নাম তার ছিল: ৬

পূর্বকথা: শিবু মন্ডলের কাছ থেকে রবীন জানতে পারে উদ্দালকের আত্মহত্যার নেপথ্য কাহিনী। সে কাহিনীতে বলরামের ভূমিকা নগণ্য নয়।

বাহাত্তরে যখন নকশালদের শক্তি প্রায় নিঃশেষিত, রবীনের কয়েকজন বন্ধু তখন পঙ্গু হয়ে গেছে, দু একজন তো মরেই গেছে। বলরামের বয়স তখন চোদ্দ পনেরো। সবুজগ্রামে ঐ বয়সীদের চোখে বছর পঁচিশের রবীন তখন নায়ক। কোথাও পার্টির মিটিং হলে ওরা রবীনের চারদিকে ঘুরঘুর করে, রবীন বক্তৃতা দিলে মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনে, স্লোগানে গলা মেলায়। বলরাম আর ওর প্রাণের বন্ধু ফাল্গুনী মাঝে মাঝে স্কুল থেকে বেরিয়ে সোজা রেললাইন পেরিয়ে বড়িহাটা হাইস্কুলের মাঠে মিটিং শুনতে চলে যেত। প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিনয় চৌধুরীদের ঐ মাঠেই প্রথম দ্যাখে বলরামরা। কিন্তু যাওয়ার অদম্য অভিলাষ তৈরি হয়েছিল রবীনের জন্য। ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে মিটিঙের প্রচার করত, হাঁটুর বয়সী ছেলেদের সাথে সময় পেলে ক্রিকেট, ফুটবল খেলত আর ছেলেগুলো অবাক হয়ে ভাবত রবীনদা কি অদ্ভুত! আমাদের সাথে খেলার সময়ে আমাদের মত, আবার বক্তৃতা দেওয়ার সময়ে অন্যরকম! এই মুগ্ধতা থেকেই আরো কাছে যাওয়ার ইচ্ছা, সেই ইচ্ছা থেকেই রবীনের বাড়ি যাতায়াত শুরু বলরাম আর ফাল্গুনী — দুজনেরই।

সবুজগ্রাম এবং তার আশেপাশে তখন নকশাল আন্দোলনের ধাক্কা সামলে সি পি এম নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে রবীনের মত দু একজনের কাঁধে ভর দিয়ে। সবুজগ্রামের পশ্চিমে জাতীয় সড়কের ওপারে আজাদপুর থেকে শুরু করে পূর্বে গঙ্গার ধারের বড়িহাটা পর্যন্ত পার্টির প্রধান নেতা তখন রবীন।

এই এলাকায় পার্টিটাকে গড়ে তুলছিলেন আসলে জীবেন মাইতি — রবীনের মাস্টারমশাই। উনিই ওকে মার্কসবাদের পথে নিয়ে আসেন। চৌষট্টিতে পার্টি ভাগ হয়ে সি পি এমের জন্ম হয়েছে। দু-তিন বছর যেতে না যেতেই সময় টালমাটাল, সবাই টালমাটাল। সবে যখন এলাকায় সংগঠনটা গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, তখনই নকশালরা মাথা চাড়া দিল। রবীনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা অনেকেই ঘর ছাড়ল, সংগঠন চুরমার। ও নিজে যখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কী করা উচিৎ, ঠিক সেই সময়, আটষট্টির ডিসেম্বরের এক রাতে জীবেন স্যার ঘুমোতে গেলেন, আর জাগলেন না। পার্টিটাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ল কুড়ি বছরের রবীনের ঘাড়ে। সে দায়িত্ব স্বীকার করে নিলেও কিছুদিন পর্যন্ত মাঝে মাঝে ভাবত বিপ্লব সত্যিই এসে পড়েছে, যারা পার্টি ছেড়ে গেছে তাদের পথেই যাওয়া উচিৎ।

হয়ত সত্যিই তাই করত রবীন, যদি না হীরুদার সাথে যোগাযোগটা বাড়ত। জীবেন স্যারই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন ওঁর সাথে। স্যার মারা যাওয়ার সময়ে হীরুদা জেলার পার্টির দায়িত্বে। নকশালদের হিট লিস্টে নাম উঠেছিল। তবু পার্টিটাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে উনি তখন সারা জেলা ঘুরে বেড়াতেন, কোথাও কোন কমরেডের বাড়িতে কোথাও বা আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতেন। সবুজগ্রামে ছিল হীরুদার মামাবাড়ি। ৬৯-৭০ এ সেই বাড়িতে নির্দেশ এবং পরামর্শ নিতে রবীনকে নিয়মিত যেতে হত। সে হাজির হত নিজের সংশয়গুলো নিয়ে, হীরুদা সেগুলো দূর করার চেষ্টা করতেন।

“আরে বাবা, রা যা চায় আমরাও তো তাই চাই। কিন্তু কেবল গায়ের জোরে বিপ্লব হয় না তো। হয় কি? শুধু জমিদার জোতদারদের খুন করে দিলেই কি বিপ্লব হয়ে যাবে? উৎপাদন সম্পর্ক পালটে যাবে?”

“না, তা হবে না বটে। জারকে খুন করলেই জারতন্ত্র শেষ হয় না। এটাই তো দাদার ব্যর্থ বিপ্লব থেকে পাওয়া লেনিনের শিক্ষা।”

“তবে? কী নিয়ে দ্বিধা তোমার? আচ্ছা বলো তো, বিপ্লবটা আসলে কার জন্যে? তোমার আমার মত মধ্যবিত্তের জন্যে?”

“নাঃ! বিপ্লব তো সর্বহারার জন্যে। আমরা তাদের পথের সাথী। সহযোগী শ্রেণীর লোক।”

“ঠিক। তা সর্বহারাকে বিপ্লবের জন্য তৈরি না করেই বিপ্লব করবে? শুধু তার হাতে বন্দুক তুলে দিলেই বিপ্লব হবে?”

“সর্বহারা কি সত্যিই তৈরি হয়নি, হীরেনদা? কৃষক তো সেই পঁয়ষট্টি সালেই হাতে অস্ত্র নিয়েছে।”

“কৃষক অস্ত্র হাতে নিয়েছে। কিন্তু কোথায় তোমার শ্রমিকশ্রেণী? আর কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে আমাদের এত বড় দেশের কটা জায়গায় বলো দেখি?”

“তা সত্যি।”

“তবে? এই যে ওরা বলছে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরো। কটা শহর ঘিরবে ঐ কটা গ্রাম দিয়ে? এত বড় দেশ আমাদের। এতগুলো রাজ্য, এতগুলো পুলিশবাহিনী। তার উপর সেনাবাহিনী। তুমি ভাবছ হাতে গোনা কয়েকটা গ্রাম দখল করে বিপ্লব করে ফেলবে?”

“কিন্তু দাদা, শুরুটা তো এভাবেই করতে হবে।”

“তাই? এভাবেই করতে হবে? তুমি নিশ্চিত? তোমার তেলেঙ্গানার কথা মনে নেই, রবীন?”

“আছে।”

“তাহলে? কমরেড রণদিভের লাইন কিন্তু ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। তারপরই, একান্ন সালে, আমাদের পার্টি কী বলেছিল মনে করে দ্যাখো। বলেছিল এদেশে যতক্ষণ অবাধ নির্বাচন হচ্ছে ততক্ষণ আমরা সেই নির্বাচনে যোগ দিয়েই ক্ষমতা দখল করার পথ নেব, রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের প্রয়োজন দেখছি না।”

“কিন্তু সেই পথে কি আমরা এগোতে পেরেছি একটুও?”

“পারিনি? একান্নর পরে আমরা পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল হয়েছি, কেরালায় সরকার গড়েছি, পশ্চিমবঙ্গেও যুক্তফ্রন্ট সরকারে। এসবের মানে কী? মানে হল মানুষের মধ্যে আমাদের প্রভাব বাড়ছে। এই পরিস্থিতিটাকে তো আমাদের ব্যবহার করা উচিৎ, সাধারণ মানুষের জন্যে কাজ করে তাদের আরো বেশি আপনজন হওয়া উচিৎ। তা নয়, ছেলেমানুষী হচ্ছে, নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি হচ্ছে, প্রচুর সম্ভাবনাময় বিপ্লবীর জীবন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

রবীন চুপ করে ভাবে, হীরুদা হাসতে হাসতে বলেন “তাছাড়া দ্যাখো, কি আজব বিশ্লেষণ ওদের! হিট লিস্টে কাদের নাম ঢুকিয়েছে? আমি কি জোতদার না জমিদার? আমি তো উদ্বাস্তু। খুলনায় মাস্টারি করছিলাম আর স্বাধীনতা আন্দোলন করছিলাম। দেশভাগ হল, কপর্দকশূন্য অবস্থায় এপারে চলে এলাম। ওপারে থাকার মধ্যে নিজেদের একখানা বাড়ি ছিল। এপারে আসার পর বাবা, মা দুজনেই মারা গেলেন কলোনিতে। আমি হচ্ছি শ্রেণীশত্রু।”

“আপনি শ্রেণীশত্রু বলে তালিকায় নেই বোধহয়,” রবীন ভয়ে ভয়ে বলে। “আপনি সংশোধনবাদী। ওদের চোখে।”

“হা হা হা। বেড়ে বলেছ। বেড়ে,” হীরুদা আহ্লাদে আটখানা হন। রবীন আশ্বস্ত হয়ে হাসে।

“আচ্ছা আমি না হয় সংশোধনবাদী, আমাদের কলেজের প্রফেসর ধরের কী দোষ বল তো?”

“প্রফেসর ধর? মানে নিরঞ্জন ধর?”

“ঠিক ধরেছ। ওরকম একজন পন্ডিত মানুষ, রাজনীতির ধার কাছ দিয়েও যান না বইপত্র, লেখালিখি — এসব নিয়েই তো থাকেন।”

“উনি তো বিখ্যাত লোক। ইন্ডিয়ান হিস্ট্রির একজন স্কলার বলে শুনেছি। ওনাকে কিছু করেছে নাকি?”

“করেনি, করবে বলে হুমকি দিয়ে গেছে।”

“কেন?”

“উনি নাকি কোন ক্লাসে গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে পড়াতে গিয়ে বলেছেন বুদ্ধের দর্শনের সাথে মার্কসের চিন্তার মিল পাওয়া যায়। তো বীরেরা এসে শাসিয়ে গেছে ‘ফের এসব অপব্যাখ্যা করলে লাশ ফেলে দেব।’”

“কলেজে ঢুকে এই করে চলে গেল? আপনারা কেউ কিছু বললেন না?”

“আমি সেদিন ছিলাম না কলেজে। আর অন্য স্টাফরা ভয় পেয়েছে ছেলেমেয়েদের কথা তো ছেড়েই দাও। তবু ভাল, ছেলেগুলো নাকি আমাদের কলেজেরই প্রাক্তনী। তাই স্যারকে চড় থাপ্পড় মারেনি। ভদ্রলোক এত ভালবাসেন ছাত্রদের যে কিছুতেই এফ আই আর করলেন না। বললেন ‘ওরা ছেলেমানুষ, কারো উস্কানিতে করে ফেলেছে।

“ছি ছি।”

“এরা সর্বহারাকে উদ্ধার করতে নেমেছে। জানেই না প্রফেসর ধর কত গরীব ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালান। বিয়ে থা করেননি, একা লোক ঠিকই, কিন্তু ঐ কটা টাকা থেকে এইসব কজন করে বলো তো?”

এরকম নানা আলোচনা, তর্ক বিতর্কের ফলে শেষপর্যন্ত রবীন সি পি এমেই থেকে যায় এবং ক্রমশ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোকের কাছে রবীন ঘোষাল আর সি পি এম সমার্থক হয়ে যায়। সিদ্ধার্থশঙ্করের আমলে পার্টির উপর যখন প্রচণ্ড আক্রমণ হচ্ছে, তখনো সামনে থেকে লড়াই করে গেছে রবীন। ততদিনে অবশ্য এলাকায় পার্টি সদস্য বেড়েছে, সমর্থক বেড়েছে অনেক — প্রকাশ্যে এবং গোপনে। তারা বুক দিয়ে আগলে রাখত রবীনদের।

সেই জন্যেই বলরামের বয়সী ছেলেদের কাছে তখন রবীনের এবং তার পার্টির আকর্ষণ দুর্নিবার। রবীনেরও সব সময় অল্পবয়সীদের প্রতি টান ছিল। সে জানত ওরাই ভবিষ্যৎ। জানত সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলতে হলে ক্রমাগত তাজা ছেলেমেয়ের যোগান থাকতে হবে। হীরুদাও বলতেন “আমার মত বুড়োদের আছে অভিজ্ঞতা। সেটা সঙ্কটে সঠিক রাস্তা খুঁজতে কাজে লাগে। কিন্তু যৌবন চাই, বুঝেছ? যৌবন না থাকলে পার্টি এগোয় না, মতাদর্শ এগোয় না।”

রবীনের নিজের তো তখন বানডাকা যৌবন। ঘুমের মধ্যেও পার্টির কথাই ভাবে। মাঝারি মানের ছাত্র ছিল, বি এ পাশ করেই বাড়ির কাছের স্কুলে চাকরি পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাস্টারির চেয়ে অনেক বেশি মন তখন রাজনীতিতে।

বলরাম প্রথম বাড়িতে এসেছিল বাহাত্তর সালের এক ভোরে, জীবেন স্যারের স্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ দিতে। ওঁদের উল্টোদিকের বাড়িটাই বলরামদের। জীবেন স্যারের ছেলে খবরটা দিতে পাঠিয়েছিল। তারপর কালে কালে এতটাই রবীনের ন্যাওটা হয়ে গিয়েছিল যে বলরামের মা বলতেন “আগের জম্মে ও রবীনের পোলা আছিল, এই জম্মে ভাই হইছে।” রবীন-জোনাকির বিয়ের পরেও মাঝেমাঝেই ঘোষালবাড়িতে সকালে আড্ডা দিতে এসে স্নান খাওয়া সেরে একঘুম দিয়ে বিকেলে বাড়ি যেত বল। পার্টির ছেলেদের অনেকেই সেই সময় এই জিনিস করত, তবে তাদেরকে বেশি বেলা হয়ে গেলে রবীন থেকে যেতে বলত। বলরামের বেলায় সেটা বলারও অপেক্ষা ছিল না।

বাড়ি ভর্তি লোক গমগম করা এবং অবেলায় নতুন করে ভাত চাপানো জোনাকিরও খুব পছন্দ ছিল, কিন্তু বলরামকে কোনদিনই তার বিশেষ ভাল লাগত না। বরাবরই মনে হত ও রবীনের প্রিয় হওয়ার জন্যে ভাল হওয়ার ভান করে, আসলে ভাল মানুষ নয়, ভাল পার্টিকর্মী তো নয়ই। সেকথা রবীনকে বললেই ও বলত “কিসে এরকম মনে হল তোমার?” এর কোন জোরদার উত্তর জোনাকির কাছে ছিল না। শুধু থেকে থেকেই আশঙ্কা হত, একদিন ও রবীনের বড় কোন ক্ষতি করবে। রবীন এই সম্ভাবনাটা হেসে উড়িয়ে দিত। “দুনিয়ায় তিনটি লোক আছে যারা কখনো আমার ক্ষতি করবে না — তুমি, নবা আর বল।” কথাটা রবীন সব সময় বলত।

নবা মানে ল্যাংটো বয়সের বন্ধু নবারুণ। অসাধারণ ছাত্র ছিল। এমন একজন ভাল ছাত্র যে সেই যুগেও ছাত্ররাজনীতির ধারে কাছে যায়নি। তবে চিন্তাভাবনায় ও আগাগোড়াই বামপন্থী। বন্ধুরা সবাই যখন রাজনীতি করতে নেমে পড়েছে, লেখাপড়া ছেড়েছে, বাড়িঘর ছেড়েছে, নবারুণ একমনে পড়াশোনা করে গেছে। নিজের রাজনৈতিক মতামত রবীন ছাড়া আর কারো কাছে কখনো প্রকাশ করেনি। সেই জন্যে রবীন জানে ওর রাজনৈতিক চিন্তার গভীরতা কতটা। ওরকম একজন লোককে যে কোন পার্টিই লুফে নেবে। তাই অনেকবার চেষ্টা করেছে ওকে পার্টির কাছে আনতে; ও কিছুতেই আসবে না। খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে নবারুণরা। ওর বড়দাকে মাত্র পনেরো বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে জুটমিলে চাকরিতে ঢুকে পড়তে হয়েছিল। ভায়েদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয় তার জন্যে উনি প্রাণপাত করেছেন। নবারুণের কাছে তাই পড়াশোনা ছাড়া অন্য কোনকিছুর কোন গুরুত্ব ছিল না। রবীন অনেকবার বুঝিয়েছে যে পড়াশোনা চালিয়েও রাজনীতি করা যায়। নবা বলত “পড়ার সময় কমে যাবে।” নিজের মেধার উপরে তার একেবারেই আস্থা ছিল না, বলত একটু অন্য দিকে মন দিলেই ফেল করবে। অথচ কোনদিন কোন পরীক্ষাতেই সে সাধারণ ফল করেনি।

এই একাগ্রতার সুফলও পেয়েছে নবারুণ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি এস সি, এম এস সি — দুটোই পাশ করেছে প্রথম শ্রেণীতে এবং পাশ করতে না করতেই চাকরি পেয়ে গেছে স্কটিশচার্চ কলেজে। রবীন চেয়েছিল নবা গবেষণা করুক, একটা দারুণ কিছু আবিষ্কার করুক, খুব নাম করা বিজ্ঞানী হোক। কিন্তু নবার মতে তার মত পরিবারের ছেলের পক্ষে গবেষণা হল বিলাসিতা। তাই চাকরির সুযোগ পেয়ে আর ছাড়েনি। চাকরি করতে করতে অবশ্য পি এইচ ডি টা করে নিয়েছিল।

বন্ধুকে শেষপর্যন্ত পার্টিতে এনেই ছেড়েছিল রবীন। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সে নবাকে টানাটানি করছিল। প্রশাসনে নবার মত উচ্চশিক্ষিত লোককে যে দরকার সেটাই বহুদিন ধরে বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল। একদিন তো জোর করে হীরুদার সাথে আলাপ করাতেও নিয়ে গিয়েছিল। সরাসরি রাজনীতিতে আসতে অনীহা দেখে হীরুদা নবাকে তখনকার মত অধ্যাপক সমিতিতে ভিড়িয়ে দিয়েছিলেন।

বলর বহুদিন ধরেই হীরুদার কাছে যাওয়ার ইচ্ছা। “তোমার কাছে এত শুনেছি ওনার কথা! ওরকম একজন মানুষের সাথে আলাপ না করলে হয়?” বারবার এই কথা শুনতে শুনতে রবীন বহুবার ভেবেছে একবার নিয়ে গিয়ে আলাপ করিয়ে দেবে, কিন্তু সাহস হচ্ছিল না। উল্টোপাল্টা লোক নিয়ে গেলে হীরুদা খুব বিরক্ত হন। লোকটার সামনে কিছু বুঝতে দেন না, কিন্তু পরে বলেন “আমার সময়ের দাম আছে, রবীন। মনে রাখলে খুশি হব।” অথবা “যার কোন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে আসা তাকে একাই আসতে বলবে, সঙ্গে করে নিয়ে আসবে না।” নবাকে নিয়ে যাওয়ার সময়ে অত চিন্তাভাবনা করতে হয়নি কারণ ওর সাথে কথা বলতে যে হীরুদার ভাল লাগবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। তাছাড়া ওর সম্পর্কে ওঁকে অনেককাল ধরে রবীন বলে আসছিল। ফলে হীরুদা নিজেও আগ্রহী ছিলেন আলাপ করতে। বলর গোঁসা হয়েছিল পার্টির ধারে কাছেও না থেকে নবারুণ তার আগে হীরুদার কাছে পৌঁছে যাওয়ায়। সে কথা বলতে গিয়ে মৃদু ধমক খেয়েছিল রবীনের কাছে। আর জোনাকি, যার ঠোঁটকাটা বলে বদনাম হয়ে গেছে অনেক আগেই, সে বলরামকে শুনিয়ে দিয়েছিল “শোনো ভাই, বলরাম। তোমার পার্টিকে দরকার কিন্তু পার্টির নবাদাকে দরকার। বুঝলে তো ব্যাপারটা?”

বলর বেশ গায়ে লেগেছিল কথাটা। রবীন অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই বলেছিল “না না, তা নয়। পার্টির সবাইকেই দরকার। কিন্তু বলর এখন যা বয়স, ওকে খেটে নিজের জায়গা করতে হবে। সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করতে হবে, পার্টিগত পড়াশোনাটা করতে হবে। নেতা ধরে নেতা হতে চাইলে তো চলবে না। নবা কোনদিন পার্টি করেনি ঠিকই, কিন্তু ও মার্কসবাদ নিয়ে আমাদের অনেকের ক্লাস নিয়ে নিতে পারে। তাছাড়া প্রশাসনিক কাজে ওর মত লোককে দরকার। সেই জন্যেই নিয়ে গেছি হীরুদার কাছে। নবা যদি কোনদিন পার্টি করবে মনে করে, ওকেও সেই এ জি মেম্বার হয়েই শুরু করতে হবে। তখন আমি কেন, হীরুদাও কোন সাহায্য করতে পারবেন না।”

পরবর্তীকালে নবারুণ অধ্যাপক সমিতি, বিজ্ঞানমঞ্চ — এসবের মধ্যে দিয়ে সত্যিই অনেক কাজ করেছে, পার্টি সদস্যও হয়েছে কিন্তু নেতা বলতে যা বোঝায় তা হয়ে উঠেছে বলরাম। সবুজগ্রাম এবং তার আশেপাশে সে বিরাট নেতা, বাঘে গরুতে নাম শুনলে এক ঘাটে জল খাবে এমন নেতা। উদ্দালকের মত ছেলে তার কাছে নস্যি।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply