বেঁচে থাক ডিম ভাত

আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না

ডিম্ভাত নিয়ে চলা বিদ্রুপ এবং তার প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে কতকগুলো কথা বলা দরকার যেগুলো মমতার ব্রিগেড সমাবেশ, বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ ছাড়িয়েও প্রাসঙ্গিক।
১) যাঁরা কোনোদিন কোনো রংয়ের রাজনৈতিক মিছিলে বা সমাবেশে যাননি এবং যাওয়াটা “down market” বলে মনে করেন তাঁদের জ্ঞাতার্থে বলি, বহু মানুষের সাথে হাঁটলে অথবা দিগন্তবিস্তৃত মাঠে লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে বসে থাকলে আর কিছু না হোক একটা জিনিস হয় সেটা হল ইগো নিয়ন্ত্রণে আসে। ছশো কোটি মানুষের দুনিয়ায় আপনি কত ক্ষুদ্র, কত অকিঞ্চিৎকর সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়। শুধু এই কারণেই নিয়মিত মিছিলে, মিটিঙে যাওয়া যেতে পারে। ল্যাজ মোটা হওয়া আটকানোর এর থেকে ভাল প্রতিষেধক নেই।
২) ব্রিগেডের সমাবেশে আসা লোকেদের উদ্দেশ্য বা কোন লোভ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে তা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপ নতুন কিছু নয়, বরাবর হয়ে আসছে। আমাদের বাল্যকালে, সিপিএম তথা বামফ্রন্ট যখন মধ্যগগনে, তখন একটি সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় স্তম্ভে দীর্ঘ লেখা বেরিয়েছিল, যাতে প্রশ্ন করা হয়েছিল “যে দেশে ব্রিগেড নেই সে দেশে কি গণতন্ত্র নেই?” পৃথিবীর সব দেশের গণতন্ত্র এক ছাঁচে ঢালা হোক, একই অর্থনীতি সব দেশে চলুক এই নিও লিবারেল বদমাইশি যাদের তত্ত্ব, বলা বাহুল্য তারাই এসব লিখেছিল। বিশ্বায়নের দুই দশকে আমরা, এ দেশের মধ্যবিত্তরা, এই বুলিগুলো মুখস্থ করে ফেলেছি। বহুজাতিক ব্র‍্যান্ডের জুতো আর জিনস পরতে পেরে আহ্লাদিত আমরাই এখন সগর্বে সকলকে বোঝাই গণতন্ত্র মানে হল পাঁচ বছর অন্তর ভোটটি দিয়ে বাকি সময়টা ঘুমিয়ে থাকা। বিরোধিতা মানেই “disruption” অতএব মিটিং, মিছিল, বনধ সবকিছুই কর্মনাশা। যাদের কর্ম নাশ হচ্ছে রোজ তারা ঘুমিয়ে থাকুক, আমাকে আমার কর্ম করতে দিক। এই চিন্তাভাবনা থেকেই ডিম্ভাত ব্যঙ্গ। এবং এই নিষ্ক্রিয়তার চাষবাসেরই ফল মমতা এবং মোদীর একনায়কত্ব, যেখানে প্রতিবাদ করলেন মানেই আপনি যথাক্রমে উন্নয়নবিরোধী এবং অ্যান্টি ন্যাশনাল। নিও লিবারেল অর্থনীতি, রাজনীতি এখন অস্তাচলে। জায়গা নিচ্ছে ট্রাম্প, ব্রেক্সিট, বলসোনারোর দল। অতএব ফ্রান্সে ব্রিগেড নেই, গণতন্ত্র আছে এবং সেখানে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন চলছে। স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেখানেও ব্রিগেড নেই। কিন্তু একনায়ক হতে চাওয়া রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রায় রোজ আপনারা যাকে “disruption” বলেন তা চলেছে। এমন অবস্থা যে মাঝেমধ্যেই সরকার ঝাঁপ ফেলে দিচ্ছে। আপনি যদি এসব না জানেন বা জেনেও আন্দোলন, সমাবেশ দেখে নাক সিঁটকোন তার মানে একটাই — আপনি backdated বা আপনাদের ভাষায় uncool. অর্থাৎ down market.
৩) লড়াই, আন্দোলন, ইউনিয়ন — এসবকে অপ্রয়োজনীয়, “যাদের কোনো কাজ নেই তারা এসব করে” বলে গালাগাল দিতে হলে ভেবেচিন্তে দেবেন। জেট এয়ারওয়েজের কর্মীদের মত চাকরি থেকে রাতারাতি ছাঁটাই হয়ে গেলে আবার প্রকাশ কারাতের কাছে ছুটবেন না যেন। আরো একটা কথা ভেবে দেখবেন। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সত্যিই কোনো ব্রিগেড সমাবেশে আসা কয়েক লাখ লোকের কোন কাজ নেই, তাহলে সেটা জাতীয় সমস্যা। সেই সমস্যার সমাধানে আপনি কী করছেন? এই সমস্যার সমাধান দাবিও করেছেন কি কখনো? যদি না করে থাকেন তাহলে এই কর্মহীন লোকগুলোকে বিদ্রূপ করার বা নিন্দা করার অধিকার আপনার জন্মায় কী করে?
৪) “এদের তো কিনে নেওয়া খুব সোজা। এদের তো ডিম ভাত (মতান্তরে, স্থানান্তরে বা দিনান্তরে এক প্যাকেট বিরিয়ানি) খাইয়ে দিলেই চলে আসে”। এটা যদি মানুষের শস্তা হওয়ার প্রমাণ হয় তাহলে তো আপনি তো আরো শস্তা। এদের দূর দূরান্ত থেকে আনতে হলে অন্তত যে আনছে তাকে গাঁটের পয়সা খরচ করে বিরিয়ানি খাওয়াতে হয়। আপনি তো আলো ঝলমলে দোকান দেখলেই সপ্তাহান্তে সপরিবারে মলে চলে যান, যা দরকার নেই তা-ও নিজের পয়সা খরচ করে কেনেন, পাঁচ টাকার পপকর্ন দেড়শো টাকায় কেনেন। অর্থাৎ আপনাকে টুপি পরিয়ে আপনার চেয়ে অনেক বড়লোকেরা আরো বড়লোক হয়, এবং আপনার রুচি পছন্দকে কিনে ফ্যালে একটা সমাবেশ আয়োজনের চেয়ে অনেক কম খরচেই।
৫) উপর্যুক্ত কথাগুলো সবই “দেশটার কিস্যু হবে না” ধরণের, প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণপন্থী, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্তদের প্রতি। এ ছাড়াও দুরকমের বামপন্থী আছেন। একদল তাঁদের অপছন্দের পার্টিকে গাল পাড়তে পারার আনন্দে ভুলেই গেছেন যে এই একই গালাগাল বরাবর তাঁদের পছন্দের পার্টিকে দেওয়া হয়েছে, কদিন পরেই আবার দেওয়া হবে। আরেক দল ঠান্ডা ঘরে বসে মার্কস, লেনিন, মাও মুখস্থ করা ছাড়া বিশেষ কিছুই করছেন না কিন্তু ব্রিগেড ফিগেডকে পাত্তা দেন না। কারণ তাঁরা তো কবেই বলেছেন যে কোনো মানুষই নিজের ইচ্ছায় ভোট দেন না এবং সকলকেই জোর করে ব্রিগেডে নিয়ে আসা হয়। এঁরা একদা ভাল করে বন্দুক চালাতে না শিখেই সশস্ত্র বিপ্লব করতে গিয়েছিলেন। সহযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করলেন, কেউ কেউ সারাজীবনের মত পঙ্গু হয়ে গেলেন, এঁরা কে জানে কী করে আস্ত থেকে গেলেন। এখন হয় খবরের কাগজের স্তম্ভের আড়াল থেকে, নয় ফেসবুক ওয়ালের আড়াল থেকে শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। এঁদের বোধ করি বেশি পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথমোক্তরা কেউ বিমান বসুর মত আশি বছর বয়সে পুলিশের লাঠি খেতে যাবেন না। দ্বিতীয়োক্তরা কবিতা কৃষ্ণনের মত মাঠে ময়দানে রোজ ধর্ষণ, খুনের হুমকি অগ্রাহ্য করে রাজনীতি করবেন না। তবে মুখিয়ে আছি মোদীর মিটিংয়ের দিন এঁরা জোর করে আনা, ডিম ভাত খেতে আসা জনতা সম্বন্ধে কটা কথা বলেন তা দেখার জন্যে।
শেষে একটা কথা বলি। আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক সমাবেশ (যে কোনো দলের) সবচেয়ে বড় জায়গা যেখানে আপনাকে আপনার ক্রয় ক্ষমতা অনুযায়ী মাপা হয় না।
আমার পকেটে হয়ত দুটো ডেবিট কার্ড, একটা ক্রেডিট কার্ড। সবকটা মিলিয়ে হয়ত আমার কাছে পাঁচশো ক্রেডিট পয়েন্ট আছে। ধরা যাক আমার স্ত্রীর পার্সেও দুটো ডেবিট কার্ড, আছে নশো ক্রেডিট পয়েন্ট। আমার বন্ধু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক, তার মোটে একটা স্যালারি অ্যাকাউন্টের কার্ড। তার সাথে তার বান্ধবী আছেন, যিনি হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে হাজার পাঁচেক টাকা আছে। আমাদের সাথে আমাদের পরিচারিকা আছেন, যাঁকে মাসে তিন হাজার টাকা মাইনে দিই। তাঁর কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টই নেই। আমরা যদি কোনো সিনেমা হলে যাই বা মলে ঢুকি, পাঁচ জনের আত্মবিশ্বাস হবে পাঁচ রকমের। কারণ আমাদের ক্ষমতা ওই চত্বরে সমান নয়। কোনো কোনো জায়গায় পরিচারিকাকে হয়ত আমাদের সাথে বসতেই দেওয়া হবে না। কে জানে, হয়ত আমরাই চাইব উনি অন্য টেবিলে বসুন বা বাইরে অপেক্ষা করুন। কিন্তু আমরা যদি কোনো মিছিলে যাই বা ব্রিগেডে যাই, পাঁচজনেই সমান। আমাদের পরিচারিকার মত আমাদেরও ঘাসের উপর চটি পেতেই বসতে হবে। সুতরাং মিছিল বেঁচে থাক, মিটিং বেঁচে থাক, সেখানে যাওয়া মানুষের ক্ষিদে পেলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা বেঁচে থাক।
বরং “কেউ যদি বেশি খাও খাওয়ার হিসেব নাও, কেন না অনেক লোক ভাল করে খায় না।”

একজন সাব এডিটর

যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না

রোজ সকালে যে কাগজটা পড়েন সেটার মধ্যে ছাপাখানার শ্রমিকদের কায়িক শ্রমের পাশাপাশি অনেক মানুষের মানসিক শ্রম মিশে থাকে। তার মধ্যে যারা নিজেদের ভাল কাজের জন্যে প্রায় কখনোই পুরস্কৃত হয় না, কিন্তু ভুল হলে প্রচণ্ড তিরস্কৃত হয়, তাদের নাম সাব এডিটর। ভাল খবর বেরোলে সম্পাদকের পিঠ চাপড়ানি এবং পাঠকের কাছে নাম — দুইই হয় রিপোর্টারের। বস্তুত পাঠকের কাছে সাব এডিটর বলে কোনকিছুর অস্তিত্বই নেই প্রায়। সাব এডিটর যখনই কোথাও সাংবাদিক হিসাবে নিজের পরিচয় দেন তখনই শুনতে হয় “ও, আপনি রিপোর্টার?” সাংবাদিকতার ইতিহাস, সব দেশে সব যুগেই, রিপোর্ট তথা রিপোর্টারদের ইতিহাস। কাগজের চমকে দেওয়া হেডিং, ছবির স্মরণীয় ক্যাপশন পাঠক ভোলেন না। কিন্তু যিনি ওগুলো দিয়েছেন তাঁর নাম কাগজে ছাপা হয় না বলে পাঠক জানতেও পারেন না। প্রতিভাবান সাংবাদিকরা যখন আত্মজীবনী বা কাল্পনিক কাহিনী লেখেন তখনো সাব এডিটরদের কথা বড় একটা আসে না। বিখ্যাত রিপোর্টার বা কাগজের সম্পাদক মারা গেলে তাঁর কাগজে (তেমন বিখ্যাত হলে অন্য কাগজেও) খবরটা ছাপা হয়। সাব এডিটর, সে তিনি যত উচ্চপদস্থই হোন না কেন, মারা গেলে সাধারণত তা হয় না। অন্য চাকরিতে কর্মরত কেউ মারা গেলে অফিসে একটা স্মরণসভা হয়, খবরের কাগজের অফিসে দৈনন্দিন কাজের এমন চাপ যে সে ফুরসতও নেই।
অতএব যদি ধরে নিই আমাদের ভাস্করদার, মানে ভাস্করনারায়ণ গুপ্তের, মৃত্যুটাও আমাদের সংবাদজগতে কোথাও রেখামাত্র চিহ্ন রাখিবে না, তাহলে একদমই ভুল হবে না। বিশেষ করে যখন মৃত্যুর বেশ আগে থেকেই ভাস্করদার সাব এডিটরবৃত্তি ঘুচে গিয়েছিল।
এক অর্থে খবরের কাগজে সাব এডিটরদের জীবন মৃত্যুর এই যে অকিঞ্চিৎকর অবস্থান, এটাই সবচেয়ে বাস্তবানুগ। যে কোন পেশার মানুষের জীবন মৃত্যুই তো, খুব বড় কিছু না করে থাকলে, এই বিরাট পৃথিবীতে এরকমই অকিঞ্চিৎকর। তবু, সবচেয়ে নগণ্য লোকটা যখন মারা যায় তখনো তার চেনা জানা মানুষরা, কাছের মানুষরা, অন্তত কয়েকটা দিন শোক পালন করে। কবি নাজিম হিকমত লিখেছিলেন বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর। একবিংশ শতাব্দীতে নিশ্চয়ই আরো কম। তাই ভাবলাম এই বেলা স্মৃতিচারণটা সেরে ফেলা যাক। কদিন পরে আমারই লোকটাকে মনে থাকবে কিনা সে কি হলফ করে বলা যায়?
ভাস্করদার সাথে আমার শেষ দেখা ২০০৭ এ, যেদিন স্টেটসম্যান থেকে তার পাওনা টাকা পয়সার তাগাদা দিতে সে অফিসে এসেছিল। তারপর বার দুয়েক ফোনে কথা হয়েছে। শেষ কথা হয় ২০০৯ এ। আমার বিয়ের নেমন্তন্ন করবার জন্যে ফোন করেছিলাম। ভাস্করদা আসবে বলে কথা দিয়েও আসতে পারেনি। সাব এডিটরদের পক্ষে সেটাই স্বাভাবিক। ভাস্করদা তদ্দিনে হিন্দুস্তান টাইমসের অধুনালুপ্ত সংস্করণের উচ্চপদস্থ সাব এডিটর। উচ্চপদস্থ, কিন্তু সাব এডিটর তো। তারপর থেকে ভাস্করদার সাথে যোগাযোগ আছে যে বন্ধুদের, তাদের কাছ থেকে তার খোঁজখবর নিয়েছি। কারণ ভাস্করদার জীবনে শোনার মত কিছুই ঘটছে না এরকম প্রায় হত না। এক আধবার ইচ্ছে হয়েছে দেখা করার উদযোগ আয়োজন করি, কিন্তু স্বভাবসিদ্ধ আলস্যে সে আর করা হয়ে ওঠেনি। তাহলে এখন লোকটার স্মৃতিচারণ করতে বসলাম কেন? এ কি আদিখ্যেতা নয়? নয়। তার কারণ আমি লিখছি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্যে। কিসের কৃতজ্ঞতা? সেই কথাই বলি।
আমি যখন শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসাবে ২০০৫ এর জুন মাসে দ্য স্টেটসম্যান কাগজে যোগ দিই তখন বহিরঙ্গ আর অন্তরঙ্গ — দুদিক থেকেই কাগজটার অবস্থা জলসাঘর ছবির জমিদারবাড়িটার মত। কাজ শেখার পক্ষে অবশ্য জায়গাটা তখনো চমৎকার ছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে তো সময় লাগে। কী শিখতে হবে, কোনটা আগে শিখতে হবে কোনটা পরে — সেসব বুঝতেও সময় লাগে। আর সেসব বুঝে ওঠার জন্যে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের দরকার হয়। সেই স্বাচ্ছন্দ্য যুগিয়ে দেওয়ায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল আমার তৎকালীন বস, ক্রীড়া সম্পাদিকা ইলোরা সেনের। ব্যাপারটা আরো একটু সহজ হয়েছিল ক্রীড়া বিভাগে আমার সহকর্মীদের মধ্যে আমার দুই সহপাঠী সুদীপ্ত আর অরিজিৎ থাকায়। কিন্তু সাংবাদিক মাত্রেই জানেন, আমাদের পেশায় এক কঠিন ঠাঁই আছে যেখানে নবীন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, এবং যেখানে কেউ কোন সাহায্য করতে পারে না। সে ঠাঁইয়ের নাম নাইট ডিউটি। যখন সেই ডিউটিতে থাকতাম, তখন গোড়ার দিকে বাড়ি যাওয়ার সময় ইলোরাদি বলে দিয়ে যেতেন “ভাস্কর, মনো (মনোজিৎ দাশগুপ্ত), ও রইল। প্রথম প্রথম নাইট করছে তো। একটু দেখো।” ঐ দুজনের ব্যবহারে আমরা (শিক্ষানবিশরা) কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেলাম, ভুল হলেও ভয় নেই। শুধরে দেওয়ার জন্যে ভাস্করদা, মনোদা আছে। আমার কাছে সেদিনের ঐ ভরসাটুকুর দাম, যত বয়স হচ্ছে তত বেড়ে যাচ্ছে।
আমি মফঃস্বলের ছেলে, চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনো সাংবাদিক ছিল না। তার উপর স্টেটসম্যান এমন একটা কাগজ যা পড়ে বাবা ইংরিজি শিখতে বলত ছোটবেলায়। ফলে বেশি রাতে অফিস ফাঁকা হয়ে গেলে অন্য ডেস্কের কার সাথে কতটা কথা বলব, কার সাথে হাসিঠাট্টা করা চলে, কার ঠাট্টায় হাসা চলে আর কার ঠাট্টায় হাসলে তিনি রেগে যাবেন — এসব নিয়ে প্রাথমিক দ্বিধা ছিলই। সেই দ্বিধা কাটাতে যে লোকটা সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল, সেও ভাস্করদাই। ফলে কিছুদিন পরেই দেখা গেল তার ভাষায় আমি হয়ে গেছি “কোন্নগরের সিপিএম।” ভাস্করদার কিন্তু সিপিএমকে ঘোর অপছন্দ। অথচ আমার বাবা সিপিএম করে বলে ঐ নামকরণটা করলেও আমাকে বেশ পছন্দ বলেই মনে হয়।
সেইসময় নাইট ডিউটি শেষ হওয়ামাত্রই বাড়ি আসার জন্যে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল না। আমাকে অফিসেই অপেক্ষা করতে হত ভোর চারটে অব্দি। তারপর অফিসের গাড়ি আমায় নামিয়ে দিত শেষ রাতের হাওড়া স্টেশনে। দিনের প্রথম ট্রেন ধরে আমি বাড়ি ফিরতাম। রাত দেড়টা দুটো নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার পর ঐ যে দুটো ঘন্টা, তা আমার দেখতে দেখতে কেটে যেত ভাস্করদার জন্যেই। হুল্লোড়ে লোকের নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা অত কাছ থেকে দেখার সুযোগ জীবনে আর হয়নি। সেই মধ্যরাতের আড্ডাগুলোতেই ভাস্করদাকে ভাল করে দেখার আমার সুযোগ হল। এবং যত দেখলাম, তত অবাক হলাম।
দেখলাম লোকটা যেমন ঝড়ের বেগে টাইপ করে সন্ধ্যেবেলা, তেমনি দুপুর রাতে গড়গড়িয়ে জয় গোস্বামীর কবিতা বলে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাঞ্জাবী বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে খালিস্তানপন্থী আন্দোলন কী এবং কেন, ভিন্দ্রানওয়ালে ইন্দিরা গান্ধীর ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইন কিনা সেই আলোচনায় ঢুকে পড়ে অনায়াসে। আদবানির প্রশংসা করতে করতে দুম করে ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্প’ শট ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে আরম্ভ করে।
বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে, অফিস থেকে বেরনোর সময়ে দেখা গেছে ভাস্করদা, মনোদাকে পৌঁছতে যাবে আবার আমাকেও হাওড়ায় ছাড়তে যাবে, অত গাড়ি মজুত নেই। ওরা তখন আমায় নামিয়ে দিয়ে বাড়ি গেছে।
স্বভাবতই আমার মত নবীনদের অনেকেরই ভাস্করদাকে তখন দারুণ পছন্দ। দেখা গেল অফিসের সমস্যা নিয়ে ভাস্করদার পরামর্শ তো চাইছিই, উপরন্তু কোন সুন্দরীকে মনে ধরেছে কিন্তু বলে উঠতে পারছি না — সে সমস্যার সমাধানও ভাস্করদার কাছেই দাবী করছি। ভাস্করদা হয়ত বলছে “ওরে ****, এর চেয়ে আমিই বলে আসি নাহয়।”
ভাস্করদার সাথে আমার সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত এক নবমীর রাত। জীবনে প্রথম নবমীর দিন নাইট ডিউটি করছি। ব্যাজার মুখে। কাজ শেষ হওয়ার পর ভাস্করদা টানতে টানতে নিয়ে গেল প্রতিদিন অফিসের সামনে। নিজেরা চা খাচ্ছে, আমাকেও খেতেই হবে। যতই বলি আমি চা খাই না, ভাস্করদা বলে “আমি বলছি, তোকে খেতে হবে **।” খাওয়া হল, তারপর বলল “আচ্ছা, এটা আমার ইচ্ছায় খেলি, এবার তোর কী খাওয়ার ইচ্ছে বল। যা বলবি তাই খাওয়াব।” সেটা সুইগি, জোম্যাটোর যুগ নয়। ক্ষিদেও পেয়েছে তেড়ে। কিন্তু কিছু বলতে পারছি না সঙ্কোচে। শেষ অব্দি ভাস্করদাই “আচ্ছা, তুই ডিম ভালবাসিস তো?” বলে রাস্তার ধারের দোকান থেকে ডবল ডিমের ভুর্জি কিনে দিল। নিউজরুমে ফিরে সামনে বসিয়ে সমস্তটা খাওয়াল। রাত আড়াইটেয় খাওয়া সেই ডিমের ভুর্জির স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।
ওরকম একজন সাব এডিটর হয়ে উঠতে আমরা কেউ পারলাম না। সব বিষয়ে অত আগ্রহ, অত পড়ার শক্তি আমাদের নেই। ওরকম একজন সিনিয়র হয়ে উঠতেও পারিনি। অত মমতাও আমাদের নেই।

ছবি: ভাস্করদার ফেসবুক পেজ থেকে

%d bloggers like this: