নাম তার ছিল: ৫

পূর্বকথা: প্রবল বৃষ্টিতে রবীনের মনে পড়ে মায়ের চলে যাওয়ার দিনটা। আর মনে পড়ে ১৯৭৮ এর বন্যা। সেই বন্যায় একজন নতুন বন্ধু হয়েছিল। নাস্তিক রবীনের সন্ন্যাসী বন্ধু।

উদ্দালক মারা যাওয়ার পর মাস খানেক প্রবল আলস্য পেয়ে বসেছিল রবীনকে। বেশ কয়েকটা জরুরী মিটিঙে তো গেলই না। স্রেফ ঘুমিয়ে কাটাল বাড়িতে। সেই প্রথমবার মনে হয়েছিল কথাটা। খুবই অদ্ভুত একটা কথা। মনে হতেই চমকে উঠেছিল সে। এমন ভাবনা তার মনে স্থান পেতে পারে এমনটা কখনো ভাবতেও পারেনি। মনে হয়েছিল পার্টিটা ছেড়ে দিলে হয় না?

একি! কোথা থেকে মাথায় এল এসব! এই পলায়নী মনোবৃত্তি কী করে বাসা বাঁধল গোপনে! হীরুদা বেঁচে থাকলে কি প্রচণ্ড বকতেন তা বুঝতে পেরে কয়েকদিন নিজেরই কাছে অপরাধী হয়ে মাথা নীচু করে দিন কাটিয়েছিল।

তার মধ্যে একদিন গিন্নীকে নিয়ে যেতে হল শ্বশুরবাড়ির দিকের এক আত্মীয়ের বিয়েতে, কলকাতায়। ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। জোনাকি মোটা হয়েই চলেছে অথচ কিছুতেই হাঁটতে চায় না। একটু রাত হয়ে গেলে তো একেবারেই না। অগত্যা একটা রিকশা নিতে হল। সবুজগ্রাম স্টেশনের স্ট্যান্ডের বেশিরভাগ রিকশাওয়ালাই ততক্ষণে রিকশা রেখে টিকিট কাউন্টারের পেছনের চুল্লুর ঠেকে চলে গেছে। নিজের রিকশায় বসেছিল শুধু শঙ্কর। রেডিওর কিশোর কুমারের সাথে গলা মেলাচ্ছিল। এই নেশাটাই ওকে চুল্লুর থেকে দূরে রেখেছে।

রিকশা চলতে শুরু করলে রবীন জিজ্ঞেস করল “বাড়িতে সব কেমন গো?”

“সব ভাল, দাদা।”

“তোমার যেন কয়টা ছেলেপুলে? একখানাই তো?”

“হ্যাঁ, দাদা। একটাই মেয়ে আমার।”

“ও হ্যাঁ। কন্যা বিদ্যাপীঠে পড়ত না?”

“হ্যাঁ। এই তো উচ্চমাধ্যমিক পাশ করল।”

“বাঃ। কোন ডিভিশন গো?”

“ফাস্ট ডিভিশন। লেখাপড়ায় খুব মন ওর। কিন্তু আমাদের ঘরে তো। মাষ্টার রাখতে পারিনি ভাল। তাও যা পেয়েছে আমি খুশি, আমার গিন্নীও খুশি। মেয়ে খুশি না।”

“কী বলে মেয়ে?”

“বললে ‘বাবা, আর বারোটা নম্বর পেলে স্টার হয়ে যেত।’”

“আরে! তাহলে তো চমৎকার রেজাল্ট করেছে। এবার কী করবে বলছে?”

“ইচ্ছে তো কলেজে পড়ার। কিন্তু যা খরচা। আমি হাত জোড় করে বললাম এত তো পারব না রে। তা মেয়ে বাপের দুঃখ বোঝে, দাদা। খুব বোঝে। বলল ‘তা’লে থাক’।”

“কত খরচা? সাইন্স না আর্টস?”

“সে তো আমি বুঝি না, দাদা। আমি তো অক্ষর চিনি শুদু। তবে কিসব ব্যাং ট্যাং কাটত শুনেচি ইশকুলে।”

“হুম। সাইন্সই। খরচের ব্যাপার বটে।”

বাকি পথটা থম মেরে থাকে রবীন। বাড়িতে নেমে ভাড়া দেওয়ার সময় হঠাৎ আজাদপুরের কমরেড মইদুলের কথা মনে পড়ে যায়। ও আজাদপুর উইমেন্স কলেজের হেড ক্লার্ক। স্থানীয় ছেলে, জনপ্রিয় পার্টিকর্মী। ওর সাথে একবার কথা বলতে হবে। পয়সা নেই বলে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে?

পরদিন সকালেই মইদুলের সাথে ফোনে কথা হয়। রবীন পরিষ্কার বলে দিল, ভর্তি করতেই হবে যে করে হোক আর কলেজের ল্যাব চার্জ সুদ্ধু মাইনেটা মাফ করে দিতে হবে। মইদুল একটু গাঁইগুই করছিল, কিন্তু রবীন ওকে চেনে ও যখন এ জি মেম্বার তখন থেকে। ওর পার্টি মেম্বারশিপই হত না আরেকটু হলে। ছেলেটার সম্ভাবনা বুঝে রবীনই জোর করে করিয়ে দিয়েছিল। তাই শেষ অব্দি রবীনকে না বলতে পারল না।

অনেকদিন পরে সকালের চা খেয়ে একটা তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে রবীন পার্টির প্যাডটা বের করে জোনাকিকে ডাকল “একটা চিঠি লিখে দিয়ে যাও তো।”

লেখা হল।

প্রিয় সাথী,

পত্রবাহক শঙ্কর সাহা আমাদের পার্টির শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক। ওর মেয়ে এ বছরের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনায় আগামী দিনে বিপুল খরচের সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছে। আপনার কাছে পাঠালাম। মার্কসবাদী হিসাবে যথাসাধ্য করবেন আশা রাখি।

ধন্যবাদান্তে

রবীন ঘোষাল

সদস্য

শ্রীপুর জোনাল কমিটি

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)

চিঠিটা নিয়ে তখনই স্টেশনে চলে গেল রবীন। স্ট্যান্ডে না পাওয়া গেলে শঙ্করের বাড়ি যেতে হবে।

স্ট্যান্ডেই পাওয়া গেল অবশ্য। হাতে চিঠিটা ধরিয়ে দিয়ে রবীন বলল “এ বেলাটা একটু কাজের ক্ষতি করে আজাদপুর চলে যাও। বাসে গিয়ে কলেজ স্টপেজে নামবে। দেখবে সোজা একটা গলি ঢুকে গেছে বাস রাস্তা থেকে। কলেজ অব্দি যেতে হবে না। তার আগেই একটা বড় পুকুর পড়বে বাঁ হাতে। এই পারে দাঁড়িয়ে নাক বরাবর ঐ পারে যে দোতলা বাড়িটা দেখবে, ওটাই মইদুলের বাড়ি। মইদুল ইসলাম। গিয়ে আমার নাম করে এই চিঠিটা দেখাবে। কলেজের মাইনে ফ্রি করে দেবে। মেয়েকে নিয়ে, মার্কশিট ফিট নিয়ে যাও। আজই ভর্তি করে এসো। ওদের ভর্তি এমনিতে শেষ হয়ে গেছে। আর মেয়েকে বলবে টিউশন করতে। তাতে যাতায়াত, বইখাতার খরচ অন্তত উঠে যাবে। আমি নাহয় পাঠিয়ে দেব কিছু ছেলেমেয়েকে।”

শঙ্কর বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়ে। সাইকেলে উঠে পড়েই রবীনের সবচেয়ে জরুরী কথাটা মনে পড়ে। “এই কদিনে আবার মেয়ের বিয়ে ঠিক করে বসোনি তো?”

শংকর একগাল হেসে বলে “এই দেখাশোনা শুরু করছিলাম, দাদা। লেখাপড়া না হলে তো দিতেই হত।”

“খবরদার। আর এগিয়ো না। এর পরে যদি শুনি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছ, আমি গিয়ে ভাংচি দেব কিন্তু।”

শঙ্কর হাসে, অন্য রিকশাওয়ালারাও হাসতে থাকে। রবীনও হাসতে হাসতে চলতে শুরু করে।

বাড়ি ফিরে আয়েশ করে বাইরের ঘরের খাটটার উপর বসে, গণশক্তিটা হাতে নেয়। চশমাটা খুঁজতে গিয়ে খেয়াল হয়, চিঠি লেখার পরে প্যাডটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখা হয়নি। পাতার এক কোণে কাস্তে হাতুড়িটা দেখে হেসে ফেলে রবীন। পার্টি ছাড়বে? পাগল নাকি? আর কিছু না হোক, ঐ চিহ্নওয়ালা কাগজে একটা চিঠি লিখলে এখনো তো একটা গরীব মেয়ের লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়। সেই পার্টি ছেড়ে দেবে? কক্ষনো না।

রবীন কখনো কাউকে বলেনি — জোনাকিকে তো নয়ই — যে উদ্দালকের মধ্যে ও কী দেখেছিল। ঠিক তা-ই দেখেছিল যা বিপ্লবের মধ্যে ছিল।

রবীন আর জোনাকির একমাত্র ছেলে বিপ্লব। ততদিনে হায়দরাবাদে মোটা মাইনের চাকরি করছে। পশ্চিমবঙ্গের বহু ছেলে সফটওয়্যারে চাকরি নিয়ে যা করে আর কি। জোনাকি চাইছে মেয়ে দেখা শুরু করতে, কিন্তু ছেলে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। বলা হয়েছিল নিজের কোন পছন্দ থাকলে জানাতে। সেরকম কিছুও বলছে না। সে নাকি আদৌ বিয়ে করতে চায় না। বিয়ে না করলে নাকি অনেক ঝাড়া হাত পা থাকা যায়, পেশায় অনেকদূর ওঠা যায়।

কথাগুলো ওর মুখ থেকে শুনতে বেশ অদ্ভুত লেগেছিল রবীনের। কবে যে ছেলেটা এত বদলে গেল! পেশায় উন্নতি তো বড় কথা ছিল না ওর কাছে! অত একমুখী ছাত্রজীবনে হলে তো অনেক ভাল রেজাল্ট করতে পারত। বরাবরই যে অন্যরকম ছিল ছেলেটা! রবীনের তা নিয়ে বেশ গর্ব ছিল। সেই জন্যে পরীক্ষায় খুব খারাপ ফল করলেও দুশ্চিন্তা হয়নি। হয়নি যে সেটা অবশ্য প্রকাশ করত না। কারণ ভয় ছিল, বুঝতে দিলে বিপ্লব একেবারেই লেখাপড়া তুলে দেবে। তাছাড়া জোনাকি। তাকে তো বোঝানো সম্ভব ছিল না বিপ্লব কত বড় হবে বলে রবীন আশা করে আছে। তাই অন্তত স্ত্রীকে দেখানোর জন্য হলেও বকাবকি করতেই হত। আত্মীয়স্বজনই বা কী বলত বাপ ছেলেকে কিছুই বলে না জানলে? অবশ্য একেকবার এতটাই খারাপ রেজাল্ট করত যে একটু চিন্তা সত্যিই হত। অন্তত পাশ করতে হবে তো পরীক্ষাগুলো। কয়েকটা ডিগ্রি না থাকলে যে কেউ কথার দামই দেবে না; আজীবন মফস্বলের নেতা হয়েই থাকতে হবে বিপ্লবকে। বাপের মত। উজ্জ্বল মুখ চোখ, ছোট থেকেই রাজনীতিতে প্রবল আগ্রহ, স্কুল ছাড়ার আগেই লেনিন পড়তে শুরু করেছে যে, যার মাথার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করে মনটা, যার সাহস অসম্ভব বেশি, যে কথা বললে মাস্টারমশাইরাও হাঁ করে শোনেন, সে যে খুব বড় কিছু করবে এটাই মনে হত রবীনের। ঠিক কী করবে? ভাবতেও বুক কাঁপত। তাই মনে মনেও সে কথা উচ্চারণ করত না। বিশ্বাস না থাকলেও ও কথা মনে এলেই রবীন বিড়বিড় করে বলত “বালাই ষাট।” কিন্তু ছেলেটা বদলে গেল। শেষ পর্যন্ত আর পাঁচজনের মত ওরও পার্টি সম্পর্কে বিতৃষ্ণা এসে গেল। লেখাপড়ায় খুব মন হল বি সি এ পড়তে পড়তে। দস্তুরমত কেরিয়ার সচেতন হয়ে উঠল।

উদ্দালক সবুজগ্রামেরই ছেলে। তবে ছাত্রজীবনের অনেকটা কাটিয়েছে হোস্টেলে। পার্টির সাথে যোগাযোগটাও সেখানেই। এই অঞ্চলের পার্টির সঙ্গে ওর সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় থেকে। ওর কাকা দীর্ঘদিনের পার্টিকর্মী। রবীনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা এই অঞ্চলের পার্টিকে গড়ে তুলেছিল, উদ্দালকের কাকা তাদের একজন। ভাইপোর কার্যকলাপে রবীনের মনে হয়েছিল ও যেন সেই ছেলেটা, যে ছেলে হয়ে উঠল না বিপ্লব। ওর রাজনীতি করা শুরু কলকাতা থেকে। ছাত্র ফেডারেশনের রাজ্য কমিটিতে ছিল; পার্টির বড় বড় নেতাদের নজর ওর উপরে সব সময়। অতএব ও একজন বড় নেতা হবেই — এমনটাই ভাবত রবীন। উদ্দালকের চলে যাওয়া তাই ওর কাছে বড় আঘাত। সবুজগ্রাম লোকাল কমিটির আর কোন কমরেড উপলব্ধি না করলেও রবীন বুঝেছিল মৃত্যুটায় কতটা ক্ষতি হল। শঙ্কর সাহার ব্যাপারটা না ঘটলে ধাক্কাটা সামলে উঠতে রবীনের আরো অনেক সময় লাগত।

তার কয়েকদিন পরে উদ্দালকদের পাড়ার কমরেড শিবু মণ্ডল এল রবীনের বাড়ি। ও লক্ষ্মীকান্ত মিলের শ্রমিক ছিল। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে গত পনেরো বছর বাড়ি বাড়ি কাগজ বিলি করে সংসার চালাচ্ছে। ওর বউও অবশ্য বসে থাকে না। শাড়িতে ফলস লাগানো, ব্লাউজ বানিয়ে দেয়া — এসব করে। ওদের ছেলেপুলে না থাকায় কষ্ট কম।

শিবু পার্টি অন্তপ্রাণ। বউ কম কথা শোনায় না। “পাটি পাটি করে হেদিয়ে মরো। পাটি তোমার ভাত যোগাতে পারে? কারখানাও তো খুলতে পারল না।”

শিবু ঝাঁঝিয়ে বলে “যা বোজো না, তাই নিয়ে কতা বোলো না। কারখানা কি পার্টির যে পার্টি খুলে দেবে?”

“তা একটা চাকরি তো দিতে পারে। এত লোককে চাকরি দিচ্ছে, তোমাকে দিতে পারে না?”

“ছি ছি! কী কতা বল? পার্টি করা কি চাকরি পাওয়ার জন্যে? ওসব ধান্দাবাজরা করে।”

শিবুর বউ এরপর বোঝায় কেন ধান্দাবাজ হওয়াই ভাল। শিবু সেসব এক কান দিয়ে ঢোকায়, আরেক কান দিয়ে বার করে। যেদিন মন মেজাজ বেশি খারাপ থাকে সেদিন চলে আসে রবীনের কাছে। খানিকক্ষণ কথাবার্তা বললে একটু বল পায়। পার্টি করা ব্যর্থ মনে হয় না আর। সেজন্যেই আসে।

সেদিন যখন এসেছে, তখন রবীন সবে প্রাতঃকৃত্য সেরে এসে বসেছে আরেক কাপ চায়ের আবদার করে। শিবুকে ঢুকতে দেখে চেঁচিয়ে জোনাকিকে বলে “শিবু এসেছে।”

“না বৌদি, আমি চা খেয়েই এলুম বাড়ি থেকে।”

“আরে খেয়ে এলি তো কী হল? আরেক কাপ খা।”

“না, রবীনদা। রুটি, চা খেয়ে পেট ভর্তি। এখন আবার চা…”

“আচ্ছা, তাইলে একখান বিড়ি খা।”

শিবু টেবিলের উপর থেকে পদ্মা বিড়ির প্যাকেট আর লাইটারটা তোলে। একটা বিড়ি ধরিয়ে রবীনের ঠোঁটের ফাঁকে লাগিয়ে দেয়, তারপর নিজেরটা ধরিয়ে চেয়ারে বসে।

“মনটা কদিন বড় খারাপ ছিল, বুঝলি?”

“ছেলের জন্যে?”

“না না। ছেলে তো রোজই ফোন করছে। কোনদিন না করলে ওর মা করে। দূরে থাকে। এর চেয়ে বেশি আর কী হবে? সেজন্যে না।”

“তবে?”

“এই তোদের পাড়ায় যেটা হল। জোয়ান ছেলেটা রে। কিভাবে কাঁদছিল ওর মা! আমি তো তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলাম। শ্মশানেও যেতে পারলাম না।”

“আমি গিসলাম। গাবলুর বাবা তো পাথর হয়ে গেচে। সেদিন থেকেই।”

“তা তো হবেই। একমাত্র ছেলে।” রবীন চোখের জল সামলায়। “একবার বাপ-মায়ের কথা ভাবল না রে ছেলেটা? কী এমন হয়েছিল, বল দেখি?”

“ঠিক যে কী হয়েচিল তা তো কেউ বলতে পারচে না। কিন্তু আমি শুনেচি একটা কতা।”

“কী রে? প্রেম ট্রেম করত?”

“ছাইটা কোতায় ফেলি?”

“ঐ যে। তোর পেছনের তাকে। নিয়ে আয়।”

শিবু অ্যাশট্রেটা নিয়ে এসে ছাই ফেলে গলা খাঁকারি দেয়।

“বলাটা উচিৎ না হয়ত।”

“কেন?”

“না, লোকের মুখে শোনা তো। শোনা কতায় কারোর নামে বদনাম দেয়া তো ঠিক না।”

“আরে বাবা, তুই তো দুনিয়ার লোককে বলতে যাচ্ছিস না।”

“তা তো বটেই। আপনি বলেই সাহস করচি বলতে। আর কাউকে বলতে যাব না। আমার ঘাড়ে কয়টা মাতা?”

“কেন, তুই কার নামে কী বলবি?”

“আমায় কতাটা বলেচে কানু। আমি জানি না কিচু।”

“আরে এত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? কী কথা? কানু মানে তোদের গলির মুখে মুদির দোকানটা যার?”

“হ্যাঁ। ওর দোকানে বসে তো গাবলু আড্ডা দিত অনেক সময়। তা মারা যাবার দিন সন্ধ্যাবেলাও নাকি আড্ডা দিচ্চিল, তখন বাইকে করে দুটো ষণ্ডামার্কা ছেলে এসে ওকেই জিজ্ঞেস করেচে ‘উদ্দালকদের বাড়ি কোনটা?’ জামার নীচে মেশিন ছিল। কানুও দেখেচে। তো গাবলু বলেচে ‘আমি তো এ পাড়ায় নতুন লোক, দাদা। আমি চিনি না।’ তখন কানুকে জিজ্ঞেস করেচে, কানু বলেচে ‘এই নামে তো চিনি না কাউকে। হয়ত ডাকনামে চিনি। ডাকনাম বলতে পারবেন?’ সে তারা বলতে পারেনি। ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাকি খানিকক্ষণ নিজেদের মধ্যে কতা বলেচে ‘যাবে কোতায়? ঠিক বার করব’, এইসব। তারপর চলে গেচে। ওখানে ভাগ্যিস আর কেউ ছিল না! ভাবুন?”

“তাহলে তুই বলছিস ভয় পেয়ে উদ্দালক আত্মহত্যা করল?”

“না, রবীনদা। ভয় পাওয়ার ছেলে ও নয়। আর কোন উপায় না দেকে কল্ল মনে হয়।”

“উপায় নেই? কেন? ও পার্টিকে জানাতে পারত। কী ব্যাপার আমরা দেখতাম। ও পার্টি মেম্বার, তার উপর পঞ্চায়েত সদস্য। এটাই তো করা উচিৎ ছিল।”

“পার্টি মানে তো শুধু আপনি নয়, দাদা।”

“তা তো বটেই। পার্টি কারো একার সম্পত্তি নাকি?”

“সেই তো মুশকিল।”

“মুশকিল! কেন?”

“পার্টিকে জানালে তো… বলরামও জানবে।”

“তাতে কী?”

ততক্ষণে জোনাকি চা দিয়ে গেছে। শিবু উঠে এসে রবীনের ঠোঁটে চা ধরে। প্রথম চুমুক দিয়েই সে আবার জিজ্ঞেস করে “তাতে কী? বল?”

“ছেলেগুলো জগার দলের ছিল। নিশ্চিত।”

“তোদের পাড়ায় ফ্ল্যাট হচ্ছে নাকি?”

“চেষ্টায় আচে।”

“তাই নিয়ে কি উদ্দালকের সাথে কিছু হয়েছিল?”

“হ্যাঁ। ঐ যে হারু ঘোষের জমিটা। ওটার মাটি কাটতে লোক এসেচিল কদিন আগে। গাবলুর চোখে পড়ে গিসল। ও গিয়ে বলেচে ‘এখানে কিসের মাটি কাটা হচ্চে?’ তা জন খাটচিল যারা তারা বলেচে ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। গাবলু বলেচে ‘চাষের জমিতে ফ্ল্যাট হবে, পারমিশন কই? কে পাঠিয়েচে তোমাদের?’ ওরা জগার নাম বলেচে। গাবলু তখন বলে ‘এখানে কাজ কত্তে দোব না। পঞ্চায়েত থেকে পারমিশন করিয়ে আনতে বলো, তবে কাজ কত্তে পারবে।’ ওরা বলেচিল পারমিশন হয়ে গেচে। গাবলু তো ছাড়বার ছেলে না। ‘আমি এখানকার পঞ্চায়েত সদস্য। হয়ে থাকলে আমি জানতাম।’ বলে ওদের ভাগিয়ে দিয়েচে।”

“তা এটা উদ্দালক কাউকে জানায়নি?”

“জানিয়েচিল। নইলে আমি জানলুম কী করে? পঞ্চায়েত অফিসে বলরামকে আমার সামনে বলেচিল ঘটনাটা।”

“তা বলরাম কী বলল?”

“‘এত লোক বাড়চে চাদ্দিকে। চাষের জমি বাদ দিলে এত লোক থাকবে কোথায়? সব কি তুই আটকাতে পারবি? কেন শুধু শুধু ঝামেলা করিস?’ বলতেই গাবলুর সাতে লেগে গেল। গাবলু বলল ‘নিয়মকানুন কিচু মানবে না? যার জমি সে বাড়ি কত্ত সে একরকম। তা বলে প্রমোটার ফ্ল্যাটবাড়ি তুলে দেবে? আর পঞ্চায়েতকে না জানিয়ে? এই সমস্ত আমি থাকতে হবে না।’ তো বলরামদা বলল ‘জানালে আমায় জানাবে। প্রধান আমি। তোকে কেন জানাতে যাবে?’ তা হাওয়া গরম হয়ে গেচে দেকে আমি বিবেচনা কল্লুম আমার ওখানে থাকা উচিৎ না, তাই সরে পল্লুম।”

চা শেষ। রবীন তখন আর কথা বলতে পারছে না। আঃ! হীরুদা আর কয়েকটা বছর বাঁচতে পারলেন না?

“যদ্দূর মনে পড়চে, যেদিন গাবলু গলায় দড়ি দিল সেদিন কি তার আগের দিন সকালে তক্কাতক্কিটা হল, রবীনদা।”

“অ। সকালে প্রধানকে পঞ্চায়েত সদস্য বলল বেআইনি কাজ করতে দেব না, আর সন্ধ্যাবেলাই প্রমোটারের লোক তাকে চমকাতে চলে এল বন্দুক নিয়ে। চমৎকার! চমৎকার! শাআআলা! কমিউনিস্ট পার্টি করে।”

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 10490957306
State Bank of India
Konnagar branch
IFSC: SBIN0002078

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

One thought on “নাম তার ছিল: ৫”

Leave a Reply