নাম তার ছিল: ১০

পূর্বকথা: প্রশাসন চালাতে গিয়ে পদে পদে প্রলোভন জয় করতে হয়েছে রবীনকে। সকলে পারে না। যারা পারেনি, তাদের কথা ভেবে মন খারাপ হয় রবীনের। আর মনে পড়ে তার একমাত্র ছেলে বিপ্লব কত ছোট বয়সে বুঝতে পেরেছিল, সৎ থাকা মানে কেবল প্রলোভন জয় করা নয়। কমিউনিস্ট হওয়া মানেও কেবল নিজে দুর্নীতিমুক্ত থাকা নয়

“আমার লোভ নেই — এই অহঙ্কারটা করলেই গণ্ডগোল, মাস্টারমশাই,” বলেছিলেন পাগল মহারাজ। “লোভ সকলেরই থাকে। সেই লোভের সাথে লড়াই করতে হয়, লোভ জয় করতে হয়। যেই আপনি ভাববেন আপনার লোভ নেই, অমনি আলগা দেবেন আর সেই সুযোগে লোভ জিতে যাবে। কিন্তু আপনাকে তো সে লড়াইয়ে হারতে দেখিনি এখন অব্দি! তাহলে কার লোভ দেখে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন?”

রবীন কথাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল, উত্তরটা দেয়নি। কারণ সত্যি কথাটা বলতে পারা যেত না, পারা যায় না। ততদিনে স্বামী মৃণ্ময়ানন্দর সাথে বেশ জমাট সখ্য হয়েছে। তবু বলা যায় না। যতই হোক, উনি তো আর নবারুণের মত ছোটবেলার বন্ধু নন। তার সাথেই যেখানে এই গোপন ব্যথাগুলো ভাগ করে নেওয়ার দিন নেই, সেখানে কয়েক বছরের বন্ধুত্বে পাগল মহারাজকে কী করে বলা যায়? যার লোভ রবীনকে অস্থির করে তুলেছিল সে যে জোনাকি। তাকে যে রবীন ভালবাসে। তার দোষ ত্রুটি কখনো বাইরের লোককে বলা যায়? মহারাজ রবীনের যত বড় বন্ধুই হোন না কেন, নবার মত পরিবারের অংশ তো হয়ে যাননি। কোনদিন হবেন না।

নবার সাথে বিচ্ছেদ অনেকটা একা করে দিয়েছে রবীনকে। বিচ্ছেদের কারণ কিছুটা জোনাকিও বটে, কিন্তু সেজন্যে ওকে দায়ী করে না রবীন। প্রশ্নটা ছিল নৈতিক এবং সেখানে ও আপোষ করেনি। যা হয়েছে ভালই হয়েছে। সেদিন না হোক, পরে কখনো নবার এই চেহারা ধরা পড়তই। যত দেরি হত, হয়ত তত বেশি কষ্ট হত বন্ধুর স্খলন দেখে। বন্ধুবিচ্ছেদের জন্য তাই কষ্ট হয়েছে, কিন্তু আফশোস হয়নি রবীনের। বরং বেশ গর্বই হয়েছে নীতির পরীক্ষায় পাশ করতে পেরে, ব্যক্তিগত আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে প্রাণের বন্ধুকে ত্যাগ করেও যা অন্যায় তার বিরুদ্ধে খাড়া থাকতে পেরে। জোনাকির সক্রিয় সমর্থন সেই ঘটনায় সাহায্যই করেছিল। নইলে হয়ত পারা যেত না।

বন্ধুকে শত কষ্ট সত্ত্বেও ত্যাগ করা যায়, স্ত্রীকে যায় কি? জোনাকির লোভ নীতিতে অনড় থাকতে দিচ্ছে না বুঝেও তো তাকে ত্যাগ করতে পারেনি রবীন। মুখ বুজে আত্মনির্যাতন করে, ফাঁক পেতেই ছুটে গিয়েছিল পাগল মহারাজের কাছে। মনের জ্বালা মেটাতে। কারো নাম না করেই একটানা অনেকক্ষণ অভিযোগ করেছিল। কথা দিয়ে কথা না রাখা আর লোভের কাছে আত্মসমর্পণ — রবীনের এই দুটো অভিযোগ ছিল জোনাকির বিরুদ্ধে এবং কমরেডদের বিরুদ্ধে। কাকে আর বলা যায় সেসব কথা? কিন্তু না বললেও তো হাঁপ ধরে। তাই ৮৫-৮৬ সালে নবার সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে হালকা হতে হলে পাগল মহারাজের কাছেই চলে যেত রবীন। মহারাজ বার দুয়েক দেখেছেন জোনাকিকে, সি পি এম কর্মীদের তো চতুর্দিকেই দেখতে পেতেন। ফলে নিশ্চয়ই বুঝতেন রবীনের ক্ষোভ কার বিরুদ্ধে। তবু রবীন নিজে কখনো মুখ ফুটে কারো নাম করে কথাগুলো বলেনি। জোনাকির চেয়ে পার্টি তার কম প্রিয় ছিল না তো। মহারাজও বিচক্ষণ। নিজের মতামত দেওয়ার সময়েও ভান করতেন যেন বোঝেননি কার ব্যাপারে কথাবার্তা হচ্ছে।

যদিও প্রথম সাক্ষাতেই মৃণ্ময়ানন্দের মনে হয়েছিল রবীনের সাথে জমবে ভাল, আটাত্তরের বন্যাত্রাণের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকে আর ওদের দেখা হয়নি। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তখন ভীষণ ব্যস্ত। একাশির মে মাসে বিপ্লবের জন্ম ব্যস্ততা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। তার কয়েক মাস পরে হঠাৎ একদিন পাগল মহারাজ পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে এসে হাজির।

“মাস্টারমশাই, চিনতে পারছেন তো?”

“আরে! বসুন, বসুন। চিনব না কেন? বন্যায় আপনি আর আপনার ছেলেরা ঐরকম খাটলেন। এর মধ্যেই ভুলে যাব?”

“আজকে কিন্তু নিজের কাজে এসেছি।”

“তা তো আসবেনই। আমরা তো পাবলিক সার্ভেন্ট। আপনাদের কাজই তো আমাদের কাজ। বলুন কী করতে পারি আপনার জন্যে?”

“খুব শক্ত কিছু না। একবারটি আমার ওখানে পায়ের ধুলো দিতে হবে আর কি,” কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বাদামী খাম বার করে রবীনের হাতে দিয়ে মহারাজ বলেন।

ভেতরে একটা চিঠি। ছাব্বিশে জানুয়ারী পাগল মহারাজের স্কুলের প্রথম পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হওয়ার নিমন্ত্রণপত্র।

“বাঃ! আপনার স্কুলটা তাহলে একটু একটু করে বড় হচ্ছে?”

“হ্যাঁ, আসলে বেশ কয়েকটা পয়সাওয়ালা লোককে টুপি পরাতে পেরেছি আর কি,” হাতের ছোট্ট কৌটো থেকে একটু মৌরি ঢেলে মুখে দিয়ে পরম তৃপ্তির সঙ্গে মহারাজ বলে ওঠেন।

রবীন চমকে যায়। ধর্ম তো মানুষকে টুপিই পরায়, কিন্তু সে কথা একজন সন্ন্যাসী নিজ মুখে অবলীলাক্রমে বলতে পারে? ওর মুখ দেখে মনের ভাবটা বুঝতে অসুবিধা হয় না মহারাজের। মুচকি হেসে বলেন “আরে মশাই, আপনার কাছে আমার লুকোনোর দরকার নেই। আলবাত টুপি পরিয়েছি। ভাল কাজের জন্য মিথ্যে বললে দোষ হয় না। এ আমাদের ঠাকুরের কথা।”

রবীনের অস্বস্তি কাটে না, তবু সে হাসার চেষ্টা করে বলে “কী বলে টুপি পরালেন?”

“খুব সোজা। বললাম একটা আশ্রম করেছি, ঠাকুরের একটা মন্দির করছি, সঙ্গে দুঃস্থ ছেলেদের জন্যে একটা স্কুল। মুক্ত হস্তে দান করুন।”

“মন্দির? আমি কিন্তু মন্দির উদ্বোধন করতে যাব না।”

“সে আমি জানি। এই কটা বছর আমি আপনার খবর রেখেছি। জানি আপনি খাঁটি লোক। মন্দির হলে তবে তো উদ্বোধন করার প্রশ্ন।” মহারাজ বিচ্ছু ছেলের মত চোখ মারেন।

“মানে?”

“মানে মন্দিরের কথা না বললে লোকে হাত খোলে না, বুঝলেন না? যদি শুধু বলতাম গরীব ছেলেদের জন্যে স্কুল করছি, অমনি পাঁচ টাকা, দশ টাকা বেরোত। আসলে কাদের টুপি পরাচ্ছি বলুন তো? পাপীদের। ধনী ব্যবসায়ী, ঘুষখোর সরকারী অফিসার, চালের আড়তদার — এরাই তো বেশি দানধ্যান করতে পারে। সাদা পথে রোজগার করা সত্যিকারের ভক্ত দানধ্যান করার জন্যে পাঁচ দশ টাকার বেশি পাবে কোথায় বলুন? তা এই যে সব বড় বড় পাপী, এরা সারাক্ষণ অপরাধবোধে ভোগে, বুঝলেন তো? ধর্মস্থানে টাকা দিচ্ছি জানলে এদের মনে হয় বুঝি পাপ স্খালন হল। মানে আমার মত সাধু সন্ন্যাসীদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার বকলমা দেয় আর কি। সেই নাটকটা দেখেছেন তো?”

“কোনটা? নটী বিনোদিনী?”

“ঠিক। ঠাকুর গিরীশকে বলেন না, ‘দে, বকলমা দে’? এও সেই ব্যাপার।”

“শুধু দেখেছি নয়, আমাদের ক্লাবের যাত্রায় গিরীশের চরিত্রে অভিনয়ও করেছি।”

মহারাজ একগাল হেসে বলেন “তাহলে ঠিকই বুঝেছি। আপনার উপরে ঠাকুরের আশীর্বাদ আছে।”

রবীন হো হো করে হেসে ওঠে। “নাস্তিক, মার্কসবাদী লোকের উপরে রামকৃষ্ণের আশীর্বাদ! এই জন্যেই আপনাকে মঠ থেকে বার করে দিয়েছিল, মহারাজ।”

মহারাজও হাসতে হাসতে বলেন “আপনি বিশ্বাস না-ই করতে পারেন। কিন্তু ঠাকুরের ইচ্ছা হলে তিনি অবিশ্বাসীকেও আশীর্বাদ করতে পারেন। আপনি ঠেকাতে পারবেন না।”

“আচ্ছা আচ্ছা, সে নয় হল। কিন্তু মন্দির বানাব বলে লোকের থেকে টাকা নিলেন, তারপর না বানালে তো ঠ্যাঙাবে আপনাকে।”

“আমি অত কাঁচা লোক নই, মাস্টারমশাই। ঐদিন সকালে ভিতপুজোর ব্যবস্থা করে রেখেছি। ভক্তসমাগম হবে, তারা এসে দেখবে মন্দির হচ্ছে। টাকাগুলো দিয়ে আমার ছেলেগুলোকে উৎসাহ দেওয়ার কাজটা এদিকে হয়ে গেল।”

“আপনার সব যুক্তিই ঠিক, মহারাজ। কিন্তু যদি আপনি মন্দির শেষ অব্দি না-ই করেন, কয়েক বছর পরে যদি লোকে আপনার বিরুদ্ধে জোচ্চুরির অভিযোগ তোলে, তখন তো আমার বিরুদ্ধে জোচ্চোরের পাশে থাকার অভিযোগ উঠবে।”

“ছি ছি,” একহাত জিভ কেটে মহারাজ বলেন “মন্দির একেবারে করবই না বললাম কখন? আমি ঠাকুরের চ্যালা, তাঁর মন্দির করব সংকল্প করে যদি না করি কত বড় পাপ হবে বলুন দেখি? মন্দির হবে। ধীরে ধীরে। আগে আমার স্কুলের উন্নতি, পরে মন্দির। ঠাকুর মন্দিরে থাকেন না, থাকেন মানুষের মধ্যে। তাদের ভাল আগে করলে পাপ হয় না।”

“হুম। জীবে প্রেম… কী যেন?”

“‘বহুরূপে সম্মুখে তোমার

ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর

জীবে প্রেম করে যেইজন

সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’

আপনি বিবেকানন্দ পড়েন নাকি, মাস্টারমশাই!”

“না না। আমার স্ত্রীর মুখে শোনা। ও তো মিশনের দীক্ষিতা।”

“তবেই দেখুন। ঠাকুর সারাক্ষণ আপনাকে ছুঁয়ে আছেন।”

“এই রে, আপনাকে বলাই ভুল হল দেখছি।”

দুজনেই হেসে গড়াগড়ি। সেই শুরু নিয়মিত দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা।

শুধু সেবার নয়, তারপর থেকে যতদিন পাগল মহারাজ বেঁচেছিলেন, বড়িহাটা রামকৃষ্ণ হাইস্কুলের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে রবীনকে যেতেই হত। যখন স্কুলটা রীতিমত নাম করা হয়ে উঠেছে আর রবীন সব প্রশাসনিক পদ ছেড়ে দিয়েছে, পার্টির জোনাল কমিটিতেও নেই, পার্টির প্রাথমিক সদস্যপদটুকু ছাড়া আর কিছুই নেই তার, তখনো মহারাজ ছাড়তেন না। “আমার স্কুল। আমি যাকে খাঁটি লোক মনে করি সে প্রধান অতিথি যদি না-ও হয়, কয়েকটা পুরস্কার আমার ছেলেদের হাতে তাকে দিতেই হবে। আপনার ইচ্ছে না হলেও বন্ধু হিসাবে এই অত্যাচার আপনাকে সহ্য করতেই হবে।”

সেই বন্ধুত্বের অধিকারেই ১৯৮৭র সেই বিকেলে মহারাজের কাছে ছুটে গিয়েছিল ক্ষতবিক্ষত রবীন। ঘটনাটা বেড়াতে যাওয়া নিয়ে।

সমীর বলে ছেলেটি কন্ট্রাক্টর। আজাদপুরের কাছে এক জায়গায় রাস্তা বানানোর বরাত নেবে বলে সোজা রবীনের কাছে চলে এসেছিল একদিন। রবীন বলেছিল “কদ্দিন ব্যবসা করছ, বাবা? বরাত কিভাবে দেওয়া হয় জানো না? টেন্ডার জমা দাও গে। সভাপতির সাথে দেখা করার তো কিছু নেই। কেটে পড়ো।” ছেলেটি কথা না বাড়িয়ে চলে গিয়েছিল। পরে যখন বরাত দেওয়া হয়ে গেল, রবীন খেয়াল করেছিল যে ঐ ছেলেটির কোম্পানিই বরাত পেয়েছে।

এরপর একদিন সন্ধেবেলা পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফিরে রবীন দ্যাখে সমীর একতলার ভেতরের ঘরের খাটে বসে বিপ্লবের সাথে খেলাধুলো করছে। বিপ্লবের কোন চেনা অচেনা ছিল না জন্মের পর থেকেই। ফলে সমীরের সাথে তার দিব্যি ভাব জমেছে। রবীন যখন ভুরু কুঁচকে ভাবছে বদমাশটাকে ছেলের সামনে কতটা ভদ্রভাবে বিদেয় করা যায়, তখনই জোনাকি এসে বলে “জানো, ওকে অনিন্দ্যদা পাঠিয়েছে। তুমি আসবে বলেই বসিয়ে রেখেছি। ও বসতে চাইছিল না। তোমাকে চেনে বলল, তাই বললাম দেখা করেই যাও।”

অনিন্দ্যসুন্দর সেনগুপ্ত বিখ্যাত কবি এবং জোনাকির দাদা শুভময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রবীনদের বিয়েতে এসেছিলেন, পরেও সস্ত্রীক সবুজগ্রামের বাড়িতে এসে সারাদিন কাটিয়ে গেছেন। অমায়িক লোক। উনি যে অত বিখ্যাত মানুষ তা বোঝাই যায় না। কলকাতার বুদ্ধিজীবীকে মাটিতে বসে অত চেটেপুটে খেতে রবীন কখনো দ্যাখেনি। সেই লোককে এই যন্তরটি কী করে চিনল ভেবেই পেল না রবীন। নির্ঘাত মিথ্যে কথা।

ছেলেটি চোর চোর মুখ করে তাকিয়ে ছিল। রবীন কাঁধে হাত রেখে শুধোল “তুমি অনিন্দ্যদাকে কীভাবে চেনো?”

“ওনার বোন-ভগ্নীপতি আমাদের বাড়িতে ভাড়া এসেছেন বছর খানেক হল। ওনাদের মেয়েটা তো সারাক্ষণ আমাদের ঘরেই থাকে। আমার সাথে বাচ্চাদের খুব ভাব।”

“বুঝলাম। কিন্তু বাচ্চার মামার সাথে আলাপটা কী করে হল, ভাই?”

“ঐ… ওনাদের ঘরে উনি সেদিন এসেছিলেন… আমি ছিলাম,” সমীর ঢোঁক গিলে বলেছিল। “কী করি টরি সেসব জিজ্ঞেস করছিলেন। তো কথায় কথায় বউদির কথা, আপনার কথা বললেন…”

কথা শেষ করার আগেই জোনাকি বলে “ওর হাত দিয়ে অনিন্দ্যদা ওঁর নতুন বইটা পাঠিয়েছেন। এই দ্যাখো।”

বইটা হাতে নিয়ে রবীনের মেজাজটা একটু ঠান্ডা হল। সবুজ মলাটের উপর সাদায় লেখা বইয়ের নাম ‘তোমার জন্যে পংক্তিভোজন’, আর কবির নাম। ভিতরে লাল কালিতে লাইন দুয়েক লিখেও দিয়েছেন ভদ্রলোক

আদরের জোনাকি আর তার আগুনে বর রবীনকে। সশরীরে হাজির হতে না পারার অপরাধ মার্জনা কোরো। পরে কবজি ডুবিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করব।

              — অনিন্দ্যদা

যাক, ছেলেটা তাহলে ছুতো করে কোন দু নম্বরি প্রস্তাব টস্তাব নিয়ে আসেনি। রবীন নিশ্চিন্ত হয়ে বইটা নিয়ে ভিতরে চলে যায়। জোনাকিকে গিয়ে বলে “তোমার বাপের বাড়ির দিক থেকে এসছে। ছেলেটাকে একটা অমলেট টমলেট খাইয়েছ তো? নইলে আবার কুটুমবাড়িতে আমার বদনাম হবে।”

“অমলেট কী বলছ? কত মিষ্টি নিয়ে এসেছে দ্যাখো,” জোনাকি বাক্সের ঢাকনা খুলে দেখায়। “এত মিষ্টি তো আমরা সাতদিন ধরে খেয়েও শেষ করতে পারব না। ওখান থেকেই ওকে দিলাম কয়েকটা। অমলেটও দিয়েছি।”

রবীনের সন্দেহটা আবার ফিরে আসে। জোনাকি বুঝতে পারে না মিষ্টি দেখে রবীনের মত খাইয়ে লোকের কী কারণে মুখ গোমড়া হতে পারে। সে বাইরের ঘরে গিয়ে সমীরের সাথে গল্পগুজব করে, রবীন গামছা পরে কুয়োতলায় গায়ে জল ঢালতে যায়। ফিরে আসতেই সমীর বলে “আমি এবার উঠি, রবীনদা।”

“আচ্ছা, এসো। অনিন্দ্যদা কি এখন মাঝে মধ্যে আসছেন তোমাদের ওখানে?”

“না, এই তো প্রথম দেখলাম।”

“আচ্ছা। আবার এলে বোলো রবীনদা, বৌদি যেতে বলেছে।”

“ওকেও আবার আসতে বলো”, জোনাকি খেয়াল করায়।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই। এসো সময় করে।”

সমীরের সময়ের দেখা যায় বিশেষ অভাব নেই। কদিন পরে পরেই তার দেখা মেলে। মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি ফিরে রবীন শোনে সন্ধ্যায় সে এসেছিল। ব্যাপারটা রবীনের খুব একটা ভাল না লাগলেও দেখা যায় বিপ্লব তার বেশ ন্যাওটা হয়ে গেছে। জোনাকিও খাঁ খাঁ বাড়িতে একটা কথা বলার লোক পেয়ে আনন্দিত। কাজ সম্পর্কিত কোন কথা বলেনি বলে রবীন এই যাতায়াতে আপত্তি করে না, কিন্তু মনটা খচখচ করে। কোন স্বার্থ ছাড়াই তার বাড়িতে একজন কন্ট্রাক্টর এতবার আসছে — এটা কেমন হিসাবে মেলে না।

এসব ৮৬ সালের কথা। পরবর্তী এক বছরে সমীর বৌদির বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে, বিপ্লবও সমীরকাকুর ফ্যান। আজাদপুরের সেই রাস্তা বানানো শেষ হয়ে সমীর তার পাওনা গণ্ডাও বুঝে নিয়েছে এর মধ্যেই। কোথাও প্রাপ্যের বেশি কিছু দাবী করেনি, এতবার রবীনের বাড়ি এসেও ঐ প্রোজেক্ট নিয়ে কোন কথাবার্তাই বলেনি। তাই সভাপতির মনটা একটু নরম হয়। বিকেল ছাড়াও ছুটির দিনে সমীর সকালে আসতে শুরু করে। বলরামের সঙ্গে সে-ও ঐ আড্ডার একজন নিয়মিত সদস্য হয়ে যায়। যথারীতি পার্টির অন্য ছেলেপুলে বা রবীনের রাজনীতির বাইরের বন্ধুরাও থাকত সেখানে, দফায় দফায় চা আর রান্না চাপানো বাদ দিলে, জোনাকিও। এবং বিপ্লব।

ওর তখন সকালে স্কুল, ফিরতে ফিরতে রবীনের বেরিয়ে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। পঞ্চায়েত সমিতি সেরে, পার্টির কাজ সেরে সে বাড়ি ফেরে অনেক রাতে। কোন কোনদিন বাবার সাথে খাবে বলে জোর করে জেগে থাকলেও বেশিরভাগ দিনই জোনাকির বকুনিতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়তে হয়। রবিবার সকালগুলোতে তাই সারাক্ষণ বাবার সঙ্গে লেপ্টে থাকত বিপ্লব। বিকেল হলেই আবার বেরিয়ে যাবে যে।

তেমনই এক রবিবারের আড্ডায় অয়ন প্রস্তাব দেয় পুজোয় গাড়ি করে কলকাতায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া হোক। পরের সপ্তাহেই পুজো।

অয়ন কুড়াইল জুটমিলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিটু নেতা বিজন চৌধুরীর একমাত্র ছেলে। লোকে বলত মাথায় ছিট আছে। কারণ বাপের কারখানা শাসনের উত্তরাধিকার বুঝে নেওয়ায় তার মোটে আগ্রহ ছিল না, ছিল কবিতা লেখায় আর লোককে ডেকে ডেকে শোনানোয়। রবীন বিজনকে কোনদিন পছন্দ করেনি এবং তার ছেলেকেও প্রথম দিকে পাত্তা দেয়নি। তারপর লোকে যেভাবে ওকে দেখলেই কবিতার ভয়ে দূর থেকে কেটে পড়ে আর আড়ালে পাগল ছাগল বলে, তাতে মায়া হল। তার ফলে নিয়মিত প্রচুর বাজে কবিতা শুনতে হয়, তবু রবীন ওকে একটু প্রশ্রয় দেয়। ছেলেটা বাপের মত নয় একেবারেই, বরং অত্যন্ত সরল, সাদা মনের মানুষ — একথা সে বুঝেছে।

সেই অয়নই একদিন ধুয়ো তোলে “বাবাকে বলব একটা গাড়ি যোগাড় করে দিতে। অষ্টমীর রাতে চলুন, রবীনদা।”

রবীন প্রথমেই জল ঢেলে দেওয়ার জন্যে বলে “না রে। আমার হবে না। অষ্টমীর দিন হীরুদার বাড়ি যেতে হবে।”

সমীর জোনাকিকে বলে “বৌদি, আপনি রাজি হয়ে যান, তাহলেই রবীনদা রাজি হবে।”

রবীনকে চমকে দিয়ে জোনাকির উত্তর “আমি তো রাজিই। আমি সব সময় রাজি। কিন্তু তোমাদের দাদার সময় হয় কোথায় ঘোরা বেড়ানোর? এখানেই দুটো ঠাকুর দেখতে যেতে চায় না। এই করে ছেলেটারও পাড়ার বাইরে কোন ঠাকুর দেখা হয় না।”

“না না, যাবে যাবে। এবারে যাবেখন,” বলরাম ফুট কাটে। “হীরুদার বাড়ি পরে যেও, রবীনদা। বছরে একটা দিন তো বিপ্লব, বৌদি — ওদের নিয়ে একটু রিল্যাক্স করবে নাকি?”

“এটা কিন্তু ঠিক,” সমীর জোর দেয়। “ওদের তো আপনি একদমই সময় দিতে পারেন না। আর আপনারও তো বিশ্রাম দরকার।”

“ওর বিশ্রাম টিশ্রাম লাগে না,” বেশ তেতো করেই জোনাকি বলে। “সারাক্ষণ রাজনীতির কচকচি না হলে ওর ভালই লাগে না। আমারই বরং বিশ্রাম দরকার।”

“আচ্ছা, তাহলে অন্তত বৌদির কথা ভেবেই চলুন? গাড়ি আমি নিয়ে আসব, অয়ন। তুমি, আমি, রবীনদা, বৌদি আর বিপ্লব।” সমীরের ব্লু প্রিন্ট তৈরি। “বলদা, তুমিও চলো।”

“না রে। আমার পাড়ার পুজোয় তো অষ্টমীর দিন দুঃস্থদের বস্ত্র বিতরণ। আমাকে প্রধান অতিথি করেছে।” বলরাম, ততদিনে ক্ষেত্রগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান, বলে।

উপস্থিত সকলে মিলে চাপাচাপি করে রবীনের মৌখিক সম্মতি আদায় করেই ছাড়ে। শুধু বিপ্লব, কে জানে কী বুঝে, বারবার বলছিল “আমি ঠাকুর দেখতে ভালবাসি না।”

বাড়ি খালি হওয়ার পর রবীন জোনাকিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে একজন কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সপরিবারে কলকাতা বেড়াতে যেতে পারে না। জোনাকি এটাকে অকারণ ছুঁৎমার্গ ছাড়া আর কিছুই ভেবে উঠতে পারেনি।

“সমীর এতদিন আসছে। কোনদিন তোমার থেকে কোন অন্যায় সাহায্য চেয়েছে? কখনো বলেছে ‘রবীনদা আমার হয়ে ওকে বলে দিন, এটায় সই করে দিন, সেটায় সই করে দিন?’ তোমার তাতেও সন্দেহ যায় না?”

“এখনো কোন সুবিধা নেয়নি বলেই যে ভবিষ্যতেও নিতে চাইবে না তার কোন গ্যারান্টি নেই। এখনো চায়নি বলেই বাড়িতে ঢুকতে দিই। সেটা কথা নয়। কথা হচ্ছে ওর পেশার লোকের আমার পদের লোককে দরকার পড়েই। ওর গাড়িতে চড়ে আমরা বেড়াতে গেলে লোকে ভাবতেই পারে আমি অসৎ।”

“লোকের কথার দাম দেড় পয়সা। তুমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকলেই হল।”

“আমাকে যারা নেতা বানিয়েছে তারাই আমার বিবেক, জোনাকি। গরীব মানুষের পার্টি করি বলতে বলতে আমি কন্ট্রাক্টরের গাড়িতে চড়তে পারি না।”

এরপর তুমুল ঝগড়া লেগে যায়। বিয়ের সাত বছর হয়ে গেছে ততদিনে। ফলে জোনাকির যে সুখী জীবনযাত্রার উপরে যথেষ্টই লোভ আছে, সেকথা জানতে রবীনের বাকি ছিল না। কিন্তু সে যা চায় তা পাওয়ার জন্যে যে রবীনের নীতি আদর্শকেও বলি দিতে পারে — এতটা ধারণা ছিল না। বেশ খানিকক্ষণ চেঁচামেচি করার পর রবীনের মনে হয় মিথ্যে এত শক্তি খরচ করা। এত বয়সে কি কারো জীবনদর্শন বদলানো যায়?

বিকেলে হরিমতীর ঝিলের ধারে বসে বিড়ি খেতে খেতে রবীনের মন বলে “জোনাকির যখন এত ইচ্ছা, ও আর ছেলে ঘুরে আসুক। আমি না গেলেই তো হল।”

“তাতেও কি বদনাম আটকাবে?” মস্তিষ্ক জিজ্ঞেস করে।

“তা আটকাবে না, কিন্তু এছাড়া উপায় কী? বউকে তো আর মেরে ধরে আটকাতে পারব না,” মন উত্তর দেয়।

মানতেই হয়।

অষ্টমীর দিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পরেই বেরোনো। অশান্তি এড়াতে আগে থেকে জোনাকিকে কিছু বলেনি রবীন। খেতে খেতেই বলে, সে যাচ্ছে না। প্রতিক্রিয়াটা অপ্রত্যাশিত। বিপ্লব বলে “আমিও যাব না। আমার ঠাকুর দেখতে ভাল লাগে না।”

জোনাকি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলে “তুমি কিছুতেই আমার কোন সাধ আহ্লাদ পূরণ হতে দেবে না, না? আবার ছেলেটাকেও শিখিয়ে রেখেছ।”

রবীন বুঝিয়ে বলে, সে চায় জোনাকি আর বিপ্লব ঘুরে আসুক অয়ন আর সমীরের সাথে। জোনাকি আরো রেগে চিৎকার করে “তুমি খুব ভাল করেই জানো আমি তোমাকে বাদ দিয়ে যাব না। যাওয়াটা বানচাল করার জন্যেই এই ফন্দি এঁটেছ।” কীভাবে নিজের সমস্ত শখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সে রবীনের হেঁশেল ঠেলছে সেই প্রসঙ্গ এরপর সারা পাড়া শুনতে পায় ভরদুপুরে। রবীন চুপ করে শোনে আর ভাবে ভিতরে কত ক্ষোভ জমা হয়ে থাকলে পাঁচ বছরের ছেলের সামনেই এভাবে তাকে অভিযুক্ত করতে পারে জোনাকি। সত্যিই তো। কত বড় পরিবারের মেয়ে কী সংসারে এসে পড়েছে! অনায়াসে কোন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কি সরকারী অফিসারের বউ হতে পারত মেয়েটা। কোন অভাব থাকত না। রবীনেরই ভুল। তাড়াহুড়ো করে সে-ই তো নষ্ট করেছে ওর জীবনটা। জোনাকি একটু শান্ত হলে রবীন বলে “রাগ করে বলিনি। আমার তোমাদের গাড়ি করে কলকাতার ঠাকুর দেখানোর সামর্থ্য কোনদিন হবে বলে মনে হয় না। ঘুরে এসো। পুজোর দিনে মন খারাপ করে ঘরে বসে থেকো না। একবার ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দ্যাখো, বেচারার মুখটা ছোট হয়ে গেছে।”

জোনাকি বিপ্লবকে বুকে টেনে নিয়ে মন ভাল করে, সাজগোজ শুরু করে। রবীন হীরুদার বাড়ি যাওয়ার নাম করে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। গিয়ে পৌঁছায় গলামনের পাড়ে পাগল মহারাজের আশ্রমে। মানুষ একা হলে একা মানুষ খোঁজে।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply