নাম তার ছিল: ৩

পূর্বকথা: উদ্দালক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে জানার পর থেকে রবীন দিশাহারা। লেখাপড়ায় ভাল, এলাকায় জনপ্রিয় একজন তরুণ পার্টিকর্মী কেন আত্মহত্যা করবে তা রবীনের কাছে রহস্য। কিন্তু স্ত্রী জোনাকি এর মধ্যে কোন রহস্য খুঁজে পায় না। তার ধারণা এই আত্মহত্যার কারণ ব্যর্থ প্রেম। এই ব্যাখ্যায় রবীন অবশ্য সন্তুষ্ট হতে পারে না। উদ্দালকের কথা ভাবতে ভাবতে তার মনে পড়ে নিজের যৌবনের কথা। সেই স্মৃতিতে প্রেমের স্থান সামান্য। মায়ের মৃত্যু, রাজনীতি, গ্রেপ্তার হওয়া — এসবই প্রায় সবটা অধিকার করে আছে। আর কিছু আছে কি?

পরাজিতের কোন ইতিহাস নেই। কথাটা জনপ্রিয় হলেও সত্য নয়। কারণ আজ যে পরাজিত কাল সে-ই জয়ী হবে, আজকের জয়ীকে হার স্বীকার করে নিয়ে লাঞ্ছনা সহ্য করতে হবে সেদিন। ইতিহাসও নতুন করে লেখা হবে। আসলে ইতিহাস নেই তাদের, যারা জয়ের কাণ্ডারী ছিল কিন্তু জয়ের অপব্যবহার মেনে নিতে পারেনি, জয়ীর স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সময়ে প্রতিবাদ করেছে, আটকানোর চেষ্টা করেছে, না পেরে নীরবে সরে গেছে অথবা গলাধাক্কা খেয়েছে। যখন স্বৈরাচারের অবসান হয় তখন নতুন জয়ী এদের স্বৈরাচারের সৈনিক হিসাবেই গাল পাড়ে, আঁচড়ায় কামড়ায়, তফাত করতে পারে না। অথবা করতে চায় না। এমন হতভাগ্যের অভাব হয় না কস্মিনকালে। তেমনই একজন রবীন ঘোষাল।

সবুজগ্রামের দক্ষিণপাড়ার মুখেই একটা দোতলা বাড়ি। সারা সপ্তাহ দিনের বেলায় নিঝুম পুরী। তবে প্রতি সন্ধ্যায় এক দশাসই ভদ্রমহিলা দরজার মুখে বসে থাকেন পালিশ চটে যাওয়া কাঠের চেয়ারে। মাথার চুল কমে এসেছে, যা আছে তা-ও সাদা। ও পাড়ায় এমন কেউ নেই যাকে উনি চেনেন না, পথনির্দেশ দিতেও ক্লান্তিহীন। দোষের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই। কোন অচেনা পথিক কারোর বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেন, সঙ্গে জুড়ে দেন “ওদের বাড়ি কার কাছে যাবেন?” উত্তর পেলে পরের প্রশ্নটা হয় “ওর কাছে কী দরকার গো?” এই অনধিকার চর্চার জন্ম একাকিত্বে। স্বামী গত হয়েছেন বছর দশেক। ছেলে, ছেলের বউ বহুজাতিকের ঘানি টানতে যায় ভোর ভোর, ফেরে সন্ধ্যে উতরে গেলে। খেতে, ঘুমোতে। ভদ্রমহিলার ধারণা ওদের মৈথুনের সময়টুকুও নেই। নইলে নাতি-নাতনির দাবী ওরা হেসে উড়িয়ে দিত না এত বছর ধরে। এক সময় সারাক্ষণ বাড়িতে চেনা অচেনা লোকের আনাগোনা লেগেই থাকত, এখন ডেকে ঘরে আনতে চাইলেও কেউ আসে না বড় একটা। কথা না বলতে পেরে উনি হাঁসফাস করেন। তাই কাউকে একবার হাতে পেলে উনি নানা ছলে কিছুক্ষণ কথা বলবেনই। আজকাল ওঁর নতুন বিপদ হয়েছে স্মৃতিভ্রংশ। খানিকক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাও বেমালুম ভুলে যান। কী যেন করার ছিল, মনে পড়ছে না — এই যন্ত্রণা নিয়েও দিনের অনেকটা সময় কাটে ওঁর। তবে বহু পুরনো ঘটনা এখনো ছবির মত মনে আছে। ইনি জোনাকি ঘোষাল — রবীন ঘোষালের স্ত্রী।

বৃদ্ধা জোনাকিকে দেখে কল্পনা করা শক্ত উনি এক সময় শঙখবেলার মাধবীর মত ছিপছিপে ছিলেন। দুদিকে তখন দুটো লম্বা বেণী ঝুলত। সাজগোজের দিকে একেবারেই নজর ছিল না তখন, মনোযোগ বেশি ছিল বই পড়ায়, সৌন্দর্য যা ছিল সে দুই চোখে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। তখনকার সেই বই থেকে মুখ না তোলা জোনাকি দুম করে প্রেমে পড়ে গেল। বইয়ের জন্যই।

আসলে পাঠ্য বইয়ের প্রতি জোনাকির বিশেষ আগ্রহ ছিল না, ছিল অপাঠ্যের প্রতি। ফলে পাড়ার লাইব্রেরিটাই ছিল বিকেলের ঠিকানা। বুড়ি লাইব্রেরিয়ানের প্রিয় পাত্রী হয়ে উঠতেও সময় লাগেনি। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যাওয়ার পর থেকে বরানগরে দিদিমার কাছে মানুষ মেয়েটার খুব একটা বন্ধুবান্ধব ছিল না, তাই লাইব্রেরিয়ান মাসির সাথে গল্প আর তাঁর কাজে সাহায্য করেই সবচেয়ে ভাল সময় কাটত।

লাইব্রেরিয়ান মাসির প্রিয় পাত্র ছিল ঝোটন। পাড়ারই ছেলে। ওকে ভালবাসে না এমন লোক পাড়ায় ছিল না। যেমন ফুটবলার তেমন উপকারী। যত ভাল ছাত্র তত ডানপিটে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা, এক মাথা চুল, গায়ের রং অমাবস্যার আকাশের মত কিন্তু পৃথিবীর সব আলো যেন ওর চোখে। এমন নয় যে ঐ চোখের দিকে জোনাকি আগে কখনো তাকায়নি। কিন্তু লাইব্রেরিতে বসে গল্প করতে করতে সে প্রথম বুঝতে পারে কোন আলোয় অত উজ্জ্বল চোখ দুটো। ঝোটন প্রায়ই গল্প করতে এসে ঝগড়া বাধাত মাসির সাথে — অমুক বইটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়। তমুক লেখক এখন আর লেখক নেই, দালাল হয়ে গেছে। এখন চাঁদ ফুল এসব নিয়ে ঘ্যানঘেনে কবিতা লেখার সময় নয়।

এসব কথা শুনে প্রথম প্রথম ভারী অবাক লাগত জোনাকির। তার চেয়ে মাত্র বছর দুয়েকের বড় ছেলে। সে এত জানল কোত্থেকে! এত অন্যরকম বই সে পড়ল কোথায়! মাসির মত পড়ুয়া মানুষ জোনাকি আর দ্যাখেনি। লাইব্রেরির কোন তাকের কোন কোণে কোন বইটা আছে তা মাসির হাতের তালুর মত জানা। কোন বইয়ের কোন পাতায় কী আছে তা-ও ঠোঁটস্থ। তিনিও অনেক সময় তর্কে পেরে ওঠেন না ঝোটনের সঙ্গে। হয়ত বলেন “আচ্ছা দিয়ে যাস। পড়ে দেখি কী এমন নতুন কথা লিখেছে তোর সরোজ দত্ত।” গোড়ার দিকে ওদের তর্কে একরোখা হয়ে তর্ক করত জোনাকি। করবে না-ই বা কেন? তারাশঙ্করকে কেউ বলবে “জোতদার জমিদারদের লোক” আর সে চুপ করে থাকবে, তা হয় না। মাঝেমধ্যে তো রবীন্দ্রনাথকেও উড়িয়ে দিত ঝোটন। গা পিত্তি জ্বলে যেত জোনাকির। তারপর হল কি, মাসির জন্যে ঝোটনের আনা বইগুলো কেড়ে নিয়ে আগে সে-ই পড়তে শুরু করল। আর পছন্দ অপছন্দগুলো কেমন গুলিয়ে যেতে শুরু করল।

লাইব্রেরি থেকে উত্তরমুখো মিনিট পাঁচেক হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই জোনাকিদের বাড়ি। তবু বকবক করতে করতে সন্ধ্যে হয়ে গেলে মাসি কিছুতেই ওকে একা ছাড়ত না। ঝোটনকে বলত “একটু পৌঁছে দিয়ে আয় না, বাবা।” আসলে সময়টা ভাল না। বরানগরে তো আরোই ভাল না। মারামারি, খুনখারাপি লেগেই আছে।

ঐ পাঁচ মিনিট হাঁটতে গিয়ে এমন কোন কথা শুরু হয়ে যেত যা বাড়ির দরজায় গিয়ে শেষ হত না। জোনাকির দিদিমা দরজা খুলেই হয়ত বলতেন “ঝোটন একটু বইস্যা যা। বেগুনি করতাছি।” ঝোটনকে টানত বেগুনি আর জোনাকিকে টানত ঝোটনের কথা। আরো ঘন্টাখানেক চলত আড্ডা। তার ফলে এমন অনেক বই আসতে শুরু করল জোনাকির হাতে যেগুলোর খবর লাইব্রেরিয়ান মাসিও পেত না। ঝোটন হয়ত নিয়ে এল লেনিনের ‘হোয়াট ইজ টু বি ডান’, এডগার স্নোয়ের লেখা ‘রেড স্টার ওভার চায়না’ আর ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’। মাসির কাছে পৌঁছল শুধু শেষেরটা, বাকি দুটো লাইব্রেরিতে ঢোকার আগেই চালান হয়ে গেল জোনাকির স্কুলফেরত ব্যাগে। ইংরিজি বই পড়ার অভ্যেস ওর ছিল না। কিন্তু ঝোটন বলেছিল “রাশিয়া থেকে বেশকিছু জরুরী বই এখন বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে। কিন্তু সব তো হয়নি। তা বলে কি হাপিত্যেশ করে বসে থাকবি? জীবন খুব ছোট। ইংরিজিতেই পড়ে ফ্যাল।”

এরকম চলেছিল বছর দুয়েক। শেষের দিকে শুধু বই নয়, এক আধ লাইন চিঠিরও আদানপ্রদান হত। জোনাকিই প্রথম জানিয়েছিল তার মুগ্ধতার কথা। জানিয়ে ফেলেছিল বলা উচিৎ।

আসলে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার বেশ কিছু অভিযোগ থাকলেও মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে তাঁর গান গেয়ে উঠত ঝোটন। দু লাইন গেয়েই বলত “আহা! এই গানটা জর্জ বিশ্বাসের গলায় যা লাগে…”। জোনাকি সেরকম গানের একটা তালিকা করেছিল গোপনে। ভেবেছিল ছোটমামার সাথে শ্যামবাজার গিয়ে খুঁজে খুঁজে কিনে আনবে রেকর্ডগুলো। সেই চিরকুটটা রাখা ছিল ঝোটনের পড়তে দেওয়া ‘ইস্পাত’ এর ভেতর। ফেরত দেওয়ার সময় আর মনে নেই। সেই চিরকুট দেখে ছেলে সোজা এসে প্রশ্ন করে “তুই কি আমাকে ভালবাসিস?”

লাইব্রেরি থেকে ফেরার পথে আচমকা এই প্রশ্ন বড় বিপদে ফ্যালে জোনাকিকে। সে আর তাকাতে পারে না ঝোটনদার দিকে। কী উত্তর দেওয়া উচিৎ তা না ভেবে সে ভাবতে থাকে ঝোটন জানতে পারল কী করে এবং এ জন্যে কী শাস্তি তাকে দেবে। কারণ জোনাকির এ নিয়ে কোন সন্দেহই ছিল না যে সে ঝোটনের প্রেমের যোগ্য নয়। ঝোটনের মত অত বড় মন তার নেই। চা বাগানের শ্রমিকের অন্নচিন্তায় রাতের ঘুম ওড়ে না তার। রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে চীনের পার্টির কোথায় তফাত তা-ও সে সবে বোঝার চেষ্টা করছে। মুখ নীচু করে নীরবে হাঁটতে হাঁটতে যখন জোনাকির গাল ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে, তখন তার হাতে চিরকুটটা গুঁজে দেয় ঝোটন। দিয়ে বলে “ছেলেমানুষী করিস না।”

বটেই তো। ছেলেমানুষী ছাড়া আর কী? জোনাকি সেদিন ভেবেছিল ঝোটনের সাথে সম্পর্ক বুঝি ঘুচে গেল। কিন্তু পরদিন স্কুল থেকে লাইব্রেরির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্যাখে নেতাজি ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে সে। ইদানীং আর আগের মত অত ঘন ঘন লাইব্রেরিতে যায় না ঝোটন। পরপর দুদিন তো নয়ই। তবু আজ দাঁড়িয়ে! জোনাকি ভেবে পায়নি কোন দিক দিয়ে পালাবে। পা দুটো পাথর হয়ে যাওয়ার যোগাড়। বোধহয় বুঝতে পেরেই ঝোটন এগিয়ে এসে তার হাতে ধরিয়ে দেয় একটা বই, বলে “এবার এটা পড়ে ফ্যাল।” কী বই সেটা দেখার আগেই জোনাকির চোখে পড়ে পেজ মার্কের মত বেরিয়ে রয়েছে একটা লাইন টানা কাগজ। “লাইব্রেরি যাবি তো?” বলেই উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ওর সাথে হাঁটতে শুরু করে ঝোটন। অস্ফূটে বলতে শুরু করে “ভেতরে একটা চিঠি আছে। পরে পড়িস। জানি তুই ভুল বুঝেছিস। সবটা বোঝানোর জন্য লিখতে হল। বলে বোঝানো শক্ত। তাছাড়া তোর সাথে আলাদাভাবে কথা বলার সুযোগ পাই কতটুকু?”

সেই চিঠিটা জোনাকির কাছে বহুকাল ছিল। বিয়ের কয়েকদিন আগে ওর আলমারি গোছাতে গিয়ে খুঁজে পেয়ে বউদি ফেলে না দিলে আরো অনেকদিন থাকত। চিঠিতে ঝোটন লিখেছিল তারও জোনাকিকে ভাল লাগে, নইলে তার তখন যা কাজের চাপ তাতে লাইব্রেরি না যেতে পারলেই ভাল হয়। কিন্তু ভালবাসবার তার উপায় নেই। কখন পার্টির কাজে তাকে কোথায় যেতে হয় তার ঠিক নেই। সুতরাং ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখাও সম্ভব নয়। পার্টি আগে, প্রেম পরে। চিঠির শেষ কয়েকটা লাইন পাকা চুলের দশাসই জোনাকিরও দাঁড়িকমাসুদ্ধু মনে আছে।

“বিপ্লবীরা জীবনসঙ্গিনী চায় না, সহযোদ্ধা চায়। তোর মধ্যে সহযোদ্ধা হয়ে ওঠার গুণ আছে। কিন্তু তৈরি হতে সময় লাগবে। তোদের বাড়ির সবাইকে খুব শ্রদ্ধা করি। দিদিমার মত মানুষ হয় না। লেবুকাকা, নবুকাকা, ভুটুজেঠু কমিউনিস্ট না হলেও খুব ভাল মানুষ। তুই ওনাদের চোখের মণি। সেই তুই আমাদের রাস্তায় এলে ওঁরা কি মানতে পারবেন? হয়ত না। একথাটা মনে হলে আবার তোকে এ পথে টানতে মন চায় না। কী জানি কোনটা ঠিক? তবে যদি তুই এ পথে আসিস, জানবি আমি তোর জন্যে আছি। বিপ্লব আসছে। তার জন্যে আমাদের অনেককে মারতে হবে, মরতেও হবে। বিপ্লবের পর যদি বেঁচে থাকি, যদি ঘর বাঁধা হয়, তোকে নিয়েই বাঁধব। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”

এর কিছুদিন পরেই ঝোটন বি এস সি পাশ করে রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে এমএসসি পড়তে শুরু করে। লাইব্রেরিতে আসা আরো কমে যায়। মাঝেমাঝেই সে উধাও হয়ে যেত পাড়া থেকে। কোথায় যেত, কেন যেত সেকথা বাবা-মাকেও বলে যেত না। এ নিয়ে ওর বাবা অনেক চ্যাঁচামেচি করেও কিছু করে উঠতে পারেনি। তবে জোনাকি জানতে পারত সবই। কারণ যাওয়ার আগে পরে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও কোথাও দেখা করে যেত, হাতে দিয়ে যেত একটা চিঠি। তাতেই লেখা থাকত তার সর্বশেষ অন্তর্ধান রহস্য আর প্রেম সম্ভাষণ। জোনাকি তখন জানে ঝোটন সি পি আই (এম-এল) কর্মী। ভাবত শুধু সে-ই জানে।

জোনাকির দাদা শুভময় তখন স্কুলমাস্টার, কলুটোলা স্ট্রিটের মেসে থাকে, সপ্তাহান্তে মামাবাড়ি আসে। মাস্টারির চেয়েও মন দিয়ে রাজনীতি করছে। কলেজজীবন থেকেই সে সাড়া জাগানো ছাত্রনেতা। ৬৪ সালে পার্টি ভাগ হওয়ার সময়ে সে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সবার সঙ্গ ছেড়ে সি পি আইতে থেকে গিয়েছে। এক শনিবার বিকেলে সে বাড়ি ঢুকল গম্ভীর মুখে।

দিদিমার বড় আদরের নাতি। কলেজে ভর্তি হওয়ার পরে যখন স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য মেসে থাকতে শুরু করে, মামাদের চেয়েও বেশি অভিমান করেছিলেন দিদিমা। তখনো মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে তিনি শনিবার বিকেলে একটু ভালমন্দ জলখাবার করতে চেষ্টা করেন “খোকা” আসবে বলে। সেই খোকা সেদিন বাড়িতে ঢুকেই পুলিশি স্বরে জানতে চাইল “জোনাকি কোথায়?”

বৃদ্ধা করুণাময়ী এই স্বর শেষ শুনেছিলেন প্রয়াত স্বামীর গলায়। তিনি গত হয়েছেন বছর তিরিশেক। হতবুদ্ধি হয়ে করুণাময়ী বলেন “আসে নাই এখনো কলেজ থিকা। আইস্যা পড়ব। সময় হয় নাই। লুচিটা কি এখন ভাজুম নাকি মনা আইলে?”

“লুচি টুচি পরে হবে। আপনি ঘরে আসুন। কথা আছে।”

এরপর করুণাময়ীকে শুভময় বোঝায় যে ঝোটন হল নকশাল। সেই নকশাল যারা শিক্ষক অধ্যাপকদের নামে হুলিয়া জারী করেছে, কলেজ স্কোয়ারে বিদ্যাসাগরের মূর্তির মাথা কেটেছে, যাদের রাজনীতি হল খতম করার রাজনীতি। এই ছেলের সাথে জোনাকিকে মিশতে দেওয়া মানে ওর সর্বনাশ করা। এতসব বুঝিয়ে শুভময় শেষে বলে “আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, আপনি কী করে এটা অ্যালাউ করছেন? আপনি তো আর পাঁচজনের মত নন, দিদিমা! আমি এ বাড়িতে বড় হয়েছি। আমি তো জানি আপনি রোজ কাগজ পড়েন, রেডিওতে খবর শোনেন। আপনি বুঝতে পারছেন না জোনাকি কত বড় ফাঁদে পা দিচ্ছে?”

করুণাময়ী সবটা চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন “তুমি ঝোটনরে চেনো? চেনো না। এই পাড়ায় একখান লোক নাই যার ও কোন উবগার করে নাই। কি তাজা পোলাডা… আর অর থিকা মনার কোন ক্ষতি হইব না।”

“ক্ষতি হবে না? কী করে জানলেন?”

“তুমি বাপ হও, তুমিও বুঝবা। তুমি এবাড়ি আইছো দশ বচ্ছর বয়সে। তোমার বোনের তখন ছয় মাস বয়স। আমি অর দিদিমা নই, মা। ও কারে ভালবাসে, কে অরে ভালবাসে হেইডা আমি অন্ধ হয়া গ্যালেও বুইঝ্যা ফ্যালামু। আমারে শিখায়ো না।”

শুভময় ভেবে পায় না এরপর কী বলা উচিৎ। ভালবাসে! ঝোটন বলে ছেলেটা জোনাকিকে ভালবাসে! উত্তর কলকাতার নকশালদের কুখ্যাত নেতা অনুপম মিত্র তার বোনের প্রেমিক! মাথার উপর ছাদ ভেঙে পড়ল না কেন? এ যে কত বড় বিপদ, শুভময়ের কত বড় অপমান তা দিদিমাকে কী করে বোঝায় সে? দিদিমা জানে ওরা কতজনকে ইতিমধ্যেই মেরেছে? আরো কতজনকে মেরে ফেলতে চায়? এসব ভাবতে ভাবতেই দিদিমা আরো বলেন “আর খতম টতম কি কইতাছিলা? অরা মারতাছে ঠিকই কিন্তু অরাও যে মরতাছে হেইডা তো কইলা না?”

“খুনোখুনির রাজনীতিতে তো এটাই হয়, দিদিমা।”

“খুনোখুনি ভাল না ঠিকই। আমি তো ঝোটনরে কই। ও আমার মুখে মুখে কথা কয় না। কিন্তু তুমি আমারে কও তো, তোমরাও তো কমুনিষ্ট। তোমাগো বইপত্তরে ল্যাখা নাই যে দরকারে রক্তপাত করত অইব? এই পোলাগুলান তো ঐসবই পড়ছে। তোমরাই তো পড়তে শিখাইছ। শেখাও নাই?”

“হ্যাঁ রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের কথা আছে বটে। কিন্তু দিদিমা আমাদের পার্টি কিন্তু অনেকদিন আগেই বলেছে এদেশে তার দরকার নেই। যে যে কারণে পার্টি ভেঙে সি পি এম হল তার মধ্যে এটা একটা। ঝোটনদের দল তো আবার আরো চরমপন্থী।”

“সে তো মনীষীদের কথা যে যেমন বুঝে। তোমরা এক বুঝছো, ঝোটনরা আর এক বুঝছে। কে ঠিক হেইডা ঠিক করনের আমি কে? ঠিক করব ইতিহাস।”

“তার মানে? এই যে ওরা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে, মাস্টারমশাইদের খুন করছে এসব ঠিক?”

“না। এগুলা নিশ্চয় ভুল। কিন্তু পালটা মাইরা অরা যে ভুল করতাছে হেইডা বোঝান যাইব না। আর খিদা প্যাটে আমার বাড়ি আইলে আমি যদি তাড়ায়ে দি, তাইলেও বোঝান যাইব না।”

শুভময় ভীষণ রেগে আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, করুণাময়ী হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বললেন “আমি বাইচ্যা থাকতে তোমার বোনেরে ঘর থিকা কেউ তুইলা নিয়া যাইতে পারব না। তোমার বিশ্বাস না থাকে বোনেরে নিয়া যাও, আমি কিছু কমু না।”

বাপ-মা মরা দুই ভাইবোনকে যিনি মানুষ করেছেন সেই দিদিমাকে এরপর আর কিছু বলা যায় না। সত্যিই তো। বরানগরে নকশালদের যতই বাড়বাড়ন্ত হোক, করুণাময়ীর ছায়ার চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় পৃথিবীর কোথাও নেই। জোনাকির জন্যে তো নেইই, শুভময়ের জন্যেও নেই — একথা শুভময় জানত। ভুলে গিয়েছিল। আসলে বরানগরের এক সি পি এম বন্ধু ওকে আওয়াজ দিয়েছিল “তুই শালা সংশোধনবাদী সি পি আই আর তোর বোন একেবারে নকশাল! এটা কিরকম হল, শুভ?” ও যে কিছুই জানে না এটা সে প্রথমে বিশ্বাসই করেনি। তারপরে খুলে বলল যে সি পি এমের সম্ভাবনাময় ছাত্রনেতা, যে সি পি আই (এম-এল) হয়ে যাওয়ায় অনেক নেতা দুঃখ করেছেন, তার সঙ্গে জোনাকিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেছে। শুভময়ের মামাবাড়িতেও তার আনাগোনা আছে বলে খবর। শুনে আর মাথার ঠিক ছিল না।

সত্যি কথা বলতে এই নিয়ে জোনাকির বড়মামা, মানে ঝোটনের ভুটুজেঠু, কিছুদিন আগেই মায়ের কাছে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ঝোটন যে আর আগের ঝোটন নেই, তার যে লেখাপড়ার চেয়ে রাজনীতিতে ইদানীং মন বেশি, সেকথা বলেছিলেন। কিন্তু ও বাড়িতে করুণাময়ীর সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তাই সব যেমন চলার তেমনই চলতে থাকে, এসব আলোচনা জোনাকির কানে পৌঁছায় না।

পরিস্থিতি তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। শুভময়ের সাথে করুণাময়ীর এই কথোপকথনের কদিন পরে ঝোটন বলে কয়েই বাড়ি ছেড়ে চলে যায় এক সন্ধ্যাবেলা। যাওয়ার পথে করুণাময়ীকে প্রণাম করতে আসে। পায়ের ধুলো নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে “রাতবিরেতে জ্বালাতে আসব কিন্তু, দিদিমা। বাড়ি গেলে বিপদ। আমার মা আপনার মত সাহসী নয় তো।”

করুণাময়ী ওর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা কামড় দিয়ে, মাথায় থুতু ছিটিয়ে বলেন “আসবা, বাবা। একশো বার আসবা। সাবধানে থাইকো। মানুষের ভাল কইরো।”

জোনাকি জল ভরা চোখ নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে ঝোটন বলে “আসব রে। মন খারাপ করিস না। চলি।” জোনাকির দিদিমা বলেন “যাওন নাই, আসো গিয়া।” কাঁধে শান্তিনিকেতনী ঝোলা নিয়ে নিকষ কালো চেহারার ঝোটন অন্ধকারে মিশে যায়।

সে কথা রেখেছিল। জোনাকিদের বাড়ির পিছনে বেশ বড় একটা বাগান। ওর ছোটমামার সাধের বাগান। তারপরই খেলার মাঠ। বল উড়ে এসে বাগানের বারোটা বাজাবে বলে আগের শীতেই উঁচু পাঁচিল দেওয়া হয়েছে। সেই পাঁচিল টপকে প্রায় মাঝরাতে হঠাৎ কোন কোন দিন এসে পড়ত ঝোটন। জোনাকি ভাবত ধুপ করে পড়ার শব্দটা শুধু ওর কানেই গেছে। কিন্তু ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়েই দেখত ততক্ষণে দিদিমা বাগানের দরজায় পৌঁছে গেছে। একটু রাগই হত তখন। আহা! যেন ঝোটন তার কাছে নয়, ঐ বাহাত্তুরে বুড়ির অভিসারেই আসে।

ইশারায় ওকে জোনাকির ঘরে বসাতে বলে করুণাময়ী চলে যেতেন রান্নাঘরে। কে জানে কী করে নিঃশব্দে, তাঁর ঘুমন্ত ছেলে, বউদের টেরটিও না পেতে দিয়ে রেঁধে ফেলতেন এক থালা ভাত আর আলু কি কুমড়ো সেদ্ধ। ঘরের মাটিতে আসন পেতে দিয়ে থালার একপাশে দিতেন দুটো কাঁচালঙ্কা। ঝোটন যখন ক্ষুধার্ত নেড়ি কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়ত থালাটার উপর, তখন মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন “খা, মণি। আর তো কিছু নাই। খিদা দিয়া খা।” কখনো সখনো ক্ষিদে দিয়ে খাওয়ার জন্য তার দু একজন কমরেডকেও সঙ্গে আনত ঝোটন। খাওয়া শেষ করে একটু জিরিয়ে নিয়ে, রাত থাকতেই পাঁচিল টপকে মিশে যেত অন্ধকারে।

এক মাস, দু মাস অন্তর কয়েক মিনিটের এইটুকু দেখা সম্বল করে আর সেই চিঠিগুলো উল্টে পাল্টে বারবার পড়ে অনেকদিন বেঁচে ছিল জোনাকির প্রেম। তারপর একদিন রাত দশটা নাগাদ সদর দরজায় কড়া নাড়ল পুলিশ। ও পাড়ায় পুলিশ আসা তখন সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে। পুলিশ আসবে, কোন ছেলের খোঁজে তার বাড়িতে চোটপাট করবে, তারপর খুঁজে না পেয়ে তার বাবা-মাকে গালিগালাজ করে, কখনো বা চড় থাপ্পড় মেরে চলে যাবে — এই ছিল রুটিন। কিন্তু সেদিন অব্দি জোনাকিদের বাড়িতে কোনদিন পুলিশ আসেনি। ও বাড়িতে কোন জোয়ান ছেলে নেই, জোনাকির মামারা কেউ কখনো কোন পার্টি করেননি। পুলিশ আসবেই বা কেন? তাই দরজা খুলে পুলিশ দেখে মেজমামা থ। দারোগা জানালেন সার্চ ওয়ারেন্ট আছে। তাছাড়া জিজ্ঞাসাবাদেরও ব্যাপার আছে। এই বাড়িতে নকশালদের যাতায়াত আছে বলে অভিযোগ।

সেই প্রথম জোনাকি ভয় পেয়েছিল। ঝোটনকে সে চেনে পাড়ার ছেলে হিসাবে কিন্তু বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে আর দ্যাখেনি, কিছু জানেও না — এইটুকু মিথ্যে বলতেই তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মেজমামা লালবাজারে ক্লার্কের চাকরি করেন বলেই যে পুলিশ তাকে সহজে বিশ্বাস করে নিল এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আরো বেশি ভয় হয়েছিল তল্লাশি চালিয়ে কী পাওয়া যাবে তা ভেবে। পড়ার টেবিলের ড্রয়ারেই পরপর সাজিয়ে রাখা ছিল ঝোটনের চিঠিগুলো। আর বইয়ের তাকে ওর উপহার দেওয়া বেশকিছু বই — গোর্কি, মায়াকভস্কি, তলস্তয়, মাও সে তুং, চে। কিন্তু তল্লাসীর সময় জোনাকি অবাক হয়ে দেখল চিঠিগুলো হাওয়া আর তাক জুড়ে রয়েছে গীতা, কথামৃত, স্বামি শিষ্য সংবাদ, স্বামীজিকে যেমন দেখিয়াছি। এই বইগুলো জোনাকিরই বটে কিন্তু বছর তিনেক ধরে ওগুলোতে হাত পড়েনি, আগামীদিনেও পড়বে না ভেবে সে চালান করে দিয়েছিল সিঁড়ির নীচে পুরনো কাগজের জায়গায়। কী করে সেখান থেকে কয়েক মিনিটের নোটিশে বইয়ের তাকে উঠে এল সে খবর রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ জানেন না, যাঁর জানার কেবল তিনিই জানতেন। পুলিশ সে যাত্রায় “মেয়ে কার সঙ্গে মিশছে না মিশছে একটু খেয়াল রাখবেন তো। দিনকাল কেমন জানেন না?” বলে মৃদু ধমক দিয়ে চলে গিয়েছিল।

এরপর ঘন্টা খানেক করুণাময়ীর তিন ছেলে জীবনে প্রথম এবং শেষবার তাঁর উপরে যারপরনাই চেঁচামেচি করেন। “তোমার প্রশ্রয়েই এরকম হয়েছে” ইত্যাদি। পুত্রবধূদের মধ্যে একমাত্র বড়টিই একটু বলিয়ে কইয়ে। সে শাশুড়ি এবং ভাগ্নীর পক্ষ নিয়ে শুনিয়ে দেয় “তোমরা তিন ভাই এক কাজ করো। চাকরি বাকরি ছেড়ে বাড়ি পাহারা দাও। ঐ তো পুলিশ। তাজা ছেলে দেখলেই নকশাল, সি পি এম আরো যা যা ইচ্ছে বলে ধরে নিয়ে যায়, ছেলেকে না পেলে বাপের গায়ে হাত তোলে। তারা কী বলে গেছে তাই নিয়ে বাড়ি মাথায় করছ। আমরা সারাদিন বাড়িতে থাকি। ঝোটন এখনো যদি আসা যাওয়া করত আমরা দেখতে পেতাম না? বলাই তো হল আগে আসত। তখন তো তোমরাও দেখেছ। কিছু তো বলোনি? আদিখ্যেতা! পুলিশ যেন ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির।”

জোনাকির বড়মামা বিড়বিড় করে বলতে থাকেন “জানি জানি। ঝোটন কি আর খারাপ ছেলে? সোনার টুকরো ছেলে। কিন্তু… সময়। আর সঙ্গ। সে জন্যেই আমাদের মেয়েটাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা। ছেলেটার বাপ-মায়ের কি অবস্থা! আহা রে!”

এই নিয়ে আর বেশিদিন দুশ্চিন্তা করতে হয়নি। বিপ্লব যে সফল হবে না সেটা বোঝা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। চতুর্দিক থেকে আসছিল নকশালদের ধরা পড়ার আর খুন হওয়ার খবর। একটা করে খবর শোনা যেত আর মিত্র বাড়ির দুই বুড়ো বুড়ির মত চক্রবর্তী বাড়ির এক বুড়িও ঠাকুরের ছবির সামনে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। জোনাকির অকারণ প্রত্যয় ছিল — ঝোটনদার কিচ্ছু হবে না। তাই তার উদ্বেগ হত না এসবে। তারপর এক রাতে গোটা বরানগর চলে গেল মনুষ্যেতর প্রাণীদের দখলে। সব দরজা জানালা বন্ধ করেও এড়ানো গেল না তাদের উল্লাসের শব্দ, থাবার নীচে পড়া মানুষের আর্তনাদ। জোনাকি জানত ঝোটন এলাকায় নেই কিন্তু তার বাবা-মাকে ওরা ছাড়বে না। তাই সে বারবার ছুটে যেতে চাইছিল ওঁদের কাছে। কি আসুরিক শক্তি তখন ঐ রোগাপটকা  মেয়ের! তিন মামা, তিন মামী আর দিদিমা মিলে আটকে রাখছিল তাকে আর মুখ চেপে ধরে আটকাচ্ছিল চিৎকার। ইতররা চিৎকারে রক্তের গন্ধ পায়। চাইলে দেয়াল ফুঁড়ে ঢুকে পড়তে পারে ঘরে।

পরদিন বেলার দিকে জোনাকির মেজমামা আর ছোটমামা খোঁজ নিতে যান ঝোটনদের বাড়িতে। তেমন কিছু হয়নি ওঁদের। ওর বাবার একটা হাত আর একটা পা ভেঙে দিয়ে গেছে বীরের দল, মায়ের একগাছা চুল ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আর কী নিয়ে গেছে সেকথা বলার অবস্থায় উনি নেই তখন। জোনাকির মামারা যখন ওঁদের হাসপাতালে নিয়ে যায় তখনো রাস্তাতেই পড়েছিল বহু মৃতদেহ — গোটা, কাটা, চিহ্নিত, অচিহ্নিত।

দিন দশেক পরেই থানায় ডাক পড়ে ঝোটনের বাবার। পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলেছিল কোথায় যেন, এবং ধরা দিতে বলেছিল। কথা শোনেনি, দৌড়ে পালাতে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে গুলি চালাতে হয়। ভদ্রলোককে ডাকা হয়েছিল শনাক্ত করে দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্যে। উনি বাড়ি ফেরার পথে চক্রবর্তীদের বাড়ি আসেন এবং জোনাকির মাথায় হাত রেখে বলে যান “আমি বডি দেখতে গেলাম না রে, মা। ওরা যা পারে করুক। আমি জানি ওটা আমার ছেলের বডি না। আমার ছেলে জীবনে কখনো পালায়নি। কত মার মেরেছি। কখনো পালায়নি। সে পিঠে গুলি খেয়ে মরতে পারে না।”

সারা বিকেল একা একা চেয়ারে বসে সেই কথাগুলো মনে পড়ে জোনাকির। তার কাছের মানুষরা কেউ পালাতে শিখল না।

*এই উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা ও চরিত্র কাল্পনিক। কোন সত্যি ঘটনা বা জীবিত/মৃত ব্যক্তির সাথে মিল পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। কিছু বাস্তব চরিত্রের নাম এসেছে কেবল সময়কাল বোঝাতে

ভাল লাগলে টাকা পাঠাতে পারেন:

Google Pay / Paytm / BHIM বা অন্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে journopratik@okhdfcbank কে

অথবা

 

নেট ব্যাঙ্কিং বা অন্য উপায়ে নিম্নলিখিত অ্যাকাউন্টে

 

Pratik Bandyopadhyay
A/c No. 14041140002343
HDFC Bank
Branch: South Calcutta Girls’ College
IFS Code: HDFC0001404
MICR Code: 700240048

 

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply