নাম তার ছিল: ১৩

পূর্বকথা: দক্ষিণপাড়ায় নারী নির্যাতনের একটা ঘটনায় রবীন কমরেডদের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্যাতিতার পক্ষে দাঁড়াল। জোনাকি ছাড়া সবাই সরে গেল পাশ থেকে। স্নেহভাজন বলরাম শত্রু হয়ে গেল, প্রাণের বন্ধু নবারুণের সাথে বিচ্ছেদ হল।

বয়স বাড়ার লক্ষণ কিনা কে জানে, ইদানীং রবীনের প্রায়ই কী কী হল না সেসবই মনে হয় বেশি, কী কী হল তা ভাবতে ইচ্ছে করে না। পাগল মহারাজকে একদিন এ কথা বলতে উনি যথারীতি খুব হালকা চালে বললেন “কেন? কী এমন হয়নি আপনার? আপনি সফল মাস্টারমশাই, সবাই শ্রদ্ধা করে, আপনার ছেলে মানুষ হয়েছে, বিরোধী পার্টির লোকেরাও মানে প্রশাসক হিসাবে আপনি অনেক ভাল কাজ করেছেন। আর কী চেয়েছিলেন?”

সবই সত্যি কথা, তবু রবীন মাথা নেড়ে বলে “হয়নি গো মহারাজ, হয়নি। যা করবার কথা ছিল তার কিস্যু হয়নি। একবার তাকিয়ে দেখুন চারদিকে… বড়লোক আরো বড়লোক হচ্ছে, গরীব আরো গরীব হচ্ছে… আশপাশে কত কলকারখানা বন্ধ। জোয়ান ছেলেগুলোর চাকরি বাকরি নেই তাই অ্যান্টি সোশালদের দলে নাম লেখাচ্ছে। আমরা কিছুই বদলাতে পারলাম না।”

“কে বললে? রাস্তাঘাট সাতাত্তরের আগে যেমন ছিল তেমনটাই আছে এখনো? আমাদের এই শ্রীপুর-মদনপুর এলাকায় এত পাকা রাস্তা ছিল? একটাও নতুন ইস্কুল হয়নি? আগের চেয়ে বেশি লোক লেখাপড়া শিখছে না? যার কুঁড়ে ঘর ছিল, তার পাকা বাড়ি হয়নি?”

“ওগুলো ঠিক বদল নয়। সমাজটা বদলাল কই? মিস্তিরির ছেলে মিস্তিরি হচ্ছে, কাজের লোকের মেয়ে কাজের লোক হচ্ছে। একে বদল বলে?”

পাগল মহারাজ মুচকি হেসে বলেন “সমাজটা বদলায়নি বটে, কিন্তু কিছু কিছু বদল তো হয়েছে। তা-ই বা কম কী? কবি কী বলেছেন?”

“কী বলুন তো?”

“জীবনে যত পূজা হল না সারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা। যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে, যে নদী মরুপথে হারাল ধারা, জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।”

রবীন সন্তুষ্ট হতে পারে না, তবে অন্য একটা কথা মনে পড়ায় অল্প হাসে।

“আপনার এই কথার মধ্যে লাগসই কবিতা কি গানের লাইন বসিয়ে দেয়াটা এক্কেবারে হীরুদার মত।”

কথাটা বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল রবীনের। ঐ লোকটা যদ্দিন ছিল, জেলার পার্টিটা তবু একটা নিয়মের মধ্যে ছিল। যারা গড়বড়ে লোক তাদের মনে ভয় ছিল, হীরুদার কানে কিছু গেলে বিপদ হবে। তিনি চলে যাওয়ার পরে একেবারে মগের মুলুক হয়ে গেল। অবশ্য উনি নিজেই শেষ দিকে বলতেন ঘোর দুর্দিন আসছে।

“একে পার্টিটা আবাসিক পার্টি হয়ে গেছে, তার মধ্যে নেতাদের মাথায় ঢুকেছে ভোটের হিসাব, বুঝলে? কী যে হবে পার্টিটার!” একা একা যখন কথা হত, তখন বলতেন রবীনকে।

“আবাসিক মানে কী বলছেন, দাদা?”

“মানে হওয়া তো উচিৎ বিপ্লবী পার্টি। হয়েছে তোমার আমার মত ছা পোষা লোকের পার্টি। হওয়া উচিৎ শ্রমিক কৃষকের পার্টি, হয়েছে মাস্টার, সরকারী কর্মচারী — এদের পার্টি। কারা সব নেতা দ্যাখো না। তুমি ইস্কুল মাস্টার, আমি এক সময় কলেজে পড়াতাম, পরে হোলটাইমার হয়েছি। তোমার লোকাল কমিটিতে এখন শ্রমিক, কৃষক কমরেড কজন?”

“তিনজন আছে বন্ধ কারখানার শ্রমিক। কৃষক তো একজনও নেই।”

“তাহলেই বোঝো। যাদের জন্যে পার্টি, তারাই নেই। এভাবে কমিউনিস্ট পার্টি চলে? ওপর দিকে তাকাও, সেখানেও দেখবে একই গল্প। বুদ্ধ ছাত্র নেতা, বিমান ছাত্র নেতা, অনিল ছাত্র নেতা। মন্ত্রিসভাতেও ছাত্র নেতার ছড়াছড়ি। এত ছাত্র নেতা কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে ভাল নয়।”

“কিন্তু হীরুদা, ছাত্র নেতাদের আমলে পার্টিতে অশিক্ষিত কমরেডদের এত রমরমা কী করে হয়?”

“কেন হবে না? সব তো তেলে আছাড় খায়। এ কি জ্যোতিবাবু পেয়েছ? ওর সামনে ওর প্রশংসা করলে তো শুনল কি শুনল না তা-ই বোঝা যায় না। আর এদের সামনে গিয়ে একবার বলো না ‘দাদা, আপনি সারাদিন কী পরিশ্রম করেন! চোখে দেখা যায় না।’ দেখবে তোমার মুখটা ঠিক চিনে রেখে দেবে। তবে তাতেও তত ক্ষতি হয় না। আসল ক্ষতি অন্য জায়গায়।”

“কিসে?”

“ঐ যে বললাম — ভোটে জেতাটাই মোক্ষ হয়ে উঠেছে। যদ্দিন শৈলেন ছিল কে কত বড় নেতা সেটা কত ভোটের লিড দেওয়ায় তা দিয়ে বিচার হত না। এখন ঐটেই সবচেয়ে বড় কথা। জেলার নেতারাও তাই বুঝেছে। ঐ যে তোমার শিষ্য বলরাম…” এই নামটা উঠলেই হীরুদা কয়েক সেকেন্ড হো হো করে হাসতেন, রবীনকে মনে করিয়ে দিতে যে মানুষ চিনতে কত বড় ভুল সে করেছিল। “সে তো এখন তোমাদের এম পি র গাড়িতে চেপে প্রায়ই আলিমুদ্দিনে যাচ্ছে। জানি না অনিলের সাথে আলাপ হয়ে গেছে কিনা, হলে আশ্চর্য হব না। ও ছেলে কি অচ্যুতের পিছু পিছু ঘুরছে খুব শ্রদ্ধা করে বলে? যদি তা-ও হয়, অচ্যুত অত পাত্তা ওকে কেন দেয় বলো দেখি?”

“সে তো ক্ষেত্রগ্রামের বাচ্চারাও জানে। ওখান থেকে তো ও প্রায় হান্ড্রেড পার্সেন্ট ভোট পাইয়ে দেয় অচ্যুত মুখার্জিকে।”

“তবে? কত বড় নেতা বলো দেখি,” বলতে বলতে হীরুদা হেসে গড়িয়ে পড়তেন। “তুমি পারবে ওরকম? তুমি যে অত বড় এলাকায় পার্টিটাকে নিজের হাতে তৈরি করলে, জেল খাটলে, তবু তো তোমার পাড়ার বুথের সব ভোট পার্টিকে এনে দিতে পারো না। পারো কি?”

রবীন হাসতে হাসতে জবাব দিত “রক্ষে করুন, কমরেড। ওসব পারব না। বাইরে থেকে লোক এনে ভোট দেওয়াব, তারপর আমায় এলাকায় মুখ দেখাতে হবে না?”

“ঐখানেই তো ফেঁসে গেলে হে ছোকরা। অতখানি এলাকার সব বাড়ির লোককে যে চিনে ফেলেছ। কোন বাড়িতে এক বেলা হাঁড়ি চড়ে আর কোন বাড়ি দু বেলা, সেইটে যে জেনে ফেলেছ। তারাও যে রবীন ঘোষালের নাড়ি নক্ষত্র জানে। বিপদে পড়লে দৌড়ে এসে তোমার বাড়িতেই ঢুকবে, আবার রাগ হলে তোমাকেই এসে গালমন্দ করবে। তাই করে আসছে এত বছর। এখন তো আর তাদের চোখ রাঙাতে পারবে না। ঐ জন্যেই যেই আমি পি জি হাসপাতালের মর্গে ঢুকব, দেখবে বলরাম ডিসিএম, এম এল এ ইত্যাদি ইত্যাদি হয়ে যাবে। তুমি সেই জোনাল কমিটির মেম্বার হয়েই থেকে যাবে।”

রবীন হাত জোড় করে বলত “থাক, দাদা। আমি তো বড় নেতা হব বলে পার্টি করতে আসিনি। যেটুকু প্রশাসনে কাজ করতে হয়েছে সেটাও পার্টির ইচ্ছায়। খুব ভাল কিছু করতে পারিনি। যথেষ্ট হয়েছে। আর আমার দরকার নেই।”

হীরুদা পিঠে একটা থাপ্পড় মেরে বলতেন “অফকোর্স, অফকোর্স। মানুষের স্বার্থকে যে নিজের স্বার্থের চেয়ে অনেক উপরে রাখে সে-ই তো আসল কমিউনিস্ট। তবে হাল ছেড়ো না কমরেড। আমরা যেরকম দুনিয়া চাই আমার জীবনে সেটা হল না বলেই যে কোনদিন হবে না, এরকম ভাবার কোন কারণ নেই।”

“হবে, হীরুদা? সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও বলছেন হবে?”

“আলবাত। মানুষের স্বপ্ন দেখা অত সহজে শেষ হয় না, কমরেড। আর সমাজের পরিবর্তনও থেমে থাকে না। ডায়ালেকটিক্স তো তাই বলে। আমাদের কবিও তো তাই বলেছেন, তাই না?”

“কবি! কোন কবি?”

“কোন কবি আবার? আরে আমাদের সবচেয়ে বড় কবি। ঐ যে গানটা — শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে।” হীরুদা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

“মাস্টারমশাই, এবার উঠে পড়ুন। আকাশের অবস্থা ভাল না। আপনার তো সঙ্গে ছাতা নেই।” মহারাজের কথায় রবীনের সম্বিত ফেরে। সত্যিই তো! মোটে তো সাড়ে পাঁচটা বাজে। এরই মধ্যে অন্ধকার করে এল!

সাইকেলে উঠে পড়ে রবীনের আর চালাতে ইচ্ছা করে না। কিসের এত বাড়ি ফেরার তাড়া? কী-ই বা করার আছে বাড়িতে? জোনাকি থাকলেও ওর সাথে আজকাল তো কথা থাকে না, আর আজ তো ও-ও নেই। বাইরে কোথাওই খেতে হবে। এই ভর সন্ধেবেলা বাড়ি না ফিরলেই হয়। কোথাও সময়টা কাটিয়ে একেবারে খাওয়াদাওয়া সেরে বেশ রাতে বাড়ি ঢুকলেই হয়। তবে সত্যি যদি বৃষ্টিটা নামে, তাহলে মুশকিল হবে বটে। তাছাড়া সময় কাটানোর মত তেমন জায়গাই বা কোথায় আছে? খাওয়াটা না হয় রঘুর হোটেলে সেরে নেওয়া যাবে, গোটা সন্ধে কাটবে কোথায়? জোনাকি ঠিকই বলে। “সারাজীবন শুধু পার্টিই করে গেলে। আত্মীয় স্বজনের সাথে তো সদ্ভাব রাখলে না।”

আসলে ও তো বোঝে না, পার্টি করতে গিয়ে কত মানুষ আত্মীয় হয়ে গেছে। এখন অবশ্য দিন পাল্টেছে। পার্টি আর মানুষকে তেমন আপন ভাবে না, মানুষও তাই পার্টিকে আপন করে নেয় না। অথচ এখন তো পার্টি ক্ষমতায়। যখন সি পি এম কর্মী মানেই পুলিশ আর কংগ্রেসী গুন্ডার টার্গেট ছিল, তখন মানুষ বুক দিয়ে আগলে রেখেছে, দু হাত ভরে আশীর্বাদ করেছে। বাহাত্তরে মানুষ সে আশীর্বাদ ব্যালট বাক্সে দিতে পারেনি, তবু পরের পাঁচ বছর পুলিশ আর গুন্ডার চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে রবীনদের ভাত দিয়েছে, লুকিয়ে রেখেছে ঘরে। দক্ষিণপাড়ার মিনতি বৌদি যেমন।

রাতুলদা আর মিনতি বৌদির সেই যুগে প্রেম করে বিয়ে। রাতুলদা মাটির মানুষ। কুড়াইল জুটমিলে রোজের হিসাবে কাজ করতেন। দোষের মধ্যে লোকটা আপাদমস্তক শিল্পী। গরীবের অতটা শিল্পী হলে চলে না। হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন তো আর উঠবেন না, ডিউটি যেতে চাইবেন না। গাইতেনও বড় চমৎকার, অথচ গরীব বাড়ির ছেলে হওয়ায় গানটা কোনদিন শেখা হয়নি ঠিক করে। পাড়ায় পাড়ায় গেয়েই জীবন কেটেছে। রবীনরা সব স্কুলজীবন থেকেই রাতুলদার ভক্ত। নটনটীর সব যাত্রায় যে চরিত্রকে গান গাইতে হত, সেটা রাতুলদার জন্যে রাখা থাকত। অমন সাদা মাঠা লোকটাকেও আশপাশের পাঁচটা এলাকার লোক চিনত গানের জন্যে। বৌদিও একেবারে অল্প বয়সে ঐ গান শুনেই প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। ধনী চাষী পরিবারের আদুরে ছোট মেয়ে, চেহারাটিও সরস্বতী ঠাকুরের মত। দাদাদের তাই মত ছিল না বিয়েতে। তারা তো জানত রাতুলদা কেমন লোক। তার উপর বৌদির চেয়ে বারো-তেরো বছরের বড়। বৌদি বলতে গেলে পায়ে হেঁটে রাতুলদার বাড়ি চলে এসে তিন কুলে কেউ না থাকা লোকটাকে বিয়ে করেছিল। কি আশ্চর্য! রাতুলদাকে কাজকম্ম করতে জোরও করত না। বরং বাড়াবাড়ি দেখলে রবীন, নবারুণরাই বলত “দাদা, ডিউটি যাওয়াটা একেবারে ছেড়ে দিও না। সংসারটা চলবে কী করে? বৌদি, তুমি বকো না কেন?”

“বকে কী হবে, ঠাকুরপো? ও গান না গাইলে আমারও ভাল লাগে না, ওরও দেখেছি মুখ চোখ কেমন শুকিয়ে যায়।”

“আরে তা পেটে ভাত না থাকলে গলায় গান আসবে কোত্থেকে?”

“সে আমাদের দুটো ঠিক জুটে যাবে। আমিও তো একেবারে বসে নেই। ওকে বিয়ে তো করেছিলাম গান ভালবেসে। বর আমায় সোনায় দানায় মুড়ে রাখবে এমনটা তো আমি চাইনি কখনো।”

বৌদির তখন বয়স বছর পঁচিশেক হবে, তিনটে ছোট ছোট ছেলে, দাদা ঐরকম। বৌদি ঠোঙা বানানোর কাজ করত, শাড়িতে ফলস লাগাত। ঐ অভাবের সংসারে যখন তখন গিয়ে রবীনের মত দেওররা আবদার করত “বৌদি, কাল থেকে কিচ্ছু খাওয়া হয়নি। দুটো খেতে দেবে?” তখন হয়ত বৈশাখ মাসের দুপুর তিনটে, রাস্তায় কাকপক্ষী নেই। নেই বলেই পুলিশ আর তাদের ফেউদের থেকে পালিয়ে বেড়ানো দেওরদের মিনতি বৌদির কাছে আশ্রয় নেওয়ার ওটাই সঠিক সময়।

বা তখন হয়ত আষাঢ় মাসের রাত দুটো। অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৌদির বাড়ির তিন দিকে তখন দু মানুষ উঁচু আগাছার ঝোপ আর এক দিকে রাস্তা, কিন্তু সে-ও তিন-চারশো মিটার দূরে। সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশীর বাড়ি থেকেও গলা সপ্তমে চড়িয়ে ডাকলে তবে শোনা যায়। সেই জন্যেই লুকোবার পক্ষে আদর্শ জায়গা বাড়িটা। কখন কে আসছে, কে যাচ্ছে নজরে রাখা শক্ত। ঝট করে পালাবারও অসুবিধা নেই। অমন রাতে যে ফাঁকা মাঠ পেরিয়ে ঝোপ জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটা, সেই মাঠের শুরুতে পৌঁছলেই হয়ত শোনা যেত রাতুলদা গাইছে “বিরহে গাঁথা মালা / ফেলিও পথ ’পরে। বাহিরে ঝড় বহে / নয়নে বারি ঝরে।” জঙ্গল পেরিয়ে বারান্দায় ওঠা মাত্রই জানলা দিয়ে দেখতে পেয়ে গাইতে গাইতেই উঠে এসে দরজা খুলে দিত। দরজা খোলার শব্দ হলেই উঠে পড়ত বৌদি। যে এসেছে তার যে আসল দরকার বৌদির হাঁড়িটা, সে কথা বলে দিতে হত না।

কিন্তু অমন পাণ্ডববর্জিত জায়গায় বাড়ি হওয়া বৌদির জন্য বড় বিপদের ছিল। কোন রাতে রাতুলদার নাইট ডিউটি আছে তা রবীনরা না জানলেও বেশ কিছু ভাদ্রের কুকুর জানত। তারা সুন্দরী মিনতি বৌদির জন্যে ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে হাজির হত, দরজা ধাক্কাত, জানলা ধাক্কাত। কোন কোন বেহায়া “দে না, দরজাটা খুলে দে না” বলে ডাকাডাকিও করত। বৌদি তাই রাতুলদার নাইট ডিউটি থাকলে মাথার কাছে দা নিয়ে শুত। উপদ্রব শুরু হলেই তিন ছেলের ঘুমের বারোটা বাজিয়ে চিৎকার শুরু করত “আয় না, একবার দরজা ভেঙে ঢুকে দ্যাখ। এক কোপে গলা না নামিয়ে দিই তো আমি চাষার মেয়ে না।” তারপর খিস্তির ভাণ্ডার উজাড় করে দিত। রবীনকে বেশ কয়েকবার দরজা ধাক্কিয়ে গালাগাল শুরু হতেই আওয়াজ দিতে হয়েছে “বৌদি, আমি, আমি। রবীন।”

সেই বৌদি আশি সালে বিধবা হল। কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ দিন সাতেকের জ্বরে রাতুলদা একেবারে অকালে মারা গেল। ভাগ্যিস ততদিনে বৌদির বাড়ির আশপাশের জঙ্গল কেটে সাফ হয়েছে, দুটো একটা নতুন বাড়ি উঠেছে। বড় ছেলেটা তখন রবীনদের স্কুল থেকে সবে মাধ্যমিক পাশ করেছে, নেহাত খারাপ ছাত্র নয়। কিন্তু ওর ভাই দুটোর একটা মোটে ক্লাস সিক্স, আরেকটা ক্লাস ওয়ান। তাই পাড়ার সকলে বললে, বাবার জায়গায় বড়টাকে কাজে পাঠানো হোক। সেই সময় সিটুর লাগাতার আন্দোলনের জেরে কারখানাটায় ক্যাজুয়াল ওয়ার্কারদের অনেককে পাকা চাকরি দেওয়া হচ্ছে। এম এল এ সৌগতদা বললেন “ওকে এই যাত্রায় ঢুকিয়ে দাও রবীন। রাতুলদা, বৌদির কাছে আমাদের কারোর ঋণ তো কখনো শেষ হবে না। এইটুকু আমরা করি। দাদা বেঁচে থাকলে ওনার চাকরিটা এমনিই হয়ে যেত… কম দিন তো কাজ করেননি ঐ ফ্যাক্টরিতে।”

ঘরে যখন চাল বাড়ন্ত ছিল তখন তৈরি হওয়া ভাতের আবদার ও বাড়িতে রবীনের রয়েই গিয়েছিল। ৯৫-৯৬ সাল অব্দিও জোনাকি বিনা নোটিসে কোথাও চলে গেলে রবীন বৌদির বাড়ির পাশ দিয়ে শর্ট কাটে স্কুল যাওয়ার সময়ে হাঁক দিয়ে যেত “বৌদি, আমার জন্যেও দুটো চাল নিও।”

টিফিনে গিয়ে ওদের বাড়ির মাটিতে বসে খেতে খেতে একদিন প্রশ্নটা করেই ফেলেছিল রবীন।

“আচ্ছা বৌদি, ঐ অভাবের মধ্যে আমরা সব আসতাম আর তুমি ঠিক কিছু না কিছু দিতে রাত বিরেতে। সত্যি বলো, পেতে কোথায়? তোমাদের কম পড়ে যেত না?”

বৌদি মুচকি হেসে বলত “মন বড় যার, কম তার পড়ে না ঠাকুরপো। এ তোমার দাদার কথা। আর কী এমন মণ্ডা মিঠাই দিয়েছি খেতে? ফেনাভাত, কাঁচালঙ্কা। খুব বেশি হলে দুটো কুমড়ো ফুল ভাজা। ঠিকই, অনেক সময় আমরা স্বামী স্ত্রী না খেয়ে থেকেছি। কিন্তু ভগবান তো দেখেছেন সব। ফিরিয়ে তো দিয়েছেন। বড় ছেলের চাকরি হয়েছে, মেজটার ফুটবল খেলে কাগজে নাম বেরোচ্ছে। ও-ও দাঁড়িয়ে যাবে ঠাকুরের আশীর্বাদে। যাবে না, বলো?”

“আলবাত যাবে। পটলার পায়ে যা কাজ আছে না! আহা! ও জুনিয়র না, একদিন ইস্টবেঙ্গলের সিনিয়র টিমের ক্যাপ্টেন হবে। লিগ, শিল্ড, ডুরান্ড — সব জিতবে।”

“ব্যাস! তাহলেই তো আমার আর ছোটটাকে নিয়েও চিন্তা থাকবে না। নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারব।”

রবীন হা হা করে হেসে উঠত। “এমন বলছ, যেন তোমার সত্তর টত্তর হল। তোমার বয়স এখন খুব বেশি হলে পঞ্চাশ।”

“উনি তো তার চেয়েও কম বয়সে গেলেন।”

“সে তোমার ভগবানকে জিজ্ঞেস কোরো। এই যে বললে ‘তিনি সব ফিরিয়ে দিয়েছেন’? কম তো নেননি। দাদাকে নিলেন, তোমার ছোট ছেলেটাকে ঠিক সুস্থ, স্বাভাবিক করলেন না… অন্তত দাদার ভাগের বছরগুলো তোমায় ফিরিয়ে দিন।”

বৌদি জিভ কেটে বলত “ছি ছি ছি! ঠাকুরের পায়ের নীচে বসে ভাত খাচ্ছ, ঠাকুরপো। ভগবানের সঙ্গে হিসেব করে নাকি!”

তা বৌদির ভগবানের দেখা গেল পাটোয়ারি বুদ্ধি দিব্যি আছে। প্রাণে মারলেন না, কিন্তু কালা করে দিলেন বছর পাঁচেক পরেই। তারপর ছানি পড়ল, কাটা হল। তবু দৃষ্টিটা পুরোপুরি ফেরত এল না। আজকাল তো মাথাটাও ঠিক কাজ করে না। ছেলে, ছেলের বউ অনেক করে বোঝালে বোঝে রবীন এসেছে। তারপর হাতটা ধরতে চায়, মাথা নেড়ে এক গাল হাসে এবং অবধারিত বলে “এইভাবে খালি পেটে দিনের পর দিন ঘুরে বেড়ানো ভাল না, ঠাকুরপো। পিত্ত পড়ে।”

বৌদির বড় ছেলেটা সত্যিকারের মানুষ হয়েছে, কারখানায় কাজ করে পাকা ঘর তুলেছে, মাকে ভাল রেখেছে। ওর বউটা রবীনেরই এক পার্টি কমরেডের মেয়ে, খুবই ভাল মেয়ে। গেলে আর ছাড়তে চায় না। অসুবিধাটার কথা জানে বলে নিজে হাতে চা-ও খাইয়ে দেয়। কিন্তু বৌদিকে দেখে এত কষ্ট হয়, যে রবীন ও বাড়ির ছায়া আর মাড়ায় না। জানে আজ রাতেও গেলে বাচ্চা মেয়েটা ঠিক যত্ন করে ভাত দেবে। কিন্তু বৌদির সে ফেনাভাতের স্বাদ কি আর পাওয়া যাবে ঐ ভাতে?

“স্যার, ভিজে গেছেন। ঠান্ডা লাগবে যে। শিগগির আমাদের বাড়ি আসুন।”

ছাত্র সুবিমলের গলার স্বরে ঘোর কাটে রবীনের। কখন যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি নেমেছে! সাইকেল চালাতে চালাতে সেই গলামন পাড়ে পাগল মহারাজের আশ্রম থেকে হরিমতীর ঝিলের ধারে এসে পৌঁছে গেছে! গাঢ় সন্ধে নেমেছে। সুবিমল কোত্থেকে সাইকেল চালিয়ে পাশে এসে পড়েছে। প্রায় টানতে টানতে নিয়ে গেল বাড়ি। ঢুকতেই ওর মা গামছা দিল গা-মাথা মুছতে। রবীন পাঞ্জাবিটা খুলে ঘরের দড়িতে মেলে দিয়ে মাথাটা ভাল করে মুছে চৌকিতে বসল।

সুবিমল ভিতরে গেল। ছেলেটা লেখাপড়াটা মন দিয়েই করছে — চৌকিময় বই খাতা। দেখে একটু নিশ্চিন্ত লাগল রবীনের। কিন্তু গাদার নীচে লাল মত ওটা কী বই! পড়ার বই তো অমন দেখতে হয় না সাধারণত! ছাইপাঁশ সহায়িকা পড়ছে না তো! রবীন টেনে বার করল। ‘সাচ্চা কমিউনিস্ট কি করে হতে হবে’। লিউ শাও কির লেখা সেই বিখ্যাত বইটা। হাতে নিয়েই চিনেছে রবীন। ওরই তো বই। না চেনার প্রশ্নই নেই। এই তো, ভিতরে কাঁপা হাতে লিখে রেখেছিল

রবীন ঘোষাল

১৩/১০/১৯৯৭

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সুবিমল ততক্ষণে ঘরে ঢুকেছে, ঢুকেই স্যারের হাতে বইটা দেখে চক্ষুস্থির। রবীন খুব গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে “এটা এখানে কোত্থেকে এল?”

“ভুল হয়ে গেছে, স্যার। মানে আপনাকে বলেই আনতাম। কিন্তু আপনি তো পরীক্ষা বলে অন্য বই পড়তে দিচ্ছেন না… খুব ইচ্ছা করছিল, স্যার… আপনার আলমারিতে দেখে… পড়ার সময় পড়ি না… সত্যি বলছি।”

রবীন গামছায় চশমাটা মুছতে মুছতে বলে “হুম”। আর ভাবে “আমার অনাগত আমার অনাহত / তোমার বীণাতারে বাজিছে তারা — / জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।”

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply