কিচ্ছু মিলছে না

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় এক ধরণের প্রশ্ন আসত, “অমুকের সাথে তমুকের পাঁচটি সাদৃশ্য লেখো।” আমরা তখন পাশে রাখা ছয় ইঞ্চি স্কেলটা টেনে নিয়ে ঠিক খাতার মাঝ বরাবর উল্লম্ব ভাবে একটা দাগ টানতাম। তারপর তার ডাইনে বাঁয়ে দু পক্ষের বৈশিষ্ট্যগুলো লিখতাম। মজার কথা, যে দুটো প্রাণীর বা উদ্ভিদের বা বস্তুর সাদৃশ্য জানতে চাওয়া হত, তাদের বৈসাদৃশ্য জানতে চেয়েও প্রশ্ন আসত অনেক সময়। অর্থাৎ তাদের মিল থাকলেও তারা কিন্তু হুবহু এক নয়। কেন এমন হয় তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের মাস্টারমশাই সুবীরবাবু। বলেছিলেন “জানবে সাদৃশ্য থাকলে তবেই বৈসাদৃশ্যের প্রশ্ন আসে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কী কী সাদৃশ্য, কী কী বৈসাদৃশ্য সেটা জিজ্ঞেস করা যায়। পাগল ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করে না মানুষ আর ছাগলের কী কী সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য।”
এইসব কথা আমার বেশ কয়েক বছর ধরে খুব মনে হচ্ছে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী আর মুখ্যমন্ত্রীকে দেখে। ওঁদের খুব লড়াই, আবার উনি সেদিন বললেন, নাকি মিষ্টি খাওয়াও চলে। শুনে ইনি কিন্তু বললেন না এসব মিথ্যে কথা। শুধু বললেন এরপর থেকে মাটির লাড্ডু না কিসব যেন পাঠাবেন, খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙে যাবে। স্কুলে পড়তে আমিও বন্ধুদের উপর রেগে গেলে এরকমই বলতাম। ফলে খুবই নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লাম। আমিও তো মানুষ, আমারও তো ইচ্ছে করে সেই সেকালের মত পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাই ভাবলাম লিখেই ফেলি কিছু একটা। কী লিখি, কী লিখি? মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য লিখি। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো শুধু দুজন মানুষ নন, তাঁরা হলেন, সাহেবরা যাকে বলে, কাল্ট ফিগার। অদূর ভবিষ্যতেই তাঁদের জীবন ও বাণী আমাদের সন্তানরা পাঠ্য বইতে পড়বে। চাকরি বাকরি চলে গেলে বাড়িতে বসে টিউশন করার সময় আমার এই লেখাটা নোট হিসাবে কাজে লেগে যাবে। তেমন জনপ্রিয় করতে পারলে ‘প্রতীকদার নোট’ হিসাবে অমুক প্রকাশনীর সহায়িকা বই হয়েও বেরোতে পারে। রয়্যালটি থেকে বিলক্ষণ দু পয়সা কামাতে পারব।
আগে বৈসাদৃশ্যগুলোই দেখা যাক।
উনি পুরুষ, ইনি নারী। উনি গুজরাতি, ইনি বাঙালি। উনি বিজেপি নেতা, ইনি তৃণমূল নেত্রী। অনেকক্ষণ মাথা চুলকেও আর কিছু বার করতে পারলাম না। এই জন্যে সুবীরবাবুর হাতে আমি চিরকাল কম নম্বর পেতাম। আচ্ছা, নাহয় সাদৃশ্যগুলো লেখার চেষ্টা করে দেখি।
ওনার সরকার অমুকটা পারেনি বললেই উনি দায়ী করেন “কংগ্রেস কে সাট সাল” কে, ইনি বলেন “বামফ্রন্ট ৩৪ বছরে যা সর্বনাশ করে দিয়েছে…”
তাতে থেমে গেলেন তো বেঁচে গেলেন, নাছোড়বান্দা হলে উনি বলেন “দেশদ্রোহী”, “পাকিস্তানি”, “আরবান নকশাল”। ইনি বলেন “সিপিএমের লোক”, “মাওবাদী” (নকশাল তকমার সঙ্গে আশ্চর্য মিল না?)। ইদানীং বিজেপিও বলছেন।
ওনার দলবল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর খড়গহস্ত। সেখানে চতুর্দিকে কন্ডোম ছড়িয়ে থাকে, ছেলেমেয়েরা সব মদ, গাঁজা, ড্রাগ ইত্যাদি খেয়ে পড়ে থাকে, আর ভারতকে খণ্ড খণ্ড করার চক্রান্ত চলে — এমনটাই ওঁরা বলেন।
এঁর দলের বিষনজরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানেও নাকি মাওবাদী গিজগিজ করছে। এবং যখন এক উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন হল, তখন এঁর দলের এক পাণ্ডা প্রশ্ন তুললেন “মদ, গাঁজা বন্ধ। তাই কি এত প্রতিবাদী গন্ধ?” তিনি আবার এখন ওঁর দলের পাণ্ডা।
তা এর সমাধান হিসাবে ওঁর মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী ক্যাম্পাসে ইয়া বড় জাতীয় পতাকা টাঙানোর ফতোয়া দিয়েছিলেন, উপাচার্য ক্যাম্পাসে মিলিটারি ট্যাঙ্ক রাখার নিদান দিয়েছিলেন। আর এঁর শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলেছিলেন সরকারের পয়সায় খেতে পরতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারের কথা শুনেই চলতে হবে। অতএব কিভাবে ভর্তি হবে আমি ঠিক করব, কী পড়ানো হবে আমি ঠিক করব, ইত্যাদি।
পরিতাপের বিষয় (কার পরিতাপ জানি না) দুটো বিশ্ববিদ্যালয়ই পড়াশোনা, গবেষণায় পারদর্শিতা দেখিয়েই চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অবশ্য দুজনেরই সম্পর্ক গভীর। উনি ‘সম্পূর্ণ’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম এ, ডিগ্রি দেখতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে ওসব তথ্য দেখানো যাবে না, নিয়ম নেই। ইনি পাশ করা উকিল না কী যেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটা ভুলে গেছি।
কর্মসংস্থানের সমস্যার কথা তুললে উনি বলেন “রোজগার নেই মানে? যে পকোড়া বেচে সে রোজগার করছে না?” আর ইনি বলেন তেলেভাজা শিল্পও তো শিল্প।
ওঁর উত্থানকে ওঁর ইংরিজি শিক্ষিত সুটেড বুটেড ধনীর দুলাল বুদ্ধিজীবীরা বলেন লুটিয়েন্স এলিটের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দলিত গরীবের ছেলের উত্থান। এঁর উত্থানকে এঁর বামপন্থী ভদ্রলোক বুদ্ধিজীবীরা বলেন ধুতি পরিহিত ভদ্রলোকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ঘরের মেয়ের উত্থান। ওঁর উত্থানের পর যে দলিতদের প্রাণ ওষ্ঠাগত সেটা চেপে যাওয়াই ভাল। আর এঁর উত্থানের পর যে সাধারণ ঘরের মেয়েরা ধর্ষিত হলেই “সাজানো ঘটনা” হয়ে যাচ্ছে, সেকথা বললেও পুলিশে ধরতে পারে।
পুলিশে ধরা বলতে মনে পড়ল, ওঁর নিন্দা করে, ওঁর পার্টির অন্য নেতাদের নিন্দা করে ফেসবুকে পোস্ট করায় কলেজ পড়ুয়া থেকে সাংবাদিক অব্দি অনেকেই দেশদ্রোহের দায়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এঁর বা এঁর সরকারের নিন্দা করে লোকে অম্বিকেশ, অরুণাচল ইত্যাদি হয়েছে। মিটিঙে প্রশ্ন তুলে শিলাদিত্যও হয়েছে।
প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে উনি করণ থাপারের অনুষ্ঠান থেকে এক গ্লাস জল খেয়ে উঠে গেছিলেন, ইনি দর্শকের প্রশ্ন পছন্দ হয়নি বলে তাকে সিপিএম, মাওবাদী ইত্যাদি বলে দেগে দিয়ে সাগরিকা ঘোষের অনুষ্ঠান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।
দুজনেই কিন্তু লেখক। উনি এক্সাম ওয়ারিয়র লেখেন। এঁর লেখা বই এক্সাম ওয়ারিয়রদের পুরস্কার দেওয়া হয়।
ওঁর বীরেরা বলেন অমর্ত্য সেন অর্থনীতি বোঝেন না, ইরফান হাবিব ইতিহাস জানেন না। এঁর বীর বলেছেন শঙ্খ ঘোষ কোন কবি নন।
উনি বাবা গোরক্ষনাথ, গুরু নানক আর সন্ত কবীর — যাঁরা একে অপরের জীবৎকালে জীবিতই ছিলেন না — তাঁদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বৈঠক করান। তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়কে অধুনা পাকিস্তান থেকে বিহারে এনে স্থাপন করেন। ইনি? ১৯৪১ এ প্রয়াত রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গান্ধীজির ১৯৪৬ এর অনশন ভঙ্গ করান, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সতীদাহ প্রথা রদ করার আইন পাশ করান।
বোর হয়ে যাচ্ছেন, না? আচ্ছা থামা যাক তবে। দুজনেই আবার বজরংবলীর ভক্ত। তিনি গদা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন ইতিমধ্যেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে দুদল ভক্ত নিয়ে গদাপেটা করতে চলে আসবেন হয়ত।

Published by

Pratik

Blogger and poet. Isn't that enough?

Leave a Reply