অহৈতুকী পার্টিজানপ্রীতি

লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না

মৃণাল সেন প্রতিভাবান, মৃণাল সেন এ দেশে নতুন ধারার চলচ্চিত্রের দিকপালদের একজন, মৃণাল সেনের লেখার হাত চমৎকার — এসব গুণ সত্ত্বেও তাঁর একটা বড় দোষ তিনি রাজনৈতিক। ছবিতে বা ছবির বাইরে তিনি কখনো পাঁচিলের উপর বসে সিগারেট হাতে পা দোলাননি। নিরপেক্ষ হতে তাঁর বয়ে গেছে।
শুধু রাজনৈতিক নয়, তিনি প্রায়শই পার্টিজান। তাঁর ছবির রঞ্জিত মল্লিক যে চাকরি স্যুটেড বুটেড হওয়াটাকেই যোগ্য হওয়ার প্রাথমিক শর্ত বলে মনে করে সেই চাকরি না পেয়ে স্যুট বুটের দোকানে আধলা ইঁট ছুঁড়ে মারে। তাঁর ছবিতে ফিল্ম ইউনিট নিজেদের শৌখিন মানবপ্রেমের অসারতা উপলব্ধি করে শুটিং বন্ধ করে ফিরে যায়। অতএব গত পরশু অব্দিও মৃণাল সেন আজকের ভদ্রলোকদের পাঞ্চিং ব্যাগও ছিলেন। প্রমাণ চাই? দিচ্ছি।
হয়ত আমার নিজের মুদ্রাদোষেই অদ্ভুত সব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠেই রবিবাসরীয় কাগজে দেখলাম এক স্বনামধন্য প্রাক্তন আমলা নতুন বাঙালিদের নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন আজকের বাঙালি যে বাংলার সংস্কৃতি ভুলে গেছে, হিন্দি, ইংরিজি, বাংলা মিশিয়ে আজব ভাষায় কথা বলছে তার দায় যে নির্দিষ্ট কোন সরকারের ঘাড়ে চাপানো উচিৎ তা নয় তবে এর জন্যে আসলে দায়ী ষাটের দশক থেকে শুরু হওয়া বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। তার ফলেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে পুঁজির পলায়ন, আর তারই দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল নাকি বাঙালির ক্রমশ অবাঙালি হয়ে ওঠা। অবশ্য এমন নয় যে এই অভিযোগ ইনিই প্রথম করলেন। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর পর আউটলুক পত্রিকায় তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও একই কথা লিখেছিলেন। কিন্তু যে কারণে সেই আমলার লেখাটার কথা এখানে উল্লেখ করছি সেটা হল তিনি এক জায়গায় লিখেছেন
“এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের মতো কেবল পাড়ার মোড়ে বা রকে বসে আড্ডা না দিয়ে, কিংবা সরকারি চাকরি হল না — এই ক্ষোভে নিজেদের নষ্ট না করে রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করে। স্থানীয় কাউন্সিলরের আশীর্বাদে ধন্য হলে তারা ছোট ছোট হকার স্টল খোলে কিংবা জ়োম্যাটো, সুইগি, ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজ়ন-এর মতো সংস্থার হয়ে মোটরবাইক চড়ে ডেলিভারি বয়ের কাজ করে। তারা কল সেন্টার বা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করে, আন্দোলনের চাহিদা ছাড়াই। তারা ঘাম ঝরায়, কিন্তু ১২ জুলাই কমিটির নাম শোনেনি কোনও দিন। এরা ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ দুনিয়ায় ওতপ্রোত জড়িত, মোবাইল রিচার্জ বা ওটিপি ব্যবহারে চোস্ত, কিন্তু এরা কেউ কোনও দিন সাহিত্যপত্রিকা বা জীবনানন্দের কবিতা পড়েনি।
এরা দিনরাত্রি কাজ করে, মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারাদের মতো মোটেই নয়।”
লেখাটা পড়া শেষ করে কাগজটা ভাঁজ করে রেখেছি সবে, এমন সময় হোয়াটস্যাপে এক সিনেমা অন্তপ্রাণ বন্ধু জানাল মৃণাল সেন প্রয়াত। লেখকের বক্তব্য সঙ্গত না অসঙ্গত তা বিচার করতে বসছি না এখন। শুধু বক্তব্য এই যে লক্ষ্য করুন বামপন্থী রাজনীতির কার্যকলাপের দায় নিতে হল মৃণাল সেনের ছবিকে। এটা আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাতার ক্ষেত্রে হয় বলে মনে হয় না, সম্ভবত আরেক ঘোষিত মার্কসবাদী ঋত্বিককুমার ঘটকের ক্ষেত্রেও নয়।
মৃণাল সেনের একাধিক ছবিতে অভিনয় করে নজর কেড়েছিলেন এক অভিনেতা। প্রায় প্রতি সাক্ষাৎকারেই বলেন “মৃণালদার থেকে কত যে শিখেছি” ইত্যাদি। অধুনা নিজে ফিল্ম বানান। আমার মত অবসর যাপনের জন্যে ফিল্ম দেখা অশিক্ষিত লোকের সেসব ফিল্ম মুখে না রুচলেও ভদ্রসমাজে তাঁর ছবি যথেষ্ট জনপ্রিয়। তিনিও কয়েকবছর আগে নবীন পরিচালক আদিত্যবিক্রম সেনগুপ্তের ছবির সমালোচনায় এক জায়গায় লিখেছিলেন “আশির দশকের মৃণাল সেনের ছবির মত।“ কেন? না ছবিতে টানাটানির সংসার চালানো এক শ্রমিক দম্পতিকে দেখানো হয়েছিল যাদের জীবিকা অর্জনের লড়াই এত কঠোর যে ঠিক করে কথাও হয় না সারাদিন, দেখা হয় পলক পড়ার মত। আর ক্ষণিকের জন্যে ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল একটি লাউডস্পিকারকে, যা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের আন্দোলনের সংবাদ বিসংবাদ। বারবার এসে পড়ছিল অর্থনৈতিক মন্দার নানা লক্ষণও।
অর্থাৎ মৃত্যুর পরে লোকের নিন্দা করতে নেই — এই সূত্র মেনে যত বিখ্যাত, অবিখ্যাত লোকের শ্রদ্ধাঞ্জলি আমরা এখন দেখছি, পড়ছি তার অনেকগুলোর আড়ালেই আছে এই অনুভব, এই মতামত যে মৃণাল সেনের ছবি আসলে বাতিল সময়ের বাতিল দলিল। বাতিল মতাদর্শের বাতিল বুলি ছাড়া ও থেকে আর কিচ্ছু পাওয়ার নেই। কিছু কিছু লোকের কাজ নিজ গুণে এমন উচ্চতায় পৌঁছে যায় যে সে কাজকে ভাল না বললে আবার রুচিশীল তকমা পাওয়া যায় না, উচ্চকোটির সদস্য হিসাবে পরিচয়টা নড়বড়ে হয়ে যায়। অগত্যা মৃণাল সেন সম্পর্কে গদগদ না হয়ে আজ অনেকেরই উপায় নেই। কিন্তু বাংলার ফিল্ম জগতের একজনেরও কাজ দেখলে কি মনে হয় যে কেউ “মৃণালদার” থেকে কিছু শিখেছেন?
সত্যি কথাটা স্বীকার করে ফেলা যাক। যাঁরা ছবি বানান আর আমরা যারা দেখি, কেউই বিশ্বাস করি না যে মৃণাল সেনের ছবিতে আর দেখার কিছু আছে। কেন করি না? কারণ স্রোতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা, প্রতিবাদ করা — এসবের অভ্যেস আমরা ‘মহাপৃথিবী’ ছবির ভিক্টর ব্যানার্জির মায়ের ডায়রির পাতার মতই পুড়িয়ে দিয়েছি। ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা বাধ্য হতে শিখেছি। বাধ্য হলেই যাবতীয় আরাম, যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্য, যাবতীয় ভোগ্যপণ্য আমাদের হাতের মুঠোয় তা আমরা বুঝে গেছি। পোষ্যকে দুভাবে বাধ্য করা যায়। এক, কলার পরিয়ে। দুই, লোভ দেখিয়ে। বস্তুত লোভ দেখিয়ে বাধ্য করে নিয়ে কলার পরানোই সবচেয়ে উত্তম উপায়। আমরা বাঙালি ভদ্দরলোকেরা সেভাবেই বাধ্য হয়েছি। আমরাই তো বাংলা ছবির দর্শক, আমাদেরই কেউ কেউ বাংলা ছবির নির্মাতা।
আমরা এতটাই বাধ্য যে শুধু যে নিজেরা প্রতিবাদ করি না তা নয়, অন্যকে প্রতিবাদ করতে দেখলেও যারপরনাই রুষ্ট হই। তাই কলকাতায় মিটিং, মিছিল হলে বাসে আলোচনা করি গাঁয়ের লোকেদের কাজকম্ম নেই তাই এই সুযোগে কলকাতায় বেড়াতে চলে আসে, ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়। মাননীয় আমলা যাদের কথা লিখেছেন আর কি। “মৃণাল সেনের ছবির সর্বহারা।”
এই যে সাদা কলারের আমরা, আমাদের কী করেই বা মৃণাল সেনের ছবি ভাল লাগবে? কলকাতায় মিছিল বেরোয়, ট্যাক্সিচালকরা ইউনিয়ন করে তা নিয়ে বাংলার বাইরের লোকেদের কাছে আমাদের যে লজ্জার শেষ নেই। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন। বছরখানেক আগে দেশের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইতে কৃষকদের বিশাল মিছিল হল। সেখানকার ভদ্রলোকেরা অনেকেই সেই মিছিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। কদিন আগে সারা দেশের কৃষকরা দিল্লীতে মিছিল করলেন। সেখানেও আমাদের মত ভদ্রলোকেরা খাবার নিয়ে, জল নিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। এখানকার মত খবরও হল না কোন রাস্তায় কার গাড়ি আটকে পড়ে কার ফ্লাইট মিস হয়েছে। বাংলায় যখন কোন মিছিল, মিটিং হয় তখন আপনি তন্নতন্ন করে সংবাদের হাজারটা উৎস খুঁজেও একটা প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাবেন না। সেটা হল “কেন?” মানে মিছিলটা হল কেন? কোন দাবীতে? খবরটা আমাদের কেউ দেয় না কারণ আমরা জানতে চাই না। কোন রাস্তা দিয়ে গেলে মিছিলটা এড়াতে পারব সেটুকু জানতে পারলেই আমরা খুশি। অতএব কী দরকার বাপু সিনেমার মধ্যে ওসব জিনিসের? রাজ্যটা অনেক দেরীতে উন্নয়নের রাস্তা ধরেছে, ওসব দেখলে বা দেখালে লোকে আবার যদি বিগড়ে যায়?
এভাবেই সত্যি সত্যি ভাল থাকা গেলে কোন কথা ছিল না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সাদা কলারের লোকেরা লক্ষ্মী হয়ে থেকেও মৃণাল সেনের সর্বহারাদের মত দুর্গতিগুলো এড়াতে পারছে না। কারখানার অস্থায়ী কর্মীদের মতই বহুজাতিকের এক্সিকিউটিভের হুটপাট চাকরি চলে যাচ্ছে, কর্মী হিসাবে যেসব অধিকার জন্মগত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সে অধিকারগুলো কোম্পানি বলে কয়েই কেড়ে নিচ্ছে অথচ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলা যাচ্ছে না। ছ ঘন্টার বদলে আট ঘন্টা, আট ঘন্টার বদলে দশ ঘন্টা কাজ করেই চলেছেন। বাড়িতে এসেও ল্যাপটপ খুলে মালিকের লাভের কড়ি বাড়িয়েই চলেছেন। বেসরকারী ক্ষেত্রের বসেদের কথা বাদ দিন, সরকারপোষিত স্কুল কলেজের সামান্য টিচার ইন চার্জরাও সাক্ষাৎ হিটলার হয়ে উঠেছেন। সেই যে সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা, যারা ১২ই জুলাই কমিটির নাম শোনেনি, আন্দোলনের নাম না করেই সোনা মুখ করে কাজ করে, তারা এত ভাল আছে যে বারো-পনেরো হাজার টাকার জন্যে বাইক নিয়ে দিন নেই রাত নেই ঝড় নেই জল নেই সুইগি, জোমাটোর হয়ে ডেলিভারি করছে। পিঠে খাবারের বোঝা তবু এ খাবার যাবে না ছোঁয়া। ছুঁয়ে ফেললেই ভিডিও ভাইরাল হবে, সামান্য মাইনের, বিন্দুমাত্র নিরাপত্তা ও অধিকারবিহীন চাকরিটিও যাবে।
একজন লিখেছিলেন “খাওয়া না খাওয়ার খেলা যদি চলে সারা বেলা হঠাৎ কী ঘটে যায় কিচ্ছু বলা যায় না।” একেবারে যে কিছু ঘটছে না তাও নয়। কয়েক বছর আগেই উবের, ওলার আগমনে যারা সচ্ছলতার মুখ দেখেছিল ঐ দালালদ্বয় এখন তাদের টাকা পয়সা কমিয়ে শুধু নিজেদের পকেট ভর্তি করায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বাইপাসের উপর গাড়ি পেটাচ্ছে। আমি, আপনি তখনো জানতে চাইছি না দাবীগুলো কী কী?
আর কটা দিন সবুর করুন। এ আই আসিছে চড়ে জুড়ি গাড়ি। তখন আমার আপনার অবস্থাও অ্যামাজনের ডেলিভারি বয় বা উবেরের ড্রাইভারের মত হতে পারে। সেদিন মৃণাল সেনের কোরাস হয়ত খুব অলীক মনে হবে না। যে নায়ক আধলা ইঁট ছোঁড়ে তাকে যে স্রেফ নকশালই মনে হবে তাও ঠিক করে বলা যায় না। আজকের অর্থহীন তর্পণ বাদ দিন। মৃণাল সেনকে আসলে সেদিন আপনার দরকার হবে।
আজ যতই ফেসবুকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বান ডাকুক না কেন, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে না দেখেই মৃণাল সেনের ছবিকে আঁতেল আখ্যা দেওয়ার একটা প্রবণতা ছিল এবং আছে। কারণ ছবিগুলো পপকর্ন খেতে খেতে দেখা যায় না। অপমানে যেদিন সবার সমান হতে হবে, সেদিন বোঝা যাবে আসলে কোন ছবিগুলো আঁতেল, অর্থাৎ আমার আপনার কথা কোনদিন বলেনি, আমাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে চলা, আমাদের টেনে নিয়ে চলা জীবনের কথা বলেনি, সম্পর্কের টানাপোড়েন আর গোয়েন্দা গল্পের গাড্ডায় ফেলে রেখেছিল।
মৃণাল সেন মার্কসবাদী ছিলেন আমৃত্যু। পরিবর্তনের হাওয়া গায়ে লেগে যখন এই বাংলায় অনেক আগমার্কা বামপন্থী কবি, অভিনেতা, গাইয়ে রাতারাতি আবিষ্কার করলেন তাঁরা এত বছর ভুল পথে ছিলেন, তখনো মৃণাল সেন অবস্থান বদলাননি। তা মার্কসবাদ ব্যাপারটাকেই যখন বাতিল করে দিয়েছিল সকলে তখন একজন মার্কসবাদীর চলচ্চিত্র ভাবনাকে বাতিল করে দেওয়া কিছু আশ্চর্যের নয়। কিন্তু যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা জানেন হাওয়া বদলাচ্ছে। এতটাই বদলেছে যে ‘দি ইকনমিস্ট’ এর মত চরম দক্ষিণপন্থী পত্রিকা মার্কসের দ্বিশতবার্ষিকীতে লিখেছে পুঁজিবাদকে বর্তমান সঙ্কট থেকে বাঁচাতে হলেও মার্কস পড়তে হবে। অতএব কেউ যদি সচেতন হন, তাহলে এই নাম কা ওয়াস্তে তর্পণ শেষ হওয়ার পরেই মৃণাল সেনকে শিকেয় তুলে রাখার ভুল তিনি করবেন না। তবু এরকম বলার মানে হয় না যে বাংলা ছবির নির্মাতারা তাঁর মত সোচ্চার বামপন্থী ভাবধারার ছবি না বানালেই সেগুলো ফালতু। বলার কথাটা হল ছবিতে আটপৌরে জীবন, তার লড়াই, তার সঙ্কট না থাকাই ফাঁকিবাজি। সেই ফাঁকিবাজি করে, তাকে প্রশ্রয় দিয়ে মৃণাল সেনের প্রয়াণে গদগদ হওয়ার মানে হয় না।
সেই ফাঁকিবাজি না করার জন্যে মার্কসবাদী বা বামপন্থী ছবি বানাতে হয় না। অনেকেই তো বলেন পশ্চিমবাংলায় বাম শাসন ছিল অপশাসন। সেই অপশাসনের স্বরূপ নিয়ে কটা বাংলা ছবি হয়েছে? অথচ সারা পৃথিবীতেই তো অপশাসনের মধ্যে থেকেই দারুণ দারুণ ছবি হয়। ইরানের পরিচালকরা যেমন করেন। বিভিন্ন দেশের ইতিহাসের রক্তাক্ত, অস্থির সময়গুলো নিয়েই তো অসামান্য সব ছবি হয়। সেগুলো সবই যে বামপন্থী ছবি তা তো নয়। আবার একটা কাকতালীয় ঘটনার কথা বলি।
মৃণাল সেন মারা যাওয়ার আগের রাতে নেটফ্লিক্সে আলফোনসো কুয়ারনের ‘রোমা’ দেখছিলাম। মেক্সিকোর ছাত্র আন্দোলন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় বানানো সাদাকালো, আবহসঙ্গীতবিহীন ছবিটা দেখতে দেখতে আমার মত ভেতো বাঙালি, ওয়ার্ল্ড সিনেমার সাথে ক্ষীণ সম্পর্কযুক্ত দর্শকের বারবারই ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনের ছবিগুলোর কথা মনে পড়ছিল। এই ২০১৮তে তৈরি ছবিতে ১৯৭০-৭১ এর গল্প বলা হচ্ছে। এমনকি ১০ই জুন ১৯৭১ এ সংঘটিত কুখ্যাত কর্পাস ক্রিস্টি গণহত্যাও দেখানো হচ্ছে। মৃণাল সেন তো রাজনৈতিক হত্যাগুলোকে পর্দায় এনেছিলেন কেবল কাগজের শিরোনামগুলোর মাধ্যমে। এই বাংলার কেউ ‘রোমা’ বানালে বোদ্ধারা নির্ঘাত বলতেন “এ ছবি দিয়ে কী হবে? এ তো মৃণাল সেনের মত।“
‘রোমা’ ছবির যে সময়কাল তা এই বাংলাতেও অস্থিরতা, ছাত্র আন্দোলন, গণহত্যার সময়। ঠিক ১৯৭১ সালেই ঘটেছিল কাশীপুর গণহত্যা। এখন তো রাজ্যে কংগ্রেস সরকার নেই, সিদ্ধার্থশঙ্কর মৃত, সেই কান্ডের খলনায়করা সকলেই প্রায় ক্ষমতাহীন, নির্বিষ। কই হোক তো দেখি একটা ভাল ছবি সেই নিয়ে। বামফ্রন্ট আমলেও তো দুর্নীতি, রাজনৈতিক হিংসার অনেক ঘটনা। নাহয় তাই নিয়েই হোক। এ আমলে ওসব নিয়ে ছবি করলে তো পুলিশে ধরবে না, উলটে একটা ভূষণ টুষণ জুটে যেতে পারে।
হবে না। কারণ “মৃণালদার” থেকে যদি স্রেফ একটা জিনিস শেখার থাকে, সেটা হল বুকের পাটা। ওটা আবার কারো শেখা হয়নি। আর মেধা? থাক সে কথা। বরং স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গলা ধরে আসা চলুক। পার্টিজানদের ব্যাপারে অস্বস্তি কাটানোর সেরা উপায় তাদের কাল্ট ফিগার বানিয়ে দেওয়া। চিরকালই।

ভুল জায়গায় সিরিয়াস

দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই

এ লেখার শিরোনামের জন্য আমি এক অগ্রজ সাংবাদিকের কাছে ঋণী। তাঁর সঙ্গে যে সময় কাজ করতাম তখন নানা কথায় তিনি বলতেন “বাঙালি ভুল জায়গায় সিরিয়াস, তার ভুল জায়গায় আবেগ।” সত্যি বলতে তখন কথাটা শুনে বেশ রাগই হত। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে যা চলছে তাতে তাঁকে সামনে পেলে করজোড়ে নিবেদন করতাম “গুরু, তুমিই ঠিক। তুমিই সত্য।” কথাটা হোয়াটস্যাপেও লেখা যায়, কিন্তু তাতে আবেগটা (ভুল জায়গায় হলেও) ঠিক ফুটিয়ে তোলা যায় না।
বিষয়টা হল এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির টিভি বিজ্ঞাপন। জনগণ দেখছি যারপরনাই রুষ্ট। ডান, বাম, যখন-যেমন-তখন-তেমন নির্বিশেষে সকলেই গেল গেল রব তুলেছেন। বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতির জন্যে কেঁদে কেটে একসা। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান তথা কবিতার প্যারডি বানিয়ে ফ্ল্যাট বেচছে প্রোমোটার। তাতে বাঙালি সংস্কৃতি প্রায় ক্যাওড়াতলা পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ। যতদিন লোকে ফেসবুকে বিষোদগার করছিল তদ্দিন ব্যাপারটা নিয়ে আদৌ ভাবনা চিন্তা করিনি। কিন্তু তারপর জানলাম শ্রীরামপুরে (যেখানে প্রাসাদোপম ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মাথা তুলে দাঁড়ানোর কথা) নাকি এ নিয়ে কারা সব মিটিং মিছিলও করে ফেলেছে। ভুল জায়গায় সিরিয়াস হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
কার সংস্কৃতি কে রাখে? ভদ্দরলোকেরা আজকাল পারতপক্ষে ছেলেমেয়েকে বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করেন না, কেউ করলে দিন রাত কানের কাছে বলতে থাকেন “এসব স্কুলের মিডিওকাররাও কিন্তু ওদের স্কুলের ফার্স্ট বয়দের থেকে ভাল।” যেন ইংরিজি মাধ্যম স্কুল থেকে ফি বছর শয়ে শয়ে শেক্সপিয়ার আর ডিকেন্স বেরোচ্ছে, বাংলা মাধ্যম থেকে কেবল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি লিট।
ইংরিজির জন্যে আকুতি না হয় তাও মানা গেল, ইদানীং আবার বাংলা সরিয়ে হিন্দিকে দ্বিতীয় ভাষা করবার হিড়িক পড়েছে বাঙালি বাবা মায়েদের মধ্যে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী মাঝে একবার, কে জানে কোন লগ্নে, বললেন বাংলার সব শিশুকে বাংলা পড়াতেই হবে। তাতে প্রগতিশীল বাঙালিরা একেবারে রে রে করে উঠলেন। তখন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য — এসব মনে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী লগ্ন দোষ কেটে যেতেই আবার ওসব ভুলে গিয়ে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করতে নেমে পড়েছেন। সেসবের বিরুদ্ধে কে কে কোথায় কোথায় মিছিল করেছেন জানতে ইচ্ছে করে। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলো উঠে যাচ্ছে। কদিন আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটাই উঠে যেতে বসেছিল, কিছু ক্ষুদিরামপ্রতিম মানুষ আপাতত আটকেছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী কদিন আগে বলেছেন সরকার ভাবছে স্কুলগুলোকে ইংরিজি মাধ্যম করে দেবে কিনা। এসবের কটা প্রতিবাদ হয়েছে? বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর মানোন্নয়নের দাবীতে সরকারের পেছনে কজন লেগেছে? ওসবে কারোর আগ্রহ নেই। কোথায় কোন বিজ্ঞাপনে দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি করা হয়েছে তাই নিয়ে আন্দোলন।
এসব নাটক যতই করুন, দুনিয়াশুদ্ধ লোক জেনে গেছে বাঙালির বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। নাহলে বহুজাতিক টেলিকম কোম্পানির সাহস হয় না কলকাতার দৈনিকগুলোর প্রথম পাতায় ছাপার বিজ্ঞাপনের বয়ানটা স্রেফ গুগল ট্রান্সলেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়ার। নিশ্চিত থাকতে পারেন ওরকম তামিলে চেন্নাইয়ের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে বা অমন মালয়ালমে তিরুবনন্তপুরমের কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোলে কোম্পানিটির সর্বভারতীয় সি ই ও টিকে করজোড়ে ক্ষমা চাইতে হত।
আর জানবে না-ই বা কেন? পনেরো থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী বাঙালিদের কথা শুনেছেন?
“আরে ইয়ার, তোদের একটা কথা কতবার বলতে হবে?”
“বস, কাজটাতে এত এফর্ট দিলাম, অব এক পার্টি তো বনতা হ্যায়।”
“যা-ই বল, মেয়েটা কিন্তু একটু হটকে।”
“উফ! কাকিমা আলুর দমটা যা হয়েছে না। অসাম।”
কারোর দিকে আঙুল তুলে লাভ নেই। এই ভাষায় কথা বলছে আমার আপনার ভাই, বোন, ছেলেমেয়েরা। বিদ্রোহ, বিপ্লব যা করতে ইচ্ছে করে নিজের ঘর থেকে শুরু করুন না। আর যদি আমার মত অক্ষম হন, তাহলে স্রেফ “চেপে যান”, লোক হাসাবেন না।
আমার মত মফঃস্বলের গাঁইয়ার কথা ছেড়ে দিন, শহুরে বাঙালিদের মুখে, ফি হপ্তায় মলে যাওয়া বাঙালিদের কাছে গত এক দশক ধরে শুনছি বাংলা সিনেমায় নাকি নবজাগরণ এসেছে। তা নবজাগরণের যুগে বাংলা ছবির নাম কী হচ্ছে? ম্যাডলি বাঙালি; মাছ, মিষ্টি অ্যান্ড মোর; আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস, ঘরে অ্যান্ড বাইরে, অ্যাডভেঞ্চারস অফ জোজো। যেসব ছবির নাম তবু আগাগোড়া বাংলা সেগুলোরও টাইটেল কার্ডে বাংলা হরফ খুঁজে পাওয়া ভার। এমনকি আমাদের এ যুগের মহানায়ক, যিনি নাকি সংসদে বাংলায় বক্তৃতা দিয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, তাঁর ছবির পোস্টারেও বাংলা হরফ খুঁজে হতাশ হয়েছি। সে ছবিটার রেডিও বিজ্ঞাপনে শুনলাম তিনি বললেন “Let’s celebrate পয়লা বৈশাখ, let’s celebrate Kabir.” উত্তমকুমার মরে বেঁচেছেন। আমার শুধু ভয় করে এই রিমেকের যুগে আবার সপ্তপদী রিমেক না হয়। শেক্সপিয়ারের সংলাপ বলা তাঁর দ্বারা হবে না, উৎপল দত্তকে লাগবে — এটা বোঝার বিনয় বা কান্ডজ্ঞান তো এখনকার মহানায়ক বা নির্দেশকদের মধ্যে দেখা যায় না। উত্তম, অজয় করের মত ভেতো বাঙালি তো এঁরা নন, সারাসসোয়াতির সাক্ষাৎ বরপুত্র সক্কলে।
তা ভদ্রমণ্ডলী এসবের প্রতিবাদ কবে করবেন? এতে ঐতিহ্যে আঘাত লাগছে না? নাকি আপত্তিটা দ্বিজেন্দ্রলালে হাত দেওয়া হয়েছে বলে? তা যদি হয় তাহলে ব্যাপারটা আরো হাস্যকর। দ্বিজেন্দ্রলাল স্বয়ং প্যারডি লিখতেন। রবীন্দ্রনাথের গান “সে আসে ধীরে, যায় লাজে ফিরে / রিনিকি ঝিনিকি রিনিঝিনি মঞ্জু মঞ্জীরে।” দ্বিজেন্দ্রলালের প্যারডি “সে আসে ধেয়ে, এন ডি ঘোষের মেয়ে / ধিনিক ধিনিক ধিনিক, চায়ের গন্ধ পেয়ে।” আপনি বলতেই পারেন কাজটা ভাল হয়নি, আমাদের কবিগুরুকে নিয়ে মশকরা অতি গর্হিত ব্যাপার ইত্যাদি। কিন্তু যিনি নিজেই প্যারডিশিল্পী, তাঁর লেখার প্যারডি হলে আন্দোলনে নামা চলে না। বস্তুত, রবীন্দ্রনাথের কোন গানের বাণীর দিকে আদৌ কান না দিয়ে ঝাঁ ঝাঁ করে পাঁচশো বাজনা বাজিয়ে বা মাঝখান থেকে গাইতে শুরু করার চেয়ে একখানা ভাল প্যারডি করা অনেক বেশি উদ্ভাবনী শক্তির পরিচায়ক। আচ্ছা সত্যি বলুন তো, এত যে দ্বিজেন্দ্রপ্রেম দেখা যাচ্ছে, “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি” ছাড়া ওঁর লেখা আর কটা গান কজনের মনে আছে? গোটা পাঁচেকের বেশি কি? তাহলে যে গীতিকারকে পরশু অব্দি ভুলে ছিলেন তাঁকে নিয়ে সংস্কৃতির ঢাক তেরে কেটে তাক তাক করে না বাজালেই নয়?
কারো কারো অবশ্য আপত্তি অন্যত্র। “এরকম একটা গানকে সামান্য ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করল? এর সাথে জাতীয় আবেগ জড়িয়ে…।” আবার ভুল জায়গায় আবেগ। বিজ্ঞাপনের ইতিহাস না ঘেঁটেও বোঝা যায় চিরকাল বহু জনপ্রিয়, আবেগজড়িত আসল গান, আসল সুরকে ব্যবহার করে বহু বিজ্ঞাপন তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তেই যেমন একটা ধূপের বিজ্ঞাপনে ভীষণ বেসুরো গলায় “আমার এ ধূপ না পোড়ালে / গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে” গাওয়া হচ্ছে। বাজি রেখে বলতে পারি এই লেখায় যে মুহূর্তে টাইটান শব্দটা আপনি পড়বেন, অমনি মাথায় একটা সুর বেজে উঠবে। সেটা কী আসলে? মোজার্টের ২৫ নম্বর সিম্ফনির একটা অংশ। ওটা টাইটানের বিজ্ঞাপনে ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি। ওটা বাদ দিয়ে আজ আর টাইটান ঘড়ির কথা ভাবাই যায় না। তাতে কী এসে গেল মোজার্টের? কী-ই বা এসে যায় রবীন্দ্রনাথের? নাকি বক্তব্যটা এই যে আসল গান গাও আপত্তি নেই, প্যারডি গেয়ে জিনিস বেচা চলবে না? এ যুক্তি তো খন্ডনেরও অযোগ্য।
সত্যি সত্যি আন্দোলন করবেন? ইস্যু কম পড়িয়াছে? কেন? কোথাও কোন চাকরিতে কর্মীদের অধিকার বলে কিছু থাকছে না। তাই নিয়ে পথে নামুন না। এ তো আপনারই ইস্যু, চাষাভুষোদের ইস্যু নয়, যারা মিছিলে নামলে আমরা সাদা কলারের চাকুরেরা বলি “কোন কাজ নেই, কলকাতায় ঘুরতে আসে আর ফ্রিতে বিরিয়ানি খেয়ে যায়।”
গত তিরিশ বছরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসার ঠ্যালায় কলকাতার জলাভূমি প্রায় নিশ্চিহ্ন, মফঃস্বলে পুকুর চুরি আর বাগধারা হয়ে নেই। তার ফলে ক্রমবর্ধমান জঞ্জালের স্তূপ, সাবমার্সিবল পাম্পের বাড়বাড়ন্তে ভূগর্ভের জলস্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। অথচ এগুলো কোন রাজনৈতিক দল ইস্যু বলে মনে করে না। এসব নিয়ে আন্দোলন করুন না। স্তূপীকৃত জঞ্জাল কোন সংস্কৃতির পরিচায়ক?
রিয়েল এস্টেট ব্যবসার সুবিধার্থে আইন কানুন বদলে ফেলে হেরিটেজ বিল্ডিং ভেঙে ফেলার সুবব্যবস্থা হয়েছে। তাতে ঐতিহ্য সঙ্কটে পড়েনি? তার প্রতিবাদ করবেন না?
উন্নয়নের নামে হাজার হাজার গাছ কাটা হয়ে গেল। আপনারা সৌন্দর্যায়ন হচ্ছে বলে আহ্লাদে আটখানা হলেন। গাছের চেয়ে কংক্রিট ভাল — এই সৌন্দর্যবোধ কোন সংস্কৃতির অভিজ্ঞান? এখন বায়ু দূষণে দিল্লীর সাথে পাল্লা দিচ্ছে কলকাতা। তা নিয়ে আন্দোলন করবেন না? বাঙালির তো প্রাণ রক্ষার সঙ্কট সেটা। প্রাণ বাঁচলে তবে তো সংস্কৃতি বাঁচবে। ঐতিহ্য কার? মানুষেরই তো?
নাঃ! বাদ দিন। এত কে ভাবতে যাবে? আর এসব নিয়ে মিছিল করতে গেলে আবার চড়াম চড়াম ঢাক বাজার সম্ভাবনা আছে। তার চেয়ে “শ্রীকান্তর গান এত ভালবাসতাম, আর ও কিনা এই বিজ্ঞাপনে গাইল!” বলে হা হুতাশ করতে করতে সিরিয়াস আলোচনা করা যাক।

আমার সন্ততি

ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ

ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

— শঙ্খ ঘোষ (বাবরের প্রার্থনা)

যেদিন বাবা হয়েছি সেদিন থেকে ভেবে চলেছি, মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় সন্তানকে যা যা দিয়ে যেতে পারে তার মধ্যে কোনটা সবচেয়ে মূল্যবান?
অনেকে টাকাপয়সা, ধনসম্পদ দিয়ে যান। টাকার দাম মুদ্রাস্ফীতির কারণে দিন দিন কমে, সম্পত্তির মূল্যও নানা কারণে বাড়ে কমে। কথায় বলে কুবেরের ধনও ফুরিয়ে যায়। ফলে সন্তানকে যত ধনসম্পত্তিই দিয়ে যান না কেন, তার মূল্য অবিকৃত থাকবে না।
সফল, কৃতি মানুষেরা তাঁদের সন্তানদের খ্যাতি দিয়ে যান। কিন্তু সেই খ্যাতি বজায় রাখতে হলে সন্তানকেও বিখ্যাত বাবা কি মায়ের মত প্রতিভাবান এবং সফল হতে হয়, যা প্রায়শই হয় না। উপরন্তু বাবা-মায়ের খ্যাতির অপব্যবহার করে সন্তান তাঁদের দুর্নামের কারণ হচ্ছে — এমন দৃষ্টান্তই চোখে পড়ে বেশি। উপেন্দ্রকিশোরের পরে সুকুমার, সুকুমারের পর সত্যজিৎ নেহাতই ব্যতিক্রম। সে জন্যেই মনে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্রের পরে নারায়ণচন্দ্রই বরং বেশি দেখা যায়।
আমরা সাধারণ মানুষ। এ যুগে সন্তানের ভোগ করার মত যথেষ্ট সম্পত্তি রেখে যাওয়ার সুযোগ আমাদের অনেকেরই হবে না। মৃত্যুর পরেও সন্তান “অমুকের ছেলে” বা “তমুকের মেয়ে” হিসাবে সমাজে অতিরিক্ত সম্মান, সুযোগসুবিধা বা খ্যাতি ভোগ করবে তেমন সম্ভাবনাও নেই। তবে কি এমন কিছুই নেই যা আমাদের মৃত্যুর পরেও সন্তানদের সম্পদ না হোক, অন্তত ছাতা হিসাবে কাজ করতে পারে? আমার সন্তানের সঙ্গে আমার সম্পর্কের সীমা তবে আমার শরীর? সেই শরীর অবলুপ্ত হওয়ার পর আমার সাথে সম্পর্কের কোন মূল্যবান অর্জন তার কাছে থাকবে না? তাহলে কেন দেশ কাল নির্বিশেষে বাবা-মায়েরা নিজের জীবনের চেয়েও সন্তানের মঙ্গলকে ঊর্ধ্বে স্থান দেন? আমাদের অষ্টাদশ শতকের কবির কেন মনে হল ঈশ্বরীর দেখা পেলে বাংলার নিরক্ষর পাটনী প্রার্থনা করবে “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”? প্রায় তিনশো বছর পরের কবির কেন মনে হল ভাগ্যান্বেষী উজবেক যোদ্ধা বাবর, যার সাথে সেই বাঙালি পাটনীর কোন দিক থেকে কোন মিল নেই, তিনিও নিজের ঈশ্বরের কাছে বলতেন, আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আমার সন্তানের জীবন দাও? কবির কল্পনা তো আকাশ থেকে পড়েনি, এমনই আকুতি বিভিন্ন ভাষায় কত বাবা-মাকে তো আজও উচ্চারণ করতে দেখি আমরা। সেই বাবা মায়েরা তাহলে জীবন ফুরোলেই ফুরিয়ে যাবেন সন্তানের কাছেও?
কেউ কেউ বলবেন বাবা-মা শিক্ষা দেন, জীবনে নিজের পায়ে দাঁড় করান। সেটাই তো সারাজীবন সঙ্গে থাকে। সেকথা ঠিক, কিন্তু সে অবদান বাবা-মায়ের অনন্য অবদান নয়। মানুষ আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থেকেও শিক্ষা পায়, সর্বোপরি শিক্ষক শিক্ষিকাদের থেকে পায়। এবং যে শিক্ষা সে পায় তার বেশিরভাগটাই স্বোপার্জিত। বাবা-মা বড় জোর সুযোগ তৈরি করে দেন।
ভেবে দেখলাম যে অক্ষয় ধন আমার সন্তানকে দিয়ে যেতে পারি তা হল সমাজ, সংসারের সঙ্গে, সারা পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের বোধ। সুসময়ে, এবং দারুণ দুঃসময়ে, সেই বোধ তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের প্রত্যেককে আমাদের বাবা-মায়েরাও জেনে বা না জেনে ঐ বোধই দিয়ে গেছেন, দিয়ে যাচ্ছেন। ইতিহাসের কোন মুহূর্তে ঠিক কোন জায়গাটায় আমি দাঁড়িয়ে আছি এবং তার সাপেক্ষে বর্তমানে আর ভবিষ্যতে আমার কোথায় দাঁড়ানো উচিৎ সেই বোধ সচেতন বাবা-মায়েরা আমাদের দিয়ে যান জেনে বুঝে। আর যে বাবা-মায়েরা তত সচেতন নন আসলে তাঁরাও স্থান নির্দেশ করে দিয়ে যান তাঁদের কথাবার্তায়, জীবনচর্যায়।
কথাটা নতুন করে উপলব্ধি করলাম টিভিতে তথাকথিত গোরক্ষকদের হাতে নিহত পুলিশকর্মী সুবোধ কুমার সিং এর ছেলে অভিষেকের কথা শুনতে শুনতে।
সুবোধ কুমার খুন হওয়ার পর যত সময় যাচ্ছে তত পরিষ্কার হচ্ছে যে খুন হওয়ার দিনের ঘটনাবলী সুপরিকল্পিত, হঠাৎ উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করেনি। তিনি সাম্প্রতিক অতীতে গোহত্যার “অপরাধে” প্রথম যে খুনটা হয়েছিল দাদরিতে, সেই খুনের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। সেই খুনের অপরাধীদের হাজতবাস করার পেছনে তাঁর যথেষ্ট অবদান ছিল। বদলি হয়ে বুলন্দশহরে এসে পড়ার পরেও আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে আপোষ না করে তিনি হিন্দুত্ববাদীদের যথেষ্ট বিরাগভাজন হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন সুবোধ কুমারকে প্রায়শই খুনের হুমকি দেওয়া হত। খবরে প্রকাশ বিজেপি নেতারা বুলন্দশহর থেকে তাঁর বদলি দাবী করেছিলেন অতি সম্প্রতি। বিপদের মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন জেনেও সুবোধ কুমার ঘটনার দিন পুলিশ ইন্সপেক্টর হিসাবে যা কর্তব্য ঠিক তাই করছিলেন। কোন সাহস তাঁকে প্রণোদিত করেছিল তা বলার জন্যে তিনি নেই, তা দেশ হিসাবে আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু বাবা হিসাবে তাঁর সাফল্য এই অন্ধকারে আমাদের ক্ষীণ আলো দেখাচ্ছে।
সকালের কাগজে মুন্ডিতমস্তক যে ছেলেদুটির ছবি কয়েকশো কিলোমিটার দূরে বসা আমাকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল, সেই বাবা হারা কিশোর যখন টিভির পর্দায় বলে “শুধু মুখ্যমন্ত্রীকে নয়, সারা ভারতের লোকের কাছে আমার আবেদন, হিন্দু মুসলমান নিয়ে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হিংসা দয়া করে বন্ধ করুন,” তখন বোঝা যায় সুবোধকুমার ছেলেটির সঙ্গেই আছেন।
আরো পরিষ্কার হয় যখন অভিষেক বলেন “আমার বাবা একটা কথাই বলতেন ‘আর কিছু হতে পার না পার, সুনাগরিক হও। সব ধর্ম, সব জাতির লোকই এক। তুমি কারো চেয়ে বড় নও, কারো চেয়ে ছোটও নও।”
বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে এই ভাষায় এই কথাগুলো বলতে পারা মুখস্থ বিদ্যায় সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী যে বিদ্যার বলে মধ্যে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর বন্দনা করেন সে বিদ্যার কর্ম নয় এসব। অনুভূতিদেশ থেকে আলো না পেলে শুধু ক্রিয়া, বিশেষণের জোরে এসব কথা বেরোয় না। অভিষেক যখন আমাদের সবাইকে সাবধান করেন এই বলে যে আমরা আত্মহননের পথে এগোচ্ছি; পাকিস্তান, চীনের দরকার নেই, আমরাই একে অপরের অনেক বড় শত্রু হয়ে উঠছি; তখন বোঝা যায় অভিষেকের প্রয়াত বাবা, এবং অবশ্যই মা, এই যুগসন্ধিক্ষণে তার যে স্থান নির্দেশ করেছেন সে সেই স্থানের যোগ্য হয়ে উঠছে। এইখানে মৃত সুবোধ কুমারের জিত, হত্যাকারীদের হার। হত্যাকারীদের সরকার তাঁর নামে রাস্তার নামকরণ করুক আর না-ই করুক, সুবোধ কুমার সন্তানের মধ্যে বেঁচে রইলেন। আমাদেরও বাঁচার রাস্তার সন্ধান দিলেন।
এত কথা বলার পরে একটা প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। সন্তান কি সবসময় বাবা-মায়ের দেখানো অবস্থান মেনে নেয়? নেয় না। প্রকৃতপক্ষে সর্বদা মেনে নেওয়া উচিৎও নয়। কারণ অনেক বাবা-মা এমন অবস্থানও ঠিক করেন যা সমাজের পক্ষে, সন্তানের চারপাশের মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর, পশ্চাৎমুখী। সেইসব বাবা-মায়েদের অবাধ্য সন্তানেরাই যুগে যুগে সমাজকে বদলে দেন, এগিয়ে নিয়ে যান। সেই জন্যেই আমাদেরও বারবার ভাবতে হবে সন্তানকে ঠিক কোথায় দাঁড়াতে বলছি। কার পক্ষে, কার বিপক্ষে? তাকে যে অবস্থান নিতে শেখাচ্ছি তা শুধু তার জন্যে ভাল, না আর পাঁচজনের জন্যেও ভাল — সেকথাও ভাবতে হবে। এমনি এমনি তো আর ঠাকুমা, দিদিমারা বলতেন না “প্রসব করলেই হয় না মাতা।”

%d bloggers like this: