বহুতল

এই শেষ। আর এই বাথরুমে চান করা হবে না। এক পাশ তুবড়ে যাওয়া সর্ষের তেলের বাটিটা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই ভাল। এত কিছু বয়ে নিয়ে যাওয়ার আছে, কী হবে বোঝা বাড়িয়ে?

ফেলে দেওয়া সোজা নয়। ঐ বাটিতে তেল ঢেলে শীতের উঠোনে মাদুর পেতে তেল মাখাত বাবা। নিজে মাখত আর ছেলেকে মাখাত। বহুক্ষণ ধরে হাতের তালু, পায়ের তলা ঘষে, হাত পা দলাই মলাই করে। মা রান্নাঘর থেকে তাগাদা দিত “কী হল? আর কত দেরি? তোমরা গেলে না এখনো? আমার রান্না যে হয়ে এল।” বাবা বলত “দাঁড়াও! টুবলুর গায়ে তেলটা বসুক আগে। নইলে আর এত কসরত করছি কেন?”

চান করে এসে উঠোনে দাঁড়িয়েই লুঙ্গি পরে গামছা ছাড়ত বাবা। গামছাটা মেলতে গিয়ে খেয়াল হত তেলের বাটিটা তুলে রাখা হয়নি। তখন বাঁ হাতে তুলে নিয়ে এই বাথরুমে ঢুকত পা ধুতে। আগে বাটিটা রাখত ঐ তাকের উপর। তারপর ডেকে বলত “টুবলু, কল টেপ।” তখনো মিউনিসিপ্যালিটির জল আসেনি এ তল্লাটে। উঠোনের কুয়ো থেকে মাটির নীচ দিয়ে পাইপ পাতিয়ে বাথরুমের ভেতরে টিউবওয়েল বসিয়েছিল বাবা। শাওয়ারের জলে চোখের জল মিশিয়ে দিতে দিতে মনে পড়ে।

এই শাওয়ারেও চান করে গেছে বাবা। তাই চাকরি চলে যাওয়ার সময়ে, বউয়ের সাথে এক এক ইঞ্চি করে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার সময়েও এই শাওয়ারে চান করে বড় শান্তি ছিল। এই শেষবারের মত বাবার আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে গায়ে মাথায়। টুবলু উপর দিকে তাকিয়ে অন্ধ হয়ে যায়। হাতড়ে হাতড়ে নবটা খুঁজে পেয়ে বন্ধ করে শাওয়ারটা। দেওয়াল ধরে ধরে বেরিয়ে আসে।

গা মাথা মুছে দৃষ্টি ফিরে পেয়ে একদম ভাল লাগে না। আজ ভেজা পায়েই গামছা মেলতে যেতে হচ্ছে বারান্দায়। পাপোশগুলো তো ফেলে দেওয়া হয়ে গেছে। খাবার ঘরটা, বাবা-মায়ের ঘরটা, বারান্দা — সর্বত্র পায়ের ছাপ পড়ে গেল। আজ তো মা নেই বকতে। “টুবলুউউউউ। কতবার বলেছি ভেজা পায়ে বেরোবি না? কিছুতেই মনে থাকে না ধেড়ে ছেলের?”

বারান্দায় পৌঁছে খেয়াল হয় দড়িগুলো আগেই খোলা হয়ে গেছে, আজ আর গামছা মেলা যাবে না। টুবলু ঘরে এসে ভেজা গামছাটা প্লাস্টিকে পুরে কোনমতে গুঁজে দেয় ব্যাক প্যাকে।

আর কখনো পাশের ঘরে ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় আঁচড়ানো হবে না চুল। ওটা কালই পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে ক্রেতার বাড়ি। ওটাও ফিরবে না, ঘরটাও থাকবে না। টুবলু চুল আঁচড়ানোর সময়ে কখনো অবাধ্য হয়নি মার, আজ হল। চিরুনি নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ঠিক সেইখানটায় যেখানে ঝুলগুলো দাগিয়ে রেখেছে ড্রেসিং টেবিলের জায়গা। সেই দেয়ালের দিকে মুখ করে আজ, শেষবারের মত, টুবলু দেখতে পেল নিজের মুখ আর মায়ের মুখ। ছোটবেলার মত ডানদিকে সিঁথে করে দিল মা, টুবলু প্রতিবাদ করল না।

শেষবার ফ্যান গালা হল টুবলুর মায়ের রান্নাঘরে। বড় সাধের, সাজানো রান্নাঘর ছিল। বিয়ে হয়ে যখন আসে তখন এর মাথায় ছিল অ্যাসবেস্টসের চাল। পুজোর বোনাসের সাথে কিছু ধার করে পাকা ছাদ করে দিয়েছিল বাবা। তবে অনেকদিন গুল কয়লায় রান্না করেছে এ ঘরে। মোচার ঘন্ট, সর্ষে বাটা দিয়ে লাউয়ের খোসার চচ্চড়ি, শশার তরকারি। মাসে কদিনই বা মাছ হত তখন? টুবলুর বউকে ফুলশয্যার পরদিনই মা বলে দিয়েছিল “যদ্দিন পরীক্ষা পাশ না হচ্ছে এ ঘরে তোমার ঢোকা বারণ, বৌমা।” সে বারণ বজায় রেখেছিল। দেবপ্রিয়ার নার্সিং পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিনই রান্না করতে করতে বেহুঁশ হয়ে গেছিল মা। পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে গেছিল টুবলু। মা আর বাড়ি ফেরেনি।

তারপর থেকে বড় ব্যস্ত জীবন ছিল টুবলু-দেবপ্রিয়ার। দিনে কথা বলার সময় ছিল না, রাতে আদর করার সময় ছিল না। সকালে বাবা কাগজ পড়ত বড় ঘরে বসে আর রান্নাঘরে প্রিয়াকে সাহায্য করতে করতে পারিশ্রমিক আদায় করত টুবলু। প্রিয়া ফিসফিসিয়ে বলত “তুমি যা কাজ কর তার ডবল মাইনে নাও।” টুবলু বলত “আমি যত মাইনে চাই তুমি তার আদ্ধেক দাও।” প্রিয়ার ঠোঁট বৈশাখী দুপুরের মত শুকনো হতে শুরু করেছিল এখানেই। টুবলু জানতে চেয়েছিল “কেন?” প্রিয়া উত্তর না দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। টুবলুর বাবা, ওদের চুমু খেতে না দেখেও, বুঝেছিল কেন। বলেছিল “এভাবে মানুষ পারে নাকি? বৌমার হাসপাতালের ওখানে একটা বাড়ি নে। এটা কোন জীবন হল? মেয়েটা তো মারা যাবে।” টুবলু তবুও যেতে চায়নি। ফলে দূরত্ব বেড়েছিল। তারপর একদিন এই রান্নাঘর ছেড়ে, এই বাড়ি ছেড়ে প্রিয়া চলে গেল। জানিয়ে দিল আর এ বাড়িতে ফিরবে না।

তখন টুবলুর কোম্পানি টালমাটাল, যে কোনদিন চাকরি চলে যেতে পারে। আলাদা বাড়ি নিলে সে বাড়ির ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য যে কদিন পরেই না-ও থাকতে পারে সে কথাটা বলব বলব করে আর বলাই হয়নি প্রিয়াকে। অবশ্য চাকরি চলে যাওয়ার পর কোত্থেকে খবর পেয়ে নিজেই এসেছিল সে। আর টুবলুর বাবা জোর করে তার সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল টুবলুকে। “আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। আমি তো অথর্ব হয়ে যাইনি। একসাথে থাক কয়েকদিন। সব ঝামেলা মিটে যাবে।”

মিটে গেছিল সত্যিই। রফা হয়েছিল সারা সপ্তাহ ওরা যাদবপুরে দেবপ্রিয়ার কোয়ার্টারে থাকবে আর শনি, রবি এই বাড়িতে টুবলুর বাবার সাথে। কোয়ার্টারটা বড্ড ছোট। দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার জন্যে আদর্শ। কলকাতায় থাকতে হওয়ায় আরেকটা চাকরির জন্যে দৌড়াদৌড়ি করতেও একটু সুবিধা হয়েছিল টুবলুর। তবুও দৌড়ানোই সার হয়েছে, কিচ্ছু পায়নি। শুধু প্রিয়াকে ফিরে পেয়েছিল। রবিবারগুলো চমৎকার কাটত তখন। বাবার রান্না মাংস তিনজন মিলে খেতে খেতে। সেই ডাইনিং টেবিলটায় কাল রাতেই শেষবার খাওয়া হয়েছে। আজ সকালে বিদায় হয়েছে।

ডাইনিং রুমের মাটিতে বসে ভাত আর আলুসেদ্ধ মাখে টুবলু। ঠিক এইখানে বসেই মা চটজলদি মেখে খাইয়ে দিত স্কুল যাওয়ার সময়ে। তখন ডাইনিং টেবিল থাকত বড়লোকদের বাড়িতে। দু একজন বন্ধুর বাড়িতে ছিল। ওদের বাড়ি গেলে টেবিলে বসে খেয়ে খিদে মিটত না। আত্মীয়দের মধ্যে সবচেয়ে আগে ডাইনিং টেবিল এসেছিল ছোটকাকার বাড়িতে। মার শ্রাদ্ধের কয়েকদিন পরে এসে এই ঘরে বসেই চা খেতে খেতে ছোটকাকা বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল “দাদা, বাড়িটা নিয়ে কী করবি ভাবছিস?” বাবা কথাটার মানে বোঝেনি। টুবলু আর দেবপ্রিয়াও বোঝেনি। কাকা বুঝিয়ে বলেছিল “বাড়িটার বয়স তো ষাটের ওপর হল। এত বড় বাড়ি। মেনটেন করার খরচাও তো অনেক। আস্তে আস্তে তো অন্য কিছু ভাবতে হবে।” ওরা তিনজনেই জোরের সঙ্গে বলেছিল যে মেনটেন্যান্সের খরচা এমন কিছু ঘনঘন হয় না আর যেটুকু হয় তাতে ওদের কোন অসুবিধা হয় না। কাকু তখন মহদাশয় হয়ে বলেছিল বাড়িটা সকলের। ওরা তিনজনেই শুধু বাড়ির পেছনে পয়সা খরচ করবে সেটা ঠিক না। সকলেরই সাহায্য করা উচিৎ। টুবলুর বাবা হেসে বলেছিল “আচ্ছা দরকার হলে তোদের বলবখন।” তাতেই বেরিয়ে এসেছিল আসল কথাটা। “দ্যাখ আমার সাথে মেজদা, সেজদা, ফুলদা সবারই কথা হয়েছে। সকলেই একমত। আমরা তো আর কোনদিন এই বাড়িতে ফিরে আসব না, আমাদের ছেলেমেয়েরাও আসবে না। টুবলু, প্রিয়ারও তো কাজকর্ম সব কলকাতায়। সুতরাং বাড়িটা কোন প্রমোটারকে দিয়ে দেওয়াই ভাল। যে যার মত টাকা পেয়ে গেলাম, তোরা সঙ্গে একটা ফ্ল্যাট পেলি। ছুটিছাটায় এসে থাকা যাবে।” টুবলু রাগে বোবা হয়ে গেছিল, দেবপ্রিয়া উঠে রান্নাঘরে চলে গেছিল। টুবলুর বাবা খুব নীচু গলায় বলেছিল “বাবা আর আমি কাঁধে করে ইঁট বয়ে এই বাড়িটা করেছিলাম। আমাকে এখানেই মরতে দে, তারপর তোরা যা ভাল হয় করিস।” ছোটকাকা আর একটিও কথা বলেনি।

খাওয়া শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে ছাদে এসে বসে টুবলু। ছাদের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে বাতিল জিনিসের স্তূপটা এত বছর আগলে রেখেছিল সে। হয়ত কাল সকালেই ওটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। লুকোচুরি খেলার সময়ে ওর পেছনে অদৃশ্য হয়ে যেত সে আর সেজকাকুর ছেলেমেয়ে বুল্টি, ভেদুয়া। পাশের বাড়ির বোকাসোকা মেয়ে রাবড়িকে ভয় দেখানো হয়েছিল ওখানে সাপ আছে। তাই ওরা ওখানেই আছে বুঝেও সে দূর থেকেই উঁকি ঝুঁকি মারত, এগোত না। তারপর পেছন ফিরলেই — ধাপ্পা। গত দশ বছর সপ্তাহান্তে এসে ছেলের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ওখানেই লুকিয়েছে টুবলু। এখনকার বাচ্চাদের সাহস অনেক বেশি। সাপের গল্পে ভয় পায় না। এতদিন পরে খেয়াল হল, যখন থেকে মার ছাদে বড়ি দেওয়া বন্ধ হয়েছে, কাক-টাক আর খুব একটা এসে বসে না বাড়িতে। ছাদের এ মাথা ও মাথা শেষবারের মত হেঁটে নেয় টুবলু। ফুলকাকা বলেছে ফ্ল্যাট হয়ে গেলে নাকি ছাদটা আরো বড় হবে।
বাবা বলত ভায়েদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিল মেজকাকা কিন্তু অধ্যবসায় সবচেয়ে বেশি ছিল ফুলকাকার। সেই জন্যে ও-ই সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে। ও-ই বরাবর লেগেছিল টুবলুর বাবার পেছনে। দুর্গাপুর থেকে ফোন করত বারবার একই কথা বোঝানোর জন্যে।

“তোদের তো কেউ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছে না, বড়দা। চার কাঠা জমি আমাদের, তার মধ্যে দু কাঠায় বাড়ি। ফ্ল্যাট হলে কত বড় বিল্ডিং হবে ভাব। আমরা তো সবাই টাকা নেব। তুই নাহয় দুটো ফ্ল্যাট একসঙ্গে করে নিয়ে নিস। প্রমোটারের সাথে সেরকমভাবেই এগ্রিমেন্ট করব। বাড়ির মতই হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে পারবি।”

বাবাকে অবশ্য টলাতে পারেনি। টুবলুও কলকাতায় থাকতে শুরু করার পর একদিন চার ভাই আর তাদের বউরা এসে চেপে ধরেছিল বুড়ো মানুষটাকে। খবর পেয়ে টুবলু আর মাথার ঠিক রাখতে পারেনি। চারজনকেই ফোন করে ধমকেছিল “এত টাকার লোভ তোমাদের যে মানুষটা মরা পর্যন্ত তর সইছে না? বাবার যদি কিছু হয়, তোমাদের আমি জেলের ঘানি টানিয়ে ছাড়ব বলে দিলাম।” এসব অর্থহীন, রাগের কথা — প্রিয়া পরে বুঝিয়েছিল। ঠিকই।

চাকরি খোয়ানোয় শাপে বর হয়েছিল টুবলুর ফটোগ্রাফির। আর কোন কাজ ছিল না তো। পুরনো যোগাযোগগুলো আবার জোড়া লাগানোর সময়ও পেয়েছিল। সেই সূত্রে চাকরি যাওয়ার বছর দুয়েক পরে বেশ কিছু ফ্রিলান্স কাজ পেয়ে গেল। একটু সুরাহা হল। কিছুদিন পরেই প্রিয়ার পেটে এল কোপাই। তখনই, বাবার পরামর্শে, একটা দু কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল ওরা। দুজনের রোজগার মিলিয়ে ভাড়ার টাকাটা উঠে যেত। ফুলকাকা সেটা জানতে পেরে টুবলুকেও ফোন করা শুরু করে। “মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দ্যাখ। দেবপ্রিয়ার যা চাকরি তাতে অত দূর থেকে যাতায়াত করতে কোনদিনই পারবে না। এরপর ছেলেপুলে হলে তার লেখাপড়া আছে, আঁকার ক্লাস, এটার ক্লাস, সেটার ক্লাস। সব মিলিয়ে আর তুই ঐ বাড়িতে ফিরতে তো পারবি না। তার চেয়ে ওটা চল বেচে দিই, বড়দাকে তোর কাছে নিয়ে আয়। বুড়ো বয়সে ওকেও একা থাকতে হবে না, তোদেরও চিন্তা থাকবে না।” প্রস্তাবটা টুবলু বা তার বাবা — কারোরই ভাল লাগেনি।

ছাদ থেকে নেমে সিঁড়ির তলার দরজা খুলে বাগানে আসে টুবলু। শীত চলে যাবার সময় হল। এই সময়ে সারা বিকেল বাবা বাগানেই কাটাত। এ গাছে সার দিত, ও গাছে জল দিত, অমুক মরশুমি ফুলের মরা গাছটা উপড়ে ফেলে নতুন গাছ লাগাত। ডিসেম্বরের রঙিন বাগানে একটা ডালিয়ার উপরে বসা দুটো প্রজাপতির ছবিটাই প্রথম কোন পুরস্কার এনে দিয়েছিল টুবলুকে। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলে এখনো বাবার গায়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে মাটি থেকে।

টুবলু যখন থ্রি ফোরে পড়ে সেই সময় বাবা শখ করে একটা নারকেল গাছ পুঁতেছিল। কদিন না যেতেই খুব ভোরে কারা মাটি খুঁড়ে তুলে নিয়ে গেছিল সেটা। পোঁতার সময়ে এক প্যাকেট নুন ছড়িয়ে কাজে হাত লাগিয়েছিল টুবলু, তাই খুব কেঁদেছিল সে। বাবা বলেছিল “যাক গে, ভালই হয়েছে। নারকেল গাছ শিকড় ছড়িয়ে বাড়ির ভিত নষ্ট করে দেয়। ভুলই হয়েছিল লাগানো।”

ছোটকাকা তখন সবে উচ্চ মাধ্যমিক। টুবলুর কান্না দেখে আরেকটা এনে বসিয়ে দিয়েছিল। সেটায় বেশ বড় বড় নারকেল ধরেছে এবারও। ওগুলো আর খাওয়া হবে না। যাক গে! কাল পরশু যারা গাছটা কাটবে তারাই নাহয় খাবে। মা তো বলতই “যার কপালে আছে সে-ই খায়। অন্য কেউ পায় না।” বাগানে আর দাঁড়ানো যায় না। গাছগুলোর কাছে নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

সিঁড়ির দরজা বন্ধ করতে করতে টুবলু ভাবে বাবা সিদ্ধপুরুষ। নইলে এমন মৃত্যু কজনের হয়? নিজের ভিটেয়, নিজের বিছানায়, ঘুমের মধ্যে? মা তবু স্ট্রোক হওয়ার পরে পঙ্গু হয়ে দিন দুয়েক বেঁচে ছিল। হাসপাতালে মারা গেছে। বাবা সেটুকু কষ্টও পায়নি। সকালে কাজ করতে এসে আরতি পিসি বেল বাজিয়ে সাড়া না পেয়ে পাড়া প্রতিবেশীদের ডেকে তালা ভেঙে ঢুকেছে, ঢুকে দ্যাখে চোখ বন্ধ — যেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে। গায়ে হাত না রাখলে বোঝাও যাচ্ছিল না মারা গেছে।

আরতি পিসির ভালই হল। ওর ছেলেমেয়েরা অনেকদিন ধরে ওকে কাজ ছাড়তে বলছিল। ছেলেরা এখন প্রতিষ্ঠিত এবং বাপ-মাকে ভালবাসে। গ্র্যাজুয়েট মেয়ের বিয়ে হয়েছে প্রাইমারি স্কুলের ক্লার্কের সাথে। ওদের মায়ের লোকের বাড়ি কাজ করার দরকার কী? অন্য সব বাড়ির কাজ ছেড়েও দিয়েছে অনেকদিন। বুড়োমানুষটা একা থাকে বলে এ বাড়িরটা এতদিন ছাড়েনি। আসলে ও কিছুতেই ভুলতে পারে না টুবলুর বাবা-মা ওর মদ্যপ স্বামীকে ধমকে ধামকে, ব্যবসা করার টাকা ধার দিয়ে পথে এনেছিল। নইলে কি আর ছেলেপুলে মানুষ হত?

বাবার খবরটা ফোন করে জানিয়েছিল পাশের বাড়ির অসীমকাকু। এ পাড়ার যা ধারা, শুধু বলেছিল “এখুনি একবার চলে আয় বৌমা আর কোপাইকে নিয়ে। দ্বিজেনদার শরীরটা খুব খারাপ।” শোনামাত্রই বুঝতে পেরেছিল টুবলু। পাড়ার যত লোকের মৃত্যুতে ও শ্মশানে গেছে, সবার আত্মীয়কে ফোনে ঠিক এই কথাটাই বলা হয়েছে যে। আর এভাবে মৃত্যু সংবাদ শোনা হবে না। যে হাউসিং সোসাইটিতে টুবলুদের ফ্ল্যাট সেখানে অত রেখে ঢেকে কেউ কথা বলে না।
সেদিন ভাগ্যিস রবিবার ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে পড়তে পেরেছিল সবাই মিলে। আর ট্যাক্সিটা স্টার্ট দিতেই হঠাৎ টুবলুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছিল “বাড়িটা আর থাকল না।” কোপাই খেয়াল না করলেও, কথাটার মানে বুঝে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল প্রিয়া। গাড়িটা যখন বিদ্যাসাগর সেতুতে, তখন কান্না সামলে নিয়ে বলেছিল “তুমিও আর বাধা দিও না। বাবাই নেই। বাড়ি থেকে আর কী হবে?”

কিসের বাধা? আর কোন অধিকারেই বা বাধা দিত টুবলু? একটা দিনও এসে থাকার সময় তো তাদের গত দুবছরে হয়নি। ফটোগ্রাফার হিসাবে নাম হয়ে যাওয়ার পর থেকে আজ দিল্লী, কাল মহীশূর, পরশু ফ্র্যাঙ্কফুর্ট — এই তো চলছে। কলকাতায় থাকলেও নানা ব্যস্ততা। দেবপ্রিয়ারও নার্সিংহোম ছেড়ে মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালে যোগ দেওয়ার পরে মাইনের মতই লাফিয়ে বেড়েছে ব্যস্ততা। কোনদিন ছুটি পাওয়া গেলেও সকালে বাবার কাছে এসে রাতে ফিরে যাওয়াই নিয়ম হয়ে গেছে বহুদিন। বাবাই বরং কয়েকবার থেকে এসেছে ওদের ফ্ল্যাটে। মৎস্যমুখীর দিন ফুলকাকা কথাটা তুলতেই এক বারে হ্যাঁ করে দিয়েছিল টুবলু। ওরা সকলে একটু অবাকই হয়েছিল। তারপর মাত্র কয়েকটা মাস লাগল সব ব্যবস্থা করতে। ভুল হল কি? আজ মনে হয় — হল হয়ত।
বাবার খাঁ খাঁ পড়ার ঘরের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ায় টুবলু। আসবাবপত্র সব বেচে দিয়েছে। ওসব ঢুকত কোথায় ঐ ফ্ল্যাটে! শুধু বইগুলো নিয়ে যাচ্ছে। নতুন শেল্ফ বানাতে হয়েছে ফ্ল্যাটের দেয়ালে, তবু বেশকিছু ডাঁই হয়ে থাকবে এদিক ওদিক। পরে দেখা যাবে কী ব্যবস্থা করা যায়। তাক থেকে নামিয়ে ঘরের মাঝখানে মেঝেতে রেখে হিসাব মত আলাদা আলাদা করে বাক্সে পুরে বাঁধতে কাল গোটা দিনটা গেছে টুবলু আর দেবপ্রিয়ার। ভাগ্যিস কোপাই একটা দিন দিদিমার কাছে থাকতে আপত্তি করেনি! আজ ভোরবেলা উঠে চলে গেছে প্রিয়া। হাসপাতাল থেকে জরুরী ফোন। ম্যাটাডোর বলা আছে, এসে যাবে একটু পরেই।

তার আগেই আসার কথা বীরেনকাকুর। ফুলকাকুর বন্ধু বীরেন সরকার — এই এলাকার সবচেয়ে বড় প্রমোটার। এই বাড়িটা ভেঙে বিলাসবহুল বহুতল গড়ার অধিকারটা সে-ই কিনে নিয়েছে। টুবলুর থেকে চাবির গোছাটা বুঝে নিতে আসবে। যে বাড়ি ভেঙে ফেলা হবে তার আবার চাবির গোছা। টুবলু ফাঁকা বাড়ি কাঁপিয়ে হেসে ওঠে।

অপেক্ষা করা ছাড়া কোন কাজ নেই। একটা বইয়ের বাক্সকে শুইয়ে বালিশ করে নিয়ে ও লম্বা হয়। তখনই চোখে পড়ে একটা বাক্স ফাটিয়ে উঁকি মারছে বাবা-মার বিয়ের অ্যালবামটা। পুরো ফেটে গেলে কাজ বাড়বে। বাঁধনটা খুলে অ্যালবামটা বার করে নিয়ে আবার বেঁধে দেয়। বহুকাল দেখাও হয়নি বটে ছবিগুলো। শুয়ে পড়ে অ্যালবামটা খোলে টুবলু।

প্রথম পাতায় সাঁটা বিয়ের কার্ড থেকে বেরিয়ে আসে প্রজাপতিটা, উড়ে বেড়াতে থাকে সারা বাড়িতে। রজনীগন্ধার সুবাসে ভরে যায় চারিদিক আর বাজতে শুরু করে সানাই। টুবলু চমকে উঠে বসতে যেতেই কে নরম হাতে টেনে কোলে শোয়ায় তাকে, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ও মা! মা! আরামে চোখ বুজে আসার আগে শোনা যায় বাবার গলা “একটু ঘুমিয়ে নে, টুবলু। অনেকটা পথ যেতে হবে।”

প্রকাশ: কেঞ্চ’স ট্রেস পুজো কমিটির পত্রিকা, অক্টোবর ২০১৯

Advertisements

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply