ভাবনা করা চলবে না

আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন

ফ্যাসিবাদের একটা মহৎ গুণ আছে — অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনির কাজ করে। কেন বলছি?
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন নানা দিক থেকেই অনন্য ছিল। যেমন ধরুন, বামপন্থী পরিবারে জন্মে, বরাবর বামপন্থী রাজনীতির কাছাকাছি থেকে যা দেখতে পাইনি, এবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে পরে তেমন এক ঘটনা দেখলাম। শক্তি কমে আসা বামপন্থীরা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন, নিজেদের মধ্যে কোন আদর্শগত মতানৈক্যে নয়, কোন অবাম দলকে সমর্থন করা উচিৎ, কাকে উচিৎ নয় তাই নিয়ে।
এক দল বললেন বিজেপি যেহেতু দেশের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই ওদের হারাতে সকলের সাথে জোট করতে হবে। তবে কিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিজেপির তফাত উনিশ বিশ। তাই ওঁকে বাদ দিয়েই করতে হবে এই জোট। কংগ্রেস অতীতে যা-ই করে থাক, ওদের সাথে থাকতেই হবে এই পরিস্থিতিতে। ওরা আর যা-ই হোক বিজেপি তো নয়। অস্যার্থ, একলা লড়তে ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তাছাড়া সারা দেশে লড়ার শক্তিও নেই। অতএব ওরা লড়ুক, বাফারের কাজ করুক। আমরা তো রইলামই।
আরেক দল বামপন্থী উপর্যুক্ত বামেদের প্রবল আক্রমণ করলেন। বললেন ওঁরা ক্ষমতা হারানোর আক্রোশে, ক্ষুদ্র স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করছেন। বরং মমতার হাতই শক্ত করা উচিৎ। বাঁচালে উনিই পারেন বাঁচাতে। উনিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে অগ্রণী সৈনিক। অস্যার্থ, আমাদের তো শক্তি নেই। উনি নেতৃত্ব দিন, আমরা লড়ে যাব।
নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর দু পক্ষই যে ভুল ছিলেন তা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখা গেল প্রথম দল কংগ্রেসের লড়ার ক্ষমতায় আস্থা রাখলেও ভোটাররা রাখেননি। উলটে কংগ্রেস কী করবে আর কী করবে না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে বিজেপি বা মমতার বিরোধী হিসাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে। যে ভোট নিজেদের ছিল সেগুলো ধরে রাখার কাজটাও ঠিক করে করা হয়নি।
দ্বিতীয় দলের ভোটের হিসাবে হারানোর মত কিছু ছিল না। সম্ভবত সেটাই তৃণমূলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের সবচেয়ে বড় কারণ। ভোটের ফলে দেখা গেল তাঁরা যে নেত্রীর উপর ভরসা করেছিলেন তাঁর উপর ভোটারদের যথেষ্ট ভরসা নেই।
ভোটের আগে বহু বাম এবং মধ্যপন্থী বন্ধুদের সাথে অনলাইন ও অফলাইনে ঝগড়া করেছি এই বলে যে বিজেপিকে আটকাতে হবে এই যুক্তিতে কোনরকম রামধনু জোট করলে কোন লাভ হবে না, বরং বিজেপির কাজ আরো সহজ হবে। এমনিতেই গত কয়েক বছরে ঘরে ঘরে যত্ন করে জমিয়ে তোলা ধর্মান্ধতা, মুসলমানবিদ্বেষের পরিমণ্ডলে অন্য সব ইস্যু যে পেছনে চলে যেতে পারে সেই আশঙ্কা করতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তার উপর বালাকোট যে মানুষকে অন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে সে তো এতদিনে পরিষ্কার। কিন্তু রামধনু জোট কেন সারা দেশের কোথাও কাজ করল না তার অন্য কারণও তলিয়ে দেখা দরকার। সেটা করা খুব সহজ হয় বিজেপির জয়ের পর যারা এই নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ছিল তাদের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে।
কংগ্রেসকে দিয়েই শুরু করা যাক। যে বামপন্থী দলগুলো কংগ্রেসকে ঢাল ভেবেছিলেন তাঁরা মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের বিজেপিসুলভ কর্মসূচীকে পাত্তাই দেননি। গোশালা বানিয়ে দেব, রাম পথ বানিয়ে দেব — এসব বলে যারা বিধানসভা নির্বাচন জেতে, তাদের যদি ভোটাররা লোকসভায় ভোট না দেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? যদি কেউ হিন্দুত্বের জন্যেই ভোট দেবে ঠিক করে, তাহলে আগমার্কা হিন্দুত্বকেই দেবে, নকল হিন্দুত্বকে কেন দেবে? বিধানসভায় নাহয় রাজ্য সরকারের কাজকর্মে রুষ্ট হয়ে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া গেল, লোকসভায় আর কেন? শুধু মধ্যপ্রদেশ? গুজরাটের নির্বাচনের সময়ে বিজেপি প্রশ্ন তুলল “রাহুল গান্ধী কি হিন্দু?” কংগ্রেস উত্তর দিল “উনি শুধু হিন্দু নন, রীতিমত পৈতেওলা হিন্দু।” বামফ্রন্ট (ওটা কি আছে এখনো? বহরমপুর কেন্দ্রে সিপিএম কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার পরেও?) নেতৃত্ব এই পার্টির হাত ধরে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়বেন ভেবেছিলেন। এসব অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। তারপর থেকে কংগ্রেস কী কী করেছে?
ইউ এ পি এ আইন এবং এন আই এ আইনের সংশোধনী, যেগুলো ব্যক্তির নাগরিক অধিকারে শেষ পেরেক পুঁতেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকারের যে অধিকার তাতে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে, কংগ্রেস সেই সংশোধনগুলো নিয়ে বিতর্কে নানা গরম গরম কথা বলে শেষে রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে সোনিয়া আর রাহুল গান্ধী সরকারের বিপক্ষে দাঁড়ালেও রোজ কোন না কোন কংগ্রেস নেতা সরকারকে সমর্থন করছেন। এমনকি পি চিদম্বরম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জয়রাম রমেশ, শশী থারুরের মত নেতা, যাঁরা সুললিত ইংরেজিতে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি বলে গত কয়েক বছরে প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছেন, তাঁরা বলতে শুরু করেছেন মোদীর অবিমিশ্র সমালোচনা করা নাকি ঠিক নয়। সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজারা ভেবেছিলেন এদের হাত ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন।
এবার তৃণমূল কংগ্রেসের কথায় আসা যাক। নকশাল, এস ইউ সি আই প্রভৃতি বামপন্থীরা এই দলটির সর্বোচ্চ নেত্রীকেই মুক্তিসূর্য ভেবেছিলেন, ২০১৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়া সত্ত্বেও। তা তৃণমূল কী করেছে ভোটের পর থেকে?
এক কথায় বললে মহুয়া মৈত্র একটা মারকাটারি বক্তৃতা দিয়েছেন লোকসভায়। ব্যাস, আর কিচ্ছু না। ইউ এ পি এ আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় বক্তৃতাটি দিয়ে ফেসবুক এবং ইউটিউবে কয়েক হাজার লাইক কুড়ানোর পর তৃণমূল সদলবলে ভোট দিয়েছে সরকারের পক্ষে। আর এন আই এ আইন নিয়ে ভোটাভুটিতে ওয়াক আউট করে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। এ তো গেল সংসদের ভেতরের কথা। বাইরে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঢল নেমেছে নির্বাচনের পর থেকে। তা আটকাতে অসমর্থ হয়ে শীর্ষ নেত্রীর বিজেপির থেকেও বেশি বিজেপি হওয়ার প্রয়াসও বেড়েছে। বিজেপি অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবে, ইনি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানাবেন বলছেন। একদিকে চা ওয়ালার সাফল্য দেখে চা ওয়ালীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বরাবরের রণং দেহি মূর্তি বিসর্জন দিয়ে কেন্দ্রের সাথে সংঘাতে যাবেন না বলছেন।
তারপর আসা যাক অখিলেশ আর মায়াবতীর কথায়। দুজনে সব অতীত বৈরিতা ভুলে উত্তরপ্রদেশে একজোট হয়ে লড়েছিলেন। সেই জোটের উপরে আমরা বিজেপিবিরোধীরা সকলেই অনেক আশা (নাকি দুরাশা?) করেছিলাম। পরাস্ত হওয়ার পর থেকে সংসদে আনা সমস্ত অগণতান্ত্রিক বিলে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি লক্ষ্মী হয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সংবিধানকে এবং গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কাশ্মীরিদের প্রতি যা করা হল, আম্বেদকরের নামে শপথ নেওয়া মায়াবতীর পার্টি তাতেও বিনা বাক্য ব্যয়ে সমর্থন জানিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদের সূতিকাগার, মোদী-শাহের ইন্দ্রপ্রস্থ যে গুজরাট, সেখানে তিন মহারথী এক হয়েছিলেন বিজেপিকে হারাবেন বলে। বামপন্থী, আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশ মেওয়ানি হাত মিলিয়েছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল উচ্চবর্ণের জন্যে সংরক্ষণ দাবী করা নেতা হার্দিক প্যাটেলের সাথে। এই বিপরীত মেরুর রাজনীতি কী করে মিলতে পারে তা নিয়ে যখন জিগ্নেশকে প্রশ্ন করা হয়েছিল নির্বাচনের আগে, তখন তিনি বলেছিলেন আগে তো বিজেপিকে হারাই, তারপর ওসব বুঝে নেব। বিজেপি বৃহত্তম বিপদ, আগে ওদের হারাতে হবে — এই যুক্তিতে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্টদের পরামর্শ দিয়েছিলেন দিদির হাত শক্ত করতে। ফলাফলে দেখা গেল পরেরটা পরে হবে যুক্তি মানুষ বিশ্বাস করেননি। জিগ্নেশ আর হার্দিকের সঙ্গে জুড়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অল্পেশ ঠাকোর। অল্পেশ এখন বিজেপিতে, হার্দিক নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় নির্বাচনে লড়তে না পারার পর থেকে চুপ, জিগ্নেশ একা পড়ে গেছেন।
আর কে বিজেপিবিরোধী ছিলেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অর্থাৎ আম আদমি পার্টি। ওঁদের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। দিল্লীতে যে ওঁরা একটা আসনও জিততে পারেননি সেটা বড় কথা নয়। বিজেপির কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী প্রচার, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পার্টিজান কার্যকলাপের মধ্যে আপের মত একটা ছোট পার্টির না জিততে পারা দোষের নয়। কিন্তু বরাবরের লড়াকু কেজরিওয়াল কেমন যেন মিইয়ে গেছেন নির্বাচনের পর থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নিয়ে তাঁর আর কোন বক্তব্য নেই। দিল্লীকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক এই দাবী তিনি কবে থেকে করে আসছেন। অথচ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে তিন টুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া হল, তিনি সমর্থন করলেন।
দেবগৌড়ার দল নিজেদের বিধায়ক, সাংসদ বিক্রি হওয়া আটকাতে পারছেন না, ডি এম কে ও সরকারের বাধ্য সন্তান।
তাহলে বাকি রইল কারা? কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স আর হায়দরাবাদের আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে (যিনি লম্বা দাড়ি রাখেন আর ফেজ পরেন বলে আমরা মৌলবাদী বলে ধরেই নিয়েছি, যদিও গেরুয়া পরা সাংসদদের দেখে মৌলবাদী মনে হয় না) বাদ দিলে, বাকি রইলেন বামপন্থীরা। আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন। বস্তুত, এন আই এ আইনে রাজ্য সরকারকে ঠুঁটো জগন্নাথ আর এন আই এ কে সর্বশক্তিমান করে দেওয়ার বিপক্ষে লোকসভায় ভোট দিয়েছিলেন ঠিক ছজন — চার বাম সাংসদ আর ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং ওয়েসি।
ফ্যাসিবাদ ছেঁকে দিয়েছে। এখন থেকে ভারতে তার যত বিরোধিতা হবে, যেটুকু বিরোধিতা হবে তার নেতৃত্ব বামপন্থীদেরই দিতে হবে। তাঁরা চান বা না চান, বিজেপিকে তাত্ত্বিকভাবে ফ্যাসিবাদী বলে মানুন বা না মানুন। কারণ বাফারগুলো আর নেই, আর থাকবে না। কেউ সি বি আই, ই ডি ওষুধে জব্দ, কেউ নিজের ক্ষমতাটুকু ধরে রাখতে পারলেই খুশি, কাউকে স্রেফ কিনে নেওয়া গেছে এবং যাবে। কিন্তু বামপন্থীদের দিকে সিবিআই, ই ডি লেলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ তাঁদের দুর্নীতি নেই। পশ্চিমবঙ্গের কিছু সেজ নেতা ছাড়া কাউকে কিনে ফেলাও যাচ্ছে না।
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন, কারণ চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে সিপিএমের দুর্নীতিগ্রস্ত এল সি এস, পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত প্রধানের মুখ আপনার মনে পড়বে, পড়া সঙ্গত। কিন্তু মনে রাখবেন, ভারতে এ পর্যন্ত ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে যে দুটি বামপন্থী দল, তাদের আমলে সরকারী স্তরে দুর্নীতি ভারতের অন্য যে কোন রাজ্যের চেয়ে কম৷ আর কোন দলে আপনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মানিক সরকার বা পিনারাই বিজয়নের মত জীবনযাত্রার মুখ্যমন্ত্রী দেখাতে পারবেন কি? ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের মত সৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে কজন পাওয়া গেছে বাজার অর্থনীতির যুগে? সদ্যপ্রয়াত নকশাল নেতা এ কে রায় বা শঙ্কর গুহনিয়োগীর কথা নাহয় না-ই বললাম। না-ই আলোচনা করলাম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী এস ইউ সি আই নেতা সুবোধ ব্যানার্জির কথা। তাঁরা তো প্রাগৈতিহাসিক লোক বলে গণ্য হন আজকাল।
এখন প্রশ্ন, বামপন্থীরা লড়বেন কী করে? কতটুকু শক্তি তাঁদের? আর এস এস (বিজেপি তো ফ্রন্ট মাত্র) নামক কর্পোরেটপুষ্ট বেহেমথের সামনে তাঁরা কতটুকু? যদি বামপন্থী বলতে ক্রমহ্রাসমান সিপিএম বোঝেন তাহলে সত্যিই তাঁরা পারবেন না। যদি সীমিত সাংগঠনিক শক্তির সি পি আই বোঝেন তাহলে তাঁরাও পারবেন না। যদি আলাদা করে সি পি আই (এম-এল) লিবারেশন বোঝেন তাহলে নিঃসংশয়ে বলা যায় তাঁরাও পারবেন না। কিছু কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী এস ইউ সি আই বা আর এস পি, ফরোয়ার্ড ব্লক — এঁরা কেউই পারবেন না। কিন্তু এঁরা সকলে যদি একত্র হন, তাহলে শক্তিটা উড়িয়ে দেওয়ার মত হয় না। এঁরা এক হলেই কি জিতে যাবেন? বা জনসমর্থন পাবেন? এক এক করে উত্তর ভাবা যাক।
কে যেন বলেছেন “I do not fight fascists because I will win. I fight fascists because they are fascists.” এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কথা নেই। সমস্ত বামপন্থী শুধু নয়, সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষেরই এই কথাটাই শিরোধার্য করা দরকার। বড় কথা হল সমস্ত বামপন্থী এক হতে পারবেন কিনা।
লোকসভা নির্বাচনের আগে ৩রা ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের উপস্থিতিকে বৃহত্তর বাম ঐক্যের পূর্বাভাস বলে যাঁরা আশা করেছিলেন, অচিরেই তাঁদের ভুল ভেঙে যায় কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের উদগ্রীব উন্মাদনায়। আজকের সঙ্কটেও, ভয় হয়, বাম ঐক্যের চেয়ে বৃহত্তম বামপন্থী দলটির নেতৃত্বের কাছে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের সখ্য বেশি প্রার্থনীয় না হয়। আরো আশঙ্কা এই যে ঐক্যের প্রচেষ্টা হলে হয়ত লিবারেশন কর্মীরা বলবেন “অমুক বছর যে আমাদের অমুক কমরেডকে ওরা মেরেছিল?” প্রত্যুত্তরে সিপিএম কর্মীরাও অনুরূপ হিংসার ইতিহাস তুলে ধরবেন। এস ইউ সি আই বলবেন “সিপিএম সংশোধনবাদী”, আর সিপিএম বলবেন “ওরা আবেগসর্বস্ব অতি বাম। বিপ্লবের পক্ষে ক্ষতিকর।”
এই যদি চলতে থাকে, তাহলে ভারতে বামপন্থী বলে আর কেউ তো থাকবেই না, বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায় ভারত ব্যাপারটাই আর থাকবে না।
এবার জনসমর্থনের প্রশ্ন। বামপন্থীরা সমর্থন পাবেন, কিন্তু পেতে গেলে ঠিক করতে হবে কাদের সমর্থন চাইছেন। সকলের সমর্থন কথাটার আজ আর কোন মানে নেই। ভারতে এখন ঔপনিবেশিক শাসন চলছে না। হিন্দু ফ্যাসিবাদ বাইরে থেকে আসা জিনিস নয়। তাই একে পরাস্ত করতে মহাত্মা গান্ধী যেরকম দল মত ধর্ম জাতি নির্বিশেষে সব ভারতবাসীকে এক করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেরকম প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না। স্পষ্টতই ভারতে যে সামাজিক ওলট পালট হয়নি অথচ হওয়া উচিৎ ছিল ইতিহাসের নিয়মে, এখন তারই সময়। অর্থাৎ এখন পক্ষ নেওয়ার সময়। বামপন্থীরা, যদি সত্যিই বামপন্থী হন, তাহলে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পক্ষ নেবেন। নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষ নেবেন। সারা পৃথিবীতে, আমাদের দেশে তো বটেই, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণকে গ্রাস করতে উদ্যত পুঁজিবাদ। পুরো গ্রহটারই ধ্বংস সাধনে উদ্যত, সরকারপুষ্ট বৃহৎ পুঁজি। ধ্বংস থেকে বাঁচতে হলে অরণ্যের অধিকার অরণ্যবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাই বামপন্থীদের আদিবাসীদের পক্ষেও অবশ্যই থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে এঁরাই কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তবে এঁদের পক্ষে দাঁড়াতে হলে বামপন্থীদের দীর্ঘকাল সমর্থন করতেন এমন অনেক মানুষের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিও কিন্তু নিতে হবে। গোড়াতেই বলেছি ফ্যাসিবাদ অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনি। সেকথা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়। চারপাশে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, জীবনে কখনো বামপন্থীদের ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেননি এমন বহু মানুষের সুপ্ত মুসলমানবিদ্বেষ কেমন বেরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের ভোট এক লহমায় ২৩% থেকে ৭% এ নেমে আসার পেছনে এঁরা বড় কারণ। অবশিষ্ট সাত শতাংশের অনেকেও যে “কাশ্মীরকে বেশ টাইট দেওয়া গেছে” ভাবছেন না এমনটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদীরা আরো সূক্ষ্ম ছাঁকনি প্রয়োগ করতে চলেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং চাকরিতে বর্ণভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। তাতে যে বহু বাম সমর্থক উচ্চবর্ণের মানুষই উল্লসিত হবেন তা পরিষ্কার। বর্ণবাদকে আলাদা করে বোঝার প্রয়োজন নেই, শ্রেণীর লড়াই ছাড়া আর কোন লড়াই নেই — এই ভ্রান্তির ফল তখন বামপন্থীদের ভুগতে হবে। অর্থাৎ আরো অনেক সাবেকি সমর্থক সরে যাবেন। বামপন্থীরা সে ঝুঁকি নেবেন তো? এখন অবশ্য তাঁদের আর হারানোর কিছুই নেই। আর কবি তো বলেছেনই “তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে। তা বলে ভাবনা করা চলবে না।”

হায়দারের দেশ, আমার দেশ

যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের?

হিন্দুশাস্ত্র বলেছে পুং নামক নরক থেকে উদ্ধার করে যে, সে-ই হল পুত্র। কিন্তু ভূস্বর্গপ্রতিম নরক থেকে উদ্ধার করা কোন্ পুত্রের পক্ষে সম্ভব? তাছাড়া হিন্দুশাস্ত্রের বিধান বিধর্মীদের বেলায় খাটে কিনা সেটাও গুরুতর প্রশ্ন। খাটলেও সবার উপরে AFSPA (Armed Forces’ Special Powers Act) সত্য তাহার উপরে নাই। অতএব যখনই হায়দারের বাবা নিরুদ্দেশ হয়েছেন তখনই তো বোঝা গেছে তাঁর আদরের পুত্রটি যতবড় তালেবরই হোক না কেন, সে এসে বাবাকে উদ্ধার করতে পারবে না, তাঁর পরিণতি যা হবার তা-ই হবে। প্রত্যাশা বাবারও ছিল না। তাই তো এলাকার সুপরিচিত শ্রদ্ধেয় ডাক্তারবাবু সন্দেহভাজন নাগরিকের আলখাল্লায় পরিচয়পত্র হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে যান হায়দারের জন্য ঈশ্বর আছেন, তিনিই থাকবেন। অর্থাৎ বোঝা গেল ‘রোজা’ সুলভ নিরুদ্দেশ লোকটিকে খুঁজে বেড়ানোর রোমাঞ্চ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে নেই।
কি করে বুঝলাম নেই? কি যে বলেন! এটা ২০১৪। খোঁজখবর না নিয়ে, দু-একজন ফিল্মপন্ডিতের লেখাপত্র না পড়ে কি আর পয়সা খরচা করে দেখতে গেছি ছবিটা?
না। হলে যে জনাকুড়ি দর্শক ছিল তারা সবাই মোটেও অতসব জেনে যায়নি। তার প্রমাণ ডঃ মীর যখন মিলিটারির মুখঢাকা খোঁচড়টির সামনে দাঁড়িয়ে, তখন সোচ্চার প্রার্থনা “চিনিস না, চিনিস না”। তবুও সকলেই বুঝলেন যে ডঃ মীর আর ফিরবেন না। কারণ অবচেতনে আমরা সকলেই জানি, উগ্রপন্থীরা ধরে নিয়ে গেলে তবু ফিরে পাওয়ার আশা আছে, পুলিশ বা মিলিটারির বিষনজরে পড়লে কেউ ফেরে না। ডঃ মীর আমাদের অচেনা হতে পারেন, ভিখারী পাসোয়ান তো অচেনা নয়।
দেশপ্রেম ব্যাপারটা ভারী গোলমেলে। আমি পশ্চিমবঙ্গবাসী, স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে বেশ একটু আত্মশ্লাঘা আছে, কাশ্মিরীদের মত ভারত আমার উপরে শোষণ চালাচ্ছে এরকমও মনে হয়না চট করে। অথচ যে লোকটাকে স্পষ্ট দেখলাম ভারতবিরোধী যোদ্ধার প্রাণ বাঁচাচ্ছে তার বাড়িটা উড়ে গেল দেখে আমার বেশ রাগ হল। এমনকি লোকটাকেও মানবতাবাদী বলেই মনে হচ্ছিল। কি আপদ বলুন দেখি!
লেনিন নাকি অনেক ঝানু কমরেডের মতামত অগ্রাহ্য করে আইজেনস্টাইনের ছবির জন্য টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। যুক্তিটা ছিল এই যে ফিল্ম যা পারে তা হাজারটা বক্তৃতাও পারে না। ‘হায়দার’ দেখার পরে এটা অকাট্য যুক্তি বলেই মনে হয়। অরুন্ধতী রায় কাশ্মিরীদের উপর অন্যায় নিয়ে যতবার লেখেন ততবার দেশদ্রোহী আখ্যা পান, মহিলা বলে ধর্ষণের হুমকিও শোনেন। অথচ ঐ যে দু ঘন্টা চল্লিশ মিনিট হিন্দুরাষ্ট্র হতে চাওয়া দেশের মূল ভূখন্ডের আমরা কয়েকজন প্রথমে হিলাল মীরের জীবনভিক্ষা করলাম নিজ নিজ ঈশ্বরের কাছে, তারপর চাইলাম হায়দার তার ভারতবন্ধু কাকাকে খুন করুক, প্রতিশোধ নিক বাবার হয়ে, এ কি ফিল্ম ছাড়া কোনকিছুর দ্বারা সম্ভব হত? আবার হল থেকে বেরিয়ে দিব্য বাড়ি চলে এলাম, একবারও নিজেকে দেশদ্রোহী মনে হলনা কিন্তু। অন্য কেউও তেমন অভিযোগ করে গ্রেপ্তার টেপ্তার করেনি এ পর্যন্ত।
যখন হায়দার আমাদের সবাইকে চমকে দিয়ে তার সবচেয়ে ঘেন্নার মানুষটাকে জীবনযন্ত্রণা ভোগ করার জন্য ছেড়ে দিল তখন তো একটা বিরাট চড় এসে পড়ল আমার গালেও কারণ আমিও তো বিড়বিড় করছিলাম “চালা, গুলিটা চালা”। অ্যারিস্টটল তো বলেছিলেন ট্র্যাজিক নায়কের কষ্টভোগের মধ্যে দিয়ে আমারও কষ্টভোগ এবং ফলতঃ পাপস্খালন। ‘Hamlet’ দেখে তাই-ই তো হয়। কিন্তু বিশাল ভরদ্বাজ কি ঠিক তা ঘটালেন? ট্র্যাজিক নায়ক যখন তার ট্র্যাজেডির ঊর্দ্ধে উঠে নতুন পথের সন্ধান দিয়ে যায়, কী বলে তাকে? Catharsis শব্দটা কি ধরতে পারে সেইসময়ে দর্শকের অপরাধবোধকে?
বয়ঃসন্ধিকালে দেখেছিলাম সেই ছবিটা — সেখানেও একটা খোঁজ ছিল; সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী খুঁজে বেড়াচ্ছে অপহৃত স্বামীকে সেই কাশ্মীরেই। কি খারাপ সেখানে কাশ্মীরের লোকগুলো। গোটা রাজ্যটায় ভালো মানুষ বলতে শুধু এক মন্দিরের পুরুত আর একটা অবলা মেয়ে। বাকি সবাই এ কে ৪৭ চালায় আর জাতীয় পতাকা পোড়ায়, এবং নামাজ পড়ে। কি মজা! কত সোজা ছবি। কিচ্ছু ভাবতে টাবতে হয় না। বেশিরভাগ লোক যেমনভাবে কাশ্মীরকে ভাবে ঠিক তেমনই দেখানো। ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৯৫ তে। ‘হায়দার’ আমাদের ঐ সময়েরই গল্প বলছে। মানে কাশ্মীরকে কাশ্মীরের চোখ দিয়ে দেখতে আমাদের সময় লাগল দু দশক। এ বড় ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি; এর কাছে ‘Hamlet’ শিশু। অথচ আমাদের দাবী হল কাশ্মীরিরা যেন এদেশটাকে নিজের ভাবে, গলা ছেড়ে “জয় হিন্দ” বলে। Chutzpah বটে।
হায়দার আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের ছাত্র ছিল। কবিতাও লিখত। তার হাতে কি কোনভাবে এসে পড়েছিল নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’? সে জন্যই কি সে জন্মভূমিকে প্রচলিত নামে সম্বোধন না করে পছন্দের নামে ইসলামাবাদ বলে ডাকে? আমাদের সকলেরই তো বড় আদরের বড় ব্যক্তিগত বাবা-মায়ের বিছানাটা, বাবার চেয়ারটা, বাবার প্রিয় গানটা, বাড়িটা, পাড়াটা। সেইজন্যেই দেশটা। যার সেগুলো হারিয়ে যায় সে তো ঈশ্বর আর সীতার মত দেশ খুঁজে বেড়ায় আজীবন।
যত সজোরে দেশপ্রেম ঘোষণা করছি আমরা আর অন্যের দেশপ্রেম দাবী করছি তত কি দেশটা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের? হায়দার কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করতে চেষ্টা করেছে। মহাত্মা গান্ধী নামে এক দেশদ্রোহী ট্র্যাজেডি কাটিয়ে ওঠার ওরকমই একটা পথ বাতলেছিলেন বটে দাঙ্গায় সন্তান হারানো এক হিন্দু বাবাকে — “প্রতিশোধ ভুলে যাও, একটা অনাথ মুসলিম বাচ্চাকে দত্তক নাও।” সেই যে রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ছবিটায়।
ওহো! সে তো আবার একটা ইংরেজ। ওর দেশের বিরুদ্ধেই তো আবার আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম। বোঝো কান্ড! এ তো দেখছি দেশ ব্যাপারটাই বেশ গোলমেলে!

*এটা ফিল্ম রিভিউ নয়। ওটা লেখার বিদ্যে আমার নেই, এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যও ছিল না।

শিক্ষণীয়

শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল

আজকাল লিখতে ইচ্ছে করে না খুব একটা। আর কতদিন যা লিখতে ইচ্ছে করে তা লেখা যাবে তাও অনিশ্চিত। তাই দুটো কথা লিখে দিই। না লিখে আর থাকা গেল না বলেই লিখছি, নইলে কাউকে “বোর” করার ইচ্ছা নেই।

একজন সাংবিধানিক প্রধান (বেচারা সংবিধান) আপত্তি করেছেন ওয়েস্ট বেঙ্গলের লোকেরা কেন ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করে তাই নিয়ে। তার জবাবে সকলে বলাবলি (এবং লেখালিখি) করছেন যে এটা ভুলভাল কথা বলে খবরে থাকার চেষ্টা, উনি ফুটবল তো জানেনই না, ইতিহাসও জানেন না ইত্যাদি।
এগুলো সবই ঠিক কথা। কিন্তু কথায় বলে প্রাজ্ঞ লোকের প্রজ্ঞার চেয়ে মূর্খের মূর্খামি দেখে অনেক বেশি শেখা যায়। এখানেও কিন্তু শেখার উপাদান আছে। কী সেটা?
হিন্দুত্ববাদীদের (“রাজ্যপাল, রাষ্ট্রপতির কোন দল হয় না” কথাটা এখন “সদা সত্য কথা বলিবে” রকমের বাতিল প্রবাদ) চিরকালই বাংলাদেশের হিন্দুদের দুঃখে বুক ফাটে। তাদের দীর্ঘদিনের ঘোষিত দাবী হল বাংলাদেশ থেকে যে হিন্দুরা ভারতে চলে আসে তাদের শরণার্থী হিসাবে এ দেশে আশ্রয় দিতে হবে। আর যে মুসলমানরা আসে তাদের অনুপ্রবেশকারী গণ্য করে ফেরত পাঠাতে হবে। ২০১৪ সালে সরকারে আসার পর একে কাজে পরিণত করতে তারা বিশেষ উদ্যোগও নিয়েছে। আসামে এন আর সি চলছে পুরো দমে (তাতে আসলে কী ঘটছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা করছি না), অন্যদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইন হচ্ছে। সেই আইনে বলা হচ্ছে যে কোন দেশ থেকে জাতিগত হিংসার শিকার হয়ে চলে আসা হিন্দুরা (বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকলকেই সাপটে হিন্দু ধরে নেওয়া হয়েছে অবশ্য) এ দেশে নাগরিকত্বের অধিকার পাবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ বা পূর্বতন পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীরা সহানুভূতিশীল। অনেকটা সেই কারণেও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের মধ্যে বিজেপির সমর্থন ক্রমবর্ধমান। যাঁরা নিজেরা বাঙাল তাঁরা জানেন যে আত্মীয়স্বজন অনেকেই ভাবছেন “হোক বাংলায় এন আর সি। ওরা আমাদের বাপ ঠাকুর্দাদের খেদিয়ে দিয়েছিল, বিজেপি এসে ওদেরও একটু দিক।”
তা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক তো মূলত বাঙালরাই। দেশভাগ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বহু আগে তৈরি ক্লাব হলেও ইস্টবেঙ্গলের হার জিতের সঙ্গে যে উদ্বাস্তু হয়ে এ পারে চলে আসা বাঙালদের হাসি চোখের জল মিশে থাকে তা বাঙালি মাত্রেই জানে। সাংবিধানিক প্রধানবাবুও বিলক্ষণ জানেন। যদি উনি মোহনবাগান সমর্থক হন, তাহলে তো আরো বেশি করে জানেন। সেক্ষেত্রে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের জন্যে তো ওঁর বিশেষ ভালবাসা থাকার কথা ছিল। উল্টোটা হল কেন?
ব্যাপারটা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাঙালদের জন্যে শিক্ষণীয়। শিক্ষা নেওয়া সবসময় ভাল। পিঠে লাঠির বাড়ি পড়ার আগে নেওয়া গেলে আরো ভাল।

একজন লোক জোম্যাটোর মাধ্যমে খাবার কিনতে চেয়েছিল। শেষ অব্দি অর্ডার বাতিল করে কারণ খাবার দিতে যার আসার কথা ছিল সে মুসলমান। আর আমাদের ইনি বিরাট হিন্দু, মোছলমানের ছোঁয়া খান না। তা জোম্যাটো বিরাট হিন্দুটিকে বলেছে খাবারের কোন ধর্ম নেই, খাবার নিজেই একটা ধর্ম। উপরন্তু জ্যোমাটোর বাবু আবার বলেছেন আমরা এসব অন্যায় আব্দার রাখব না, তাতে যা হয় হবে। বলতেই গেল গেল রব উঠেছে, হাজার হাজার বছরের ধর্ম একটা ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মালিকের খোঁচায় নাকি রসাতলে যাচ্ছে। অতএব ধর্ম অন্তপ্রাণ হিন্দুরা সবাই মিলে অ্যাপটি আনইনস্টল করতে লেগেছে।
এ সম্বন্ধে কিছু শুকনো কথা বলার আছে। প্রথমত, জোম্যাটো বেশ করেছে। শুধু তাই নয়, যে লোকটি অর্ডার বাতিল করেছে তার কাজটা বস্তুত অস্পৃশ্যতা। দেশে অস্পৃশ্যতাবিরোধী আইন আছে। সেই আইন অনুযায়ী লোকটিকে অভিযুক্ত করা যায় কিনা সেটা আইনজ্ঞরা বলতে পারবেন, তবে নীতিগতভাবে এটা অস্পৃশ্যতাই।
দ্বিতীয়ত, আমাদের অফিসের পাশেই একটা নাম করা রেস্তোরাঁ থাকায় বিভিন্ন ডেলিভারি অ্যাপের হয়ে কর্মরত ছেলেদের সাথে আমাদের অল্প স্বল্প আলাপ আছে। যে কোন পেশার লোকের যে ন্যূনতম নিরাপত্তা প্রাপ্য তা তাদের নেই। ছেলেগুলো মোটামুটি লেখাপড়া জানা এবং বাইক চালায় দেখে ভুল করবেন না। এরা আক্ষরিক অর্থেই দিন আনে দিন খায়। ফলত ক্ষিদে পেলে পিঠের বাক্স খুলে অন্যের অর্ডার দেওয়া খাবারও খায়। ওদের জায়গায় আমি থাকলে আমিও খেতাম। বেশ করতাম।
সারা পৃথিবীতে মানুষের শ্রমকে বড় লোকেরা শস্তায় কিনে নিয়ে আরো বড়লোক হচ্ছে। তাই একুশ শতকের অর্থনীতিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হল দালালি। নানারকমের দালালি, যেখানে বিনিয়োগ তেমন কিছু নয় কারণ আসল পুঁজিটা হল শ্রম, যা খুব শস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। শুধু ভারতের জোম্যাটোর ডেলিভারি বয়রা নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যামাজনের কর্মীরাও একদম ভাল নেই। সেই কারণেই কদিন আগে প্রাইম সেলের দিনগুলোয় তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল।
এসবের প্রতিবাদ করতে চান? খুব ভাল কথা। এইভাবে শ্রমিকদের শোষণ করার জন্যে অ্যামাজনকে গালাগাল দিন, জোম্যাটোকেও গালাগাল দিন। তা বলে সংখ্যাগুরু বাঁদরামির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে পাবলিসিটি স্টান্ট বলে উড়িয়ে দেবেন না। যদি এটা স্টান্ট হয় তাহলে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্টান্ট যা দেখানোর ঝুঁকি আজকের ভারতে বিশেষ কেউ নেবে না। আমাদের কোটিপতি ক্রিকেটারদের দেখছেন না? বিমুদ্রাকরণকে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ বলে দিতে পারেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে, অথচ নানা অজুহাতে যখন বেছে বেছে একটাই সম্প্রদায়ের মানুষকে খুন করা হয় তখন এঁরা অন্তত পাবলিসিটির জন্যেও একটা কথা বলেন কি? রূপোলি পর্দার তারকারাও তথৈবচ। সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকাকে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন গণপিটুনি নিয়ে। তো তিনি বলেছিলেন তিনি নাকি বিষয়টা ঠিক জানেন না। অর্থাৎ এই স্টান্টটা দেখাতে অমিতাভ বচ্চনও ভয় পান।
উনপঞ্চাশজন নানা পেশার বিশিষ্ট মানুষ অবশ্য দেখিয়েছিলেন স্টান্টটা। ফল কী? পাটনা হাইকোর্টে তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। বোঝা গেল কতটা বিপজ্জনক এই স্টান্ট? সেই স্টান্ট যদি নিজেদের পুরো ব্যবসার ঝুঁকি নিয়ে জোম্যাটো কর্তৃপক্ষ দেখিয়ে থাকেন তাহলে আপনার অবশ্যই হাততালি দেওয়া উচিৎ। অবশ্য আপনি যদি প্রকাশ্যে লিবারাল আর মনে মনে হিন্দুত্ববাদী হন তাহলে আলাদা কথা।

%d bloggers like this: