোর পক্ষে, তুই বুঝবিই না। দ্বিতীয়ত, ওভাবে তুই কবার ভোট করবি? একবার, দুবার, তিনবার, পাঁচবার? একদিন না একদিন তো তোর মেশিনারি ফেল করবেই। বিরোধীরা শক্তিশালী হয়ে উঠে আটকে দেবে। সেদিন যখন লোকে নিজের ভোট নিজে দিতে যাবে, তখন ঠিক করেই যাবে ‘আর যাকেই ভোট দিই, এই শালাদের আর দেব না।’ তখন তুই হেরে ভূত হয়ে যাবি।”

“আমাদের সেই সময় এসে গেছে বলছ?”

“শিরে সংক্রান্তি একেবারে। আমাদের দৌরাত্ম্য লোকে অনেক বেশিদিন সহ্য করে ফেলেছে বলা যায়। বোধহয় আমাদের আগের সুকৃতির কারণে। সেই কবে থেকে এ জিনিস শুরু হয়েছে ভাব। সবুজগ্রামে আমরা এই কালচারটা চালু হতে দিইনি তাই। ক্ষেত্রগ্রামে কবে থেকে বল বাইরের লোক আনছে ভেবে দ্যাখ। শ্যামলদারও খুব ইচ্ছা ওসব হোক। নইলে ওর নিজেকে বলর চেয়ে ছোট নেতা মনে হয়। কিন্তু ওকে অনেকদিন আগে একবার হীরুদা বলেছিল ‘ওসব করতে গেলে কিন্তু অনেক সময় পাড়ার লোক ক্ষেপে গিয়ে প্যাঁদাতে শুরু করে। সেটা সামলাতে পারবে তো?’ সেই ভয়ে ও শেষ অব্দি আর করে উঠতে পারে না।”

“তা নেতারাই বা এসব অ্যালাউ করে কেন?”

“বাহাদুরি। আর যে করেই হোক ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে। অনিল বিশ্বাসের আমল থেকে কে কত মার্জিন দিতে পারে সেই নিয়ে কম্পিটিশন শুরু হয়ে গেছে। তুমি যেভাবে পারো মার্জিন বাড়াও, পার্টি তোমার সঙ্গে আছে।”

“কিন্তু এখনো কি মমতার এত জনসমর্থন হয়েছে যে আমাদের হারাবে?”

“সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু ওর সমর্থন প্রতিদিনই বাড়ছে এটা জেনে রাখ। আর আমাদের রাশ আলগা হচ্ছে। দেখছিস না, কিছুই সামলানো যাচ্ছে না? নন্দীগ্রামই বল আর সিঙ্গুরই বল।”

ফাল্গুনীর মুখটা দেখে বেশ মায়াই হচ্ছিল রবীনের। বেচারা নিপাট ভাল মানুষ, খুব অল্প বয়স থেকে পার্টি করছে, সবুজগ্রাম হাইস্কুলের দারুণ জনপ্রিয় মাস্টার। বেশ ভাল ছাত্র ছিল। যে সময় পাশ করেছে সেই সময় কলেজের চাকরি পেতে পারত কিন্তু নিজের জায়গা এই সবুজগ্রাম — এর উপর ওর এমন টান যে স্কুলের চাকরিটা পেয়ে যেতেই আর ওসব চেষ্টাই করল না। রবীন একটু বকাই দিয়েছিল তাই নিয়ে। তাতে ওর জবাব “আরে রবীনদা, যে ইস্কুলে পড়েছি সেইখানেই মাস্টারি করতে পারছি। এর চেয়ে সুখের আর কী আছে বলো? আর এখানেই ইস্কুল, সাইকেলে যেতে আসতে দশ দশ কুড়ি মিনিট; পার্টিটা করার সময় পাব। কলেজে ঢুকলে সে কোন কলেজে হবে, ডেলি প্যাসেঞ্জারি করতে করতেই জীবন কেটে যাবে। পার্টি করব কখন?” এমন বোকা ছেলে যে পাশের বাড়ির ছেলে, ল্যাংটো বয়সের বন্ধু বলরাম — তার মুখের উপর সত্যি কথা বলতে শুরু করেছিল। তাই ব্যাটা ওকে আর উঠতে দিল না। বল পঞ্চায়েত প্রধান হয়ে রইল আর ফাল্গুনী পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হয়ে গেল — এতেও ওর চোখ টাটিয়েছিল। ফলে ল্যাং মেরে দিল। গত কনফারেন্সে এল সি এম পর্যন্ত থাকতে দিল না। পার্টি ওর থেকে কত কিছু পেতে পারত, কিছুই পেল না। ও-ই বা কী পেল?

“যাকগে, ছাড়ান দে। চা-টা দে,” বলে রবীন আলোচনাটা শেষ করার চেষ্টা করে। কয়েকজন খদ্দের এসে গেছে, তাদের এইসব আলোচনা শুনতে দেওয়া উচিৎ না।

ফাল্গুনী নিজের চায়ের গেলাসটা বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাতে রবীনেরটা ঠোঁটে ধরে। ও চুমুক দিতে না দিতে প্রায় স্বগতোক্তির মত ফাল্গুনী বলে “হীরুদা আর কয়েকটা বছর বাঁচলে…”

রবীন চা গিলে নিয়ে বলে “ধুর! হীরুদা আর কটা বছর বাঁচলে, জ্যোতি বসু আর কটা বছর বাঁচলে, প্রমোদ দাশগুপ্ত আর কটা বছর বাঁচলে, লেনিন আর কটা বছর বাঁচলে… এরকমভাবে রাজনীতি হয়? যারা বেঁচে থাকে, যা করার তাদেরই করতে হয়। তারাই গড়বড়ে হলে আর কী করা যাবে? তাছাড়া হীরুদা তো নব্বই বছর বয়সে মারা গেল। আর কতদিন বাঁচতে পারে একটা মানুষ?”

ফাল্গুনী গরম চা এক ঢোঁকে খেয়ে ফেলে বলে “তুমি তো কোন আশাই দিচ্ছ না, রবীনদা।”

“আশা আমায় দিতে হবে কেন? আশা আছে তো।”

“আছে!”

“নিশ্চয়। বামফ্রন্ট সরকার না থাকলেই কি বাম আন্দোলন শেষ নাকি?”

“সরকার না থাকলে কি আর পার্টি টিকবে?”

“যারা টিকবে না তাদের না টেকাই ভাল। যদ্দিন পার্টি ক্ষমতায় থাকবে ওগুলোকে বার করাও যাবে না। ক্ষমতা গেলে তবে নতুন করে গড়া যাবে।”

“কিন্তু কাদের নিয়ে গড়বে?”

“নতুনদের নিয়ে, তরুণ ছেলেমেয়েদের নিয়ে।”

“সে কি সম্ভব? আজকাল ছেলেমেয়েগুলো কি স্বার্থপর দ্যাখো না? নিজের কেরিয়ার ছাড়া এরা কিচ্ছু নিয়ে ভাবে না। এখন পার্টি ক্ষমতায় আছে বলে তাও কিছু ছেলেমেয়ে আসছে। ক্ষমতা চলে গেলে এরা আর ছায়া মাড়াবে না।”

রবীনের চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। পয়সাটা দিয়ে বলে “চল, বেরিয়ে কথা বলি।”

বেরিয়ে রবীন সুভাষ কলোনির দিকে হাঁটতে শুরু করে। “এ কি! এদিকে চললে? আজকে এল সি মিটিং না?” ফাল্গুনী বোধহয় ভেবেছিল রবীন কথা বলতে বলতে পার্টি অফিসে গিয়ে ঢুকবে, আর ও খানিকক্ষণ বসে গল্পগুজব করে মিটিঙের জন্য কমরেডরা আসতে শুরু করার আগে উঠে আসবে।

“বড় বড় বিপ্লবীদের মিটিং। আমার গিয়ে কাজ নেই। আমি আমার ছাত্রগুলোর খোঁজ নিয়ে আসি।”

“আমি যাব? আমার তো কোন কাজ নেই এখন।”

“চল না,” রবীন ফাল্গুনীর কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। “অদূর ভবিষ্যৎটা আমাদের ঝরঝরে, বুঝলি। সুদূরের যত্ন নেয়া দরকার। সেটাই করছি।”

ফাল্গুনী মুচকি হেসে বলে “ও, তাই বলো। তুমি ভবিষ্যতের কমরেড তৈরি করছ। তাই তোমার নতুনদের নিয়ে আশা?”

“আরে সবাই কি আর কমিউনিস্ট হবে? হবে না। কিন্তু এক দল ভাল মানুষ যদি তৈরি করা যায়, তার থেকে কিছু ভাল কমিউনিস্ট বেরোবেই।”

“হ্যাঁ, তোমার ঐ ছাত্রটাকে পার্টিতে আনতে হবে। কী যেন নাম? তোমার বাড়ি আলাপ হল একদিন?”

রবীন একটা চওড়া হাসি হেসে বলে “সুবিমল। খুব সম্ভাবনাময়। তবে ও একা নয়। ওর বয়সী সব ছেলেমেয়েকেই ধরতে হবে। আগামী দিনের কমরেড ওদের মধ্যে থেকেই আসবে রে।”

“তুমি বড্ড বেশি আশাবাদী, রবীনদা। হাতে গোনা কয়েকজনকে দেখে তুমি ভবিষ্যৎ নিয়ে এত উৎসাহিত!”

“হ্যাঁ রে, তোর বয়স কত?” রবীন ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে। “আমার তো রিটায়ারমেন্টের সময় হল। এখন তো আমার নৈরাশ্যবাদী হবার সময়। তোর কী হইছে?”

“দেখে দেখে সিনিক হয়ে গেছি, রবীনদা। হয়ত হওয়া উচিৎ না। কিন্তু… তুমি নিজেই ভেবে দ্যাখো না। কেষ্টর থেকেও তো তোমার অনেক আশা ছিল। সেই জন্যেই তো ৯৩ তে বলকে সরিয়ে তুমি ওকে প্রধান করালে। কিন্তু ফল কী হল?”

ঠিকই। কোন লাভ হয়নি শেষ অব্দি। কিন্তু রবীন তো চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। চেষ্টাই তো করতে পারে মানুষ, সর্বশক্তি দিয়ে। আশা নেই বলে চেষ্টাও করবে না মানুষ? পরাজয়ের ভয় পাবে কমিউনিস্টরা?

হীরুদা কথা রেখেছিলেন। লোকাল আর জোনাল কমিটির সিদ্ধান্তকে জেলা কমিটি থেকে পুনর্বিবেচনার জন্যে ফেরত পাঠিয়ে, কী চান সেটা বুঝিয়ে দিয়ে সবুজগ্রামের প্রধানের পদ থেকে শ্যামলদাকে আর ক্ষেত্রগ্রামের প্রধানের পদ থেকে বলরামকে সরতে বাধ্য করেছিলেন। ডি ওয়াই এফ আই নেতা, সাতাশ বছরের হোলটাইমার কৃষ্ণমোহন দাসকে বলর জায়গায় আর বছর পঁয়তাল্লিশের শিক্ষক নেতা হরিপদ মজুমদারকে শ্যামলের জায়গায় বসানো হয়েছিল। নামগুলো, বলাই বাহুল্য, রবীনই যুগিয়ে দিয়েছিল।

কৃষ্ণমোহন, মানে কেষ্ট, রাজনীতিতে এসেছিল বলর হাত ধরেই। বল যে প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার, কেষ্ট সেই স্কুলেই পড়ত। ফাল্গুনী, শিবুর মত অনেক কমরেডই রবীনকে সাবধান করেছিল, কেষ্ট ছেলে ভাল হলেও বলর প্রভাব এড়াতে পারবে না। তার চেয়ে এমন কাউকে প্রধান করা উচিৎ যে রবীনের কথা শুনবে। ও মানতে পারেনি। উদ্দেশ্য তো দুর্নীতিগ্রস্ত, দাম্ভিক প্রশাসককে সরিয়ে একজন সৎ লোককে দায়িত্ব দেওয়া, নিজের বশংবদ কাউকে প্রধান বানানো তো নয়।

ক্ষেত্রগ্রামে যারা সেবার পঞ্চায়েত সদস্য হয়েছিল তাদের মধ্যে সব মিলিয়ে কেষ্টর চেয়ে যোগ্যতর কাউকে দেখতে পায়নি রবীন। কেষ্ট দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর থেকেই রবীনের কানে আসতে থাকে “প্রধান যে কে সে তো বোঝা যায় না। সইসাবুদগুলোই শুধু কেষ্ট করে। আমাদের আর্জি শোনে বলদা, বিধানও দেয় বলদা। আগের মতন বাড়িতে দরবারও বসাচ্ছে বলদা। তা’লে আর বদল হল কী?”

সবুজগ্রামে কিন্তু বদল হয়েছিল। কেষ্টকেই যোগ্যতম মনে হলেও হরিপদর ব্যাপারে রবীন ঠিক খুশি হতে পারেনি। প্রথমত, হরিপদ রবীনেরই বয়সী, মানে মোটেই তরুণ নয়। দ্বিতীয়ত, ও কলকাতার এক নাম করা স্কুলের মাস্টার। কথাবার্তায় একটু আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিল। শ্যামল কংসবণিকের বদলে যদি এমন কেউ প্রধান হয় যে চাষাভুষো দেখলে ভাল করে কথাই বলে না, তাহলে আর লাভ কী? হরিপদ যে পাড়ার পঞ্চায়েত সদস্য, সে পাড়ায় ওটা কোন সমস্যা নয় কারণ ওটা মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত চাকুরিজীবীদের পাড়া। কিন্তু প্রধান হলে? রবীনের তাই প্রথম পছন্দ ছিল অবনী ঘোষ।

স্টেশনের গায়ে যে বন্ধ হয়ে যাওয়া সেরামিকের কারখানাটা, অবনী সেটায় কাজ করত। বন্ধ হয়েছে হালে। ৯৩ সালে রমরমিয়ে চলত। অবনী উচ্চমাধ্যমিকের বেশি পড়াশোনা না করে থাকলেও খুব গুণী ছেলে। হাতের লেখা মুক্তোর মত, আঁকতে পারত চমৎকার। যে কোন ভোটের সময় ওকে দিয়ে দেয়াল লেখাতে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত ব্রাঞ্চগুলোর মধ্যে। রবীনেরই ছাত্র, রবীনের হাত ধরেই পার্টিতে আসা। নিজের উদ্যোগে পার্টির বইপত্র পড়ত খুব। আর পড়ত সুনীল, শীর্ষেন্দু, সঞ্জীব, দুই সমরেশ। অমায়িক ব্যবহার বলে কারখানায় যেমন, এলাকাতেও তেমন জনপ্রিয়। সেবারই প্রথম পঞ্চায়েত সদস্য হয়েছে, বয়সও পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কিন্তু সবুজগ্রামের যতজন ভাল কমরেডের সাথে কথা বলেছিল রবীন, সকলেরই মত ছিল হরিপদকেই প্রধান করা ভাল। গোড়ায় রবীন ভেবেছিল ওরা ওরকম বলছে মধ্যবিত্ত অভ্যাস থেকে। মানে স্কুলমাস্টারকে প্রধান মানতে আপত্তি নেই, শ্রমিককে মানবে না। না মানবে বুঝলে অবশ্য জোর করে চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই, তবু রবীন ওদের বোঝানোর চেষ্টা করছিল। সেই চেষ্টা করতে গিয়েই একদিন শিবুর মুখে শুনল জগার সঙ্গে নাকি অবনীর আবার দোস্তি হয়েছে।

জগা এলাকার পলাতক সমাজবিরোধী। রবীনের স্কুলেই পড়ত, অবনীর গলায় গলায় বন্ধু ছিল। বাবা ছিল কুড়াইল জুটমিলের শ্রমিক। ছেলে ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পাগলা সুরেনের দলে ভিড়ে গিয়েছিল। সুরেন তখন সেই সময়কার কংগ্রেসী এম এল এর ছত্রছায়ায় রেল ইয়ার্ডের স্ক্র্যাপ স্মাগলিং করে।

তবে সাতাত্তরে বামফ্রন্ট সরকার আসার আগেই দুবার স্ট্রোক হয়ে সে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে, তার সাম্রাজ্য চলে গেছে জগার দখলে। রবীন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হওয়ার পরে পরেই দলেরই একজনের সঙ্গে ওর ঝামেলা লেগে যায়। তার জেরে সবুজগ্রাম, ক্ষেত্রগ্রামে শুরু হয় বোমাবাজি, খুনোখুনি। এই এলাকা তখন মদনপুর থানার মধ্যে পড়ে। হীরুদাকে গিয়ে রবীন বলেছিল একজন কড়া ও সি দরকার। সেই মত এসে পৌঁছেছিল জয়ন্ত ভৌমিক। রবীনেরই বয়সী। তার তাড়া খেয়ে সেই ৮৫ সাল থেকে জগা এলাকা ছাড়া, ওর দলবলও লোপাট হয়ে গিয়েছিল। রবীন শুনেছিল জগা ৯০-৯১ থেকে গলামনের ও পারে লক্ষ্মীপুরে ঘাঁটি গেড়ে জমির দালালি করছে, আর এ পারে ফিরে আসার রাস্তা খুঁজছে। অবনী যে আবার ওর পাল্লায় পড়েছে সেটা জানা ছিল না।

“কোন প্রমাণ দিতে পারব না, তবে লক্ষ্মীপুরে ওর আত্মীয়স্বজনও কেউ থাকে না, কাজের জন্যেও যাবার দরকার হয় না। তবু মাসে দুবার তিনবার অবনী খেয়া পার হয়ে ওখানে যাবেই। আর জগা যে এখন ওখানে আচে সে খবরটা পাকা। দুয়ে দুয়ে চার অনেকেই করচে,” বলেছিল শিবু। এরপর আর হরিপদ ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না।

হরিপদ যে শ্যামলকে ওরকম টাইট দিয়ে দেবে রবীনও ভাবতে পারেনি। ক্ষমতা এমন এক নেশা, যা ছাড়ানো বেশ শক্ত। যত দিন যায়, ছাড়ানো তত শক্ত হয়। শ্যামল তো আবার যে সে নেশাখোর নয়, দিনরাত ক্ষমতায় চুর হয়ে থাকা লোক। তাই হরিপদকে নিজের কথায় ওঠাবে বসাবে ভেবেছিল। কিন্তু সে একেবারে প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দেয়। শপথ নেওয়ার দিনই কি একটা জ্ঞান দিতে গিয়েছিল শ্যামল, হরিপদ সোজা বলে দেয় “আপনি নিজের কাজে মন দিন, শ্যামলদা। আমি আমারটা ঠিক বুঝে নেব।” এক ঘর লোকের মাঝখানে এই কথাটা শুনে শ্যামলের মুখটা কেমন হয়েছিল রবীন আজও ভোলেনি। লোকটা এমন বেহায়া, এর পরেও হরিপদকে ঠারেঠোরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আসলে ও-ই প্রধান। এতে বিরক্ত হয়ে হরিপদ ওকে এমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা শুরু করে, যে কয়েক মাস পর থেকে শ্যামল পঞ্চায়েতে আসাই বন্ধ করে দেয়।

এসব রবীনের কানে আসত, আর আসত হরিপদর সুখ্যাতি। রিকশাওয়ালা, বাড়ির কাজের লোক, সবজিওয়ালা — এরাই দেখা গেল নতুন প্রধানকে নিয়ে বেশি খুশি। “শ্যামলদা পুরানো লোক, অনেক করেছেন আমাদের জন্যে। কিন্তু বয়স্ক লোক তো, চট করে রেগে যান। ওনাকে একটু ভয় ভয় কত্ত, হরিপদবাবুকে মন খুলে বলা যায়,” রবীনকে স্টেশন বাজারের একজন বলেছিল।

আশ্বস্ত হয়েও রবীন ভেবেছিল শ্যামল কি আর ছেড়ে দেবে? নিশ্চয়ই প্রত্যাঘাত করবে। কিভাবে? অবশ্য শ্যামল যতটা গোঁয়ার ততটা ধূর্ত নয়। তাই ও বলরামের চেয়ে চিরকালই কম বিপজ্জনক। দুজনে রেষারেষিও আছে, তবে আঁতে ঘা লাগলে গলাগলি হতে দেরী হয় না। আর বল ওর পদচ্যুতির শোধ তুলতে চাইবেই, সে যতই বকলমে ও পঞ্চায়েত চালাক। সুতরাং দরকার পড়লে যে বলর থেকেই দুষ্টু বুদ্ধি পেয়ে যাবে শ্যামল, তাতে সন্দেহ ছিল না। আশঙ্কা সত্যি হল অনেক পরে — ৯৮ সালের গোড়ায়।

থান রোড ধরে জাতীয় সড়কের দিকে যেতে ক্ষেত্রগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা শেষ হয় আমলকিতলা দিয়ে। তারপরই হাজিপাড়া। ওটা দিয়ে আজাদপুর মিউনিসিপ্যালিটির এলাকা আরম্ভ। আমলকিতলায় আমলকি গাছ আর অবশিষ্ট ছিল না একটাও, তবে পাড়ায় ঢুকতেই একটা বিশাল বটগাছ ছিল। সেই গাছের তলায় কোত্থেকে একটা বড়সড় পাথর এনে ফেলে দিয়েছিল কেউ। ব্যাস, শিবরাম চক্রবর্তীর সেই গল্পটার মত দেবতার জন্ম হয়ে গেল।

ও পাড়ার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ধাক্কা সামলে বাড়ি ফিরেছেন। তাই রবীন, হরিপদ, বলরাম আর ফাল্গুনী আরো কয়েকজনকে নিয়ে ওঁকে দেখতে গিয়েছিল। ফেরার পথে তেল সিঁদুর মাখানো, খুচরো পয়সা পরিবৃত পাথরটার দিকে চোখ পড়তে হরিপদ ঐ পাড়ারই এক কমরেডকে জিজ্ঞেস করেছিল “এসব কী হচ্ছে রে?”

“আর বলবেন না, দাদা। মাস তিনেক আগে জলের লাইন বসল, তখন মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে ঐটে বেরিয়েছিল। আমার সামনে। অত ভারী পাথর, দুজন লেবার মিলে তুলল। তারপর কোথায় রাখবে? তা শ্যামলদা ছিলেন, বললেন ‘ঐ গাছের তলায় রেখে দিগে যা।’ রাখা হল। দু একদিন পর থেকেই দেখছি এই কাণ্ড।”

“সে তো বুঝলাম। মানুষের অন্ধ বিশ্বাস থেকে এগুলো হয়। কিন্তু তোরা সব রয়েছিস, তাও লোকের অন্ধ বিশ্বাস গেল না। এইটাই দুঃখের কথা।”

পরদিন রবীন স্কুলে গেছে, হঠাৎ টিফিনের সময়ে হন্তদন্ত হয়ে, আমলকিতলার কিছু ছেলেকে নিয়ে শিবু হাজির। “রবীনদা, শিগগির চলুন।”

“কেন রে? কী হল?”

“সকাল তেকে আমলকিতলায় অশান্তি। আমরা অনেক সামলানোর চেষ্টা কল্লুম, কিন্তু লোকজন হেবি ক্ষেপে আচে।”

“আরে, কী হয়েছে কি?”

“ঐ বটগাচ তলার ঠাকুরকে কে তুলে ফেলে দিয়েচে।”

রবীন কল্পনাও করেনি এমন হতে পারে। ও পাড়ার যে ছেলেটা আগের দিন সঙ্গে ছিল, সে অনেক দিনের পার্টি সদস্য। এত মাথামোটা হওয়ার তো কথা নয়!

“সে কি কথা রে!” রবীন আঁতকে উঠেছিল। “কে করল এই কাণ্ড?”

“সেসব জানি না। পাড়ার লোকের ধারণা হয়েচে হাজিপাড়ার কেউ।”

“সে কি!” হাজিপাড়া পুরোপুরি মুসলমানদের পাড়া। কী ঘটতে পারে ভেবে মাথা ঘুরে গেল রবীনের। “কেউ দেখেছে নাকি করতে? এটা কাদের অভিযোগ?”

“কেউ দ্যাখেনি, স্যার,” শিবুর সঙ্গের ছেলেদের একজন বলে। “যারা ভোরবেলা মর্নিং ওয়াক করতে বেরোয়, তারাই প্রথম দেখেছে পাথরটা রাস্তার ধারে গড়াগড়ি যাচ্ছে। তখন ভোর পাঁচটা। মানে গভীর রাতে করেছে কেউ। কে আর দেখতে পাবে? এই ঠান্ডায় তো সবার জানলা দরজাও বন্ধ।”

“তা কেষ্ট, বল — ওদের খবর দিয়েছিস?”

“কেষ্ট তো সকাল থেকে ওখানেই চিল। কিন্তু ওর কথা কেউ শুনচে না। রেগে মেগে চলে গেল এই মাত্তর,” শিবু বলে। “আর বলদার বাড়ি গিসলাম। সে তো বলল ‘আমি কে? আমি গিয়ে কী করব?’”

“অ। তা আমায় সকালে খবর দিসনি কেন?”

শিবু চোখ নামিয়ে নিয়ে বলে “বলেচিলাম। কেষ্ট বললে ‘ওনাকে জানানোর দরকার নেই।’ কিন্তু এখন আপনি না গেলে উপায় নেই, রবীনদা। ক্লাবের ছেলেরা লাঠিসোটা বার করে ফেলেচে। বলচে হাজিপাড়ার লোকেদের মারতে যাবে।”

“আসছি, দাঁড়া।”

রবীনের টিফিনের পরে আরেকটা ক্লাস বাকি ছিল। সেটা যে করতে পারবে না হেডমাস্টারকে সে কথা মুখ বাড়িয়ে বলে দিয়েই সাইকেলটা নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ওদের সাথে। পথে যেতে যেতে শুনল শুরু থেকেই হল্লা বেশি করছে আমলকিতলা তরুণ সংঘের ছেলেরা, যারা বলরামের অনুগত সি পি এম বলে পরিচিত, বলরামের ভুয়ো ভোটার বাহিনীর সদস্য। সকাল থেকে দফায় দফায় কেষ্ট মিটিং করেছে ওদের সাথে, কিন্তু ওদের প্রথম থেকেই এক কথা — হাজিপাড়াকে শিক্ষা দিতে হবে। বয়স্ক লোকেরা প্রথম দিকে শান্ত থাকলেও এখন তারাও উত্তেজিত। ওখানকার পঞ্চায়েত সদস্য বাবুল বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে আন্দাজে এরকম অভিযোগ করা ঠিক না। তাতে একজন বয়স্ক লোক ঠাস করে চড় কষিয়ে দিয়েছে। বাবুল অপমানিত হয়ে সেই যে বাড়ি ঢুকেছে, আর বেরোচ্ছে না। হাজিপাড়ার দুই পঞ্চায়েত সদস্য — ইসমাইল আর সিরাজুলকে কেষ্ট ডাকিয়েছিল। ওরা এসে বলে গেছে খুঁজে দেখছে, যদি দেখা যায় ওদের পাড়ার লোক এই কাণ্ড করেছে, তাহলে ওরাই কান ধরে নিয়ে আসবে। কিন্তু আমলকিতলার লোক ওদের বিশ্বাস করতে রাজি নয়।

রবীন পৌঁছে দেখে তরুণ সংঘের সবচেয়ে বদ ছেলেটা যে বেদীর উপর পাথরটা ছিল, সেটার উপর লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে গলার শির ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে। “এখন অনেক বড় বড় সি পি এম নেতা এখানে আসবে, এটা সেটা বলে ভোলানোর চেষ্টা করবে। আপনারা ভুলবেন না। এটা পাটির ব্যাপার না। এটা আমার আপনার ধর্মে লাথি। যা করার আমাদেরই কত্তে হবে। সি পি এম ওদের পক্ষই নেবে। ওরা সি পি এমের ভোট ব্যাঙ্ক…”

রবীন শিবুকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে “এ কি রে! এ এরকম উল্টো গাইছে?”

“নতুন বিজেপি হয়েচে তো। ক্লাবের আর দু একজনও হয়েচে।”

রবীন বুঝে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে “এই যে বাবা, তুমি হিন্দুর ছেলে ঠাকুরের বেদীতে উঠে দাঁড়িয়েছ কেন? তাও আবার চটি পায়ে?”

গলা শুনে ভিড়টা ওর দিকে ঘুরে গিয়েছিল। অনেকে “আসুন, রবীনদা” বলে জায়গা করে দেয়। রবীন বেদিটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা তখনো কোমরে হাত দিয়ে বেদির উপরেই দাঁড়িয়ে আছে। একজন ধমক দেয় “অ্যাই হতভাগা! এখনো দাঁড়িয়ে আছিস! নাম।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে নেমে আসে। রবীন আর ওর দিকে না তাকিয়ে হাত তুলে সকলকে বলে “বসুন, সবাই বসুন। শান্তিতে কথা হোক।” জনতা বসে পড়ে।

“আপনাদের মুখগুলো দেখে বুঝতে পারছি সবাই খুব রেগে আছেন। রেগে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু রেগে থাকলে তো কোন সমাধান হবে না…”

“আমরা এসব ভ্যানতাড়া শুনব না,” কথার মাঝখানেই একজন চেঁচিয়ে বলে। এই মুখটাও চেনা। তরুণ সংঘেরই। রবীন ওর দিকে ঘুরে বলে “আচ্ছা, তাহলে আপনারা বলুন, আমি শুনি? বলুন কী করতে চান?”

সঙ্গে সঙ্গে চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। রবীন তার উপরে গলা চড়িয়ে বলে “একজন, একজন।” সবাই থেমে গেলে যে মাতব্বরটা বেদির উপরে দাঁড়িয়ে লোক ক্ষেপাচ্ছিল, সে-ই চিৎকার করে বলে “আমাদের ভগবানের গায়ে হাত তুলেছে। আমরা ছেড়ে দেব? হাত পা ভেঙে দোব শালাদের। একটাকেও আস্ত রাখব না। হাজিপাড়া জ্বালিয়ে দেব আজকে।” বলেই ছেলেটা হাতের লাঠিটা মাথার উপর তুলে ঘোরাতে থাকে। অনেকেই হৈ হৈ করে ওঠে। রবীন এবার হুঙ্কার দেয় “অ্যাই! থামা তোর হিন্দি সিনেমা। কে দেখেছে হাজিপাড়ার লোককে ঠাকুর ফেলে দিতে?”

সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে, গুজগুজ ফুসফুস করে, মিনিট খানেক কোন জবাব আসে না, তারপর এক ছোকরা বলে “আমি দেখেছি।” রবীন এগিয়ে গিয়ে খপ করে তার হাতটা ধরে।

“চল।”

“ক-কোথায় যাব?”

“হাজিপাড়ায়।”

“ক-কেন?”

“যে করেছিল তাকে চিনিয়ে দিবি। প্রথমে ব্যাটাকে পেটাব, তারপর পুলিশে দেব। চল।”

“ন-না, মানে মুখটা তো ঠিক ভাল করে দেখতে পাইনি…”

“কেন?”

“আ-সলে ভোররাত্তির তো… অন্ধকারের মধ্যে…”

“কটা বাজে তখন?”

“ঘড়ি দেখিনি তো।”

“কোথা দিয়ে দেখলি?”

“জানলা দিয়ে।”

“কোন বাড়ি তোর?”

“ও রমেশবাবুর ভাইপো, দাদা,” শিবু পেছন থেকে বলে। রমেশবাবু। অর্থাৎ আগের দিন বিকেলে রবীনরা যাকে দেখতে এসেছিল।

“তার মানে তোর বাড়ি তো সে-ই পুকুর ধারে।”

ছেলেটা ঢোঁক গিলে মাথা নাড়ে।

“তা সেখান থেকে এই বটতলা কী করে দেখতে পাওয়া যায়, বাপ? মধ্যিখানে এত ঘরবাড়ি?”

ছেলেটা কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল। তার আগেই রবীন ওকে টানতে শুরু করে। “চল, আগে তোকে পুলিশে দিই গুজব ছড়ানোর অপরাধে। তারপর দেখব কে করেছে কাণ্ডটা।”

ছেলেটা রবীনের পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। “ভুল হয়ে গেছে, রবীনদা। আর করব না, দাদা। এইবারটা ছেড়ে দিন।”

রবীন কানটা ধরে টেনে তোলে। তারপর বলে “কে বুদ্ধি দিয়েছিল এইসব বলতে? জিজ্ঞেস করার সঙ্গে সঙ্গে তো বললি না? কিছুক্ষণ পরে বললি। বল কে ইশারা করল? বল, নইলে কিন্তু তোকে থানায় নিয়ে যাবই। এক রাত হাজতে থাকবি, পুলিশের খাতায় নাম উঠে যাবে, চাকরি বাকরি কিচ্ছু কোনদিন পাবি না। বল।”

“এখানে অনেকেই বলছে দেখেছে, কিন্তু কেউ সাহস করে বলছে না। আমাকে বলল ‘তুই বল তুই দেখেছিস। আমরা তোকে সাপোর্ট করব।’”

রবীন কানটা ছেড়ে দিয়ে বলে “আচ্ছা। কে কে সাপোর্ট করছে ওকে? কে কে নিজে চোখে দেখেছে হাজিপাড়ার লোককে এই কুকম্মটা করতে?”

কারোর মুখে আর কথা নেই। রবীন ছেলেটাকে বলে “দেখেছিস তো, বাজে লোকের কথায় নাচলে কী হয়? তোকে এখন পুলিশ অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেলেও কেউ টুঁ শব্দ করবে না। তোর বাবা, জ্যাঠা ভাল লোক, সেই জন্যে এ যাত্রায় তোকে ছেড়ে দিলাম। খবরদার যেন এসবে আর না দেখি।”

“আপনি সেই মুসলমানদের বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।” ফোঁস করে ওঠে সেই মাতব্বরটা। “বটেশ্বরের অপমানের প্রতিকার করার কোন ইচ্ছা নেই। এইসব চালাকি এখানে চলবে না।”

রবীন একগাল হেসে বলে “এক্ষুণি করছি প্রতিকার। এসো তো বাবা এদিকে।” কী হতে যাচ্ছে বুঝতে না পেরে ছেলেটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে “কেন? কী করতে হবে?”

“ভয় পাচ্ছ নাকি হে? এখুনি তো লাঠিসোটা নিয়ে বেপাড়ায় মারামারি করতে যাচ্ছিলে। এসো এদিকে। মারবও না, ধরবও না।”

ছেলেটা তবুও ইতস্তত করে। কে একজন ভিড়ের মধ্যে থেকে বলে “দ্যাখো, দ্যাখো। এইবারে আর পা নড়তাছে না। সকাল থিকা ‘মাইরা ফ্যালামু, কাইট্যা ফ্যালামু’ বইলা লোক ক্ষ্যাপাইতাছে, এদিকে নিজের পায়রার বুক। নিশ্চয় কোন বদ মতলব আছিল।”

এই গঞ্জনার পরে আর ছেলেটা থাকতে পারে না, এগিয়ে আসে। রবীন কাঁধে হাত দিয়ে বলে “ঠাকুর মাটিতে পড়ে আছেন এটা তো ভাল কথা নয়। আগে সেইটের প্রতিকার করতে হবে তো। এসো, হাত লাগাও।”

দু পাশে ধানজমি, মাঝখান দিয়ে এখানকার রাস্তা। তাই রাস্তাটা অনেক উঁচু। রাস্তার একপাশে জমিতেই পড়েছিলেন বটেশ্বর। রবীন নেমে পড়ে হাত লাগায়, ছেলেটাও হাত লাগায়। দেখাদেখি অনেকে ছুটে আসে, বটেশ্বর অবিলম্বেই নিজের আসনে ফেরত চলে আসেন। রবীন বদমাইশটার চোখে চোখ রেখে বলে “এত বড় হিন্দু তুমি, তোমার দলবল নিয়ে সকাল থেকে এইটুকু করে উঠতে পারোনি, কেবল বাজার গরম করছিলে? ফের যদি মুখ খুলেছ, তোমাকেই থানায় নিয়ে যাব। দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টায় অ্যারেস্ট হবে, তারপর কে তোমায় জামিন দেয় আমি দেখব।”

ছেলেটা আর দাঁড়ায় না।

ভিড় ততক্ষণে অনেক পাতলা হয়ে গেছে। ঠাকুর আসনে বসে যেতেই বেশিরভাগের আর কে করল, কেন করল জানার উৎসাহ ছিল না। শুধু কয়েকজন পরিচিত কংগ্রেসী তখনো দাঁড়িয়ে। তাদেরই মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটি বললেন “ভালই ধামা চাপা দিলে, কিন্তু সকাল থেকে যে কাণ্ডটা হল তার জন্যে দায়ী কিন্তু তোমরাই।”

রবীন বেশ বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করেছিল “আমরা?”

“অবশ্যই। ঠাকুর দেবতাকে ভক্তি কত্তে তো শেখোনি। সে নয় হল, কিন্তু তোমাদের নেতা হরিপদ মজুমদার ঠাকুর দেবতাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে অসম্মান করে কোন সাহসে?”

রবীন অবাক হয়ে মনে করার চেষ্টা করে আগের দিন সন্ধ্যায় ওরা যখন ওখান দিয়ে যাচ্ছিল তখন এ পাড়ার লোক কেউ উপস্থিত ছিল কিনা। উনি বলেই চলেছেন। “তাছাড়া এই ক্লাবের ছেলেরা কাদের লোক সবাই জানে। ওরাই তো গণ্ডগোলটা পাকাচ্ছিল।”

“না না, ডাব্বু বিজেপি করে” শিবু প্রতিবাদ জানায়।

“সে তো হালে, বাপু। লাস্ট ভোটে ও কাদের কাছে পাঁউরুটি, আলুর দম খেয়েছে?”

“শুধু পাঁউরুটি, আলুর দম খেয়ে বাড়ি যায়নি, জেঠু। আমাদেরও খাইয়ে গেছে দু চার ঘা” একজন বলে। একটা ছোট খাটো হাসির রোল ওঠে।

রবীন মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে বলে “ধামা চাপা বলে আপনারা ভাবতেই পারেন, কিন্তু আর কী করার আছে আমার তো মাথায় ঢুকছে না। কেউ যদি যে করেছে তাকে ধরতে পারেন তো পুলিশে দিন, পার্টি তাকে প্রোটেক্ট করবে না, এটুকু নিশ্চয়তা আমি দিতে পারি। আর হরিপদ কালকে ঠাকুর দেবতাকে অশ্রদ্ধা করে কিছু বলেনি, পাথরটা তুলে ফেলে দেওয়া উচিৎ তা-ও বলেনি। আপনাদের যে-ই এসব বলে থাক, মিথ্যে কথা বলেছে। আমি নিজে হরিপদর সঙ্গে ছিলাম।”

সেই ভদ্রলোক বলেন “তোমাকে তো আমরা অবিশ্বাস করছি না, বাবা। তুমি তো একটা যথাত্থ বামুনের ছেলের কাজ কল্লে নিজে চোখেই দেখলাম। কিন্তু তোমার দলের বিপ্লবীদের এট্টু সমঝে কথা বলতে বোলো রাস্তাঘাটে। নেতা হলে যখন যা মাথায় এল বলে দেয়া চলে না। আজকে সামলাতে পেরেছ, বারবার না-ও পারতে পারো। হাজিপাড়ার কেউ এই কম্ম করেছে এ আমরাও মনে করি না। এত বচ্ছর কল্ল না, হঠাৎ আজ কত্তে যাবে কোন দুঃখে? কিন্তু পাবলিক ক্ষেপলে তো আর কারো কথা শোনে না। আর আমাদের কথা শুনবেই বা কেন? এখন তোমাদের দিন।”

রবীন আর কথা বাড়ায় না, মাথা নেড়ে সাইকেলে উঠে পড়ে। ততক্ষণে পরিষ্কার মনে পড়েছে আগের দিন সন্ধ্যের কথা। শীতটা জাঁকিয়ে পড়েছিল, যতক্ষণে রমেশবাবুর বাড়ি থেকে বেরনো হয়েছিল, ততক্ষণে সন্ধে উতরে গিয়ে রাস্তাঘাট শুনশান। ওরা কজন ছাড়া আর জনমনিষ্যি ছিল না এই মোড়ে।

এগুলো মনে পড়তেই রবীন বুঝতে পেরেছিল এই ভয়ঙ্কর দুর্বুদ্ধি কার। বুঝে গিয়েছিল ব্যাপারটা অত সহজে মিটবে না। মেটেওনি।

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply