ভগবান নেই?

পুলিন অন্ধ। মাথারও ঠিক নেই। পাড়ার ছেলেপুলেরা তাই দেখতে পেলেই পেছনে লাগে, আর পুলিন রেগে গিয়ে মুখ খারাপ করে। আগে বাড়ি বাড়ি ধূপ বিক্রি করে পেট চলত, ক বছর হল টাকাপয়সার হিসাব রাখতে পারে না। কার কাছে পায় আর কে ওর কাছে পায় কিছুই খেয়াল থাকে না, লোকেও ঠকিয়ে নেয় ইচ্ছে মত, ব্যবসা লাটে উঠেছে। কেউ দয়া করে দু পয়সা দিলে দুটো খাওয়া হয়। সব দিন হয় না।

বাঁড়ুজ্জে বাড়ির গিন্নী কিন্তু খেয়াল রাখেন। ধূপ কিনতে হলে ওর থেকেই কেনেন, তখুনি পয়সা দিয়ে দেন। এ বাড়ির ছেলেমেয়েরা পুলিনকাকু বলে, পেছনে লাগে না। তাই এ বাড়িতে পুলিন ঘন ঘন আসে, যতগুলো প্যাকেট পারে বেচে দিয়ে যায়। গিন্নী হিমসিম খান বোঝাতে যে পরশুই তিন প্যাকেট দিয়ে গেছে, এখন আর কেনা যাবে না। পুলিন পীড়াপীড়ি করে, তারপর হতাশ হয়ে লাঠি ঠকঠক করতে করতে ফিরে যায়। গিন্নীর মনটা ভার হয়ে থাকে সারা বেলা।

কর্তা একদিন পুলিনকে বললেন “তোমার প্রতিবন্ধী কার্ড আছে?” পুলিন ওসব জানত না। তা কর্তা বললেন “একদিন এসো, চিঠি লিখে দেব। করিয়ে নিলে অনেক সুবিধা। ট্রেনে, বাসে ভাড়া লাগবে না।” পুলিন করিয়েছিল।
পুলিনের মাংস ভাত খাওয়ার সাধ। একদিন মুখ ফুটে বাঁড়ুজ্জে গিন্নীকে বলেই ফেলল। গিন্নী কর্তাকে বলতে তিনি বললেন “বেশ তো। এই সোমবারে তো মাইনে পাব। ওকে সামনের রোববার খেতে বলে দাও।”

ডাল, ভাজা, বাঁধাকপির তরকারি আর মুরগির ঝোল। পুলিন চেটেপুটে খেল। তারপর এক গেলাস জল খেয়ে যে তৃপ্তির হাসি হাসল, গিন্নী তা দেখে চোখ মুছলেন। মানুষটা অনেককাল পেট ভরে খায়নি নিশ্চয়ই। মাস খানেক পরেই পুজো। কর্তা পুলিনের জন্যে একখানা শার্ট কিনে দিয়ে গিয়েছিলেন। হাতে দিয়ে গিন্নী বললেন “তোমার জামাটা একদম ছিঁড়ে গেছে গো। এটা পরে নিও।” পুলিন ব্রাউন কাগজের প্যাকেটটায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল “কী রঙ, বৌদি?” “কচি কলাপাতা।”

এসব পুলিনের জোয়ান বয়সের কথা। এখন ওর অনেক চুল পেকে গেছে। মাথাটা আরো খারাপ হয়েছে। চেনা পাড়াতেও রাস্তা হারিয়ে ফেলে। বাঁড়ুজ্জে গিন্নী মাঝে মাঝে ভাবেন, লোকটা গেল কোথায়? আজকাল তো আর এদিকে আসেই না। বেঁচে আছে তো?

অনেকদিন পর ঘুরতে ঘুরতে সেদিন ও পাড়ায় গেছে বাঁড়ুজ্জেদের বাড়ি যাবে ভেবেই। ধূপ আর বেচা হয় না, তবু। পাগলের খেয়াল। গিয়ে শোনে চারদিকে বড্ড হৈ চৈ, অনেক লোক। “বলো হরি হরিবোল।” কাকে যেন সাবধানে ম্যাটাডোরে তুলতে বলছে সবাই।

“কে গো? কে মারা গেল?” জিগেস করতে করতে মুখ ব্যথা পুলিনের। সবাই ভীষণ ব্যস্ত, পাগলের কথার জবাব দেয়ার সময় নেই। শেষে বয়স্ক একজন বেজায় বিরক্ত হয়ে বললেন “আঃ! কিছুই খবর রাখো না? এত বড় মানুষটা এই বয়সে চলে গেল?”

“কে? কার কথা বলচেন?”

“আরে কে আবার! বাঁড়ুজ্জে মশাই। আহা, সবে ষাট হয়েছিল গো…”

পুলিন হঠাৎ, কে জানে কার উপর রেগে গিয়ে চেঁচাতে শুরু করল “অ্যাঁ! বাঁড়ুজ্জে মশাই নেই! কেন? কেন থাকবেন না? উপরে ভগবান নেই? ভগবান দেখছেন না? দেখবেন না আমাদের?” পাড়ার লোকে অনেক কষ্টে পুলিনকে চুপ করাল, বলল “শোকের জায়গায় চেঁচামেচি করতে নেই।”

প্রকাশ: ফেসবুক

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply