ফুটন্ত সকালের পুরনো স্বপ্ন

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি

নতুন নয়, আজ পুরনো কথার দিন।

ইতিমধ্যেই দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে যে মানুষ বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। লেবানন আর চিলির ছবি উল্কার বেগে ছড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। চিলির আতঙ্কিত রাষ্ট্রপ্রধান সেবাস্তিয়ান পিনেরা পুরো ক্যাবিনেটকেই বরখাস্ত করেছেন। কিছুদিন আগে বিশাল আন্দোলন হয়েছে হংকঙে। সে আন্দোলন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মহাশক্তিধর চীনও। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন (আমিও পাচ্ছিলাম) চীন না আবার একটা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার ঘটিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লে এই একবিংশ শতাব্দীর পরমাণু শক্তিধর, নেট নজরদার রাষ্ট্রও কিন্তু আতান্তরে পড়ে। “শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

কথাগুলো পুরনো, নাকি চিরনতুন? এদিকে আজ নয়া উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত আর্জেন্টিনার মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাম-মধ্যপন্থী প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্ডেজকে জিতিয়ে দিলেন। তাঁর পাশে উপরাষ্ট্রপতি হতে লড়ছিলেন ভূতপূর্ব বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা কির্শনার। এইমাত্র দেখলাম বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেদক কেটি ওয়াটসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন আলবার্তোর জয়ে ক্রিস্টিনার রাজনীতির অবদান এতটাই যে অনেক ভোটার ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন তাঁরা ক্রিস্টিনাকে ভোট দেবেন। যেন তিনিই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, আলবার্তো নন।

পৃথিবীর মানচিত্রে সবচেয়ে ওজনদার দেশ, আর্জেন্টিনা থেকে আরো উত্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ক্রমশ সুর চড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তিনি অতি ধনীদের উপর আলাদা কর চালু করার কথা বলছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সকলের অধিকার হওয়া উচিৎ বলছেন। কখনো বা টুইট করছেন পৃথিবীতে বিলিয়নেয়ার থাকাই উচিৎ নয়। আমাদের কানে এসব শুনতে লাগে নন্দ ঘোষ নেহরুর মত, বা যারা নাকি দেশটার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সর্বনাশ করেছে, সেই কমিউনিস্টদের মত। মার্কিন দেশে কিন্তু এসব কথা ব্লাসফেমির সামিল ছিল এই সেদিন অব্দিও। অথচ এই মুহূর্তে বার্নির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই আবার শ্রমজীবী মানুষ। বার্নি প্রকাশ্যে ধর্মঘটের অধিকারের পক্ষে বলছেন, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থন করছেন। কী কাণ্ড বলুন তো!

লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননই হোক আর লাতিন আমেরিকার চিলি বা আর্জেন্টিনা কিংবা উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আমাদের প্রতিবেশী চীন। মানুষ রাস্তায় নামছেন কিন্তু আরো বেশি অধিকারের দাবীতে। হংকঙের আন্দোলন সেখানকার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটাই প্রধান। অন্য সবকটা দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষোভ আসলে সাধারণ চাকুরিজীবী এবং শ্রমজীবী গরীব এবং মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগার কেড়ে নেয় যে অর্থনীতি, কর্পোরেটদেরই দন্ডমুন্ডের কর্তা করে তোলে যে অর্থনীতি, যার ভুরি ভুরি আছে তাকে আরো পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে আর শিক্ষা স্বাস্থ্যকে বেসরকারীকরণ করে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায় যে অর্থনীতি — তার বিরুদ্ধে।

ভারতের অবস্থা কি অন্যরকম? সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন সারা বিশ্ব শিখল সমাজতন্ত্র মৃত, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্নয়নের পরিপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পের ক্ষতি করে, বেসরকারীকরণই মুক্তির পথ — তখন থেকেই তো এ দেশের সরকারগুলো আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ইত্যাদির বাধ্য ছাত্র হয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণ করেছে। জওহরলাল নেহরুর নিজের পার্টিই কাণ্ডটি করায় এখনকার মত তাঁকে অকথ্য গালাগাল তখন করা হয়নি সত্য, কিন্তু নেহরুর “সমাজবাদী অর্থনীতির অচলায়তন” থেকে নরসিমা, মনমোহন ভারতকে মুক্ত করেছেন একথা তো তখন থেকেই কাগজে, টিভিতে বলাবলি শুরু হয়েছে। শ্রম আইনকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারী ক্ষেত্রের কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, বর্তমান সরকারের আমলে মজা টের পাওয়ানো হচ্ছে সরকারী কর্মচারীদেরও। গ্রামীণ অর্থনীতি তখন থেকেই দুয়োরানী, তাই কৃষকদের মৃত্যু মিছিলও তো শুরু হয়েছে মনমোহিনী অর্থনীতির আমলেই। বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আক্রমণের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ব্যাপারটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে, তুলে দেওয়া হয়েছে বহু শিল্পক্ষেত্রে। আমি আপনি, মানে ভদ্রলোকেরা, খুশি হয়েছি। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল এতে শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নতি হবে। মনমোহন সিং নোটবন্দীর বিতর্কে জন মেনার্ড কেনসকে উদ্ধৃত করে বললেন বটে “In the long run we are all dead,” কিন্তু এই লং রানের কথা সেসময় তাঁরাও শুনিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আসল কথা হল দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা।

প্রশ্নটার উত্তর পেতে গেলে জানা দরকার দেশ মানে কে? বঙ্কিম লিখেছিলেন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তর কথা। জানি না তাদের লাভ হয়েছে কিনা, তবে আমার আপনার তো লাভ হয়েছে বটেই। আমার বাবার সাদা-কালো টিভির বেশি কেনার সামর্থ্য হয়নি, আমি রঙিন টিভি দিয়ে শুরু করে এখন স্মার্ট টিভিতে পৌঁছে গেছি। বাবার জীবন কেটেছে ট্রেনে বাসে ঘামে ভিজে, আমি যখন তখন ওলা উবের। সত্যি বলতে কি গাড়ি কেনার জন্যে ধার দিতে চেয়ে ব্যাঙ্কের লোকেরা আমার পায়ে ধরতে বাকি রাখে। উন্নতি হয়নি?

আমার জন্যে চকলেট কিনতে ঢুকে দাম শুনে মুখ চুন করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি বাবাকে, আর আমার মেয়ে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে বাছাই করে কোন কোন চকলেট সে কিনবে না। উন্নতি নয়, বলুন? বাবার জীবন কেটে গেছে পাড়ার দর্জির তৈরি জামাকাপড় পরে, আজ আমি ব্র‍্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরি না, বিদেশী ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি থাকে হাতে। উন্নতি নয়?

বাড়িতে একখানা ল্যান্ড ফোন নেওয়া খুব দরকার হয়ে পড়েছিল বলে রেকারিং ডিপোজিট করতে হয়েছিল বাবা-মাকে, আজ আমি আর আমার বউ হাতের মোবাইলে সামান্য টাকায় সারা পৃথিবীর কথা বলা ছাড়াও বিশ্বায়িত বিনোদন ভোগ করছি। তবুও বলবেন উন্নতি হয়নি?

এদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সময়ে আমার কিছু ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তাই সেই অর্থনীতি আমাকে আরো আয় করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে আমি আরো ব্যয় করে যে আমার চেয়ে অনেক বেশি ধনী তাকে আরো ধনী করতে পারি। আমার যে সহপাঠীর বাবার ছোট মুদির দোকান, তার যে জয়েন্টে পেছন দিকে র‍্যাঙ্ক করে বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার টাকা না থাকায় লেখাপড়া শেষ হয়ে গেল সেকথা থাক। আমি তো কয়েক লক্ষ টাকা ফিজ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আজ এ দেশে কাল সে দেশে কাজ করে বেড়াচ্ছি। সেটা উন্নতি নয়?

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি। আমার সন্তান জন্মেছে ঝাঁ চকচকে নার্সিংহোমে। মনমোহন সিং না থাকলে কে দিত আমাকে এই সুযোগ? আমার চটকলের শ্রমিক বন্ধুর স্ত্রী যে সরকারী হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে সংক্রমণের ফলে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেল সে কথা থাক। একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।

সুতরাং দেশ মানে আমার কাছে যেহেতু আগে আমি, আমার পরিবার, তাই উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার লাভ হয়নি সে করুক চিলি, লেবানন বা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের মত কিছু। বা আর্জেন্টিনার লোকেদের মত ভোট দিক বামপন্থীদের, ভিড় জমাক তাদের মিটিঙে যারা বার্নির মত বলে চিকিৎসার জন্যে গাদা গাদা ইনশিওরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হওয়া অন্যায়, যে পড়তে চায় তার পড়ার খরচ সরকারের দেওয়া উচিৎ। আমি কেন এসবের মধ্যে থাকব? আমার তো প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েকে পয়সা খরচ করে যেখানে ইচ্ছে পড়ানোর ক্ষমতাও আছে আমার।

অবশ্য এত উন্নতির সঙ্গে কিছু উদ্বেগও আমি পেয়েছি, যা আমার বাবার ছিল না।

নিজের যৌবনে আমার চাকুরিজীবী বাবা মাইনে পেলে মায়ের সাথে মাস খরচের হিসাব করতে বসে দেখতেন এটা করলে সেটা হবে না, অমুক শখটা পরের মাসের জন্যে তুলে রাখতে হবে। কিন্তু জানতেন পরের মাসেও চাকরিটা থাকবে, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে দুটো খাওয়া পরার অভাব হবে না। আমার সে নিশ্চয়তা নেই। শুধু নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করেই নিশ্চিন্ত থাকার আমার উপায় নেই। কোম্পানি যদি তার লাভের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারে তার মানে হবে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন হবে, বস বলবেন “সবাই তো ব্যবসা করতে এসেছে। কেউ তো মাদার টেরেসা নয়”। অতএব গত মাসের এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ আমি বছর চল্লিশেক বয়সে হয়ে যাব বেকার, সামার ভ্যাকেশনে ফুকেটের বীচে যে বউকে দীপিকা পাড়ুকোন মনে হচ্ছিল অচিরে দেখব তার চোখের কোলে কালি পড়ে সে নিরুপা রায় হয়ে গেল। মেয়েকে ভেবেছিলাম বিদেশে পড়তে পাঠাব, এখন স্কুলের মাইনে দেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য বউ আমার যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তার সরকারী চাকরি আছে আমার বাবার মতই। তাই ভেবেছিলাম অবসর জীবনে অন্তত তার পেনশনে আমাদের দুজনের চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি সরকার তার পেনশন না-ও দিতে পারে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অথচ গিন্নীর মাইনে কাল কমিয়ে দিলেও কিছু বলার নেই। ওদিকে ব্যাঙ্কে যা টাকা জমিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ফেল পড়লে শুনছি তার সবটা পাব না। অন্যত্র যা জমিয়েছি তার পাওনা গণ্ডাও নাকি শেয়ার বাজারের মর্জি মাফিক।

এসব মনে পড়লে বোধ হয় কি মিছিলে নামা উচিৎ? নাকি কেবলই মনে হয় ঐ ব্যাটা সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো — ওর জন্যেই আমি সরকারী চাকরি পাইনি, পেলে একবার…? ঐ যে সব মুসলমান বাংলাদেশ থেকে হুড়মুড়িয়ে আসছে, ওদেরকে বার করে দিতে পারলেই…? মনে হয় কি অমুকে কেন তমুকের মাংস খায় এটাই মূল সমস্যা? নাকি আমরা যারা আতঙ্কে ভুগছি আপনি তাদের দলে? ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক, গণপিটুনির আতঙ্ক। আমরা সকলেই যে ঘুমোচ্ছি, সকলেই যে বিশ্বাস করছি “সব চাঙ্গা সি”, তা তো নয়। তাহলে কেন আমরা রাস্তায় নেই?

নেই তার বড় কারণ যাঁরা মিছিল ডাকবেন, মিটিং করে রাস্তায় নামাবেন আমাদের তাঁরাই নিজেদের জায়গায় নেই। বার্নি স্যান্ডার্স সারাজীবন লড়ে গেলেন। যখন কেউ তাঁর কথা শুনত না তখনো লড়েছেন, আজও লড়ছেন। আজ অনেকে তাঁর কথা শুনছে। ক্রিস্টিনা কির্শনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তবুও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি, মানুষ আজ তাঁর লড়াইকে জয়যুক্ত করলেন। বিবিসি লিখেছে “A comeback for the old politics”। এ দেশে পুরনো সমাজবাদী, কল্যাণকামী রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এই তো সময়। মানুষ, জল, জঙ্গল বাঁচাতে সেই রাজনীতিরই তো প্রয়োজন। কিন্তু দু একটি অঞ্চলে ছাড়া কোথায় সেই রাজনীতির লোকেরা? তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা কোথায়? তাঁদের কেউ কেউ যে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক, ধ্বংসোন্মুখ নয়া উদারবাদী মোদী সরকারের থেকে মনমোহিনী পথেই নিস্তার খুঁজছেন!

পৃথিবী জুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির (রাজনীতিরও, কারণ প্রয়াত অশোক মিত্র যথার্থই বলতেন “রাজনীতিই অর্থনীতি”) শিয়রে শমন। ট্রাম্প, মোদী জানেন যে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ তাঁরা জানেন না। তাই উনি বলেন ইমিগ্র‍্যান্টদের কথা, ইনি বলেন এন আর সি করব, নাগরিকত্ব আইন করব, মুসলমানরাই যত নষ্টের গোড়া ইত্যাদি।

এই দুঃসময়ে, এই সম্ভাবনার সুসময়ে, কোথায় তাঁরা যাঁরা রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার স্বপ্ন দেখাতে পারেন?

লাঠালাঠি নয়, গলাগলি

৩৩ এর পল্লী যে অপরাধে অপরাধী, একই অপরাধে রামকৃষ্ণও কি অপরাধী নন?

বিজয়া দশমীর মিষ্টির স্বাদ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কথাগুলো বলে ফেলা যাক, কারণ আমাদের স্মৃতি অতি দুর্বল।

বেশ কয়েক দশক হল একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ এক জাতি, তাই তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোরও সামাজিক চরিত্রটাই বড় কথা, ধর্মীয় চরিত্রটা নয়। উৎসবটা মূলত সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উৎসব হলেও সংখ্যালঘু মুসলমানরাও এতে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন, করতে কোন বাধাও নেই। কিন্তু গত কয়েক দিনে প্রমাণ হয়ে গেছে যে বাঙালি হিন্দু, মুসলমানকে নজরুলই যথার্থ বুঝেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি।

ব্যাপারটা কী? না বেলেঘাটা ৩৩ এর পল্লী এবারের পুজোয় সর্বধর্ম সমন্বয় নিয়ে ভেবেছেন। তাই তাঁদের পুজো মণ্ডপে আজানও বেজেছে। আর যেই না বেজেছে, অমনি বহু বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস খসে পড়েছে। বজরং দলের বাঁদরদের নিয়ে বেশি চিন্তিত নই। সেই একটা প্রাচীন কবিতা আছে না “কুকুরের কাজ কুকুর করেছে” ইত্যাদি? তা মৌলবাদী সংগঠনের কাজ তারা করেছে। মণ্ডপে গিয়ে অশান্তি করার চেষ্টা করেছে, অকৃতকার্য হয়ে থানায় এফ আই আর করেছে। পুলিশ কোন আইনের কোন ধারায় এসব এফ আই আর গ্রহণ করে সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার বিষয় নয়। চিন্তার বিষয় সাধারণ হিন্দু ও মুসলমানদের উষ্মা প্রকাশ। এই সাধারণদের মধ্যে আবার প্রগতিশীল, এমনকি বামপন্থীরাও আছেন। আশঙ্কা, আতঙ্ক এখানেই।

এক নিকটাত্মীয় একটি হোয়াটস্যাপ মেসেজ ফরোয়ার্ড করলেন। পড়লে চট করে মনেই হবে না কাজটা হিন্দুত্ববাদী আই টি সেলের। অবশ্য ইদানীং তো বাংলার প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ও দলে ভিড়েছেন, হয়ত তাঁদের কাউকে দিয়েই লেখানো বার্তাটা। উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।

ওই দুর্গাপুজো থিম যে শিল্পীর মস্তিষ্কপ্রসূত তাঁর নাম রিন্টু দাস। তাঁর কথায়, “আমাদের থিমের বিষয় হচ্ছে যে আমরা সবাই এক, কেউ একা নই। সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সবাই যাতে সম্প্রীতির পথে চলি সেই বার্তায় দেওয়া হয়েছে। মায়ের হাতে অস্ত্র নেই। সেটা যুদ্ধ ভুলে শান্তির বার্তা।”
এখন আমরা কি জানি এই আযানে আসলে কী বলা হয়। এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের ও কোনও ধারণা আছে? আসুন আযানের বাংলা অনুবাদটা পড়া যাক।
* আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*আশহাদু-আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত দূত।
*হাইয়া আলাস সালা – নামাজের জন্য এসো।
*হাইয়া আলাল ফালা – সাফল্যের জন্য এসো।
*আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*মহম্মদ রসুলুল্লাহ- মহম্মদ ই একমাত্র রসুল, মানে আল্লার দূত।
এবার ভাবুন, সামনে দুর্গা প্রতিমা। মাথার উপরে দেবাদিদেব মহেশ্বর। পাশে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী আর সরস্বতী। তাঁদের অকালবোধনে আবাহন করা হয়েছে। মাইকে বাজছে: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই!
এই হল প্রোগ্রেসিভ, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির জ্ঞানের গভীরতা!
(দেশপ্রেমিক বানানাদি অপরিবর্তিত)

আমি আরবি ভাষা জানি না, ইসলাম ধর্মাবলম্বীও নই। ফলে আজানে যা বলা হয় তার অর্থ সত্যিই এই কিনা জানি না। তবে কত আর অবিশ্বাস করব? তাই ধরেই নিলাম এখানে সঠিক অনুবাদই করা হয়েছে। তা আপত্তির হেতুটা বোঝার চেষ্টা করে দেখি।

আজানে বলা হচ্ছে আল্লাই সর্বশক্তিমান, আল্লা একমাত্র উপাস্য, মহম্মদ আল্লার একমাত্র দূত। হিন্দু দেবদেবীদের পূজাস্থলে এসব কি কথা! এ জিনিস কখনো ওখানে বাজানো যায়!

ব্যাপারটা সর্বধর্ম সমন্বয়ের থিমের সঙ্গে কেন অসঙ্গতিপূর্ণ ঠিক বুঝলাম না। সব ধর্মেই তো সেই ধর্মকেই সর্বোত্তম সত্য বলে দাবী করা হয়। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে উদাহরণ দিই। যদিও হিন্দুধর্মের কোরান শরীফ বা বাইবেলের মত নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ নেই (বস্তুত হিন্দুধর্ম আদৌ কোন একক ধর্ম কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিলক্ষণ তর্ক আছে), তবু বাড়িতে বাড়িতে শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাওয়া যায়। আমি আবার বামুন বাড়ির ছেলে হওয়াতে ছোট থেকে বাড়িতে রোগা, মোটা, বেঁটে, লম্বা — নানা চেহারার গীতা দেখছি। অনিচ্ছায় দু বছর এবং পরে স্বেচ্ছায় দু বছর সংস্কৃত পড়তে হয়েছিল। তা বাড়ির একটা গীতা খুলে দেখলাম সপ্তম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন

মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদন্তি ধনঞ্জয়
ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।

অর্থ কী?

হে ধনঞ্জয়, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। মালায় যেভাবে মণিগুলো সুতোয় গাঁথা থাকে, আমার মধ্যে সেইভাবে সর্বভূত এবং সমস্ত জগৎ গ্রথিত।
তার আগেই, চতুর্থ অধ্যায়ে, রয়েছে প্রায় সকলের পরিচিত পঁয়ত্রিশতম শ্লোকটা

শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ।।

অর্থাৎ নিজের ধর্মে যদি দোষ ত্রুটি থাকে এবং পরের ধর্মে না থাকে, তাহলেও পরধর্মের চেয়ে নিজ ধর্ম ভাল। নিজের ধর্মে থেকে মৃত্যুও ভাল, পরধর্ম পালন করা ভয়াবহ।

যদি বা দ্বিতীয় শ্লোকে ধর্ম বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা নিয়ে সূক্ষ্ম তর্কের অবকাশ আছে, প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষাতেই বলছেন। আজান দেওয়ার সময়ে যেমন বলা হয় আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ, শ্রীকৃষ্ণও বলছেন তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তা হোয়াটস্যাপবাবুদের যুক্তি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ এত বড় কথা বলে দেওয়ার পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস যে কলমা পড়েছিলেন, গবেষকসুলভ অনুসন্ধিৎসায় খ্রীষ্টধর্মও পালন করেছিলেন সেটা কি উচিৎ কাজ হয়েছিল? “প্রোগ্রেসিভ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির” জ্ঞানের না হয় গভীরতা নেই, পরমহংসকেও কি পরম মূর্খ বলবেন তাহলে? ৩৩ এর পল্লী যে অপরাধে অপরাধী, একই অপরাধে রামকৃষ্ণও কি অপরাধী নন? এঁরা তো কেবল অস্থায়ী মণ্ডপে মাটির মূর্তির উপস্থিতিতে নমাজ বাজিয়েছেন, তিনি তো খোদ দক্ষিণেশ্বরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর পুরোহিত হয়ে অন্য ধর্মের দেবতার উপাসনা করেছেন।

মজার কথা (না, চিন্তার কথা) এই নিয়ে আপত্তি শুধু রামকৃষ্ণের চেয়েও বড় হিন্দুরাই করছেন না। মুসলমানরাও করছেন। তাঁদের কারো কারো ধারণা সর্বশক্তিমান আল্লা এতে হিন্দু দেবদেবীদের কাছে ছোট হয়ে গেলেন। আল্লাকে ছোট করা এত সহজ বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁরা এক কথায় মৌলবাদী। নইলে অন্য ধর্মের লোক তাঁর ধর্মের প্রার্থনা লোককে জানালে আপত্তি হবে কেন? অন্য ধর্মের লোক কোরান পড়লে কি আপনি রেগে যান, না খুশি হন? খুশি হওয়ারই তো কথা। উল্টোদিকেও তাই। কোন মুসলমান ভালবেসে বেদ, উপনিষদ পড়েন জানলে রেগে যায় যে হিন্দু, সে যেমন মৌলবাদী, প্যান্ডেলে নমাজ শুনে যে মুসলমান রেগে যায় সেও মৌলবাদী ছাড়া কিছু নয়। এখন সঙ্ঘ পরিবারের যুগ, দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল হিন্দুরা, তাই বজরং দল হল্লা করতে সাহস পায়, এঁরা পান না। এই যা তফাৎ।

আরেকটা মতও প্রচার হচ্ছে। অনেক মুসলমান নাকি আহত এই জন্যে যে আজান ব্যাপারটা প্রার্থনা, গান নয়। অতএব এটাকে পুজো মণ্ডপে বাজানো মানে আজানের অসম্মান। কি অদ্ভুত যুক্তি! পুজোর জায়গাতেই তো আজানের ব্যবহার করা হচ্ছে। আজানের সাথে কোমর দুলিয়ে কোন সিনেমাবণিতা নাচছেন বলে তো খবর নেই। এতে আজানের অসম্মান হয়? এ যুক্তির সাথে তো হোয়াটস্যাপের যে বার্তার উল্লেখ করলাম তার কোন পার্থক্য নেই। আমারটা সেরা, তাকে অন্য কিছুর পাশে রাখলেই তার অসম্মান হয় — এই তো বলতে চাওয়া হচ্ছে আসলে।

তথাকথিত প্রগতিশীল যারা, তাদের বুদ্ধি বেশি। তাই তারা চালাকি করে বলছে “সর্বধর্ম সমন্বয়ের কোন প্রয়োজন নেই, সহাবস্থান হলেই যথেষ্ট।” শুনে মনে পড়ল আমার এক হিন্দুত্ববাদী প্রাক্তন বন্ধুর কথা। তার সাথে তর্ক হতে হতে একদিন বলেছিলাম “তুই কী চাস? মুসলমানদের মেরে ফেলা হোক বা ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক?” তার উত্তর ছিল “তা কেন? থাকুক এক পাশে। লাঠালাঠিরও দরকার নেই, গলাগলিরও দরকার নেই।”

মুসলমান নাগরিককে বাড়ি ভাড়া দেয় না যারা, মুসলমান হলে আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে দেয় না যারা তাদেরও কিন্তু আসলে বক্তব্য এটাই। তুমি বাপু তোমার এলাকায় থাকো, আমি আমার এলাকায় থাকি। এক কথায়, সমন্বয়ের দরকার নেই, সহাবস্থানই যথেষ্ট। যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী প্রগতিশীল সমন্বয় বাতিল করে সহাবস্থানের তত্ত্ব খাড়া করেন, তিনি আসলে মুসলমানদের কোণঠাসা করার ব্যাপারীদেরই সাহায্য করেন। আর যে বামপন্থীরা এই তত্ত্ব সমর্থন করেন, তাঁদের উপযুক্ত বিশেষণ আমি খুঁজছি। এখনো পাইনি।

তাছাড়া এই প্রগতিশীলরা কে হরিদাস পাল যে সমন্বয়কে বাতিল করবেন? এ দেশে কয়েক হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সমন্বয় হয়েই চলেছে। কোন শাসক শুরু করেননি, অনেক শাসক আটকাতে চেয়েও পারেননি। সাধারণ মানুষ নিজের বুদ্ধি বিবেচনায় এই সমন্বয় করে চলেছেন। হিন্দুদের সত্যনারায়ণ কখন সত্য পীর হয়ে যান টের পাওয়া যায় না। ওলাউঠায় গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত এক সময়। তা থেকে তৈরি হয়েছে ওলাবিবি। ওলাবিবির থানে হিন্দু, মুসলমান উভয়েই যান। কত মাজারে যে সন্তানহীনা হিন্দু মহিলারা সন্তান প্রার্থনা করেন তার কোন সেন্সাস হয়নি আজ অব্দি। গত বছর বন্ধু মৃণালের শ্বশুরালয় পশ্চিম মেদিনীপুরের মোগলমারি গ্রামে গিয়েছিলাম। সে গ্রামের চালু মন্দির দূর থেকে দেখলে মসজিদ বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়। ইসলামিক স্থাপত্যের অভিজ্ঞান যে গম্বুজ তা রয়েছে মন্দিরের মাথায়, দেয়ালে মসজিদের মত নকশা কাটা জাফরি। সুফি সাধকদের কথা তো বলতে শুরু করলে শেষ হবে না। দুজন কাওয়ালি গায়কের কথা বলি।

বন্ধু উজ্জ্বলের কল্যাণে বছর দুয়েক আগে শুনেছিলাম ফরিদ আয়াজ আর আবু মুহাম্মদের গান “ইয়াদ হ্যায় কুছ ভি হামারি”। সেখান গোকুল ছেড়ে চলে যাওয়া কানাইকে রাধিকা জিজ্ঞেস করছেন তাঁর কথা মনে আছে কিনা। কিভাবে কানাইয়ের খবর পেতে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তার উদাহরণ হিসাবে বলছেন “পইয়াঁ পড়ি মহাদেবকে যা কে”। শেষ দিকে রয়েছে “ম্যায় কৌন হুঁ ঔর কেয়া হুঁ ইয়ে রিজওয়ান (জন্নতের দারোগার নাম) সে পুছো / জন্নত মেরে অজদাদ (পূর্বপুরুষ) কি ঠুকরায়ি হুয়ি হ্যায় / ফিরতি থি কিঁউ মারি মারি।” অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রেয়সীর পূর্বপুরুষদের জন্নতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদিনী হয়েছেন বলে। এই সমন্বয় যাঁরা চান না, যাঁরা বলেন এই সমন্বয় জগাখিচুড়ি, তাঁরা হিন্দু বা মুসলমান কারোর ভাল চান না।

অল ইন্ডিয়া রেডিওর তৈরি যে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না শুনলে বাঙালির শারদোৎসব শুরু হয় না, সেই অনুষ্ঠানের যন্ত্রশিল্পীদের অনেকেই ছিলেন মুসলমান। সেটা কি সহাবস্থানের উদাহরণ নাকি সমন্বয়ের উদাহরণ? সহাবস্থানবাদীরা কি বলবেন ঐ শিল্পীদের বাদ দিয়ে করা উচিৎ ছিল অনুষ্ঠানটা বা ঐ শিল্পীদের নিজে থেকেই বলা উচিৎ ছিল আমরা বাজাব না? এরপর কি শুনব বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের উচিৎ ছিল “হায় রাম” বোল বাদ দিয়ে “ইয়াদ পিয়া কি আয়ে” গাওয়ার আদেশ মেনে নিয়ে পাকিস্তানেই থেকে যাওয়া? নাকি শুনব নজরুলের অতগুলো শ্যামাসঙ্গীত লেখা ঠিক কাজ হয়নি? হিন্দুরাষ্ট্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা এভাবে সাভারকর-জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বকেই মেনে নেব নাকি?

কেউ কেউ আপত্তি করছেন এই বলে যে দৈনন্দিন জীবনে যখন মুসলমানদের এক সূত্রে বেঁধে নেওয়ার প্রচেষ্টা ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, তখন এ সমস্ত “দ্যাখনাই” ব্যাপারের কোন দরকার নেই। প্রথমত, ৩৩ এর পল্লী ওরকম থিম না করলে কি রোজকার জীবনে মুসলমানদের প্রান্তিক করে দেওয়ার চেষ্টা কিছুমাত্র কম হত? আর ঐ মণ্ডপ হওয়াতেই বা দুই সম্প্রদায়ের ব্যবধান ঘোচানোর প্রচেষ্টায় আমাদের বাধা দিচ্ছে কে?

দ্বিতীয়ত, কিছুটা দ্যাখনাইয়েরও প্রয়োজন আছে বইকি। যুগটাই দৃশ্য শ্রাব্য উদ্দীপকের যুগ। নইলে মুসলমানদের রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে চুপিসাড়ে খুন করলেই তো হিন্দুত্ব ব্রিগেডের কাজ চলে যেত। প্রকাশ্য জায়গায় পিটিয়ে মারার দরকার কী? গণপিটুনির ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? আসলে ওরা এমন করে শুধু সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্যে নয়, এমনটাই যে স্বাভাবিক, এরকম যে করাই যায় তা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে। এদের সাথে লড়তে গেলে আমাদেরও বেশি বেশি করে দেখানো দরকার যে পুজো আর নমাজ পাশাপাশি চলাটাই স্বাভাবিক।

আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। তিনিও বলতেন যে আমার ভাই তাকে ছাদে উঠে চেঁচিয়ে আহা, ভাই বুকে এসো, বলার দরকার নেই। বললেই বরং বোঝা যায় কোন গোলমাল আছে। কথাটা সাধারণ অবস্থায় ঠিক। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথই তো বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে পথে নেমে সকলের হাতে রাখী পরালেন। অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন গঙ্গাতীরে রাখীবন্ধন উৎসব করে জোড়াসাঁকোয় ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ সটান নাখোদা মসজিদে ঢুকে পড়লেন। ওঁরা তখন বাইরে দাঁড়িয়ে আশঙ্কা করছেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে। অথচ কিছুক্ষণ পরেই সহাস্য রবীন্দ্রনাথ ইমামের হাত ধরে বেরিয়ে এলেন রাখী পরিয়ে। তাহলে দ্যাখনাই কাজ করলেন কে? রবীন্দ্রনাথ, না ইমাম? নাকি দুজনেই? তার চেয়েও বড় কথা, কাজটা অন্যায় হয়েছিল কি?

আর দ্যাখনাই বলছেন কাকে? কোন মুসলমান ব্যক্তি প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গেছেন এমন ছবি দেখেও দেখছি অনেকে অসন্তুষ্ট। এগুলো নাকি সংখ্যাগুরুর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে দ্যাখনাই। মানে কি এই কথাটার? কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ পুজোয় নতুন জামাকাপড় কেনেন, ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোন হিন্দুদের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে? পশ্চিমবঙ্গের বহু পুজো কমিটি চালান যে মুসলমান কর্মকর্তারা, তাঁরা আসলে হিন্দুদের প্রিয় হতে চান? এইভাবে ব্যক্তিমানুষকে, তার সাধ আহ্লাদকে ধর্মীয় পরিচিতির কারণে অপমান করা যায়? তাহলে আমি যখন আমার মুসলমান বন্ধুর বাড়ি ইফতারে যাই সেটা আসলে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করতে যাই? হোস্টেলজীবনে আমরা যে মুসলমান সহপাঠীদের ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময়ে হুমকি দিতাম “খাবার দাবার না আনলে ঢুকতে দেব না হোস্টেলে”, সেটা তাহলে সংখ্যালঘুর উপরে সংখ্যাগুরুর শক্তির আস্ফালন ছিল?

আমাকে আমার মত থাকতে দাও, তুমি তোমার মত থাকো — এই অনুপম রায়ে আসলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত হচ্ছে। অনেক প্রগতিশীল, বামপন্থী হিন্দু এবং মুসলমানের যেসব বক্তব্য এবার পুজোয় শুনলাম তাতে বুঝলাম এঁরাও হিন্দুত্ববাদীদের মত হিন্দু, মুসলমান পৃথগন্ন হয়ে থাকলেই খুশি। কদিন পর এমনও বলতে পারেন যে হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে টিয়েও না হলেই ভাল হয়। সেই আমার বন্ধুর মত আর কি। লাঠালাঠি চাই না, গলাগলিও চাই না।

নজরুলের কথা বলেছিলাম গোড়াতেই। তিনি ঠিক যা বলেছিলেন সেটা দিয়ে শেষ করি

আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেন না, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি।

%d bloggers like this: