ম্যাজিক দেখার গল্প

ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি ছিলাম গল্পের পোকা। আর আমার বন্ধু রাজু দারুণ গল্প বলতে পারত। কোন ক্লাসে মাস্টারমশাই না এলেই আমরা রাজুকে ঘিরে বসতাম। ও হাত পা নেড়ে, গলা টলা বদলে এমন করে গল্প বলত যে মনে হত এক বর্ণও মিথ্যে নয়। ভূতের গল্প হলে আমাদের গায়ে কাঁটা দিত, আর মজার গল্প হলে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যেত। একবার তো রাজুর গল্পের কথা মনে পড়ে অঙ্ক স্যারের ক্লাসে অকারণে হেসে ফেলে আমাকে সারা ক্লাস বারান্দায় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল।

তা সেই রাজু একবার আমাকে চুপিচুপি একটা গল্প বলেছিল যা শুনে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি ওটা আনন্দের গল্প, না দুঃখের গল্প। অবশ্য রাজু বলেছিল ওটা নাকি সত্যি ঘটনা। তাই তিন সত্যি করিয়ে নিয়েছিল বন্ধুদের কাউকে বলা চলবে না। বললে নাকি ওরা হাসাহাসি করবে! আমি কাউকে বলিনি, তবে ওসব সত্যি বলে বিশ্বাসও করিনি। কারণ ও তো দাবী করত ওর বলা সব গল্পই সত্যি। গল্পটা তোমাদের বলছি। তোমরাই বুঝে দ্যাখো সত্যি কিনা।

তখন আমাদের সবুজগ্রামে কোন বড় হল ছিল না। নাচ, গান, নাটকের সব বড় বড় অনুষ্ঠান হত আমাদের স্কুলের বিরাট মাঠে স্টেজ বানিয়ে। তা সেই মাঠে একবার এত বড় স্টেজ হল যে আমরা তো আমরা, স্যারেরাও বললেন সবুজগ্রামে এত বড় স্টেজ তাঁরা দ্যাখেননি।

“জাদুসম্রাট পি সি সরকারের ইন্দ্রজাল। দর্শকদের দাবিতে আরও এক সপ্তাহ। স্হান সবুজগ্রাম বিদ্যাভবনের খেলার মাঠ। প্রতিদিন দুটি শো। চার ও সাত ঘটিকায়। টিকিটের দাম একশো, দুশো ও চারশো টাকা। সভ্যপত্র সংগ্রহ করতে হলে এগিয়ে আসুন আমাদের প্রচার গাড়ির দিকে। এছাড়াও সভ্যপত্র পাওয়া যাচ্ছে…”

ঘোষণাটা রোজই রাজুর কানে আসত। বন্ধুরা অনেকেই দেখে ফেলেছে। শুনলে আশ্চর্য লাগে। কি করে যে কী করে লোকটা! রোজ রাতে ঘুম আসার আগে পর্যন্ত এটাই ভাবত সে।

ওর বাবাকে অবশ্য রাজু বুঝতে দেয়নি। বাবার সামনে ইচ্ছে করেই স্কুলে যা যা শুনেছে সেসব আলোচনা করেনি। আলাদা করে বোন টুপুরকে বলেছে। আমাদের ক্লাসের অনেকেই দেখে এসেছিল কিন্তু অনির্বাণের মত গুছিয়ে আর কেউ বলতে পারেনি। রাজু বাড়ি গিয়ে টুপুরকে অনির্বাণের মত করেই বলার চেষ্টা করত। টুপুর চোখ বড় বড় করে শুনত। একদিন বলে বসল “চল না, আমরা একদিন দেখে আসি?”

রাজু সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখ চাপা দেয়।

“চুপ কর, চুপ কর।”

“কেন?”

“মা শুনতে পেয়ে যাবে।”

“বকবে?”

“বকবে না। দুঃখ পাবে। টিকিটের অনেক দাম। ও আমাদের দেখা হবে না।”

“বাবাকে বল না।”

“এ রাম!” টুপুরের উপর একটু রাগই হয়েছিল রাজুর। “তুই কি পাগল? বাবা আরও কষ্ট পাবে।”

টুপুর দমে গিয়ে চুপচাপ যেমন ছবি আঁকছিল তেমন আঁকতে লাগল। তখন আবার ওর জন্যে কষ্ট হয় রাজুর। ঐটুকু মেয়ে কী করেই বা বুঝবে! রাজু তো জানত প্রতি মাসে ধার শোধ করতেই বাবার অর্ধেক মাইনে চলে যায়। তার উপর আবার রাজু দু জায়গায় প্রাইভেট পড়তে যেত। এত করেও যখন অঙ্কে কিছুতেই চল্লিশের বেশি নম্বর পেত না, তখন লজ্জায় বাবার দিকে তাকাতে পারত না ও। তাই জন্যে এবার বছরের শুরুতেই বাবাকে বলেছিল ইংরিজির স্যারকে ছাড়িয়ে দিতে। অঙ্কে আতঙ্ক থাকলেও আমাদের রাজু ইংরিজিতে ছিল দারুণ। ফার্স্ট বয় ঋক পর্যন্ত ইংরিজিতে রাজুকে সমঝে চলত। রাজুর বাবাও জানতেন সে কথা। তবু বলেছিলেন “বাবা, তোর বাপের এখনো এমন অবস্থা হয়নি যে মাস্টার ছাড়িয়ে দিতে হবে। তুই এরকম বললে আমার বড় কষ্ট হয় রে। এসব বলিস না।”

পরদিন অবাক কাণ্ড। বাবা খেতে বসে রাজুর মাকে বললেন “বেলা, পি সি সরকারের ম্যাজিকটা এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে। সবাই মিলে তো যাওয়া সম্ভব না। ছেলেমেয়ে দেখে আসুক?”

“হ্যাঁ। আমিও তাই ভাবছিলাম। পাড়ার অনেক বাচ্চাই তো দেখে নিল। রাজু তো এখন বোনকে নিয়ে একাই যেতে পারে।”

“না না। অনেক টাকার টিকিট। দরকার নেই” বলে রাজু শুরুতেই আলোচনাটা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।

“দেব টাকা। ভাবছিস কেন?” বাবা তখন আশ্বাস দেন। “শুধু এ মাসে মাংস খাওয়াটা হবে না।”

“কী দরকার? টুপুর কবে থেকে মাংস খেতে চাইছে…”

“না না, মাংস খাব না। ম্যাজিক দেখব,” টুপুর সাত তাড়াতাড়ি বলে ফেলেছে।

তো শেষ অব্দি যাওয়াই ঠিক হল। রাজু তো একেবারেই আশা করেনি পি সি সরকারের ম্যাজিক দেখা হবে। বাবা কি দারুণ বুদ্ধিটা বার করেছেন ভেবে রাজুর অবাক লেগেছিল। আগের মাসে মাংস খাওয়া হয়নি, না হয় সে মাসেও হল না। মাংস তো পরেও খাওয়া যাবে, পি সি সরকার তো আর রোজ রোজ সবুজগ্রামে ম্যাজিক দেখাতে আসবেন না।

এইসব ভাবতে গিয়ে হঠাৎ রাজুর মনে হল “আচ্ছা! মা কাল টুপুরের আর আমার কথা শুনতে পায়নি তো? নাহলে হঠাৎ আজ ম্যাজিকের কথা উঠল কেন? ছি ছি! আমাদের খুব দেখার ইচ্ছে জানতে পেরে বাবা হয়ত খুব কষ্ট করে টাকাটা যোগাড় করবে। হয়ত ধার করবে। এক কিলো মাংসের দাম দুশো টাকার চেয়ে কম। শুধু মাংস না খেলেই কি আর ক্ষতিপূরণ হবে?” এসব তো আর বাবাকে জিজ্ঞেস করা যায় না। তাই অপরাধবোধ সত্ত্বেও ম্যাজিক দেখতে যাওয়ায় বাগড়া দেবে না ঠিক করল ও।

পরদিন যাওয়া। বাবা স্কুল থেকে ফিরে টাকা দেবে, রাজু একেবারে হলে গিয়েই টিকিট কেটে নেবে কথা হয়েছে। সকাল থেকে খুব উত্তেজনা। স্কুলে বন্ধুদের বলতেও ভাল লাগল “আজ আমি আর বোন আসছি দেখতে।”

বাবা ফেরার আগেই টুপুর সেজেগুজে তৈরি। সাধারণত যখন ফেরে তখনই বাবা ফিরল, কিন্তু রাজুর মনে হচ্ছিল যেন কত দেরি হচ্ছে।

বাবা ঢুকল কেমন থমথমে মুখে। মনে হল কিছু একটা হয়েছে। মা আগে থেকেই বলে রেখেছিল “ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই ঝাঁপিয়ে পড়বে না। একটু ঠাণ্ডা হয়ে নিতে দিও টাকা চাওয়ার আগে। অনেক সময় আছে।” সেই জন্যেই রাজু আর টুপুর অনেক কষ্টে চুপ করে ছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তর সইছিল না।

বাবা প্রথমে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মা বলল “কি গো! হাত-মুখ ধোও। খেতে দেব তো?” তখন বাবা হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলল। রাজু তখনই বুঝেছিল কিছু একটা হয়েছে। তারপর বাবা, যেন অনেক কষ্টে, ডাকল “টেঁপু মা, আমার কাছে আয়।”

টুপুরকে কোলে বসাল।

“রাজু বাবা, আয়।” রাজু পাশে গিয়ে বসল।
“বাবা শোন। আমি একটা কাজ করে ফেলেছি। তোরা অপরাধ নিস না।”

“কী হয়েছে? তুমি এরকম বলছ কেন?” মা জিজ্ঞেস করল।

“আসলে বেলা, আমাদের স্কুলের একটা মেয়ে… লেখাপড়ায় ভাল না। কিন্তু খেলাধুলোয় এক নম্বর। ও এবার স্টেট অ্যাথলেটিক্সে দৌড়ে তিনটে ইভেন্টে ফার্স্ট হয়েছে। ওরা অনেকগুলো ভাই বোন, বাবা রিকশা চালায়। আজ আমাদের স্কুলে এসেছিল। বলল একজন কোচের ওকে পছন্দ হয়েছে। বলেছে ওকে ন্যাশনাল লেভেলের জন্যে কোচিং করাবে, মাইনে কড়ি কিছু নেবে না। শুধু দৌড়ের জুতোটা কিনে দিতে হবে। এতদিন তো খালি পায়ে দৌড়েছে, আর তাতে হবে না।”

এতটা বলে বাবা ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। টুপুর তখনো বোঝেনি কেন এসব কথা হচ্ছে, মা বুঝেছে বলে মুখ ম্লান হয়ে এসেছে আর রাজু আন্দাজ করলেও জোর করে আশা করছে বাবা অন্য কিছু বলবে।

“ঐ জুতোর তো অনেক দাম,” বাবা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল। “ওর বাবা অত টাকা পাবে কোথায়? তা আমাদের কাছে সাহায্য চাইতে এসেছিল। সকলেই কিছু না কিছু দিল। আমি আজই তোরা ম্যাজিক দেখতে যাবি বলে তিনশোটা টাকা তুলেছিলাম। আর তো আমার কাছে কিছু নেই। তা কী করব? ঐ টাকাটাই দিয়ে দিলাম।”

কথা শেষ করেই তাড়াতাড়ি হাত-পা ধুতে চলে গেল বাবা। মা-ও কিছু না বলে বাবার খাবার আনতে গেল রান্নাঘরে। রাজু দেখল বোনের মুখখানা কাঁদো কাঁদো। “ধুর বোকা। কাঁদিস না। যখন পি সি সরকার কলকাতায় ম্যাজিক দেখাবে, তখন আমরা যাব” বলতে বলতে বোনকে বুকে টেনে নিল। টুপুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে একটু কাঁদল। বেশি না।

চোখ মুছতে মুছতেই বাবা এসে পড়ল, মা এল দুধ রুটি নিয়ে। বাবা বলল “আমার ঠিক ক্ষিদে নেই গো।”

“ধ্যাত। ক্ষিদে নেই কি? সেই কখন ভাত খেয়ে গেছ!” মা রেগে গেল।

রাজু বুঝেছিল কেন বাবার ক্ষিদে নেই। জড়িয়ে ধরে বলেছিল “বাবা, আমি একটুও দুঃখ পাইনি। সত্যি বলছি। আমাদের তো তুমি তাও জুতো কিনে দিতে পারো। ঐ মেয়েটার বাবা তো পারে না।”

রাজুর বাবা তখন ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফ্যালেন। টুপুর অমনি লাফিয়ে কোলে উঠে চোখ মোছাতে মোছাতে বলে “ও বাবা, কাঁদছ কেন? আমিও দুঃখ পাইনি। সত্যি বলছি। আমরা পরে একদিন যাব ম্যাজিক দেখতে।”

তারপর রাজুর বাবা নাকি দুই ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। তিনজনেই কেঁদেছিল। না, চারজনে। রাজুর বাবা কাঁদতে কাঁদতেই ওর মা-কে বলেছিলেন “বেলা, ওরা আমারই ছেলেমেয়ে গো, আমারই।”

শুনে রাজুর মা হেসে ফ্যালেন। “ও আবার কী কথা? তোমার নয় তো কার ছেলেমেয়ে?”
তারপর বলেন “সামনের মাসে যেদিন মাংস আনবে সেদিন ঐ মেয়েটাকে আমাদের সাথে খেতে বলে দিও। অতগুলো মেডেল জিতেছে। ওকে তো একদিন খাওয়ানো উচিৎ।”

অলঙ্করণ: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়

প্রকাশ: কিচিরমিচির, উৎসব সংখ্যা ২০১৯

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply