নাম তার ছিল: ৮

পূর্বকথা: উদ্বাস্তুদের পাড়া সুভাষ কলোনিতে কয়েকজন সম্ভাবনাময় ছাত্রছাত্রী আছে রবীনের। সে দিনে অন্তত একবার তাদের লেখাপড়ার খবর নিতে যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে একদিন রাতে চোখে পড়ে, পার্টি অফিসের টিভিতে কয়েকজন তরুণ হিন্দি সিনেমা দেখছে

প্রায় ষাট বছর বয়স হল, রাজনীতিতে বছর চল্লিশেক। অনেক স্বপ্ন দেখা হল, স্বপ্নভঙ্গও কম হল না, তবু রবীন আজও মনে করে রোম্যান্টিক না হলে কেউ কমিউনিস্ট হয় না। নিজেকে কখনোই কমিউনিস্ট বলে মনে হয়নি। কমিউনিস্ট হওয়ার ইচ্ছা নিয়েই রাজনীতি করতে আসা। এবং বিপ্লব করার জন্যে। কিন্তু সে পথে কোনদিন হাঁটাই হয়নি। মাঝে মাঝে রবীন ভাবে, আসলে পার্টিই কি কোনদিন বিপ্লব করতে চায়নি? চলতি সমাজব্যবস্থার মধ্যেই একটু আধটু সংস্কার করতে চেয়েছিল কি? সোশাল ডেমোক্র্যাট? এটাই কি ঠিক তকমা সি পি এমের? লেনিন তো এক সময় কঠোর সমালোচনা করেছেন সোশাল ডেমোক্র্যাটদের। এত মানুষের জেল খাটা, প্রাণ দেওয়া — সব কি শুধু সোশাল ডেমোক্র্যাট হওয়ার জন্যে?

প্রশ্নগুলো ইদানীং ভাবায়। আর এসব ভাবতে গেলেই অনিবার্যভাবে মনে পড়ে মুন্নার কথা। মুন্না কিন্তু পরিষ্কার বলত “ও শালাদের বিপ্লব করার কোন ইচ্ছাই নেই। থাকলে যুক্তফ্রন্ট সরকারে যেত না।” কোনদিন একমত হতে পারেনি রবীন। মতান্তর, তা থেকে মনান্তর। তবুও মুন্নার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হাউ হাউ করে কেঁদেছিল। ঐ মৃত্যু শুধু যে প্রিয় বন্ধুকে চিরকালের জন্য কেড়ে নিয়ে গেছে তা তো নয়, প্রথম প্রেমকেও নিয়ে গেছে। মুন্নাকে দাহ করার দিনই মুন্না-মুনিয়ার দাদা বলেছিল মুনিয়া আর ওদের মাকে নিজের কাছে নিয়ে চলে যাবে — আমেদাবাদ না হায়দরাবাদ, কোথায় যেন। কয়েক বছর পরে শোনা গিয়েছিল মুনিয়া বিয়ে হয়ে আমেরিকায় চলে গেছে। শুনে খুশিই হয়েছিল রবীন। তার মত ছা পোষা স্কুলমাস্টারকে বিয়ে করলে সবুজগ্রাম আর কলকাতা — এই তো হত গণ্ডি। যেমন জোনাকির হল। অত বড় বাড়ির মেয়ে, তার কোন নাম করা লোকের সাথে বিয়ে হওয়াই তো উচিৎ ছিল।

রবীন বিয়ে করবে না বলেই ঠিক করেছিল। পঁচাত্তরে মা মারা গেল, তার বছর খানেক আগে বাবা। একাই দিব্যি চলে যাচ্ছিল রবীনের। আটাত্তর অব্দি তো বড়দি শ্যামার পরিবার ঘোষালবাড়িরই বাসিন্দা ছিল। ফলে রান্নাবান্নার চিন্তাও ছিল না। তারপরও হাতের যা অবস্থা ছিল, তাতে নিজের জন্য দুটো ফুটিয়ে নিতে অসুবিধা হত না। এদিক ওদিক কিছুটা ছড়িয়ে পড়ত যদিও। কিন্তু রাঁধুনি দরকার বলে বিয়ে করার কথা কখনো ভাবেনি সে। বরং ভাবত বিয়ে করলে খাওয়াবে কী আর বসে দুটো কথা বলবে কখন? পার্টি আর পঞ্চায়েত সমিতিই তো সবটুকু সময় নিয়ে নিত। তা নিয়ে কোন আফশোসও ছিল না। শুধু কোনদিন ক্লান্তি একটু কম থাকলে বাড়িটাকে বড্ড বড় মনে হত। একজনের জন্যে এই প্রাসাদের কী-ই বা দরকার। আটাত্তরের বন্যার কদিন যখন বুড়িমার পরিবার এসে ভরিয়ে রেখেছিল বাড়িটা, সেসময় ভাল লাগত। কিছু অদরকারী কথা বলার লোক পাওয়া যেত দিনের শেষে। জল নেমে যেতে ওরা যখন চলে গেল, রবীন আবার কাজের মানুষ হয়ে গিয়েছিল। হয়ে যেতেই হয়েছিল।

রবীনের দাদারা তখন বহু দূরে থাকে। বড়দার ছিল বদলির চাকরি, মেজদা মানকরে স্কুলমাস্টার আর ছোড়দা শিলিগুড়ির কলেজে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে ওদের সবুজগ্রামে যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ। তখন বাড়ি বাড়ি টেলিফোনের যুগ নয় আর ঘোষালবাড়িতে চিঠি লেখার চল বড় একটা ছিল না। ফলে ওরাও রবীনের খবর রাখত না, রবীনও ওদের খবর রাখত না। মেজদি আর ছোড়দির সুপাত্রে বিয়ে দিয়েছিলেন রবীনের বাবা, তারা গোড়া থেকেই প্রবাসী। বাবা-মা বেঁচে থাকতে বছর দুয়েক পরে পরে আসত, ততদিনে সে পাটও তুলে দিয়েছে। শুধু বাতে কাবু পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েও মাসে অন্তত একবার এসে পৌঁছত রবীনের বড়দি শ্যামা।

সকলের বড়, লেখাপড়ায় সবচেয়ে ভাল এবং রন্ধনপটিয়সী মেয়েটাকে ক্লাস এইটে পড়তে পড়তেই পাত্রস্থ করেছিলেন বাবা এবং আমৃত্যু সেজন্যে আফশোস করেছেন। তাঁর ছেলেমেয়েদের মধ্যে তাঁর মত টকটকে গায়ের রং পায়নি মাত্র দুজন — এই মেয়েটা আর রবীন। ছেলেকে নিয়ে চিন্তা ছিল না, কিন্তু আশঙ্কা ছিল অত গুণী মেয়েটার বর জুটবে না গায়ের রঙের জন্যে। তাই অবসর নেয়ার কিছুদিন আগে সুপুরুষ অধস্তন কর্মচারীটিকে হাতের মুঠোয় পেয়ে বিমানবিহারী ঘোষাল আর দেরি করেননি।

ভেবেছিলেন চাকরিজীবন শেষ হওয়ার আগেই একটা বড় দায়িত্ব পালন করলেন। কিন্তু কে জানত ছেলেটি নেশাখোর এবং খামখেয়ালি? এমন শিবের মত স্বামী পেয়ে রবীনের দিদির জীবনের অর্ধেকের বেশি দারিদ্র্য ঘাড়ে করেই কেটেছে। যতদিন বেঁচে ছিলেন তার সংসার আসলে বিমানবিহারীই চালাতেন। নেশার ঘোরে অফিসারের সাথে দুর্ব্যবহার করার জন্যে জামাইয়ের সরকারি চাকরিটি বিয়ের পরে পরেই গিয়েছিল। তারপর শ্বশুরের সুনামের কারণে এখানে ওখানে ছোটখাটো কাজ, সেখানেও গাফিলতি এবং চাকরি খোয়ানো — এভাবেই গোটা যৌবনটা কেটেছে শ্যামা আর তার স্বামীর। সাতাত্তর সালে বড় ছেলে পোর্ট ট্রাস্টে চাকরি পাওয়ার পরে এই দুর্দশা ঘোচে এবং সেই ছেলে মামাবাড়ির ছত্রছায়া থেকে পরিবারকে সরিয়ে নিয়ে যায়।

বড়দি এবং ভাগ্নে-ভাগ্নীদের প্রতি রবীনের বড় টান। বাবা-মায়ের পর ওদেরই রবীন সবচেয়ে বেশি ভালবাসত। তাই ওরা থেকে গেলেই খুশি হত। শুধু বড় ছেলের রোজগারে ভাড়া বাড়িতে ওদের যে টানাটানি করেই চালাতে হবে তাতেও সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সে বুঝেছিল বড়দির ছেলেমেয়েরা আর আশ্রিত হয়ে বাঁচতে চায় না। তাই বাধা দেয়নি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেয়ে ভাল আর কী আছে? ধীরে ধীরে বড়দির অন্য ছেলেরাও চাকরি পেল, মেয়ের ভাল বিয়ে হল।

সাতাত্তর থেকে সাতানব্বইয়ে মারা যাওয়া অব্দি কুড়িটা বছরই শ্যামার জীবনের সবচেয়ে ভাল সময়। সাতাত্তরে ওরা সবুজগ্রাম ছেড়ে কুড়াইলে চলে যায় আর আটাত্তরের গোড়াতেই শ্যামার মাতাল স্বামী মারা যান। তাতে ওর জীবনটা শান্তিপূর্ণ হয়। মোটামুটি নব্বই সাল থেকে রবীনের দুঃখী বড়দির নুন আনতে পান্তা ফুরোয় না এমন সংসারে গিন্নীপনা করার সময়, সংসারের সবাইকে পেট ভরে খাইয়েও নিজে পেট ভরে খাওয়ার সময়, ইচ্ছে মত জামাকাপড় কেনার সময়। শেষদিকে তো আজীবন সিড়িঙ্গে মার্কা শরীরে বেশ গত্তি লেগেছিল। শুধু ভোগাত হাঁটুর বাত, বেশ অল্প বয়স থেকেই। তবে বাত কখনো শ্যামাকে শুইয়ে দিতে পারত না। রবীন জেলে থাকার সময়ে ঐ পা নিয়েই সে নিজের বছর পনেরোর মেয়ের হাত ধরে দেখা করতে যেত। বাপের বাড়িতে তখনো টানাটানির সংসার। রোজগেরে লোক বলতে শুধু রবীন। দাদারা বাইরে থেকে কখনো বাবা-মার জন্যে টাকা পাঠায়, কখনো পাঠায় না। সেই সংসার থেকেই শ্যামা টিফিন বাক্সে নিয়ে যেত সর্ষেবাটা দিয়ে লাউয়ের খোসার চচ্চড়ি, কি একটু কচুর লতি বা আধখানা ডিমের ডালনা।

বাপের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেও একলা ভাইটার জন্যে ছটফট করত শ্যামা। ভালমন্দ কিছু রান্না করলেই ছোট ছেলের হাতে টিফিন কেরিয়ার ধরিয়ে বলত “সাইকেল কইরা দিয়া আয়। রবীন না থাকলে পাশের বাড়ি দিয়া আসবি।” আর মাসে অন্তত একবার সশরীরে এসে পৌঁছত ভাই কেমন আছে খবর নিতে, পাড়ার যে মেয়ে বউরা তার সই তাদের সাথে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে।

প্রত্যেকবারই ভাইকে বলত “তুই এবারে বিয়াডা কর। আমি এই পা নিয়া ঘনঘন আসতেও পারি না, এদিকে চিন্তায় মরি। তুই কী খাইলি, কখন শুইলি? তর চিন্তায় আমার কোনদিন হার্ট অ্যাটাক হইব গিয়া।”

রবীন পাত্তা না দিয়ে বলত “চুপ কর। কিস্যু হইব না। তোর হাড় খুব শক্ত। সারাডা জীবন যা কষ্ট করছস, অন্য কেউ হইলে অনেক আগেই মইরা যাইত।”

শ্যামা তখন ভায়ের গালে মৃদু থাপ্পড় কষিয়ে বলত “কতা। কেবল সুন্দর সুন্দর কতা। কতা দিয়াই তুমি মাত কইরা রাখছ দুনিয়ার লোকেরে। কিন্তু আমি কতায় ভুলতাছি না। তুই বিয়া করবি কিনা?”

রবীন কোনদিনই বলেনি বিয়ে করবে না। বিয়ে করবে না এমন ধনুর্ভঙ্গ পণ তার ছিল না, কিন্তু বিয়ে করার উদ্যোগও ছিল না। আর থাকবেই বা কেন? কোন প্রেমিকা-টেমিকা থাকলে না হয় কথা ছিল। কে আর নিজের সম্বন্ধ নিজে দেখে বেড়ায়? বড়দি হতাশ হয়ে বলত “এত মানুষেরে মোহিত কইরা ফেলাইছস আর একখান ভদ্রঘরের ভাল মাইয়ারে মোহিত করতে পারলি না? তাইলে আর খোঁজাখুঁজির ঝামেলা থাকত না।”

রবীন বলত “আমি তো ছোটলোকের জন্য কাম করি রে দিদি। দ্যাখস না, আমাগো পার্টিরে লোকে ফালতু পার্টি কয়? ভদ্দরলোকেরা যাদের ফালতু ভাবে তারাই হইতাছে আমাগো ভগবান। তা এমন লোকেরে ভদ্দরলোকের বাড়ির মাইয়ার কখনো পছন্দ হয়?”

কথাটা শ্যামার পছন্দ হত না একেবারেই। অন্য ভাইরা অনেক বড় বড় চাকরি করলেও ছোট ভাইটাকে নিয়েই তার সবচেয়ে বেশি গর্ব। বিরাট এলাকা জুড়ে সবাই রবীনকে এক ডাকে চেনে, আর চেনে কারণ সে নিজের জন্য কাজ করে না, অন্যের জন্য কাজ করে। এর চেয়ে গর্বের কথা আর কী আছে! রবীনের হাফ প্যান্ট পরা বয়স থেকেই ওদের মায়ের মাথাটা খারাপ, তাই শ্যামাকে রবীনের মা-ই হয়ে উঠতে হয়েছিল। সেই রবীন আজ কত বড় পদে! সেকথা ভাবলে নিজের সারাজীবনের গ্লানি ভুলে যায় শ্যামা। কুড়াইলে যে পাড়ায় থাকে সেখানে ছুতো পেলেই লোককে শোনায় “আমি রবীন ঘোষালের দিদি।” সেই রবীনের পাত্র হিসাবে কোন দাম নেই? শ্যামার স্নেহপ্রবণ মন কিছুতেই মানতে চায় না। সে যাকে পারে তাকেই বলে ভাইয়ের জন্যে একটা মেয়ে দেখে দেওয়ার কথা।

শ্যামা ছাড়া জগতে আর একটি মাত্র প্রাণী সেসময় রবীনের বিয়ের ব্যাপারে উৎসাহী ছিল — তার নাম রজনী মুখার্জি। রজনী রবীনের সহকর্মী, তবে বয়সে অনেকটা বড়। রবীনের মেজদির সহপাঠী ছিল, সেই সুবাদে এক সময় রবীনদের বাড়িতে যাতায়াত ছিল, তবে যেহেতু মেজদির স্কুল ছাড়ার পরেই বিয়ে হয়ে যায় সেহেতু আর যোগাযোগ ছিল না। তবু সবুজগ্রাম বিদ্যায়তনে যোগ দেওয়ার পর থেকেই রবীনকে নিজের ভাইয়ের মতই দেখত রজনী। রবীনের পরে যে অবিবাহিত মেয়েরা শিক্ষিকা হয়ে এসেছে তাদের প্রত্যেকের সাথেই কিছু একটা করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে গেছে সে। সফল হয়নি, কারণ রবীনের তখন প্রেম করার ইচ্ছা বা সময় কোনটাই ছিল না। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রজনী রবীনের কানের কাছে বলে যাচ্ছিল “এবার তো আর পুলিসের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানোর ব্যাপার নেই। এবার একটা বিয়ে করো, ভাই।” রবীন শুধু হাসত, হ্যাঁ বা না বলত না। সেই রজনীদিই শেষমেশ জোনাকির সম্বন্ধ নিয়ে আসে।

রজনী সবুজগ্রামেরই মেয়ে, বিয়ে হয়েছিল কলকাতায়। ওর শ্বশুরবাড়ি কাঁকুড়গাছির বনেদি পরিবার — শ্বশুরমশাই স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, গান্ধীবাদী কংগ্রেসী। আর স্বামী জোনাকির দাদা শুভময়ের সেই কলেজজীবন থেকে বন্ধু। প্রথমে সি পি আই, চৌষট্টির পর থেকে সি পি এম।

ঝোটনের পর জোনাকি আর কোন পুরুষের দিকে তাকায়নি। নিজের দিকেও তাকায়নি, তাকে যারা ঘিরে ছিল — মামা, মামী, মামাতো ভাই বোন — কারোর দিকেই কটা বছর তাকায়নি ঠিক করে। এমনকি দিদিমার দিকেও না। কথাটা ও বুঝতে পেরেছিল সেদিন, যেদিন দিদিমা গত হলেন। ১৯৭৮ এর সেই সকালে সকলে যখন হাউহাউ করে কাঁদছিল, জোনাকি অবাক হয়ে করুণাময়ীর শরীরটাকে দেখছিল।

কবে চামড়াগুলো এত কুঁচকে গেল? এত রোগাই বা কবে হল দিদিমা? এরকম মলিন কাপড় পরা শুরু করল কবে? সবই বিস্ময়কর লাগছিল। আসলে আগের কয়েক বছর এক বাড়িতে থেকে, এক বিছানায় শুয়ে এবং দিদিমার ভালবাসা নিরন্তর ভোগ করেও যে সে দিদিমার দিকে একবারও ভাল করে তাকায়নি — এটা বুঝতে পেরে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। সবাই প্রাণ ভরে কেঁদেছিল, জোনাকি অপরাধবোধে পুড়ে যেতে যেতে কাঁদতেও পারেনি। সকলে ভেবেছিল মেয়েটা শোকে পাথর হয়ে গেছে। আসলে সে পাথর হয়ে ছিল ঝোটনের মৃত্যু থেকে করুণাময়ীর মৃত্যু পর্যন্ত। তিনি পাথরে গর্ত করে দিয়ে গেলেন।

তারপর জোনাকি মানুষের দিকে তাকাতে শুরু করেছিল ঠিকই, কিন্তু কর্তব্যবোধে। নিরাসক্ত মানুষের কর্তব্যবোধে। ঝোটনদা আর দিদিমার মরণ থেকে জেগে উঠে তার কাছে নিরর্থক লেগেছিল সমাজ এবং সমাজবিজ্ঞান। অতএব মার্কসবাদও। বইয়ের তাকে পুনর্বাসন হয়েছিল রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, নিবেদিতা, অরবিন্দের।

আটাত্তরের জানুয়ারীতে করুণাময়ী চলে যান আর মার্চে কাছেই রামকৃষ্ণ সারদা মিশনে একটা অস্থায়ী চাকরি পেয়ে যায় জোনাকি — কলেজের ক্লার্কের চাকরি। তার আগেই ঠিকানা বদলেছে — বরানগরের মামাবাড়ির বদলে বাগবাজারে শুভময়ের ফ্ল্যাট। শুভময়ের বোনকে মামাদের আশ্রয় থেকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার অভিলাষ পূর্ণ হল। দিদিমা বেঁচে থাকলে হয়ত এভাবে ভাবত না সে, বা জোনাকিও দিদিমাকে ছেড়ে আসতে রাজি হত না।

জোনাকির দাদা শুভময় আর বৌদি রচনা তখন মাস্টারির পাশাপাশি চুটিয়ে রাজনীতি করছে। তার উপর লেখক হিসাবেও অল্পবিস্তর নাম হয়েছে শুভময়ের। দিনের বেশিরভাগটাই তাদের বাইরে কাটে। জোনাকির তাতে সুবিধাই হয়েছিল। সে কলেজ ছুটি হওয়ার পরেও সন্ন্যাসিনীদের সাথেই গল্পগুজব, পুজোআচ্চা করে সন্ধ্যেটা কাটাত। ক্রমশ সে বুঝতে পারল ঐ পরিবেশেই সে বেশি স্বচ্ছন্দ, সাধারণ লোকের মধ্যে প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে। কোন কোন দিন তো জোনাকি রাতে বাড়িও ফিরত না। শুভময়দের তখনো ফোন ছিল না, ওদের নীচের ফ্ল্যাটে ফোন করে জানিয়ে দিত আশ্রমেই থেকে যাচ্ছে। ব্যাপারটা ওর দাদা খুব একটা গা করেনি, ভেবেছিল সারা সন্ধ্যে একা একা ফ্ল্যাটে বসে থাকার চেয়ে কলেজে থাকাই তো ভাল। কিন্তু জোনাকির নিরাসক্তি চোখ এড়ায়নি ওর বৌদির। সে স্পষ্টই বুঝেছিল ননদ ক্রমশ দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছে। রচনার খোঁচাখুঁচিতেই শেষ পর্যন্ত শুভময় একদিন বোনকে খোলাখুলি জিজ্ঞেস করে কলেজ ছুটির পরেও ওখানে থেকে যাওয়া, মাঝে মাঝে বাড়ি না ফেরার কারণ দাদা-বৌদির প্রতি কোন অভিমান কিনা।

তার কয়েকদিন আগেই প্রিন্সিপাল প্রব্রাজিকা বিশ্বপ্রাণার কাছে সন্ন্যাসিনী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে জোনাকি। তিনি বলেছেন “বাড়ির অনুমতি নিয়ে এসো”। বলি বলি করেও জোনাকি কথাটা বলে উঠতে পারেনি দাদাকে। সময় দিতে না পারলেও বোনের প্রতি শুভময়ের টান কতটা সেটা বোন ভালই জানত। এখন দাদা নিজেই জিজ্ঞেস করায় কাজটা সহজ হয়ে যায়। কথাটা শুনে শুভময় প্রথমে বুঝতেই পারে না কী বলা উচিৎ। তারপর জ্যেষ্ঠতা ভুলে কেঁদে ফ্যালে হাউ হাউ করে। তাতে কিন্তু মন গলে না জোনাকির। রচনা অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, জোনাকি শুধু চুপচাপ শুনে যায় — হ্যাঁ বলে না, না-ও বলে না।

শুভময়ের তখন দিশাহারা অবস্থা। মা-বাপ মরা বোন সন্ন্যাসিনী হয়ে গেলে পাড়া প্রতিবেশী কী বলবে ভালই বুঝতে পারছিল সে। উপরন্তু মামারা। এটাই প্রমাণ হয়ে যাবে যে দাদা-বৌদির অবহেলাতেই মেয়েটা মনের দুঃখে এই পথ বেছে নিল। মামারা বলবেনই “আমরা বলেছিলাম ও আমাদের কাছেই থাকুক।” কে বাঁচাবে এই অপমানের হাত থেকে? শেষ চেষ্টা হিসাবে বিশ্বপ্রাণার সাথে দেখা করার বুদ্ধিটা রচনাই দিয়েছিল। দুজনে মিলে এক রবিবার জোনাকিকে না জানিয়ে গিয়ে দেখা করে তাঁর সাথে।

ভদ্রমহিলা কিন্তু জোনাকির সন্ন্যাসিনী হওয়ার সম্ভাবনা হেসে উড়িয়ে দেন।

“ও সন্ন্যাসিনীর জীবন কাটাতে পারার মেয়েই নয়। সেই জন্যেই আমাকে যখন বলল আমি আপনাদের অনুমতির কথা বলে এড়িয়ে গেছি।”

“কিন্তু ও যে গোঁ ধরে বসে আছে!”

“ও কিছু না। আসলে সেই যে একজনকে ও ভালবাসত…”

“ঝোটন?”

“হ্যাঁ… এই নামটাই তো বলেছিল। এত বছর হয়ে গেল, তবু ওর মৃত্যুটা মেয়ে ভুলতে পারছে না। তার উপর একটা অপরাধবোধও কাজ করছে বোধহয়।”

“অপরাধবোধ? কী নিয়ে?”

“শেষ কয়েক বছর দিদিমার দিকে নজর না দেওয়া। এই দুটো ব্যাপারই ও ভুলতে চায়, তাই সারাক্ষণ পালাচ্ছে। নিজের কাছ থেকে পালাচ্ছে, আপনাদের কাছ থেকেও পালাচ্ছে। সন্ন্যাসিনী হলে চিরতরে পালিয়ে যেতে পারবে ভাবছে। কিন্তু আমরা সেটা হতে দিতে পারি না। দিলে কিছুদিন পরে যখন ওর ভুল ভাঙবে তখন ফিরতেও পারবে না, সন্ন্যাসিনীর জীবনেও সুখে থাকবে না।”

“কিন্তু আমাদের কথা তো ও শুনল না।”

“আমাদের উপর ভরসা রাখুন, সময় দিন। ইতিমধ্যে ছেলে দেখতে থাকুন।”

কথাটায় রচনা, শুভময় — দুজনেই হকচকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বপ্রাণা বেশ জোর দিয়ে বলেন জোনাকির বিয়ে দেওয়া সম্ভব শুধু নয়, উচিৎও।

ওঁর কথা মত পাত্র দেখা শুরু হয়, কিন্তু জোনাকি কিছুতেই বিয়ে করবে না। মিশনের সন্ন্যাসিনীরা প্রথমে গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে, পরে কড়া ভাষায় যখন বুঝিয়ে দিলেন যে সন্ন্যাস ওর জন্যে নয়, তখনো মেয়ে গোঁ ধরে রইল “সন্ন্যাসিনী না হলেই বিয়ে করতে হবে এমন কোন কথা নেই। বিয়ে আমি করব না।” মামাদের অনুমতিক্রমে শুভময়-রচনা কিন্তু বোনের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেই যেতে লাগল। প্রায়ই যা করা হত তা হল যেদিন পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে সেদিন দুপুরে খাবার টেবিলে ব্যাপারটা জোনাকিকে জানানো — পাছে আগে থেকে জানলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে মিশনে গিয়ে বসে থাকে। তাতে অবশ্য ফল ভাল হত না। দাদা-বৌদির সম্মানার্থে পাত্রপক্ষের সামনে এসে বসলেও জোনাকির হাবভাব কথাবার্তায় বোঝাই যেত যে মেয়ে বিয়েতে উৎসাহী নয়। যারা ভদ্রলোক তারা চুপচাপ চলে যেত, অন্যরা দু কথা শুনিয়েই দিত। এরকম বছর খানেক চলার পর যখন শুভময় হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখনই রজনী ওদের বাড়িতে এক আড্ডায় রবীনের কথা তোলে।

ততদিনে শুভময়রা এতটাই হতাশ যে রচনা কথা উঠতেই বলে “কেন আবার একটা পরিবারকে ডেকে এনে অপমান করতে চাইছ বলো তো? মেয়ে তো মুখ হাঁড়ি করে বসে থাকবে, দশটা কথা জিজ্ঞেস করলে একটার উত্তর দেবে। আমাদেরই লজ্জায় মাথা কাটা যায় মাঝখান থেকে।”

“পরিবার বলে প্রায় কিছুই নেই তো ছেলেটার। হয়ত একাই আসবে কি দু একজন বন্ধু আসবে সঙ্গে। আর ছেলেটা নিপাট ভদ্রলোক। কথা শোনানোর ছেলেই নয়। সেই জন্যেই বলছি,” রজনী ব্যাখ্যা করে।

পার্টির সূত্রে এবং রজনীদের স্কুলের অনুষ্ঠানে বার দুয়েক দেখার দৌলতে রজনীর বর নিখিলেশও রবীনকে কিছুটা চিনত এবং পছন্দ করত। দুজনের পীড়াপীড়িতে শুভময় আর রচনাকে রাজি হতেই হয়।

রবীনকে রাজি করাতে অবশ্য বেগ পেতে হয়নি। রজনী নিজের চেষ্টায় শ্যামাকে খুঁজে বার করে তার কাছে কথাটা পেড়েছিল, আর শ্যামার অনুরোধ তার ছোট ভাই আমৃত্যু ফ্যালেনি। তবে দুটো শর্ত দিয়েছিল। এক, রজনী আর নিখিলেশকে রবীনের পক্ষ হিসাবে উপস্থিত থাকতে হবে। দুই, রবীনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং সেটা ভালমন্দ যা-ই হোক, ওখানে বসেই জানিয়ে দিয়ে আসা হবে, এক পেট মিষ্টি খেয়ে “পরে জানাব” বলে চলে আসা যাবে না। রজনী ভেবেছিল দ্বিতীয়টা কথার কথা। তাই রাজি হয়ে গিয়েছিল।

মাঝে কয়েক মাস এই ব্যাপারটা বন্ধ থাকায় জোনাকি বেশ নিশ্চিন্তে ছিল, ভেবেছিল বিয়ে সংক্রান্ত কার্যকলাপ বরাবরের জন্যই থেমেছে। তাই সেই রবিবার যখন খেতে বসে শুনল আবার এক রাউন্ড হতে চলেছে, তখন বিরক্তির সীমা ছিল না। শুভময় সেটা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ বলে দেয় “এই শেষবার। নিখিলেশ আর রজনী আমাদের কিরকম বন্ধু তুই তো জানিস। তোকেও ওরা ভালবাসে। ওদের তো না বলা যায় না, ওরাও আসছে ছেলেটার সাথে। তুই বিয়ে করতে রাজি না হোস, অন্তত ভালভাবে কথাটুকু বলিস? এই সম্বন্ধটাও না হলে আর তোকে বিয়ের কথা বলব না কথা দিচ্ছি।” অতএব জোনাকি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে রবীনদের সামনে গিয়ে বসেছিল।

রবীন প্রথমেই বলে “আপনি আমার সম্বন্ধে কতটা কী শুনেছেন আমি জানি না। রজনীদি আমায় খুব স্নেহ করেন, ফলে কিছু বাড়িয়েও বলে থাকতে পারেন। তাই আমি নিজে একবার পরিষ্কার করে বলে দিই। আমি সামান্য স্কুলমাস্টার, পাঁচশো টাকা মাইনে পাই। আপনি চাকরি করেন শুনে আমি আসতে রাজি হয়েছি। কারণ আপনি এখানে যেরকম জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত সেটা পাঁচশো টাকায় চালানো সম্ভব না। আর আমি যতদূর শুনলাম, আপনি তো বরাবরই কলকাতায় মানুষ। আমাদের সবুজগ্রাম কিন্তু একেবারে ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুর। পঞ্চায়েত এলাকা, সন্ধ্যে হলে শেয়ালের ডাক শোনা যায়। বাড়িতেও আমি একা লোক, অধিকাংশ সময় বাড়ি থাকি না। এরকম একটা পরিবেশ আপনার পক্ষে খুব কষ্টকর হবে বলে আমার ধারণা। এখন আপনি যা বিবেচনা করবেন।”

তারপর প্রায় স্বগতোক্তির মত যোগ করে “অবশ্য আমার জীবনটা কেন এরকম সেটা আপনি হয়ত কিছুটা বুঝলেও বুঝতে পারেন। আপনার দাদাও তো কমিউনিস্ট পার্টি করেন, আমাদের পার্টি না হলেও। জেলও খেটেছেন। সি পি আই বলুন, সি পি এম বলুন আর নকশালই বলুন, আমরা সবাই তো গরীব মানুষের জন্যে কাজ করি। এটা তো আর অবসর সময় কাটানোর মত করে হয় না। পার্টি করা আর পাড়ার ক্লাবে তাস পেটানো তো এক জিনিস নয়।”

এই কথাগুলো কানে যাওয়ার আগে অব্দি জোনাকি মন দিয়ে রবীনের মুখটাও দ্যাখেনি। তখন দেখল। সাদামাটা গোঁফওয়ালা চেহারা। বেশ লম্বা, সেটা বসে থাকলেও বোঝা যায়। কালোই বলা উচিৎ, তবে ঝোটনের তুলনায় ফরসা। দাদা-বৌদি যা বয়স বলেছিল সেই তুলনায় জোয়ান বলেই মনে হয়।

“আপনি কি কিছু জিজ্ঞেস করতে চান?” রবীন সুযোগ দিয়েছিল।

“না, আপনি তো সবই বলে দিলেন। আমার খুব অল্পে চলে যায়। শাড়ি জামাকাপড়ের শখ খুব একটা নেই। ফলে ওটা আমার সমস্যা নয়। তবে আমি বিয়ে করব কিনা সেটাই ঠিক ভেবে দেখা হয়নি।”

কথাটা বলেই চোখের কোণ দিয়ে জোনাকি দেখতে পায় দাদা মাথা নীচু করে ফেলেছে, বৌদি বিরক্ত হয়ে উঠে চলে গেল। আশা করছিল পাত্রও রেগে উঠে বলবে “সেটা জানা থাকলে সময় নষ্ট করতে আসতাম না। চলি।” কিন্তু রবীন তা বলল না।

বলল “নিশ্চয়ই। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত দুম করে নেবেন না। আমি তো আপনার সম্পর্কে সব জেনে শুনেই এসেছি। আমার এ বিয়েতে মত আছে, কিন্তু আপনি ভেবে দেখুন। আপনি চাইলে তবেই এ বিয়ে হবে। আর আমার অনুরোধ এ ব্যাপারে আপনি কারো কথা শুনবেন না — আপনার দাদা-বৌদির কথাও না, রজনীদি-নিখিলেশদার কথাও না। মন যা বলে তাই করবেন।”

এরপর নিতান্ত পাষাণ না হলে সকলেরই মন একটু নরম হতে বাধ্য, জোনাকিরও হয়েছিল।

শুভময় বলে ওঠে “ঠিক আছে, ভাই রবীন। তুমি তো বলেছ তোমার আমার বোনকে পছন্দ। এরপর ওর পছন্দ না হলে তো আর তোমার দোষ নেই? এবার একটু কিছু খাও? অনেক দূর থেকে এসেছ।”

রবীনকে কিছু বলতে না দিয়েই রজনী বলে “আনুন, আনুন, শুভদা। সেই কাঁকুড়গাছি থেকে আসছি। কি ক্ষিদে যে পেয়েছে! এই আদর্শবাদী ভাইটির পাল্লায় পড়ে মুখ বুজে থাকতে হয়েছে।”

অতঃপর লুচি, আলুর দম, মিষ্টি। তখনই জোনাকির চোখে পড়ে খেতে গিয়ে রবীনের হাতটা যেন কাঁপছে। কিছু জিজ্ঞেস করা অশোভন হবে কিনা ভাবতে ভাবতেই রবীন দেখে ফ্যালে ওর তাকিয়ে থাকা। লুচির টুকরোটা নামিয়ে রেখে বলে “ওঃ! এটার কথা রজনীদি তাহলে বলেনি আপনাদের!” বলে ভুরু কুঁচকে তাকায় রজনীর দিকে। ও কোন জবাব দেওয়ার আগেই বলে “অন্যায়। খুবই অন্যায়।”

লেখার অসুবিধা, খাওয়াদাওয়া করার ক্ষেত্রে সামান্য অসুবিধার কথা এরপর বিস্তারিতভাবে বলে রবীন। এ-ও বলে যে এই অসুবিধা শুরু হয়েছে বছর পাঁচেক হল এবং স্থানীয় ডাক্তাররা কোন সুরাহা করতে পারেনি। তবে কোন ব্যথা বেদনা নেই বলে খুব একটা পাত্তা দেয় না ও। বলা শেষ করে জোনাকিকে জোর দিয়ে বলে “আপনি সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এটাও মাথায় রাখবেন। কে বলতে পারে, এই অসুখটা হয়ত ভবিষ্যতে আমাকে পঙ্গু করে দিল। জেনে শুনে পঙ্গু লোককে বিয়ে করবেন না যেন।”

কথাটা শুনে জোনাকির কী হয়েছিল কে জানে? শুধু সঙ্কোচ নয়, বোধহয় মায়া। শুভময় বলে “তোমাকে এবার কিন্তু আমি একটু বকব। তুমি কাজের ছেলে, পার্টির জন্য সর্বস্ব পণ করেছ, এত বড় একটা প্রশাসনিক দায়িত্বে আছ, এভাবে শরীরটার অবহেলা করছো? তোমার শরীর তো শুধু তোমার নয়। হবু স্ত্রী, ছেলেমেয়ের কথা যদি ছেড়েও দিই, তোমার শরীরের উপর তোমার পার্টির অধিকার আছে, যারা তোমায় ভোট দিয়েছে তাদের অধিকার আছে। তুমি কি অস্বীকার করতে পারো সেটা?”

রবীন অপরাধ স্বীকার করে। নিখিলেশ বলে “আসলে শুভ, ওকে নিয়ে চিন্তা করার লোক একা ওর বড়দি। যতদূর শুনেছি তিনি বয়স্ক, নিজেও খুব একটা সুস্থ নন। ও যা ব্যস্ত লোক, ওকে কান ধরে বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার একটা লোক চাই তো।”

“সে তো বিয়ে না হওয়া অব্দি আর হচ্ছে না,” শুভময় বলে। “তবে আমি তোমাকে সিরিয়াসলি একটা পরামর্শ দিচ্ছি, রবীন। আমার বোনকে ঘাড়ে চাপাবই বলে দিচ্ছি না, কমরেড হিসাবে দিচ্ছি। তুমি মানবে কি?”

“বলুন শুনি।”

“মেডিকাল কলেজের অর্থোপেডিক্সের হেড ডাক্তার রামমূর্তি আমাদের বিশেষ বন্ধু। রচনার এক বন্ধুর হাজব্যান্ড আসলে। আমরা সময় বার করে দেব, তুমি ওনাকে দ্যাখাও।”

রবীন স্বভাবতই কী উত্তর দেবে ভেবে পায় না।

“এর সাথে তোমার জোনাকির সঙ্গে বিয়ে হওয়া বা না হওয়ার কোন সম্পর্ক দেখছি না আমি। সত্যি বলছি। আমি পরামর্শটা দিচ্ছি একেবারে রাজনৈতিক কারণে। ভারতবর্ষের এত বড় একটা রাজ্যে এই প্রথম কমিউনিস্টদের সরকার আর তার বিরাট বড় একটা যন্ত্র পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। তুমি সেই যন্ত্রটার একটা গুরুত্বপূর্ণ চাকা। তোমার স্বাস্থ্য ভীষণ দামী। বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা যায় না।”

রবীন রসগোল্লায় কামড় দিয়ে বলে “আপনার যখন বামফ্রন্ট সরকারের প্রতি এত মমতা, আপনার পার্টিকে বলুন না বামফ্রন্টে যোগ দিতে।”

হাসাহাসি শুরু হয়ে যায়। সবচেয়ে জোরে হাসে নিখিলেশ। বলে “আরে শুভ তো হাফ সি পি এম। ওর প্রায় সব বন্ধু সি পি এম, শালাগুলো সবকটা সি পি এম, বউটাও সি পি এমই হত, নেহাত তদ্দিনে ওর সাথে প্রেম হয়ে গেছে, তাই পারেনি।”

“আর বোন?”

রবীনের এই প্রশ্নটায় হাসি থেমে যায়। সে ছাড়া উপস্থিত সকলেই তো জানত ঝোটনের কথা। জোনাকির প্রতিক্রিয়া কী হবে ভেবে তটস্থ হয়ে যায় তারা। ও অবশ্য মৃদু হেসে উত্তর দেয় “আমার রাজনীতিতে কোন আগ্রহ নেই”।

ফ্রন্টে যোগ না দিলেও সি পি আই এর কয়েক মাসের মধ্যেই বামফ্রন্টের সাথে মিলে ১৯৮০র লোকসভা নির্বাচনে লড়ল। জোনাকির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গিয়ে থাকলেও রবীন আর শুভময় দুজনেই হঠাৎ এসে যাওয়া নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় বিয়েটা হল এপ্রিলে। তখন শুধুই জয়ের পালা রবীনের।

জয়ে কি কোন রোম্যান্টিকতা আছে? রবীন ভেবে পায় না।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply