নাম তার ছিল: ১৪

পূর্বকথা: বৃদ্ধ রবীনের কেবলই মনে হয় এত বছর রাজনীতি করে, ক্ষমতায় থেকেও সমাজ বদলে দেওয়ার মত কিছুই করা হয়নি। হতাশার মধ্যে তাকে আশা যোগায় ছাত্র সুবিমল। ওকে পড়াতে গিয়ে রবীন আবিষ্কার করে ছেলেটা লুকিয়ে পড়ছে লিউ শাও কি র লেখা ‘সাচ্চা কমিউনিস্ট কি করে হতে হবে’

হীরুদা থাকতে এলাকার পার্টিটাকে বাঁচানোর, বলরাম আর শ্যামলের দুর্নীতির চাপে পিষে যাওয়া মানুষকে বাঁচানোর একটা শেষ চেষ্টা করেছিল রবীন।

সেবার পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী নির্বাচনের সময়েই রবীন ঠিক করেছিল ওদের দুজনকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করবে। লোকাল কমিটির মিটিঙে এই নিয়ে তুমুল বাকবিতণ্ডা। রবীন জানত দুর্নীতির কথা বললে সেটা প্রমাণ করার প্রশ্ন উঠবে। সাধারণ মানুষ ওদের যা ভয় পায়, প্রমাণ যোগাড় করা যাবে না। উলটে যে কমরেডরা বা সমর্থকরা প্রমাণ যোগাবে, তারা বিপদে পড়বে। তাই ওসবের মধ্যে না গিয়ে লোকাল কমিটির মিটিঙে যখন পুরো প্রার্থী তালিকা পাশ হয়ে যাচ্ছে সর্বসম্মতিক্রমে, তখন বলেছিল “আমার দুটো নামে আপত্তি আছে, কমরেড।”

মিনিটস লিখছিল নন্টে। সেদিনের ছেলে, বলরামের ঘনিষ্ঠ, গুণের মধ্যে পার্টির বইপত্র একটু পড়ে, অতএব নিজেকে বিরাট বোদ্ধা ভাবে। এলাকার লোকেরা ওকে আড়ালে বুদ্ধদেব ভটচায বলত। নন্টে এমন বিরক্তি নিয়ে তাকাল যেন ওর ক্লাসে সহজ অঙ্কের ভুল উত্তর দিয়ে ফেলেছে ছাত্র রবীন। হঠাৎই এমন রাগ হল, রবীন দিল এক ধমক “তাকাচ্ছিস কি? লেখা থামা।” ধমক খেয়ে ও তড়িঘড়ি কলম নামিয়ে রাখল।

শ্যামলদা রবীনকে তখনো বেশ ভয় খায়, কিন্তু বলরাম বিরক্তি গোপন না করেই বলল “কোন দুটো নাম? আমরা যাদের নাম ঠিক করলাম, প্রত্যেকের যোগ্যতাই তো প্রমাণিত। বেশিরভাগ অনেক দিনের সদস্য।”

“ঠিক। সেখানেই আমার আপত্তি। একই লোক বারবার প্রশাসনে গেলে সাধারণ মানুষেরও লাভ নেই, পার্টিরও লাভ নেই। পরের প্রজন্মকে তুলে আনতে হবে তো। গ্রাম পঞ্চায়েতই সেটার জন্যে আদর্শ জায়গা। পঞ্চায়েত সমিতি বা জেলা পরিষদ নতুন লোকের পক্ষে শক্ত হয়ে যায়।”

শ্যামলদা ততক্ষণে কথা বলার সাহস পেয়ে গেছে। “ঠিক আছে। কোন দুটো সিট নিয়ে বক্তব্য সেটা বলা হোক।”

“সবুজগ্রাম পঞ্চায়েতে আপনি দাঁড়াবেন না, আর ক্ষেত্রগ্রাম পঞ্চায়েতে কমরেড বলরাম দাঁড়াবে না।”

যদিও রবীন কয়েকজন কমরেডকে নিয়ে এটা করার পরিকল্পনা করে রেখেছিল বেশ আগে থেকেই, শ্যামলদা আর বল যে ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সেটা ওদের থ মেরে যাওয়া মুখ দেখেই বুঝতে পারে।

বলরাম রাগে অন্ধ হয়ে বলে “কেন, কেন? আমরা দাঁড়াব না কেন?”

“কারণটা তো আগেই বললাম, কমরেড। আপনি সেই ৮৩ থেকে প্রধান, শ্যামলদা ৭৮ থেকে। এবার জায়গা ছাড়ুন, তরুণদের কাজ শিখতে দিন।”

“হ্যাঁ, সে তো ভাল কথা,” শ্যামল কংসবণিক প্যাঁচ কষে। “কিন্তু কথা হচ্ছে জায়গাটা নেবে কে? আর তরুণ বলছ? আমার কথা বাদ দাও, বলরাম তো এখনো তরুণই।”

“ও যদি তরুণ হয়, শ্যামলদা, আপনিও তাহলে চিরতরুণ। তরুণ মানে কুড়ি, পঁচিশ, তিরিশের কমরেডদের কথা বলছি।”

“কী যে বলো, রবীনদা! কুড়ি পঁচিশের ছেলেরা পঞ্চায়েত চালাবে!”

“তোর তিরাশি সালে কত বয়স ছিল রে?”

প্রশ্নটা শুনেই মুখ ছোট হয়ে যায় বলরামের। কিন্তু সামলে নিয়ে বলে “ঐ পঁচিশ-ছাব্বিশ ছিল… কিন্তু ততদিনে আমার অনেকদিন রাজনীতি করা হয়ে গেছে।”

“সে তো তুই ছাড়া যারা প্রার্থী তাদেরও অনেকের অনেক দিন পার্টি করা হয়ে গেছে। তারা কেউ প্রধান হবে আমরা জিতলে।”

শিবু, রবীনের অনুগত কমরেডদের একজন, বলে “আমার তো মনে হয় বলরামদার মত কমরেডকে আমাদের সংগটনে বেশি দরকার। শুদু তো পঞ্চায়েতটা চালালে হবে না। আমাদের এখানে ডি ওয়াই এফ আই, এস এফ আই কিন্তু ঠিক করে হচ্চে না। বলদার মত কোন সিনিয়র কমরেড, যে নিজে ছাত্র, যুব করে উঠেচে, সে গাইড কল্লে ভাল হয়। কিন্তু প্রধান থাকলে আর বলদার সময় কোতায়?”

“না না, এভাবে হয় না তো,” শ্যামল হঠাৎ রুখে ওঠে। “শুধু আমরা দাঁড়াতে পারব না বললেই তো চলবে না, বিকল্প নাম বলতে হবে।”

“বিকল্প আমি কেন বলব? আপনাদের পাড়া আপনারা তো হাতের তালুর মত চেনেন। আপনারাই বলুন ভাল, নতুন ছেলেমেয়ে কারা আছে?” রবীন বলে।

“না, প্রার্থী করার মত লোক তো অনেক আছে। প্রধানটা হবে কে?”

“সেটা ভোটের পরে ঠিক করা যাবে, শ্যামলদা। আগে আমরা জিতি। জিতলে তবে তো প্রধান হওয়ার প্রশ্ন।”

“কেন? কমরেড রবীন ঘোষালের সমীক্ষা অনুযায়ী আমরা জিতব না এরকম কোন সম্ভাবনা আছে নাকি?” বলরাম তির্যক মন্তব্য করে।

“জিতব তো নিশ্চয়। কিন্তু মানুষকে এইভাবে টেকন ফর গ্রান্টেড করে নেওয়াটা কোন দেশী কমিউনিস্টসুলভ মনোভাব?”

“যাকগে, ওসব কথা বাদ দিন, কমরেড।” সি এম ডি এ কর্মী সঞ্জয় দাস, রবীনের আরেক ঘনিষ্ঠ কমরেড, বলে ওঠে। “বিকল্পটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে সিনিয়র কমরেডরা জুনিয়রদের জন্যে জায়গা ছাড়তে রাজি কিনা।”

সঞ্জয়কে বলরাম বরাবরই খুব অপছন্দ করে, কারণ ও ঠোঁটকাটা। ওর একটা বড় বদভ্যাস হল, উত্তেজিত হলে পার্টির কথা বাইরের লোকের সামনে বলে বসে। সেজন্যে রবীনের কাছেও প্রচুর বকা খায়। ওর সততা এবং জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও এইজন্যই এল সি এমের বেশি হয়ে উঠতে পারেনি। বলরামের অবশ্য ওর উপরে ব্যক্তিগত রাগও যথেষ্ট। পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হওয়ার পর থেকে ওর এলাকায় জমির দালালি একদম বন্ধ করে দিয়েছে সঞ্জয়, আর তাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলর ভাই নাটু। সঞ্জয় মুখ খুলতেই বল তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। “সিনিয়র কি শুধু আমি আর শ্যামলদা নাকি? তুই কোন কচি খোকা? তুইও দাঁড়াস না তাহলে।”

“আমি শখ করে ভোটে দাঁড়াই না। আর আমি দাঁড়াব কিনা সেটা আমি ঠিকও করি না। পার্টি বললে দাঁড়াব না। আমার তো পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য হয়ে দু পয়সা লাভ নেই। আমার বয়েই গেছে দাঁড়াতে। আমার নাম কেটে দিন, কমরেড।”

রবীন দ্যাখে যথারীতি সঞ্জয় ফাঁদে পা দিয়ে সব ঘেঁটে ফেলছে। ও থামিয়ে দিয়ে বলে “ইস্যুটা কমরেড সঞ্জয় নয়। ও তো মাত্র এক বারের জনপ্রতিনিধি। আর তাও ও পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য, সভাপতি নয়। ফলে ওর সাথে কমরেড বলরাম ঘোষ বা কমরেড শ্যামল কংসবণিকের কোন তুলনা হয় না। আর সঞ্জয় পার্টিতেও এসেছে ওদের অনেক পরে।”

“ও, তাহলে সিনিয়রিটিটাই ওনাদের অপরাধ?” বলে ফোড়ন কাটে স্কুলমাস্টার অনাবিল। এ শ্যামলদার বাড়িতেই পড়ে থাকে দিনরাত।

“অপরাধ!” শিবু খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে। “ভোটে না দাঁড়ালে জীবন বৃতা হয়ে যায় নাকি, কমরেড?”

অনাবিল মাস্টারি ঢঙে বলে “সেটা আপনাকে বোঝানো একটু শক্ত, কমরেড।”

“তা তো বটেই। আপনি মাষ্টারমশাই বলে কথা, আমি ক্লাশ এইট পাশ ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার। আমার তো পেটে বিদ্যে নেই আপনার মত। তবে পার্টি করতে যখন এসেচিলুম, হাতটা উপুড় করে এসেচিলুম। কিচু পাব বলে তো আসিনি, আর জনপ্রতিনিধি হতে পারব, খুব নাম হবে — এসব বলেও রবীনদা, শ্যামলদারা আমাদের পার্টিতে আনেননি। এসব নতুন কতা এখন আপনাদের মুখে শুনচি। শিখচি, অনেককিচু শিখচি।”

শ্যামল আর থাকতে না পেরে বলে “আচ্ছা, আচ্ছা, অনেক হয়েছে। ফালতু বকবক করে লাভ নেই। ভোটাভুটি হোক। যে যে তালিকা বদল করার পক্ষে তারা হাত তুলুন।”

রবীন বুঝে গিয়েছিল ব্যাপারটা পক্ষে যাবে না। তবু বিরুদ্ধ মতটা মিনিটসে যাতে থাকে সেই জন্যে ভোটাভুটিতে সায় দেয়। ১০-৫ এ অপরিবর্তিত তালিকা পাশ হয়ে যায়। পরে অবশ্য শ্যামল, বলর পক্ষের দু একজন গোপনে রবীনকে বলে “কিছু মনে করবেন না, রবীনদা। জলে থেকে কি আর কুমিরের সাথে বিবাদ করতে পারি? বোঝেনই তো সব।”

সে তো রবীন বুঝতই। তাই ঠিকই করে রেখেছিল ব্যাপারটা ওখানেই ছেড়ে দেবে না, জোনাল কমিটিতেও লড়বে। কিন্তু তার আগেই সঞ্জয় চরম আহাম্মকি করে ফেলল। একদিন রাস্তার চায়ের দোকানের আড্ডায় ওকে বল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা এ কথা সে কথায় উত্তেজিত করছিল। ও ক্ষেপে গিয়ে ওখানে বসেই বলে দেয় “তোরা কমিউনিস্ট পার্টির কলঙ্ক। তোর ৭৭ সালে টিনের চাল ছিল। সেখান থেকে আজকে তিনতলা বাড়ি কী করে হল লোকে জানে,” ইত্যাদি। বলরাম উত্তরে সঞ্জয়ের বউয়ের যে বিয়ের আগে আরেকজনের সাথে প্রেম ছিল, সে কথা তুলে একটা নোংরা মন্তব্য করে। ব্যাস! সঞ্জয় টেনে এক চড় কষিয়ে দেয় ওখানেই।

আর যায় কোথায়? পরের জোনাল কমিটির মিটিঙে মূল এজেন্ডাই হয়ে যায় এই ব্যাপারটা। যেহেতু সঞ্জয়কে পার্টি মেম্বারশিপ পাইয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা ছিল রবীনের, অতএব ওকে অনেক কথা হজম করতে হয়। সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়, তদন্ত শেষ হওয়া অব্দি সাসপেন্ড করা হয়, পঞ্চায়েত ভোটের প্রার্থী তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়। বল আর শ্যামলের ব্যাপারটা তোলার সুযোগই পায় না রবীন।

সেদিন মিটিঙে রবীন সাইকেল না নিয়ে, ট্রেনে করেই গিয়েছিল। ফেরার পথে স্টেশনে বিন্দুর চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে, এমন সময় সেখানে সঞ্জয়ের প্রাণের বন্ধু হাবু এসে হাজির। সোজা এসে রবীনের উল্টো দিকে বসেই বলতে শুরু করল “আজকে জোনালের মিটিং ছিল না, রবীনদা?”

রবীন প্রচণ্ড রেগে ছিল সঞ্জয়ের উপরে। রাগ চেপে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। হাবু আরো উৎসাহ পেয়ে জিজ্ঞেস করল “সঞ্জয়ের ব্যাপারটা কী হল?”

রবীন আর থাকতে পারল না। চা খাইয়ে দিচ্ছিল ফাল্গুনী। ও যেমন রবীনের ছাত্র, তেমনি আবার বলরামের ছোটবেলার বন্ধু। হাবুও রবীনের ছাত্র ছিল। রবীন ফাল্গুনীকে বলল “ওর কানটা ধরে বার করে দে তো।” শুনেই হাওয়া খারাপ বুঝে হাবু উঠে দাঁড়িয়েছিল। রবীন দোকান কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল “দাঁড়া। পালাচ্ছিস কোথায়? তোরা কী ভাবিস? পার্টিটা মাছের বাজার? তোর এত বড় সাহস তুই আমায় জিজ্ঞেস করছিস মিটিঙে কী হল? তুই কে? তুই পার্টি মেম্বার?”

ফাল্গুনী ক্ষীণ স্বরে বলে “ছেড়ে দাও, রবীনদা।”

“চুপ কর। ছেড়ে দেব কি? এই যে শোনো হাবু, তুমি যদি আমার হাতে মারধোর না খেতে চাও, আর কোনদিন আমার কাছে পার্টির হাঁড়ির খবর জিজ্ঞেস করতে এসো না।”

হাবু ততক্ষণে হাত জোড় করে ফেলেছে। দোকানে উপস্থিত সকলে তটস্থ। বিন্দুও দৌড়ে এসেছে রবীনকে ঠান্ডা করতে। হাবু ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাচ্ছে, এমন সময় রবীন সামান্য নরম গলায় ডাকে “অ্যাই, শুনে যা।” ও কাঁপতে কাঁপতে ঘুরে দাঁড়ায়। “তোর বন্ধুকে বলে দিস আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন না আসে। মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেব।”

মেজাজটা বাড়ি এসেও তিরিক্ষে হয়ে ছিল, ভাল হল যখন হাত-পা ধুয়ে এসে বসতেই বিপ্লব হাতে একটা বই নিয়ে গা ঘেঁষে বসে বলল “বাবা, আজকে লাইব্রেরি থেকে এই বইটা এনেছি। এই কবিতাটা শোনো। দারুণ।

‘দেশসুদ্ধ লোক যতদিন

খেতে পায়নি

কমলালেবু —

খাননি লেনিন

এই গল্প

বলেছিলেন ধর্মভীরু বাবার বন্ধু

আমার তখন বয়স অল্প

পরে যখন বড় হলাম

পৃথিবী আর কমলালেবুর

এক আকারে

জড়িয়ে গেল লেনিনের নাম

চতুর্দিকে তুমুল তর্ক

কোনটা সত্যি কোনটা মিথ্যে…’”

রবীন বলতে থাকে

“কমলালেবুর ছবিও নাকি

খাপ খায় না ভূগোলচিত্রে

আমার কাছে ছেলেবেলার

সে গল্পই চিরসত্য

পৃথিবী আর কমলালেবুর

এক আকারে

লেনিনের নাম মৃত্যুঞ্জয় মনুষ্যত্ব।”

বিপ্লব চোখ বড় বড় করে বলে “বাবা! এটা তোমার মুখস্থ!”

রবীন হেসে বলে “না রে। আজকাল আর ঠিক মনে পড়ে না। এক সময় মুখস্থ ছিল। লেনিনকে নিয়ে বাংলায় কত যে দারুণ দারুণ কবিতা লেখা হয়েছে…”

“বাবা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল কেন?”

প্রশ্নটা শান্ত জ্যোৎস্না রাতে হঠাৎ আসা ঝড়ের মত স্তব্ধ করে দেয় রবীনকে। কোন মতে বলে “কে জানে, বাবা! বোধহয় আমাদেরই মত লোকেদের দোষে। নিশ্চয়ই খুব অন্যায় হচ্ছিল মানুষের সাথে। নইলে কেন মানুষ ভেঙে দেবে অমন ব্যবস্থা!”

সেদিন রাতে বিপ্লবের প্রশ্নটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুম এসে যায় রবীনের। “সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেল কেন?” তারপর আসে দুঃস্বপ্ন।

মাঝনদীতে প্রবল ঝড়ের মধ্যে পড়েছে নৌকো। কে হাল ধরবে তা নিয়ে শ্যামল আর বল ঝগড়া করে চলেছে। রবীন চিৎকার করে কিছু বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু তার কথা ঝড়ের শোঁ শোঁ আওয়াজে শোনা যাচ্ছে না মোটেই। এক কোণে মাথা নীচু করে বসে আছেন মার্কস, এঙ্গেলস আর লেনিন। রবীন প্রাণপণ চেষ্টা করছে ওঁদের দিকটায় পৌঁছতে, কিন্তু নৌকো এমন টালমাটাল, কিছুতেই এগনো যাচ্ছে না।

বারবার এই একই স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। ভোরের দিকে গাঢ় ঘুম এল। সে ঘুম ভেঙে গেল জোনাকির ডাকে। “শুনছ? শুনছ?”

বহু কষ্টে চোখ খুলতেই বলল “শিগগিরি ওঠো, গাদা লোক এসছে। শ খানেক হবে মনে হয়।”

“শ খানেক! কারা?”

“মনে হচ্ছে মিলপাড়ার লোক। তোমাদের পার্টির মোহনলাল আর সেই কি সিং? ওরা দুজন রয়েছে।”

মিলপাড়া শুনেই ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ে রবীন। সঞ্জয়ের পঞ্চায়েত সমিতি এলাকার অনেকটা জায়গা জুড়ে মিলপাড়া আর রাম কলোনি। দুটো জায়গারই বেশিরভাগ বাসিন্দা বিহার, উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব, হরিয়ানা থেকে আসা শ্রমিক পরিবার — যারা কুড়াইল জুটমিলে কাজ করে। ওদের মধ্যে সঞ্জয় অসম্ভব জনপ্রিয়। কারণ অসুস্থকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বুড়ো লোককে হাত ধরে দোকান থেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া — সবেতেই ওরা তাকে পাশে পায়। ওরা সবাই মিলে কাকভোরে রবীনের কাছে কেন?

ব্রাশটা মুখে দিয়েই বারান্দায় এসে দ্যাখে জোনাকির আন্দাজ নেহাত ভুল নয়। একশোর বেশি লোকই এসেছে। বারান্দা, উঠোন ভরিয়ে ওরা বসে আছে। যাদের জায়গা হয়নি তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে, অনেকে সামনের মাঠে। রবীন সামনেই কমরেড সত্যপ্রসাদ সিংকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে “কেয়া বাত হ্যায়? ইতনে লোগ কিস লিয়ে?”

সত্যপ্রসাদ একেবারে কানের কাছে মুখ এনে বলে “বহুত সমঝায়া, রবীনদা। কোঈ হামারা শুনতা হি নহি। ইনকো পতা চল গয়া কি সঞ্জয়দা ইস বার খড়ে নহি হোঙ্গে। বহুত দুখী হ্যাঁয় সবলোগ। ম্যায়নে কাহা কি কুছ কিয়া নহি যা সকতা। মানতে হি নহি। আখির মে কাহা ‘হামলোগ যা কে রবীনদা সে বাত করেঙ্গে। হাম নে সোচা চলো ঠিক হ্যায়, ইস সে অগর ইনকো শান্তি মিলে…”

রবীন চট করে মুখ চোখ ধুয়ে এসে সামনের মাঠে গিয়ে বসল। কে যেন বাড়ি থেকে একটা চেয়ার এনে বসতে দিয়ে বলল “আপ থোড়া উপর বৈঠিয়ে, দাদা। নেহি তো সব লোগ দেখ নহি পায়েঙ্গে।” সত্যপ্রসাদ আর মোহনলাল — মিলপাড়া আর রাম কলোনিতে পার্টির দুই পঞ্চায়েত সদস্য — রবীনের পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

ভোটারদের সাফ কথা “সঞ্জয়দা উম্মিদওয়ার নহি হোঙ্গে তো হাম লোগ পার্টি কো ভোট নহি দেঙ্গে।” রবীন তাদের বোঝাল যে পার্টি এখনো কোন সিদ্ধান্ত নেয়নি, প্রার্থী তালিকা ঘোষণাই হয়নি। কিন্তু চিড়ে ভিজল না। এরা জেনেই এসেছিল যে সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, ওর প্রার্থী হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। রবীনকে অগত্যা বলতে হল যে পার্টি ভোটারদের আবেগ নিশ্চয়ই মাথায় রাখবে প্রার্থী ঠিক করার সময়ে। উচ্চতর নেতৃত্বকে ও জানাবে এলাকার মানুষের মতামত। অতি কষ্টে এটুকু বুঝিয়ে লোকগুলোকে বাড়ি পাঠানো গেল।

তারপরই স্কুল কামাই করে রবীন ছুটল হীরুদার কাছে। সেদিন সকালের ঘটনা জেলা নেতৃত্বের কানে তুলে দিয়ে বলরাম যে রবীনকেও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করবে সেটা বলাই বাহুল্য। তার আগেই হীরুদাকে ঘটনাটা জানানো দরকার।

“ছেলেটা দেখছি শুধু মাথামোটাই নয়, নিজের সম্পর্কে খুবই উচ্চ ধারণাও পোষণ করে,” হীরুদা এক রাশ বিরক্তি নিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন। “ভোটারদের তোমার কাছে চলে আসা নিশ্চয়ই স্বতঃস্ফূর্ত নয়?”

“হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম,” রবীন বলে। “এই লোকগুলো রাজনীতি নিয়ে খুব একটা ভাবনা চিন্তা করে না। বহু বছর লেগেছে ওখানে পার্টির একটা ব্রাঞ্চ তৈরি করতে। সেখান থেকে এইরকম মোবিলাইজেশন স্বতঃস্ফূর্তভাবে হওয়া প্রায় অসম্ভব।”

“তবে? এটা করিয়ে ও নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে দিল। ওর সম্পর্কে পার্টির বিরুদ্ধে লোক ক্ষ্যাপানোর অভিযোগও চলে আসবে। এবং সে অভিযোগ অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। ওর বহিষ্কার ঠেকায় কার সাধ্যি!”

রবীনের সেদিন আর কিছুই বলার মুখ নেই।

“যাকগে, আশু সমস্যাটার আগে সমাধান করা যাক,” হীরুদা বলেন। “মানে ওখানে কে প্রার্থী হবে সেটা।”

“ঐ সিট এ বারে খরচের খাতায় ধরে নিন। জ্যোতি বসু দাঁড়ালেও জিতবেন না। এই মোবিলাইজেশনটা স্বতঃস্ফূর্ত না হলেও, সঞ্জয়ের জনপ্রিয়তা ঐ এলাকায় একদমই বানানো নয়। ওরা সত্যিই পার্টির উপর রাগ করে অন্য প্রার্থীকে জিতিয়ে দেবে।”

হীরুদা এবার একটু অসন্তুষ্টই হলেন। “তুমি বহু যুদ্ধের সৈনিক, কত অসম্ভব সব সিট জিতিয়েছ। এরকম ডিফিটিস্ট কথাবার্তা বলছ কেন? দু তিনদিন সময় নাও, ওখানে জিততে পারে এরকম প্রার্থীর নাম ভেবে আমায় জানাবে।”

রবীনের দুদিন ধরে রাতে ঘুম এল না। ঐ দুটো পাড়ায় চারটে গ্রাম সংসদের সিট, সেগুলোতে কংগ্রেসের ভোট দিন দিন কমছে আর বিজেপির বাড়ছে। আগের বছর একটার উপনির্বাচনে বিজেপি দ্বিতীয় হয়েছে। শেষে বিজেপি জিতবে ক্ষেত্রগ্রামে! ছি ছি! তিন দিনের দিন সাতসকালে শিবু মণ্ডল এল।

“যাক, অন্য লোক এসে যাওয়ার আগেই পৌঁচে গেচি,” হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

“বোস, বোস। কী হয়েছে?”

“সঞ্জয়টা একদম পাগল হয়ে গেচে, রবীনদা। কালকে প্রায় মাঝরাতে আমার বাড়ি বয়ে এসে পার্টিকে গালমন্দ করে গেল… সবই অভিমানের কতা… ‘পার্টি দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি দিতে পারে না, যত শাস্তি আমার মত লোকেদের জন্যে’, ‘আমি কোনদিন কারো থেকে একটা সিগারেটও নিই না আর আমাকেই পার্টি সাসপেন্ড কল্ল’, এইসব। আমি বোজালাম যে অন্যায় তো তুমিই করেচ। রাস্তার মদ্যে পার্টির লোকের সঙ্গে ঝগড়া কত্তে তোমাকে সবাই অনেকবার বারণ করেচে, রবীনদা কতবার বলেচে, তুমি শুনেচ কারো কতা? আচ্ছা মুখে নয় যা বলেচ বলেচ, তুমি গায়ে হাত তুললে কেন? ভাল হোক মন্দ হোক, বলদা পার্টির নেতা। এইটা মেনে নিলে পার্টিতে কোন ডিসিপ্লিন থাকবে?’ সে কোন কতাই শোনে না। বলে ‘যা করেচি বেশ করেচি, বল একটা দু নম্বরি ছেলে। ওরই শাস্তি হওয়া উচিৎ।’”

“এসব তো ও বলবেই এখন। কিন্তু তুই এই বলতে সক্কালবেলা হাঁপাতে হাঁপাতে এলি? ধীরে সুস্থে এলেই তো হত। কিছু খেয়ে এসেছিস?”

“না না। সকাল হওয়ার অপেক্ষায় চিলাম। আসল কতাটা অন্য…”

“দাঁড়া, দাঁড়া। কথা পরে।”

রবীন রান্নাঘরে গিয়ে জোনাকিকে বলে আসে “শিবুটা কিন্তু খালি পেটে এসেছে।”

জোনাকি বলে “সে তো বুঝতেই পেরেছি। সকাল সাতটার সময় কি আর বউ ঘুম থেকে উঠে ওকে ভালমন্দ জলখাবার দিয়েছে? দিচ্ছি আমি।”

রবীন বাইরের ঘরে এসে বিড়ির প্যাকেট আর দেশলাইটা শিবুর হাতে ধরিয়ে বলে “এবার বল।”

শিবু রবীনেরটা ধরিয়ে দিয়ে, নিজেরটা ধরিয়ে বলে “শেষে আমায় বলল ‘আমি কিন্তু বসে বসে দেকব না।’ আমি বললাম ‘কী করবে?’ বলল ‘আমি নিদ্দল দাঁড়াব।’ বললাম ‘পাগল নাকি! এসব কোরো না, আর কোনদিন পার্টিতে ফিরতে পারবে না। মাতা ঠান্ডা করো।’ বলল ‘আমি মাতা ঠান্ডা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েচি, বাড়ি বাড়ি প্রচারও শুরু করে দিয়েচি। নমিনেশন জমা দেয়া যেদিন শুরু হবে, সেদিনই আমি জমা দোব। তোরা যাকে পারিস দাঁড় করা, আমিই জিতব।’”

রবীন সেদিনই স্কুল থেকে ফিরে আবার ছুটল হীরুদার কাছে।

“তা তুমি বিকল্প কিছু ভাবলে?”

“নাঃ। তেমন কারোর নাম মাথায় আসছে না, হীরুদা।”

“আর ভেবে কাজ নেই। ঐ রগচটা ছোকরা তোমার কাজটা নিজেই করে দিয়েছে,” হীরুদা একগাল হেসে রবীনের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলেন।

“মানে?”

“মানে ওখানে এখন একজনই পার্টির প্রার্থী হতে পারে। সে প্রার্থী হলে ও ব্যাটা নির্দল হয়ে দাঁড়াবেও না, আর আমরাও সিটটা হারব না।”

“কে সে?”

“তুমি।”

“আমি!”

“অফকোর্স। তুমি ঐ জুটমিলে সিটু করেছ দীর্ঘদিন। ঐ এলাকার লোকেরা এখনো যে পার্টি বলতে তোমাকেই বোঝে সে তো দেখাই যাচ্ছে। তুমি দাঁড়ালেও যদি ঐ ছোঁড়া দাঁড়ায়, ও হেরে যাবে। ইফ ইউ বিলিভ মাই গ্রে হেয়ার। তবে আমি তোমাকে স্ট্যাম্প পেপারে লিখে দিতে পারি, তোমার নাম অ্যানাউন্স হয়ে গেলে ও আর দাঁড়াবে না।”

“কিন্তু হীরুদা, যারা দুবারের বেশি পদাধিকারী তাদের আর দাঁড়ানো উচিৎ না — এই যুক্তি দিয়ে যে আমি বল আর শ্যামলদাকে আটকাতে চাইছিলাম… এখন আমি নিজে ভোটে দাঁড়াব?”

“আরে, দরকার তো ওদের ক্ষমতা কেড়ে নেয়া। সেটা ভোটের পরেও করা যাবে। ওটা করেই ছাড়ব। আই প্রমিস। এখন এই সিটটা জেতা বেশি জরুরী। এটা পার্টির প্রেস্টিজের প্রশ্ন, রবীন। আর ওটা নন-বেঙ্গলি এলাকা। আমাদের ঝামেলায় ওখানে বিজেপি জিতে গেলে খুব খারাপ হবে।”

হীরুদার হিসাব নির্ভুল। জমা দেওয়ার শেষ তারিখ পেরিয়ে গেল, সঞ্জয় মনোনয়ন জমা দিল না। রবীনও বিপুল ভোটে জিতে গেল। তবে আসল লড়াইটার কথা তখনো সে ভোলেনি।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply