নতুন করে পাব বলে

20200508_164038-COLLAGE.jpg

প্রিয় কবি,

আপনার সাথে আমার সংলাপে বিপত্তির অন্ত নেই। এক দিকে খবরদারি, অন্য দিকে দেখনদারি। আপনাকে নিজের করে পাবার জো নেই।

এক দল টিকি নেড়ে বলবে “রবীন্দ্রনাথকে যেখানে সেখানে যেভাবে ইচ্ছে টেনে নিয়ে বসিয়ে দিলেই হল? নিয়ম কানুন নেই? আজ প্রত্যুষে শুকতারাটি অমুক কোণে স্থির হয়ে ছিল কি? না হয়ে থাকলে কোন আক্কেলে গুনগুনিয়ে ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও’ গাইছিলে? বলি ভোরের বেলার তারা তুমি পেলে কোথায়?”

আবার বিপক্ষ দল বলবে “কিসব ন্যাকা ন্যাকা ব্যাপার! রবীন্দ্রনাথ কারো বাপের সম্পত্তি নাকি? রবীন্দ্রনাথকে বুকে রেখেচি। বুকে। শালা হৃদয় আমার নাচে রে, পাগল কুত্তার মত নাচে রে।”
প্রথম দলের মত আসলে এরাও মনে করে আপনি এদের পৈতৃক সম্পত্তি। আপনার লেখা নিয়ে যা ইচ্ছে করলেই হল। অন্য কারো লেখা চটকালে তো সহজে বিখ্যাত হওয়া যায় না।

আমাকে তাই বারবার আপনাকে নিয়ে পালাতে হয়। কোলাহল বারণ হলে মন্দ হয় না, আপনার আমার কথা কানে কানে হওয়াই ভাল। গত পঁচিশে বৈশাখের পর থেকে আজ অব্দি যা যা হয়েছে, তাতে আপনার সাথে কিছু নতুন সংলাপের প্রয়োজন হয়েছে। সে কথাই বলি।

কহো মোরে তুমি কে গো মাতঃ!

মহাসঙ্কট উপস্থিত। দেশের রাজার (হ্যাঁ, রাজাই। স্বাধীনতার এত বছর পরে দেশটা একেবারে যক্ষপুরী হয়ে উঠেছে। সে কথায় পরে আসছি) আদেশ, দেশকে মা বলে ভাবতে হবে। কেবল ভাবলে হবে না, আবার চিৎকার করে ডাকতেও হবে। যারা ছাগল ছানাদের মত দিবারাত্র গলা ছেড়ে ডাকবে না, তাদের দেশের শত্রু দেগে দেওয়া হয়েছে। গারদে ভরার ব্যবস্থাও হয়েছে। দেশকে মা বলে ডাকতে হুকুম হয়েছে, এদিকে দেশের লোককে সন্তান ভাবার হুকুম হল না। তারা কেবল প্রজা। রাজা হুকুম করবেন, তারা তামিল করবে। অন্যথা হলেই রাজার পাইক, বরকন্দাজ লাঠিপেটা করবে, গারদে ভরবে। আবার সকলে প্রজা নয়, কেউ কেউ প্রজা। রাজা যাকে প্রজা বলবেন, কেবল সে-ই প্রজা। বাকি সব অনুপ্রবেশকারী শয়তান।

তা দেশ মানে কী? দেশ মানে কে? আপনাকে সে প্রশ্ন করতে গিয়ে কোন মায়ের ছবি তো পেলাম না। পেলাম কেবল মানুষ। ক্লাসঘরে আর ঠাকুরঘরে আপনাকে দেখতে অভ্যস্ত চোখে দেখলাম আমার সাথে প্রতিবাদ মিছিলে। যে মহামানবের সাগরতীর বলে ভারতকে চিনিয়েছেন, দেখলাম সেই মানবসাগরই আপনাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। আপনার বিশ্বভারতী অভ্রভেদী দেবালয় হয়ে গেছে অনেকদিন, তা থেকে আপনার বিগ্রহটুকুও উধাও করে দেওয়া হবে অদূর ভবিষ্যতে। তাতে অবশ্য কিছু এসে যায় না। শিবরাম কবেই সাবধান করেছিলেন, “সঙ্ঘ মানেই সাংঘাতিক।” চুলোয় যাক সেই সঙ্ঘ, তার সাথে আর যত সঙ্ঘ আছে। আপনি তো আমাদেরই লোক। আমরা আমাদের মত করে পেলেই হল। কিন্তু গোলমালের এখানেই শেষ নয়।

দেশকে দিনরাত মা বলে প্রণাম ঠুকতে হবে, অথচ মায়েদের জন্য দেশটা বড় শক্ত ঠাঁই হয়ে উঠেছে। যারা প্রজা হয়ে থাকতে রাজি নয়, যারা আপনার গান শুনে বা না শুনে দাবী করেছে আমরা সবাই রাজা, তাদের মধ্যে মায়েরা বড় কম ছিলেন না। সেই মায়েদের উপর রাজার আঘাত নেমে এসেছে। সাতাশ বছরের সফুরা জারগরের সন্তানের জন্মের প্রথম ক্ষণ শুভ হবে না, হতে দেওয়া হবে না। কারাগারের অন্ধকূপে তাকে মা হতে হবে রাজার আদেশে। পুরাণকে ইতিহাস বলে গেলানো কংস রাজার অনুগত অসুরকুল অবশ্য তাতেও খুশি নয়। তারা প্রশ্ন তুলেছে সফুরা কি বিবাহিতা, নাকি সফুরা কুমারী? মুসলমানবিদ্বেষী, বিকৃত কামনায় হিলহিলে অসুরকুল মায়ের অগ্নিপরীক্ষা চায়। সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে।

সফুরা কুন্তীর মত কুমারী না হলেও তার সন্তান যেন কর্ণের মতই পাণ্ডব বর্জিত হয় তা নিশ্চিত করতে রাজা রাতে মাত্র চার ঘন্টা ঘুমিয়ে নতুন ভারত গড়েছেন। এ ভারতে সংখ্যালঘুকে গর্ভে থাকতেই নিষ্ফলের, হতাশের দলে ঠেলে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কবি, এ দেশে কি আর কেউ অনাথ বিধর্মী শিশুকে নিজের সন্তান বলে মানবে? আর কি কোন সন্তান বলবে “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকল জাতই আমার জাত, সকলের অন্নই আমার অন্ন”?
আপনি কি পিছিয়ে পড়লেন, কবি?

৪৭ফ, ৬৯ঙ

“একদিনের পর দুদিন, দুদিনের পর তিনদিন; সুড়ঙ্গ কেটেই চলেছি, এক হাতের পর দু হাত, দু হাতের পর তিন হাত। তাল তাল সোনা তুলে আনছি, এক তালের পর দু তাল, দু তালের পর তিন তাল। যক্ষপুরে অঙ্কের পর অঙ্ক সার বেঁধে চলেছে, কোন অর্থে পৌঁছয় না। তাই ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা।”

আমাদের কালের কথাই লিখেছেন আপনি। এতখানি বয়সে এসে এই উপলব্ধি হল। যক্ষপুরীর কথা বলছিলাম। শুধু দেশটা কেন? গোটা পৃথিবীটাই যে রক্তকরবীর যক্ষপুরীতে পরিণত। নবীন কোরোনাভাইরাস এসে কদিন খনির দরজা এঁটে দিয়েছে৷ তাই এ কদিনের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ৪৭ফ আর ৬৯ঙ দের এবার মুখের রক্ত তুলে মরতে হবে। যক্ষপুরীর কবলের মধ্যে ঢুকলে তার হাঁ বন্ধ হয়ে যায়, এখন তার জঠরের মধ্যে যাবার একটি পথ ছাড়া আর পথ নেই। তাই বিল্ডারদের সাথে মিটিং করে সরকার রেলকে বলে “এদের বাড়ি যাবার ট্রেন বাতিল করো হে।” যদিও বিস্তর চেঁচামেচি হওয়ায় ঢোঁক গিলে বলতে হয়েছে “আচ্ছা বাতিল করতে হবে না। এরা যাবেখন।”
কেবল ঠেলে খনির গভীরে পাঠানো তো নয়, আরেক রকম ব্যবস্থাও আছে। বিশেষত আমাদের মত পুঁথি পড়ে চোখ খোয়াতে বসা, সর্দারদের চর বিশু পাগলদের জন্য। চাকরি থেকে ছুটি। ওরা বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছে, কেমনে দিই ফাঁকি?

উত্তর খুঁজছি, পাচ্ছি না। রচনাবলী, গীতবিতান, ছিন্নপত্রাবলী, ইংরেজি বক্তৃতামালা — সর্বত্র খুঁজছি। খুঁজতে খুঁজতে আপনার উপর বেজায় রেগে যাচ্ছি কখনো, কখনো আনন্দে কাঁদছি, আত্মগ্লানিতে হাসছি, বিষাদে চুপ করে থাকছি। সংলাপ চলছে, চলবে। আপনাকে এ জানা আমার ফুরাবে না।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply