নাম তার ছিল: ১১

পূর্বকথা: পেশায় রোড কন্ট্রাক্টর সমীর পঞ্চায়েত সমিতিতে রবীনের কাছে পাত্তা না পেয়ে বাড়িতে এসে হাজির হয়, হাতে শুভময়ের কবিবন্ধুর বই। ক্রমশ যাতায়াত বাড়ে, কোন দিন কী সুবিধা চেয়ে বসবে ভেবে অস্বস্তি হয় রবীনের। সমীরের গাড়ি চেপে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার প্রস্তাবে জোনাকি উল্লসিত হয়, রবীনের বারণ শোনে না। অতঃপর

শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির লাগোয়া ঋষিনগর পঞ্চায়েত সমিতি। সেখানে বেশ কয়েক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হবে। পুজোর পরেই টেন্ডার ডাকা হবে জানত রবীন। পুজোর আগে জেলা পার্টি অফিসে ওখানকার সভাপতি কমরেড রাখী সরকারের সাথে দেখা হয়েছিল, উনিই বলেছিলেন।

সমীরদের বাড়িতে বড় করে লক্ষ্মীপুজো হত। টিফিন কেরিয়ারে সেই প্রসাদ নিয়ে বাইক চালিয়ে সন্ধেবেলা এসেছিল সে। রবীন তখন বাড়িতেই। জোনাকি চা করল, খেতে খেতে সমীর বলল “রবীনদা, শুনলাম ঋষিনগরে একটা বড় রাস্তার কাজ আছে?”

গণশক্তিতে সেদিন সরোজ মুখার্জির লেখাটা সকাল থেকে পড়ে ওঠার সময় পায়নি রবীন। সবে শুরু করেছে, বকবক করার একদম ইচ্ছে ছিল না। শুধু বলে “হুঁ।”

“ওখানকার সভাপতি তো একজন মহিলা, না?”

“হুঁ। রাখীদি।”

“ও, আপনার থেকে সিনিয়র? আমি ভেবেছিলাম একটু জুনিয়রই হবে।”

রবীন কোন জবাব দেয় না। মন তখন পুরোপুরি লেখাটায়।

সমীরই বলে “আপনার সাথে তো খুব ভাল আলাপ।”

“হুঁ।”

“ভাবছিলাম ওখানকার টেন্ডারটা তুলব।”

“তোলো।”

“আপনি একটু বলে রাখবেন নাকি?”

এবার কাগজ থেকে চোখ তুলতেই হয়। সে দৃষ্টি দেখে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে সমীরের।

“কাকে কী বলতে বলছ?”

“ন….না। ও….ই আর কি। রাখীদিকে।”

“কী বলব?”

কী বলতে হবে সেটা রবীন জানে না তা যে একেবারেই নয়, সেটুকু বোঝার বুদ্ধি সমীরের ছিল। উঠে চলে যাবে কিনা ভাবছে, এমন সময় জোনাকি ঘরে ঢুকেই হড়বড় করে অনেক আবোল তাবোল বলতে থাকে। সমীর বুঝতে পারে সেদিকেই মন দেওয়া ভাল, রবীনও গণশক্তির পাতায় ফিরে যায়।

তবে আর একটা শব্দও পড়ে উঠতে পারে না। মাথাটা এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে কিছুতেই ঠান্ডা করে লেখাটায় মন দেওয়া যাচ্ছিল না।

পরদিন ছিল শনিবার। স্কুল থেকে ফিরে, খেয়ে দেয়ে আর বিশ্রাম না নিয়ে রবীন হীরুদার বাড়ি রওনা দিয়েছিল।

পৌঁছে দ্যাখে ঘর ভর্তি লোক। অধিকাংশই চেনা, পার্টির লোক। কিন্তু তাদের সামনে যা বলতে এসেছে তা বলা উচিৎ হত না। অতএব চুপ করে অপেক্ষা করতে হয়। ঘরে ঢুকতেই হীরুদা খেয়াল করেছেন, হাত নেড়ে বসতেও বলেছেন। মুখ দেখেই বুঝেছেন গুরুতর কিছু ঘটেছে। তাই উনিও সকলের মাঝখানে উচ্চবাচ্য করছেন না। একবার শুধু জিজ্ঞেস করলেন “রবীন চা খাবে নাকি? খেলে… আচ্ছা থাক।” আসলে বলতে শুরু করেই মনে পড়েছে রবীনের চা খেতে ইদানীং খুবই অসুবিধা হয়, হাতটা আজকাল একটু বেশিই কাঁপে। তাই চুপ করে গেলেন।

ঘন্টা দুয়েক লাগল সবার সাথে কথা শেষ করতে। ঘর খালি হলে রবীনকে চৌকিতে পাশে এসে বসতে বললেন। তারপর তলা থেকে অ্যালুমিনিয়ামের বড় বাটিটা বের করে তাকের টিন থেকে মুড়ি, আর কৌটো থেকে চানাচুর ঢাললেন। পাশের ছোট বাটি থেকে গোটা তিনেক লঙ্কা নিয়ে এসে বসলেন। রবীনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন “নাও। একটু শুকিয়ে গেছে, তাও খারাপ ঝাল নয়।”

রবীন এক গাল মুড়ি মুখে ফেলে, লঙ্কায় একটা কামড় দিয়ে বলল “হীরুদা, আর পারছি না। এবার আমায় ছেড়ে দিন।”

“পারছ না? কী পারছ না?”

“সভাপতির দায়িত্ব আর সামলাতে পারছি না। আপনি অনুমতি দিলে আমি রিজাইন করব।”

“সে কি! তুমি জেল খাটা ছেলে, কী এমন চাপ পড়ল যে রিজাইন করতে চাইছ? অক্রূরকে তো তোমার এখন সামলাতে পারা উচিৎ। ওর বিষদাঁত তো অনেকদিন ভেঙে ফেলেছ!”

“না, সমস্যা ওনাকে নিয়ে নয়।”

“তবে?”

“সমস্যা নিজেকে নিয়ে। আমি প্রলোভনগুলো এড়াতে পারছি না।”

রবীনকে অবাক করে হীরুদা মুচকি হাসেন। তারপর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাঁক দেন “নন্দওওও।”

নীচের রাস্তা থেকে উত্তর আসে “এই যে, কাকু।”

“দুটো চা। একটা আমার, আরেকটা দুধ চিনি দিয়ে।”

“পাঠাচ্ছি।”

হীরুদা বিড়ি ধরিয়ে জিজ্ঞেস করেন “তা কী দিয়ে তোমায় কেনা গেল শেষ অব্দি?”

রবীন শশব্যস্ত হয়ে বলে “না না, সেরকম কিছু হয়নি। আমি ঘুষ টুষ নিইনি। প্রস্তাব দিতে সাহসই পাবে না কেউ।”

“এই যে বললে ‘প্রলোভন জয় করতে পারছি না’? কিসের প্রলোভন দিয়েছে?”

রবীন মাটিতে মিশে যেতে যেতে বলে “আমাকে নয়, আমার বউকে।”

“অ। তোমায় কাবু করতে পারবে না বুঝে তোমার বউকে ধরেছে। কে? কোন কন্ট্রাক্টর?”

রবীন মাথা নাড়ে। এবার হীরুদা একটু গম্ভীর হয়ে যান।

“কী দিয়েছে? শাড়ি জামাকাপড়?”

“সেটা হলে তো জোর করে ফেরত দিয়ে দিতাম, মিটে যেত। এ চালাক লোক। পুজোর মধ্যে একদিন গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। আমাকেও পীড়াপীড়ি করেছিল। আমি কাটিয়ে দিয়েছি।”

“তা তোমার বউ রাজি হয়ে গেল?”

“অনেক বুঝিয়েছিলাম। বুঝল না।”

“বোঝো! তোমার শালা তো শুভময়। মানে সি পি আই রাজ্য কমিটির সদস্য শুভময়। তাই না?”

“হুম।”

“তার বোনের এরকম বুদ্ধি শুদ্ধি! আশ্চর্য!”

রবীনের চুপ করে থাকা ছাড়া কোন উপায় ছিল না। নিভে যাওয়া বিড়িটা আবার ধরিয়ে হীরুদা বলেন “যাক গে। লোকটা তার বিনিময়ে কী দাবী করেছে? পুজো তো সেই কবে হয়েছে, হঠাৎ আজ তোমার পদত্যাগ করার ইচ্ছে হল কেন?”

“তখুনি তখুনি তো কিছু দাবী করেনি… সেই জন্যেই আর কিছু বলিনি। কিন্তু গতকাল আলগাভাবে বলার চেষ্টা করছিল আমি যেন রাখীদিকে বলি ওর টেন্ডারটা দেখতে। ঋষিনগরে মেন রোডটা তৈরি হচ্ছে না?”

“তা তুমি কী বললে?”

“কিছুই বলিনি। কটমটিয়ে তাকাতেই ভয়ে চুপ মেরে গেছে।”

“কী নাম এর?”

“সমীর। সমীর রাউত। থান রোডের যে কাজটা আমাদের পঞ্চায়েত সমিতিতে হল সেটাও ওরাই করেছিল। কিন্তু তখন আমার সাথে আলাপ ছিল না। টেন্ডার কী করে জমা দিতে হয় জানতে একদিন হঠাৎ আমার অফিসে ঢুকে পড়েছিল, আমি ভাগিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন দেখি আমার বাড়ি গিয়ে হাজির। জোনাকির দাদার এক বন্ধুর রেফারেন্স নিয়ে এসেছিল। ফলে ঠিক তাড়িয়ে দেওয়াও সম্ভব হয়নি।”

“এবং সেই থেকে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেছে তো?”

“হ্যাঁ। ছেলের সাথেও ভাব জমিয়েছে, জোনাকিকেও ‘বৌদি বৌদি’ করে পকেটে পুরে ফেলেছে। কী বিপদে যে পড়েছি, হীরুদা।”

“তোমার ছেলের তো বছর ছয়েক বয়স। তার কথা নয় বুঝলাম, কিন্তু তোমার স্ত্রী…”

“আমার রিজাইন করা ছাড়া কোন উপায় নেই, দাদা। আমার চারপাশে স্বার্থান্বেষীদের ভিড় জমতে শুরু করেছে। এই বেলা ক্ষমতা ছেড়ে না দিলে পরিস্থিতি আমাকে দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য করবে।”

চা এসে পড়ে। হীরুদা খেতে খেতে পায়চারি করেন। রবীনকে অপেক্ষা করতে হয় একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্যে। নইলে চলকে পড়ে একটা বিশ্রী কাণ্ড হবে। ও বুঝতে পারে হীরুদা বেশ চিন্তায় পড়েছেন।

হাঁটাহাঁটি করতে করতেই চা শেষ করেন। তারপর বসে পড়ে বলেন “আপাতত তুমি চালিয়ে যাও, বুঝলে? কোন উপায় নেই। এই সময়ে হঠাৎ সভাপতি বদল করলে বিরোধীরা প্রশ্ন তুলবে ‘কেন? কী হয়েছিল?’ তখন আমরা কী জবাব দেব? তাছাড়া তোমার জায়গায় বসাব কাকে, বলো তো? সহ সভাপতিটিকে বসালে কি কেলেঙ্কারিটা হবে তুমি তো বোঝোই।”

রবীন প্রবল প্রতিবাদ করে। “কিন্তু এদের আমি আটকাব কী করে, হীরুদা? বউকে বাড়ি থেকে বার করে দেব? তা তো পারব না।”

“ছি ছি, তা করবে কেন? বউকে বোঝাও। প্রয়োজনে ঝগড়া করো। দুর্বল হলে চলবে না, কমরেড। লড়াইয়ের এই তো শুরু।”

রবীন ভেবে পায় না কী করে, কতদিন আটকাতে পারবে সমীরকে, সমীরের মত আরো যারা ভবিষ্যতে আসবে তাদের।

“তুমি গান টান শোনো, রবীন?” এই প্রশ্নটা হঠাৎ কেন, রবীন বুঝতে পারে না।

“শুনি। বাবা সবুজগ্রামের বাড়িটা করার পরে অনেক কষ্টে একটা রেকর্ড প্লেয়ার কিনেছিলেন, এখনো দিব্যি চলছে। পিন বদলানো ছাড়া কোন খরচ নেই।”

“বাঃ! আমার তো গান শোনা বলতে এইটে।” হীরুদা টেবিলের উপর থেকে হাতলওয়ালা রেডিওটা তুলে দেখান। “যা-ই হোক, গান যখন শোনো তখন রবীন্দ্রনাথ শোনো নিশ্চয়। ঐ গানটা মন দিয়ে শুনবে। ‘তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে, তা বলে ভাবনা করা চলবে না।’”

রবীন বোঝে, কিন্তু কিভাবে চলা উচিৎ সেটা বোঝে না।

“অত ভাবনার কিছু নেই,” হীরুদা কাঁধে হাত রেখে বলেন। “তুমি যেমনভাবে ছেলেটিকে স্টোনওয়াল করছ, তেমনই করে যাও। সুবিধা আদায় করতে না পারলেই দেখবে ছোঁড়া নিজেই সরে পড়বে। আগামী পঞ্চায়েত ভোটে আর তোমায় প্রার্থী করব না। কথা দিচ্ছি।”

কথাটা কিছুটা স্বস্তি দেয় রবীনকে। ভোটের তখন আর কয়েক মাস বাকি।

হীরুদার কথামত সে জোনাকিকে আবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সমীরের মত কারো সঙ্গে রবীনের বা তার পরিবারের কোন রকম ঘনিষ্ঠতাই থাকা উচিৎ নয়। কিন্তু বলতে গেলেই এমন রণং দেহি মূর্তি হয়ে দাঁড়াত স্ত্রীর যে বলাই বন্ধ করে দিতে হয়। জোনাকির সেই এক কথা। “তোমার মনটাই ব্যাঁকা। মানুষকে সোজা ভাবে দেখতে জানো না। আমি মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখি, পেশা দিয়ে বিচার করি না।” অগত্যা রবীন করত কি, সমীর এলেই কোন না কোন ছুতোয় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। তাতে জোনাকির উপর কোন প্রভাব না পড়লেও রবীন এই ভেবে স্বস্তি পেত যে সমীর কোন অন্যায় অনুরোধ করার সুযোগ পাচ্ছে না।

সেবারের বসন্তটা রবীন আমৃত্যু ভোলেনি।

তখন দক্ষিণে হাওয়া ছেড়েছে। সন্ধেয় কোন কাজ না থাকলে পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে বিপ্লবকে কাঁধে চড়িয়ে হরিমতীর ঝিলের পাড়ে চলে যেত। বাবলুর চায়ের দোকানে বসে বিকেলের চা খেত, বিপ্লব খেত সন্দেশ বিস্কুট বা বাপুজি কেক। ওখানে বসে এলাকার পার্টি না করা লোকেদের সাথে গল্পগুজব হত। যার যত অভাব অভিযোগ সব ওখানে জানা যেত। পার্টির ছেলেপুলে দু একজনও থাকত না তা নয়। বাবলুই ছিল পার্টির সবচেয়ে বড় সমালোচক। ও জ্যোতি বসুর উপর চটে থাকত প্রায় সব সময়েই। জ্যোতিবাবু যা করেন, সবই ওর চোখে ভুল। সবেরই বিকল্প ব্যবস্থা ওর জানা। মাঝে মাঝে রবীন হাসতে হাসতে বলত “নাঃ! জ্যোতিবাবুরে দিয়া আর চলব না রে, বাবলু। আগামী বারে আমরা জিতলে তরেই মুখ্যমন্ত্রী করুম।” অন্য ক্রেতারা হেসে খুন হত।

তেমনই একটা দিনের কথা। সেদিন সকাল থেকেই শরীরটা ভাল লাগছিল না। জোনাকি বারণ করেছিল পঞ্চায়েত সমিতি যেতে। কিন্তু সেদিন অনেকগুলো জরুরী মিটিং, না গিয়ে উপায় ছিল না। সারাদিন কেমন বুক পেট ভার লাগল। ক্যান্টিনের যে খাবার রোজ দুপুরে তৃপ্তি করে খেত রবীন, সেটাও সেদিন সামান্য খেয়ে আর ভাল লাগল না। অফিস থেকে বেরোনোর সময়ে মনে হল গা গুলোচ্ছে, বমি হবে। হনহনিয়ে বাথরুমে যেতে যেতেই মাথাটা ঘুরে গেল, তারপর সব অন্ধকার।

যখন জ্ঞান ফিরল, রবীন দ্যাখে ও সভাপতির টেবিলে শুয়ে আছে, ওকে ঘিরে অফিসের সবাই। পঞ্চায়েত সমিতিরই সদস্য ডাক্তার প্রাণতোষ হাজরা ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন। “সব দেখতে পাচ্ছেন পরিষ্কার? আমাদের সবাইকে চেনা যাচ্ছে?” রবীন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতে পেরেছিল। কথা বলার শক্তি পাচ্ছিল না। তখনো যেন চারপাশটা অল্প অল্প দুলছে। “দেখি পালসটা। সঙ্গে তো স্টেথোটা পর্যন্ত নেই,” বলতে বলতে উনি রবীনের কব্জিটা ধরেন। ঘড়ি দেখে বলেন “এখন অনেকটা ভাল। বাড়ি গিয়ে অবশ্যই একটা কাউকে দেখিয়ে নেবেন। ইসিজি মাস্ট। এখুনি উঠবেন না, আরেকটু শুয়ে থাকুন।”

মিনিট কয়েক পরে উঠে বসলেও, মাটিতে পা রাখতেই মাথাটা ঝনঝন করে ওঠে। ডাক্তার হাজরা বলেন “ওনাকে একলা ছাড়া যাবে না। ট্রেনে করে একা একা যাওয়ার অবস্থা নেই। আমি যাচ্ছি সঙ্গে। আর কে যাবে?” আরো জনা দুয়েক রাজি হয়ে যায়। এস ডি ও সাহেব নিজের গাড়িটা দিতে চেয়েছিলেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য, রবীন রাজি হয়নি। হাঁটতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। তিনজনে মিলে প্রায় চ্যাংদোলা করে রিকশায় মদনপুর স্টেশন, তারপর ট্রেন, তারপর সবুজগ্রাম স্টেশন থেকে আবার রিকশায় চাপিয়ে রবীনকে বাড়ি নিয়ে এসেছিল।

সেদিন পাড়ার হরিসভায় কীর্তন হচ্ছিল। দুপুর থেকেই জোনাকি ছেলেকে নিয়ে সেখানে। বাড়ির উল্টোদিকের ক্লাবের ছেলেরা মাঠে বসে আড্ডা মারতে মারতে হঠাৎ দ্যাখে রবীনকে রিকশায় কোন মতে শুইয়ে দুজন নিয়ে আসছে, পেছনে আরেকটা রিকশা। রবীনের চোখ বন্ধ দেখে মনে হয়েছিল বুঝি অজ্ঞান। আসলে চোখ খুলে রাখলে মাথায় অসহ্য ব্যথা হচ্ছিল, তার উপর রিকশার ঝাঁকুনি। বাড়ি তালাবন্ধ দেখে ক্লাবের ছেলেরাই দৌড়ে গিয়ে রবীনকে নিয়ে এসে ক্লাবঘরে শোয়ায়। সারা পাড়ার লোক জড়ো হয়। পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা জানতেন জোনাকি আর বিপ্লব হরিসভায়। একটা ছেলে দৌড়ে ডেকে নিয়ে এসেছিল ওদের।

ডাক্তার হাজরা স্থানীয় কার্ডিওলজিস্ট এসে ইসিজি করা পর্যন্ত ছিলেন। ইসিজিতে কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু সাহায্য ছাড়া হেঁটে বাথরুম পর্যন্ত যাওয়ার ক্ষমতাও ছিল না রবীনের। পরের হপ্তা দুয়েক এই অবস্থা চলেছিল। সেই পনেরো দিনে শুভময় আর রচনা এসে দেখে গেছে, সেই বিয়ের আগে থেকে বলা সত্ত্বেও রবীন বড় ডাক্তার দেখায়নি বলে বকাঝকা করেছে। পারিবারিক ডাক্তার আর ডাক্তার হাজরার সাথে আলোচনাও করেছে কী করা উচিৎ। দুই ডাক্তারের মতেই হার্টের সমস্যা নেই যখন, তখন অসুখটা নিউরোলজিকাল। সম্ভবত রবীনের হাত কাঁপার সঙ্গে জড়িত। শুভময়ের সাথে ছাত্র রাজনীতি করতেন, পরে সিপিএমে যোগ দেন ডাক্তার জীবন চৌধুরী। তখন ভারতের সবচেয়ে নাম করা নিউরোলজিস্ট। তাঁকে দেখানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল শুভময়।

পরের ছ মাস মাসে দুবার সবুজগ্রাম থেকে কলকাতা যেতে হত ওঁকে দেখাতে। রবীনের তখন যা অবস্থা, ট্রেনে বাসে যাওয়া খুব কষ্টকর। কষ্ট করে হলেও সেভাবেই সে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু জোনাকি কিছুতেই গাড়ি ছাড়া ওকে নিয়ে যাবে না, আর সে গাড়ি সমীরের। রবীন প্রবল আপত্তি করলেও বলরাম, দিদি শ্যামা আর শুভময় জোনাকির পক্ষ নিয়ে প্রবল ধমকাধমকি করে। অশক্ত শরীরে রবীনকে মেনে নিতেই হয়।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply