হে বাঙাল, ভুলিও না

এই মহাকাব্যিক ট্র‍্যাজেডিকে ১৯৮৯ এ কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিপদের সাথে এক যোগে ব্যবহার করে যারা, তারা যে আসলে বাঙালদের যন্ত্রণারই লঘুকরণ করে

স্বাধীনতার আগে পূর্ববঙ্গে (অধুনা বাংলাদেশ) বসত ছিল এমন হিন্দু — চলতি কথায় বাঙাল। আমি এবং আমার বাবা আর মায়ের পরিবারগুলো যেমন। আমার স্ত্রীর বাবা, মায়ের পরিবারও। ভারতে হিন্দুত্ববাদের রমরমা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নিয়ে আলাদা করে চর্চা অনেক বেড়ে গেছে। নতুন নাগরিকত্ব আইন এবং এন আর সি র আবহেও এদের নিয়ে ক্রমবর্ধমান চর্চা।

“হিন্দু খতরে মে হ্যায়” প্রমাণ করতে কিছুদিন হল কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সাথে এক নিঃশ্বাসে আমাদের কথা বলা হচ্ছে। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের হত্যা ও উচ্ছেদ ঘটেছিল স্বাধীন দেশের একটি প্রদেশের একটি অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসনের মদতে। আর বাঙালদের দুর্দশার কারণ ছিল একটা পরাধীন দেশের দু টুকরো হওয়া। কয়েক লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে এত বিপুল সংখ্যার মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। এই মহাকাব্যিক ট্র‍্যাজেডিকে ১৯৮৯ এ কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিপদের সাথে এক যোগে ব্যবহার করে যারা, তারা যে আসলে বাঙালদের যন্ত্রণারই লঘুকরণ করে সেই চেতনা আজকের বাঙালদের মধ্যে দেখতে পাই না। আরো যা দেখতে পাই না, তা হল দেশভাগের ফলে বহু মুসলমানকেও যে ভিটে ছাড়া হয়ে এ পার থেকে ও পারে যেতে হয়েছিল সেই স্বীকৃতি। স্বাধীনতার আগে পরে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায় সম্পত্তিহানি, প্রাণহানি, মেয়ে বউদের সম্মানহানির ইতিহাস যে তাদেরও আছে — সেই চেতনা। বোঝা যায় হিন্দুত্বের অপরবিদ্বেষী রাজনীতি আমাদের মস্তিষ্কে জাঁকিয়ে বসেছে।

আজকের বাঙাল, অর্থাৎ আমার মত ১৯৪৬-৪৭ না দেখা বাঙাল, এমনকি বাংলা ভাষার জন্যে লড়াই করে একটা আলাদা দেশ তৈরি হল যে যুদ্ধে, সেই ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধও নিজের চোখে না দেখা বাঙাল। তার কাছে গুরুজনদের মুখে শোনা “অরা আমাদের তাড়ায় দিছিল” কথাটুকুই কেবল আছে। তৎসহ ইতিহাস না পড়ার এবং ফেসবুক, হোয়াটস্যাপ পড়ার অভ্যাস আছে। ফলত আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া খুব শক্ত হয় না যে ধর্মীয় নিপীড়নের বদলে পাল্টা নিপীড়নই উচিৎ কাজ। তাই সি এ এ, এন আর সি মিলিয়ে এ দেশের মুসলমানদের যদি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে দেওয়া হয় তো হোক, যদি দেশ থেকে তাড়ানো হয় তাতেও ক্ষতি নেই। “ওরাই তো আমাদের তাড়িয়েছিল” একটি যুক্তি হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া করার সপক্ষে সাক্ষীগোপাল করা হয় ঋত্বিক ঘটককে, যিনি মানুষকে উদ্বাস্তু বানানোর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার প্রতিবাদ করেছেন তাঁর ছবিতে।

যাক সেকথা। ইদানীং তো দেখতে পাই মানবতা কোন যুক্তি নয়। তাই যদি কেউ বলে, আমার বাপ-ঠাকুর্দা উদ্বাস্তু ছিল বলেই আমি চাই না অমন দশা আর কারো হোক — তাকে দল বেঁধে ন্যাকা বলা হয়। সৎ উদ্দেশ্য, অসৎ উদ্দেশ্যের সংজ্ঞাও আমূল বদলে গেছে। নিরস্ত্র, নিরপরাধ মানুষের উপর প্রতিশোধ নেওয়াই সৎ উদ্দেশ্য আজকাল। আমার এক আত্মীয় যেমন এন আর সি নিয়ে আলোচনায় বললেন “আমি বিজেপির সাপোর্টার নই। কিন্তু কোন কাজের উদ্দেশ্য যদি সৎ হয়, কেন সমর্থন করব না? এরা বাংলাদেশ থেকে এসে দেশের কাজকর্ম সব দখল করে নিচ্ছে। কেন অ্যালাউ করব?”

এ হেন বাঙালের কাছে মানবতার যুক্তি দেখিয়ে লাভ নেই। তাই একটা অন্য কথা বলি। আজকের বাঙালরা ভেবে দেখুন, যদি দেশভাগের সময় এ পারের মানুষরা (নেতারা তো বটেই) এই “কেন অ্যালাউ করব” কথাটা বলতেন, তাহলে কী অবস্থা হত আমাদের পূর্বপুরুষদের? আমরা এতদিনে জমিয়ে বসেছি বলে এখন যারা উদ্বাস্তু তারা চুলোয় যাক — আসামের বাঙালরা সেখানকার পূর্ববঙ্গীয় মুসলমান (ওখানে যাদের মিঞা বলা হয়) সম্পর্কে এই মনোভাব পোষণ করেই এন আর সি হয়ে বিপদে পড়লেন। একথা বললেই আমার সেই আত্মীয়ের মত অনেক বাঙালই বলেন “আমার সব ডকুমেন্ট আছে। এখানে এন আর সি হলে আমার ভয় নেই।” আপনি যদি এই ভেবে নিশ্চিন্ত থাকেন, তাহলে আপনি নিজের চারপাশ সম্বন্ধে অদ্ভুত উদাসীন। শেষ পর্যন্ত এন আর সি হোক বা না হোক, আপনার বাপ-ঠাকুর্দাকে যে “অ্যালাউ” করা হয়েছিল সেকথা বলা কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। সোশাল মিডিয়ায় দেখুন, রাস্তাঘাটে কান পাতুন। প্রকাশ্যেই অবাঙালি হিন্দুত্ববাদীরা বলতে শুরু করেছে “এরা সব ওপার থেকে এসেছিল। এদের আমরা খেতে দিলাম পরতে দিলাম থাকতে দিলাম। আর এরা এখন নিজেদের ইতিহাস ভুলে মুসলমানদের জন্যে মিছিল মিটিং করছে!”

কিভাবে ইতিহাস বিকৃত করে আপনাকে আপনার পূর্বসুরীদের মতই উদ্বাস্তু বানানোর চক্রান্ত হচ্ছে বুঝুন। তাঁরা নাকি ওপার থেকে এসেছিলেন, ওরা খেতে পরতে থাকতে দিয়েছিল। অর্থাৎ দেশটা যে এক ছিল, ঐ পারের মত এই পারটাও যে আপনার বাপ-ঠাকুর্দার দেশই ছিল সেকথা অস্বীকার করা হচ্ছে। ভাল করে খেয়াল করলে দেখবেন সুচতুরভাবে পশ্চিমবঙ্গীয়দেরও (চলতি কথায় এদেশী) বোঝানো হচ্ছে পূর্ববঙ্গীয়রা তাদের জায়গায় উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। সব মিলিয়ে ব্যাপারটা এরকম যে স্বাধীনতার পরে বাঙালদের “অ্যালাউ” করা হয়েছিল এ দেশে থাকতে। এখন আপনাকে আবার নতুন করে নিজের জন্যে অ্যালাউয়েন্সের ব্যবস্থা করতে হবে।

এদের কথায় ভুলে দেশভাগের প্রতিশোধ নেওয়ার ঝোঁকে যদি সি এ এ, এন আর সি মেনে নেন, তাহলে সারাজীবন আপনাকে ঐ অ্যালাউয়েন্সেরই বন্দোবস্ত করে যেতে হবে। বারবার প্রমাণ করতে হবে আপনি ভারতীয়, কারণ কোন প্রমাণই সকলের চোখে যথেষ্ট হবে না।

পুনশ্চ: কোন এদেশী যদি ভেবে থাকেন তিনি তোফা থাকবেন তাহলে তিনিও মূর্খ। কারণ বাঙাল আর এদেশীর তফাত কেবল বাঙালিরাই বোঝে। অন্যদের কাছে সবাই বাঙালি, এবং হিন্দুত্ববাদ শেখাচ্ছে “বাঙালি দেখলেই জানবে অনুপ্রবেশ।” আপাতত তার ফলে মার খাচ্ছেন গরীব গুরবো মানুষ। তা বলে হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, দিল্লী, মুম্বাইয়ের উচ্চবংশীয় বহুজাতিকের কর্মী বঙ্গসন্তানরা চিরকাল সুখে থাকতে পারবেন ভাবার কারণ নেই।

সত্য; তবু শেষ সত্য নয়

যদি না আসেন তাহলে দেশের শত্রুদের পক্ষে সহজ হবে বলে দেওয়া যে এই আন্দোলনে মুসলমান ছাড়া কারো কিছু এসে যায় না। রেল অবরোধে, উত্তেজনায় সাম্প্রদায়িক হিংসার তকমা সেঁটে দেওয়া জলভাত হয়ে দাঁড়াবে, দাঙ্গা বাধানো সহজ হয়ে যাবে। তাতে শুধু আপনি নয়, ডাহা ফেল করবে ভারতবর্ষ

আসাম জ্বলছে। অসমিয়াদের বক্তব্য ওঁদের ভাষা, সংস্কৃতি সব বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালিরা ধ্বংস করে দিচ্ছে। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে সেই অনসমিয়াদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঁরা রাস্তায়। যারা নাগরিকত্ব আইনের এই নব কলেবরের বিরুদ্ধে কারণ এতে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেওয়া হচ্ছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের বাদ রাখা হচ্ছে — তারাও ক্রমশ রাস্তায়, ক্রমশ একজোট।

লড়াইটা লম্বা। লড়াইটা কেবল নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে নয়, জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর বিরুদ্ধেও। এবং স্পষ্ট করে বলা যাক, নাগরিকত্ব সংবিধানের কেন্দ্রীয় তালিকার বিষয়। ফলে যে যে রাজ্য সরকার এই আইন প্রয়োগ করব না বলছেন তাঁরা আদর্শগত অবস্থান জানাচ্ছেন মাত্র। তাঁরা কাউকে নাগরিকত্ব দিতে পারেন না, অতএব না দেওয়ারও প্রশ্ন নেই। কিন্তু রাজ্য সরকারগুলো অবশ্যই জাতীয় নাগরিকপঞ্জী (NRC) আটকাতে পারেন। কারণ ব্যবহারিক কারণেই রাজ্য সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কাজটা করা মুশকিল। সত্যিই যদি কোন রাজ্য সরকার অসহযোগ করতে চান তাহলে সেটা NPR থেকেই শুরু করতে হবে। আশাব্যঞ্জক যে বহু মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই বলেছেন NRC করতে দেবেন না। তবে সেই কথাকে কজন কাজে পরিণত করবেন সেটাই আসল কথা।
পরিষ্কার করে এটাও বলা দরকার যে নতুন আইনের বিরোধিতাকে যে হিন্দুবিরোধিতা বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে সেটাও বিশুদ্ধ বদমাইশি। একজন বিরোধীও বলেননি “হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া অন্যায়।” বরং সকলেই বলেছেন “বেছে বেছে মুসলমানদের বাদ দেওয়া অন্যায়।” উত্তর পূর্বাঞ্চলের বাঙালিবিদ্বেষী প্রতিবাদ ছাড়া কোন প্রতিবাদ শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিবাদ নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে রাজ্যসভায় বললেন এই আইন নিয়ে যারা ইতিমধ্যেই নাগরিক তাদের দুশ্চিন্তা করার কিচ্ছু নেই — সেটা ধূর্ততা। সত্যিই তো। সংশোধিত আইন তো যারা আগে থেকেই নাগরিক তাদের সম্বন্ধে নতুন কিছু বলছে না, বলছে যারা নাগরিক ছিল না তাদের সম্বন্ধে। খবরের কাগজের পাতা জোড়া বিজ্ঞাপনে যে লেখা হয় চোদ্দ হাজার টাকার জিনিস চোদ্দশো টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, তা যতটা সত্যি, অমিত শাহ যা বলেছেন তাও ততটাই সত্যি। পাতার একেবারে তলায় প্রায় আণুবীক্ষণিক হরফে লেখা থাকে “শর্তাবলী প্রযোজ্য”। ওটা দেখতে না পেয়েছেন কি মরেছেন। এই নাগরিকত্ব আইনের “শর্তাবলী প্রযোজ্য” মানে হল “এরপর নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা হবে। তখন বুঝে নেব কে কে কবে কোথা থেকে এসেছ। পছন্দ না হলেই নাগরিকত্ব বাতিল।”

কাদের পছন্দ হবে না তা বুঝতে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ হওয়ার দরকার নেই। নতুন নাগরিকত্ব আইনেই বলা আছে। তার পরেও যদি ঘেঁটু ফুলের মত নিষ্পাপ কেউ থেকে থাকেন তার জন্যে অমিত শাহ রাজ্যসভায় পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, আপনাদের দাবীটা কী রে বাপু? দুনিয়ার যেখান থেকে যত মুসলমান আসবে সবাইকে নাগরিকত্ব দিতে হবে নাকি? এর জবাবে বাংলার সাংসদ ডেরেক ও ব্রায়েন চমৎকার বক্তৃতা দিলেন, এমনকি আমাদের ঠাকুর মানে রবীন্দ্রনাথ — সেকথাও বললেন। ভাল হত ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় ভারতীয় কারা তার যে সংজ্ঞা আছে সেটাও শুনিয়ে দিলে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ অব্দি একটা ভাল বই পড়েননি বলে সারা জীবন অশিক্ষিত হয়ে থাকবেন এ কি ভাল কথা? যাকগে।

কথা হচ্ছে ইতিহাস না পড়লে বা ভুলে মেরে দিলে (আমাদের উচ্চশিক্ষিত লোকেদের অনেকেই যা করেছে বলে আজকাল দেখতে পাচ্ছি) যা হয় সঙ্ঘ পরিবার তথা আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরও তা-ই হয়েছে। এত বয়সে ফের ইতিহাস পড়তে যাওয়া কষ্টসাধ্য, তাই ঐ পাতা দুয়েকের কবিতাটার কথা বলছিলাম। পড়লে বোঝা যায় ভারত এমন এক দেশ যেখানে “সবারে হবে মিলিবারে আনতশিরে।” মিলতে হবে, মেলা যাবেও। কিন্তু মাথা নীচু করে সবার সমান হয়ে। আঙুল উঁচিয়ে সবাইকে এক করতে গেলে যা হয়, বিজেপি আমলে তা-ই হচ্ছে।

সবাইকে হিন্দু হতে হবে, সবাইকে হিন্দি বলতে হবে আমাদের হিন্দুস্তানে। এই আর এস এস প্রকল্প লাগু করতে গিয়ে কাশ্মীরকে বন্দুক আর ট্যাঙ্ক দিয়ে শান্ত রাখতে হয়েছে। এখন আবার আসামকে বন্দুক দেখাতে কাশ্মীর থেকে সেনা ডেকে আনতে হচ্ছে। সম্পর্কটা খেয়াল করুন। এক দেশ দুই আইন নাকি অন্যায় — এই যুক্তিতে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হল। এদিকে নতুন নাগরিকত্ব আইনের আওতার বাইরে রাখা হল উত্তর পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্য, কিছু অঞ্চলকে। কেন? কারণ ভারতের সব রাজ্যের ইতিহাস এক নয়, আশা আকাঙ্ক্ষা এক নয়। ঐ রাজ্যগুলোর আদি নিবাসীদের দীর্ঘকালীন আশঙ্কা বাইরে থেকে লোক এলে তাঁদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে যাবে, সে তারা যে ধর্মের লোকই হোক। বিজেপি যদি বলে কেউ অন্য দেশ থেকে ঐ রাজ্যগুলোতে এলেই নাগরিকত্ব পাবে, তাহলে যাকে গোদা বাংলায় বলে “এক ঘাও মাটিতে পড়বে না।” কত সেনা আছে তোমার? কোথায় কোথায় দাঁড় করাবে?

এই বাস্তব ভারত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা, মানে যাঁদের আজকাল লম্পট, চামার, মুসলমানদের এজেন্ট, ব্রিটিশ এজেন্ট ইত্যাদি বলা হয়, তাঁরা জানতেন। সেই কারণেই হাতুড়ি পিটিয়ে এক দেশ, এক আইনের নির্বোধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যাননি। অমিত শক্তিধর শাহকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে বাইরে রাখার জন্যেও সেই লম্পট দুশ্চরিত্র লোকগুলোর তৈরি সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলেরই দোহাই দিতে হয়েছে।

কিন্তু আসামকেও তাহলে ছাড় দেওয়া হল না কেন? হয়েছে। উপজাতি এলাকাগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছে, কারণ ষষ্ঠ তফসিল সেই এলাকাগুলোর কথাই বলে। বাকি আসামের জন্যে সরকার অমন ব্যবস্থা করল না কেন? করলেই তো অসমিয়ারা আর আপত্তি করতেন না, তাই না? করতে যে পারল না সেখানেই ভারতবর্ষ নামক সাড়ে বত্রিশ ভাজার মজা। আসামে কোটি খানেক বাঙালি, তার অনেকেই আবার হিন্দু। NRC তে তাদের অনেকেই বাদ পড়েছে। প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দ তাড়া খেয়েছেন, দুষ্টু লোকে বলে চড় থাপ্পড়ও খেয়েছেন। খেতে খেতে নাগরিকত্ব আইনের খুড়োর কল দেখিয়েছেন। এখন যদি অসমিয়া হিন্দুদের না বাঁচান তাহলে পশ্চিমবঙ্গে… ঐ যে… এক ঘা…।

এই গল্পের নীতিবাক্যগুলো কী তাহলে?

১) ভারত এক ধর্মের দেশ নয়, এক ভাষার দেশ নয়, এক আইন সর্বত্র প্রয়োগ করাও যাবে না এখানে। এ এমন এক দেশ যেখানে এক কোণে যে সংখ্যাগুরু, অন্য কোণে সে-ই সংখ্যালঘু।

২) সকলেই যে গেরুয়া দেশপ্রেমিকদের মত নিজের ধর্মীয় পরিচিতিকেই সবচেয়ে উপরে স্থান দেয় তা-ও নয়। অমর্ত্য সেন বলে এক অ্যান্টিন্যাশনাল একটা বইতে লিখেছে একজন মানুষের অনেকগুলো পরিচয় থাকে। এ দেশের বহু লোক বইটা না পড়েও ব্যাপারটা নিজের জীবনে পালন করে। এখানে একটা পরিচিতির উপর ভর দিয়ে ভেদাভেদ তৈরি করতে গেলে অন্য একটা পরিচিতি সব গুবলেট করে দিতে পারে। (উফ! আবার বইয়ের কথা বলে ফেললাম। এত পড়লে মন্ত্রীরা কাজ করবেন কখন?)

যারা মনে করে ভারত সকলের জন্য তাদের বছর আষ্টেক খুব খারাপ কেটেছে। এমন নয় যে তার আগে ভারতে সাম্প্রদায়িক রেষারেষি, হানাহানি ছিল না। কিন্তু সেগুলো ছিল আইনত নিষিদ্ধ, সামাজিকভাবে অস্বীকৃত। কিন্তু হিন্দুত্ববাদের রমরমায় গত কয়েক বছরে সাম্প্রদায়িকতা প্রথমে সামাজিক স্বীকৃতি পেল, তারপর আইনগত বৈধতা পেল। তারপর অর্থনীতি যখন তলানিতে, গণতান্ত্রিক অধিকার যখন ভূলুণ্ঠিত — এরকম একটা সময়ে নাগরিকত্ব আইনের এই সংশোধন সাম্প্রদায়িকতাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিল

সবটাই হতে পারল কারণ আমাদের চারপাশের মানুষেরা হয় পরধর্মবিদ্বেষী, পরজাতিবিদ্বেষী হয়ে উঠলেন, নয় যাবতীয় অন্যায়ের প্রতি উদাসীন হয়ে রইলেন। মৌনং সম্মতি লক্ষণম।

সেদিক থেকে গত কয়েক দিনের ঘটনাবলী কিন্তু নতুন আশার সঞ্চার করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ দ্রুত জড়ো হচ্ছেন, প্রতিবাদ করছেন। দীর্ঘ বিশ তিরিশ বছর ধরে লালিত আন্দোলনবিরোধী, প্রতিবাদবিরোধী সংস্কৃতির জাল ছিঁড়ে এমন মানুষ মিছিলে নেমে পড়ছেন যাঁরা চিরকাল এসবের থেকে সযত্নে দূরে থেকেছেন। তার মানে তাঁরা বিপদটা বুঝছেন। অনেকে নিজে নিজেই বুঝে নিচ্ছেন, কেউ বা সাগ্রহে জেনে নিচ্ছেন। প্রশ্ন করলেই আক্রান্ত হওয়ার কালে দাঁড়িয়ে এ কি কম কথা?

তবে এই আশাবাদে লাগাম পরানো দরকার। গত দুদিনের প্রতিবাদে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরই প্রধানত অংশগ্রহণ দেখে অনেকেই নাক সিঁটকোচ্ছেন। “ওটা তো ওদের প্রতিবাদ”। তা বন্দুকের নলের ঠিক সামনে যখন “ওরা” আছে তখন প্রতিবাদ করার তাগিদ “ওদের” থাকবে বই কি। কিন্তু আপনি যদি বুঝে থাকেন বিপদটা কোনখানে, যদি বুঝে থাকেন আসলে CAB, NRC ভারতের বিরুদ্ধেই অন্তর্ঘাত তাহলে আপনিও এসে দাঁড়ান। ভারত তো আপনারও। এবং ভুলেও মনে করবেন না মুসলমান না হলেই আপনি নিরাপদ। আসামের বাঙালি হিন্দুদের দেখে শিখুন। নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। আসলে আপনিও হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের উদ্যত থাবার আওতায় থাকা বাঙালি। আর যদি না আসেন তাহলে দেশের শত্রুদের পক্ষে সহজ হবে বলে দেওয়া যে এই আন্দোলনে মুসলমান ছাড়া কারো কিছু এসে যায় না। রেল অবরোধে, উত্তেজনায় সাম্প্রদায়িক হিংসার তকমা সেঁটে দেওয়া জলভাত হয়ে দাঁড়াবে, দাঙ্গা বাধানো সহজ হয়ে যাবে। তাতে শুধু আপনি নয়, ডাহা ফেল করবে ভারতবর্ষ।

আন্দোলনের ফলে রাতারাতি কিন্তু কিছু হবে না। রাত সবে শুরু। আরো গভীর হবে। আন্দোলন জোরদার হলে কাশ্মীর বা আসামের মত বাংলারও কণ্ঠরোধ হতেই পারে। খুব বেশি রাজ্যে প্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়লে NRC করতে বদ্ধপরিকর সরকার কতটা দমন পীড়নের পথে যাবে কেউ বলতে পারে না। সরকারের পুলিশ আছে, সেনাবাহিনী আছে, না জানি আরো কত কী আছে! আমরা অবয়বহীন দেড়শো কোটি। আমাদের আমরা ছাড়া আর কিছু নেই। সে নেহাত ফেলে দেওয়ার মত শক্তি নয়, উপস্থিত নানাবিধ বিদ্বেষে শতধাবিভক্ত হলেও।
তাই অন্ধকারের আজকের সফলতা সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।

সব সত্যি

রাম সত্যি, রাবণ সত্যি, হনুমান সত্যি, আয়রন ম্যান সত্যি, স্পাইডারম্যান সত্যি, সুপারম্যান সত্যি, ব্যাটম্যান সত্যি

রুকুদার সাথে আমার সেদিন দেখা হল রুবী হাসপাতালের মোড়ে। আপনারা দেখলে চিনবেন না। সে কপাল ছাপানো চুল নেই, মুখে সে মিষ্টি ভাবটি নেই, অভিমানে কেঁদে ভাসানো চোখ দুটিও দিন হোক রাত হোক ব্র‍্যান্ডেড রোদচশমায় ঢাকা থাকে।
কাশীর উমানাথ ঘোষালের একমাত্র পুত্র এখন বছর পঞ্চাশের প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক। কসবার ফ্ল্যাটটা বেচে দিয়ে সদ্য নিউটাউনের নতুন ফ্ল্যাটে উঠে গেছেন। বয়স যা-ই হোক, তিনি এখনো হাল ফ্যাশনের তরুণ। মাথাটা ক্লীন শেভন, মুখে ফ্রেঞ্চ কাট, গায়ে টি শার্ট আর পরনে ফেডেড জিনস, কব্জিতে ইয়াব্বড় রোলেক্স। জিম করে শরীরটা একদম শন কোনারির মত রেখেছেন। মার্সিডিজ চালিয়ে যেতে যেতে কী করে যে বাস স্ট্যান্ডে আমায় খেয়াল করলেন সে এক আশ্চর্য ব্যাপার। বললেন “উঠে আয়, তোকে ড্রপ করে দেব।”
গাড়িতে উঠেই দেখি পেছনের সিটে হাতের স্মার্টফোনে নিবিষ্ট বছর আষ্টেকের একটি ছেলে। “ও সম্পর্কে আমার নাতি হয়। আমার কাজিনের গ্র‍্যান্ডসন আর কি। বাট উই আর গ্রেট ফ্রেন্ডস। হোয়াট ডুয়ু সে, স্পাইডি?”
“য়া ডুড। ইউ আর আয়রন ম্যান, আয়াম স্পাইডারম্যান। উই আর অ্যাভেঞ্জার্স,” ছেলেটি গম্ভীর মুখে বলল।
“তারপর? কেমন চলছে?” রুকুদা আমার পিঠে চাপড় মেরে বললেন।
“চলার দরকার নেই। থেমে গেলেই ভাল হয়। উল্টোদিকে চলে লাভ কী?” বেজার মুখে বললাম।
“হোয়াই?” প্রশ্নটা শুনেই বুঝলাম উনি বেশ ভালই আছেন। “এনি প্রবলেম?”
“প্রবলেম কি আর একটা? পেঁয়াজের কিলো একশো টাকা, রান্নার গ্যাস সাত-আটশো, রোজ শুনছি এখানে দশ হাজার লোকের চাকরি গেছে, সেখানে পাঁচ হাজার লোকের চাকরি গেছে, লোকে ন-দশ মাস মাইনে না পেয়ে গলায় দড়ি দিচ্ছে, ওদিকে চিকিৎসার যা খরচ… মনে হয় স্বেচ্ছামৃত্যুটা চালু হলে খারাপ হয় না। আর লেখাপড়ার খরচ এত বেড়ে গেছে… ছেলেমেয়েকে মানুষ করব কী করে জানি না…”
“ট্রু। তেলের দাম পঞ্চাশ পয়সা করে বাড়িয়ে বাড়িয়ে এমন জায়গায় এনেছে… ড্রাইভিং আ কার হ্যাজ বিকাম আ লাক্সারি। ডিসগাস্টিং। অ্যান্ড নোবডি প্রোটেস্টস!”
এবার মনে হল রুকুদা আমার দুঃখ কিছুটা হলেও বুঝেছেন। একটু শান্তি পেলাম। এমন সময় উনি বললেন “বাট অ্যাট লিস্ট একটা ভাল জিনিস তো হল।”
“কী বলুন তো?”
“দ্য টেম্পল অফ কোর্স!” এমনভাবে কথাটা বললেন যেন বুঝতে পারিনি বলে আমার সীতার মত পাতাল প্রবেশ করা উচিৎ। “সেই কবে থেকে এই ঝামেলাটা চলছে বল তো? আয়াম সো হ্যাপি দ্যাট ইটস ওভার। আর কি ব্যালান্সড ভার্ডিক্ট বল তো?”
“কিসের ব্যালান্স?”
“আরে কাউকেই তো বঞ্চিত করা হল না। আমরা মন্দির পেলাম, ওদেরও ল্যান্ড দেয়া হল। বানিয়ে নাও মস্ক।”
“কিন্তু রুকুদা, ওখানে তো একটা মসজিদ ছিল। সেটা ভেঙে…”
“আরে যা ছিল, ছিল। সে তো আর ফেরানো যাবে না। ওর নীচে তো মন্দিরও ছিল। আর্কিওলজিস্টরা বলেছে তো।”
“জাজমেন্টে তো তা লেখা নেই। লেখা আছে একটা কাঠামো পাওয়া গেছে। সেটা রামেরই মন্দির কিনা বলা যাচ্ছে না।”
“আরে মন্দির যে ছিল সেটা তো ওয়েল নোন ফ্যাক্ট। সবাই জানে। লর্ড রাম ওয়জ বর্ন দেয়ার।”
“মানে আপনি বলছেন রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমান এরা সব সত্যি সত্যি ছিল? লঙ্কাকাণ্ড, সীতাকে উদ্ধার করার জন্যে যুদ্ধ — এসব সত্যি?”
“মিথ্যে কী করে বলি, প্রতীকবাবু? মুনি ঋষিরা তো এসব লিখে গেছেন।”
“সব সত্যি,” হঠাৎ পেছনে বসা ছেলেটি কেমন রোবটের মত বলে উঠল। আমার পিলে চমকে গিয়েছিল। “রাম সত্যি, রাবণ সত্যি, হনুমান সত্যি, আয়রন ম্যান সত্যি, স্পাইডারম্যান সত্যি, সুপারম্যান সত্যি, ব্যাটম্যান সত্যি। মার্ভেল ইউনিভার্স সত্যি, ডি সি কমিকস সত্যি।”
কথাগুলো বলেই সে আবার মোবাইলে ডুবে গেল। তার গম্ভীর মুখ দেখে আমি প্রতিবাদ করতে সাহস পেলাম না। মুখটা রুকুদার কানের কাছে নিয়ে গিয়ে বললাম “এ কোন ক্লাসে পড়ে? এসব ছাই পাঁশ শিখল কোথায়?”
রুকুদার আমাদের কথাবার্তা গোপন রাখার দেখলাম কোন ইচ্ছাই নেই। বেশ জোরেই বললেন “ছাই পাঁশের কী আছে? এদের জেনারেশন অনেক ওপেন। আমাদের মত নাকি? আমাদের তো কিছু ব্যাডলি রিটন ক্রাইম ফিকশন ছাড়া পড়ার কিছু ছিল না। লুক অ্যাট দেম। দে হ্যাভ দ্য ওয়ার্ল্ড ইনসাইড দ্যাট স্মল মেশিন। ওদের কোন ডগমা নেই।”
“বুঝলাম, কিন্তু এসব কী বলছে! ব্যাটম্যান, সুপারম্যান সত্যি?”
“দ্যাখ, আমরা যখন ছোট ছিলাম আমরাও তো জানতাম পুরাণ হচ্ছে গল্প। ইট টুক আস সেভেন্টি এইট্টি ইয়ারস টু সী থ্রু দ্যাট লেফটিস্ট প্রপাগ্যান্ডা। ওনলি নাও উই নো দ্যাট রাম ডিড এক্সিস্ট। তা কে বলতে পারে, ও যতদিনে বড় হবে হয়ত ততদিনে জানা যাবে মেনি আ টাইম উই ওয়্যার রিয়ালি অন দ্য ভার্জ অফ এক্সটিঙ্কশন অ্যান্ড দি অ্যাভেঞ্জার্স সেভড আস। এগুলো সব টপ সিক্রেট তো। গভমেন্ট লেভেলে ওরা নিশ্চয়ই জানে, আমাদের জানানো হয় না। ফেয়ার এনাফ। কী দরকার আননেসেসারি প্যানিক তৈরি করে?”
“এরকম হয় নাকি?”
“এরকমই তো হয়। আরে তুই কাশ্মীরের কেসটাই দ্যাখ না। এই যদি ওখানে ফিফথ অগাস্ট থেকে সব বন্ধ না করে দিত, এতদিনে স্টোন পেলটিং, এটা সেটা করে হান্ড্রেডস উড হ্যাভ ডায়েড। জাস্ট ইনফরমেশন ছড়াতে দেয়নি গভমেন্ট, দ্যাখ কত পীসফুল আছে।”
“পীসফুল! কদিন ধরে রোজই তো খবরে দেখছি এখানে ব্লাস্ট, ওখানে টেররিস্ট অ্যাটাক…”
“ও কিছু না। ঐটুকু তো হবেই। কিন্তু যা হওয়ার কথা ছিল তার কিছুই হয়নি। দ্য গভমেন্ট হ্যান্ডলড কাশ্মীর এক্সট্রিমলি ওয়েল। এটা কিন্তু মানতেই হবে।”
আর কিছু বলা উচিৎ হবে কিনা ভাবছি, রুকুদা বলল “কী ভাবছিস অত? কথাগুলো পছন্দ হচ্ছে না, না? আসলে কী জানিস তো? তোদের না বেসিকে গন্ডগোল হয়ে গেছে। তোদের পুরো হিস্ট্রিটাই ভুল শেখানো হয়েছে। নট ইয়োর ফল্ট দো, আমিও ভুল শিখেছিলাম। আমার বাবা তো বোকাসোকা লোক ছিল, ব্যবসায় সেরকম শাইন করতে পারেনি, বেনারসের বাড়িটা ছাড়া কিছুই রেখে যেতে পারেনি। আমার তো স্ট্রাগল করেই লাইফটা কেটে গেল। সেরকম স্কুলিং আর পেলাম কোথায়? সেই সময় মগনলালের অফারটা নিয়ে নিলে আজকে আমি স্টেটসে থাকতাম।”
ভেবেছিলাম বাকি পথটা মুখ খুলব না, কিন্তু আর চুপ করে থাকতে পারলাম না।
“রুকুদা, এটা আপনি কী বললেন? মগনলাল তো একজন অপরাধী। ও ওরকম একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট বিদেশে চালান করে দিত। তাছাড়া আপনার বাবা তো বলেছিলেনই ওনাকে ওটা পেতে গেলে চুরি করতে হত আপনার দাদুর দেরাজ থেকে…”
“ধুর! যত্তসব মিডল ক্লাস মর‍্যালিটি। নিজের বাড়ির জিনিস বাবার কাবার্ড থেকে বার করবে। ওকে চুরি বলে? এইসবের জন্যেই বাঙালির কিস্যু হল না। এই মাইন্ডসেট নিয়ে বিজনেস হয় না।”
আমার তখন গাড়িটাকে মনে হচ্ছে ডিটেনশন ক্যাম্প, বাইরের হাওয়া খাওয়ার জন্যে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছে, নামতে পারলে বাঁচি। রুকুদা কিন্তু আপন মনে বলে চলেছে।
“যা বলছিলাম, বুঝলি? আমাদের আসলে হিস্ট্রিটাই ভুল শেখানো হয়েছে। ধর আমাদের ফ্রিডম ফাইটার কারা? সাভারকর, দীনদয়াল উপাধ্যায়, সর্দার প্যাটেল — এরাই তো। আমাদের এদের কথা শেখানোই হয়নি। আমরা কেবল নেহরু, গান্ধী শিখেছি। দে ওয়্যার বেসিকালি ব্রিটিশ এজেন্টস। সাভারকর সেলুলার জেলে, গান্ধী এদিকে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ জাস্ট থিঙ্ক অ্যাবাউট ইট।”
“গায়ে হাওয়া লাগিয়ে মানে! গান্ধী, নেহরু দুজনেই তো অনেকদিন জেল খেটেছেন…”
“আরে এরা সব মাইনরিটির স্বার্থ খুব দেখত তো, তাই জন্যে এত মাথায় তোলা হয়েছে। তুই বল তো, হোয়াট ইজ দ্য সো কলড মাইনরিটিজ কন্ট্রিবিউশন টু আওয়ার ফ্রিডম স্ট্রাগল?”
আমি না হেসে পারলাম না।
“এ তো পনেরো নম্বরের প্রশ্ন হয়ে গেল রুকুদা। সেই সিপাহী বিদ্রোহের সময় বাহাদুর শাহ জাফরকে দিয়ে শুরু করতে হবে, মৌলানা আবুল কালাম আজাদে এসে শেষ হবে।”
“নাঃ! তোর মাথাটা দেখছি ওরা পুরো খেয়ে নিয়েছে। তোকে আমাদের স্পাইডির স্কুলে ভর্তি করে দিতে পারলে ভাল হত রে।”
বলে রুকুদা বিশ্রীভাবে হাসতে লাগল। আমি জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি আমাদের বাস স্টপটা এল কিনা, পেছন থেকে আদরের স্পাইডি বললেন “আমাদের স্কুলে হি ওন্ট ফিট, মিস্টার স্টার্ক। ও কি গায়ত্রী মান্ত্রা বলতে পারে?”
“স্কুলে আবার গায়ত্রী মন্ত্র শেখায় নাকি?” আমার তো চক্ষু চড়কগাছ।
“অফকোর্স,” ছেলে ভারী তাচ্ছিল্য করে বলল “অ্যান্ড উই ডোন্ট ইট নন ভেজ ইন স্কুল। ইউ নিড টু হ্যাভ ডিসিপ্লিন টু বি প্রপারলি এজুকেটেড।”
আমি রামানন্দ সাগরের সীতার মত কেঁদে ভাসিয়ে “হে ধরিত্রী, দ্বিধা হও” বলতে যাচ্ছি, তার আগেই রুকুদা বলল “আমি জানি তুই খুব আপসেট হচ্ছিস। বাট বিলিভ মি, প্রপার স্কুলিং খুব ইম্পর্ট্যান্ট। ইসলাম, ক্রিশ্চিয়ানিটির সাথে মাখামাখি করে আমাদের যে কালচারাল পলিউশন হয়েছে সেটা দূর করতে হবে তো। তারপর লাস্ট থার্টি ফর্টি ইয়ারসে বেঙ্গল তো বাংলাদেশীতে ভরে গেছে। দ্যাট অলসো নিডস টু বি অ্যাড্রেসড।”
“বাংলাদেশী!”
“হ্যাঁ। দেখিস না চারদিকে? তবে ওটা নিয়ে অবশ্য আর চিন্তা নেই। এন আর সি হলেই তো সব ধরা পড়ে যাবে।”
“রুকুদা, আমি কিন্তু বাঙাল। দেশভাগের সময় আমার পূর্বপুরুষরা ওপার থেকেই এসেছিল তাড়া খেয়ে।”
“আরে সে তো জানি। তোর ভয় নেই। যারা তাড়া করেছিল, এন আর সি হলে তারাই এবার তাড়া খাবে। ওয়েট অ্যান্ড সি। অনেকদিন ওরা এই দেশটা রুল করল। এবার দে হ্যাভ বিন পুট ইন প্লেস। আর ওসব চলবে না।”
“কিন্তু আসামের এন আর সি তে যে উনিশ লাখ বাদ পড়েছে তার বারো-তেরো লাখই যে হিন্দু?”
“এগুলো সব কংগ্রেসী মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা, বুঝলি না? অ্যান্ড আসাম ইজ আসাম। দিস ইজ বেঙ্গল। এখানে চালাকি চলে না। আমরা রবীন্দ্রনাথের লোক, বিবেকানন্দর লোক।”
আমার স্টপটা দেখলাম রুকুদার মনে আছে। গাড়িটা দাঁড় করাতেই দরজা খুলে প্রায় লাফ দিয়ে নামলাম। দরজাটা বন্ধ করার আগে মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি চাপল।
“রুকুদা, আপনাদের বেনারসের বাড়িটা আছে এখনো?”
“না রে, সোল্ড ইট লং টাইম ব্যাক। অত বড় বাড়ি রাখা আজকের দিনে হাতি পোষা।”
“দলিলটা আছে তো?”
“বাড়ি বেচে দিলাম, দলিল কী হবে?”
“না, এন আর সি হলে আপনার লিগ্যাসি প্রমাণ হয়ে যেত ওটা থাকলে। দেড়শো বছরের পুরনো বাড়ি তো। আপনাদের কলকাতার বাড়ি তো ষাটের দশকে তৈরি, তাই না? আর সে বাড়িও তো বেচে দিয়েছেন। আপনি যে বিশুদ্ধ ঘটি আর বড় বংশের ছেলে সে আমি জানি। কিন্তু আমি বললে কি আর এন আর সি অথরিটি শুনবে? কে জানে!”
বলেই গাড়ির দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করলাম। কয়েক পা হেঁটে গিয়েও স্টার্ট দেওয়ার শব্দ না পেয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখি রুকুদা একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মগনলালের ঘরে শরবতের গেলাসটাকে লালমোহনবাবু যেরকম সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছিলেন প্রথমে, অনেকটা সেই রকম।

*লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। রুকু চরিত্রের অভিনেতা জিৎ বসুর সঙ্গে এই লেখার রুকুর কোন সম্পর্ক নেই

হৃদয়ে ভোরের শব্দ: কোলাহলহীন কবিতা

শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীরও প্রেমের চুম্বন দরকার হয় লড়াইয়ের জ্বালানি হিসাবে

অনস্বীকার্য যে সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কিন্তু বাংলা ভাষার অধোগতি যত দ্রুত হচ্ছে তার সাথে পাল্লা দিয়েই যেন কবিযশপ্রার্থী বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক সময় ফেসবুক টাইমলাইনে কবিতার (যেগুলো পৃথিবীর কোন সংজ্ঞা অনুযায়ী কবিতা নয়) প্রাবল্যে বমি পায়। সেই ভিড়ের মধ্যে থেকে যখন সত্যিকারের কবিতা মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন বুকের ভেতর থেকে যে শব্দ কানে আসে সেটাই ‘হৃদয়ে ভোরের শব্দ’।

অনাড়ম্বর মন ছুঁয়ে যাওয়া প্রচ্ছদ উল্টে প্রথম কবিতাটা পড়তে গিয়েই যখন পাই

আশ্চর্য মুহূর্তরা রোদ্দুরের ধারে শুয়ে
অগ্নিশুদ্ধ প্রতীক্ষায় লীন

তখন সহসা বিশ্বাস হতে চায় না এটা কৌস্তভ দাশগুপ্তের প্রথম কবিতার বই।

বিশ্বাস করতাম না, যদি কৌস্তভ আমার স্কুলবেলার বন্ধু না হত। বিশাল চেহারা অথচ ঈষৎ লাজুক। নিতান্ত ঘনিষ্ঠতা না হলে কৌস্তভের ভাবনার হদিশ পাওয়া মুশকিল। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে বুঝতে পারছিলাম গোটা হাইস্কুল জীবন এক ক্লাসে পড়ে, অনেক সময় এক বেঞ্চে বসেও কৌস্তভের প্রাণের মাঝে যে এত সুধা আছে সে খবর পাইনি।

হৃদয়ের শব্দ শুনতে পাওয়ার জন্য যে নৈঃশব্দ্য জরুরী, তা প্রতিনিয়ত খান খান হয়ে যাচ্ছে। এ বইটার সবচেয়ে বড় গুণ হল পড়তে পড়তে চারপাশের সেই কোলাহল ক্রমশ আর কানে পৌঁছায় না। মন চলে যায় এমন এক সময়ে যখন প্রেম অনুভবের বিষয় ছিল, উদযাপনের নয়। এ ধরনের কবিতার বা সাহিত্যের একটা সমালোচনা চিরকাল ছিল, হয়ত থাকবেও। সেটা হল এগুলো সমকাল থেকে বিযুক্ত। এই সমালোচনা কোনদিন আমার মাথায় ঢোকেনি। প্রেমের চেয়ে মহত্তর মানবিক অনুভূতি কিছু আছে বলে জানি না, আর অনুভূতি চিরকালীন। আলাদা করে সমকালীন হওয়ার কোন প্রয়োজন তার আছে বলে মনে হয় না। কৌস্তভ যখন লিখছে

আজ কি তবে শিশির বলে ভুল করেছি তোমার চোখের জল?
আজ কি তবে ভোর ছিল না?… শুধুই ছিল ধূসররঙা শোকের চলাচল?

তখন সে নিঃসন্দেহে সব কালের সব প্রেমিকের জিজ্ঞাসাকেই লিখে ফেলছে, এ কালের প্রেমিকের তো বটেই। আমার অবশ্য আরো একটা কথা মনে হয়।

বার্টোল্ট ব্রেখট বলেছিলেন অন্ধকার সময়েও গান হবে, অন্ধকার সময়টাকে নিয়েই গান হবে। ঠিকই বলেছিলেন, কিন্তু সেটাও শেষ কথা নয়। অন্ধকার সময়েও আলোর গান গাইতে হবে। নইলে অন্ধকারের আগে যে আলো ছিল সে বিশ্বাস হারিয়ে যাবে। গল্প, উপন্যাস, সিনেমার কথা জানি না। কিন্তু অন্ধ মেয়েকে জ্যোৎস্নার ধারণা কবি ছাড়া আর কে দেবেন? তাই দারুণ ধ্বংসের মধ্যে, লড়াইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়েও স্রেফ প্রেমের কবিতা লিখেছে বলে কোন কবিকে পলায়নী মানসিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করা যাবে না। শ্রেষ্ঠ বিপ্লবীরও প্রেমের চুম্বন দরকার হয় লড়াইয়ের জ্বালানি হিসাবে। তেমনি ধ্বংস, রক্তপাত, প্রতিবাদের কবিতার মতই নীচের পংক্তিগুলোর প্রয়োজনও ফুরোবার নয়।

মেদুর বর্ষায় রাঙানো ভরসায়
দুপুর জলে ভেজা অন্তরীপ
সাঁকোটি পার করে এসেছি, ভেসে গেছি,
সোনালুগাছ রাখে একলা টিপ

তাহলে কৌস্তভের প্রথম কবিতার বই কি নিখুঁত, ত্রুটিমুক্ত? এক্ষুণি দু চারজন প্রথিতযশা কবির সাথে তুলনা করে ফেলা উচিৎ ওকে? বন্ধুবান্ধবদের লেখা নিয়ে তেমন আদিখ্যেতা করার একটা চল হয়েছে বটে, তবে আমি সে রাস্তায় যাব না। কারণ যে কোন কবিতালেখককে শেষ পর্যন্ত নিজের লেখার উপর ভর দিয়েই দাঁড়াতে হয়, বন্ধুদের উচ্ছ্বাসের উপর নয়।
খামতির কথা বলতে গেলে বলতেই হয় এই বইয়ের বেশ কিছু কবিতায় বয়ঃসন্ধির ছেলেমানুষী প্রেমের স্মৃতি কাব্যগুণকে ছাপিয়ে গেছে। সেই কবিতাগুলো মননে বা প্রকরণে অন্যগুলোর উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। দু এক জায়গায় সম্ভবত মুদ্রণ প্রমাদও ঘটেছে, ফলে রসভঙ্গ হচ্ছে। তদসত্ত্বেও প্রথম কবিতার বই লোভী করে তুলল। কৌস্তভের কবিতা এরপর কোন দিকে যায়, প্রেমের কোন অদেখা দিক কৌস্তভ এরপর দেখায় — এইসব জানার লোভ।

যে কবিতাটা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে, সেই তিন নম্বর কবিতাটা সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করার লোভ আর সামলাতে পারছি না। মধুরেণ সমাপয়েৎ।

আকাশ ভেঙে বৃষ্টি তখন, স্নান সারছে তোদের বাড়ি
থমকে আমার চিলেকোঠায়, দুইখানি চোখ সুদূর পাড়ি
বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো! চল ছাদে চল তাড়াতাড়ি
পূবের দিকে বাবার জামা, পশ্চিমে মা দিদির শাড়ি
এইবেলা না তুললে পরে সবটা ভিজে একসা হবে
বৃষ্টিবিকেল, আমার দুচোখ আটকে গেছে কোথায় কবে!
বসতবাড়ির নীল মরসুম, চটজলদি ফুলের টবে
শব্দ কিছু দিই উড়িয়ে, শব্দ কিছু থাক নীরবে

কাঁধের ডানে ছাপা শাড়ির শরীর জুড়ে দমকা হাওয়া
একটা জীবন ছোট্ট ভারী, আমার তোমায় দেখতে পাওয়া
আয় বৃষ্টি যায় বৃষ্টি, জমছে কথা বলতে চাওয়া
ইচ্ছেগুলো স্টীমারঘাটে, ইচ্ছেরা সব নৌকা বাওয়া

নিঝুম রাতের রূপকথারা অসীম নাভি মেঘলা ক্ষত
শূন্য দু’হাত তোমার টানে শ্রাবণধারায় রমণরত
হঠাৎ যেন নেই কেউ নেই, সামনে দাঁড়াও দেবীর মত
দশ দিকে থাক আঁধারজীবন, মাঝখানে প্রেম লজ্জানত
বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো! যাচ্ছি ধুয়ে অতর্কিতে
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি তখন… জ্যোৎস্না লুকোয় ১০ এর B তে

ফুটন্ত সকালের পুরনো স্বপ্ন

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি

নতুন নয়, আজ পুরনো কথার দিন।

ইতিমধ্যেই দিকে দিকে বার্তা রটে গেছে যে মানুষ বিভিন্ন দেশে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। লেবানন আর চিলির ছবি উল্কার বেগে ছড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে। চিলির আতঙ্কিত রাষ্ট্রপ্রধান সেবাস্তিয়ান পিনেরা পুরো ক্যাবিনেটকেই বরখাস্ত করেছেন। কিছুদিন আগে বিশাল আন্দোলন হয়েছে হংকঙে। সে আন্দোলন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মহাশক্তিধর চীনও। অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন (আমিও পাচ্ছিলাম) চীন না আবার একটা তিয়েন আন মেন স্কোয়ার ঘটিয়ে দেয়। এখন পর্যন্ত তেমনটা ঘটেনি। অর্থাৎ লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে পড়লে এই একবিংশ শতাব্দীর পরমাণু শক্তিধর, নেট নজরদার রাষ্ট্রও কিন্তু আতান্তরে পড়ে। “শাসনে যতই ঘেরো, আছে বল দুর্বলেরও”।

কথাগুলো পুরনো, নাকি চিরনতুন? এদিকে আজ নয়া উদারবাদী (neo-liberal) অর্থনীতিতে ব্যতিব্যস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত আর্জেন্টিনার মানুষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাম-মধ্যপন্থী প্রার্থী আলবার্তো ফার্নান্ডেজকে জিতিয়ে দিলেন। তাঁর পাশে উপরাষ্ট্রপতি হতে লড়ছিলেন ভূতপূর্ব বামপন্থী রাষ্ট্রপতি ক্রিস্টিনা কির্শনার। এইমাত্র দেখলাম বিবিসির দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেদক কেটি ওয়াটসন তাঁর বিশ্লেষণে লিখেছেন আলবার্তোর জয়ে ক্রিস্টিনার রাজনীতির অবদান এতটাই যে অনেক ভোটার ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে বলেছিলেন তাঁরা ক্রিস্টিনাকে ভোট দেবেন। যেন তিনিই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী, আলবার্তো নন।

পৃথিবীর মানচিত্রে সবচেয়ে ওজনদার দেশ, আর্জেন্টিনা থেকে আরো উত্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে ডেমোক্র্যাট নেতা বার্নি স্যান্ডার্স ক্রমশ সুর চড়াচ্ছেন অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে। তিনি অতি ধনীদের উপর আলাদা কর চালু করার কথা বলছেন। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সকলের অধিকার হওয়া উচিৎ বলছেন। কখনো বা টুইট করছেন পৃথিবীতে বিলিয়নেয়ার থাকাই উচিৎ নয়। আমাদের কানে এসব শুনতে লাগে নন্দ ঘোষ নেহরুর মত, বা যারা নাকি দেশটার (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের) সর্বনাশ করেছে, সেই কমিউনিস্টদের মত। মার্কিন দেশে কিন্তু এসব কথা ব্লাসফেমির সামিল ছিল এই সেদিন অব্দিও। অথচ এই মুহূর্তে বার্নির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই আবার শ্রমজীবী মানুষ। বার্নি প্রকাশ্যে ধর্মঘটের অধিকারের পক্ষে বলছেন, ধর্মঘটী শ্রমিকদের সমর্থন করছেন। কী কাণ্ড বলুন তো!

লক্ষ্য করুন মধ্যপ্রাচ্যের লেবাননই হোক আর লাতিন আমেরিকার চিলি বা আর্জেন্টিনা কিংবা উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আমাদের প্রতিবেশী চীন। মানুষ রাস্তায় নামছেন কিন্তু আরো বেশি অধিকারের দাবীতে। হংকঙের আন্দোলন সেখানকার স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, অর্থাৎ সেখানে রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটাই প্রধান। অন্য সবকটা দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষোভ আসলে সাধারণ চাকুরিজীবী এবং শ্রমজীবী গরীব এবং মধ্যবিত্ত মানুষের রোজগার কেড়ে নেয় যে অর্থনীতি, কর্পোরেটদেরই দন্ডমুন্ডের কর্তা করে তোলে যে অর্থনীতি, যার ভুরি ভুরি আছে তাকে আরো পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে আর শিক্ষা স্বাস্থ্যকে বেসরকারীকরণ করে সাধারণের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যায় যে অর্থনীতি — তার বিরুদ্ধে।

ভারতের অবস্থা কি অন্যরকম? সেই নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় যখন সারা বিশ্ব শিখল সমাজতন্ত্র মৃত, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি উন্নয়নের পরিপন্থী, ট্রেড ইউনিয়ন শিল্পের ক্ষতি করে, বেসরকারীকরণই মুক্তির পথ — তখন থেকেই তো এ দেশের সরকারগুলো আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক ইত্যাদির বাধ্য ছাত্র হয়ে ঢালাও বেসরকারীকরণ করেছে। জওহরলাল নেহরুর নিজের পার্টিই কাণ্ডটি করায় এখনকার মত তাঁকে অকথ্য গালাগাল তখন করা হয়নি সত্য, কিন্তু নেহরুর “সমাজবাদী অর্থনীতির অচলায়তন” থেকে নরসিমা, মনমোহন ভারতকে মুক্ত করেছেন একথা তো তখন থেকেই কাগজে, টিভিতে বলাবলি শুরু হয়েছে। শ্রম আইনকে ক্রমশ দুর্বল করে বেসরকারী ক্ষেত্রের কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া শুরু হয়েছে তখন থেকেই, বর্তমান সরকারের আমলে মজা টের পাওয়ানো হচ্ছে সরকারী কর্মচারীদেরও। গ্রামীণ অর্থনীতি তখন থেকেই দুয়োরানী, তাই কৃষকদের মৃত্যু মিছিলও তো শুরু হয়েছে মনমোহিনী অর্থনীতির আমলেই। বিভিন্ন প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আক্রমণের মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ব্যাপারটাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হয়েছে, তুলে দেওয়া হয়েছে বহু শিল্পক্ষেত্রে। আমি আপনি, মানে ভদ্রলোকেরা, খুশি হয়েছি। কারণ আমাদের বলা হয়েছিল এতে শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নতি হবে। মনমোহন সিং নোটবন্দীর বিতর্কে জন মেনার্ড কেনসকে উদ্ধৃত করে বললেন বটে “In the long run we are all dead,” কিন্তু এই লং রানের কথা সেসময় তাঁরাও শুনিয়েছিলেন। সে যা-ই হোক, আসল কথা হল দেশের উন্নতি হয়েছে কিনা।

প্রশ্নটার উত্তর পেতে গেলে জানা দরকার দেশ মানে কে? বঙ্কিম লিখেছিলেন হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্তর কথা। জানি না তাদের লাভ হয়েছে কিনা, তবে আমার আপনার তো লাভ হয়েছে বটেই। আমার বাবার সাদা-কালো টিভির বেশি কেনার সামর্থ্য হয়নি, আমি রঙিন টিভি দিয়ে শুরু করে এখন স্মার্ট টিভিতে পৌঁছে গেছি। বাবার জীবন কেটেছে ট্রেনে বাসে ঘামে ভিজে, আমি যখন তখন ওলা উবের। সত্যি বলতে কি গাড়ি কেনার জন্যে ধার দিতে চেয়ে ব্যাঙ্কের লোকেরা আমার পায়ে ধরতে বাকি রাখে। উন্নতি হয়নি?

আমার জন্যে চকলেট কিনতে ঢুকে দাম শুনে মুখ চুন করে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি বাবাকে, আর আমার মেয়ে এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে বাছাই করে কোন কোন চকলেট সে কিনবে না। উন্নতি নয়, বলুন? বাবার জীবন কেটে গেছে পাড়ার দর্জির তৈরি জামাকাপড় পরে, আজ আমি ব্র‍্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরি না, বিদেশী ব্র‍্যান্ডের ঘড়ি থাকে হাতে। উন্নতি নয়?

বাড়িতে একখানা ল্যান্ড ফোন নেওয়া খুব দরকার হয়ে পড়েছিল বলে রেকারিং ডিপোজিট করতে হয়েছিল বাবা-মাকে, আজ আমি আর আমার বউ হাতের মোবাইলে সামান্য টাকায় সারা পৃথিবীর কথা বলা ছাড়াও বিশ্বায়িত বিনোদন ভোগ করছি। তবুও বলবেন উন্নতি হয়নি?

এদেশে মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার সময়ে আমার কিছু ক্রয় ক্ষমতা ছিল, তাই সেই অর্থনীতি আমাকে আরো আয় করার সুযোগ দিয়েছে, যাতে আমি আরো ব্যয় করে যে আমার চেয়ে অনেক বেশি ধনী তাকে আরো ধনী করতে পারি। আমার যে সহপাঠীর বাবার ছোট মুদির দোকান, তার যে জয়েন্টে পেছন দিকে র‍্যাঙ্ক করে বেসরকারী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে পড়ার টাকা না থাকায় লেখাপড়া শেষ হয়ে গেল সেকথা থাক। আমি তো কয়েক লক্ষ টাকা ফিজ দিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আজ এ দেশে কাল সে দেশে কাজ করে বেড়াচ্ছি। সেটা উন্নতি নয়?

আমার জন্ম হয়েছিল সরকারী হাসপাতালে, আমার বউকে আমি সেই পূতিগন্ধময় হাসপাতালের ধারে কাছে নিয়ে যাইনি। আমার সন্তান জন্মেছে ঝাঁ চকচকে নার্সিংহোমে। মনমোহন সিং না থাকলে কে দিত আমাকে এই সুযোগ? আমার চটকলের শ্রমিক বন্ধুর স্ত্রী যে সরকারী হাসপাতালে সন্তান প্রসব করতে গিয়ে সংক্রমণের ফলে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা গেল সে কথা থাক। একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।

সুতরাং দেশ মানে আমার কাছে যেহেতু আগে আমি, আমার পরিবার, তাই উন্নতি যে হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। যার লাভ হয়নি সে করুক চিলি, লেবানন বা ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলনের মত কিছু। বা আর্জেন্টিনার লোকেদের মত ভোট দিক বামপন্থীদের, ভিড় জমাক তাদের মিটিঙে যারা বার্নির মত বলে চিকিৎসার জন্যে গাদা গাদা ইনশিওরেন্স প্রিমিয়াম দিতে হওয়া অন্যায়, যে পড়তে চায় তার পড়ার খরচ সরকারের দেওয়া উচিৎ। আমি কেন এসবের মধ্যে থাকব? আমার তো প্রিমিয়াম দেওয়ার ক্ষমতা আছে, ছেলেমেয়েকে পয়সা খরচ করে যেখানে ইচ্ছে পড়ানোর ক্ষমতাও আছে আমার।

অবশ্য এত উন্নতির সঙ্গে কিছু উদ্বেগও আমি পেয়েছি, যা আমার বাবার ছিল না।

নিজের যৌবনে আমার চাকুরিজীবী বাবা মাইনে পেলে মায়ের সাথে মাস খরচের হিসাব করতে বসে দেখতেন এটা করলে সেটা হবে না, অমুক শখটা পরের মাসের জন্যে তুলে রাখতে হবে। কিন্তু জানতেন পরের মাসেও চাকরিটা থাকবে, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে দুটো খাওয়া পরার অভাব হবে না। আমার সে নিশ্চয়তা নেই। শুধু নিজের কাজটুকু মন দিয়ে করেই নিশ্চিন্ত থাকার আমার উপায় নেই। কোম্পানি যদি তার লাভের লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারে তার মানে হবে কোম্পানির ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি পূরণ করতে কর্মী সঙ্কোচন হবে, বস বলবেন “সবাই তো ব্যবসা করতে এসেছে। কেউ তো মাদার টেরেসা নয়”। অতএব গত মাসের এমপ্লয়ি অফ দ্য মান্থ আমি বছর চল্লিশেক বয়সে হয়ে যাব বেকার, সামার ভ্যাকেশনে ফুকেটের বীচে যে বউকে দীপিকা পাড়ুকোন মনে হচ্ছিল অচিরে দেখব তার চোখের কোলে কালি পড়ে সে নিরুপা রায় হয়ে গেল। মেয়েকে ভেবেছিলাম বিদেশে পড়তে পাঠাব, এখন স্কুলের মাইনে দেওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

অবশ্য বউ আমার যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। তার সরকারী চাকরি আছে আমার বাবার মতই। তাই ভেবেছিলাম অবসর জীবনে অন্তত তার পেনশনে আমাদের দুজনের চলে যাবে। কিন্তু এখন দেখছি সরকার তার পেনশন না-ও দিতে পারে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে অথচ গিন্নীর মাইনে কাল কমিয়ে দিলেও কিছু বলার নেই। ওদিকে ব্যাঙ্কে যা টাকা জমিয়েছিলাম, ব্যাঙ্ক ফেল পড়লে শুনছি তার সবটা পাব না। অন্যত্র যা জমিয়েছি তার পাওনা গণ্ডাও নাকি শেয়ার বাজারের মর্জি মাফিক।

এসব মনে পড়লে বোধ হয় কি মিছিলে নামা উচিৎ? নাকি কেবলই মনে হয় ঐ ব্যাটা সোনার চাঁদ, সোনার টুকরো — ওর জন্যেই আমি সরকারী চাকরি পাইনি, পেলে একবার…? ঐ যে সব মুসলমান বাংলাদেশ থেকে হুড়মুড়িয়ে আসছে, ওদেরকে বার করে দিতে পারলেই…? মনে হয় কি অমুকে কেন তমুকের মাংস খায় এটাই মূল সমস্যা? নাকি আমরা যারা আতঙ্কে ভুগছি আপনি তাদের দলে? ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক, গণপিটুনির আতঙ্ক। আমরা সকলেই যে ঘুমোচ্ছি, সকলেই যে বিশ্বাস করছি “সব চাঙ্গা সি”, তা তো নয়। তাহলে কেন আমরা রাস্তায় নেই?

নেই তার বড় কারণ যাঁরা মিছিল ডাকবেন, মিটিং করে রাস্তায় নামাবেন আমাদের তাঁরাই নিজেদের জায়গায় নেই। বার্নি স্যান্ডার্স সারাজীবন লড়ে গেলেন। যখন কেউ তাঁর কথা শুনত না তখনো লড়েছেন, আজও লড়ছেন। আজ অনেকে তাঁর কথা শুনছে। ক্রিস্টিনা কির্শনারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, তিনি পদচ্যুত হয়েছিলেন। তবুও লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি, মানুষ আজ তাঁর লড়াইকে জয়যুক্ত করলেন। বিবিসি লিখেছে “A comeback for the old politics”। এ দেশে পুরনো সমাজবাদী, কল্যাণকামী রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনার এই তো সময়। মানুষ, জল, জঙ্গল বাঁচাতে সেই রাজনীতিরই তো প্রয়োজন। কিন্তু দু একটি অঞ্চলে ছাড়া কোথায় সেই রাজনীতির লোকেরা? তাঁদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা কোথায়? তাঁদের কেউ কেউ যে চূড়ান্ত আক্রমণাত্মক, ধ্বংসোন্মুখ নয়া উদারবাদী মোদী সরকারের থেকে মনমোহিনী পথেই নিস্তার খুঁজছেন!

পৃথিবী জুড়ে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির (রাজনীতিরও, কারণ প্রয়াত অশোক মিত্র যথার্থই বলতেন “রাজনীতিই অর্থনীতি”) শিয়রে শমন। ট্রাম্প, মোদী জানেন যে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথ তাঁরা জানেন না। তাই উনি বলেন ইমিগ্র‍্যান্টদের কথা, ইনি বলেন এন আর সি করব, নাগরিকত্ব আইন করব, মুসলমানরাই যত নষ্টের গোড়া ইত্যাদি।

এই দুঃসময়ে, এই সম্ভাবনার সুসময়ে, কোথায় তাঁরা যাঁরা রাত্রির বৃন্ত থেকে ফুটন্ত সকাল ছিঁড়ে আনার স্বপ্ন দেখাতে পারেন?

লাঠালাঠি নয়, গলাগলি

৩৩ এর পল্লী যে অপরাধে অপরাধী, একই অপরাধে রামকৃষ্ণও কি অপরাধী নন?

বিজয়া দশমীর মিষ্টির স্বাদ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই কথাগুলো বলে ফেলা যাক, কারণ আমাদের স্মৃতি অতি দুর্বল।

বেশ কয়েক দশক হল একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি দারুণ ধর্মনিরপেক্ষ এক জাতি, তাই তাদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপুজোরও সামাজিক চরিত্রটাই বড় কথা, ধর্মীয় চরিত্রটা নয়। উৎসবটা মূলত সংখ্যাগুরু হিন্দুদের উৎসব হলেও সংখ্যালঘু মুসলমানরাও এতে সানন্দে অংশগ্রহণ করেন, করতে কোন বাধাও নেই। কিন্তু গত কয়েক দিনে প্রমাণ হয়ে গেছে যে বাঙালি হিন্দু, মুসলমানকে নজরুলই যথার্থ বুঝেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি।

ব্যাপারটা কী? না বেলেঘাটা ৩৩ এর পল্লী এবারের পুজোয় সর্বধর্ম সমন্বয় নিয়ে ভেবেছেন। তাই তাঁদের পুজো মণ্ডপে আজানও বেজেছে। আর যেই না বেজেছে, অমনি বহু বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতার খোলস খসে পড়েছে। বজরং দলের বাঁদরদের নিয়ে বেশি চিন্তিত নই। সেই একটা প্রাচীন কবিতা আছে না “কুকুরের কাজ কুকুর করেছে” ইত্যাদি? তা মৌলবাদী সংগঠনের কাজ তারা করেছে। মণ্ডপে গিয়ে অশান্তি করার চেষ্টা করেছে, অকৃতকার্য হয়ে থানায় এফ আই আর করেছে। পুলিশ কোন আইনের কোন ধারায় এসব এফ আই আর গ্রহণ করে সে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদী চিন্তার বিষয় নয়। চিন্তার বিষয় সাধারণ হিন্দু ও মুসলমানদের উষ্মা প্রকাশ। এই সাধারণদের মধ্যে আবার প্রগতিশীল, এমনকি বামপন্থীরাও আছেন। আশঙ্কা, আতঙ্ক এখানেই।

এক নিকটাত্মীয় একটি হোয়াটস্যাপ মেসেজ ফরোয়ার্ড করলেন। পড়লে চট করে মনেই হবে না কাজটা হিন্দুত্ববাদী আই টি সেলের। অবশ্য ইদানীং তো বাংলার প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের কেউ কেউ ও দলে ভিড়েছেন, হয়ত তাঁদের কাউকে দিয়েই লেখানো বার্তাটা। উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না।

ওই দুর্গাপুজো থিম যে শিল্পীর মস্তিষ্কপ্রসূত তাঁর নাম রিন্টু দাস। তাঁর কথায়, “আমাদের থিমের বিষয় হচ্ছে যে আমরা সবাই এক, কেউ একা নই। সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সবাই যাতে সম্প্রীতির পথে চলি সেই বার্তায় দেওয়া হয়েছে। মায়ের হাতে অস্ত্র নেই। সেটা যুদ্ধ ভুলে শান্তির বার্তা।”
এখন আমরা কি জানি এই আযানে আসলে কী বলা হয়। এ ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের ও কোনও ধারণা আছে? আসুন আযানের বাংলা অনুবাদটা পড়া যাক।
* আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*আশহাদু-আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ – আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত দূত।
*হাইয়া আলাস সালা – নামাজের জন্য এসো।
*হাইয়া আলাল ফালা – সাফল্যের জন্য এসো।
*আল্লাহু আকবর – আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
*লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই।
*মহম্মদ রসুলুল্লাহ- মহম্মদ ই একমাত্র রসুল, মানে আল্লার দূত।
এবার ভাবুন, সামনে দুর্গা প্রতিমা। মাথার উপরে দেবাদিদেব মহেশ্বর। পাশে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী আর সরস্বতী। তাঁদের অকালবোধনে আবাহন করা হয়েছে। মাইকে বাজছে: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই!
এই হল প্রোগ্রেসিভ, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির জ্ঞানের গভীরতা!
(দেশপ্রেমিক বানানাদি অপরিবর্তিত)

আমি আরবি ভাষা জানি না, ইসলাম ধর্মাবলম্বীও নই। ফলে আজানে যা বলা হয় তার অর্থ সত্যিই এই কিনা জানি না। তবে কত আর অবিশ্বাস করব? তাই ধরেই নিলাম এখানে সঠিক অনুবাদই করা হয়েছে। তা আপত্তির হেতুটা বোঝার চেষ্টা করে দেখি।

আজানে বলা হচ্ছে আল্লাই সর্বশক্তিমান, আল্লা একমাত্র উপাস্য, মহম্মদ আল্লার একমাত্র দূত। হিন্দু দেবদেবীদের পূজাস্থলে এসব কি কথা! এ জিনিস কখনো ওখানে বাজানো যায়!

ব্যাপারটা সর্বধর্ম সমন্বয়ের থিমের সঙ্গে কেন অসঙ্গতিপূর্ণ ঠিক বুঝলাম না। সব ধর্মেই তো সেই ধর্মকেই সর্বোত্তম সত্য বলে দাবী করা হয়। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে উদাহরণ দিই। যদিও হিন্দুধর্মের কোরান শরীফ বা বাইবেলের মত নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ নেই (বস্তুত হিন্দুধর্ম আদৌ কোন একক ধর্ম কিনা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিলক্ষণ তর্ক আছে), তবু বাড়িতে বাড়িতে শ্রীমদ্ভগবদগীতা পাওয়া যায়। আমি আবার বামুন বাড়ির ছেলে হওয়াতে ছোট থেকে বাড়িতে রোগা, মোটা, বেঁটে, লম্বা — নানা চেহারার গীতা দেখছি। অনিচ্ছায় দু বছর এবং পরে স্বেচ্ছায় দু বছর সংস্কৃত পড়তে হয়েছিল। তা বাড়ির একটা গীতা খুলে দেখলাম সপ্তম অধ্যায়ের সপ্তম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন

মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদন্তি ধনঞ্জয়
ময়ি সর্ব্বমিদং প্রোতং সূত্রে মণিগণা ইব।।

অর্থ কী?

হে ধনঞ্জয়, আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কেউ নেই। মালায় যেভাবে মণিগুলো সুতোয় গাঁথা থাকে, আমার মধ্যে সেইভাবে সর্বভূত এবং সমস্ত জগৎ গ্রথিত।
তার আগেই, চতুর্থ অধ্যায়ে, রয়েছে প্রায় সকলের পরিচিত পঁয়ত্রিশতম শ্লোকটা

শ্রেয়ান স্বধর্ম্মো বিগুণঃ পরধর্ম্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্ম্মো ভয়াবহঃ।।

অর্থাৎ নিজের ধর্মে যদি দোষ ত্রুটি থাকে এবং পরের ধর্মে না থাকে, তাহলেও পরধর্মের চেয়ে নিজ ধর্ম ভাল। নিজের ধর্মে থেকে মৃত্যুও ভাল, পরধর্ম পালন করা ভয়াবহ।

যদি বা দ্বিতীয় শ্লোকে ধর্ম বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তা নিয়ে সূক্ষ্ম তর্কের অবকাশ আছে, প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যা বলছেন দ্ব্যর্থহীন ভাষাতেই বলছেন। আজান দেওয়ার সময়ে যেমন বলা হয় আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ, শ্রীকৃষ্ণও বলছেন তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ। তা হোয়াটস্যাপবাবুদের যুক্তি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণ এত বড় কথা বলে দেওয়ার পরে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস যে কলমা পড়েছিলেন, গবেষকসুলভ অনুসন্ধিৎসায় খ্রীষ্টধর্মও পালন করেছিলেন সেটা কি উচিৎ কাজ হয়েছিল? “প্রোগ্রেসিভ অসাম্প্রদায়িক বাঙালির” জ্ঞানের না হয় গভীরতা নেই, পরমহংসকেও কি পরম মূর্খ বলবেন তাহলে? ৩৩ এর পল্লী যে অপরাধে অপরাধী, একই অপরাধে রামকৃষ্ণও কি অপরাধী নন? এঁরা তো কেবল অস্থায়ী মণ্ডপে মাটির মূর্তির উপস্থিতিতে নমাজ বাজিয়েছেন, তিনি তো খোদ দক্ষিণেশ্বরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর পুরোহিত হয়ে অন্য ধর্মের দেবতার উপাসনা করেছেন।

মজার কথা (না, চিন্তার কথা) এই নিয়ে আপত্তি শুধু রামকৃষ্ণের চেয়েও বড় হিন্দুরাই করছেন না। মুসলমানরাও করছেন। তাঁদের কারো কারো ধারণা সর্বশক্তিমান আল্লা এতে হিন্দু দেবদেবীদের কাছে ছোট হয়ে গেলেন। আল্লাকে ছোট করা এত সহজ বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁরা এক কথায় মৌলবাদী। নইলে অন্য ধর্মের লোক তাঁর ধর্মের প্রার্থনা লোককে জানালে আপত্তি হবে কেন? অন্য ধর্মের লোক কোরান পড়লে কি আপনি রেগে যান, না খুশি হন? খুশি হওয়ারই তো কথা। উল্টোদিকেও তাই। কোন মুসলমান ভালবেসে বেদ, উপনিষদ পড়েন জানলে রেগে যায় যে হিন্দু, সে যেমন মৌলবাদী, প্যান্ডেলে নমাজ শুনে যে মুসলমান রেগে যায় সেও মৌলবাদী ছাড়া কিছু নয়। এখন সঙ্ঘ পরিবারের যুগ, দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হল হিন্দুরা, তাই বজরং দল হল্লা করতে সাহস পায়, এঁরা পান না। এই যা তফাৎ।

আরেকটা মতও প্রচার হচ্ছে। অনেক মুসলমান নাকি আহত এই জন্যে যে আজান ব্যাপারটা প্রার্থনা, গান নয়। অতএব এটাকে পুজো মণ্ডপে বাজানো মানে আজানের অসম্মান। কি অদ্ভুত যুক্তি! পুজোর জায়গাতেই তো আজানের ব্যবহার করা হচ্ছে। আজানের সাথে কোমর দুলিয়ে কোন সিনেমাবণিতা নাচছেন বলে তো খবর নেই। এতে আজানের অসম্মান হয়? এ যুক্তির সাথে তো হোয়াটস্যাপের যে বার্তার উল্লেখ করলাম তার কোন পার্থক্য নেই। আমারটা সেরা, তাকে অন্য কিছুর পাশে রাখলেই তার অসম্মান হয় — এই তো বলতে চাওয়া হচ্ছে আসলে।

তথাকথিত প্রগতিশীল যারা, তাদের বুদ্ধি বেশি। তাই তারা চালাকি করে বলছে “সর্বধর্ম সমন্বয়ের কোন প্রয়োজন নেই, সহাবস্থান হলেই যথেষ্ট।” শুনে মনে পড়ল আমার এক হিন্দুত্ববাদী প্রাক্তন বন্ধুর কথা। তার সাথে তর্ক হতে হতে একদিন বলেছিলাম “তুই কী চাস? মুসলমানদের মেরে ফেলা হোক বা ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হোক?” তার উত্তর ছিল “তা কেন? থাকুক এক পাশে। লাঠালাঠিরও দরকার নেই, গলাগলিরও দরকার নেই।”

মুসলমান নাগরিককে বাড়ি ভাড়া দেয় না যারা, মুসলমান হলে আবাসনে ফ্ল্যাট কিনতে দেয় না যারা তাদেরও কিন্তু আসলে বক্তব্য এটাই। তুমি বাপু তোমার এলাকায় থাকো, আমি আমার এলাকায় থাকি। এক কথায়, সমন্বয়ের দরকার নেই, সহাবস্থানই যথেষ্ট। যে ইসলাম ধর্মাবলম্বী প্রগতিশীল সমন্বয় বাতিল করে সহাবস্থানের তত্ত্ব খাড়া করেন, তিনি আসলে মুসলমানদের কোণঠাসা করার ব্যাপারীদেরই সাহায্য করেন। আর যে বামপন্থীরা এই তত্ত্ব সমর্থন করেন, তাঁদের উপযুক্ত বিশেষণ আমি খুঁজছি। এখনো পাইনি।

তাছাড়া এই প্রগতিশীলরা কে হরিদাস পাল যে সমন্বয়কে বাতিল করবেন? এ দেশে কয়েক হাজার বছর ধরে ধর্মীয় সমন্বয় হয়েই চলেছে। কোন শাসক শুরু করেননি, অনেক শাসক আটকাতে চেয়েও পারেননি। সাধারণ মানুষ নিজের বুদ্ধি বিবেচনায় এই সমন্বয় করে চলেছেন। হিন্দুদের সত্যনারায়ণ কখন সত্য পীর হয়ে যান টের পাওয়া যায় না। ওলাউঠায় গ্রাম কে গ্রাম উজাড় হয়ে যেত এক সময়। তা থেকে তৈরি হয়েছে ওলাবিবি। ওলাবিবির থানে হিন্দু, মুসলমান উভয়েই যান। কত মাজারে যে সন্তানহীনা হিন্দু মহিলারা সন্তান প্রার্থনা করেন তার কোন সেন্সাস হয়নি আজ অব্দি। গত বছর বন্ধু মৃণালের শ্বশুরালয় পশ্চিম মেদিনীপুরের মোগলমারি গ্রামে গিয়েছিলাম। সে গ্রামের চালু মন্দির দূর থেকে দেখলে মসজিদ বলে ভুল হওয়া বিচিত্র নয়। ইসলামিক স্থাপত্যের অভিজ্ঞান যে গম্বুজ তা রয়েছে মন্দিরের মাথায়, দেয়ালে মসজিদের মত নকশা কাটা জাফরি। সুফি সাধকদের কথা তো বলতে শুরু করলে শেষ হবে না। দুজন কাওয়ালি গায়কের কথা বলি।

বন্ধু উজ্জ্বলের কল্যাণে বছর দুয়েক আগে শুনেছিলাম ফরিদ আয়াজ আর আবু মুহাম্মদের গান “ইয়াদ হ্যায় কুছ ভি হামারি”। সেখান গোকুল ছেড়ে চলে যাওয়া কানাইকে রাধিকা জিজ্ঞেস করছেন তাঁর কথা মনে আছে কিনা। কিভাবে কানাইয়ের খবর পেতে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তার উদাহরণ হিসাবে বলছেন “পইয়াঁ পড়ি মহাদেবকে যা কে”। শেষ দিকে রয়েছে “ম্যায় কৌন হুঁ ঔর কেয়া হুঁ ইয়ে রিজওয়ান (জন্নতের দারোগার নাম) সে পুছো / জন্নত মেরে অজদাদ (পূর্বপুরুষ) কি ঠুকরায়ি হুয়ি হ্যায় / ফিরতি থি কিঁউ মারি মারি।” অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রেয়সীর পূর্বপুরুষদের জন্নতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি তিনি কৃষ্ণপ্রেমে উন্মাদিনী হয়েছেন বলে। এই সমন্বয় যাঁরা চান না, যাঁরা বলেন এই সমন্বয় জগাখিচুড়ি, তাঁরা হিন্দু বা মুসলমান কারোর ভাল চান না।

অল ইন্ডিয়া রেডিওর তৈরি যে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ না শুনলে বাঙালির শারদোৎসব শুরু হয় না, সেই অনুষ্ঠানের যন্ত্রশিল্পীদের অনেকেই ছিলেন মুসলমান। সেটা কি সহাবস্থানের উদাহরণ নাকি সমন্বয়ের উদাহরণ? সহাবস্থানবাদীরা কি বলবেন ঐ শিল্পীদের বাদ দিয়ে করা উচিৎ ছিল অনুষ্ঠানটা বা ঐ শিল্পীদের নিজে থেকেই বলা উচিৎ ছিল আমরা বাজাব না? এরপর কি শুনব বড়ে গোলাম আলি খাঁ সাহেবের উচিৎ ছিল “হায় রাম” বোল বাদ দিয়ে “ইয়াদ পিয়া কি আয়ে” গাওয়ার আদেশ মেনে নিয়ে পাকিস্তানেই থেকে যাওয়া? নাকি শুনব নজরুলের অতগুলো শ্যামাসঙ্গীত লেখা ঠিক কাজ হয়নি? হিন্দুরাষ্ট্রবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমরা এভাবে সাভারকর-জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্বকেই মেনে নেব নাকি?

কেউ কেউ আপত্তি করছেন এই বলে যে দৈনন্দিন জীবনে যখন মুসলমানদের এক সূত্রে বেঁধে নেওয়ার প্রচেষ্টা ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে, তখন এ সমস্ত “দ্যাখনাই” ব্যাপারের কোন দরকার নেই। প্রথমত, ৩৩ এর পল্লী ওরকম থিম না করলে কি রোজকার জীবনে মুসলমানদের প্রান্তিক করে দেওয়ার চেষ্টা কিছুমাত্র কম হত? আর ঐ মণ্ডপ হওয়াতেই বা দুই সম্প্রদায়ের ব্যবধান ঘোচানোর প্রচেষ্টায় আমাদের বাধা দিচ্ছে কে?

দ্বিতীয়ত, কিছুটা দ্যাখনাইয়েরও প্রয়োজন আছে বইকি। যুগটাই দৃশ্য শ্রাব্য উদ্দীপকের যুগ। নইলে মুসলমানদের রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে চুপিসাড়ে খুন করলেই তো হিন্দুত্ব ব্রিগেডের কাজ চলে যেত। প্রকাশ্য জায়গায় পিটিয়ে মারার দরকার কী? গণপিটুনির ভিডিও তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? আসলে ওরা এমন করে শুধু সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্যে নয়, এমনটাই যে স্বাভাবিক, এরকম যে করাই যায় তা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্যে। এদের সাথে লড়তে গেলে আমাদেরও বেশি বেশি করে দেখানো দরকার যে পুজো আর নমাজ পাশাপাশি চলাটাই স্বাভাবিক।

আমাদের একজন রবীন্দ্রনাথ ছিলেন। তিনিও বলতেন যে আমার ভাই তাকে ছাদে উঠে চেঁচিয়ে আহা, ভাই বুকে এসো, বলার দরকার নেই। বললেই বরং বোঝা যায় কোন গোলমাল আছে। কথাটা সাধারণ অবস্থায় ঠিক। কিন্তু সেই রবীন্দ্রনাথই তো বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনে পথে নেমে সকলের হাতে রাখী পরালেন। অবনীন্দ্রনাথ লিখেছেন গঙ্গাতীরে রাখীবন্ধন উৎসব করে জোড়াসাঁকোয় ফেরার পথে রবীন্দ্রনাথ সটান নাখোদা মসজিদে ঢুকে পড়লেন। ওঁরা তখন বাইরে দাঁড়িয়ে আশঙ্কা করছেন কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে। অথচ কিছুক্ষণ পরেই সহাস্য রবীন্দ্রনাথ ইমামের হাত ধরে বেরিয়ে এলেন রাখী পরিয়ে। তাহলে দ্যাখনাই কাজ করলেন কে? রবীন্দ্রনাথ, না ইমাম? নাকি দুজনেই? তার চেয়েও বড় কথা, কাজটা অন্যায় হয়েছিল কি?

আর দ্যাখনাই বলছেন কাকে? কোন মুসলমান ব্যক্তি প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে গেছেন এমন ছবি দেখেও দেখছি অনেকে অসন্তুষ্ট। এগুলো নাকি সংখ্যাগুরুর কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে দ্যাখনাই। মানে কি এই কথাটার? কোন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ পুজোয় নতুন জামাকাপড় কেনেন, ছেলেমেয়েকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরোন হিন্দুদের কাছে প্রিয় হওয়ার জন্যে? পশ্চিমবঙ্গের বহু পুজো কমিটি চালান যে মুসলমান কর্মকর্তারা, তাঁরা আসলে হিন্দুদের প্রিয় হতে চান? এইভাবে ব্যক্তিমানুষকে, তার সাধ আহ্লাদকে ধর্মীয় পরিচিতির কারণে অপমান করা যায়? তাহলে আমি যখন আমার মুসলমান বন্ধুর বাড়ি ইফতারে যাই সেটা আসলে নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ প্রমাণ করতে যাই? হোস্টেলজীবনে আমরা যে মুসলমান সহপাঠীদের ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময়ে হুমকি দিতাম “খাবার দাবার না আনলে ঢুকতে দেব না হোস্টেলে”, সেটা তাহলে সংখ্যালঘুর উপরে সংখ্যাগুরুর শক্তির আস্ফালন ছিল?

আমাকে আমার মত থাকতে দাও, তুমি তোমার মত থাকো — এই অনুপম রায়ে আসলে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের হাত শক্ত হচ্ছে। অনেক প্রগতিশীল, বামপন্থী হিন্দু এবং মুসলমানের যেসব বক্তব্য এবার পুজোয় শুনলাম তাতে বুঝলাম এঁরাও হিন্দুত্ববাদীদের মত হিন্দু, মুসলমান পৃথগন্ন হয়ে থাকলেই খুশি। কদিন পর এমনও বলতে পারেন যে হিন্দু-মুসলমানে বিয়ে টিয়েও না হলেই ভাল হয়। সেই আমার বন্ধুর মত আর কি। লাঠালাঠি চাই না, গলাগলিও চাই না।

নজরুলের কথা বলেছিলাম গোড়াতেই। তিনি ঠিক যা বলেছিলেন সেটা দিয়ে শেষ করি

আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেন না, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি।

বং কারেকশন

জন্মদিনে ছোটদের উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ দিতে ভয় হয়। যদি আদৌ ছুঁয়েই না দ্যাখে স্নেহভাজনটি?

জ্যাঠতুতো, পিসতুতো মিলিয়ে আমার এগারোজন জামাইবাবু। সর্বকনিষ্ঠ শ্যালক হওয়ার কারণে তাঁদের অনেকের বিয়ের সময়ে আমি যুক্তাক্ষর পর্যন্ত জানতাম না। কিন্তু শালা শালীদের সিনেমা দেখতে নিয়ে যাওয়ার সময়ে আমাকে তাঁরা বঞ্চিত করেননি। আমার কাছে এবং আমার তুতো ভাইবোনদের কাছে তাই জামাইবাবুরা বড় আব্দারের জায়গা। আজকাল কিন্তু তাঁরা বিরল। জিজু নামের এক নতুন প্রজাতি তাঁদের জায়গা দখল করেছে।

পাশের বাড়ির ছেলেটা আমাকে কাকু বলে না, বলে আঙ্কল। আমার স্ত্রীকে আমার মেয়ে বন্ধুদের ছেলেমেয়েরা মামী বলা শিখল না, শিখল আন্টি। ট্রেনে বাসে অচেনা বয়স্ক মহিলারাও আর মাসিমা নেই, আন্টি হয়ে উঠেছেন। সম্পূর্ণ অচেনা লোককে আন্তরিক ভদ্রতায় “দাদা, একটু সরবেন?” বলার দিন গেছে। কেঠো “এক্সকিউজ মি” না বললে অভদ্র বলেই মনে করা হয় আজকাল।
ঘরোয়া আইবুড়ো ভাতকে কনুইয়ের গুঁতোয় এক কোণে সরিয়ে দিয়েছে মেহেন্দির জাঁকজমক। জন্মদিনে ছোটদের উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, সত্যজিৎ দিতে ভয় হয়। যদি আদৌ ছুঁয়েই না দ্যাখে স্নেহভাজনটি?
প্রাণের বন্ধু এখন আর ভাইয়ের মত নয়। সে হল ব্রো। মেয়েদের পাতানো ভায়েরা সব “ভাইয়া”। যে বন্ধুর মা চমৎকার রাঁধেন, তাঁর রান্না “সুপার সে ভি উপর”।

অনেক শিক্ষিত পাড়ায় গ্রীষ্মে রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যা বন্ধ বহুকাল, যেমন নবমীতে পাড়ার মণ্ডপে ছোটদের জন্যে ধুনুচি নাচের প্রতিযোগিতাও উঠে গেছে। কোথাও কোথাও এসে গেছে টিভির রিয়্যালিটি শোয়ের অনুকরণে নাচ গানের প্রতিযোগিতা, যেখানে পাঁচ ছয় সাত আট বছরের শিশুরা হিন্দি ছবির আইটেম সঙে নেচে গেয়ে হাততালি পায়।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কাঁধ ঝুলে পড়া ছেলেকে তার বন্ধুরা “দেবদাস দেবদাস ভাব করলে প্যাঁদাব কিন্তু” বলে না, বলে “কাম অন ইয়ার।” ইংরিজি শব্দ বাদ দিয়ে বাংলা ছবির নামকরণ হওয়াই শক্ত হয়ে গেছে, হলেও তা লেখা হয় রোমান হরফে। ছবির নায়ক নায়িকা প্রেম সম্বোধন করে “সোড়িঁয়ে”, “সাইয়াঁ”, “জানু”, “জানেমন” বলে। প্রিয়ার কী রূপ সে-ও জানে না, যে কখনো ভালবাসে।

অমিত শাহ এসব জানেন। তিনি জানেন হিন্দি চাপাতে গেলে তামিল, তেলুগু, মালয়ালিরা ক্ষেপে উঠতে পারে, বাঙালিদের ক্ষেপে ওঠার সম্ভাবনা কম। কারণ বাঙালি সুদূর অতীতে ব্যতিক্রমী ছিল বটে, এখন সে শুধু “হটকে”।

সাত শতাংশের অধিকারে

তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ?

যতই ক্ষমতাচ্যুত হোক, ক্ষমতাহীন হোক, বামপন্থীরা রাস্তায় নামলে ঢেউ উঠবে। আজও এর কোন ব্যতিক্রম পৃথিবীর কোথাও নেই। পার্টির নাম, সংগঠনের নাম যা-ই হোক। আর ন্যায্য দাবীতে রাস্তায় নামলে অকর্মণ্য শাসক মারবে, ধরবে, মাথা ফাটাবে — এরও কোন ব্যতিক্রম হয় না। ফলে গতকালের নবান্ন অভিযানে রাজপথে যেসব দৃশ্যের জন্ম হয়েছে সেগুলো অনভিপ্রেত হলেও অপ্রত্যাশিত নয়। বুক চিতিয়ে পুলিশের সঙ্গে লড়ে গেলেন যে নূতন, সবুজ, কাঁচারা তাঁদেরও সাধুবাদ প্রাপ্য। ফেসবুক বিপ্লবের যুগে রাস্তাই যে একমাত্র রাস্তা সেকথা শিরোধার্য করে এইভাবে রক্তাক্ত হতে যাঁদের বাধে না তাঁদের কুর্নিশ না করে উপায় নেই। সমস্যা অন্যত্র।
কাল সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এস এফ আই আর যুব সংগঠন ডি ওয়াই এফ আই যে দাবীগুলোর ভিত্তিতে নবান্ন অভিযান করছিলেন — স্বল্প খরচে শিক্ষার দাবী এবং কাজের দাবী — সেগুলো যে ন্যায্য তা নিয়ে কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের মনে কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়, যদি না তিনি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলের অন্ধ সমর্থক হন বা মুখ্যমন্ত্রীকে দৈবী শক্তির অধিকারী, মানবিক ভুলচুকের অতীত বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনীতি, বিশেষত বিরোধী রাজনীতি, শুধু দাবী সনদ পেশের ধারাবাহিকতার নাম নয়। উপরন্তু ছাত্র সংগঠনের বা যুব সংগঠনের কেবল তাদের গোষ্ঠীগত স্বার্থের কথাই বলা উচিৎ, বৃহত্তর রাজনীতি তাদের কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিৎ নয় — এমনটা আর যে-ই ভাবুক, বামপন্থীরা নিশ্চয়ই ভাবেন না। সেদিক থেকে দেখলে প্রায় একইরকমের দাবী নিয়ে গত কয়েক বছরে কখনো সিপিএম দলের নবান্ন অভিযান, কখনো কৃষক সভার নবান্ন অভিযান, কখনো ছাত্র, যুব সংগঠনের নবান্ন অভিযান দেশের যে বর্তমান রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক সঙ্কট তার সাপেক্ষে কী অবস্থান নিচ্ছে? অভিযানগুলো বারবার নবান্নেই বা যাচ্ছে কেন?
শিক্ষা, স্বাস্থ্যকে পণ্য করে তোলার যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ তে শুরু হয়েছিল, ২০১৪ থেকে বিজেপি শাসনে তা আরো প্রকাশ্য, আরো নির্লজ্জ। আম্বানিদের যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো চালুই হয়নি তাকে সেন্টার অফ এক্সেলেন্স তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের মত সরকারপোষিত প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের পুরো মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা নাকি সরকারের নেই, ইসরোর গবেষকদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এ রাজ্যে কলেজে তোলাবাজি, হবু শিক্ষক, প্যারা টিচারদের পুলিশ দিয়ে পেটানো ইত্যাদি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের কোথাও শিক্ষাজগতের লোকেরা ভাল নেই। না ছাত্রছাত্রীরা, না গবেষক শিক্ষক শিক্ষিকারা। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মৌলিক অধিকার বিপন্ন। তাহলে এসব নিয়ে সিপিএম বা তার গণসংঠনগুলোর সংসদ অভিযান হচ্ছে না কেন?
কাজের অধিকার সারা দেশে কিভাবে বিপন্ন তা তো আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গত কয়েক মাসে কয়েক হাজার মানুষের চাকরি গেছে, আরো বহু মানুষ আশঙ্কিত। যাদের চাকরি আছে তাঁরাও অনেকে মাইনে পাচ্ছেন না বি এস এন এল কর্মীদের মত। তা নিয়ে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলো (সিটু তো বটেই) আন্দোলনও করছে। অথচ দল হিসাবে এসব নিয়ে সিপিএমের রাস্তায় নেমে আন্দোলন সংসদ বা সাউথ ব্লকের দিকে যাচ্ছে না কেন? এস এফ আই বা ডি ওয়াই এফ আই এর অভিযানই বা দিল্লীমুখো নয় কেন? অন্য রাজ্যে সাংগঠনিক শক্তির অভাব আছে বলে দিল্লী আক্রমণ করছি না, একথা যদি কেউ বলেন, সেটাকে অজুহাত বলেই ধরতে হবে কারণ মহারাষ্ট্র, রাজস্থান বা হরিয়ানার মত যেসব রাজ্যে সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক কম, সেখানকার কৃষকদের পর্যন্ত সংগঠিত করে দিল্লী, মুম্বইয়ের বুকে সিপিএমের কৃষক সভার উদ্যোগে কিষাণ লং মার্চ সারা দেশ অল্প দিন আগেই দেখেছে। তাহলে?
তার চেয়েও বড় কথা “বুনিয়াদি লড়াইটা হল ভাতের লড়াই। বামপন্থীদের সেই লড়াই জারী রাখতে হবে” — এই জাতীয় যুক্তিতে সমকালের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কি কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন রাজনৈতিক দলের উচিৎ? সারা দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিপদ হল হিন্দুত্ববাদী একনায়কতন্ত্রের বিপদ। যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র লুপ্ত হওয়ার বিপদ। সেই বিপদ কোন দিক থেকে এসেছে (এখনো আসছে ভাবার ভুল করবেন না) তা আমরা সবাই জানি। তার বিরুদ্ধে রাস্তার লড়াইকে কি সিপিএম কোন অদূর ভবিষ্যতের জন্যে স্থগিত রেখেছে? রাখতে পারে? রাজ্যের তৃণমূল সরকার তো ২০১১ থেকেই এখনকার মত চলছে। তা নিয়ে বারবার নবান্ন অভিযানে পার্টি সদস্য বা গণসংগঠনের সদস্যদের রক্ত ঝরছে অথচ মানুষের সমর্থন বাড়ার বদলে কমেই চলেছে। এর কারণ কী? আসলে কি মানুষের ইস্যু বুঝতেই ভুল হচ্ছে? নিজেদের পছন্দের ইস্যুকেই মানুষের ইস্যু বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? নেতৃত্ব এগুলো ভাববেন না?
পশ্চিমবঙ্গের গরীব, বড়লোক, মধ্যবিত্ত সকলেই এই মুহূর্তে কোন ইস্যুটা নিয়ে উদ্বিগ্ন? বা নিদেন পক্ষে আগ্রহী? নিঃসন্দেহে এন আর সি। বিজেপি রোজ বলছে, বড় মেজ সেজ ছোট সব নেতা নেত্রী বলছেন বাংলায় এন আর সি হবেই। শুধু বাংলাই বা কেন? আসামে ডিটেনশন সেন্টার তৈরি হয়ে গেছে, অন্যত্রও হচ্ছে। তা নিয়ে সিপিএম নেতৃত্ব এখনো কিন্তু, যদি, তবে করছেন। কখনো শোনা যাচ্ছে আসামের বাইরে এন আর সি হলে ওঁরা বিরোধী, অর্থাৎ আসামে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। কখনো বলছেন দেখতে হবে যেন সত্যিকারের নাগরিকরা বাদ না পড়ে যান। এসবের মানে কী? যে পার্টি অসহায় মানুষ, গরীব মানুষ, ছিন্নমূল মানুষের পাশে নির্দ্বিধায় দাঁড়ায় না, মানুষকে ছিন্নমূল করার প্রক্রিয়ার বিপক্ষে পিঠ সোজা করে দাঁড়ায় না — সে আবার কিরকম কমিউনিস্ট পার্টি?
ওদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু এ নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শেষ অব্দি সারদা, নারদের চোখ রাঙানি পেরিয়ে কদ্দূর কী করবেন সেটা পরের কথা, কিন্তু ছিন্নমূল হতে চলা মানুষ কিন্তু দেখছেন তিনি বলেছেন “দু কোটি লোককে বার করে দেবে? দুটো লোকের গায়ে হাত দিয়ে দেখাক।” এরকম কথা সিপিএম তথা বাম নেতাদের মুখে শোনা যাচ্ছে না কেন? তাঁরা কি ভাবছেন বাঙালদের পক্ষ নিলে এদেশীয় ভোটাররা ক্ষেপে যাবেন? উদ্বাস্তুদের জন্যে আন্দোলন কিন্তু স্বাধীনোত্তর ভারতে তথা বাংলায় বামপন্থীদের শক্ত জমিতে দাঁড় করিয়েছিল।
আচ্ছা, রাজ্য সরকারকেও কি সঠিক ইস্যুতে আক্রমণ করা হচ্ছে? মুখ্যমন্ত্রীর সাধের মেট্রো রেল প্রকল্প এমনই কল্পরাজ্যের জিনিস যে তাকে বাস্তবের মাটিতে নামাতে গিয়ে বহু লোকের ভিটেমাটি চাটি হওয়ার যোগাড় হয়েছে। তা নিয়েই বা বামেদের আন্দোলন কই? যে শহরে এই সরকারের আমলেই নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে, প্রকল্প শেষ করা সম্ভব নয় বলে ঘোষিত হয়েছে, সেই শহরে আবার এরকম সর্বনাশা প্রকল্প এগোল কী করে তা নিয়ে বামেরা সরকারকে প্রশ্নবাণে, আন্দোলনে জর্জরিত করলেন কই? নেতৃত্ব কি মনে করেন এগুলোতে কারোর কিছু এসে যায় না? নাকি ওখানেও হিসাব? বাড়ি ভেঙে পড়া লোকেদের চেয়ে মেট্রো হলে যারা চড়বে তাদের ভোটসংখ্যা বেশি হওয়ার হিসাব?
যদি তা-ই হয়, তাহলে এই যাঁরা লাল ঝান্ডার জন্যে এখনো প্রাণ বাজি রাখছেন তাঁরা কোন হিসাবে আছেন জানতে ইচ্ছা করে। তাঁদের ত্যাগ, তাঁদের রক্ত অপচয় হচ্ছে না তো? সাম্প্রতিককালে অনেকের মুখে কাছের শত্রু তৃণমূল, তারপর বিজেপির মোকাবিলা করা হবে ইত্যাদি শোনা যাচ্ছে। মনে পড়ল, ছেলেবেলা থেকে দেখি গণশক্তির সম্পাদকীয় স্তম্ভের উপরে কোন মার্কসবাদী ক্লাসিক সন্দর্ভ থেকে কয়েক লাইন উদ্ধৃত থাকে। যখন স্কুলে পড়ি তখন একটা উদ্ধৃতি প্রায়ই দেখতাম। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পারছি তাতে কথাটা ছিল খানিকটা এরকম: কমিউনিস্টদের লক্ষ্য, অন্য সব সর্বহারা পার্টির মতই, শ্রমিক শ্রেণীর আশু দাবীগুলি আদায় করা। কিন্তু তার মধ্যেও তারা বৃহত্তর লড়াইয়ের কথা ভোলে না এবং আসন্ন বিপ্লবের জন্যে প্রস্তুতি নেয়।
আশা করি বাম নেতাদের স্মৃতিশক্তি আমার চেয়ে অনেক ভাল, তাঁরা আমার মত ক্লাসিকগুলো না পড়া লোক নন এবং ক্লাসিকগুলোর সময়োপযোগী ব্যাখ্যা করার শক্তিও তাঁদের অনেক বেশি।
কোন সিপিএম/বাম কর্মী বলতেই পারেন “তুমি কে হে, এত কথা বলছ? কোনদিন আমাদের কোন মিছিলে এক ঘা লাঠিও তো খাওনি। তোমার কী অধিকার এসব লেখার?” বললে তিনি ঠিকই বলবেন। তবে উত্তরে আমারও একটু বলার আছে।
আমি এই কথাগুলো লিখলাম সাত শতাংশের অধিকারে। অর্থাৎ আমি সেই সাত শতাংশের মধ্যে পড়ি যারা এখনো আপনাদের ভোট দেয়। অতএব আমার মতামতকে গুরুত্ব দিতে আপনারা বাধ্য। সংসদীয় গণতন্ত্রে কতিপয় লোকের এটুকু বাঁদরামি আপনাদের মেনে নিতেই হবে।

ন্যায় অন্যায়

রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে?

ঐতিহাসিক সঙ্কটের সময়ে অনেক বড় মানুষেরই ন্যায় অন্যায় গুলিয়ে যায়, আমাদের মত সাধারণ লোকের তো গুলিয়ে যেতেই পারে। তাই ৩১শে আগস্ট আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পর দেখছি উনিশ লক্ষ বাদ পড়েছে বলে যাঁরা দুঃখ বা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য ব্যাপারটা দুঃখজনক, কিন্তু ন্যায় কি অন্যায় তা জানি না। খসড়া তালিকা প্রকাশ পাওয়ার পরে উদাসীন বা এন আর সি সমর্থক মানুষের সংখ্যা কিন্তু অনেক বেশি ছিল এই বাংলায়। সেদিক থেকে এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। কিন্তু তার একটা বড় কারণ, যা বিজেপির প্রতিক্রিয়া থেকেই পরিষ্কার, তালিকার বাইরে থাকা মানুষদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া।

আসামের অনেক হিন্দু বাঙালির মত পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু বাঙালিও বিজেপির প্রোপাগাণ্ডায় ভুলে বিশ্বাস করেছিল আসাম রাজ্যটাকে বাংলাদেশ থেকে আগত মুসলমানরা একেবারে দখল করে নিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গও “ওদের” দখলে চলে যাচ্ছে। ফল আশানুরূপ না হওয়ায়, উপরন্তু হিন্দুরাই বেশি বাদ পড়ে যাওয়ায় এরা স্তম্ভিত, উৎকণ্ঠিত। ফলে উনিশ লক্ষ দেশহীন মানুষের জন্য হঠাৎ সমবেদনা তৈরি হয়েছে এবং রংচঙে ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা “বাংলায় এন আর সি চাই” বলে যে ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছিল, নিজেদের বিপদের আশঙ্কায় সেগুলো আর তত চোখে পড়ছে না। উলটে এই অধমের পোস্টে, যারা কাশ্মীরকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, কাশ্মীরি মেয়েদের বিয়ে করতে পারবে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়েছিল (চুয়াত্তর বছর ধরে তো নেহরু আটকে রেখেছিল), তারাও লাইক দিয়ে যাচ্ছে।

এদের নিয়ে ভাবি না। কিন্তু এরাই সব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিনি এমন অনেক হৃদয়বান মানুষকেও দেখছি বলছেন কোনটা ঠিক কোনটা ভুল জানি না। সেই জন্যই এই পোস্টের অবতারণা।

আসামে নাগরিকপঞ্জী নবায়ন করা বন্ধ করা উচিৎ এবং দেশের কোথাও এ জিনিস করা কেন উচিৎ নয় এসব বোঝাতে বহু মানুষ বহুদিন ধরে কাজ করছেন। ফেসবুকে NO NRC নামে একটা গ্রুপও আছে। সেসব দেখতে পারেন, দেখা প্রয়োজনও। কিন্তু সেসব ছাড়া নিজেই কতকগুলো কথা ভেবে দেখুন।

প্রথমত, পৃথিবীর সব রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নাগরিকত্বের কিছু প্রমাণপত্র দেয়। ভারত রাষ্ট্রও দেয়। যেমন ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট। এখন আবার সব কার্ডের বাড়া বলা হচ্ছে আধার কার্ডকে। এই প্রমাণপত্রগুলো কিসের প্রমাণ? আপনি যে ভারতের নাগরিক তার প্রমাণ। পৃথিবীর সব দেশই নাগরিকের থেকে তার সেই দেশের নাগরিক হওয়ার প্রমাণই দাবী করে। কিন্তু এন আর সি র কাছে এগুলো কোন প্রমাণই নয়। সেখানে রাষ্ট্র বলছে আপনি এদেশের নাগরিক কিনা তাতে আমার বয়ে গেছে। আপনি বলুন আপনার ঠাকুর্দা, দাদু, দিদিমা, বাবা, মা এঁরা এদেশের নাগরিক ছিলেন কিনা। একে যুক্তি বলে? কতটা পেছোব আমরা? ঠাকুর্দাতেই বা থামা কেন? ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ এই বা থামার দরকার কী? ১৫ই আগস্ট, ১৯৪৭ এ আমার পরিবারের যাঁরা জীবিত ছিলেন তাঁরা এ দেশের নাগরিক ছিলেন কিনা জানতে চাইলেই বা ঠেকাচ্ছে কে? ধরুন আগামী দিনে রাষ্ট্র আরো পেছোতে চাইল। বলল ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহ হল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। তার আগে আপনার পূর্বপুরুষ এ দেশে ছিলেন কিনা বলুন। না থাকলে আপনি নাগরিক নন। আজ লিগ্যাসি ডকুমেন্ট চাইলে না হয় বাড়ির দলিল, বাবার গ্র‍্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট ইত্যাদি দেখাচ্ছেন। তখন পূর্বপুরুষের নামটা খুঁজে পাবেন তো?
জানি এর পালটা যুক্তি হিসাবে বলা হবে ভারতে এত দুর্নীতি যে সীমান্ত পেরিয়ে এসে ভোটার কার্ড ইত্যাদি করিয়ে ফেলা কোন ব্যাপারই নয়। অতএব ওগুলো কোন প্রমাণ নয়। ঠিক কথা। আচ্ছা দুর্নীতিটা কার? রাষ্ট্রেরই তো। ঘুষ নিয়ে সীমান্ত পার করিয়ে দেয় যে সীমান্ত রক্ষী সে রাষ্ট্রের যন্ত্র। রাষ্ট্রেরই অন্য কয়েকটা যন্ত্রের দুর্নীতি ছাড়া আপনি সত্যিকারের নাগরিক না হলে ভোটার, প্যান, পাসপোর্ট, আধার কিছুই বানিয়ে উঠতে পারবেন না। একথা ঠিক যে যে ঘুষ নেয় আর যে ঘুষ দেয় — দুজনেই দোষী। কিন্তু এন আর সি যদি যে ঘুষ দিয়ে নাগরিকত্ব কিনেছে তাকে চিহ্নিত করার এবং শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়, তাহলে যারা ঘুষ নিয়ে নাগরিকত্ব বিক্রি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থাটা কোথায়? নেই যখন তখন স্পষ্ট যে এই ব্যবস্থা তৈরিই হয়েছে এক পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে, অর্থাৎ এ অন্যায় ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত আইনের মূল মন্ত্র হল “Innocent till proved guilty.” অর্থাৎ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হলে যতক্ষণ আপনি দোষী প্রমাণিত না হচ্ছেন ততক্ষণ আপনি নির্দোষ। এন আর সি কিন্তু উলটপুরাণ। রাষ্ট্র ধরেই নিচ্ছে তার কিছু নাগরিক আসলে নাগরিক নয়। তারপর সেই নাগরিককে বলছে “প্রমাণ করো তুমি নাগরিক।” কেন? রাষ্ট্র প্রমাণ করে দেখাক না যে অমুক আসলে অনুপ্রবেশকারী, নাগরিক নয়। “মারতে চাও তো ডাকাও নাকো জল্লাদ। গন্ধ শুঁকে মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ?”

কিন্তু এ দুটো যুক্তির চেয়েও বড় কথা, এদেশে নাগরিকত্বের একাধিক প্রমাণপত্রের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যদি আমরা জাতীয় নাগরিকপঞ্জী তৈরি করা মেনে নিই, তাহলে রাষ্ট্রকে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা ইচ্ছে মত বদলে নেওয়ার অধিকার দিয়ে দেওয়া হয়। ইংরিজিতে যাকে “shifting posts” বলে। এর বিপদটা ভেবে দেখুন। আজ রাষ্ট্র একটা তারিখ বেঁধে দিয়ে বলছে তার আগে যাদের পরিবার এ দেশে ছিল না তারা নাগরিক নয়। কাল বলতেই পারে সকলের ডি এন এ পরীক্ষা করব। যাদের মধ্যে উত্তরে হিমালয় আর দক্ষিণে ভারত মহাসাগরের মাঝের এই ভূখণ্ডের বাইরের জিন পাওয়া যাবে, সে নাগরিক নয়। তাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। তখন রাষ্ট্রের সুবিধা মত এক একটা জনগোষ্ঠী ধরে অনাগরিক ঘোষণা করে দেওয়ার ভারী সুবিধা হবে। এবং সেটা কখন কোন জনগোষ্ঠী, তা কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছাধীন হবে। ফলে কোন জনগোষ্ঠীই নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। ভাবছেন নেহাত ভয়ের বেসাতি করছি? মনে রাখবেন, আধার কার্ডের মাধ্যমে আমার আপনার বায়োমেট্রিক তথ্য কিন্তু ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রের হাতে।

আসামের নাগরিকপঞ্জীর অবশ্যই একটা ইতিহাস আছে, যা দেশের অন্য কোন রাজ্যের সাথে মেলে না। অসমিয়া জাতি পরিচয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতিকে ধামাচাপা দিতে ১৯৮৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী সেই ইতিহাসটার অপব্যবহার করে ১৯৫১ র নাগরিকপঞ্জী নবায়নের এই গাজরটি ঝুলিয়েছিলেন। আজকের কেন্দ্রীয় সরকারকে এই নিয়ে কিছু বললেই তাঁরা হাত উলটে বলেন “সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তো হচ্ছে। আমরা তো কিছু করিনি।” যেন সবসময় সব মামলায় সরকার সুপ্রিম কোর্টের বাধ্য ছেলেটি। যেন আইনি বিতর্কের মাধ্যমে আদালতের মত বদলের চেষ্টা করা সরকারের কাজ নয়। অথচ এই সেদিন আধার মামলার সময়ে সরকারী কৌঁসুলি বিচারপতিদের ধমক খেতে খেতেও আধারের জন্যে প্রাণপণ লড়ে গেছেন।
আর বিরোধী দলগুলো? তারা কে জানে কোন প্রণোদনায় কতকগুলো অর্থহীন কথা বলে চলেছে। কংগ্রেসের বিশেষ কিছু বলার মুখ নেই, যেহেতু তাদের নেতাই প্যান্ডোরার এই বাক্সটি খুলে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তারা কেবল পদ্ধতিগত ত্রুটির প্রশ্ন তুলে বাদ পড়া মানুষের জন্যে অশ্রুপাত করছে। কিন্তু অন্য দলগুলোর ভূমিকাও কম ন্যক্কারজনক নয়। তৃণমূল আজ বাঙালি বাদ না গেলেই খুশি তো কাল গোর্খারা বাদ না গেলেই খুশি। বৃহত্তম বামপন্থী দল আবার প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক যেন বাদ না যায় সেদিকে নজর দিতে বলছেন। সরকার কেন খুলে বলছে না যাদের নাগরিকত্ব শেষ অব্দি প্রমাণ হবে না তাদের কী করা হবে — এই নিয়ে চেঁচামেচি করছেন। যেন তাঁরা জানেন না ইতিমধ্যেই আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যাঁরা আছেন তাঁরা কেন আছেন, নির্মীয়মাণ ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো কেন বানানো হচ্ছে।

হে মোর দুর্ভাগা দেশ!

ভাবনা করা চলবে না

আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন

ফ্যাসিবাদের একটা মহৎ গুণ আছে — অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনির কাজ করে। কেন বলছি?
২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচন নানা দিক থেকেই অনন্য ছিল। যেমন ধরুন, বামপন্থী পরিবারে জন্মে, বরাবর বামপন্থী রাজনীতির কাছাকাছি থেকে যা দেখতে পাইনি, এবারের লোকসভা নির্বাচনের আগে পরে তেমন এক ঘটনা দেখলাম। শক্তি কমে আসা বামপন্থীরা দু ভাগে ভাগ হয়ে গেলেন, নিজেদের মধ্যে কোন আদর্শগত মতানৈক্যে নয়, কোন অবাম দলকে সমর্থন করা উচিৎ, কাকে উচিৎ নয় তাই নিয়ে।
এক দল বললেন বিজেপি যেহেতু দেশের সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ, তাই ওদের হারাতে সকলের সাথে জোট করতে হবে। তবে কিনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর বিজেপির তফাত উনিশ বিশ। তাই ওঁকে বাদ দিয়েই করতে হবে এই জোট। কংগ্রেস অতীতে যা-ই করে থাক, ওদের সাথে থাকতেই হবে এই পরিস্থিতিতে। ওরা আর যা-ই হোক বিজেপি তো নয়। অস্যার্থ, একলা লড়তে ঠিক সাহস পাচ্ছি না। তাছাড়া সারা দেশে লড়ার শক্তিও নেই। অতএব ওরা লড়ুক, বাফারের কাজ করুক। আমরা তো রইলামই।
আরেক দল বামপন্থী উপর্যুক্ত বামেদের প্রবল আক্রমণ করলেন। বললেন ওঁরা ক্ষমতা হারানোর আক্রোশে, ক্ষুদ্র স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করছেন। বরং মমতার হাতই শক্ত করা উচিৎ। বাঁচালে উনিই পারেন বাঁচাতে। উনিই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবচেয়ে অগ্রণী সৈনিক। অস্যার্থ, আমাদের তো শক্তি নেই। উনি নেতৃত্ব দিন, আমরা লড়ে যাব।
নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর দু পক্ষই যে ভুল ছিলেন তা পরিষ্কার হয়ে গেল। দেখা গেল প্রথম দল কংগ্রেসের লড়ার ক্ষমতায় আস্থা রাখলেও ভোটাররা রাখেননি। উলটে কংগ্রেস কী করবে আর কী করবে না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে গিয়ে বিজেপি বা মমতার বিরোধী হিসাবে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে। যে ভোট নিজেদের ছিল সেগুলো ধরে রাখার কাজটাও ঠিক করে করা হয়নি।
দ্বিতীয় দলের ভোটের হিসাবে হারানোর মত কিছু ছিল না। সম্ভবত সেটাই তৃণমূলের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের সবচেয়ে বড় কারণ। ভোটের ফলে দেখা গেল তাঁরা যে নেত্রীর উপর ভরসা করেছিলেন তাঁর উপর ভোটারদের যথেষ্ট ভরসা নেই।
ভোটের আগে বহু বাম এবং মধ্যপন্থী বন্ধুদের সাথে অনলাইন ও অফলাইনে ঝগড়া করেছি এই বলে যে বিজেপিকে আটকাতে হবে এই যুক্তিতে কোনরকম রামধনু জোট করলে কোন লাভ হবে না, বরং বিজেপির কাজ আরো সহজ হবে। এমনিতেই গত কয়েক বছরে ঘরে ঘরে যত্ন করে জমিয়ে তোলা ধর্মান্ধতা, মুসলমানবিদ্বেষের পরিমণ্ডলে অন্য সব ইস্যু যে পেছনে চলে যেতে পারে সেই আশঙ্কা করতে খুব বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তার উপর বালাকোট যে মানুষকে অন্য সবকিছু ভুলিয়ে দিয়েছে সে তো এতদিনে পরিষ্কার। কিন্তু রামধনু জোট কেন সারা দেশের কোথাও কাজ করল না তার অন্য কারণও তলিয়ে দেখা দরকার। সেটা করা খুব সহজ হয় বিজেপির জয়ের পর যারা এই নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী ছিল তাদের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে।
কংগ্রেসকে দিয়েই শুরু করা যাক। যে বামপন্থী দলগুলো কংগ্রেসকে ঢাল ভেবেছিলেন তাঁরা মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস সরকারের বিজেপিসুলভ কর্মসূচীকে পাত্তাই দেননি। গোশালা বানিয়ে দেব, রাম পথ বানিয়ে দেব — এসব বলে যারা বিধানসভা নির্বাচন জেতে, তাদের যদি ভোটাররা লোকসভায় ভোট না দেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? যদি কেউ হিন্দুত্বের জন্যেই ভোট দেবে ঠিক করে, তাহলে আগমার্কা হিন্দুত্বকেই দেবে, নকল হিন্দুত্বকে কেন দেবে? বিধানসভায় নাহয় রাজ্য সরকারের কাজকর্মে রুষ্ট হয়ে কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া গেল, লোকসভায় আর কেন? শুধু মধ্যপ্রদেশ? গুজরাটের নির্বাচনের সময়ে বিজেপি প্রশ্ন তুলল “রাহুল গান্ধী কি হিন্দু?” কংগ্রেস উত্তর দিল “উনি শুধু হিন্দু নন, রীতিমত পৈতেওলা হিন্দু।” বামফ্রন্ট (ওটা কি আছে এখনো? বহরমপুর কেন্দ্রে সিপিএম কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন করার পরেও?) নেতৃত্ব এই পার্টির হাত ধরে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়বেন ভেবেছিলেন। এসব অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। তারপর থেকে কংগ্রেস কী কী করেছে?
ইউ এ পি এ আইন এবং এন আই এ আইনের সংশোধনী, যেগুলো ব্যক্তির নাগরিক অধিকারে শেষ পেরেক পুঁতেছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকারের যে অধিকার তাতে কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিয়েছে, কংগ্রেস সেই সংশোধনগুলো নিয়ে বিতর্কে নানা গরম গরম কথা বলে শেষে রাজ্যসভায় পক্ষে ভোট দিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর ইস্যুতে সোনিয়া আর রাহুল গান্ধী সরকারের বিপক্ষে দাঁড়ালেও রোজ কোন না কোন কংগ্রেস নেতা সরকারকে সমর্থন করছেন। এমনকি পি চিদম্বরম গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে জয়রাম রমেশ, শশী থারুরের মত নেতা, যাঁরা সুললিত ইংরেজিতে গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি বলে গত কয়েক বছরে প্রচুর হাততালি কুড়িয়েছেন, তাঁরা বলতে শুরু করেছেন মোদীর অবিমিশ্র সমালোচনা করা নাকি ঠিক নয়। সীতারাম ইয়েচুরি, ডি রাজারা ভেবেছিলেন এদের হাত ধরে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়বেন।
এবার তৃণমূল কংগ্রেসের কথায় আসা যাক। নকশাল, এস ইউ সি আই প্রভৃতি বামপন্থীরা এই দলটির সর্বোচ্চ নেত্রীকেই মুক্তিসূর্য ভেবেছিলেন, ২০১৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়া সত্ত্বেও। তা তৃণমূল কী করেছে ভোটের পর থেকে?
এক কথায় বললে মহুয়া মৈত্র একটা মারকাটারি বক্তৃতা দিয়েছেন লোকসভায়। ব্যাস, আর কিচ্ছু না। ইউ এ পি এ আইনের সংশোধনী নিয়ে আলোচনায় বক্তৃতাটি দিয়ে ফেসবুক এবং ইউটিউবে কয়েক হাজার লাইক কুড়ানোর পর তৃণমূল সদলবলে ভোট দিয়েছে সরকারের পক্ষে। আর এন আই এ আইন নিয়ে ভোটাভুটিতে ওয়াক আউট করে পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছে। এ তো গেল সংসদের ভেতরের কথা। বাইরে তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যাওয়ার ঢল নেমেছে নির্বাচনের পর থেকে। তা আটকাতে অসমর্থ হয়ে শীর্ষ নেত্রীর বিজেপির থেকেও বেশি বিজেপি হওয়ার প্রয়াসও বেড়েছে। বিজেপি অযোধ্যায় রামমন্দির বানাবে, ইনি দীঘায় জগন্নাথ মন্দির বানাবেন বলছেন। একদিকে চা ওয়ালার সাফল্য দেখে চা ওয়ালীকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বরাবরের রণং দেহি মূর্তি বিসর্জন দিয়ে কেন্দ্রের সাথে সংঘাতে যাবেন না বলছেন।
তারপর আসা যাক অখিলেশ আর মায়াবতীর কথায়। দুজনে সব অতীত বৈরিতা ভুলে উত্তরপ্রদেশে একজোট হয়ে লড়েছিলেন। সেই জোটের উপরে আমরা বিজেপিবিরোধীরা সকলেই অনেক আশা (নাকি দুরাশা?) করেছিলাম। পরাস্ত হওয়ার পর থেকে সংসদে আনা সমস্ত অগণতান্ত্রিক বিলে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি আর মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি লক্ষ্মী হয়ে সরকারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। সংবিধানকে এবং গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে কাশ্মীরিদের প্রতি যা করা হল, আম্বেদকরের নামে শপথ নেওয়া মায়াবতীর পার্টি তাতেও বিনা বাক্য ব্যয়ে সমর্থন জানিয়েছে।
হিন্দুত্ববাদের সূতিকাগার, মোদী-শাহের ইন্দ্রপ্রস্থ যে গুজরাট, সেখানে তিন মহারথী এক হয়েছিলেন বিজেপিকে হারাবেন বলে। বামপন্থী, আম্বেদকরপন্থী জিগ্নেশ মেওয়ানি হাত মিলিয়েছিলেন চরম প্রতিক্রিয়াশীল উচ্চবর্ণের জন্যে সংরক্ষণ দাবী করা নেতা হার্দিক প্যাটেলের সাথে। এই বিপরীত মেরুর রাজনীতি কী করে মিলতে পারে তা নিয়ে যখন জিগ্নেশকে প্রশ্ন করা হয়েছিল নির্বাচনের আগে, তখন তিনি বলেছিলেন আগে তো বিজেপিকে হারাই, তারপর ওসব বুঝে নেব। বিজেপি বৃহত্তম বিপদ, আগে ওদের হারাতে হবে — এই যুক্তিতে তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্টদের পরামর্শ দিয়েছিলেন দিদির হাত শক্ত করতে। ফলাফলে দেখা গেল পরেরটা পরে হবে যুক্তি মানুষ বিশ্বাস করেননি। জিগ্নেশ আর হার্দিকের সঙ্গে জুড়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অল্পেশ ঠাকোর। অল্পেশ এখন বিজেপিতে, হার্দিক নির্বাচন কমিশনের বদান্যতায় নির্বাচনে লড়তে না পারার পর থেকে চুপ, জিগ্নেশ একা পড়ে গেছেন।
আর কে বিজেপিবিরোধী ছিলেন? অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অর্থাৎ আম আদমি পার্টি। ওঁদের কথা যত কম বলা যায় তত ভাল। দিল্লীতে যে ওঁরা একটা আসনও জিততে পারেননি সেটা বড় কথা নয়। বিজেপির কয়েক হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী প্রচার, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পার্টিজান কার্যকলাপের মধ্যে আপের মত একটা ছোট পার্টির না জিততে পারা দোষের নয়। কিন্তু বরাবরের লড়াকু কেজরিওয়াল কেমন যেন মিইয়ে গেছেন নির্বাচনের পর থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নিয়ে তাঁর আর কোন বক্তব্য নেই। দিল্লীকে রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হোক এই দাবী তিনি কবে থেকে করে আসছেন। অথচ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে তিন টুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করে দেওয়া হল, তিনি সমর্থন করলেন।
দেবগৌড়ার দল নিজেদের বিধায়ক, সাংসদ বিক্রি হওয়া আটকাতে পারছেন না, ডি এম কে ও সরকারের বাধ্য সন্তান।
তাহলে বাকি রইল কারা? কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স আর হায়দরাবাদের আসাদুদ্দিন ওয়েসিকে (যিনি লম্বা দাড়ি রাখেন আর ফেজ পরেন বলে আমরা মৌলবাদী বলে ধরেই নিয়েছি, যদিও গেরুয়া পরা সাংসদদের দেখে মৌলবাদী মনে হয় না) বাদ দিলে, বাকি রইলেন বামপন্থীরা। আপনার যদি গণতন্ত্র নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা থেকে থাকে এবং বিজেপির দেশপ্রেমের চশমা সরিয়ে আপনি যদি ফ্যাসিবাদ দেখতে পেয়ে থাকেন, তাহলে যতবড় বামবিরোধীই হোন না কেন, এই সত্য মেনে না নিয়ে আপনার উপায় নেই যে শুধু বামপন্থীরাই পড়ে আছেন। বস্তুত, এন আই এ আইনে রাজ্য সরকারকে ঠুঁটো জগন্নাথ আর এন আই এ কে সর্বশক্তিমান করে দেওয়ার বিপক্ষে লোকসভায় ভোট দিয়েছিলেন ঠিক ছজন — চার বাম সাংসদ আর ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং ওয়েসি।
ফ্যাসিবাদ ছেঁকে দিয়েছে। এখন থেকে ভারতে তার যত বিরোধিতা হবে, যেটুকু বিরোধিতা হবে তার নেতৃত্ব বামপন্থীদেরই দিতে হবে। তাঁরা চান বা না চান, বিজেপিকে তাত্ত্বিকভাবে ফ্যাসিবাদী বলে মানুন বা না মানুন। কারণ বাফারগুলো আর নেই, আর থাকবে না। কেউ সি বি আই, ই ডি ওষুধে জব্দ, কেউ নিজের ক্ষমতাটুকু ধরে রাখতে পারলেই খুশি, কাউকে স্রেফ কিনে নেওয়া গেছে এবং যাবে। কিন্তু বামপন্থীদের দিকে সিবিআই, ই ডি লেলিয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, কারণ তাঁদের দুর্নীতি নেই। পশ্চিমবঙ্গের কিছু সেজ নেতা ছাড়া কাউকে কিনে ফেলাও যাচ্ছে না।
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন, কারণ চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনে সিপিএমের দুর্নীতিগ্রস্ত এল সি এস, পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত প্রধানের মুখ আপনার মনে পড়বে, পড়া সঙ্গত। কিন্তু মনে রাখবেন, ভারতে এ পর্যন্ত ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছে যে দুটি বামপন্থী দল, তাদের আমলে সরকারী স্তরে দুর্নীতি ভারতের অন্য যে কোন রাজ্যের চেয়ে কম৷ আর কোন দলে আপনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বা মানিক সরকার বা পিনারাই বিজয়নের মত জীবনযাত্রার মুখ্যমন্ত্রী দেখাতে পারবেন কি? ইন্দ্রজিৎ গুপ্তের মত সৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে কজন পাওয়া গেছে বাজার অর্থনীতির যুগে? সদ্যপ্রয়াত নকশাল নেতা এ কে রায় বা শঙ্কর গুহনিয়োগীর কথা নাহয় না-ই বললাম। না-ই আলোচনা করলাম যুক্তফ্রন্ট সরকারের শ্রমমন্ত্রী এস ইউ সি আই নেতা সুবোধ ব্যানার্জির কথা। তাঁরা তো প্রাগৈতিহাসিক লোক বলে গণ্য হন আজকাল।
এখন প্রশ্ন, বামপন্থীরা লড়বেন কী করে? কতটুকু শক্তি তাঁদের? আর এস এস (বিজেপি তো ফ্রন্ট মাত্র) নামক কর্পোরেটপুষ্ট বেহেমথের সামনে তাঁরা কতটুকু? যদি বামপন্থী বলতে ক্রমহ্রাসমান সিপিএম বোঝেন তাহলে সত্যিই তাঁরা পারবেন না। যদি সীমিত সাংগঠনিক শক্তির সি পি আই বোঝেন তাহলে তাঁরাও পারবেন না। যদি আলাদা করে সি পি আই (এম-এল) লিবারেশন বোঝেন তাহলে নিঃসংশয়ে বলা যায় তাঁরাও পারবেন না। কিছু কিছু অঞ্চলে শক্তিশালী এস ইউ সি আই বা আর এস পি, ফরোয়ার্ড ব্লক — এঁরা কেউই পারবেন না। কিন্তু এঁরা সকলে যদি একত্র হন, তাহলে শক্তিটা উড়িয়ে দেওয়ার মত হয় না। এঁরা এক হলেই কি জিতে যাবেন? বা জনসমর্থন পাবেন? এক এক করে উত্তর ভাবা যাক।
কে যেন বলেছেন “I do not fight fascists because I will win. I fight fascists because they are fascists.” এই মুহূর্তে এর চেয়ে বড় কথা নেই। সমস্ত বামপন্থী শুধু নয়, সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয় দেশপ্রেমিক মানুষেরই এই কথাটাই শিরোধার্য করা দরকার। বড় কথা হল সমস্ত বামপন্থী এক হতে পারবেন কিনা।
লোকসভা নির্বাচনের আগে ৩রা ফেব্রুয়ারি বামফ্রন্টের ডাকা ব্রিগেড সমাবেশে লিবারেশন নেতা দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের উপস্থিতিকে বৃহত্তর বাম ঐক্যের পূর্বাভাস বলে যাঁরা আশা করেছিলেন, অচিরেই তাঁদের ভুল ভেঙে যায় কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের উদগ্রীব উন্মাদনায়। আজকের সঙ্কটেও, ভয় হয়, বাম ঐক্যের চেয়ে বৃহত্তম বামপন্থী দলটির নেতৃত্বের কাছে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের সখ্য বেশি প্রার্থনীয় না হয়। আরো আশঙ্কা এই যে ঐক্যের প্রচেষ্টা হলে হয়ত লিবারেশন কর্মীরা বলবেন “অমুক বছর যে আমাদের অমুক কমরেডকে ওরা মেরেছিল?” প্রত্যুত্তরে সিপিএম কর্মীরাও অনুরূপ হিংসার ইতিহাস তুলে ধরবেন। এস ইউ সি আই বলবেন “সিপিএম সংশোধনবাদী”, আর সিপিএম বলবেন “ওরা আবেগসর্বস্ব অতি বাম। বিপ্লবের পক্ষে ক্ষতিকর।”
এই যদি চলতে থাকে, তাহলে ভারতে বামপন্থী বলে আর কেউ তো থাকবেই না, বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায় ভারত ব্যাপারটাই আর থাকবে না।
এবার জনসমর্থনের প্রশ্ন। বামপন্থীরা সমর্থন পাবেন, কিন্তু পেতে গেলে ঠিক করতে হবে কাদের সমর্থন চাইছেন। সকলের সমর্থন কথাটার আজ আর কোন মানে নেই। ভারতে এখন ঔপনিবেশিক শাসন চলছে না। হিন্দু ফ্যাসিবাদ বাইরে থেকে আসা জিনিস নয়। তাই একে পরাস্ত করতে মহাত্মা গান্ধী যেরকম দল মত ধর্ম জাতি নির্বিশেষে সব ভারতবাসীকে এক করতে চেষ্টা করেছিলেন, সেরকম প্রচেষ্টার কোন মানে হয় না। স্পষ্টতই ভারতে যে সামাজিক ওলট পালট হয়নি অথচ হওয়া উচিৎ ছিল ইতিহাসের নিয়মে, এখন তারই সময়। অর্থাৎ এখন পক্ষ নেওয়ার সময়। বামপন্থীরা, যদি সত্যিই বামপন্থী হন, তাহলে আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুর পক্ষ নেবেন। নিম্নবর্ণের মানুষের পক্ষ নেবেন। সারা পৃথিবীতে, আমাদের দেশে তো বটেই, জঙ্গল এবং বন্যপ্রাণকে গ্রাস করতে উদ্যত পুঁজিবাদ। পুরো গ্রহটারই ধ্বংস সাধনে উদ্যত, সরকারপুষ্ট বৃহৎ পুঁজি। ধ্বংস থেকে বাঁচতে হলে অরণ্যের অধিকার অরণ্যবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। তাই বামপন্থীদের আদিবাসীদের পক্ষেও অবশ্যই থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে এঁরাই কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তবে এঁদের পক্ষে দাঁড়াতে হলে বামপন্থীদের দীর্ঘকাল সমর্থন করতেন এমন অনেক মানুষের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিও কিন্তু নিতে হবে। গোড়াতেই বলেছি ফ্যাসিবাদ অতি উৎকৃষ্ট ছাঁকনি। সেকথা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে সত্যি তা নয়। চারপাশে তাকালেই দেখা যাচ্ছে, জীবনে কখনো বামপন্থীদের ছাড়া অন্য কাউকে ভোট দেননি এমন বহু মানুষের সুপ্ত মুসলমানবিদ্বেষ কেমন বেরিয়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থীদের ভোট এক লহমায় ২৩% থেকে ৭% এ নেমে আসার পেছনে এঁরা বড় কারণ। অবশিষ্ট সাত শতাংশের অনেকেও যে “কাশ্মীরকে বেশ টাইট দেওয়া গেছে” ভাবছেন না এমনটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদীরা আরো সূক্ষ্ম ছাঁকনি প্রয়োগ করতে চলেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং চাকরিতে বর্ণভিত্তিক সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। তাতে যে বহু বাম সমর্থক উচ্চবর্ণের মানুষই উল্লসিত হবেন তা পরিষ্কার। বর্ণবাদকে আলাদা করে বোঝার প্রয়োজন নেই, শ্রেণীর লড়াই ছাড়া আর কোন লড়াই নেই — এই ভ্রান্তির ফল তখন বামপন্থীদের ভুগতে হবে। অর্থাৎ আরো অনেক সাবেকি সমর্থক সরে যাবেন। বামপন্থীরা সে ঝুঁকি নেবেন তো? এখন অবশ্য তাঁদের আর হারানোর কিছুই নেই। আর কবি তো বলেছেনই “তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে। তা বলে ভাবনা করা চলবে না।”

%d bloggers like this: