নাম তার ছিল: ৪

পূর্বকথা: প্রথম যৌবনে যাকে ভালবেসেছিল রবীনের স্ত্রী জোনাকি, সে হারিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক হিংসার যুগে। কারণ সে পালাতে শেখেনি। প্রায় এক যুগ পরে জোনাকির জীবনে এল রবীন। সে-ও পালাতে শেখেনি। অতঃপর

টানা অনেকক্ষণ বৃষ্টি পড়লে রবীনের মনে পড়ে সেই দিনটার কথা। তারিখটা মনে নেই কিন্তু শনিবার ছিল। স্কুলে হাফ ছুটির পর বাড়ি না ফিরে স্টেশন রওনা দিয়েছিল। হীরুদা, পার্টির জেলা সম্পাদক, বারবার ডেকে পাঠাচ্ছেন অথচ যাওয়া হচ্ছে না। সেদিন যাবেই ঠিক করে রেখেছিল। যখন প্রায় স্টেশনে পৌঁছে গেছে তখন নামল ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি।

সকাল থেকেই মেঘ করেছিল বটে, কিন্তু ও মেঘে বেশি বৃষ্টি হয় না। ক্লাস করাতে করাতে রবীন খেয়ালই করেনি কখন ঘন হয়েছে সেই মেঘ। স্কুল থেকে বেরিয়ে সাইকেলে চাপতেই চারপাশটা বেশ অন্ধকার মনে হল। উপরে তাকিয়েই দ্যাখে মেঘে মেঘে সমস্ত আকাশটা ঢাকা পড়েছে প্রায়। মেঘগুলো একে অপরের সাথে জুড়ে গিয়ে দ্রুত ভরাট করে দিচ্ছে ফাঁকা জায়গাগুলোও। তবু সে ভেবেছিল স্টেশন পর্যন্ত চলে যাওয়া যাবে। তারপর ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে পড়লেই হল। ট্রেন আসবে আর লাফিয়ে উঠে পড়বে। আশা করা যায় সাত স্টেশন দূরের জেলা সদরে একই সময়ে ভারী বৃষ্টি হবে না।

বর্ষাকালে এমন আশা করার কোন মানে হয় না। কিন্তু সেটা না করলে নিজের প্রতিবন্ধকতা মেনে নিতে হয়। ছাতা হাতে সাইকেল চালানো যে তার পক্ষে প্রায় অসম্ভব সে কথা নিজের কাছেও স্বীকার করতে চাইত না রবীন। স্বীকার করলেই প্রতিবন্ধী মানসিকতা চেপে ধরবে — এই ভয়।

শুভাকাঙ্ক্ষীরা মৃদু স্বরে, বাকিরা বিদ্রূপের ভঙ্গীতে, বেশ কয়েকবার বলেছে একটা প্রতিবন্ধী কার্ড করিয়ে নেওয়ার কথা। ট্রেনে, বাসে ছাড় পাওয়া যায়; উঠলেই বসার জায়গা পাওয়া যায়, আরো নানা সুবিধা। রবীন কিন্তু নিজেকে প্রতিবন্ধী বলে মানতে চায় না। ওর হাঁটাচলা স্বাভাবিক, কথাবার্তা স্বাভাবিক। হাত দিয়ে ভারী কাজ করতেও কোন অসুবিধা নেই। কেনই বা নিজেকে প্রতিবন্ধী ভাববে? অসুবিধা বলতে ভাত খেতে গিয়ে এদিকে ওদিকে বেশ খানিকটা পড়ে যায়, গ্লাসে জল ভরে খেতে গিয়েও ভর্তি করে ফেললে চলকে পড়ে, চা নিজে হাতে একেবারেই খাওয়া যায় না — গরম গায়ে পড়বে বলে। লিখতেও একটু অসুবিধা হয় বটে কিন্তু বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কব্জিটা ধরে নিলে আর অতটা কাঁপে না। বোর্ডের লেখা কাঁপা কাঁপা হলেও ছাত্রছাত্রীরা শেষ বেঞ্চ থেকে দিব্যি পড়তে পারে। লেখার পরে বেশ খানিকক্ষণ হাত টনটন করে ঠিকই, তবে রবীন তো বিজ্ঞান কি ভূগোলের মাস্টার নয়, ফলে খুব বেশি বোর্ড ওয়ার্ক করতে হয় না। পরীক্ষার খাতায় নম্বর দিতেও দুটো হাতকেই কাজে লাগাতে হয়। কখনো কখনো লেখার কাজ বাঁ হাত দিয়েও চালিয়ে নিতে হয়। একেবারে দুর্বোধ্য লেখা পড়ে তা নয়। এইটুকু মানিয়ে নিতে অসুবিধা কোথায়? যে লোক মাইলের পর মাইল সাইকেল চালাতে পারে, ঘন্টার পর ঘন্টা বক্তৃতায় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারে, প্রশাসন চালাতে পারে, সে কেন নিজেকে প্রতিবন্ধী ভাববে? কেন অন্যকে সুযোগ দেবে তাকে প্রতিবন্ধী ভাবার? সামান্য বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য?

এই জেদ বজায় রাখে বলেই অবশ্য রবীনের চট করে কারো সাহায্যের দরকার হয় না এখন অব্দি। তবে যখনকার কথা হচ্ছে তখনো অসুখটা প্রবল হয়নি। ১৯৭৮। কিছুদিন আগেই পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছে আর এক ঘুষখোর রেলকর্মী কংগ্রেসীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে রবীন পঞ্চায়েত সমিতির ভোটে জিতেছে। ওর একেবারেই ইচ্ছে ছিল না ভোটে দাঁড়ানোর। কিন্তু সেকথা বলতেই হীরুদা প্রচণ্ড ধমক দিয়েছিলেন।

“ভোটে দাঁড়াবে না তো কী করবে শুনি?”

“মন দিয়ে সংগঠনটা করতাম। কাজ তো সবে শুরু। আমাদের পার্টিটাকে একটা সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টি করতে হবে তো। সাধারণ মানুষকে তো বোঝাতেও হবে আসলে আমরা কী করতে চাই।”

“শোনো ছোকরা, আমার বয়স কত জানো? জ্যোতি বোস আমার থেকে বয়সে ছোট। তা তুমি কি চাও আমরা বুড়ো হাবড়ারা প্রশাসন চালাই? তারপর লাইন দিয়ে মরতে শুরু করলে সামলাবে কে?”

“মরার বয়স আপনার এখনো হয়নি, হীরুদা।”

“ওসব বাজে কথা রাখো। প্রশাসনটা ভাল করে চালানোর গুরুত্বটা বোঝো। ঠিক কথাই যে পার্টিটাকে যেরকম করা দরকার তার এখনো দেরি আছে। কিন্তু তোমাদের তো বয়স কম, তোমরা সংগঠন করার অনেক সময় পাবে। এখন তোমাদের মত তাজা ছেলেদের প্রশাসনে দরকার। বিপ্লবটা করতে হলে তো সারা দেশে করতে হবে। শুধু পশ্চিমবঙ্গে কি বিপ্লব হবে?”

“কখনোই না। সেটা হবার হলে নকশালরাই পেরে যেত।”

“তবে? এই যে আমরা সরকার চালানোর সুযোগটা পেয়েছি, এটাকে কাজে লাগাতে হবে, বুঝেছ? দেখিয়ে দিতে হবে দেশের লোককে যে কমিউনিস্টদের মত সরকার অন্য কেউ দিতে পারে না। তবে অন্য রাজ্যের লোকেও বিশ্বাস করবে আমাদের। তবে বিপ্লব-টিপ্লবের কথা ভাবা যাবে।”

“কিন্তু…”

“আরে পুরো কথাটা শোনো আগে। এই যে আমরা পঞ্চায়েত করতে চাইছি, এ যদি সফল হয় তাহলে যা দাঁড়াবে সে জিনিস এত বড় করে ভারতবর্ষে আগে হয়নি। গরীব মানুষ নিজে হাতে নিজের এলাকা শাসন করবে। তা সে তো দুম করে পারবে না। তার তো সময় লাগবে, লেখাপড়া লাগবে। তোমার মত শিক্ষিত ছেলেরা যদি শুরুতে হাল না ধরো, হবে কী করে?”

“সে পার্টি সিদ্ধান্ত নিলে নিশ্চয়ই মেনে নেব…”

“মন সায় দিচ্ছে না? কেন? সংশয়টা কিসের?”

“না, ভাবছি শুধু ভোটে জেতাটাই তো আমাদের উদ্দেশ্য নয়…”

“একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আপাতত ওটাও জরুরী। মাও কী বলতেন? ‘সচেতন মানুষের হাতে বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’, তাই তো? তা চারুবাবুরা সচেতন মানুষের ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেলেন। কমরেডরা শিখলেন ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।’ আমরা এবার দেখাব যে বন্দুকের নল নয়, নলকূপ দিয়ে বিপ্লব শুরু করা যায়। তোমাকে যে কাজটা দিতে চাইছি সেটা বিপ্লব শুরু করার কাজ। ভেবো না এর সাথে বিপ্লবের কোন সম্বন্ধ নেই।”

সেদিন উঠে আসার আগে হীরুদা পিঠে হাত দিয়ে বলেছিলেন “একটা কথা জেনে রেখো। ভূমি সংস্কার আর পঞ্চায়েত যদি আমরা ঠিক করে করতে না পারি, ৮২র ভোটে ভরাডুবি হবে। আর সেটা হলে তোমার বিপ্লবের বাণী কেউ শুনবে না। এবং প্রশাসন চালাতে গিয়ে যা শিখবে তা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”

রবীনকে শুধু পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য করে অবশ্য হীরেন্দ্রনাথ ঘোষ ছাড়েননি, একেবারে সভাপতি করেছেন। দু একটা বাদে শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির অধিকাংশ আসন প্রত্যাশিতভাবেই বামফ্রন্ট প্রার্থীরা জিতেছিল। সকলেরই ধারণা ছিল পার্টি সভাপতি করবে অক্রূর গুপ্তকে। রবীন নিজেও তাই ভেবেছিল। অক্রূর দীর্ঘদিনের পার্টিকর্মী, নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে প্রবীণতম, কলকাতা কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ফলে প্রশাসন চালানোর কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল, আর ভদ্রলোক কর্তা হওয়ার উপযুক্তও বটে। কর্তৃত্ব করতে ভালবাসেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে জেলা কমিটি সিদ্ধান্ত নিল রবীন সভাপতি হবে। জোনাল কমিটির মত চাওয়া হয়েছিল, সেখানে ঐকমত্য হয়নি। পরে অবশ্য রবীন বুঝতে পেরেছিল হীরুদার মাথায় এই ভাবনাটাই ছিল, সেই জন্যেই ভোটে দাঁড়ানো নিয়ে অতগুলো কথা সেদিন বলেছিলেন।

পঞ্চায়েত সমিতি ব্যাপারটা ঠিক কিরকম হওয়া উচিৎ, পঞ্চায়েত আর জেলা পরিষদের মাঝখানে স্রেফ যোগসূত্র হয়ে থাকা উচিৎ নাকি নিজ উদ্যোগেও কিছু করা উচিৎ — এসব নিয়ে কারো থেকে কোন পরামর্শ পায়নি রবীন। নিজেকেই কাজ করতে করতে বুঝে নিতে হচ্ছিল। সেইসব করতে গিয়ে আর হীরুদার কাছে যাওয়া হয়নি বহুকাল। শেষ দেখা হয়েছিল শপথ গ্রহণের দিন। ৭৮ এর সেই বিকেলে তাই রবীন যাচ্ছিল হীরু ঘোষের রতুগঞ্জের বাড়ি। পথে নামল বৃষ্টি।

তোড় খুব বেড়ে যাওয়ার আগে কোন মতে নিমাইয়ের সাইকেল স্ট্যান্ডে গিয়ে পৌঁছতে পেরেছিল রবীন, তাই শেডের নীচে দাঁড়াতে পারল। তাতেও পাঞ্জাবীটা ভিজে গিয়েছিল। বৃষ্টিটা চট করে থামবে না বুঝে নিমাই বলল “পাঞ্জাবীটা যে অ্যাক্কেরে ভিজা গ্যাছে, রবীনদা। দ্যাও ঐ ফ্যানের নীচে মেইলা রাখি। জল ধরনের আগে শুকায়া যাইব গিয়া।”

তাই-ই করা হল। তারপর রবীনের সাথে একথা সেকথা চলতে লাগল। একটু পরে লাগোয়া বিন্দুর চায়ের দোকান থেকে ভাঁড়ে চা নিয়ে এল বিন্দুর ছেলে। সে খাইয়ে দিচ্ছে, রবীন খাচ্ছে, কথাও বলছে। কিন্তু চোখ রাস্তার দিকে। আধ ঘন্টা যেতে না যেতেই নালাগুলো ভরতে শুরু করল। স্টেশন চত্বরটা তাও উঁচু জায়গা। এই বৃষ্টি আরো কিছুক্ষণ চললে বাকি সবুজগ্রামের কী অবস্থা হবে, সেটাই ভাবছিল রবীন। সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা সুভাষ কলোনি। পাশেই হরিমতীর ঝিল। যদি উপচে পড়ে! তাছাড়া শুধু তো সবুজগ্রাম নয়, আজাদপুর, ধাঙ্গড়পাড়া, ক্ষেত্রগ্রাম, বড়িহাটা — এরকম অনেকগুলো পঞ্চায়েত এলাকা শ্রীপুর-মদনপুর পঞ্চায়েত সমিতির মধ্যে।

বৃষ্টি কমার নাম নেই। রবীন দোটানায় পড়ে গেল। শুধু অনেকদিন যাওয়া হয়নি বলেই নয়, সেদিন হীরুদার সাথে কিছু জরুরী আলোচনাও করার ছিল। সভাপতি না হতে পারাটা অক্রূরদা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সরাসরি রবীনকে অমান্য করতে পারে না, কিন্তু মাঝেমাঝেই ওকে না জানিয়ে একেকটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিচ্ছে। অবধারিত খারাপ সিদ্ধান্ত। এ পর্যন্ত প্রত্যেকবারই রবীন জানতে পেরে হস্তক্ষেপ করেছে। কিন্তু পার্টিকে জানিয়ে রাখা দরকার যে উনি নিজের অধিকারের বাইরে গিয়ে কাজ করছেন। অথচ যা বৃষ্টি হচ্ছে তাতে এলাকার অবস্থা সঙ্গীন হবে মনে হয়। সে অবস্থায় সন্ধ্যেটা নষ্ট করা কি উচিৎ হবে?

ঘন্টাখানেক হয়ে যাওয়ার পরেও যখন বৃষ্টি থামল না, তখন রবীন ঠিক করে ফেলল হীরুদার বাড়ি যাবে না। জামাটা ততক্ষণে প্রায় শুকিয়ে গেছে, কলারের কাছটা ছাড়া। পরে নিতে দেখে নিমাই জিজ্ঞেস করল “এই বৃষ্টিতে বাইরাইবা নাকি? যাইবা কোথায়?”

“বাড়িই ফিরা যামু রে। রাস্তাঘাটের কী অবস্থা দেখা দরকার। এ তো থামনের লক্ষণ নাই।”

“তা এট্টু দাঁড়ায়ে যাও। অন্তত কমুক কিছুটা। একবার ভিজছ আবার ভিজবা?”

কথাটা ঠিকই। অসুস্থ হয়ে পড়লে আবার বিপদ। রবীন তাই জামাটা পরে দাঁড়িয়েই রইল। মিনিট দশেক পরে মনে হল যেন অনেকটাই কমেছে। টিনের চালে জল পড়ার আওয়াজ শুনেই আন্দাজটা করতে হল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই কারেন্ট চলে গিয়েছিল। ফলে চারদিকে তো ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। ঐ অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়ল সে। সাইকেলে একটা আলো লাগিয়েছিল কদিন আগেই। হ্যান্ডেলের উপরে লাগানো হেডলাইটের মত। তার দিয়ে পেছনের চাকার গায়ে লেগে থাকা বোতলের মত দেখতে ব্যাটারির সাথে যুক্ত। চাকা ঘুরলে ঘর্ষণে সে ব্যাটারি চার্জ হয়। রবীনের মাথায় আসেনি। এক ছাত্রের বাবার দোকানে সেদিন হাওয়া দিতে গিয়েছিল। তিনিই জোর করে লাগিয়ে দিয়ে বললেন “আপনি তো সাইকেলটা নিয়েই হিল্লী দিল্লী করেন দিনরাত। খুব কাজে লাগবে আপনার।” সত্যিই খুব কাজে লাগল।

তখনো এক দু ফোঁটা পড়ছে। রবীন সবুজগ্রাম চষে ফেলে বুঝল হীরুদার বাড়ি যাওয়া বাতিল করে ঠিকই করেছে। হরিমতীর ঝিল প্রায় ভরে গেছে, সুভাষ কলোনির নীচু, সরু গলিগুলোতে ইতিমধ্যেই প্রায় হাঁটুজল, ঝিল উপচোলে আর দেখতে হবে না।

সেদিন তো হীরুদার কাছে যাওয়া হলই না, পরের প্রায় এক মাস হল না। বৃষ্টি বটে। সেবারের মত বর্ষা রবীন তার আগে বা পরে আর কখনো দ্যাখেনি। সবুজগ্রামের বেশিরভাগটা দীর্ঘদিন জলের তলায় ছিল। তার পঞ্চায়েত সমিতির বেশিরভাগ এলাকারই ঐ অবস্থা। সারাদিন এত কাজ থাকত যে কোন কোনদিন বাড়ি ফেরাই হত না। রবীন ভাবত, ভাগ্যিস বাবা একটা দোতলা বাড়ি করতে পেরেছিল। বুড়িমার পরিবারের কাজে লাগল।

সবুজগ্রামের বাড়ি তৈরি করতে ওর বাবার সর্বস্ব খরচা হয়ে গিয়েছিল। তাই পরের পনেরো বছর অত বড় বাড়ি ঝাঁট দেয়া, মোছার কাজ মাকে একা হাতেই করতে হয়েছে। যন্ত্রণাও এক সময় অভ্যেস হয়ে যায়। এমনই অভ্যেস যে ওটা ছাড়া বাঁচা যায় না। রবীনের দিদিরা একটু বড় হয়ে যখন সংসারের কাজে হাত লাগাল তখনো ঝাঁট দেওয়া মোছাটা কিছুতেই ওদের করতে দিতেন না মহিলা। শেষপর্যন্ত চাকুরে বড় ছেলে জোর করে কাজের লোক রাখে — এই বুড়িমাকে।

তখন সবে রবীনের দাড়ি গোঁফ বেরোতে শুরু করেছে, বুড়িমা তখনই বুড়ি। সেই থেকে যদ্দিন বেঁচেছিল, ঘোষালবাড়ি তার অর্ধেক বাড়ি ছিল। নাতি নাতনিদের কাঁখে করে কাজে আসত, তারা এই বাড়ির মেঝেয় হামাগুড়ি দিতে দিতে, মুড়ি চিঁড়ে, ধুলো খেতে খেতে বড় হয়ে যেত। বুড়িমার শরীর খারাপ হলে সে নিজের ছেলেদের বলত না, বলত রবীনের বাবাকে বা ওর দাদাদের কাউকে। দাদারা যখন চাকরিসূত্রে একে একে সবাই বাইরে চলে গেল, তখন রবীনই হয়ে উঠল বুড়িমার অভিভাবক। ততদিনে অবশ্য গোটা ঘোষালবাড়ির অভিভাবক বুড়িমা। রবীনের মায়ের মাথাটা যখন একেবারে খারাপ, ওর বাবাকে খামোকা গালাগালি দেয়, ছেলের বউয়েরা খাবারে বিষ মেশাবে বলে অভিযোগ করে, তখন একমাত্র বুড়িমাই পারত জোর করে স্নান করাতে, ভাত খাওয়াতে। বুড়ি দুম করে মারাও গেল এ বাড়ির ঘর ঝাঁট দিতে দিতেই। সেই বুড়িমার নাতিপুতিরা নিজেদের ঘরে জল ঢুকতেই এসে হাজির হয়েছিল রবীনের কাছে। ওর বাড়ির একতলাও জলের তলায়। ও থেকেছে দোতলার দুটো ঘরে ওদের ছয়জনের সাথে ভাগাভাগি করে। কাছাকাছি সময়ে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে অত বড় বাড়িতে ও একা মানুষ। বুড়িমার পরিবার আসায় কদিন বাড়িতে থাকার লোক হয়েছে।

জল যখন নামতে শুরু করেছে, চারিদিকে নানা অসুখ বিসুখ, তখন একদিন পঞ্চায়েত সমিতির অফিসে ঢুকে রবীন দ্যাখে এক সন্ন্যাসী অক্রূরদার উল্টোদিকে বসে আছে। ও ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। অক্রূরদা বলল “এনাকে চেনো? না চিনলে চিনে রাখো। ইনি হলেন স্বামী মৃণ্ময়ানন্দ।”

রবীন প্রতিনমস্কার জানিয়ে বলে “মাপ করবেন, নাম শুনেছি বলে তো মনে পড়ছে না।”

“ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম। তোমরা আজকালকার ছেলে ছোকরারা কোন খোঁজখবর রাখো না, রাখার চেষ্টাও করো না…”

“আরে, ধুর! আমি এমন কোন লোক নই যে উনি জানবেন”। অক্রূর গুপ্তর কথার মাঝখানেই ভদ্রলোক বলে ওঠেন। “কাজ বলতে আমরা কজন সাধু মিলে একটা আবাসিক স্কুল খুলেছি। এই বড়িহাটায়, গলামনের পাড়ে।”

“ও! আপনি ঐ রামকৃষ্ণ সংঘের হেড সন্ন্যাসী তো? পাগল মহারাজ?”

“ঠিক ধরেছেন। লোকে আমাকে ঐ নামেই ডাকে বটে। আমারও ঐটেই বেশি পছন্দ। সন্ন্যাসী মানুষের নামের কী গুরুত্ব বলুন? গেরুয়া পাবার সময় গুরু একটা নাম দিয়েছিলেন সেইটে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। কিন্তু আমি যাদের পূজা করি তারা আমায় যে নাম দিয়েছে সেইটেই তো আমার আসল নাম। নয় কি?”

সাধু সন্ন্যাসীদের বিশেষ পছন্দ করত না রবীন, তবে এঁর কথা বলার ধরনটা মন্দ লাগে না।

“আমি আসলে আপনার সাথে দেখা করতে চাইছি অনেকদিন থেকে। কিভাবে আসা উচিৎ বুঝতে পারছিলাম না ঠিক, তা অক্রূরদা আমার পরিচিত। ওনাকে বলাতে উনি বললেন ‘এসো, আলাপ করিয়ে দেব।’”

“আমার সাথে? কেন বলুন তো?”

“আসলে ত্রাণের কাজ তো এখনো শেষ হয়নি। তা ভাবছিলাম আমার ছেলেদের যদি আপনি কাজে লাগিয়ে নিতেন। আমি নিজেও নামতে চাই।”

অক্রূরদা মন্তব্য করলেন “ও সাধু সন্ন্যাসীদের একদম পছন্দ করে না।”

“পছন্দ করার তো দরকার নেই, দাদা। উনি মানুষের জন্যে কাজ করছেন, আমিও মানুষের জন্যে কাজ করতে চাইছি। আমাদের পছন্দ অপছন্দ দিয়ে হবে কী?”

প্রস্তাবটা রবীনের একটু অদ্ভুত লেগেছিল। সে বলেই ফেলল “না, এমনিতে তো আপত্তির কিছু নেই। অনেক সংস্থাই তো করছে। নিজেদের মত করে করছে। আমরা তো বাধা দিই না। আপনি আপনার ছেলেদের নিয়ে করুন না। কিন্তু আমি কাজে লাগাব মানে বুঝলাম না।”

মহারাজ হেসে বললেন “ও হো, আপনি বোধহয় আমায় রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু ভাবছেন?”

“হ্যাঁ। তা আপনি তো রামকৃষ্ণ সংঘ…”

“সংঘ। মিশন নয়। আমি ঐ মিশন থেকে দল ভেঙে বেরিয়ে নতুন আশ্রম করেছি। তাই নামও আলাদা। কিন্তু আমারও গুরু সেই রামকৃষ্ণ, সেই বিবেকানন্দ। মানে আপনারা যেমন সি পি আই ভেঙে বেরিয়ে সি পি এম করেছিলেন আর কি। আপনাদেরও গুরু মার্কস-এঙ্গেলস, ওনাদেরও তাই।”

“বুঝলাম। কিন্তু আমার কী সাহায্য লাগবে বুঝলাম না।”

“বোঝাচ্ছি। আপনাদের পার্টি যখন হয় তখন অফিস কাছারি, পত্রিকা এসব নিয়ে সি পি আইয়ের সাথে গোলমাল হয়েছিল। আপনাদের দিকে বেশি কমরেড থাকাতে অনেক কিছুই দখল করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমাদের বেলায় আমরা মোটে তিনজন সাধু আর দুজন ব্রক্ষ্মচারী। না আছে টাকাপয়সা, না ত্রাণ সামগ্রী। এমনকি লোকবলও নেই। তা বলে এই দুর্যোগে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব? তাই আপনাদের যারা কাজ করছে তাদের সাথে নেমে পড়তে চাইছি আর কি। আমরা পাঁচজন আর স্কুলের জনা পনেরো ছাত্র।”

এই সন্ন্যাসী যা বলছেন এবং যেভাবে বলছেন তা যে একেবারেই অন্য সন্ন্যাসীদের মত নয় তা দেখে রবীনের অবাক লাগছিল। কিন্তু ওঁর প্রস্তাব না মানার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণও ছিল না। তাই রাজি হয়ে গেল। উনি যখন যাবেন বলে উঠে পড়েছেন তখন বলতেই হল “আপনি আমাদের পার্টি সম্পর্কে অনেকগুলো কথা বললেন। বেশ খবর রাখেন দেখছি।”

পাগল মহারাজ একগাল হেসে বললেন “অদ্ভুত লাগছে, না? একটা কথা আছে জানেন তো, সব পাপীরই ভবিষ্যৎ আছে আর সব সাধুরই অতীত আছে?”

“তা আপনার অতীতটা কী?”

“সে তো লম্বা গল্প, মাস্টারমশাই। একদিন বলা যাবে। অক্রূরদা বলেছিল আপনার সাথে আমার একদম বনবে না। আমার তো উল্টোটাই মনে হচ্ছে। দেখা যাক ঠাকুরের কী বিধান। আজ আসি।” সেই আলাপ পাগল মহারাজের সাথে, তারপর একসাথে বন্যার কাজ, বন্ধুত্ব। বৃষ্টি এলে সেসব মনে পড়ে রবীনের।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@oksbi কে

Donate

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply