চিরকুট

বহু বছর পর, আজ সুখেন্দুর অফিস থেকে বেরনোর তাড়া নেই।

কাজ শেষ, সবাই বেরোবে বলে তোড়জোড় করছে, সুখেন্দু দেখছে আর ভাবছে — এরা কেউ সোজা বাড়ি যাবে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা করে আড্ডা মারবে কোথাও, কেউ পরকীয়া প্রেম করবে, কেউ নাইট শোতে সিনেমা দেখে রেস্তোরাঁয় খেয়ে বাড়ি ফিরবে বেশ রাতে। শুক্রবারের সন্ধ্যে এসে পড়লেই কত মনোরম দৃশ্যের জন্ম হয় এই শহরে, সেসব দৃশ্যের অভিনেতা অভিনেত্রীদের আরো কত দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা থাকে শনি, রবিবার নিয়ে। তাই এত তাড়া। সুখেন্দুর কল্পনা নেই, পরিকল্পনা নেই। ফলত তাড়া নেই।

কি বোর্ডটাকে মনিটরের কোলে তুলে দিয়ে ডেস্কে এক চিলতে জায়গা বার করে হাতে মাথা রেখে চোখদুটো বুজে ফেলে মনে হয় — মন্দ কী? সাত বছর ধরে সারাদিন যা ব্যস্ততায় কেটেছে, এখন নির্জন অবসরে সেসব রোমন্থন করেই তো দিব্যি চলে যাবে। শরীরেরও তো সহ্যের সীমা আছে। চঞ্চলতা সহ্য করা আর তার পক্ষে সম্ভব হবে না। আর তো একটা সপ্তাহ। তারপর যেটুকু দৌড়াদৌড়ি করতে হয় অফিস যেতে, সেটুকুও থাকবে না। অখন্ড অবসর। কল্পনার সাথে।

মিনিট খানেক জিরিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে সুখেন্দু টের পায় একটা চিনচিনে ব্যথা বাঁ কাঁধ বেয়ে নামছে, হাতটা ভারী হয়ে উঠছে। ভাগ্যিস এসব ব্যথা বেদনা গত সোমবার অব্দি লুকিয়ে ছিল। নইলে পাঁচটায় অফিস থেকে বেরিয়ে দৌড়ে মেট্রো ধরে সাড়ে পাঁচটায় হাসপাতালে পৌঁছে এক ঘন্টা কল্পনার সাথে গল্প করে গল্ফগ্রীনের ফ্ল্যাটে ফিরে রান্নাবান্না করে খেয়ে সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে কল্পনার নির্দেশ মত বাড়ির সব কাজ সেরে ঠিক সাড়ে দশটায় অফিসে আসার ধকল এই আটান্ন বছরের শরীরটা নিত কী করে?

কল্পনার তো কিছুতেই বিশ্বাস হত না সুখেন্দু একা একা সব ঠিকঠাক করে নিতে পারে। তাই শেষদিকে মোবাইলে ছবি তুলে এনে দেখাতে হত।

দেখে কল্পনা লিখত “ভালই হয়েছে৷ কিন্তু মাটিটা আরেকটু কুপিয়ে দিতে হত। আর গৌরাঙ্গর মা দেখছি খুব ফাঁকি দিচ্ছে। থালায় মুখ দেখা যাচ্ছে কই?”

উত্তরে সুখেন্দু “উফ! কিছুতেই তোমায় সন্তুষ্ট করতে পারলাম না।”

মুচকি হেসে কল্পনা লিখত “পরের জন্মে আবার গোড়া থেকে চেষ্টা কোর।”

বৃষ্টির দিনগুলোয় কল্পনার ভারী আহ্লাদ হত। যাওয়া মাত্রই লিখত “জানলার পাশে বস। গান গাও।”

“যাঃ! পাশের কেবিনের পেশেন্টরা বিরক্ত হবে।”

“হোক। এদের তো জীবন পড়ে রয়েছে। তুমি তো আমার জন্যে গাইছ। আর তো বেশিদিন শুনতে পাব না। গাও।”

এরপর না গেয়ে উপায় কী?

গত সপ্তাহে অবশ্য এই ঠান্ডার মধ্যেও ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ়’ গাইতে হল বার পাঁচেক। কারণ কল্পনা লিখল “এটা ফুলশয্যায় গেয়েছিলে। সামনের বর্ষা অব্দি থাকা হবে না। এখনই শুনিয়ে দাও।”

ভোকাল কর্ডটা বাদ দেওয়ার কথা যখন ডাক্তার মন্ডল বলেছিলেন তখন সুখেন্দু ভেবেছিল কল্পনা আপত্তি করবে। গান গাওয়া বন্ধ হলে সেই কষ্টেই ও মারা যাবে। ডাক্তার যে ভাবছেন “লাইফ এক্সপেকট্যান্সি” বাড়বে, সে মোটেই হবে না। অবাক কান্ড! কল্পনা কিন্তু এক কথায় রাজি হয়ে গেল। অপারেশনের পর থেকে ও-ই বুদ্ধি করে চিরকুটে কথা বলা চালু করল। ভাগ্যিস। একের পর এক অর্গান ফেল করা সত্ত্বেও শেষ দিন কোমায় চলে যাওয়া অব্দি কথাবার্তা তো চালিয়ে যাওয়া গেল।

অফিস থেকে এক সময় বেরোতেই হল। বাসে উঠে জানলার সিটটা পেয়ে গেল সুখেন্দু। তারপর হাতের ব্যাগ থেকে বের করল চিরকুটের তাড়াটা। পড়ছে আর আপন মনে হাসছে। ভিড় বাড়ল, সুখেন্দুর ভ্রূক্ষেপ নেই। একটু দূরে বসা অল্পবয়সী ছেলেটি পাশে বসা বান্ধবীকে হোয়াটস্যাপ করল “এই বয়সেও বুড়োর রস দেখেছিস?”

প্রকাশ: ফেসবুক

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply