নাম তার ছিল: ১২

পূর্বকথা: গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ল রবীন। ডাক্তার দেখাতে ট্রেনে বাসে কলকাতায় যাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। অশক্ত অবস্থায় রোড কন্ট্র্যাক্টরের গাড়িতে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ার ব্যবস্থা মেনে নিতেই হল।

নির্জন বাড়িটায় সারাদিন একলা ভূতের মত বসে থাকা জোনাকির খবর নিতে আজকাল একজনই আসে — নবারুণ। এলে খুব যে কথা হয় তা নয়। দুজনে মুখোমুখি বসে থাকে, একটা দুটো কথা বলে। নবারুণ জিজ্ঞেস করে জোনাকির শরীর ঠিক আছে কিনা, জোনাকি জিজ্ঞেস করে নবারুণের সুগার এখন নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, ওর স্ত্রী সুদেষ্ণার প্রেশার কমল কিনা, ছেলে-ছেলের বউয়ের কী খবর, নাতি কত বড় হল।

একটা কলেজের প্রিন্সিপাল হয়ে অবসর নিয়েছিল নবারুণ, বছর দশেক আগে। ততদিনে ছেলে চাকরি পেয়ে গেছে, সবুজগ্রাম থেকে কলকাতা যাতায়াত করা কলেজজীবন থেকেই তার পোষায় না বলে সে ভাড়াবাড়িতে থাকত। ফিরে আসার প্রশ্নই নেই। সুদেষ্ণাও দু তিনটে জায়গার পার্ট টাইম পড়ানো সেরে প্রায়ই ছেলের কাছে থেকে যেত। মাঝে মধ্যে আসত শুধু নবারুণ সবুজগ্রামের বাড়িতে থাকত বলে। না থেকে উপায়ই বা কী? হাওড়া থেকে কালাদীঘি যেতে হলে প্রথমে ট্রেন, তারপর বাস, শেষে রিকশা — প্রায় তিন ঘন্টা সময় লাগে; সবুজগ্রাম থেকে মোটে সোয়া এক ঘন্টা। অবসরের পরে আর ছেলে, বউ ছাড়বে কেন? নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে তাই নবারুণ কলকাতাবাসী হয়ে গেছে বহুদিন। এখন মাসে দু মাসে একবার সবুজগ্রামে আসা, যদ্দিন না বাড়িটা বেচে দেওয়া হচ্ছে।

সুদেষ্ণা আর ছেলে খুবই চাইছে বেচে দেওয়া হোক। অন্য দাদা-বউদিরা জীবিত নেই, তাদের ছেলেমেয়েরাও রাজি। কিন্তু নবারুণই কিছুতে মনস্থির করে উঠতে পারছে না। প্রতিবার ছেলে, বউয়ের মুখ ঝামটা শুনে সংকল্প নিয়ে আসে প্রমোটার বন্ধু অতীনের বাড়ি গিয়ে কথাবার্তা বলে আসবে, কিন্তু যে মুহূর্তে রবীনের বাড়িটার দিকে চোখ পড়ে, অমনি ইচ্ছেটা উবে যায়। নিজেদের বাড়িটা বেচে দিলে আর তো কোন ছুতোয় সবুজগ্রামে আসা হবে না, জোনাকির খোঁজখবর নেওয়া হবে না। বন্ধুটা বলতে গেলে অকালেই মরে গেল। তার বউকে কুশল জিজ্ঞাসা করার মতও তো বিশেষ কেউ নেই। সেটাও তো আর করা হবে না বাড়িটা না থাকলে। এই কথাটা সুদেষ্ণাকে বা নিজের ছেলেকে কিছুতেই বলে উঠতে পারে না নবারুণ। অত দিন পরে পরে একবার গিয়ে জোনাকির শরীর কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে তার যে বিশেষ কোন উপকার হয় তা অবশ্য নয়। আসলে উপকার হয় নবারুণের নিজের।

সে ২০০৪ এর পরে আর পার্টি সদস্যপদ রিনিউ করায়নি। রবীনও ততদিনে বুঝতে শুরু করেছে যে পার্টিতে সে খুব একটা বাঞ্ছিত নয়। বুঝে নিজের ব্যস্ততায় নিজেই রাশ টানছে। তখন আবার কথাবার্তা, যাতায়াত শুরু হয়। শৈশব, কৈশোর, যৌবনের সেই উষ্ণতা হয়ত ফিরে আসত রবীন হঠাৎ চলে না গেলে। কলকাতায় ফ্ল্যাট কেনার আবদার তখন থেকেই ছিল, কিন্তু নবারুণ ঠিক করেই ফেলেছিল, ফ্ল্যাট কিনে দিয়ে ছেলেকে, তেমন হলে সুদেষ্ণাকেও, বলবে ওখানে থাকতে। নিজে এই সবুজগ্রামের বাড়িতেই জাঁকিয়ে বসবে। রান্নার লোকটোক সবই তো আছে। মাঝের অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেছে রবীনের সাথে আড়ি করে। সেগুলো সুদে আসলে আদায় করতে হবে তো। সে সময়কার বন্ধুরা অনেকেই আর নেই ততদিনে। কিন্তু রবীন থাকলে আর কাকে লাগে?

রবীন থাকল না। নবারুণের সব প্ল্যান ভেস্তে দিয়ে সে চলে গেল হঠাৎ। হঠাৎ? না, এমনিতে কেউ ওটাকে হঠাৎ বলবে না। কিন্তু তিনটে মাস কি যথেষ্ট প্রাণের বন্ধুর মৃত্যুর জন্যে তৈরি হওয়ার পক্ষে?

সে যা-ই হোক, রবীন চলে যাওয়ার পরে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়েছিল। মাঝের এতগুলো বছর আলাদা হয়ে জীবন কাটাতে হল বলে। তখন মনে হয়নি, কিন্তু যত দিন গেছে ততই নবারুণ বুঝেছে, যে ঘটনাটায় সে রবীনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল, তাতে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল রবীনই। সেকথা নিজের কাছে স্বীকার করলেও আর কারো কাছে স্বীকার করে উঠতে পারেনি। আসলে ইগো বড় বিষম বস্তু। রবীন যখন মৃত্যুশয্যায়, দিনের অনেকটা সময় তার সামনে চেয়ারে বসে আড্ডা মারতে মারতে কাটায় নবারুণ, তখনো ভেবেছে একদিন গল্প করতে করতে বলবে “রবীন, তুইই ঠিক ছিলিস। আমারই ভুল।” কিন্তু বলে উঠতে পারেনি শেষ অব্দি।

তা জোনাকির সাথে দুটো একটা কথা বললে মনে হয় কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হল। “প্রায়শ্চিত্ত! ছ্যাঃ। এসব তুই কী কস, নবা? তুই কমিউনিস্ট, আবার বিজ্ঞানের মাস্টার। এসব কী কইতাছস?”

মনে হয় কানের পাশে সজোরে বলে উঠল রবীন। নবারুণ চমকে ওঠে। ঠিক কথা। প্রায়শ্চিত্ত, পরলোক — এসব গালগল্প। মানুষ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বানিয়েছে। যা রবীনকে বলা হয়নি তা আজ জোনাকিকে বলে কোন লাভ নেই। রবীন শুনতে পাবে না। তাছাড়া নবারুণ কোনদিন বলে উঠতেও পারবে না। যে ইগো বন্ধুর কাছেই বিসর্জন দেওয়া যায় না, তা কি আর বন্ধুর বউয়ের কাছে বিসর্জন দেওয়া যায়?

তবে যতই যুক্তিহীন হোক, ও বাড়িতে পা রাখলে কিন্তু সত্যিই মনে হয় রবীনকে এখনো ছোঁয়া যায়। কয়েকটা বাঁধা কথার পর জোনাকি আর নবারুণ যে চুপ করে থাকে তার কারণ দুজনেই তখন রবীনকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে, রবীনের সাথে হেঁটে আসা পথে আবার হাঁটতে বেরোয়।

ছবির মত মনে আছে নবারুণের। ১৯৮৬। তখন পাড়ায় গোটা পাঁচেক টিভি, কিন্তু রঙীন টিভি একটাই — মিলিটারি সুখেনদের বাড়িতে। আসলে সুখেনের সাথে মিলিটারির কোন সম্পর্ক নেই, তবে ওর বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সবুজগ্রামের দক্ষিণপাড়ায় জমিটা উনিই কিনেছিলেন, বাড়ি করে থাকাটা আর হয়নি। একাত্তরের যুদ্ধে মারা যান। সুখেনের মা বাড়িটা করিয়ে ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখানে থাকতে শুরু করেন। সুখেনের তখন বছর দশেক বয়স। সেই থেকে ও মিলিটারি সুখেন হয়ে গেছে। লেখাপড়ায় ভাল, একবারে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের চাকরি পেয়েছিল। নেশাভাং করত না, অফিস আর বাড়ি বাদ দিলে বাকি সময়টা রবীন, নবারুণদের যাত্রাক্লাব নটনটীতে পড়ে থাকত। প্রম্পটারের বেশি হওয়ার সাধ্য ওর ছিল না, তবে টাকাপয়সা, উদ্যোগ মিলিয়ে ও একজন গুরুত্বপূর্ণ আয়োজক ছিল। স্বভাবতই বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলাগুলো ওর বাড়িতেই দেখা হচ্ছিল। মারাদোনা যেদিন সাতজনকে কাটিয়ে গোল দিল, সেদিনই সুখেনের মা খেলার ফাঁকে বললেন ছেলের বিয়ে ঠিক করেছেন। বিয়েটা হয়েছিল শীতের শেষ দিকে। নটনটীর সবাই মিলে বরযাত্রী যাওয়া হয়েছিল সেই সাঁইথিয়া।

সুখেনের বউকে দেখে শুনে নবারুণ, রবীনের বেশ ভালই লেগেছিল। শুধু চেহারার দিক থেকে নয়, যেটুকু কথাবার্তা হয়েছিল তাতে বোঝা গিয়েছিল মেয়েটা রুচিশীল, লেখাপড়া জানা। মানে নাম কা ওয়াস্তে এম এ পাশ নয়। কিন্তু মাস খানেক যেতে না যেতেই গণ্ডগোল লেগে গেল। অত আড্ডা দিত অথচ সুখেন কিন্তু কিছু বলেনি নবারুণদের। প্রথম শোনা গেল মহিলা মহল থেকে।

সুদেষ্ণা একদিন জিজ্ঞেস করল “হ্যাঁ গো, সুখেনের বউকে নিয়ে নাকি খুব অশান্তি ওদের বাড়িতে?” নবারুণ আকাশ থেকে পড়েছিল। জানা গেল পাড়ায় সবাই বলাবলি করছে বউয়ের মাথায় নাকি ছিট আছে। অভিযোগটা তুলেছে সুখেনের মা আর বোন। বউ নাকি বরকে পাশে শুতে দেয় না, শাশুড়ি কিছু বললে ভীষণ রেগে যায়, একদিন গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়েছিল। আর সন্দেহ করে ননদ ওর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেবে।

নবারুণ খুবই অবাক হয়েছিল যে এত কাণ্ড চলছে বাড়িতে অথচ ক্লাবে সুখেন কিচ্ছু বলেনি। এমনিতে তো মায়ের বাতের ব্যথা থেকে বোনের বিয়ের পরিকল্পনা পর্যন্ত কিছুই বাদ দেয় না। বিশেষ করে রবীন আর নবারুণ নাকি সুখেনের “ফ্রেন্ড, ফিলোজফার এন্ড গাইড”।

সেদিন সন্ধ্যায় ক্লাবে চেপে ধরতেই ছেলে জবাব দিয়েছিল “কী বলব বলো তো? বলার মত কিছু থাকলে তো বলব। কেন এরকম আচরণ করছে কিছুই তো বুঝছি না।”

“ওকে জিজ্ঞেস করেছিস?” রবীন জানতে চেয়েছিল।

“হ্যাঁ… মানে, না। কী আর জিজ্ঞেস করব? যা উন্মাদের মত আচরণ করছে, কথা বলার কোন উপায় আছে?”

“উন্মাদের মত মানে? কথা বলতে গেলে কামড়াতে আসছে?” নবারুণ প্রশ্ন করেছিল।

“না, ঠিক তা নয়…”

“যদি তা না হয় তাহলে পরিষ্কার কথা বল। সমস্যাটাকে বাড়তে দিচ্ছিস কেন? তোর বউ, তোকেই তো মেটাতে হবে।”

সুখেনের বক্তব্য ছিল ঝামেলাটা মূলত তার মা আর বোনের সঙ্গে, তার সঙ্গে নয়। তাই সে ব্যাপারটার মধ্যে ঢুকছে না।

“তোর মা, বোন পাড়ায় বলে বেড়াচ্ছে তোর বউ পাগল, আর তোর কোন বক্তব্য নেই? মানেটা কী?” রবীন খুব রেগে গিয়েছিল।

“দেখে শুনে তো পাগল বলে আমারও মনে হচ্ছে।” এই ছিল সুখেনের আত্মপক্ষ সমর্থন।

“সেটা ওর বাপের বাড়িতে জানিয়েছিস? সত্যিই যদি কোন অস্বাভাবিকতা থেকে থাকে সেটা তো একটা অসুখ। তার চিকিৎসা করাতে হবে। পাড়ার লোককে বলে বেড়িয়ে কী হবে?”

রবীনের এই কথাটা নবারুণের ঠিক পছন্দ হয়নি। সুখেন বলেছিল মা-বাপ মরা মেয়েটার দাদাদের নাকি বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা বলেছে তাদের বোন মোটেই পাগল নয়। সঙ্গে যোগ করেছিল “আসলে লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছে তো, এখন স্বীকার করবে কেন?” এখানটায় অবশ্য নবারুণের একটা খটকা ছিল, কারণ বিয়ের সময়ে মেয়েটাকে একেবারেই অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু কথা হচ্ছে সুখেনই তো চেনা। মেয়েটা অচেনা, তার পরিবারও অচেনা। সুতরাং বিশ্বাস করতে হলে সুখেনকেই করা উচিৎ। এটাই তো সহজ সরল কথা। ক্লাব থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে রবীনকে একথা বলতেই সে বলেছিল “এটা কোন যুক্তি নয়। কোন ব্যাপারেই এক পক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত করা উচিৎ না। আমি যে পক্ষকে চিনি সে-ই ঠিক, এটা তো একটা বিশ্বাস। যুক্তি আর বিশ্বাস এক জিনিস নয়।”

কিছুদিনের মধ্যেই কানাঘুষো খবর পাওয়া গেল সুখেনের বউ নাকি বাপের বাড়ি চলে গেছে। ওকে আবার জিজ্ঞেস করতে বেশ বুক ফুলিয়ে বলল “কী করব? কিছুতেই তেনার মন ওঠে না। আমার বাড়ির নাকি সবাই খারাপ। তো আমি বললাম তাহলে চলে যাও যেখান থেকে এসেছিলে। সেখানে তো সবাই ভাল।”

“ও। তাহলে বউ চলে যায়নি, তাড়িয়ে দিয়েছিস বল,” রবীন বলেছিল।

সুখেন তাতে ঢোঁক গিলে চুপ করে গেলেও কথাটা নবারুণের মোটে পছন্দ হয়নি। ওদের মধ্যে ঠিক কী ঘটেছে, বউটা সত্যিই বদ কিনা — সেসব ঠিক করে না জেনে এভাবে মন্তব্য করা উচিৎ না বলেই মনে হয়েছিল। রবীন কিন্তু প্রচণ্ড বকাবকি করেছিল সুখেনকে। রবীনকে অতটা রাগতে ক্লাবের কমবয়সী সদস্যরা আগে কখনো দ্যাখেনি। সুখেন কোন উত্তর দিতে পারেনি, কিন্তু ভুল হয়েছে তাও কিছুতেই স্বীকার করেনি।

বোধহয় তার ঠিক পরের দিন, যখন রোববার সকালের আড্ডা চলছে রবীনের বাড়িতে, সেই সময় এক ভদ্রলোক এসে হাজির হন। মুখটা দেখে চেনা চেনা লাগলেও পরিচয়টা ঠিক মনে করতে পারছিল না নবারুণ। রবীন অবশ্য উনি ঢোকামাত্রই চিনতে পেরেছিল। “আরে, আপনি! আসুন আসুন” বলে উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করেছিল।

দেখে মনে হচ্ছিল ভদ্রলোক অনেক দূর থেকে এসেছেন, ভীষণ ক্লান্ত। রবীন বলরামকে ভেতরে পাঠাল খাবার জল আনতে। তারপর জিজ্ঞেস করল “আপনাকে এরকম বিধ্বস্ত লাগছে! সোজা সাঁইথিয়া থেকে আসছেন?”

“না। সাঁইথিয়া থেকে কাল রাতে এসেছি। বড়িহাটায় এক বন্ধুর বাড়িতে উঠেছি। যে জন্যে এসেছি… আজ সকালে গেলাম বোনের শ্বশুরবাড়ি। ওখান থেকেই আপনার কাছে আসছি… আসলে আর কাউকে তো চিনি না এখানে… আপনার নামটা মনে ছিল। বাড়িটা একে ওকে জিজ্ঞেস করতে করতে চলে এলাম আর কি…”

ওঁর গলার স্বর শুনেই বোঝা যাচ্ছিল ভীষণ ভেঙে পড়েছেন। কেন, তা ভাবার চেষ্টা করতেই নবারুণের মনে পড়ে গিয়েছিল লোকটি কে। সুখেনের বড় শালা, মানে ওর বউ অনামিকার বড়দা। মেয়েটার বাবা জীবিত নেই, সুতরাং উনিই ওর অভিভাবক বলা যায়। ওঁর এই অবস্থা!

জল খাওয়া হলে রবীন নবারুণ ছাড়া সবাইকে বিদায় করে আড্ডা ভেঙে দিয়েছিল। তারপর সুখেনের শালার কাছে জানতে চেয়েছিল কী হয়েছে। উনি যা বললেন সেটা এরকম।

“আমার বোন হপ্তা খানেক আগে হঠাৎ একা গিয়ে হাজির। আমরা জিগেস করলাম ‘জামাই কই?’ তা বলল ওর মন খারাপ করছিল তাই একাই চলে গেছে, জামাই পরে যাবে। তা সে আর যায় না, যায় না; এদিকে বোন নাকি লুকিয়ে কাঁদে। আমার ছেলেমেয়েরা দেখেছে। কিন্তু ওকে জিগেস করলে বলে ‘কিছু হয়নি’। আমার বউ, আমার ভায়ের বউ — সবাই জিগেস করে দেখেছে। কিছুতেই মেয়ে মুখ খোলে না। এমনিতেও ও একটু চাপা স্বভাবের। তাই আমি ভাবলাম নিজে গিয়ে খবর নিয়ে আসি কী হল। তাই গেছিলাম ওদের বাড়ি। কিন্তু… এমন অপমান করল, দাদা…”

বলতে বলতে অত বড় একটা লোক — রবীন, নবারুণের চেয়ে একটু বড়ই হবেন — কেঁদে ফেললেন। ফেলারই কথা অবশ্য, কারণ সুখেনরা বলে দিয়েছিল মেয়ে পাগল, ওঁরা সেটা লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। সেজন্যে ওঁদের পুলিশে দেওয়া উচিৎ। ওরা নেহাত ভদ্রলোক বলে সেটা করছে না, তবে ঐ মেয়েকে ওরা আর ফিরিয়ে নেবে না। “আমাকে চোর, চিটিংবাজ — আরো নানা কথা বললেন সুখেনের মা…”

“সুখেন নিজে কী বলল?” জোনাকি এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল, এইবার সে ফোঁস করে ওঠে।

“সে তো বিশেষ কিছুই বলল না। যা বলার তো ওর বোন আর মা-ই বললেন। ও দিব্যি পায়ের উপর পা তুলে টিভি দেখছিল। আমিই সব শুনে জিগেস করলাম ‘তোমারও কি এই মত?’ তাতে বলল ‘মা আর ছেলের মত আলাদা হবে ভাবলেন কী করে? আমাদের বাড়ির ওরকম শিক্ষা দীক্ষা না।’”

“বাঃ! চমৎকার। এবার তোমরা ওকে কিছু বলো? এত বড় অন্যায় করল, আর তোমরা চুপটি করে থাকবে?”

জোনাকির এত উত্তেজনা নবারুণের একেবারেই পছন্দ হয়নি। ভদ্রলোক এসেছিলেন রবীনের কাছে, কিছুটা ওর পদমর্যাদা, কিছুটা পাড়ার মধ্যে ওর প্রভাবের কারণে। তার মধ্যে জোনাকির ঢুকে পড়ার দরকারটা কী? আরো বিরক্তিকর লেগেছিল রবীনের প্রতিক্রিয়া। বউও বলল আর ও-ও অমনি ক্ষেপে উঠল। “চল তো, নবা। একবার মুখোমুখি গিয়ে কথা বলে আসি। ওদের বক্তব্যটা কী শুনে আসি।”

“আমাকে দয়া করে আর ও বাড়ি যেতে বলবেন না,” সুখেনের শালা হাত জোড় করে বললেন।

“কোন প্রশ্নই ওঠে না।” রবীন অভয় দেয়। “তবে আপনি এই দুপুর রোদে বেরোবেন না। স্নানটান করে, দুটো ডাল ভাত খেয়ে যাবেন।”

“না না, আমার তো বন্ধুর বাড়িতে ব্যবস্থা আছে।”

“তা বললে হবে না, দাদা। আমাদের পাড়া থেকে কুটুম মানুষ এইভাবে চলে যেতে আমরা দেব না। জোনাকি, ওনাকে ছেড়ো না। আমি ঘুরে আসছি।”

সেই দুপুরে সুখেনের বাড়ি গিয়ে লাভ কিছু হয়নি। ওর, ওর মায়ের আর বোনের কথা বলার ধরণ দেখে নবারুণ তাজ্জব বনে গিয়েছিল। ঘুরে ফিরে সেই এক কথা — বউ বদ্ধ পাগল, অতএব তাকে আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না। পাগল হওয়ার প্রমাণ কী? না উনুনে রান্না বসিয়ে ভুলে যায়, চান করতে ঢুকে পড়ে জামাকাপড় না নিয়েই, তারপর শাশুড়ি বা ননদকে বলে জামাকাপড় হাতে দিতে। এগুলোকে যখন রবীন মস্তিষ্ক বিকৃতির লক্ষণ বলে মানতে চাইল না, তখন সুখেনের বোন বলল “আপনারা আমার বাবার মত, আপনাদের মুখ ফুটে আর কী বলব? বৌদি দাদাকে এক বিছানায় শুতে পর্যন্ত দেয় না। পাগল না হলে কেউ এটা করে?”

নবারুণ গোটা সময়টা দর্শক হয়েই ছিল। একথা শোনার পর রবীনকে বলেছিল “এটা কিন্তু সত্যিই অস্বাভাবিক।”

“নিশ্চয়। কিন্তু বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়াটা তো তার সমাধান নয়। ওর সাথে বসতে হবে। জানতে হবে এরকম কেন করে। হতে পারে এটা মানসিক সমস্যা। বা কোন শারীরিক সমস্যাও থেকে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে ওর বাপের বাড়িতে খবর দিয়ে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল। মেয়েটাকে ওরা তাড়িয়েছে কী বলে?”

“আমি তোমাকে আগেও বলেছি, রবীনদা। আমরা তাড়াইনি, ও নিজেই চলে গেছে,” সুখেন তেরিয়া হয়ে উত্তর দিয়েছিল এবং ধেড়ে লোকেরও পিলে চমকে যাওয়ার মত একটা ধমক খেয়েছিল।

“চোপ। তাড়াইনি। সেই জন্যে ওর দাদার সাথে ঐরকম ব্যবহার করেছো?”

সুখেনের মা বলতে গিয়েছিল যে যারা বোনের মাথার গণ্ডগোল লুকিয়ে বিয়ে দেয়, তাদের কুটুমের খাতির আশা করা উচিৎ নয়। তাতে রবীন আরো জোরে ধমকে দেয়। “তখন থেকে মাথার গণ্ডগোল বলে যাচ্ছেন? আপনি কি ডাক্তার? আপনি কে একটা মানুষকে পাগল তকমা দেয়ার?”

নবারুণ একেবারেই মন থেকে মানতে পারছিল না রবীনের এতটা চরমপন্থী ব্যবহার, কিন্তু ওর বিরোধিতা করার সাহস তখনো ছিল না। রবীন উঠে আসার সময়ে বলেছিল “এখন ভালয় ভালয় মিটিয়ে নিতে বলছি শুনছো না। এরপর যদি এই নিয়ে পুলিশ কাছারি হয় তখন আমার কাছে আসবে না বলে দিলাম।”

সুখেনের শালা অবশ্য তখন মানসিকভাবে ওসব ভাবার মত অবস্থায় ছিলেন না। শুধু বলে গিয়েছিলেন “বাড়ি গিয়ে সবার সাথে কথা বলি। বোন কী বলে দেখি। তারপর যা থাকে কপালে।”

ব্যাপারটা অন্যদিকে মোড় নেয় এরপর। রবীন-জোনাকিকে সুখেনদের আশপাশের বাড়ির বেশ কিছু লোক জানায় যে অশান্তিটা বৌভাতের পরদিন থেকেই চলছিল আসলে। নতুন বউয়ের গায়ে হাত তোলাও নাকি বাকি ছিল না। নবারুণ এসব শুনে সুখেনকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছিল। সে বলেছিল “তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, নবাদা, সব মিথ্যে কথা। এত বছর এ পাড়ায় আছি। আমরা সেই ধরণের লোক, তুমি বলো?” রবীনকে বলাতে ও শুধু “হুঁ” বলেছিল, বিশ্বাস করেছিল কিনা বোঝা যায়নি। মেয়ে পক্ষ থেকে কোন সাড়াশব্দ না আসায় নবারুণ ভেবেছিল ওরা বোধহয় নিজেদেরই দোষ বুঝে চুপ মেরে গেছে। রবীনেরও বোধহয় পার্টি, প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ততায় এই ব্যাপারটা মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একদিন রাত দেড়টা দুটোর সময়ে এক দল ছেলের ডাকাডাকিতে রবীন আর জোনাকির ঘুম ভেঙে যায়। ওরা পাড়ার ক্লাবের ছেলে, কয়েকজন মিলে রাত পাহারায় ছিল। বছর তিরিশেক আগে পরিত্যক্ত একটা চণ্ডীমণ্ডপের পেছনে গজিয়ে ওঠা ঝোপ থেকে নড়াচড়ার আওয়াজ পেয়ে ভাম বা শেয়াল ভেবে তাড়াতে গিয়ে দুটি মৈথুনরত মানুষকে আবিষ্কার করেছে। একটি সুখেন, অন্যটি তার প্রাণের বন্ধু ভোম্বলের বোন অমৃতা।

দক্ষিণপাড়ায় বাড়ির বউকে তাড়িয়ে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল না। সুখেনদের উপরে পাড়া প্রতিবেশী তাই এমনিতেই চটেছিল, এরকম বামালসমেত ধরা পড়ায় ছেলেরা আরো ক্ষেপে উঠেছিল। মেরে আধমরা করে দিত হয়ত, কিন্তু ওদের মধ্যে ঠান্ডা মাথার কয়েকজন থাকায় আক্ষরিক অর্থে কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে রবীনের কাছে নিয়ে এসেছিল সুখেনকে। বোধহয় পাড়ার মেয়ে বলেই অমৃতাকে ওরা ধমকে ধামকেই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। সুখেনকে নিয়ে এসে রবীনকে বলেছিল “ওর বউকে কেন পাগল সাজিয়েছে বুঝলেন তো?” রবীন খুব করে ধমকে “যা, বাড়ি যা। কাল সকালে তোর ব্যবস্থা হবে” বলে তখনকার মত বিদেয় করতে চেয়েছিল। কিন্তু ক্লাবের ছেলেরা ছাড়বার পাত্র নয়। ওরা দাবী করে সুখেনকে কান ধরে ওঠবোস করতে হবে এবং রবীনের কাছে প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে এই ব্যভিচার ও আর করবে না। রবীন হ্যাঁ, না কিছু বলার আগেই ছেলে সুবোধ বালকের মত ঐ কাজটুকু সেরে ফ্যালে।

পরদিন সকালে এই ঘটনা শুনে নবারুণ প্রথমবার রবীনের সাথে ঝগড়া করে।

“এই দল বেঁধে গুন্ডামিটা তুই সমর্থন করলি?”

“মোটেই সমর্থন করিনি। করলে তো ওদের হাতেই ছেড়ে দিতাম। তা তো দিইনি। কিন্তু এত বড় অন্যায় করে এর থেকে কী ভাল ব্যবহার পেত ও?”

“অন্যায় ঠিক বলা যায় কি? ও কি অমৃতাকে রেপ করতে গিয়েছিল?”

“এসব তুই কী বলছিস, নবা? নিজের বউকে তাড়িয়ে দিয়ে অন্য একটা মেয়ের সাথে রাতের অন্ধকারে ফষ্টিনষ্টি করছে। এটা অন্যায় নয়?”

আজ ভাবলে নবারুণের লজ্জা হয় যে সেদিন ওরকম একটা ব্যাপারকে সে সমর্থন করেছিল। তখন কিন্তু মনে হয়েছিল ঠিকই করছে। আসলে সুখেনের প্রতি অন্ধ স্নেহ, তার উপর অমৃতাকেও ছোট থেকে দেখছে। তাও হয়ত রবীনের প্রতি মনটা অতটা বিরূপ হত না, যদি না জোনাকি ব্যাপারটার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ত।

প্রথম থেকেই এই ঘটনায় জোনাকি খুব সুখেনের বউয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলছিল। অমৃতার সঙ্গে সুখেনের সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পরে তো আরো বেশি করে। নবারুণ পরে শুনেছে, সেদিন রাতে যখন সুখেনকে ওরা ধরে এনেছিল, রবীন ধীর স্থির থাকলেও জোনাকি নাকি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে কথা বলেছিল। এক সময় রবীন বিরক্ত হয়ে ধমকে ওকে ভিতরে পাঠিয়ে দেয়।

পরদিন সকালে এই ব্যাপারটা নিয়ে কী করবে ভেবে ওঠার আগেই পাড়ার নানা বয়সের পুরুষ, মহিলারা রবীনদের বাড়িতে হাজির। দাবী একটাই — সুখেনের একটা উপযুক্ত শাস্তি চাই, ভদ্রলোকের পাড়ায় এ সমস্ত চলবে না। কথাটা অসঙ্গত তা নয়, কিন্তু কে শাস্তি দেবে? কার অভিযোগের ভিত্তিতে? সুখেনের শ্বশুরবাড়ির দিক থেকেও তো কোন অভিযোগ আসেনি। এগুলো রবীন সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, নবারুণ চুপ করে শুনছিল। কিন্তু বুঝিয়ে পারবে কী করে? রবীনের বউই তো বারবার পাড়ার লোকের পক্ষ নিয়ে কথা বলে যাচ্ছিল। তার বক্তব্য একটাই “এসব ছেলেকে চাবকে সোজা করে দেয়া উচিৎ।”

বলরামও উপস্থিত ছিল। তখন পর্যন্ত ও রবীনের ছোট ভাই। ও-ও রবীনের পক্ষ নিয়ে লোককে বোঝাতে চেষ্টা করছিল। এরকম চলতে চলতে ফস করে জোনাকি বলে বসে “যারা নিজের বাড়ির মেয়েদের পর্দানশীন করে রাখে তারাই শুধু সুখেনের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে পারে।” কথাটা নবারুণের গায়ে আলপিনের মত বিঁধেছিল। সুদেষ্ণা ছাড়া ওদের বাড়ির আর কোন বউই সেরকম লেখাপড়া জানা নয়, কথাবার্তায় জোনাকির মত চৌখসও নয়। ফলে বাড়ি থেকে খুব একটা বেরোয় না প্রয়োজন ছাড়া। বলরামও রেগে গিয়েছিল। সে “বৌদি, আপনি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছেন” বলে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছিল। নবারুণের দ্বারা ঐ ছোটলোকামি হত না, তাই সে চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল। রবীন তখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে জোনাকিকে ওখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার।

ঐ যে বেরিয়ে আসা, তার পরে প্রায় দু দশক আর ও বাড়িতে পা রাখা হয়নি। আসলে এত দ্রুত সবকিছু বদলে গেল… হয়ত কাকতালীয় নয় যে দু একদিনের মধ্যেই শোনা গেল সুখেনের শ্বশুরবাড়ি ওদের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগ করেছে পুলিশে।

দক্ষিণপাড়া তখন সি পি এমের শক্ত ঘাঁটি। লোকে বলত ওখানে একটা নুড়িকে সি পি এম প্রার্থী করে দিলে সেও হৈ হৈ করে জিতবে। সুখেনের পরিবার, অমৃতার পরিবারও, ব্যতিক্রমহীনভাবে, সি পি এম সমর্থক। ভোম্বল তো ততদিনে এ জি মেম্বার। সবুজগ্রাম লোকাল কমিটির পরবর্তী মিটিঙের এজেন্ডার বিবিধতে এই ব্যাপারটাও উঠে পড়ল। নবারুণ তখনো পার্টি মেম্বার নয়, খবরগুলো পেত বলরামের থেকে। মিটিঙে গিয়ে রবীন আবিষ্কার করে এই ইস্যুতে সে সম্পূর্ণ একা। লোকাল কমিটির সদস্যদের সবার মতে পার্টির উচিৎ তার সদস্য, সমর্থকদের বিপদে পাশে থাকা। রবীন জিজ্ঞেস করেছিল যাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক লোকে নিজের চোখে দেখেছে, তারা কোন যুক্তিতে বিপন্ন। বলরামের নেতৃত্বে সবাই মিলে বলেছিল, সব অভিযোগ মিথ্যে। বউকে মারতে কোন পার্টি সদস্য দ্যাখেনি, অমৃতা আর সুখেনকে অস্বস্তিকর অবস্থাতেও পার্টির কেউ আবিষ্কার করেনি।

ক্রমশ এমন হল যে প্রত্যেক মিটিঙেই সুখেনের সমস্যাটাই হয়ে দাঁড়াল অলিখিত প্রধান এজেন্ডা। একা পড়ে যাওয়ায় রবীন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না ব্যাপারটা। এদিকে পাড়ার অবস্থা ভাল নয়। সুখেনদের গ্রেপ্তার হওয়ার পর জামিন নিতে হয়েছে। আবার মারধোর খাওয়ার ভয়ে গোটা পরিবার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল, বলরাম আর নবারুণ অভয় দেওয়ায় ফেরত এসেছে, কিন্তু পাড়ার কেউ ওদের সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। লোকাল কমিটির মিটিঙে কী ঘটছে না ঘটছে সে খবরটা দেখা গেল পাড়ার সবাই জানতে পারছে। এক মিটিঙে বলরাম দাবী তুলে দিল “পার্টি থেকে সরকারীভাবে কমরেড সুখেন্দু মজুমদার এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো হোক।”

“কমরেড!” রবীন হো হো করে হেসে ফেলেছিল বলে শোনা যায়। “সমর্থক কবে থেকে কমরেড হয়ে গেল আমাদের পার্টিতে, কমরেড বলরাম?”

“সমস্ত নিপীড়িত মানুষই একজন কমিউনিস্টের কমরেড বলে আমি মনে করি।”

“আপনি মনে করেন? পার্টির গঠনতন্ত্র, আদবকায়দা এসব কি এখন থেকে আপনি ঠিক করবেন নাকি? আপনি কি লেনিন না স্তালিন? নাকি আরো বড় কেউ? আর ‘নিপীড়িত’? কমিউনিস্ট পার্টিতে নয় নয় করে কম দিন তো আপনার হল না। এতদিন পার্টি করে আপনার যদি মনে হয় একজন লম্পট, বউ পেটানো উচ্চবিত্ত চাকুরীজীবী হচ্ছে নিপীড়িত, তাহলে আপনার মার্কসীয় সাহিত্য কিচ্ছু পড়া হয়নি। আবার পড়ুন।”

ঘটনাটা নবারুণকে বলার সময়ে বলরাম বুক ফুলিয়ে বলেছিল “এর উত্তরে আমি যা বললাম… রবীনদার মুখে রা নেই। আমি বললাম ‘যারা কতকগুলো লুম্পেনের কথায় পার্টির একজন বিশ্বস্ত সমর্থককে অবিশ্বাস করে, একজন কমরেডের বোনকে বদনাম করার চেষ্টা করে, তাদের কাছে আমি মার্কসীয় সাহিত্যের পাঠ নিই না, কমরেড।’”

শুনে নবারুণ বলরামের সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেছিল। রবীনের হাত ধরেই পার্টির সদস্যপদ পাওয়া একটা ছেলে এরকম দাপটে কথা বলেছে পার্টি মিটিঙে! ভাবা যায়! তখন ভাবতে পারেনি, এখন ভেবে লজ্জা হয় নবারুণের।

মজার কথা বলরাম সেই সময় পাড়ার অনেককে আলাদা করে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সুখেনের পরিবারকে একঘরে করে রাখা অন্যায় এবং যারা এগুলো করছে পার্টি তাদের চিনে রাখছে। যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, পার্টি তাদের পাশে থাকবে। তাতে কারো মত বদলানো যায়নি, উল্টে লোকে আরো বিগড়ে গিয়েছিল। যে ক্লাবের ছেলেরা সুখেন আর অমৃতাকে হাতেনাতে ধরেছিল, সেই গান্ধী সংঘের একটি ছেলে তো নবারুণের সামনেই বলরামকে মুখের উপর বলে দিয়েছিল “পার্টি মানে কি তুমি? না রবীনদা? রবীনদা অনেক বড় নেতা। তোমার কথা কেন শুনতে যাব?”

পাড়ার লোকে সব জানে একথা বুঝেও রবীন কারো সাথে এসব নিয়ে আলোচনা করত বলে শোনা যায়নি। তবে অনেকে নাকি বাড়ি বয়ে এসে বলে যেত, পার্টিতে ও একলা পড়ে গেলেও পাড়ার লোকেরা সকলে ওর সঙ্গেই আছে। বলরাম অ্যান্ড কোম্পানির শত চেষ্টা সত্ত্বেও, রবীন যেটা করতে পেরেছিল সেটা হল লোকাল কমিটিতে সুখেনকে সমর্থন করে কোন প্রস্তাব পাশ হতে দেয়নি। বলরামের ভয়ে বা ভক্তিতে যে কমরেডরা গোটা ব্যাপারটায় সুখেনের পক্ষে ছিল বা নিরপেক্ষ থাকার ভান করছিল, তারাও ব্যাপারটা ভোটাভুটি অব্দি নিয়ে যেতে সাহস করছিল না। কারণ এলাকায় রবীনের জনপ্রিয়তা তারা জানত। এও জানত যে জেলা সম্পাদক হীরুদা রবীনের গডফাদার। বলরামের সাহসের পেছনে ছিল তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর স্থানীয় সাংসদ অচ্যুত মুখার্জি। কিন্তু সবুজগ্রামের অধিকাংশ কমরেড বুঝত, জেলায় যে কোন ব্যাপারে শেষ কথা বলবেন হীরেন্দ্রনাথই, অচ্যুত মুখার্জিকেও সেকথা মানতেই হবে। জ্যোতি বসু যাঁকে হীরুদা বলেন, তাঁকে টপকে যাওয়ার ক্ষমতা অচ্যুতের নেই। উনি বড় জোর বলরাম প্যাঁচে পড়ে গেলে তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন।

তবে বলরামের আর যে দোষই থাক, কোনদিন দুঃসাহস এবং দুষ্টু বুদ্ধির অভাব ছিল না। তাই পার্টির জেলা নেতৃত্বের কাছে শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রবীন ঘোষালের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে একটা চিঠি জমা পড়ে। চিঠিটা লিখেছেন কমলা মজুমদার বলে একজন মহিলা। তাঁর অভিযোগ রবীন ঘোষালের প্রত্যক্ষ মদতে পাড়ার ছেলেরা তাঁকে, তাঁর নিরীহ ছেলে সুখেনকে এবং অবিবাহিতা তরুণী মেয়ে অদিতিকে উত্যক্ত করছে। ছেলেকে মিথ্যে বদনাম দিয়ে মারধোর করেছে, মেয়েকে রাস্তাঘাটে টোন টিটকিরি হজম করতে হচ্ছে, তিনি নিজেও পাড়ায় বেরোলেই নানা হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এইসব কারণে তিনি নিজের বাড়িতে নিজের ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকতে ভয় পাচ্ছেন। নেতারা যেন বিহিত করেন। এই মর্মে তিনি এফ আই আর ও করেছেন স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িতে।

এফ আই আরে ক্লাবের যে ছেলেরা সেই চণ্ডীমণ্ডপে সুখেনের কান মুলে দিয়েছিল তাদের কয়েকজনের নাম ছিল। এর ফলে ফাঁড়ি থেকে পাড়ায় পুলিশ এসে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই আগুনে ঘি পড়ল। নবারুণ একদিন সাতসকালে উঠোনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে দেখল রবীনদের উঠোন ভর্তি লোক। সবাই পাড়ার লোক। রবীন আর জোনাকিও রয়েছে। লোকে খুব উত্তেজিত। আসলে সকলে ছুটে এসেছিল রবীনের কাছে বিচার চাইতে। যে দোষী সে উল্টে পাড়ার কতকগুলো নির্দোষ ছেলের নাম পুলিশের খাতায় তুলে দিল — কে মেনে নেবে? তখন পর্যন্ত পাড়ার লোকে সুখেনের পরিবার সম্পর্কে বলতে আসত জোনাকিকে, যেহেতু রবীনকে কিছু বলে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত না। কিন্তু এবার রবীনকে কিছু একটা করতেই হবে — এটাই দাবী।

রবীন কী বুঝিয়ে উত্তেজিত জনতাকে বাড়ি পাঠাল সেটা উঠোনে দাঁড়িয়ে ঠিক বোঝেনি নবারুণ। বোঝা গেল কদিন পরে, যখন ক্লাবের ছেলেরা বাড়ি বাড়ি এসে বলে গেল “কাল বিকেল পাঁচটায় আমাদের ক্লাবের মাঠে সুখেনের ব্যাপারটা নিয়ে মিটিং। পার্টির লোকেরা থাকবে, সুখেনের পরিবার থাকবে, আমরা পাড়ার লোকেরা থাকব। বাড়ির সবাই প্লিজ আসবেন।”

বলরামের তখন সকালের আড্ডা রবীনের বাড়ি থেকে উঠে এসেছে নবারুণের বাড়ির বারান্দায়। ওকেই নবারুণ জিজ্ঞেস করেছিল “কী রে? রবীন এত সাহস কী করে পাচ্ছে? পার্টির বাইরের লোকের সঙ্গে মিলে মিটিং ডাকছে!”

“আরে অত বোকা নাকি! ঝানু জিনিস,” বলরাম ব্যাজার মুখ করে বলে। “জেলা কমিটি থেকে এল সি এস কে অ্যাড্রেস করে চিঠি করিয়েছে। তাতে নির্দেশ আছে পার্টি সদস্যরা যেন এই ঝামেলা মেটাতে সব রকম চেষ্টা করে। আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে যেন জনমত মাথায় রাখা হয়।”

“আর রবীনের বিরুদ্ধে অভিযোগটা?”

“লেখা আছে ‘পার্টিনেতাদের এর সঙ্গে জড়ানোর প্রচেষ্টা সহ্য করা হবে না।’”

“যাঃ! তার মানে তো হেরেই বসে আছিস।”

“অত সোজা নয়, দাদা; অত সোজা নয়। আজ হারলাম বলেই কি চিরকাল হারব? রবীন ঘোষালের নেতাগিরি আমি ঘুচিয়ে ছাড়ব।”

সেটা তৎক্ষণাৎ পেরে ওঠেনি বলরাম। প্রচণ্ড উত্তপ্ত সেই মিটিঙে ভয়ঙ্কর চাপে পড়ে সুখেন্দু মজুমদার ঐ এফ আই আর প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় এবং বলরাম, নবারুণ, শ্যামল কংসবণিকের মত যেসব পার্টির লোকেরা ওদের পক্ষে ছিল, তাদের পাড়ার লোকের কাঁচা খিস্তি হজম করতে হয়।

তবে নবারুণের সবচেয়ে খারাপ লেগেছিল যেভাবে জোনাকি পাড়ার লোকেদের সঙ্গে মিলে ওদের যা নয় তাই বলে। ও যে ও পক্ষের একজন বক্তা হয়ে যেতে পারে সেটাই নবারুণ কল্পনা করেনি। রবীনের মুখ দেখে সন্দেহ হয়েছিল ও-ও বোধহয় সেটা জানত না। মাঝখানে যত ব্যবধানই থাক, বন্ধুর মুখ দেখেই নবারুণ বুঝেছিল, পার্টির বিরুদ্ধে, কমরেডদের বিরুদ্ধে বলা প্রত্যেকের প্রত্যেকটা কথা ওর বুকে তীরের মত বিঁধছে। জোনাকির বক্তৃতার সময়ে রবীনের মুখটা যেমন দেখাচ্ছিল, তেমনি দেখিয়েছিল পঁচিশ বছর পরে, মারা যাওয়ার ঠিক আগের সন্ধ্যায়। বিপ্লব যতবার জিজ্ঞেস করছিল “বাবা, ব্যথা করছে?” ততবার চোখ বন্ধ করে ঢোঁক গিলে মাথা নেড়ে বলছিল “না”। সেদিন তবু নবারুণ রবীনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে পেরেছিল, ঐ মিটিঙে পারেনি। নেতাগিরি না ঘুচলেও, রবীন নবারুণের বন্ধুত্ব হারিয়েছিল।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply